“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
অরূপা মহাজন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অরূপা মহাজন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ৩১ আগস্ট, ২০১২

সাম্রাজ্যবাদী সংঘাত, ‘লুক ইস্ট পলিসি’ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অস্থিরতা

                                                               ।। অরূপা মহাজন।। 
                                                       (রচনাকাল ঃ আগস্ট, ২০০৮)

             [এই প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় শিলচার থেকে প্রকাশিত অরুণোদয় পত্রিকার ২০০৮-এর আগস্ট সংখ্যায় এবং পরবর্তীতে কলকাতা ও ত্রিপুরা থেকে প্রকাশিত দুটি পত্রিকায় এই লেখাটি পুনর্মুদ্রিত হয়। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় এটা এখানে তুলে দিলাম। এই প্রবন্ধটিতে   সাম্রাজ্যবাদী রণকৌশলের ২০০৮ সালে প্রাপ্ত তথ্যের অলোকে রোহিঙ্গিয়া, অন্যান্য জনজাতি সহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ভবিষ্যদবাণী করা হয়েছে। কিন্তু নতুন তথ্যের আলোকে এই লেখাটির পুনরায় যাচাই করার যেমনি প্রয়োজন রয়েছে, ঠিক তেমনি অভ্যন্তরিণ আধিপত্যবাদী রাজনীতির কারণ ছাড়া অন্য আরেকটি দৃষ্টিকোণ থেকেও বর্তমান পরিস্থিতির বিচার বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন রয়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতটি গড়ে উঠেছে ২০০৭-০৮ সালের আমেরিকান সাব-প্রাইম সংকটের পরবর্তীতে। পুঁজিবাদের যে কাঠামোগত সংকটের কথা অর্থনীতিবিদেরা বলছেন সেই সংকটের মধ্যেও ফিনান্সিয়্যাল মার্কেটে বিনিয়োগের মাধ্যমে যে মুনাফা ও কেন্দ্রীভবন ঘটে চলেছিল তাতে বড়রকমের ধাক্কা আসে সাব-প্রাইম সংকটের মাধ্যমে। কিন্তু রাষ্ট্রের উপর ওলিগোপলিস্টিক (মনোপলিদের গ্রুপ) নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পাবলিক-প্রাইভেট ও বাজার সব স্পেসকে কর্পোরেট প্রয়োজনানুসারে পরিচালিত করে এলিট ও উচ্চ-মধ্যবিত্তদের ক্রয়ক্ষমতার দ্রুত বৃদ্ধি ঘটিয়ে মুনাফাবৃদ্ধি ও পুঁজির কেন্দ্রীভবন প্রক্রিয়াটিকে বজায় রেখেছে। অন্যদিকে আমজনতার ক্রয়ক্ষমতা ও তার সাথে সম্পর্ক রেখে আমজনতার প্রয়োজনীয় সামগ্রীর উৎপাদন কমে চলেছে দ্রুত। সুতরাং আম জনতার বিপর্যয়ের মুখে রাজনৈতিক দলগুলির কর্পোরেট প্রভুদের মুনাফা বৃদ্ধির স্বার্থে নীতি নির্ধারণ করা ছাড়া জনগণকে কাছে টানার একমাত্র সম্বল হয়ে পড়ছে কর্পোরেট প্রভুদের দাক্ষিণ্যে পাওয়া অর্থবল। কর্পোরেট মুনাফার স্বার্থে কর্পোরেট সামাজিক দায়িত্বের নামে যদি কিছু বিনিয়োগ হয়, তখন তারা আহ্লাদে আটখানা হয়ে জনগণের কাছে প্রচার করতে পারেন। অন্যথায় এই অর্থবলের সাথে সংকীর্ণ জাতি-সম্প্রদায়গত খেলায় মদত যোগানো ছাড়া তারা আর কোন পথ খুঁজে পান না এবং এভাবেই গণ-চাহিদার চাপকে তারা মোকাবিলা করেন। কারণ বিকল্প রাস্তাটি হচ্ছে উন্নয়ণের গণমুখী মডেল, তৃণমূল গণতন্ত্র ও পিরামিডাকৃতি ক্ষমতা-কাঠামোকে উল্টে দেওয়ার রাজনীতি এবং এই পথ অবলম্বন করা মানে নয়া-উদারবাদকে বিরোধিতা করা]

              কিছুদিন আগে অরুণাচল প্রদেশে নির্মাণশিল্পে কর্মরত দিনমজুরদের উপর হামলা হয়। এই দিনমজুরেরা যে বাংলাদেশি মুসলমান নয় –- নিম্ন অসমের বাসিন্দা, সেটা প্রমাণিতও হয়। এবারও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণের সূত্রপাত ঘটে উজান অসমে দিনমজুরদের হেনস্তার মধ্য দিয়ে। এই আক্রান্তরাও মূলত নিম্ন অসমের বাসিন্দা ও সড়ক নির্মাণের কাজে নিযুক্ত ঠিকা শ্রমিক। এই আক্রমণের মাধ্যমে অনুপ্রবেশকারী ইস্যুকে গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট হয় আসু ও তার নতুন তৈরি মঞ্চ ‘নেরসু’। বাংলাভাষী মুসলমানরা তাদের মূল র্টাগেট হলেও বাঙালি হিন্দু, নেপালি, বিহারিরাও স্থানে স্থানে তাদের অক্রমণের লক্ষ্য হয়।

             অসমে ‘বিদেশি খেদার’ নামে সংখ্যালঘুদের আক্রমণের এক ধারাবাহিক ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে মুসলমানদের গণহারে কোতল করারও ইতিহাস। এধরনের বড়মাপের মুসলিম গণহত্যার সর্বশেষ সংযোজন ১৯৮৩’র নেলির দাঙ্গা। সত্তরের দশকে অসমে যে ব্যাপক কৃষক আন্দোলন ও তার উপর ভিত্তি করে সত্তরের শেষের দিকে যে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল তাকে ধ্বংস করে দিতেই শুরু হয় আসুর ‘বিদেশি খেদা’ আন্দোলন। ১৯৮৩-তে নির্বাচন ঘোষণা করে আসু আন্দোলনের প্রতি যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া হয়, নেলি ছিল সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উগ্রজাতিয়তাবাদী প্রতিহিংসার বর্বরতম রূপ। নির্বাচনের পর স্বাভাবিকভাবেই স্তিমিত হয়ে পড়া উগ্রজাতিয়তাবাদী শক্তিরা অসম চুক্তির মাধ্যমে চাঙ্গা হয়ে উঠে। কিন্তু দীর্ঘ অগপ শাসন ও আলফা সন্ত্রাস অসমের জনজাতীয়দের মূল অসমিয়া সমাজ থেকে দূরে ঠেলে দেয়। আক্রান্ত হওয়ার ভীতিকে উপেক্ষা করে ন-অসমীয়ারা নিজেদের বাংলাভাষী পরিচিতেতে ফিরে যায়। উগ্রজাতিয়তাবাদী কার্যকলাপ অসমীয়া জাতির যে ক্ষতিসাধন করে তাতে উগ্রজাতিয়তাবাদীরা দ্রুত জনভিত্তি হারাতে শুরু করে। তাদের স্বাভাবিক মৃত্যু অনিবার্য হয়ে উঠা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে উঠার যে সম্ভাবনা দেখা দেয় তাকে প্রতিহত করতে নেওয়া হয় নতুন কৌশল। শুরু হয় জনজাতীয়দের ন্যায্য ক্ষোভকে সংকীর্ণতাবাদে রূপান্তরিত করে সন্ত্রাসের বাতাবরণ সৃষ্টি করার মাধ্যমে। নিম্ন অসমে বড়ো সন্ত্রাসীদের জাতি-নির্মূলীকরণের (Ethnic Cleansing) অভিযান স্বীকৃতি পায় বিটিসি গঠনের মধ্য দিয়ে। এবার জনগোষ্ঠীগত হিংসা ও ঘৃণাকে গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে অসমিয়া উগ্রজাতীয়তাবাদী ও জনজাতীয় সংকীর্ণতাবাদ এক মঞ্চে সামিল হয়েছে।

