“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

।। মর্জিনার মা ।।


।। মাসকুরা বেগম ।।
            
   

 


 

(C)Image:ছবি

          


    খড় আর মাটি দিয়ে তৈরি বিধ্বস্ত চালা ঘরটার পুরানো পচা-নষ্ট শনের চালের ফাঁক দিয়ে বৃষ্টির জল পড়ে ভিজে সব একাকার ।সকাল বেলার আকাশে সূর্যের মসৃণ আলোর ঝলকানি দেখে মনে হচ্ছে  রাত্রে প্রকৃতি যেন হৃদয় উজাড় করে তার দু:খ-কষ্ট গুলোকে  ঝেড়ে মুছে নিজেকে হালকা করে নিয়েছে।  ভিজে যাওয়া ছেঁড়া নকশিকাঁথা, বালিশ আর জ্বালানির খড়িগুলো রোদে শুকাতে দিয়ে বাঁশের খুঁটিতে ঠেস দিয়ে বসে আছে চিন্তিত মর্জিনার মা । মর্জিনা একমনে উঠোনটা ঝাড়ু দিচ্ছে । ছোট দুই বোন আপনমনে উঠোনে খেলছে । 

 

       মর্জিনার বাবার যেন কোনো চিন্তা ভাবনাই নেই ! সেই সকালে বের হয়ে গেলে আর পাত্তাই নেই। ভাঙ্গা চালের ফাঁক দিয়ে বৃষ্টির জল পড়ে যে ঘরটা বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠেছে সে যেন চোখেই পড়েনি তার। তেমাথার কোনো দোকানের বারান্দায় বসে বিড়ি টানছে নইলে ক্যারাম খেলছে । 

 

      মর্জিনার মা বসে বসে রোমন্থন করছে অতীতের দিনগুলোর স্মৃতি। তারও একটা নাম ছিল -ফুলবানু খাতুন । কিন্তু এখন যেন সে নিজেই ভুলে গেছে তার নামটা ! মর্জিনার মা-ই যেন তার নাম ! মর্জিনার বাবা বিয়ের পর কতো আদর সোহাগে ভরিয়ে দিয়েছিল সেই দিনগুলো। একটা সাইকেল ছিল মর্জিনার বাবার পেছনে বসিয়ে  ঘুরতে নিয়ে যেতো যেখানে-সেখানে । বিয়ের প্রথম বছর পাশের গ্রামে মেলায় গিয়েছিল তারা। অনেক ঘুরোঘুরি করে, খেয়ে-দেয়ে, এটা-সেটা কিনে ঘরে ফিরতে রাতের অন্ধকার নেমে এসেছিল। হঠাৎ আঁকাবাঁকা মেটে রাস্তার গর্তে ধাক্কা খেয়ে সাইকেল নিয়ে ছিটকে পড়ে গিয়েছিল ! আঘাতের চাইতেও যেন আনন্দ ছিল অধিক । ভাগ্যিস নরম মাটি আর ঘাসের মধ্যে পড়েছিল বলে কোনো আঘাত পায়নি ! মনে পড়লে এখনও হাসি পায়। 

 

      মর্জিনার মায়ের নাকে ছিল তিনটা সোনার নাকফুল - নাকের ডানদিকে একটা, বাঁদিকে একটা আর মধ্যে একটা । দুটা ওর বিধবা মায়ের দেওয়া আর একটা মর্জিনার বাবার দেওয়া। রূপার তৈরি নেকলেস, কানের দুল, হাতের চুড়ি আর পায়ের পায়েল মর্জিনার বাবা বিয়ের সময় দিয়েছিল। 

 

মর্জিনার বাবা-চাচারা পাঁচ ভাই। ছিল কিছু কৃষি জমি। পাঁচ ভাই মিলে চাষাবাদ করত। মর্জিনার বাবা সাপ্তাহিক হাটে গিয়ে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করত। ব্যাগ ভর্তি করে নিয়ে আসত  অনেক কিছু। একান্নবর্তী পরিবার টুকরো টুকরো হয়ে পাঁচ ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। একজোড়া ঘোড়া আর একটা ঘোড়ার গাড়ি ছিল যা এক ভাইয়ের  ভাগে পড়েছে। দুই জোড়া চাষের গরু তার একজোড়া আর এক ভাইয়ের ভাগে পড়েছে। একজোড়া মর্জিনার বাবার ভাগেও পড়েছিল । একটা মাছ চাষের পুকুর তা আরেক ভাইয়ের ভাগে। বাজারে একটা মুদির দোকান তা আর এক ভাইয়ের ভাগে পড়েছে। মর্জিনার বাবার ব্যক্তিগত কোনো কাজ ছিল না কিন্তু কাজকর্ম  সে করত - হালচাষ, হাটে ফসলাদি বিক্রি করা, মুদির দোকানে বসা, ঘোড়ার গাড়িটা চালানো - সব মিলিয়ে অনেকটা  আয় করত । ভাইদের সাথে এটা-সেটা করে ভালোই রোজগার  হয়ে যেত । কোনো সমস্যা ছিল না ।

 

      মর্জিনার বাবার ভাগে পড়েছে এই খড়-কুটোর ঘরটা আর আধ বিঘা চাষের জমি। দুটো টিনের ঘর নিয়ে টানাটানি দেখে মর্জিনার মা-ই বলেছিল, ‘এতো টানাটানির দরকার নেই আমাদের, খড়-কুটোর ঘরটাই থাক, টিনের ঘর একটা বানিয়ে নেব ক'দিন পর।’ কিন্তু ক'বছর চলে গেল টিনের ঘর তো আর হলোই না উল্টো খড়ের ঘরটা বিধ্বস্ত হয়ে বৃষ্টির পানিতে সবশেষ !

ভাইয়েরা যে যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত। মর্জিনার বাবার এতটুকু জমির চাষাবাদে সংসার কুলোয় না । তাই জমিটা বন্ধক দিয়ে, গরু দুটো বিক্রি করে একটা চা-পানের স্টল করেছিল বাজারের তেমাথার মোড়ে । কিন্তু সেটাও টিকিয়ে রাখতে পারল না ! দু'বছর হলো বন্ধ হয়ে গেছে । বন্ধক দেওয়া জমিটাও ফিরে পেল না - দেনা শোধ করতে পারে নি বলে । শুরু হলো মর্জিনাদের সাংঘাতিক কষ্টের দিন !

 

      মর্জিনার জন্মের পর কী আনন্দ ফুর্তিই না ছিল মর্জিনার বাবার ! হাট বাজার থেকে কত কিছু নিয়ে আসত মেয়েটার জন্য। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়ের জন্মের পর মর্জিনার বাবা বলেছিল,

- ‘ আবার মেয়ে !’ 

কথাটা যেন হৃদয়ে গেঁথে আছে মর্জিনার মায়ের। তৃতীয় বার মেয়ে জন্ম দিয়ে মা হয়েও তার নিজের মুখ দিয়েই বেরিয়ে এসেছিল - ‘আবার মেয়ে !’

 

       সর্বস্বান্ত হয়ে মর্জিনার বাবা দিন মজুরি করতে আরম্ভ করে । যখন যেটা পায় সেটা । বোধহয় কোনো কাজেই তার মন বসে না ! দিন দিন সে কর্মবিমুখ হয়ে উঠে ! নিজের সংসারের দায় দায়িত্ব ভুলে গেছে ! মর্জিনার মায়ের বিধবা মাও চলে গেছেন ওপারের ডাকে । তার যে আর আপনার বলতে কেউ নেই এ দুনিয়ায় । কীভাবে চলবে এ সংসারটা, মেয়েগুলোর খাওয়া-পরা, পড়া-শোনা, বিয়ে ইত্যাদি নানান চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে মর্জিনার মা । 

 

       একবার মর্জিনার খুব কঠিন অসুখ হলে মর্জিনার মা একটা নাকের ফুল  সদকা করে দেয়। ছোট মেয়েটার একবার নিউমোনিয়া হলে আরেকটা ফুল বিক্রি করে ওষুধের খরচা বার করে। হাজার কষ্ট হোক মায়ের দেওয়া একটা নাকের ফুল সে কোনো দিন বিক্রি করবে না,  স্মৃতি হিসেবে রাখবে। রূপার গয়নাগুলোও বিক্রি করে দিয়েছে প্রয়োজনের তাগিদে !

 

      মর্জিনার মা উঠে গিয়ে ছোট একটা চিরকুট নিয়ে যায় পাশের বাড়ির জা'য়ের কাছে ।

- ‘ ভাবি এই নম্বরে তোমার মোবাইল থেকে একটা ফোন করবে কি ? আমার এক মামাতো বোন থাকে শহরে । ওর সাথে একটু কথা বলব গো ।’

 

‘ নিশ্চয়ই ! নিশ্চয়ই ! কই ? দাও নম্বরটা ।’ বলে জা তার হাত চিরকুটটা নিয়ে নেয় ।

 

     ফোনে  কথা হয় তার মামাতো বোনের সাথে যে শহরে নিজে দিন মজুরি করে আর তার স্বামী সবজি ফেরি করে ।এতে তাদের চার জনের সংসার ভালোই চলছে । তাদের এক ছেলে এক মেয়ে । বাচ্চা দুটোও স্কুলে পড়ছে । কথা বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল যে তারা ও শহরে চলে যাবে । সে নিজে দিন মজুরি করে দৈনিক তিনশো টাকা পাবে আর মর্জিনার বাবাও একটা কাজ জুটিয়ে নেবে ।  দিদি বলেছে শহরে কত কাজ আছে !

 

      রাতে মর্জিনার বাবাকে বলল শহরে যাওয়ার কথা । প্রথমে সে রাজি হলো না। পরে মর্জিনার মা যখন প্রশ্ন করল - ‘সংসারটা কীভাবে চলবে ? মেয়েদের নিয়ে কেমন করে থাকবে এই বিধ্বস্ত ঘরে ? কী খাওয়াবে ? কী পরাবে ? ......???’

