“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
পল্লব ভট্টাচার্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
পল্লব ভট্টাচার্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০১৪

বাঙালিয়ানা : বর্হিবঙ্গ বা বৃহৎবঙ্গ

                                      ।। পল্লব ভট্টাচার্য।।

   
সাগ্নিক সম্পাদক , আমাদের মিলন দত্ত মশাই যে বাঙালি , নাম-উপাধি দেখে , তা কি বোঝার কোনও উপায় আছে ? চিত্রাভিনেতা সুনীল দত্ত , সঞ্জয় দত্ত বা গুরু দত্তের সঙ্গে যে তাঁর আত্মীয়তা নেই , বুঝবো কীভাবে ? কিংবা অসমীয়া কবি হীরেন ভট্টাচার্যের ছবির পাশে এই অধম ভট্টাচার্যের ছবি রাখলে , চেহারা দেখে কি এই অধমকে বাঙালি বলে চেনা যাবে ? যায় না যে , সেটা অনেক আগেই শ্রদ্ধেয় অতুল সুর মশাই , বলে গেছেন । বাঙালির একটা নৃতাত্বিক পরিচয় দিতে গিয়ে , বিভিন্ন সমীক্ষার উপর ভর করে , শেষ অব্দি তাঁকে এমন একটা সিদ্ধান্তেই পৌঁছুতে হয়েছিল যে দেহ গঠনে অনেকটা আদি অস্ট্রাল বা অস্ট্রিক জনদের চিহ্ন থাকলেও , কোনও একটি বিশেষ নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠির পুরোপুরি ছাপ নেই বাঙালিদের মধ্যে । নৃতাত্বিকভাবে বাঙালি একটি সংকর জাতি ।

    তবু , এই জাতিটি যে খুব একটা নতুন নয় ,ঐতরেয় আরণ্যকের উল্লেখ থেকেই একথা বলা যায় । সেই কবে , মহাকবি কালিদাস জানিয়ে ছিলেন , এদের বসতি যেখানে , সেই দেশটা “গঙ্গাস্রোতহন্তরেষু” । গঙ্গার বিভিন্ন স্রোতের মধ্যে অবস্থিত । আবার দ্বিতীয় শতকের ভুগোলবিদ টলেমিও বলেছেন , গঙ্গার সব মোহনাগুলোই গঙ্গারিদাই বা গঙ্গারিদ নামের অধিবাসীদের দেশভুক্ত ।  সুতরাং আজকের বাংলাদেশের সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলগুলোও এই দেশের মধ্যে ছিল বলা যায় । যদিও ভুখন্ডের সীমা বারবার পাল্টেছে রাজনৈতিক কারণে ।  যেমন পাল ও সেন আমলে বঙ্গ ছিল পুন্ড্রবর্ধনভুক্তির অন্তর্ভুক্ত , আবার গুপ্ত আমলে  বঙ্গ ও পুন্ড্রবর্ধন আলাদা রাষ্ট্রবিভাগ । কিন্তু বঙ্গ , বঙ্গাল বা বাংলা বলে একটা সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ভুখন্ড তো মুসলমানদের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার আগে আমরা দেখতে পাই না । বিভিন্ন সময়ের ইতিহাসে রাঢ় , সমতট , হরিকেল , তাম্রলিপ্তি , পুন্ড্রবর্ধন এরকম অজস্র জনপদের উল্লেখ পাচ্ছি । ত্রিপুরাকেও পাচ্ছি কখনও হরিকেল সীমার মধ্যে , তো কখনও সমতটের প্রধান কেন্দ্র হিসাবে । আবুল ফজলের আইনই আকবরীতে পাচ্ছি , সুবা বঙ্গালের উত্তরে কুচ(বিহার)রাজ্য , দক্ষিণে সমুদ্র ও সুন্দরবন (ভাটি) পূর্বে ত্রিপুরা (বর্তমানের কুমিল্লা ও পার্বত্য ত্রিপুরা সহ)ও আসাম , পশ্চিমে বিহার ।

    এই সীমারেখার মধ্যবর্তী অঞ্চলটি , মোগল আমল থেকে যা সুবা বঙ্গাল হয়ে উঠেছে বিভিন্ন জনপদ মিলে , তাও তো কোনও স্থির ভুগোল নয় । ইংরেজ আমলে এই প্রদেশ তো আরও প্রসারিত হয়েছিল । তাহলে কোন ভূ-সীমাটিকে আমরা বলবো , বঙ্গ বা বাংলা ? কোন ভূ-সীমার বাইরের সমস্ত ভুগোলকে বলবো বর্হিবঙ্গ ? আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায় , এই নির্দিষ্ট ভূখন্ড যাকে বঙ্গ বা বাংলা বলা হচ্ছে , সেখানকার অধিবাসীরাই কি বাঙালি ? ১৪৩২ য়ে মা হুয়ান যে ভূখন্ড ভ্রমন করে তাঁর ইং য়াই শেন লান গ্রন্থে লিখেছিলেন ,-“দেশের ভাষা হিসাবে লোকেরা ব্যবহার করতো পঙ্গ-কো(গো)-লি , যা একটি স্বাধীন ভাষা , যদিও লোকে পা-এরহ-সি ভাষাতেও কথা বলেন ।“ প্রথম ভাষা বোঝাতে মা হুয়ান যে তিনটি চীনা লিপি ব্যবহার করেছেন , ব্রতীন্দ্রকুমার মুখোপাধ্যায়ের মতে , তৎসাময়িক উচ্চারণ অনুযায়ী তা হবে বঙ্গালি বা বাঙ্গালি । এই বঙ্গালি বা বাংলা ভাষায় যারা কথা বলেন , তাদের স্বাভাবিকভাবে বঙ্গালি বলা হবে । যে ভাষায় কথা বলে বা লিখে চর্যাপদের কবি ভুসুক বঙ্গালি হয়েছিলেন , সেই ভাষাভাষী মানুষের প্রধান বাসভূমিটিকে তো স্বাভাবিক কারণেই বঙ্গালি -বঙ্গাল-বঙ্গ বা বাংলা বলা হবে । যদি এই যুক্তি গ্রাহ্য করা যায় , তবে বলতে হয় , বাঙালি নৃতাত্বিকভাবে কোনও বিশুদ্ধ নরগোষ্ঠি না হলেও ভাষাভিত্তিক জাতিতে বা গোষ্ঠিতে পর্যবসিত হয়েছিল বহুবছর আগেই । আর এই ভাষাভিত্তিক জাতিটি , আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে ,” দেশের জলবায়ু ও তাহার আনুষাঙ্গিক ফলস্বরূপ এই দেশের উপযোগী বিশেষ জীবনযাত্রার পদ্ধতিকে অবলম্বন করিয়া….গত সহস্র বৎসর ধরিয়া যে বাস্তব , মানসিক ও আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি “ গড়ে তুলছেন , “তাহাই বাঙ্গালী সংস্কৃতি “।

    আজকে যখন সেই বিশেষ ভূ-খন্ডটি রাজনৈতিক কারণে বিভক্ত ; যখন সেই বিভাজিত বাংলার একটি অংশ ভাষা রক্ষার তাগিদে সংগ্রাম করে , বাংলাদেশ নামে এক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে , তখন ভারতের একটি প্রদেশ , পশ্চিমবঙ্গ কীভাবে ‌'বর্হিবঙ্গ‌ শব্দটি ব্যবহার করবে ? বর্হিবঙ্গ বলতে কি তাহলে , ভারত রাষ্ট্রের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশটির বাইরের অঞ্চলগুলোকেই বোঝাবে ? তবে তো , বাংলাভাষী মানুষের মূল ভূ-খন্ডটির অস্তিত্বকেই এই বঙ্গ চিন্তার বাইরে রাখতে হয় । আবার বৃহৎবঙ্গ শব্দটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়  কাঠামো , এবং রাজনৈতিক ভূগোল নিশ্চিতভাবেই বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় ।

    অথচ কলকাতাকেন্দ্রিক পশ্চিমবঙ্গীয় বুদ্ধিজীবিগণ , পশ্চিমবঙ্গের বাইরের বিভিন্ন প্রদেশ বসবাসকারী বাঙালিদের নির্দ্বিধায় বর্হিবঙ্গীয় বলে চিহ্নিত করে চলছেন বিগত কয়েক দশক ধরে । সে জন্যই প্রথম যে প্রশ্নটা দিয়ে আমরা কথা বলা শুরু করেছি , তা এই যে বাঙালিকে বাঙালি বলে চিনবো কীভাবে ? উপাধি , নাম বা চেহারায় ভারতবর্ষে বাঙালিকে আলাদা ভাবে চেনার খুব একটা সুযোগ নেই । আমি যে রাজ্যের বাসিন্দা , সেই ত্রিপুরায় ককবরকভাষী জনজাতির মানুষ বাঙালিদের বলেন ,-ওয়ানছা । কথাটির শব্দগত অর্থ অদ্ভুত বা আশ্চর্য মানুষের ছেলে । এবং এই মোঙ্গলয়েড জনগোষ্ঠির মানুষদের মধ্যে দাঁড়ালে , আমার আলাদা চেহারাটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে । যাতে করে আমি বা যে কোনও দর্শকই চেহারা দেখেই বুঝতে পারে আমার আলাদা জাতিসত্তাটি । যা কলকাতার বড়বাজার অঞ্চলে দাঁড়ালে কিন্তু হবে না । এখানেই পশ্চিমবঙ্গীয় দৃষ্টিতে বর্হিবঙ্গীয় আমার সুবিধা । আমার আত্মপরিচয়ের প্রশ্নটি  এখানে অন্তত কোনও দ্বিধার সৃষ্টি করে না । উপরন্তু যে ভাষার কারণে আমার জাতিসত্তাটি চিহ্নিত , তাও কোনও প্রশ্নচিহ্নের মুখোমুখি হয় না । কারণ , মোগল আমলে গৌড়বঙ্গ যখন ফারসীকে রাজভাষা হিসাবে মেনে নিয়ে , ফারসী শিখে চাকরির উমেদারীতে ব্যস্ত , তখন থেকে এই রাজ্যের রাজভাষা হিসাবে বাংলা স্বীকৃত এবং রাজকীয় আদেশগুলো বাংলাতেই বেরুতো ।

    কলকাতাকেন্দ্রিক যে পশ্চিমবঙ্গীয় মেধা আজ , ভিন্ন প্রদেশে বসবাসকারী বাঙালিদের বর্হিবঙ্গীয় বলে চিহ্নিত করছেন , তার পেছনে রয়ে গেছে নিজেকে কেন্দ্র ভাবার সেই প্রচল অভ্যাস এবং কলোনির ঘোর । এটা এমন নয় যে , একটা শব্দমাত্র । এই শব্দ ব্যবহারের মনোভঙ্গিটি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হয়েছে । আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে সুবিধা পাওয়া সেই মন , প্রতিপত্তিপ্রবণ হয়ে নিজেকে ক্ষমতাকেন্দ্র ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল । ক্ষমতার স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ীই তা সার্বিক কর্তৃত্ব চায় । তার ইচ্ছা ও রুচির চেয়ে আলাদা সমস্ত কিছুকেই সে হয় তাচ্ছিল্যে হীন বানিয়ে তোলে , নয়তো অবহেলায় ‘বাহির’ করে রাখে । একটা সময় অব্দি অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসকারী বাঙালিদের মধ্যে নিজেদের রুচি চারিয়ে দেয়া গেলেও , কলকাতা আজ আর তার সত্তায় বাঙালিত্বকে নিয়ন্ত্রণ করার অবস্থায় নেই । দেশ বিভাগ তার আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তির হানি ঘটিয়েছে । আর হয়তো তাই , আপ্রাণ সে তার বাঙালিয়ানাকে বিসর্জন দিয়ে , কোনওক্রমে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতে চাইছে । তার পোষাকে এখন আর বাঙালিত্বের চিহ্ন নেই । আন্তর্জাতিকতা স্পষ্ট । এমন কি সামাজিক অমুষ্ঠানেও এই পোষাক তাকে বিড়ম্বিত করে । খাদ্যাভাসে সে এখন কসমোপলিটান । এমন কি , দুর্গাপূজা ছাড়া একটি উৎসবও তার নেই , যাকে সে বাঙালির উৎসব বলে চালাতে পারে । তারপরও , যে বাংলাভাষায় তার আত্মপরিচয় নিহিত , সেই বাংলাভাষাটিও সে হারিয়ে ফেলছে অবহেলায় । এখন সে যদি কথা বলে তাও বাংলায় নয় , বাংলা হিন্দি ইংরাজির এক জগাখিচুরি ভাষায় , আর এই খিচুরি ভাষাটাকেই সে চলমান বাংলা বলে চারিয়ে দিতে চাইছে চারপাশে । এটা নতুন কোনও প্রবণতাও নয় , যখন আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সুবিধার সুযোগে কৃষ্ণনাগরিক বুলিটিকে মান্যভাষা ধরে নিয়ে , বৃহত্তর অংশের বাংলাটিকে উপভাষা বানিয়েই ক্ষ্যান্ত হয় নি , সেই উপভাষাভাষী মানুষগুলোকেও অবজ্ঞা ও ঠাট্টার পাত্র করে তুলেছিল , সেই তখনই , মহেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর আত্মকথায় জানিয়েছিলেন ,” বাঙাল দেখিলে আমরা ঠাট্টা করিতাম ও উৎপাত করিতাম ।“ তখন থেকে বাঙালি ও বাংলাভাষাকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দেওয়া শুরু হয়েছিল । তবুও সেই সময় অবিভক্ত বাংলার রাজধানীর মর্যাদা ছিল বলে , অনেকেই কলকাত্তাইয়া হতে চাইতো । না পারলে সধবার একাদশীর রামমানিক্যের মতো ভাবতো , “এত কইরাও কলকত্বার মত হবার পারলাম না , তবে এ পাপ দেহেতে আর কাজ কি , আমি জলে জাপ দিই ।“

    আজ যখন বাংলাদেশ নামে এক আলাদা রাজনৈতিক সীমারেখা তৈরি হয়ে গেছে ভাষার ভুগোলেও , তখন ঠাট্টা উৎপাত সহ্য করা বাঙাল ভাষাও কবি আল মাহমুদ , সৈয়দ শামসুল হক , মজনু শাহ , ব্রাত্য রাসু বা মুজিব ইরমদের হাতে হয়ে উঠেছে নান্দনিকতার অস্ত্র । কলকাতা যখন ৩১ ডিসেম্বরের রাতে নববর্ষ পালনের হুজুগে আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতে ব্যস্ত , তখন ১লা বৈশাখকে ঘিরে বাংলাদেশ গড়ে নিয়েছে বাংলার এক ধর্মনিরপেক্ষ উৎসবের রূপ । আর এভাবেই পশ্চিমবঙ্গীয় মূলস্রোতের ধারণাটি আজ আর কোনওভাবেই বাংলাভাষা বা বাঙালিয়ানাকে প্রভাবিত করার অবস্থায় থাকে না ।