                উজান অসমে আসুর সংখ্যালঘু বিরোধী অভিযানে কংগ্রেস সরকার প্রথম দিকে মদত দেয়। কংগ্রেসিরা নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘সাপ হয়ে কাটা ও ওঝা হয়ে ঝাড়ার’ – তাদের পুরোনো রণকৌশলটি প্রয়োগ করতে সচেষ্ট হয়, যাতে সংখ্যালঘুদের ত্রাতা হিসেবে তাদের হারানো মুসলিম ভোট ব্যাঙ্ক ফিরে পাওয়া যায়। বিশ্বায়নের নীতির ফলে দুরবস্থার দ্রুত বৃদ্ধিজনিত ক্ষোভ থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে নিতেও অনুপ্রবেশকারী ইস্যুটিকে চাঙ্গা করাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু আসু-নেরসু ও সংঘ পরিবারের এবারের সংখ্যালঘু বিরোধী এই চালে রয়েছে বিশ্ব আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সাম্রাজ্যবাদী সংঘাতের ছায়াও।

                রাশিয়ার জর্জিয়া আক্রমণ প্রমাণ করে দিয়েছে যে বিশ্ব আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদী রণনীতি রাশিয়ান অক্ষশক্তির চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। জর্জিয়াকে আমেরিকার সামরিক সাহায্য, পোলাণ্ডে আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন, কাসপিয়ান অঞ্চল ও কৃষ্ণ সাগরে ক্রমবর্ধমান সামরিক গতিবিধি, কিউবাতে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন ইত্যাদি ঘটনার মাধ্যমে রাশিয়া-আমেরিকা সংঘাতের পারদ তড়তড় করে চড়ছিল। জর্জিয়াকে ন্যাটোভুক্তির আমেরিকান প্রচেষ্টা ও ৭-৮ আগস্ট আমেরিকার মদতে জর্জিয়ার সামরিক অভিযান ও দক্ষিণ ওসেটিয়ায় প্রায় ২০০০ সামরিক নাগরিককে হত্যার পর রাশিয়ার সেনাবাহিনী জর্জিয়ায় প্রবেশ করে। এই হত্যালীলার ভিডিও রেকর্ডিং এবং রাশিয়ান আক্রমণে সন্ত্রস্ত ও পলায়নরত জর্জিয়ান বাহিনীর মধ্য থেকে আমেরিকান ইংরেজিতে কথাবার্তার রেকর্ডিংও রয়েছে রাশিয়ার কাছে। ১৯ আগস্ট জর্জিয়া প্রশ্নে ন্যাটোর সভায় আমেরিকান আবেদনকে অগ্রাহ্য করে বেশীরভাগ ইউরোপিয়ান দেশই রাশিয়াকে সমর্থন করেছে। দক্ষিণ ওসেটিয়া ও অবখাজিয়ার স্বাধীনতার স্বীকৃতি প্রদানের পর রাশিয়ার মৃদু নিন্দা শোনা গেলেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধের আমেরিকান প্রস্তাবে বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশগুলি সম্মতি দেয়নি। কারণ, একদিকে রাশিয়ার তেল সরবরাহের উপর ইউরোপীয় দেশগুলির নির্ভরশীলতা এবং অন্যদিকে আমেরিকান বিশ্ব আধিপত্যকে খর্ব করার সাথে তাদের স্বার্থও জড়িয়ে থাকা। রাশিয়া ইতিমধ্যে ন্যাটোর সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা লিখিতভাবে জানিয়ে দিয়েছে এবং সফলভাবে নতুন প্রযুক্তির ‘টপল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র’ পরীক্ষণ করে আমেরিকার দিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। পরিস্থিতি এমনই যে আমেরিকার মিত্র হিসাবে পরিচিত তুরস্কও কৃষ্ণসাগরে সামরিক গতিবিধির জন্য তাদের বন্দর ব্যবহার করার আমেরিকান প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। চীন ও রাশিয়া সহ মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ‘সাংঘাই কোঅপারেশন অর্গেনাইজেশন’ রাশিয়াকে সমর্থন করেছে, যদিও নিজেদের অভ্যন্তরিণ কারণে স্বাধীনতার স্বীকৃতির প্রশ্নে কোন মন্তব্য করা থেকে চীন বিরত থেকেছে। এস.সি.ও’র সভায় পর্যবেক্ষক সদস্য হিসেবে ভারতীয় প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন। ‘নিউক ডিল’-এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারত এব্যাপারে কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবে না। তবে একথা খেয়াল রাখা জরুরি যে শীতল যুদ্ধের পরিস্থিতিতে ‘সোভিয়েত রাশিয়ার’ সাথে যে সম্পর্ক ছিল, প্রতিরক্ষা খাতে রাশিয়ার সাথে সে সম্পর্ক এখনও অটুট রয়েছে এবং সম্প্রতি ব্রাহ্ম এরোস্পেস যৌথ উদ্যোগের জন্য ভারত রাশিয়ার কাছে ২ বিলিয়্ন ডলার মূল্যের ক্ষেপণাস্ত্রের অর্ডারও দিয়েছে। জর্জিয়া আক্রমণকে কেন্দ্র করে সাম্রাজ্যবাদী সংঘাতের যে ছবি সামনে চলে এসেছে এ ধরণের সংঘাত আগামীদিনে দ্রুত বৃদ্ধি ঘটতে থাকবে। রাশিয়ান অক্ষশক্তির প্রধান এশিয়ান অংশীদার হচ্ছে চীন। সাম্রাজ্যবাদী সংঘাতের এপিসেন্টার হচ্ছে মধ্য এশিয়া। সে হিসাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং তাই সাম্রাজ্যবাদী সংঘাতের শিবির বিভাজনের ক্ষেত্রে ভারতবর্ষের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত সরকারের ‘পূর্বে তাকাও নীতি’ এবং চীন-ভারত ও আশিয়ান দেশগুলির বাণিজ্যিক-আর্থিক নৈকট্য স্থাপনের ক্ষেত্রে মায়ান্মার হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল এবং উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ করিডর। মায়ান্মার-বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস ভাণ্ডারের দিকেও রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শ্যেনদৃষ্টি। মায়ান্মারের আর্থিক-সামরিক ক্ষেত্রে ও জুন্টা সরকারের উপর রয়েছে চীনের প্রভাব। চীন পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয় দেশগুলির একটি আঞ্চলিক গোষ্ঠী তৈরি করতে এবং আতে জাপানকেও সামিল করে নিতে আগ্রহী। জাপানের সাথে আমেরিকার ক্রমবর্ধমান দূরত্ব এবং এই আঞ্চলিক গোষ্ঠীর সাথে আমেরিকার ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য সংঘাত, মালয়েশিয়া-মায়ান্মার সহ আশিয়ান দেশগুলির সাথে আমেরিকার ক্রমবর্ধমান দূরত্ব এবং এই আঞ্চলিক গোষ্ঠীর সাথে জড়িত বাণিজ্যিক স্বার্থ জাপানকেও চীনের পরিকল্পনার দিকে আকৃষ্ট করছে। বাণিজ্যিক স্বার্থের সম্পর্কগুলি একমুখীন নয় এবং তাতে নানাধরনের জটিলতা রয়েছে, তথাপি আমেরিকা যে ক্রমশই এশিয়ার এই অঞ্চলে কোণঠাসা হচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই এবং চীন-ভারত সম্পর্কের উন্নতি এবং চীন-ভারত সহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় সমুদ্র পথের বিকল্প সড়ক ও রেল যোগাযোগ গড়ে উঠা এবং মায়ান্মার-ভারত ও মায়ান্মার-চীন গ্যাস পাইপলাইন গড়ে ওঠার সম্ভাবনা আমেরিকার শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