 

     কোনো উত্তর নেই তার কাছে ! তাই বলল, ‘ঠিক আছে। গোছগাছ কর। যাব না হয় ।’

 

     প্রথমবার শহরের উঁচু উঁচু বিল্ডিং আর নানান রঙের, নানান ধরনের গাড়ি আর জাঁকজমক পরিবেশ দেখে হা করে তাকিয়ে থাকে মর্জিনার মা। মনে মনে ভাবে এসবের মধ্যে কোথায় তাদের থাকার জায়গা হবে ! তারপর যখন তার দিদি আর জামাইবাবু আগে থেকেই তাদের জন্য ঠিক করে রাখা বাঁশ আর টিনের তৈরি চালা ঘরে নিয়ে যায় তখন সে বুঝতে পারে যে এখানে তাদের মত মানুষের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা ঠিকই  আছে। প্রথম দিনে কী আর বুঝবে মর্জিনার মা যে ওই উঁচু উঁচু বিল্ডিং তাদের জন্য বসবাস উপযোগী নয় । সেখানে যারা থাকেন তাঁরা হলেন অন্য এক আলাদা শ্রেণীর মানুষ। ওই শ্রেণীর মানুষ আর তাদের মধ্যে পার্থক্য হলো দুটো ভিন্ন ভিন্ন গ্রহের মত যারা চলতে থাকে নিজ নিজ কক্ষপথে !  

 

      দিদিরা নিজের ঘরের পাশাপাশিই তাদের জন্য ঘর ভাড়া করে দিয়েছে । ঘরের মেজটা পাকা । বাইরে কমন স্নানঘর, টয়লেট আদি । প্রতি মাসে পাঁচশত টাকা ঘর ভাড়া দিতে হবে। স্নান-টান সেরে দিদির ঘরে শান্তিতে পেট ভরে খাওয়া-দাওয়া করল সবাই। দিদি আগে থেকেই মুরগির মাংস, পোলাও আর মাছ, ভাত রান্না করে রেখেছে । দিদির  বাচ্চা গুলোও খুব তাড়াতাড়ি মিশে গেছে তার মেয়েদের সাথে । তারপর ঘরটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে সবকিছু গুছিয়ে রেখে, বিছানা পেতে, তারা বিশ্রাম করতে লাগল। মেয়েরা বালিশে মাথা লাগাতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। মর্জিনার বাবা ও ঘুমিয়ে পড়েছে ।

 

      মর্জিনার মায়ের ঘুম আসছে না। সে ভাবছে কতকিছু ! কীভাবে শুরু করবে নতুন পথ চলা ? পারবে কী সে ? হেরে যাবে না তো জীবন যুদ্ধে ? মর্জিনা পারবে কী ছোট্ট বোন দুটোকে দেখে-শুনে রাখতে ? কতই বা বয়স মেয়েটার ? সবে এগারোয় পা দিল ! এই বয়সে যে তার স্কুল যাওয়ার কথা ! এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে মর্জিনার মা ! তাকে যে কাজে যেতে হবে তাই ছোট বোন দুটোকে কে দেখবে ! মর্জিনা খুব শান্ত মেয়ে । ঘরোয়া কাজ-কর্ম ও শিখে ফেলেছে অনেকটা। সে পারবে সামলাতে । ছোট মেয়ে দুটোকে এখানে সরকারি স্কুলে ভর্তি করে দেবে । 

 

      পরদিন সকালে মর্জিনার কাছে মেয়ে দুটোকে রেখে দিদির সাথে নয়টার সময় চলে যায় কর্ম ক্ষেত্রে । রবিবার দিন থাকায় দিদির ছেলে-মেয়ে দুটোও ঘরে আছে। তাই একটু ভরসা আছে । দিদির বাচ্চা দুটো কিন্তু দারুণ চটপটে আর  সমঝদার ! ছেলের নাম শফিকুল আর মেয়ের নাম সফিনা । মর্জিনার বাবাকে শফিকুলের বাবা নিয়ে যায় সবজি বিক্রি করার মহাজনের কাছে একেবারে ভোরের আলো উঠার সঙ্গে সঙ্গে । 

 

      শফিকুলের বাবার অনুরোধে মর্জিনার বাবাকে মহাজন সবজি বিক্রি করার জন্য  নিযুক্তি দেয়। খুব ভোরে বেরিয়ে গিয়ে ঘরে ঘরে সবজি বিক্রি করতে হয়।  মহাজন বললেন, ‘ হ্যাঁ শফিকুলের বাবা, শুনো, আজ ও তোমার সাথে যাক্ । একটু চেনা জানা হউক । কাল থেকে ও একলা ফেরি করতে যাবে । ঠিক আছে ?’

 

শফিকুলের বাবা মর্জিনার বাবার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় ! সে জবাব দেয়, ‘ হবে হবে। ঠিক আছে।’

 

        তারপর তারা সবজির ভার কাঁধে নিয়ে সব্জি মণ্ডি থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তার ধার ঘেঁষে গিয়ে একটা গলি পথ ধরল তারা । এভাবেই কয়েকটি গলিতে ঘুরল তারা । পথের দুধারে কী উঁচু উঁচু বিল্ডিং, বাংলো বাড়ি, প্রায় বেশির ভাগ বাড়ির সামনে ফুলের বাগানে ফুটে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের ফুল । যেমন - গোলাপ, শেফালী, কাগজ ফুল, হাছনুহেনা, টগর, গাঁদা ফুল, ইত্যাদি  আরো কত কী নাম না জানা,  আগে  না দেখা বাহারি ফুল ! মর্জিনার বাবা অবাক চোখে শুধু দেখছে আর শফিকুলের বাবার সাথে হাঁটছে ।

 

     শফিকুলের বাবা হাঁক দিয়ে দিয়ে যাচ্ছে বাড়িগুলোর সম্মুখ দিয়ে ,  ‘ সবজি লাগে ? সবজি ? পটল, সজিনা, টমাটো, বেগুন, কাঁচা মরিচ,.........’। 

 

      ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলারা বেরিয়ে আসছে, দর- দাম  করছে, যার যেটা দরকার কিনছে । দাদা - বউদি বলে সম্বোধন করে কী মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছে শফিকুলের বাবা আর সবজি বিক্রি করছে ! কেউ সবজির বদনাম করতে গেলে আরো মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে সবজি বিক্রি করে তবেই ছাড়ছে ! লেশ মাত্র বিরক্তি নেই তার চেহারায় ! ঠোঁটের কোণের হাসিটা অম্লান হয়ে আছে ! সঙ্গে সঙ্গে মর্জিনার বাবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে , ‘ ও আমার আপন জন । এদিকে সবজি নিয়ে আসলে ওর কাছ থেকে কিনবেন । খুবই নিরীহ মানুষ ও .......।’ ইত্যাদি কত কথা !

 

      শফিকুলের বাবার সবজির ঝুড়ি দুটো পুরো খালি করে গিয়ে পৌঁছল মহাজনের কাছে । মহাজন শফিকুলের বাবার সাথে সাথে তার হাতেও কিছু টাকা গুঁজে দিল। তার শরীরটা খুব একটা  ভালো লাগছে না, মাথাটা ধরছে ! সারা দিনে বিড়িতে একটা টানও দিতে পারে নি। শফিকুলের বাবা একটা চায়ের দোকানে নিয়ে গেল । চায়ের সাথে বেকারির বিস্কুট খেয়ে, তারপর মুখে পান পুরে, ঘরে ফিরে যায় তারা। ঘরে গিয়েই আগে বিড়ির প্যাকেটটা বের করে শান্তিতে বেশ কয়েক টান দেয় সে । পৃথিবীর সব সুখ, আমেজ যেন এই বিড়ির টানে !

 

     মর্জিনার মাকে নিয়ে তার দিদি শফিকুলের মা একটা 'কনস্ট্রাকশন সাইটে' যায় যেখানে আরো মহিলারাও সহযোগিতার কাজ করছে । শফিকুলের মা ও এখানেই কাজ করে । সে আগে থেকেই ঠিকাদার বাবুর সাথে কথা বলে রেখেছিল । মর্জিনার মাকে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করিয়ে দেয় । বাবু বললেন,

-  ‘ আজ ঘুরে ঘুরে দেখে বুঝে নাও । কাল থেকে কাজ শুরু করবে । খুব নিপুণভাবে, একাগ্রতার সাথে কাজ করতে হবে নইলে কাজ থেকে বের করে দিতে সময় লাগবে না । রোজ তিনশো টাকা করে পাবে ।’

 

- ‘ ঠিক আছে বাবু । আমি ঠিক পারব ।’ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জবাব দেয় দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ মর্জিনার মা । সত্যি ! পারবে সে ! কারণ তার মধ্যে আছে অভাব অনটনের চিন্তা, মাথায় তিনটে মেয়ের দায়িত্ব বোধ, চোখে সুন্দর একটা ভবিষ্যতের স্বপ্ন !

 

      শফিকুলের মা তাকে একটু কনস্ট্রাকশন সাইটটা ঘুরিয়ে কয়েক জনের সাথে পরিচয় করিয়ে নিজে কাজে লেগে যায়।  মর্জিনার মা এদিক সেদিক ঘুরে ঘুরে দেখছে আর অবাক হচ্ছে !  বিল্ডিং গুলো মনে হচ্ছে  যেন আসমান ছুঁয়ে ফেলবে ! কী করে মানুষ উঠে এতো উঁচু ঘরগুলোতে ! মানুষ উপরে উঠতে উঠতে তো হাঁপিয়ে উঠবে।  এতো বড় বড় বিল্ডিং ! এক একটায় যেন পাঁচ গাঁয়ের মানুষ থাকতে পারবে ! দিদি বলেছে এগুলোকে বলে ফ্ল্যাট । আর উপরে উঠার জন্যও রয়েছে লিফট ! তাই নাকি কষ্টের কোনো কথাই নেই !   

 

     পরের দিন সকালে তাড়াতাড়ি রান্না-বান্না করে চারটা ডাল-ভাত খেয়ে দিদির সঙ্গে সাইটে চলে যায় সে। সাইটে গিয়ে শাড়িটা কোমরের সাথে ভালো করে পেঁচিয়ে উপরে মর্জিনার বাবার পুরোনো একটা শার্ট পরে, মাথায় একটা গামছা পেঁচিয়ে কাজে যোগদান করে সে । এখানে প্রায় সব মহিলা শ্রমিকরা পরেছে এরকম করে । 

 

     মর্জিনার বাবাও সবজি নিয়ে বেরিয়েছে । যে এলাকাটা শফিকুলের বাবা চিনিয়ে রেখেছে সেদিকটাই দেওয়া হয়েছে তাকে । শফিকুলের বাবা অন্যদিকে গেছে ।  প্রথম দিনই মর্জিনার বাবার বিরক্তি লাগে যখন একজন ক্রেতা তার পটলগুলোর বদনাম করে ! চেঁচাতে চেঁচাতে, ‘ সবজি লাগে.....’ তার গলাটা বেশ শুকিয়ে গেছে। গলির মোড়ে একটি নির্জন জায়গায় গিয়ে বিড়ি জ্বালিয়ে আমেজের সাথে কয়েক টান নিয়ে হালকা অনুভব করে সে । তারপর আবার চলতে থাকে। 

 

      সব সবজি বিক্রি করতে পারেনি সে । কিছু ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। শফিকুলের বাবা মহাজনকে বলল,

- ‘প্রথম দিন তো তাই বোধহয় বেশি কাবু করতে পারে নি । ধীরে ধীরে ঠিকই ঝুড়ি গুলো খালি করে নিয়ে আসতে পারবে ।’ 

      ঘরে ফেরার সময় শফিকুলের বাবা তাকে কীভাবে সে অনেকটা সবজি বিক্রি করতে পারবে, কীভাবে ক্রেতার মন জয় করতে হয় - এসব পন্থা বলতে বলতে ঘরে পৌঁছে তারা । কিন্তু মর্জিনার বাবার এসব এক কান দিয়ে ঢুকে আরেক কান দিয়ে বেরিয়ে যায় ! 

