“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২০

ব্ল্যাঙ্ক ভার্সেস

।। অর্পিতা আচার্য ।।



 

 

 

 

 

 

 

 

 ১.

প্রতিটি পরাজয়ের গায়েই আজকাল লিখে রাখি

আমার অক্ষম অস্বীকার


২.

উৎসব পুড়ে গেল।

বাড়বানল থেকে তুলে রাখলাম

কিছু মৃত অঙ্গার


৩.

মণ্ডপের কোনায় দাঁড়িয়ে থাকা 

      কলাবৌয়ের আনত শরীরে

গতকাম নারীটির

ধুনুচি নৃত্যের আঁচ


৪.


সিঁদুর লেপা ঢাকের গায়ে

কাঠির তীব্র আস্ফালন


উফ্ফ্ফ্ফ শব্দে,

কান ফেটে যায়...

৫.

সমস্ত ভুলের ভেতর জেগে থাকে দীর্ঘরাত

একক অরণ্যে 

এসব হিংস্রতার পাশাপাশি 

মর্মর পাতার শব্দ

শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২০

হৃদয়ের মণিকোঠায়

  

 

(C)Image:ছবি

                   ।। মাসকুরা বেগম।।

 

--- হ্যালো। 

--- হ্যালো।

--- মাধুরী নাকি। আমি ফাতিমা বলছি। চিনতে পারছিস।

--- ফাতিমা! তুমি তুমি কি.... তুই কি আমার ছোটবেলার বন্ধু ফা-তি-মা ।

--- হ্যাঁ। তুই ঠিক ধরতে পেরেছিস। কেমন আছিস রে। কী বলবো খুঁজে পাচ্ছি না। আমি ভীষণ এক্সাইটেড........।

--- খুব ভালো আছি। ফাতিমা তুই কেমন আছিস রে। আমি ও কী বলবো খুঁজে পাচ্ছি না। কোথা থেকে শুরু করবো। কতো জমানো গল্প। এতো বছর পর তোর কণ্ঠস্বরটা শুনতে পাচ্ছি... সেটাই অনেক।

--- হ্যাঁ রে। কালকে আশুতোষের সাথে দেখা হয়ে যায় ডিসট্রিক্ট অফিসে। তোর নাম্বারটা তার কাছ থেকে পেয়েছি।

--- ও আচ্ছা। সে তো হাইলাকান্দি কোনো এক স্কুলে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্তি পেয়েছে। কোথায় আছিস তুই? কী রকম চলছে? শিক্ষিকা হয়েছিস কি?

--- হাইলাকান্দি বিয়ে হয়েছে আমার। হ্যাঁ, আমার শিক্ষিকা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে রে।এখানেই এক সরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করি। মিঃ মেডিকেল ডিপার্টমেন্টে চাকুরী করেন। তোর কথা বল।

--- খুব ভালো লাগছে তোর কথা শুনে। একটা মেডিক্যাল সাব-সেন্টারে  এ এন এম নার্স হিসেবে কাজ করছি । আমার শিলচর মানে মামার বাড়ির পাশেই বিয়ে হয়েছে। মিঃ এখানে পোস্ট অফিসে চাকরি করেন। তোর বাচ্চা-কাচ্চা আছে?

--- হ্যাঁ। দুই মেয়ে। একজন ক্লাস ওয়ান আর একজন দু বৎসর হবে নেক্সট মাসে। তোর?

--- আমার এক ছেলে, এক মেয়ে। একজন ক্লাস টু আর একজন ক্লাস নার্সারি।

 

          ইত্যাদি অনেক কথা হলো দুই পুরাতন বান্ধবীর মধ্যে অনেক বছর পর। আশুতোষ হচ্ছে মাধুরীর ছোট ভাই। তারা তিন বোন, এক ভাই। ফাতিমারা দুই ভাই, দুই বোন।

 

         মাধুরী আর ফাতিমা মাত্র তিন বৎসর একসাথে স্কুলে পড়তো একই স্কুলে। পঞ্চম শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত। 

 

          তখন জানুয়ারি মাস। মধুপুর গ্রামের বড় রাস্তার দুপাশে ছড়িয়ে আছে ধান ক্ষেতের মাঠ । গ্রামের কৃষকরা ধান কেটে তুলে নিয়েছেন নিজ ঘরে। খালি মাঠ। শিশুরা খেলছে। ছেলেরা খেলছে। গরু ছাগল অবাধে চরছে মাঠে। কোনো কোনো জায়গায় সবজি চাষ করেছেন কেউ কেউ। সুন্দর মনোরম দৃশ্য। শান্ত পরিবেশ। এই গ্রামেরই  জন্ম ফাতিমা আর মাধুরীর।   