                 চীন-ভারত-আশিয়ান বা পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক পরিকাঠামো গড়ার ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও বাস্তব অগ্রগতি বিচার করে দেখা যাক। সম্প্রতি চীন-ভারত যে প্রাচীন বাণিজ্য পথ রয়েছে সেগুলি চালু করা হচ্ছে। সীমান্ত বাণিজ্যের জন্য সিকিমের গ্যাংটক থেকে ৫৪ কিঃমিঃ দূরে নাথুলা-পাস খুলে দেওয়া হয়েছে। তিব্বতের ইয়াতুং শহর নাথুলা-পাস থেকে মাত্র ৫২ কিঃ মিঃ দূরে। ব্রিটিশ আমলে চীনের কিং-রাজত্বের সময়ে তিব্বত ও ভূটানের বাণিজ্য পথ হয়ে উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ারে বক্সা দিয়ে বাংলাদেশের রংপুর, গুয়াহাটির সন্নিকটস্থ হাজো থেকে তিব্বত হয়ে চীনের সিচ্যুয়ান প্রদেশের রাজধানী চেংগদুরের মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ ছিল। গুয়াহাটির কামাখ্যার সন্নিকটে ব্রহ্মপুত্র নদ বন্দরটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ছিল যা পুনরায় নির্মাণ করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বাণিজ্য পথ নির্মাণের কাজ দ্রুত গতিতে চলছে সেটি বিস্তৃত রয়েছে চীনের ঝেজিং, হিউয়ান, গুরহও এবং ইউনান থেকে মায়ান্মার পর্যন্ত। ইউনানের রাজধানী কানমিং থেকে মায়ান্মার সীমান্ত অঞ্চল মিইতিকিইনা পর্যন্ত রেলপথের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে এবং ২০০৫-এর এপ্রিলে মায়ান্মার সীমান্ত খুলে দিয়ে ইউনান-ভিয়েতনাম রেলপথ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। ইউনান-অরুণাচল প্রদেশ-অসম-মণিপুর-মায়ান্মার সড়ক পথ নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। ইউনান থেকে মায়ান্মারের মিইতিকিইনা হয়ে অসমের লিডো এবং লিডো থেকে মণিপুর হয়ে মায়ান্মার হয়ে থাইল্যাণ্ড পর্যন্ত মায়ান্মার-ভারত-থাইল্যাণ্ড ত্রিস্তরীয় মহাসড়ক বা এশিয়ান হাইওয়ে এবং আন্তঃএশিয়ান রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ব্যাপারেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মণিপুর মায়ান্মার সড়ক নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ হতে চলেছে। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেল-সড়ক যোগাযোগ গড়ে ওঠার সাথে সাথে দক্ষিণ চীন সমুদ্রে ও মায়ান্মারের মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরে চীনের উপস্থিতির পরিকল্পনাও আমেরিকা ভাল চোখে দেখছে না। ভারতও মিজোরামের কালাদান নদীর মুখে মায়ান্মারের পুরোনো ব্রিটিশ বন্দরের আধুনিকীকরণের মাধ্যমে নদীপথে বাণিজ্যেরও পরিকল্পনা করছে। আমেরিকা জাপান ও তাইওয়ানের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করলেও, জাপানের সাথে বাণিজ্যিক স্বার্থের সংঘাত তীব্র হচ্ছে এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আমেরিকার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে চীন-ভারত ও আশিয়ান গোষ্ঠীর সাথে জাপানকে সামিল করার চীনের পরিকল্পনার দিকেই জাপান ঝুঁকে পড়বে। সুতরাং এই পরিকল্পনাকে ভেস্তে দিতে ভারতই হবে আমেরিকার কাছে দাবার ঘুঁটি। সেক্ষেত্রে উত্তর-পূর্বাঞ্চলও একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। উত্তর-পূর্বাঞ্চল উন্নয়নের (DoNER) কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মন্তব্য করেছেন – “উত্তর-পূর্বাঞ্চল এখন আর স্পর্শকাতর অঞ্চল নয়, এই অঞ্চল শুধুমাত্র ভারতবর্ষের জন্য নয়, প্রতিবেশী রাষ্ট্র চীন, বাংলাদেশ, ভূটান মায়ানমারের জন্য একটি রণনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল”। বাণিজ্য মন্ত্রী কমল নাথ মন্তব্য করেন যে চীন-ভারতের সাথে আশিয়ানই এশিয়ার ভবিষ্যত। মায়ান্মারের উপর রয়েছে আমেরিকার অবরোধ (Sanction )। মায়ান্মার সরকারের বিরুদ্ধে ভারতকে ব্যবহার করতে আমেরিকা চাপ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু ভারত সরকার মায়ান্মারে বিনিয়োগ করতে এবং সে দেশের গ্যাস সরবরাহ পেতে আগ্রহী। মায়ান্মারের উপর রয়েছে চীনের প্রভাব। সেজন্য ভারত আমেরিকার প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। মায়ান্মারের ভূগর্ভস্থ গ্যাসের ড্রিলিং-এর কাজের ৩০ শতাংশে ভারতের অংশীদারীত্ব রয়েছে এবং ভারতের ইঞ্জিনিয়ার কারিগররা ড্রিলিং-এর কাজের সহায়তা করছেন। ওনজিসি ও গ্যাস অথরিটি অব ইণ্ডিয়া মায়ান্মারের বৃহত্তর গ্যাস ফিল্ড ‘শিউফিল্ড’ ডেভেলাপমেন্টের কাজে যুক্ত রয়েছে। অপরদিকে চীনের তেল কোম্পানীর সাথে বিভিন্ন দেশে যৌথ উদ্যোগ ইস্পাত সহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রসারিত হচ্ছে। চীন-ভারত বাণিজ্যের বৃদ্ধি ঘটছে এবং এক্ষেত্রে ভারতের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। আশিয়ানের সাথে ভারতের বাণিজ্য ২০০৫-০৬ সাল থেকে ২০০৬-০৭ সালে আমদানীর ক্ষেত্রে ৬৬% ও রপ্তানীর ক্ষেত্রে ২০.৬৭% বৃদ্ধি ঘটেছে (Source : Director General of Commercial Intelligence and Statistics) আশিয়ানের সাথে চীনের বাণিজ্য বৃদ্ধির হার ৩০%। ভারতের বাণিজ্য চীনের সাথেই সবচাইতে বেশি। ভারতের সাথে সম্পর্কের উন্নতির জন্য সিকিমকে ভারতের অঙ্গ বলে চীন সরকারীভাবে ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে গ্যাস রিজার্ভকে কেন্দ্র করে আমেরিকান তৎপরতা এবং বাংলাদেশ সমুদ্রবন্দরে সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলার জন্য আমেরিকার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে ব্যাপক আমেরিকান সান্রাজ্যবাদ বিরোধী গণচেতনার উন্মেষ ঘটেছে। এই গণচেতনার ভয়েই বাংলাদেশের তদারকি সরকার এমনকী টাটাদের সাথেও চুক্তি করা থেকেও বিরত থাকে এবং সম্প্রতি টাটারা বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হয়। পার্শ্ববর্তী দেশ নেপালে নতুন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন সূর্যের উদয় হয়েছে। গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলির বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ বঞ্চনাজনিত ক্ষোভ। চীন-ভারত-মায়ান্মার সবকটি দেশই অভ্যন্তরিণ ক্ষেত্রে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক অধিকার মেনে নিতে অস্বীকার করে। ১৭৮৪-তে আরাকান অঞ্চল অধিগ্রহণের পর এবং পরবর্তীতে জাপানী ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের অধিগ্রহণ ও চক্রান্তের ফলে রহোঙ্গিয়া জনগোষ্ঠীর কোন অধিকার সাব্যস্ত হয়নি এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রামের কক্সবাজারে এই মুসলিম জনগোষ্ঠীর বহু লোক এখনও রিফিউজি এবং মায়ান্মারে তারা অনুপ্রবেশকারী সমস্যার শিকার। মায়ান্মার সরকার বিভিন্ন বিদ্রোহী জনগোষ্ঠীর সাথে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে পুরো দেশে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করলেও রোহিঙ্গিয়া সহ বেশ কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সাথে শান্তি চুক্তি এখনও হয়ে উঠেনি। মায়ান্মারের জুন্টা সরকারের কোনধরনের গণতান্ত্রিক রীতিনীতি না মানাই স্বাভাবিক, যদিও আশিয়ানভুক্ত দেশ হিসাবে তারা মানবাধিকার সংক্রান্ত ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে। বাংলাদেশের চাকমাদের প্রশ্ন নিয়েও রয়েছে জটিলতা এবং চাকমারা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিছু রাজ্যে বহিরাগত হিসাবে প্রায়শয়ই আক্রমণের শিকার। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মত চীনের ইউনান প্রদেশ বঞ্চিত ও অনুন্নত, তীব্বতীদের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি চীন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গী ফ্যাসিস্টসুলভ।

