Sponsor

.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

Monday, August 22, 2016

দুটি হাত ...চিরশ্রী দেবনাথ

দুটি হাত

................©চিরশ্রী 

দুটি হাত শক্ত করে ধরে আছে বাসের হ্যান্ডেল

একটি হাত ,রোমহীন, সুডোল, স্বচ্ছ নখে রোদের চাষ 

যেন জ্যোৎস্নায় ঢাকা নদী নেমেছে বরফের স্বর্গ ছুঁয়ে

অন্য হাতে রোমের কালো বন, বাঁকাচোরা ময়লা নখ

যেন ময়াল সাপ উঠে এসেছে খনির অন্ধকার মেখে 

এই দুটো হাত যে যার মতো করে কাল রাতে ভালোবেসেছিল

কাল ছিল অমাবশ্যা ...সুগভীর 

কালো রোমশ হাত থেকে  লাফিয়ে পড়েছিল বাঘ

ময়লা নখ থেকে সুনামীর জলোচ্ছাস  

ফর্সা সুডোল হাত চেপে দিয়েছিল অন্ধকার

প্লুতনোভা আলোয় ভেসেছে তখন  রঙীন মাছ

দুখানি হাতের তলায় রোশন চৌকি, পরিশ্রমের নহবত

প্রতিরাতে তারা ভালোবাসতে যায়,

তারপর উটের মতো পথচলা রেখে আসে দোরগোড়ায়, 

আম্রপলবের কষ ঝরে,  টুপটাপ, সুস্বাদু মঙ্গলছাপ...




সুরমা গাঙর পানিঃ উজান পর্ব ৯



 
(দেশভাগ এবং পরের দশকের কাছাড় সিলেটের প্রেক্ষাপটে রণবীর পুরকায়স্থের এই উপন্যাস ছেপে বের করেছে দিন হলো। ভালো লাগা এই  উপন্যাস পুরোটা টাইপ করে তুলে আমার প্রিয় কথা শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। আশা করছি আপনাদের সবার এটি পড়তে ভালো লাগবে। সম্পূর্ণ উপন্যাসের সংলাপ ভাগটি সিলেটিতে -সে সম্ভবত এই উপন্যাসের সবচাইতে আকর্ষণীয় দিক। আপনাদের পড়বার সুবিধে করে দিতে, ঈশানে এই উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে আসছে। আজ তার  উজান  পর্বের নবম অধ্যায় --- সুব্রতা মজুমদার।)