 

          রাস্তাটা কাঁচা ছিল। তাই গাড়ি ও চলতো না। পা নাহলে সাইকেলই মানুষের ভরসা যাতায়াতের জন্য। শুকনো দিন ব্যক্তিগত গাড়ি চলতো। কিন্তু বর্ষার দিন কাঁদা মেড়েই যেতে হয়। গাড়ি নিয়ে রাস্তায় উঠলে তো কথাই নেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চলে যেতে হবে সবুজ ধান ক্ষেতের মাঝে। বৃষ্টির সময়  কাঁদা, তারপর হাঁটু জল মেড়ে যেতে হয়।  বন্যার সময় নৌকাই ভরসা। মধুবাজার থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার বিস্তৃত গ্রামের রাস্তার অবস্থা এই ছিল। বাজার, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল যেখানেই যান এভাবেই যেতে হতো। একসময় মধুপুর গ্রামের এক পাড়ার কিছু লোক  মৌমাছি পালন করতেন আর মধুবাজারে বিক্রি করতেন। এর থেকে এই গ্রামের আর বাজারের নামকরণ বলে জানা যায়। বাজার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ফাতিমার বাড়ি আর প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে মাধুরীর বাড়ি 

 

     গ্রামের ভিতরে ছিল দুটা পাঠশালা, একটা মক্তব ও একটা এম.ই. স্কুল ও একটা এম.ই.মাদ্রাসা । কিন্তু যারা একটু শিক্ষানুরাগী তারা মধুবাজারে অবস্থিত মধুবাজার এম.ই. স্কুলে নিজের ছেলেমেয়েদের পাঠান । অনেক কষ্ট হয় যাতায়াতে। কিন্তু ঐ স্কুলটার পরিবেশ যে ভালো।      

     

       ফাতিমার বাবা ছিলেন এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। সমাজসেবী। নামে নয়, কাজে। শিক্ষার উন্নয়নে আশেপাশের এলাকায় অনেক কাজ করেছেন। যার জন্য মানুষ যাতায়াতের কষ্ট স্বীকার করে ও শিক্ষা অর্জনে আগ্রহী। মাধুরীর বাবার সেনাবাহিনীতে চাকুরী। তাই দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হয় । 

    

    সেদিন পঞ্চম শ্রেণিতে নাম ভর্তির জন্য এসেছিল মাধুরী নাথ তার বাবার সাথে। ছোট্ট, পাতলা গড়নের, মিষ্টি মেয়ে। প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ আলিম এর সাথে খুব ভালো সম্পর্ক মাধুরীর বাবার। দেখা করতে নিয়ে গিয়েছিলেন মেয়েকে। ভীষণ খুশি হয়ে উনি বলেছিলেন,

 ---  দাদা, আমার মেয়ে ও তো ক্লাস ফাইভে । বলে ডেকে আনলেন ফাতিমাকে। লম্বাটে, শ্যামলা মেয়ে, মুখে এক সরল হাসি।

 

--- ফাতিমা এ হচ্ছে মাধুরী। আর মাধুরী এ হচ্ছে ফাতিমা। তোমরা এক ক্লাসের স্টুডেন্ট। যাও এক সাথে খেল গিয়ে।

 

  ফাতিমা মাধুরীর হাতটা ধরে নিয়ে গিয়েছিল বাইরে। একদিনেই ভাব জমে গিয়েছিল দুজনের মধ্যে।

   

      দুজনের স্কুলে যাত্রা শুরু হয়েছিল একসাথে। স্কুলে যাওয়ার সময় মাধুরী এসে দাঁড়িয়ে থাকত ফাতিমার বাড়ির সামনে। ফাতিমা অপেক্ষায় থাকত মাধুরীর। বিনা কারণে স্কুল কামাই করত না তারা কোনোদিন। ফাতিমা ছিল লম্বা, তাই ছাতাটা ও ধরত। এক ছাতার ছায়ায় হয়ে যেত দুজনের। একজনেরটা বন্ধ করে বই-পত্র কেরি করার এলুমিনিয়ামের বাক্সে রেখে দিত। দুজনে হাতে বাক্স নিয়ে বিভিন্ন কথা বলতে বলতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে কখন যে পৌঁছে যেত স্কুলে, টেরই পেত না।