            এই পরিপ্রেক্ষিতে জনগোষ্টীগত বঞ্চনার বাস্তবতার উপর দাঁড়িয়ে উগ্রজাতিয়তাবাদী, জনজাতীয় সংকীর্ণতাবাদ ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ এবং থাইল্যাণ্ডের অস্ত্রব্যবসায়ী কুখ্যাত স্বর্ণ ত্রিভুজের (Golden Triangle) সাথে সম্পর্ককে ব্যবহার করে উত্তর-পূর্বাঞ্চল সহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করার পেছনে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ জড়িত থাকাই স্বাভাবিক। তিব্বতীদের সংগ্রামে যে আমেরিকানরা গণ্ডগোল পাকাতে চাইছে এটাও স্পষ্ট। এবারের অনুপ্রবেশ ইস্যু নিয়ে ঘটনা পরম্পরাও এদিকেই ইঙ্গিত করছে। আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে রাশিয়ান প্রতিনিধি দল অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর সাথে দেখা করে পরিকাঠামো ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বিনিময়ের ব্যাপার আলোচনা করে। বাংলাদেশ আমেরিকার চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে বলে একটা ধারণা তৈরি হচ্ছিল, এখন আবার উল্টো ইঙ্গিত আসতে শুরু করেছে। বিশ্ব বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার জন্য চীন-ভারতকেই দায়ী করছে ওয়াশিংটন এবং অন্যদিকে আশিয়ানের সাথে ভারত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং এ’বছরের মধ্যেই চীন ও জাপানের সাথেও আশিয়ানের চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। অন্যদিকে আমেরিকার শর্ত মেনে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করছে আশিয়ানভুক্ত মালয়েশিয়ার মত দেশও। সুতরাং চীন-ভারত ও আশিয়ান দেশগুলির বাণিজ্যিক উদ্যোগ ও আঞ্চলিক জোট গড়ার ক্ষেত্রে ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য এঅঞ্চলে অস্থিরতা ও নাশকতা সৃষ্টির পেছনে আমেরিকান মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদীরা তৎপর থাকবে। এবং তাই আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দাদের মুখ্য কর্তব্য। এই কর্তব্য পালন করতে হলে এক বৃহৎ গণতান্ত্রিক জোট গড়ে তুলতে হবে। একটি গনতান্ত্রিক কর্মসূচীর ভিত্তিতেই এই জোট গড়ে উঠতে পারে, যে কর্মসূচীতে থাকবে বিদেশি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের প্রশ্ন, প্রতিটি জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার – সমান মর্যাদার প্রশ্ন ও সম্প্রসারণবাদ, উগ্রজাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবাদের বিরোধিতা। গণআন্দোলন ও গণপ্রতিরোধই দেশীয় প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের টুঁটি চেপে ধরবে।  

রবিবার, ১২ আগস্ট, ২০১২

প্রযুক্তি-চর্চা, সমস্যা জর্জরিত বরাক উপত্যকা ও বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা


(বেশ কিছুদিন আগে 'দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গে' এই লেখকের একটি চিঠি বেরিয়েছিল – সেই চিঠির বিষয়বস্তুকে নিয়েই 'অরুণোদয়' কাগজের  জন্য এই পুনর্লিখন – অরূপা মহাজন।)
           ঙ্গল গ্রহে ইসরোর উপগ্রহ অভিযানের জন্য ভারত সরকারের কেবিনেট ৪৫০ কোটি টাকা মঞ্জুর করেছে। এই উপগ্রহটি নাকি লাল-গ্রহের বায়ুমণ্ডল যাচাই করবে। অর্থমূল্যের হিসেবে বিচার করলে এই অভিযানকে ভারতের মত দরিদ্র দেশের অর্থের অপচয় হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। কিন্তু এই অভিযানকে ফলাও করে প্রচার করার মধ্যে বিজ্ঞান ও কারিগরি বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্রে আমাদের দিশাহীন কিংবা একদেশদর্শী পরিকল্পনার প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই অভিযানকে কেন এতো গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে? তার দুটি মুখ্য কারণ রয়েছে। প্রথমত এতে আমাদের এলিট শ্রেণির এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষিত ও প্রভাবান্বিত মধ্যশ্রেণির সুপার-পাওয়ার হওয়ার সুপ্ত অলীক বাসনাকে আরেকটু উস্কে দেওয়া যায় – বিশ্ব এলিট ক্লাবের সাথে  গা-ঘেঁষাঘেষি করে তাদের ‘অল্টার-ইগোকে’ ফুলে-ফেঁপে উঠতে দেওয়া যায়। সুপার-পাওয়ার হওয়ার এই বহিরঙ্গের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত একটা অন্তরঙ্গও রয়েছে যা আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের এমনকি মানব সভ্যতার জন্য বিপদজনক। কী সেই বিপদ? বহিরঙ্গে সুপার-পাওয়ার হওয়ার প্রয়াস অন্তরঙ্গে সুপার হওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেই করতে হয় অর্থাৎ আমাদের এলিট শ্রেণি ও তাদের পোঁ-ধরারা যখন ইউরোপ-আমেরিকার সমকক্ষ সঙ্গী হওয়ার চেষ্টায় ব্রতী, তখন কোটি কোটি নিরন্ন দরিদ্র মানুষ যারা খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের জন্য সরকারী ব্যয় বৃদ্ধি করার ব্যাপারে উদগ্রীব হয়ে এলিট-শ্রেণির উপরে উঠার প্রক্রিয়ায় অন্তরায় হতে চায় – তখন এই নিরন্ন-হাঘরেদের পদদলিত করেই তাদের বাসনাকে কায়েম করা যায় এবং এরজন্যই উন্নত প্রযুক্তির দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষকে ভিটেমাটি ছাড়া করা হচ্ছে – তা সে নিউক্লিয়ার এনার্জির জন্যই হোক বা বিগড্যাম। প্রযুক্তির এই চর্চার সাথে সৃজনশীলতার বিশেষ কোন সম্পর্ক নেই –এটা একধরণের স্কিলের চর্চা। অথচ আমজনতার সমস্যা সমাধানের সাথে যদি প্রযুক্তি চর্চার বিষয়কে জুড়ে দেওয়া যেত তাহলে প্রযুক্তিচর্চার সাথে যুক্ত সবাই সৃজনশীল গবেষণার এক বিশাল কর্মযজ্ঞের সাথে সামিল হয়ে দেশ গঠনে ব্রতী হওয়ার সুযোগ পেত। এই দৃষ্টিভঙ্গীতে যাতে বৌদ্ধিক সমাজ প্রভাবিত না          হয় – সেটাই মঙ্গল-অভিযানকে ফলাও করে প্রচার করার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্নিহিত কারণ। অথচ আধুনিক ইউরোপ যে এই পথ পরিক্রমা করেই এসেছে সে ব্যাপারে আমাদের এলিটরা অবগত হলেও ন্যস্তস্বার্থে ও ওলিগোপলিস্টদের (একচেটিয়া কর্পোরেটদের গ্রুপ) সেবাদাসত্বের দাসখতে সই করে জ্ঞানচর্চার এক ভ্রান্ত পথের দিকে দেশ-জাতিকে পরিচালিত করছেন।  উন্নত প্রযুক্তির ঢোল বাজিয়ে কর্পোরেট প্রভুদের নির্দেশে ২০০৫ সালে বিদ্যুৎ ক্ষেত্র সংস্কারের আইন পাশ করা হল। দীর্ঘ সাত বছর পর উন্নত প্রযুক্তির দেশজোড়া নমুনা দেখল দেশবাসী। বিদ্যুত ঘাটতিজনিত যন্ত্রণার স্থানিক অনুভূতিকে দীর্ঘ তথাকথিত উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বিশাল পরিমাণ মৃত-পুঁজির সৃষ্টি করে এবং সাধারণ মানুষের উপর বিশাল বিদেশি ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে জাতীয় অনুভূতিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। বিশ্বায়িত প্রযুক্তির বাজারে অনুভূতির বিশ্বায়নের দিকে যাত্রা। বিশ্বায়নের এই যাত্রার বিপরীতে একটা স্থানিক যাত্রার হিসাব আমরা এবার করে দেখতে পারি। কারণ যখন প্রযুক্তি শিক্ষার নামে মঙ্গল গ্রহে যান পাঠাচ্ছে আমাদের সরকার, তখন বরাকের মানুষরা নিজের অঞ্চলের বাইরে বেরোতে নিজের প্রাণটাকেই অজানা ভিন-গ্রহে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
                 বিজ্ঞান ও কারিগরি বিদ্যার বিভিন্ন শাখায় আমাদের এঅঞ্চলে কৃতবিদ্যদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। কিন্তু কৃষি-শিল্প-নাগরিক সুযোগ সুবিধা-পরিবেশ ইত্যাদি সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার সমাধানকল্পে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ ও তার বাস্তবায়ন আমাদের খুব একটা চোখে পড়ে না। ভাষা-সংস্কৃতি-উৎপাদন পদ্ধতি-জলবায়ু ইত্যাদি সবদিক থেকে আমাদের মত বৈচিত্রময় দেশে যে কোন সমস্যার একটা স্থানিক মাত্রা থাকে। কিন্তু বাস্তব পৃষ্ঠভূমি থেকে সমস্যা সমাধানের বাস্তব কোন পদ্ধতি আবিষ্কারের কষ্টসাধ্য ও সৃজনশীল পথ পরিহার করে আমরা অনুকরণের মাধ্যমে দক্ষ বিশেষজ্ঞ তকমা পেতে বেশি আগ্রহী। জ্ঞানার্জনকে বাজারের চাহিদার দ্বারা পরিচালিত দক্ষতার (Skill) স্তরে নামিয়ে আনার পরও আমাদের সমাজ নামী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের অত্যন্ত সম্ভ্রমের সাথে দেখে, কারণ সমাজ ধরে নেয় যে এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের বিদ্যা-বুদ্ধি-জ্ঞান এতো বিশাল যে তার থেকে সমাজ উপকৃত হবে। কিন্তু বাস্তবে এই  দক্ষ লোকদের সংখ্যাবৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে আর্থ-সামাজিক সমস্যা ও সামাজিক অবনতির মাত্রা কেন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে? এর উত্তর আমাদের সার্বিক আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার সাথে সাথে সম্ভবত শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেও নিহিত রয়েছে। সম্প্রতি এক টিভি-চ্যানেলের বিতর্ক প্রোগ্রামে একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ চিকিৎসক মন্তব্য করেন যে আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি ক্রমাগত অনুভূমিক (Horizontal) থেকে উলম্ব (Vertical) হয়ে যাচ্ছে এবং ফলে সামগ্রিক জ্ঞানের মাধ্যমে সৃজনীক্ষমতা বিকাশের বদলে এটা একধরনের ট্রেনিং-এ রূপান্তরিত হচ্ছে – সবকিছুই এখন উন্নত  থেকে উন্নততর ওয়ার্কশপ যেখানে পুঁজির সেবা করার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ লোক তৈরি করা হচ্ছে এবং বিশ্লেষণী ক্ষমতা বিকাশের বদলে শিক্ষার মানে হয়ে যাচ্ছে পুনঃপুনঃ পাঠের মাধ্যমে একধরনের মুখস্ত বিদ্যা (Learning by rote)। এরমধ্যেই ব্যতিক্রমী কাজ যে হচ্ছে না তা নয় –  কিন্তু তা সাধারণত মিডিয়াকে, বাজারের নিয়মকে ও নীতি নির্ধারণকে প্রভাবিত করতে পারে না। এভাবে বেশিদিন চলতে পারে না – কারণ গোটা সমাজ গুটি গুটি পায়ে অতি সত্বর এক ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে পা বাড়াচ্ছে। যদি আমরা মনে করি যে সব বিজ্ঞানই শেষ বিচারে মানব সভ্যতার জন্যই, যে সভ্যতা আজ অস্তিত্ব সংকটের    সামনে দাঁড়িয়ে গেছে – তাহলে আমাদেরকে বিকল্প পথ অনুসন্ধান করতেই হবে।
               অত্যন্ত ছোট মাপের কাজের কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। সারা পৃথিবী জল সংকটে ভুগছে – জল নিয়ে প্রায় যুদ্ধ বাধার উপক্রম। দক্ষিN ভারতের কোন এক শহরের পুরসভা ছাদের জল সংগ্রহ করা বাধ্যতামূলক করে দিয়ে উপকৃত হয়েছে। চেরাপুঞ্জিতে যখন জল সংকট, তখন থর মরুভূমির এক বসতি অঞ্চল কোন ব্যয়বহুল পদ্ধতি অবলম্বন না করেই জল সমস্যার সমাধান করে নিয়েছে। আমাদের শিলচরের কোন বিশেষজ্ঞ ছাদের জল নিয়ে একটা হিসাব করতেই পারেন এবং তাতে যদি দেখা যায় আমাদের উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা আছে তাহলে পুরসভা ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ তা বাধ্যতামূলক করে দিতে পারে। জল নিষ্কাশনী সমস্যার  সমাধানেও কোন উদ্ভাবনী প্রয়াস নজরে পড়ে না – জল নিষ্কাশন ও জল সংরক্ষণকে সম্পৃক্ত করে ভাবলে কোন সমাধানসূত্র বেরতেও পারে। বরাকের কৃষির অবস্থা খুবই শোচনীয় এবং তারজন্য বিভিন্ন ফ্যাক্টর দায়ি। কিন্তু বরাকের কৃষকদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সার-সংকলিত করে কোন বিকল্প পন্থা-পদ্ধতি আবিষ্কারের চেষ্টা কেউ করছেন বলে শোনা যায়নি। মাত্র ১০০/১১০ মেগাওয়াট চাহিদা থাকা একটা অঞ্চলে বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের জন্য কোন এক বৃহৎ কর্মকাণ্ডের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। সামাজিকভাবে উপযোগী-স্থায়ী ও সস্তায় এই নগণ্য পরিমাণ  বিদ্যুৎ উৎপাদন ও যোগানের বন্দোবস্ত এখানেই করা যায় বলে আমাদের বিশ্বাস। এই বিশ্বাসকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে আমাদের এঅঞ্চলের কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলো কোন কাজ করছে কি? মনে হয় – না। অথচ প্রতিবারই সমস্যা সমাধানের নতুন নতুন মন্ত্র আমাদের শোনানো হয় – এবারের নতুন মন্ত্র হচ্ছে পালাটনা, ভাবখানা এরকম যে এই বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বরাকের চাহিদা মেটানোর জন্যই তৈরি হচ্ছে, আর বরাক ড্যাম – সে তো আরেক মিথ্যার বেসাতি।  সব পরিকল্পনা তৈরি করা হয় বিদেশি ঋণ ও প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে, তাতে সম্পদের বহির্গমণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি ঘটে প্রকৃত অর্থনীতি পঙ্গু হলেও নীতি নির্ধারকদের কোন মাথাব্যথা নেই। 
              এখন আমাদেরকে প্রতিনিয়ত ভূমিকম্পের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করা হচ্ছে। ব্যয়বহুল সব পদ্ধতির কথা আমাদেরকে শোনানো হচ্ছে যা আমাদের মত দেশে বাস্তবে গণহারে কার্যকরী হওয়া সম্ভব নয়। ভূমিকম্প রোধ ও ভূমিকম্প থেকে বাঁচানোর কার্যকরী কোন পদ্ধতি যদি বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে এই ব্যয়বহুল মচ্ছবের কী অর্থ? সব বিষয়ের উপর আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রচুর অর্থ ব্যয়ে ওয়ার্কশপ হয়। ভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত কার্যকরী ও সৃজনশীল আবিষ্কারের ট্যাকনিক্যাল তথ্য এই ওয়ার্কশপগুলোতে দেওয়া হয়। প্রথমত এই বিষয়গুলি ট্রেনিরা ট্রেনিং-লিটার্যা চার থেকে নিজেরাই আয়ত্ব করে নিতে পারে, দ্বিতীয়ত আমাদের বাস্তব পরিস্থিতিতে এগুলোর বিশেষ কোন বাস্তব কার্যকারিতা নেই। সুতরাং এই ওয়ার্কশপগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বোঝাগুলো মাথায় বয়ে নিয়ে বেড়ানো কি অর্থহীন হয়ে পড়ে না?

শুক্রবার, ৬ জুলাই, ২০১২

শান্তির বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে


(অরূপা মহাজনঃঅরুণোদয়ের জন্য)

শান্তির আদর্শ

           “শান্তির দ্বীপ” কথাটি বহুচর্চিত। এই রাজনৈতিক উপমাটি চালু করেছিলেন ভারতীয় শাসকশ্রেণির দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী। এরমধ্যে বরাক উপত্যকার সাংস্কৃতিক গরিমা খুঁজে পান অনেকেই। শান্তির এই পরিমণ্ডলকে বরাকের গৌরব হিসেবে দেখাতে পিছিয়ে থাকেন না বামপন্থী বলে পরিচিত একাংশ বুদ্ধিজীবীরাও। এই শান্তি আসলে কীসের ইঙ্গিত বহন করে তা আমরা তলিয়ে দেখতে চাই না। আমরা কায়মনোবাক্যে কামনা করি এই শান্তি সম্প্রীতি যেন অটুট থাকে আবহমান কাল ধরে। শাসক শ্রেণির প্রতিভূর ছুঁড়ে দেওয়া এই উপমাটি কী এমনই নিরীহ যে নিরীহ ছা-পোষা সাধারণ বরাকবাসীকে একেই আদর্শ হিসেবে মেনে নিতে হবে?

মতাদর্শগত কাঠামো

           আমাদের উপনিবেশিক অতীত আমাদের সভ্য হয়ে ওঠার বাসনাকে চাগিয়ে দিয়ে সভ্য করে তোলার দায়িত্বে নিয়োজিত উপনিবেশিক প্রভুদের গ্রহণযোগ্যতার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো গড়ে তুলে। এই অধিপত্যবাদী কাঠামোই পুরুষত্বের বিপরীতে গুণহীন ক্লীবত্বের মতাদর্শ গড়ে তুলে নারীত্বকে পুরুষত্বের অধীনে সামিল করে নেয়। অর্থাৎ এমন একটি মতাদর্শগত কাঠামো যেখানে আধিপত্যের দৃষ্টিকোণ থেকেই কোন গুণকে বিচার করার বাতাবরণ সৃষ্টি হয় – বিপরীতটি হয় হারিয়ে যায় নতুবা বিপদজনক হিসেবে বিবেচিত হয়। শাসক শ্রেনির জারি করা “শান্তির দ্বীপ” উপমাটি এরকমই এক আধিপত্যবাদী মতাদর্শ থেকে উদ্ভূত যেখানে শোষিতের অশান্ত হয়ে ওঠার ধারণাকে নাকচ করে তাদেরকেও সহাবস্থানের এই অমোঘ শান্তির কাঠামোয় সামিল করে নেয়। বৌদ্ধিক চর্চার দৌড় এই কাঠামোর গণ্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় শোষিতের দৃষ্টিকোণ থেকে শান্তির প্রশ্নটিকে দেখতে চায় না বা দেখার সাহস করে নাসাহস করে না এই কারণে যে এই মতাদর্শগত কাঠামোটি এই বোদ্ধাদেরও সামাজিক প্রতিষ্ঠা দেয়

শান্তির মাহাত্ম

           তাহলে এই “শান্তির দ্বীপ” কথাটির মাহাত্মটা কী?  এর সোজাসাপটা মাহাত্ম এই যে বরাক উপত্যকায় শাসক শ্রেণির দল এবং দিল্লি-দিসপুরের হুকুম তামিল করা রাজনৈতিক নেতৃত্বরা কখনওই কিন্তু তেমন কোন বাধার সম্মুখীন হয়নি, তাদের অপ্রতিরোধ্য স্রোতে সামান্য প্রতিস্রোতের হাওয়া লেগেছিল জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে ‘জরুরি অবস্থা বিরোধী’ আন্দোলনের পরবর্তী ১৯৭৭-এর নির্বাচনে। কেন এই অপ্রতিরোধ্য গতি তা বিচার করার জন্য বরাকের বুদ্ধিজীবীদের যুক্তির কাঠামো কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় তা দেখে নিতে হবে। সাম্প্রতিক ভারতে যে দু’টি বিষয়ের উপর সবচাইতে বেশি চর্চা হয়েছে ও হচ্ছে তা হলো – জাতপাত ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা। এই দু’টি বিষয়ের উপর আলোচনাকে কেন্দ্রীভূত করলেই আমরা “শান্তির দ্বীপ” প্রসঙ্গের উপর অনেকখানি আলোকপাত করতে পারব।

যুক্তির কাঠামো

           বরাক উপত্যকার বুদ্ধিজীবীরা বিশেষ করে বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা কিছুদিন আগে পর্যন্তও পশ্চিমবাংলাকে দেখিয়ে বড়াই করে বলতেন ‘বাঙালির মধ্যে জাতপাত নেই’। কীভাবে তাঁরা বুঝলেন যে সেখানে জাতপাতের বিভাজন নেই – কারণ বিহারে ভূমিহার-রাজপুত-ঠাকুর-দলিত-যাদব-কুর্মী ইত্যাদির মধ্যে সহিংস সংঘাত লেগেই থাকে, কিন্তু পশ্চিমবাংলায় অপার শান্তি। সেখানে যেমন রণবীর সেনা রয়েছে – তেমনি রয়েছে দলিত সেনা – পশ্চিমবাংলায় তো তেমন নেই। তাঁরা সম্পত্তি-সম্পর্ক বিচার করার দিকে না গিয়ে বহিরঙ্গের শান্তি-অশান্তির রূপ দিয়ে জাতপাতের বিচার করলেন। বিহারে উচ্চবর্ণের জমির মালিক সরাসরি জমির সাথে যুক্ত থেকে সস্তায় শ্রম শোষণকে সুনিশ্চিত করতে শারীরিক নিগ্রহ চালাত। দলিতরা তার প্রতিরোধ করলে কিংবা যে কোন শ্রেণি সংগ্রাম সেখানে শুরু থেকেই হিংসাত্মক রূপ নেয়। দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এই সম্পত্তি সম্পর্কের খানিকটা পরিবর্তন সাধিত হয়েছে – কিন্তু তা এখানে আলোচ্য বিষয় নয়। পশ্চিমবাংলায় বর্ণহিন্দু আধিপত্য যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্যেই বিরাজ করছিল তা এখন সবার কাছেই পরিষ্কার। সাচার প্রতিবেদন প্রকাশ পাওয়ার পর “পশ্চিমবাংলায় সাম্প্রদায়িকতা নেই” এই দাবিও যে ঠুনকো তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া গরীব মুসলমানদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার হিংসাত্মক রূপ পরিগ্রহ করার প্রয়োজন পড়ে না, কারণ বর্ণহিন্দু আধিপত্য যেখানে শান্তির বাতাবরণেই সবচাইতে সুরক্ষিত থাকে সেখানে অশান্তি ডেকে আনা আধিপত্যের পায়ে কুড়োল মারার সামিল। বরাক উপত্যকার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জনসংখ্যাগত ভারসাম্যের চিত্রটি বাদ দিলে শান্তির এই একই যুক্তি ক্রিয়াশীল থাকে।

রাজনীতি ও মতাদর্শ সম্পর্ক

             উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণের সম্পর্ক, হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক পরস্পর সম্পৃক্ত। সম্পত্তির সরাসরি মালিকানা তা      কৃষি-অকৃষি যে কোন উৎপাদনের ক্ষেত্রে কিংবা সরকারী দপ্তর ও প্রশাসনের মাধ্যমে সম্পত্তির অমলাতান্ত্রিক মালিকানার হিসেবে সংখ্যালঘু বর্ণহিন্দু আধিপত্য প্রশ্নাতীত। নীতি নির্ধারণে বর্ণহিন্দুদের সংখ্যাধিক্য তাদের আধিপত্যকে বজায় রেখেছে এবং নিম্নবর্ণীয়দের কায়িক শ্রমশক্তি শোষণের উপযোগী পিরামিডাকৃতি শ্রম বিভাজনের কাঠামোর চূড়ায় তাদের অবস্থান রয়েছে। অনুরূপভাবে মতাদর্শ – মূল্যবোধ গড়ে তোলার সকল প্রতিষ্ঠানও তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় লোকায়ত প্রাক-ব্রাহ্মণ্যবাদী বস্তুবাদী মতাদর্শ ক্রমশঃ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বর্ণবাদী মতাদর্শের অধীনস্ত হয়ে পড়েছেমতাদর্শের সাথে রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে ‘পারস্যে’ রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “...যে বাস্তবের পরে মানুষের স্বাভাবিক মমতা, সে যখন ঝাপসা হয়ে আসে তখন মমতারও আধার যায় লুপ্ত হয়ে। গীতায় প্রচারিত তত্ত্বোপদেশও এই রকমের উড়োজাহাজ – অর্জুনের কৃপাকাতর মনকে সে এমন দূরলোকে নিয়ে গেল, সেখান থেকে মারেই-বা কে, মরেই-বা কে, কেই-বা আপন, কেই-বা পর। বাস্তবকে আবৃত করবার এমন অনেক উড়ো জাহাজ মানুষের অস্ত্রশালায় আছে, মানুষের সাম্রাজ্যনীতিতে, সমাজনীতিতে, ধর্মনীতিতে। সেখান থেকে যাদের উপর মার নামে তাদের সম্বন্ধে সান্ত্বনাবাক্য এই যে, ‘ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে’। কঠ উপনিষদ থেকে গীতায় উদ্ধৃতি – ‘ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে’ – হত্যা করলেও তাকে সত্যি হত্যা করা যায় না। কাকে? পরমাত্মাকে। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় লিখছেন, “ যে-দার্শনিক তত্ত্বের উড়োজাহাজ অর্জুনের কৃপাকাতর অনেক ধ্যানধারণার এমনই ঊর্ধ্বলোকে নিয়ে গেলো যেখানে বাস্তব পৃথিবীর সত্তা অস্পষ্ট, তার অস্তিত্বের দাবি বিলয়ের মহাশূন্যে বিলীন – ধ্যানধারণার সেই উর্ধ্বলোকই দার্শনিকদের ভাষায় ভাববাদ ...” সেখান থেকে মারেই বা কে, মরেই বা কে! কঠোর শ্রমই বা কে করে – তার শ্রমশক্তিকে শোষণই বা কে করে। এই দর্শনের বিশ্বাসেই এসব নিয়ে প্রশ্ন তোলা অজ্ঞানের ঘোর, পাওনা-গণ্ডা নিয়ে সোরগোল পাকানো – এসবই নেহাত বেকুবের লক্ষণ। এই বিশ্বাসই দ্বিজ-শূদ্রে বিভক্ত এই সমাজ আদর্শের ভিত। কোশাম্বী ভারতীয় বর্ণকে বর্ণণা করেছেন অনগ্রসর পণ্য উৎপাদনী ব্যবস্থায় একধরণের শ্রেণি হিসাবে, সামাজিক সচেতনতা নির্মাণে এমন এক ধর্মীয় পদ্ধতি হিসাবে যেখানে প্রকৃত উৎপাদকরা ন্যূনতম বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাদের উৎপাদিত উদ্বৃত্ত থেকে বঞ্চিত হয়”। এই ন্যূনতম বলপ্রয়োগের পরিস্থিতির নামই শান্তি। এই শান্তির কাঠামোর বাইরে যারা রইল – তারাই অ-হিন্দু। মতাদর্শগত স্তরে এই অ-হিন্দুদের উপর বলপ্রয়োগের সম্ভাবনা সবসময়ই থাকে, কারণ বর্ণবাদী মতাদর্শ দিয়ে তাদের আচ্ছন্ন করে রাখা যায় না, তারা তাদের পাওনা-গণ্ডার দাবি করেই ফেলে এবং তাতেই তাদের উপর নেমে আসে আক্রমণের খড়গ। এই আক্রমণকে বৈধতা দিতেই নানাধরনের অপপ্রচার চালানো হয়। হিন্দুত্ববাদীরা যেমন নাগরিক ও সম্প্রদায়গত বহুত্ববাদকে খণ্ডন করে এক সমসত্তাবিশিষ্ট রাজনৈতিক শক্তি কায়েম করতে চায়, ঠিক তেমনি অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিশেষ করে মুসলমানদেরও এধরনের এক সমসত্তা হিসেবে জনসমক্ষে তুলে ধরতে সচেষ্ট থাকে। কিন্তু বাস্তবে অন্যান্য দেশের মত ভারতীয় ইসলামও নাগরিক ও সম্প্রদায়গত বহুত্ববাদ রয়েছে, যদিও ধর্ম হিসেবে ইসলাম সম্প্রদায়গত বৈষম্য ও শ্রম-বিভাজনকে বৈধতা দেওয়ার বিপরীতে সাম্যের কথা বলে। এই সমসত্তার ধারণা ও আধিপত্যের কাঠামো যতক্ষণ অটুট থাকে ততক্ষণ শান্তির উপমাটি খুব যুৎসইভাবে রাজনৈতিক পরিভাষা হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। কিন্তু সংরক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে এই কাঠামোতে ইতিমধ্যে বেশ জোরালো আঘাত পড়েছে। সাচার ও রঙ্গনাথ কমিশনের সুপারিশের পর মুসলিমরাও সংরক্ষণের দাবির সপক্ষে সাংবিধানিক বৈধতা পেয়েছে। হিন্দুত্ববাদীরা তাতে শঙ্কিত হয়ে উঠছে। বুদ্ধিজীবীদের একাংশ হিন্দুত্ববাদীদের সক্রিয়ভাবে মোকাবিলা করার মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দিকে আরও একধাপ অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে শান্তির বারি বর্ষণ করার প্রতি যে বেশি আকর্ষণ বোধ করছেন তা প্রতিক্রিয়ার সাথে আপসকামী ও দুর্ভাগ্যজনক।

অর্থনীতিবাদের গাড্ডা

           তবে এই আচরণ যে প্রতিক্রিয়ার সাথে আপসের ও আধিপত্যবাদের পক্ষে যায় তা তাদের উপলব্ধিতেই আসে না, বরঞ্চ তাঁরা ভাবেন যে শান্তির জন্য এই কামনা সমাজের কল্যাণেই। তাঁরা মনে করেন যে অর্থনৈতিক অধিকার ও উন্নয়নের দাবিতে শোষিত-বঞ্চিত মানুষের আন্দোলনের মাধ্যমে হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতাকে মোকাবিলা করা সম্ভব। আজকের উদার আর্থিক নীতির পরিপ্রেক্ষিতে আর্থিক অসাম্য যখন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মানুষের মনের মধ্যে ক্ষোভ ধূমায়িত হচ্ছে, তখন এই ধরনের ধারণা বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আরও জাঁকিয়ে বসছে। জনগোষ্ঠীগত সমতার প্রশ্নকে এড়িয়ে গিয়ে গরীব-মেহনতি মানুষের ঐক্যবদ্ধ লড়াই যে দানা বাঁধতে পারে না – এই সত্যকে তাঁরা দেখতে পান না। অর্থনৈতিক প্রশ্নকে অনৈতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করার জন্যই এই বিভ্রান্তি ঘটে – মার্কস যাকে আখ্যায়িত করেছেন অর্থনীতিবাদ হিসেবে। রাজনীতিকে অর্থনীতি থেকে আলাদা করা বা অর্থনীতিকে ইতিহাসের আলোকে বিচার না করাই আসলে পুঁজিবাদী অর্থনীতি কিংবা তার নব্য রূপ উদারবাদী অর্থনীতির গ্রহণযোগ্যতার মুল চাবিকাঠি। বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের একাংশ অর্থনীতিবাদের এই ফাঁদে পা দিয়েছেন। ফলে তাঁরাও জনগোষ্ঠীগত অধিকারের প্রশ্নকে আড়ালে রেখে তথাকথিত শান্তি বজায় রাখার পক্ষে ওকালতি করেন, কারণ তাঁরা মনে করেন যে শান্তির পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক আন্দোলন গড়ে উঠে এবং তা দিয়ে হিন্দুত্ববাদকে মোকাবিলা করা যেতে পারে। তাদের এই ধারণা যে ভ্রান্ত বরাকের সাম্প্রতিক ঘটনা তাই প্রমাণ করল।
সাম্প্রতিককালে বরাক উপত্যকার উন্নয়নের প্রশ্নে, অর্থনৈতিক-নাগরিক ও মানবিক অধিকারের প্রশ্নে বিভিন্ন ধরনের আন্দোলন গড়ে উঠছেহিন্দুত্ববাদী আধিপত্যবাদ তাতে শঙ্কিত হয়ে উঠাই স্বাভাবিক ছিল। তাদের এই শঙ্কা দূর করার এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দিল হাই-প্রোফাইল ভিন-ধর্মী বিয়ের ঘটনা। প্রগতিশীল শক্তি তাদের এই সুযোগের সদ্ব্যবহারের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে খাট করে দেখল এবং এর সক্রিয় প্রতিরোধের বদলে নিষ্ক্রিয় শান্তির পক্ষে ওকালতি করল। তাদের এই অবস্থান এই বোধ থেকে উদ্ভূত হয়েছে যে অর্থনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে সম্প্রদায়গত ও শ্রেণিগত যে ঐক্য গরে উঠেছে হিন্দুত্ববাদের সক্রিয় বিরোধিতা এই ঐক্যকে বিনষ্ট করতে পারে। তাদের এই ভূমিকা যে সুবিধাবাদের নামান্তর ও বাস্তববোধ বর্জিত তা আবারও প্রমাণ হলো। আর্থিক সংকটের ফলে নড়বড়ে আধিপত্যবাদী কাঠামোয় কোণঠাসা হতে থাকা হিন্দুত্ববাদী শক্তি এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠল। আমরা যদি অতিসত্বর এই অর্থনীতিবাদী মোহ থেকে বেরিয়ে আসতে না পারি তাহলে পরাজয়ের গ্লানি আমাদেরকে আরও বহুদিন বহন করে বেড়াতে হবে।