নয় 
   
গীতেশ বিশ্বাসকে বৈতল অন্য কথা জিজ্ঞেস করেছে । সেই তার পুরনো কথা, দুখু যাকে বলে পাগলামি । নদীর আকৃতি নিয়ে প্রশ্ন । নদী কোথা থেকে আসে দেখে নি বৈতল, তালগাছ চড়েও ঠাহর করতে পারেনি । তবে একটু জানে খুরাদিল এই বাটির জন্য শহরের যত দুঃখ । বছর বছর বন্যা । এত উঁচু বাঁধ । জাহাজ ঘাট থেকে এঁকে বেঁকে অন্নপূর্ণা ঘাটের অদূরে গিয়ে নদীর জল আর বৃষ্টির জলের একাকার । এর পরেই রেল গাড়ির ঝমঝমি ।
মাছিমপুর শালচাপড়া কাটাখাল পাঁচগ্রাম বদরপুর । একদিকে পাহাড় লাইন সোজাসুজি করিমগঞ্জ, মহিষাশন । হিন্দুস্থান পাকিস্তান ভাগাভাগি । দুর্গাবতীকে নিয়ে এক জলের দুপুরে বসেছিল ইস্টিশনে । কখন ছাড়বে করিমগঞ্জের গাড়ি । করিমগঞ্জ থেকে উল্টোপাকে বদরপুর হয়ে শিলচর । এর আগে বইয়াখাউরি থেকে কইমাছের মতো কানে হেঁটে, জল সাঁতরে আর ভোরায় ভেসে ওদেশের জল থেকে এদেশের মাটিতে আশ্রয় ।
এদেশে বৈতলের কেউ নেই । কৈবর্তের পুত, ব্রাহ্মণের কন্যা দুর্গাবতীকে সঙ্গে নিয়ে চলে এসেছে নতুন দেশে । দুর্গাবতী বৈতলকে দিয়েছে নতুন পরিচয় । বলেছে,
--- তুমি পাটনি থাকলে কৈবর্ত থাকলে তুমার কিচ্ছু নায় । আমার কিতা অইব কও । আমারে তো কেউ মাইমলের বেটি কইত নায় । একলা পুড়িরে পাইলে মাইনষে নি ছাড়ব কও, দেখছ অউত্ত । তুমি আমার কথা রাখো, তুমার বউ অইয়াই থাকমু । খালি তুমি একখান লগগুন লাগাইলাও । কইও তুমি শর্মা বাবন ।
 বেশ তবে তাই হোক । কেউ জানে না, হয়ে যায় বিয়ে । স্ত্রীর পদবি নিতে কোন দুঃখ হয়নি বৈতলেরদেশ ছাড়া মানুষের নামই বা কী, পদবীই কী । তাই গুরুর নামে নাম লেখায় রিফুজি খাতায়, সৃষ্টিধর শর্মা । একা একা শপথ নেয় । বৈতল আর কোথাও জড়াবে না, কাটিয়ে দেবে গরিব মানুষের গৃহস্থ জীবন নিরুপদ্রবে । কিন্তু বৈতলের জীবন কখনও সোজা খাতে বয় না । কোনো শপথ শেষ শপথ হয় না জড়িয়ে যায় সামাজিক সম্পর্কে । বন্ধুতা থেকে শত্রুতার ধারাবাহিকতায় তার নতুন সংযোজন হয় হরিৎবরনের জমিদার যমুনা প্রসাদ সিং । এছাড়া আসে তার খুশি, খুশির বন্যা, প্রাণের পুত্তলি তার কন্যা মনি । যম জমিদারের উপর রাগ করে বৈতল মেয়ের নাম রাখে মরনি । কী জানি কী সন্দেহের বশে মেয়েকে কোলে নিতেও দ্বিধা বৈতলের । মনের মধ্যেও তাচ্ছিল্য ।  বৈতলের বাপও তার নাম নিয়ে তাচ্ছিল্য করেছে । মায়ের মতো এমন গৌরবর্ণা মেয়ে বৈতল কামনা করেনি । তার সন্তান তারই মতো হবে কালোবরনী । জন্মের পর থেকেই বৈতল খুটে খুটে দেখে মেয়ের চোখ নাক কান হাতের পায়ের আঙুল, বৈতল নিজেকে খুঁজে খুঁজে হতাশ হয় । বৈতলের তো সবই বিপরীত, হতাশা থেকেই হয় আনন্দের সূত্রপাত । সেই মরনি কন্যার ‘র’ আর উচ্চারিত হয় না খুশিতে । সেই মনি মেয়েই এখন তার হৃদয়ের মনি । জড়িয়ে যায় বৈতল আবার ।
আরো হয়, তিন বন্ধু হয়, হয় বাপের মতো এক বোবা সাধু । বয়সটাও বাপের মতো, স্বভাবে গুরু সৃষ্টিধরের মতো অবিকল । আবার বিপরীতও অনেকটা । গুরু সৃষ্টিধরের গলায় সর্বক্ষণ কথা আর গান । তিনি তো কথাই বলেন না, কিন্তু এক উজ্জ্বল আলো বিচ্ছুরিত হয় তাঁর বিপুল শরীর থেকে । সেই সাধুমানুষকে ঘিরে জড়ো হয় তারা চার বন্ধু । মামুপিরের খিদমত খাটে চারজন ।
গ্রামের ছেলে বৈতল শহরে এসে হাঁপায় । রিক্সার প্যাঁ পোঁর যান্ত্রিকতায় বিরক্ত হয় । নিরিবিলি খোঁজে । সন্ধ্যের আঁধারে জাহাজঘাটের দিকে যায় । দেশভাগ হওয়ার পর জাহাজ কমে গেছে । মাঝে মাঝে কলকাতা থেকে কয়লার জাহাজ আসে । বিহারী দারোয়ান শামুদা বলে,
--- আভি তো কুছু নাহি, শুনশান । আগে জাহাজ কম্পানিতে কিতনা ভিড় ছিল ।
শামুদা নির্জন রাতে বৈতলকে জলের কাছে যেতে দেয় । বৈতল একা বসে থাকে, বসে থেকে জীবন সাজায় । ফেলে- আসা নদীর সঙ্গে জুড়ে দেয় নিজেকে । ভরাবর্ষার উথাল পাথাল সুরমার সঙ্গে নিজেকে মেলায় শরতের এই বরাকপারে । বৈতল গান গায় গুনগুনিয়ে । মন আনন্দের গানে ইদানীং আর পরিচিতি সুর কাজ করে না । বৈতল এখন নতুন গান শিখেছে । সিনেমার গান গায় যখন রিক্সা নিয়ে তারাপুর রেল গেট পেরিয়ে যায় তখন ‘তুফান মেল যায়’ কেউ যেন তাঁর গলায় তুলে দেয় । নদীপারের একাকী সময়ে এক নতুন শেখা গান গায় ‘ছিরু ভীরু পায় পল্লীর বালিকা বনপথে যায়’ । সুরের যাদুতে পাগল হয়ে যায় বৈতল । একদিন দুখুও শোনে তার একা সময়ের গান । দুখুর কাজ তো শুধু বৈতলের খুঁত ধরা । বলে,
--- ‘ছিরু ভীরু’ কিতা বে । ইতা কিতা গান
--- অইব কিচ্ছু, সুর ভালা লাগলে অত অর্থ খুজন লাগে না
--- তর পুথির গান থাকি একেবারে আলেদা । তুইন হিন্দু গান গাছ না কেনে । ‘পয়গাম’ আর ‘ইনসানিয়তো’ বউত ভালা ভালা গান আছে ।
--- অখন গাইমু । শ্রীমঙ্গল চা বাগানো শুনছি হিন্দি মাত আর অউ ইখানো আইয়া ইটখলাত । পুদুম, চেম, নুনুয়া কত কিছিমর নাম তারার । সিলেটর বাগানো অত নামর বাহার নাই । সাত দিনর নামে নাম । শুক্‌কুরবারে জন্মাইলে নাম রাখি দেয় শঙ্কর ভোলা নায় রামচন্দ্র । এগুর নাম আছিল জানছনি মঙ্গালাল, তে তার বৌরে টিল্লাবাবু এ জিগাইছইন মরদর নাম কিতা । হায়রে কপাল, বেটি ইগু মরি যায় শরমে, আবার টিল্লাবাবুরে নাম না কইলেও নায়, তখন কছাইন দেখি কেমনে কইল জামাইর নাম ।
--- জানি জানি । ইশারা করি কই দিছে আরি ।
--- অয়, তর মগজ ইগু হইল নাগেশ্বরর ছিয়া, সব জানে, জানতে জানতে ছাতু করিলায়, অলাখান ভুতা । কইল কিতা জানছ নি, কইল, তলব দিনে লাল লাগাইকে । অখন বুঝিলাও । মঙ্গলবাড়ে তলব দিন । তেউ মঙ্গলের লগে লাল, মঙ্গালাল ।
দুখুর মত না নিয়ে বৈতল কোনো কাজ করে না, আবার দুখুর সঙ্গেই লাগ সব থেকে বেশি । দুখুর ওস্তাদি বেশি, সব কিছুতেই শেষ কথা বলবে দুখু । বৈতল মানবে কেন । তাই খটাখটি ।
বৈতলেরও এক রগ তেড়া । চুরি করবে ডাকাতি করবে তবু কারো দয়ার দান নেবে না । হরিৎবরণ ইটখোলার জমিদারের আমন্ত্রণ ফিরিয়ে ফিরিয়ে দেয় গোঁয়ার্তুমি করে । দ্বিতীয়বার মেনে নেয় । মেহেরপুর রিফ্যুজি শিবির থেকে হরিৎবরণে চলে আসে দুর্গাবতীকে নিয়ে । যম সিং বলেছে থাকতে দেবে, ঘর দেবে পুকুর পারে ঘরের দুয়ারে । দুর্গাবতীকে জমিদারের ঠাকুরঘরে ব্রাহ্মণীর কাজ করবে । আর বৈতলবৈতলের প্রতি কৃতজ্ঞতায় তখনও ঠিক করে নি উপযুক্ত কাজ । তাই নতুন বাড়িতে এসে এদিক ওদিক ঘুরে, পুকুরে ডুব দেয় । হপ্তায় একদিন গিয়ে ডোল নিয়ে আসে মেহেরপুর থেকে । একেবারে তো নাম কাটিয়ে আসেনি । বৈতলের মন মানে না বদ্ধ জীবনে । অফুরন্ত জল না থাকলে, গায়ে মাছের গন্ধ না থাকলে কেন সে পাটনির পুত । বৈতল দুর্গাবতীকে বলে দেয় এখানে মন টিকবে না । দুর্গাবতী মানে না । বলে,
--- আর ফিরতাম নায়, পানিত ভাসি থাকতাম নায় আর । আলাদা জীবন অখন ।
     বৈতলের আপত্তি নেই । কিন্তু কী হবে তার জীবিকা । তার পরিচয় কী । দুর্গাবতী ব্রাহ্মণীর পতি হয়ে থাকা শুধু । কর্মহীন জীবিকাহীন, পত্নীর উপর নির্ভরশীল । বৈতল বিদ্রোহী হয়, জল ছাড়ে না, চলে যায় চাতলার পারে । হাওরের পাশে গ্রাম রাজপুরে, রাজপুরের কৈবর্ত রবিলাল বৈতলকে বলে সরকারি জমির কথা । মাছ মারবে, হাঁস পালবে ছাগল পালবে । ওখানে পশুপালন করে অনেকেই সচ্ছল হয়েছে । বৈতলের মারও শখ ছিল হাঁস ছাগল পালনের । মা বলে, ‘হাসে উনা কইতরে দুনা, ছাগলে পিন্দায় কানো সুনা’ । সোনা পরেনি মা, চান্দকপালিকে ঘরে এনেছে । মা মরে গেলে বাপ বেচে দিয়েছে সৌভাগ্যের গাভীটি । বেচে দিয়েছে না যৌতুক দিয়েছে যুবতি বৌ –এর লোভে । সেই বাপও শখ পূরণ না করে মরে যায় এক দুর্যোগের রাতে, গাছ মাচান এর উপর । বৈতল টঙএর উপর বসে বসে দেখেছে জলের দৈত্য বাপের জলে পড়ে হাবুডুবু খেতে খেতে মরে যাওয়া । হিসেবি জীবনে অভ্যস্ত নয় বৈতল, জীবজন্তু নিয়ে আয় দ্বিগুণ করা কিংবা কানের সোনা কল্পনাও করে না । বরং রবিলালের সঙ্গে হাওরের জলে মাছ মারতেই তার আনন্দ । রবির সঙ্গে ভাগাভাগিতে ভার বয়ে নিয়ে যায় ফাটকবাজার । রবিলালের পাশে বসে । দেখে দোকানদারি । ভাগা করে মাছ বিক্রি করে রবি, টুকরির ডালা উল্টে মাছের ভাগা করার অনেক কেরামতিগ্রাহক ঠকানোর অনেক কল জানে রবিলাল । উল্টো ডালায় অল্প মাছে ভাগা বড় দেখায় । বৈতল বিরক্ত হয় রবির কার্যকলাপে । তবু শোনে রবির কথা । রবিলাল বলে,
--- ঝলঝলা তাজা মাছ দিবে উপরে, আর তলে জাবড়া জুবড়া পচামাছও দিতে পারছ ।
--- অয় গাউক তর মতো আড়ুয়া বেভুতা নি । লাড়াই চাড়াই কিনব । একদিন নি বেচতে, পররদিন নি আইব কেউ ।  
--- আইব, আমার কাছে আইব আমি নু লাগাই দেই । ফাউ দিলাই লে অউ খুশি অই যায় ।
--- বুঝছি ঠগাউরা অইচছ তুই । অখন তর বাং উং ভার ডালা ইতা দিলাইছ আমারে কয়দিনর লাগি । আমি দেখি বেচতাম পারিনি ।
--- তুই কিনিলাছ না কেনে তরে দিলে আমি লিতা করমু ।
--- তুই মাছ মারবে, আমি বেচমু, পয়সা তোর ।
--- অয় পয়সা তোরতারপরে আমার ভার ভাগলে । রিফুজি হকল অখন খুব ঠগঠগামি কররা
--- তুই আমারে ঠগ কইলে নি । ঠিক আছে, দেখিছ আইজ অউ দেখিছ । ভার লইয়া আর রাজপুর ফিরতে না । ঠেং ভাঙি রাখি দিমু তোর
     মাছুয়ার সঙ্গে একটু মস্করা করার জন্যই বৈতলের কথা বলা । বলেই হেসেছে । ও হরি, এমন ভিতু মানুষ বৈতল দেখে নি জীবনে, বৈতলের কথায় গাট্টা গোট্টা মানুষটা ভ্যাঁ করে কেঁদেই দেয় । কিছু বলে না শুধু কাঁদে । এরকম ভিতু, ছইতে –মরা মানুষ বৈতলের পছন্দ নয়, কোথায় প্রতিরোধ করবে, উল্টো বৈতলের ঠেং ভাঙার শাসানি দেবে তবে না জলের সৈনিক । বৈতলের বন্ধু । লড়াই লড়াই ভাব না থাকলে কিসের পাটনি কিসের কৈবর্ত । আর বৈতলকেও তো জানতে হবে, বন্ধুর স্বভাব না জেনে শুধু কাঁদলে হবে । বৈতল জানে বন্ধুত্বের প্রথম ধাপই হলো লাগালাগি । অকারণ ঝগড়া । গায়ে গা লাগিয়ে পায়ে পা লাগিয়ে শত্রুতা । লড়াই করে টিকে থাকতে পারলে দোস্তি, ইয়ারি । লুলা পারে । প্রথম দিনই মিরতিঙ্গার পাহাড় থেকে বৈতলের লাথি খেয়ে পড়েছে নিচে । খিত্তা গাঁও এর বাঙাল কিশোর উঠে দাঁড়িয়ে বৈতলের বিরুদ্ধে ‘তাও’ নিয়েছে, তারপর হেসেছে । হয়েছে প্রাণের মানুষগুরু সৃষ্টিধর মানেন বৈতলের বুদ্ধি । বলেন,
--- যারে ভালা লাগে তারে একটু বাজানি লাগে । খালি মিঠা কুনু ভালা নি । পেট মাতলাইব, মধুমেহারি অই যাইব মনো । এর লাগি কিছু তিতাও খাওয়ানি লাগে । তিতাবাখরর ছাল জিবরা দিয়া ঢুকলে  নাড়িভুড়ি বারই যায় । কিন্তু শরীর ঠিক রাখেআমি তো আমার মনসা মাই হকলর লগে অতা করি । খালি লাগি । যারে ইচ্ছা কান্দাই দেই । ছোটজনরে কইলাম, তুমি যে অত কালা, তুমারে কেউ ঘরো নিত নায় । মাইঝলা জনর চুল ধরি এমন টান দিলাম যে তিন দিন ধরি কান্দরা । হেসে বুঝছি ইতা কান্দা নায় আমারে কান্দানির ফন্দি । আদর করতাম গিয়াবাপ আইছইন, বাপ আইছইন তানে ডরাও, ইলাখান কুনু ভালা নি কও ।
কান্নাকাটি ব্যাপারটাই পছন্দ নয় বৈতলের । রবিলাল যে তাকে এমন অপ্রস্তুত করবে ভাবেনি বৈতল । বৈতল চেয়েছে রবির বন্ধুত্ব । নইলে ছোট ছোট এসব কুয়ার সমষ্টি চাতলার হাওরে যাওয়ার কোনও ইচ্ছেই তার নেই । হাকালুকি আর বড় হাওরের পরাণকাড়া হাওয়ার কাছে চাতলা কিছুই না । জল থেকে যদি মায়ের আদরের মতো হাওয়া না বেরোয় তাহলে কী জলাশয় । ছোটমাছ ভাগা করে বিক্রি করার মানুষ যে নয় বৈতল, রবিলাল বুঝতেই চায় না । অকারণ ভয় পেয়ে যায় । যাক, ভালই হয়, তৈরি হওয়ার আগেই খুলে বেরিয়ে আসতে পারে বৈতল নতুন গ্রন্থি ।
বৈতলের মন এখন আর বিল হাওরে মজে না । এখন সে নদী আর তার অবিরল জলধারার রহস্যে মশগুল । কোথা থেকে আসে নদী, তৈরি করে জনপদ । মানুষ কি নদীর টানে আসে না নদী টানে মানুষকে । বৈতল জানে ভালবাসার কথায় শুধু জট লাগানো আর জট ছাড়ানোর খেলা । মানুষ আগে না নদী আগে, এসব কথার জবাব হয় না, তবু মন কথা বলে । নদীর সদাই চলা দেখে ভাবুক হয় মন । বৈতলের মন ও সদা চলমান । তাও তো বৈতল থামে, আবার চলে । সিলেটের গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরেছে, থেমেও থেকেছে । আবার চলেছে, ফিরে এসেছে বইয়াখাউরি । তার জন্মভূমি । একদিন জন্মভূমি জন্মজল ছেড়েও চলে এল বৈতল । দুর্গাবতীর হাত ধরে মেহেরপুর রিফ্যুজি ক্যাম্প । ক্যাম্প ছেড়ে ইটখোলা, হরিৎবরণ জমিদার বাড়ি । নদী কিন্তু চলেছে অবিরাম । আর আশ্চর্য এক নদী, একই শহরে নদীর উজানভাটি । এদিকে তাকাও উজান ওদিকে ভাটিএদিক ওদিক নদী দিয়ে সুরক্ষিত শহর কি আছে কোথাও । সুরমা গাঙকে বৈতল জেনেছে শুধু তার নিজের নদী, সিলেটের আপন নদী, তার সুনামগঞ্জে সুরমা শুধু ভাটিতেই বয় । কিন্তু সুরমার উজানেও যে আছে অন্য এক নদী বৈতল দেখেনি আগে । সুরমার ভাটির কথা বলেছেন শুধু গুরু সৃষ্টিধর । গুরুর কথায়,
--- সব নদী অউ সাগরো যায় । সব নদী অউ মানুষের মতো, খালি আউগ্‌গায় । থামে না, শেষে গিয়া ঝপ করিয়া সাগরো পড়ে । অউ অইল মৃত্যু । মৃত্যু কিন্তু শেষ নায় রেবা, আবার এক আরম্ভর লাগি সাজিয়া গুজিয়া বই থাকা ।
গুরু সৃষ্টিধর বড়াইল পাহাড়ের কথা বলেননি বইতলকে । গুরুর ভয়, যদি উৎসবের টানে শিষ্য বেরিয়ে পড়ে । গুরুর ভয় শুধু ভালবাসার আঘাত । অগেরস্থ গুরু ভরসা ভাবেন বৈতলকে । পঞ্চকন্যার একজনকে দান করার ইচ্ছা থেকে বৈতলকে ধরে রাখার টান । সদা চলমান বৈতলকে ধরে রাখবে কে । গুরুর হাত ছেড়ে পালায় বৈতল । পালিয়ে চলে এল জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে দেখা সুতোর নালীর মতো নদীর কাছে । নদীর উৎসেরও কাছাকাছি এখন । চোখ মেলে দেখে বড়াইল পাহাড়, পাহাড়ের কোন গুহা থেকে জানি বেরিয়েছে এই সুতার নালী, হঠাৎ জলরাশি হয়ে জড়িয়ে ধরেছে বৈতলের নবীন শহরকে । বৈতল একদিন পৌছে যাবে নদীর জন্মস্থানে । বরাকোত্তরীতে গিয়ে গুরুর পায়ে এক অঞ্জলি জল দেবে । বলবে,
--- খালি মৃত্যু নায়, জন্মও আসল ।
জন্ম ও মৃত্যুর মাঝামাঝি বসবাসের সময়কালে নদীর বিভঙ্গ বৈতলকে আকৃষ্ট করে । নৃত্যপরা রূপ থেকে কত যে মুদ্রার বিচ্ছুরণ । সেই আকর্ষণেই বন্ধু দুখুর সঙ্গে তার লড়াই । লড়াই করতে করতে কত রকম আকারে যে সাজায় শহরবাসী নদীকে । গুলতির বাঁট, খুরাদিল বাটি এমন কি চাঁদের আকৃতিতে সাজাতে সাজাতে বন্ধুত্বকে দৃঢ় করে । হেডমাস্টার বলে ঘোড়ার নাল, বৈতল জানে সব কল্পনারই এক সত্য থাকে । দেখার সত্য আর কল্পনার সত্য মিলেই তো সৃষ্টি; নতুন দেখা । দুখু বছই আপদ যোগেন্দ্রদ্দা লাখুদা হেডমাস্টার বৈতল সবার দেখা এক এক করে নতুন চোখের দেখা । একা মানুষের বুদ্ধিতে কতটুকু আর সুন্দর থাকে, সবাই মিলে যে সুন্দর সাজায় সেই তো আসল । মানুষ একা থাকার জন্য ঘরবাড়ি সাজায় না, একলা থাকার জন্য ধর্মকর্ম করে না, মানুষ একা থাকার জন্য সমাজ সাজায় না । জন্ম থেকে মৃত্যুর মাঝামাঝি সময়টাকে সহনীয় করতে মানুষ সুন্দরকে ডাকে । মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ সুগম করে । ভাটির পথে নামে । ভাটি মানে যদি অবধারিত পরিণতি পথ হয় তাহলে কেন দুপার উর্বরা করার এই শ্রম । বৈতল গুরুর কাছ থেকে জেনেছে নদীর শিক্ষা । মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ সাজায় নদী, খৈ ছিটিয়ে যায় নিজেই । মৃত্যুকে জয় করার সব উপকরণ রেখে যায় উপত্যকায় । এক ছুতার মানুষের সান্নিধ্য বৈতলকে অনেক কিছু শিখিয়েছে । গুরু সৃষ্টিধরও তাই হৈ চৈ করে বেঁচেছেন । আট আনা রোজগার করে এক টাকা খরচ করেছেন । বলেছেন,