 

     সবজির ভার রেখে গলির নির্জন মোড়ে মোড়ে বিড়ি টানা চলতে থাকে তার । এখন আরো শিকড় মুখে পুরার ও অভ্যাস হয়েছে । রাস্তার মোড়ের ঐ দোকানটার সামনে কয়েকটা বখাটে ছেলে ক্যারাম বোর্ড খেলে। সেও সামিল হয়ে যায় তাতে !  ক্রেতা যদি সবজির দাম কম করার জন্য একটু বদনাম করে তবে বলে দেয় - ‘ আপনার পছন্দ হলে কিনুন না হলে নাই ।’ ‘এতো দেমাগ রে বাবা !’ - বলে ক্রেতা চলে যায়।

 

      সেদিন কাজ সেরে ঘরে ফেরার সময় রাস্তায় শফিকুলের মা মর্জিনার মাকে বলল, ‘ ফুলবানু ! আজ বাবু তোর কাজের খুব তারিফ করেছেন রে ! তুই খুব সুন্দর কাজ করছিস ! একটুও কামাই করছিস না ! ইত্যাদি । এত বদমেজাজি বাবু যদি তোর কাজের তারিফ করেছেন তাহলে সত্যি তুই খুব ভালো কাজ করেছিস ।’

 

- ‘ আলহামদুলিল্লাহ ! আমারও কাজ করে ভালো লাগছে বু। মেয়েগুলোকে দুবেলা দুমুঠো খাওয়াতে পারছি, পরাতে পারছি । ছোট মেয়ে দুটো স্কুলে যাচ্ছে । এই আমার যথেষ্ট । আর একটু একটু করে মর্জিনার বিয়ের জন্য ও কিছু জমাব ।’

 

- ‘তাই যেন হয়। আল্লাহ যেন তোর সব ইচ্ছা পূরণ করেন।’

 

      মর্জিনার বাবার সবজি বিক্রির কাজটাও চলে গেছে । তারপর দু'বছরের মধ্যে আরো কত কাজে লাগিয়ে দিল শফিকুলের বাবা কিছুতেই টিকে থাকতে পারে না সে ।তার বিড়ি, শিকড়, ক্যারাম বোর্ড আর তেমাথার দোকানের সামনে বসে আড্ডার নেশা চলতে থাকে সমানে ।  মর্জিনার মায়ের রোজগারেই সংসার চলে । 

 

     একদিন কাজের সাইটে খেতে বসে শফিকুলের মা লক্ষ করে খাবার খেতে পারছে না মর্জিনার মা । পাশে এসে জিজ্ঞেস করে, 

- ‘ কী হয়েছে তোর ফুলবানু ? মুখটা এতো শুকনো শুকনো লাগছে কেন ? খাবারও শুধু নাড়াচাড়াই করে যাচ্ছিস !......’ 

 

- ‘ ও কিছু না বু । আমার তিন মাস চলছে ..... বুঝেছ নিশ্চয়ই।’ ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি হেসে বলল মর্জিনার মা।

 

- ‘কী বলছিস তুই ! আবার !.......’

 

- ‘ বু দোয়া কর আল্লাহ যেন এবার একটা ছেলের মুখ দেখান ।’

 

- ‘ কী পাগলামি বকছিস তুই ! আগে-পিছে কিছু ভেবেছিস কী ! আর কত কষ্টের মুকাবিলা করবে !..... ‘ বলে শফিকুলের মা ভাবল  'মর্জিনার বাবা ও তো ছেলে মানুষ' কিন্তু মুখে কিছু বলল না কারণ সে জানে মর্জিনার বাবা যাই হোক মর্জিনার মা তাকে শ্রদ্ধা করে - ভালোবাসে ! 

 

-  ‘ভেবেছি বু ! মেয়েগুলো যেন একটা ভাই পায় এই কামনা করি। আজ আমার যদি একটা ভাই থাকত হয়তো আমাকে কত দেখে শুনে রাখত ! ‘

 

        কথাটা শুনে শফিকুলের মায়ের হৃদয় কেঁদে উঠে । আর কিছু বলতে পারে না সে। হাতটা বুলিয়ে দিল মর্জিনার মায়ের মাথায়-চেহারায় আর আশির্বাদ করল, 

- ‘ আল্লাহ যেন তাই করেন বোন !’ 

      তারা যে কনস্ট্রাকশন সাইটে কাজ করে দু'বছরে সেই হাউসিং কমপ্লেক্সে দুটো ব্লক কমপ্লিট হয়েছে । বসবাসের জন্য মানুষও এসে গেছে । প্রথম প্রথম শহরের মানুষের চলন-বলন ইত্যাদি অবাক চোখে দেখত মর্জিনার মা। তার মনে হতো ওদের জীবন-যাত্রা গ্রামের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা । সাইটে আরো কাজ চলছে, তারা সহযোগিতা করছে বরাবরের মত। 

 

        আজ সকাল থেকে মর্জিনার মায়ের শরীরটা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না । শফিকুলের মাকে বলেনি । শফিকুলের মা জানলে যে কী বলবে তা তার জানা আছে ! বলবে আজ আর কাজে যাওয়ার দরকার নেই , একটু আরাম কর । আমাদের ঘরে খেয়ে নেবে তোরা। কিন্তু তার যে লজ্জা লাগে কত সাহায্য করবে ওঁরা ! শফিকুলের মা বাবা দু'জনে মিলে রোজগার করে অনেকটা উন্নতি করেছে, কোথায় যেন একটা ভিটেও কিনেছে নিজেদের ঘর বানানোর জন্য। 

 

      আনমনা হয়ে বসে বসে কাজ করছে মর্জিনার মা । শফিকুলের মায়ের অনুরোধে আর মর্জিনার মায়ের  কর্ম নিষ্ঠায় সন্তুষ্ট হয়ে ঠিকাদার বাবু তাকে আগের তুলনায় একটু হালকা কাজ দিয়েছেন, যেগুলো বসে বসে করা যায় তবুও এ অবস্থায় সারাদিন কাজ করা যে কত ঝুঁকি পূর্ণ ! তাই বাবু তাকে ছুটি দিয়ে দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু  সে ছুটি নিতে রাজি হয়নি । 

 

       সকাল দশ/এগারোটায় মর্জিনার মা দেখল ফ্ল্যাটের কয়েকজন বিশিষ্ট ভদ্রমহিলা বেরিয়ে আসছেন । আহ্ কী সুন্দর চেহারা এক এক জনের ! কী সুন্দর স্বাস্থ্য ! দেখলেই মনটা ভরে যায় ! একজন মহিলা তার পাশেই দাঁড়িয়ে কারো সাথে মিষ্টি ধমক দিয়ে ফোনে কথা বলছেন,

-  ‘ আজকে নারী দিবস, তুই সেলিব্রেশনে না আসলে হয় ? তুই এতো বিখ্যাত নারীবাদী লেখিকা তাই তুই থাকলে আলাদা একটা ইমেজ তৈরি হত অনুষ্ঠানে । আমিও গর্ববোধ করতে পারতাম যে তোর মতো একজন সেলিব্রেটির বোন আমি।’ 

 

      মর্জিনার মা মনে মনে ভাবল এই ‘নারী দিবস'-টা কী ! খায় না মাথায় ভরা দেয় ! কৌতূহলী হয়ে মর্জিনার মা বাকি কথা গুলো ও শুনল । তারপর ওদিক থেকে কী জানি প্রত্যুত্তর আসল, ভদ্রমহিলার কণ্ঠস্বর পাল্টে গেল, 

- ‘ ওয়াও! আই এম সো হ্যাপি টু হিয়ার দ্যা গুড নিউজ ! তা আগে বলবে তো যে আমি মাসি হতে চলেছি ! শুন ! খুব সাবধানে চলাফেরা করবে ! বেশি কাজ কর্ম করবে না, বেশি দৌড় ঝাঁপ করবে না, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেবে,......।’ তারপর আবার ও প্রান্তের জবাবে তিনি বললেন,

-  ‘ এবার আমাদের মহিলা সমিতির অনুষ্ঠানে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় মুহূর্ত হচ্ছে  কিছু দুস্থ, অসহায়, রুগ্ন মহিলার মধ্যে বস্ত্র বিতরণ করা, ফলমূল বিতরণ করা ও আর্থিক সহায়তা করা।’ 

 

      মর্জিনার মা এক পলক তাকায় নিজের  কঙ্কালসার শরীরের মধ্যাঞ্চলের দিকে আর বুকের ভিতর থেকে আপনাআপনিই এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ! তার মনে বোধহয় সন্দেহ হয়েছে যে সে যে আট মাসের গর্ভবতী এটা বাইরে থেকে বুঝা যাচ্ছেনা নাকি ! বুঝা গেলে তো নিশ্চয়ই এই সব মহান মহিলারা তার প্রতি সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিতেন । তাঁরা তো প্রায়ই তার পাশ দিয়ে  কর্মক্ষেত্রে যান, বেড়াতে কিংবা শপিং এ যান কিংবা ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিকেলের মৃদু মন্দ হাওয়া গায়ে মাখেন আর সূর্যাস্তের সৌন্দর্য উপভোগ করেন  !

 

       সেদিন দুপুরে শফিকুলের মা তার পাশে এসে বসে খাবার বের করল । মর্জিনার মাকে শুকনো মুখে বসে আছে দেখে বলল,

-  ‘ এই খাবে না ?’ বলে নিজে তার ব্যাগ থেকে টিফিনটা বের করে খুলে দিল । মর্জিনার মা মুখে খাবার তুলেও খেতে পারছে না দেখে শফিকুলের মা জিজ্ঞেস করল, 

- ‘ তোর কী হয়েছে রে বোন ? কেমন যেন লাগছে তোকে !’  