সংকট, বিশৃঙ্খলা ও পরিবর্তন

          বিশ্ব-পুঁজিবাদী সংকট ও ভারতীয় উদারবাদী অর্থনীতির কুফলের পরিণতিতে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ধূমায়িত হচ্ছে এবং তা হিন্দুত্ববাদী আধিপত্যের কাঠামোকেও দুর্বল করে তুলছে। কিন্তু এই অর্থনীতিতে লাভবান একাংশ উচ্চশ্রেণি-বর্ণের লোকের সমর্থনে ও ক্রমবর্ধমান বেকার যুবকদের বিপথে পরিচালিত করে এক আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদ যে গণ-সমাজের উপর জাঁকিয়ে বসতে পারে না তা হলফ করে বলা যায় না। আধিপত্যকামী শক্তির শান্তির শ্রুতলিপিকে মান্যতা দিয়ে এই আগ্রাসনকে মোকাবিলা করা যায় না, বিশেষ করে আজকের পরিস্থিতিতে যখন মধ্যপন্থার জায়গা ক্রমশঃ সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। সুতরাং আমাদেরকে এর মোকাবিলা করতে হবে এক সম্পূর্ণ র‍্যাডিক্যাল অবস্থান থেকে।
‘রুমি কাণ্ডে’ যে এক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। আবার তীব্র অর্থনৈতিক সংকট থেকে উদ্ভূত রাজনৈতিক সংকটেরও প্রতিফলন এই শ্লীল-অশ্লীল, ঔচিত্য-অনৌচিত্য, হিংসা-ভালবাসা, অন্তর্ঘাত-সম্মুখ সমর ইত্যাদি মহাকাব্যিক গুণে ভরপুর এই কুনাট্য। শাসক শ্রেণির অভ্যন্তরিণ দ্বন্দ্বে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা যে আগামী দিনে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি ঘটবে তা হলফ করে বলা যায়। অর্থনৈতিক সংকট থেকে এই রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার কীভাবে উদ্ভব ঘটে তা সাধারণ পাঠকের জন্য একটু ব্যাখ্যা করে বলা যাক। রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখা সম্ভব হয় মতাদর্শগতভাবে মোহাচ্ছন্ন ও শাসকীয় অর্থনৈতিক নীতিতে পরিচালিত শাসিতের প্রচ্ছন্ন সম্মতির বলে অথবা শাসিতরা যদি অসম্মতি প্রকাশ করে তাহলে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সম্মতি আদায় করে। প্রথম অবস্থা বজায় রাখার জন্য আর্থ-সামাজিক অসাম্যকে একটি সহ্যের সীমার মধ্যে ধরে রাখা প্রয়োজন, প্রয়োজন শ্রমশক্তি লুণ্ঠনের এক নমনীয় কাঠামো। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট অসাম্যের তীব্রতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সামাজিক ভারসাম্যকে বিনষ্ট করে। আর্থিক সংকটে জর্জরিত মানুষ বিদ্রোহ করতে চাইলে – শাসক শ্রেণি দিশেহারা হয়ে পড়ে। এই দিশেহারা অবস্থাতেই রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। স্বাভাবিকভাবেই যে কোন অবস্থার দ্বিমুখী গতি সম্ভব। তাই এক্ষেত্রেও এই বিশৃঙ্খলার         নব্য-উপনিবেশিক পরিণতি হিন্দুত্ববাদী–আক্রমণাত্মক-শৃঙ্খলার দিকে যাওয়ার প্রবণতা যেমনি থাকবে – ঠিক তেমনি আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন সমাজ গড়ার প্রবণতাও থাকবে। এই দ্বিতীয় পথকে উন্মোচিত করার জন্যই হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে ও সমান-অধিকার, সমান-মর্যাদার দাবিতে তীব্র ও প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের লড়াই গড়ে তুলতে হবে। ‘সাম্প্রদায়িকতা শান্তি বিনষ্ট করে – তাই বর্জনীয়’ – এধরনের প্রচারের মাধ্যমে শান্তি বজায় রাখা যাবে না। আমাদের দুর্ভাগ্য যে তথাকথিত বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরাও বাস্তবকে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়ে শান্তির বারি ছিটিয়ে দেওয়ার একধরনের ক্লীব অবস্থান নিয়েছেন।

র‍্যাডিক্যাল অবস্থান

           রাজনৈতিক ক্ষেত্রে র‍্যাডিক্যাল অবস্থান সুনিশ্চিত হবে প্রতিটি জনগোষ্ঠীর সমান-অধিকার, সমান-মর্যাদার নীতির ভিত্তিতে জনসংখ্যার অনুপাতে সংরক্ষণের দাবিতে জোরদার অন্দোলন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। সংখ্যালঘু তোষণের হিন্দুত্ববাদী প্রচারকে জোরালোভাবে খণ্ডন করে সংখ্যালঘুদের সংরক্ষণের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর ভাষিক-সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্নকে গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। হিন্দুত্ববাদী ইতিহাস পাঠের বিপরীতে দলিত-নিপীড়িতের সংগ্রামের ইতিহাসকে উর্ধে তুলে ধরতে হবে। নমঃশূদ্রদের আন্দোলন – কৈবর্ত বিদ্রোহ – সিধু-কানুহ, বিরসা মুণ্ডার বিদ্রোহ – নাথ পন্থের ইতিহাস – তেভাগা – নানকার বিদ্রোহের ইতিহাস এবং সর্বোপরি বরাক-বাংলাদেশের ভাষা সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাসকে সামনে এনে পরিচিতির সংগ্রামকে হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। অর্থনৈতিক অধিকার – গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও শোষিতের ক্ষমতায়নের প্রশ্নকে যুগপৎভাবে পরিচালিত না করে অসাম্য ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার দিকে এককদমও অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। বরাকের বুদ্ধিজীবীরা যত তাড়াতাড়ি এই বাস্তব সত্য উপলব্ধি করতে পারেন ততই মঙ্গল। শোষণ – বঞ্চনা – অনুন্নয়নের কাঠামো বজায় রেখে তথাকথিত ‘শান্তির দ্বীপের’ চেয়ে তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ভবিষ্যতের প্রকৃত শান্তির আশায় অশান্ত বরাক হাজারো গুণ কাম্য।      

                                           (c) Picture: ছবি