--- তুমি দেখাত দেখরায় আট আনা । আমার মনর মাঝে নু কোটি টেকার সিন্দুক ।
     মনের সিন্দুক খুলে গুরু টাকা বের করেন একা একা । কেউ থাকে না সঙ্গে । মনসামঙ্গল গাওয়ার জন্য সৃষ্টিধর ওঝা ঘোরেন সারা সিলেট । সাকরেদ বৈতলকেও থাকে সঙ্গে স্বাধীনতার মিটিং মিছিল, তেভাগার আন্দোলনেও সবার সঙ্গে । নিয়ম করে কখনও দেবতাঘরে যেতে দেখেনি বৈতল গুরুকে । কিন্তু তিনি একবার দিনের শেষে নিয়ম করে কোথায় যেন হারিয়ে যান । বৈতল ভাবে গুরুর ভর হয় । বৈতল ভাবে সিন্দুক খুলে টাকা বের করেন । গুরু বলেন,
--- না রেবা খালি বার করলে অইব নি । সিন্দুকো না জমাইলে বার করমু কেমনে । দিনো একবার একলা হওন লাগে । নাইলে তো আরি, রান্দা, বাইশর লাখান অস্তর অই যাইবায় । একটু স্বার্থপর না অইলে আর মানুষ অইলাম কেনে । ঔ সময় দেখবায় মগজেদি জ্যোতি বার অইব ।
বৈতল জ্যোতির দেখা পায় নি । বৈতল চেষ্টা করেও একাকী থাকার সুফল পায়নি । লুলার সঙ্গে, দুর্গাবতীর সঙ্গে, দুখু আপদের সঙ্গে, মামুপীর হেডমাস্টার সবার সঙ্গে থাকতেই বৈতলের সুখ । নতুন বান্ধবহীন দেশে রবিলালের সখ্য না পাওয়ায় একবার একাকী হয় বৈতল । মিরতিঙ্গার টিলায় যেমন তার পাথর, তেমন পাটপাথরের খোঁজে অভয়াচরণ ভট্টাচার্য পাঠশালার মাঠে বসে থাকে একাকী । আর এস এন কোম্পানীর জাহাজঘাটার সন্ধ্যায় ‘ছিরুভিরু পায়ে’র শব্দ শোনে । বরাক নদীর উপর নির্মীয়মান পুলের উপরমুখী নির্জনতা থেকে হারিয়ে যায় আকাশনীলের কুলুকুলু ডাকে । সন্ধ্যার ঘনায়মান অন্ধকারে আলো নেই কোথাও, কিন্তু আভাসে বোঝা যাচ্ছে পাথরের পুল উঠে যাচ্ছে গগনে, নদীর উপর থেকে সোজা গিয়ে থেমেছে, আকাশের গায় । নাকি আকাশ থেকে নেমেছে আকাশগঙ্গা । বৈতল দেখে বাঁশের বেড়া পুলের উঠতি পথে, আগাছার জঙ্গলে পরিত্যক্ত নির্মাণ । ঝোপঝাড় আর বেড়া পেরিয়ে পুলে ওঠা কঠিন কাজ নয় বৈতলের । তেলাল শরীরে গতি আনে বৈতল, বেড়া জঙ্গল পেরিয়ে মেচি বাঘের ক্ষিপ্রতায় অসমাপ্ত পুলের উপর দৌড়য় বৈতল, পেরিয়ে যায় এক নম্বর দুনম্বর খুঁটি । ভাবে এ কেমন পুল, শুধু উঠছেই উপরে । বাঁশের হাকম দেখেছে গ্রামের ছড়ার উপর বইয়াখাউরির হাতলহীন হাক্ম দেখে অভ্যস্ত বৈতলের চোখ বিস্মিত হয় সিলেটের লোহাপুল দেখে । সুরমা নদীর উপর এই বিশাল পুল দেখে বলেছে, বাপরে বাপ । বরাক নদীর উপর পাথরের পুল এত লম্বা না হলেও চওড়ায় বড় । বৈতল শুধু উপরেই ওঠে । তিন চার নম্বর খুঁটির নিচে বসে বলে, আঃ কী আরাম । এমন সুখের ঠাঁই কোথাও খুঁজে পায় নি শহরে । কিন্তু কোথায় নদী, অন্ধকারে কিছুই বোঝা যায় না । ঐ দূর কালীবাড়ির দিকে নদীর জলরেখা চিকচিক করে আলোর প্রতিফলনে । নদীর সুবাতাসে আকুল হয়ে মনে পড়ে তার ফেলে –আসা একাকীর সাম্রাজ্যকথা । প্রথমেই মনে পড়ে মিরতিঙ্গার টিলা পাহাড়, তারপর একে একে সব বিল হাওর চুনা পাথরের টিলা, পিয়াইন সুরমা কুশিয়ারা । বরাক নদীর পারের মানুষের বড় ভূতের ভয় । জল আর জঙ্গলময় শহরে শেওড়াগাছের ঘন ছায়া অন্ধকারে কলাগাছের দীর্ঘ পাতাকে ডাকে আয় আয়, পাতা বলে সরসর । দুখু এসব গাছভূতের কথা শোনায় বৈতলকে । বলে,
--- দেখছি কুনুবাড়ির ঘসামাজা থালবাটিত কিচ্ছু খাইছ না ।        
--- কেনে বে ।
--- ইখানো মাইনষে ভূতর ভয়ে রাইত বার অইননা ।
--- তে কিতা করইন ।
--- অখন বুঝিলা । তেও যদি না বুঝছ খাওয়ার সময় বর্তনর গন্ধেউ বুঝি লাইবে ।
     সন্ধ্যের পর তাই আধখানি পুলের ধার ঘেঁষে না কেউ । খেয়াঘাটে তখন সাহেব ভূতের মোচ্ছব হয় । সাদা রঙের সাহেবরা এসে জড়ো হয় পুলের উপরসাহেব ভূতের জন্যই নাকি পুল সম্পূর্ণ হয় না । রাতের বেলা ভারিরা আসে হাজারে বিজারে । কত রকমের খাবার আসে কেক পাউরুটির বাখরখানি রুটি গরু শূয়োর মুরগির মাংস আসে কাছাড় ক্লাব থেকে । চিনামাটির বড় বড় বোতলে বিলাতি মদ আসে জন স্মীল থেকে । সদরঘাটে সারসার গাড়ি জমে থাকে সারারাত । জুড়িন্দায় পারাপার হয় সাহেব মেমে ভর্তি গাড়ি । ঘোড়ায় চড়ে আসে লাবকের ডাক্তার । বৈতল তাই ঘাপটি মেরে বসে থাকে বিলাতি ভূত দেখতে । দেখার হাওরে, বড় হাওরেও ভূত আছে শুনেছে মায়ের কাছে । মা বলে,
--- দেওলা ।
বলে,
--- দেখিছ, একদিন আমারেও দেওলায় নিব ।
মাকে দেওলায় নেওয়ার ভয় নিয়ে বড় হয়েছে বৈতল । সন্ধ্যে হলেই মাকে আগলে আগলে রাখে । হাওরমুখো হতে দেয় না । বাপের মুখ যেদিন ছোটে, সেরাতে বৈতল মাকে ছাড়ে না এক মুহূর্তের জন্য । নৌকোর কাছি খুলে বাপ যে – রাতে ডাকে, বৈতল প্রমাদ গোনে । একাকী মাকে রেখে যায় কী করে । বাপের কথাও অমান্য করে না বৈতল । বাপ বলে,
--- হেই বৈতল, পানিত লাম ।
 নেমে যায় বৈতল বাপের সঙ্গে পানি খেইড় খেলতে । সারারাত ধরে মাছ ধরার খেলা । জল খেলার রাতে বৈতল বাপের সঙ্গেও খেলে । বন্ধু লুলাকে ডেকে আনে । বলে,
--- মারে দেখিছ ।
বৈতল মাকে শেষ দেখা দেখতে পারেনি । লুলা দেখেছে । লুলা করেছে সন্তানের কাজ । সর্পদংশনে মৃত মায়ের সৎকার । মাকে নিয়ে লুলার সঙ্গে হিংসার সম্পর্ক বৈতলের । মা আবার তাদের জুড়েও রাখে । বলে,
--- রাম জন্মাইতে বেটা রইম । দেখিছ ছাড়াছাড়ি অইছ না ।
     সেই লুলার শ্বাসনালী টিপে মেরে ফেলে দিয়েছে বৈতল ক্রুদ্ধ পিয়াইন এর জলে । ছাড়াছাড়ি হয় জীবনের মতো । লুলার যে বুদ্ধিনাশ হয় । লুলা কেন মরে, এখনও হিসাব মেলাতে পারে না বৈতল লোকে বলে লুলা বেছে বেছে হিন্দু মেয়ের সর্বনাশ করে, ধর্মনাশ করে । বৈতল জানে লুলা ওরকম নয় । লুলার মনে মলিন রঙের সব দুঃখ । লুলার মা নেই । বাপ নতুন মাকে নিয়ে চলে যায়, লুলা বড় হয় নানার কাছে । বৈতলের মাকে মা পেয়ে লুলা হাসে । সেই মাও একদিন চলে যায় আচমকা । বৈতলও নেই বইয়াখাউরি, মনসাপুঁথি শেখাতে রেখে এসেছে বিয়ানিবাজারের রইদপুয়ানি গ্রামে । কালো রঙের পেচকুন্দা পাখির সঙ্গে জড়িয়ে যায় বৈতল গুরুগৃহে । গুরু সৃষ্টিধরের কনিষ্ঠা কন্যাকে যখন ছেড়ে যায় তখন দেরি হয়ে গেছে । লুলা বইয়াখাউরি ছেড়ে চলে গেছে পাগলা । লুলা কবিগান লিখতে শুরু করে । সুর করে পড়ে গ্রামের হাটে বাজারে । লুলা নাম পাল্টে হয় দিলবাহার বাঙ্গাল । বৈতলকেও বলে নতুন নাম দেবে সুখবাহার । বৈতলের টানেই লুলা ফিরে আসে এনায়েৎপুর কবরখানায় । সব হারিয়ে বরাকপুলের চারনম্বর খুঁটিতে বসে বৈতল বুক চাপড়ায় একা একা । অশরীরী লুলাকে বলে,
--- কৈ দিলে বেটা । নাম দিলে না, সুখও দিলে না, গেলেগি । মার কথা রাখলে না, মায় কইছলা ছাড়াছাড়ি অইছ না । এক বেটির লাগি মরি গেলে । দুর্গার উপরেউ তর চউখ  পড়ল কেনে । দুর্গায় তো তোরে চাইত না । তে কেনে হাত দিলে তাইর গাত । দুর্গা কথার অর্থ জানছনা বেটা । দুর্গার গাত যখন হাত দিচছ তর বিনাশ তো অইবউ ।
নির্বান্ধব শহরে এতসব কথার মাঝে কি চোখ দিয়ে টপটপ জল ঝরে বৈতলের । বৈতলের চোখ চুনাপাথরের থলা, জলের কোনও উৎস নেই । বৈতল কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করে না । কিন্তু বুক ফাটে মাঝে মাঝে । বুক খুলে দেখায় না বৈতল । তবু দেখে তিনজন । অন্ধকারের অতিথি আরো তিনজন তখন চারের উল্টো খুঁটিতে । গাঁজার আসরে বসে তিন ভূতশরীর । বেয়াদব দখলদারের উপর রাগে ওরা
তিনজনের মধ্যে বেঁটে লোকটাই দুখু । দুখুই ন্যাকড়া জড়ানো চিলিম বাড়িয়ে দেয় বৈতলের দিকে । সন্দেহের চোখে দেখে, বৈতল জানে, বাট্টি হারামজাদার লাট্টি । সাবধান হ্য় । শুকনো নেশার মৌতাতে না করতে নেই, তাই নেয় । কয়েকটানে পেটভরা ধোঁয়া নিয়ে চুলু ঢুলু চোখে বলে,
--- ইতায় আমার কিচ্ছু হয় না । আমার লগে কানা পয়সাও নাই যে বেহুশ করিয়া লুটি লাইবায় । খাওইয়াইছ, বালা করছ । আমিও খাওইয়াইমু একদিন । কও কুনদিন খাইতায় ।
--- আমরা রুজঅউ খাই ।
--- আমিও খাই । তে ইতা নায় । আমি মালা খাই ।
--- মালা কিতা । পানি নি । শরাব ।
--- না, না । মউয়া চিনো নানি ।
--- মউয়া ।
--- অয় আমিও চিনতাম না । তে ইখানো আইয়া জমিদার বাড়ির উঠানো দেখলাম মস্তবড় এক গাছ । সাদা সাদা গুটার লাখান ফুল । খাইলে নিশা হয় । আমার বউএ গাছর তলে যেতা পড়ি থাকে ইতার মালা করিয়া শুকাইয়া রাখি দেইন । আর আমি যখন রিক্সা লইয়া রাইতর টিপো যাই, তখন মালা থাকিয়া ফুল ছিড়িয়া খাই । কী মজা লাগে । পেডেলর আগেউ গাড়ি ছুটে ।
--- ধুর বেটা পগার পগা । তর বাড়ি কই । কোন জমিদার বাড়ির কথা কইরে ।
--- বৈতলরে পগা উগা কইছ না । মারি ফালাই দিমু কইলাম, তিনটায় মিলিয়াও কিচ্ছু করতে পারতে নায় । অখন গাইঞ্জা খাওয়াইচছ, কিচ্ছু কইতাম নায় । যদি লাগতে চাছ, কাইল আইছ, হরিৎবরণ জমিদারিত । দেখাইমুনে মউইয়ার তাকত ।
--- বাক্কাউ দেখি শুক্কুর মামুদর পুত । তিন টানেউ বেটা হাতেমতাই ।
--- কইলাম যে ইতার আমার কিছহু হয় না । আমার আসল নিশা পানি ।
--- পানিও খাচ নি বেটা অত পয়সা পাছ কই । জমিদারে দেয় নি পেদারে ।
--- জমিদারে কেনে দিত । আমি কাম করি নানি । আমার রিক্সা আছে । আরো কাম আছে । রাইত টিপ মারলে বহুত পয়সা ।
সব উল্টোপাল্টা হয় । নেশাড়ু তিনজনের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মন খুলে দেয় বৈতল । ইশারায় জানায় তার সব কথা । বুঝলে বোঝ, কাছে এসো । দোস্তি করো । দেশ ছাড়ার পর তো বিশ্বাসের মানুষ পায়নি । অন্ধকারের তিন চুতরা পাতাই সই । বইয়াখাউরির একমাত্র বদমতলবি মানুষই হলো বৈতল । আর সব ভাল । বন্ধু লুলা ও সহজ সরলবৈতলের পাল্লায় পড়ে সিলেট জুড়ে ধূর্তামি করে বেড়িয়েছে । তখন তো একটাই দেশ, সবাই মিলে মিশে থেকেছে নিজের নিজের ভিটেয় । এখানে স্থানীয় মানুষ আর ভিটে ছাড়া মানুষে হয়েছে রেষারেষি । সব শয়তানি শিখেছে খাদ্য আর বাসস্থান এখন সহজলভ্য নয় । ভালমানুষিতেও কাজ হয় না । রিফ্যুজি না হয়েও অনেকে ক্যাম্পে নাম লেখাচ্ছে । চাল ডাল নগদ টাকায় ডোলের সন্ধান পেয়েছেতাই বৈতল একটু মেজাজ দেখায় । মারামারির ভয় দেখায় । মানে পুরোপুরি বিশ্বাস নেই এখনও । কিন্তু বৈতলের পছন্দ হয়েছে একটাকে । যেটা খুব চ্যাটাংচ্যাটাং কথা বলেছে, বেটার নাম দুখু । গাঁজা খায় না কিন্তু সঙ্গ দেয় । মানে, বৈতল ঠিকই ধরেছে, ঐ ব্যাটাই হারামজাদা । পঞ্চায়েতির উস্তাদ । বাকি দুটো বছই আর আপদ । তিনটেই বাঙাল, মুসলমান । দুখুই ওদের দাবড়ে বেড়ায় । বৈতলের সন্দেহ, লোকটা অনেক কুকর্ম করে । যদিও বলে মামুপিরের খিদমতগার । অন্ধকারের ভিতরই বৈতলকে জেরা করে । বলে,
--- তোর বাড়ি সুনামগইঞ্জ নি
--- তুই কেমনে বেটা, হক্কলতাত উস্তাদি মারছ দেখি ।
--- আউয়া দেখলেউ মারি । তোর পানি নিশা কইলে নানি ।
--- পানি তো হবিগঞ্জোও আছে ।
--- আউয়া নাই হবিগইঞ্জো । ছলাইরে নি ।
--- না বেটা, তোর খুব পানিতরাস । শরীল দেখিয়াউ বুঝিয়ার । পানিত নামতে নি । অউত্ত দেখ আধখানি পুলর মাথা । মাথা থাকি মার এক ফাল, গিয়া পড়বে পানিত । পাইবে মাছ । ঘাঘট বোয়াল গজার । ধরিয়া লইয়া আইতে পারলে কইমু বেটা ।
--- হাচানি । আমারে হাচারির আউয়া পাইচছ নি । নদীত গজার ধরতাম । জাল ছাড়া মাছ মারতাম ।
--- ঠিক আছে, গজার নায় রউ অউ ধর চাইন দেখি ।
--- জাল লাগব ।
--- তে আর তুই বেটা কিওর পাটনি ।
একটু তো নেশা হয় বৈতলের । কিন্তু বৈতলের কাছে সব নেশার রাজা হল জল । তাই নদীর জলের কথায় নড়ে চড়ে জলচর শরীর । বৈতল জানে জলকে তার ভয় নেই । জলের নাগাল পেলে সে মহাবীরযদি অর্ধেক পুল থেকে ঝাঁপ দিলে নদী হয়, তাহলে কোনও ভয় নেই । সে নেবে যাবে ঝপাং । কিন্তু যদি জলের বদলে থাকে শুকনো পাথর । বেঘোরে মারবে বৈতল । তবে বন্ধুহীন বেঁচে থাকাও কি বাঁচা । যদি ওরা ভুল বলে, তবে ওরাই মরবে । একের বদলে তিনদগ্ধে দগ্ধে মরবে । লুলা তাকে যেমন মারছে, মারবে সারাজীবন । তাই নবীন বন্ধুদের বলে, আনবে । মাছ ধরে আনবে । একটা কিছু বাহাদুরি না দেখালে ওরাই কেন মানবে বইয়াখাউরির মাইমলকে । বৈতল ভুলে যাওয়া দেবীকে স্মরণ করে, গুরু সৃষ্টিধরের চরণে প্রণিপাত করে, পেছন ফিরে দেয় দৌড় । চারের খুঁটি থেকে পিছিয়ে তিন দুই এক । বৈতল পালাতে জানে না, বেটাগিরি দেখাতে পেলে ছাড়ে না । তেলাল শরীর থেকে নিমা খোলে, তফন খোলে, আন্ডার প্যান্টের ফিতে শক্ত করে বাঁধে । অন্ধকার রাতের স্নগে মিশে যায় বাপের বেটা বৈতল । শরীরে পায় মাইমলি গন্ধ । বাপ যেমন বলে,
--- মাছর লগে লড়তে অইলে, সাপর লগে লড়তে অইলে মাইমলি গন্ধ লাগে । কালা তেলাল শরীর লাগে । শত্রুরে ডর দেখানি লাগে আইছলা গন্ধে ।
     কে কার শত্রু । কাকে বৈতল ভয় দেখাবে তার আঁশটে গন্ধে আর কালো শরীরে । বৈতল এখনও জানে না পাগলার মেয়ে দুর্গাবতী তার কালো শরীরকে ভয় করে না ভালবাসে । দুর্গাবতীর কাছে সে অবলম্বন না ভরসা, জানে না বৈতল । দুর্গাবতীর দুধের শরীরটায় লোভ আছে বৈতলের, তাই দুর্গার পায়ের তলায় পড়ে থাকে । রহস্য করে বলে,
--- আমি অইলাম ভোলানাথ । তুমার পাওর তলে পড়ি থাকমু ।
     বিয়ানিবাজার রইদপুয়ানির চায়নার রঙ নিকষ কালোবৈতলের রঙে রঙে মেলানো । মনটা যে ধলা ফক্‌ফকা । মন দিয়ে বসে রয়েছে, শরীরও যে দিতে চায় । নেয় না বৈতল । কেন, কালো বলে, গুরুকন্যা বলে । সৃষ্টিধর ওঝা কাঠমিস্ত্রি বৈতলকে শেখান পুঁথির মন্ত্র, মনসামঙ্গল । শেখান জাতিধর্মের বিভেদ ভুলতে । বৈতল জানে চায়নার গায়ের রঙই বিভেদ করে । আবার সেই গায়ের রঙই মনে পড়ে রেল গাড়ির কামরা । টেলিগ্রাফের তারের উপর দেখা লেজঝোলা ফিঙে পাখি । চায়নার কাছে ফিরে আসে । বলে,
--- অউ পেচকুন্দির টানেউ আইলাম আবার ।
      ফিরে আসে বৈতল চামেলির কাছে । থাকে কই । গুরুকে অমান্য করে চলে যায় বইয়াখাউরি আবারধলাবরণ দুর্গাবতীর জন্য খুনখারাবিও হয় । দেশ ছাড়বে না বলে শপথ করেছিল । জেল ফাঁসির ভয়ে পালিয়ে যায় ইন্ডিয়া ।
 নতুন শহরের এমাথা থেকে অমাথা রিক্সা চালায় বৈতল । ‘যাইতায় নিবা’ বললে সেও মাঝে মধ্যে বলে ‘যাইতাম নায়’ । শহরের প্রতিটি গলিঘুঁজি বৈতল চেনে । দিনের বেলা, রিক্সা চালাতে চালাতে সে দেখেছে পুলের অবস্থান । বৈতল জানে কোনখানে জল, কোনখানে চোরাপাথর । তবু সে দৌড়য় । সাহেব ভূতের মোচ্ছব দেখতে এসে তারও সাধ হয় ভূত হওয়ার । মহাবীরের মতো দৌড় শুরু করে বৈতল । আত্মহত্যা করার মানুষ নয় সে, তবে কেন সে দৌড়ে পৌঁছে যায় শেষ সীমায় বৈতল জানে তার মনে কী আছে । বৈতল জানে বন্ধুরা জাপটে ধরবেই । নইলে যে মরণ । ভাঙাপুলের শেষ সীমানা থেকে অনেক দূরে নদী । ঝাঁপ দিলেই পাথুরে পথের উপর থেঁতলে মরা । বেঁটে লোকটা, যার উস্কানি সবচেয়ে বেশি, সেই আটকে দেয়, আপদ অন্ধকার জড়িয়ে ধরে কাঁদে । বছই সাজায় আবার চিলিম । বৈতল হাসে রহস্যনয়নাকি কাঁদে ভিন্নধর্মী তিন বন্ধুর বুকে মুখ রেখে । বুক কাঁদে, বৈতলের চোখে দুষ্টুমি ছাড়া কোনও ছাপ নেই ।



