.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

শুক্রবার, ২৩ মার্চ, ২০১৮

সমালোচনা করবেন না


।। জাকারিয়া ইছলাম ।।




(C)Image:ছবি
ক ব্যক্তি তার বন্ধুর গাড়িতে উঠল। গাড়িতে বসেই সে বলে ফেললো, ‘তোমার গাড়ি এত পুরোনো!এরপর তার বাড়িতে প্রবেশ করে আসবাবপত্রের ওপর দৃষ্টি পড়তেই সে বলল, ‘তোমার ঘরের আসবাবপত্রগুলো এতো এলোমেলো কেন? বন্ধুর সন্তানদেরকে দেখে বলল, ‘মাশাআল্লাহ! তোমার সন্তানগুলো তো দেখতে খুব আকর্ষণীয়। কিন্তু এদেরকে আরও ভাল পোশাক পরাও না কেন?’ বন্ধুর স্ত্রী বেচারি কয়েক ঘণ্টা রান্নাঘরে কষ্ট করে তার সামনে বিভিন্ন আইটেমের খাবার পরিবেশন করলো। খাবার দেখে সে আফসোসের সুরে বলল, ‘হায় আল্লাহ! ভাত রান্না করেছেন কেন? তরকারিতে লবণ কম হয়েছে! এ জাতীয় খাবারের প্রতি আমার এক্কেবারে আগ্রহ নেই!
ফল কিনতে সে একটি দোকানে ঢুকল। দোকানটিতে নানা রকমের ফলমূলে ভরপুর ছিল। সে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনার দোকানে আম আছে?’ উত্তরে দোকানদার বলল, ‘না। আম ত কেবল গ্রীষ্মকালেই পাওয়া যায়। তরমুজ আছে?’ উত্তরে দোকানদার বলল নাভাই। সে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল। অথচ সে দোকানে চল্লিশ প্রকারের চেয়েও বেশি ফল ছিল। এটা যেন সে ভুলেই গেল।
.
এমন অনেক মানুষ আছে যারা সমালোচনা করে অনেক মানুষকে বিরক্ত করে। কোন কিছুই তাদের সন্তুষ্ট করতে পারে না। ফলে সুস্বাদু খাবারের দিকে তাকালে তাদের নজর গিয়ে পড়ে কেবল অনিচ্ছায় পড়ে যাওয়া এক টুকরো চুলের দিকে। আর কাপড়ের দিকে তাকালে তার নজর পড়ে কেবল কালো সে দাগটির দিকে যা অসাবধানতাবশত লেগে গেছে। উন্নতমানের কোন বই পড়তে বসলে তার নজর পড়ে কেবল ছোট-খাটো মুদ্রণবিভ্রাটের দিকে বা অনিচ্ছাকৃত ভুল-ত্রুটির দিকে। এদের সমালোচনা থেকে কেউই মুক্তি পায় না। এরা ছোট-বড় সব বিষয়ে খুঁত খুঁজে বেড়ায়। আমর এক বন্ধুর কথা বলি সে আমার সাথে অফিসে কাজ করে প্রায় দুই বৎসর দরে কিন্তু এ দীর্ঘ দুই বৎসরে আমার মনে পড়েনা সে কোন বিষয়ে আমার প্রশংসা করেছে। একদিন আমি তাকে একজন বক্তার বক্তৃতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তখন সে তার বক্তৃতার ইতিবাচক কোন দিক খুঁজে পেল না। তার এই ব্যবহার আমার কাছে পাহাড়ের চেয়েও ভারী মনে হলো। এরপর থেকে আমি তার কাছ থেকে আর কোন বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাই নি। কারণ, আমি তাকে চিনে ফেলেছি। সে সবকিছু নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে।
.
এভাবে ঐ ব্যক্তির কথাও আপনি উদাহরণ হিসেবে পেশ করতে পারেন যে সমাজের সবাইকে আদর্শবান ব্যক্তি হিসেবে কল্পনা করে। এ জন্য সে আশা করে তার স্ত্রী ঘর-বাড়ি ও আঙ্গিনা চব্বিশ ঘণ্টা শতভাগ পরিচ্ছন্ন রাখবে। তার সন্তানরা সারাদিন পরিপাটি থাকবে। যখনি মেহমান আসবে তখনি স্ত্রী উন্নতমানের খাবারের প্রস্তুত করবে। কথা বলার সময় স্ত্রীর কাছে শুধু ভাল ভাল কথা আশা করে সন্তানদের কাছেও ভাল ভাল আচরণ ও উত্তম আদর্শের প্রত্যাশা করে। সবকিছুই ষোল আনা চায়। সহকর্মী, বাজারে কিংবা পথে যার সাথেই সাক্ষাত হোক, সবার কাছেই সবকিছু শত ভাগ কামনা করে। এদের কেউ কোন ত্রুটি করে ফেললে, পারলে এরা সামান্য কথা কাঠা-কাঠি নিয়ে তাকে জর্জরিত করে ফেলে। আলোচনা সমালোচনার ঝড় সৃষ্টি করে দেয়। একই কথা বারবার বলতে থাকে। ফলে মানুষ বিরক্ত হয়ে যায়। কারণ এ ধরনের মানুষ স্বচ্ছ সাদা কাগজে কালো দাগ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না।