- ‘ বু আমি আর পারছি না। ঘরে যাব । বিশ্রাম নেব ।’

- ‘ খাবারটা খেয়ে নে বোন । না খেয়ে থাকলে তোর আর বাচ্চার যে ক্ষতি হবে। আমি নিয়ে যাব ঘরে । তোর বিশ্রামের খুব প্রয়োজন।’ 

 

     কোনোমতে একটু আধটু খায় সে । তারপর শফিকুলের মা একটা রিক্সা করে তাকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে , শুইয়ে রেখে, মর্জিনাকে মায়ের লক্ষ রাখতে আর কোনো অসুবিধা হলে তাকে ডাকতে, এসব বলে নিজে আবার চলে যায় কাজে ।

 

     শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল মর্জিনার মা । ঘণ্টা খানেক পর ঘুম ভাঙ্গলে অনুভব শরীরটা কেমন যেন করছে । ওয়াশরুমে যায় । বমি করে। পেটে ব্যথা অনুভব করে । ধীরে ধীরে ব্যথা বাড়তে থাকে । সন্ধ্যার সময় ব্যথা এতটাই বেড়ে যায় যে তার আর বুঝতে বাকি রইল না যে এটা প্রসব বেদনা । মর্জিনাকে বলে দিদিকে ডাকতে । দিদি সবে মাত্র এসে গা ধুতে ঢুকেছে । তাড়াতাড়ি গা ধুয়ে বেরিয়ে মর্জিনার মায়ের কাছে আসে ।

 

     কিছুক্ষণ পর মর্জিনার মা একটা বাচ্চা জন্ম দিয়েই জিজ্ঞেস করে ,

- ‘ বু , ছেলে হয়েছে কি ?’

- ‘হ্যাঁ রে তোর ছেলে হয়েছে !’

কতবছর পর যেন মর্জিনার মায়ের মুখে খুশির হাসি ফুটে উঠে ।

- ‘ আলহামদুলিল্লাহ ! বু ওকে আমার কোলে দাও !’ 

     ছেলে কোলে নিয়ে আদর করে । অস্পষ্টভাবে গুন গুনিয়ে ‘আল্লাহ ! লাইলাহা ইল্লা.......’  বলে হঠাৎ পড়ে যায়। শফিকুলের মা তাড়াতাড়ি বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে শুইয়ে রেখে দৌড়ে এসে তুলতে গিয়ে তাকে আর তুলতে পারে না । মর্জিনাকে ডেকে দু'জনে মিলে ধরে বিছানায় শুইয়ে দেয় । দেহটা কেমন যেন ঠাণ্ডা হয়ে গেছে । অনেক ডাকাডাকি, হাতে পায়ে তেল মালিশ করেও যখন আর তুলতে পারল না তখন শফিকুলের মায়ের বুঝতে বাকি রইল না  যে সব শেষ ! চিৎকার করে কেঁদে উঠল, 

- ‘ মর্জিনা তোর মা কী আমাদের ছেড়ে চলে গেল রে ! তোর বাবাকে ডাক !’

 

      বাবাকে কোথায় ডেকে পাবে মর্জিনা ! সে যে ভবঘুরে ! রাত দশটার আগে কী ঘরে ফিরে ! যা হারানোর বাচ্চাগুলোই তো হারিয়েছে ! সে তো আরেকটা বিয়ে করলে বউ পেয়ে যাবে !!!

 

 

বুধবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

যাত্রা


মূল অসমিয়া : মামণি রয়সম গোস্বামী (ইন্দিরা গোস্বামী)

বাংলা অনুবাদ: মনোতোষ চক্রবর্তী



[অনুবাদটি হুমায়ুন কবির ও আতাউর রহমান সম্পাদিত  "চতুরঙ্গ' পত্রিকার বর্ষ ৬১ -র ৩-৪ সংখ্যার (কার্তিক-চৈত্র ১৪০৮ বাংলা ) ২২২-পৃৃৃষ্ঠা- তে প্রকাশিত। পাঠক হিসেবে আমাদের মনে হয়েছে কিছু শব্দে মুদ্রণ প্রমাদ আছে, কিছু শব্দের বানান আকাদেমি অভিধান অনুসারে পরিবর্তন দরকার (যেমন কি-র বদলে কী, ভাল-র বদলে ভালো), কিছু শব্দেরও পরিবর্তন দরকার (লেখক অঞ্চল শব্দটি নিজেও ব্যবহার করেছেন, কিছু জায়গাতে খণ্ড ছিল---আমরা অঞ্চল করে দিলাম)। আমরা সেই সব করেছি। --সুশান্ত কর] 
(C)Imageঃছবি

 

 

অধ্যাপক মীরাজকার ও আমি কাজিরাঙ্গা অভয়ারণ্য দেখে ফিরে আসছিলাম। আমরা দু’জন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতীয় ভাষা বিভাগে কাজ করি। খুব আগ্রহের সঙ্গে আয়োজিত ছাত্রদের এক সভায় আমরা দু’জন নিমন্ত্রিত অতিথি হয়ে এসেছিলাম।

আমরা দু’জন একটি অ্যাম্বাসেডরে গুয়াহাটি অভিমুখে ফিরছিলাম। গাড়িটি ছিল খুব পুরনো। সে জন্যে আমরা দিনের আলোয় ফিরছিলাম যাতে গুয়াহাটিতে তাড়াতাড়ি পৌঁছুতে পারি।

মীরাজকার সাহেবের বাঘ-ভালুকের ভয় ছিল না। কিন্তু সন্ত্রাসীদের তিনি বড় ভয় পাচ্ছিলেন। তাঁর একজন অন্তরঙ্গ বন্ধুকে পাঞ্জাবের সন্ত্রাসবাদীরা গুলি করে হত্যা করেছিল। পথে তিনি আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন:

তোমাদের এই রম্যভূমিতে সত্যি সত্যি সন্ত্রাসবাদের সমাপ্তি ঘটেছে?

আমি এই প্রশ্নটির সঠিক উত্তর দিতে পারিনি।

আসার পথে আমরা বেশ কয়েকটি জায়গায় মিলিটারি চেকপোস্ট পার হয়ে এসেছি। আসার সময় তারা টর্চ জ্বালিয়ে আমাদের তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা করেছে। কোন জায়গায় কাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল ড্রাইভারটি আমাদের এই কথা বলছিল।

... অত্যন্ত সুন্দর পথ দিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম। দূরের আলোয় ওইগুলি কি বাঁশ? কাজিরাঙ্গার টুরিস্ট লজের বারান্দায় বসে আমি বাঁশ ঝাড় থেকে আসা ঝরঝর শব্দ শুনছিলাম। মনে হয়েছিল কেউ একটা মুগার কাপড়ের থান খুলে আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছে। ... ছাতিম  গাছের বাঁকা হয়ে আসা একটি ডালে খুব একটি ডালে খুব একটা বড় একটা পেঁচা বসে ছিল। জ্যোৎস্নারাতে তার গোল মাথাটি সদ্যোজাত শিশুর গোল মাথার মতো দেখাচ্ছিল।

মীরাজকার সাহেবকে বুঝিয়েছিলাম---গুয়াহাটিতে পৌঁছুতে আমাদের দেরি হলেও আপনার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সন্ত্রাসবাদ আস্তে আস্তে শেষ হয়ে আসবেই। হয়ত হয়ে গেছেও।

... আমরা জাতীয় সড়কের দু’দিকে সবুজের অপূর্ব শোভা দেখছিলাম। দুপুরের সোনালি রোদ যেন একখানা রেশমের কাপড় হয়ে এসে ফুল, ধান, পাতা সব কিছুকেই আরও উজ্জ্বল ও স্বচ্ছ করে তুলেছিল। ধানের খেতগুলি যেন এক উন্মত্ত যৌবনের কাহিনির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল।

মীরাজকার সাহেব মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দূরের পাহাড়শ্রেণীর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কোথাও ছায়া পড়ে গভীর নীল ধারণ করা, কোথাও রোদ পড়ে সোনালি পাহাড়ের রূপ ধারণ করা, আর কোথাও আধো আলো, আধো অন্ধকারের রহস্যময় রূপ ধারণ করা পাহাড় যেন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল।

... তবুও মাঝে মাঝে তিনি উৎকর্ণ হয়েছিলেন।

কী জানি কোথায় তিনি সন্ত্রাসবাদীর বন্দুকের আওয়াজ শুনতে পাবেন। কিছু সময় পর এই ভাবনা তাঁর মন থেকে দূর হল। এই সময় সন্ত্রাসবাদী নেই আমার এই কথা তিনি বিশ্বাস করলেন।



শিমূল, খয়রা, শিশু, হলং, পমা , বগীপমা, বকুল, জাম আর সেগুন গাছে ভরা অরণ্যের পথে আমরা এগিয়ে গেলাম। অস্তগামী সূর্যের শেষ আলো গাছ-গাছালির সারিতে ঢুকে পড়ল। আলোর টুকরো যেন রেশমের একটি চাদরের টুকরো গায়ে জড়িয়েছে সেই ঝড়ের মধ্যে এখন ছোপ ছোপ দাগ দেখা গেল। যেন রোদের নয় হরিণের ফুটকি ফুটকি ছাল গাছগুলি শরীরে জড়িয়েছে। ... রেশমের চাদর এখন হরিণের ফুটফুটে ছাল।

ধানক্ষেতের সবুজ রংও এখন এক অনন্য রূপ নিয়েছে। এই রং কোনোখানে অন্ধকারের আঁচলে কাঁচুমাচু হয়ে ঢুকবার তোড়জোড় করছে। কোথাও রোদের আলোয় গা ধুয়ে যেন পরিচ্ছন্ন হয়ে আছে, কোথাও যেন সোনালি সুতোর সঙ্গে জট পাকিয়ে আছে এই রং, আবার কোথাও যেন এই রং বৌদ্ধ ভিক্ষুর শরীরে কাপড় টানাটানি ক’রে আনার চেষ্টা করছে।

গাড়ি এগিয়ে গেল। ড্রাইভার বলল:

এই অঞ্চলে এখন আর কারও হাতে বন্দুক নেই। গতবার এখানেই গোলাগুলি হয়েছিল।

বন্ধুক নেই? আঃ, একটি মোলায়েম গালিচা যেন সবকিছু ঢেকে রেখেছে। ... ঢেকে রেখেছে বারুদের ধোঁয়া, ঢেকে রেখেছে রক্তের দাগ...!!