    তবুও ‘বর্হিবঙ্গ’ শব্দটি ব্যবহার করে সে তার পুরনো প্রতিপত্তির ঘোরটিকেই জানান দিতে চায় হয়তো , কিন্তু এই শব্দটি যাদের প্রতি ব্যবহার করা হচ্ছে , তাদের অবস্থান থেকে এই শব্দটি যে কতদূর অবমাননাকর , তা না ভাবলে , ক্ষতি কিন্তু বাঙালির এবং বাংলাভাষারই ।

    মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর সময় থেকে বা তারও আগে , ক্ষমতার নির্যাতন আর অপমানের যন্ত্রণা নিয়ে বাংলার বহু মানুষ এক বসতি থেকে অন্য কোথাও বসতি গড়ে নেওয়ার জন্য বাধ্য হয়েই ভেসে গেছেন । বহু আকাঙ্খিত স্বাদহীন স্বাধীনতা , বাংলার বহু মানুষকে ভাসিয়ে নিয়েছে এখানে সেখানে । তাদের ভুগোল পাল্টেছে । অভ্যাস পাল্টেছে , তবুও তারা ধরে রেখেছেন তাদের ভাষা । কোথাও এই ভাষাটিকে ধরে রাখার জন্য প্রাণও দিয়েছেন আর আপ্রাণ যুদ্ধ করে চলেছেন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে । স্বাধীন ভারতবর্ষে তাদের ব্যাক্তি পরিচয় মুছে , হীনমন্যতাসূচক এক গোষ্ঠি পরিচয় দেওয়া হয়েছে ,-উদ্বাস্তু ।

    আজ যাদের বর্হিবঙ্গীয় বলে পরিচয় দিয়ে আলাদা করা হচ্ছে , তাদের একটা বড় অংশ এই শিকড় উপড়ানো মানুষ বা তাদের উত্তরপুরুষ । তাদের ধারণ করার মতো স্থান পশ্চিমবঙ্গের ছিল না বলেই , তাদের ছড়িয়ে পড়তে হয়েছিল ভারতবর্ষের বিভিন্ন  প্রদেশে । বহুভাষিক সমাজের বাসিন্দা হয়েও , তারা বাংলাভাষাকে ভুলেন নি । ভাষা রক্ষার প্রশ্নে আসামের বরাক উপত্যকায় তাদেরই ১১ জন শহীদ হলেও , একমাত্র মনীষ ঘটক ছাড়া পশ্চিমবঙ্গীয় উন্নাসিকতা ১৯শে মে’কে স্মরণ করার প্রয়োজন বহুদিন অনুভব করে নি । আজ যখন খোদ পশ্চিমবঙ্গেই বাংলাভাষার অস্তিত্ব বিপন্ন , তখন কোনও কোনও সংগঠন বিচ্ছিন্নভাবে দিনটিকে স্মরণ করছেন সত্য , কিন্তু বৃহত্তর পরিসরে কতদূর অনুভব করতে পারছেন , এ নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায় ।

    পশ্চিমবঙ্গীয় পরিসরে আজ বাংলা বলা ক্রমশই লজ্জাস্কর হয়ে উঠছে । টিকে থাকার জন্য সে ভুলভাল হিন্দি আর মুখ বাঁকানো ইংরেজির দিকে ছুটিয়ে নিয়ে চলছে তার উত্তরপুরুষকে । আমার ছেলেটা না একদম বাংলা পড়তে পারে না ,-বলে আত্মশ্লাঘা বোধ করছেন যে মা-বাবা , তাদেরই কেউ কেউ , উত্তরপূর্বের বাঙালিকে বাংলা বলতে শুনে , অবাক হয়ে বলেন , বাব্বা , আপনি এত ভাল বাংলা জানেন ! আসলে পশ্চিমবঙ্গের বাইরে যে বাঙালি রয়েছে , তারা জীবনযাপনে অনেকদূর অবাঙালি হয়েও , বাংলাভাষাটিকে ঘিরে যে তাদের বাঙালিয়ানাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন , এই সামান্য আত্মীয়তাসূচক খোঁজখবরটিও তারা এতদিন রাখেন নি । রাখার প্রয়োজনও বোধ করেন নি । আজ হঠাৎ তারা বর্হিবঙ্গীয় খোঁজার চেষ্টা করছেন , কিছুটা প্রয়োজনের তাগিদে । ভাষা ও সাহিত্যের বাজারটি খোদ পশ্চিমবঙ্গেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে । সীমান্ত পেরুনোয় আরোপ হয়েছে বিধিনিষেধ । তাই ভারত বর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে বসবাসকারী বাঙালিদের বর্হিবঙ্গীয় বলে নিজেকে প্রসারণের এই চেষ্টা , অনেকটাই দায়ে পড়া গোছের ।

    জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে , রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রনৈতিক বাধ্যবাধকতায় বাঙালি যখন আজ বিশ্বময় ভ্রাম্যমান , বহুভাষিক জগতের বাসিন্দা ; ঐতিহাসিক কারণেই বাংলার ভুগোল তখন বহুধাবিস্তৃত , বহু দ্বীপ সমন্বিত । এই সময়ে , কোনও একটি অঞ্চলকে  বাংলার কেন্দ্র ধরে নিয়ে , বর্হিবঙ্গ বা বৃহৎ বঙ্গের ধারণাটি প্রসারিত করার ইচ্ছা কোনও অর্থেই গ্রহনযোগ্য হতে পারে না ।

    আজ যদি বাংলাকে বাঁচতে হয় , বাঙালিয়ানাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয় , তবে মেনে নিতে হবে তার বহু দ্বীপ সমন্বিত চরিত্রকে । কোনও কেন্দ্রীয়তার বাঁধনে নয় , তাকে বাঁধতে হবে বাংলাভাষার বন্ধনে । যেখানে দাঁড়িয়ে কোনও তরুণ কবিকে যেন বলতে না হয় ,-‘ঢাকা আর কোলকাতা , পার্বত্য ত্রিপুরা থেকে ভৌগোলিকভাবে দুটোই পশ্চিমবঙ্গ !’ ‘হায় আত্মবীর্য , হায় বখরাসর্বস্ব চেকপোস্ট , বাংলাভাষা….’!

    কলকাতার কেন্দ্রিক চরিত্র এই বাংলাভাষাটিকেই হারিয়ে ফেলছে । তাই ইদানিংকালে বইয়ের দেশ পত্রিকায় কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তকে এক সাক্ষাৎকারে বলতে হয় ,-“কলকাতার মানুষ তার ভাষা ভুলে গিয়েছে । আমার তো ভাষাগত আত্মপরিচয় । তাই ভয় হয় , কলকাতায় এলে বাংলা ভুলে যাব ।“

    বাংলাভাষা এখন আর কলকাতায় নয় , বেঁচে আছে গ্রামে গঞ্জে , বিশ্বের বিভিন্ন কোণে , কিছু ব্যাক্তিগত ও গোষ্ঠিগত প্রচেষ্টায় ।ভাষাভুগোলের এইসব খন্ড খন্ড অঞ্চলগুলো , যাকে মূলস্রোতের বাইরের করে রাখা হয়েছে , গ্লানি ও বেদনায় এই অঞ্চলগুলো যদি হারিয়ে যায় ভাষার ভুগোল থেকে , তা কি সেই ভাষাভুগোলেরই ক্ষতি নয় ? পশ্চিমবঙ্গীয় মেধাকে আজ ভাবতে হবে , বাহির বা বৃহৎ ধারণার বাইরে গিয়ে , ভাষার প্রশ্নে একটি নতুন ভুগোল গড়ে নেয়ার ভাবনা । যেখানে অন্তত ভাষাগত আত্মপরিচয়ের সূত্রে গড়ে উঠবে নতুন বাঙালিয়ানা ।

রবিবার, ২ ডিসেম্বর, ২০১২

ডুগডুগি বাজাই

শিবের গাজন কথাটা শুনলেই , আমার কেন যেন একটা উলট পালট ব্যাপার মনে হয় । মনে হয় , স্হিতাবস্থাকে পাল্টে দেওয়ার নামই গাজন । মাঝে মাঝেই যখন মেয়েকে শোনাই , “আমরা দুটি ভাই / শিবের গাজন গাই “ , তখন দুই ভাই কথাটার চেয়েও , শিবের গাজন কথাটাতেই জোর বেশি পড়ে । আর এই ছড়ার এটুকু পড়লে মনে হয় , শিবের কীর্তিগাঁথা গাওয়ার নামই গাজন । 
          শিবঠাকুরের যা চেহারা , পোষাকআশাক , চলনবলন , তাতে ভদ্রসমাজে তার তেমন প্রভাবপ্রতিপত্তি থাকার কথা নয় । বরবেশী তাকে দেখে শ্বাশুড়ি সনকাকে ঘোমটা টানতে হয় লজ্জ্বায় , কারণ জামাই নেংটা । এতদূর প্রথাবহির্ভূত যার চলন , তাকে স্বীকার করে নিতে প্রথাগত সমাজ দুটো কারণে বাধ্য হয় , এক তার প্রথাবিরোধীতা যদি বেশিরভাগ মানুষের সমর্থ পায় , অথবা সেই প্রথা বিরোধিতা সমাজকে পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে । 
        শিবঠাকুরের ক্ষেত্রে দেখা গেছে , প্রথম থেকে এখন অব্দি তার ভক্তরা ঠিক যাকে বলে সামাজিক ভদ্দরলোক তেমন নয় । সমাজ যাদের নিম্নবর্গ বানিয়ে রেখেছে , হাড়ী , মুচি , বাগদী , শব্দকর , মালাকর , কৈবর্ত , জেলে-মালো শ্রেণীর লোকেরা , তারাই তার ভক্ত । শিবের গাজন বা চড়কের মূল অনুষ্ঠানটা হয় চৈত্রমাসের সংক্রান্তিতে । একমাস , অর্থাৎ পুরো চৈত্রমাস মানত রেখে , গেরুয়া বা লালশালু কাপড় পড়ে শুদ্ধাচার পালন , ভিক্ষান্নে একবেলা হবিষ্যান্ন ভোজন করে জীবনধারণ করে,  একধরণের আত্মসংযম আর আত্মপীড়নের মধ্য দিয়ে গৃহীরাও সন্ন্যাসজীবন যাপন করতেন । তাদের বলা হতো ভক্তা বা সন্ন্যাসী ।এখন এই যে সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করা নিম্নবর্গের মানুষ , গাজনের নাচ বা গান গাইছেন , এর সঙ্গে প্রথাবিরোধিতার একটা যোগসূত্র খোঁজার কারণ কি শিবঠাকুরের নামটাই ?
            উনিশ শতকের “কলিকাতার ইতিবৃত্ত” য়ে প্রাণকৃষ্ণ দত্ত জানিয়েছেন , “ গাজনের সন্ন্যাসীদিগের মধ্যে হাড়ী , মুচি , বাগদী প্রভৃতি ইতরজাতীয় লোকেরাই বাণ ফুঁড়িত , উপবীতের ন্যায় একগোছা সুতা গলায় পরিধান করিত “,  এই উপবীতধারণ করার         ব্যাপারটাই তো সামাজিকভাবে একধরণের প্রথাভাঙা বা প্রথাবিরোধীতা । যা কোনও অর্থেই উচ্চবর্গের মানুষের কাছে স্বস্তিদায়ক ছিল না । তবু কৃচ্ছসাধনের এই একমাস ব্রাহ্মণ ছাড়া অনেকেই তাদের প্রণাম করতো , আদরের সঙ্গে ভোজন করাতো । 
         হুতোমের নকশায়ও দেখা যায় ,-“বুড়ো মূল সন্ন্যাসী কানে বিল্বপত্র গুঁজে , হাতে এক মুটো বিল্বপত্র নিয়ে , ধুঁকতে ধুঁকতে বৈঠকখানায় উপস্থিত হলো ; সে নিজে কাওরা হলেও আজ শিবত্ব পেয়েছে , বাবু তারে নমস্কার কল্লেন ; মূল সন্ন্যাসী এক পা কাদাসুদ্ধ ধোব ফরাশের উপর দিয়ে বাবুর মাতায় আশীর্ব্বাদী ফুল ছোঁয়ালেন ,--বাবু তটস্থ !” তাহলে দেখা যাচ্ছে , হাড়ী , কেওট সম্প্রদায়ের মানুষ , যারা সামাজিকভাবে নিম্নবর্গ হিসাবে পরিচিত , তারা চৈত্রমাসব্যাপী শিবের গাজন গাওয়ার মাধ্যমে , সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধাচারণ করেও , একধরণের সামাজিক মর্যাদা আদায় করে নিতেন । 
            এতসব কথা মনে এলো যদিও , মেয়েকে শোনানোর মতো নয় । আর বললেও আমার এই ছোট্ট মেয়ের এতসব বোঝার বয়সই হয় নি । তাই নিজের মনে মনেই আওড়াই , কোন দুটি ভাই , এই শিবের গাজন গাইছি ? 
          
         শিবের দুই অনুচর ,-নন্দী ভৃঙ্গী ? নাকি কার্তিক গনেশ ? ছড়াটি তো সোজাসুজি বলছে দুই ভাই শিবের গাজন গাইছে । তাদের ঠাকুমা গয়া-কাশী গেছে , তারা ডুগডুগি বাজাচ্ছে । ডুগডুগি বা ডমরু কোনও অভিজাত বাদ্যযন্ত্র নয় । শিবের বাদ্যযন্ত্র । ছোটবেলায় ডুগডুগি বাজানো দুইধরণের লোক দেখেছি । শোনপাপড়িওয়ালা আর ভালুকনাচ দেখানেওয়ালা । এদের যে কেউ ডুগডুগি বাজালেই পেছন পেছন ছুট লাগাতাম । আর এরা কেউ সামাজিকভাবে উঁচুস্তরের লোক ছিলেন না । অথচ যে দুইভাই ডুগডুগি বাজাচ্ছে , তাদের ঠাকুমা যদি গয়া-কাশী নামের তীর্থে গিয়ে থাকেন , তবে তারা যে খুব একটা নিম্নবর্গীয় কেউ নন , তা স্পষ্ট । এই দুইভাইয়ের জট ছাড়ানোর আগে , গাজনের এই প্রথা বিরোধিতার উৎসটা একটু গভীর থেকে বুঝে নেওয়া দরকার । 
          বৈদিক ভারতে অথর্ববেদের আগে শিব ঠিক ততটা আর্যীকৃত হন নি । রবং দক্ষরাজার যজ্ঞে শিবকে আমন্ত্রণ না জানানোর বিষয়টি , আর্যঅহমিকার চিহ্ন হয়ে থাকলো । পরবর্তী দক্ষযজ্ঞ বিনষ্টিকারী শিব এবং শিবগণ ভীতিপ্রদ ও অনিষ্টকারী হিসাবেই স্বীকৃত হয়েছিল । আজকের মতো তখনও , শিব মূলত নিম্নবর্গীয় মানুষদেরই পূজ্য ছিলেন । 
        বৈদিক সমাজের যাগযজ্ঞে ঋষিরা ইন্দ্র , মিত্রবরুণ , ব্রহ্মার উদ্দেশ্যে হোম করতেন । ঋষি ব্রাহ্মণেরা ছিলেন উচ্চবর্গীয় , বেদ গান ও শ্রবনের অধিকার ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় ব্যাতিরেকে আর কারও ছিল না , অর্থাৎ বেদ যদি জ্ঞান হয় , তবে সেই জ্ঞানের আওতা থেকে বাইরে ছিলেন নিম্নবর্গীয় মানুষ । আর এটাই ছিল সামাজিক প্রথা । 
         সেই বৈদিক আমলেই , একদল ব্রাহ্মণ ঋষি এক আন্দোলনের সৃষ্টি করেছিলেন । ঋষি জরৎকারুকে মনে পড়ে ? এখান থেকে ওখানে ঘুরে বেড়ান । পূর্বপুরুষদের অনুরোধে বংশরক্ষার জন্য বিয়েতে রাজি হলেন , কিন্তু শর্ত এই , মেয়ের নাম হতে হবে তার নামে ।  পুরাকথায় মনসা জরৎকারুর স্বামী  এই ঋষি জরৎকারু “যাযাবর”গোত্রের ব্রাহ্মণ । এদের বলা হতো “ব্রাত” । এই ভ্রাম্যমান দলের সকলকে বলা হতো “ব্রাত্য” । তাদের গাওয়া সামগানের নাম “ব্রাত্যস্তোম” । 
          এই ব্রাত্যস্তোম বা সাম গানের যে বর্ণনা পাওয়া যায় , তাতে মনে হয় , “ব্রাত্যস্তোম” হয়তো একধরণের শুদ্ধিযজ্ঞই ছিলো । প্রথা অনুযায়ী বৈদিক যজ্ঞে মাত্র একজনই যজমান থাকে , কিন্তু “ব্রাত্যস্তোম”য়ে হাজার হাজার যজমান থাকতে পারতো । সকলেই “ব্রাত্যস্তোমের পর পবিত্র হতেন এবং ঋষিদের সঙ্গে একত্রে খেতেন এবং রান্না করে খাওয়াতে পারতেন । ঋষিরা যজমানদের তিনবেদ পড়তে দিতেন । এই যে প্রথাবিরোধী একদল ব্রাহ্মণ , সমাজিক নর্মসের তোয়াক্কা না করে , চন্ডাল ব্রাহ্মণ সবাইকে সবাইকে সমান  বানিয়ে , তিন বেদ পড়ার অধিকার দিয়ে দিচ্ছেন , তা কি একধরণের উলট পালট নয় ? এই যাযাবর “ব্রাত্য” ব্রাহ্মণদের দেবতা শিব । আগে “ব্রাত্যস্তোম” যখন তখন , যে কোনও সময়ে হতো , পরে একটি নির্দিষ্টদিনে এই হোম শুরু হয় । 
           আজও চৈত্রসংক্রান্তির আগের রাতে শিবের গাজনের নাম -হোমপর্ব । ব্রাত্যস্তোমের মতোই গাজনেও চন্ডাল ব্রাহ্মণ সবাই উপবীত বা উত্তরীয় গ্রহণে সমান হয়ে যায় ।তাহলে কি সুদুর অতীতের ব্রাত্যস্তোমের স্মৃতিই কি কোনও না কোনও ভাবে থেকে গেল আজকের গাজন উৎসবেও ? যেখানে হাড়ী কেয়ট মুচী বাগদীরাও সন্ন্যাসী হয়ে একমাস সামাজিক মর্যাদা  ও  প্রভাব দেখানোর সুযোগ পেতো ? ব্রাত্যস্তোমের সেই সামাজিক নর্মসকে পাল্টে দেওয়ার প্রচেষ্টাই কি ধরে রাখে নি এতযুগ পরেও গাজনের উৎসব ? 
   সে না হয় হলো , কিন্তু শিবের গাজন গাওয়া এই দুই ভাইয়ের হদিস কীভাবে পাই ?আমরা দুই ভাই    কারা ?    খুঁজতে খুঁজতে কি আমাদের কলকেতায় যেতে হবে ? উনিশ শতকের বাংলার পথনির্দেশক মাইল ফলকটি তো কলকাতার দিকে তীরচিহ্ন দিয়ে আঁকা । সহজে দু’পয়সা রোজগারের আশায় গ্রাম থেকে দলে দলে বিভিন্ন পেশার লোক এসে ভিড় জমিয়েছিলেন কলকাতার বিভিন্ন পাড়ায় টোলায় । তাদের মধ্যে কেউ কেউ সাহেবদের মুৎসুদ্দিগিরি করে হয়ে উঠেছিলেন নয়া কলকাতার বাবু । কিন্তু গ্রামীণ সংস্কৃতিকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া তখনও সম্ভব হয় নি , নগর কলকাতার পক্ষে । ফলে নাগরিক নকুবাবু ছকুবাবুরা তাদের পুরনো আত্মপরিচয়টি যেমন অস্বীকার করতে পারেন না , তেমনি নব্যধনীর নতুন পরিচয়ে “জাতির কর্তা রাজীব রায়”কে উপেক্ষা করে “অক্কুর হল দত্ত , নকুড় হল ধর” । এই দোটানায় নগর কলকাতায় যে চড়ক বা গাজন সংস্কৃতি এসেছিল , তা অবিকল গ্রামীণ নয় । আজও গ্রাম বাংলায় ঢাকের নাচ , বাধনদার কাটনদারের কথা সুর তালের খেলা থেকে দূরে , কলকাতার বাবু কালচারে জন্ম নিয়েছিল , গাজনের সঙ । আর এই সঙের দলগুলোর পৃষ্ঠপোষকও থাকতেন কোনও না কোনও বাবু ।এই বাবুরা অন্তত প্রথাগত বাঙালি বর্ণ-সমাজকে তোয়াক্কা না করে , নিজেদের পছন্দমাফিক উচ্চ বর্ণে ওঠার যে তৎপরতা দেখিয়েছিলেন , তা প্রথাবদ্ধ সমাজের উপর একধরণের শিবের গাজন তো বটেই । 
        
    ধন-বলে বলীয়ান , এই নতুন সমাজ কর্তাদের পেছুটান তাদের পিতমহীদের তীর্থদর্শনে পাঠানো আর এক ধরণের আভিজাত্য প্রদর্শন অন্তত তৎকালীন হিন্দু সমাজের কাছে । আর এই কর্মটি করা মানে , নিজেদের সামাজিক প্রতিষ্ঠার পূর্ণতা । সুতরাং এখন সমাজে ডুগডুগি বাজানো বাজিকর হয়ে উঠেছে , কলকেতার নব্যধনী দুইভাই । তাদের দিকে ঈষৎ বাঁকা চোখে তাকিয়ে , উনিশ শতকের কলকাতার স্বভাবকবিত্বের তীব্র উচ্চারণ হয়ে যদি এই ছড়াটির জন্ম হয়ে থাকে , তা কি খুব অস্বাভাবিক মনে হবে ?
মেয়ে অনেকক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল , টের পাই নি । হঠাৎ বললো ,-বাবা , তোমার ঠাকুমাও কি গয়া কাশী গেছে ? 
 না রে । আমার ঠাকুমা পৃথিবী থেকেই চলে গেছে ।
 মনে মনে বললাম , তোর মেয়েকে কি তুই বলবি , তোমার ঠাকুমা বৃদ্ধাশ্রমে গেছে ?
সে আরেক কাশী । এই যুগের কাশী ।
কেন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে ? -মেয়ে বললো ।
আমি যেন ডুগডুগি না বাজাই ।
মেয়ে চোখ ছলছল করে বললো ,-আমি আর ডুগডুগি বাজাবো না । আম্মুকেও কোত্থাও যেতে দেবো না ।

(c) Picture: ৌজন্যঃ সামহোয়ারিন ব্লগ এবঅন্যান্য 

শনিবার, ১৩ অক্টোবর, ২০১২

উপন্যাস ‘কমলিনী উপাখ্যান’: একটি সহজ পাঠ

“এই মেয়েটিরে লইয়া তাহার ভিতরে ময়ূরপঙ্খের তুল্য আকাশ; বৃষ্টির বিন্দুমাত্র চিহ্ন নাই, অথচ কান্দিতে আছে—যা এই হাৎকা হইয়া উঠা নাগরেরা চোখের নাগালে পায় না। তাই মস্করা ইত্যাদি, মণ্টু ঘোষের দোকানে, বিপ্রকে স্পর্শে না। গ্যাঁজাইবার বিষয় অভাব হইলে , যদিও ইয়েনান বক্তৃতা হইতে লোডশেডিং পর্যন্ত হাজার বিষয়, তবু মেয়েটির বৃত্তান্ত একা ঘুরিয়া বেড়ায়। এবং গ্যাঁজাইবার আবেগ ক্ষীণ হইলে, বিপ্র ভূমিকাহীন প্রস্থান করে। ঘোষের দোকানে ইহা নিত্য ঘটনা, বিশদে বলিবার কিছু নাই। যদিও পরবর্তী ঘটনা সকলের গোচরে ঘটেনা, উহা কমলিনীর পাঠক্রম।”—এভাবেই শুরু হয়েছে পল্লব ভট্টাচার্যের উপন্যাস ‘কমলিনী উপাখ্যান’ । উপন্যাসটি কমলিনীর পাঠক্রমই বটে। আশির দশকের মাঝামাঝি ১৯৮৫-৮৬তে পল্লব যখন সদ্য কৈশরোত্তীর্ণ তরুণ, তখন লেখা এই উপন্যাস ছেপে বেরিয়েছে এই সেদিন ফেব্রুয়ারি, ২০১২তে। বের করেছেন ত্রিপুরার বিখ্যাত প্রকাশক ‘অক্ষর’। কিছু কিছু লেখা আছে লোককথার সেই কচ্ছপের মতো এগিয়ে গিয়ে পাঠকের দরবারে পৌঁছোয়। আর আমাদের পূর্বোত্তরের কোনো প্রকাশনা হলেতো আর কথাই নেই।সবারই প্রায় ভাগ্য সেই একই। পল্লবের উপন্যাসটি তাই। খুব পরিচিত নয়, কিন্তু আমি নিশ্চিত যারা পড়ে ফেলেছেন একবার কমলিনীর প্রেমে পড়ে গেছেন, নিশ্চিত। কমলিনীর তাঁর ভাবনাকে গ্রাস করবে, এবং ‘বৃত্তান্ত একা’ ঘুরে বেড়াবে। আমাদেরও তাই হয়েছে। কেন, বলছি।
                  তার আগে জানিয়ে দিই, পল্লব ত্রিপুরা নিবাসী। পূর্বোত্তরের বাংলা কথা এবং কবিতা সাহিত্যে তিন দশক ধরে এক পরিচিত এবং সম্মানিত নাম। যারা সাহিত্য পাঠ করেন নিত্য, তাঁরা পল্লবের লেখা না পড়ে ফেলে রাখেন না। নিত্য পাঠ যাদের অভ্যাসে নেই তাঁরা হয়তো তাঁর নাম জানেন না তেমন, কেননা পল্লব প্রচার যেদিকে-- হাঁটেন তাঁর উল্টো পথে। যে পথে কমলিনী হাঁটে । একা নিঃসঙ্গ।
                  কী নিয়ে লিখেছেন উপন্যাস? ওই যে লিখেছেন ‘উহা কমলিনীর পাঠক্রম।” এইটেই উপন্যাসের বিষয় বটে।কমলিনীর পাঠক্রম। ‘...তবু মেয়েটির বৃত্তান্ত একা ঘুরিয়া বেড়ায়।’ সেই বিপ্র আর কমলিনীর প্রেমের কথাতে কথাতে আসছি পরে। কিন্তু এ মন্টু ঘোষের চায়ের দোকানে বসে যে আড্ডা, সেই আড্ডার কাহিনিও বটে। আড্ডার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা, আড্ডার থেকে বেরিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর জীবন বৃত্তান্ত। পড়তে পড়তে মনে হয় যেন, এই জীবন এক বৃহৎ আড্ডাশালা। আমাদের কোন অসুবিধে নেই যদি পাঠকের মনে পড়ে যায় সেই বিখ্যাত শব্দটি , ‘মধুশালা।’ হরিবংশরাই বচ্চনের সেই বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থটির নাম। সেই আড্ডাতে ‘গ্যাঁজাইবার আবেগ ক্ষীণ হইলে’ বিপ্রের মতো কেউ কেউ কমলিনীর সন্ধানে ‘ভূমিকাহীন প্রস্থান করে’ মাত্র। উপন্যসের শেষে বাসে চড়ে বিপ্র সেই বৃহৎ আড্ডাশালা থেকে তাই করে।
                এবারে, আড্ডার কাহিনি লেখক লিখবেন কী করে? আড্ডার কি আর কোনো পুনরুপস্থাপন সম্ভব? সেতো এক মহা বিশৃঙ্খল ব্যাপার। আড্ডাতে বসে আমরা করি বটে গল্প। কিন্তু সে গল্পের কি আর কোনো শুরু আছে, না শেষ? দ্বিতীয় ব্যক্তিটি এসে কথা বলতে শুরু করলেই শুরু, এবং শেষ ব্যক্তিটি উঠে গেলেই শেষ। মাঝের খেই কে কবে ধরতে পেরেছে? সেখানেতো কথা হয় ‘ইয়েনান বক্তৃতা হইতে লোডশেডিং পর্যন্ত হাজার বিষয়’ নিয়ে। সেই অসাধ্য সাধনের এক পরীক্ষা করেছিলেন সদ্য কৈশরোত্তীর্ণ তরুণ লেখক। এবং আমাদের অভিমত তিনি আশ্চর্যরকম সফল হয়েছিলেন।আড্ডার সমস্ত রং রূপ এনে এই উপন্যাসে তিনি হাজির হয়েছেন। এমনকি তার ভাষাটিও। তাই কিছু কিছু পাঠকের মনে হবে বড় বিশৃঙ্খল বয়ন এর। সে অর্থে কোনো কাহিনি নেই। চরিত্রগুলো গল্পের টানে গড়ে উঠেনা, লেখকের সৃজনী ইচ্ছার টানে গড়ে উঠা চরিত্রগুলো যখন খুশি তখন এসে হাজির হয় এসে । লেখকও যদি আড্ডা দিতেন পাঠকের সঙ্গে তবে তিনি যে বিশৃঙ্খলার সূত্র মেনে চলতেন, পল্লব তাই করেছেন। ফলে যে পাঠক আড্ডার মেজাজে না বসবেন , তিনি বইটা হাতে নিয়েও মাঝপথে পড়া ছেড়ে দিতে পারেন। তাই বলে, সত্যিই কিন্তু বিশৃঙ্খল নয় এই উপন্যাস। এমনটা হয় না, যদি লেখক পাকা হন। কেউ কেউ আজকাল কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে বলেন বটে, জীবন বড় বিশৃঙ্খল, সুতরাং সাহিত্যও হবে সেরকমই। কিন্তু সে হচ্ছে অর্ধবিজ্ঞান এবং অর্ধ সাহিত্য তত্ত্ব। বিশৃঙ্খলার যে তত্ত্বটি রয়েছে বিজ্ঞানে, ইংরেজিতে যাকে বলা হচ্ছে ‘কেওস থিয়োরি’, সে কিন্তু শেষ অব্দি এক শৃঙ্খলার কথাতে এসেই শেষ হয়, না হওয়া অব্দি তৃপ্ত হয় না। পল্লবের উপন্যাসটিরও রয়েছে সেরকম শৃঙ্খলা। তাঁর এক চরিত্র অশেষ গুপ্ত এক জায়গাতে বলছিলেন, “ তত্ত্বের সৌন্দর্য বড়ো কথা নয়। পরীক্ষার সঙ্গে না মিলিলে সেটা ভুল তত্ত্ব।” আমরা জানিনা, পল্লব সেরকম কিছু তত্ব্ব নিয়ে পরীক্ষা করছিলেন কিনা, কিন্তু তার উপন্যাস ‘বিশৃঙ্খলা’র তত্ত্বকে সত্য প্রমাণিত করে যেন। বস্তুত তাঁর উপন্যাসটি জীবনের সেই শৃঙ্খলারই সন্ধানের গল্প। কমলিনী সেই শৃঙ্খলারই নাম। আমরা কমলিনীর কথাতে আসব পরে। সেটি থাক শেষ পাতে আকর্ষণের মতো। আপাতত আড্ডার মানুষগুলোকে চেনা যাক। আড্ডা বলেই কথা। একে ধরতে গেলে আমাদেরকেও পল্লবের পথেই বুঝিবা হাঁটতে হবে, বহু কথা ধরা দেবে, বহু কথা নয়।
             কারা আসেন মন্টু ঘোষের দোকানে? বিপ্র আসে সেতো জানাই গেল। আসে যুধিষ্ঠির, হিমাদ্রি, শ্যামল, পার্থ, সৌরীন আরো অনেকে। অবনীমোহন যেমন বিপ্রের বাবা, লাবণ্য মা--তেমনি নানা চরিত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যাদের দেখা মন্টু ঘোষের দোকানে পাওয়া যাবে না। কিন্তু উপন্যাসে রয়েছেন। যেমন, প্রসন্ন চৌধুরী, তাঁর স্ত্রী দীপালি, উপপত্নী মীনারানি, অখিল, বিনয় মন্ডল, অশেষ গুপ্ত, রঞ্জন, জবা, নুনু, গরিবা, নিরাপদ, প্রতিমা, আব্বাস আলি ইত্যাদি। এরা কোথাকার লোক, কোন শহর কিম্বা প্রদেশের কোনো তথ্য নেই। কিন্তু অধিকাংশ চরিত্র পাহাড় ঘেরা সমতলের এক আধাশহরের বাসিন্দা বলে মেনে নিতে কোনো অসুবিধে নেই। তার উপর, ভাষাতে ওমন পূর্বোত্তরীয় প্রচুর নাম-ক্রিয়াপদের অনুপ্রবেশ দিয়েও লেখক নিজেই ইঙ্গিতটি দিয়ে রেখেছেন যে এটি আসলে ত্রিপুরারই গল্প।
              “মণ্টু ঘোষের দোকানের যা হাল, তাহাতে কীই বা বেচিবার থাকে। আর এই দোকানে যাহারা কিনিতে আসে তাহাদেরও যে হালৎ, তাহাতে কেনাবেচা দুটোই হাস্যকর চেষ্টা। যুধিষ্ঠির তাই বলে, ঘোষের দোকানে তো কাস্টমার নাই, সব কাস্টকুমার” এই হলো সেই দোকান যেখানে আড্ডাটি বসে। বিপ্র এই আড্ডার পার্শিক চরিত্র, কিন্তু উপন্যাসের কেন্দ্রীয়। সে অবনীমোহন লাবণ্যের চতুর্থ সন্তান। তাঁর বড় ভাই ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে কাজ করে। বাড়িতে থাকা না থাকার সময় অসময় নেই। মেজো ভাই দূরে কোথাও থেকে ব্যক্তিগত কোম্পানিতে কাজ করে। ব্যস্ততা এতোই যে অবনীমোহনের মৃত্যুতেও বাড়ি আসার ছুটি পায় নি। আর সেজোটি অনেক কিছুই করে, কী –সেটি কেউ জানে না, মা লাবণ্যও না। তবে টাকা বানাচ্ছে এটা বোঝা যায়। কিন্তু বিপ্র বৈষয়িক অর্থে কিছু করে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার ছাত্র ছিল এখন চিন দেশের লংমার্চের কাহিনি পড়ে। আর কমলিনীর সন্ধান করে। বিপ্র কী করে খাবে, ভেবে মায়ের চোখের জল ঝরে। বাবা অবনীমোহন কিছু একটা চাকরি করতেন, তিরিশ বছর চাকরি করে লোয়ার থেকে আপার ডিভিশনে উঠেছিলেন। কিন্তু শ্বাস ফেলে টের পেলেও বেঁচে যে ছিলেন সেটি টের পেতেন না। বিড়িতে তেতো টান দিতেন, মানে খুব একটা স্বচ্ছল জীবন ছিল না। তাঁর শেষ জীবনে বেকার বিপ্র যখন ভাতের গ্রাস মুখে তুলত মনে হতো বাবার হাড় চিবুচ্ছে। নিজেকে মানুষ ভাবতে ঘেন্না করত। লেনিনের ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে কী করিতে হইবে?’ পড়তে পড়তে বিপ্রের মনে হয়, কোথায় পৌঁছুবেন না জেনেও বাবা কিন্তু বেঁচে থাকতে চান। না চাইলেই কি আর অনর্থক মরে যাওয়াটাও উচিত? এর মধ্যে কি আছে কোনো বীরত্ব? এই সব প্রশ্ন তাকে কিম্বা লেখকে তাড়া করে। ওদিকে গোপন বিপ্লবী দলের কর্মী কবি অশেষ গুপ্তের লাস যখন পথের পাশে পড়ে থাকতে পাওয়া গেল, তখন তাঁর প্রতি সমস্ত শ্রদ্ধা নিয়েও কৃষ্ণসুন্দরের মনে হয়, এও এক অর্থহীন অপরিপক্ক মৃত্যু। দেশের জন্যেও মরবার সঠিক মুহূর্ত সেটি ছিল না। তবে কিনা বিপ্রের এই জিজ্ঞাসা উত্তরাধীকার সূত্রেই পাওয়া। কোন এক মুহূর্তে অবনীমোহনের মনেও প্রশ্ন জাগে, ‘মায়া যাহাকে জড়ায় সে অবনীমোহন হয়। অবনীমোহন হইয়া কী পাওয়া গেল?’ তাঁর আক্ষেপ, ‘...ফুরাইবার আগে একবার দপ করিয়া জ্বলাও হইল না।’। সেই জ্বলার আশাপ্রদীপ, তিনি বিপ্রের মধ্যে জ্বলে উঠবে বলে মনে করেন। বিহারি গরিবা গাঁজাও বিক্রি করে। তার সঙ্গে বিপ্রকে দেখে তাঁর সন্দেহ হচ্ছিল, তিনি যে তাকে স্বপ্নের সফরি ভেবে নিশ্চিন্ত থাকতে চাইছিলেন, সে চাওয়া কি ভুল ছিল? এ তাঁর সন্দেহ ছিল মাত্র। বিপ্র বস্তিবাসীদের জীবনের আঁচ নিতে গিয়ে গাঁজাতে টান দিয়েছিল বটে, হাত জোড় করে গরিবাই মানা করেছিল। যাতে করে নিজেকে তার মনে হয়েছিল, সে গরিবারও সন্তান। সেই গরিবাই পথে পেয়ে তাকে একদিন বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার সংবাদ দিয়েছিল।
