“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

মঙ্গলবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

বিশ্ব

বিশ্ব

।।    এম রিয়াজুল আজহার লস্কর  ।।

হরেক রকম ধর্ম হেথা হরেক রকম জাতি।
হরেক রকম দিন যে হেথা হরেক রকম রাতি।।
হরেক রকম গাছ যে হেথা হরেক রকম প্রাণী।
হরেক রকম রাজা হেথা হরেক রকম রাণী।।

হরেক রকম ভাষা হেথা হরেক রকম বস্ত্র।
হরেক রকম ত্রাস যে হেথা হরেক রকম অস্ত্র।।
হরেক রকম গুণী হেথা হরেক রকম মন্ত্র।
হরেক রকম গাড়িঘোড়া হরেক রকম যন্ত্র।।

হরেক রকম মত যে হেথা হরেক রকম দ্বন্দ্ব।
হরেক রকম পুষ্প হেথা হরেক রকম গন্ধ।।
হরেক রকম নদী হেথা হরেক রকম নালা।
হরেক রকম সুখ যে হেথা হরেক রকম জ্বালা।।

হরেক রকম আরাম হেথা হরেক রকম ব্যথা।
হরেক রকম নেত্রী হেথা হরেক রকম নেতা।।
হরেক রকম ঝর্না হেথা হরেক রকম বন।
হরেক রকম মানুষ হেথা হরেক রকম মন।।
হরেক রকম ধনী হেথা হরেক রকম নিঃস্ব।
নানান রঙ্গের জিনিস মিলেই উঠল গড়ে বিশ্ব।।

বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

গ্যাসট্রিক

।। অভীককুমার দে।।

পেটে ভাত নাই,
তারকাঁটার খাঁচা টপকালেই
এয়ার
ইন্ডিয়া !

পাচনতন্ত্র চিবিয়ে খাচ্ছে শরীর।

রাস্তা

।। অভীককুমার দে।।

এই রাস্তা আমার পরিচিত নয়।

বহুরূপী মুখোশ চেনা মানুষের মুখে
যাবতীয় অস্ত্র হাতে
রাস্তা রুখে দাঁড়ায় !

সেদিনের মিছিল শেষে স্বাধীনতা বলেছিল--
এই রাস্তায় কটোরা হাতে খুঁজতে হবে না খাবার
নীল আকাশের নিচে মানুষের ঘর হবে
সব জাতির এক জাত
তিনরঙা কাপড় বুকে
মেতে উঠবে ভারতীয়তায়।

স্বাধীনতার পরেও মিছিল
রাস্তা জুড়ে
ঠিকানা বিহীন মানুষের ভিড়
রাস্তা খোঁজে রাস্তায় !

ফিরিয়ে দাও অধিকার

।। অভীককুমার দে।।

গত সন্ধ্যায় যে পাখি খুঁজে পায়নি বাসা
ঠোঁটে খাবার ওঠেনি

অশ্রু সাজিয়ে ভোর
ঘোলা আলোয় মেঘলা আকাশ গায়
এ মাটি রুগ্ন মাটি...

ভৈরবী বলে হারিয়ে গেছে সুর
উদাস কলি
অসুস্থ মাটিমুখ চেয়ে আধবোজা ভেজা পাপড়ি
গলায় ফোঁটা জল ঢালে !

মাটি বলে, ফিরিয়ে দাও অধিকার
কাল- কোটরে পোড়াকষ্টের পাখি।

খোলা রেখো জানালা

।। অভীককুমার দে।।

দেশীয় ছাদ উড়ে গেলে আটক শিবিরে ঘুমায় স্বাধীনতা।

রক্তের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম...
স্বাধীনতা এসেছে কার, কোন দেশে ?

এ দেশের চোখে কাশ্মীরি বরফের ঘুম
আড়াল স্বচ্ছ তার
রাখি হাতে মৃত্যু লিখছে কেউ !

ধর্মের দড়ি গলায় জন গণ মন
তিন পাড়ে...

এই উপসাগর সূর্য ডুবিয়ে রঙ রেখেছে জলে
একদিন উদ্বাস্তু শিবিরে লাশ পাওয়া যাবে ঠিক
মানুষের,
যদিও শবস্নানের জলে ফুরিয়ে যায় না রঙ;

বোলতা পাখি খোলা রেখো জানালা
এবার লিখতে হবে জাতের ইতিহাস।

আসলে নকল

।। অভীককুমার দে।।

নাটক !
রঙিন আলোয় আলোছায়া মুখ, মায়াবী...

খুঁজেছি, অনেক খুঁজেছি, ভেবেছিও
চলমান নাটক, আসলে নকল।

পাঁচ ফুরিয়ে বছর পাঁচ
জেগেই থাকে মঞ্চ
পায়রা ওঠে নামে।

এক একটি নাটকের পর
দর্শক ময়দানে, পড়ে থাকে বাদামের খোসা !

আত্মীয়তা

।। অভীককুমার দে।।

আমরা একই গ্রামে থাকি
রিফিউজি লতার কোরক থেকে লতানো সম্পর্ক

আত্মীয়তা বেড়ে ঘন, মধুর
গ্রামীণ অথবা পাড়াতো
এ'গ্রাম সে গ্রাম হয়ে যিনি'র ঘরের তিনি, তিনি'র ঘরে সে,
সম্পর্কের বুলি ভুল হয়নি কোনদিন।

এখনও আত্মীয়তা আছে, তবে
আত্মার ভেতর বাস করেন রাজার প্রতিনিধি।

নিয়তির মিহিদানা

।। অভীককুমার দে।।

উপস্থাপন চলছিল,
উপ স্থাপন চলছে,
হয়তোবা এভাবেই, চলবে...
কিন্তু কোন সিদ্ধান্তের দিকে!

