“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

।। চোর যখন স্বামী।।

            ।।মাসকুরা বেগম।।
     মেহেরুন। ব্যাংকের ম্যানেজার। ব্যাংক ম্যানেজারের কঠিন খোলসের আড়ালে সে একজন কোমলমতী, আবেগপ্রবণ, সহজ-সরল নারী। বাবার কথা মনে পড়লে "আয় খুকু আয়" গানটা ছেড়ে দিয়ে চোখ মুছে।

     তার সংসারে আছে শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী হামিদ আর দুই ছেলে - হাসান ও হোসেন।

     মেহেরুনের জীবনের প্রথম আঘাত এসেছিল খুব ছোট বয়সে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন। তখন আসামে ক্যান্সারের উন্নত চিকিৎসা ছিল না।

   মেহেরুন ছিল অসম্ভব মেধাবী। জেদ ছিল, স্বপ্ন ছিল। বাবা-মরা একমাত্র মেয়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য মা নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়েছেন। গণিতের শিক্ষকের মেয়ে, অংকের প্রতি ছিল তার অদ্ভুত নেশা।

    উচ্চমাধ্যমিকে কমার্স বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগে ডিস্টিংশন মার্কস পেল। শহরের নাম্বার ওয়ান কলেজে ভর্তির সুযোগ পেল। কিন্তু সমস্যা - বাড়ি থেকে কলেজ প্রায় ৩০০-৪০০ কিলোমিটার দূরে।

    ভরসা হলো মামা। গুয়াহাটি শহরে মামার বড় ফ্ল্যাট। মামি আর একমাত্র মামাতো ভাই থাকে সেখানে। মামা স্টেট ব্যাংকের ম্যানেজার। ট্রান্সফারেবল চাকরি।

    মা ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "রমিজ ভাই আমার! মেয়েটাকে গুয়াহাটিতে একা কোথায় রাখব? তোর ঘরে একটু থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দে।"
   মামা বললেন, "ঠিক আছে বুবু, চিন্তা করবেন না।"

    কিন্তু মামি রাজি হলেন না। মামাকে চাপ দিয়ে বললেন, "তুমি এত বোকা কেন? জোয়ান ভাগ্নিকে ঘরে রাখবে? আজ ডিগ্রি, কাল মাস্টার্স, পরশু চাকরি। এই ক'বছরে মেয়েটা কত মান-সম্মান নষ্ট করবে কে জানে!"

     পরের রবিবার মামা-মামি মেহেরুনের বাড়িতে গেলেন। অনেক বোঝালেন, "দিনকাল ভালো না। মেয়ে মানুষ শহরের হাওয়া লাগলে নষ্ট হয়ে যায়। আঠারো বছর বয়স, ভালো পাত্র পেলে বিয়েই দিয়ে দাও।"
     মেহেরুনের মা শক্ত গলায় বললেন, "বিয়ে জন্ম-জন্মান্তরের লিখন। আমার একটা মাত্র এতিম মেয়ে। পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। থাকার জায়গাটুকু দিতে পারবে না?"

    অবশেষে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মামি রাজি হলেন। কিন্তু মন থেকে মানতে পারলেন না।

    মেহেরুন নিজেই ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করে একদিন মায়ের সাথে মামার ফ্ল্যাটে উঠল। মামা ঘরে ছিলেন না। মামি খুব একটা আন্তরিকতা দেখালেন না। যাওয়ার সময় মা চোখ মুছে বললেন, "যেভাবে পড়তে এসেছ, সেভাবেই চলবে। কোনো অভিযোগ যেন না শুনি।"
   মেহেরুন মায়ের হাত ধরে কথা দিল, "মা, আমি তোমার অসম্মান হতে দেব না।"

   ধীরে ধীরে মেহেরুন বুঝল সে এই ঘরের বোঝা। মামি কোনোদিন প্লেটে খাবার বেড়ে দেন না। কলেজ থেকে ফিরে অনেকদিন ঠাণ্ডা ভাত আর ডাল ছাড়া কিছুই জোটেনি। মামি মাছ-মাংস হিসেব করে রাখতেন। বাড়িতে মামির মা-বোন বেড়াতে এলে মাংস-পোলাও আরও কত কী রান্না হতো। মামি বলতেন, "আমার রনি মাংস পছন্দ করে, কোরমা-পোলাও পছন্দ করে।" মেহেরুন সেদিনও শুধু আলু আর গ্রেভি দিয়েই ভাত খেত।

   এই এক বছরে মেহেরুন বুঝে গেল, মামির অনুমতি ছাড়া মামা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।

    এদিকে বড় মাসির স্বামী এক বছর ধরে প্যারালাইজড। স্কুল শিক্ষক মেসোমশাই স্কুলে যেতে না পারায় বেতন আটকে আছে। সংসারে অভাব। ছেলে হামিদ গ্রাজুয়েশন করে মাস্টার্স করছে, কিন্তু চাকরি নেই।

    বড় মাসি একদিন মামাকে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "রমিজ, কিছু টাকা দে ভাই। তোর দুলাভাইকে গুয়াহাটিতে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাব।"
    মামা বললেন, "আচ্ছা বুবু, দেখছি।"
কিন্তু মামির না-এর কাছে মামার হ্যাঁ-এর কোনো দাম ছিল না।

    উপায় না পেয়ে হামিদ গুয়াহাটি এসে মামির কাছে টাকা ধার চাইল। মামি সাফ না করে দিলেন, "টাকা যখন ফেরত দেবে, ব্যাংক থেকেই নাও।"

    রাতে খাওয়ার পর হামিদ গেস্ট রুমে শুতে গেল। সেদিন মামা ঘরে ছিলেন না। মেহেরুন সাধারণত গেস্ট রুমেই থাকত। সেরাতে মামির রুমের সোফায় শুয়ে পড়ল। মামি রনিকে নিয়ে বিছানায়। পাশের রুমে মামির ভাই।

   গভীর রাতে কিসের শব্দে মামির ঘুম ভাঙল। লাইট জ্বালিয়ে দেখেন আলমারির পেছনে হামিদ। 
মামি চিৎকার করে উঠলেন, "ভাই! তাড়াতাড়ি এই লুচ্চাটাকে বাঁধ!"
    মেহেরুন ঘুম ভেঙে কিছু বুঝে ওঠার আগেই মামি বলতে লাগলেন, "আমি কতবার বলেছি জোয়ান মেয়ে ঘরে রাখলে মান-সম্মান যাবে। এখন মেহেরুন আর হামিদের ফষ্টি-নষ্টি কে সামলাবে?"

     মামির ভাই হামিদকে বেঁধে ফেলল। আর মামি মামাকে ফোন করে বললেন, "ভাগ্যিস জেগে উঠেছিলাম। নইলে আজ কী কাণ্ড হতো কে জানে!"

     মাঝরাতে মেহেরুনের মায়ের কাছে ফোন গেল, "বুবু, আপনার মেয়ে আর হামিদকে হাতে-নাতে ধরেছি। আপনার ভাই বলেছেন সকালেই যেন আপনারা এসে ওদের বিয়ে দিয়ে দেন।"

    মিথ্যা অপবাদ শুনে মেহেরুন স্তব্ধ হয়ে গেল। বাকরুদ্ধ।

    হামিদের মা-ও ফোন পেয়ে পাথর। হামিদের ছোট বোন বলল, "মা, মেহেরুন দিদিকে তো তুমি চেনো। মামি নিশ্চয়ই ঝামেলা পাকিয়েছে। মামি বিয়ে দিতে চাইলে তোমার আপত্তি নেই বলে দাও।"

    হামিদ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বিনাদোষে একটা মেয়ে কলঙ্কিত হচ্ছে, অথচ সে কিছু বলতে পারছে না। 
    আসলে সে রাগের বশে মামির গয়না চুরি করতে ঘরে ঢুকেছিল। জীবনে প্রথমবার চুরি করতে গিয়েই এমন ফাঁদে পড়বে ভাবেনি। এখন তো একথা ও বলতে পারবে না যে সে চুরি করতে রুমে ঢুকেছিল।

   পরের দিন বিকেলে সবাই রমিজের ফ্ল্যাটে হাজির। হামিদের মা বউয়ের পোশাক নিয়ে, মেহেরুনের মা বরের পোশাক নিয়ে। মামি আগেই কাজী ঠিক করে রেখেছেন।

   কাজীর সামনে কবুল বলার সময় মেহেরুনের চোখ দিয়ে শুধু পানি পড়ছিল। অনিশ্চিত জীবন শেষ পর্যন্ত কি তার স্বপ্ন কেড়ে নেবে? 
এভাবেই চুরি করতে গিয়ে হামিদ হয়ে গেল মেহেরুনের স্বামী। 

    বিয়ের পর সবাই খুশি-খুশি হামিদকে নিয়ে হাইলাকান্দি ফিরে গেল। 

    কিন্তু লোকের মুখে মুখে তাদের নিয়ে নানান গুঞ্জন। সত্যিটা না জেনে যে যার মতো করে কাহিনি তৈরি করছে তাদের নিয়ে। মেহেরুন কাউকে কিছু কৈফিয়ৎ দিতে যায়নি। শুধু রাতের পর রাত জেগে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। অপবাদ কিংবা অপমানকে সে শক্তি বানিয়েছে। তার পাশে দাঁড়িয়েছে হামিদের পরিবার।

    কিছুদিন পর হামিদ ও মেহেরুন গুয়াহাটিতে ছোট্ট একটি ঘর ভাড়া নিল। সেদিনের ঘটনার পর হামিদের মধ্যে এক ধরনের অপরাধবোধ আর জেদ কাজ করছিল। সে ঠিক করেছিল, যে মেয়েটার জীবন তার জন্য উলোটপালোট হয়ে গেছে সেই মেয়েটাকেই সে সফলতার শিখরে পৌঁছে দেবে।

    হামিদ গুয়াহাটিতে টিউশনি শুরু করল। দিনে ৩টা, রাতে ২টা ব্যাচ। পঙ্গু বাবার চিকিৎসা ও নিজের মাস্টার্স ডিগ্রি - সব একসাথে। 
দুই বছর পর মাস্টার্স কমপ্লিট করে একটি বেসরকারি কলেজে অর্থনীতির বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করল। 
    দেখতে দেখতে হামিদের বাবাও কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেন। তিনি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। তাঁর পেনশন নিয়মিত হচ্ছে। হামিদের সংসারের অর্থনৈতিক চিন্তা কমেছে। বাবা হামিদকে পিএইচডি করতে উৎসাহিত করলেন।   

    মেহেরুন থেমে থাকেনি। রাত জেগে ব্যাংকের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে। একটার পর একটা পরীক্ষা দিয়েছে। দুবার ফেল করার পর তৃতীয়বার সে ব্যাংকে অফিসার হিসেবে সিলেক্ট হলো।

    তারপর প্রমোশন। আর ৮ বছরের মাথায়, মাত্র ৩২ বছর বয়সে সে হয়ে গেল একটি জাতীয় ব্যাংকের ম্যানেজার।  
    যে মামি একদিন বলেছিল "মেয়েরা বেশি পড়লে বিয়ে দিতে কষ্ট হয়।", সেই মামিই এখন গর্ব করে বলে, "আমার ভাগ্নি ব্যাংক ম্যানেজার।"

   আজ তাদের সংসার পরিপূর্ণ। মেহেরুনের শ্বশুর-শাশুড়ি, ডাক্তারি পড়ুয়া ননদ, স্বামী হামিদ - আর দুই ছেলে হাসান ও হোসেন। 
হামিদ পিএইচডি কমপ্লিট করে এখন শহরের নামকরা কলেজের প্রভাষক।

    বাবার প্রিয় গান "আয় খুকু আয়" গানটা এখনও মেহেরুন শোনে। আবেগিক হয়। তবে এখন আর আগের মতো কাঁদে না। রিল্যাক্স অনুভব করে। 
বাবা বলতেন, "মা, তুই একদিন অনেক বড় হবি।" বাবার কথা সত্যি হয়েছে।

    অনেকেই জিজ্ঞেস করে, "আপনাদের বিয়েটা তো অ্যারেঞ্জড ছিল না, তাই না?"
মেহেরুন শুধু হাসে। হামিদের দিকে তাকিয়ে বলে, "আমাদের বিয়েটা পরিস্থিতির কারণে হয়েছিল। কিন্তু সংসারটা আমরা নিজেরা গড়েছি।"

    রাতে খাওয়ার পর হামিদ যখন বই পড়ে, মেহেরুন তখন ছেলেদের পড়াশোনা দেখে। 
মাঝে মাঝে হামিদ বলে, "মেহের, সেদিন যদি আমি ওই ভুলটা না করতাম?"
মেহেরুন উত্তর দেয়, "তাহলে হয়তো আমি ব্যাংক ম্যানেজার হতাম না। আর তুমি কলেজ শিক্ষকও হতে না। কষ্টই আমাদের দুজনকে মানুষ করেছে।"


মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬

।। ক্ষমার আলো : রাজকুমারী মালতি।।

।।মাসকুরা বেগম।।

( এই কিচ্ছাটি ছোটবেলা আমার দিদি তাহিয়া আমাকে শুনায়। এটা আমার হৃদয়কে এতো স্পর্শ করে যে বার বার শুনার জন্য দিদিকে বায়না করতাম। সেই ছোট্ট বেলায় শুনে মনের গভীরে দাগ কাটা কিচ্ছা আজ নিজে সাজিয়ে প্রকাশিত করার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস!) 

     অনেক কাল আগের কথা। এক দেশে ছিলেন এক সহজ-সরল রাজা। তাঁর ছিল দুই রানী।

     বড় রানী ছিলেন রূপে-গুণে অনন্যা। তিনি যেমন সুন্দরী ছিলেন, তেমনই ছিলেন দয়ালু। দাস-দাসী থেকে গরিব-দুঃখী প্রজা—সকলের কাছেই তিনি ছিলেন "রানী মা"। তাঁর কন্যা রাজকুমারী মালতিও ছিল মায়ের মতোই। রূপে-গুণে সে ছিল অতুলনীয়া।

     ছোট রানী দেখতে তেমন সুন্দরী ছিলেন না, মনটাও ছিল বিষে ভরা। প্রজারা তাই তাঁকে ভালোবাসত না। তাঁর মেয়ে চন্দনাও ছিল মায়ের মতোই—কালো, আর অন্ধ মাতৃভক্ত। ভালো-মন্দ বিচার না করেই সে মায়ের সব কথায় "হ্যাঁ" বলত।

     প্রজাদের মুখে মুখে সবসময় "বড় রানী মা! বড় রানী মা!", "রাজকুমারী মালতি! মালতি!"—এই কথা শুনে ছোট রানীর বুক জ্বলে যেত। মনে মনে ভাবত, "এত আদিখ্যেতা কেন? নিশ্চয়ই বড় রানী যাদু-টোনা জানে। একদিন আমাদের তাড়িয়ে দিয়ে নিজের মেয়েকে সিংহাসনে বসাবে।" 

    এইসব কুচিন্তা সে ঢেলে দিত মেয়ে চন্দনার কানে।

     ছোট রানী হঠাৎ বদলে গেল। বড় রানীর সাথে খুব ভাব জমাতে লাগল। প্রথমে বড় রানী অবাক হলেও পরে ভাবলেন, "হয়তো ছোট বুঝতে পেরেছে, আমি ওদের কত ভালোবাসি।" 

     রাজাও খুশি। ভাবলেন, দুই রানী মিলেমিশে আছে—এর চেয়ে সুখের আর কী আছে!

    রাজা একবার রাজ্যের বাইরে গেলেন। সেই সুযোগে ছোট রানী বড় রানীর চুলে তেল মালিশ করার ছলে যাদুকরের দেওয়া এক বিষাক্ত তেল লাগিয়ে দিল। সাথে সাথেই বড় রানী কাতরাতে কাতরাতে কুমির হয়ে পুকুরের জলে মিলিয়ে গেলেন।

    মালতি পাঠশালা থেকে ফিরে মাকে না পেয়ে কেঁদে অস্থির। ছোট রানী বলল, "জানি না, দেখো গিয়ে।" 

    ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর মালতি পুকুর ঘাটে বসে কাঁদছিল। হঠাৎ একটি কুমির উঠে এল। মায়ের গলা শুনে মালতি চমকে উঠল। কুমিরই ছিল তার মা। মা বললেন, "আমি প্রতিদিন তোকে একটি করে ডিম দেব। ওটা খেলেই তোর পেট ভরবে। সাবধানে থাকিস মা।"


    ছোট রানী দেখল মালতি না খেয়েও দিব্যি বেঁচে আছে। চন্দনাকে লাগিয়ে দিল মালতির পিছনে। চন্দনা দেখল, কুমির মালতিকে ডিম খাওয়ায়। সে বাড়ি এসে মাকে সব বলে দিল।

     ছোট রানী রাজাকে বলল, "মহারাজ, পুকুরে কুমির হয়েছে। ওটাকে নদীতে ফেলে দিন।" কুমিরকে নদীতে ফেলে দেওয়া হলো। 

     এরপর মালতি নদীর পাড়ে ছাগল চরাতে যেত। কুমির-মা সেখানেও এসে তাকে ডিম খাওয়াত। চন্দনা আবার পিছু নিল। একদিন ভুলিয়ে-ভালিয়ে মালতির কাছ থেকে সব কথা জেনে মাকে বলে দিল। ছোট রানী রাজাকে দিয়ে কুমিরটাকে মেরে ফেলার হুকুম করাল।

      অসহায় মালতি জঙ্গলে চলে গেল। সেখানে এক ফলের বাগান পেল। ক্ষুধা মিটিয়ে বেঁচে রইল। চন্দনা আবার খবর দিল। ছোট রানী সেই বাগানও কাটিয়ে দিল।


       একদিন শিকার করতে এসে অন্য রাজ্যের রাজকুমার জঙ্গলে ঘুমন্ত মালতিকে দেখতে পেলেন। মালতির করুন কাহিনি শুনে রাজকুমার তাকে নিজের রাজপ্রাসাদে নিয়ে গেলেন এবং বিয়ে করলেন। মালতি হয়ে উঠল যুবরানী।

     বছর ঘুরল। একদিন রাজপ্রাসাদের দরজায় দুই ভিখারিনী এল—ছোট রানী আর চন্দনা। রাজা মারা গেছেন। মন্ত্রীর ষড়যন্ত্রে তারা রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়েছে। 

      মালতি তাদের চিনতে পেরে কাছে ডাকল। মালতির পা জড়িয়ে ধরে তারা কাঁদতে লাগল, "আমাদের ক্ষমা করে দাও মালতি।"

মালতি তাদের বুকে জড়িয়ে ধরল। বলল, "অতীত ভুলে যাও।" পেট ভরে খাওয়াল, নতুন কাপড় দিল, আর সম্মানের সাথে বিদায় দিল।

 * নীতিকথা *
হিংসা মানুষকে কোথায় নামায়, আর ক্ষমা মানুষকে কোথায় তোলে—"চন্দনা ও মালতি" গল্পটা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। 

মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

সেবক


পিঁপড়েগুলো শিল্পীর মত ছবি এঁকে হাটছে। 
লড়াই  প্রতিনিয়ত
ভাতকাপড়ের,
কেউ থেমে নেই।
মিথ্যে আবরণে শরীর  ঢেকে
প্রধান চেয়ারে বসে আছি
কারণ
সাপ লুডো খেলায় আমি অপরাজেয় ।
ফুটপাতে লাথি মেরে ভাতের থালা উপড়ে দিই,
প্রয়োজনে শরীর খুবলে কাপড় ছিড়ে দিই।
স্কুলের দরজা ভেঙে
রোদ-বৃষ্টি ছাদে শৈশব পোড়াই,
বিশ্বনাগরিকের
ভাষণ-উত্তরীয় গলায় নিই
কাঁটাতারের সীমানায়।
পরবর্তী ইচ্ছে-
অজ্ঞাতবাস পরে
বিরাট রাজ্যে অভিষেক
        ৷৷ মিঠুন ভট্টাচার্য্য।।

মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬

কুয়াশার ভেতর দিয়ে দেখা মাঠ

।। মাসকুরা বেগম ।।

ফটো: গুগল সৌজন্য 
    

  অগ্রহায়ণ মাসের ভোর। চারদিক কুয়াশায় ঢাকা। জানালার ওপাশে কিছুই স্পষ্ট নয়—না সামনের ফ্ল্যাটের নির্মাণ সাইটের আলো, না পেছনের খোলা মাঠ। সবকিছু যেন নিঃশব্দে মিলিয়ে গেছে সাদা ধোঁয়ার ভেতর। পাশের বাড়ির মোরগটিও ডাকেনি আজ। সূর্য উঠেছে কি না, তার কোনো চিহ্নই পায়নি রহিমা।

   ঘড়ির কাঁটা আর দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসা ফজরের আজান—এই দুটোর উপর ভরসা করেই নামাজ আদায় করে সে। নামাজ শেষে কোরআন পাঠ, তারপর আধঘণ্টা হাঁটা—এটাই তার প্রতিদিনের নিয়ম। কিন্তু আজ শরীরের চেয়েও মন বেশি অলস। কনকনে শীত আর ঘন কুয়াশা তাকে কম্বলের ভেতরেই আটকে রাখে।

    বিছানা থেকে কাঁচের জানালাটা দেখা যায়। এই জানালাই তার প্রকৃতির সঙ্গে নীরব সংলাপ। পর্দা সরিয়ে চারটি বালিশে মাথা উঁচু করে কম্বল জড়িয়ে শুয়ে পড়ে রহিমা। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বাইরের দিকে। কুয়াশায় ভেজা কাঁচের মতোই মনের ভেতর ঝাপসা স্মৃতিরা একে একে ভেসে ওঠে। শৈশব আর কৈশোর—সব যেন এই ভোরের আলো-আঁধারিতে মিলেমিশে যায়।

    কনকনে শীত। কুয়াশাচ্ছন্ন চারদিক। সবুজ-হলদেটে মাঠ। কাঁচা-পাকা ধানের মো মো গন্ধ। মেঠো পথ।