.
এ ধরনের লোকেরা মূলত নিজের আচরণের মাধ্যমে নিজেকেই কষ্ট দেয়। কাছের লোকেরাও তাদেরকে ঘৃণা করতে থাকে এবং তাদের সঙ্গে চলাফেরা করাকে বিড়ম্বনা মনে করে।এদের ব্যাপারে কবি বলেছেন-
একটু খড়কুটো দেখলেই যদি পানি পান না করে,
তাহলে তো তোমাকে তৃষ্ণার্তই থাকতে হবে।
এমন কে আছে যার পানপাত্র সবসময় স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন থাকে!
সব বিষয়েই যদি তুমি তোমার সঙ্গীকে ভর্ৎসনা কর
তাহলে তো তোমার সাথে কেউ থাকবে না,
এমনকি দোষ ধরার জন্যও কাউকে পাবে না।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
তোমরা যখন কথা বলবে তখন ন্যায়ানুগ অ ভারসাম্যপূর্ণ কথা বলবে
.
এ আলোচনার মাধ্যমে আমি আপনাদেরকে এ আহ্বান জানাচ্ছি না যে, কারও কোন ভুল হলে উপদেশ দেবেন না কিংবা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে যাবেনা এমন না; বরং আমার উদ্দেশ্য হলো, প্রত্যেক বিষয়ে বিশেষ করে পার্থিব দোষ-ত্রুটি খোঁজার মানসিকতা পোষণ করবেন না; এসব বিষয় দেখেও না দেখার ভান করার অভ্যাস গড়ে তুলুন
.
মনে করুন আপনার কাছে কোন মেহমান আসল। আপনি তাকে স্বাগত জানিয়ে ড্রয়িংরুমে নিয়ে গেলেন। চা-নাস্তা পরিবেশন করলেন। সে চা নিয়েই বলে উঠল, ‘কাপটা ভরে দিলেন না?’
আপনি বললেন, ‘আরেকটু বাড়িয়ে দেব?’
সে বলল আরে নানা। চলবে।
এরপর সে পানি চাইল। আপনি পানির গ্লাস এগিয়ে দিলেন পানি পান করে সে বলল, ‘পানিটা তো খুব গরম! তারপর ফেনের দিকে তাকিয়ে বলল আরে ফ্যানের বাতাসটা কম আসছেএভাবে সে সবকিছুতেই খুঁত খুঁজে বেড়াতে লাগলো। বলেন, এ ধরনের ব্যক্তির উপস্থিতি কি আপনি বোঝা মনে করবেন না? আপনি কি চাইবেন না, সে আপনার বাড়ি থেকে এখনি চলে যাক এবং আর কখনও না আসুক?
.
মানুষ এতো বেশি সমালোচনা পছন্দ করে না। তাই যদি কারও দোষ-ত্রুটি নিয়ে কথা বলতেই হয় তাহলে সুন্দর ও আকর্ষণীয় মোড়কে আবৃত করে তা উপস্থাপন করুন।সমালোচনার আঙ্গিকে না বলে পরামর্শের আঙ্গিকে কিংবা পরোক্ষভাবে তা তুলে ধরুন।
অতএব, যদি কারও দোষ-ত্রুটি আলোচনা করতেই হয় তাহলে দূর থেকে লাঠি দিয়ে ইঙ্গিত করুন। লাঠি দিয়ে আঘাত করতে যাবেন না। প্রত্যক্ষভাবে না বলে পরোক্ষভাবে বলুন।
.
ধরেন আপনার স্ত্রী যদি ঘরের পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে উদাসীন হয় তাহলে আপনি তাকে এভাবে বলুন, ‘গতরাতে অমুকের বাড়িতে গিয়েছিলাম আমরা কয়েকজন। সবাই তার বাড়ির পরিচ্ছন্নতার প্রশংসা করলো ইত্যাদিআপনার ছেলে নামায পড়ে না, তাকে যদি বলেন অমুকের ছেলেটাকে অনেক ভাল লাগে। সে সব সময় জামাতে নামায আদায় করে। তাহলে তা কি অতি উত্তম সংশোধন হবে না? এভাবে বলার অর্থ হলো, শ্রোতাকে বলা হচ্ছে, ‘হে শ্রোতা! তোমাকেই বলছি। তুমি মনোযোগ দিয়ে শোন।
.
আপনি আমাকে এ প্রশ্ন করতে পারেন যে, ‘মানুষ সমালোচনা পছন্দ করে না কেন?’

