“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
ত্রিপুরা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ত্রিপুরা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

বিকেলের শিহরণ

 

।। রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ ।।

(C)সৌজন্য

 

 

 

 

 

বুদ্ধি-সুখে কাতরায় কিছু দৃশ্য 
মাতব্বরি শেষে রাতের শিহরণে
উত্তেজনায় টানটান গাণিতিক ত্রাণ 
বিশেষজ্ঞ মেঘে কাতুকুতু 
জাগিয়ে রাখে মৃত্যুর সংলাপ 
স্বপ্নদোষ এড়িয়ে কবিতা দোষে
খাতায় চোখ বুজে আসে…

রবিবার, ২৭ জুলাই, ২০২৫

সুমন পাটারি


 

সুমন পাটারি ত্রিপুরার সন্তান । আমার গর্বের দক্ষিণ জেলার । রাজ‍্যের জন‍্যে দিয়েছে গর্বের সম্মান । সাহিত‍্য একাডেমি যুব পুরস্কার - ২০২২ ঘরে এল তার লিখে কিছু হয় না–অক্ষর প্রকাশনী/২০১৯  কাব‍্যগ্রন্থের জন‍্যে ।  তার সঙ্গে প্রথম পরিচয় বাইখোরাতে একটি সাহিত‍্যানুষ্ঠানে । আমাকে বাইখোরা বাজার থেকে বাইকে তুলে সোজা অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে যায় । তরুণ সৈনিকের মতো একহারা দৃপ্ত চেহারা । সুমনের কবিতায়ও সেইরকমের তীব্র ঋজুতার ছাপ । তারপর থেকেই বিভিন্ন সময়ে দেখা হয়েছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে । ভদ্র, নম্র ও চলাফেরায় একদম সাদাসিধে । কিন্ত জীবন, জগৎ ও প্রকৃতি সম্বন্ধে অত‍্যন্ত সংবেদনশীল । একবার আমরা একসঙ্গে রাজ‍্যের বাইরেও গেছি । একদম কাছে থেকে দেখেছি সুমনকে । এই যাত্রাপথে সুমন আমাকে সন্তানসুলভ দায়িত্ব নিয়ে আগলে রেখেছিল । আমার খাওয়া দাওয়া সময়মতো ঔষধ খাওয়ানো সবকিছুতেই ওর লক্ষ‍্য ছিল । আমার কষ্ট হলেই সুমন তৎপর হয়ে উঠত আমার অসুবিধা দূর করার জন‍্য ।

 নিষ্পাপ শিশুর মতো সুমনকে নাগরিক জটিলতায় আচ্ছন্ন করেনি । সুমন একদিন সকালবেলায়  এসে আমাকে বলল তার সদ‍্য লব্ধ অভিজ্ঞতার কথা । সে ময়দানের সামনের মোড়ে দাঁড়িয়েছিল । তার বাবার বয়সী একজন বৃদ্ধ এসে আব্দার যে, লোকটার টাকাপয়সা হারিয়ে ফেলেছে । সুমন যদি কিছু টাকা দেয় তাহলে লোকটা বাড়ি যেতে পারবে । সুমন তাকে পঞ্চাশ টাকা দেয় । লোকটা তখনকার মতো চলে যায় । কিছুক্ষণ পরে সুমন লক্ষ করে লোকটা আবার এসে পাশের লোকটার কাছ থেকে একই কায়দায় টাকা চাইছে । শহুরে তঞ্চকতায় বেকুফ হয়ে যায় সুমন । সুমনের ভাষায় তার 'বাবার বয়সী' লোকটার আচরণে সে বিস্মিত । এতোটাই স্বচ্ছ সুমন ।