মীরাজকার সাহেব বললেন, এই অঞ্চল থেকে বন্দুকগুলি উধাও হয়েছে, যদিও চোরাকারবারিদের হাতে বিভিন্ন ধরনের বন্দুকের আদান-প্রদান হচ্ছে।

কাজিরাঙ্গায় বন-বিভাগের আধিকারিক আহমেদ সাহেব বলেছিলেন, চোরাকারবারীরা পয়েন্ট থ্রি-জিরো, থ্রি-ইউ এস কার্বাইন, ফাইভ হান্ড্রেড ডাবল ব্যারেল, ফোর সেভেন জিরো ডাবল ব্যারেল ব্যবহার করছে। মারিডিফুতে দু’জন চোরাকারবারি ধরা পড়েছে। গুলি খেয়েও মরেছে কয়েকজন।

মীরাজকার সাহেবের বন্দুকের প্রতি একটি জন্মগত কৌতূহল ছিল। তিনি বন্দুক, খার-বারুদ ইত্যাদি সম্পর্কে অনেক কিছু জানতেন। বইপত্রও পড়েছিলেন। এই বার তিনি প্রথম মহাযুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে এই রকম কিছু বন্ধুক সম্পর্কে কয়েকটি সরস কাহিনি বলতে আরম্ভ করলেন। রমাকান্ত ড্রাইভারও খুব কৌতূহলের সঙ্গে মীরাজকারের কথা শুনল। সে তার অর্ধেক বয়সী। চুল না থাকার জন্য সে মাথায় নেপালি টুপি পরে। ছোটখাটো শক্ত চেহারা। ঘাড়-গলা প্রায় নেই বললেই চলে। চোখ দু’টিও তেমনই ছোট। নাকের নিচে জম্পেশ গোঁফ। সে বিজ্ঞ ড্রাইভার, ক্লাচ ও ব্রেক বেশি ব্যবহার করে না।

দূরের অপূর্ব প্রকৃতির শোভা থেকে কোনও মতেও আমি চোখ সরিয়ে নিতে পারছিলাম না। মাঝে মাঝে মীরাজকার সাহেবের কথা থেকে আমার মন সরে যাচ্ছিল। দূরের বড় বড় ভেলেউ গাছগুলিতে লেগে থাকা শ্যাওলা চোখে পড়ছিল। সেইগুলোকে বানরের শরীরের লোমের মতো লাগছিল। আঃ কত ধরনের গাছ ওইগুলি? কিছু কিছু গাছকে মুগা লতার মতো দেখতে বন্যলতা আষ্টে-পৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। যেন মাকড়সার জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বন্দি কোনও অর্বাচীন খণ্ডহর। ... আঃ, ওইগুলি কোণ বর্ণের পাতা? কাঁঠাল গাছের পাতার মতো? আর ওই গাছগুলি? পুঁটি মাছের শরীরের মতো পাতা? কিছু কিছু গাছের ভিক্টোরিয়ার ছবি থাকা রূপার টাকার মতো গোলগোল পাতা? কিছু কিছু ঝোপের গাছের পাতা নারিকেল গাছের পাতা আবার অন্য গাছকে ছায়া দিচ্ছে। কী গাছ ? কী গাছ? এইগুলি... আর ওইগুলি? মনে হয় ওইগুলি যেন বিরিণ গাছ নয় মাটিতে খেলা করছে মেঘ।

মাটিতে পড়ে থাকা এই রকম মেঘের খেলা মীরাজকার সাহেবও বহুদিন দেখেন নি। দিল্লির এক বিষম আবহাওয়া থেকে এসে যেন তিনি এক অনুপম স্বর্গরাজ্যে উপস্থিত হয়েছেন। এখানে বন্দুকের শব্দ? হাতিমারা বন্দুক!

পয়েন্ট থ্রি জিরো থ্রি?

ফাইভ হাণ্ড্রেড ডাবল ব্যারেল?

পয়েন্ট ফোর সেভেন জিরো?

ইউ. এস. কারবাইন, উইথ এ সাইলেন্সর।

... না, না এই সব অস্ত্র এখানে থাকা অসম্ভব? দিল্লির আবহাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা যায় না এটি এ রকম এক মধুর ভূমি। স্বর্গরাজ্য! দিল্লি আর মানুষ থাকার যোগ্য নয়। আফগান, তুর্কি কবির যমুনা এখন দুর্গন্ধ নর্দমায় পরিণত হয়েছে। মানুষের ভিড়ে সদরবাজার যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। রিং রোডে এক্সিডেন্ট হয়ে পড়ে থাকা মৃত মানুষের শব বাসি হয়ে থাকার মতো অবস্থা হয়েছে।

... আস্তে আস্তে দিনের আলো সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে এল। এক প্রকাণ্ড অজগর সাপ যেন নিজের চকচকে ছাল ফেলে অদৃশ্যের দিকে অগ্রসর হতে আরম্ভ করেছে... । দিন সাপ হয়ে অন্তর্ধান করল।

... হুর হুর হুরাৎ... গাড়ি শব্দ করে রাস্তার কিনারে চা ও ডাবের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। রমাকান্ত সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থেকে নেমে গেল বনেট খুলে দেখল। রেডিয়েটার লিক হয়ে জল শুকিয়ে গেছে। প্রচণ্ড গরমও হয়েছে। লিকেজ বন্ধ করার জন্য গাড়ি গ্যারেজ নিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।

আমরা দু’জনেই নামলাম। ... ছোট ছোট কয়েকটি দোকান কাছে থাকায় আমার মন্দ লাগল না। মীরাজকার সাহেব বললেন:

জঙ্গলের মধ্যে খারাপ হলে খুব মুশকিল হত। অন্ধকার হয়ে আসছে। আমিও তাঁর কথায় সায় দিলাম। ইতিমধ্যে রমাকান্ত ওয়ার্কশপের খোঁজ নিতে রাস্তার কিনারের ছোট ছোট দোকানগুলিতে ঘোরাফেরা করতে লাগল।

হঠাৎ দেখলাম জাতীয় সড়কের একটু ভেতরের একটা দোকান থেকে একটি মানবমূর্তি আমাদের গাড়িটিকে লক্ষ ক’রে আসছে। হাতে একটা কেরোসিনের বাতি । ঢিলে পাঞ্জাবি, হাঁটুর গোঁড়ায় ধুতি। পায়ে স্যান্ডেল আছে কি না বোঝা যায় না। ...

তিনি এগিয়ে এসে একেবারে গাড়ির সামনে দাঁড়ালেন। ... আমি ভালোভাবে লক্ষ করে দেখলাম তাঁর চুলের গুচ্ছ দীঘল। খোঁপা করে বেঁধে রেখেছেন। বয়স হয়েছে। সত্তরের  চৌকাঠ পার হয়েছেন বলে মনে হয়। ... বাতিটা উপরে তুলে তিনি বললেন:

সম্ভবত গাড়ি ব্রেকডাউন হয়েছে --- ওয়ার্কশপ সাতমাইল দূরে। ... দাঁড়ান আমি গাড়ি একটা দাঁড় করাই। ড্রাইভার গিয়ে ওয়ার্কশপ থেকে একজন মেকানিক আনতে পারবে। এই সময়টুকু আপনারা আমার দোকানে কিছুক্ষণ বসতে পারেন। চা-পান খেতে পারবেন।

এইবার তিনি গিয়ে মাঝখানে দাঁড়িয়ে কেরোসিনের বাতিটি উপরে তুলে ধরলেন। বেঁধে রাখা খোপাটি খুলে কাঁধের উপর চুলগুলি ছড়িয়ে পড়ল।

দীঘল চুল, হাঁটুর উপর ধুতিতে তাঁকে ওঝাপালির ওঝার মতো লাগছে। রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামানোর জন্য তিনি বিচিত্র ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকলেন।

মীরাজকার সাহেব ও আমি শেডের নীচের দোকানটিতে ঢুকলাম। ছোট হ্যারিকেন ল্যাম্প, তা-ও বাঁশের খুটার উপর ঝুলিয়ে রাখা আছে। ল্যাম্পটির চিমনি ফাটা ও মলিন। কেরোসিনের স্টোভ, কিম্ভূতকিমাকার চেহারার একটা সসপেনে আধা করে রাখা চা আর কয়েকটি জং ধরা টিন একটি কাঠের বেঞ্চের নীচে ফেলে রাখা হয়েছে। বেড়ায় সিগারেট ফুঁকতে থাকা চিত্র-তারকার একটি ফটো ঝুলিয়ে রাখা আছে। পেট্রলের গ্যালন, ছেঁড়া কাপড়, নারিকেলের খুলি ইত্যাদি কাঠের বেঞ্চের চৌকোণে ছত্রাখান হয়ে পড়ে আছে। চারিদিকে এক হতাশাজনক দৃশ্য। আমরা দু’জন কাঠের বেঞ্চটিতে বসলাম। আমরা বসার সঙ্গে সঙ্গে কেরোসিনের বাতি একটা নিয়ে একজন বৃদ্ধাও এসে হাজির হলেন। তিনি বললেন :

            উঃ ! আজ সারাটা দিন আমি যেন সাগরে মাছ ধরছিলাম। একটাও খদ্দের নেই।

খদ্দের নেই?

আমি বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলাম। বৃদ্ধ বললেন : ওইসব দোকানে খারাপ জিনিসও বিক্রি হয়। আমরা হচ্ছি ভক্ত মানুষ। ওই ধুমপানরত মেয়েটির ছবি এখানে রাখা নিয়ে ছেলের সঙ্গে ঝুটঝামেলা হয়ে গেছে।

বুড়ি এইবার কাঁপা কাঁপা হাতে চায়ের সসপেনটি তুলে নিলেন। বাতি ও সসপেন নিয়ে দোকানের পিছন দিকে গিয়ে সসপেনটি ধুয়ে নিয়ে এলেন। স্টোভটিতে বোধহয় কেরোসিন ছিল না। জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গে একটা উগ্র গন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল।

মীরাজকার ও আমি এক কাপ গরম চায়ের অভাব খুব বেশি করে অনুভব করছিলাম। বুড়ি কাঁপা কাঁপা হাতে কাঁচের গেলাস, দুধ ইত্যাদি সরঞ্জাম সাজিয়ে নিচ্ছিলেন দেখে আমার একটু খারাপ লাগল। দুটি বাতির আলোয় এবার বুড়ির পরনের পোশাক-আশাক বড় স্পষ্ট হয়ে উঠল। সূতির মেখলা। পাড় দেওয়া চাদরের এখানে ওখানে সুপুরির পিকের দাগ। ব্লাউজের অনেক তালি। ছিঁড়ে যাওয়া খানিকটা জায়গা দিয়ে বৃদ্ধার শরীরের শিথিল মাংস যেন স্পষ্ট হয়ে পড়েছে। আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম: দিদিমা , এই বয়সে আপনাকে যে এইরকম করতে হচ্ছে, সাহায্য করার মতো কেউ কি নেই?