চলবে  

Sunday, August 21, 2016


ব্যবহারিক 

 

খবরটা পড়ে আঁতকে উঠল শমিতা । ‘দেওয়াল ধসে মৃত দুই, গুরুতর আহত এক ।’ মৃত ও আহত সকলেই শিশু । গুরুতর আহত শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে । এইরকম খবর মাঝেমাঝেই খবরের কাগজে বের হয়, ঘটনাস্থল ও ঘটনাগ্রস্ত অপরিচিত হলে লোকে দার্শনিক ঔদাসীন্যে পাতা উলটে যায় । শমিতা চমকে উঠল, কারণ আহত  যে শিশুটি দেওয়াল চাপা পড়ে মৃত্যুর শিকার হতে হতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, তার নাম পরিচয় ওর জানা, সে শমিতারই এক সময়ের ঝিয়ের মেয়ে টুসু ।

শমিতার মনে হল মৃত্যু যেন তার কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেল । তার ঘরের আশেপাশেই ওত পেতে বসেছিল। আকস্মিক বিপদ থেকে সদ্যমুক্তির স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল শমিতা, ভাগ্যিস তার নিজের সন্তান, স্বামী বা আপনজন  কেউ সেই চরম দুর্ভাগ্যের শিকার হয়নি । বিপদটা ঝিয়ের মেয়ের উপর দিয়ে কেটেছে ।

শমিতা আবার চমকে উঠল ।

এটা সে  কি ভাবছে । এরকম ভাবনা তো অনুচিত । যেখানে আবেগের ঘাটতি পড়ে, সেখানে লোকে উচিত অনুচিত দিয়ে পুষিয়ে নিয়ে কর্তব্য করে । শমিতা গৃহবধূ হলেও কলেজ ইউনিভার্সিটিতে পড়া শিক্ষিত মেয়েকলেজ ইউনিভার্সিটি জীবনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক তত্ত্বের সঙ্গে পরিচিত, উচিত অনুচিত, কর্তব্য অকর্তব্য বিষয়ে অবহিত ।

আর এটাও তার মনে পড়ল যে বাচ্চা মেয়েটা  দেওয়াল চাপা পড়ে আজ হাসপাতালে, তাকে সে এইটুকু থেকে দেখেছে । তাদের বাড়িতে প্রায়ই আসত ওর মা শান্তির কোলে চেপে কিংবা হাত ধরে । শমিতারা তখন হাওড়ার যেখানে থাকত, তার কাছেই বোজাপুকুর বস্তি---- এলাকার সবরকম সস্তা শ্রমের জোগানদার ।

কালোকোলো হলেও দেখতে বেশ মিষ্টি ছিল মেয়েটি । বেশির ভাগ সময়ই হাসিখুশি থাকত । তাই শমিতার খারাপ লাগত না, দু-একটা কথাও বলত । ওর মা ওকে বসিয়ে রেখে কাজ করত ।

তবে মাঝে মাঝে যখন কাঁদত, তখন বিরক্তি চেপে শমিতা ওকে একটা বিস্কুট ধরাত । নোংরা করলে গা গিন গিন করত, দাঁতে দাঁত চেপে শান্তিকে বলত জায়গাটা পরিষ্কার করে দিতে । শমিতার উপায় ছিল না, ‘বাচ্চা নিয়ে কাজে এসো না’  বলতে মুস্কিল ছিল । বউটার কাজ ভাল, কামাই বড় একটা করত না, হাতসাফাইয়ের দোষ ছিল না । তায় দরকারমত বাড়তি কাজও করে দিত, অজুহাত দিয়ে পালাত না । কাজে কখনোসকনো খুঁত থাকলে শমিতা বকত, শান্তি জবাব দিত না ।

আর শান্তি যে রোজ বাচ্চা নিয়ে কাজে আসত তা নয় । অনেক দিন বাচ্চাটিকে ঘুম পাড়িয়ে প্রতিবেশী কাউকে বলে আসত । এইসব কারণে অসুবিধাটুকু শমিতা মেনে নিত । বরং ভাল কাজের লোক কেউ ভাঙ্গিয়ে নিয়ে যাবে---- এই ভয়ে কুড়িটাকা ও বাসি খাবার বাড়তি দিয়ে তাকে ধরে রেখেছিল । ওর বন্ধুরা, যারা পাড়ায় অন্যবাড়িতে কাজ করত, তাদের শান্তি বলত, ‘বউদির মত লোক হয় না । আমি কতদিন বাচ্চা নিয়ে কাজে যাই, তবু কিছু বলে না ।’ বন্ধুরা হিংসেয় জ্বলত । বলত, ‘দ্যাখ, অত ভাল দেখাচ্ছে যখন তখন নিশ্চয়ই ভেতরে ভেতরে কিছু মতলব আছে ।’ শান্তি বলত, ‘তোরা তো সবকিছুতেই মতলব দেখিস ।’

টুসু একটু বড় হলে শমিতা ওকে স্কুলে ভর্তি করবার জন্য সাহায্য করেছিল । সে যখন তিন বছরের, তখন শান্তি একদিন এসে বলেছিল, ‘আমার মেয়েটাকে এবার আর ইস্কুলে ভর্তি করতে পারলাম না বৌদি ।’

‘এখনি স্কুলে ভর্তি করার কি আছে ? ক্লাস ওয়ানে তো পাঁচ বছরের আগে নেবে না ।’ শমিতা জানত এখানে যে নার্সারি স্কুল আছে, তাতে শুধু মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরাই পড়ে। শমিতার নিজের মেয়েও সেখানে পড়ে । শান্তির মত খেটে খাওয়াদের ছেলেমেয়েরা সোজাই সরকারি প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হয়, কারণ বেসরকারি নার্সারি স্কুলের বেতন দিয়ে পড়ানো ওদের পক্ষে সম্ভব নয় । বাচ্চারা পড়তে গিয়ে পারলে এগোয়, না পারলে পড়া ছেড়ে দেয়, এবং আশি শতাংশ পড়ুয়া শেষেরটাই করে ।

‘আমতলা পেরাইমারি ইস্কুলে  নাসারি কেলাস খুলেছে, বৌদি । আমাদের পাড়ার অনেক বাচ্চা ওখানে ভর্তি হয়েছে । ওতে ভরতি হলে কেলাস ওয়ানে এমনি এমনি উঠে যেত । ইংরিজিটাও একটুকুনি শিখতে পারত ।’ শান্তি বলেছিল।

‘তবে দিলে না কেন ?’