 

      একই বেঞ্চে পাশাপাশি তো বসবেই দুজন। পড়াশোনায় দুজনই মনোযোগী ছিল। আর পড়াশোনায় সহযোগিতা করত একে অপরকে বা অন্যান্য সহপাঠীদের ও। যখন টিফিনের সময় হতো ছাত্র ছাত্রীদের হৈ-হুল্লোড় সাথে  এলুমিনিয়ামের বাক্সগুলোর শব্দে স্কুল মাথার ওপর উঠে যেত । ফাতিমা আর মাধুরীর টিফিন ভাগাভাগি তো একটা রুটিন হয়ে গিয়েছিল, নাইলে তো তাদের খাবার হজমই হত না। 

 

     নাথপাড়া থেকে আরো ওদের সাথে যারা আসতো স্কুলে, একদিন একজন মাধুরীকে 'টুনটুনি' বলে ডাক দিয়েছিল। ফাতিমা ঘুরে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘টুনটুনি কে রে?' মেয়েটি বলেছিল, 'কেন তুই জানিস না? মাধুরীর ডাক নাম টুনটুনি।' একদিন ফাতিমা ডাক দিয়েছিল,

--- ও টুনটুনি...।

কোনো জবাব দেয় নি মাধুরী। মিষ্টি মুখটা কালো হয়ে গিয়েছিল তার। চোখ ছলছল করছিল। ফাতিমা তৎক্ষণাৎ বুঝে ফেলেছিল। 

--- কী হয়েছে তোর? কথা বলেছিস না কেন? 

মাধুরী কিন্তু নীরব।

--- আমার উপর অভিমান হয়েছে নাকি। লক্ষ্মীটি বল না কিছু। কিছু না বললে আমি আর তোর সাথে কথা বলবো না। বলে পাল্টা রাগ দেখিয়ে ছিল ফাতিমা।

--- তুই ও আমাকে ঐ নামে ডাকলি।ঐ নামটা আমার একদম পছন্দ না। আমি দেখতে ছোট বলে ঐ নামে ডাকে।

--- কান ধরছি ভাই। আর কোনো দিন তুই ঐ নামে ডাক শুনবি না। 

ফাতিমা মাধুরীর অজান্তে যারা তাকে টুনটুনি বলে তাদের বুঝিয়ে ছিল।  আর কোনো দিন কেউ মাধুরীকে টুনটুনি বলতে শুনা যায় নি স্কুলে।

 

          সপ্তম শ্রেণির পরীক্ষা শেষে মাধুরীর একমাত্র  মামা আর মামী এসে তার মা-বাবাকে ধরেছিলেন যে শিলচরে তাঁদের ঘরের পাশেই স্কুল-কলেজ সব আছে। মামা ব্যবসায়ী। মাধুরীর মামি চাকুরী করেন, ছোট ছোট দুটা ছেলে, সংসার সব কিছু সামাল দিয়ে তাদের দিদিমার ভালো করে যত্ন করতে পারছিলেন না। তাই তাঁরা মাধুরীকে সেখানে নিয়ে গিয়ে দিদিমার সাথে রাখতে চান  আর অষ্টম শ্রেণিতে নাম ভর্তি করাতে চান। মাধুরীর মা-বাবা খুশি খুশি দিয়ে দিয়েছিলেন তাকে। মেয়েটার এতো কষ্ট হয় স্কুলে যাতায়াত করতে। শিলচর টাউনে সব সুবিধাই পাবে পড়াশোনার জন্য। তার ভালোই লাগছিলো, ভাবছিল, "দিদিমা, মামা-মামি সবাই আদর করবে, বাপন-পাপনদের সাথে খেলবে........।’

 

       সেখানে নতুন স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। ঘরের বেশি দূর না স্কুল, প্রায় আধা কিলোমিটার মাত্র। সে কীসের যেন এক অভাব অনুভব করছিল।

স্কুলে গিয়ে ফাতিমাকে খুঁজত তাঁর মন। স্কুল আসা-যাওয়া করতে এই একটুখানি পথ যেন তার শেষ হতো না। মনে পড়ে কীভাবে এতোটা পথ হেঁটে, কাঁদা মেড়ে, পানি ঠেলে স্কুলে যেতো তারা। বর্ষায় হাওয়াই চপ্পল পরে কাঁদা মাখা রাস্তা দিয়ে তারা যখন যেত নীল রঙের স্কার্টটা কাঁদায় প্রিন্টেড হয়ে যেতো। শুকনোর পর একজন আর একজনের স্কার্ট ঝেড়ে দিত। ছাতা নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে আনন্দে আত্মহারা হয়ে তারা স্কুলে আসা-যাওয়া করতো। 

 

           মামাবাড়িতে বড় হয়ে উঠে ছিল মাধুরী। এখানে যে হাইস্কুলে পড়েছিল সেই স্কুলের একজন শিক্ষক তাঁর একমাত্র পোস্টমাস্টার ছেলের বউ করে নিয়ে যান। মাধুরীর চারিত্রিক গুণাবলী ও শিক্ষানুরাগ তাঁর খুব ভালো লেগেছিল। সুখী সংসার মাধুরীর।

 

      ফাতিমাও কতো সহপাঠী বন্ধু পায় জীবনে চলার পথে কিন্তু মাধুরীকে সযত্নে রেখে দেয় তার হৃদয়ের এক কোণে। নিজে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে শিক্ষকতায় যোগদান করে।

     

     এখন মধুপুরের সেই রাস্তা এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পাকা হয়ে গেছে। অনবরত চলতে থাকে ই-রিকসা, অটো, টেম্পো, ভ্যান, ম্যাজিক, কার ইত্যাদি। গাড়ির শব্দে এখন আর সেই শান্ত পরিবেশ নাই। রাস্তার দুপাশে গড়ে উঠেছে নতুন নতুন পাকা বাড়ী-ঘর। আর দেখা যায় না সেই বিস্তৃত কৃষি জমি। কৃষি কর্ম ও আগের মতো হয় না, কৃষি কর্মে ছেলেদের অনীহা কিংবা আলস্যের জন্য। ধান কাটার পর শুকনো মাঠে আর আগের মতো শিশুদের বা ছেলেদের খেলতে দেখা যায় না। এখন অনেকেই ভিডিও গেম নিয়ে ব্যস্ত, কেউবা টিউশন আর অত্যধিক পড়াশোনার চাপে খেলাধুলার সময়ই পায় না। সরকারি স্কুলের ঐতিহ্য ও এখন বেসরকারি স্কুলের সম্মুখে ম্লান হয়ে গেছে। তখন কাঁদা মাখা কাপড়েও যেখানে ছেলে-মেয়েরা বিন্দাস ছিল, আজকাল অল্প কলমের কালির দাগও লেগে গেলেই ছেলে-মেয়েরা হীনমন্যতায় ভোগে। মধুবাজারও এখন অনেক বিস্তৃত, সমৃদ্ধ, উন্নত।

     

    সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন তো স্বাভাবিক। কিন্তু পরিবর্তন হয়নি দুটো হৃদয়ের। পাশাপাশি দুই জিলায় বসবাস করার পর ও ফাতিমা ও মাধুরীর মধ্যে কোনো যোগাযোগ হয়নি। তখন ছিল যোগাযোগ মাধ্যমের অভাব। দুজনই রক্ষণশীল পরিবারের মর্যাদা দিত। উচ্ছৃঙ্খল জীবন-যাপন করেনি কোনোদিন। কিন্তু দুজনের হৃদয়ের মধ্যে ছোটবেলার ছবি, বন্ধুত্ব অম্লান হয়ে আছে। এতো বছর পর ফাতিমা আর মাধুরী আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় হৃদয়ের মণিকোঠায় গচ্ছিত প্রিয় জনকে ফোনে পেয়ে। কী যেন এক ভালোলাগা ছুঁয়ে যায় একজন আরেকজনের কন্ঠস্বর শুনে। 

 

 

                           

 

                                 

 

     

 

শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২০

হায়রে এন আর সি

 ।। মাসকুরা বেগম ।।

     

(C)Imageঃছবি

                              

                                    

- মা মা মা, বলে বাড়িতে ঢুকছে মুন্না।

- আস্তে আস্তে মা বোধহয় ঘুমাচ্ছেন।

    ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এসে জবাব দে রহিমা। এক মাস হয়েছে মুন্নার সাথে বিয়ে হয়েছে রহিমার। শান্ত, সুশ্রী মেয়ে। মুন্নার মা-ই পছন্দ করে মেয়ে এনেছেন। তিনি তাকে বউ ভাবতেই পারেন না। নিজের তিন ছেলে। মেয়ে একটা ছিল। পাঁচ বছর বয়সে চলে গেছে বেহেশতে। 

  - মা তো দিনের বেলা ঘুমান না, কোনো দিন। শরীর খারাপ নাকি। মুন্না বললো।

    - মা না খুব আনমনা হয়ে কী যেন ভাবছেন, কী  যেন কষ্ট পাচ্ছেন । আমি পাশে গিয়ে বসে জিজ্ঞেস করলাম, ''আম্মা আপনার কি শরীর খারাপ?'' কিছু বলছেন না। যখন আমি বেশি জোর করলাম শুধু 'হায়রে এন আর সি' বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। আমার আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস হয়নি। মা কেন এমন করলেন? কী  কষ্ট মায়ের মনে?