                কৃষ্ণসুন্দর বয়সে প্রবীণ। খুব যে বয়স তা নয়, ছেচল্লিশ। এই বয়সেই যেন মনে বুড়িয়ে গেছেন। শ্মশানে দাঁড়িয়ে অবনীমোহনের শরীরে পুড়ে যাওয়া দেখে মনে হচ্ছিল, ‘কত কিছু হইতে চাওয়া আর না পারা একটি শরীর ধোঁয়াতে মিশিয়া যাইতেছে...পুড়িয়া যাইতে আছে। মনে মনে তিনিও পুড়িতেছেন।’ বিপ্রের ভাবগুরু কি অনেকটা? না হলেও পরিপুরক। মানে তাঁর জিজ্ঞাসা যেখানে থৈ পাচ্ছে না, সেখান থেকেই বিপ্রের শুরু। মন্টু ঘোষের দোকানের ধুলিকালির বেড়াতে বহুদিন ধরে ঝুলন্ত উড়ন্ত এরোপ্লেনের ছবি ওয়ালা ক্যালেণ্ডারের দিকে তাঁকালে তাঁর বিষন্নতা বাড়ে। গতির এমন স্থির চিত্র এ জীবনে আঁকা হবে না ভেবে, পাক ধরা চুলে হাত বুলিয়ে তিনি আন্মনে বলে উঠেন, “যৌবন যায়...” । ছেলেবেলা কিচ্ছু না বোঝে ‘ভুলো মৎ, ভুলো মৎ’ স্লোগানে গলা মিলিয়ে জেঠার হাতে মার খেয়েছিলেন। বোধকরি, ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়’ স্লোগানের দিকে লেখকের ইঙ্গিত। রাতে বিধবা মা তাঁকে বুঝিয়েছিলেন, ‘সত্য কথা কহিতে নাই।’ ছোটবেলার স্বাধীনতা মানেই রিফিউজি কলোনির স্কুলে চকলেটের দিন। বন্দেমাতরম বলে চিৎকার করবার দিন। স্বাধীনতার মানে বুঝবার দিন নয়। বোঝেনও নি । জেঠার গলগ্রহ হয়ে বড় হয়েছেন। বড়বেলাতে বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়া দেখেছেন। কিন্তু স্বাধীনতার যে মানে তিনি বোঝেছেন, তা দেখেন নি কোথাও। কলকাতাতে (নামটি নেই, মহাকরণের উল্লেখ থেকে আমাদের অনুমান) কলেজ পড়া কৃষ্ণসুন্দরের জীবন থেকে একে একে চলে গেছে বন্ধুরা, উৎপল, ত্রিদিব, খুকু, শুভেন্দু...। কেমিস্ট্রির ছাত্র ত্রিদিব সত্তরের নকশাল আন্দোলনে সময়ের আগে বোমা ফোটাতে গিয়ে ‘ঠুণ্ডা জগন্নাথ।’ বোমা ফুটুক, কিন্তু সমস্ত প্রস্তুতির পর --এই ছিল কৃষ্ণসুন্দরের মনের বাসনা, যা তিনি এখনো মনে মনে লালন করেন। তাই জীবনের সমস্ত শ্লোগান মুছে ফেলে উৎপলের শেক্সপিয়র পড়াতে ফিলাডেলফিয়া চলে যাওয়া, তাঁকে ম্লান করে। খুকু ভালো গান করত, এখন হারমোনিয়ামে , ‘কিচেনের ভারে, গয়নার ধারে’ ধুলো জমেছে বহুদিন। শুভেন্দু করে মানবাধিকার সংগঠন সি আর পি সি। কৃষ্ণসুন্দর কোথায় তারা কেউ জানে না। তাঁর ধারণা, জানে হয়তো জবা। জবাকে নিয়ে রঞ্জনে তাতে এক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। এবং জবাকে নিয়ে গেছিল রঞ্জন। সেই রঞ্জন যে তাঁকে প্রথম বুঝিয়েছিলেন, ‘তাড়াহুড়া করে,বাইরে থেকে চাপ দিয়ে কিছু পাল্টানো যায় না...ভেতর থেকে পাল্টানোর জন্যে সময় দিতে হয়। ঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে হয়।’ বোঝাই যায় এই তর্ক তাঁর যৌবনের মার্ক্সবাদী কম্যুনিষ্ট দলের দুই লাইনের তর্ক। এবং রঞ্জনের পক্ষ কিছুদিন পরেই শাসনে বসেছিল। তার জন্যে কোনো সময়ের অপেক্ষা করে নি। ‘কী এক কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান হইয়া সেই রঞ্জন দত্ত, আজকাল তাহার সাদা অ্যাম্বাসেডরের ভিতরে বসিয়া কালো কাচ দিয়া বাহির দেখে।” জি-কে পরীক্ষাতে পাঁচ নম্বর ছেড়ে দিয়ে ছেলে সন্তানটি তার সমস্ত পরিশ্রমে জল ঢেলে দিয়েছে বলে লিপস্টিকে কদাকার ঠোঁট উল্টে জবা এখন দুঃখ করে। এখন সকাল থেকেই তিনি ‘জর্ডনের বিশুদ্ধ জল’ গলায় ঢালেন, এই কৃষ্ণ সুন্দরের নিত্য সঙ্গী। ‘সকল কিছুর পর উহাতেই মুখ দেখিতে হয়।’ অথচ এক কালে ইনি ভালো বাঁশি বাজাতেন। এখন মদ্যপানও তাঁকে উদাস করে। জীবনের নদী এখন মরে গেছে, মাছ দূরেই থাক , কাদাখোঁচাও আসবে না। শুধু ‘ঘুম আসিবে মৃত্যুতুল্য আচ্ছন্নতায়...।’ ভাবতে ভাবতে কান্না পায় তাঁর কখনো...অধ্যাপক বুদ্ধিজীবি প্রশান্ত কুমার দেবের সভাতে বক্তৃতা শুনে পার্থ যখন কাগজের খবর পড়ে বোমা মারবার ইচ্ছেতে উত্তেজিত হয়, তাঁর তখনো মনে হয় নিজেকে পুড়িয়ে আলো হতে চেয়েছিলেন। এখন পড়ে আছে শুধু ছাই আর ধ্বংসস্তূপ। পিকেডি-র বক্তৃতা শুনতে শুনতে তার মনে পড়ে কলেজের দিনগুলোর সেই মূর্তিভাঙার বিপ্লবীআনার রাজনীতির কথা। বাস্তবতার বাইরে যা আজও মনকে লোভায় তেমনি এক অন্যতর মূর্তি যেন আজ আবার তৈরি করছেন পিকেডি আটটি খণ্ড দলিল জুড়ে জুড়ে। পাঠকের বুঝতে অসুবিধে হয় না, চারু মজুমদারের আটটি দলিলের কথা হচ্ছে। সেই বক্তৃতা শুনতে শুনতে তাঁর মনও যে আবার এতোদিন সামান্য উত্তেজিত হচ্ছিল না তা নয়। কিন্তু আবার মনে পড়ে যায় সৌরীণদা এখন পাগলা গারদে। নির্বাক। তিনি যেন সেই ভেজা দিয়াশলাই কাঠি যাতে আর কোনো অগ্নিগুণ থাকে না। ‘পুনরায় যদি রৌদ্র হইতে উষ্ণতাপ সংগ্রহ করা যায়, তবে জ্বলিলেও জ্বলিতে পারে এক আধটা কাঠি।’ সেই কাঠি যেন উপন্যাসের শেষে এসে তিনি খুঁজে পান বিপ্রের মধ্যে। কমলিনীর সন্ধানে বিপ্র যখন বাসে চড়ল, বিদায় জানাতে এসে কৃষ্ণসুন্দরের মনে হচ্ছিল বাসের ভেতরেও আসলে বসে আছে কৃষ্ণসুন্দর।
                 প্রসন্ন চৌধুরী আরেকটি বেশ বড় চরিত্র এই উপন্যাসে। তাঁরই যেন পরোক্ষ কিম্বা প্রত্যক্ষ শাখা প্রশাখা অখিল, রঞ্জন ইত্যাদিরা এবং তাঁর স্ত্রী দীপালি অবশ্যই। তাঁকে না বুঝলে আসলে বিপ্র কৃষ্ণসুন্দরের এহেন হতাশার কিছুই বোঝা হবে না।যদিও ইনি ঘোষের দোকানের আড্ডার কেউ নন।বাংলার শিক্ষিকা স্ত্রী দীপালি আর কলেজের হোস্টেল ছেড়ে আসা মেয়েকে নিয়ে তাঁর ছোট সংসার। পার্টি করতে করতে আর নির্বাচন লড়তে লড়তে , মেয়ে বৌএর দিকে নজর দিতে পারেন নি খুব। তাই মেয়ে যখন হোস্টেল ছেড়ে আসে, পাশে বসিয়েও কারণটি জিজ্ঞেস করে উঠতে পারেন নি ভালো করে। যৌবনে স্বাধীনতার জন্যে লড়েছিলেন, কিন্তু স্বরাজ আসেনি বোঝেন। জীবনানন্দের কবিতা বুঝতেন, কিন্তু এখনকার জীবনের মানে বোঝেন না। কিন্তু ইনি কৃষ্ণসুন্দর নন। ‘বহুৎ মাছ খাইয়া এখন বিড়াল তপস্বী হইয়া’ আছেন। জীবনের শেষ বেলাতে এসে এঁর ব্যর্থতা বোধ তাঁকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে যেন। মনে হয়, জীবনে সবই হয়ে গেল, যা চেয়েছিলেন তা নয় তেমন, যা চাননি তাই। তিনি কিছু করেন না যেন। নির্বাচনের সময় এলে পার্টি তার নাম নিয়েই ফেলে, তিনিও দাঁড়িয়ে পড়েন। জিতেছিলেন একবারই। তার নামে এক জমিও এসে গেছিল। কোন এক সেটেলমেন্ট বাবুর পেন্সিলের টানে বিনামূল্যেই। নির্বাচনের সময়ে নিজের কিছু নেই দেখাবার জন্যে সমস্ত স্থাবর সম্পত্তিই লিখে দিয়েছিলেন দীপালির নামে। আজ তাঁর সত্যি মনে হচ্ছে, কিচ্ছুটি নেই। তিনি নিঃস্ব। সেখানে তিনি নুনু-যতন-গরিবাদের বসিয়েছিলেন। যতনার মতো অনেকে তাই তাঁকে দেবতা জ্ঞান করে। দীপালির বড় ইচ্ছে এই জমির একটা হিল্লে করা, দালাল নিরাপদকে জুটিয়েছেন। এখন সেখানে এক ফ্যাক্টরি বসবে। প্রসন্নের ইচ্ছে নুনু-গরিবাদের লিখে দিয়ে দেয়া। গণি মিঞা উকিল তাঁর বন্ধু ছিলেন, মারা গেছেন। তিনি থাকলে বুদ্ধি দিতেন। এখন বৌ বলে কিনা, ‘বিনবায় ধরছে, ভূদান করবা? তা চুপে চুপে ক্যান, পত্রিকায় দাও, যাতে খবর হয়।’ জমি বিক্রির জন্যে দীপালি দালাল নিরাপদের সঙ্গে নিরাপদ যোগযোগ গড়ে তোলেন। নুনুদের বস্তিতে বিপ্রের যাতায়াত ছিল। তাদের মধ্যে গিয়ে সে এক তথ্যচিত্র করে, ‘পভার্টিঃ কজ অফ ইণ্টারনেল মাইগ্রেশন’। ব্যয় কোত্থেকে আসবে, বিনয় সেই প্রশ্ন উঠলে শ্যামল, যুধিষ্ঠিরেরা জবাব দেয়, চাঁদা তুলে হবে সেই চিত্র। ‘বস্তি উন্নয়ন কমিটি’ সম্প্রতিই শুধু বানিয়ে রেশন কার্ড পাইয়ে দেবার ব্যবস্থা করেছে সে এবং তার সঙ্গীরা । জমির মালিক প্রসন্ন চৌধুরী , এ কথা জেনে বলেছিল, ‘যারই হোক, জমি ছাড়বে না।’ জমি তাঁকে জমিদার বানিয়েছিল বটে। ইয়ার দোস্ত চ্যালাও ভাল জুটেছিল। তাদেরই কেউ তাঁর কাছে নিয়ে এসছিল সদ্য বিধবা মীনারানিকে । এসছিল কাজ চাইতে, তিনি ঠাই দিলেন খামার বাড়িতে। খামার বাড়িতে ধান তোলা, সেদ্ধ করা ছাড়াও আর যা কাজ তাকে করতে হয়েছিল, তাতে শরীর ছিঁবড়ে হয়ে এসছিল। শেষ কালে প্রসন্নের পায়ে পড়ে মীনারানি ভিক্ষে করেছিল , মরলে যেন তিনি মুখে আগুন টুকু দেন। দেন নি। সকালে যে খবর দিতে এসছিল তার হাতে টাকা কটা ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘দায় সারো’। তখনই আসছিল দীপালির সন্তান, মাতৃসদনে। এখন যখন মেয়ের ক্ষোভ বুঝে উঠতে পারেন না, ইচ্ছে জাগে, ‘সব যদি আবার নতুন করে শুরু করা যাইত...বড়ো ভুল হয়ে গেছে , মা...।’ বস্তুত প্রসন্ন চৌধুরীই বোধ করি সেই ব্যক্তি যিনি ‘কমলিনী’র বৃত্তান্তকে অনেক বেশি স্পষ্ট করেন। তিনি শাসক শ্রেণি এবং দলের লোক বটে, ব্যবস্থার ভেতরের লোক। কিন্তু ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক নন। ইচ্ছে করলেই সব পালটে দিতে পারেন না। বিপ্রের মনে একবার প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল, ‘নিজের জীবন কি সত্যই রচনা করিতে পারিতেছে! পারা যায়? পূর্বে রচিত না হইলেও, পারিপার্শ্বিক দ্বারা রচিত হইবার নানাহ সম্ভাবনা লইয়া, জীবন রচিত হইয়া চলিতেছে। ইহাতে হয় স্রোতে ভাসিতে হইবে, নয় প্রতিস্রোতে। প্রায় সকলেই বলে, সে প্রতিস্রোতে ভাসিতেছে, কিন্তু ইহা যে আদতে স্রোত নয়, একথাই বা কে নিশ্চিত বলিবে?’ সেই প্রতিস্রোতের স্রোতকে ভয় করছিল বিপ্র। কিন্তু সেই স্রোতেই গা ভাসিয়ে বিপন্ন প্রসন্ন চৌধুরী আসলে এই উপন্যাসের এক ট্রাজিক চরিত্র। তাঁর প্রতি ঘৃণার উদ্রেক ঘটিয়ে নায়ক খলনায়কের দ্বন্দ্বে জমিয়ে তুলতে যান নি পল্লব এখানেই তাঁর মুন্সিয়ানা। বরং প্রশ্নগুলোকেই আরো ঋদ্ধ করেন। তিনি হতে চেয়েছিলেন এক ‘না-পারা স্বপ্নের সওয়ারি।’ শৈশবে অক্ষম হাতে গোরা সৈন্যের দিকে ঢিল ছুঁড়েছিলেন। মড়কের রোগীর পথ্য কিনতে গিয়ে বাবার পকেট কেটেছিলেন। আখড়াতে লাঠি খেলা, ছুরি খেলা শিখেও বিশ্বাস করতেন ‘চরখা আর খাদিতে আত্মনির্ভর হইবে পচা পানার ম্যালেরিয়া গ্রাম।’ কিন্তু মাঝ বয়সে এসে স্বাধীনতার যে চেহারা দেখলেন এবং নিজেও আঁকলেন তাতে নিজেই অবাক হন। ‘তিনি ভাবিয়াছিলেন স্বাধীন সমাজের সেনা -পুলিশের দরকার হয় না। আজ স্বাধীনতাই সেনা ও পুলিশনির্ভর। হয়তো সেই চাওয়া এক শতাব্দীর কাজ ছিল না, তবু তাহারে মূর্তি বানাইয়া, তাহার ভাবনা সহ দেশকে এমন এক অটোমোবাইলে তুলিয়া দেওয়া হইয়াছে, যাহার ব্রেক নাই। ছুটিতে আছে এক অনিবার্য ধ্বংসের দিকে।’ ভয় হয়, আজকের ছেলেরাও কি সেই যৌবনের প্রসন্ন হতে গিয়ে বার্ধক্যের প্রসন্ন হয়ে পড়ছে? এখনো ইচ্ছে করে নিজেকে পাল্টাবার , কিন্তু চৌধুরী বংশের আভিজাত্যকে মরতে দিতে মন সায় দেয় না। তাঁর এই দ্বন্দ্বের শরিক নন স্ত্রী দীপালি। তাঁর সমস্যা অন্য। নষ্ট প্রসন্নের সঙ্গিনী ছিলেন আজীবন। নিজেকে এক সময় মনে হতো প্রসন্নের হাতের পুতুল। সেই পুতুল জীবন থেকে বেরিয়ে আসতেই তাঁর প্রয়াসগুলো সবল হয়েছে, যখন প্রসন্ন নিজেও আর পুতুল নাচাবার সামর্থ্য রাখেন না কোনো, চানও না। তাঁর গর্ভে মেয়ে এসছিল জ্যোতির্ময়ের সৌজন্যে। অপঘাতে সে মারা যায় । তার কাটা ছেঁড়া শরীরের ফুলে ওঠা, পচা টুকরোগুলো দিন দুই পরে পাওয়া গেছিল এক পুরোনো কুয়োতে। স্পষ্ট নয়, বোধকরি এর জন্যে প্রসন্নকেই দায়ী করেন দীপালি। ওদিকে মেয়ে একান্তে একদিন মায়ের পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে আবিষ্কার করে মাকে লেখা জ্যোতির্ময়ের চিঠি। সেই থেকে তাকে আর বোঝেন না, প্রসন্ন। শহরের কলেজের হোস্টেল ছেড়ে সে অন্য বাড়িতে গিয়ে উঠে। কোথায়, কেন –কেউ জানে না। ব্যর্থজীবন প্রসন্ন ইচ্ছে করলেই জিজ্ঞেস করতে পারতেন, “এ কী কৌতুক নিত্যনূতন/ ওগো কৌতুকময়ী ,/আমি যাহা কিছু চাহি বলিবারে/ বলিতে দিতেছ কই ।/অন্তরমাঝে বসি অহরহ/মুখ হতে তুমি ভাষা কেড়ে লহ ,/মোর কথা লয়ে তুমি কথা কহ/ মিশায়ে আপন সুরে।” জীবনের শেষ বেলাতে এসে মনে হয় এই প্রসন্নই শুধু নুনু-গরীবাদের মধ্যে পেয়েছিলেন কমলিনীর সন্ধান। কিন্তু তখন আর তাঁর করবার বেশি কিছু ছিল না বিশেষ। শুধু উপন্যাসের শেষের দিকে নিরাপদের জবানীতে বিপ্র জানতে পায়, যে মেয়ের সন্ধানে শহরে যাবার আগে চুপিচুপি তিনি জমির সবটাই নুনু-গরিবাদের লিখে দিয়ে গেছেন। বিপ্রও এই প্রথমই মনোযোগ দিয়ে জানতে এবং বুঝতে পারে, জমিটি তাঁর। নিজের বাড়িটি , যে টুকু বোঝা যায়, তাঁকে তুলে দিতেই হয় গোল্ডেন রিসর্ট কনস্ট্রাকশনের হাতে।
               এবারে আমাদের কমলিনীর কথাতে আসতেই হবে। রাধা প্রসঙ্গে শব্দটি অজস্রবার উচ্চারিত হয়েছে বাংলা কবিতায়, গানে। নিধু বাবুর টপ্পাতে আছে, “কমলিনী অধিনী তোমার, শুন অলিরাজ।সদত তোমারে, ভাবি হে অন্তরে, এই মোর কায।” উপন্যাসের শেষের দিকে রয়েছে, বাসে চড়ে বিপ্রের চলে যাবার পথের দিকে তাকিয়ে কৃষ্ণসুন্দর ভাবছেন, “ যাচ্ছিস, যা। জানি না, সেখানেও পাবি কিনা। তবে মনে রাখিস, কমলিনীর দিকে যাওয়ার চেষ্টাটাই আসল।”
                    কিন্তু কমলিনী কি কিছু করে না? সেও কি যায় না? উপন্যাসের শুরু হয়েছে কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে। ‘কমলিনী আমার নাম। আমারে দেখিতে সহসা আয়নার দরকার হয় না। যদিও অই ফুলটি, যাহা জাতীয়, আজ অবধি দেখিলাম না। তবু, নিজেরে যখন দেখি অই ফুলটির মনোলোভা টের পাই বিপ্রের চোখে।’ সে মেয়ে মেয়ে নয়, যে কমলিনী বা কমল ফুল দেখেনি। এই কথাটা এখন বলবার সময় এসে গেল। গুরুগম্ভীর শৈল্পীক কুশলতার সঙ্গে লেখক এক রসিকতাপূর্ণ চালাকি করেছেন পাঠকের সঙ্গে। পাঠকের মনে এক বাসনা জাগে বিপ্র-কমলিনীর প্রেম কাহিনি পড়বেন বলে। কথা যত এগোয়, তিনিও সেই ভ্রমের থেকে বেরুতে থাকেন বিপ্রের সঙ্গে সঙ্গে। অথবা বেরোন না। কমলিনী এক ভাবের নাম। অথবা এক মেয়ের নাম। এর সঙ্গে বিপ্রের আলাপ হয় বিনয়ের পাল্লাতে পড়ে। ভাব হলেও তার আবির্ভাব হঠাৎ হতে পারে নাতো। কেউ আলাপ করিয়ে দিতে হবে। লেখক পরিপক্কতার সঙ্গে কথাটি মনে রেখেছেন। বিনয় মন্ডল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিস্কের ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয় বলতে মনে পড়ল, ত্রিপুরাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা কিন্ত ১৯৮৭তে । উপন্যাস লেখা হয়ে উঠবার পরের বছর। তাতে ক্ষতি বৃদ্ধি কিছু হয় নি। বিপ্রের সঙ্গে যেচে এসে ক্যান্টিনে আলাপ। সেই আলাপ সাত মাসের ঘনিষ্ট বন্ধুত্বে পরিণত হলো। এই সাত মাসে, ‘কমলিনী কীরূপে থাকিয়া গেল, গড়িয়া উঠিল। গড়িয়া যে উঠিল, ইহাতে তাহার তেমন ভূমিকা নাই। হয়তো সময়ের জটিলতা। যে জটিলতা লইয়া আজিকাল ঘোষের দোকানেও সে বেমানান।’ বিনয় সপ্রতিভ তরুণ। তার ভেতরে বিপ্রের চোখে ধরা পড়ে যেন যেন এক স্বপ্নের দেশ। চুম্বকের মতো টানে বিপ্র তার অনুগামী হয়ে গেল। মন্টুঘোষের দোকানে একদিন যখন সব্বাই এক জ্যোতিষকে নিয়ে ব্যস্ত হয়েছিল। বিপ্রও খেলার ছলে হাত দেখিয়েছিল, জ্যোতিষ যা বলেছিল, উপন্যাসে সেও অর্থবহ, “আপনার কিছুই পাওয়ার নেই।’ শুনে বিনয় বলছিল, ‘ কিন্তু...বৈষম্য যতদিন থাকবে,...অন্তত হাত চেপেতো আর বসে থাকা যাবে না।” তার টেবিলে তখন গুয়েভারার ডাইরি। বিপ্রের মনে হলো বিনয়ের চোখে লেগে আছে আলো। বিনয়ের সঙ্গে করেই নুনুদের বস্তিতে যায় বিপ্র প্রথম। ‘মিডলক্লাস জীবনের বাইরে যাচ্ছি।’ এই ছিল বিনয়ের উত্তর।
                  এবারে, এই মিডিলক্লাস বাইরের জীবনটি কেমন? ‘গ্রামের বাইরে, বোধ হয় খাসভূমিতে, ঘর নয়, কতগুলা ঝুপড়ি, কোনমতে বান্ধিয়া রাখা, ভাল করিয়া বাতাস আইলে লণ্ডভণ্ড হইয়া যাইবে মনে লয়; এইগুলিতে উহারা থাকে। ভিতরে খাট পালঙ্ক দূরে থাক, একটা কাঁথা কী বিছানাও নাই। দেখিয়া অবধি তাহার মনে হইতেছিল, এমন জীবন আগে দেখে নাই। ঘুমায় কোথায় জিজ্ঞাসা করায়, নুনুর বৌ অবাক চাহিয়া মাটির দিকে আঙুল দেখাইল।’ এই ‘অবাক চাহিয়া’ কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। কৃষ্ণসুন্দর একজায়গাতে ভেবেছিলেন, ‘এ-ই ভারতবর্ষ। এইখানে আসিয়া নিজেরে স্ট্রেঞ্জার বলিয়া বোধ হয়।’ বিনয়রা জানেনা তারা মাটিতে শোয় ---এই তথ্যটাই নুনু তেলেঙ্গার বৌএর কাছে অবাক কথা। বিপ্রও ভাবে, এদের সঙ্গে বিনয়ের পরিচয় কী করে! ‘নুনুদের জীবনে ঢুকিয়া যাওয়া কি সম্ভব, বিনয়ের পক্ষেও? ভাবিয়া পায় না।’ কে কবে এই নুনুদের চা-বাগানের শ্রমিক করে এনেছিল নুনু নিজেও জানে না। মালিক বাগান বেচে দিলে থাকার কোন জায়গা নেই বলে নুনুরা এখানে এসে উঠে। আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি, এই জমি খাস হয়ে নেই। এ জমির মালিক প্রসন্ন চৌধুরী। চাষের কাজ জানে না বলে দিনমজুরি করে। যেদিন কাজ জুটে না পাখি শিকার করে পুড়িয়ে খায়। এই বস্তিতে গরিবারাও থাকে । সে তিনপুরুষের প্রাচীন এখানে। উপন্যাসের শুরুতে আছে কিন্তু দিন তিনেক আগেও একটি লোক বিহার থেকে এসছে। জমি ছিল না। ‘জমিদারের খেতিতে বেগার খাটুয়া বাপ, ভুখ মিটাইতে না পারিয়া উহারে ভাগাইয়াছে।’
             বিনয় আর বিপ্রকে খাওয়াবে বলে বড় আনন্দে নুনু ছুটতে ছুটতে দুটো পাখি মেরেছিল তিরে। সেই মাংস বিনয় খায় নি। বিপ্রেরও উদ্গার এসছিল। কিন্তু বিনয়, বুঝতে না দিয়ে যখন বলল, ‘মাংস বাচ্চাদের দাও নুনু। আমি খাব না...’ তখন নুনুর বকলমায় আসলে বিপ্রেরই মনে হয়েছিল, ‘বাবু, যতই চেষ্টা করো, নুনু হইতে পারিবে না। নুনু হওয়া যায় না।’ সেদিন ফিরবার পথে প্রথমে ধুলি ঝড় এবং বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছিল এদের দু’জনকে। কাছেই টিলার উপর শাদা বাড়ি। প্রসন্ন চৌধুরীর বাড়ি এটা বিপ্র বিনয় কেউ জানত না। ‘বৃষ্টিতে ভিজিতে ভিজিতে দেখে , ক্রমশ আকাশ মাঠ শাদা হইয়া যাইতেছে। সমস্ত নীলাভ কালো মুছিয়া, শাদা বাড়িটিও আর স্পষ্ট নয়, জলরঙে ধুইয়া গিয়াছে।’ বিপ্র দেখছিল দাঁড়িয়ে। বিনয় বলল, ‘বৃষ্টি আর থামবে না, চল যাই।’ কিয়ৎক্ষণ পরে বিপ্রের উত্তর, ‘ চল, অই বাড়িতে যাই।‘ ‘কী করবি গিয়ে? কাউকে চিনিস, না কেউ তোকে চেনে?’ বিপ্র তখন নিজেতে মগ্ন। বুঝিবা একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়। বিনয়ের আবার জিজ্ঞাসা, ‘ তুই চিনিস?’ নিজের ভাবনা বলয়ের ভেতর থেকে অস্ফুট উত্তর ‘কমলিনী’।
             বাস্তবে বাড়িটি প্রসন্ন চৌধুরীর। তাঁর একটি মেয়ে আছে। যার কোন নাম নেই উপন্যাসে। ওদিকে কমলিনীর নেই কোন শরীরী অস্তিত্ব। সেই কি কমলিনী? দুই কি এক? তাকে যে কোথাও ভালো করে দেখেছে বিপ্র, পাশে বসে দুটো মনের কথা বলেছে কোনদিন-- সেরকম একটিও তথ্য নেই গোটা উপন্যাসে। এর কি দুটো ইঙ্গিত? এক , দু’জনের সত্যিই বাস্তব সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তাই উপন্যসের শেষে সেই মেয়েটি যেমন নিরুদ্দেশ, বিপ্রও যাত্রা করে সেই নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে। কিন্তু প্রবল অস্পষ্টতা আছে সেই সম্পর্কের। এমন কি, বিপ্রতো এও জানতো না বাড়িটি প্রসন্ন চৌধুরীর। যেদিন জেনেছিল, সেদিনই শুধু সে সব ছেড়ে বাসে চড়ে বসে। সুতরাং প্রথম সম্ভাবনাটি নাকচ হয়ে যায়। দুই, তেমন প্রবল না হলেও অস্পষ্টতা প্রসন্ন চৌধুরীর মনেও রয়েছে নিজের মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে। তিনি জানেনও না সে তার নিজের ঔরসজাত নয়। তিনও শহরে ছুটছেন মেয়ের সন্ধানে। পাচ্ছেন না। বিপ্র প্রসন্ন দু’জনেই তখন সন্ধান করছেন জীবনের মানে, দু’জনেই কিন্তু দুভাবে জুড়ে গেছেন নুনু তেলেঙ্গাদের জীবনের সঙ্গেও । নুনুদের জমির অধিকারের প্রশ্নে দু’জনের অবস্থানের কোনো ভিন্নতা নেই। এই অধিকার সাব্যস্ত করা নিয়ে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে লড়ছেন যখন তখনই নিজেকেও প্রসন্ন চৌধুরীর মনে হচ্ছে নিঃস্ব, তিনি যেন জানেন ভুল কোথায় হয়ে গেছে। জীবনে প্রথমবার মেয়েকে দিয়ে সেই ভুল শুধরাবার চেষ্টা নিচ্ছেন। আর ওদিকে নুনুদের গ্রামে গিয়ে বিনয়ের সেই উদ্গারের পর থেকেই বিপ্রের মনে আঁকা হচ্ছে ছবি , ‘কমলিনী’র। এ কমলিনীকে বিনয় চেনে না। বিনয় সম্পর্কে এর পর থেকে বিপ্রের উপলব্ধি হচ্ছে, ‘ উহার কোনো ঠায় ঠিকানা আদৌ ছিল না। তিক্ত বিতৃষ্ণায় চক্ষু বুজিয়া আসিল।’ এক বিকেলে বিপ্র জানছিল, গবেষণার কাজে বিনয় বিদেশ যাবে। তার ইচ্ছে হলো জিজ্ঞেস করে, ‘কোথায় যাইবেন বিনয়বাবু, সে কোন দেশ? উহাতে কি বদলাইবার থাকিবে না?’
             প্রসন্ন, বিনয়, বিপ্র এবং কমলিনীর সংযোগের অনেকগুলো ইঙ্গিত আছে উপন্যাসে । সংযোগ রেখাটি যেমন হয় না সরল সোজা, তেমনিই। বাঁকা। পড়তে হয় মন দিয়ে, ধরতে হয় ‘সৃজনশীলতা’ দিয়ে। কথাটি বিনয়েরই, “ অধরাকে ধরতে হয়। ধারণাকে বাস্তব রূপ দিতে হয়। ইহাই সৃজনশীলতা।” নুনুদের জমি বাঁচাবার জন্যে উকিল বন্ধু গণি মিঞার অভাবে যখন হাহাকার করছিলেন প্রসন্ন। তার ঠিক পরের অধ্যয়টি শুরু হচ্ছে এই বাক্য দিয়ে, ‘ এই হাহাকারটি কাহারেও বুঝাইবার নয়। হয়ত বিনয়ই বুঝিত...’ কিন্তু এরপরেই বাক্যটি ঘুরে যায়, ‘ এখানে আইলেই বিপ্রের গতি কেন শ্লথ হয়।’ নুনুদের বস্তিতে যাবার পথেই টিলার উপর প্রসন্ন চৌধুরীর শাদা বাড়ি। ‘নুনুদের গ্রামে যাইবার পশ্চাতে যে এই আকর্ষণটি কম নয়, ইহাই অস্বীকার করে কীরূপে?’ জমি চলে যাবে জেনেও যখন যতনবুড়া, চধরি ‘নিশ্চিন্তে হাড়িয়া লইয়া বয়, টানিতে টানিতে ঘনঘন মাথা নাড়ায় আর হাসে’ বিরক্তি ভরে বিনয় বিপ্রকে বলে, ‘ভাব , এদের অবস্থা।’ কিন্তু এই উদ্বেগবিলাস নিয়েইতো বিনয় বিদেশ পাড়ি দিচ্ছে। কোন আলো ধরতে যাচ্ছে সে? এতেই কি বেঁচে থাকার কোন সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যাবে? বিপ্র জানে না। ‘শুধু ছাই উড়াইতে থাকে। একদিন এই ছাইয়ের ভিতর হইতে, কমলিনী উঠিয়া আইবে। বহুদিন পর, সে মনে মনে ডাকিয়া উঠিল, ---কমলিনী।’ নানা রূপে নানা চেহারাতে কমলিনী ধরা দেয় তার কাছে। পূর্ণস্বরূপে কক্ষনোই না। জরাগ্রস্ত অবনীমোহনকে দেখে বিপ্রের মনে হয় কমলিনী এক সাগর, নদী যেমন সাগরের দিকে ছুটে, ‘ এই জীবন কী তবে কমলিনীর দিকে যাইবার জন্যই রচিত?’ তার পরেই আছে সেই স্রোত –প্রতিস্রোতের কথা—যেগুলো আমরা আগে লিখছি। যেখানে বিপ্রের মনে জাগে এই জিজ্ঞাসা, প্রতিস্রোতটিই যে ‘আদতে স্রোত নয়, একথাই বা কে নিশ্চিতে বলিবে?’ নিজের জীবনকে অর্থহীন মনে হয়। অর্থ বুঝিয়ে দিতে পারত আবার সেই কমলিনী। আর কেউ না। কিন্তু তার সঙ্গেই ‘অই দূরত্ব আজিও ঘুচিল না।’ ভাবতে ভাবতে সে যেদিকে এগোয় সে গরিবাদের বস্তি।
         