‘অনেক টাকা লাগবে, বৌদি । এই ধরগে ভর্তির জন্য তিনশ টাকা, মাসে মাসে একশটাকা করে বেতন, বইখাতা, স্কুলের ডেরেস, সব মিলিয়ে পয়লা মাসে এক হাজার টাকার ধাক্কা । ওর বাবার কথা তো জানোই, রিশকা চালিয়ে যা পায় মাল খেয়েই উড়িয়ে দেয়। ’

শমিতা শুনেছিল ব্যাপারটা ।

বোজাপুকুর বস্তিতে কোনো স্কুল নেই, ছেলেমেয়েরা পড়তে চাইলে আমতলা প্রাইমারি স্কুলে যায় । স্কুলটা সরকারি, তাই অবৈতনিক, কাজেই পড়াশুনোর মান যেমনই হোক না কেন, গরিব মানুষ তাদের ছেলেমেয়েদের সেখানেই পাঠায় ।

ইদানীং সেখানে নার্সারি খুলেছে, কিন্তু সেটা বেসরকারি সেকশন, যদিও সরকারি স্কুলে বেসরকারি কোনো কার্যকলাপ চালানো বেআইনি। তাতে পড়াচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের পরিচালিত ক্লাবের সদস্য জনা দুয়েক বেকার দশ বারো ক্লাস পাশ । সরকারের দলের লোক, তাদের বেআইনি কাজও তাই সমাজসেবার তকমা পেয়েছে ।  পড়ুয়াদের ফিজ, বই এবং ইউনিফর্মের কমিশন, সবই প্রাইভেট স্কুল থেকে অনেক কম, ---- তবুও যা আসছে, সব মিলিয়ে ওদের পকেটমানিটা বেশ উঠে আসছে । আর ওখানে ভর্তি হলে  ক্লাবের দাদাদের দেওয়া সেই পরিচয়ের জোরে প্রাথমিক ক্লাসে ভর্তির জন্য মা-বাপের আর চিন্তা থাকবে না ।

ক্লাস ওয়ানে ভর্তি করতে গেলে সিট নেই এই অজুহাতে ফিরিয়ে দেবার ভয়, আবার ইংরাজি শেখানোর লোভ----খেটে খাওয়া মানুষদের মধ্যেও  সন্তানকে নার্সারি স্কুলে ভর্তি করার হিড়িক পড়ে গেছে , যদিও বাংলা স্কুলে পরবর্তী বছরগুলোতে ইংরাজি না থাকায় এই  বড়জোর অক্ষরপরিচয় ও সামান্য শব্দার্থের ইংরাজি শিক্ষাটা কাজে আসবে না । এরপর প্রাণপণ খেটে স্কুল ও প্রাইভেট দিদিমণির মাইনে জোগাড় করার পালা ।

শমিতা বলল, ‘ঠিক আছে, হাজার টাকা দিয়ে দিচ্ছি, টুসুকে স্কুলে দিয়ে দাও । পরের তিন মাসে মাইনে থেকে কেটে নেব । আর টুসুকে বিকেল বেলা তোমার সঙ্গে নিয়ে আসবে, আমিই পড়িয়ে দেব ।’ কৃতজ্ঞ শান্তি কথা খুঁজে পায় না ।

সেই সময় শমিতার শাশুড়ি ওর সঙ্গে ছিলেন । শাশুড়ির কাজের জন্য আরো একজন লোকের দরকার হয়ে পড়ছিল । পরদিন থেকে সকালে বিকেলে দুবেলাই শান্তির কাজের সময় বেশ খানিকটা করে বেড়ে গেল । শমিতা আর বাড়তি লোক রাখল না । বরং টুসুর পড়ার জন্য ঘরের কাজে শান্তির উপস্থিতি একশো শতাংশ নিশ্চিত হল । পাড়ার লোকের কাছে  পরোপকারী মহিলা হিসেবে তার পরিচিতি হয়ে গেল । সুযোগের সদ্‌ব্যবহারের জন্য সে স্বামী ও শাশুড়ির কাছে বুদ্ধিমতী বলেও প্রশংসিত হল । টুসুর পড়াশুনো অবশ্য এগোচ্ছিল, সন্দেহ নেই ।

বছরখানেক পর শমিতারা হাওড়া ছেড়ে কলকাতা চলে আসে । সদ্য তৈরি হওয়া নতুন ফ্ল্যাটে ধূলোবালি ঝাড়া, মালপত্র সাজানো গোছানো ইত্যাদি কাজের জন্য শান্তিকে দুদিনের জন্য নিয়ে এসেছিল । এজন্য কিছু টাকা শান্তিকে দিতে চাইলে শান্তি বলেছিল, ‘থাক বৌদি, আর কত নেব তোমাদের কাছ থেকে । তোমরা আমার জন্য কত করেছ । আমার ভাই ভাইবৌ যদি কোথাও যেত, তবে তাদের জন্যেও এটুকু কাজ করে দিতাম ।’ ফেরত যাবার বাসভাড়াটুকু শুধু নিয়েছিল ।

শমিতার হিসেব মিলে গিয়েছিল । বাড়তি পাওনা হল, নতুন জায়গায় লোক নিয়ে এসে কাজ করানোতে পড়শিরাও তাকে একেবারে উটকো ভাবল না, আর এখানকার স্থানীয় কাজের লোকেদের একটা বার্তা দেওয়া গেল, নতুন লোক দেখে যা তা রেট বলা চলবেনা । আর  নতুন লোক নিলে সে কখনোই শান্তির মত পাকা হাতে ও বিশ্বস্তভাবে এত কাজ করত না ।

ফেরত যাবার সময় শান্তিকে শমিতা বলেছিল, ‘টুসুর পড়া ছাড়িও না । আমি ঠিক ওর খবর নেব ।’ শান্তি ম্লান হেসে বলেছিল, ‘দেখি কতদিন পারি ।’ নতুন জায়গায় নতুন পরিবেশে শমিতার বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে, ব্যস্ততায় আর খবর নেওয়া হয় নি । এতদিন পরে এই খবর পেল, তাও খবরের কাগজ পড়ে ।

ঠিকঠাক জানবার জন্য শমিতা ওখানকার ভূতপূর্ব প্রতিবেশিনীকে ফোন করল । প্রতিবেশিনীর বাড়িতে শান্তির পাড়ারই একটা মেয়ে কাজ করে, তাই উনি নিশ্চয় বলতে পারবেন ।

‘শুনেছেন তাহলে খবরটা,---- হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনাদের কাজের মেয়ের বাচ্চাটা---- শুনে অবধি আপনাদের কথা মনে হয়েছে-----জখম সাংঘাতিক, বাঁচবে কিনা সন্দেহ ----- নিয়ে গেছে মেডিক্যালে----আপনি আসছেন তো ?----- বড্ড ভালোবাসতেন কিনা ওকে আপনার তো খারাপ লাগবেই ।

শমিতা সাবধান হয়ে গেল, আবেগের বেশি প্রকাশ হয়ে গেল না তো ? বলল, ‘দেখি আসতে পারি কি না । পারলে শান্তিকে বলবেন ফোন করতে ।’ তারপর কুশল বিনিময় ও পূর্বতন পাড়ার খোঁজখবর নিয়ে ফোন ছেড়ে দিল । পড়শিনি যদি দায়িত্ব নিয়ে শান্তিকে খবর  দেন তাহলে দেখা যাবে । বেশি ভালবাসা দেখালে খরচা আছে ।

বিকেলে শান্তি ফোন করল পড়শিনির বাড়ি থেকে, ‘বউদি, আমার সব্বোনাশ হয়ে গেছে বউদি। আমার মেয়েটা কথা বলছে না । কি করব আমি। ডাক্তার বলছিল অনেক টাকা লাগবে । তুমি তো ওকে কত ভালবাসতে । যদি কিছু সাহায্য কর ।’ ফোনেই কাঁদছিল ।

শমিতা ঠান্ডা গলায় বলল, ‘কেঁদো না, দেখি কি করতে পারি । কাল পরশুর মধ্যে একবার আসার চেষ্টা করব ।’ ফোনটা কেটে দিল । খবর নিয়েছে বলেই পেয়ে বসেছে, সাহায্য চাইছে । এতক্ষণের সহানুভূতি তরল হয়ে বিরক্তির আভাস উঁকি মারছিল ।

ব্যাপারটা ভাল হল না । শান্তি পড়শিনির বাড়ি থেকে ফোন করায় এবারে ওকে যেতেই হবে । এতদিনের ভাবমূর্তির একটা ব্যাপার আছে । পড়শিনি আবার ভালবাসার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন । শমিতার রাগ হচ্ছিল । কাউকে কিছু দিতে হলে বা সাহায্য করতে হলে উনি তো চোখে সর্ষেফুল দেখেন । একটু খোঁজ নিতে না নিতেই একেবারে ধরে নিয়ে এসেছেন । শমিতা খালি হাতে শুকনো আশ্বাস দিলে এখন উনি মজা দেখবেন, ওকে ওঁর সমান স্তরের ভাববেন । এখন আবেগের খেসারত দিতেই হবে, উপায় নেই ।

শমিতা ওর স্বামীকে শান্তির কথা বলেছিল, কিন্তু সে কোনো উত্তাপ দেখাল না । উলটে জিগ্যেস করল, ‘কোন শান্তি ?’ মনে করিয়ে দিতে বলল, ‘কোন কালে সেই পাড়া ছেড়ে এসেছ, এখনো সেখানকার ঝিয়ের কি হল তার খবর নিতে হবে নাকি? তোমার যত আদিখ্যেতা । কি দরকার গায়ে পড়ে দরদ দেখাবার ? ওরকম বস্তিতে বস্তিতে কত অ্যাক্সিডেণ্ট হয় ।

এমনিতে ব্যাঙ্ক অফিসার স্বামী তাকে মোটা টাকাই হাত খরচ হিসেবে দেয়, তার বেশির ভাগই খরচ হয়না, মাসের শেষে সে ব্যাঙ্কে রেখে দেয় । বেশ কিছু জমলে দু এক পদ শখের গয়না কেনে । এবারে প্ল্যান ছিল পুজোর আগে একটা হিরের দুল কিনবে । এখানকার প্রতিবেশী অনেক মহিলারই কিছু কিছু হিরের অলঙ্কার আছে । তার নেই, সেজন্য নিজেকে ওদের কাছে খাটো মনে হয় । কিছু টাকা শান্তিকে দিতেই হবে । টাকাটা আবার কমে যাবে, এবারে পুজোয় আর হিরের দুল পরা হবে না । বউ বেশি দান দক্ষিনা করলে তার বরও মুঠি শক্ত করে । কি আর করা । তবে সে বেশি দিতে পারবে না । তার বাড়িতে কাজ করলেও নাহয় কথা ছিল । দেওয়া টাকাটা এবারে পুরোই জলে যাবে ।

 পরদিন বর অফিসে বেরিয়ে গেলে মেয়েকে শাশুড়ির কাছে রেখে শমিতা সেখানে গেল ।

ওর মত ভদ্রমহিলা খুব কমই ওইরকম জায়গাতে যায়, তাই লোকে তাকিয়ে দেখছিল । অনেকদিন ওদিকে থাকার দরুণ অনেকেই মুখ চিনত, তাই ফিসফিসানি কানে আসছিল, শান্তির কাজের বাড়ির বৌদি । শমিতা একজনকে শান্তির বাড়ির ঠিকানা  জিগ্যেস করায় উৎসাহী কয়েকজন তক্ষুনি তাকে রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে গেল । খোলা  দুফুট চওড়া নর্দমার পাশ ঘেঁষে সরু তিনফুট ইটের রাস্তা, রাস্তার একধারে কোথাও দরমা কোথাও টিন বা ইটের দেওয়াল, মাথায় পলিথিন নাহয় খাপরার টালির ছাদ, গায়ে গায়ে লাগানো ছোটো ছোটো ঝুপড়ি ঘর ।

দুপুর বেলা, তাই মেয়েরা বেশিরভাগই বাবুদের বাড়ি কাজ করে ফিরেছে । কেউ কেউ রান্না করছে, কেউকেউ বাচ্চা কোলে খাওয়াচ্ছে, কেউকেউ দরজায়  বসে  পরস্পরের উকুন বাছছে ।  ন্যাংটো অথবা নোংরা জামাকাপড় পরা ছোটছোট ছেলেমেয়ে রাস্তায় ছোটাছুটি করছে, খেলছে । ক্ষয়াটে চেহারার দুচার জন পুরুষও বসে আছে, হয়তো কাজে যায় নি, কিংবা কাজ থেকে ফিরে এসে বিশ্রাম নিচ্ছে ।

ইটের রাস্তা যেখানে শেষ হয়ে গেছে, সেখান থেকে মাটির রাস্তা ধরে এ ঝুপড়ির সামনে তো ও ঝুপড়ির পেছন দিয়ে ছাইয়ের গাদা, মাছি ভন্‌ভন করা নোংরার স্তূপের উপর দিয়ে খোলা নর্দমা সাবধানে ডিঙ্গিয়ে যখন শান্তির বাড়ি পৌঁছল, তখন শমিতা আশ্চর্য হয়ে দেখল, বস্তির বেশির ভাগ বাড়িই এইদিকে । এইরকম জায়গায় ও এতো লোক থাকে !

উৎসাহী লোকগুলো কোত্থেকে একটা চেয়ারও জোগাড় করে বসতে দিল, নিজেরা দাঁড়িয়ে রইল। শান্তি বাড়িতেই ছিল । কোলে আরেকটা বাচ্চা থাকাতে হাসপাতালে যেতে পারে নি।

শমিতা জিগ্যেস করল কি হয়েছিল ।

শান্তি কিছু বলবার আগেই লোকগুলো বলতে লাগল, বাচ্চাগুলো স্নান করে দশটায় স্কুলে যাবে, তাই পুকুরে গিয়েছিল । হটাৎ ই পুকুরপাড়ে কারখানার দেওয়াল ভেঙ্গে পড়ে । দুটো বাচ্চা সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে যায়, টুসুর মাথায় চোট লাগে । আজকে সকালে জ্ঞান ফিরেছে, ডাক্তার বলেছে অপারেশন করতে হবে । ওর বাবা ও পাড়ার আরও দুজন হাসপাতালে রয়েছে ।

শান্তি ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদছিল । শমিতা ওর পিঠে হাত রাখল সান্ত্বনা দিতে । হাতটা গিন্‌গিন করছিল, কি নোংরা ! গুণে গুণে  তিনহাজার টাকা শান্তির হাতে দিল, সবাই দেখল, সে নিতান্ত কম দিচ্ছে না । এই বাজারে এত টাকা কেউ কাউকে মাগনা দেয় না । তার ব্যাগে  অবশ্য  আরো হাজার তিনেক টাকা ছিল, কিন্তু বাসে আসতে আসতে সে ভেবেছিল, এত টাকা দেওয়া যাবে না । এ টাকার কোনো রিটার্ণ নেই ।  তিন হাজার টাকাই যথেষ্ট ।

শমিতা ভাবছিল, শরীর গিন্‌গিন করছে, কতক্ষণে বাড়ি গিয়ে স্নান করতে পারবে, কিন্তু লোকগুলো একজন সমব্যথী ভদ্রমহিলাকে পেয়ে এত তাড়াতাড়ি ছাড়ল না । ‘চলুন, বৌদি, অ্যাকসিডেন্টের জায়গাটা দেখবেন ।’  শমিতা নাচার হয়ে চলল, সহানুভূতি যখন দেখাতে এসেছে, তখন না গেলে তো চলে না ।

