“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
দেবব্রত দেব লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
দেবব্রত দেব লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৩ জুলাই, ২০২১

সাক্ষরতার হার আর জনসংখ্যা বৃদ্ধি: ২০১১-এর আদমশুমারি কি বলে?

।। দেবব্রত দেব ।।

           সাধারণ ভাবেই আন্দাজ করা যায় যে সাক্ষরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটা বিপরীত সম্পর্ক আছে। আর এই সম্পর্ক খুব পরিষ্কার ভাবে ফুটে উঠে আমাদের দেশের ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য থেকে। আমি নীচে রাজ্য গুলোর সাক্ষরতার তথ্য সমূহ একটা টেবিল আকারে দিয়ে দিয়েছি যা আমি সেনসাস ২০১১ এর ওয়েবসাইট থেকেই নিয়েছি।

শুধু উত্তর প্রদেশ (UP), মহারাষ্ট্র (MH), বিহার (BR), পশ্চিমবাংলার (WB) মত জনবহুল (মোট জনসংখ্যা ২ কোটি থেকে বেশি ) রাজ্য গুলো নিলে দেখা যায় যে, সাধারণের সাক্ষরতা বাড়ার সাথে সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার টা খুবই সুন্দর ভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। গ্রাফে দেওয়া লাল লাইন টা এই সম্পর্ককে ইঙ্গিত করছে।

তবে ছোট রাজ্য গুলোর ক্ষেত্রে এই সম্পর্কটা একটু কম জোরালো। এখানে ছোট রাজ্য বলতে জনসংখ্যায় ২ কোটি থেকে কম রাজ্য গুলোর কথা বলা হচ্ছে। গ্রাফে দেখা যাবে যে, এই রাজ্য গুলো বেশিরভাগই লাল লাইনের উপরেই আছে। তাই সব রাজ্য গুলোকে ধরলে, সাক্ষরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের কম হওয়া টা একটু দুর্বল হয়েছে (নীল লাইনটা একটু উপরের দিকে উঠে গেছে)। ছোট রাজ্য গুলোতে জনসংখ্যা নানান কারণে খুব সহজেই বদলে যেতে পারে। কাজের খোঁজে অর্থনৈতিক ভাবে ভালো অবস্থায় থাকা রাজ্য গুলোর প্রতি জনসাধারণের প্রব্রজন একটা বড় এবং সাধারণ কারণ। একই ভাবে বেশি নগরায়িত রাজ্য গুলোর প্রতিও প্রব্রজনের হার বেশি হয়।

এখানে লক্ষ্য করা যেতে পারে যে সব চাইতে ছোট্ট (কেন্দ্র শাষিত) রাজ্য দাদরা-নাগর হাভেলি (DN) এবং দমন-দিউ (DD), বাকি সব রাজ্য গুলো থেকে একদম আলাদা। এই রাজ্য দুটোর জনসংখ্যা এতো কম যে যেকোনো কারণেই এখানে জনসংখ্যা বদলে যেতে পারে।

ভারতের রাজ্য গুলোর শিক্ষার হারের সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গ্রাফ। লাল বা নীল রঙের লাইন এই সব ডাটার মাঝে থাকা একটা সরল রৈখিক সম্পর্কের প্রতি ইঙ্গিত দেয়। শিক্ষার হার যত বাড়ছে, জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ততো কমছে।

এবার ডানপন্থী রাজনীতির এক বহুল কথিত যুক্তিকে যাচাইকরে দেখা যাক। যুক্তিটা কিছুটা এরকম: “মুসলিম ধর্মাবলম্বীরাই দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ“। জনসংখ্যার দিক থেকে বড় রাজ্য গুলোর মধ্যে জম্মু-কাশ্মীর (JK, ৬৮.৩১% মুসলিম), আসাম (AS, ৩৪.২২% মুসলিম), পশ্চিমবাংলা (WB, ২৭.০১% মুসলিম), এবং কেরালা (KL, ২৬.৫৫% মুসলিম) রাজ্যের মোট জনসংখ্যার একটা বড় অংশ মুসলিম। যখন এই রাজ্য গুলো হিন্দু প্রধান উত্তর প্রদেশ (UP, ১৯.২৬% মুসলিম), বিহার (BR, ১৬.৮৭% মুসলিম) এবং গুজরাট (GJ, ৯.৬৭% মুসলিম) এর সাথে তুলনা করা হয় তখন এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে রাজ্যের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার রাজ্যের জনগণের ধর্মীয় বিন্যাসের সাথে নয়, বরং সাধারণ সাক্ষরতার হারের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, যে রাজ্য যত বেশি স্বাক্ষর, সে রাজ্যের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার তত কম।

এই গ্রাফ থেকে এটা স্পষ্ট যে রাজ্যের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার রাজ্যের জনগণের ধর্মীয় বিন্যাসের সাথে নয়, বরং সাধারণ সাক্ষরতার হারের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, যে রাজ্য যত বেশি স্বাক্ষর, সে রাজ্যের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার তত কম।

#State-Code Population Increase Area(Km2) Density Sex-Ratio Literacy State-Name
UP 1 19,98,12,341 20.23 240928 829 912 67.68 Uttar Pradesh
MH 2 11,23,74,333 15.99 307713 365 929 82.34 Maharashtra
BR 3 10,40,99,452 25.42 94163 1106 918 61.8 Bihar
WB 4 9,12,76,115 13.84 88752 1028 950 76.26 West Bengal
AP 5 8,45,80,777 10.98 275045 308 993 67.02 Andhra Pradesh
TN 6 7,26,26,809 20.35 308252 236 931 69.32 Madhya Pradesh
MP 7 7,21,47,030 15.61 130060 555 996 80.09 Tamil Nadu
RJ 8 6,85,48,437 21.31 342239 200 928 66.11 Rajasthan
KA 9 6,10,95,297 15.60 191791 319 973 75.36 Karnataka
GJ 10 6,04,39,692 19.28 196244 308 919 78.03 Gujarat
OD 11 4,19,74,218 14.05 155707 270 979 72.87 Orissa
KL 12 3,34,06,061 4.91 38852 860 1084 94 Kerala
JH 13 3,29,88,134 22.42 79716 414 948 66.41 Jharkhand
AS 14 3,12,05,576 17.07 78438 398 958 72.19 Assam
PB 15 2,77,43,338 13.89 50362 551 895 75.84 Punjab
CG 16 2,55,45,198 22.61 135192 189 991 70.28 Chhattisgarh
HR 17 2,53,51,462 19.90 44212 573 879 75.55 Haryana

DL 18 1,67,87,941 21.21 1483 11320 868 86.21 Delhi
JK 19 1,25,41,302 23.64 222236 56 889 67.16 Jammu and Kashmir
UK 20 1,00,86,292 18.81 53483 189 963 78.82 Uttarakhand
HP 21 68,64,602 12.94 55673 123 972 82.8 Himachal Pradesh
TR 22 36,73,917 14.84 10486 350 960 87.22 Tripura
ML 23 29,66,889 27.95 22429 132 989 74.43 Meghalaya
MN 24 28,55,794 24.50 22327 128 985 76.94 Manipur
NL 25 19,78,502 -0.58 16579 119 931 79.55 Nagaland
GA 26 14,58,545 8.23 3702 394 973 88.7 Goa
AR 27 13,83,727 26.03 83743 17 938 65.38 Arunachal Pradesh
PY 28 12,47,953 28.08 490 2547 1037 85.85 Puducherry
MZ 29 10,97,206 23.48 21081 52 976 91.33 Mizoram
CH 30 10,55,450 17.19 114 9258 818 86.05 Chandigarh
SK 31 6,10,577 12.89 7096 86 890 81.42 Sikkim
AN 32 3,80,581 6.86 8249 46 876 86.63 Andaman and Nicobar Islands
LD 35 64,473 6.30 30 2149 946 91.85 Lakshadweep

এরকম বিষয়ে আমার আরেকটা লেখা আছে এখানে। ইচ্ছুকরা এটাও পড়ে দেখতে পারেন।

সূত্র:


রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২০

অংক দৌড়

।। দেবব্রত দেব  ।।

আমার মাস্টার কাকুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, পাটিয়ালা, ১৯ জুলাই , ২০২০


















আজ থেকে প্রায় চার দশক আগেকার কথা। আমি তখন আমাদের গ্রামের স্কুল ১০৭ নং তেষুয়া নিম্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়’, সংক্ষেপে তেষুয়া স্কুলে পড়ি। মায়ের কথা অনুযায়ী প্রচুর দুষ্টু ছিলাম। স্কুল ছাড়া দিনের অর্ধেক সময় কাটাতাম বাড়ির সামনের বাগানে। কাজ প্রচুর করতাম, যেমন পেয়ারা গাছের ডালে ঝুলতাম, না হয় হাতে খুন্তি নিয়ে কোনো ফুল গাছের বারোটা বাজাতাম। অথবা বাড়ির নীচে ক্ষেতের জমি খুঁড়ে এঁটেল মাটি নিয়ে আসতাম আর তাই দিয়ে গরু, ঘোড়া, কলসি ইত্যাদি বানাতাম। তবে মা সঙ্গে এটাও বলত, সারাদিন গাছের ডালে ঝুললেও সকাল-সন্ধেতে নিয়ম করে পড়াশোনা করতাম। তখন ঘাড়ের উপরের বাঁদর নেমে বিছানার তলায় ঘুমোতে যেত। তবে এখন মনে হয়, সেসময় পড়াশোনা করার স্বদিচ্ছা আমার যত ছিল, তার থেকে বেশি ছিল ভয় মেশানো এক শ্রদ্ধা। পাশের বাড়ির মাস্টার কাকুর প্রতি। সন্ধে হলেই আমাদের বাড়ি আসতেন। চা-বিস্কুট খেয়েই আমাদেরকে নিয়ে বসতেন। বারান্দায় একটা খালি খাট ছিল, তার উপরে। এখানে আমরা বলতে আমি আর আমার দিদি। বাংলা বানান আর অংকের নামতা মুখস্থ করাই ছিল প্রধান কাজ। এই মাস্টার কাকুর ভয়েই গ্রামের রাস্তায় বেরোতে ভয় লাগতো। কখন জানি কোন দিক থেকে এসে পথ আগলে বলবেন, “এই থাম, দৌড়াস কই!সাতর কোঠার নামতা ক।নাহলে কোনো একটা বাংলা শব্দের বানান জিজ্ঞেস করবেন, “! পৃথিবী বানান করিয়া ক।

 

স্কুলে যেতাম দিদির সাথে। দিদি ফ্রক পরে। আমি হাফ পেন্ট আর সেন্ডো গেঞ্জি পরে। দুজনেই খালি পায়ে। গ্রামের ভেতরেই স্কুল, আমাদের বাড়ি থেকে দেখা যায়। জল তেষ্টা পেলে বা এমনিতে খিদে পেলে এক দৌড়ে বাড়ি থেকেই কিছু খেয়ে যেতে পারতাম। স্কুলে মাস্টার মশাই ছিলেন দুজন। বড় মাস্টার, ছোট মাস্টার। এখানে বড়-ছোট মানে বয়েসেই বড়-ছোট। বড় মাস্টার সবাই কে আদরই করতেন। তবে মাঝে মাঝে প্রচণ্ড ভয় পেতাম। একবার উনাকে কি একটা লিখে দেখাচ্ছি। কালো স্লেটে লেখা। স্লেটটা উনার হাতে দিয়ে, কী জানি কী ভেবে, উনার চেয়ারের হাতল ধরে ঝুলতে লাগলাম! স্লেটের লেখা চেক করে নিয়ে, আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “লেখা ঠিক অইসে।তখনই উনার খেয়াল হলো যে আমি চেয়ারের হাতল ধরে ঝুলছি। এত্ত জোরে একটা ধমক দিলেন, আমি ত ভয়েই কাচু মাচু। সেদিন নিশ্চয়ই চেয়ারের হাতল আর পেয়ারা গাছের ডালের মধ্যে তফাত বুঝতে পেরেছিলাম। যাইহোক, এই গল্পের বাকি অংশটা বড় মাস্টার কে নিয়ে নয়, বরং ছোট মাস্টার কে নিয়ে।