    যা বয়ে যায় সেতো নদী। কিন্তু যা স্থির গভীর? ভাসায় না ডুবিয়ে দেয়—তার কী নাম? ‘ভাবিয়া কি কমলিনীও উন্মনা হয় না?’ কখনো বা দূরের আকাশের তারাকে দেখেও ‘কমলিনীরেও বিন্দু বলিয়া ভ্রম হয়। যেরূপ স্নিগ্ধতায় তারারা আলো ছড়ায়, তেমন স্বপ্নবৎ’ তথ্যচিত্রের পাণ্ডুলিপির লেখক বিপ্রের তেমনি কখনো আবার কমলিনীকে মনে হয়, ‘...ফ্রিজশট; স্থির হইয়া আছে। অথচ জীবন ক্রমাগত বদলাইতে আছে।’ এ আসলে বিপ্রের উদ্বেগ। জীবনের দিশা সন্ধানেই যদি জীবন যায়, তবে চলমান জীবনকে ধরে সে এগুবে কবে? করে খাবে কী , এই ভাবনাও তাকে বিব্রত করে। গরিবাদের বস্তিতে গিয়েও চরস গাঁজায় ডুবে লুম্পেন জীবন না বরণ করে নিতে হয় এই উৎকণ্ঠাও কম নয় তার। ‘কিন্তু এই হওয়াটাও যে কত কঠিন, অন্তত আজকের জন্মভিত্তির উপর দাঁড়াইয়া, একথা গরিবাই তাহারে বুঝাইয়া গিয়াছে। ভিত্তিকে মুছিয়া দিবার, হারাইয়া যাইবার প্রচেষ্টা যে ভুল, তাহা বুঝিয়াও, বুঝিবার ইচ্ছা লয় না। মনে হয় নিজেরে মুছিয়া দিতে পারিলেই, কমলিনী আসিয়া দাঁড়ায়।’ এমন অজস্র কঠিন সত্য দার্শনিক জিজ্ঞাসার সামনে লেখক পাঠককে দাঁড় করান গোটা উপন্যাসে। এবং উত্তরে ভুল- শুদ্ধের এমন দ্বান্দ্বিকতা নিয়েই পাঠকের সামনে, ‘কমলিনী আসিয়া দাঁড়ায়।’ কমলিনী নিজেই কখনো প্রশ্ন করে, ‘আমি কি কোনও দিনই স্পষ্টতা পাব না?’ বিপ্র ভেবে পায় না, ‘কমলিনী নাই বলিলে, কমলিনী থাকিবে না, এতটা কি মানিয়া লওয়া সম্ভব?’ দিনের শেষে বাড়ি ফেরা লোকের হাতে ব্যাগ দেখলে বিপ্রের মনে হয়, সেসব আগামী দিনের সঞ্চয় তাদের। ‘যত সামান্যই হোক, ইহা কি কিছুই নয়?’ অথচ নিজের দিকে তাকালেই দেখে, ‘ বাড়ি নাই, ঘর নাই, উপাধি নাই, উত্তরাধিকার নাই। এক অপরিচয়ের ভূত তাহার ভিতর ঢুকিয়া যায়।’ অস্বস্তিতে চঞ্চল কমলিনী জিজ্ঞেস করে, ‘আমি কে? বলো আমি কে?’ বিপ্রের উত্তর, ‘তুমি কমলিনী।স্থিরতা’
                 মন্টু ঘোষের আড্ডা থেকে উঠে একদিন গরিবাদের বস্তিতে গিয়ে বিপ্র এবং কৃষ্ণসুন্দর দেখেন দালাল ঘোরাঘুরি করছে। নিরাপদ। বিপ্রদের জিজ্ঞেস করে, ‘দাদাদের কী কোন কোম্পানি? হাড়িয়াতে মত্ত কৃষ্ণসুন্দর জবাব দেন, ‘টো-টো কোম্পানি।’ নিরাপদ নুনুকে বলে, ‘জমিটা বেচলে জানিও নুনুভাই।’ ‘কোন জমি?’ বিপ্রের জিজ্ঞাসা। এর পরে প্রতি প্রশ্ন আসে, ‘এটা নুনু বেচবে কী করে? এটা তো প্রসন্ন চৌধুরীর।’ কথাটি বোধকরি কৃষ্ণসুন্দরের। আগে কখনো উচ্চারণ করবার দরকার বোধ করেন নি, বললে বিস্ময়ে তাকাতো না বিপ্র। নিরাপদের মনে হয়, ‘আমি নিরাপদ, এরা দেখছি বিপদ- আপদ। সব জানে। জমির মালিকানাও।’ হাত জোড় করে সে বলে, ‘তিনিতো ভগবান মানুষ। যাওয়ার আগে, এই জমি এদের নামেই লিখে দিয়ে গেছেন।’ ‘গেছেন মানে?’ আরে না না, শহরে চলে গেছেন। যাওয়ার আগে এই জমি এদের দিয়ে গেছেন, তা কাক পক্ষীতেও জানতে পারে নি।’ ‘চৌধুরী কি এখানেই থাকতেন?’ বিপ্র আবার জিজ্ঞেস করে, এবং প্রথম জানতে পায় ‘কমলিনী’র সেই শাদা বাড়িটিতেই থাকতেন প্রসন্ন চৌধুরী। ‘মুহূর্তে তার পৃথিবী দুলিয়া উঠে। একটা শাদা বাড়ি; কাগজের মতো টুকরো টুকরো হইয়া যাহা ছড়াইয়া পড়িল। কিছুই লেখা নাই। শাদা শূন্য। এই শূন্যতায় একটি ছবি আঁকা হইয়াছিল, অথবা শূন্যতা সেই ছবি আঁকিয়া দিয়াছিল। এখন টুকরা টুকরা হইয়া সেই ছবি ভাসিতে আছে। বিপ্র দেখিতে চেষ্টা করে, সেই মুখ, সেই চোখ। কিন্তু কিছুতেই সামগ্রিকতায় মিলাইতে পারিতেছে না।” কিয়ৎক্ষণ ঘোরের পর কৃষ্ণসুন্দর জিজ্ঞেস করেন, ‘বাড়ি যাইবি না?’ বিপ্রের উত্তর, ‘ খুঁজতে হবে।’ ‘কী?’ ‘একটা বাড়ি।’ তারপরেই হচ্ছে বিপ্রের সেই বাস যাত্রা। পাঠক নিশ্চয় মুচকি হেসে ভাবতে বসবেন, ওহ! এই তাহলে কথা। তবে বাপু ঝেড়ে কাশো না কেন? প্রসন্ন চৌধুরীর মেয়েটির পেছনে ছুটছতো? কৃষ্ণসুন্দরও জিজ্ঞেস করেছিলনে, ‘খুঁজবি কীভাবে? ঠিকানা আছে?’ বিপ্র জবাব দেয়, ‘ ঠিকানা একটা নির্দিষ্ট ছাঁচ, ইহাতে কমলিনীরে আঁটিবে কেন! কমলিনী ছড়াইয়া থাকিবে ঠিকানার বাইরে। সেখানেই তাহারে খুঁজিতে হইবে। এই কথা কাহাকে বলিবে, আর বলিলেই বা কে বুঝিবে?’... শেষে গিয়ে তাই কৃষ্ণসুন্দর এই বোধে গিয়ে থামেন, ‘কমলিনীর দিকে যাওয়ার চেষ্টাটাই আসল।’
                 পল্লব যখন এই উপন্যাস লিখছিলেন, সাহিত্যে উত্তরআধুনিকতাবাদ কিম্বা যাদু বাস্তবতার কথা বেশ শোনা যাচ্ছিল। অনেকেই এই ছাঁচে ফেলে দিতে চাইলেও চাইতে পারেন উপন্যাসটিকে। পুরাকথার থেকে নেয়া কমলিনীর নামও তাদের প্ররোচিত করলেও করতে পারে। এই অব্দি এসে সব্বাই আশা করি, মেনে নেবেন যে এমন কোন আধা চেনা প্রতীচ্য তত্ত্বের আলো না ফেলেও এই উপন্যাস বেশ বুঝে ফেলা যায়। ধরেও ফেলা যায়। কোন যাদু টাদু নেই । নেই কোন বাস্তবাতিরিক্ত গল্প কথা। ছাঁচের বাইরে ঠিকানা খুঁজতে হবে বলেই কমলিনীও নয় কোন বিশৃঙ্খলার প্রতীকী নাম। সে আসলে এক নবতর শৃঙ্খলার নাম। গতির ভেতরে নবতর স্থিতির নাম। যাকে অনুধাবন করাটা আপাতত যেকোন পাঠকের বিপ্রের মতোই, লেখকের মতোই, ব্যক্তিগত কাম।
                লেখকের কথা বয়ন কৌশল নিয়ে আলাদা করে বলা যেত। কিন্তু বোধকরি ইতিমধ্যে আমরা সে পরিচয় দিয়েছি অনেক। কিন্তু এ কেমন ভাষা, ‘কান্দিতে আছে’, ‘গ্যাঁজাইবার’? একেবারে শুরুর উদ্ধৃতিটি দেখুন। এহ বাহ্য! আরো আছে। এই যেমন, “...পরনের ফিরোজ লুঙ্গিটি হাঁটুর উপর গোটানো , খালি গা, মাথায় গামছা বান্ধিয়া, তাহার বয়সি যে, এই মাত্র চাউলের বস্তাটি ট্রাক হইতে নামাইয়া, উহাদের মধ্যে আইয়া বইল, কয়দিন আগে মাত্র বিহার হইতে আইয়াছে।” কিম্বা “...বুজিবা চুকুমবুদাই, দূর রাস্তার দিকে চাহিয়া , কিছুই দেখিতেছে না, এমন দাঁড়াইয়া রহিল।” নজির লিখে গেলে তালিকা দীর্ঘ হবে। ইতিমধ্যে প্রচুর দেয়াও হয়েছে। প্রশ্নটা উঠবেই। এ কেমন ভাষা? তাই লিখছি, যিনি পড়বেন তাঁর ‘বৃত্তান্ত একা’ ঘুরে বেড়াবে। যিনি লিখেছেন তাঁরতো বটেই।
               এখন যখন এই সহজপাঠ লিখতে বসেছি তখনো মনে হচ্ছে এই জবাবদিহির দায়িত্ব এড়িয়ে এক পাও এগুনো যাবে না। আমাদের এলাকার, একালের পাঠক এই ভাষার সঙ্গে পরিচিত বটে । কিন্তু তিনি জানেন এই ভাষাতে আজকাল আর উপন্যাস কেন, কোনো কিছুই লেখা হয় না তেমন। তার উপর তিনি যে বাংলা সাধু ভাষাকে জানেন সেটি সংস্কৃতপ্রায় তৎসম শব্দ বহুল। সেই ভাষাটিকে বিদ্রূপ করে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ সেই আদ্যিকালেই লিখেছিলেন“সংস্কৃত বাংলা অর্থাৎ যাকে আমরা সাধুভাষা বলে থাকি তার মধ্যে তৎসম শব্দের চলন খুবই বেশি। তা ছাড়া সেই-সব শব্দের সঙ্গে ভঙ্গির মিল করে অল্প কিছুকাল মাত্র পূর্বে গড়-উইলিয়মের গোরাদের উৎসাহে পণ্ডিতেরা যে কৃত্রিম গদ্য বানিয়ে তুলেছেন তাতে বাংলার ক্রিয়াপদগুলিকে আড়ষ্ট করে দিয়ে তাকে যেন একটা ক্লাসিকাল মুখোশ পরিয়ে সান্ত্বনা পেয়েছেন; বলতে পেরেছেন, এটা সংস্কৃত নয় বটে, কিন্তু তেমনি প্রাকৃতও নয়। যা হোক, ওই ভাষা নিতান্ত অল্পবয়স্ক হলেও হঠাৎ সাধু উপাধি নিয়ে প্রবীণের গদিতে অচল হয়ে বসেছেন। অন্ধভক্তির দেশে উপাধির মূল্য আছে।”(বাংলা শব্দতত্ত্ব ; বানান-বিধি) চলিত ভাষা , যাকে আমরা ভুল করে কখনো বা ‘মুখের ভাষা’ বলেও জানি, তাকে সাহিত্যের এবং সভার ভাষা হিসেবে দাঁড় করাবার কৃতিত্বটাও আসলে রবীন্দ্রনাথেরই, সঙ্গে ছিলেন প্রমথ চৌধুরী। এই জুটির প্রায় এক শতক পরে সেকালের সেই কৃত্রিম ভাষাতে উপন্যাস লেখা উচিত কী?-- এই প্রশ্নটি পল্লবের উপন্যাস পড়তে গেলে শুরুতেই উঠবে। তার উপর ওই ‘চাউল’, ‘চুকুমবুদাই’, ‘মাজাকি’র মতো শব্দগুলো দেখে এই প্রশ্নও উঠবে , তিনি বাংলা ভাষাটি জানেন তো?
                পল্লব নিশ্চয়ই জানেন, আমরাও জানি। শুধু জানাটা লুকিয়ে গেছে প্রতাপ লব্ধ কিছু অভ্যাসেই আড়ালে। চারপাশের বাস্তবতা । চাউল, কয়দিন, আইয়া বইল –এগুলোর সবটাই আমাদের নিত্যদিনের ব্যবহৃত বাংলা ভাষারই শব্দ। আর রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত ভাষাটিও আমাদের মুখের বাংলা নয় আদৌ। যেখানকার এ মুখের ভাষা সেখানকার বই পত্তর পড়তে পড়তে সংস্কারটা আমাদের দাঁড়িয়ে গেছে মাত্র। এমনিতেও সাধু বাংলার ব্যবহার কমে গেলেও উঠে কোনদিনই যায় নি। শরৎ চন্দ্র , তারাশঙ্কর , বিভূতি ভূষণেরা দিব্যি চালিয়ে গেছিলেন এর ব্যবহার। ফুরিয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছিল যখন তখন একে প্রায় পুনরুজ্জীবিত করলেন এসে প্রথমে জীবনানন্দ এবং পরে কমলকুমার। কমলকুমার ফিরে গেলেন, মাইকেলী যুগে—এমনটা অনেকে বলে থাকেন। আমাদের সন্দেহ আছে। তত দাঁত খটমট যুক্তাক্ষর বহুল মাইকেলী বাংলা তিনি তেমন ব্যবহার করেন নি, বরং তাঁর পরীক্ষা নিরীক্ষা ছিল সাহেবী বাংলার বাক্য গঠন অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার। কতটা পেরেছেন,সে অন্য বিতর্ক। কিন্তু করেছিলেন সেরকমই।
                রবীন্দ্রনাথ এবং প্রমথ চৌধুরী আশা করেছিলেন ‘কলকাতা’তে যেহেতু ভিড় করেন গোটা বাংলার বাঙালি, তাই ওখানকার ভাষা হয়ে উঠবে বাঙালির ভাষা। কিন্তু এটি হয়ে উঠেনি তেমন। দেশটিও ভাগ হয়ে দু’ভাগ হয় নি শুধু চার বা তারও বেশি ভাগ হয়েছে। এখনা আর বাংলার বৈচিত্র শুধু নয়, জেলার । বরং রাষ্ট্রের এবং প্রদেশের। অসম-ত্রিপুরার বাঙালিও যে বাঙালি—পুথিপত্তর সেই সত্য আড়ালে ঠেলে দিতে চাইলেও কথাটা সত্য। কলকাতার বাংলা পড়ে-শোনে বোঝেন যারা তাঁরা বিদ্বান। কিন্তু লিখতে বলতে পারেন না, অধিকাংশ বাঙালি। তাদের কাছে চলতি কিম্বা ‘মুখের ভাষা’টিও আসলে এক কৃত্রিম ভাষা, চাপানো ভাষা। আমাদের এলাকার, একালের বাঙালি সম্পর্কেও কথাটা খুবই খাঁটি। যিনি পড়েন মাও-ৎসে-তুঙের ‘ইয়েনান বক্তৃতা’ কিম্বা লুসুনের কবিতা, কিম্বা তথ্যচলচ্চিত্র করেন, ‘পভার্টিঃ কজ অফ ইণ্টারনেল মাইগ্রেশন’ নামে তিনিও ‘চলিত বাংলা’ বিশুদ্ধ বয়নে উচ্চারণে বলতে বা লিখতে পারেন না মোটেও। সেই বাঙালির গল্প ‘কমলিনীর উপখ্যান’। তাই তাঁরা যখন তাঁর উপন্যাসে চরিত্র হয়ে উঠে আসেন, তখন রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে নিজেদের ভাষাকে ছেটে উঠে আসেন নি, এসছেন সঙ্গে নিয়ে। অবিকল , অকৃত্রিম। উপন্যাসের আর প্রতিটি উপকরণ যেমন শিল্পের দাবি মেনে এসছে, মিশেছে, নবরূপ নিয়েছে –এর ভাষাটিও তেমনি। ঠিক তাই, কি? আমরা কি তবে সাধু বাংলাতে কথা বলি? নয় বটে, কিন্তু ‘সাধু বাংলা’ কথাটাও উনিশশতকী নির্মাণ ।ভাষাটি তার আগেও ছিল। আমাদের বৈষ্ণব সুফি কাব্যের ভাষা দেখুন, দেখুন পাঁচালী-মঙ্গল কাব্যগুলোর ভাষা। এ যেন প্রাদেশিক বৈচিত্রকে এক সুতোতে বাঁধতে বাঁধতে আপনিই গড়ে উঠছিল সারা বাংলার সাহিত্যের ভাষা হিসেবে। না ছিল কোনো ব্যাকরণের নির্দেশ, না ছিল কোনো শুদ্ধিকরণের সূচিবাই। তার নাম ছিল, দেশি ভাষা। বানান, শব্দপ্রকরণ, বাক্যগঠনের চরিত্রের সবটাই ছিল দেশি।সংস্কৃত বা তৎসম নয়। পল্লব সেই রীতি মেনে লিখেছেন উপন্যাস। মুখের শব্দ তিনি বসিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথও না বসিয়ে থাকেন নি। সেই যে ‘দেখলুম, খেলুম, গেলুম’ ক্রিয়াপদগুলো—নিতান্তই ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘উপভাষা’ থেকে নেয়া। পল্লবের ‘চাউল’, ‘চুকুমবুদাই’ তবে করেনি অপরাধ কোনো। যে বাঙালির এগুলো মুখের শব্দ তাঁরাও বরঞ্চ এখনো চিঠিতে, বিজ্ঞাপনে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন এহেনো বাংলা লিখতে এবং ‘কান্দিতে আছে’র মতো প্রচুর ব্যাকরণের ভুল সহই। সুতরাং এই সিদ্ধান্ত নিতেই পারি যে ‘চলিত’ সংস্কারের বাইরে বেরিয়ে এলে দেখব, যে পল্লব উপন্যাস লিখেছেন আমাদের আদি অকৃত্রিম গুরুচণ্ডালি ভাষাতেই। বরং ভাষা যখন তার অর্থবহ বর্ণনাতে বাস্তবতার ছবি আঁকে, পল্লবের ভাষা সেখানে বাস্তবতার সেই বর্ণগন্ধ ধারণ করেছে নিজের শরীরে। বোঝা যায় উপন্যাসটি আসলে ত্রিপুরার তথা পূর্বোত্তরের এক আধাশহরের মধ্যবিত্ত জীবনের গল্প। কমলিনী সেই মধ্যবিত্তের সন্ধান কিনা, এই প্রশ্ন আমরাও খোলাই ছেড়ে দিলাম। শুধু এইটুকুন মনে রাখলে চলবে, যে রাধারমণ যখন এই ভাষাতেই গেয়েছিলেন, ‘আমার ছিলো আশা দিলো দাগা রে সুবল।।/আমার এই পিরিতের কার্য নয়/কেমন আছে কমলিনী রাই।' তখন সেই গানের তালে দোলেন যেসব সিলেট টিপেরার লোক তারা কিন্তু অধিকাংশই জানেন না, ডকু ফিল্ম মানে কী,আর ফিজিক্স কোন স্কুলে পড়ানো হয়। তারা সব টুনু-গরীবার আত্মীয়, হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্তের দেশের লোক।

