“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
মিত্রপক্ষ সাই লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মিত্রপক্ষ সাই লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ১ অক্টোবর, ২০১৪

সপ্তমী














জ উচ্ছল সপ্তমীসমুদ্র!
ঠাকুরের চক্ষুদান হোল পাটকাঠির স্পর্শে
রামধনু আঁকা জামা পড়েছে আকাশ! তুমি মেঘলা কিশোরী!
কেউ কি দাঁড়িয়ে জংধরা জানালার রেলিংটা ধরে,
তোমার সন্ধি পুজার অপেক্ষায়!
আমার চোখদুটো কী  করি!

তুমি বলেছিলে জল শুকিয়ে গেলে সব ঝাপসা হয়ে যায়।
তুমিও জলছবি হয়ে যাবে।
আঁজলা ভরে অষ্টমীর সমুদ্র থেকে জল নিয়ে এসো
নবমীর সকালে ছড়িয়ে দেবো আমার পাহাড়ে
যদি রামধনু দেখতে পাই

যদি তোমায় দেখতে পাই





রবিবার, ২৫ আগস্ট, ২০১৩

টু, দ্য গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া

টু,
দ্য গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া
একদিন অর্থনীতির মতো
সরু হয়ে যাবে
তোমার পুরুষাঙ্গ।

গান্ধি মাথার কদর কমে গেছে
হালফিলের আর্থ যুদ্ধে

চীনারা জানেনা অসমিয়া
গামছার প্রকৌশল।

অন্যথায়, এতদিনে
বিক্রি হয়ে যেত অরুণাচল।

সিন্ধু প্রদেশের যাবতীয়
প্রজাপতিদের বিক্রি করে দাও,
রেশম পোকাদের নীলাম ডাকো
হোয়াইট হাউসে
রাষ্ট্রীয় শোক হবে

গজরাজ ব্যর্থ উড়ানে

টু,
দ্য গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া,

জতুগৃহের চিতাভষ্মে
পঞ্চপাণ্ডবের শব খোঁজার
পালা এবার শেষ হোক

জাপানী ইন্দ্রবর্ধক যন্ত্রের
প্রচার বন্ধ হোক মিডিয়ায়
একদিন সরু হয়ে যাবে
বিষুব রেখা

সেদিন অপ্রসবা থাকবে এই দেশ

এবং সেদিন...
প্রসব করবে
কফিন বন্দী
নন্দিনীরা

মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই, ২০১৩

তুলসী সাঁও

##

যে পথ দিয়ে হেটে যায়
কবি, সে পথ দিয়ে হেটে যায়
আজ দীর্ঘ  মিছিল।

যে সভ্যতা যত্নে তৈরী করেছিল পিরামিড
আজ সেই সভ্যতা ভেঙ্গে খান খান।

এরপরেও বলবে বেঁচে আছি,
ভালোবাসা আছে!

##
গত কদিন ধরে
সুভদ্রার রথের জং
তুলছে কিছু মানুষ।
ঘোড়া গুলির গায়ে লেগেছে সাদা রঙ।

পিচগলা রাস্তায়, নরম হাতে সাদা রেখা এঁকে,
দিক ঠিক করে দিচ্ছে তুলসী সাঁও,
ফোস্কা পড়া এই হাতেই রাতে চুমু খায় পৌরসভার পারিষদ
এরপর বিক্রি হয়ে যায় গণতান্ত্রিক শরীর
সুগন্ধি সাবানের বুদবুদে সমাজতন্ত্রের স্লোগান
গাল দেয় শহীদ মিনার। সহ্য করে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস।

এরপরেও বলবে ভালো আছি!
কিছুই শেষ হয়ে যায়নি!

##
কোর্টের কাগজটা এখনও রান্নার গ্যাসের পাশেই
রাখা আছে, সই করে দাও
নচেৎ টিপ দাও,
এটাও না পারলে কপালের টিপটা
সেঁটে দাও। ফরেনসিক ল্যাবে পাঠিয়ে প্রমান করে দেব
তোমার ঘামের গন্ধ, এটা আমার দেয়া নয়

প্রমান করে দেব সামাজিকভাবেই তোমায় বিক্রি করেছিল
তোমার বাবা,

####
আজ আমি আস্ত সমাজতত্বকেই নোটিস পাঠাবো।
আদালত কাল রাতে তোমার সাথে ঘুমোবে না,
আদরও করবে না, ভাত কাপড় দেবে না।

ভাঙ্গা পিরামিডটা লীজে নিয়েছি,
বিছানার চাদরটা সমাধিস্থ করবো বলে

সেদিন রক্তাক্ত হবে গণতন্ত্র
মেঘ লিখবে কবিতা, আর তুমি বাসর জাগবে
রাতভর।
পরদিন ভোট, বঙ্গোপসাগরের সরকার নির্বাচন।

বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন, ২০১৩

আমি আর দুধ খাইনা...

সুগ্রীব! না রামায়ণ বা মহাভারতের সেই কাল্পনিক চরিত্র নয়। বানর মুখো শক্তিশালী কোন বীর যোদ্ধাও নয়।
         ত্রিপুরার প্রত্যন্ত মিশ্র জনবসতির এক কিশোর। স্রেফ বিস্কুট চুরি করে খেয়েছিল খিদে সহ্য করতে না পেরে। তাই প্রকাশ্যে গণপিটুনি দিয়ে তাকে হত্যা করে কিছু মানুষ।
         তাদের মধ্যে কে নেই! যুব ফেডারেশনের কমরেড থেকে শুরু করে কংগ্রেস দলের নেতা, তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, এবং এলাকার প্রবীণ নবীন সহ অত্যুতসাহী কিছু মানুষ। তাদের সামনেই ঘটেছে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড। তাদের উৎসাহেই নৃশংসভাবে নারকীয় উল্লাসে রাতভর তাকে পিটিয়ে মেরেছে কিছু মানুষ।
          তখন বেশ ছোট ছিলাম মনে আছে একবার পাউডার দুধ খেয়েছিলাম চুরি করে, ধরা পড়েছিলাম মায়ের হাতে। মারধোর করেননি, তবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এই শেষবার ক্ষমা করে দিলাম। এরপর থেকে আর দুধ খাইনা। আজও খাইনা।
         টাইমস ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে এবার বিষয় 'দ্য ফেস অব বুদ্ধিস্ট টেররিস্ট' (এক বৌদ্ধ সন্ত্রাসীর মুখ)। গল্প একটাই বৌদ্ধ আর মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের নেপথ্য!
         আমার প্রিয় বন্ধু এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। সকাল এগারোটা। আর কোনদিন জেগে না উঠলেও আশ্চর্য হবো না। কারন, কাল এক কলামের নিউজ হবে পাঁচ বা ছয়ের পাতায়। এইটুকুই। এরপর দিন থেকে সবকিছু আবার ঠিকঠাক চলবে।
          সুগ্রীব নামে যে কিশোরটি মরে গেছে গণপিটুনিতে সে আর কোনদিন বিস্কুট চাইবে না। অথচ প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ বিস্কুট ডাস্টবিনে যাবে এবং ফ্যাক্টরি তে উৎপন্ন হবে। রামায়ণ মহাভারতের সুগ্রীব চরিত্রটি বানর এবং কাল্পনিক হলেও তিনি পুজিত। আর আমাদের সুগ্রীব জ্যান্ত মানব কিশোর হলেও তার মৃত্যু হয় গণপিটুনিতে।
            একটি বিস্কুটের দাম ও নেই সুগ্রীবের জীবনের। ঐ ঘটনার পর আমি বলেছিলাম তোমরা তোমাদের ভগবান কে হত্যা করেছো। সুগ্রীব হিন্দুদের দেবতা। তোমরা সবাই হিন্দু।       শুনেছি এরপর সেই এলাকার কিছু মানুষ প্রায়শ্চিত্য করেছে মাথা মুন্ডন করে।
       টাইমস ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ নিয়ে সে দেশের সরকার চিৎকার করলেও এটাই সত্যি, মিন্দালেই প্রদেশের বৌদ্ধ ভিক্ষু ভিরাতুর সম্প্রতি ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের পর মুসলিম বিরোধী মন্তব্য করেছিলেন, তাই তিনি আজ টেরর অনেকের কাছেই, বিশেষ করে মুসলিম দুনিয়ায়। আর সেই দুনিয়ায় কাগজের বিক্রি বাড়বেই।
        এবং এটাও আজ সত্যি আমি আজকাল আর দুধ খাইনা। এক চামচ দুধ আমার জন্য, আমার পরিবারে বরাদ্দ থাকতেই পারতো।
       আমিও অনেকদিন দুধ খাইনি, আমিও দেখেছি অনেকেই শিশুর দুধ চুরি করছেন জন্ম হওয়ার আগেই।
আমার যে বন্ধুটি ঘুমিয়ে থাকতে থাকতে আর জেগে উঠবেনা কোনদিন, তার সাথেও গতকাল রাতে চলেছিল চূড়ান্ত সন্ত্রাস। সভ্য ঘরের আসবাব তার সাক্ষী। যামিনী রায়ের ডুপ্লিকেট ফটো ফ্রেমের কাঁচে সেই সাঙ্ঘাতিক সংঘর্ষের কিছু রঙ এখনও লেগে আছে।
         তার স্বামী এখন অফিসে বসে লেবু চা খাচ্ছেন।
     ঈশ্বর, হনুমান, সুগ্রীব আর আমি একই দেশের ধর্ম আর নাগরিক। আমাদের মৃত্যু বা হত্যা শেষে প্রায়শ্চিত্য তবু হয়। সন্ত্রাসী কোন ভিক্ষু বা সন্ন্যাসী বা মোল্লার জন্যও হয়ে থাকে বিরোধ বা একটি বিশেষ ধর্ম বা সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতিবাদ।
       কিন্তু আমার বন্ধুটির জন্য তা হয়না। কারন আমার বন্ধুটি দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক এবং তিনি মেয়ে এবং রক্ষনশীল হিন্দু পরিবারের।
      কোরান, ত্রিপিটক, রামায়ণ আর বাইবেলে বন্ধুত্বের কোন সংজ্ঞা নেই। মেয়েদের বিপ্লব করারও কোন পথ বাৎলে দেয়া হয়নি।
     তাই দুধ চুরি করে আমি খাবোই। বিস্কুট খাও তুমি। টাইমস তুমি চিৎকার করে যাও প্রচ্ছদে, সংঘাত চলবেই, প্রতিটি ধর্মে, রাষ্ট্রে, ঘরে, মন্দিরে, মসজিদে, বৌদ্ধ বিহারে অথবা বেডরুমে, মানুষ আর সন্ত্রাসীদের।
     সব ধর্মেই দুধ খাওয়ার কথা বলা আছে। তবুও আমি দুধ খাবোনা, কারন আমি আফিং বনে যাইনা, এই পাহাড়ের কাছেই ধার নেই সভ্যতার, পাঠ নেই ভালোবাসার।


রবিবার, ২৩ জুন, ২০১৩

লাল চন্দন
















জ আহ্লাদে আহ্লাদে মেঘ করেছে সকাল সকাল স্নান।
 আর চাঁদ হাঁসফাঁশ করছে নীলাচলের আলিঙ্গনে
লাল চন্দন কিছু পাঠিয়ে দিলাম রেখে দিও তোমার দু'বুকের সন্ধিতে
আমার চলে যাওয়ার দিনে ফিরিয়ে দিও।
#
আমি,আমার ধোঁয়া আর তোমার সুগন্ধি মাখা লাল চন্দনপৌঁছে দেব ঈশ্বরের কাছে
খুলে দেবো কামাখ্যার দরজা
এবং রেখে যাবো কিছু স্বর্গীয় ফুল নামহীনা, তোমার বন্ধ দরজার চৌকাঠে।
যেখানে গত কয়েক বছর ঘরকন্না করছে দুটি সুখী পায়রা।

বুধবার, ১৯ জুন, ২০১৩

চুপ


চুপ! কথা নয়, কারন মসনদে আমি আছি।
আমার রঙ পৃথিবীর রঙ হবে। আমার আত্মা হবে সক্রেটিসের।
আমার সাম্রাজ্যের দেয়ালে পিকাসো ছবি আঁকবেন সাদা কোরা শাড়ীর ক্যানভাসে।

যে শাড়ী দিয়ে কামদুনির মেয়েটির ঘায়ে ব্যান্ডেজ বাধা হয়েছিল সেটি অসংরক্ষিত এবং সবুজ নয়।

আগামী তিনদিন রাষ্ট্রপতি ঘুরে বেড়াবেন কোন পাহাড়ি সরকারের বিশ্ববিদ্যালয়ে। দীক্ষান্ত ভাষণ দেয়ার জন্য যে গাউনটা বানানো হয়েছে তার রঙ নির্ধারণ করবে সেই মেয়েটি। আমি সেই অসংরক্ষিত অসবুজ কাপড়ের টুকরো
দিয়ে ব্যাচ বানাবো এবং পড়ে যাবো দীক্ষান্ত ভাষণের অনুষ্ঠানে।
কারন এই কামদুনীর পথ দিয়ে বহুবার হেটে গেছেন রাষ্ট্রপতি। তিনিও পুরুষ।

এই চুপ! কথা নয়।

আমার সাম্রাজ্যে এমনটা হবেই। আর এমনটা হওয়ার জন্য তোমাদের তৈরি থাকতে হবে। কারন সেদিন আমার রাস্তায় একটি সবুজ বা হলুদ পতাকাও ছিলনা।
লাল শাড়ী বিছিয়ে দিয়েছিল কিছু মানুষ। তাই তোমায় চুপ থাকতে হবে।
জল কর দাও, মাটির জন্য পয়সা গোন। নিরাপত্তার জন্য কোন ট্যাক্সো কিন্তু দাওনা ভায়া! তাই তোমার শরীরকে যেকোন সময় তৈরি থাকতে হবে।
তৈরি রাখতে হবে তোমার ব্যাগে লিপস্টিক। ঠোঁট পালিশের রঙটাও হবে সবুজ। লাল ক্ষতর উপর সবুজ লিপস্টিকের টাচ। লালের উপর সবুজের রঙ। যেমন হয়না সিঁদুরে আকাশে কালো মেঘের ইতিউতি।
বৃষ্টি আসবে বলেই সেই সিঁদুররঙা আকাশ মিলিয়ে যায় সান্ধ্য আড্ডায়। সৌর মণ্ডলের রকে বসে আড্ডা দেয় তখন বৃহস্পতি।

লাল গ্রহের কাছে বলে যেও তোমার কথা।

চুপ!
আমার নিঃশ্বাস, কার্বন ডাই অক্সাইড হয়ে তোমায় সাহায্য করবে বেঁচে থাকতে।
গাছেরা যেমন রাতের অন্ধকারে রান্নাবাটি খেলে, ঘর গৃহস্থী করে, তেমনি তোমার জন্যও বরাদ্দ ঐ রাতটুকু। অজস্র লতাপাতা আর ঘাস ফুলেদের নিয়ে বাগান বানাও কমরেড।
কামদুনির আকাশকে ভুলে থাকাই ভালো। সেখানে শুধু লাল শালুর শামীয়ানা। সীমা মাহাতো কে চিহ্নিত করে রাখো। সালোক সংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় তাকে দরকার পরবে কাল অথবা পরশু।
তাই চুপ করে থাকো কামদুনী।

চুপ!

সোমবার, ১০ জুন, ২০১৩

সাগরকন্যা


ক সাগর কন্যার সাথে আজ দেখা। নীল চোখ। লালচে গাল আর সবুজ শাড়ী। নাম তার রাই।

আমি আমার বাসর ঘরে তাকে দেখেছি। আমার প্রথম কৈশোরে তাকে আঁকড়ে ধরেছি বহুবার ভয় পেয়ে।

আমি যৌবনে তার কাছে একটা সকাল চেয়েছি। সারারাতের ক্লান্তি শেষে বাঁশের বেড়া দিয়ে উঁকি মারা সূর্যালোক থেকে তাকে বাঁচাতে কম্বল মুড়ি দিয়েছি তার এলোমেলো সুডৌল পায়ের হলদে রঙে।

'নাইন ও ক্লক' ফুলের কাছে বলেছি আজ তুমি প্রস্ফুটিত হবে না। ওর ঘুম ভেঙ্গে যাবে।
আমি লজ্জাবতি লতাদের বিছিয়ে রেখেছি ওর আসা যাওয়ার পথে। কাঁটা ফুঁটুক, রক্তাক্ত হোক তার পায়ের পাতা, তবু জানবো কোন পথে সে চলেছে রাত্তির শেষে সমুদ্র ফেনায় নিজেকে আহত করতে।
এক পালহীন নৌকোর সাথে সঙ্গম করেছি। একটাই কারন ছিল, তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া সেই মাঝ সমুদ্রে।

এরপর জগন্নাথ মন্দিরে এসে ধ্বজা উড়িয়ে অনভস্ত পায়ে নেমে আসবো সূর্য মন্দিরের সবচেয়ে উঁচু চূড়া থেকে পুরীর সমুদ্রে। জন্ম সুত্রে আমি শূদ্র নই। আমি ব্রাহ্মণ ও নই। আমি নাম গোত্রহীন এক অকাল সন্তান।

১৯শে শ্রাবনের মাসে বৃষ্টি ছিল বলে আমি আকাশ দেখতে পারিনি। সূর্যের রাগ আমি বুঝিনি।
সমুদ্রকন্যার কাছে তবুও আমি শেষ রাত্তির।

এক সাগর কন্যার সাথে আজ আমার দেখা। যে চেয়েছিল, আজ আমার মৃত্যু হোক, সে আমায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সমুদ্র সৈকতে। এরপর সিক্ত বসন ছাড়িয়ে, সারারাত সংগ্রহ করবে আমার সফেদ রক্ত।
যা সংরক্ষিত হবে কোন গবেষণাগারে।
এরপর সে মা হবে। এবং ফিরে আসবে পৃথিবীতে অথবা আমার পাহাড়ে।

একটা নতুন ছোট পাহাড়ে অকারনেই পড়বে চাঁদের আলো শেষ রাত্তিরের।

বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০১৩

অন্দরমহল


তোমার অন্দরমহলে আজ বৃষ্টি

সুগন্ধি চন্দন কাঠের বাক্সে বন্দী
তোমার কিশোরী দুপুর

যৌবন আজ নীলাম
নীমকাঠের সিঁদুর কৌটয়

জানালার রেলিং ধরে ঝুলে থাকা
মানিপ্ল্যান্টের পাতা সব রুগ্ন।

কাঠের উনানে সেদ্ধ হচ্ছে বুনো আলু
আরেকটা হিরোশিমার প্রস্ততি

পৃথিবীটা আজ পোড়া আলুর মতো নরম আর কালো।

#
তবুও বৃষ্টি ঝড়বে, বীনুনি বাঁধবে যত্ন করে ইউকেলিপ্টাস।
শরীরময় সুগন্ধি ছড়াবে যত্নে,গোধূলি বিকেলের
একফালি সোনালী রোদ্দুর স্নান শেষে তোমার কপালে,

আজ তুমি চরিত্রহীনা
একশ বছর পর মৃত ফলকে
খোঁদাই করা এপিক

বৃষ্টিতে স্নাত স্বর্গীয়া শ্রীমতী জুইরানীর শ্বেত পাথর

##
বৃষ্টি আসবেই, তুমি ভিজবেই, রাত নামবেই
সকাল হবেই, ভালোবাসবেই,
চোখ ভিজবেই, তুমি হাসবেই, ভালোবাসবেই।

শনিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

শাইনিং ইন্ডিয়া



         "বিড়ি জ্বালাইলে জিগর সে পিয়া..." কি সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার ভায়া। ঐ কন্যার জিগর থেইক্যা নাকি আগুন জ্বলে ! সেই আগুনে আবার বিড়ি ধরে ! খারাপ না ব্যাপারটা । মনটা খারাপ হইয়া গেল সকাল বেলাতেই গানটা শুনে। ‘আমার প্রিয়ার জিগরে শুধু জল ক্যানে !’
   মুম্বাইইয়ে কি মেয়েদের জিগর থিক্যা আগুন জ্বলে নাকি! আবার কলকাতা কয়, শূন্য এ বুকে...। বাংলাদেশ রেডিও আরও একটু সেন্টু সেন্টু সুরে বাজায়, ‘পাখী মোর আয়, ফিরে আয়, ফিরে আয়...’।
দূর আজকাল এতো সেন্টু নিয়ে ডাকলে পাখিও পালায়! শুরুটাই করতে হবে আমাকে আমার মতো থাকতে দাও, দিয়ে। মানে কোন অবস্থাতেই বলা বারণ, তোমার মনের কন্ডিশান। মুখে দাড়ি থাকতে হবেই। না হলে সিকোয়েন্সটা ঠিকঠাক জমবে না। বিড়ি টাইপের কালার হতে হবে শরীরের। কিন্তু ওয়াইল্ড স্টোন রাখতে হবে। পকেটে না বুকে ধরে রাখতে হবে পাথর, বুঝলে ভায়া! পাত্থরেরও নাকি আবার গন্ধ থাকে!

          বিড়ি বেশ সেন্টিমেন্টাল টাইপের হয়। মানে জ্বলে দুমদাম করে। কিন্তু একটু না টানলেই নিভে যায়। একটু অবজ্ঞা মানেই লেপের তলে সিটিয়ে থাকা নতুন বউয়ের নাক ডাকা। সিগারেটের কিন্তু সেই অর্থে এতো সেন্টু নেই। জীবন দিয়ে জ্বলবে। নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই, তার ক্ষয় নাই... টাইপ। হৃদয় একদম জ্বালাইয়া ছাই কইরা তবে তবে ছাড়ব। একদম কর্পোরেট দের মতো বিহেভ। রিফাইন্ তামাকের গুন নেই। একদম খাটি নেপালি তামাকের সাথে সিগারেটের তামাকের তুলনা চলে! আমার হৃদয় ঐ নেপালি বিড়ির পাতার মতো। সর্বদা শূন্য এ বুকের মতো খাঁ খাঁ করে।

         সকাল সকাল এই গানটা কানে আসতেই কত স্বপ্ন যে দেখে ফেললাম, লেপের তলায় ! সেটা সেন্সর করা। বলা বারণ। স্যরি উসখুস কইরা কোন লাভ নেই। এমন কিছুই ঘটেনি। এটা হিন্দি ফিল্ম   জিসম পার্ট ফোর নয় ভায়া।  মনটা শান্ত থাকা ভীষণ জরুরি পরবর্তী অংশ সহ্য করতে। আজকাল কথায় কথায় গান। সোনালী গানের এই এক সুবিধে সিকোয়েন্স বুঝে বোতাম টিপলেই হলো। সব রঙ্গিন, সব উত্তর হাতের কাছে, সব কিছু চোখের সামনে একদম ফকফকা। এরবেশী বলা বারণ...।
       সেদিন আমি আমার প্রেমিকাকে বললাম আমায় সত্যিই ভালবাস! কেন ভালোবাস? শেষ দু'বছরে প্রেমের এই চতুর্থ অধ্যায়ে এটাই সবচেয়ে বড় সময়ের ইনভেস্টমেন্ট আমার। মানে গোটা দশেক বই, ক্যাডবেরি, সিনেমা, আইসক্রিম খায় না গলায় ব্যাথা আছে, আর প্রেমের অভারঅল অপারেটিং কস্ট সর্বসাকুল্যে হাজার দুয়েক টেনেটুনে। মেয়েরা ভালবাসলে সব মেনে নেয়, তাই আমাদের কপালে প্রেম জোটে। দেখি পাত্তাই দেয়না আমার কথার। কানে মোবাইল ফোনের হেডফোন গুজে দিয়ে চোখ বন্ধ করলো। আবার শুধোলাম, ‘সত্যি বলোনা ভালবাসো আমায় ! কেন ভালবাসো’ ! কেমন জানি একবার চোখ টানটান করে তাকিয়ে আমার ডান কানে হেডফোন গুজে দিল। আবার চোখ বন্ধ করলো। মুখে বলল, ‘চুপ শোন শুধু, কথা বলোনা...’

            ইয়ার্কি পেয়েছে, অনিন্দ্য অনিন্দ্য বলে সকাল সন্ধ্যা কাৎরাচ্ছে আমার সামনে, আর এখন আবার কানেও কালা করে দেয়ার প্রয়াস। কিছুতেই হতে দেব না। আজ জবাব চাই। হেস্তনেস্ত করবোই আজ আমি। রাগে আমি কান থেকে হেড ফোন ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গাছের পাতা গুনছি। কোন ভ্রূক্ষেপ নেই তার। গাছের গায়ে একপায়ে হেলান দিয়ে থাকতে থাকতে পা ধরে গেছে। সিগারেট শেষ। চোখ আর খোলেনা আমার দু'বছরের প্রেমিকা।

           রাগে উল্টোমুখো হয়ে পালাবো ভাবছি বিড়ি টানতে। কারণ মেয়েদের সামনে আর যাই হোক বিড়ি টানা যায়না। পকেট ফুটো ধোসার টাকা মিটিয়ে। চোখ খুলেছেন তিনি কাছে না পেয়ে। মেয়েরা বড্ড বেশি ভরসা করে তাদের সঙ্গীকে। আর তাই বোধহয় মেয়েরাও প্রেমে পড়ে কোন কোন সময়। শেষে পেছন থেকে এসে বলল, এতো রেগে যাও কেন! গানটা শুনেও রেগে গেলে!
- আমি কোন গানটান শুনিনি। আমার মন ভালো নেই। যা বলার তা তো বলেই দিয়েছ, আর গান শুনে কি হবে!
- আরে শোন না, অনিন্দ্য...
- মানে তোমার নতুন প্রেমিক!! বাহ কি করে ! ইঞ্জিনীয়ার না ডাক্তার!
- আরে তোমার প্রিয়...
- হ্যাঁ, তোমার যে প্রিয়, তাকে আমাকেও গিলতে হবে ! কেন ! হোম টোম নাকি তোমার অনিন্দ্য!
- আরে শোন না... বলা বারণ... অনিন্দ্য'র গানটা শুনতে বলেছিলাম। মেয়েরা সব কথা মুখে বলতে পারেনা।
- হুম, তা বলবে তো তুমি অনিন্দ্যর গানে আমার কথার উত্তর দিচ্ছ। বেবাট টাইপ হয়ে গেলাম। হাসলে আমায় সত্যিই বেবাট টাইপ লাগে। আমি জানি । ইশ, দুমদাম মন খারাপ করে ফেললাম। তবে এটাও ঠিক, শেষ তিন অধ্যায়ে দেখেছি, চলে যাওয়ার সময় ওড়নায় নখ প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বেশ বলে যেতে পারে মুখেই, বিদায় বন্ধু, ভাগ্যে নেই, তাই তুমি নেই। কি করবো তুমি তো একটা কিছুই করে উঠতে পারোনি এখনও । না বলে এসেছি, বাড়িতে প্রচুর মানুষ। রেন কোট টাইপ ভাগ্য আমার। ভাবি, এই অধ্যায় যদি ভাগ্যে থাকতো, কি যে হতো আমার অবস্থা ! এরচেয়ে অনেক ভালো আমার এই 'চার অধ্যায়'। এই নিয়ে দশবার গেছেন উনি, আর আজ নিয়ে এগারো বার আবার এন্ট্রি নিয়েছেন। উনি এলেই আমি 'শেষের কবিতা'র পাতা চোখে দেখি। চলে গেলে পড়ি জীবনানন্দ।

আমি যে একটু পাগল টাইপের তা আমি জানি। মানে কবি কবি ভাব, কিন্তু কবিতার অভাব। কস্মিনকালেও একটি কবিতা লিখতে পারিনি। তবে সে চলে গেলে কাব্য ভর করে মাথায়। একবার লিখেছিলাম । ক্লাশ টেন এ লিখেছিলাম -
'মাথার উপর নীল আকাশ,
পায়ের নিচে দূর্বাঘাস,
তোমার আমার পেছনে বরাক বাঁশ।'
মানে, বরাক বাশের উপর বসে ছিল মিষ্টি দিদিমণি আর নতুন স্যার। এই স্যারকে দেখলেই আমার পিত্তি জ্বলে যায়। মিষ্টি দিদিমণিকে দেখলেই, আমার মন ভালো হয়ে যেত। মোটেই 'ম্যারা নাম জোঁকার টাইপের' গল্প নয়। সবকিছুতে ঐ গন্ধ না খোঁজাই ভালো ! কী সুন্দর করে হাসতেন, নরম করে কথা বলতেন। ইস্কুলের রবীন্দ্রজয়ন্তীতে দিদিমণির পাশে দাড়িয়ে গান গাইতাম। কী মিষ্টি গন্ধ পেতাম। সারাটা মাস রিহার্সাল চলতো, আমরা সবাই রাজা...
       আমি ভাবতাম একবার যদি দিদিমণির হাতটা ছুঁতে পারতাম! তাই লিখে ফেলেছিলাম ঐ কাব্য। আমার এই কবিতা পড়ে আর মুখ দর্শন করেননি আমার। আমায় দেখলেই ট্যারা করে তাকাতেন। সেই প্রথম ধাক্কা। আমার প্রেমের চার অধ্যায়ের মধ্যে অবশ্য এই দিদিমণিকে আমি ধরি না হাতে। এরপর থেকে আর সেই ছন্দের চেষ্টা করিনি। বাকিটা বলা বারণ। কী করে বুঝবো বল ? তুমি আমার হৃদয়ে সঙ্গীত ফিরিয়ে দিচ্ছ ! দেখুন এই আমার বদ অভ্যাস। সুযোগ পেলেই কাব্য করি। প্রেক্টিকেল হতে হবে, জানি কন্যা, দু'চার দিন বাদে কোন ডাক্তারের বুক জ্বালাইবা তুমি সক্কাল সক্কাল। বিড়ির মতো সেন্টু সেন্টু মুখ করে।