নোংরা নালাটির উপরে একজায়গায় সিমেণ্টের স্ল্যাব। সেটা নিশ্চয়ই কোনো ম্যানহোলের ঢাকনা ছিল, পাড়ার ছোঁড়ারা রাস্তা থেকে উঠিয়ে এনেছে । সেটাই এখন নালার পুল । সেটা পেরিয়ে ওধারে একটা জলা, তার ওধারে বড় বড় ফ্ল্যাট বাড়ি,  একধারে একটা কারখানার দেওয়াল । ফ্ল্যাট বাড়িগুলোর অন্যধারে রাস্তা থাকায় রাস্তা থেকে বস্তিটা প্রায় দেখাই যায়না ।

বিল্ডিং-গুলো তৈরি করার সময়ই জলার অনেকখানি বোজানো হয়েছিল, তাই তার নাম পড়েছিল বোজাপুকুর । এধারে কারখানাটাও জলা বুজিয়েই উঠেছিল । রাস্তার দিক থেকে নালাটা বোজাপুকুর বস্তির মাঝখান দিয়ে এসে এই পুকুরেই মিশেছে । কচুরিপানা ও সূর্যালোকে পরিশোধিত এই পুকুরের জলেই বস্তির লোকেদের স্নান কাপড়কাচা বাসন মাজা্র কাজ হয় । শমিতা এতদিন কাছাকাছি থেকেও কিছুই জানত না ।

কারখানার দেওয়ালের প্লাস্টার জায়গায় জায়গায় উঠে গিয়ে ইট বেরিয়ে গেছে । একজায়গায় পুকুরের উপর ইট ধসে পড়ে স্তূপ হয়ে  আছে -----লোকগুলো শমিতাকে দেখাল, অ্যাকসিডেন্টের জায়গা । শমিতা বলল, ‘তাইতো, এতখানি ইট পড়লে কেউ কি আর বাঁচে ? তায় সব বাচ্চা ।’

কেমন করে ঘটনাটা ঘটেছিল লোকগুলো তার সবিস্তার বিবরণ দিচ্ছিল । আর শমিতা মনে মনে ভাবছিল, এরকম তো হবেই । যেখানে সেখানে তোমরা ঘর বাঁধবে, রাস্তাঘাট, নালা, পুকুরপাড়----কোনো কিছুই বাকি থাকবে না । তোমাদের রুজিরোজগার নেই, থাকবার জায়গা নেই, তবু পিল্‌পিল করে বংশবৃদ্ধি করবে । তবে মুখে সে বলছিল, ‘ভাংতে পার না এসব দেওয়াল ? ভাঙ্গা দেওয়াল রিপেয়ার হয় না, বছরের পর বছর পড়ে থাকে, গরিবের ছেলেমেয়ে মারা জখম হয়, মারা যায়, কেউ দেখতেও আসে না ।’

নোংরা পরিবেশে গা গিন্‌গিন করলেও সে একধরণের আত্মপ্রসাদ অনুভব করছিল ।

সে এই বস্তিতে আসাতে, তার সঙ্গে কথা বলাতে, লোকগুলো নিজেদের ধন্য মনে করছে ।

ওদের চোখের দৃষ্টিতে তার প্রতি সমীহ অথচ আত্মীয়তা । এখানে নিজেকে বেশ উঁচু স্তরের জীব মনে হয় । ভেঙ্গে দাও গুঁড়িয়ে দাও বলা যায় কোনো দায়িত্ব না নিয়েই । সে অবশ্য জানত এই কারখানার মালিক এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার আত্মীয়ের । কাজেই এই ভাঙ্গা দেওয়ালেও ধাক্কা দেবার সাধ্য এদের নেই । তাই হয়তো নিরুত্তরে শুনছিল তার কথা ।

ফেরবার সময় শমিতা শান্তিকে বলেছিল, ‘চিন্তা করোনা, টুসু নিশ্চয়ই ভাল হয়ে যাবে । আমি আবার আসব, হাসপাতালেও খবর নেব সে কেমন আছে ।’

মাসখানেক হাসপাতালে কাটিয়ে টুসু বাড়ি ফিরেছে বটে, ওর আরো চিকিৎসা বাকি, সঙ্গে ওষুধ পথ্য এবং তার জন্য চাই আরো অনেক টাকা । ওর বাপ-মা সেটা কি করে করছে, তা ওরাই জানে । কিন্তু শমিতা আর ওদিক মাড়ায়নি বা হাসপাতালের যায়নি । সবাই জানে কথা পাত্রবিশেষে রাখতে হয় এবং সব কথা রাখতে নেই । বস্তির লোকেদের সমাজসেবী ক্লাব দেখুক, সরকার দেখুক, ওরা তো সরকারের ভোটব্যাঙ্ক । সে অনেক করেছে, এখন অন্য লোকে করুক । ভূতপূর্ব প্রতিবেশিনীকে কখনোসকনো ফোন করলেও শান্তির প্রসঙ্গ কখনো তোলে না ।  পুজোয় না হলেও দেওয়ালিতে সে হিরের দুল পরতে পেরেছে ।



(গল্পটি বছরপাঁচেক আগে করিমগঞ্জের 'দৈনিক নববার্তা প্রসঙ্গ'তে প্রকাশিত হয়েছিল ।---শিবানী দে)

Saturday, August 20, 2016

সুরমা গাঙর পানিঃ উজান পর্ব ৮

(দেশভাগ এবং পরের দশকের কাছাড় সিলেটের প্রেক্ষাপটে রণবীর পুরকায়স্থের এই উপন্যাস ছেপে বের করেছে দিন হলো। ভালো লাগা এই  উপন্যাস পুরোটা টাইপ করে তুলে আমার প্রিয় কথা শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। আশা করছি আপনাদের সবার এটি পড়তে ভালো লাগবে। সম্পূর্ণ উপন্যাসের সংলাপ ভাগটি সিলেটিতে -সে সম্ভবত এই উপন্যাসের সবচাইতে আকর্ষণীয় দিক। আপনাদের পড়বার সুবিধে করে দিতে, ঈশানে এই উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে আসছে। আজ তার  উজান  পর্বের অষ্টম অধ্যায় ---সুব্রতা মজুমদার।) 




