।।মাসকুরা বেগম।।
( এই কিচ্ছাটি ছোটবেলা আমার দিদি তাহিয়া আমাকে শুনায়। এটা আমার হৃদয়কে এতো স্পর্শ করে যে বার বার শুনার জন্য দিদিকে বায়না করতাম। সেই ছোট্ট বেলায় শুনে মনের গভীরে দাগ কাটা কিচ্ছা আজ নিজে সাজিয়ে প্রকাশিত করার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস!)
অনেক কাল আগের কথা। এক দেশে ছিলেন এক সহজ-সরল রাজা। তাঁর ছিল দুই রানি।
বড় রানি ছিলেন রূপে-গুণে অনন্যা। তিনি যেমন সুন্দরী ছিলেন, তেমনই ছিলেন দয়ালু। দাস-দাসী থেকে গরিব-দুঃখী প্রজা—সকলের কাছেই তিনি ছিলেন "রানি মা’। তাঁর কন্যা রাজকুমারী মালতীও ছিল মায়ের মতোই। রূপে-গুণে সে ছিল অতুলনীয়া।
ছোট রানি দেখতে তেমন সুন্দরী ছিলেন না, মনটাও ছিল বিষে ভরা। প্রজারা তাই তাঁকে ভালোবাসত না। তাঁর মেয়ে চন্দনাও ছিল মায়ের মতোই—কালো, আর অন্ধ মাতৃভক্ত। ভালো-মন্দ বিচার না করেই সে মায়ের সব কথায় "হ্যাঁ’ বলত।
প্রজাদের মুখে মুখে সবসময় "বড় রানি মা! বড় রানি মা!’, "রাজকুমারী মালতী! মালতী!"—এই কথা শুনে ছোট রানির বুক জ্বলে যেত। মনে মনে ভাবত, "এত আদিখ্যেতা কেন? নিশ্চয়ই বড় রানি যাদু-টোনা জানে। একদিন আমাদের তাড়িয়ে দিয়ে নিজের মেয়েকে সিংহাসনে বসাবে।’
এইসব কুচিন্তা সে ঢেলে দিত মেয়ে চন্দনার কানে।
ছোট রানি হঠাৎ বদলে গেল। বড় রানির সাথে খুব ভাব জমাতে লাগল। প্রথমে বড় রানি অবাক হলেও পরে ভাবলেন, "হয়তো ছোট বুঝতে পেরেছে, আমি ওদের কত ভালোবাসি।’
রাজাও খুশি। ভাবলেন, দুই রানি মিলেমিশে আছে—এর চেয়ে সুখের আর কী আছে!
রাজা একবার রাজ্যের বাইরে গেলেন। সেই সুযোগে ছোটরানি বড়রানির চুলে তেল মালিশ করার ছলে যাদুকরের দেওয়া এক বিষাক্ত তেল লাগিয়ে দিল। সাথে সাথেই বড় রানি কাতরাতে কাতরাতে কুমির হয়ে পুকুরের জলে মিলিয়ে গেলেন।
মালতী পাঠশালা থেকে ফিরে মাকে না পেয়ে কেঁদে অস্থির। ছোট রানি বলল, "জানি না, দেখো গিয়ে।’
ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর মালতী পুকুর ঘাটে বসে কাঁদছিল। হঠাৎ একটি কুমির উঠে এল। মায়ের গলা শুনে মালতী চমকে উঠল। কুমিরই ছিল তার মা। মা বললেন, "আমি প্রতিদিন তোকে একটি করে ডিম দেব। ওটা খেলেই তোর পেট ভরবে। সাবধানে থাকিস মা।’
ছোট রানি দেখল মালতী না খেয়েও দিব্যি বেঁচে আছে। চন্দনাকে লাগিয়ে দিল মালতীর পিছনে। চন্দনা দেখল, কুমির মালটিকে ডিম খাওয়ায়। সে বাড়ি এসে মাকে সব বলে দিল।
ছোট রানি রাজাকে বলল, "মহারাজ, পুকুরে কুমির হয়েছে। ওটাকে নদীতে ফেলে দিন।’ কুমিরকে নদীতে ফেলে দেওয়া হল।
এরপর মালতী নদীর পাড়ে ছাগল চরাতে যেত। কুমির-মা সেখানেও এসে তাকে ডিম খাওয়াত। চন্দনা আবার পিছু নিল। একদিন ভুলিয়ে-ভালিয়ে মালতীর কাছ থেকে সব কথা জেনে মাকে বলে দিল। ছোট রানি রাজাকে দিয়ে কুমিরটাকে মেরে ফেলার হুকুম করাল।
অসহায় মালতী জঙ্গলে চলে গেল। সেখানে এক ফলের বাগান পেল। ক্ষুধা মিটিয়ে বেঁচে রইল। চন্দনা আবার খবর দিল। ছোট রানি সেই বাগানও কাটিয়ে দিল।
একদিন শিকার করতে এসে অন্য রাজ্যের রাজকুমার জঙ্গলে ঘুমন্ত মালতীকে দেখতে পেলেন। মালতীর করুণ কাহিনি শুনে রাজকুমার তাকে নিজের রাজপ্রাসাদে নিয়ে গেলেন এবং বিয়ে করলেন। মালতী হয়ে উঠল যুবরানি।
বছর ঘুরল। একদিন রাজপ্রাসাদের দরজায় দুই ভিখারিনী এল—ছোট রানি আর চন্দনা। রাজা মারা গেছেন। মন্ত্রীর ষড়যন্ত্রে তারা রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়েছে।
মালতী তাদের চিনতে পেরে কাছে ডাকল। মালতীর পা জড়িয়ে ধরে তারা কাঁদতে লাগল, "আমাদের ক্ষমা করে দাও মালতী।’
মালতী তাদের বুকে জড়িয়ে ধরল। বলল, "অতীত ভুলে যাও।’ পেট ভরে খাওয়াল, নতুন কাপড় দিল, আর সম্মানের সাথে বিদায় দিল।
* নীতিকথা *
হিংসা মানুষকে কোথায় নামায়, আর ক্ষমা মানুষকে কোথায় তোলে—"চন্দনা ও মালতী’ গল্পটা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
1 টি মন্তব্য:
Very creative, wel done keep it up
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন