“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
আসাম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আসাম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬

কুয়াশার ভেতর দিয়ে দেখা মাঠ

।। মাসকুরা বেগম ।।

ফটো: গুগল সৌজন্য 
    

  অগ্রহায়ণ মাসের ভোর। চারদিক কুয়াশায় ঢাকা। জানালার ওপাশে কিছুই স্পষ্ট নয়—না সামনের ফ্ল্যাটের নির্মাণ সাইটের আলো, না পেছনের খোলা মাঠ। সবকিছু যেন নিঃশব্দে মিলিয়ে গেছে সাদা ধোঁয়ার ভেতর। পাশের বাড়ির মোরগটিও ডাকেনি আজ। সূর্য উঠেছে কি না, তার কোনো চিহ্নই পায়নি রহিমা।

   ঘড়ির কাঁটা আর দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসা ফজরের আজান—এই দুটোর উপর ভরসা করেই নামাজ আদায় করে সে। নামাজ শেষে কোরআন পাঠ, তারপর আধঘণ্টা হাঁটা—এটাই তার প্রতিদিনের নিয়ম। কিন্তু আজ শরীরের চেয়েও মন বেশি অলস। কনকনে শীত আর ঘন কুয়াশা তাকে কম্বলের ভেতরেই আটকে রাখে।

    বিছানা থেকে কাঁচের জানালাটা দেখা যায়। এই জানালাই তার প্রকৃতির সঙ্গে নীরব সংলাপ। পর্দা সরিয়ে চারটি বালিশে মাথা উঁচু করে কম্বল জড়িয়ে শুয়ে পড়ে রহিমা। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বাইরের দিকে। কুয়াশায় ভেজা কাঁচের মতোই মনের ভেতর ঝাপসা স্মৃতিরা একে একে ভেসে ওঠে। শৈশব আর কৈশোর—সব যেন এই ভোরের আলো-আঁধারিতে মিলেমিশে যায়।

    কনকনে শীত। কুয়াশাচ্ছন্ন চারদিক। সবুজ-হলদেটে মাঠ। কাঁচা-পাকা ধানের মো মো গন্ধ। মেঠো পথ।

    ফজরের নামাজ শেষে মসজিদ থেকে ঘরে ফিরছেন পুরুষরা। আর রহিমা—তার বোন করিমা, চাচাতো বোন জাকিরা আর সাদিয়াকে নিয়ে—দল বেঁধে যায় মসজিদে। মসজিদের লাগোয়া বারান্দায় বসে ধর্মীয় শিক্ষা নেয় তারা। রহিমার বড় ভাই আবিদ বাবার সঙ্গে নামাজে গিয়ে ঘরে ফিরে আসে না। মসজিদে পড়াশোনা শেষ করে তবে বাড়ি ফিরে। 

    মেঠো পথের দু’ধারের ধানের পাতায় জমে থাকা কুয়াশার পানি ঠোঁটে লেপ্টে যায়। জাকিয়ার বড় বোন বলেছিল, এতে নাকি ঠোঁট ফাটে না। কাকভোরে কনকনে শীতে পড়ার প্রতি তাদের আগ্রহ দেখে ইমাম সাহেব সন্তুষ্ট হন। দেরিতে আসা ছাত্রছাত্রীদের নাম ধরে যখন বকুনি দেন উস্তাদ, তখন ওরা নিজেরাই ভেতরে ভেতরে একধরনের গর্ব অনুভব করে।

    ধীরে ধীরে কুয়াশা ঠেলে সূর্যের স্নিগ্ধ আলো পূব আকাশে উঁকি দেয়। মসজিদের সামনে পাতা-ঝরা আমগাছটার শুকনো ডালে দু-চারটি পাখি এসে বসে। দেয়াল ঘড়িতে আটটা বাজে। ছুটি হয়। ফেরার পথে পথের ধারের কুল গাছ থেকে ঢিল ছুড়ে কাঁচা টক কুল পেড়ে কাড়াকাড়ি করে খায় তারা—দাঁতে কামড়ে ধরা টক স্বাদে শীতের সকাল আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে।

    রহিমা ঘরে ফিরে কোরআন রেখে সোজা রান্নাঘরে ভাত খেতে যায়। তারপর পড়ার টেবিলে বসে স্কুলের বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে, পড়ে কিংবা অংক কষে। স্নান করে স্কুলের জন্য প্রস্তুতি নেয়। সকাল দশটায় শীতের মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যাওয়া। সঙ্গে তো করিমা, জাকিরা, সাদিয়া আছেই রাস্তায় আরও যোগ হয় মুনমনি, শেফালি, দুর্গা। সাড়ে দশটায় স্কুল শুরু হয়।

    রহিমাদের জমিতে চাষাবাদ করেন সুরুজ চাচা আর তাঁর দলবল। জমি তৈরি থেকে ধানের চারা রোপণ—সবকিছু তাঁরাই সামলান। রহিমার বাবা রাজনীতিতে ব্যস্ত; টানা দশ বছর ধরে গাঁও পঞ্চায়েতের সভাপতি। তিন ভাই-বোন কৃষিকাজের প্রতিটি ধাপ গভীর আগ্রহে লক্ষ করে। কাঁচা হলুদাভ চারাগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গাঢ় সবুজ হয়ে মাঠ ভরে দেয়। শীষ বেরোলে মাঠটা ছবির মতো সুন্দর হয়ে ওঠে। পাকা ধানের সোনালি রঙ আর মো মো গন্ধ—চারপাশের দৃশ্যটাই বদলে দেয়। করিমা রঙ-তুলিতে এই দৃশ্য ধরে রাখে। 

    সুরুজ চাচারা কাঁচি দিয়ে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে ধান কাটেন। ছোট ছোট মুঠি বাঁধেন। ছোট ছোট মুঠি একলগে করে বড় মুঠি বাঁধেন। ‘হুজা’ দিয়ে ধানের বড় বড় মুঠি তুলে কাঁধে নিয়ে নেচে নেচে গ্রামের দিকে যান। উঠোনের এক কোণে জমা হয় ‘ফারা’। সুযোগ পেলেই ওরা সেই ফারায় উঠে নাচে।

    ধান মাড়াইয়ের সময় গরুর হালের পেছনে ঘোরে রহিমা। হাতে পাতলা বাঁশের লাঠি।
—“রহিমা মার! ডাণ্ডা মার!”
—“চাচা, মারলে তো গরু কষ্ট পাবে।”

করিমা চেঁচিয়ে ওঠে,
—“বুবু মারিস না! ওদেরও তো কষ্ট হয়!”

সুরুজ চাচা হাসেন,
—“আইজ আর আমার মাড়া দেওয়া অইত নায়।”

ঠিক তখনই মা লাঠি হাতে বেরিয়ে আসেন,
—“দাঁড়াও ক্ষেতুয়ালনি হখল! পড়াশোনা নাই?”

   দুই লাফে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসে রহিমা। পিছে পিছে করিমাও পড়তে বসে। মা বকুনি দিতে দিতে রান্নাঘরে ফিরে যান। আবিদের সামনে মেট্রিক পরীক্ষা তাই সে দিন রাত এক করে পড়াশোনা করছে।

    ধান থেকে খের আলাদা করা রহিমার খুব প্রিয়। ‘উকৈট’ দিয়ে খের সরানো, ঝাড়ু দিয়ে বাছাই - এসব যদি সুরুয চাচা সব সময় তাকে করতে দিতেন! তার খেরের পাহাড়ে গড়াগড়ি। সন্ধ্যায় পা ধোয়ার পর চুলকানি আর জ্বালা। মা বকতে বকতে সরিষার তেল মাখিয়ে দেন। খের দিয়ে তৈরি হয় ‘ফেইন’—সারা বছরের জন্য সংরক্ষণ।

    হঠাৎ মোবাইলের নোটিফিকেশন শব্দে বর্তমান ফিরে আসে। সকাল আটটা বেজে গেছে। ছেলের স্কুলে শীতের ছুটি, স্বামীর কলেজও বন্ধ। তারা গ্রামে গেছে। রহিমা যেতে পারেনি—অফিস খোলা। আজ রবিবার। ঘরে সে একা।

    হোয়াটসঅ্যাপে ছেলের পাঠানো একটি ভিডিও।সে কিছু তথ্য সংগ্রহ করে ও কিছু নিজে প্রত্যক্ষ করে রীল বানিয়েছে—ট্র্যাক্টর দিয়ে জমি চাষ, চারা রোপণ, শস্য শ্যামল মাঠ, সোনালি ধান। তারপর মেশিনের ক্যাঁচ-ক্যাঁচ শব্দে ধান মাড়াই। আগের মত গরু নেই। পাখি নেই। মানুষগুলো পাশে দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে আছে। দূরে মাঠে কয়েকটি গরু শব্দ দূষণের ফলে অস্থিরতা অনুভব করছে।

ভিডিও শেষ হয়।

   রহিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলেকে লিখে পাঠায়—
“কোথায় সেই কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর, পাখির কলতান, মুক্ত বাতাস? মানুষ আর পশুর মধ্যে যে আত্মিক সম্পর্ক ছিল—সবই কি আজ শব্দ আর ধোঁয়ার ভেতর হারিয়ে গেল?”