ছিল, ছিল, সাহায্য করার জন্য আমার বৌমা ছিল। গতবছর বন্যার সময় আমার বড় ছেলেটি মারা গেছে। অজানা এক ব্যাধি হয়েছিল, চিকিৎসা করা হয়নি। ডাক্তাররা ডাকাত হয়ে গেছে কি না। সে মারা যাবার সময় ও অন্তঃসত্ত্বা ছিল। এখন একটি ছেলে জন্মেছে। মেয়েটি খুব দুর্বল। এখানে এসে সাহায্য করা দূরের কথা, পেট  ও পিঠ এক হয়ে গেছে। ভালোমতো খাওয়া-দাওয়া তো হয়ই না!

আমি প্রশ্ন করলাম, বাড়িতে আর কে আছে দিদিমা?

দু’টি ছেলে ও দু’টি মেয়ে আছে। তারা স্কুলে পড়ছিল। একটি উগ্রপন্থীদের দলে যোগ দিয়েছে। অন্যটি কোথায় উধাও হয়েছে জানি না। ... অথচ আজ সাত বছর ধরে নদীর উপদ্রব। ভূমি একেবারে গ্রাস করে ফেলেছে। দিদিমা এবার ফিসফিস করে বললেন:

আমার বড় মেয়ে নির্মালির একজন মিলিটারির সঙ্গে গণ্ডগোল হয়েছিল। পাড়ার ছেলেরা তাকে মেরে শরীরের হাড় ভেঙে দিয়েছে। মিলিটারি বেঁচে গেল। দায়ের কোপ একটা কিন্তু খেয়েছে।

... এই সময় হাতে কেরোসিনের বাতি নিয়ে বুড়ো রাস্তা থেকে ফিরে এলেন। তিনি বোধহয়, গাড়ি দাঁড় করিয়ে মেকানিক আনার জন্য ড্রাইভারকে পাঠিয়ে দিয়ে এখন ফিরে এসেছেন। দূর থেকেই তিনি চিৎকার করছিলেন।

ও নির্মালির মা! শ্রান্ত হয়ে আসা পথিকদের নিজের দুঃখের কাহিনি শুনাস না; চা দে চা দে...!

হঠাৎ বুড়ি উঠে গিয়ে বৃদ্ধের কাছে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বললেন:

আজ রেললাইনের কাছে মনোহররা ওকে দেখেছে। বুড়ো আশ্চর্য হয়ে কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকলেন। তারপর হালকা করে দেবার জন্য বললেন:

গতবারও মানুষ তাকে রেললাইনের কাছে দেখেছে বলে বলেছিল। এই সব কথায় মন-কান দিস না! ... যা যা কাজিরাঙ্গা দেখে ক্লান্ত হয়ে আসা খদ্দেরদের চা দে!

বিস্কুট আছে না-কি?

নেই, বিস্কুট কোথায় থাকবে? গত সপ্তাহ থেকে চিনি চা-পাতা আনতেই ভাঁড়ার খালি!

মীরাজকার সাহেব ও আমি একসঙ্গে চেঁচিয়ে বললাম :

না-না আমরা গরম চা-ই শুধু খাব।

চা করে একেবারে ঢেলে দেওয়া পর্যন্ত বুড়ি দিদিমা মনমরা ও অসন্তুষ্ট হয়ে রইলেন ও বলতে থাকলেন...

বুড়ো কী চিন্তা করবে! আমি জানি আর কী ঘটবে---হরি হরি আর কী ঘটবে ! বন্যার সাহায্য সমিতি কোথায় মিটিং করেছে...পথের কিনারে দপ্তর সাজিয়ে সরকারি মানুষ থেকেছে... এই মেয়েটি শুনেছিল আজ সাতবছর কত কত জমি খেয়েছে--- সরকারি লোক একজন টাকা একশো দিয়ে খেল খতম করে দিল...

বুড়ো দাদু গর্জে উঠলেন: এই বুড়ি চুপ করে থাক!


সরকারি অফিসারের পায়ে পড়তে লজ্জা করে বুড়োর। বন্যায় নাজেহাল হওয়া মানুষকে দেবার জন্য সরকারের দেওয়া টাকা পয়সা খেয়ে ফুলে ফেঁপে ওঠা লাঠি নিয়ে তিনি ঘোরাফেরা করতেন... বসতেন দামি কারুকার্যময় গালিচায়... সেই সব পুরনো কথায় মাথা ভার হয়ে আছে... ঠেলে ঠেলে আমি সরকারি মানুষের কাছে পাঠাতে পারিনি---সাতবছর ধরে ভুগছি... আমার অবস্থা দেখে আসবে এবার অন্তত সরকারকে বলবে... কাজিরাঙ্গার জন্তুগুলি দেখলে এলে তোমরা আমাদের গ্রামের মানুষগুলির অবস্থাও দেখে আসবে! বুড়ো দাদু এবার হাতজোড় করে বললেন:

বাবারা , আপনারা মনে কিছু করবেন না... খদ্দের এলেই বুড়ি এরকম বকবক আরম্ভ করে।

বুড়ির দিকে তাকিয়ে এবার ধমক দিয়ে উঠলেন।

দে দে চায়ের সঙ্গে অল্প আদাও থেঁতলিয়ে দে! আদা যদি না থাকে তেজ পাতা দু’টুকরো ফেলে দে...

হঠাৎ আমার চোখ পড়ল বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখা একটা দোতারার দিকে । আমরা বসে ছিলাম যে বেঞ্চে তার পেছন দিকে ঝুলিয়ে রাখা ছিল বলে এতক্ষণ ভালো করে আমার চোখে পড়েনি। বস্তা, টিন, নারিকেলের খুলি ইত্যাদি নানারকম জিনিসের স্তূপের মধ্যে আমি এই দোতারাটি লক্ষ করে আশ্চর্য হলাম। কারুকার্য করা আছে। খুব অল্প করে রাখা বলে মনে হল।

দাদু, এই দোতারাটি কে বাজায়?

প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করার সঙ্গে সঙ্গে একটা ঐশ্বরিক হাসি দাদুর মুখে ছড়িয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ আগেও বৃদ্ধের মুখে যে এই ধরনের হাসি ঝিলিক দিয়ে উঠতে পারে এ বিষয়ে আমার ধারণা ছিল না। তিনি বললেন:

ডিফলুর পাড়ে যতগুলি নামঘর আছে সবকটিই আমার এই বাদ্য চিনত। ডিফলুর পাড়ের অনেকগুলি নামঘর নদী গ্রাস করেছে, আরিমরাহ, হোলাপার, কোহরার, মিহিমুখ সবকটিই একসময় আমার এই দোতারাটিকে চিনত। ডিফলুর পাড় দূরের কথা ব্রহ্মপুত্র পার হয়ে একেবারে বেহালি পর্যন্ত মানুষ আমার গানের প্রশংসা করত!

কোণায় পড়ে থাকা একটি বেলনায় আদা থেঁতলাতে থাকা বুড়ি দিদিমা আবার রেগে উঠলেন---

বুড়ো এখন পুরোনো কালের ইতিহাস বলবে। দুইমাস ধরে উধাও হয়ে থাকা ছেলেটি যে খাই খাই মূর্তি ধরে রেললাইনের কাছে দাঁড়িয়ে আছে সে সব কথা, হায়, সে সব কথা বুড়োর ভালো লাগে না।

চুপ থাক, চুপ থাক বুড়ি। দু’গ্লাস চা করতেই এত দেরি করছিস!

অধ্যাপক মীরাজকার মধ্যস্থতা করে বললেন:

আমার কিন্তু একটা গান শোনার খুব ইচ্ছে হয়েছে!

দাদু যেন এই কথা শোনার জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন।

হ্যাঁ, হ্যাঁ শোনাব শোনাবো, আপনাদের মেকানিক এখনও এসে পৌঁছায়নি, কিছুক্ষণ বসতেই হবে। যত খদ্দের আসে, সবাই আমার গান শোনে... বুড়ি আবার রেগে ধমকে উঠলেন---

গত সপ্তাহ থেকে খদ্দের আসেনি বললেই হয়। দেখলেন তো কতগুলি গাড়ি পার হয়ে গেল! বুড়োর দিকে তাকিয়ে আবার বললেন: আমি খদ্দেরদের চা দিচ্ছি। আপনি  বাতিটি নিয়ে রেল লাইনে গিয়ে দেখে আসুন। গল্প করতে আর গান গাইতে বসলে বুড়ো আর উঠবেই না।

রাখ! রাখ! বুড়ি! গতবারও কে একজন বলেছিল না সে রেললাইনে এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করছে?

বুড়ির হাত থেকে গ্লাস দুটো নিয়ে দাদু সাবধানে আমাদের দিকে এগিয়ে দিলেন। একেবারে নিশ্চিন্ত হয়ে দাদু বললেন:

চাটুকু খেয়ে নিন। আমি গান শুনাবই।

আমরা দু’জনেই খুব আগ্রহের সঙ্গে ধোঁয়া-ওঠা চায়ের গ্লাস হাতে তুলে নিলাম।

দাদু বললেন: কাজিরাঙ্গায় বাঘ দেখেছেন কি? শুনেছি ১৯৬৬ সনে কাজিরাঙ্গায় কুড়িটা মাত্র বাঘ ছিল, এখন ষাটটার মতো না-কি আছে... গণ্ডারও তিনশো’ থেকে দেড় হাজারের মতো হয়েছে, হাতিও পাঁচশো’র বেশি না কি হয়েছে...

আমি উৎসাহের সঙ্গে বললাম: আমরা একটা হাতির পাল দেখেছি। এদিকেও কখনও সখনও হাতি বেরোয় না-কি?