 

    মুন্না তখন বলতে শুরু করল। তার মা বেগমকে স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ সবাই স্নেহ করতেন। তিনি নিজের গুনে সবাইকে খুব আপন করে নিয়েছিলেন। তার দাদার অনেক কৃষি কর্মের জমি। তাই বাবা আলীকে কৃষি কর্মই করতে হয়েছে। কিন্তু এই কৃষক বাবা আলী খুবই জ্ঞানী ছিলেন। গ্রামের মানুষ খুব শ্রদ্ধা করত। যখন কোনো বিষয়ে বক্তৃতা আরম্ভ করতেন, অনেক শিক্ষিত লোকই লজ্জায় মুখ লুকাতো। গ্রামের মানুষ জোর করে সভাপতি আসনে বসাতো উনাকে। বেগম ও আগলে রেখেছিলেন পরিবার, সম্পত্তি সব কিছুই। আলী ও বেগমের সুখী সংসার। 

 

     ২০১ ইংরাজিতে শুরু হলো এন. আর. সি. প্রক্রিয়া। দৌড় শুরু হলো নথিপত্র যোগাড়ের । বেগম নবম শ্রেণিতে থাকতে বিয়ে হয়ে যায়। স্কুল সার্টিফিকেট ও বের করা হয়নি। বার্থ সার্টিফিকেটটা আজকের মতো তো সঙ্গে সঙ্গে রেজিস্ট্রি হয়নি। স্কুল থেকে সার্টিফিকেট আনলেন তো নামটা ভোটার আইডি কার্ডের সাথে মিলে না। এক জায়গায় করিমা বেগম তো অন্য জায়গায় কারিমা বেগম।বাপ-দাদার লিগ্যাসি, তাও আছে। তারপর বিবাহিত মহিলার নাকি আবার নিজ বাবার গ্রামের পঞ্চায়েত সার্টিফিকেটও আনতে হবে। তাই আনলেন। ২০১৮ ইংরাজিতে ভেরিফিকেশনও হয় গোয়ালপাড়ায়। ২০১৯ আবার ভেরিফিকেশনর ডাক আসে উনারা ভাই-বোনদের সবার করিমগঞ্জ থেকে। যেখানে উনাদের চৌদ্দ গুষ্টির ও কেউ নেই । তারপরও যেতে হবে সরকারি নির্দেশ। আবার না দেশ ছাড়া হতে হয়। রমজান মাসের দিন, কাঠফাটা রোদ। রোজা রেখে রওয়ানা দিলেন কামরূপের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে। এক কিলোমিটার ই-রিকসা, তিন কিলোমিটার টেম্পো তারপর বাসে শরাইঘা  হয়ে ব্রহ্মপুত্র পার হয়ে গুয়াহাটি । এখানে উঠলেন নিজ ভাইয়ের ভাড়াঘরে। তিন বোন, দুই ভাই এক সাথে জড়ো হলেন ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে । ভোরের ট্রেনে গুয়াহাটি পল্টনবাজার রেলস্টেশন থেকে রওয়ানা দিলেন করিমগঞ্জের বদরপুর অভিমুখে।গুয়াহাটি - বদরপুর পাহাড়িয়া রাস্তার সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করলেন কিন্তু ভালো খাবারের ব্যবস্থা হলো না বাচ্চাদের জন্য। জীবনে প্রথম বার এতো দীর্ঘ যাত্রা। বিকেলে বদরপুর পৌঁছে একটি হোটেলে উঠলেন। সবাই ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়া করে একটু রেস্ট করতে লাগলেন। ছোট ভাইটা বেরিয়ে পড়লো ভেরিফিকেশন সেন্টারের খোঁজে। ও পেশায় উকিল। গুয়াহাটি হাইকোর্টে কাজ করে।খোঁজ পেলো সেন্টারটা শহর থেকে ভিতরের দিকে গ্রামে। ফিরে এসে হোটেলে বিশ্রাম নিলো। পরেরদিন ভেরিফিকেশন।  এখানে  খাবার-দাবার মোটামুটি ভালোই । হোটেল থেকে রাত্রে খাবার নিয়ে রেখে দিলেন সেহরি খাবার জন্য। সেহরি সেরে, ফজরের নামাজ পড়ার পর আর কারো চোখে ঘুম আসলো না। ভোরের আলো দেখা দিলে বেরিয়ে পড়লেন অচেনা গ্রামের উদ্দেশ্যে। সেখানে গিয়ে যে সেন্টারে উপস্থিত হলেন ওরা বললো এই সেন্টার না। গ্রামের অপর প্রান্তে আর একটা সেন্টার আছে সেখানে যেতে হবে। তড়িঘড়ি রওয়ানা দিয়ে পৌঁছলেন সেখানে। দুপুর অবধি অপেক্ষা করার পর ডাক আসলো। তারপর কাজ শেষ করে হোটেলে পৌঁছলেন।ব্যাগ-ট্যাগ গোছালেন । রাত্রে গুয়াহাটি অভিমুখী ট্রেনে করে যাত্রা শুরু করলেন। সারা রাত দুচোখে একটুও ঘুম আসলো না বেগমের। রাত একটা বা দুটোর মধ্যে ছোট ভাইটার ফোনটার রিং বেজে উঠলো। কেন যেন ফোনটা রিসিভ করে হুড়মুড় করে ট্রেনের বার্থ থেকে নেমে গেল। প্রায় পনেরো বা বিশ মিনিট পর চলে এলো। জিজ্ঞেস করলেন, - কী  হয়েছে?