 

স্কুলে একদিন ছোট মাস্টার গুণ অংক করতে দিয়েছিলেন। আমি কিছুক্ষণ পর গুণফল বের করে স্লেটে করা অংকটা মাস্টার কে চেক করতে দিয়েছি। না, এবার চেয়ারের হাতল ধরে ঝুলে পড়িনি। উনার চেয়ারের সামনে টেবিল, সেই টেবিলের এক পাশেই দাড়িয়ে আছি। মাস্টার মশাই অংক আমার ভাল করে দেখলেন। তারপর গুরুগম্ভীর মুখ করে পুরো অংকটাই কেটে দিয়ে শূন্য বসিয়ে দিলেন। শূন্য দেখে আমার মাথাটা গেল বিগড়ে। মনে ভাবনা এলো, আমার গুণ অংক ভুল হয়নি। মাস্টার মশাই নিশ্চয়ই কোনো ভুল করছেন। এবার কি করা। টেবিলের একপাশে রাখা লম্বা ছড়ি দেখে সাহস যোগাতে পারিনি যে বলব, “আমার অংক ভুল হইসে না, বরং মাস্টার মশাই, আফনেই কিছু ভুল করছইন!মাস্টার মশাইকে কিছু বলার সাহস না যোগাতে পারলেও, নিজের মনের সংশয়টা ত মেটাতেই হয়, এই ভেবে ভেবে মাথা নিচু করে গুটি গুটি পায়ে নিজের বেঞ্চে এসে বসলাম। কিছুক্ষণ পর একটা বুদ্ধি মাথায় এলো।

 

এবার একটু উদ্বিগ্ন চেহারা বানিয়ে হটাত দৌড়ে গেলাম ছোট মাস্টারের কাছেই, বললাম, “হাগু পাইসে, বাইরে যাইতে লাগবো।প্রসঙ্গক্রমে, এখানে বাইরেমানে বাড়ি যেতে হবে। আর সেইসময় কেউ বাইরে যেতে গেলে হাতে একটা তালা ধরিয়ে দেওয়া হতো। ফিরে এসে সেই তালা আবার ঠিক জায়গায় রাখতে হতো। এরকম স্কুলে দুটো দরজার দুটো তালা। তারমানে একটা সময়ে শুধু দুজনই বাইরে থাকতে পারবে আর ঐ দুজনের একজন ফিরে এলেই অন্য কেউ বাইরে যেতে পারবে। যাইহোক, আমার বাইরে যাইতে লাগবোর অনুরোধ মাস্টার মশাই মেনে নিলেন। বললেন, “বাড়িত গিয়া সময় কাটাইস্ না, পটকরি ফিরিয়া আইস!আমি হাতে একটা তালা নিয়েই দিলাম এক দৌড়। তার আগে যদিও আমি কেটে দেওয়া অংকের স্লেটটা সাথে নিয়ে নেই। স্কুল থেকে আমাদের বাড়ি যাই নাই, গিয়েছিলাম মাস্টার কাকুর বাড়ি। উঠোন থেকে চিল্লি-চিৎকার করে বললাম, “মাস্টার কাকু কই, একটা অংক দেখাইতাম, শুদ্ধ অইসে কি না। ছোট মাস্টরে কাটি দিছইন!ঘরের ভেতর থেকে কেউ একজন জবাব দিল, “তোর মাস্টর কাকু ত ঘরো নাই। ক্ষেতে গেসইন। ওখানে গিয়া খুজ!ক্ষেত-মানে, মাস্টার কাকুর বাড়ির পেছন দিকে খোলা মাঠ, ওখানে ধান ক্ষেত হয়। অগত্যা, আবার দৌড়, উঠোন থেকে ধান ক্ষেতের দিকে। মাঠ জল-কাদাময়। কিছুদূরেই দেখতে পেলাম মাস্টার কাকু কাজ করছেন। হাতে, পায়ে, গায়ে কাদা আর  কাদা, চেনাই যাচ্ছে না। আমি তখন রীতিমতো হাঁপাচ্ছি। আমাকে এরকম দেখে বললেন, “কিতা রে, স্কুল ছাড়িয়া, এই সময় ইখানো কেনে? আর এক হাতো তালা আর আরেক হাতো স্লেট কেনে? এই পেকো  উলটিয়া পড়ি গেলে ত হাতোর তালাও যাইবো, স্লেটও যাইবো! যাইঅউক, , কিতা অইসে?” কাঁদো কাঁদো চোখে স্লেট দেখিয়ে বললাম, “ছোট মাস্টর আমার অংক কাটি দিছইন! তুমি দেখোসাইন, শুদ্ধ কি না?” মাস্টার কাকু ত আমার কাণ্ড দেখে হতভম্ব। বললেন, “স্লেটটা ভালা করি ধর, দেখি তোর অংক ঠিক অইসে কি না।

 

মাস্টার কাকু সেদিন আমার অংক সঠিক হয়েছিল জানিয়ে ছিলেন। আর কী কী বলেছিলেন এখন আর মনে নাই। তবে সেদিন স্কুলে ফেরত যাই নাই। মাঠ থেকেই মাস্টার কাকু আমাকে বাড়ি নিয়ে এসেছিলেন। তালাটা নিশ্চয়ই ফেরত দিয়ে দিয়েছিলেন অন্য কারুর হাতে করে। আমার সেই মাস্টার কাকু এখনও বেঁচে আছেন, ক্ষেত-কৃষি নিয়েই।

 

শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২০

ইআইএ-২০২০: উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য একটি দুর্যোগবাহি খসড়া বিল