 

যানবাহনের শব্দের জন্যে এইদিকে হাতির দল আর বেরোয় না। আগে খেতে মাঠে নামা হাতিকে আমাদের জাল পেতে তাড়াতে হত... কিন্তু বাঘ বেরোয়। এই তো সেদিন একটি ঘটনা ঘটে গেল। ডিমৌগুড়ির মহন্তের হাতিটি রাস্তার পাশের পুকুরের পাড়ে বেঁধে রেখেছিল। খুব শান্ত হাতি। ডিফলুতে ধোয়ানোর জন্য নিলে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খেলাধুলা করত। দুপুরবেলা পুকুরের পাড়ে হাতিটি শুয়ে ছিল।

হঠাৎ কখন বাঘ এসে পাছা কামড়ে নিয়ে গেল আমরা টেরই পেলাম না। ‘ইস! ইস!’ আমরা আর্তনাদ করে উঠলাম। বুড়ো দাদু এবার হাতির গল্প বলতে আরম্ভ করলেন:

হাতি কিন্তু অন্তর্যামী জন্তু! শুনেছিলাম বেশ কয়েকটি মহাসমর না-কি হাতির জন্যই হয়েছিল... আমাদের লক্ষ্মী সিংহের দিনের মোয়ামারিয়া বিদ্রোহ না-কি একটি হাতির জন্যই হয়েছিল।

একটা হাতির জন্য?

হ্যাঁ, একটা রোগা হাতির জন্যই। পড়েন নি কি মা জননী? লক্ষ্মীনাথ সিংহের সময়ের কথা? বুড়ো বয়সে রাজ্যপাট পেয়েছিলেন ---কীর্তিনাথ বরবরুয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। আমাদের রাজাদের মধ্যে এই লক্ষ্মী সিংহ আর গৌরীকান্ত সিংহ দেখতে খুবই কদাকার ছিলেন। গৌরীকান্ত সিংহ আফিম খেয়ে চোখ মেলতে পারতেন না।

শুনুন, শুনুন।

হাতির গল্প...! বরবরুয়ার আবার মোয়ামারিয়া মহন্তের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছিল না! এই ঝগড়ার বীজ অবশ্য অন্য জায়গায় ছিল। ... বছরের শেষে হাতি পরিশোধ করতে হত, পর্বত মোয়ামারিয়া মহন্ত বরবরুয়াকে একটা ক্ষীণকায় হাতি উপহার দিলেন। হাতি দিতে গিয়েছিলেন নাহর খুড়া। বরবরুয়া ভয়ংকর ক্রোধে নাহরের কান দুটি কেটে ফেললেন।

... এই সময় বুড়ি দিদিমা আবার একবার ধমক দিয়ে উঠলেন---

কান-কাটা ছাড় এই বুড়ো... বাতিটি নিয়ে দেখে আয় কোথাও মিলিটারির গুলি খেয়ে পড়ে থাকে যদি...

বুড়ো দাদু সেইদিকে খুব একটা মন দিলেন না। বললেন:

এই অঘ্রান মাসে ন’হাজার মোয়ামোরিয়া সেনা রংপুর পর্যন্ত গিয়ে কীর্তি চন্দ্রকে শূলে চড়াল, এই সব কাহিনির গোড়াতেই সেই ক্ষীণকায় হাতিটিই তো ছিল?

আমি দাদুর কথা শুনতে শুনতে চা খাচ্ছিলাম। মাঝখানে ড্রাইভার রমাকান্ত এসে চটপট এক গ্লাস চা খেয়ে গেল। সঙ্গে বলেও গেল যে “ কাজ শেষ হতে খুব কম করে আরও ঘণ্টা দেড়েক লাগবে। রেডিয়েটারটি খুলে ওয়ার্কশপে নিয়ে চলে গেছে!”

 বুড়ি দিদিমা বললেন:

আজ দু’জন মার খদ্দের এসেছে। মা জননী আরও এক গ্লাস করে চা যদি খান তা’হলে খুব ভালো হয়। চিনি, চা-পাতা তো আছেই!

আমরা দু’জনে খুব উৎসাহের সঙ্গে দিদিমাকে আরও এক গ্লাস করে চায়ের অর্ডার দিলাম।

দাদু ইতিমধ্যে দোতারার তার দুটি ঠিক করে নিলেন। সঙ্গে সঙ্গে বলেও গেলেন---

বন্যার কবল থেকে কোনওরকমে আমি এই দোতারাটি রক্ষা করেছি। এইরকম দোতারা বানানোর কারিগর এখানে আর নেই। এটি আমার খুব আদরের...

বুড়ি দিদিমা আবার মনে করিয়ে দিলেন ---খদ্দেরদের আমি যত্ন করে দেখছি। বাতিটি নিয়ে রেললাইনের দিকে গিয়ে দেখে এস... কিছু বলা যায় কি। কিছু বলা যায় কি!!

বুড়ো দাদু এবার ধমক দিয়ে উঠলেন।

চুপ কর বুড়ি! আমাকে খদ্দেরদের সঙ্গে কথা বলতে দেখলে তোর কলিজা পোড়ে, তাই না? সঙ্গের সবাই মরে, হেজে শেষ হয়ে গেছে। গল্পের সঙ্গী আর নেই...।

বুড়ি দিদিমা চাদরের আঁচল দিয়ে চোখ দু’টি মুছলেন। চায়ের ছাকনি আর সসপেন নিয়ে তিনি ধীরে ধীরে বাইরে চলে গেলেন। সম্ভবত পুরোনো সব চা-পাতা ফেলে দিয়ে তিনি একেবারে নতুন করে আবার চা করবেন।

এবার বুড়ো দাদু বেড়ার পেরেকে ঝুলিয়ে রাখা পুরোনো নোংরা গামছা দিয়ে দোতারাটি মুছতে আরম্ভ করলেন। তিনি আমাদের খুব কাছে বেড়ায় হেলান দিয়ে বসলেন। বললেন, “ইস! আমাদের রাজরাজড়াদের কত কাহিনি আমি জানতাম। জ্যোৎস্না রাতে লুইতকে কেমন দেখাত। জানেন তো মা জননী?”

কী রকম?

ইস! নদী নয় যেন বুড়ি দিদিমার একগোছা সাদা চুল উড়ছে। শুনছেন মা জননী?

এইবার গলা বাড়িয়ে কপাল কুঁচকিয়ে দাদু একটা বিচিত্র ভঙ্গী করে বললেন: আমার এই বুড়ি এখন এই রকম খিটখিটে হয়েছে। আগে এরকম ছিল না। ... গৌরীনাথ সিংহের সময়ের দশটা ‘বানবাটি’ (পুরোনো দিনের অভিজাত বাটি) ছিল। সেগুলি তেঁতুল দিয়ে ধুয়ে মুছে চকচকে করে রাখত, যাতে সন্ধেবেলা অতিথিরা এলে আপ্যায়ন করতে পারে...। ঊ: দিনকাল একেবারে অন্যরকম ছিল... একেবারে অন্যরকম ছিল।

গামছাখানি বুকের কাছে নিয়ে কিছু সময় দাদু কী একটা যন্ত্রণা রুদ্ধ করে রাখতে চাইলেন।

... এক মুহূর্ত মাত্র। তারপর হঠাৎ তিনি যে আবার উৎসাহিত হয়ে উঠলেন...

“শুনুন মা জননী! গৌরীনাথ সিংহের কাহিনি আমি যতটা জানতাম এই অঞ্চলের কেউ জানত না। ... আফিমের নেশায় রাজা চোখ মেলতে পারতেন না।” দাদু আবার মাথা বাড়িয়ে দিয়ে চোখ দু’টি ছোট ক’রে খুব কৌতূহলের সঙ্গে আমার দিকে তাকালেন, আর ফিস ফিস করে বললেন:

স্বভাবও খুব ভালো ছিল না। তাঁরা মাসির ঘরের সামনে অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকতেন। অপেক্ষার ধরন দেখেই সবাই বুঝতে পারত। ... তাছাড়া আমাদের ডিফলুর দিকের একজন মহিলাও ছিল। তাঁকে রাজার সোনার অলংকার পাঠানোর কাহিনি এই অঞ্চলে সকলের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল... বরাহি, চুতিয়া, কলিতা, কায়স্থের মেয়েও রাজকন্যা হয়েছিল, যদিও একে নিয়েছিলেন কি না জানতে পারিনি। এই তো সেদিনও সব কথা চটপট মনে পড়ত। আজকাল মনে থাকে না।

আমি প্রশ্ন করলাম ---

শুনেছিলাম একজন রাজা খুব আফিমখোর ছিলেন। আফিমের সঙ্গে মুগা-পোকা ভেজে খেতে ভালোবাসতেন... তাই না?

দাদু জোরের সঙ্গে হাসতে লাগলেন, শুনুন মা জননী আমার ইনি মহিষের সঙ্গে মাংস খেতে পারা গদাধরের মতো ছিলেন না। ... হঠাৎ যেন একটা ভূমিকা কষা হল।

হয়েছে হয়েছে, মোষের মাংসের কথা ছেড়ে রেললাইনের কাছে যা, রেল লাইনের... । বুড়ি দিদিমা আমাদের হাতে চায়ের গ্লাস তুলে দিয়ে চিৎকার করে উঠলেন।

---আমি লক্ষ  করলাম দাদু বুড়ি দিদিমার কথায় এইবারও খুব একটা মনোযোগ দিলেন না। তিনি তাড়াতাড়ি দোতারাটির দিকে এগিয়ে গেলেন। তিনি কাঁধে একটা গামছা নিয়ে ঘোরাফেরা করছিলেন। সেটি দিয়ে দোতারাটি মুছতে মুছতে বললেন:চোখেও ভালো করে দেখতে পাই না। বুড়ি তো বাতি নিয়ে গিয়ে দেখে আসতে বলে... সেদিনও রেললাইনের ধারে হঠাৎ পড়ে গেলাম। বুকে এখনও ব্যথা আছে... শুনছেন মা। আমার অবস্থা এইরকম ছিল না। বন্যায় খেয়ে খেয়ে এমন অবস্থা করেছে... আমার এ রকম অবস্থা হওয়ার কথা ছিল কি? সত্যি, আমার এই রকম পথে দাঁড়ানোর মতো অবস্থা হওয়ার কথা ছিল কি? খদ্দের আসবে আসবে বলে অপেক্ষা হওয়ার কথা ছিল কি? খদ্দের আসবে আসবে বলে অপেক্ষা করে থাকার মতো এই অবস্থা! দু’টো ভাঁড়ার ছিল। অচেনা পথিকও পুকুরের  মাছ দিয়ে জহা চালের ভাত খেয়ে যেত। আমরা বরবরুয়া বংশের মানুষ। রাজার ছিল গুরুতর অপরাধীকে বাঁশের খাঁচায় পুরে জলে ফেলে প্রাণদণ্ড দেবার অধিকার। আমার পূর্বপুরুষ বরবরুয়াও অপরাধীকে হাঁটুর ঘিলা কেড়ে নেবার মতো শাস্তি দিতে পারতেন। তিনি আবার দয়ার সাগর ছিলেন। চিহ্নস্বরূপ তার রূপার ছাড়া এখনও আছে। দিনে বা সকালবেলা হলে দেখিয়ে আনতে পারতাম। কারুকার্যময় গালিচা , রূপোর গানের বাটা, সোনার মতো ভালো গুণমানের ধান হয় এমন বুকের মাংসের মতো জমি এসব এখন কিছুই নেই।