বিড়ি নিয়ে দৌড়াচ্ছি নদী পারের দিকে (হাসির কোন কারণ নাই, এই দেশের ষাট শতাংশ মানুষ এখনও ট্রেন লাইন, ফাঁকা মাঠ আর নদীর পাড়ে প্রাকৃতিক কর্ম সারেন)। এরপরেও 'সাইনিং ইন্ডিয়া' ডুবে না। আমি তাই আপাতত ভাবছি কম পয়সায় পাকা ল্যাট্রিন বানানোর ব্যাবসা করবো। ব্যাঙ্কে গিয়েছিলাম লোন চাইতে। দেখে বলে দিল ব্যাঙ্ক ম্যানেজার, ‘ওইটা বাকিতে হইব না’। কষ্ট হবে বুঝলেন ! কোষ্ঠকাঠিন্য ব্যাবসায় ওয়ালমার্ট লগ্নী করবে না। কাগজের তিন নম্বর পেইজটা পড়বেন। বুঝলেন ! ব্যাবসার পাতা । আপনাদের মতো তরুণ ব্যাবসায়ীদের জন্য কতো বড় বাজার ! ব্যাঙ্ক গ্যারান্টি চায়। কিছু গ্যারান্টি দিতে পারবেন !
- আপনি কি বিবাহিত ! আমার এই প্রশ্নে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন ব্যাঙ্ক ম্যানেজার।
- হুম বিবাহিত।
- মেয়ে আছে ! কোন কলেজে পড়ে !
- সুরেন্দ্রনাথে ! ইংলিশ নিয়ে পড়ছে !
- হ্যাঁ তো কেন ! আমার মেয়েকে চেনেন আপনি !
- হ্যাঁ আমার প্রেমিকা । আপনি উনার বাবা। মানে আমার পরবর্তী শ্বশুর।
চিৎকার করছেন ভদ্রলোক। অবস্থা ভালো নয় বুঝতে পারছি। চা তখনো শেষ হয়নি। এক চুমুকে শেষ করলাম। নিজের মেয়ের কথা অধস্তনদের কাছে ফলাও করে বলবে না জানি। চেয়ার থেকে উঠে গিয়েও আবার বসে পড়েছেন। খুব শান্ত হয়ে বললাম, ‘আমার সঙ্গে ক্লাশ টুয়েলভ থেকে প্রেম করছে । লাস্ট টু ইয়ারে আমার সব ইনভেস্টমেন্ট আপনার ঐ মেয়ের কাছে । সেই আমার সিকিউরিটি আপাতত। চলবে’ ?
ভদ্রলোক ঘামছেন । বললেন, ‘তুমি বাড়ি এসো, পরে কথা হবে। গার্ড...’
- লোনটা দেবেন, সিকিউরিটি আমার আপনার ঘরে গচ্ছিত। সত্যি বলছি রিটার্ন পাবেই ব্যাঙ্ক।
- তুমি যাবে !
--‘না’ স্পষ্ট জানিয়ে দিলাম। ‘লোনটা না পেলে আমি যাবো না। আর বের করে দিলে সবাইকে জানিয়ে যাবো, আপনি আমার পরবর্তী হবু শ্বশুর হয়েও আমাকে বিশ্বাস করেন না। আপনার মেয়ের কাছে আমার সব জমানো গচ্ছিত। এখন সে অনুপমের সঙ্গে প্রেম করছে । আমায় ছেড়ে দিয়েছে । বলেছে আমি নাকি কোন কাজের না। প্রমাণ আছে সব। চিঠি, ইনবক্সে মেসেজ, ফোন কল, ছবি...’।
- তুমি কি পাগল ! ইয়ার্কি মারছো সাত সক্কাল বেলা । কত ইনভেস্ট করেছো টু ইয়ার্সে !
- মানে এমাউন্ট টা কতো ! কেন দিয়েছ !
- টু ইয়ার্সে চারবার। তেত্রিশ লক্ষ ইন্টু চার, মানে ওয়ান ক্রোড়ের কাছাকাছি।
ভদ্রলোকের কপাল থেকে ঘাম এবার দুম করে ঝরে পড়ল আমার প্রজেক্টের উপর। ঘামছে, শুধু ঘামছে ।
- ইয়ার্কি পেয়েছ ! চুরি করো নাকি !
- হ্যাঁ চুরি করেই, আপনার ফ্ল্যাটে দু'বার। আর বন্ধুর ঘরে দু'বার।
- মানে ! আমার ঘরে তো চুরি হয়নি কোনদিন ! তুমি কি পাগল ! উন্মাদ ! যাও বেরিয়ে যাও এখুনি।
- থাক সেই হিসেব করবেন না । লোনটা সেংশান করে দিন । চলে যাচ্ছি ।
- কোনমতেই না ।
- ঠিক আছে । তাহলে ডাকাতিটা আজ সেরেই ফেলি বলুন !
- মানে ? কি ডাকাতি । ভয় দেখাচ্ছ ! গার্ড...
- মানে আজ আমরা পালাবো। আমি আর আপনার মেয়ে । আমার শেষ দুবছরের ইনভেস্টমেন্ট  আর আপনার একুশ বছরের...।
- আমি পুলিশে জানাচ্ছি ।
- জানান, আমরা লিগ্যাল মেরেজ সেরে নিয়েছি। শুধু টাকা নেই তাই লোন চাইতে এসেছি । দেখুন এটা একটা ব্যাবসা শুধু নয়, মানুষের জন্যেও কাজ হবে এতে। কত মানুষ বাঁচবে বলুন। এই যেখানে সেখানে...
- থাক। আর বলতে হবে না । আমার একুশ বছরের ইনভেস্টমেন্ট চুরি করেছ । লোনটা হয়ে যাবে। নেক্সট উইকে এসে একবার দেখা করো। এখানে নয় বাড়িতে আসবে । তোমার বাবাকে নিয়ে আসবে সঙ্গে।
- এই রে। কেন বাবাকে দিয়ে কি হবে?
- আমার মেয়ের গ্যারেন্টার।

ব্যাঙ্ক থেকে যখন বেরিয়ে এলাম, তখন দেখি রাইজিং ইন্ডিয়ার বিজ্ঞাপনটা সত্যিই ঝকঝক করছে। ও দাঁড়িয়েছিল নিচেই। ভয়ে চোখমুখ ফ্যাকাসে। জানতে চাইলো কি বলল বাবা !
বলা বারণ... ইন্ডিয়া শাইনিং । কিন্তু আকাশে মেঘ আজও । জানিনা কপালে কি আছে। মেঘ না রোদ্দুর ! যাই থাক থাক, তুই থাক, শূন্য এ বুকে থেকেই যা তুই ।

মঙ্গলবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০১৩

ফর্মালিন



মাথাটা কে ব্যাবচ্ছেদ করে মিউজিয়ামে রাখবো ভাবছি
কোন কাজে লাগবে না জানি

হৃদয় দিয়েও বোঝাতে পারিনি,
ভালোবাসি তোমায়।

শিরচ্ছেদের সিদ্ধান্ত তাই।

ফর্মালিনের শিশিতেও
তোমারই নাম সেঁটে যাবো
নিহত চোখের মণিতে বিঁধে যাবো তোমার
হারিয়ে যাওয়া কানের দুল

হৃদয় অক্ষত থাকবে সেদিনও,
হেসে উঠবে তোমায় দেখে আমার পাহাড়ি পাখি,
হরিণ ছড়াবে সুগন্ধ, ফুলেরা বিছিয়ে দেবে বিছানা,
ঝর্ণা হবে শান্ত, পাহাড় দাঁড়াবে মাথা তুলে


যেদিন তুমি যাবে আমার শিরচ্ছেদ দেখতে
লংতরাইয়ের সবুজ গালিচা ধরে, তোমার আঁচল এলোমেলো হবে,
নতুন পাতা ছুঁয়ে যাবে তোমার হাত, পায়ের পাতা,
ঘাস জানবে শুধু তোমার অন্ধ কুঠুরির রহস্য

কোন কবির মিউজিয়ামে সেদিনও অকারনেই ছুঁয়ে যাবে বসন্ত
এখানেই ছিল কবির আস্ত পৃথিবী আর তুমি, শেষ কয়েক দশক।
এবং আজ

যদি ভুলক্রমেও ছুঁয়ে দাও একবার!

তাই, মাথাটাকে ব্যাবচ্ছেদ করবো ভাবছি।
হৃদয়টা রেখে দেবো অক্ষত, তোমারই জন্যে।

সোমবার, ২১ জানুয়ারি, ২০১৩

তুমি ছুঁয়ে দিলেই ...


বটের ঝুড়ি ধরে চলে যাও মেঘেদের কাছে।
দেখবে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ছে মেঘবালিকা

তুমি এমনটাই,
ছুঁয়ে দিলেই ঝরে অসংখ্য আকাশ মাটিতে

তুমি ছুঁয়ে দিলেই মেঘ ঝরে পড়ে বৃষ্টি হয়ে
তুমি ছুঁয়ে দিলেই ঈশ্বর হয় রাহুমুক্ত
তুমি ছুঁয়ে দিলেই আজানের সময় হয় অসময়ে

ছুঁয়ে দিলেই স্খলন শুরু হয় ধানী জমির
সূর্যমুখীর ক্ষেত ভিজে যায় ধূতরা ফুলের কষে
শুরু হয় নতুন সৃষ্টি অথবা অগ্নুৎপাত
লাভাপথে জমে যায় অজস্র বরফ

হেসে ওঠে ইন্ডিয়া গেইটের তাক করা রাইফেল

চিতা থেকে জেগে উঠেন রবীন্দ্রনাথ
রাইটার্সের রঙ হয়ে যায় নীল

তুমি ছুঁয়ে দিলেই ... ফুল ফোটে, পাতা ঝড়ে
নুইয়ে পড়ে লজ্জাবতী

তুমি ছুঁয়ে গেলেই রোদ্দুর, অথবা বৃষ্টি, সকাল অথবা বিকেল


তুমি না থাকলেই সব বেসামাল অথবা শব যাত্রার গেঁদা,
খই ছড়ানো পথে সিলভার কয়েন।
জলহীন মঙ্গল আর চাঁদের শরীর, মাটি
এবং আমার অনিদ্রা, ভেজা ছাই অথবা ফ্রেমে রজনীগন্ধা।

বৃহস্পতিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৩

আর্চিস গ্যালারী


র্চিস গ্যালারীতে অনেককাল ধরে নীরবে অপেক্ষা করছে দুটি লাল গোলাপ।
হাতে তৈরি কাগজে রাতের পর রাত জেগে এই গোলাপের জন্ম দিয়েছিল আর্ট কলেজের ছেলে ঋতু। তেল রঙ কিনবে, তাই একদিন নিজেই বিক্রী করে দিয়েছিল কালো রাবার মুড়ে গোলাপ আঁকা কার্ডগুলি।
সেই থেকে গোলাপ ঘিরে অন্ধকার।
এখন কি কাল কে জানে! কতকাল সূর্য দেখেনি, কুয়াশাদের সাথে খেলেনি, বাবুই পাখির কোলাহল শোনেনি। ভেবেছিল মিষ্টি প্রেমের উপহার সেজে মুক্তি পাবে এককালে এই কালো রাবারের ঘুম থেকে এই গোলাপ হৃদয়।