।। দেবব্রত দেব ।।

           সম্প্রতি ভারত সরকার পরিবেশ বিষয়ক মূল্যায়ন বিজ্ঞপ্তি, ২০২০ (সংক্ষেপে ইআইএ-২০২০) এর একটি খসড়া সংস্করণ প্রকাশ করেছে যা পূর্ববর্তী 'ইআইএ বিজ্ঞপ্তি-২০০৬'কে প্রতিস্থাপন করবে। এই নতুন খসড়া বিলটি আইন হিসাবে কার্যকর হওয়ার পর, এরই ভিত্তিতে শিল্প, কৃষি বা অন্য কোনও "কৌশলগত' প্রকল্পের পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া হবে। যখন নতুন কোনো প্রকল্প শুরু হয় বা বিদ্যমান প্রকল্পের সম্প্রসারণ হয়, তখন অনেক সময়েই তার কিছু প্রতিকূল প্রভাব পড়ে সংশ্লিষ্ট জমি, বন এবং পরিবেশের উপর। খসড়া ইআইএ-২০২০ বিলে এমন কয়েকটি বিধান রয়েছে যার কারণে পুরো উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষ কোনো প্রকল্পের প্রতিকূল প্রভাব থেকে তাদের জমি, বন এবং পরিবেশকে রক্ষা করার সব অধিকার হারাবেন। নীচে, আমি কেবল এই বিশেষ বিধানগুলোর প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করব।

১১ই আগস্ট, ২০২০-র আগে পদক্ষেপ নিন

আইন হিসাবে কার্যকর হওয়ার আগে এই খসড়া বিলে সংশোধন করার এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষের অধিকার অটুট থাকবে তা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের ১১ই আগস্ট, ২০২০ পর্যন্ত পরিবেশ মন্ত্রকের কাছে পরামর্শ পাঠানোর সময় রয়েছে।
খসড়া বিজ্ঞপ্তিতে প্রস্তাবিত বিষয়ে আপত্তি বা পরামর্শ দিতে আগ্রহী যে কোনও ব্যক্তি কেন্দ্রীয় সরকারের বিবেচনার জন্য নির্দিষ্ট সময়ের ভেতরে এই ঠিকানায়: Secretary, Ministry of Environment, Forest and Climate Change, Indira Paryavaran Bhawan, Jor Bagh Road, Aliganj, New Delhi-110 003, চিঠি লিখতে পারেন, অথবা এটি ই-মেইল ঠিকানা eia2020-moefcc@gov.in এও পাঠাতে পারেন।

জনগণের বক্তব্য এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র

             বর্তমানে যখন শিল্প, কৃষি বা অন্যকিছু সম্পর্কিত কোনও প্রকল্প প্রস্তাবিত হয়, তখন যে সব  সাধারণ মানুষ এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে তারা "জনগণের পরামর্শ' (পাবলিক কন্সালটেশন) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারী কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের উদ্বেগ জানাতে পারে। সরকারকে কোনও প্রকল্পে চূড়ান্ত ছাড়পত্র দেওয়ার আগে জনগণের এই জাতীয় উদ্বেগগুলিরও  বিবেচনা করে দেখতে হয়। তবে এই নতুন খসড়া ইআইএ-২০২০এর অনুসারে আন্তর্জাতিক সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষ কোনো প্রকল্প নিয়ে তাদের মতামত ব্যক্ত পারবে না। প্রকল্প নিয়ে কোনো উদ্বেগ দেখা দিলেও, তা প্রকাশ্যে জানাতে পারবে না।


উত্তর-পূর্ব ভারত এবং "সীমান্ত অঞ্চল' সংজ্ঞা

              পয়েন্ট নম্বর 19 এর 2 নং পৃষ্ঠার খসড়া বিলে বলা হয়েছে যে "… জনগণের পরামর্শের জন্য নিম্নলিখিতগুলির জন্য ছাড় দেওয়া হয়েছে:" এবং এর মধ্যে একটি হ'ল "সীমান্ত অঞ্চলে 31 এবং 38 আইটেমের অধীনে সমস্ত লিনিয়ার প্রকল্প'। ৩ নং পৃষ্ঠায় দলিলটি সীমান্ত অঞ্চলকে "ভারতের সীমান্তবর্তী দেশগুলির সাথে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণের লাইন থেকে ১০০ কিলোমিটার আকাশপথে দূরত্বের মধ্যে পড়া অঞ্চল' হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। উত্তর-পূর্ব ভারত চারটি পৃথক দেশ দ্বারা একটা স্থলবেষ্টিত জায়গা। এবার এই নীচের ম্যাপ থেকে স্পষ্টতঃই দেখতে পারেন যে উত্তর-পূর্ব ভারতের কোনো জায়গাই আন্তর্জাতিক সীমানা থেকে ১০০ কিলোমিটার থেকে বেশী দূরত্বে নয়। এর কারণেই উত্তর-পূর্বের যে কোন জায়গাতেই নতুন বা পুরোনো কোনো শিল্প, স্থানীয় জল-স্থল-আকাশ-বায়ুর কোন ক্ষতি করলে ইআইএ-২০২০ আওতায় নাগরিকগণ কোনও প্রতিবাদ করতে পারবে না (১৯-নং পৃষ্টার (f) পয়েন্টের জন্যে - উপরের ছবি দেখুন)।

ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের মানচিত্র (গুগল ম্যাপ )। ১০০ কিলোমিটার স্কেল চিহ্নটি ইঙ্গিত দেয় যে উত্তর-পূর্ব ভারতের কোনো জায়গাই আন্তর্জাতিক সীমানা থেকে ১০০ কিলোমিটার থেকে বেশী দূরত্বে নয়।


কৌশলগত বিবেচনার নামে

উত্তর-পূর্ব জনগণের জন্য আর একটি সম্ভাব্য উদ্বেগের কারণ হ'ল, ইআইএ-২০২০ এর  আরেকটি বিশেষ বিধান যার মাধ্যমে 'কৌশলগত বিবেচনার' নামে সরকার যে কোন প্রকল্পের তথ্য প্রকাশ্যে আসা রোধ করতে পারবে।