আট 

ভ্যাসের বিরতি হলে, অনভ্যাসের নিবৃত্তি হলে বৈতলের দুঃখ হয় । বুকের ভিতর চুনখলার মার্তুলের ধুমধুমি হয় । ভেঙে খানখান হয় মন, চোখের দৃষ্টি হয় উদাস । তবু জল বেরোয় না এক ফোঁটা । হেডমাস্টার চলে যাওয়ায় মন খারাপের সঙ্গী হয়ে আসে বাদ্র মাস । অকালে মনের বৃষ্টি উজাড় করে ঝরে চরাচরে । টইটুম্বুর হয় বরাক নদী । আবার শুকোয়, আবার ভ্যাপসা গরম । গরমে গরমে ঢ্যাঙা গাছে তালের পাকা গন্ধ জানান দেয় শরতের মাঝামাঝি চলে এসেছে ঋতুচক্র ।
তালগাছেও চড়তে জানে বৈতল । পায়ে দড়ি বেঁধে উঠে যায় গাছে । সুপুরি কিংবা নারকেল গাছেও চড়ে । বৈতলের ভয়ডর নেই, তালগাছে চড়লে আর নামতেই চায় না । পায়ের বেড়ি টুকটুক করে ঘুরিয়ে দেখে সে চরাচর । যা অন্যে দেখতে পায় না । একদিকে বড়াইল পাহাড়, চারদিকে বরাক আর তার ছানাপোনা নদী । বৈতল গাছের উপর থেকে খোঁজে নদীর উৎস । কোথা থেকে আসে নদী । সমতলের নদীর গোলক ধাঁধার ভাঙানি খুঁজতে চোখকে নিয়ে যায় অনেক দূর । কিছুই নেই কোথাও । প্রকৃতি বৈতলের সঙ্গে কানামাছি খেলে । বৈতল তার গুরু সৃষ্টিধরের চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করে যেমন দেখেছে জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে ভাবে বিভোর হয়ে । দেখেছে কাছাড় দেশ, আর তার রানী নদী বরাক । ওঝা গুরুর পছন্দ নয় এই নদী । তাই বলেন,
--- অউ হুতার নালির দিকে চাইও না । এইন এক তেড়াভেড়া নদী । এইন মা নায় আমরার সৎ -মা ।
     বৈতল বোঝে গুরুর উচাটন । বোঝে দেশ ছাড়ার হিড়িক পড়ে গেছে । সিলেট ছেড়ে পালাচ্ছে সবাই । বরাক নদীর পারে স্থায়ী ঠিকানা চাইছে একদল মানুষ । গুরুর ভয়, যদি প্রিয় শিষ্য তাকে ছেড়ে যায় । তাই সত-মার প্রতিরোধ ।
মিরতিঙ্গার পাহাড়ে পাটপাথরের রাজা বৈতল । কিশোর বৈতলকে আবার ডাকে তালগাছ । তালগাছের আগায় সাম্রাজ্য ফিরে পাওয়ার আনন্দে ডগমগো হয় বৈতল । নেমে আসতে চায় না । চোখ মেলে তাকায়, দেখে ইটখোলা, ঘনিয়ালা, আর্যপট্টি, নসিবালি হাকিমের দিঘী, নতুনপট্টি, দুর্গাবতীর খোলা বুক, বুকের উপর বিছাহারনদী বাঁধ অন্নপূর্ণা ঘাট, ঐ দূরে মাছিমপুর, এদিক ঘুরে, কচুদরম বেরেঙ্গা, ঐ দিকে মেহেরপুর কাঠালবস্তি মানে হাওর । জল, চাতলার শুরু, ভাটির দেশের হাওর নয় চাতলা, চাতলার জলে ঢেউ নেই । মাটির ঢেউএ অনন্য এর রূপ । মন চাইলেও নেমে আসে বৈতল । দুর্গাবতীর শূন্যবুকে খোঁজে মিছিমিছির বিছেহার । বলে,
--- একদিন তুমারে লইয়া উঠতাম উপরে
--- তে বাইচ্ছা পুড়ি ইগুয়ে কিতা দুষ করল । তাইর লাইইয়াউ চলো তুমার তালবাড়িত ।
দুর্গাবতী তার স্বামীর সব উদ্ভট খেয়ালে জেরবার হয়ে যায় । ভয়ও হয় । চালনিতে পাকা তাল চেলে চুন দিয়ে গামছায় বেঁধে সারারাত ঝুলিয়ে রাখে উঠোনে । সকাল থেকেই তালের বড়ার উপকরণে বাড়িতে গন্ধের ম ম । দুর্গাবতীর মনেও আনন্দ । তিনভাগে বড়া তৈরি করে । একভাগ পাঠায় জমিদার বাড়িতে । বৈতলকে লুকিয়ে চুপিচুপি, মেয়ের হাত দিয়ে । জানলে আর রক্ষা নেই । তখন দুর্গাকে হতে হয় রক্ষাকালী । বের করে তার দ্বিতীয়ভাগ, বৈতলের বন্ধুদের ভাগ । আর নিজেদের ভাগে তিনজনের মহানন্দ । রসে গন্ধে মোহিত হয়ে বৈতল শোনায় কোকিলা কন্যার বারমাসী,
--- ‘আইল রে ভাদ্রমাস, পাকিয়া পড়ে তাল
      নারী হইয়া লাখের যৌবন রাখতাম কতকাল’
   দুর্গাবতীর হাতটাতও দেয় বৈতল খুশিতে । বলে,
--- চলো না বেটি, একদিন তুমি আর আমি উঠি গাছো ।
--- অয় খুব জিলকি অইছে, নানি । ধুমসি বেটিরে লইয়া গাছো উঠতায় ।
--- তে বাদ দেও, তুমি বেটি যাইতায় নায়, আমি আমার পুড়িরে লইয়া উঠমু একদিন দেখিও । তাই দেখত নানি ।
--- সাবধান কইলাম । তুমিও উঠিও না, তাইরেও না । জানো নানি, ইনাইৎপুরর বিধু মাস্টর কেমনে মরল । গাছো চড়ছে না, তলে উবাই রইছে, বাজ পড়িয়া মরল । তাল গাছো খুব বাজ পড়ে ।
--- আইচ্ছা, যাইতাম নায়, চড়তাম নায় তালগাছো চড়ি যখন লাইছি একবার, পাপ করি লাইছি, তাল পাড়ি লাইছি । অখন মাপ করি দেও গো দুর্গামাই । পিঠা দেও দেখি আর কয়টা ।
--- আর নাই । কত থাকত এক তালো ।
--- অ ‘মুরে যে বুঝাইলে এমতে আর হেমতে
      পাইতলা ভাঙ্গি মাছ পালাইল, সুরুয়া রইল কেমতে ?’       
আমি বুঝি নানি । তুই বেটি কই দেছ । তর হাইরে দিচছ । ইগুরে আমি কুনদিন মারি ফালাই দিমু কইলাম তরে । জমিদার ইগু মানুষ নায় । খাওইয়াইছ না ।
--- কেনে কিতা অইছে । থাকতে তো দিছে ।
--- অয় বিনাপয়সার বান্দি পাইছে তোরে । হে ভাবছে আমিও তার চাকর । চকিদার । পুটকি দিয়া যেদিন বার করমু চকিদারি হিদিন কইছ । আমার বাপেও মারছিল ইলাখান এক আলদরে, গাছুয়া আলদে আমার মারে দেখত ।
বৈতলের ভয়ডর নেই । জমিদারকে মারতে তার হাত কাঁপবে না । বৈতল জানে পাপ করলে, অন্যায় করলে তাকে মরতে হবে । সোজা হিসেব । প্রথম দিনেই মেরে ফেলতে পারত । তখন তো আর বুঝতে পারে নি যে লোকটা এত বদ । থাকতে দিয়েছে বলে কোনও কৃতজ্ঞতা নেই বৈতলেরসে তো আর বৈতল দাস পাটনিকে থাকতে দেয় নি । দিয়েছে সৃষ্টিধর শর্মাকে, দুর্গাবতী শর্মার স্বামীকে । নীচুজাতির মানুষদের প্রতি অপরিসীম ঘৃণা পোষণ করে এই ক্ষত্রিয়গর্বী জমিদার । বাড়ির দাওয়ায় উঠতে দেয় না কোন কুলগৌরবহীন মানুষকে । নকল ব্রাহ্মণ বৈতলকে বলে,
--- বুঝছনি বা বাবন বেটা, ইদেশ স্বাধীন অইয়া আপাঞ্জালি বাড়ি গেছে । ছুটলোক হকলর তেল বাড়ি গেছে । কই সব বাঙালরে খেদাই দিতা পাকিস্তানো, না মৌলানা অউলানা ইতারেও মিনিস্টার বানাই দিল । যোগেন মণ্ডল হিপারো গদ্দারি করল হিন্দুর লগে, ইপারোও বুলে মিনিস্টার বানাইব । বাঙাল আর ছুটলোক হকলর খুব আদর কংগ্রেছর কাছে । আগে মানুষ আছলা, বাবন জমিদারর গাত ছায়া লাগলে হুনছি বেত মারা অইত, অখন তো ছেইছও উঠি যায় । জগজীবন রাম বেটা মুচি তার ও নামর আগে অখন বাবু । ডোম পাটনি চামার চুনার নমঃশূদ্র ধুপি নাপিত মালুয়া হকলর রাজা । আমার লগে ইতা চলত নায় । দশ হাত দূরে থাকি মাতবায় বেটা । সকালে যেদিকে উবাইয়া মাতবায় বিকালে উল্টাদিকে । ছায়া পড়তে দিতাম নায় । কতদিন রাখতাম পারমু জানি না । ভোটো উবাইলে তো একটু ছাড়ন লাগব । তুমি থাকবায় আমার ধারো ধারো । তুমি রেবা আমারে বাচাইছ, ইতানি ভুলমু ।
বাঁচানোর গল্পটা বানানো । ওরকম অনেক ঢপযাত্রায় কাজ করেছে বৈতল । সেই কিশোর বয়স থেকেই । লুলা শিখিয়েছে সাপ ধরতে, সাপের দাঁত ভাঙতে, বিষথলি নির্বিষ করে রাখতে, তারপর সেই সাপ দিয়ে ভয় দেখাতে । দাঁতহীন সাপ দেখেই ভয় পেয়ে যায় যম । বৈতলও সাপ ধরে বাঁচিয়ে দেয় ভিতু জমিদারকে । বৈতল ভয় ভাঙিয়ে জমিদারকে বলে,
--- আপনে যম অইয়া মরার ডর ডরাইন কেনে ।
--- আমি ডরাই না কুনুগুরে । আর আমি কুনু যম উম নায় । তুমি কইলায় কইলায়, আর কইও না ।
--- কেনে কইতাম না আপনার নাম কিতা যম নায় নি । সবেউতো কয় যম জমিদার ।
--- আমার সামনে কয়নি কইলে নু মাটিত গাড়ি লাইমু ।
--- তে কইতাম নায় । আপনে তো জমিদার, রাজা মানুষ । রাজার কুনু নাম অয়নি ।
বৈতল জানে জমিদারের নাম যমুনা প্রসাদ সিং, প্রজার রোষে যমুনা হয়েছে যম । বৈতল জানে জমিদারের অসুখ । জানে তার দুর্বলতা । স্বাধীন দেশে রাজা প্রজার ফারাক নেই জানে । তবু জমি আছে, অর্থ আছে, জমিদারিও আছে । কমবয়সী জমিদারও নট্টকোম্পানির যাত্রাওয়ালা কম নয়, নাটক সাজায় মঞ্চে থাকে না । জমিদার একাই মালিক, কোনও তরফ নেই । খুড়োমশাই একজন আছেন হাবাগোবা, তার কোনও অংশ নেই । খুড়তুতো ভাই আছে পাঁচজন । হরিৎবরণের প্রজারা বলে পঞ্চপাণ্ডব । যমুনা প্রসাদের ভাড়াবাড়িও আছে এখানে ওখানে, ভাড়াটেরাও প্রজা । পাণ্ডবের একজন দুর্যোধন দুঃশাসন রাবণ শকুনি । দাদা জমিদারের নির্দেশ জমিদারির শান্তি বজায় রাখে । সদাশয় জমিদারও দুঃখ দুর্দশার প্রতিকার করেন পরিদর্শনে বেরিয়ে । গরিবের জন্য প্রাণ কাঁদে প্রজারঞ্জনের ইদানীং রাজনীতির ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে ঘনিয়ালার মুসলমানদের ভাই এবং চাচা ডাকছেন । ধন্য ধন্য হয় রাজার । এতদিন যুবারাজার রাজনীতি হয়েছে বৈঠকখানায় । খিলান স্তম্ভগুলি ইদানীং একটু নড়বড়ে, যেমন এক, দুই বাংলা এক করা, দুই, সব মুসলমানকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো আর তিন নম্বরে, ___নেতাজিকে ফিরিয়ে আনা । কিন্তু যোয়াল কাঁধে জোড়া বলদ প্রতীকের কাছে এসব স্তম্ভ কার্যকারী হচ্ছে না দেখে ইদানীং কংগ্রেসের তাঁবেদারি করার মনস্থ করেছেন । কারণ স্বাধীন দেশে কংগ্রেস বিরোধিতার কোনও সুখী রাজনীতি এখনও শুরু হয়নি ।
তবে বৈতলেরও মনস্থির করতে সময় লাগে । শুরুতে যম সিংকে অপছন্দ করার কারণ খুঁজে পায়নি । রাজনীতির একটা ঘন আস্তরণ যে মনের ভিতর রয়েছে বুঝতে পারেনি । যদিও নেতাজিকেই উদ্ধারকর্তা ভেবেছে । দেশভাগ হয়ে যায় তবু নেতাজি ফিরে না আসায় মনে তার দুঃখ জমে । সেই সময়টায় সে অনেকটা কাছে চলে আসে যম সিং –এর রাজনীতিরইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনও কাজ করাতেই অপমান বোধ হয় বৈতলের, যেমন হয়েছে দাড়িয়াপাড়ার পেশকারের বাড়ির গরু রাখালি করতে । পেশকারের সাদা মেয়ে বুড়ির চাকর বলাকেও ভুলতে পারেনি । দেশভাগের অপমান ভুলতে পারে নি বৈতল । দেশভাগের অপমান সরাসরি তাকে বিদ্ধ না করলেও, জাতিগতভাবে এক বোধ কাজ করেছে । মানুষের এই ধর্মাধর্মের ভেদ সে মানে না, আবার একই ধর্মে লালিত হওয়া বংশানুক্রমিক সামাজিকতাও উপেক্ষা করতে পারে না । তাই তো অনেকবার চেষ্টা করেও সে মুসলমান হতে পারেনি । মুসলমানের দেশ হবে বলে ভিটেমাটি ছেড়ে চলে আসার অপমান মানতে পারেনি বৈতল । বিভ্রান্তি থেকেই হঠকারী হয় বৈতলযম জমিদারের উল্টো পথটাকেই সোজা রাস্তা মনে হয়েছে । যম সিং বলেছে,
--- হিন্দুস্থানো ইতা চলত নায় । ইখানো থাকলে হিন্দুর মতো থাকন লাগব । হিন্দুস্থানো খালি হিন্দু অউ থাকব । পাওর তলর বেঙ অইয়া পাওর তলে থাকতে পারলে থাকো, নাইলে ভাগো ।
     বৈতল যে – তিক্ততা নিয়ে দেশ ছেড়ে এসেছে, যে তিক্ততা দেখেছে দেশভাগের, গণভোটের আগে ও পরে, তাতে মনে হয়েছে জমিদারের কথাই ঠিক । কুশিয়ারা পাড় হওয়ার পর মনে হয়েছে নিজের দেশ ফিরে পেয়েছে । তখন বন্দীশালা থেকে মুক্তির আনন্দ শুধু । মুসলমানি টুপি ‘তকি’ দেখলেই রাগ, মনে হয় ওদের জন্যই পালিয়ে আসতে হলো । এদের জন্যই সাধুমানুষ পিরমানুষ তার বন্ধু লুলা পাল্টে যায়, হয় নারী শিকারী । নইলে এমন কত খুন খারাবি হয় ওদেশে, মানুষ ভুলেও যায় । জালুয়া মাইমলরা এমনিতেই ক্ষণরাগী, রাগ উঠলে রক্ত না দেখে ছাড়ে না । তার জন্য জেলপুলিশ হলেও কিচ্ছু হয় না । কিন্তু দেশভাগ যে হিংসা প্রতিহিংসা আর অবজ্ঞার জন্ম দিয়েছে । মেহেরপুর ক্যাম্পে থাকার সময় বৈতল শুনেছে অনেক করুণ কাহিনী । অজিত চক্রবর্তী নামে এক সংস্কৃত পণ্ডিত মহাশয়- এর স্মৃতি লোপ পায় । কোনও কিছুই আর মনে করতে পারেন না । অজিত পণ্ডিতের ছেলের কাছে জানা যায় বৃত্তান্ত,
--- বাবা আকতা বোবা লাগি গেলা । বাবার ছোটবেলার বন্ধু আমজাদ চাচা আইলে বাইরর বেঞ্চিত বইতাহিদিন কিতা অইল, বাবা যে আসনো বইয়া পড়াশুনা করইন, পড়াইন, হিঘরো আইলা চাচা । বাবারে রায়টর কথা কইলা । চাচা যাওয়ার পরে বাবায় কইলা ইন্ডিয়াত চলো । তার পরেউ বোবা । কিতা বুঝলায় । বুঝতায় নায়, রায়ট উয়ট কিচ্ছু নায়, অউ যে চাচা আইয়া ঘরো ঢুকলা, তেউ বাবার মাথাত বাজ পড়লোতাইন তান মতো বুঝলা আর মানসম্মান নিয়া থাকা যাইত নায় ।
মানিক দাস নামে এক ভালমানুষ ‘মাটি কামলা’ কোনও তিক্ত স্মৃতি নেইসে মনলোভা মানুষ, ক্যাম্পে কাজ পেলে করে, নইলে চলে যায় বরমবাবার মন্দিরে । মন্দিরের সামনে ভিক্ষে করে । কেউ প্রশ্ন করলে বলে,
--- সাইচান যাইতাম, ভাড়ার পয়সা নাই আমার ।