                কর্ম বা ভাগ‍্য বিষয়টাকে বিশ্বাস না করলেও জীবনের উত্থান ও বিপর্যয়কে গতিমুখের নির্ণায়ক বলে মেনে নিতেই হয় । সুমনের বাবা সংসারের কর্তা । তাঁর পরিশ্রমের আয়ের উপরই চলছিল তার পড়াশুনা । ত্রিপুরা রাজ‍্যের ইকফাই ইউনিভার্সিটি থেকে বিসিএতে দুর্দান্ত ফল করে রাজ‍্যের বাইরে পড়তে যায় এমসিএ । কিন্তু বিধি যে সুমনের দিকে অলক্ষ‍্যে চেয়ে হাসছিল কে জানে ! বাইখোরা বাজারে সুমনের বাবার  ধান চালের ব‍্যবসা । হঠাৎ একদিন স্তুপ করে রাখা বস্তার সারি থেকে একটা এক কুইন্টাল ওজনের ধানের বস্তা পেছন থেকে ছিটকে পড়ে গদিতে বসে থাকা সুমনের বাবার পিঠে । ঘাড়ে ও মেরুদন্ডের হাড় ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাঁর । উচ্চশিক্ষার উচ্চাশা ছেড়ে সুমনকে ফিরে আসতে হয় বাড়িতে । বাবার চিকিৎসা ও সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে সুমনের কাঁধেই । বাবার চিকিৎসার জন‍্যে সব সহায় সম্পদ বিক্রি করেও বাবাকে সুস্থ করে তুলতে পারেনি আর । এরপর নানারকম খেত-কৃষি, রাবার বাগানের কাজ, ছুটকো পেশা, প্রাইভেট পড়ানো ইত‍্যাদি করে চলতে থাকে সুমনের জীবনযুদ্ধ । বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে জীবনের পাঠ নিতে থাকে সুমন । সেইসঙ্গে কবিতাযাপনও সমানে চলে । সেকারণেই সুমনের কবিতাও প্রাত‍্যহিক জীবন অভিজ্ঞতার স্পষ্টতায় উজ্জ্বল । আমি সুমন পাটারির প্রথম কাব‍্যগ্রন্থটি ( মাটির মানুষ-স্রোত প্রকাশনা/২০২৬ ) নিবিড় পাঠ করার ও আলোচনার সুযোগ পেয়েছিলাম সেদিন । একদম জোরালো কব্জিতে তোলা ভাষাই সুমনের কবিতা ।
                    কার্যকারণে অনেকদিন দেখা হয়না । কিছুদিন আগে সেলিমদা ধর্মনগর থেকে 'পাখি সব করে রব'-র বিশেষ সংখ‍্যা পাঠিয়েছিলেন আমার কাছে । দক্ষিণ ত্রিপুরার কয়েকজন কবির কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার জন‍্যে । সুমনের কপিও ছিল । কিন্তু আমি যেদিন বাইখোরা যাই সেদিন ও বিশেষ কাজে ব‍্যস্ত থাকায় আর দেখা হয়নি । ওর কপিটা কবি তারাপ্রসাদ বনিকের কাছে দিয়ে এসেছিলাম ।
           নোয়াখালি অ্যাকসেন্ট থাকে সুমনের কথাবার্তায় । মনে হবে আনস্মার্ট এক গ্রাম‍্য যুবক । সুমনের ইংরেজি উচ্চারণ ও অনর্গল কনভার্সেশন শুনলে অনেকেই চমকে যাবেন । বাহ‍্যিক দর্শনে রাজ‍্যের মেধাবী ও গুণী এই তরুণকে চিনতে অনেকেই ভুল করবেন । সুমন যদি তার উচ্চশিক্ষা শেষ করতে পারত তবে আজ সে একজন নামজাদা আইটিয়ান হতে পারত । অথবা বড়ো কোনো মাল্টিন‍্যাশনাল কোম্পানির উচ্চপদে আসীন থাকত ।

             যাই হোক, লক্ষ্মীর ঝাঁপির ভেতরের রজতকাঞ্চনের ভান্ডার হাতে না এলেও সরস্বতীর বীণাতন্ত্রীতে ঝংকার তুলে তার শব্দকথা  বহুদূর ছড়িয়ে দিতে পেরেছে, আমার সন্তানপ্রতিম রাজ‍্যের গর্ব সুমন পাটারি । তোমাকে স্নেহ ও আদর হে কবি !

অশোকানন্দ
২৫. ৮. ২০২২.

মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

তমসা সিরিজ

 

 

 


 

 

 

 

 

 ।। অভিজিৎ চক্রবর্তী ।।

 

 

এক

 

একা নিরক্ষরা রাত। ওড়ে বাঘছাল।

মা মা বলে ডাকে মনোহর। ভয় পেয়ে ডাকে।

বিষাদ। পংক্তির কাটা মাঠ। ফাঁকে ফাঁকে

সরোবর। তোর লীলা অবাধ। অক্ষর-শিস নাভি থেকে ওঠে

ধ্বনি তো প্রহরের প্রমাদ। লুঠ হবে গ্রহ-তারা

পরমায়ু, যতি। কারক ও ক্রিয়াপদ।

 

 

 

দুই

 

কপালে আলোর ছিটে লাগে। দূর গোধূলি-মায়ার। যাও ছুটে যাও।

ছবি। স্মৃতি। দেহ ভেসে যায় কোলাহলে।

একা জলযান আসে

গোপন। লোকালয়ের। লাল নীল আলো চোখে মুখে।

মাঠেই দাঁড়ালো। তমসা। নিকষ কালো

কালো তো মা-ই আমার।

কান্না শুকিয়ে পাথর। পাথর তো মা-ই।

পাথরের স্তন। চুষতে চুষতে স্ফুরণ

 

তিন

 

জলের ভিতর আর বাইর। রাস্তায়

পানের দোকানেসব কথা জমে ক্ষীর।

নিরক্ষর চাঁদ। উদার জোছনা।

জোছনা না কাচ। পায়ে বিঁধে যায় অনুগত দিন।

দিনের ভেতর না বাহির। পাত

এই সংশয়ে বাজে বীণ

                      বাড়ে ঋণ

 

চার

রাত-সরোবর। চাঁদ নেই। তাই অন্ধ।

দেখে না। কবি দেখে। কবিরা নিশাচর।

নেশাচোর। হাতে পায়ে পাথরঝুনঝুনি। মল।

ধরতে চাইলেই মাছেরা নড়ে খলবল

 

 

 

পাঁচ

 

এরপর ক্ষুধা। এরপর খাড়া

সবার চোখের সামনে দাঁড়া

কাঁদা লেগে রক্ত লেগে ঘাম

জন্মের মাটি দিলাম। তবে

এবার দ্বিগুণ বেগে খাড়া

শীর্ষচূড়া তারায় ভরা

রাত্রিটা দুদিক থেকে নাড়া

 

ছয়

 

তুমি মাটি। কাল ছিলে শিরে

কাল তোমাকে ঘিরে ধূপ-ধূনা-উল্লাস

মন্ত্র ছুঁইয়ে দিয়েছি কপালে। এখন রোদ

এখন সত্যের বোধ। দায়ভার। গাছের তলায়

মেলেছে ক্রোধ। । অথচ কাল মুদ্রা, নৃত্য- বিভঙ্গে। 

ধ্বনি সর্বাঙ্গে। মেঘ ও বাদলাহাওয়া ও যতিচিহ্নের। এখন করুণ

একফোঁটা জলের রেখায়। লক্ষ্যে স্থির

যত গুণ, ডুবে যায়

 

 

সাত

ভেদ করো। তবে তুমি

ঝলসে পড়ো ছুঁয়ে ভূমি

শিরস্নান খোলো ত্রিনয়নী

মারো মারো মারো। জ্বালো ধুনি।

জাগে জাগাও। ভেতরে

আপাদ বিস্তৃত ভূমি। তারপর

ঊর্ধ্বগামী। আঁকাবাঁকা। ওঠো

তুলে ধরো। তুলে ধরো

দেখাও অ-যোনি

 

আট

 

কেঁপে কেঁপে ওঠো। বাজে তারা

মুণ্ডে মালা গাঁথা। গলে তারা

কেঁপে কেঁপে ওঠো। হাড়ের গয়না

বাজো রণে। অক্ষরে নাচাও

ডম্বরু দোলে। শিখায় শিখায় দিহন

শিরায় শিরায় সুনামী। অকারণ

বেজে যায় ঘর হতে শ্মশানভূমি

 

 

 

নয়

 