এক দর্শন।
দর্শক একক, মধ্যমণি।

একটি মঞ্চ,
দুদিকে দরজা
পর্দায়, অদৃশ্য থেকে ফুটে ওঠছে শরীর, যাবতীয় চরিত্র।
প্রবেশ পথের দরজা খুলে গেলে
দৃশ্য অথবা একটি দিন আঁধার শেষ, কালো দাগ পড়ে।

আঁধার থেকে উপস্থাপন চলছিল যেমন
তেমনি চলছে, যদিও প্রতিস্থাপন বলেন কেউ,
আমি বলি ভিন্নতার শিশু
দিনের আলো নিভে গেলেও খেলা ভোলে না,
কোনও বেসুরো চলন উঠে আসে শুধু
কড়া নাড়ে,
দৃশ্য বদল হলেই স্থানচ্যুত,
শরীর চ্যুতি ঘটে এবং
প্রস্থানের পথ খুঁজে হেঁটে যায় শরীর।

মধ্যমণি টের পায়--
প্রস্থানের পথেই হাঁটছে সব।
আগে- পরের শেকলসময়
পড়ে থাকে স্মৃতি কিংবা চ্যুতিরেখা,
বাকি সব কল্পনা
ভর শূন্য;
ভারি।

ভারি হতে থাকে শরীর
ভাবনায় মেঘের চাতাল
নরম বেড়া
ধোঁয়াশায় উপর খড়
ঝুরঝুরে চাল।
বৃষ্টি আসে
মাটি ভিজে
ভিজে মাটি মাটির পর !
কেবল সরে যায় আর সরে আসে,
এমন সরণ চিতা জ্বালে
চিতা জ্বলে বুকে।
সব জ্বলে ঘোলা রঙ
কিছু ধোঁয়া কিছু ধুলো জেগে
ঘুরতে থাকে আর ছুটতে থাকে।

কোথাও চোখ আছে
দেখছে সব চোখ
চোখের ভেতর উল্টে আছে ছবি।

যদিও চোখের চোখে উল্টো ছবি
ঝুলে আছে ঝুলতে থাকা দোলনায়, তবু
পাপড়ি বোঝে না,
লুকিয়ে রাখে,
গুছিয়ে রাখে গোপনীয়তা।
লাশের ভিড় বাড়ছে
নদী মরছে একটু একটু
একেকটি মঞ্চ ফাঁকা, একা...

একা তবুও একা নয়।
একের পিছে অনেক, শুধু একতা নেই।
এক সূর্য।
এমন অনেক সূর্য হারিয়ে গেছে,
হারিয়ে যায় প্রতি দিন
কত সুকান্ত নিঃশেষ রাস্তায়
কত প্রভাত খুলতে পারে না মুখ!

ফুলের ঘুম ভাঙার আগে উড়ে গেছে যে পাখি
সুবাস নিতে আসে কত লোক
এদের ভেতর সুভাষ নেই
সুভাষ গেছে
কোথাও নেই সুভাষ,
একটিও নেই,
একটিও নেই!
কারও সুভাষ নেই!

এসময় সুবাস ছাড়া কিছুই হয় না,
তখন দেখেও দেখেনি কেউ
এখন জেনেও না জানার অভিনয়
ঘরে ঘরে ষড়যন্ত্রে;
মৃত সব।

সবকিছুই টের পায় মধ্যমণি,
তাই একটি নদী জেগে ওঠে
পাড় ভাঙে বুকের ভেতর
দুভাগ হয়
দুদিক ভাসে
বোবা শব্দ ঝুলে থাকে তার কাঁটায়।

তারকাঁটা আকাশ দেখছে
এদিকের শূন্যতায় থরথর থর মরু,
বুকের ওদিকে জলচঞ্চলতা,
নিচের জল আরও গড়ায় নিচে।
একদিকে পরিচালক অন্যদিকে মধ্যমণি
মাঝে মঞ্চ, অগণিত মঞ্চ
মঞ্চের ভেতর মঞ্চ,
অভিনয়ের অভিনয় এবং বিনিময়।

এ সময় বিকৃত সুখের,
এতে- ওতে গলা কাটা প্রেম।
কেউ খেলছে,
কেউ দেখছে,
চেয়ে দেখি-- হাতে হাত,
হাতের তালুতে বারুদের আলপনা,
মৃত্যু পার্বন।

কিংবদন্তি উইপোকা তুলে রাখে নিয়তির মিহিদানা।

স্বজন বোঝে

।। অভীককুমার দে।।

যে দেশের রক্ত নদী
অধিকার পায় সে যদি
কেন কার গদির নেশা !
নীতি- বা কেমন পেশা ?

কথাদের যাদু আছে
ভগবান উঠছে গাছে,
কপালে তিলক আঁকা
তবুও চলন বাঁকা !

ভক্ত বুঝলো শেষে
স্বপ্ন ধুলোয় মেশে,
যে দেশে গোড়ায় গলদ
সে দেশের শ্রেষ্ঠ বলদ।

কত যে মাশুল দিয়ে
কে তুমি কোথায় গিয়ে ?
ঠিকানা পাই না খুঁজে,
এ ব্যথা স্বজন বোঝে।

এ গোসাই গান ধরেছেন
আপনি ভুল শুনেছেন,
যে বেটা তাল জুড়েছে
সে কেন রাগ করেছে ?

মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

শহিদ উদ্যান-গান্ধীবাগ-সাপনালা’ সংস্কার – একটি শৈক্ষিক পর্যালোচনা



।। পার্থঙ্কর চৌধুরী।। 


(C)দৈনিক যুগশঙ্খ, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
যে পরিবেশটাতে আমরা বসবাস করছি, সেটা আমাদের উত্তরাধিকার সুত্রে পাওয়া সম্পদ নয়, বরং ভেবে নেওয়া উচিত যে আগামী প্রজন্মের কাছ থেকে  আমরা ধার নিয়েছি এই আপ্তবাক্যটি দিয়েই আলোচনা শুরু করা যাক ভারতবর্ষ তো মুনি-ঋষিদের দেশপাচ হাজারেরও বেশি বছর পুরনো বেদ-বেদান্তের নির্যাসই এদেশের চালিকা শক্তি পরিবেশ সংরক্ষন নিয়ে বেদান্তদর্শনে পঞ্চ-মহাযাজনার উল্লেখ রয়েছে। এগুলো হল ব্রহ্ম-যাজনা, দেব- যাজনা,  পিত্র- যাজনা, অতিথি- যাজনা এবং বলিবৈশ্য়দেব-যাজনা। এদের মধ্যে পাঁচ-নম্বর-টি, অর্থাৎ ‘বলিবৈশ্য়দেব-যাজনা’ এ ক্ষেত্রে খুবই প্রাসঙ্গিক। যেখানে বলা হয়েছে, যে পরিবেশ ও প্রকৃতির রক্ষণাবেক্ষন যদি ঠিকঠাক না করা হয়, তাহলে বাস্তুতন্ত্র তথা পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা মুস্কিল ! ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও এগুলোর রক্ষনাবক্ষনের উপর সেই সময়কার দিনেই যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

দেশটা স্বাধীন হয়েছে ১৯৪৭ সালে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭২ এই দীর্ঘ পঁচিশ বছর পরিবেশ, বায়ুমণ্ডল, জলাভুমি, স্থল ভাগ ইত্যাদি সংরক্ষণের জন্য বাস্তবিক অর্থে কোনও আইনই প্রনয়িত হয় নি ফলে যা হওয়ার, তাই হয়েছে সাংখ্য-দর্শনে পুরুষপ্রকৃতিএই দুটো  ধারনার উল্লেখ রয়েছে, তারই সুত্র ধরে লিখতে হয়, ঐ সময়টুকুতে যথেচ্ছ ভাবে প্রকৃতির উপর পুরুষের উপর্যুপরি অত্যাচার হয়েছে আবার, এস ওয়াজেদ আলীর কথা ধার করে  আজকের দিনে বলতে হয়… ‘সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে’…!

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পত্র-পত্রিকায় গান্ধিবাগ-সাপনালা-শহিদ স্মৃতি উদ্যান’ নিয়ে বেশ কিছু খবর প্রকাশিত হয়েছে, এবং হচ্ছেও শহর শিলচরের বুকে এককালে একটা প্রাকৃতিক জলাশয় ছিল বছর দশেক হল, সেটা ভরাট হয়েছে চারতলা মল, শপিং কমপ্লেক্স, ফাস্ট ফুড সেন্টার ইত্যাদি হয়েছে সবই এ সবই হয়েছে কিন্তু প্রকৃতির মতামত না নিয়ে, প্রকৃতির বিরুদ্ধে স্বভাবতই প্রকৃতি তার নিজ ভঙ্গিমায় প্রতিবাদ জানানো শুরু কুরে দিয়েছে তিন বা চার ফুট পুরু রড-কঙ্ক্রিটের ঢালাই ভেদ করে জল চলে আসে, মলের নিচতলায়, গাড়ী রাখার স্থানে এটা শুধু একা নিবন্ধ লেখকের অভিজ্ঞতা নয়, আপনাদের অনেকেরই নিশ্চয়  একই অভিজ্ঞতা  য়েছে ! মলের নিচতলায় গাড়ি রেখে মলে ঢোকার আগে পায়ের জুতো-জোড়া পুরোপুরি ভিজে যায় আরও কিছুদিন পর হয়ত, এক-দেড় ফুট জল সেখানে থাকাটাও অবান্তর কিছু নয় শহর–মাতৃকা ভয়ে ভয়ে রয়েছেন, হয়ত বা মনে মনে প্রমাদ গুনছেন... এক রামে রক্ষা নেই, সুগ্রীব দোসর...!
দোসর এই কারনেই যে এক পা এগিয়েগান্ধিবাগ-সাপনালা-শহিদ স্মৃতি উদ্যান’ নামক কফিনে প্রথম পেরেকটা গ্যাঁড়ে দেওয়া হয়েছে এই কদিন আগে, ৫ই সেপ্টেম্বর, অর্থাৎ এবছরের শিক্ষক দিবসে! ডঃ দীপঙ্কর দেবনাথ নামক পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের এক প্রাক্তন ছাত্র বছর দুয়েক আগে একটা আর-টি-আই করে রাজ্যের শিক্ষা বিভাগে জানতে চেয়েছিলেন যে  অসমের কতটা স্কুল-কলেজে পরিবেশ-বিদ্যা বাধ্যতামুলক ভাবে পড়ানো হয়। উত্তর এল ‘৩৬০টা’পরবর্তী আরেক আর-টি-আই করে তিনি একই দপ্তরে জানতে চাইলেন, ঐ  স্কুল-কলেজগুলোর মধ্যে কতটাতে পরিবেশ শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। এবার উত্তর এল, ‘শূন্য-টা’তার মানে এই দাঁড়াল যে, মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের সরাসরি নীতি-নির্দেশিকা থাকা সত্বেও পরিবেশ শিক্ষার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিরা কুম্ভকর্ণের কালনিদ্রায়! এহেন পরিস্থিতিতে ‘ সবুজ-ধরিত্রি-মাতা’ কি সুবিচার আশা করতে পারেন?

অতীতের সিঁড়ি বেয়ে পেছনের দিন গুলোর কথা অবলম্বনে লিখতে হয়, গান্ধীবাগ নামটি হওয়ার আগে, সাপনালা নামটি এসেছে প্রয়াত ঐতিহাসিক ডঃ দেবব্রত দত্তের লিখায় এর উল্লেখ রয়েছে। সেখানে উল্লেখ রয়েছে, প্রয়াত কামিনী কুমার চন্দের উদ্যোগে ‘স্টেশন কমিটি’ থেকে শিলচর মিউনিসিপালিটি উন্নীত হয়েছিল, আজ থেকে ১২৭ বছর আগে, অর্থাৎ ১৮৯৩ সালে। প্রয়াত চন্দ, ১৮৯৪ সাল থেকে দীর্ঘদিন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শিলচর মিউনিসিপালিটির ভাইস- চেয়ারম্যান পদে ছিলেন যদিও, কিন্তু আক্ষরিক অর্থে চেয়ারম্যানের সব কাজই উনাকে সামাল দিতে হতো।

সার্কিট হাউস- টাউন ক্লাব- ডি,এস,-পুলিশ প্যারেড গ্রাউন্ড ইত্যাদি সবকিছু নিয়ে গোটা এলাকাটিই ব্রিটিশ সাহেবদের অধীনে ছিল, এবং ভারতীয়দের ঐ এলাকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল আজকে যেখানেগান্ধিবাগ-সাপনালা-শহিদ স্মৃতি উদ্যান’ রয়েছে, ঐ সম্পূর্ণ এলাকাটি তখন ছিল একটি জলাভুমি সেটা ১৯১৩ সাল, প্রয়াত কামিনি কুমার চন্দের ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই জমি টুকু ব্রিটিশ দের কাছ থেকে নতুন ভাবে হওয়া মিউনিসিপালিটির জন্য অধিগ্রহন করেন প্রাথমিক ভাবে ঐ স্থানের বেশী অংশটুকুতে বক্রাকার সাপ-নালা খনন করা হয়েছিল পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে গান্ধীজীর নিধনের পর উনার চিতাভস্ম এনে এখানে রাখা হয়েছিল তাই পরবর্তী নাম হয়েছে গান্ধীবাগ চিতাভস্মের বাকি অংশ মধুরামুখে বরাক নদীতে বিসর্জন করা হয়েছিল, তাই মধুরাঘাটের নাম, গান্ধীঘাট ঐতিহাসিকদের মতে, পবিত্র এ স্থানগুলো বরাক উপত্যকারহেরিটেজ সাইটহিসেবে ঘোষণা করার দাবি রাখে

সাপ নালার ধারে পাশের অপেক্ষাকৃত উঁচু এবং সমতল জায়গায় তৎকালীন বন বিভাগের আধিকারিক (Conservator of Forests) জনৈক দত্ত মহাশয় এবং কামিনী কুমার চন্দ এই দুইজনের যৌথ উদ্যোগে কোলকাতার শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে বিভিন্ন প্রকারের মুল্যবান গাছ এবং ঔষধি বৃক্ষের চারা এনে এই স্থানে রোপণ করা হয়েছিল এ সবই আজ অতীত পরবর্তীতে দশকের পর দশক ধরে ক্রমবর্ধমান অবহেলার শিকার হয়েছে এই স্থান ইংরেজিতে একটা কথা চালু আছে, Give the dog a bad name, and then kill it.  সাপ নালা-গান্ধীবাগের ক্ষেত্রে সম্ভবত এটাই ঘটতে চলেছে !   

শহর শিলচরের মাস্টার প্ল্যান যেটা রয়েছে, সেখানে সম্প্রসারিত শহর একদিকে কাশীপুর,  আর অন্যদিকে শ্রীকোনা, আর ওদিকে সোনাবাড়ীঘাট এবং এন আই টি ছাড়িয়ে প্রায় শিলকুড়ি পর্যন্ত রাখা আছে। খবরে প্রকাশ, বরাক উপত্যকায় একটা ছোট খাট চিড়িয়াখানা এবং পশু পুনর্বাসন কেন্দ্র হবে। সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে জানা গেল, এদের  কোনোটাই শহরের ঐতিহ্য নষ্ট করে করা হবে না, বরং, শহুরে কোলাহলের বাইরেই থাকবে। কক্ষনও পত্র-পত্রিকার এটা চোখে পড়ে নি, যে গৌহাটির ‘দিঘলি-পুকুরি’-কে সংস্কারের নামে বিনির্মাণ করা হবে। তেজপুরের অগ্নি-গড়-এর ক্ষেত্রেও তা হবে না। ঐতিহ্য সংরক্ষনের জন্য আপোষহীন মানসিকতা রয়েছে বলেই সেসব জায়গায় তা কক্ষনো হবে না। ‘একোল্যান্ড’ নামের জলকেলি  তো গৌহাটিতেও রয়েছে, তবে তা রানী যাওয়ার পথে, গাড়ভাঙ্গা নামক স্থানে, শহর থেকে প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার দূরে।

(C)Image:ছবি
শহর এলাকার উন্নয়নের জন্য ভারত সরকারের  টাউন এন্ড কান্ট্রি প্লানিং বিভাগের আরবান প্লানিং গাইডলাইন, ২০১৪ রয়েছে।  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্দেশ মেনে প্রতিটি শহরে মাথাপিছু ৯ বর্গমিটার সবুজ খোলা জায়গা রাখার বিধান রয়েছে এবং এটাও বলা হয়েছে যে শহরের প্রতিটি নাগরিকই যেন মিনিট পনেরো হাঁটলেই সেরকম একটা জায়গায় গিয়ে পৌছাতে পারেন। শহর অঞ্চলে যান বাহন এবং সুউচ্চ দালান-বাড়ী থেকে যে তাপ নির্গত হয়ে উষ্ণমণ্ডলের (Heat Island) সৃষ্টি হয়, সেটাকে শুষে নেওয়ার জন্যই এই প্রেসক্রিপ্সন। আন্তর্জাতিক ষ্ট্যাণ্ডার্ড মতে প্রতি ১০০০ জনসংখ্যায় ১.৬২ হেক্টর খোলা জায়গা থাকা আবশ্যক। বিশ্বের বিভিন্ন শহরে এটা যথেষ্ট সন্তোষজনক (অর্থাৎ ১.৯% থেকে ৪৬%)। এ দেশেরও বিভিন্ন শহরে (যেমন বেনারস, চণ্ডীগড়, জয়পুর, ভূপাল, এলাহাবাদ, এবং নয়ডা) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত শহরে মাথাপিছু ৯ বর্গমিটারের অনেক বেশী সবুজ খোলা জায়গা রয়েছে। আমাদের প্রিয় শহর শিলচর, এই পরিসংখ্যানের ধারে কাছে আসার প্রশ্নই উঠে না ! এ দিকটায় যে বা যারা নজর দেবেন, তাঁরা কে বা কারা ?

আরবান প্লানিং গাইডলাইনের নির্দেশিকায় একদিকে যেমন  যথেষ্ট পরিমানে ‘আরবান গ্রিন স্পেস’ রাখার প্রণিধান রয়েছে, ঠিক তেমনি আরবান অর্থাৎ শহরের সবুজ এলাকা এবং পথের ধারে কি কি প্রজাতির গাছ লাগানো উচিত তার সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। বলা হয়েছে, নিম, আমলকি, মহুয়া, সিসাম বা শিশু-গাছ, আম, শিরীষ ইত্যাদি বর্ষা-বৃক্ষ (Rain tree) লাগাতে হবে, এবং ইউকেলিপ্টাস তথা অন্যান্য কাটা জাতীয় গাছ লাগানো বারন করা হয়েছে।  দুটো গাছের মধ্যে ন্যুনতম দুরত্ব ১০ থেকে ১২ মিটার রাখা উচিত বলে উল্লেখ রয়েছে, এবং তা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বলা হয়েছে, যাতে করে গাছগুলো বড় হলে পর দুটো গাছের চন্দ্রাতপের (Canopy) মধ্যে ফাঁকা জায়গা থাকে, নতুবা এক গাছের জন্যও অন্য গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা। প্রস্তাবিত গান্ধিবাগ-সাপনালা-শহিদ স্মৃতি উদ্যান’ স্থানের বিনির্মাণের জন্যও যেহেতু এক হাজার গাছ (লতা কিম্বা গুল্ম জাতীয় নয়) লাগানোর কথা পত্র পত্রিকায় বলা হয়েছে, সে প্রসঙ্গে কোনও কিছ বললে বলতে হয় যে তার জন্য  ৬২ বিঘা জমি দরকার। ন্যুনতম ১০ মিটার ফাঁক রেখে গাছ লাগালে, এবং ঐ এলাকায় যদি অন্য সব কিছু বাদ দিয়ে শুধুমাত্র গাছই লাগানো হয়, তাহলে ১৭ বা ১৮ বিঘা জমিতে সাকুল্যে ২৭৮ বা ২৯১টা গাছ লাগানো যেতে পারে। আরবান প্লানিং এর নিয়ম মেনে এর চাইতে বেশী গাছ লাগানো কোনও ভাবেই সম্ভব নয়। স্বভাবতই প্রশ্ন থেকে যায়, সবুজায়নের জন্যও এক হাজার লাগানোর গল্পটা তাহলে মিলছে কোথায় ? এটা কি তাহলে গল্পের সেই চতুষ্পদী জন্তু... যেটা গাছে চড়বে...?

সবাইকে নিয়ে সবার উন্নতি হোক, এই মন্ত্রটাই তো আজকের দিনে চালিকাশক্তি। এই আপ্তবাক্যটি যদি শিরোধার্য করা যায়, তাহলে মনে হয় ভালো থাকার মন্ত্রটা আমাদের শহরবাসীর হাতেই থাকবে। এটাকেই পাথেয় করে গান্ধিবাগ-সাপনালা-শহিদ স্মৃতি উদ্যান’ –এর প্রকল্পটার বিষয়ে শহরের নাগরিকদের নিয়ে একটা গনসমাবেশ করা যেতেই পারতনাগরিকরা যেহেতু পূরসভার করদাতা, অতএব, এ বিষয়টিতে তাদের নিজ নিজ সুচিন্তিত মতামত পেশ করার অবকাশ তখন থাকতো। সুস্থ গনতন্ত্রে এটাই তো কাম্য। শহরের অভিবাবকরা সময় মত সে পথ মাড়ান নি কেন, বিষয়টা ধন্ধে থেকেই গেল...!

(বিভিন্ন তথ্যসুত্র তথা বিশিষ্ট সুধিজনের বিভিন্ন তথ্য আলেখ্যটিতে ব্যবহৃত হয়েছে, সবার প্রতি রইলো কৃতজ্ঞতা ।)




মঙ্গলবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

সোজাসাপ্টা

।। অভীককুমার দে।।

১.
গদির নেশায় যদি- র খেলা
রাজার গুটি প্রজা,
অভাব যাদের তাদের মারো
এতেই ভারি মজা !

২.
ওই যে শিশু ঢালাই মেশায়
পড়ার কথা ছিল,
ভোটের আগে ভাগে ভাগেই
নেতা বলেছিল।

৩.
ভোটের পরে অভাব ঘরে
কাজের দেখা নাই,
ক্ষুধার জ্বালায় খুশি পালায়
খাবার কোথা পাই ?

৪.
রাস্তার উপর সস্তা প্রলেপ
দোস্ত'র ঠিকাদারি,
ভাগের টাকা মায়ায় ঢাকা
সবটাই সরকারি।

৫.
মন্ত্রী মশাই যেমন কসাই,
গরীবের পেট কাটে।
চাঁদের মাটি এতোই খাঁটি
অভাবে বুক ফাটে !

অধিকার

।। অভীককুমার দে।।

আমার রক্তে এই দেশ,
তোমাকে দিয়েছি
উত্তরাধিকার ভেবে দখল নিতে পারো না।

এই টুকরো মাটির বুকে অসংখ্য টুকরো
মানুষের, দেশ।

একমুঠো ভাত আর একটুকরো কাপড়, তা-ও
কেড়ে নিতে পারো না
যে জন্মেছে
যে জন্মাবে
অধিকার আছে তার।

ক্ষুধা

।। অভীককুমার দে।।

আমার উঠোন জুড়ে শুকোতে দিয়েছি ধান
তোমাদের কালো মেঘ রোদ ঢেকেছে হঠাৎ !

গিরগিটির মতো রঙ বদলে ভিজিয়ে দিচ্ছে সুখ
গলে যাচ্ছে মাটি
অসমের কাদায় ঢেকে যাচ্ছে সোনালী ধানের মুখ।

তবুও আশা ছাড়িনি,
জানি, আবার গাছ হবে নতুন করে।

হয়তো আরও কিছুদিন...
হয়তো মাঠের বদলে উঠোন,
যে ধান শুকোতে পারেনি বলে মেটেনি ক্ষুধা
খোলা করেই শুকোতে দেবো তখন।

অমলকান্তি চন্দের ছড়ার থলি

।। অভীককুমার দে।।

অমলকান্তি চন্দ থলি নিয়েই হাঁটেন
ছড়ার থলি
মুখ খোলা রাখেন সবসময়।

হয়তো তিনি বুঝতে পারেন--
ডানে ভুত
বামে ভুত
সামনে ভুত
পেছনে ভুত,
'ভুতের মুখে রাম নাম... '
ওদের তান্ডবে নিরাপত্তা নেই মানুষের,
শ্মশানমুখী মুখে বলছে--
'ভুত আমার পুত, পেতনি আমার ঝি... '

চোখের সামনেই জ্বলছে চিতা,
চিতার লাল চোখে মানবতার ছাই
অসুস্থ বাতাস 
জল ঢেলে দিলেই দূষিত নদী
অসহ্য যন্ত্রণা শহর থেকে গ্রামের পথে...

শুনেছি, চন্দবাবু খবরাখবর রাখেন,
অমেরুদণ্ডীদের মিছিলে নজর আছে তাঁর,
হ্যামিলনের বাঁশিটি খুঁজে পেলেই
থলিতে ঢুকিয়ে নেবেন ভুত।

বৃহস্পতিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

মিশ্র মননের কবি মনোমোহন মিশ্র ও তাঁর স্বপ্নের ‘উড়ান’-এর পাঠ প্রতিক্রিয়া


- - - - - - - - বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

সম্প্রতি শেষ শ্রাবনের বরাক ভ্রমণে আমার প্রাপ্তির ভাঁড়ার পূর্ণ হয়েছে কানায় কানায়। তারই অঙ্গ হিসেবে আজ বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরছি সেদিনের অন্যতম এক প্রাপ্তির বিবরণ

বছর পনেরো আগের কথা তখন অধুনা লুপ্তসময় প্রবাহপত্রিকার পাতায় প্রায়শঃই এটা ওটা লিখতাম লেখালেখির সূত্রে আরোও যেসব কবি লেখকের লিখার সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছিলাম তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন শ্রী মনোমোহন মিশ্র তিনি কোথায় থাকতেন বা তাঁর বয়স কত সেসব কিছুই জানতাম না কিন্তু তাঁর সাবলীল সব রচনা পড়ে তখনই আমি মুগ্ধ হতাম বলতে গেলেতাঁরে আমি চোখে দেখিনি, তাঁর অনেক গল্প শুনেছি’- ধরণের ব্যাপার আরকি সেই থেকে মনের মানসে তিনি ছিলেন লুকিয়ে হঠাৎ করে প্রায় মাস তিনেক আগে শিলচর অম্বিকাপট্টিতে থাকা আমার অকৃত্রিম বন্ধু পীযুষ ফোনে নিয়মিত কথাবার্তার মধ্যে বললো – ‘বন্ধু, তুই তো লেখালেখি করিস, তা আমারই ফ্ল্যাটে আমার মুখোমুখি ঘরেও একজন লেখক আছেন

জিজ্ঞেস করলাম- কী নাম ?

বললো- মনোমোহন মিশ্র

আমি তো আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠেছি নমস্য লেখকের পুনরাবিষ্কারে আমি প্রচণ্ড উত্তেজিত মুখে শুধুইউরেকা !!” বলাটাই যা বাকি ছিল

বললাম- আরে, বলছিস কী ? আমি শিলচর আসলে অবশ্যই তাঁর সাথে দেখা করব বন্ধু তো দারুণ খুশি কারণ এই অছিলায় একপ্রস্থ আড্ডাও হয়ে যাবে ওর ঘরে

সেই থেকে প্রতীক্ষা - যার অন্ত হলো এবারের বরাক যাত্রায় এক ঝলমলে সকালে প্রথম দর্শনেই একেবারে মুগ্ধ আমি আমার কল্পনার চেয়ে অনেক বেশি সপ্রতিভ, সতেজ, কর্মচঞ্চল এবং কম বয়সের এই  অগ্রজসম মানুষটির সাথে মুহূর্তেই জমে গেল আড্ডা পদবীর সাথে একেবারে মানানসই তাঁর সবকিছুতেই বৈচিত্র লেখালেখির তো সম্ভার আছেই, পাশাপাশি চিত্রকলা ও ফটোগ্রাফিরও শৌখিন চিত্রকল্পে সমগ্রগীতাঞ্জলী ঘরের দেয়ালে টাঙানো আমার থেকে প্রায় চৌদ্দ বছরের বড় হলেও যে কেউ দেখলে আমারই সমবয়সী বলে ভাবতে বাধ্য বয়সকে হার মানানোর এও এক রহস্য ধীরে ধীরে গল্প উঠলো জমে এক ভূমি, এক ভাষা তাই বাঁধনহীন দুজনেই এরই ফাঁকে উঠে গিয়ে ফিরে এলেন তিনখানা বই হাতে করে সবগুলো নিজের লিখা উপহারে আমাকে বাধিত করলেন চিরতরে

তিনটির মধ্যে যে বইটি আমার সবচাইতে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করল সেই বইটি আজ পড়ে শেষ করলাম। কবিতার বই ‘উড়ান’। প্রকাশিত হয়েছে জুলাই ২০১১ তে। অর্থাৎ প্রকাশের আট বছর পর হাতে এলো আমার। সেখানে বসে একনজর চোখ বুলিয়েই জানতে চেয়েছিলাম যে বইটির কোনও পর্যালোচনা বেরিয়েছে কি না। জানালেন ইতিমধ্যেই তা হয়েছে। তাই আর এ বিষয়ে সচেষ্ট হলাম না। কিন্তু অসাধারণ এই কাব্যগ্রন্থটির পাঠ প্রতিক্রিয়া সবার সাথে ভাগ করে নেওয়ার লোভ সংবরণ করতে না পেরেই আজ এই রচনার অবতারণা।

প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে শেষ পৃষ্ঠা অবধি ‘উড়ান’ এক অনবদ্য সংকলন। সচরাচর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ থেকে একেবারেই ভিন্ন আঙ্গিকে সজ্জিত বৈচিত্রময় এক কাব্য সংকলন। প্রচ্ছদ ও অক্ষর বিন্যাস – নিখিল শব্দকর। প্রচ্ছদ ওল্টাতেই লেখকের অতি সংক্ষিপ্ত পরিচয়। সেখানেও চমক। শ্রী মিশ্র প্রথম জীবনে তবলা বাদক ছিলেন জেনে নিজের সাথে সামঞ্জস্যটা যেন বেড়ে গেল আরোও কয়েক ধাপ। ‘উড়ান’ এর সম্পাদনা জয়দীপ বিশ্বাস, গ্রন্থনা কবি নিজে। প্রকাশক পুণ্যপ্রিয় চৌধুরী। কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন ‘বরাক উপত্যকা তথা বাংলার বিশিষ্ট কবি শক্তিপ্রদ ব্রহ্মচারীর স্মৃতির উদ্দেশে’। মুখবন্ধ লিখেছেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক তপোধীর ভট্টাচার্য।

সম্পূর্ণ গ্রন্থটিকে কবি সুস্পষ্ট তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছেন। প্রথম ভাগটিতে আছে ব্যতিক্রমী ধারায় লিখিত ঊনিশটি কবিতা। অলঙ্কার হিসেবে প্রতিটি কবিতার প্রতিটি লাইনের শুরু, মধ্যভাগ অথবা শেষের অক্ষরগুলোকে উপর নিচে সাজিয়ে এক একটি অর্থবহ শব্দবন্ধ বা বাক্যের সংযোজন ঘটিয়ে এক অসাধারণ মুন্সিয়ানার পরিচয় রেখেছেন কবি। কবিতার এই ধারাটিকে ইংরেজিতে Acrostic বললেও বাংলায় এর যথাযথ প্রতিশব্দ নেই। কবি তাই খুব যথার্থ ভাবেই এই পর্বের কবিতাগুলোকে বলেছেন মিশ্র ভাবের কবিতা বোধ করি এও তাঁর পদবীর সাথে মানানসই প্রতিটি কবিতা পাঠে বিস্ময় জাগে মনে, কী অসাধারণ অধ্যবসায়ে লিখিত হয়েছে একের পর এক কবিতা এর মধ্যেআজকের দ্রৌপদীশিরোনামে যে কবিতাটি লিখেছেন তাঁর মোট লাইন সংখ্যা ৬৯ উপর নিচে লিপিবদ্ধ আছে – “যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায়চ দুষ্কৃতাম ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে এত দীর্ঘ একটি কবিতা অক্ষর বিন্যাস বজায় রেখে গেঁথে ফেলা হয়তো তাঁরই পক্ষে সম্ভব ছন্দের এই অলঙ্কার বজায় রাখতে গিয়ে মুদ্রকেরও মুন্সিয়ানার প্রয়োজন আছে বৈকি আর এখানে যথার্থ ভাবেই এই কাজটি করেছে শিলচর সানগ্রাফিক্স

পরের পর্ব তাঁর নিজের লিখা বারোটি কবিতার সম্ভার প্রতিটি কবিতা পাঠককে গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত করে ফেলে অনায়াসে প্রথম কবিতা – ‘শক্তিদা, তুমি বলেছ বলেইপ্রয়াত কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য সব কটি কবিতা নিদারুণ অর্থবহ একেকটি কবিতার কিছু কিছু লাইন পড়ে চমকে উঠতে হয় যেমন

ভাগ্য কবিতা লেখে
তুমি আমি উপলক্ষ মাত্র
কিংবা
আকাশ থেকে টপকে পড়ে
কবিতার প্রথম ছত্র (কবিতাআকাশকে ডাকব)

অথবা –

একদিন নির্বল বাহু তুলে আকাশের দিকে
বিধাতাকে বলবশক্তি দাও
বিধাতা বিরূপ হলে
তুমি পাশে এসে দাঁড়িও
তোমার হাতখানি বাড়িয়ো
তোমার মিনিট খানেক সময় আমাদের দিও (কবিতামিনিট খানেক সময়)

কিংবা

বিজয়ের উৎসব সাজাতে গেলে
পরাজিত সৈনিকের শবগুলো চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়,
-----------
------------
আনন্দের উন্মাদ বাসনায়
ছায়া নামে বিষাদের (কবিতা বিজয়ের ভার)

তৃতীয় তথা শেষভাগে রয়েছে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী তথা বিশিষ্ট কবি অটল বিহারী বাজপেয়ীর লিখা ২০টি কবিতার বঙ্গানুবাদ। কবিতার ভাব যথাযথ বজায় রেখে, ভাব বিন্যাস বজায় রেখে অনুবাদ করা প্রকৃত অর্থেই এক দুরূহ কাজ। কিন্তু এখানেও শ্রী মিশ্র পরিচয় দিয়েছেন অসাধারণ নৈপুণ্যের। অনুবাদের যথার্থতা পরখ করেই তবে মিলেছে অনুবাদের অনুমতি। নিপুণ অনুবাদকের অনুবাদে এতটুকুও বিঘ্নিত হয়নি কবিতার পঠনধারা। এখানেই তাঁর প্রয়াসের সার্থকতা।

গ্রন্থের শেষ প্রচ্ছদে ন্যাশনেল বুক ট্রাস্টের পূর্বতন অধিকর্তা নির্মলকান্তি ভট্টাচার্যের এক সংক্ষিপ্ত অথচ অনিন্দ্য আলোচনা কবি ও কাব্যগ্রন্থের যথার্থ সার্থকতা ফুটিয়ে তুলেছে। সম্পূর্ণ গ্রন্থটিতে সিন্ধুতে বিন্দুরই মতো দু’একটি ছাপার ভুল এবং হয়তো বা শব্দের গভীরতা বজায় রাখার তাগিদে দু’একটি হিন্দি শব্দের প্রয়োগের বাইরে কোথাও ন্যূনতম ছন্দপতনের কোনও সুযোগ নেই বললেই চলে।  

সব মিলিয়ে একটি চমৎকার কাব্যগ্রন্থের পাঠে বহুদিন পর এক নিরেট সুখানুভূতির আস্বাদন হলো আমার। একেবারে ষোলোআনা সফল আমার সেদিনের সাহিত্য আড্ডা।
উত্তরোত্তর সাফল্য ও সুস্বাস্থ্যময় দীর্ঘজীবন কামনা করি এই মিশ্র মননের সুকবি, সুসাহিত্যিক শ্রী মনোমোহন মিশ্রের।

                                                       ------------------------