বুড়ি দিদিমা আবার রেগে উঠলেন।

হয়েছে হয়েছে মরা-পোঁতার গর্তগুলো কেন খুঁড়ছ। একবার রেললাইনের পাশে গিয়ে দেখে এস।

দাদু আবার চিৎকার করে উঠল...।

চুপ থাক। চুপ থাক বুড়ি। আগেও দু’তিনবার এরকম উড়ো খবর শুনিসনি? আমাদের চায়ের দোকানে আজ গণ্যমান্য মানুষ এসেছেন। দাদু এবার বেপরোয়া হয়ে দোতারা বাজাতে শুরু করলেন। কুপির আলোয় এইবার দাদুর মুখখানা একেবারে স্পষ্ট হয়ে পড়ল। দাদুর নাকটি লম্বা। ভেতরের দাঁতগুলি পড়ে যাওয়ায় গাল তোবড়ানো। চোখের নীচে মাকড়সার জালের মতো যাওয়ায় গাল তোবড়ানো। চোখের নীচে মাকড়সার জালের মতো অজস্র রেখা। তার রং অত্যন্ত কালো, তাই শুধু কুপির আলোয় এই রেখাগুলি স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল। কপালের বলিরেখাগুলি কীসের সংকেত দিচ্ছে? চিন্তা, জিজ্ঞাসা , দুঃখ আর? আর?

অত্যন্ত সুললিত সুরে দাদু পদ্মাপ্রিয়ার গীত গাইতে আরম্ভ করলেন---

“পুত্র পতিধন সকলই অকারণ

যেন জলবিম্ব হাসে।

এই আছে নেই সব হবে ছাই

সব কিছু কালগ্রাসে।

জীবন যৌবন সব অকারণ

যেন স্বপনের নিধি। ...

শুধু পদ্মপ্রিয়াই না-কি? গোপাল দত্ত শ্রী শঙ্কর রাজা প্রভুরও গীত দাদু আমাকে গেয়ে শোনাতে আরম্ভ করলেন। আমাদের হাতে সময় বড় কম। কিন্তু দাদু আমাদের ছাড়ছেন কই? বললেন, এরকম খদ্দের আমি কোথায় পাব? মনের আনন্দে তিনি গীত গাইবেন।

---আমরা প্রায় একঘণ্টা ধরে দাদুর সুললিত সুরের গীত শুনলাম। দিদিমার উশখুশ ভাবের জন্য আমাদের রস আস্বাদনে বাধা পড়ল । ... এবারে দিদিমা যেন রণচণ্ডী মূর্তি ধরে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন:


তাকে রেললাইনের কাছে দেখেছে বলে কিছু মানুষ বলে গেল...। বুড়োর কানে ঢোকে না। মিলিটারিরা গুলি মেরে তার প্রাণ নিলেও বুড়োর বুক ভেঙে যাবে না...

আমরা হঠাৎ দাঁড়ালাম। বললাম, আমাদের গাড়ি ভালো হবার সময় হয়েছে। এখন আমরা গাড়িতে গিয়েই বসি। দাদুর গান শুনে আমরা যেন স্বর্গরাজ্যেই ছিলাম। জ্যোৎস্না পোশাক যেন শরীরে পরেছিলাম।

কেউ যেন ফুলের হাতা দিয়ে আমাদের মুখে একফোঁটা দু-ফোঁটা করে মধু ঢালছিল। শেফালি ফুলের নীচে পরিষ্কার করে রাখা আসনে যেন আমরা বসেছিলাম। মীরাজকার সাহেব এইবারে কোটের পকেট থেকে বেশ কিছু নোট বের করে দাদুর সামনে রাখলেন। দাদু খুব জোরে চেঁচিয়ে উঠলেন।

এই নির্মালির মা, চায়ের পয়সা হিসেব করে রাখ। বাকি টাকা সাহেবদের ফিরিয়ে দে। অতটাকা কেন দিয়েছেন বাবা?... আমরা টোকো পাতার ঝাঁপি দিয়ে ফেরা বরবরুয়া বংশের মানুষ... এই সঙ্গীত। এই সঙ্গীত। গুরুজনদের আত্মার প্রতিধ্বনি এই সঙ্গীতের জন্যে কেউ আমাকে টাকা দিলে আমি হৃদয়ে বড় কষ্ট পাব... এইসব কথা কেউ বোঝে না...। আজকাল কেউই বোঝে না।

বুড়ি দিদিমা টাকাগুলির দিকে টো টো করে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি কোনও প্রশ্ন করছিলেন না, টাকাগুলি গুনেও দেখছিলেন না। ... ঠিক এই সময়ে একজন যুবতী মেয়ে ল্যাংড়াতে ল্যাংড়াতে এসে দরজায় হাত রেখে ভিতরের দিকে উঁকি দিয়ে দেখল। বুড়ো বুড়ি দু’জনেই চেঁচিয়ে উঠল...

এই হতশ্রী এখানে কেন এসেছিস!

এ কোনও উচ্চবাচ্য করল না। আমাদের সামনে দিয়ে পার হয়ে গিয়েও পেছনের বাসন ধোয়ার জায়গায় ফেলে রাখা একটি কাঠের টুলে গিয়ে বসল। আমরা বুঝতে পারলাম যে ও-ই ভারতীয় সেনাটির সঙ্গে প্রেমের লেনদেন করে পরিবারটির মুখ-কালো-করা নির্মালি।

... এই মুহূর্তটুকু বুড়ো দাদু ও বুড়ি দিদিমা নিজেদের কাজে মন দিল। বুড়ি দিদিমার দৃষ্টি আবার টাকাগুলির উপর পড়ল। এত টাকা সম্ভবত বহুদিন তারা দেখেনি।

ঠিক এই সময় হঠাৎ যেন একটি বিস্ফোরণ-ই হল। আমরা চারটে মানুষ কিছুদূর গিয়ে যেন ছিটকে পড়লাম। পাশের গাছ-গাছালির ঝাড় থেকে ঝাঁপ দিয়ে এসে কী করে যেন একটা জবড়জং পুরুষমূর্তি আমার কাছে দাঁড়াল। আমি বুঝতেই পারলাম না। কেরোসিনের বাতির আলোয় আমি তাকে স্পষ্টভাবে দেখলাম। ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। ... তরুণ যুবক, ঠোঁট ও চোখের এক অংশ বন্দুকের ধারালো অস্ত্রের আঘাত লেগে এক ভয়ংকর জখম। ভুরুর নীচ থেকে চোখের কিনারা পর্যন্ত এক টুকরো মাংস ছিঁড়ে যাওয়ার ফলে মুখটি এত বেশি ভয়ংকর ও কুৎসিত হয়ে যে আমি দিদিমার হাতটি খামচা মেরে ধরলাম। পরে এসেছে একটা বিবর্ণ কালো জিনস। ঠিক এই রকম বিবর্ণ একটা খাকি জ্যাকেট। মাথার লম্বা কালো চুল এলোমেলো। থুতনির নীচে দীঘল দাড়ি। হাতে ওটা? ওটা রিভলভার... কেরোসিনের বাতির আলোয় ঝিকমিক করছে ওটির ব্যারেল?

হঠাৎ ছেলেটি বেড়ার কাছে এসে নির্মালিকে দেখল। সে ছুটে গিয়ে তার পেটে একটি লাঠির খোঁচা দিয়ে চিৎকার করে উঠল।

“শালী বেশ্যা! ছেলেগুলি কুপিয়ে তোর পা ভাঙেনি তাহলে... সেনাটিকেও না-কি দু’টুকরো ক’রে কাটতে পারেনি... ফু!” সে থুথু ফেলল। দিদিমা অনুনয়  বিনয় করে তার হাত ধরে টানাটানি করে ভিতরে নিয়ে আসার চেষ্টা ক’রে কাঁদতে লাগলেন।

ও আমার আদরের বাবা! ও আমার আদরের বাবা! আমি তোর বাবার কাছে কাকুতিমিনতি করেছি বাতিটি নিয়ে গিয়ে তোকে রেললাইন থেকে নিয়ে আসুক... ডিফলু থেকে আসা দু’জন মানুষ তোর দেখা পেয়েছে বলে আমাকে বলে গেছে--- ও আমার আদরের বাবা...

দিদিমা এইবার চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন। ছেলেটি কিন্তু এইদিকে বেশি ভ্রুক্ষেপ করল না। সে কিছু সময় বাতির আলোয় উজ্জ্বল হয়ে থাকা টাকটা নোটগুলির দিকে কৌতূহলের দৃষ্টিতে চেয়ে থাকল। তার দৃষ্টি শিকারের আশায় উড়ে উড়ে বেড়ানো শ্যেন পাখির দৃষ্টিতে রূপান্তরিত হল। সে ছুটে গিয়ে নোটগুলির উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল:

দিদিমা চিৎকার করে উঠলেন---

এগুলি অতিথিদের পয়সা বাবা, ফিরিয়ে দে , ফিরিয়ে দে...

জবড়জং ছেলেটি এ কথায় ভ্রুক্ষেপ করল না। সে বকবক করতে লাগল---চোরা শিকারিরা দুটো ইউ.এস. কারবাইন বিক্রি করবে। আমার কাছে মাত্র কুড়ি টাকা কম আছে। টাকার দরকার, টাকার দরকার...।

সে যেমন ঝড়ের মতো এসেছিল ঠিক তেমনই অন্ধকারের বুকে অদৃশ্য হয়ে গেল।

দাদুর মুখে একটা হাসির ঝিলিক দেখা গল। মানুষের হাসি যে এমন হৃদয়-বিদারক হতে পারে এই কথা আমি আগে জানতাম না।

গুয়াহাটি পর্যন্ত ফিরে আসার বাকি পথটুকু মীরাজকার আমাকে আর কোনও প্রশ্ন করেন নি। অন্ধকারের বুকে আমাদের গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছিল।