“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
সুদীপ নাথ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সুদীপ নাথ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

আগরতলার বন্যা ও ভবিষ্যৎ

(দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত)
।। সুদীপ নাথ।।

মাদের দেশের অনেক সংস্থার মত, বিদেশের একটি অগ্রণী দাতব্য সংস্থা হচ্ছে, খ্রিশ্চিয়ান এইড মিশন এই সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত, তাদের নেটওয়ার্ক নিউজের, এক প্রতিবেদনে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে,  মাত্র ৫০ বছরের মধ্যেই কোলকাতা, মুম্বাই ও ঢাকা শহরত্রয় সহ, অনেক শহরই জলের নিচে চলে যেতে পারে। এক কথায়, ২০৬০ সাল নাগাদ ঢাকাকলকাতামুম্বাইসহ এশিয়া-আমেরিকার বেশ কয়েকটি শহর বন্যার তলিয়ে যেতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে গিয়ে অনেক দেশের উপকূলীয় এলাকাগুলোও ডুবে যাবে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের পরই এই ঝুঁকিতে রয়েছে, চীনের গুয়াংজু ও সাংহাই প্রদেশ। ভিয়েতনামের হো-চি-মিন সিটিথাইল্যান্ডের ব্যাংকক ও মায়ানমারের ইয়াংগুনেরও একই পরিস্থিতি হতে পারে। খ্রিশ্চিয়ান এইডের এই ভবিষ্যৎ বাণী সত্যি হলে, অন্তত একশ কোটি মানুষ যে বিপদের সম্মুখীন হবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

এই দাতব্য সংস্থাটি জানাচ্ছে, সামনে ভয়াবহ এক দুর্যোগ অপেক্ষা করছে সকলের জন্যে যেসব দেশে দারিদ্রের হার বেশি সেইসব দেশে ক্ষতির পরিমাণও বেশি হবে বলেই ধারণা করছে খ্রিশ্চিয়ান এইড সংস্থাটি সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঝুঁকিমুক্ত নয় ধনী রাষ্ট্রগুলোও। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ লাখ মানুষের শহর মিয়ামিইউরোপের আমস্টারডাম, আমস্টারডামের মতো শহরও তলিয়ে যেতে পারে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়তে হবে ইতালির ভেনিসযুক্তরাজ্যের লন্ডন শহরকে এমনিতেই বৃষ্টিবহুল লন্ডনের ড্রেনেজ ব্যবস্থা সেকেলে, তার ওপর টেমস নদীর জোয়ার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উচ্চতার জোয়ারে পরিণত হয়ে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশিত করা হয়েছে প্রতিবেদনে

তবে পূর্ব সতর্কতার মাধ্যমে এই বিপুল আর্থিক-মানবিক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে করে খ্রিশ্চিয়ান এইড। এক্ষেত্রে দুর্যোগ মোকাবেলায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ারও সুপারিশ করেছে এই দাতব্য সংস্থাটি। এজন্য সংস্থাটির পক্ষে থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ১০০ কোটি ডলারের একটি তহবিল গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সর্বোচ্চ গুরুত্ব এবং সর্বাধিক আন্তরিকতা দিয়ে সম্প্রতি সাক্ষরিত জলবায়ু পরিবর্তন রোধের ‘প্যারিস চুক্তি’ বাস্তবায়িত করা হবে বলেও আশা প্রকাশ করা হয়েছে।

  গত এক বছর ধরে দুনিয়াব্যাপী বেশ কয়েকটি দেশে আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটেছে। যার কারণে ওই সমস্ত দেশগুলো অপরিসীম ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। যার মধ্যে ভারত ছাড়া রয়েছে, অস্ট্রেলিয়াআমেরিকাচিনপাকিস্তান প্রভৃতি দেশ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো ভারত বাংলাদেশ ছাড়া এসব দেশ বন্যা প্রবণ নয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে তারা অনেক উন্নত। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এসব স্বত্বেও, বন্যার মতো দুর্যোগ মোকাবেলা করতে তারা সক্ষম হয়নি বরং ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতির শিকার হয়েছে। তাহলে দুইটি বিষয় এখানে লক্ষণীয়আর তা হলো বন্যা প্রবণ নয় এমন দেশেও বন্যা হচ্ছে এবং তারা এটা মোকাবেলা করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।

 গঙ্গাযমুনাসিন্ধু ভারতবর্ষের প্রধান নদী গুলোর মধ্যে অন্যতম । হাজার বছর ধরে এই নদীগুলোর অববাহিকায় গড়ে উঠেছে ভারতীয় সভ্যতা। নদীগুলোর জোয়ার ভাটার সঙ্গে আবর্তিত হয়েছে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবন এর উপরেই নির্ভরশীল ছিল হাজার হাজার মানুষের জীবন জীবিকা। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে এই সব নদীর দুই কূল ছাপিয়ে যেমন বন্যা এসেছে, তেমনি চলেও গেছে প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে। বন্যায় ফসলের জমি পলি মাটিতে উর্বর হয়েছেকৃষকের গোলা ফসলে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সে সময় বন্যা ছিল কৃষকের কাছে আশীর্বাদ।

কিন্তু সময়ের আবর্তে বন্যা হয়ে উঠেছে নিম্নাঞ্চলের নদী অববাহিকা অঞ্চলের ও শহরের মানুষের কাছে অভিশাপ। নিয়মিত বন্যার পরিবর্তে তারা ইতিমধ্যেই মুখোমুখি হচ্ছে এক অস্বাভাবিক আকস্মিক বন্যারযার মূল কারণ ওয়াটার লগিং এই বন্যা সম্পূর্ণভাবে মনুষ্য সৃষ্ট। উন্নয়নের নামে প্রাকৃতিক নিয়মের ওপর মানুষের ক্রমাগত দায়িত্বহীন হস্তক্ষেপের কারণে, এই মহাদুর্যোগের সূচনা। প্রকৃতির ক্ষয় ক্ষতির বিষয়টি চিন্তা না করে, বা জলের গতি স্বাভাবিক রাখার উপযুক্ত ব্যবস্থা না করেই, ঢালাও হারে উন্নয়নের নামে তাণ্ডব চালানো হয়েছে। একটি ক্লাস সিক্সের ছাত্রও জানে জলের সমোচ্চশীলতা বলতে কী বোঝায়।

সম্প্রতি ভারতের উড়িষ্যা এবং পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশ ভয়াবহ বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। মৌসুমি বায়ুর কারণে, কয়েকদিন ধরে ভারি বর্ষণে এই বন্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে। বর্ষা মৌসুমের প্রায় শেষের দিকে এই ধরনের বন্যা একেবারেই আকস্মিক কোনো রকম পূর্বাভাসের আগেই এই বন্যায় বিপর্যস্ত হয়েছে দুই নদীর অববাহিকায় বসবাসরত লক্ষ লক্ষ মানুষ।

বন্যার কারণ হিসেবে জানা গেছে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দুই দেশের আকাশে ভারি মেঘমালার সৃষ্টি হয়। এটা একটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনাসাধারণত ভারি মেঘমালা এ সময় সৃষ্টি হয়নাএটা মৌসুমি বায়ু প্রবাহের খেয়ালী আচরণ বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে আবহাওয়ার পরিবর্তন এর জন্য দায়ী বলে তারা জানিয়েছেন। তারা আরো জানিয়েছেনতীব্র বৃষ্টি হলেও বন্যার সম্ভাবনা কম থাকে যদি জল নিষ্কাশনের যথেষ্ট ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে নদীর জল প্রবাহে বাধা সৃষ্টির কারণে জল আটকে বন্যার মতো বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটছে

এদিকে ১৯৭৮ বন্যায় কোলকাতা এবং ১৯৭৭ ও ১৯৭৮ সালের বন্যায় দিল্লি শহর ডুবে গিয়েছিল বন্যায়। জাতীয় বন্যা কমিশন তথা National Flood Commission-এর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯৭০ সাল থেকেই বন্যার প্রবণতা বাড়ছে দেশব্যাপী।

পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছেতাই আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটছে। পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন দেশের ঋতু বৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ। অতিবৃষ্টিঅনাবৃষ্টিতীব্র খরাবন্যা ও ঘূর্ণিঝড় এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাধারণ ঘটনা। আপাত দৃষ্টিতে এটা প্রাকৃতিক ঘটনা বলে মনে হলেও, আসলে এর পেছনে রয়েছে মানুষ্য সৃষ্ট কারণ। এখন প্রত্যেক সচেতন মানুষ মাত্রই জানেন জলবায়ুর পরিবর্তনের জন্য মানুষই দায়ী। অতি মুনাফার লোভে মানুষ প্রতিনিয়তই প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি সাধন করছে। শিল্প কল কারখানার ধোয়াবৃক্ষ নিধনসহ আরো অসংখ্য কারণে বায়ুমণ্ডলে কার্বন গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে। যার ফলে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একারণে পৃথিবীব্যাপী ঋতু বৈচিত্র্যের পরিবর্তন হচ্ছে এবং তাদের স্থানীয় প্রাকৃতিক পরিবেশে এমন সব ঘটনা ঘটছে যা প্রত্যাশিত নয়।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে পরিবেশের ক্ষয় ক্ষতির বিচার বিবেচনা না করেই অপরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন তৎপরতা চালানো। যেমন খাল বিল পুকুর জলাশয় ভরাট করে আবাসন প্রকল্পশিল্প কল কারখানাফসলী জমি তৈরি করা বা বিভিন্নভাবে ব্যাবহার করা হচ্ছে। নদীতে বাধ দিয়ে জল প্রবাহের স্বাভাবিক গতিকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা ঘাট ব্রিজ কালভার্ট নির্মাণ করার ফলে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। যার কারণে বৃষ্টি হলে অতিরিক্ত জল স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অপসারিত হতে পারে না। ফলে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা এবং বন্যা।

মানুষজনের মধ্যেও এ সম্পর্কিত জ্ঞানের কোন বিকাশ ঘটেনি। গত বছর সৌদি আরবে অতি বৃষ্টির কারণে বন্যার সৃষ্টি হয়। কারণে খুঁজতে গেলে দেখা যায় অতিরিক্ত জল বের হয়ে যাওয়ার জন্য তারা কোন ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলেনি। তাহলে দেখা যাচ্ছে বন্যার কারণগুলো সবই মানুষের সৃষ্ট কারণ।
কিন্তু পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। খাল বিল পুকুর ডোবা নালা এমনকি নদী পর্যন্ত ভরাট করে নগরায়ণ ঘটানো হচ্ছে । গড়ে তোলা হচ্ছে রাস্তা বাধ ব্রিজ কালভার্ট। অপরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য জলের স্বাভাবিক গতিপথ বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। যার ফলে বৃষ্টির জল আটকে সৃষ্টি হচ্ছে মারাত্মক বন্যার। এখন বন্যা হলে জলের অপসারণ একটি সমস্যা হয়ে দেখা দেয়।

এবার আসা যাক, আগরতলা শহরের কথায়। আগরতলা শহরের কেন্দ্রস্থলটা ঠিক একটা গামলার মতো। তবে কেউ যদি মনে করেন, এটাই আগরতলা শহরের সমগ্র অঞ্চল, তাহলে তা হবে হঠকারিতা। এটা সাবেক আগরতলা শহর। ইতিমধ্যেই এই শহর অনেক বিস্তৃত হয়েছে উত্তর থেকে দক্ষিণে ও পুব দিকে। বলদাখাল সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকাও এখন শহরের মধ্যেই পড়ে। অথচ সাম্প্রতিক দুই দফা বন্যার সময়ে ফেইসবুকের দেয়ালে দেয়ালে ঐ গামলাটাকেই আগরতলা শহর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন শহরের ইঞ্জিনিয়ার সহ বুদ্ধিজীবীরা সকলেই।

যাইহোক, সব মিলিয়ে, উপরে উল্লেখিত পরিস্থিতিটা কিন্তু এখানেও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এর পেছনের কারণগুলো বিচার বিশ্লেষণ করলে যে মোদ্দা কথাটা বেড়িয়ে আসে, তা হচ্ছে, প্রকৃতির উপর অযাচিত হস্তক্ষেপ। মূল কারণ কিন্তু শুধু মাত্র আগরতলা নামক সাবেক বা সাম্প্রতিক শহরেই সীমাবদ্ধ নয়। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুই দুইটি মারাত্মক বন্যা আর নিত্যনৈমিত্তিক বন্যার মধ্যেও কোনো মৌলিক তফাৎ নেই। ড্রেন পরিষ্কার রেখে বা পুকুর সংরক্ষণ করেও, এর থেকে পরিত্রাণের পথ সুদূরপরাহত।

সুদীর্ঘ কাল আমরা অযাচিত ভাবে হাওড়া নদীর উৎস থেকে শুরু করে শহরের পার্শ্ববর্তী সমগ্র অঞ্চলকেই নির্মমভাবে আঘাত করে চলেছি। এসব সবাই বুঝেও বুঝি না। এই বিষয়ের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হলো ভূমি ক্ষয়ের উপযুক্ত পরিস্থিতি তৈরি করা। হাওড়া নদীর সমস্ত ছোট বড় ছড়া তথা স্রোতস্বিনীগুলোর পাড়ে পাড়ে নিদারুণ ভূমিক্ষয়ের ফলে, বয়ে আসা মাটি জলে মিশে কোথায় যায় ত্রিপুরায় রাবার চাষ এই ধরণের একটি উৎপাত। হাওড়া নদীর জলের রঙ স্বচ্ছ নয় কেনো ? এসব কথা একটা বাচ্চাও বোঝে, কিন্তু বোঝে না ইঞ্জিনিয়াররা, আর পলিসি মেকার নেতারা আর আমলারা। এখন সবাই ঐ ছোট্ট গামলা সুরক্ষিত রাখতে উঠেপড়ে লেগেছেন। এসব হচ্ছে উদ্ভট আর লোক দেখানো কাজ। জলের সমোচ্চশীলতা ধর্মের জন্যই এই গামলা কোনোদিনই বন্যা এবং শহরের লাগোয়া পশ্চিমে অবস্থিত বাংলাদেশের আখাউড়া অঞ্চলের বিস্তৃত ওয়াটার লগিং (Waterlogging) থেকে মুক্তি পাবে না। একথা হলফ করেই বলা যায়।

কদিন আগেই এক মন্ত্রী স্বীকার করেছেন, এই গামলায় নাকি বাংলাদেশের জল বিপরীতমুখী হয়ে ঢুকেছে। এটা জলের সমোচ্চশীলতা ধর্মের জন্যেই হবে। এবং এই সূত্র থেকেই বলা যায়, আগরতলার বন্যা শুধু আগরতলা বা ত্রিপুরা বা ভারতের একার সমস্যা নয়, এটা একটা আন্তর্জাতিক একটা সমস্যা। আরো বলা যায়, আগরতলার এই গামলাটা একদিন না একদিন হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর মতই পরিত্যক্ত শহর হিসেবে চিহ্নিত হবে। এই গামলার ভিতরের বড়লোকেরা টিলা অঞ্চলে তাদের বাসস্থানের বিকেন্দ্রীভবন ঘটাতে বাধ্য হবে। তাদের সাথে গরীবরাও রোজগারের স্বার্থে, নূতন এলাকায় বসতি স্থাপন করবে। এমতাবস্থায়, নিয়তির হাতে  আত্মসমর্পণ করে নিশ্চল বসে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না।


তামিলনাড়ুর কাড্ডাপা জেলার পুরুমামিল্লার সন্নিকটে প্রাপ্ত, ১৩৬৯ সালে উৎকীর্ণ শিলালিপিতে কিছু নির্দেশিকার মধ্যে লেখা রয়েছে, “দেশে জল বিদ্যায় অভিজ্ঞ ব্যক্তি থাকা দরকার। কিন্তু আমাদের রাজ্যে এমন মানুষ আছে কিনা জানা নেই।
(সূত্র: ইন্টারনেটের বিভিন্ন সাইট ও কিছু পুস্তক)


রবিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

তালাক-ই-বিদ্দত কেন নিষিদ্ধ


( ৩ সেপ্টেম্বর, দৈনিক সংবাদে , ১৩ পৃষ্ঠাতে প্রকাশিত )



।। সুদীপ নাথ ।।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪১ ও ১৪২ অনুযায়ী ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ভারতের মুসলিম সমাজের প্রচলিত তালাক-ই-বাদাত অসাংবিধানিক বলে রায় ঘোষণা করেছে। সুদীর্ঘ রায়ের অপারেটিভ পোর্শন তথা কার্যকর অংশটি হচ্ছে: In view of the different opinions recorded, by the majority of 3-2 the practice of ‘talaq-e-biddat’ –triple talaq is set aside.