এর উত্তরে আমি বলি মানুষ সমালোচনাকে নিজের জন্য অবমাননাকর ও অপূর্ণতা মনে করে। মানুষ চায় নিজের পূর্ণতা ও শ্রেষ্ঠত্ব। একজন সরল মনের ভদ্রলোক নিজেকে সে কর্তৃত্বশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইল। এ উদ্দেশ্যে সে পানির দুটি ফ্লাক্স নিল। একটি লাল অপরটি সবুজ। ফ্লাক্স দুটিতে ঠাণ্ডা পানি ভরল এবং মানুষের চলাচলের পথে বসে চিৎকার করতে লাগল, ‘ঠাণ্ডা পানি! ফ্রিতে ঠাণ্ডা পানি!। পিপাসিত কোন ব্যক্তি এগিয়ে এসে নিজ হাতে গ্লাসে পানি ঢেলে পান করতে সবুজ ফ্লাক্সের দিকে হাত বাড়িয়ে পানিওয়ালা সে ব্যক্তি বলতো, ‘না, না, লাল ফ্লাক্স থেকে নাও!সে লাল ফ্লাক্স থেকে পান করত। কেউ লাল ফ্লাক্স থেকে পানি পান করতে চাইলে তাকে বলতো, ‘এটা থেকে না, সবুজটা থেকে পান করুন। অন্যথায় একজন আপত্তি করে বলল, ‘দুই ফ্লাক্সের পানির মধ্যে পার্থক্য কী?’ সে উত্তর দিল, ‘পানি আমার। আমার কথা মতো ভাল লাগলে পান করেন, অন্যথায় আপনি যেতে পারেন! এটাই মানুষের প্রকৃতি। মানুষ সবসময় চায় তাকে সবাই মূল্যায়ন করুক, গুরুত্ব দিক। তার কথা মেনে চলুক।

মাছি ও মৌমাছি
মাছি হবেন না, মৌমাছি হোন।
মৌমাছি শুধু পরিষ্কার ও সুগন্ধযুক্ত বস্তুতেই বসে, নোংরা বস্তুকে এড়িয়ে চলে। তাই সবাই তার মধুতে হয় তৃপ্ত। আর মাছি, সে তো কেবল রক্ত আর পুঁজের সন্ধানে থাকে। তাই সবাই তার প্রতি হয় বিরক্ত।






একটি মন্তব্য পোস্ট করুন