                              *******************************

রবিবার, ২৬ আগস্ট, ২০১২

দুটি কবিতা


তা ধিন তিনা
………………………………………………………………….












মাদের হাতেই ছিল  সাজানোর দায়িত্বভার
ডিজনির বাগান জুড়ে   ভুতুড়ে চিত্রমালা ।

লিকপিক জ্যান্ত হয়ে   সদাশিব ধরলো কী রূপ !
তিন ইটের উনোন ঘিরে  ফুটপাত যাচ্ছে ভরে
কে ছেলে কাঁদছে ক্ষুধায়  কে মেয়ে নামছে পথে !
পথ খুব খুবলে নিলে      সারারাত ফুপিয়ে কারা
ভেজালো ময়লাবালিশ    বলো তো পেপসি কোলা !
বলো ভাই ইন সুজুকি    কম দামি করুন রঙে
বসে আঁকো বাচ্চারাসব আঁকে যে রঙিন ছবি
সে ছবির ঠোঙায় কারা  কিনে খায় ঝালমুড়ি
আর পার্কে গ্যাঁজায় বসে থিয়েডোর বাখ দেরিদা
          সুবিমল এন্টি নভেল ।
ঊহাদের হাতেই ছিল মোটা ব্রাশ রঙের ডিবি
লিখেছে মুক্ত দশক   মুছে কে লিখছে এখন
ছাপ দাও , ছাপ্পা ও ছাপ ।

ছাপ দিই , দিতেই হবে   আমরা তো সামান্য নই
দরকারে ছড়াই পথে       বাতাসা আর শুয়া খই ।
হরি বোল , বল হরিকে    কোন পায়ে ধরবো কাকে ,
দুই পা বাড়িয়ে সবাই      যেতে চায় জয়ের দিকে ।

জয়ে ভয় নেই আমাদের    ভয়ে জয় লুকিয়ে আছে
আমাদের মন্দ ভালো        ঠাকুরের পায়ের নিচে ।
ঠাকুরের পা-ই বা কোথায়   তিনি তো অপাণিপাদ
দরকারে ছড়িয়ে রাখেন      ফড়ফড়ি ঝরোখা ফাঁদ ।
ফাঁদে রোজ পড়ছি , পড়ি
উপরে ঘুরছে ছরি
নিচে সেই আমরা কজন
জড়িয়ে থাকছি শুধু
স্বজনের রুগ্ন দেহ    সজনীর বুকভাঙা শোক ।

আমরা তাধিন তিনা    বেঁচে রোজ থাকছি কিনা
বুঝি না , চাইছি তবু    আমাদের জন্য কিছু
সাজানোর ব্যবস্থা হোক ।



খাদ্যাখাদ্য
……………………………………………………………..
পল্লব ভট্টাচার্য

আকাশ বাতাস ভরছে ক্ষুধায় , কানছি আমি , কানছে মেয়ে
শূন্য দিয়ে ভরাচ্ছি পেট , কানছে মা ও কানছে মেয়ে ।

হং যং বং রং লং সব দিচ্ছি তোকে , পেট পুরে খা
পেট পুরে খা মেয়ে আমার , মাথায় রেখে ক্ষুধার্ত পা ।

ছাইপাশ সব গিলছি আমি , রক্ত চুষছি , স্তন্যধারা
খেয়ে দেয়ে তাগড়া হলে , তোর বুকে মা থাকবো খাড়া

কোলে নিয়ে জুড়াও শরীর , সহবাসে তৃপ্ত করো ,
কুসুম দিচ্ছি , কুসুম দিচ্ছি , পাতালভান্ড তুলে ধরো ।

পর্দা ফাটছে , বিছনা উড়ছে , কানছি আমি কানছে মা
বামুন আমি পৈতে খাচ্ছি , শূদ্রাণী তুই আমায় খা --



রবিবার, ১২ আগস্ট, ২০১২

নদী । এই একটি প্রবহমানতা সমুদ্রগামী ।...............।

 (কিছু কিছু কবি ইচ্ছে করলেই নিজেরা লিখতে পারেন, লিখবেন না আলস্যবশত।  থুক্কু, তাঁরা ফেসবুকে লিখে রাখবেন। যে ফেসবুক আসলে একটি কোম্পানী  ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর মতো। আজ আছে কাল নেই। অন্যদিকে ব্লগ এক ব্যবস্থার নাম। এখানে সংরক্ষিত থাকে, সার্চ  ইঞ্জিনে মেলে  তাড়াতাড়ি । তেমনি এক ফেসবুক নোট লেখক কবি পল্লব ভট্টাচার্য ।  তিনি কেমন শ্রম করেন ফেসবুকে তাঁর একটি নমুনা দিলাম নিচে ,  আশা করছি এরপর  এঁনার  নিজের এবং পরের সমস্ত শ্রম এখানে তুলে দেবার জন্যে গণ দাবী উঠবে।  যাদের কবিতা এখানে রইল তাঁরা সব্বাই ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি ফুল, বিশ্বময়  সুবাস ছড়ান।) 

পল্লব ভট্টাচার্য

নদী । এই একটি প্রবহমানতা সমুদ্রগামী । অস্তিত্বকে অস্তিত্বহীনতায় পৌছে দিতে । ভাসতে থাকে শুধু নৌকাটি ।

…………………………………………………………………
নলিনী দলগত জলমতিতরলং  তদ্বজ্জীবনমতিশয় চপলম্ ।
ক্ষণমিহ সজ্জনসঙ্গাতিরেকা ভবতি ভবার্ণবতরণে নৌকা ।।

…………………………………………………………………………………………………

সমরজিৎ সিংহ

আকাশছায়া

মাকে , মনে হয় , ঐ আকাশছায়া । দিন শেষ হলে
ডেকে ওঠে জ্যোৎস্নাপাখি
শুরু হয় গাছেদের কথাবার্তা
আর একটি নদীর কথা এসে পড়ে প্রাসঙ্গিকতায়
ঐ নদীর জলে একটি নৌকাকে আমি
ভেসে যেতে দেখেছি অনেকদিন

মা যাবার পর , ঐ আকাশছায়া আর নেই
রাত এলে আমি , প্রতিদিন খুঁজে বেড়াই নদী ও জ্যোৎস্না

……………………………………………………………………………………………………


অশোক দেব

উৎসর্গ

শুনেছি জ্যোৎস্না রাতে
একটি গোপন নৌকা ঘাটে ঘাটে ঘোরে

বহুকাল এই গ্রামে থেকে আমি দেখিনি
শুধু শুধু নদীর নামে রটিয়েছি অপবাদ

আজ মনে হয় সব ঘাটই রাতে রাতে
মিশে যায় জলে
নদী আর নৌকাতে চলে অভিমান ।

…………………………………………………………………………………………………

প্রবুদ্ধ সুন্দর কর

অম্বুবাচী

একটি কলকল নদীর কাছে একটি কথা মনে হলো

পাগলা আশ্রম থেকে বেরিয়েছে মাটির নিয়ামক স্রাব , এতো কল্লোল

মাটির অতীতচুমু  যৌনচিহ্ন নিয়ে বিরহচুপ্ নিষিদ্ধ নাঙ্গলবর্ষ
মাটির বিছানায় শুয়ে আছে নিয়ামক রমনী , পাশে আমি নিষিদ্ধ পুরুষ

অনন্ত ৩ দিনরাত একাকী ভালোবাসার নক্ষত্র  আকাশ

চারপাশে তানপুরাবৎসল ফসলের রিন্ ঝিন্ রিন্ ঝিন্

…………………………………………………………………………………………………………

স্বাতী ইন্দু

সামুদ্রিক

সমুদ্রের মধ্যে ডুইব্যা যে মানুষ
যে মানুষ প্রলয় ছাড়া আর কিছু
চিহ্নিত করে না --- ভাবে  না রৌদ্রের রঙ
ভাইঙ্গ্যা গেলে অন্ধকার আসে
আসে--আসে হে প্রিয়তম অন্ধকার--
আর কোন গল্পের প্রয়োজন নাই
নাই কোন গাঁথুনির  নিরেট উচ্ছাস
ভাষা ছাইড়া যে মানুষ রক্তে কথা কয়
বিষন্ন কোষের ঠোঁটে ঠোঁটে
প্রথম প্লাজমের সে মানুষ --নির্দয়তা
তাকে কষ্ট তুমি কি ভাবে দিতে চাও ?

মঙ্গলবার, ২২ মে, ২০১২

সবুজ হয়ে উঠবে মাটি



পর হয়ে আছে যারা , আসবে তারাও ,
এই পৃথিবীর মাঠে মাঠে , বুনবে বীজ ।
 সবুজ হয়ে উঠবে মাটি
এই ভরসায় আজও হাঁটি.........