মহামান্য সর্বোচ্চ আদালত যে রায়  ঘোষণা করেছে তাতে মুসলিম সমাজে প্রচলিত অন্য ধরণের তালাকের পদ্ধতিগুলো নিয়েও আলোচনা করেছে। যেমন talaq-e-ahsan এবং talaq-e-hasan/talaq-e-ehasan ইত্যাদি। এমতাবস্থায় এটাতে বিভ্রান্তির অবকাশ মোটেই নেই যেঐ সমাজে কয়েক ধরণের তালাকই প্রচলিত।
ভারতের সর্বোচ্চ আদালত ২২-৮-২০১৭ তারিখে ঐ রায়ে মুসলমানদের এই তিন তালাক প্রথাকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছে। পর পর তিনবার তালাক উচ্চারণ করে অথবা চিঠি লিখেসামাজিক মাধ্যম বা ফোনে তিনবার তালাক উচ্চারণ করে যে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেওয়া হয়তার বিরুদ্ধে ৫জন মুসলিম নারী সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদন করেছিলেন। তারই প্রেক্ষিতে ৫ সদস্যক  এক সাংবিধানিক বেঞ্চের ২ জন বিপক্ষে ও ৩ জন পক্ষে এই রায় দিয়েছে। এই রায় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে ভারতের মুসলমান প্রধান এলাকাগুলোতেও।
কিন্তু বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মত মুসলমান-প্রধান দেশ সহ বিভিন্ন দেশে এই তিন তালাক নিষিদ্ধ হয়েছে দীর্ঘদিন আগেই। পাকিস্তান সৃষ্টির লগ্ন থেকেই নারী আন্দোলন কর্মীরা তিন তালাক বন্ধের জন্য চাপ দিচ্ছিল। পাকিস্তানে তখন আইয়ুব খান ছিলেন ক্ষমতার শীর্ষে। নারী অধিকার কর্মীরা তখন হুমকি দিয়েছিলএই তিন তালাক তথা তালাক-ই-বাদাত বিষয়ে মুসলিম পারিবারিক আইনে যদি পরিবর্তন না আনা হয়তাহলে তারা আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলবেন। ফলে ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইনে সংস্কার সাধন করতে একরকম বাধয় হয়েছিল আইয়ুব খান সরকার। তখন বলা হয়েছিলমুখে-মুখে তিন তালাকের কোন আইনগত বৈধতা থাকবে না। আইয়ুব খান সরকার তালাকের ক্ষেত্রে যে সংস্কার এনেছিল সেটি এখনো বাংলাদেশে চালু আছে। বাংলাদেশে আদালতের মাধ্যমে এবং পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতেও বিবাহ বিচ্ছেদ এখন সম্ভব।
এবার ঐসব বিভিন্ন ধরণের তালাকগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। বিভিন্ন দেশে, পদ্ধতিগত দিক দিয়ে, পুরুষ কর্তৃক দেয় তালাক মুখ্যত তিন প্রকার:-
ক) তালাক-ই-আহসান বা সর্বোত্তম তালাক
খ) তাকাল-ই-হাসান বা উত্তম তালাক
গ) তালাক-ই-বিদ্দাত বা শরিয়া বিরুদ্ধ তালাক

আবার ক্ষমতা বা এখতিয়ার গত দিক দিয়ে তালাক পাঁচ প্রকার:- তালাক-ই-সুন্নাততালাক-ই-বাদীতালাক-ই-তাফবীজতালাক-ই-মোবারত এবং খোলা তালাক। কার্যকর হওয়ার দিক দিয়ে তালাক প্রধানত দুই প্রকার:- তালাকে রেজী ও তালাকে বাইন। এই তালাক-ই-বাইন আবার দুই প্রকার:- বাইন-ই-সগির ও বাইন-ই-কবির। মর্যাদা ও অবস্থানের দিক থেকেও তালাক চার প্রকার হয়যেমন হারামমাকরুহমুস্তাহাব ও ওয়াজিব।

এবার বিভিন্ন রকমের তালাক পদ্ধতি নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। তালাক-ই-হাসান তাকে বলেযে তুহুরে অর্থাৎ মাসিক রজঃস্রাবের মধ্যবর্তী সময়ে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে সহবাসজায়েজ অবস্থা কিংবা গর্ভাবস্থা নেই। উল্লেখিত অবস্থা সমূহ নেই এমন তুহুর অবস্থায়শুধু মাত্র এক তালাক দিয়ে ইদ্দত পূর্ণ হতে দেওয়া। অর্থাৎ তিন তুহুর অতিক্রম করলে তালাকটি কার্যকর হয়ে যায়। এমতাবস্থায় স্ত্রী ইচ্ছা করলে অন্য যে কোন পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে কিংবা তালাক প্রাপ্তা স্ত্রী ইচ্ছা করলে এবং স্বামী চাইলে তারা পুনঃ বিবাহে আবদ্ধ হতে পারে। এই ধরনের তালককে বলা হয় তালাকে আহসান।
হাসান তালাক হলো প্রত্যেক তুহুরে একটি করে তালাক দেয়ার পদ্ধতি তথা নিয়ম। এই নিয়মে তিন তুহুরে তিন তালাক দেওয়ার নিয়ম কে তালাক-ই-হাসান বলে। এই তালাক-ই-হাসান দিলে অর্থাৎ তিন তুহুরে তিন তালাক দিলেসেই স্ত্রী তার স্বামীর জন্য চিরতরে হারাম হয়ে যাবে। সে তার স্বামীর নিকট রেজাত বা পুনঃ বিবাহে আসতে পারবেনা। তবে স্ত্রীর যদি অন্য কোন পুরুষের সাথে বিবাহ হয় এবং দ্বিতীয় স্বামী যদি কোনো দৈবাৎ কারণে তালাক দেয় কিংবা মৃত্যু বরণ করেতবে ইচ্ছা করলে আগের স্বামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে।