9 নং পৃষ্ঠার ৭ নম্বর পয়েন্ট অনুযায়ী, সরকার যদি কোনও প্রকল্পকে জাতীয় কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ কারণে হিসাবে নথিভূত করে, তাহলে "এই জাতীয় প্রকল্পগুলির সাথে সম্পর্কিত কোনও তথ্য জনসমক্ষে রাখা হবে না"। এমনকি নাগরিকগণ যদি কোনও প্রকল্প সম্পর্কে কিছু তথ্যের জন্য অনুরোধ করেন তাহলেও সরকার "কৌশলগত বিবেচনার" ধারাটি উদ্ধৃত করে কোনও তথ্য দিতে অস্বীকার করতে পারে। উত্তর-পূর্বের জন্য, এই বিধানটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হতে চলেছে কারণ নানাবিধ কারণে সরকার ইতিমধ্যে এই অঞ্চলটিকে জাতীয় সুরক্ষার ক্ষেত্রে সংবেদনশীল বলে বিবেচনা করে এবং বিশেষত আমাদের ড্রাগন প্রতিবেশী, চীনের দ্বারা বেড়ে যাওয়া হুমকির কারণেও আমাদের সরকার যেকোন সময় তথ্য গোপন করতে পারে। তথ্যের সহজ প্রাপ্যতাই স্বাস্থ্যকর গণতন্ত্রের মূল, এবং এখানে সরকার এমন একটি আইন প্রস্তাব করছে যা অবশ্যই সরকারের কাছ থেকে তথ্য জানার  জনগণের অধিকারকে আরও সীমিত করবে।

খসড়া ইআইএ-২০২০এর 9 নং পৃষ্ঠার ৭  নম্বর পয়েন্ট অনুযায়ী, সরকার যদি কোনও প্রকল্পকে জাতীয় কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে নথিভূত করে, তাহলে "এই জাতীয় প্রকল্পগুলির সাথে সম্পর্কিত কোনও তথ্য জনসমক্ষে রাখা হবে না"।


শীঘ্রই সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া বিশেষ জরুরী

ভবিষ্যতে যে কোনও পরিবেশ ও সুরক্ষা বিপর্যয় এড়াতে উত্তর-পূর্বের জনগণকে খুব বেশি দেরী হওয়ার আগেই সরকারের সামনে এই খসড়া ইআইএ-২০২০এর বিভিন্ন উদ্বেগকারি বিধানের বিরুদ্ধে দ্রুত এবং কার্যকরভাবে মুখর হতে হবে! বিলটি এখনও জনসাধারণের মন্তব্যের জন্য উন্মুক্ত। আগামী ১১ই আগস্ট অবধি eia2020-moefcc@gov.in এ ইমেল পাঠিয়ে জনগণ নিজের পরামর্শ সরকারকে জানতে পারেন। এই নতুন ‘ইআইএ-২০২০’ সম্পর্কে আরও বেশি জনসচেতনতা তৈরি করতে সমস্ত গণতান্ত্রিক মঞ্চ, পাবলিক ফোরাম, এনজিওগুলিকে এগিয়ে আসতে হবে। এই মুহূর্তে কোভিড-১৯ এখনও ছড়িয়ে রয়েছে সমাজে, তবে আমরা যদি এই নতুন খসড়া বিলের অযাচিত বিধানগুলির বিরুদ্ধে দাড়ানোকে উপেক্ষা করি তবে খুব শীঘ্রই আমাদের সবুজ, স্বচ্ছ এবং প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর উত্তর-পূর্ব ভারত দায়িত্বজ্ঞানহীন সম্পদ-ক্ষুধার্তের অনিয়ন্ত্রিত টার্গেটে পরিণত হবে।

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২০

ভাষা, গল্প, কবিতা, উপন্যাসের ভবিষ্যৎ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এ-আই)

 ।। দেবব্রত দেব ।।


         বাংলা বানান শুদ্ধি, ব্যাকরণ, বাক্য গঠন, ইত্যাদি নিয়ে অনেক সময়ই বোদ্ধাগণের মধ্যে বেশ গম্ভীর আলোচনা হয়, বিতর্ক হয়। এবার বানান শুদ্ধির পক্ষে যারা (এবং যারা নন অনেক সময় কিছু ব্যবহারিক কারণে) তাদের জন্যে আমি এই বিতর্কের একটা অন্য দিক তুলে ধরব।

'স্পেল চেকার' - বানান পরীক্ষক

কম্পিউটারে টাইপ করার সময় যে স্বয়ংক্রিয় 'স্পেল চেক' সুবিধাটা উপভোগ আমরা করি তার পেছনে একটা সফটওয়ার কাজ করে। এই সফটওয়ার যে যুক্তি নিয়ে কাজ করে তা শুধু অভিধান আর ব্যাকরণ থেকে আসে না। সফটওয়ারকে প্রথমে বানান ভুলটা ধরতে হয় তার পর সেই ভুল বানানের শুদ্ধটা দেখাতে হয়। এবার বানানে ভুল ধরা খুবই সহজ, টাইপ করা কোনো শব্দকে শুধু একটা স্বীকৃত অভিধানের সাথে তুলনা করলেই হল। এরপর স্পেল চেক সফটওয়ার কে সম্ভাব্য সঠিক বিকল্প লেখককে দেখাতে হয়। এই কাজটা তুলনা মূলক ভাবে মুশকিল। কারণ এখানে, টাইপ করা শব্দটিতে ভুলের পরিমাণের উপরে নির্ভর করে একাধিক সঠিক বিকল্প থাকতে পারে। যেমন যেমন ধরুন আমি লিখব "অমর", ভুল করে লিখলাম "অমির"। তাহলে স্পেল চেকার "অমির" এর সঠিক বিকল্প হিসাবে "আমার", "আমির" "আমীর", "আমিন", "অমর" ইত্যাদি অনেক শব্দই দেখতে পারে এবং সেই বিকল্প শব্দের তালিকা থেকে আমি আমার পছন্দের শব্দ নিয়ে নিতে পারি।

এবার আরও উন্নত স্পেল চেকার কিন্তু শুধু অভিধানের সাথে তুলনা করে সব ধরণের বিকল্প শব্দ না দেখিয়ে, বরং সেই ভুল শব্দ যে লাইনে আছে সেই লাইনের 'সম্ভাব্য অর্থ বোঝে' সবচেয়ে উপযোগী একটা শব্দ সঠিক বিকল্প হিসাবে দেখাতে পারে। এরকম করে আরও উন্নত স্পেল চেকার এক সময় শুধু অভিধান নির্ভর না থেকে ব্যাকরণ সহায়ক সফটওয়্যার হিসাবে উন্নীত হয়। ইংরেজি ভাষার জন্যে এরকম সফটওয়্যার এর উদাহরণ হচ্ছে "Language Tool" এবং "Grammarly"। বাংলা ভাষার এরকম কোনো সফটওয়ার আছে কি না জানা নেই। তবে নিশ্চয়ই পৃথিবীর কোনও এক কোনায় এক বাঙালি "বাংলা ব্যাকরণি" সফটওয়ারের জন্যে কাজ করছে। এতক্ষণ "ধান ভানতে শিবের গান" করলাম, গান মনেহয় বেশ লম্বা'ই হয়ে গেল। তবে এবার ধান ভানা যাক।