এরপর কাব্য বলে দিলাম ঊরু। ঊরু নয় ঊরুসন্ধি

এরপর কাব্য বলে দিলাম ক্ষত

চুইয়ে পড়া জল। জলের ভাঁড়ার একা বন্দী।

নগ্নপদে  চ্যাংদোলা হয়ে

জ্বালো চিতা। হাড়ের ভেতর ঘুমিয়ে পিতা।

বাজুক শয়তানি। ব্রহ্মখুলি ফাটুক।

ঝরুক। বৃষ্টি পড়ুক।

এরপর কাব্য বলে দিলাম ধরিয়ে মধ্যমণি।

ঘি-এর বাজার। যজ্ঞথলি।

ঝরুক জোছনা। জোয়ারে ফাটুক সোনার খনি

 

 

 

 

 

দশ

 

ডুবছিনা তো ভেসে উঠছি বন্ধ দুয়ার

মাথার ভেতর একের পর একের জোয়ার

নীলের কথা শুনবে বলে মনের গতি

বিষের বড়ি আহামরি আবার যতি

ধন্দ নিয়ে একাই একা বসত গড়ি

দুখানা দু'দিকে লাগিয়ে নিজেই লড়ি

 

 

 

 

 

 

এগারো

 

তোমার কাছেই ভয়। ভয় মানে বটের ঝুরিঅতিকায়।

জঙ্গল নিবিড়। ভেদ করে যাবে ধড়।

পৌঁছুবেখোলা মাঠ। বৃষ্টিতে ঝাপসা। ধড় আর কী

মুণ্ড খুঁজে পাবে। শুধু যাবে। একা। চেনা পথ

পেরিয়ে। অচেনা। সারি সারি ঘর

দরজার ধড় টোকা দিয়ে যায়।

মুণ্ড নাই। মুণ্ড কী আর পাবে! মুণ্ড তো তোমার হাতের মুঠিতে

চোখ বুজেই আছে

 

 

বারো

 

অথচ তেমনি নীল। ঝড়।

তেমনি উড়ো টিন। ভয়াল। ক্ষুরধার।

হত্যাকাণ্ড ফোঁটা ফোঁটা

চাপ চাপ। জনসভা। মিছিল। তরুণ

কবির লাশ মাড়িয়ে। পলাশ না শিমূল

কাটা হাত-পা আড়াআড়ি। ৪৪০ ভোল্ট

বিদ্যুৎ প্রবাহ। বিষে জর্জর। নীলাভ।

অসুরেরা সারি সারি মাথানত দাঁড়িয়েছে

একটাই অপরাধকবির বই পুড়িয়েছে

 

 

 

 

 

 

 

তেরো

 

 

ফোঁটা ফোঁটা ঠোঁটে। কাটা পথ। প্রুফ দেখা

হল না আবারো। ফাঁকে দেখা যায় ঝড়।

বাতি নেই। অন্ধকার। বেগ পায়। মাথা বলি

না ব্রহ্মতালু। ব্রহ্ম বুঝিনি যদিও। শব্দ

পাইনি এখনো। ধ্বনিজন্ম

কাটে না আর। প্রুফের তলায় চাপা

মাঝে রাস্তা। টেরিকাটা। নানা রঙের আলোয়।

আলো না পানীয়, দোলে সামনে পেছনে।

ফোঁটা ফোঁটা। বই বেরিয়ে যায় আবারো

অপ্রকাশিত। ভুলে ঠাসা। এর মাথা ওর

জুতা। দেব দেবারি হয়। রাক্ষস জনতা।

 

 

 

 

চৌদ্দ

চাঁদ আসিয়াছে। থার্ড ডিগ্রি লাগাও

বোঁ বোঁ মাথা। মাথা তো নেই, মস্তক।

পুস্তকের মত। আপ্রাণ। অযোনিসম্ভূত।

জবা ফুল ফুটিয়াছে।

 

 


বুধবার, ২৫ আগস্ট, ২০২১

বৃক্ষ

॥ পৃথ্বীশ দত্ত ॥

 

     

(C)Image:ছবি

 সেই ছেলে ও মেয়েটি,  কী যেন নাম ? না, তখনও নাম জানা যায়নি । এখন মেয়েটি উধাও । তবু ছেলেটি রুটিন মেনে যায় ।

       ছেলেটি রোজ সেই বৃক্ষের কাছে যায় । তার সাথে কথা বলে । ভাদ্রের তাল পাকা দুপুরে, সূর্যের রৌদ্র শাসনে, তপ্ততা যখন দিগন্তব্যাপী, ছেলেটি তখন অশ্বত্থ ছায়ের শীতলতায় বসে নিঃশব্দে গল্প করে । গল্পের ছলে খেলা করে । বুকের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে নামে বেদনার পাথর । একটু হালকা লাগে । আবারও পাথর গড়িয়ে নামে । বার বার । এ যেন বুক ও দহনের নিরন্তর খেলা !