সাইচান তার বাড়ি । গ্রামের বাড়ির গল্প বলে দাতাকে । টিলার উপর ছবির মতো বাড়ি, বাড়ির নীচে ঢুপির বিল । বিলের জলে মাছ, পারের গাছগাছালি আর পাখির গল্প বলে যায় অবিরল । মানিক দাসের গল্পে কোনও মানুষ থাকে না । বিলের গল্প শুনতে শুনতে বৈতল ফিরে যায় বইয়াখাউরি । ভাল লাগে মানিককে । বলে,
--- তোমার রেবা খালি মাছ গাছ পাখি আর পানির গপ । তোমার কুনু বন্ধু উন্ধু নাইনি ।
--- আছে আমার কত বন্ধু । একজনের নাম মিতা মিতারে চিনো নি । হাওয়াত ভাসাই দেওন লাগে মিতা ডাক । তেউ আইবা ।
--- কেনে, কেউ ছইলেউ তাইন পাথর অই যাইন ।
--- ছেদা নি ।
--- না । তে ছেদার লগেও আমার দোস্তি আছে । আমার মিতা অইলা বনরউ । আমারে ডরায় না । আর অউ যে কইলায় লজ্জাবতী, তাইন ও খেলইন আমার লগে তান ময়ূরপঙ্খী শাড়ি পিন্ধিয়া । আমরার টিল্লার পিছে অউ পারা সপরিগাছ, তার নিচে থাকইন । ছইলেউ অইছে । খালি ছইয়া ছইয়া যাও, আর তারার কী লইজ্জা ।
--- ও ইতো ছইতে মরা ।
--- না লইজ্জাবতী । আমি সাচাইন যাইতাম এক পয়সা দেও ।
বৈতল কাউকে কখনও ভিক্ষে দেয় না । মানিকের সঙ্গে কিন্তু বৈতল নিজের মিল খুঁজে পায় । বৈতল জানে মানিকের ভিক্ষে চাওয়ার ভিখিরির দীনতা নেই । হারানো স্বদেশের খোঁজে মানিক পথে বেরিয়েছে । ভিক্ষেটাই আসল, ভিক্ষের কড়ি তার কাছে অর্থহীন তাই বৈতল তার কাঁধে হাত দেয় ভরসার । বলে,
--- যাইমু, আমরা সব যাইমু আবার দেশো । তুমি সাইচান যাইবায়, আমি যাইমু বইয়াখাউরি ।
কিন্তু একা একা কী করে যাবে বৈতল । কে দেখাবে স্বদেশের অসীম । এখন বর্ডার নামের এক দৈত্য বসে আছে স্বদেশের পারে । লাল লাল পাগড়িওলা এদিকে সবুজ ওদিকে । বন্দুকওলা মানুষ দিয়ে আটকে দিচ্ছে সন্ধ্যাপ্রদীপের আলো, ভোরের আজান বাড়ির মিনার । বৈতল ভাবে এ কেমন খেলা, মানুষ চাইল বলে ভেঙে দেওয়া হয় দেশ । এখন আবার আঠা দিয়ে জুড়ে দেওয়ার কেরামতি । সত্যি কি তবে আঠায় জোড়া লাগে ভাঙা দেশের ভাঙা মন । এসো ভাই বসো ভাই তোমার ভিটেয় বললে দখলদার ছেড়ে দেবে । তাহলে কি জমিদার যমুনাপ্রসাদের কথাই ঠিক, স্বাধীন বঙ্গ হবে । একবার তো চেষ্টা হয়েছে। গুরু সৃষ্টিধর বলেছেন, করাচীতে পাকিস্তান আর কলকাতায় স্বাধীন বঙ্গের রাজধানী স্থির হয়েছে । নেতারা মানেননি, গান্ধিজি চুপ । নেতারা মানলে বঙ্গদেশ অখণ্ডই থাকে । নেতারা মানে নি, এক পক্ষ ভেবেছে মুসলমান প্রধান হলেও হিন্দুবুদ্ধির পায়ের নিচেই থাকতে হবে । ওপক্ষ ভাবে মুসলমান মেজরিটিতে আর রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া যাবে না । এখন যদি জোড়া লাগে তা হলে কী হবে বঙ্গদেশ, কী হবে রাষ্ট্রধর্ম, কে হবে রাষ্ট্রপতি । সুরাবর্দি ফজলুল হক । তারা কি এখনও জীবিত আছেন । বিধান রায় । নেতাজি ফিরবেন । নাকি মুখরক্ষার তৃতীয়পক্ষ কৈবর্ত পাটনির যোগেন মণ্ডল । জমিদার যম বলে,
--- রাষ্ট্রপতি হওয়ার একমাত্র উপযুক্ত আছলা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ।অখনও কইয়ার, এক অইল তো বালা, নাইলে সব বাঙালরে ধাক্কা মারিয়া হিপারো খেদাইমু, দেখি লাইও ।
     দেশভাগের কটুত্বে জমিদারের শেষ কথাটার প্রতিবাদ করতে পারেনি বৈতল । তখনকার প্রকৃত পরিস্থিতিই ছিল এমন । এদেশের হিন্দুর কাছে মুসলমান মানেই পায়ের তলার বেঙ । আসলে সংখ্যাগুরুর দাপট দেখে ছিন্নমূল হয়ে এদেশে এসে সব দুর্দশার শেখড় খুঁজে পেয়েছে ধর্মদ্রোহে । তাই তাদের মারো এবং তাড়াও । বৈতল ধীরে ধীরে বুঝে গেছে বাঙালি হিন্দু মুখেই শুধু বড় কথা বলে, করতে পারে না কিছুই । বাঙালি মুসলমানরাই বা কী এমন করিৎকর্মা যে হিন্দু মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে সব । বাঙালি মুসলমান বাংলার মধ্যে দুই বাংলা চেয়েছে, বাঙালি মুসলমান পাকিস্তান প্রস্তাব মানে নি । বাঙালির অবাঙালি নেতারাই উস্কে দিয়েছে । সেই শুরুর সময় একমাত্র নেতা ঢাকার নবাব সলিমুল্লা, সুরাহবর্দি । এরা কি বাঙালি । এসব কথা বৈতলের জানার কথা নয়, গুরু সৃষ্টিধর শিখিয়েছেন । গুরুর শিক্ষা শুধু কথার কথা মনে হয় আপৎকালে । মানুষের মধ্যে অবিশ্বাসের মাত্রা বাড়লে মানুষ থাকে না মানুষ । শুভ চিন্তায় কাজ হয় না । আক্রোশ দিয়ে সব ভাল ভাবনার গলা টিপে মারে । বন্ধু লুলার ব্যবহারে বৈতল নিজেকেই অস্বীকার করে । শুধু হিন্দু রমণী বলেই কেন যে দুর্গাবতীর গায়ে হাত দিতে যায় । বন্ধু লুলাকে মেরে ফেলার অনুশোচনাহীনতাও কি তার জাতক্রোধের উপশমতবে হ্যাঁ, এদেশের নিরাপদ আশ্রয়ে এসে সে অপরাধবোধে আক্রান্ত হয়েছে । আবার জমিদার যম সিং –এর নতুন রাজনীতির তত্ত্ব তাকে তাতিয়ে দিয়েছে । জমিদারের সুরে সুর মিলিয়েছে । ভেবেছে, পাকিস্তান যদি মুসলমানের হয়, হিন্দুস্থান কেন হিন্দুর হবে না ।
 তবে, বৈতল তো বৈতলই । তেলাল শরীর তার, পেক কাদা বসে গেলে ঝরে পড়তে সময় লাগে না । মন্দবুদ্ধি জমিদারের কথার শূন্য বুঝতে তার সময় লাগেনি । যম সিং –এর দুঃস্বপ্নের রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে সে । সত্য মিথ্যে দিয়ে ভুলিয়েছে সিঁদুরটিপের জমিদারকে । বলেছে,
--- আপনে কেনে জমিদার কইন । অখন বুলে জমিদারি উরি নাই ।
--- কে কইল রেবা তুমারে । তুমি কিতা হিন্দু নায়নি । হিন্দুর রক্ত নাই । জানো না বাবনর পুয়া বাবন হয়, হালুচার পুয়া হালুচা হয় । রাজা হয় নি কুনু পাটনির পুত । জমিদারর পুয়াউ জমিদার হয়, হয় রাজা ।
--- কিন্তু জহরলালে তো কইছইন তান নামর আগে যেনে কেউ পণ্ডিত লাগায় না ।
--- ইতা কংগ্রেসি চালাকি । তাইন তো পারলে নামর লগে মুল্লা লাগাই দিবা । তারার কথা ছাড়ো । হিন্দুর দেশো হিন্দুর সব উপাধি লাগানি লাগব । মক্কাত গেলে তারা হাজি লাগানি ছাড়ব নি । আমরারও লাগব, রাজা পণ্ডিত বিদ্যাসাগর সর্দার সব । বাঘর বাইচ্চা কও তারাপুরর করর বেটা, নিজের নামর আগে লাগাইছ সর্দার । ডর দেখানিও তো লাগে ।
--- বউত মুসলমানেও নামর লগে বাঙাল লেখরা অখন । তারার কথা, বাঙাল কইয়া বিদ্রূপ করছ অতদিন । অখন আমরা কইয়ার আমরাউ আসল বাঙালি ।
--- বাঙাল কুনুদিন বাঙালি অইত নায় । তারার দেশ আরবো তারা আরবি অইব । গাট্টি বান্ধিয়া আরবো পাঠানি লাগব ।
--- তে নায় পাঠাইলা । কিন্তু তারার কাম কে করব ।
--- কী কাম রেবা । কী কামর কতা কইরায় ।
--- ধরইন আপনার মুর্তজা ডাকতর । তাইন গেলে গি দাওয়াই কে দিব ।
--- মুর্তজা আবার ডাক্তারনি । হে অইল কম্পাউন্ডার । আর তার ওষুধ অইল এম এন বি গুল্লি । তুমারেউ বানাই দিমু ডাকতরবৈতল ডাকতর । অইব নি ।
--- আর বেচু মিয়া । মাংস বেচবো কে ।
--- আমরা খাইনা ইতা আড়াই পেচর মাংস । হে ছাগিও মিলাই দেয় । বাড়িত কাটমু পাঠা ।
--- আর বছই গেলে কিতা করবা । লুকাইয়া মুর্গি কাটি দিব কে । কইন ।
   বৈতলের আচমকা আঘাতে যম জমিদারের চোখ রক্তবর্ণ হয় ।
বৈতল ভাবে মানুষটার শরীর কেন নীলবর্ণ হয় না । বৈতলের ছোবল যে দুনিয়ার বার । বছই নামের ছোট ছোবল দিয়ে বৈতল তার জাত চিনিয়ে দেয় । হিন্দুবাড়িতে মুর্গির মাংসের চল নেই । বিশেষ করে বড় জাতের হিন্দু, যারা ব্রাহ্মণ যারা জমিদার । অনেক বাড়িতে তো পেঁয়াজ রসুনও বারণ । পাঁঠার মাংস নিরামিষ মশলায় রান্না হয় । একঘেয়েমির আলুনিতে কারই বা ভাল লাগে । যম জমিদারেরও মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় অন্যরকম । যমুনা প্রসাদ সিং নামে যম হলে কী হবে, তারও আছে প্রিয় মানুষ দুএকজন, আছে ইয়ার । খুড়তুতো পাঁচ ভাই –এর বড় যে ভ্রম । ভ্রমদা, ভ্রম ভাইয়া । এখানেও একটা ভ্রমের ব্যাপার আছে । যম সিং আর তার পরিবার এখন আদ্যোপান্ত বাঙালি সিলেটি । তার আপন কাকার পরিবার বিহারি, ভাষাও হিন্দি । ভ্রম যমের ভাই বন্ধুও বটে, আর একজন আছেন কলেজের অধ্যাপক । তিনিও বন্ধু । শহরের মানুষ মান্য করে নিষিদ্ধ পার্টির মেম্বার বলে, কম্যুনিস্ট । ভাই বন্ধু নিয়ে জমিদারের বাগানে প্রায়ই হয় মোচ্ছব । হাকিম দিঘীর পারে হয় বনভোজন, রাতে । এই বাগানবাড়িতেই রাতের সব ধনরত্ন লুকিয়ে রাখে বৈতল ও তার দলবল সেই অনুষঙ্গেই বছই কথার উদয় । জমিদারের দুই বন্ধু, বছই আর বৈতল ছাড়া দুজন জানে এই নৈশ অভিসারের সমাচার । আপদ আর দুখু পায়না প্রবেশ অধিকার, কিন্তু জানে । কারণ আয়োজনের দায়িত্ব থাকে বৈতল । জন স্মীল থেকে বিলাতি মদ কিনে লুকিয়ে রাখে দিনের বেলা । রাতে মুরগি জবাই করে বছই । মুসলমানের হাতের রান্না খেলে জাত যাওয়ার ভয় তাই বৈতল রাঁধে । দুপাত্র গলায় ঢেলেই জমিদার আর তার যুধিষ্ঠির ভাই চড়িয়ে নেয় বাঘের চাদর গায়ে । বৈতল আর বছইকে বারবার সাবধান করে, মদমুরগির কথা পাচকান না করতে । ভেজা গলায় আর তুমির মান্যতা থাকে না সিং প্রতাপের গলায়হয় তুইবলে,
--- অই বেটা সাপর বেজ । তরে বাবন বানাইল কে । তোর বউএ নি ।
   বৈতল সাপের বেজ নয়, বৈতল কুলোপানা চক্করের গোখরা সাপ । লেজ মাড়ালেই দুই দাঁতে ঝাড়ে বিষবলে,
--- অয় । চিনছ না তো আমার বউরে, তরে জমিদার থাকি ভিখারি বানাইয়া ছাড়ব কই দিলাম ।
   জমিদারের দাদা ভ্রম সিংও বাঘের চাদর ওড়ে । বৈতলের কথায় গুম মেরে যায় যম । ভ্রম তেড়ে যায় বদলা নিতে । বলে,
--- অই বেটা রিফুজি । খুব তেল বাড়ি গেছে নানি । ই দেশো আইচছ, থাকরে খাইরে আর জমিদারর মুখর উপরে কথা কইরে ।
--- অখন তো মুখে মাতিয়ার, এরপরে নু হাত দিয়া মাতমু ।
     মদের নেশায় জমিদার তার ভাই আর বৈতলের অবস্থান বদল হয় । বৈতল হয় জমিদার আর দুই ভাই বৈতলের গোসা সামলায় । ভ্রম বলে,
--- আরে মরদে, কাহে গুস্‌সা করো তারা । ছাড় না । ইতা মাতিছ পরে । অখন হুন ইতা যে করিয়ার আমরা ইখানো ইতা কেউরে কইছ না রেবা । তাইন কত মানী মানুষ জানছ নানি । আর বাঙাল ইগুরেও কই দিছ, মাতলেউ দেওলার পেটো যাই বে ।
এতবড় সাহসের কথা জমিদার নিজের মুখে বলেনি তাই রক্ষানইলে জলের কারিগর সেদিনেই শেষ করে দেয় যমের জীবন । বৈতল তার বাপের মতো নয়, একবারের অপরাধ মাপ করে দিয়েছে নেশাগ্রস্ত বলে । জমিদারের চাকর ভাই তো তার কাছে কোমরের ময়লা, মশা মারার মতো টিপে মারতে পারে যে – কোনও সময়ে । যম বড় অপরাধ করেছে, মদের মুখে বউ –এর কথা বলে । বলেছে বলে মরাকে মারার মতো কাপুরুষ নয় বৈতল । জানে বিলাতি খেলে এরকম হয় । যম ও ভ্রম পরদিন কিছুই মনে করতে পারবে না । তবে অধ্যাপক বন্ধুটির হাসি বলে দেয় নেশা হলেও স্মৃতিভ্রংশ হয় না তার । বৈতল জানে, জমিদার তার বন্ধুকে বৈতলের বিশ্বস্ততা নিয়ে অনেক কথা বলেছে । নইলে মানী মানুষ কেন এক রাতের ফুর্তিতে নষ্ট করবে প্রতিষ্ঠা । গরমাগরম কথার শেষে বৈতলের কাঁধে হাত রাখে দীর্ঘতম মানুষটি । বলে,
--- কান্ধো হাত রাখছি এর লাগি আবার গুসা করিও না, যে ক্ষণরাগী মানুষ তুমি । তুমি অইলায় আমার কমরেড রেবা, এর লাগি রাখলাম । আর বুঝলাম যমুনার লগে টক্কর দিতায় পারবায় তুমি ।
--- কমরেড কিতা ।
--- হে, হিদিন নু কইলায় তুমি কমরেড অনন্ত সাধুরে চিনো । তান মিটিংও গেছো ।
--- গেছি, বিয়ানিবাজার থাকতে । বাক্কা আগে ।
--- এর লাগিয়াউ কমরেড । কম্যুনিস্টে বন্ধুরে কমরেড কয় ।
--- ইতা কুনদেশি মাত । বন্ধু কইলে অয় নানি । দোস্ত কইন ।
--- আইচ্ছা রেবা দোস্ত । অত গুসা করলে অইত নায় । ধৈর্য ধরণ লাগব । বিপ্লব আইব । যমুনার জমিদারি শেষ অইব কমরেড নবযুগ আইব । গরিবর শাসন অইলে জমিদার উর থাকত নায় । ফরাসি দেশো রাজারে রানিরে মারছে মাইনষে, রাশিয়াতও মারছে । ভাবিও না, অইব ।
--- আপনে মদ খাইয়া কইরা । অখন হুনতাম নায় কিচ্ছু । আপনারে আমি চিনি । থাকইন বিলপারো । খাসিয়াপট্টি আইয়াও আপনে চুঙা ফুকইন । আপনে অইলা কমরেড গীতেশ বিশ্বাস । আমার রিক্সাত আপনে চড়ছইন নানি আগে ।
--- চড়তাম পারি, মনো নাই
--- আপনারেও জিগাইছলাম ।
--- কিতা ।
--- আপনার কথা আর কামর লগে মিলে না কেনে । ই যম ইগুর লগে আপনার কিতা কমরেডি । হে ত রায়ট লাগাইত চায় ।





চলবে 


আরো পড়তে পারেন

Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...