তালাক-ই-বিদ্দাত হলোকোনো ব্যক্তি কর্তৃকএকসাথে তিন তালাক দিয়ে দেওয়া বা জায়েজ অবস্থায় তিন তালাক দেওয়া অথবা যে তুহুরে সহবাস করেছে সেই তুহুরে তিন তালাক দেওয়া। উল্লেখিত যে কোন প্রকারে তালাক দেওয়া হউক না কেন তালাক দাতা গুনাহগার হবে গর্ভাবস্থা প্রকাশ পায়নি এমন সন্দেহ জনক অবস্থায় তিন তালাক প্রদান করাও বিদায়াত বা হারাম। এই তালাক-ই-বিদ্দাত সম্পূর্ণ শরিয়া বিরুদ্ধ তালাক পদ্ধতিযা মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট আমাদের সংবিধান সম্মত নয় বলে নিশ্চিত করেছে উল্লেখিত আইনে।  বর্তমান সময়ে অধিকাংশ তালাক অনুষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত মুসলিম পারিবারিক আইন অথবা শরীয়ত প্রবর্তিত পদ্ধতির কোনটাই ভারতে ঠিকমতো অনুসরণ করা হচ্ছিলো না। বাংলাদেশেস্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে চেয়ারম্যানমেম্বার বা কোন গণ্য মান্য ব্যক্তি তালাকের নোটিশ স্বাক্ষর করলেইএই তালাক হয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়া হয়। তারা তালাকের ঘোষণা দেন নাআবার কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যায় তালাকের নোটিশে লিখা হয় এক তালাকদুই তালাকতিন তালাক ও বাইন তালাক। এমন ধরনের তালাক , তালাক-ই-বিদ্দাতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং যারা এধরনের তালাক অনুষ্ঠিত করিয়া থাকেন তারা সবাই গুনাহগার হয় বাংলাদেশে।
ইসলাম ধর্মানুসারে তালাকের পর তালাক প্রাপ্তা মহিলাকে ইদ্দত পালন করতে হয়। ঐ সময়ে কোনো মুসলিম নারীর পক্ষে পুনর্বিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। স্বামীর মৃত্যুতেও বিধবাদের ইদ্দত পালন করতে হয়। ইদ্দতের নিয়মানুসারে তালাক বা বিধবা হবার পর নব্বই দিন অথবা তিনিটি চান্দ্র মাস মহিলাদের অপেক্ষা করতে হয় পুনর্বিবাহের জন্যে। এমতাবস্থায়তালাকের পরে ইচ্ছে করলেই ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়া স্বামী ও স্ত্রী পুনর্বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না। এই শর্তটি হচ্ছে শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী ওই স্ত্রীকে অন্য কোনো পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে এবং নূতন স্বামীর মৃত্যু বা নূতন স্বামী কর্তৃক আবার তালাক প্রাপ্তা হতে হবে। তবেইপুরোনো স্বামীর সঙ্গে পুনর্বিবাহ সম্ভব। এই শর্তটি খুবই কঠিনকারণ বাস্তবে এমন পরিস্থিতি সচরাচর ঘটে না। এক কথায় বলা যায়কথায় কথায় ঘর ভাঙ্গা আর গড়া একপ্রকার অসম্ভব।
প্রাচীন সমাজে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তালাক হয়ে গেলে তারা আবার বিয়ে করতে চাইলে মধ্যবর্তীসময়ে স্ত্রীকে আরেকটি বিয়ে করতে হত। এই দ্বিতীয় বিয়ের ব্যক্তি তথা নতুন স্বামীস্ত্রীকে তালাক দিলে বা মারা গেলে তবেই স্ত্রী পুনরায় প্রথম স্বামীকে বিয়ে করতে পারত। এই মধ্যবর্তীকালীন বিয়েকে ‘হিল্লা’ বিয়ে বলে। তবে বর্তমানে হিল্লা বিয়েকেও কোথাও কোথাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
         এবার বাংলাদেশের পরিস্থিতিটা একটু দেখে নেয়া যাক। বাংলাদেশে মুসলিম বৈবাহিক আইনে 'তালাক-ই-আহসানএবং 'তালাক-ই-ইহসানবলে দুটো পদ্ধতি আছে। সে দুটো মিলিয়ে 'তালাক-ই-তৌফিজপদ্ধতি সবার জন্য বৈধ করে দেয়া হয়েছে। এই পদ্ধতি অনুসারে স্বামী বা স্ত্রী যে কেউ তাদের বিবাহ বিচ্ছেদের ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু তিন মাসের মধ্যে তারা যদি মত পরিবর্তন করে ফেলেন তাহলে সেই তালাক কার্যকরী হবে না। তিন মাসের মধ্যে যদি তারা মত না বদলান , তাহলে তিনমাস পরে সেই তালাক কার্যকরী হবে। কেউ যদি বিচ্ছেদের ইচ্ছা পোষণ করেন তাহলে সেটি একটি সালিশি বোর্ডের কাছে চলে যাবে। এ সালিশি বোর্ড তিন সদস্য বিশিষ্ট হয়। সেখানে একজন জনপ্রতিনিধি এবং স্ত্রী ও স্বামীর পক্ষ থেকে একজন করে প্রতিনিধি থাকে।
বাংলাদেশে যারা তালাকের জন্য ইচ্ছা পোষণ করেনতারা যদি মনে করেন , তাহলে সালিশের মাধ্যমে একটি সমাধান নিতে পারেন। যদি সেটা না হয়তাহলে তিনমাস পরে সেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যাবে। বাংলাদেশে কেউ যদি তিন তালাকের বিরুদ্ধে আইনগত সুরক্ষা চায়তাহলে তাকে সেটি দেয়া হয়। কারণ তিন তালাক উচ্চারণের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ বাংলাদেশে বৈধ নয়। কিন্তু 'তিন তালাকউচ্চারণের মাধ্যমে কেউ বিবাহ বিচ্ছেদ করতে চাইলে তাকে শাস্তি দেবার বিধান নেই। তবে সে তালাক আইনগত-ভাবে কার্যকরী হবে না। তখন স্ত্রীকে তার মর্যাদা দিতে হবে এবং তাকে ভরণ-পোষণ দিতে হবে।
পাকিস্তানের ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশে হিল্লা বিয়েকে বাংলাদেশেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১৯৬১ সালের আইনে তালাকের পর স্বামী-স্ত্রী পুনরায় বিয়ে করতে চাইলে হিল্লা বিয়ের দরকার হয় না। তবে পর পর ৩ বার তালাক হলে তৃতীয় বারের পর স্বামী ১ম স্ত্রীকে পুনরায় বিয়ে করতে চাইলে স্ত্রীকে আরেকটি বিয়ে দিয়েতারপর সেই বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটিয়েপ্রথম স্বামী স্ত্রীকে আবার বিয়ে করতে পারতেন।বাংলাদেশে  বিবাহ-বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব হলো১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুসারেযে নোটিশ তাকে দেয়া হয় তা পাবার ৩০ দিনের মধ্যে উভয় পক্ষকে ডেকে সালিশের ব্যবস্থা  করা । সালিশে পুনর্মিলনের একটি সম্ভাবনা থাকে বলে এখানে চেয়ারম্যান ও সালিশি পরিষদের ভূমিকা অপরিসীম।
বাংলাদেশে তালাকের ক্ষেত্রে স্বামীর অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ ও স্ত্রী কর্তৃক শর্ত সাপেক্ষে তালাকের অধিকার প্রদানসহ মুসলিম পরিবারের পারিবারিক সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৩৯ সালে মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন এবং ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ আইন জারি করা হয়। স্বামী-স্ত্রীর অধিকার ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে এই আইনকে পরিমার্জন ও গ্রহণযোগ্য করা হয়।
এদিকে ভারতে মুসলিম মহিলারা তিন ভাবে বিয়ে ভেঙ্গে দেয়ার সুযোগ পায় বর্তমানে। এই তিনটে পদ্ধতি হচ্ছে;-
১) তালাক-ই-তাফয়েজ
২) লিয়ান
৩) মুসলিম বিবাহ আইন ১০৩৯ অনুযায়ী