এ-আই সফ্টওয়্যার

উপরের গানটাতে এটা বোঝাতে চাইছি যে বাজারে ইতিমধ্যেই এরকম সফটওয়্যার আছে যা শুধু বানান শুদ্ধ করে দেয় না, বরং বাক্যের ব্যাকরণ, গঠন, লেখার ভঙ্গি, একেকটা অনুচ্ছেদের সাথে কোনো শব্দ খাপ খাচ্ছে কি না ইত্যাদিও দেখিয়ে দেয়। এরকম ক্ষমতা থাক সফটওয়ার কে বলা হয় কৃত্রিমভাবে বুদ্ধিমান (Artificially Intelligent) সফ্টওয়্যার অথবা সংক্ষেপে এ-আই সফ্টওয়্যার। লেখা লেখির ক্ষেত্রে এরকম এ-আই সফ্টওয়্যার ইংরেজি ভাষা ছাড়াও জার্মান, ফরাসি, স্প্যানিশ, ইতালিয়ান ইত্যাদি ভাষায় সহজ লভ্য। আর বাংলা ভাষায়ও আশাকরি এরকম সফটওয়্যার আগামীতে আসবে যদি আমরা এরকম করে বাংলা ভাষায় চর্চা জারি রাখি।

কৃত্রিম উপন্যাস ও কবিতা

এ-আই সফ্টওয়্যার ইতিমধ্যে ইংরেজি ভাষায় উপন্যাস, কবিতা লিখেছে যা তর্কসাপেক্ষ ভালো মানের। ইচ্ছুকরা গুগল করলেই অনেক তথ্য পেয়ে যাবেন। তাহলে বর্তমানে আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে কৃত্রিম সফ্টওয়্যার কবিতা, উপন্যাস লিখছে, লেখকের লেখার ভুল শুদ্ধ সবকিছুই বলে দিচ্ছে। একটু এগিয়ে ভেবে বলা যায় যে এরকম ভবিষ্যও খুব দূর নয় যেখানে, শুধু সফটওয়্যার নয়, হার্ডওয়্যারও বেরোবে, যেমন একটা ছোট্ট কম্পিউটার চিপ (chip) যা আমাদের গলায়, মাথায়, অথবা মস্তিষ্কের ভেতরে কোনো এক জায়গায় লাগানো থাকবে, আর আমাদের কথা বলা বা চিন্তনকে পরিচালনা করবে যাতে আমরা প্রত্যেকেই একেকজন সুনীল গাঙ্গুলি অথবা কবি সুকান্ত হয়ে উঠবো। তখন সৃজনশীল কাজের সংজ্ঞাটাই কি হবে কে জানে।

অজানা ভবিষ্যৎ

এরকম একটা ভভিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে যখন বানানের শুদ্ধা-শুদ্ধি আর বাক্যের ব্যাকরণ নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে দেখি, তখন কেমন জানি নিরুপায় লাগে। নাতিসুদূর ভবিষ্যতে এ-আই প্রযুক্তি আমাদের ভাষা, চিন্তন, আত্ম প্রকাশের উপায়, জ্ঞানের আদানপ্রদান, ইত্যাদিকে এমন ভাবে দুমড়ে-মুছড়ে, উল্টে-পাল্টে বদলে দেবে যা আমরা হয়তো এখন কল্পনাই করতে পারবো না। আর হ্যাঁ, এ-আই প্রযুক্তির জন্যে শুধু ভাষা না, বৌদ্ধিক যা কিছু আছে সবই বদলে যাবে। তাই আমাদেরকে এখন থেকেই ভাবা উচিৎ কি ভাবে ভবিষ্যতের অবশ্যম্ভাবী এ-আই পরিচালিত বৌদ্ধিক জগৎকে আমরা গ্রহণ করবো।


তথ্যসূত্র



শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২০

মন্টি হল সমস্যা – অন্তর্দৃষ্টিকে চ্যালেঞ্জ করার খেলা

ভোগবাদ-ই হচ্ছে বর্তমান যুগের মূল মন্ত্র। সেই ভোগবাদের ভুক মেটায় পদার্থ বিজ্ঞান (Material Science)। প্রতিদিন পৃথিবীর কোণায় কোণায় বেশীরভাগ গবেষণাগারে শত শত বিজ্ঞানী এই নিয়ে কাজ করে চলেছেন যে কি ভাবে নতুন নতুন পদার্থ আবিষ্কার করা যায়। এই গবেষণার তাত্বিক ভিত্তি আসে পদার্থবিদ্যার প্রধান দুটি শাখা থেকে, যথা,   পরিসংখ্যানগত বলবিজ্ঞান (Statistical Mechanics) এবং কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান (Quantum Mechanics)। আবার এই দুটি ভাগেরই মূলে আছে সম্ভাব্যতা তত্ত্ব (Probability Theory)।  তাই বর্তমান যুগের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতে সম্ভাব্যতা তত্ত্বের একটা বিরাট ভূমিকা আছে। পদার্থ বিজ্ঞান ছাড়াও এই সম্ভাব্যতা তত্ত্বের উপযোগিতা আছে অর্থনীতি শাস্ত্রে। 
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ও অর্থনীতিতে এতো গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্তেও আমাদের স্কুলের পাঠ্যসূচীতে সম্ভাব্যতা তত্ত্বকে বিশেষ ভাবে রাখা হয়নি, আর যা আছে তাও খুব গুরুত্ব সহকারে পড়ানো হয় না। এ কারণে সম্ভাব্যতা তত্ত্বে আমাদের খুব মজবুত ভিত কখনোই গড়ে উঠে না। তাই এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের ভাল অন্তর্দৃষ্টিও (intuition) জন্মে না। অর্থশাস্ত্র অথবা বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজতো দূরের কথা, আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও সম্ভাব্যতার খেলা অনেক পরিস্থিতিতে আসে এবং আমরা তখন দুর্দান্ত রকম ভাবে বিফল হই আর অনেক ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।

সম্ভাব্যতা তত্ত্ব নিয়ে আমাদের এই দুর্বল অন্তর্দৃষ্টিকে পরীক্ষা করার জন্যে "মন্টি হল সমস্যা" হল এক খুব সুন্দর বৈজ্ঞানিক উপায়।

মন্টি হল (Monty Hall) সমস্যা হল একটি সম্ভাবনার ধাঁধাঁ যা মার্কিন টেলিভিশন গেম শো লেট'স মেক এ ডিল এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। হেঁয়ালিটির নামকরণ হয়েছে অনুষ্ঠানটির উপস্থাপক মন্টি হলের নামে। সমস্যাটি মন্টি হল হেঁয়ালি নামেও পরিচিত, কারণ এর প্রকৃত ফলাফল অসম্ভব মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সত্য। [বাংলা উইকিপিডিয়া থেকে নেওয়া মন্টি হল সমস্যার সংজ্ঞা]

মূলতঃ, মন্টি হল সমস্যা একটা অনুমানের খেলা। কখনো এটাকে সম্ভাব্যতার ধাঁধাঁ বা হেঁয়ালিও বলা হয়। এই খেলার চমকপ্রদ ইতিহাস আর বাকি বিবরণ উইকিপেডিয়ার পাতায় আছে। এই পোষ্টে আমি আমার মতো করে এই খেলার সম্ভাব্যতা তত্ত্বের দিকটা সংক্ষেপে আলোচনা করব। আর একদম শেষে সি-ভাষায় লেখা কম্পিউটার এর একটা প্রোগ্রাম দেব। এই খেলার বৈশিষ্ট্যগুলো কিছুটা এরকম বলা যেতে পারে:
  • এই সমস্যা আপনার অন্তর্দৃষ্টিকে একটি পরীক্ষার মধ্যে ফেলে!
  • গেমটি জিততে আপনার অন্তর্দৃষ্টি আপনাকে এমন কিছু করতে বলতে পারে যা সম্ভাব্যতার গণিত যা বলে তার সাথে বিপ্রতীপ হয়।
  • সুতরাং, এটা সত্যই একটা আকর্ষণীয় খেলা যা আমাদের দেখায় যে শুধু অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে সত্য কখনই অর্জন করা যায় না।
  • বরং গাণিতিক কঠোরতা এবং বৈজ্ঞানিক তদন্তই সর্বোত্তম উপায়।

কেমন করে খেলে ...

এই খেলায় রয়েছে
  • একজন পরিচালক এবং একজন খেলোয়াড়
  • তিনটে বাক্স (ক , খ এবং গ ) এবং একটা বল
  • খেলা শুরুর আগে পরিচালক তিনটে বক্সের যেকোনো একটাতে রাখবে বলটি
  • খেলোয়াড় জানেন না, বলটি কোন বাক্সে রয়েছে।
  • গেমটি জিততে খেলোয়াড়কে অনুমান করতে হয় কোন বাক্সে বলটি রয়েছে।
  • গেমটি নিম্নলিখিত ধাপে হয়:
    • প্রথমত, খেলোয়াড় অনুমান করে একটি বাক্স বেছে নেয় (ধরুন বাক্স ক)
    • তারপর পরিচালক বাকী দুই বাক্সের মধ্যে একটি খালি থাকা বাক্স খোলে (ধরুন বাক্স খ)
    • তারপর পরিচালক খেলোয়াড়কে জিজ্ঞাসা করে যে খেলোয়াড় তার অনুমানটি ক থেকে গ-এ বদল করতে চায় কিনা?
এখন প্রশ্ন: খেলোয়াড়ের কি করা উচিত? তার প্রথম পছন্দেই (বাক্স ক) বজায় থাক, না নিজের প্রথম অনুমান পরিবর্তন করে অন্য বাকি বাক্স (উপরের উদাহরণ অনুসারে বাক্স গ) নির্বাচন করা উচিত?


সম্ভাব্যতার অংক ...

সম্ভাব্যতার অংক মতে খেলোয়াড়কে সব সময়েই তার প্রথম অনুমান বদলে নেওয়া উচিত, তাতে তার জেতার সম্ভাবনা দ্বিগুণ বেড়ে যায়।

আসুন বোঝা যাক এটা কেমন করে হয়। প্রথমে তিনটে বাক্সের (ক, খ এবং গ) মধ্যে যেকোনো একটাতে বল থাকার সম্ভাবনা এক-তৃতীয়াংশ (১/৩)। সব বাক্সের সম্ভাবনা সমান (১/৩)। তার মানে যখন খেলোয়াড় প্রথম বাক্সেটা পছন্দ করল (ধরুন বাক্স ক) তখন বাকি দুটো বাক্সে বল থাকার মোট সম্ভাবনা (১/৩+১/৩=২/৩)। এবার পরিচালক বাকি দুটো বাক্স থেকে একটাকে (ধরুন বাক্স খ খুলে দেখিয়ে দিলেন যে ওটাতে বল নেই, তখনও বাকি দুটো বাক্সে (ক এবং খ-এ) বল থাকার মোট সম্ভাবনা ২/৩-ই রয়ে গেছে (খেয়াল করবেন "মোট সম্ভাবনা")। তাহলে কি দাড়াল? বাকি দুটো বাক্সের মোট সম্ভাবনা ২/৩, একটাতে (মানে বাক্স খ-এ) এখন জানা হয়ে গেছে যে বল নেই, তাহলে রয়ে যাওয়া বাক্সে (মানে বাক্স গ-এ) বল থাকার সম্ভাবনা বদলে গেলো, ১/৩ থেকে বেড়ে হল ২/৩। তারমানে, প্রথম যে বাক্সটা পছন্দ ছিল তাতে টাকা আদৌ আছে কি না তার সম্ভাবনা ১/৩, দ্বিতীয় বাক্স, যা পরিচালক খোলে দেখিয়েছিলেন যে ওটা খালি, তাতে বল থাকার সম্ভাবনা নেই (০), আর শেষ ব্যাগটিতে সম্ভাবনা ২/৩। তাহলে পরিচালকের হস্তক্ষেপের পর (মানে দ্বিতীয় বাক্সের সম্ভাবনা নেই শূন্য করে দেবার পর), খেলোয়াড়কে তার পছন্দ বাক্স ক থেকে বাক্স গ-এ বদলে নেওয়াই উচিত (সফলতার সম্ভাবনা ১/৩ থেকে বেড়ে হয়ে যাবে ২/৩, মানে দ্বিগুণ হয়ে যাবে)।
এটাকে অন্য ভাবেও বোঝা যায়। যেমন খেলোয়াড় যদি তার প্রথম অনুমানেই কায়েম থাকে, পরিচালক কি করল না করল তার কোনো কথাই ভাবে না, তাহলে তার জেতার সম্ভাবনা শুরুতে যা ছিল তাই রয়ে গেল, মানে জেতার সম্ভাবনা ১/৩ হয়ে রয়ে গেলো। তারমানে, পরিচালকের হস্তক্ষেপের পর খেলোয়াড় তার পছন্দ বদলালে, জেতার সম্ভাবনা হয়ে যাবে ১-১/৩=২/৩।