       সহস্র প্রসারিত হাতে ছায়া মেলে রাখে অশ্বত্থ গাছ । গাছ নয়, সে বৃক্ষ । সেও কথা বলে ছেলেটির সাথে । তার চপল পল্লব হেসে হেসে প্রমোদ ছড়ায় । ভালো লাগা দিতে চায় পরম আশ্রিতকে ।

      কোন মানুষ এখানে আসে না । কোনও প্রয়োজন নেই এখানে আসার ।  জঙ্গলাকীর্ণ চারপাশ । তবু এই নির্জনতা ভরে আছে কত স্মৃতি, কত কথার গুঞ্জন, কত স্পর্শের উষ্ণতায় । এখানেই ওরা বসত । গল্প করত, গল্প রচিত করত দুজনে । সেই গল্পের ভাষা বৃক্ষটি জানত। সে শুনতে পেত তাদের কথার গভীরে কত স্বপ্নের ধ্যান ।  আজ ছেলেটি মৌন । তবু কিসের টানে সে  বৃক্ষের পদতলে আসে !  স্মৃতি সততই নির্জনতা বিলাসী ।

      একদিন সেই বৃক্ষের প্রসারিত শেকড়-চরণে ছেলেটি বসত মেয়েটিকে নিয়ে । সে কোনও একদিন ।  তরল স্বপ্নের রঙ নিয়ে নিবিড় লোফালুফি খেলত । গল্পের মৃদুভাষ ছড়িয়ে পড়ত বৃক্ষের শরীর জড়িয়ে । কল্পকালির টানে নানা স্বপ্নের কোলাজ এখানেই রচিত হত । এই অশ্বত্থ জানে প্রেমিকের মায়া মেদুরতা । সে জানে প্রেমের কথামালা কেমন করে কাব্য হয়ে ফুটে ওঠে । সে জানে প্রেম ও প্রতারণার অলৌকিক সম্মোহন । রঙ মুছে গেলে ক্যানভাসের পাতাগুলো বারবনিতার মত আরোপিত রূপ নিয়ে পড়ে থাকে ।

      ছেলেটি এখন একা । এখন সে অবসাদে নিথর । তার স্বপ্নময় মারীচ হরিণী । তবু সে অশ্বত্থের কাছে যায় । অশ্বত্থই তার প্রেমের সাক্ষী । তার কাছে বসে, তারই কোলে শরীর এলিয়ে স্মৃতি-তর্পণে ডুবে যায় । কত কথা কত গল্প, স্বপ্ন ভাঙার আকুল ঢেউ আছড়ে পড়ে মনতটে । এ বড়োই বেদনাসুধা । এই বৃক্ষের বাকলে এখনো খোদাই করা আছে মেয়েটির নাম l যেন সে মেয়েটির ধারক । জড়িয়ে রাখে বাকলাঙ্গের নীরব মমতায় । গাছেরও প্রাণ আছে । গাছেরও প্রেম আছে । সে ছেলেটিকে নিঃশব্দে ডাকে-- ওরে আয়, আয় আয় !

       হঠাৎ একদিন এই নির্জন বৃক্ষের চারপাশ ঘিরে মানুষের ভিড় । পুলিস এলো । এলো এম্বুলেন্স । ছেলেটি সত্যিই গাছ হয়ে গেল । গাছেই বিলীন হল অদৃশ্য আকুতি । কারণ, গাছেরও প্রেম আছে ।

       কিন্তু তার শরীরটা চলে গেল লাশকাটা ঘরে । মেয়েটি তখন হ্যানিমুনে মত্ত নৈনিতালে । বরফ ও উষ্ণতা নিয়ে মাখামাখি খেলছে তার নিজস্ব পৃথিবীতে, আপন মানুষের সাথে ।

     জানা গেল সেই ছেলেটির নাম আবেগ । মেয়েটি মায়া ।

                                             ***