তবে এই বিধিগুলো পুরুষদের মত তত বেশি স্বাধীনতা দেয়নি মহিলাদের। পুরুষেরা কোনো কারণ না দেখিয়েই তালাক পদ্ধতিতে বিয়ে ভেঙ্গে দিতে পারে এখনো। মুসলিম পার্সোনাল ল অনুযায়ী মুসলিম মেয়েরা ডিভোর্স দিতে পারেন না। তবে মুসলিম উইমেন প্রোটেকশন অন রাইটস অফ ডিভোর্স ১৯৮৬ অনুযায়ীস্ত্রীধন সম্পত্তি ফেরত পাবেন। ডিভোর্সের পর স্বামীর সম্পত্তিতে অবশ্য তাঁদের অধিকার মাত্র তিন মাস পর্যন্ত (ইদ্দত পিরিয়ড)। তখন স্বামীর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তিতে মহিলাদের কোনও অধিকার নেই। তবে পরিত্যক্ত মহিলারা ওয়াকফ বোর্ডে আর্জি জানাতে পারেন আর্থিক সাহায্যের জন্য। বোর্ড খোরপোষের ব্যবস্থা করতে পারে। মুসলিম মেয়েরাও ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৫ নম্বর ধারায় স্বামীর কাছে খোরপোষ দাবি করতে পারেন।  মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন অনুযায়ী কখনও কখনও স্বামী-স্ত্রী আলোচনা করে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে পারেন। ইসলাম ধর্মে এই পদ্ধতি হল ‘খুল্লা এতে বিচ্ছেদ করতে গেলে স্ত্রী বিয়ের সময় যা যা যৌতুক হিসেবে পেয়েছিলেনতার সবটা না-হলেও আংশিক ফেরত দিতে হয়। এই ফেরত দেওয়াকে বলা হয় ‘মুবরাত
বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে মুসলিম বিবাহ তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন প্রণীত হয়। মুসলিম স্বামী-স্ত্রীর বৈধ সত্ত্ব-স্বার্থ নির্ধারণ করে, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন আইন একত্রীকরণ ও সংশোধন করে এটি প্রণয়ন করা হয়। এরপর বিবাহ-তালাক বিধিমালা রেজিস্ট্রেশন ১৯৭৫ সালে জারি করা হয়। বিবাহ- বিচ্ছেদদাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধারদেনমোহরভরণপোষণঅভিভাবকত্ব ইত্যাদি পারিবারিক বিষয়াদির দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫ প্রণীত হয়। বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইনে তালাক সম্পর্কে বলা হয়েছেবিয়ে একটি চুক্তিতাই এ চুক্তি নানা কারণে সমাপ্ত করা যায়। মুসলিম পারিবারিক আইনে বিয়ের চুক্তি ভেঙ্গে বিয়ে-বিচ্ছেদ ঘটানো সম্ভব।
তবে বাংলাদেশে একজন স্ত্রী যখন ইচ্ছা তখন স্বামীকে তালাক দিতে পারেন না। কিন্তু মুসলিম আইনেস্বামীকে তালাক দেয়ার ক্ষেত্রে স্ত্রী সীমিত অধিকার ভোগ করেন। যে সকল উপায়ে একজন স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিতে পারেনসেগুলো হচ্ছেস্ত্রী আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন। স্ত্রী তালাক-ই-তৌফিজ-এর মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন। তারা খুলার মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন এবং স্বামী-স্ত্রী দুজনই মুবারতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন।
বাংলাদেশে একজন মুসলিম পূর্ণ বয়স্ক সুস্থ মস্তিষ্কের পুরুষযে কোন সময় স্ত্রীকে তালাক দিতে পারেন। কিন্তু সে মুখে বা লিখে যেভাবে তালাক দিক না কেনোসেই তালাক সাথে সাথে কার্যকর হবে না। ঐ দেশে বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাকের ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান উভয় পক্ষকে ডেকে সালিশের ব্যবস্থা করতে পারেন।
এক্ষেত্রে কাজীও অনেক দায়িত্ব পালন করতে পারেন। কাজীর দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছেজন্ম ও বিবাহের মতোতালাকও রেজিস্ট্রি করা। নিকাহ নিবন্ধক কাজী তার এখতিয়ারভূক্ত এলাকার মধ্যে আবেদনপত্রের ভিত্তিতে তালাক রেজিস্ট্রি করেন। তালাক রেজিস্ট্রির জন্য নিকাহ নিবন্ধক নির্দিষ্ট ফি নিতে পারেন যা সময়ে সময়ে সরকার দ্বারা পরিবর্তন করা হয়। যে ব্যক্তি তালাক কার্যকর করবেসে-ই রেজিস্ট্রির জন্য আবেদন করবে এবং ফি দেবে। এটা তালাক দাতার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। দুই পক্ষের মধ্যে সত্যি সত্যিই তালাক কার্যকর হয়েছিল কিনাতা নিকাহ নিবন্ধক পরীক্ষা করে দেখেন।
বাংলাদেশের ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী কাজীর মাধ্যমে তালাক দিতে হয় এবং তালাকের নোটিশ স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে অথবা স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনকে পাঠাতে হয়।. মুখে মুখে তালাক দিলে তালাক কার্যকর হয় না। স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে নোটিশ প্রদান ছাড়া তালাক দিলে তালাক কার্যকর হবেতবে নোটিশ প্রদান না করায় স্বামীর ১ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হবে। এ এক অদ্ভুত আইন বাংলাদেশে।
বাংলাদেশে গর্ভাবস্থায় তালাক দিলে তালাক কার্যকর হয় না। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী নোটিশ প্রদান করে ৯০দিন পর তালাক কার্যকর করতে হয়। ১৯৬১ সনের মুসলিম পারিবারিক আইনের ৭ (৬) ধারা অনুসারে তালাকের মাধ্যমে কোন বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটলেবিচ্ছেদপ্রাপ্ত অর্থাৎ তালাকপ্রাপ্ত স্বামী-স্ত্রী পুনরায় একত্রে ঘর-সংসার করতে চাইলেনতুন করে নিয়ম অনুসারে বিয়ে করতে হবে। তবে পুনর্বিবাহ করে ঘর-সংসার করায় আইনত: কোন বাধা নেই।
কাবিন নামা’ অনুযায়ী স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষমতা দেয়াকে ‘তালাক-ই-তৌফিজ’ বলে। এই ‘তালাক-ই-তৌফিজের’ ক্ষমতা দেয়া থাকলে স্ত্রী আদালতের আশ্রয় ছাড়াই স্বামীকে তালাক দিতে পারেন। এক্ষেত্রে স্বামীর মতোই স্ত্রী তালাকের নোটিশ চেয়ারম্যানের কাছে পাঠাবেন ও এক কপি স্বামীর কাছে পাঠাবেন। নোটিশ প্রাপ্তির ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হবে। আর খুলা তালাক হলোস্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীর দাম্পত্য অধিকার থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রস্তাব। এক্ষেত্রে স্ত্রী কোনো কিছুর বিনিময়েস্বামীকে বিচ্ছেদের বিষয়ে রাজী করানোর চেষ্টা করেন। স্বামী রাজী থাকলেএভাবে বিচ্ছেদ ঘটতে পারে। বিচ্ছেদের উদ্যোগ তখন অবশ্যই স্ত্রীর কাছ থেকে হতে হবে। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতিতে বিয়ে-বিচ্ছেদ সম্পন্ন হলে তাকে মুবারত বলে। যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিয়ে বিচ্ছেদের ইচ্ছা পারস্পরিক হয়তখন একপক্ষ প্রস্তাব করে এবং চুক্তির মাধ্যমে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। যিনি বিয়ে বিচ্ছেদের প্রস্তাব দিবেন তিনিই নোটিশ পাঠাবেন।
এমতাবস্থায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ছয় মাসের জন্যে শুধুমাত্র যা শরীয়তে নেই, সেই তালাক-ই-বাদাত নিষিদ্ধ করে কেন্দ্রীয় সরকারকে হুকুম জারি করেছেআগামী ঐ সময়ের মধ্যেভারতের উপযোগী নতুন আইন তৈরি করে তা কার্যকর করতে। আশা করা অনুচিত হবে না যেএই নূতন আইন বাংলাদেশের থেকেও আরও অধিকতর উপযোগী হবেআমাদের দেশের জন্যে।(প্রকাশ কাল ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ইং)

তথ্যসূত্র:  বাংলাদেশ ই-তথ্যকোষ ও অন্যান্য ওয়েবসাইট )


রবিবার, ২৩ জুলাই, ২০১৭

মেজাজ উদ্ভূত সমস্যা ও প্রতিকার

।। সুদীপ নাথ।।
(আজ দৈনিক সংবাদের ১৩ পাতায় প্রকাশিত হয়ছে। )