সম্ভাব্যতার ভুল অংক ...

কোনো কোনো খেলোয়াড় আবার অন্তর্দৃষ্টি বশতঃ একটু অন্য ভাবে ভাবতে পারেন আর সম্ভাব্যতার অংকে ভুল করে তার জেতার সম্ভাবনা টা কমিয়ে দিতে পারেন। তাহলে, ভুল ভাবনাটা হচ্ছে এরকম:

খেলোয়াড় একটা বাক্স অনুমান করে পছন্দ করেছে। পরিচালক বাকি দুটো বাক্সের মধ্যে কোনো একটা বাক্স, যেটা খালি, সেটা খুলে দেখিয়ে দিলন যে বল ওটাতে নেই। তাহলে এবার বল হয় খেলোয়াড় যে বাক্সটা পছন্দ করেছে তাতে আছে নয়ত যে বাক্সটা এখন খোলা হয়নি সেটাতে আছে। অন্য ভাবে বললে বল দুটো বাক্সের মধ্যে যেকোনো একটাতে আছে। তাই এই ক্ষেত্রে এখনও বন্ধ থাকা বাক্স দুটোর মধ্যে বল থাকার সম্ভাবনা সমান আর সেটা ১/২। তাই এই খেলায় পরিচালকের হস্তক্ষেপের পর খেলোয়াড় তার পছন্দ বদল করার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ বদল করলেও জেতার সম্ভাবনা সমানই থাকবে।

পরীক্ষা করে দেখা যাক ...

এখানে একটা কথা বলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, যেকোনো সম্ভাবনার খেলায় গাণিতিক যে সম্ভাব্যতার সংখা আসে সেটা পরীক্ষা করে দেখতে গেলে অনেক অনেক বার (যেমন ১ লক্ষ বার) খেলাটা খেলতে হয়। পরিসংখান তত্বের ভাষায় "নমুনার সংখ্যা" (sample size) বাড়াতে হয়। তারপর সব খেলার পরিসংখ্যান নিলে তবেই দেখা যাবে যে সম্ভাবনাটা ঠিক হচ্ছে কি না।

মন্টি হল (Monty Hall) সমস্যার খেলাটাকে লক্ষ বার খেলা হয়তো ব্যবহারিকভাবে একটু মুস্কিলই বটে, কিন্তু এখানে ব্যাপারটা সহজ হয়ে যায় যদি আমরা একটা কম্পিউটার এর সহায়তা নেই। এখানে সি-ভাষায় লেখা একটা কম্পিউটার কোড দেয় আছে। এটা যেকোনো কেউ চালিয়ে দেখে নিতে পারেন যে এতক্ষণ যা আলোচনা করলাম সেটা কতটুকু সঠিক।
#include <stdio.h>
#include <math.h>
#include <stdlib.h>
// This MONTY-HALL PROBLEM
// Written by- Debabrata Deb, TIET, Patiala
// To understand the code better 
// see the following video on YouTube (last 5 mins)
// https://youtu.be/rTSfPOOayaU
// Dated: 10th July 2020
int main(){
 int ii,nplay=10000000,bags[3];
    int hid,pid,heid;
    int nwin=0, win=0;
    for (ii=1;ii<=nplay;ii++){
        // set up the bags
        bags[0]=bags[1]=bags[2]=0;            // emptying all three bags
        hid=(int)(3*(double)rand()/RAND_MAX); // host chooses in which box to put ball
     bags[hid]=1;                          // ball is placed into the hid-th box
          // play the game
     pid=(int)(3*(double)rand()/RAND_MAX); // the player chooses the pid-th box
        
        do{
          // host has to choose an empty box which is neither pid nor hid
          // why not hid? because host only opens the box which is empty
          // and hid is the box which contains the ball. 
          heid=(int)(3*(double)rand()/RAND_MAX); // host's choosen empty box id
        }while(heid==hid || heid==pid);
        // game ends -- next we will check if the player have won 
          // to win with 2/3 probability, 
     // the player switches its choice from pid to
     // the third box which the host did not choose
     // in otherwords, because player would choose to switch to win more, 
     // now if the pid box has the ball then he looses
     if(bags[pid]==1) win=0;   // i.e. the player looses the game 
     else win=1;
        //printf("Game #%4d: ball was in %d box, Player chooses %d box, Host chooses %d box, win %d\n",ii,hid+1,pid+1,heid+1,win);
        
        nwin+=win;
    }
    printf("\nWin probability = %f (ideal=%f)\n",(double)nwin/nplay,2.0/3.0);
    return 0;
}
এই নিচে দেওয়া ইউটিউব ভিডিও তে মন্টি হল সমস্যার আগা-গোড়া আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে সি-ভাষায় লেখা উপরের কোড কেমন করে ব্যবহার করতে হবে, প্রোগ্রাম আউটপুট কেমন করে ব্যাখ্যা করবেন, এই সব বিশদ ভাবে রয়েছে।