- কিছু না, তুমি একটু ঘুমাও বু।

- ঘুম আসছে না, মনটা ভালো লাগছে না ।

 কিছু না বলে চুপচাপ শুয়ে পড়লো ভাইটা। বড় ভাই ঘুমাচ্ছিলেন। একবার উঠলেন ওয়াশরুমের দিকে গেলেন। পিছনে ছুটে গেল ছোট ভাইটা। তারপর এসে চুপচাপ শুয়ে পড়লো তারা। কোনো কথা বলছে না। বেগমও কিছু বলতে পারছেন না। নিস্তব্ধ ট্রেন ছুটে চলছে। সকালে গুয়াহাটি পৌঁছলে তারা একটা ভ্যানগাড়ি নিয়ে এসে বললো যে এখনি ফোন এসেছে বেগমের স্বামীর একটু শরীরটা খারাপ লাগছে তাই সবাই মিলে সোজা সেখানে গিয়ে তাঁকে দেখে আসবেন। বেগম বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। তারা সান্ত্বনা দিলো - কিছু হয় নি। 

গাড়ি ছুটে চলছে। সবাই চুপচাপ বসে আছে। গাড়ি গিয়ে পৌঁছলো বাড়ীর পাশে। বেগম গাড়ি থেকে হুড়মুড়য়ে নেমে যান বাড়ীর সদর দরজায়। উঠোন ভর্তি মানুষ। থমথমে পরিবেশ। পাগলের মত দৌড়ে গিয়ে দেখেন খাটের উপর শুয়ে আছে কেউ যেন,  সাদা কাপড়ের নিচে। আর একটু এগিয়ে গিয়ে মুখটা দেখে মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। 

ছেলেরা মাকে দেখে কান্নায় লুটিয়ে পড়ে। আলীর মৃতদেহ পড়ে আছে খাটে। ঐ রাতে ভাত খাবার পর আলীর কী  রকম যেন অস্বস্তি অনুভব হয়, বমি হয়। আলীর মা বুঝতে পেরে নাতিদের ডাকেন। রাত বারোটায় হাসপাতালে নিয়ে যায়। ডাক্তার দেখে জানান যে সব শেষ, তার স্ট্রোক হয়েছিল। কতই বা বয়স হয়েছিল আলীর। পঞ্চাশ হবে। পুত্র শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েন আলীর মা।তারপর কিছু দিন পর তিনিও চলে যান পরলোকে। 

 - তখন থেকে মা দুর্বল হয়ে পড়েছেন, আব্বার চলে যাওয়ার মুহূর্তে পাশে থাকতে না পারায় কেমন যেন হয়ে গেছেন। চোখ মুছতে মুছতে মুন্না বললো।

 রহিমা সব শুনে শুধু চোখের জল মুছে আর তার মুখ দিয়েও বেরিয়ে আসে,

- হায় রে এন. আর. সি.-র হিয়ারিং!