জানালার বাইরে কুয়াশা তখনও ঘন। মাঠ দেখা যায় না।
শুধু নিস্তব্ধতা।


 

  

সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫

বেমসুমে ফুল ফোটাতে পারি

 ।। আবু আশফাক্ব চৌধুরী ।।

 


 

 

 

 

 

হে আমার নয়নঝুরি প্রিয়তমা 
যদি কাছে থাকো অনায়াসে
 ফুল ফোটাতে পারি বেমসুম দিনে 
নীল আকাশের বুকে লিখে দিতে পারি
তোমার অশ্রুত নাম হৃদয়ের রক্ত দিয়ে 
মেঘেরা ধোয়াবে এসে যত্ন করে
তোমার উদ্ধত বাহুযুগল
যদি কাছে থাকো অনায়াসে 
প্রজাপতির ডানা থেকে হাজারো বর্ণের 
শিখা ছিনিয়ে আনতে পারি


বুধবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৫

।। গায়ে পড়া অতিথি।।

।। মাসকুরা বেগম ।।
 ফটো : গুগল সৌজন্য 
          
 
    মজুমদার বাড়ির পিছন দিকের আম গাছটার তলায় আনমনে একা বসে আছে সামিরা মজুমদার। কাতর দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ওই টিলার পানে। মাঝে মাঝে মাথার ওড়নার আঁচল দিয়ে ভেজা চোখ দুটো মুছে নিচ্ছে! বিকেলের পড়ন্ত সূর্যের আলো ও মেঘেরা মিলে মিশে পশ্চিমের আকাশে কী যে মনোরম রং এঁকেছে! কিন্তু সামিরাকে এই মুহূর্তে কোনো মনভোলানো দৃশ্যই টানছে না! তার বুকের ভিতরে উথাল পাথাল ঝড় বইছে! কত সুখ দুঃখের স্মৃতি মনে পড়ছে! এই মাঠ- ঘাট, এই আম গাছ, কাঁঠাল গাছ, এই পথের দুপাশের বাঁশ ঝাড়, ওই টিলা, ওই ধান ক্ষেতের মাঠ, ওই সূর্যাস্তের রং; সবই জড়িয়ে আছে তার শৈশব কৈশোরের স্মৃতির পাতায়! 
      
      এক সময়ের এই আনন্দ উল্লাসের স্থান পরিবর্তন হয়নি, এখনও সেই বিদ্বানপুর গ্রাম ঠিকই আছে, সেই মাঠ ঘাট আছে, অবশ্য কিছু কাঁচা রাস্তা পাকা হয়েছে, কিছু কাঁচা ঘর পাকা হয়ে গেছে। কিন্তু সামিরা অনুভব করছে কোথাও যেন কিছু একটা পরিবর্তন ঘটেছে! পরিবর্তনের সেই উপাদানটি হচ্ছে মানুষ! মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও মন মানসিকতার পরিবর্তন ঘটেছে! সামিরার আনন্দ উল্লাস পরিবর্তিত হয়েছে বুক ফাটা কান্নায়! হুক হুকিয়ে কাঁদে সামিরা! ওড়না দিয়ে চোখ মুছে নেয় সে! বাচ্চা দুটো এসে যদি তার কান্না দেখে তবে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বে; যেভাবে একদা এক সময় ওই টিলার কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত তার মা বাবা অস্থির হতো! আজ মা বাবার স্থান দখল করেছে তার এই সন্তান দুটো ! নিজের সন্তানের চেহারা মনে পড়তে একটু শান্ত হয় সামিরার মন।

      সামিরা স্বামী-সন্তানদের নিয়ে ব্যাঙ্গালোরে থাকে। সেখানে তার স্বামী আরিফ বড়ভূইয়া একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে উচ্চপদস্থ কর্মচারী। সেই সুবাদে তারা ব্যাঙ্গালোরে থাকে। সামিরা এক  কৃষিপ্রধান গ্রামের এক কৃষকের মেয়ে। সে ছোটবেলা থেকেই খুব মেধাবী! তার শ্বশুর আব্দুল আলিম বড়ভূইয়া সে যে উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছে সেই বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি সামিরার বাবা ইলিয়াস আহমাদ মজুমদারের বন্ধু। তার বাবা ও শ্বশুর একই কলেজে একসাথে পড়াশুনা করেছেন। সামিরার বাবার প্রচুর পৈতৃক কৃষি জমি ছিল। এখনও আছে। তার বাবা দাদার সঙ্গে কৃষি কাজ করতেন, পড়াশোনাও করতেন প্রচুর। বিজ্ঞান ও অংকে তার বাবা খুব প্রখর ছিলেন।নিজ গ্রামেই একটি হাইস্কুলে শিক্ষকতা করতেন। স্কুলটি ভেনচার ছিল।কত বছর কাটালেন কিন্তু স্কুলটি সরকারিকরণ হচ্ছিল না। তাই বাবা স্কুলের শিক্ষকতা ছেড়ে পুরোপুরি কৃষি কাজে মনোনিবেশ করেন। তিনি ভাবলেন ভেঞ্চার স্কুল নিয়ে পড়ে থাকলে আমার ভাত-পানির যোগাড়, আমার পাঁচটা সন্তানের ভরণপোষণ, তাদের পড়ালেখার খরচ কোথা থেকে আসবে! ।্তা্্তা্তা্্ত্তা্্্তা্্তা্তা্্ত্তা্ তাই নিজের শ্রম ও বুদ্ধি দিয়ে বাবা একজন দক্ষ কৃষক হয়ে উঠলেন। তারা বেশ সচ্ছল জীবন যাপন করতে লাগল। পড়াশোনার ক্ষতি হবে ভেবে বাবা তার কোনো ছেলেকেই কৃষি কাজে লাগালেন না। তাই তারা এক একজন উচ্চ শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠেছে।

       সামিরার জ্ঞান পিপাসু মন, আচার-ব্যবহার, চরিত্র ইত্যাদি গুনাবলী দেখে তার গ্রেজুয়েশন সম্পূর্ণ হওয়ার পর পরই ছেলের বউ করে ঘরে  তুললেন আব্দুল আলীম। মাস দুয়েক শ্বশুর বাড়ি থাকার পর তাকে স্বামীর সঙ্গে ব্যাঙ্গালোরে পাঠিয়ে দেন শ্বশুর। 

      ব্যাঙ্গালোরে যাওয়ার পর প্রথম প্রথম খুব কাঁদত সামিরা! তার গাভী মনি আর ছাগল ননির জন্য মন কেমন করত! কিছু স্মৃতি মনে পড়তে এই মন খারাপের মুহূর্তেও হাসি পায় সামিরার । সে নাকি সাংঘাতিক গাঁইয়া মেয়ে ছিল! সেখানকার খাওয়া দাওয়ার সঙ্গে প্রথম প্রথম মানিয়ে নিতে তার সময় লেগেছিল বেশ কয়েকদিন। দেশী চাউলের ভাত নেই, দেশীয় শাক- সবজি নেই, দেশীয় গাভীর দুধ নেই, পুকুরের মাছ নেই, মুখে সেই সাধ নেই ইত্যাদি নিয়ে তার আক্ষেপ ছিল খুব! এখন কিন্তু নেই ওগুলো। ধীরে ধীরে সে পরিবেশ পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। স্বামী তাকে চটানোর উদ্দেশ্যে মাঝে মাঝে ছেলে মেয়েকে এইসব পুরনো কথা বলে জ্বালাতন করে। সে কিন্তু আজকাল চটে না বরং ছেলে মেয়ের সামনে  গর্ববোধ করে কত তাজা প্রাকৃতিক পুষ্টিকর খাবার খেয়েছে, খোলামেলা প্রকৃতির বুক থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করেছে! এখন যে কৃত্রিমতার মাঝে তারা এসবকিছু থেকে বঞ্চিত তাই নিয়ে কত আক্ষেপ করে সামিরা!

     স্বামী বেশিরভাগ সময় অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকেন তাই বাচ্চা দুটোকে সামলাতেই তার দিন- রাত -মাস - বছর কেটে যায়। নবম শ্রেণী পড়ুয়া মেয়ে আদিবা প্রায়ই বলে ' মা তোমার স্মৃতি শক্তি কত প্রখর! নিজের ছোটবেলার কথা আমাদের সাথে যখন শেয়ার কর তখন মনে হয় কোনো গল্পের বই থেকে নেওয়া কাহিনি শুনছি, যেন ইতিহাসের পাতা থেকে কুড়িয়ে আনা কোনো এক সময়, সেই সময়ের ঘটনা, সামাজিক পটভূমি, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদি তুমি কত সাবলীল ভাবে তুলে ধর!'

      সামিরার দুই সন্তান তার এই আবেগ, ভালোবাসা সর্বোপরি তার নিজস্বতা আর তার এই নস্টালজিক হওয়াকে কদর করে, সঙ্গ দেয়, আবেগিক কথাবার্তায় আপ্লুত হয়ে উঠে, এটা তাদের দুই ভাই-বোনের মায়ের প্রতি থাকা সহমর্মিতা। যে সামিরা এক রাতের জন্যও নিজের বাড়ি ছেড়ে কোথাও থাকতে পারেনি, বিয়ের পর থেকে সে বছরের পর বছর দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছে বাড়ি থেকে বহু দূরে! এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে সামিরা বুক থেকে!

    'মা! মা! আমাদের মাঠ ঘাট দেখা শেষ চল ঘরে যাই!' আসিফের ডাকে বাস্তবে ফিরে সামিরা। অতীতের সেই রঙিন স্মৃতির টানে বেঁচে আছে এই বাবার বাড়ির সাথে ভাঙাচোরা সম্পর্ক! এই বাড়ি, এই গ্রাম, এই পথ-ঘাট-মাঠ তাকে হাতছানি দেয় তাইতো সে চলে আসে এই ভগ্নাবশেষ দেখতে! ওই নীল আকাশের সীমাহীন বিস্তৃতির মতো বিস্তৃত সামিরার কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এখানে! সাগরের গভীরতার মতো গভীর সেগুলো! সেই গভীরতায় শৈশব কৈশোরের মুক্তর খোঁজ করে সামিরা!

    'আমি একটু পরে আসছি তোরা গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে বিশ্রাম কর। বিকাল ছয়টা থেকে সাতটার মধ্যে গাড়ি আসতে বলেছি! রেডি হয়ে থাকবে তোমরা।'

      'মা কোথায় যাব? বলে ছিলে না এক রাত থাকবে এখানে!' আদিবা বলল।

     ' তোদের দাদার বাড়িতে ফিরে যাব! তোদের দাদাজীর শরীর বেশি ভালো নেই যে।'

      বাচ্চাদের কাছে শ্বশুরের শরীর খারাপের বাহানা দেখিয়ে চলে যেতে চায় সামিরা! এক রাত কেন? তিন রাত এখানে কাটালেও তার শ্বশুর কিছু বলবেন না! আসলে সামিরার মন চাইছে না নিজের বাড়িতেই অতিথি হয়ে থাকতে!

     পাঁচ বছর আগে বড়দা নিজে ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে তাকে আদরের সাথে নিয়ে এসেছিলেন। সেটা দাদার প্রথম ও শেষবারের মতো সামিরার ব্যাঙ্গালোরের ফ্ল্যাটে যাওয়া। খুব খুশি হয়ে সামিরা তার সঙ্গে এসেছিল। পর পর বাবা মা মারা যাওয়ার পর সামিরা নিজের বাড়িতে আসা কমে যায়। এখন আর কেউ পথ চেয়ে থাকে না! কেউ ফোন করে জিজ্ঞেস করে না 'তুই আমাদের আব্বু ও নাতি নাতনী দুটোকে নিয়ে কবে আসবি?' মা বাবা কোনদিন তার স্বামীকে নাম ধরে ডাকেননি, আব্বু বলে ডাকতেন। 

     বড়ো ভাইয়ের সঙ্গে বাড়িতে আসার দুদিন পর ভাইয়েরা সবাই বাড়িতে এসে জড়ো হয়েছিল ‌। যেহেতু নিজেদের কর্ম সুত্রে তারা বাড়ির বাইরে থাকেন তাই ঈদে-পর্বে একত্রিত হয় সবাই। ছোটখাটো একটা অনুষ্ঠানের মতো আয়োজন করা হয়েছিল সেদিন। সামিরা খুব খুশি ছিল। সামিরার খুশিতে ছাই পড়েছিল আছরের নামাজের পর! তার জন্য যে অপেক্ষা করছিল এক বিস্ময়! বড়ো ভাই হাতে একটা কাগজ নিয়ে তার সামনে এসে শুরু করলেন, ' সামিরা আয়! বস্ এখানে! একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনায় বসেছি! তোর থাকা দরকার! আমরা চারজনের মধ্যে তুই একমাত্র আদরের বোন! তোকে ছাড়া কি  আমরা কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারি।'

উৎসুক সামিরা অধৈর্য্য হয়ে বলল, 'কী বলবে? বলোনা বড়োভাইসাব! এতো ভনিতা করছো কেন?'

    মেজভাই চেয়ার থেকে উঠে বড়দার হাত থেকে কাগজটা নিতে নিতে বললেন, 'আরে বড়দা তুমি সোজাসুজি বলতে পারোনা! সামিরা আসলে  তোর এখানে একটা সই লাগবে! আমাদের সম্পত্তি গুলো এখনও সব বাবার নামে রয়ে গেছে। এগুলো সব আমাদের চারজনের নামে বাটোয়ারা করে নেব। শরিয়ত মোতাবেক তুইও অংশীদার কিন্তু তুই এসব দিয়ে কি করবি? তাই তুই তোর বাবার সম্পত্তির কিছু লাগবে না বলে সই করে দিলে ভাগ বাটোয়ারা সহজ হয়ে যাবে!'

      সামিরা কিছুটা বিস্মিত হলো তাদের কথায় কিন্তু ভাবল 'এ আর কী এমন কথা! ভাইরা আমার জন্য কী কম করেছে; বিয়েতে কত খরচাপাতি করল, বাচ্চা দুটোরও জন্মের সময় মা আমাকে এখানে নিয়ে আসল তাঁর একমাত্র মেয়ের নাতি পুঁতির দেখাশোনা তিনি নিজে করবেন বলে, তারপর সব কিছু তো ভাইরাই দেখাশোনা করল! আমার অংশ নিজের ভাইদের কাছে থাকলে ভালোইতো, বিপদে আপদে কাজে আসবে। বাড়িতে যখন তখন আসব, তাদের কাছেই তো থাকব!' হাত বাড়িয়ে কাগজটা  নিয়ে সে তার  'পৈতৃক সম্পত্তির অংশ থেকে কিছুই চাই না, সবটুকু স্বেচ্ছায় ভাইদের দান করে দিলাম ‌‌‌‌.......' খুশি খুশি সই করে দিল। 

     এখন কেউই সামিরার খবর প্রায় নে-ই না। 'এত দূর ব্যাঙ্গালোর!' 'কেমনে যাব ‌! এত খরচ হবে!' 'যাওয়ার এত সময়ই বা কোথায়?' যাওয়া তো দূরের কথা একটা ফোন করে বোনের খবর নেওয়ার সময় পর্যন্ত হয়ে উঠে না ভাইদের!এই তো কদিন আগে এক ভাইপো হোয়াটসঅ্যাপ এ ম্যাসেজ করল, 'পিসিমনি! আমাদের বাড়িতে আগামীকাল দাদা দাদির রূহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া আছে। খানা-পিনা হবে। তোমার দাওয়াত রইলো। সবাইকে নিয়া আসলে ভালো হতো। আত্মীয় স্বজন সবাইকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। প্রোগ্রামের ডিসিশন হঠাৎ করে নেওয়া হয়েছে তাই হয়তো তোমাকে আগে বলা হয়নি । এখন আসতে না পারলেও পরে আসিও কিন্তু!' ম্যাসেজটা দেখে সামিরা পড়ে আর মনে মনে হাসে; 'নিজের বাড়িতে দাওয়াত!' ' আমাদের বাড়িতে তোমার দাওয়াত!' প্রোগ্রামটার জন্য নিশ্চয়ই চার ভাইয়ের মধ্যে মিটিং হয়েছে তখন তো মিটিং এ ডাকেনি! সেদিন অন্তত একটা ফোন করতে পারত ভাইয়েরা !' কেন ডাকবে ? সামিরা তো এখন এ বাড়ির সদস্য নয়! সামিরার নিজের বাড়ি যে আজ তার অংশীদারি ভাইদের দখলে! বাচ্চা ছেলেটার হয়তো পিসিকে ডাকা হয়নি বলে খারাপ লেগেছিল তাই বোধহয় একটা ম্যাসেজ পাঠিয়েছে।

     কয়েক দিন থেকে নিজের বাড়ির জন্য মনটা খুব কাঁদছিল তাই সামিরা বাচ্চা দুটোকে নিয়ে চলে আসল। জন্মভূমিতে এসে অনুভব করল এখানে তার স্থান শূন্য! এখন সে শুধু এ বাড়ির এক গায়ে পড়া অতিথি! বড়ো ভাবির আজ বাবার বাড়িতে নিমন্ত্রণ আছে; তাই তিনি চলে গেলেন। মেজ ভাবির কাছে শুনল তাদের সংসারের অভাব অনটনের যত গল্প। অবশ্য মেজদা সরকারি স্কুলের শিক্ষক। সেজ ভাবি বাচ্চাদের পড়াশোনা নিয়ে এতটা সচেতন যে পিসির সঙ্গে বা পিসতুতো ভাই-বোনের সঙ্গে দশ-পনেরো মিনিট কথা বলার সময় পর্যন্ত দিলেন না বাচ্চাদের। ছোট ভাবি নিজেই সারাদিন রিল ভিডিও বানানো নিয়ে ব্যস্ত। নিজের স্বামী সন্তানকেই সময় দিতে পারছেন না । অবশ্য তাদের নিয়ে ভিডিও করেছেন, ফটো তুলেছেন। হঠাৎ গুড়ুম করে মেঘের শব্দ হলো। শিহরিত হয়ে সামিরা ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসল! উঠে দাঁড়াল।এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে মা-বাবার কবরের পানে চেয়ে নিল শেষ বারের মত। কী জানি আর কবে আসা হবে, কতদিন পরে! 

বুধবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২৪

।। এক কিপটে ও এক দল ইঁদুর।।

 

             ।। মাসকুরা বেগম ।।

 


    --"মা-ই গো!ও মা-ই! তুমি কইয়া দেওনা আমার মাঝে কিতা কিতা দোষ আছে! তোমার এই নির্বোধ বেটার ওপর আল্লাহ বোধহয় খুব নারাজ আছইন! নাইলে এত আপদ - বিপদ আইতো কেনে? এই চার-পাঁচ বছরে কি কম লোকসান অইছে! তুমি যদি আঙুইল দিয়া দোষ ত্রুটি দেখাইয়া না দেও তাইলে আমার যে ইহ-পরকাল সব ধ্বংস অই যাইব মাই!' ফজরের নামাজের পর মায়ের পায়ের কাছে বসে মায়ের পা দাবাতে দাবাতে অনুতপ্ত আমিরুল বলছে আর মাঝে মাঝে পরনের সাদা পাঞ্জাবির হাতায় চোখের জল মুছে চলেছে। 

     আমিরুল একজন খুবই কর্মঠ ও সৎ ব্যবসায়ী । সে ও তার স্ত্রী দুজনেই খুব মেহনতি। খাটে প্রচুর। হেলায়- ফেলায় দিন কাটায় না। খরচ করে খুব মেপে-জোখে । লোকজনের সঙ্গে তারা বেশি সম্পর্ক রাখে না । একা একা থাকতে পছন্দ করে। তারা মনে করে সব সম্পর্কের মাঝে কোন না কোন স্বার্থ জড়িত থাকে । আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী তাঁদেরকে "অসামাজিক' "কিপটে' ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত করে! কিন্তু তাদের মতে তারা একটু মিতব্যয়ী মাত্র ! আসলে বেশির ভাগ মানুষই তো নিজের সম্বন্ধে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতে পারে না। নিজের ভুলটাকেও যুক্তি দিয়ে সঠিক ধরে নেওয়া মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। 

 আজ থেকে প্রায় চার বছর আগের কথা। একদিন সন্ধ্যার পর আমিরুলের অসহায় দুস্থ বোন মারিয়া তার কাছে এসেছিল । একটু সাহায্যের জন্য হাত পেতেছিল,

--" ভাইজান! একটু টাকা পয়সা দিয়া আমারে সাহায্য করইন। আমার ফুয়াটার স্কুলর সারা বছরর ফি বাকি আছে। ফি দিতে না পারলে যে ফাইনাল পরীক্ষায় বসতে দিব না স্কুল।'

-- "আইজকাইল তো স্কুল ফি লাগে না।'

--"ভাইজান ইতা সুবিধা তো সরকারি স্কুলর ছাত্ররা পায় । আমার মনির যে বেসরকারি স্কুল পড়াশোনা করের....।'

--"তাইলে সরকারি স্কুল পড়তে পাঠাও।'

--"হি যে ক্লাস এইট অব্দি ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করছে এখন হঠাৎ করিয়া সরকারি স্কুল বাংলা মাধ্যম পড়ব কিলা?'

--" খরচ চালাইতে পারো না যদি বেসরকারি স্কুল দিলায় কেনে?'

--"তার আব্বায় দিছে।'

--"তাইলে তার আব্বা টাকা দিব। আমি কেনে দিমু?'

--" তুমি তো জানো ভাইজান তার আব্বার মেঘালয়র কয়লার ব্যবসা আর আগর মত চলের না। দিনে দুই বেলা ভাতের যোগাড়ই অয় না ভালা করিয়া !'

-- " তাইলে ও দিনমজুর করউক, তুমি কাজ কর, নাইলে ছেলের পড়া বাদ দিয়া কাজে পাঠাও । পরের কাছে আত পাততে আসো কেনে? একেবারে লজ্জা শরমের মাথা খাইছো!'

     মারিয়ার মুখ দিয়ে আর কোন কথা বেরুলো না! দুচোখের পানি মুছতে মুছতে নিজের শ্বশুরের ঘুণ পোকায় ধরা কাঠের তৈরি পুরনো আমলের জমিদার বাড়ির ভগ্নাবশেষ এ চলে গেল। কাউকে বলল না ভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া অপমানের কথা। তার মনে পড়ে "ভাই বড় ধন, রক্তের বাঁধন '। আপনজনের বদনাম তো লোকের কাছে করা যায় না। তাই হজম করে নিল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে! 

      বোন যদিও কাউকে কিছু বলল না কিন্তু ওপরে থাকা নিরাকার একজন সব দেখলেন, শুনলেন। আর তার সঙ্গে চোখের জল ফেলল আমিরুলের ঘরে লুকিয়ে থাকা একদল ইঁদুর!

      -- "ও আমির! বাপজানরে আল্লাহ তোমায় অত দিছে, একটু সাহায্য করলে তো পারতায়! ফুড়িটারে ইলা খালি আতে বিদায় করা কী ঠিক অইছে?' আমিরুলের বৃদ্ধ মা  ভয়ে ভয়ে ছেলেকে বললেন।

--" মা তুমি আমার ঘরো শান্তিতে থাকো তো। খাও-দাও, ঘুমাও । অন্যের ব্যাপারে নাক গলাতে যাইও না। আমি মেহনত করে দুইকে চার করছি, দান-খয়রাত করে বিলিয়ে দেবার লাগি নায়। আমার কষ্টর উপার্জনে শুধু আমারই অধিকার! আলসেমি করে দিন কাটাচ্ছে আর আমার কাছে আসে 'সাহায্য লাগে' বলে। আরে বাবা আঁচল যতটুকু ততটুকু মেলো না! যত্তসব!' রাগে গজগজ করে আমিরুল বলল।

    মা নিজের অসহায়ত্বের কথা ভেবে ভয়ে চুপচাপ কেটে পড়লেন।

     রাত নিস্তব্ধ হয়ে এসেছে। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। সভা বসল ইঁদুরদের। সভায় আলোচনার বিষয় হল কেমন করে এই আমিরুলকে শিক্ষা দেওয়া যায়। বড্ড অহংকার বেড়েছে যে তার! ইঁদুরের সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হল যে আজ রাতেই হামলা করতে হবে আমিরুলের লাইব্রেরিতে! সব তছনছ করে দিতে হবে! নানা ধরনের বই দিয়ে সারি সারি করে দেয়ালে সাজিয়ে রেখেছে কাঁচের আধুনিক ডিজাইনের আলমারি । কোনদিন একটাও বই হাতে নিয়ে পড়তে তো দেখা যায় না তাকে। শুধু শুধু লোক দেখানো কারবার! পরের ছেলেকে একটু পড়াশোনায় সাহায্য করতে পারে না আর নিজের কচি ছেলের জন্য এত সংগ্রহ!

 

       আরেকদিনের কথা ।   আমিরুলের বড় ভাই আসলেন কিছু টাকার সাহায্য চেয়ে। 

--"ভাইরে! ও ভাই! তোর ভাবীর বড্ড অসুখ ! ডাক্তরে কইছে ইখানো ট্রিটমেন্ট সম্ভব নায়! চেন্নাই নিয়া যাইতে অইব। কিতা করতাম এখন! অত টাকা তো আমার গেছে নাই। থুড়া সায্য কর না আমারে টাকা দিয়া।'

--" কোন ডাক্তরে কইছে? আইজকাইল ডাক্তর ইতাও সব ব্যবসায়ী অই গেছইন। সরকারি মেডিকেল কলেজ সব ধরনের সুযোগ সুবিধা থাকতে অত খরচ করে চেন্নাই যাওয়ার কী দরকার !' আমিরুল বলল।

--" সোজাসুজি কইয়া দেয় না যে দিতে পারবি না । উপদেশ দিতে যাস্ কেনে? ভাইগ্নাটারে পড়াশোনার লাগি একটু সাহায্য করলি না। আটকাইছে না তার পড়াশোনা। তোর এই ভাবী তাইর হাঁস মুরগি পালন করিয়া জমানো টেকা দিয়া সাহায্যর আত বাড়াইয়া দিছে ভাইগ্নাটারে। তারার দোয়ায় তাই সুস্থ অইয়া উঠব।তোর সায্য লাগতনায়! দেখিস্ তুই!' আমিরুলের কথায় ক্রুদ্ধ হয়ে বড় ভাই গদগদ করে চলে গেলেন ।

      সব শুনে ইঁদুরের দল এবার সিদ্ধান্ত নিল আমিরুলের টাকার সিন্দুকে হামলা করবে! সে ব্যাংকে টাকা জমা রাখেনা কর দিতে হবে বলে। স্ত্রী বায়না এবার স্কুল ছুটির সময় বাংলাদেশে বেড়াতে যাবে । আমিরুলের ও প্রস্তাবটা মন্দ লাগল না ।  তার একজন মাসির বিয়ে হয়েছিল সিলেটে । তাই মাকেও নিয়ে যাবে । মা তাঁর বোনকে দেখে আসবেন । বেশ কয়েক বছর হল দুবোনের সরাসরি দেখাই হয়নি । বরাক উপত্যকার মানুষের কেমন যেন একটা প্রাণের টান আছে বাংলাদেশের সঙ্গে। আত্মীয়তার বন্ধন ।   ভারত, পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশ সব মিলে তো এক দেশই ছিল -- ভারত । সবারই তো ছিল একই মিশন, একই ভিশন, একই স্লোগান -- একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ! স্বাধীন ভারত! কিন্তু ব্রিটিশের ষড়যন্ত্রের  ফল স্বরূপ এক দেশ শুধু ভাঙলেই না; পরস্পর চির শত্রু হয়ে রয়ে গেল । যাই হোক সেটা সাতাত্তর বছর আগের কথা! তারপর ফাটল ধরল পাকিস্তানে মাতৃভাষা বাংলার স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার শঙ্কায় ! ফলস্বরূপ জন্ম নিল স্বাধীন বাংলাদেশ! দেশ ভাগের ফলে আমিরুলের স্ত্রীর অনেক আত্মীয় স্বজন বাংলাদেশ রয়ে গেছে । কেউবা সেখানে চাকুরীরত ছিল কেউবা বিয়ে হয়ে সেখানকার বাসিন্দা । ছেলে আবুর ইচ্ছে সিঙ্গাপুর যাবে । 

আমিরুল বলল, "এখন না আব্বু! তোমার দাদিজীরে নিয়া হজ্জ করিয়া ফিরিয়া আসি তারপর সিঙ্গাপুর নিয়ে যাব তোমাদের । আরও দুবছর অপেক্ষা করতে হবে । ঠিক আছে!' 

ছেলে বলল, "ঠিক আছে হবে! তুমি দাদিজীকে নিয়ে হজ্জ করে এসো তারপর আমরা সিঙ্গাপুর যাব। এখন নাহয় বাংলাদেশ ঘুরে আসি।' 

     বিদেশ-ভ্রমণের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে কিছু টাকা সিন্দুকে জমা রাখা আছে । ইঁদুরের সর্দার বললেন, "ভাইকে একটু সাহায্য করতে পারে না আবার নিজে স্ত্রী পুত্র নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করবে! চল! করাচ্ছি বিদেশ ভ্রমণ বেটাকে!' সবাই বলল," চলো! চলো! টাকার পুঁটলি খুলো! সব চিবিয়ে ফেলো!'

     আমিরুলের স্ত্রী আমিরুলের আত্মীয় স্বজনদের বেশি পাত্তা দিত না। এতে আমিরুল স্ত্রীর ওপর খুশি। শুধু তার মায়ের সাথে যেন কোনো খারাপ ব্যবহার না করে সেটা কিন্তু সতর্ক করে দিয়েছে। মাকে খুব ভালোবাসে সে। মায়ের যত্নের কোনো ত্রুটি রাখে না। মায়ের কষ্ট হবে ভেবে অভাবী ভাই বোনের ঘরে মাকে থাকতে দেয় না। মা চটপট করেন কিন্তু কিছু বলেন না । তিনি ভাবেন, "নিজর না আছে জন, না আছে ধন! বাবা! ছেলের ইচ্ছে মত চলাই ভালো!'

     আমিরুলের গেল বছরের ধান খেয়ে দেয়ে, বিক্রি করে এখনও প্রচুর পরিমাণে গোলায় মজুদ রয়েছে। ভেবেছে নতুন ধান উঠানোর আগে বিক্রি করে দেবে - যেটুকু অতিরিক্ত থাকবে। একদিন এক বিধবা বৃদ্ধা এসে আমিরুলের স্ত্রীর কাছে হাত পাতলেন, 

-- " কিছুটা ধান দেও মাই গো? আমার ঘরো চাউল নাই! ঢেকিত বানিয়া কয়টা চাউল ছফা করিয়া ভাত রান্দিতে পারলাম অনে। '

--"টেকা নিয়া আইছো নি ? বাকি নিয়া ফাঁকি দিবায় নি?' আমিরুলের স্ত্রী বলল।

--"আমি মানুষর দুয়ারো দুয়ারো খুঁজিয়া খাওয়া মানুষ গো!  এক সপ্তাহর জ্বরে ভুগিয়া  ফুয়া গেছে গিয়া দুনিয়া ছাড়িয়া। বউ নাতি নাতনি আর আমারে নিয়া পাঁচটা পেট। তোমাদের তো অঢেল দিছে আল্লাহ! আল্লাহর ওয়াআছতে একটু সাহায্য করলে কমবে না।'

--"ইখান কিতা বন্টনখানা নি যে সব আই যাও ইনো! আমরা বিলাইয়া দেওয়ার লাগি ধন সম্পদ সঞ্চয় করি নাই। আমারার ভবিষ্যৎ আছে! ছেলের ভবিষ্যৎ আছে! তখন আমরা বিপদে পড়লে কি তুমি দেখবায়? যাও ইখান থাকি।' আমিরুলের স্ত্রীর তিরস্কার শুনে বৃদ্ধা আপন মনে বিড়বিড় করে চলে গেলেন।

    আমিরুলের স্ত্রী ঘরে মেহমান আসলে শরবত দিলে চা দেয় না আর চায়ের সঙ্গে নাস্তা  দিলে ভাত দেয় না আর ভাত খাওয়ালে চা দেয় না ! কাজের মাসিকে খড়ায়-গণ্ডায় হিসেব করে মাইনে দেয় । কোনদিন যদি কোনো কারণ বসত মাসি কাজে আসতে পারে না সেদিনের মাইনে কেটে দেয়।

     ক্ষেতের মাঠে কচি কচি চারা ধানে চারদিকে সবুজের সমারোহ। আহ: কী নয়ন ভোলানো অপূর্ব দৃশ্য! ক্লান্ত দুচোখ যেন সতেজ হয়ে উঠে ! আরও ক'দিন পরে চারা গাছগুলো বেড়ে উঠবে । ফুটবে ফুল, ছাড়বে ধান। তারপর পাকা সোনালী ধানের মো-মো গন্ধে সুবাসিত হয়ে উঠবে মাঠ-ঘাট ! সে অপেক্ষায় আছে ইঁদুরের দল। নিমন্ত্রণ দিয়ে রেখেছে নিজের আত্মীয় স্বজন, বন্ধু- বান্ধবদের। বুড়ি মা-কে খালি হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার বদলা নেবে তারা!

 

      পাসপোর্ট হয়ে গেছে সবার । বাংলাদেশ যাওয়ার জন্য জমানো টাকার সিন্দুক খোলা হলো। সিন্দুক খুলে সবার মাথায় হাত! একি সব টাকা-পয়সা তছনছ! শুধু মাত্র হজ্জে যাওয়ার জন্য জমানো টাকার পুঁটলিটা অক্ষত অবস্থায় আছে ! 

    আমিরুলের স্ত্রী বলে উঠল, "হজ্জে যাওয়া তো এখনও অনেক  দেরি আছে । কিছুই তো ঠিক হয়নি।  তবে ঐ টাকাগুলো দিয়ে এখন বাংলাদেশ ঘুরে আসি.....।' তার কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই রান্নাঘর থেকে প্রেশার কুকারের সিটি বেজে উঠল। তাই সে দৌড়ে গেল রান্নাঘরে । সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠল সে রান্নাঘর থেকে! চিৎকার শুনে সবাই দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, " কী হয়েছে?' 

সে কুঁকড়ে কুঁকড়ে বলল, 

--"আঁধারের মাঝে ইঁদুর আমার পায়ে কামড় মারিয়া দিছে!'

--" কী! এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার! এখনি ডাক্তরের কাছে নিয়া যাইতে অইব! ভ্যাকসিন নিতে অইব! তাড়াতাড়ি চল! আমি গাড়ি বাইর করছি !' আমিরুল এই বলে দৌড়ে গিয়ে গাড়ি বের করে স্ত্রীকে গাড়িতে তুলে ছুটল হাসপাতালে ।

      আমিরুলের চাষবাস দেখা শোনা করে কুটিমিয়া । সে পরদিন সকাল সকাল হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল, --" মালিক সর্বনাশ অই গেছে ! মাঠর সব পাকনা ধান নষ্ট করিয়া দিছে ইঁদুর ! কাইল  তো দেখলাম সব ঠিক আছে । এক রাইতে এত ধান নষ্ট করল কী কিলা!' 

    এমনিতেই আগের রাতে ডাক্তারের কাছ থেকে ফিরে এসে অনুশোচনায় দগ্ধ আমিরুল! অনবরত কেঁদে চলেছে মায়ের পায়ের কাছে বসে আর আত্ম-সমালোচনা করে নিজেকে শুধরানোর পণ করছে। তার ওপর এই সর্বনাশের খবর! স্তব্ধ হয়ে গেছে সে । সে শুধু কুটি মিয়ার কথা গুলো শুনল মায়ের পায়ের কাছে বসে । কিছুই বলতে পারল না কুটিমিয়াকে । 

    আমিরুলের মা উঠে বসলেন। বুকে টেনে নিলেন ছেলেকে। আঁচল দিয়ে ছেলের দুচোখ মুছে দিয়ে আদর করতে করতে বলতে লাগলেন, --"দেখো বাবা! তুমি অনুতপ্ত অইছ, নিজে নিজর দোষ খুঁজার চেষ্টা করছ -- ইতা খুবই ভালা লক্ষণ। তোমার মাঝে কিছু দোষ আছে। মানুষ মাত্রই দোষ - গুন থাকে। ইতা স্বাভাবিক। আমার কর্তব্য আসলো, তোমার ভুলকে দেখাইয়া দেওয়া। কিন্তু অসহায় নারী নিজর স্বার্থটাই দেখে! ভালো পরামর্শ বা উপদেশ দিতেও চিন্তা করে 'যদি বাবা নারাজ হন কিংবা যদি ভাই নারাজ হন কিংবা যদি স্বামী নারাজ হন, তখন এই পরজীবী বাঁচব কেমন করে?' এই ডরে আমরা বেটিনতে নিজর পেটর সন্তানের ওপরেও দাবি কাটাইতে পারি না !'

--" মাইগো! তোমার এত জ্ঞান!' অবাক হয়ে আমিরুল বলল,"তুমি আইজ থাকিয়া তোমার এই অপদার্থ অদম ফুয়ারে নিঃসংকোচে উপদেশ দিও, গালি দিও, মারিও পিটিও। যে ছেলেকে মা ভয় করছে সে ছেলের পরকাল কি হবে? আমি এতদিন দুনিয়ার মোহ মায়ায় অন্ধ ছিলাম! এখন আমার চোখ খুলছে। তুমি যা আদেশ - উপদেশ দিবে আমি মাথা পাতিয়া নিমু । আইজ তুমি কইবায়, আমি শুনমু।'

--" সবই আল্লাহর ইচ্ছায় অয় ! আইজ আমার ফুয়ার অন্তর আত্মা খুলছে -- এটাই আমার অনেক বড় পাওয়া ! দেখ বাবা! তোমার ধন সম্পদ তুমি নিজে কষ্ট করিয়া উপার্জন করেছ ঠিকই কিন্তু এতে তোমার পরিবারের, সমাজের, আত্মীয় স্বজনের,  পাড়া প্রতিবেশীর সবারই কমবেশি হক আছে। দান খয়রাত করলে বালা - মুসিবত দূর অয় । কেউররে খালি হাতে ফিরাইয়া দিও না তাইলে তোমার দুনিয়া আখেরাত ভালো অইব। তোমার বাবার তেমন কিছুই আসলো না তবুও যতটুকু পারতা দান-খয়রাত করতা । কইতা,"দানে ধন কমে না''

-- "তুমি একদম ঠিক কইছো মা! আমি আমার মনে একটি ভুল ধারণা পোষণ করিয়া আসলাম যে আব্বা কেউ যখন কিছু চাইতেই দিয়া দিতেন বলিয়া আমরার ধন সম্পদ সঞ্চয় অইছে না আর সময় সময় আমরার অভাব অনটনে পড়তে অইছে ।এর লাগি আমি আমার ভাই-বোন, আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী কাউকে মূল্য দেই নাই ! কারও প্রয়োজনে সাহায্য করি নাই !  ফল স্বরূপ আমার আলমারি ভর্তি বই নষ্ট হয়েছে, গোলা ভরা ধান নষ্ট হয়েছে, সিন্দুক ভর্তি টাকা নষ্ট হয়েছে, মাঠে পাকা ধান নষ্ট হয়েছে। শেষমেশ আবুর মাকে পর্যন্ত কামড়ালো ইঁদুর ! কিন্তু মা! দেখলে মা! কী আশ্চর্য কাণ্ড! শুধু মাত্র আব্বার বদলা হজ্জের জন্য আর তোমার হজ্জের জন্য যেটুকু টাকা জমা করেছিলাম, সেটুকু যেভাবে রেখেছিলাম সেভাবেই আছে।' 

     পাশে বসে সব শুনছে আমিরুলের স্ত্রী আর চোখের জল ফেলছে। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল, ' আম্মাজান! আমার বেআদবি মাফ করবা ! অনেক কিপটামি করছি! কিন্তু আম্মা আইজ বুঝতে পারতেছি কিপটামি করিয়া করিয়া কতটা বিবেক হারাইয়া ফালাইছি! আত্মীয় স্বজনর স্নেহ - মমতা - ভালোবাসার সম্পর্ক গুলোর গুরুত্ব ভুলিয়া গেছি । একটুও সাহায্য সহায়তা করিনি কেউররে কোনদিন । শুধু নিজর কথা ভাবছি । ছিঃ ছিঃ ! নিজর ওপরেই নিজর ঘিন্না লাগের ! এতো অদম আমি! এতো নীচ!'

--"একটা কাম করা যাউক্! কাইল একটা দোয়া - দুরুদ, খানা- দানার আয়োজন করা যাউক্ ! মা তুমি ফোন করিয়া ভাইসাব ও মারিয়ারে এখনই সবরে নিয়া আমরার ঘরো আইতা কইয়া দেও। আমরার হজ্জ্ব যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়াও আলোচনা করতে লাগবো । তখন তো আবু ও তার মার দেখাশোনা তারারেউ করতে অইব । সবরে সঙ্গে নিয়া আয়োজন করব। অসহায় গরীব দুঃখী দুঃস্থদের খাওয়ানো অইব দুবেলা পেট ভরে ।' আমিরুল বলল। 

 আমিরুলের স্ত্রীও খুশি হয়ে বলল, "অয় অয়! ওটাই কর! ভালা অইব। ভাইসাব ও মারিয়ার মনে আমরা কম কষ্ট দিছিনি? এখন তারা কত খুশি অইবা দেখিও !'

 

সোমবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৪

ঘরের দিকে ফিরে তাকাইনি একবারও

 ।। মোহাজির হুশেইন চৌধুরী ।।


বাড়ির বাঁ পাশের কোণায় ঘরটি দাঁড়িয়ে আছে
তিনতলা।
নতুন পলেস্তারায় রাজমিস্ত্রির গন্ধ
এখনও লেগে আছে
যে আসে ঘুরে ঘুরে দেখে
 সে-ই বেশ তারিফ করে
বিশেষ করে প্রকৌশলগত চারুকলার
এবং আমার বিশাল খরচের বহর
 
আমি একদিনও ফিরে তাকাইনি ঘরটির দিকে
কারণ আমি জানি এ ঘরটি আমার নয়
 
সুরম্য একটি কোঠা অবশ্য আমার জন্য বরাদ্দ আছে।
কাঁচের জানলা সোনালী হাতল কারুকাজ করা দরজা
ভীষণ আকর্ষণ করা এ সি ব্লগ
মেহগনি কাঠের সুদৃশ্য পালঙ্ক
 
প্রতিদিন সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করি
দেয়ালের আয়নায় নিজের মুখ দেখি
এক বেদুইন মুসাফির দাঁড়িয়ে থাকে
প্রতিদিন কপট আয়নায়
প্রতিবিম্ব আমাকে একটা মাটির ঘরের দিকে
টেনে টেনে নিয়ে যায়
উপরে বাঁশের ছাদ মাটির দেয়াল
চারপাশে ছড়ানো ছিটানো কিছু কংকাল
আমি একা নি:সঙ্গ অন্ধকারে   ডুবে আছি
শুধু বুকপকেটের ডাইরিখানা লটকে আছে 
কেউ হয়তো পড়ে নেবে কোন এক অন্তিম দিনে 
তারপর ঠেলে দিবে জান্নাত বা জাহান্নামে 

 
 
 
 
 
 


সোমবার, ১৫ জুলাই, ২০২৪

।। ভিঞ্চি রাভার সংসার।।

সৌজন্য


         ।।মাসকুরা বেগম।। 
  ফটো: গুগল সৌজন্য
      

অনবরত ঝমঝম বৃষ্টি পড়ছিল। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল!  মাথার খদাবংগের উপরে একটি তালপাতার ছাতা বেঁধেছিল ভিঞ্চি। হাঁটু জলে নেমে জাকৈ মারতে মারতে মাছ ধরে চলছিল ভিঞ্চি ও তার সঙ্গীরা । কোমরে বাঁধা খালুইতে মাছ ধরে রাখছিল তারা । মাছ বেশি ধরতে পারলে খুশিতে ঝলমল করছিল  আর মাছ না পেলে কায়মনোবাক্যে তাদের উপাস্যের কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছিল! কত যে দায়িত্ব তাদের ওপর! সহজ সরল টান টান চামড়ার স্নেহ ভরা চেহারাটা দেখলে কি বুঝা যায়? রোদে পুড়ে কিংবা কাঁদা- জলে, মাঠে- বিলে কাজ করেও ক্লান্তির ছাপ খুব একটা পড়ে না এই মহিলাদের চেহারায়! তারা দায়িত্ব নেয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত! কাজ করে তারা অভ্যস্ত! তারা দলবদ্ধ হয়ে মাছ ধরে, মাঠে কাজ করে, বাজারে মাছ শাক-সবজি ইত্যাদি বিক্রি করতে যায়! তাদের পেট - পিঠের ভাবনা আছে! সংসার আছে, পেটের সন্তান আছে, স্বামী-পরিবার আছে!

ভিঞ্চির মত মহিলারা ছাতারও  প্রয়োজন বোধ করে না! কিন্তু ভিঞ্চি মেয়ের আদেশ, 'মা!ছাতা মাথায় বেঁধে বৃষ্টিতে বের হবে নাইলে বের হবে না ঘর থেকে!'

ভিঞ্চির মাথায় তালপাতার ছাতা ছিল তাই খদাবংগটা ভিজে নি কিন্তু খোলা কাঁধ বেয়ে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ছিল তার সারা শরীর জুড়ে! 

কোমর থেকে ঝুলানো রিফান বা লেমাফোটা, বুক থেকে ঝুলানো কামবংগ বা আংচা - সমস্ত পোশাক ভিজে চিপকে গিয়েছিল তার ছিপছিপে গায়ে। ভিঞ্চির শরীর ঠাণ্ডা - গরম সব সহে! 

ভিঞ্চির ঘরে সেদিন না ছিল আলু - ডাল, না ছিল টাকা - পয়সা! তাই তার চারটে মাছের খুব প্রয়োজন! সে ভেবে রেখেছিল নিজের ভাগের মাছগুলো থেকে কিছুটা গাঁওবুড়ার বাড়িতে বিক্রি করবে আর চারটে মাছ নিয়ে যাবে মেয়ের জন্য! মেয়ে পিঙ্কি খুব মাছ খেতে ভালোবাসে কিন্তু ছেলে বিট্টু মাছ খাওয়া তো দূরের কথা মাছের গন্ধই সহ্য করতে পারে না! তাই তার জন্য ডিম কিনতে হবে আর আলু-ডাল- পিঁয়াজ যতটুক পারা যায় কিনতে হবে! তারপর কিছু টাকা বাঁচিয়ে না নিয়ে গেলে কি পিঠ বাঁচবে! "দূর! যা হয় হবে! এতো চিন্তা করে লাভ কী? এ তো নিত্যদিনের ব্যাপার!' সব দুঃখ- কষ্ট- চিন্তাকে দূরে ঠেলে দিয়ে নিজের কাজে মনোযোগ দেয় ভিঞ্চি। কারণ জীবনের টানাপড়েন নিয়ে বেশি ভাবলে তার মাথাটা ঝিমঝিম করে, বুকটা ধড়পড় করে, কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে! তাই তো বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে দলের সর্দারনীর গানের সাথে গলা মিলিয়ে গান গেয়ে আনন্দে মাছ ধরত থাকল সে! 

সবাই মাছ ধরা শেষ করে সব মাছ একত্রিত করল। তারপর দলের সব সদস্যের মাঝে সমানে ভাগ করে নিল।  আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় তারা বেশি মাছ ধরতে পারেনি । ভিঞ্চির ভাগে প্রায় এক কেজি পরিমাণ মাছ পড়েছিল। এর থেকে আড়াইশ গ্রামের মত মেয়েটির জন্য রেখে বাকি গুলো বিক্রি করে দিয়েছিল গাঁও বুড়ার বাড়িতে। মাছগুলো কেটে কুটে দিয়ে যেতে পারলে আরও দশ টাকা পেত। কিন্তু সমস্ত পোশাক ভিজে গেছিল তাই এই অবস্থায় কেমনে বসে মাছ কাটবে! মুদির দোকান থেকে দুইটা ডিম, চারটে আলু আর চারটে পিঁয়াজ কিনার পর যে কয়টা পয়সা অবশিষ্ট ছিল সেগুলো পলিথিনের ঠোঙায় ভরে কোমরে গুঁজে রাখল যতনে। যদি তার স্বামী জয়রামকে মদ কিনার পয়সা দিতে না পারে তবে যে আস্ত ছাড়বে না তাকে! জয়রাম সকাল - বিকাল মদ গিলে টালমাটাল  হয়ে পড়ে থাকে! কোনো কাজ কর্ম করতে অক্ষম সে! 

ভিঞ্চির মনে পড়ে সেই পুরনো দিনের কথা! যখন জয়রামের সঙ্গে প্রথম দেখা হয় তখন ভিঞ্চির বয়স পনের - ষোলো বছর! ভিঞ্চি মায়ের সঙ্গে মাঠে কাজ করতে যেত। সেখানেই কাজ করত জয়রাম রাভা - হাল বাওয়া, মাটি কুঁড়া, জল সেচ  যা পায় তাই করত দিন হাজিরা হিসেবে।

তখন তার বয়স প্রায় বিশ - একুশ বছর। আসা যাওয়ার পথে দেখাদেখি, চোখাচোখি, বন্ধুত্ব থেকে প্রেম শেষমেশ বিয়ে! কী যে মিষ্টি মধুর দিন ছিল তখন! আপনাআপনি এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসল ভিঞ্চির বুকের গভীর থেকে! একদিন তাদের কোল আলো করে পৃথিবীতে আসল ফুটফুটে পিঙ্কি! মেয়েকে কোলে নিয়ে সেদিন কী আনন্দ বাবা জয়রামের! মেয়ের গোলাপি চেহারা দেখে সে তার নাম দিল পিঙ্কি! বকো খণ্ড প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সব কর্মচারীদের মিষ্টি মুখ করাল সেদিন সে! তখন এত নেশা করত না জয়রাম। ভিঞ্চির তখন মাঠে কাজ করতেও হত না। ঘরোয়া কাজ কর্ম করত, বাড়িতে বসেই লোকের বাঁশ বেতের জিনিস পত্র তৈরি করে দিত। তার নিজের বাড়িতে বাঁশ, বেত নেই। যারা তৈরি করতে দিত তারাই বাঁশ, বেত দিয়ে দিত আর বানানোর পারিশ্রমিকটা তাকে দিত । এতে ভিঞ্চির টুকটাক হাত খরচের পয়সা হয়ে যেত আর পিঙ্কির খুব যত্ন করতে পারত! 

একবার বাইখো উৎসবের সময় পিঙ্কির খুব জ্বর ছিল তাই বাইরে বের হয়নি ভিঞ্চি। জয়রাম তার বন্ধুদের সঙ্গে গিয়েছিল উৎসব উদযাপন করতে। সেদিন রাতে জয়রাম ঘরে ফিরল এক অন্য জয়রাম হয়ে! তার টালমাটাল অবস্থা দেখে স্তম্ভিত ভিঞ্চি! ভালোবাসার মানুষটির ওপর খুব জোর খাটাতো সে তাই সেই দাবি নিয়ে জয়রামকে একটুখানি শাসনের সুরে দুচারটে কথা শুনাতে গিয়ে আরও অবাক হতে হল ভিঞ্চিকে! প্রথম বার জয়রাম তাকে মারল! মারতে পারল সে! কেমনে পারল! জয়রাম না কত্ত ভালোবাসত ভিঞ্চিকে! এভাবেই ঘুমিয়ে পড়ল জয়রাম! ভিঞ্চি চোখে ঘুম নেই! কাঁদতে লাগল আর আগন্তুক দিনের কথা চিন্তা করল! বুকটা তার কেঁপে উঠল! বাবার কথা মনে পড়ল! তার চোখের সামনে দেখেছিল বাবার মাতাল রূপ ও মায়ের কষ্টের জীবন! সেই বাবার মূর্তিটা আজ সে দেখেছিল জয়রামের মধ্যে! জয়রাম পরদিন সকালে খুব কাকুতি মিনতি করেছিল ভিঞ্চির কাছে, হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়েছিল! ভিঞ্চির সব ভুলে বুকে টেনে নিয়েছিল  তাকে! প্রতিজ্ঞা করিয়ে ছিল কিন্তু সেই রাতের পুনরাবৃত্তি হতেই থাকল! কয়েকদিন চলল ক্ষমা চাওয়া, প্রতিজ্ঞা করা! ধীরে ধীরে বেপরোয়া হয়ে উঠল জয়রাম! ভিঞ্চির ভালোবাসা তাকে আর আটকাতে পারল না! এভাবেই রাত পোহাতে লাগল দিন কাটতে থাকল! পিঙ্কির যখন ছয় বছর বয়স তখন কোল আলো করে বিট্টু আসল! কিন্তু জয়রামের আগের মত কোনো উচ্ছ্বাস নেই! সব কিছু একাই সামলে চলল ভিঞ্চি!

বাড়িতে ঢুকে পিঙ্কিকে হাঁক দিতে দিতে বারান্দায় হাত থেকে জাকৈ আর কোমর থেকে খালুই খুলে রাখল ভিঞ্চি।

ঝুপড়ি থেকে বেরিয়ে আসল পিঙ্কি, 'মা তুমি আমায় ডাকছিলেন?'

"হ্যাঁ মাজনী! ঘর থেকে আমায় গামছা, রিফান আর খদাবংগ দেয় তো । একেবারে ভিজে কাক হয়ে গেছি যে!'

"মা তুমি এতো ঝড় বৃষ্টির মধ্যে মাছ ধরতে যাও কেন? আমার খুব ভয় করে! যতক্ষণ তুমি ঘরে না আসা অব্দি খুব চিন্তা হয়!'

"মাজনী রে! আমার বাইরের ঝড় বৃষ্টি কোনো কিছুর ভয় করে না রে! ভয় করে ঘরে ঝড় উঠলে ! কী দিয়ে দুমুঠো ভাত খাবে? খাওয়ার জন্য যে কিছুই নেই ঘরে!'

"মা তুমি এতো চিন্তা কর কেন? আমরা নুন ভাত খেয়ে নিতাম!' বিট্টু ঘর থেকে বেরিয়ে দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে বলল।

ছেলে-মেয়ে দুটোর কথা শুনে সব কষ্ট যেন নিমিষেই দূর হয়ে গেল ভিঞ্চির! প্রশান্তিময় একটা দীর্ঘশ্বাস আপনাআপনি বুক থেকে বেরিয়ে আসল তার! "শুন মাজনী! তুই পড়াশোনা করে যখন বড় পুলিশ অফিসার হবি তখন তোর মা কি আর মাছ ধরতে যাবে? পড়াশোনা যখন নেই তখন তো পেটের জ্বালা মেটাতে কিছু একটা করতে হবে! স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত গিয়েছিলাম! সব ক্লাসে প্রথম হতাম! ছোট ছোট চারটে সন্তানের মধ্যে মা-বাবার বড় মেয়ে আমি! ঠাকুমাকে নিয়ে সাত জনের সংসার মায়ের পক্ষে একা সামলানো মুশকিল হচ্ছিল তাই স্কুল ছেড়ে দিয়ে মায়ের সঙ্গে কাজে নেমে পড়েছিলাম!' বলতে বলতে পিঙ্কির হাতে ঠোঙাটা ধরিয়ে দিতে উদ্যত হল ভিঞ্চি। 

মাঝখান থেকে হেঁচকা মেরে খাদ্য বস্তুর ঠোঙাটা নিয়ে গেল জয়রাম! ভেতরটা হাতড়ে ঠোঙাটা ছুঁড়ে ফেলে দিল সে! ডিম দুটো পড়ে ফেটে গড়িয়ে গেল ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে বারান্দায়! ভিঞ্চির গালে টাশটুশ করে চড় মারতে মারতে চেঁচিয়ে উঠল, "আমার জন্য মাল আনিস্ নি কেন? তুই কি জানিস না আমার মাল ছাড়া চলে না!'

"হেই পিঙ্কি তুই মায়ের সঙ্গে কাজে যাস্ না কেন? চৌদ্দ-পনের বছর বয়স হল এখনও বসে বসে খাবে?' বলতে বলতে পিঙ্কির দিকে ধেয়ে গেল সে! পিঙ্কিকে মারতে হাত উঠাতেই খপ করে সঙ্গে সঙ্গে হাতটা ধরে ফেলল ভিঞ্চি! জয়রাম হাতটা ছাড়াতে চেষ্টা করল কিন্তু মাতাল দুর্বল জয়রাম পেরে উঠল না রোদ-বৃষ্টিতে কাজ করা শক্তপোক্ত ভিঞ্চির সাথে!  জয়রামের হাতটা মুচড়ে দিয়ে সে বলল, "আমার সঙ্গে যা ইচ্ছে তাই কর কিন্তু আমার মেয়ের সঙ্গে কোনো অন্যায় আমি হতে দেব না! পিঙ্কির পুলিশ অফিসার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য যতটুকু পরিশ্রম করতে লাগে আমি করব! ওর  পড়াশোনা কিংবা শরীর চর্চা কোনটারই ক্ষতি হতে দেব না আমি! কোন ধরনের শারীরিক বা মানসিক কষ্ট যেন আমার মেয়ের স্বপ্ন পূরণে বাধা না হয়! কান ভরে শুনে রেখো!  মন মস্তিষ্কে গুজে রেখো!' বলে কোমরে গুঁজে রাখা পলিথিনের ঠোঙাটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, "এই নাও টাকা! যত ইচ্ছে তত মদ গিল! কিন্তু আমার মেয়ে ও ছেলের ওপর নজর দিওনা!'

টাকা হাতে পেয়ে খুশি হয়ে ভিঞ্চিকে আদর করতে এগিয়ে গেল কিন্তু ভিঞ্চি তাকে পাত্তা না দিয়ে হনহনিয়ে টিউবওয়েল থাকা একচালা টিনের ছোট্ট স্নান ঘরটাতে ঢুকে গেল ভিজে কাপড় বদলাতে!

পিঙ্কি মা ফিরে আসার আগেই ভাত রেঁধে রেখেছিল। মাছগুলো পুড়ে পিঁয়াজ ও মরিচ কুচি দিয়ে চাটনি মেখে নিল । বিট্টুর জন্য আলাদা করে আলু চাটনি করল। বাবা ডিমগুলো ভেঙে ফেলল! এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসল তার বুকের ভেতর থেকে। মা ও ভাইকে ভাত খেতে ডাকল । তিনজনে খেতে বসল। জয়রামের কোনো পাত্তাই নেই! টাকা হাতে পেয়ে খুশিতে নাচতে নাচতে বাড়িতে থেকে যে বেরিয়ে গেছে আর কখন ফিরবে এর কোনো ঠিক নেই! 

পিঙ্কি বলল, "মা! আমি একটা কথা ভাবছি!'

"কী কথা মাজনী!'

"মা বাবা আসলে ইচ্ছে করে এমন করে না। তাঁর হুস নেই! বুঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে!'

"আমি বুঝতে পারি রে মা! তাইতো সব সহ্য করি! তুই কী বলবি?বল!'

"মা! বিট্টুকে এই পরিবেশ থেকে দূরে সরাতে হবে!'

" কোথায়?'

"মা বিট্টু সব ক্লাসে প্রথম হয়ে আসছে বরাবর! এবার ক্লাস সে ফাইভে পড়ছে। ভালো করে পড়াশোনা করে নবোদয় বিদ্যালয়ের ভর্তির জন্য প্রবেশ পরীক্ষাটা দিলে নিশ্চয়ই সুযোগ পেয়ে যাবে! ক্লাস সিক্স থেকে ওখানে চলে যাবে!'

"আমরা বিট্টু বাবুকে ছেড়ে থাকতে পারব কি? সে পারবে কি আমাদের ছেড়ে থাকতে?'

"মা! আমাদের পারতেই হবে! বিট্টু তোকে পারতেই হবে! দ্বিতীয় কোনো রাস্তা নেই এই দুর্দশার থেকে মুক্তির!'

 

"আমি পারব মা! তোমার মাথায় হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করছি এই জিনিসটা কখনও ছুঁয়ে দেখবনা যা বাবাকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে!' বিট্টু মায়ের মাথায় হাত রেখে আবেগ জড়িত কণ্ঠে বলে উঠল।

মা ছেলে মেয়ে দুটোকে জড়িয়ে ধরল ! তিনজনে গলাগলি করে ধরে খুব কাঁদল!

প্রকৃতি ঝড়বৃষ্টি দিয়ে পৃথিবীকে ধুয়ে মুছে হালকা ঝরঝরে করে দিয়েছে! সব ধুলো ময়লা ধুয়ে পরিষ্কার করে মিষ্টি মিষ্টি রোদ উঠেছে পৃথিবীর বুকে!

ভিঞ্চি, পিঙ্কি ও বিট্টু কেঁদে নিল কিছুক্ষণ! বুকের ভেতরের দুঃখ কষ্ট ধুয়ে মুছে একটু হালকা অনুভব করছে তারা। 

                                ***

ভিঞ্চি আজ খুব ব্যস্ত! তাদের মাটির ঝুপড়িটা আজ ঝকঝক চকচক করছে! লেপে পোঁছে সুন্দর পরিপাটি করে রেখেছে! কতোটা দিন ধরে সে অপেক্ষা করছিল এই দিনটির জন্য! একটু একটু করে পয়সা জমিয়ে আজকের দিনে পরিধান করার জন্য নতুন খদাবংগ, কামবংগ ও রিফান  কিনেছে সাথে রং মিলিয়ে একটা ব্লাউজও কিনেছে নিজের জন্য! জয়রামের জন্য কিনেছে আঠুঁমুরিয়া(গামোচা), জামা ও পজার!

জয়রামকে স্নান করিয়ে পোশাক পরিয়ে দিয়েছে। নিজে সাজগোজ করেছে মনপ্রাণ ভরে । আহ্ কী শান্তি লাগছে আজ! নবোদয় বিদ্যালয়ে ছুটি চলছে তাই বিট্টু বাড়িতে এসেছে। সে বেরিয়ে গেছে সাব ইন্সপেক্টর অফ পুলিশ মিস্ পিঙ্কি রাভাকে স্যালুট জানিয়ে নিয়ে আসতে! 

উঠোনে ভিড় করেছে গ্রামবাসী! কারো হাতে আসামের ঐতিহ্যবাহী গামোছা, কারো হাতে ফুলের তোড়া, কারো বা হাতে মিঠাইয়ের বাক্স! ধন্য ধন্য করছে সবাই ভিঞ্চিকে! হঠাৎ টুং টুং শব্দ! বারান্দায় রাখা মিষ্টির হাঁড়ি দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য জয়রাম ভেঙে ফেলেছে লাঠি দিয়ে! ভিঞ্চি মেয়েকে দেখতে আসা লোকজনকে খাওয়াবে বলে কিনে এনেছিল রসগোল্লার মাটির হাঁড়ি! কিন্তু সবাই হৈচৈ করলেও ভিঞ্চির নড়চড় নাই! সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে এসব পরিস্থিতির! আজকাল সে কোনো প্রতিক্রিয়া করে না, প্রতিবাদ কিংবা প্রতিরোধ কিছুই করে না সে!

পিঙ্কি সবাইকে নমস্কার জানিয়ে সোজা গিয়ে দাঁড়াল বাবার সামনে! বাবাকে জড়িয়ে ধরে মাকে বলল, "মা চল!'

"কোথায়?'

"বাবাকে গুয়াহাটিতে নেশা মুক্তি কেন্দ্রে নিয়ে যাব!'

তিনজনে মিলে জয়রামকে টেনেটুনে গাড়িতে উঠিয়ে চলে গেল ! তাদের যাওয়ার পথে হা করে তাকিয়ে থাকল গ্রামবাসী! গামোছা, ফুলের তোড়া কিংবা মিঠাইয়ের বাক্স নিজ নিজ হাতেই রয়ে গেল!