ঋতু বলেছিল, তানি কে ভরিয়ে দেবে কাগুজে গোলাপে। ভেবেছিল, হাতে তৈরি এই কাগজে ছড়িয়ে দেবে শেষ বার কোন জুঁই ফুলের পারফিউম।
কোন মিষ্টি প্রেমের উপহার সেজে খুনসুটি করবে ভ্যালেন্টাইন ডে'র সন্ধ্যায় দুই লাল গোলাপ।

সময় গেল, চরিত্রহীন এখনও বেষ্ট সেলার। গোলাপ এখনও বিক্রী হয়। শুধু বিক্রী হয়না ঋতুর হৃদয়। এখনও তানির কালো ফিতের বাঁধুনি আলগা হয়নি।
ঋতু এখন আর ছবি আঁকেনা।

আজ ১৬ই জানুয়ারি। আজই এমনি করে চলে গিয়েছিলেন রূপনারায়নের পারে শরৎবাবু। চরিত্রহীন এখনও বেষ্ট সেলার। কিন্তু কেউ মনে রাখেনি চরিত্রহীনের মৃত্যুর খবর।
কেউ মনে রাখেনি শরৎ ঋতুর নিরুদ্দেশ হওয়ার খবর। কেউ মনে রাখেনি কাল শেষবার আমার দেয়া গোলাপের শেষ পাপড়িটি ঝড়ে পড়েছিল তোমার ডায়েরির পাতা থেকে অজান্তেই।

কেউ মনে রাখেনি, এই দিনটিতে তুমি চলে গিয়েছিলে। কেউ মনে রাখেনি, রেখে গিয়েছিলে আমাকে।

ঋতুর আঁকা গোলাপ আর আমি, এখন কালো চুল বাঁধার রাবারে হাঁসফাঁস করছি, অন্ধকার এক ঘরে, এককোণে তোমারই জন্যে...

হে পিতা! স্বর্গ মর্ত্যের প্রভেদ আমি জানিনা। আমি জানি, তোমার প্রশস্ত দুই হাত আর সেই হৃদয়ের কথা। যা আমাকে দিয়েছিলে তুমি আমার প্রথম কৈশোরে, আমাকে। আমার মাকে, আমার প্রথম ভালোবাসাকে।
তুমিই ছিলে আমার কৈশোরের আর্চিস গ্যালারী...।

রবিবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০১২

আমানত


কিছু আগাছার মধ্যে বড় হচ্ছে একটি বনফুলের গাছ। গত কদিন ধরে প্রতিদিন সকালে পরখ করে দেখি কবে ফুটবে বেগুনি ফুলের গোছা। বনফুলেরা একা ফোটে না। একসাথে একই বৃন্তে বেশ কিছু ফুল জানান দেয়, তারা ফুটেছে। অযত্নে হলেও তার রুপের জৌলুসে বনে আজ সুখ লেগেছে। অহংকারী হয়ে ওঠে বনরাজী আর ঝরা পাতার দল।

হেমন্ত সকালের শিশির লেগে আছে বনফুলেদের পাপড়িতে। মনে হয় সঙ্গম শেষে ঘামে ভিজে আছে ফুলের শরীর। সবসময় দেখেছি বন্যতায় প্রকৃতি রঙ ঢালে অকাতরে। বেগুনি, লাল, গাড়ো সবুজ, হলুদ। এই সব রঙের গভীরতায় আছে এক আদীম ভালোবাসার উচ্ছ্বাস। এই জগতের যাবতীয় রঙ ঠিক করে দেয় প্রকৃতি।

আমাদের ভালোবাসার রঙ লাল, মৃত্যুর রঙ সাদা বা শোকের রঙ কালো সব নির্দিষ্ট। আমাদের আমানত এই দুনিয়া। প্রকৃতির আমানত ঈশ্বর। ঈশ্বরের আমানত সৃষ্টি।
আজ সকালে চোখ খুলেই দেখলাম রক্ত মাংসের এক আমানত সাদা কাপড়ের ঢেকে পিস অব হেভেনে জিরিয়ে নিচ্ছে শেষবার। গত কদিন ধরে উশখুশ করছিল মনটা। তেরো দিন, তেরো রাত, তেরোটি সকাল আবার প্রমান করলো ব্ল্যাক ফ্রাইডের কথা।
শুক্রবার আমার প্রার্থনার দিন। তোমার নামাজ পড়ার দিন। ভাবিনি শেষরাতে অপেক্ষা করছে এমন একটা ভয়ানক ডেট লাইন।

আজ ঈশ্বর রোদ্দুর দিয়েছেন ঢেলে আমার উপত্যকায়। অনেকদিন পর রোদে পিঠ দিয়ে কমলা খাচ্ছে পাহাড়ি ছেলে উমন। গত একবছরে আরও একটু বড় হয়েছে ছেলেটি। এই কৈশোরের সন্ধিক্ষণে বাচ্চা গুলি একটা নিজস্ব জগৎ তৈরি করে নেয় মনে মনেই। আজকাল বেশ সুখ এসেছে ওদের ঘরে। মাথায় টিনের ছাদ, ঘরে রঙিন টেলিভিশন, সৌরবিদ্যুতের আলো সর্বক্ষণ জ্বলে ঘরে। অনেকরাত পর্যন্ত রিমোটে চ্যানেল চেঞ্জ হয়। দুমদাম পাল্টে যায় অন্ধকারের রঙ।
ফুলবতীর শরীরে বাড়তি লাবণ্য এসেছে। মুখে মধু আর কমলার খোসার রস মেখে, বসে থাকে সকাল সকাল রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে। এরপর কাঁচা দুধ মেখে জলপাইয়ের আচার খায়। শুনেছি শীত গেলেই আবার পোয়াতি হবে ফুলবতী। এবারও মেয়ে চাই তাদের।

ফুলবতীর স্বামী আজকাল আর মধ্যরাতে দেশী খেয়ে চিৎকার করেনা। চোখ লুকিয়ে চলে। মাঝে মধ্যে আঙ্গুলের ডগায় ধরে থাকে তুলো দেয়া সিগারেট। ধোঁয়ার রিং বাতাসে উড়িয়ে, আবার নিজেই এলোমেলো করে দেয়।

নেই শুধু ফুলবতীর মেয়েটা। শুনেছি, কাঁচুলিতে বেঁধে গত চৈত্রে গাছের মগডালে ঝুলিয়ে দিয়ে এসেছে মেয়েটাকে। অকালে মরেছে এই পাহাড়ের আমানত। বছর দুই ছিল বয়েস। গোলগাল মুখ, লাল খয়েরি চুল, কাঁচা হলুদ রঙের তুলতুলে শরীর, আমপাতায় তোলা কাজল টিপ কপালে। মিষ্টি হেসেই জানান দিত পাহাড়ের সুখ আর সকাল আহ্লাদী হয়েছে এবার।
ঈশ্বরের উদ্দেশ্যেই মেয়ের জান নিবেদন করেছে ফুলবতী! এরপর থেকে সংসারে সুখ এসেছে। ঈশ্বর মেয়েকে নিয়ে, তাদের করে গেছে দোয়া। তাই ফিরেছে দিন।

একটা গর্হিত কাজ আমি করেছি জানো! একটা দুই লাখের ড্রাফট গত তেরোদিন ধরে আমার কাছে। এটা ফুলবতীর নামে এসেছে।
সেদিন পোস্ট অফিসে গিয়েছিলাম তোমার কোন চিঠি এসেছে কিনা তার খোঁজ নিতে। আসার কথা ছিল কিছু বই পত্তরও। কিছুই পেলাম না। মন খারাপ করে বেড়িয়ে আসছি তখন পোস্টম্যানটা ডাক দিয়ে বললো,
- বাবু কিছু যদি মনে না করেন এই চিঠিটা দিয়ে দেবেন ফুলবতীরে! যা ঠাণ্ডা পাহাড়ে, তাইলে আর আমারে যাইতে হয়না এতদূরে...।

হাত বাড়িয়ে নিলাম খামটা। ফুলবতীর নামে চিঠি! একটু অবাকই হলাম। জানি আমাকেই পরে দিতে হবে। তাই খামটা খুললাম। খুলেই দেখি এই দুলাখের ড্রাফট আর সাথে একটা ছোট্ট চিরকুটে লেখা,
'তোমার মেয়ে ভালো আছে। সব টাকা দেয়া হয়ে গেল। ও এখন আমাদের আমানত। ভালো থেকো।'
কোন নাম বা ঠিকানা লেখা নেই।

ভাবছি জানো! ড্রাফটটা কাকে দেবো! ফুলবতীর হাতে না ঈশ্বরের জন্য লটকে দিয়ে আসবো ঐ পাহাড়ের কোন গাছের মগডালে! না ঐ পাহাড়ী নদীর বুকে ভাসিয়ে দেবো!
না রেখে দেবো আমানত করে আমার কাছেই!

রবিবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০১২

ক্রমোজোম, প্রেম, আমার জিন্স এবং তুমি/ দুই


তোমার ঠোঁটে কুয়াশাদের আশ্রয়, কপালে লেপ্টে থাকা চাঁদ, কপালে লেপ্টে থাকা এলো চুল আমার স্বপ্ন সম্ভব পৃথিবীর উপমা।
সামনে একটা কলম, তুমি আর কুয়াশার শামিয়ানায় ঢেকে থাকা চাঁদ, সেও তোমারই কথা বলে।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে ক্রীতদাস তুলো চাষির দল তাদের ভালোবাসার নারীকে উপহার দিতে একটা বিপ্লবের জন্ম দিয়েছিল। সেটাই ছিল বোধহয় পৃথিবীর প্রথম বিপ্লব কোন পুরুষের, তার ভালোবাসার নারীর জন্য।
বিপ্লব জয়ী পুরুষ ক্রীতদাসের দল সেদিন মেতে উঠেছিল উৎসবের রাতে। আকাশ জুড়ে উড়িয়ে দিয়েছিল কোটি কোটি তুলোর নরম কোষ। নরম তুলোর দল হারিয়েছিল আশ্রয়। যেমন অবৈধ সুখী জন্মের পর অবাঞ্ছিত কোন শিশু আশ্রয় পায় ডাস্টবিনে। সভ্য আলোর মুক্তি নেই অচেনা এই নিয়মসর্বস্ব পৃথিবীতেও।
সেদিন প্রেম আর যুদ্ধ জয় শেষে পুরুষ তছনছ করে দিয়েছিল বিস্তীর্ণ তুলোর মাঠ।

প্রকৃতির সহ্য হয়নি পুরুষের এই জয়োল্লাস। তাদের ভালোবাসার নারীরা সেদিন প্রত্যাখান করেছিল তাদের যোদ্ধা পুরুষকে। নারীর হৃদয় চাই, পুরুষের শরীর আর চাই জয়, চাই অধিকার।
উপহার চাইল নারী শীতের রাতে আশ্রয়, চাইলো উষ্ণতার জন্য একটি পুরুষের পশমহীন কালো বুক। একটা খোলা পিঠ। উদ্দেশ্য একটাই অসংখ্য নির্মম প্রেমের অত্যাচার দেখে পরখ করে নেবে তার ভালবাসা আর বিশ্বাসকে।
যোদ্ধা পুরুষ ভালবেসে বড় অসহায়।
রিক্ত নিঃস্ব হাতে থাকেনা কোন উপহার।
সেই থেকে শুরু নতুন ভাবনার পুরুষের। অন্য চিন্তা। মিলন পিয়াসী পুরুষ জড়ো করতে শুরু করে পৃথিবীর সব জঞ্জাল। রিক্ত পুরুষের আর কিছুই নেই দেয়ার, তাই জঞ্জালের উপহার নিয়ে আবার নতুন করে বেঁচে থাকার গান ধরে ক্রীতদাসের দল। প্রেমিক পুরুষ প্রত্যাখান হলেই তার মধ্যে শুরু হয় একটা জেনেটিক পরিবর্তন। অসম্ভব শক্ত হয়ে ওঠে মাংশপেশী। পাল্টে যায় ঘামের গন্ধ, চামড়ার রঙ। চুলের রঙে গ্রীষ্ম দুপুরের আগুনে আভা দেখা দেয়।

পরিচিত নীল আকাশে সিঁদুরে মেঘের দাপাদাপি।

অশান্ত পুরুষকে শান্ত করতে সেদিন তাদের প্রিয় নারীরা দিয়েছিল সিঁদুর রঙা শিমূল ফুল।
অশান্ত পুরুষ হৃদয় দিয়ে, সেদিন জঞ্জাল আর শিমূল ফুলের তুলো দিয়ে সৃষ্টি করলো নারীর জন্য প্রথম উপহার। সবুজ শীতচাদর।
অসংখ্য পুরুষ ক্রীতদাস আর তাদের প্রেয়সীরা সেদিন আশ্রয় পেল শিমূল তুলোর সুখে আর উষ্ণতায়।
পুরুষ পেল নতুন আশ্রয়। জেনেটিকেল একটা পরিবর্তন এলো পুরুষ আর নারীর সম্পর্কের। পৃথিবীর সব আগ্নেয়গিরির সুখ শুধু গলছে। হাওয়াই দ্বীপের, মওনা লোয়া নিঃসৃত লাভা গড়িয়ে পড়ছে প্রকৃতির সবুজে। আশ্রয় চাইছে এক নিভৃত ফুল ভাঙ্গা জলের।

মানুষ উষ্ণতায় ভাষা খোঁজে, শীতার্ত হলেও ভাষা খোঁজে। অনুচ্চারিত শব্দ গুলির সুখ খোঁজে শিমূল ফুলের কুসুমে।
এক আকাশ সুখ চাই। এক আকাশ কথা চাই। কিছু নিঃশব্দ উচ্চারনের আজ প্রয়োজন ঝড়ে পড়ার সুখ, তোমার আকাশ থেকে।
স্তব্ধ হয়ে যাওয়া সমুদ্র আড়াল চায় পৃথিবীর কাছে। পৃথিবী আশ্রয় চায় মাটির কাছে। যুদ্ধজয়ী ক্রীতদাস পুরুষ স্পর্শ চায় তার প্রিয় নারীর। শূন্য স্তব্ধ দুই হাত দারুণ অবাধ্যতায় ঢেকে রাখে প্রকৃতির সব লজ্জা।
ক্রীতদাস প্রেমিক পুরুষ জানলো উপহার দিতে। তাদের নারী জানলো তাদের প্রিয় পুরুষকে অভ্যাস করার প্রথম কৌশল।

তোমার আকাশে ভেসে যাওয়া মেঘের দল আমার নিঃসারিত নিকোটিনের অবশিষ্ট। তোমার আকাশের অসংখ্য তারায় আমার উচ্চারিত শব্দের ভিড় করে থাকা। তোমার আকাশে লেপ্টে থাকা আলোকরশ্মি তে আমার উষ্ণতা। তোমার ঘিরে থাকা উত্তুরে হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়, সারাদিনের কাজের শেষে ঝড়ে পড়া ঘামের গন্ধ। তোমায় ঘিরে থাকা রাতে, আমার ক্রীতদাস শরীরের কালো চামড়ায় জমাট বাধা অন্ধকার।

এবার একেকটি জমাটবাধা কালশিটে চাবুকের দাগে খুঁজে নাও তোমার প্রত্যাখ্যানের গল্প, তোমার শেষ হয়ে যাওয়া সুখের শেষ প্রহর। কষ্ট, যন্ত্রণা আর নষ্ট আদর।

এই নিয়েই থাকি। চোখের তারায় তুমিই এসে দাড়াও বারবার।

আমার জিন্স, আমার স্বপ্ন, আমার আকাশ, তুমি, আর আমার শব্দ। আমার বেঁচে থাকা, আমার ক্রমোজোম আর এই জেনেটিক পরিবর্তনের জন্য তুমিই দায়ী। নিন্দিত এক সন্ধ্যায় শুধু খুঁজে চলা উপুড় করা সুরাপাত্রের শেষ বিন্দু। আমার নেশা ধরেনা।
আমার শব্দেরা থেমে যায়। শুধু নীরবতাই আমার শাস্তি। তোমার অসুখ। আমার বেঁচে থাকার জন্য তোমার বরাদ্দ উপহার।

পৃথিবী আজ পাল্টেছে। আজ ক্রীতদাসেরা উপহার দেয় তাদের প্রিয় নারীকে, লাল শিমূল ফুল। বিদ্রোহ হয়না আর আকাশ জুড়ে। তাই আরেকটা পরিবর্তন হয়না শিমূল ফুলের জমিতে। আরেকটা পরিবর্তন হয়না এই স্বপ্নের উপত্যকায়।
শুধু তুমি চাওনা বলে।
শুধু তুমি নেই বলে।
শুধু আমি জানি তাই... তুমি আছো বলেই.........                                                                                                  (চলবে)

শনিবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১২

ক্রমোজোম, প্রেম, আমার জিন্স এবং তুমি/ এক


কটা উল্কাপাত। একটা দুঃস্বপ্ন, পাতা ঝড়ার বেলায় সুখ বিলাসী আমার ভালোবাসা। ক'দিন ধরে আমার ব্রেন সেল গুলিতে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে অসংখ্য শব্দ। তবে আমি শুধু একটি শব্দকেই চিনতে পারি, 'ছুটি'।
এক নিরুদ্দেশের ভাষা। যে শব্দের আকৃতিতে রয়েছে শুধু অন্ধকারের হাতছানি।

যুদ্ধক্ষেত্রের তাঁবু গড়ে উঠেছিল যে কাপড়ে, সেই কাপড়ে লজ্জা ঢেকেছিল আমেরিকান সৈন্যরা। এই কাপড়ে লজ্জা ঢেকে বব ডিলান বিপ্লব এনেছিল পৃথিবীতে। সঙ্গীতের মূর্ছনায় ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল প্রাচীন জীর্ণ পৃথিবীর। মানুষ ভাবতে শুরু করেছিল এবার একটা পরিবর্তন চাই। সঙ্গীত, কাপড়, যুদ্ধ আর ডিলানের পৃথিবী পাল্টে দিয়েছিল পৃথিবীর যাবতীয় মিথ।

 এক সময় ডারউইন সাহেবের মাথায় একই ভাবে খেলা করে গিয়েছিল কিছু ব্ল্যাক হোল। আর সেই অজস্র ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষ আর টানাপড়েন থেকেই ঘটতে থাকে শরীরের ভেতর একের পর এক বিপ্লব। নিজের চেনা শরীরের এই অদ্ভুত ভাষা জানার কোন ল্যাব নেই। সেই থেকেই দিনের পর দিন চলতে থাকে একের পর এক বিস্ফোরণ। খুব পরিচিত এই শরীর জুড়ে শুরু হয়েছিল তোলপাড়। বুঝতে পারছিলেন একটা জেনেটিক চেঞ্জ হচ্ছে কোথাও। নিজের শরীর ভাষা পাল্টে যাচ্ছে। মন সেই ভাষা বুঝতে পারছে। সেই ভাষা ভালোবাসার অথবা মৃত্যুর। শূন্যতার অথবা সুখের। একের পর এক আঘাতে শুধু বৈধব্য আর ক্ষুধা।

 আসলে আমাদের শরীরের জিন গুলির আকার, চলন, বলন আর পরিবর্তনের এই ভাষা শেখার পর থেকেই একটা অদ্ভূত বিহেভ করতে শুরু করেছিল প্রকৃতিও। মানুষের চেনা শরীরের এই হঠাৎ অবাধ্য হয়ে যাওয়ার খেলা, কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছিলনা প্রকৃতি। মানুষের স্লোগান প্রতিনিয়ত আঘাত করছিল প্রকৃতিকে। গাছ, মাটি নির্বাক, কথা বলার অধিকার নেই। আওয়াজ না তুললে বিপ্লব সম্ভব নয়। প্রতিবাদ দরকার। প্রতিবাদের ভাষা বলার কণ্ঠস্বর তো নেই প্রকৃতির। নিঃশব্দে শুরু হল প্রকৃতির রক্তক্ষরণ। মানুষের সাথে নিজেকে পাল্টে নেয়ার অদম্য জেদ জন্ম দিল এক নতুন ভাবনার, শুরু হল নতুন করে গড়ার কাজ।

 সময় আর শতাব্দীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, মানুষের জেনেটিক বিহেভের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাল্টাতে শুরু করলো প্রকৃতি নিজেকেই। সেই থেকে জানা যায় প্রকৃতিরও একটা জেনেটিক বিহেভ আছে। প্রকৃতিরও একটা শরীর আছে। সেই শরীর বিপ্লব জানে, বিদ্রোহ জানে, ভালবাসতে জানে, জানে সঙ্গীতের নোটেশান। জানে নিজের ক্রমোজম গুলির বিভাজন। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেকে সাজিয়ে তোলার এই প্রয়াস এবার দরকার বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রয়োজনে। সময়ের সাথে পাল্ল দিয়ে প্রকৃতির জিনগুলিও তাদের রুপ পাল্টায়, ব্যাবহার আর ভাষা বদলায়।

ভাষারও আছে ক্রমোজম জনিত বিন্যাস। ভাষা, মন, প্রেম, ঈশ্বর, প্রকৃতি আর শরীর মিলে তৈরি হয় একটা বন্ডেজ এই পৃথিবীতে। সে কারণেই মানুষ আর প্রকৃতির এই যূথবদ্ধ হয়ে থাকার অভ্যেস। এই অভ্যেস থেকেই মানুষ ভালোবাসে। পুরুষ চিনতে শেখে নারীকে। নারী পুরুষকে সহ্য করার অভ্যাস রপ্ত করে। আবার ছুটি চায় একসময়। এই ছুটি নতুন করে বাঁচার তাগিদ দেয়, স্নান করিয়ে দেয় মনের, শরীরের।

মানব শরীর, মানব প্রেম, মানব হৃদয় আর প্রকৃতির জিন গুলি সব একাকার হয়ে সৃষ্টি করে সভ্যতার।

 মানুষের মনের এই জেনেটিক পরিবর্তনকে সুরক্ষিত রাখতেই প্রয়োজন পোশাকি পরিবর্তন বা পোশাকের। ডারউইন সাহেবের জিন আবিস্কার আর লিওব স্ট্রসের জিন্স সেই তাগিদ থেকেই উদ্ভাবন হয়েছিল। কেউ পরিবর্তন চায় মনের, কেউ চায় পোশাকের পরিবর্তন। কেউ সমাজের, কেউ পরিবারের। ফ্যামিলি প্ল্যানিং, যৌথ পরিবারের ভেঙ্গে পড়া, প্রতিদিন যুদ্ধ বিদ্ধস্থ এই পৃথিবী কিন্তু পাল্টাচ্ছে, সয়ে নিচ্ছে সব। মরছে প্রেম। নিহত হচ্ছে শরীর আর ঋতু।

কেউ চায় জীবনের পরিবর্তন, কেউ চায় প্রসাধনের। এক্সপেরিমেন্টাল এই চাহিদা গুলি কিন্তু সবই ভালো থাকার জন্য। এই সভ্যতা রপ্ত করা শিখে গেছে মানুষের এই চাহিদাগুলি।

 আকাশের রঙে যেমন ঘন নীলের রহস্য, তেমনি আমার জীবনেও সেই একই রঙের রহস্য। এই রঙ দেখেই চিনে নাও আমার মন। আমার জিন্সেও সেই একই রঙের ছড়াছড়ি। আকশের হাতছানি। আমার বিপ্লব, আমার সভ্যতা, আমার ভালোবাসা আমার জিন্সের রঙে, আমার আকাশের রঙে, আমার স্বপ্নের রঙে। আমার একমাত্র পরিচিত শব্দ ছুটি। ছুটি চাই এই আকাশে, তোমার আকশে। আমার মৃত্যু, আমার বেঁচে থাকা এই স্বপ্ন সম্ভব আকাশকে ঘিরেই।

একটা উল্কাপাত মানেই একটা রহস্যের ঝরে পড়া। তোমার উল্কাপাত, আমার প্রার্থনা। তোমার মনের হদিস যেমন এই মুহূর্তে এসে আশ্রয় নিল আকাশ থেকে মাটিতে পড়ার আগেই কোন মনে। একটা আদিম বন্য আকাশের নড়াচড়া শুরু হয় ঠিক তখন থেকেই। আমার তখন ইচ্ছে করে অবাধ্য হতে।

কোন কোন সময় ছাইদানিতে সিগারেটের কাউন্টার পার্ট না ফেলে ঘরের মেঝেত বা কার্পেটে ফেলার সুখ আলাদা। স্বাধীনতাকে আর তোমাকে ছুঁয়ে ফেলার মতো। কোন কোন সময় অবাধ্য হওয়া মানেই ছুটি, আমার সুখ, তোমার বিশ্বাস আর উদ্দাম প্রেম। এরপর আকাশের রঙ দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়া...। (চলবে)  
     

সোমবার, ১২ নভেম্বর, ২০১২

এম্ব্রয়ডারি















ন্ম নিয়ন্ত্রনের বেলুনের দেয়ালে হাঁসফাঁস করে ভালবাসা
জন বিস্ফোরণ রোধ করার কোন ইকুয়েশান জানা হয় নি আজও
এর চেয়ে ঢের ভালো শীতল পাটিতে কাটাকুটি খেলা
কাস্তে হাতে হেমন্ত ধানের শীষ কাটলেও 
যেমন নিশ্চিহ্ন করা যায় না উর্বর মাটির সুখ
তেমনি নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব সোহাগী হৃদয়ের

জামা কেটে সেলাই করে নে হৃদয়টাকে
এম্ব্রয়ডারি করে ভালোবাসার চিহ্ন এঁকে দেবো
তাই নিয়ে সুখে থাকিস অথবা ভুলেই থাকিস

শুক্রবার, ২ নভেম্বর, ২০১২

তোমার একুশে














তটুকু সময় আমার প্রাপ্য ততটাই দেবে পৃথিবী আমায়। ঠিক সব ঋতুর শেষে আসে যেমন চৈত্র মাস।
আর আমার সর্বনাশ।
মিষ্টি রোদ্দুর চারিদিকে। একটা দলছাড়া হলুদ পাখী ক্ষণে ক্ষণে বলে যায় তোমার কথা।
তুমি নাকি ভূমধ্যসাগরের পারে দাঁড়িয়ে একা।
কোন ফুল কোথায় ফোটে, কোন পাখী কি গান গায়, শুনে লাভ কি বল তোমার!
আমারই বা কি ক্ষতি!

একটা জীবন সে তো গেছেই সেই কুড়িতে।
আরেকটা জীবন! এই জীবন ছেড়ে গেলেই স্বপ্ন দেখা ভালো।

আমার কাঠের উনানে কলমি শাক কিছু সেদ্ধ হচ্ছে। যেমন করে তোমার জীবন চলছে গত কিছু বছর। সেদ্ধ হতে হতে পাংশুটে তোমার মুখ।

চলো কালো গাভীনের দুধ মেখে দিই। ফিরে পাবে তোমার একুশের স্বাধীনতা।
চলো তোমার বিকেলটায় হলুদ মেখে দিই
অথবা শাল পাতায় করে ডিম খাই পিঁপড়ের
এরপর ঢলতে ঢলতে ফিরে যাই আমাদের একুশে

এরপর শুক্র সকাল
ছত্রিশ ডিগ্রী সেলসিয়াস
দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রায় সেদ্ধ হোক আদিম উচ্ছ্বাস

রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১২

ঘুমিয়ে থেকো


চাঁদ দেখা বারণ আমার। তাই আজকাল চুরি করেই দেখি চাঁদের আলো।
চাঁদ দেখার চেয়ে ঢের ভালো হলুদ প্রজাপতি বা হিমেল ঘাসেদের চুমু খাওয়া।
চুরি আমি করবোই, পারলে আটকে রেখো। বেশী সুন্দরী হলে সাবধানে থাকাই ভালো!
 
যেমন থাকে চাঁদ। অনেকদূরের আকাশে সাবধানে একাকী।
সবাই বলে চাঁদের কলঙ্ক, আমি বলি চাঁদের কপালে লাল চন্দনের প্রলেপ। যেমন নতুন বৌঠানের কপালে ছিল বিয়ের রাতে।

তোমায় নীরা হতে বলিনি তো! বলিনি বৌঠানের মতো আত্মহত্যা করো।

আমার সহ্য হয়না তোমারই ঐ রূপ, তাই তো ভালবেসে ফেলি অজান্তেই বারবার।
যেমন ভালোবাসে কুয়াশারা সকালের শিউলিকে। অথবা সবুজ ঘাসেদের হৃদয়কে। চলো কোন এক সকালে তোমায় আকাশ থেকে ঝড়ে পড়া কুয়াশায় স্নান করিয়ে দেই।

শেষ দুদিন লিখতে পারিনি। লিখতে পারলে তোমাকেও আমার সাথে কড়া নাড়তে হতো মৃত্যুপুরীর।
হয়তো বেঁচে যেত বৌঠান। অথবা চাঁদ বেছে নিতো আত্মহত্যার পথ!

আমায় পথ দেখিয়েছে হাজার হাজার আলোকবর্তিকা তোমার ঘরে উঁকি দেয়ার। এরপর চোর হওয়ার সাধও আমার গেছে।
মনে হয়েছিল এতো অহংকারী শরীর ঘুমিয়ে থাকে কী করে!

তুমি ঘুমোলে তো পৃথিবী জড়বৎ হয়ে যায়, আকাশ হাসে না, বৃষ্টি থেমে যায়, পাহাড় শান্ত হয়ে যায়, নদীর দিক পাল্টে যায়।
আবার মনে হয়েছিল, ঘুমিয়ে আছো বলেই বেঁচে গেলাম আমি অথবা এই বঙ্গোপসাগর।

আগুনের কাছে বন্ধক রেখে এসেছি তোমায় পবিত্র করতে , প্রতিমুহূর্তের সুদ আমায় নিঃস্ব করে প্রতিদিন। আর সেই আগুন তোমার কপালে টিপ হয়ে ভয় দেখায় আমায়! দখল নিয়েছে অজান্তেই।
আমি কয়লা হই।
চুরি আমি করবোই। পারলে রুখে দিয়ো।
তুমি চুপ থাকলেই আমার ইচ্ছে করে অবাধ্য হতে। আবার আরেকটা অপরাধ করতে। তোমায় ভালবাসতে।
বলেছিলাম তো...

চাঁদের আলো তবুও আমাকে ছুঁয়েই যায়, জানি ভাঙ্গনের রাতে বড় নির্দয় তুমি, তবে হৃদয়হীনা তুমি নও।  তাই ভালবাসবোই।

তবুও আমার জন্য নিষিদ্ধ ঐ চাঁদ, তুমি এবং তোমার হিমেল রাত।

রবিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১২

বলি প্রদত্ত...


ঠিক এই মুহূর্তে আকাশটা একটু লালচে নীল। আমি বসে আছি রাঙ্গামাটির ভুবনেশ্বরী মন্দিরে। নীচে দিয়ে বয়ে চলেছে মজা গোমতী। অসম্ভব শান্ত জল,শ্যাওলা সবুজ। আশেপাশে শুধু টুপ টুপ করে শিশির পড়ার শব্দ। অনেকদূরে কোথাও মাইকে বাজছে, ও লো সই, তোর চোখ কেন ছলছল... আজ জয়ের মালা কাকে দিবি বল...!

একটা সময় এই ভুবনেশ্বরী মন্দিরে নরবলি হতো। শোনা যায় শরীরে কোন ক্ষত নেই এমন মানুষদের ধরে এনে বলি দিত রাজরাজারা। কখনও কখনও যুদ্ধে পরাস্ত সেনাকেও দেয়া হতো বলি রাজার কল্যাণে।এই রক্তের স্রোত উঁচু টিলা গড়িয়ে গোমতীর জলে মিশে যেত। রবীন্দ্রনাথের বিসর্জনের পটভূমিও নাকি ছিল এই ভুবনেশ্বরী মন্দির। রাঙ্গামাটিতেই ছিল ত্রিপুরার পুরনো রাজবাড়ী। পরবর্তী সময় রাজা এই রাঙ্গামাটি থেকে রাজধানী সরিয়ে নিয়ে যান আগরতলায়। একসময় আগরতলায় প্রচুর আগর গাছ ছিল। তাই নাম আগরতলা। আজ সেই গাছ নেই, আগরতলা আছে অবশ্য।
        আগরতলার রাজবাড়ীর দুর্গাপূজার বয়স প্রায় আড়াইশ বছর হবে। তবে এনিয়ে মতভেদ রয়েছে। রাজবাড়ীর পুজায় এখনও মহিষ বলি হয় নবমী পুজার দুপুরে।রাজচন্তাই স্বর্ণ পৈতা পরে মহিষ বলি শেষে মদ, আদা আর ডিম বলি দেন। এটাই রাজণ্য প্রথা। অথচ দেবী শুনেছি বলি চান না। পুরাণে কথিত আছে রামচন্দ্র পশু বলির পরিবর্তে ১০৮ টি নীল পদ্ম দিয়ে দেবীর আরাধনা করেছিলেন রাবণকে পরাস্ত করতে।
রাজা সুরথ শত মহিষ আর পাঠা বলি দিয়েও দেবী কৃপা না পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। শেষে দেবী স্বপ্নাদৃষ্ট হয়ে আদেশ দিলেন, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ আর মাৎসর্য বলি দেয়ার।

           বলছিলাম ত্রিপুরার রাজবাড়ির দুর্গাপুজার কথা। এই রাজবাড়ীর দুর্গা ঠাকুরের দুই হাত প্রসারিত। কার্ত্তিক ঠাকুরের মাথায় পাহাড়িদের সাদা গামছার পাগড়ি আজও দর্শনীয়। মিষ্টি মুখ ঠাকুরের। এই সবই রাজণ্য প্রথা মেনে। জানা যায় ত্রিপুরার মহারাণী সুলক্ষণা দেবী দেবীর দশ হস্ত আর মহিষাসুর মর্দিনীর রূপ দেখে ভয় পেয়ে মূর্ছা যান মহারাণী। এই অবস্থায় দেবী স্বপ্নে আদেশ দিলেন দুই বাহু দৃশ্যমান করতে। বাকি আট হস্ত ছোট আকারে অদৃশ্য রাখতে দেবীমূর্তির পেছনে।এখনও সেই রীতি মেনেই ঠাকুর গড়া হয় দুর্গাবাড়ির।
          ত্রিপুরার পুজা মানেই একটা মিশ্র সংস্কৃতির উৎসব। এখানে দেবী কখনও রাজনন্দিনী, কখনও লাল বেনারসীতে আবার কখনও রিয়া আর পাছড়া পরিহিতা। উপজাতি আর হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ ভীড় করেন দুর্গোৎসবে। মনে হয়না একবারও গত কয়েক দশক ধরে চলা বাঙালি আর উপজাতিদের মধ্যেকার কোন বৈরিতার কথা।
        সরকারি পরিসংখ্যান বলছে গত দুই দশকেই প্রায় হাজার দুয়েক মানুষ নিহত হয়েছে এই হানাহানিতে। এবারও পুজা হচ্ছে, কিন্তু কোথায় যেন একটা আশংকা, সন্দেহ। সামনেই নির্বাচন বলে হয়তো! কিন্তু রাজনৈতিক নেতারা ঠিক এই সময়টাকেই বেছে নিলেন তাদের প্রচারের জন্য। কেউ বলেন উনারা দিচ্ছে উগ্রপন্থীদের মদত, কেউ বলছেন তিনি নিজেই উগ্রপন্থী। হামলা, পাল্টা হামলা হতে পারে যেকোন সময়! মাথা পিছু নিরাপত্তারক্ষী রাজপথে।

                আমার আশেপাশে কিছু ছাগ শিশু এই মাঝরাত্তিরের স্বপ্নে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। আসলে এরা জানে তারা বলি প্রদত্ত। মানুষের কল্যাণে। তাই শেষবারের জন্য হয়তো জিবনভিক্ষা চাইছে মানুষের কাছে।মানুষের কল্যাণে পশু, ডিম, আদা সবই বলিপ্রদত্ত। এই সময়ে পৃথিবীকে বাঁচাতে গেলে দরকার পশু আর জীবের বেঁচে থাকা। কিন্তু রীতি এটাই। নিধন চাই উৎসবেও যুদ্ধেও।
       মানুষ কি করবে বিনিময়ে! কিছুই না উৎসব, শুধু উৎসব।
      কিছু কুমারী মেয়ে গত কদিন ধরে কৃচ্ছসাধন করে চলেছে। মহাষ্টমীতে তাদের পুজা হবে তাও মানুষেরই কল্যাণে! তৈরি হচ্ছে এই বালিকা হৃদয় কাল সারাদিনের জন্য উপোস থাকার। সবই উৎসব।আরও বিসর্জন চাই!! না এবার মানুষের ঘুরে দাঁড়ানো দরকার! একবার অন্তত বলি প্রদত্ত হতেই পারি আমরা সবাই ঐ পশু আর শিশুদের জন্য! ছাগ শিশু আর ঐ কুমারী দেবীরা আজ সারাদিন কাঁদছে, খিদেয়। উপোষ না করলে বলি প্রদত্ত হওয়া যায়না যে!

শনিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১২

কলাবউ



জ ষষ্ঠী।
স্নান শেষে মণ্ডপে ফিরেছে কলাবউ। এবার শুরু হবে পুজা। ঘিয়ের প্রদীপ, ধূপ ধুনোর গন্ধে আজ মাতোয়ারা এই পট্টি। কাশর বাদ্যির শব্দে খুনসুটি আর অশ্লীল  গালাগাল আজ অনেকটাই কানে আসে না।
সবাই আজও সেজেছে। অন্ধকারের থেকে কালী নিয়ে চোখে পড়েছে কাজল।
কলাবউ স্নান শেষে লাল পাড়ের আটপৌরে শাড়ীটায় জড়িয়ে নিল নিজেকে কোনমতে। হাটের রদ্দি মাল। কলাবউয়ের শরীরে বেড় পায়না। শায়া নেই, শেমিজ নেই, ব্লাউজ নেই।

কাল সপ্তমী।
আজ এই পট্টিতেও কাপড়ের অভাব নেই। ক্ষণে ক্ষণে লাইন ধরিয়ে দিনভর চলছে বস্ত্র বিতরণের পালা। সৌজন্যে লাল বাবু, সবুজ বাবু, তার বাবু, পাড়ার বাবু, কর্পোরেশনের বাবু, সব বাবুর ফিনফিনে আদ্দির সাদা পাজামা পাঞ্জাবী আজ পতপত করে উড়ছে। ফ্ল্যাশের ঝলকানি, ক্যামেরা, ক্লিক।
ক্যামেরার চোখও মেয়েমানুষের শরীর দেখলে তিড়িং করে বেড়িয়ে যায়। স্পীড কন্ট্রোল হয়না। আর যা হবার তাই হয়। ছবি সব ঘোলাটে, আর নাহয় ঝাপসা।

কলাবউয়ের পুজো শুরু হয়েছে।
এই পট্টির পুজোয় ভিড়ও হয়। মানুষেরা ঠাকুর দেখতে আসেনা। শরীর দেখতে আসে।
এই পাড়া দেখে ঠাকুর। কলাবউয়ের অস্বস্তি আরও বাড়ে। রাত আরও বাড়ছে।
লাল পট্টির মানুষেরা সব যে যার ঘরে। যে বাবু বস্ত্র বিতরণ করছিল এতক্ষণ এখন সে নাঙ্গা। ইস।

কাল সপ্তমী সকাল।
নবমীনিশিতে কে বলি হবে কে জানে! ভালো করে শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে নেয় কলাবউ। নীলকণ্ঠের লতাতেই জড়িয়ে নিল নিটোল সবুজ শরীর তার। লাল সিঁদুরে অন্তর্জলী যাত্রা আজ সাঙ্গ হলো।

আজ ষষ্টি।
আসছে বছর এই পট্টির কলাবউয়ের কাপড় হবে কমপক্ষে দশহাতি। শরীর দেখা যাবে না কোন বউয়ের। এটাই পুজোর থিম হোক না আসছে বছর!

আর্টিকেলটা এখুনি পাঠাতে হবে প্রেসে। নাহলে খাবে না ঠিকঠাক।

শুভষষ্ঠী বন্ধুরা।