কটা কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কোনো মানুষেরই মানসিকতা সবসময় স্থায়ী কোনো বিষয় নয় শত-সহস্র তথা অসংখ্য অতি সূক্ষ্ম সব বিষয়বস্তুর সমন্বয়ে একজনের মানসিকতা গড়ে উঠলেও তা যেকোনো সময় পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। নূতন নূতন উদ্দীপনা বা সংকেত বা ভাষার মাধ্যমে, নূতন তথ্যের আগমনে মানসিকতা ধীরে বা দ্রুত পরিবর্তিত হতে দেখা যায়। যেখানে পরিবেশ তথা সমাজ, যত দ্রুত পরিবর্তিত হয়, সেখানে মানসিকতাও তত দ্রুত পরিবর্তিত হয়। ব্যক্তি বিশেষের ক্ষেত্রে , তার স্থান পরিবর্তনে, তা আমাদের চোখে বেশি ধরা পড়ে। তথ্য আহরণও মানসিকতা পরিবর্তনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এক কথায় বলা যেতে পারে, মানসিকতা পরিবর্তনশীল, তা ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রেই হোক আর সমাজের সবারই হোক। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, সমগ্র মানবজাতির সংগৃহীত জ্ঞানের মোট পরিমাণ প্রতি দশ বছরে মোটামুটি দ্বিগুণ হয়। তাই এই দ্রুতলয়ে তথ্যের বৃদ্ধি ও এসবের প্রতিফলন, আমাদের মানসিকতাকে দ্রুত পরিবর্তন করে চলছে, তা সহজেই অনুমেয়। তবে এটাও ঠিক একটা নির্দিষ্ট সময়ে আমাদের একটা সুনির্দিষ্ট মানসিকতা অনুমান করা যায়। সেটাও হয় প্রতিটা বিষয় ভিত্তিক। একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে একজন একটা নির্দিষ্ট আচরণ প্রদর্শন করে। এইভাবে ভাঙ্গা-গড়ার মধ্য দিয়েই আমরা এগুতে থাকি। কিন্তু তার পরেও কয়েকটা প্রশ্ন রয়েছে। প্রশ্নটা উঠেছে শারীরিক দিক থেকে। শারীরিক দিক থেকেও বিষয়টার ভাগ আছে। একটা হল, জন্মগতভাবে সমস্ত শিশুর কি মস্তিষ্কের এবং স্নায়বিক ক্রিয়াকলাপের বৈশিষ্ট্য একরকম কিনা। আর অন্যটা হল, জন্মকালীন সময়ে মস্তিষ্কের ও স্নায়বিক ক্রিয়াকলাপের বৈশিষ্ট্য পরবর্তীকালে পালটে যায় কিনা। দীর্ঘ দিনের অধ্যয়ন, অনুসন্ধান ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে এ পর্যন্ত চব্বিশটিরও বেশি ধরণের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে শিশুরা জন্মগ্রহণ করে বলে প্রমাণিত হয়েছে। এই চব্বিশটির বেশি বৈশিষ্ট্যকে মোটামুটি চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। সংশ্লেষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যাদির দ্রুত ও নির্ভুল প্রসেসিং মানুষের আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণে মস্তিষ্ককে সাহায্য করে। যদিও সমস্ত মানুষের মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপ একই ধরণের, কিন্তু তা সত্ত্বেও মস্তিষ্কের জৈবিক গঠন বিভিন্ন কারণে সবার একরকম হতে পারে না। এই সমস্ত বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠে উত্তেজনা ও নিস্তেজনা প্রক্রিয়াগুলোর অনুপাত, ঐসবের দ্রুততা এবং শক্তিমত্তার উপর নির্ভর করে। এই তিনটি মৌলিক স্নায়ুপ্রক্রিয়াকে, উত্তেজনা-নিস্তেজনার তিনটি ধর্ম হিসাবেই চিহ্নিত করা হয়। প্রথমটি হচ্ছে উত্তেজনা-নিস্তেজনার ভারসাম্য (balance), দ্বিতীয়টি হচ্ছে গতিময়তা (mobility), আর তৃতীয়টি হচ্ছে শক্তি (strength) ভারসাম্য বলতে এখানে যা বলছি তা হলো, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চল বা কেন্দ্রে উত্তেজনা কেন্দ্রীভূত হওয়া বা নিস্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার সমতা অর্থাৎ মস্তিষ্কের স্থিতিস্থাপকতা। গতিময়তা বলতে যা বলতে চাইছি তা হল, উদ্দীপনা বা সংকেত গৃহীত হলে, তার কারণে কোন অঞ্চল বা কেন্দ্রের, উত্তেজনা থেকে নিস্তেজনায় অথবা নিস্তেজনা থেকে উত্তেজনায় রূপান্তরিত হবার মাপকাঠি। শক্তি বলতে যা বলছি তা হল, আগত উদ্দীপনার চাপ মস্তিষ্ক কোষ কতটুকু সইতে পারে তার ক্ষমতা তথা মাত্রা। এই শক্তি মাত্রার ভিত্তিতে সমস্ত প্রাণীর ক্ষেত্রেই দুটি বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। একটি শ্রেণিকে বলা হয় সবলও অপরটিকে বলা হয় দুর্বলশ্রেণির বৈশিষ্ট্যের মস্তিষ্ক। একটি কথা আগেই বলেছি যে, জন্মের পরই শিশুর চারটি প্রধান বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। এই চারটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে তিনটি সবল শ্রেণিভুক্ত, আর একটি মাত্র দুর্বল শ্রেণির মধ্যে পড়ে। 

এই চারটি বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ-
 ১। সবল শ্রেণির প্রথমটিকে বলে অতিচঞ্চল বা CHOLERIC, অনেকে বলে রগচটা
 ২। সবল শ্রেণির দ্বিতীয়টিকে বলে প্রাণচঞ্চল বা SANGUINOUS, অনেকে বলে হাসিখুশি
 ৩। সবল শ্রেণির তৃতীয়টিকে বলে PHLEGMATIC, অনেকে বলে আত্মপ্রতিষ্ঠ
 ৪। দুর্বল শ্রেণির একমাত্র বৈশিষ্ট্যকে বলে বিমর্ষ বা MELANCHOLIC
            এবার এই চারটি বৈশিষ্ট্যের ব্যবহারিক দিকটা একটু আলোচনা করা যাক। যে সকল শিশু অতিচঞ্চল মেজাজের অধিকারী, তারা সাধারণত চঞ্চল ও লড়াকু হয়ে থাকে এবং দ্রুত ও সহজেই উত্তেজিত হয়ে উঠে। তারা খুবই চটপটে ও আবেগপ্রবণ, তারা সহজে নিজেদের বাসনা দমন করতে পারে না এবং পরিকল্পিত কাজ ত্যাগ করতে পারে না। যখনই স্থায়ী বাধা নিষেধের সাহায্যে, এই ধরণের শিশুদের সক্রিয়তা দমন করার চেষ্টা করা হয়, তখন সমস্যা দেখা দেয়। এই ধরণের স্নায়বিক ব্যবস্থার উপযোগী স্বাভাবিক চাহিদাগুলোর সাথে মা বাবার ধারণার আপসহীন বিরোধ দেখা দেয়। কারণ মা-বাবারা তাদের সব সন্তানের কাছ থেকেই লক্ষ্মী ছেলের মত ব্যবহার, চালচলন আশা করে বসে থাকে। যে সকল শিশুর এই ধরণের মেজাজ আছে, তাদের পক্ষে যথেষ্ট শারীরিক চাপ, ছুটাছুটি এবং খেলাধুলা খুবই প্রয়োজনীয়। তবে শিশুর স্বাস্থ্য দুর্বল হলে অবশ্যই ডাক্তার দেখিয়ে দ্রুত স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করতে হবে, নতুবা পরিণাম খুব খারাপ হবে। শারীরিক চাপ, ছুটাছুটি ও খেলাধুলায় তারা তাদের অসামান্য শক্তি ব্যয় করতে পারবে এবং তার দ্বারা তারা অধিকতর স্থির ও শান্ত হয়ে উঠবে। এই ধরণের ছেলেমেয়েরা যদিও তারা সহজেই উত্তেজিত হয়ে উঠে, তথাপি তারা মৌখিক শাস্তি এবং তিরস্কার সইতে পারে। বিশেষ কোন মানসিক জখম এদের মধ্যে দেখা যায় না। তবে ছুটোছুটি বন্ধ করার মত শাস্তি দিলে অর্থাৎ তার বৈশিষ্ট্য সঞ্জাত স্বাধীনতা থেকে সে বঞ্চিত হলে, সেই ধরণের শিশুরা খুবই যন্ত্রণা ভোগ করে। এদের মধ্যে উত্তেজনা-নিস্তেজনার সমতার অভাব বিশেষভাবে প্রতীয়মান হয়। নিস্তেজনার ক্রিয়া এদের খুবই দুর্বল, নিস্তেজনার উপাদান এদের কম। কোলেরিক টাইপের মানুষ সাধারণত অতিমাত্রায় উৎসাহী হয় তাদের আত্মবিশ্বাসের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেশি। তারা যেন সবসময়ই প্রাণশক্তি ও কর্মশক্তিতে টগবগ করছে। এরা স্বভাবতই অসহিষ্ণু, অসংযত এবং অস্থিরমতির হয়। এই টাইপের মানুষ সাধারণ নতুনত্বের সন্ধানী হয়। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণে এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার বশবর্তী হয়ে এরা বিপজ্জনক এবং সাধ্যের অতীত কাজে প্রণোদিত হয়। সেইজন্য এদের জীবনের পরিণতি প্রায়শই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এরা অনেকসময় যুক্তি-তর্কের ধার ধারে না এবং খেয়াল খুশিমতো অপরিকল্পিত কাজে জড়িয়ে পড়ে। এই ধরণের বৈশিষ্ট্যের অধিকারীদের মধ্যে, খুবই অল্পসংখ্যক যারা সাফল্যলাভ করে, তারা বিখ্যাত লোক হয়ে উঠে। এই ধরণের চরিত্রের প্রকাশ শিশুদের মধ্যে দেখা গেলে, মা বাবাকে শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়তির হাতে ছেড়ে দিলে চলবে না। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা শৈশবকালেই নিতে হবে। সঠিক লালন-পালনের মাধ্যমে এই বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনযোগ্য।
সবল শ্রেণির তিন রকম বৈশিষ্ট্য সমন্বিত মেজাজের তথা চরিত্রের মধ্যে আরেকটি হচ্ছে প্রাণচঞ্চল বা স্যাঙ্গুইনাসএই বৈশিষ্ট্যের সাথে কোলেরিক টাইপের কিছু কিছু মিল থাকলেও পার্থক্যটাই বেশি। স্যাঙ্গুইনাস টাইপের লোকেরা একসঙ্গে অনেক কাজে মন বসাতে পারে। তারা কোলেরিকদের চেয়ে কম চটপটে হলেও, তারা সাধারণত প্রাণোচ্ছল, স্ফূর্তিবাজ, উদ্যমী ও মেহনতি হয়ে থাকে। তাদের মনখারাপ হতে দেখা যায় না। তারা আগ্রহের সঙ্গে তাড়াতাড়ি খেলাধুলায় মত্ত হতে পারে। তারা খুবই অধ্যবসায়ী এবং সহজেই বাধা বিপত্তি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। কান্নাকাটি এবং কোনপ্রকার আবেগ উচ্ছ্বাস ছাড়াই তারা সবরকম শাস্তি ভোগ করতে পারে।
স্যাঙ্গুইনাস মেজাজের অধিকারী ছেলেমেয়েদের মস্তিষ্কে উত্তেজনা থেকে নিস্তেজনা এবং নিস্তেজনা থেকে উত্তেজনা সহজেই ঘটে থাকে। তাদের মস্তিষ্কের গতিময়তা খুবই বেশি। উত্তেজনা-নিস্তেজনার রূপান্তর সহজেই ঘটে বলে এবং তাতে একটা সমতা থাকায়, পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে খুব সহজেই এরা নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে। বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে মনোনিবেশ করতে পারে অবলীলাক্রমে। এরা অল্পেতে সাড়া দেয় এবং তা উৎসাহেরই সঙ্গে। কোলেরিকদের সঙ্গে এদের মূল পার্থক্যটা হচ্ছে, এরা সংযমীএরা উত্তেজিত ও নিস্তেজিত সহজেই হয় বটে কিন্তু আত্মসংযমের ক্ষমতা এদের যথেষ্ট বেশি।
স্যাঙ্গুইনাসরাও কোলেরিকদের মত উচ্চাভিলাষী, প্রাণশক্তিতে চঞ্চল, কিন্তু তারা কোলেরিকদের মত মাত্রাজ্ঞানহীন নয়।এরাও আত্মবিশ্বাসী, কিন্তু হঠকারী নয়। এরা নিজেদের ক্রোধ ও আবেগ দমন করতে পারে। স্থান কাল পাত্র বিচার করতে পারে এবং সুসংহত আচার আচরণ প্রদর্শন করতে পারে।নিজেদের ক্ষমতা সম্পর্কে এরা সজাগ, কিন্তু বাস্তবের বাধা বিপত্তি সম্পর্কেও এরা সচেতন। কাজেই কোলেরিকদের মত অপরিকল্পিত বিপজ্জনক কাজে নিজেদের জড়িয়ে ফেলে, অসফল ও ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা এদের খুব কম। বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দলের নেতা এবং সফল রাষ্ট্রনায়ক তথা মন্ত্রীদের, এই ধরণের মেজাজ দেখা যায়। এই ধরণের মেজাজের অধিকারী ছেলেমেয়েদের নিয়ে মা-বাবাদের খুব বেশি ভুগতে হয় না। তবে এমন ধারণা পোষণ করা উচিৎ নয় যে, এ ধরণের ছেলেমেয়েরা নিজে থেকেই জীবনে সাফল্য অর্জন করতে পারবে। যেকোনো ছেলে মেয়ে যেকোনো সময় পরিবেশের কোনো নেতিবাচক আনুকূল্যে বিপথগামীতার শিকার হতেই পারে, বিশেষত কিশোর বয়সে। তাছাড়া সুস্থতা এবং স্বাস্থ্যের ব্যাপার তো আছেই। আবার অনেক মা-বাবাও, অজ্ঞানতার কারণে অনেকসময় নেতিবাচক পরিস্থিতি তথা বিষয়বস্তুর আমদানি করে এবং ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যৎ উন্নতির পথে বাধা সৃষ্টি করে।
এবার আসি নির্বিকার তথা ফ্লেগমেটিক টেম্পেরামেন্ট বা মেজাজের অধিকারী ছেলে মেয়েদের কথায়।এক কথায় অনেকে এদের শান্ত প্রকৃতির মেজাজের অধিকারীও বলে থাকে।যে শিশুরা স্যাঙ্গুইনাস শিশুদের চেয়েও অধিকতর শান্ত, তাদের বাহ্যিক আচরণেও থাকে সংযমী ভাব এবং স্পষ্টভাবেই প্রকাশিত হয় বাহ্যিক মন্থরতা। এই শিশুরা অতীব অধ্যবসায়ী এবং খুবই কর্মক্ষম। কিন্তু সমস্তকিছুই করে অত্যন্ত ধীরে এবং আপন মনে। অন্যান্য শিশুদের ভিড়ের মধ্যে শান্ত স্বভাব ও গাম্ভীর্যের জন্য এদের সহজেই চেনা যায়। এই ধরণের শিশুদের অনেকসময় সক্রিয় করে তুলতে হয়। বিভিন্ন কাজের প্রতি তাদের মধ্যে আগ্রহ বিকশিত করতে হয়। তবে তারা একবার যে অভ্যাস রপ্ত করে, তা শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে উঠে এবং সুদীর্ঘ বছর টিকে থাকে। ঠিক সেই কারণেই এদের জীবন ধারণের নিয়ম, অভ্যাস ও অনুরাগের ব্যাপারে খুঁটিনাটি সমস্ত কিছুই মা-বাবাদের ভালোভাবে ভাবা দরকার। ফ্লেগমেটিক চরিত্রের ছেলে মেয়েরা জীবনের দৌড়ে একবার পিছিয়ে পড়লে, তা থেকে পুনরুদ্ধার পাওয়া খুবই কঠিন। কিন্তু স্যাঙ্গুইনাসদের ক্ষেত্রে স্পষ্টতই দেখা যায় কিশোর বয়সের, অতি অধঃপতন থেকেও নিজের চেষ্টায় চূড়ান্তভাবেই ফিরে দাঁড়িয়েছে এবং জীবনে অনেক বড় কাজ করেছে। এমতাবস্থায়, ফ্লেগমেটিক চরিত্রের ছেলেমেয়েদের মা-বাবারা যদি শৈশব অবস্থায় সঠিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব না নেন তবে সেই সন্তানের ভবিষ্যৎ হাতছাড়া হয়ে যাবে এবং এই প্রশ্নে অবশ্যই বলা যায় সন্তানের ভবিষ্যৎ মা বাবারই হাতে।
ফ্লেগমেটিকরা প্রায়শই ঘাতসহ, অচঞ্চল এবং সংযমী। এরা উদ্যমশীল, অধ্যবসায়ী এবং অক্লান্ত পরিশ্রমী হয়। কিন্তু তাদের সবকিছুই খুবই সময় সাপেক্ষ। এই টাইপের মানুষের একই কাজে লেগে থাকার ক্ষমতা অসাধারণ। একই উদ্দীপক অনেকক্ষণ ধরে মস্তিষ্কে ক্রিয়া করলেও প্রতিরক্ষামূলক নিস্তেজনা নেমে আসে না। এরা চট করে বিষয়ান্তরে যেতে পারেনা বটে, কিন্তু বিফলতা এদের উদ্যমকে কমাতে পারে না। নিজের কাজ করে চলে ধীরে সুস্থে, প্রতি পদে ভেবে চিন্তে।এরা অনেকদিন ধরে কষ্টসাধ্য কাজ করার শক্তি রাখে এবং এরা দীর্ঘস্থায়ী গবেষণার কাজের উপযুক্ত

এবার দুর্বল শ্রেণির একমাত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটি নিয়ে এবার আলোচনা করা যাক। দুর্বল টাইপ তথা বিমর্ষ টাইপের মস্তিষ্কের মানুষের,  সহ্য ক্ষমতার বিশেষ অভাব থাকে। পরিবেশের সামান্য চাপে, উত্তেজনা কিছুটা বাড়লেই, তাদের ক্রিয়াকলাপে বিশৃঙ্খলা প্রকাশ পায়। উত্তেজনার উপাদান মস্তিষ্কে কম, তাই উত্তেজনার মাত্রা বাড়ার ফলে আত্মরক্ষামূলক নিস্তেজনা নেমে এসে, মস্তিষ্ক কোষের ক্ষয়ক্ষতি নিবারণের চেষ্টা করে। এদের মস্তিষ্কের মধ্যে নিস্তেজনা প্রবাহ সহজেই ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা থাকার দরুন, এরা সহজেই ঘুমিয়ে পড়ে। এই টাইপের মানুষের বেলায় উৎসাহ-উদ্দীপনার অভাব দেখা যায়। স্বভাবতই এরা বিষণ্ণ, তাই এদের বলা হয় বিষণ্ণ বা মেলানকোলিকটাইপ। নিম্ন মধ্যবিত্ত বাঙ্গালীদের মধ্যে এই টাইপেরই আধিক্য দেখা যায়অপরদিকে, সবল টাইপের মস্তিষ্কে উত্তেজনার উপাদান বেশি থাকে, তাই তারা উত্তেজনার মাত্রা অনেকটা অবধি সহ্য করতে পারে। অনেকক্ষণ ধরে উত্তেজিত থাকলেও এরা ঘুমিয়ে পড়ে না, উত্তেজনার ফলে এদের মস্তিষ্ক-ক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা দেখা যায় না। দুর্বল টাইপের বিশেষত্ব এই যে,তাদের মস্তিষ্কে উত্তেজনা এবং নিস্তেজনা দুটোরই তীব্রতার অভাব পরিলক্ষিত হয় এবং স্নায়ু প্রক্রিয়ার মাত্রাও এদের কম। এদের সহ্যক্ষমতাও কমউত্তেজনা ও নিস্তেজনার মাত্রা একটু বাড়লেই এরা আর তা সইতে পারেনা। উচ্চ মস্তিষ্কের তথা কর্টেক্সের ক্রিয়া কলাপের বিশৃঙ্খলা এদের মধ্যে অতি সহজেই প্রকাশ পায়। নিউরোসিসের প্রধান উৎস হল এই দুর্বল টাইপের মস্তিষ্ক বিষাদ রোগের প্রাদুর্ভাব এদের মধ্যে বেশি। এরা অল্পতেই পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ে। এরা আত্মবিশ্বাস থেকে বঞ্চিত এবং সব কাজে উৎসাহের অভাব বোধ করে। এরা সবকিছুতেই ভয় পায় এবং সবসময় অতিমাত্রায় উৎকণ্ঠিত থাকে নতুবা ঘুমিয়ে থাকে। অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে এদের খুবই অসুবিধা হয়। বিপদ আপদের সময় বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে। এরা পরিবর্তন ও নতুনত্বকে সন্দেহের চোখে দেখে।
মেলানকোলিক তথা দুর্বল স্নায়ু-ব্যবস্থার অধিকারী শিশুদের বেলায় মা-বাবাকে বিশেষভাবে বিবেচনা-শীল ও সতর্ক হতে হবে। অত্যধিক উত্তেজনাশীলতা , বদমেজাজ, কাঁদুনে স্বভাব এবং উচ্চ সংবেদনশীলতা অনেকসময় মা-বাবার ভুল লালন-পালনের জন্য, জটিল থেকে জটিলতর হয়। তার ফলে শিশু বয়সেই দেখা দিতে পারে নিউরোসিস নামে মানসিক রোগ। এই ধরণের শিশুরা প্রায়শই নিঃচেষ্ট, ভীরু এবং লাজুক প্রকৃতির হয়। তারা প্রবল স্নায়বিক চাপ সহ্য করতে কমবেশি অক্ষম। এদের যত বেশি সম্ভব অন্য শিশুদের সঙ্গে দল বেঁধে খেলাধুলায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এদের দ্বারা উদ্যোগ এবং আত্ম-নির্ভরশীলতা প্রকাশের ছোট খাট প্রয়াসও, দৃঢ়ভাবে সমর্থন করা উচিৎ। মা-বাবাদের পক্ষ থেকে সমস্ত ব্যাপারে তাদেরকে সবসময় অনুপ্রেরণা যোগানো অব্যাহত রাখতে হবে। ব্যায়াম এবং হাইড্রোথেরাপিউটিক প্রসিডিওর, এই ধরণের শিশুদের জন্য অপরিহার্য। কেননা এইসব তাদের মজবুত করে তুলে, তাদের স্নায়ু ব্যবস্থা দৃঢ় করে এবং দেহযন্ত্রের শক্তি বৃদ্ধি করে।
অন্যান্য ধরণের মেজাজের ক্ষেত্রেও, শরীরচর্চা বলা বাহুল্য অনুরূপ ভূমিকাই পালন করে থাকে। তবে যে সমস্ত শিশুর স্নায়ু-ব্যবস্থা দুর্বল তাদের পক্ষে দৈনন্দিন জীবন যাত্রার সঠিক রুটিনে অভ্যস্ত হতে অনেক বেশি অসুবিধা হয়। তারা সবরকম দায়-দায়িত্ব এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করে। কারণ তা তাদের কাছে কষ্টকর ব্যাপার বলে মনে হয়। এমতাবস্থায় সন্তান লালন-পালনের সঠিক পদ্ধতি এবং সুবিবেচিত ব্যবস্থাই কেবল সুফল দিতে পারে।
মা-বাবার পক্ষে শিশুর স্নায়ুব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যাবলী বোঝা এবং লালন পালনের উপায় খুঁজে বের করাটা খুবই জটিল। তার জন্য চাই আন্তরিক সংবেদনশীলতা ও বিচার-বিবেচনার ক্ষমতা। তবেই সন্তান লালন-পালনের কাজে যেকোনো প্রচেষ্টা সার্থক বলে প্রতিপন্ন হবে হতে