    ফজরের নামাজ শেষে মসজিদ থেকে ঘরে ফিরছেন পুরুষরা। আর রহিমা—তার বোন করিমা, চাচাতো বোন জাকিরা আর সাদিয়াকে নিয়ে—দল বেঁধে যায় মসজিদে। মসজিদের লাগোয়া বারান্দায় বসে ধর্মীয় শিক্ষা নেয় তারা। রহিমার বড় ভাই আবিদ বাবার সঙ্গে নামাজে গিয়ে ঘরে ফিরে আসে না। মসজিদে পড়াশোনা শেষ করে তবে বাড়ি ফিরে। 

    মেঠো পথের দু’ধারের ধানের পাতায় জমে থাকা কুয়াশার পানি ঠোঁটে লেপ্টে যায়। জাকিয়ার বড় বোন বলেছিল, এতে নাকি ঠোঁট ফাটে না। কাকভোরে কনকনে শীতে পড়ার প্রতি তাদের আগ্রহ দেখে ইমাম সাহেব সন্তুষ্ট হন। দেরিতে আসা ছাত্রছাত্রীদের নাম ধরে যখন বকুনি দেন উস্তাদ, তখন ওরা নিজেরাই ভেতরে ভেতরে একধরনের গর্ব অনুভব করে।

    ধীরে ধীরে কুয়াশা ঠেলে সূর্যের স্নিগ্ধ আলো পূব আকাশে উঁকি দেয়। মসজিদের সামনে পাতা-ঝরা আমগাছটার শুকনো ডালে দু-চারটি পাখি এসে বসে। দেয়াল ঘড়িতে আটটা বাজে। ছুটি হয়। ফেরার পথে পথের ধারের কুল গাছ থেকে ঢিল ছুড়ে কাঁচা টক কুল পেড়ে কাড়াকাড়ি করে খায় তারা—দাঁতে কামড়ে ধরা টক স্বাদে শীতের সকাল আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে।

    রহিমা ঘরে ফিরে কোরআন রেখে সোজা রান্নাঘরে ভাত খেতে যায়। তারপর পড়ার টেবিলে বসে স্কুলের বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে, পড়ে কিংবা অংক কষে। স্নান করে স্কুলের জন্য প্রস্তুতি নেয়। সকাল দশটায় শীতের মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যাওয়া। সঙ্গে তো করিমা, জাকিরা, সাদিয়া আছেই রাস্তায় আরও যোগ হয় মুনমনি, শেফালি, দুর্গা। সাড়ে দশটায় স্কুল শুরু হয়।

    রহিমাদের জমিতে চাষাবাদ করেন সুরুজ চাচা আর তাঁর দলবল। জমি তৈরি থেকে ধানের চারা রোপণ—সবকিছু তাঁরাই সামলান। রহিমার বাবা রাজনীতিতে ব্যস্ত; টানা দশ বছর ধরে গাঁও পঞ্চায়েতের সভাপতি। তিন ভাই-বোন কৃষিকাজের প্রতিটি ধাপ গভীর আগ্রহে লক্ষ করে। কাঁচা হলুদাভ চারাগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গাঢ় সবুজ হয়ে মাঠ ভরে দেয়। শীষ বেরোলে মাঠটা ছবির মতো সুন্দর হয়ে ওঠে। পাকা ধানের সোনালি রঙ আর মো মো গন্ধ—চারপাশের দৃশ্যটাই বদলে দেয়। করিমা রঙ-তুলিতে এই দৃশ্য ধরে রাখে। 

    সুরুজ চাচারা কাঁচি দিয়ে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে ধান কাটেন। ছোট ছোট মুঠি বাঁধেন। ছোট ছোট মুঠি একলগে করে বড় মুঠি বাঁধেন। ‘হুজা’ দিয়ে ধানের বড় বড় মুঠি তুলে কাঁধে নিয়ে নেচে নেচে গ্রামের দিকে যান। উঠোনের এক কোণে জমা হয় ‘ফারা’। সুযোগ পেলেই ওরা সেই ফারায় উঠে নাচে।

    ধান মাড়াইয়ের সময় গরুর হালের পেছনে ঘোরে রহিমা। হাতে পাতলা বাঁশের লাঠি।
—“রহিমা মার! ডাণ্ডা মার!”
—“চাচা, মারলে তো গরু কষ্ট পাবে।”

করিমা চেঁচিয়ে ওঠে,
—“বুবু মারিস না! ওদেরও তো কষ্ট হয়!”

সুরুজ চাচা হাসেন,
—“আইজ আর আমার মাড়া দেওয়া অইত নায়।”

ঠিক তখনই মা লাঠি হাতে বেরিয়ে আসেন,
—“দাঁড়াও ক্ষেতুয়ালনি হখল! পড়াশোনা নাই?”

   দুই লাফে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসে রহিমা। পিছে পিছে করিমাও পড়তে বসে। মা বকুনি দিতে দিতে রান্নাঘরে ফিরে যান। আবিদের সামনে মেট্রিক পরীক্ষা তাই সে দিন রাত এক করে পড়াশোনা করছে।

    ধান থেকে খের আলাদা করা রহিমার খুব প্রিয়। ‘উকৈট’ দিয়ে খের সরানো, ঝাড়ু দিয়ে বাছাই - এসব যদি সুরুয চাচা সব সময় তাকে করতে দিতেন! তার খেরের পাহাড়ে গড়াগড়ি। সন্ধ্যায় পা ধোয়ার পর চুলকানি আর জ্বালা। মা বকতে বকতে সরিষার তেল মাখিয়ে দেন। খের দিয়ে তৈরি হয় ‘ফেইন’—সারা বছরের জন্য সংরক্ষণ।

    হঠাৎ মোবাইলের নোটিফিকেশন শব্দে বর্তমান ফিরে আসে। সকাল আটটা বেজে গেছে। ছেলের স্কুলে শীতের ছুটি, স্বামীর কলেজও বন্ধ। তারা গ্রামে গেছে। রহিমা যেতে পারেনি—অফিস খোলা। আজ রবিবার। ঘরে সে একা।

    হোয়াটসঅ্যাপে ছেলের পাঠানো একটি ভিডিও।সে কিছু তথ্য সংগ্রহ করে ও কিছু নিজে প্রত্যক্ষ করে রীল বানিয়েছে—ট্র্যাক্টর দিয়ে জমি চাষ, চারা রোপণ, শস্য শ্যামল মাঠ, সোনালি ধান। তারপর মেশিনের ক্যাঁচ-ক্যাঁচ শব্দে ধান মাড়াই। আগের মত গরু নেই। পাখি নেই। মানুষগুলো পাশে দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে আছে। দূরে মাঠে কয়েকটি গরু শব্দ দূষণের ফলে অস্থিরতা অনুভব করছে।

ভিডিও শেষ হয়।

   রহিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলেকে লিখে পাঠায়—
“কোথায় সেই কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর, পাখির কলতান, মুক্ত বাতাস? মানুষ আর পশুর মধ্যে যে আত্মিক সম্পর্ক ছিল—সবই কি আজ শব্দ আর ধোঁয়ার ভেতর হারিয়ে গেল?”

জানালার বাইরে কুয়াশা তখনও ঘন। মাঠ দেখা যায় না।
শুধু নিস্তব্ধতা।


 

  

সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫

বেমসুমে ফুল ফোটাতে পারি

 ।। আবু আশফাক্ব চৌধুরী ।।

 


 

 

 

 

 

হে আমার নয়নঝুরি প্রিয়তমা 
যদি কাছে থাকো অনায়াসে
 ফুল ফোটাতে পারি বেমসুম দিনে 
নীল আকাশের বুকে লিখে দিতে পারি
তোমার অশ্রুত নাম হৃদয়ের রক্ত দিয়ে 
মেঘেরা ধোয়াবে এসে যত্ন করে
তোমার উদ্ধত বাহুযুগল
যদি কাছে থাকো অনায়াসে 
প্রজাপতির ডানা থেকে হাজারো বর্ণের 
শিখা ছিনিয়ে আনতে পারি


সোমবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

বিকেলের শিহরণ

 

।। রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ ।।

(C)সৌজন্য

 

 

 

 

 

বুদ্ধি-সুখে কাতরায় কিছু দৃশ্য 
মাতব্বরি শেষে রাতের শিহরণে
উত্তেজনায় টানটান গাণিতিক ত্রাণ 
বিশেষজ্ঞ মেঘে কাতুকুতু 
জাগিয়ে রাখে মৃত্যুর সংলাপ 
স্বপ্নদোষ এড়িয়ে কবিতা দোষে
খাতায় চোখ বুজে আসে…

বুধবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৫

।। গায়ে পড়া অতিথি।।

।। মাসকুরা বেগম ।।
 ফটো : গুগল সৌজন্য 
          
 
    মজুমদার বাড়ির পিছন দিকের আম গাছটার তলায় আনমনে একা বসে আছে সামিরা মজুমদার। কাতর দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ওই টিলার পানে। মাঝে মাঝে মাথার ওড়নার আঁচল দিয়ে ভেজা চোখ দুটো মুছে নিচ্ছে! বিকেলের পড়ন্ত সূর্যের আলো ও মেঘেরা মিলে মিশে পশ্চিমের আকাশে কী যে মনোরম রং এঁকেছে! কিন্তু সামিরাকে এই মুহূর্তে কোনো মনভোলানো দৃশ্যই টানছে না! তার বুকের ভিতরে উথাল পাথাল ঝড় বইছে! কত সুখ দুঃখের স্মৃতি মনে পড়ছে! এই মাঠ- ঘাট, এই আম গাছ, কাঁঠাল গাছ, এই পথের দুপাশের বাঁশ ঝাড়, ওই টিলা, ওই ধান ক্ষেতের মাঠ, ওই সূর্যাস্তের রং; সবই জড়িয়ে আছে তার শৈশব কৈশোরের স্মৃতির পাতায়! 
      
      এক সময়ের এই আনন্দ উল্লাসের স্থান পরিবর্তন হয়নি, এখনও সেই বিদ্বানপুর গ্রাম ঠিকই আছে, সেই মাঠ ঘাট আছে, অবশ্য কিছু কাঁচা রাস্তা পাকা হয়েছে, কিছু কাঁচা ঘর পাকা হয়ে গেছে। কিন্তু সামিরা অনুভব করছে কোথাও যেন কিছু একটা পরিবর্তন ঘটেছে! পরিবর্তনের সেই উপাদানটি হচ্ছে মানুষ! মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও মন মানসিকতার পরিবর্তন ঘটেছে! সামিরার আনন্দ উল্লাস পরিবর্তিত হয়েছে বুক ফাটা কান্নায়! হুক হুকিয়ে কাঁদে সামিরা! ওড়না দিয়ে চোখ মুছে নেয় সে! বাচ্চা দুটো এসে যদি তার কান্না দেখে তবে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বে; যেভাবে একদা এক সময় ওই টিলার কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত তার মা বাবা অস্থির হতো! আজ মা বাবার স্থান দখল করেছে তার এই সন্তান দুটো ! নিজের সন্তানের চেহারা মনে পড়তে একটু শান্ত হয় সামিরার মন।

      সামিরা স্বামী-সন্তানদের নিয়ে ব্যাঙ্গালোরে থাকে। সেখানে তার স্বামী আরিফ বড়ভূইয়া একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে উচ্চপদস্থ কর্মচারী। সেই সুবাদে তারা ব্যাঙ্গালোরে থাকে। সামিরা এক  কৃষিপ্রধান গ্রামের এক কৃষকের মেয়ে। সে ছোটবেলা থেকেই খুব মেধাবী! তার শ্বশুর আব্দুল আলিম বড়ভূইয়া সে যে উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছে সেই বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি সামিরার বাবা ইলিয়াস আহমাদ মজুমদারের বন্ধু। তার বাবা ও শ্বশুর একই কলেজে একসাথে পড়াশুনা করেছেন। সামিরার বাবার প্রচুর পৈতৃক কৃষি জমি ছিল। এখনও আছে। তার বাবা দাদার সঙ্গে কৃষি কাজ করতেন, পড়াশোনাও করতেন প্রচুর। বিজ্ঞান ও অংকে তার বাবা খুব প্রখর ছিলেন।নিজ গ্রামেই একটি হাইস্কুলে শিক্ষকতা করতেন। স্কুলটি ভেনচার ছিল।কত বছর কাটালেন কিন্তু স্কুলটি সরকারিকরণ হচ্ছিল না। তাই বাবা স্কুলের শিক্ষকতা ছেড়ে পুরোপুরি কৃষি কাজে মনোনিবেশ করেন। তিনি ভাবলেন ভেঞ্চার স্কুল নিয়ে পড়ে থাকলে আমার ভাত-পানির যোগাড়, আমার পাঁচটা সন্তানের ভরণপোষণ, তাদের পড়ালেখার খরচ কোথা থেকে আসবে! ।্তা্্তা্তা্্ত্তা্্্তা্্তা্তা্্ত্তা্ তাই নিজের শ্রম ও বুদ্ধি দিয়ে বাবা একজন দক্ষ কৃষক হয়ে উঠলেন। তারা বেশ সচ্ছল জীবন যাপন করতে লাগল। পড়াশোনার ক্ষতি হবে ভেবে বাবা তার কোনো ছেলেকেই কৃষি কাজে লাগালেন না। তাই তারা এক একজন উচ্চ শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠেছে।

       সামিরার জ্ঞান পিপাসু মন, আচার-ব্যবহার, চরিত্র ইত্যাদি গুনাবলী দেখে তার গ্রেজুয়েশন সম্পূর্ণ হওয়ার পর পরই ছেলের বউ করে ঘরে  তুললেন আব্দুল আলীম। মাস দুয়েক শ্বশুর বাড়ি থাকার পর তাকে স্বামীর সঙ্গে ব্যাঙ্গালোরে পাঠিয়ে দেন শ্বশুর। 

      ব্যাঙ্গালোরে যাওয়ার পর প্রথম প্রথম খুব কাঁদত সামিরা! তার গাভী মনি আর ছাগল ননির জন্য মন কেমন করত! কিছু স্মৃতি মনে পড়তে এই মন খারাপের মুহূর্তেও হাসি পায় সামিরার । সে নাকি সাংঘাতিক গাঁইয়া মেয়ে ছিল! সেখানকার খাওয়া দাওয়ার সঙ্গে প্রথম প্রথম মানিয়ে নিতে তার সময় লেগেছিল বেশ কয়েকদিন। দেশী চাউলের ভাত নেই, দেশীয় শাক- সবজি নেই, দেশীয় গাভীর দুধ নেই, পুকুরের মাছ নেই, মুখে সেই সাধ নেই ইত্যাদি নিয়ে তার আক্ষেপ ছিল খুব! এখন কিন্তু নেই ওগুলো। ধীরে ধীরে সে পরিবেশ পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। স্বামী তাকে চটানোর উদ্দেশ্যে মাঝে মাঝে ছেলে মেয়েকে এইসব পুরনো কথা বলে জ্বালাতন করে। সে কিন্তু আজকাল চটে না বরং ছেলে মেয়ের সামনে  গর্ববোধ করে কত তাজা প্রাকৃতিক পুষ্টিকর খাবার খেয়েছে, খোলামেলা প্রকৃতির বুক থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করেছে! এখন যে কৃত্রিমতার মাঝে তারা এসবকিছু থেকে বঞ্চিত তাই নিয়ে কত আক্ষেপ করে সামিরা!

     স্বামী বেশিরভাগ সময় অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকেন তাই বাচ্চা দুটোকে সামলাতেই তার দিন- রাত -মাস - বছর কেটে যায়। নবম শ্রেণী পড়ুয়া মেয়ে আদিবা প্রায়ই বলে ' মা তোমার স্মৃতি শক্তি কত প্রখর! নিজের ছোটবেলার কথা আমাদের সাথে যখন শেয়ার কর তখন মনে হয় কোনো গল্পের বই থেকে নেওয়া কাহিনি শুনছি, যেন ইতিহাসের পাতা থেকে কুড়িয়ে আনা কোনো এক সময়, সেই সময়ের ঘটনা, সামাজিক পটভূমি, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদি তুমি কত সাবলীল ভাবে তুলে ধর!'

      সামিরার দুই সন্তান তার এই আবেগ, ভালোবাসা সর্বোপরি তার নিজস্বতা আর তার এই নস্টালজিক হওয়াকে কদর করে, সঙ্গ দেয়, আবেগিক কথাবার্তায় আপ্লুত হয়ে উঠে, এটা তাদের দুই ভাই-বোনের মায়ের প্রতি থাকা সহমর্মিতা। যে সামিরা এক রাতের জন্যও নিজের বাড়ি ছেড়ে কোথাও থাকতে পারেনি, বিয়ের পর থেকে সে বছরের পর বছর দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছে বাড়ি থেকে বহু দূরে! এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে সামিরা বুক থেকে!

    'মা! মা! আমাদের মাঠ ঘাট দেখা শেষ চল ঘরে যাই!' আসিফের ডাকে বাস্তবে ফিরে সামিরা। অতীতের সেই রঙিন স্মৃতির টানে বেঁচে আছে এই বাবার বাড়ির সাথে ভাঙাচোরা সম্পর্ক! এই বাড়ি, এই গ্রাম, এই পথ-ঘাট-মাঠ তাকে হাতছানি দেয় তাইতো সে চলে আসে এই ভগ্নাবশেষ দেখতে! ওই নীল আকাশের সীমাহীন বিস্তৃতির মতো বিস্তৃত সামিরার কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এখানে! সাগরের গভীরতার মতো গভীর সেগুলো! সেই গভীরতায় শৈশব কৈশোরের মুক্তর খোঁজ করে সামিরা!

    'আমি একটু পরে আসছি তোরা গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে বিশ্রাম কর। বিকাল ছয়টা থেকে সাতটার মধ্যে গাড়ি আসতে বলেছি! রেডি হয়ে থাকবে তোমরা।'

      'মা কোথায় যাব? বলে ছিলে না এক রাত থাকবে এখানে!' আদিবা বলল।

     ' তোদের দাদার বাড়িতে ফিরে যাব! তোদের দাদাজীর শরীর বেশি ভালো নেই যে।'

      বাচ্চাদের কাছে শ্বশুরের শরীর খারাপের বাহানা দেখিয়ে চলে যেতে চায় সামিরা! এক রাত কেন? তিন রাত এখানে কাটালেও তার শ্বশুর কিছু বলবেন না! আসলে সামিরার মন চাইছে না নিজের বাড়িতেই অতিথি হয়ে থাকতে!

     পাঁচ বছর আগে বড়দা নিজে ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে তাকে আদরের সাথে নিয়ে এসেছিলেন। সেটা দাদার প্রথম ও শেষবারের মতো সামিরার ব্যাঙ্গালোরের ফ্ল্যাটে যাওয়া। খুব খুশি হয়ে সামিরা তার সঙ্গে এসেছিল। পর পর বাবা মা মারা যাওয়ার পর সামিরা নিজের বাড়িতে আসা কমে যায়। এখন আর কেউ পথ চেয়ে থাকে না! কেউ ফোন করে জিজ্ঞেস করে না 'তুই আমাদের আব্বু ও নাতি নাতনী দুটোকে নিয়ে কবে আসবি?' মা বাবা কোনদিন তার স্বামীকে নাম ধরে ডাকেননি, আব্বু বলে ডাকতেন। 

     বড়ো ভাইয়ের সঙ্গে বাড়িতে আসার দুদিন পর ভাইয়েরা সবাই বাড়িতে এসে জড়ো হয়েছিল ‌। যেহেতু নিজেদের কর্ম সুত্রে তারা বাড়ির বাইরে থাকেন তাই ঈদে-পর্বে একত্রিত হয় সবাই। ছোটখাটো একটা অনুষ্ঠানের মতো আয়োজন করা হয়েছিল সেদিন। সামিরা খুব খুশি ছিল। সামিরার খুশিতে ছাই পড়েছিল আছরের নামাজের পর! তার জন্য যে অপেক্ষা করছিল এক বিস্ময়! বড়ো ভাই হাতে একটা কাগজ নিয়ে তার সামনে এসে শুরু করলেন, ' সামিরা আয়! বস্ এখানে! একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনায় বসেছি! তোর থাকা দরকার! আমরা চারজনের মধ্যে তুই একমাত্র আদরের বোন! তোকে ছাড়া কি  আমরা কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারি।'

উৎসুক সামিরা অধৈর্য্য হয়ে বলল, 'কী বলবে? বলোনা বড়োভাইসাব! এতো ভনিতা করছো কেন?'

    মেজভাই চেয়ার থেকে উঠে বড়দার হাত থেকে কাগজটা নিতে নিতে বললেন, 'আরে বড়দা তুমি সোজাসুজি বলতে পারোনা! সামিরা আসলে  তোর এখানে একটা সই লাগবে! আমাদের সম্পত্তি গুলো এখনও সব বাবার নামে রয়ে গেছে। এগুলো সব আমাদের চারজনের নামে বাটোয়ারা করে নেব। শরিয়ত মোতাবেক তুইও অংশীদার কিন্তু তুই এসব দিয়ে কি করবি? তাই তুই তোর বাবার সম্পত্তির কিছু লাগবে না বলে সই করে দিলে ভাগ বাটোয়ারা সহজ হয়ে যাবে!'

      সামিরা কিছুটা বিস্মিত হলো তাদের কথায় কিন্তু ভাবল 'এ আর কী এমন কথা! ভাইরা আমার জন্য কী কম করেছে; বিয়েতে কত খরচাপাতি করল, বাচ্চা দুটোরও জন্মের সময় মা আমাকে এখানে নিয়ে আসল তাঁর একমাত্র মেয়ের নাতি পুঁতির দেখাশোনা তিনি নিজে করবেন বলে, তারপর সব কিছু তো ভাইরাই দেখাশোনা করল! আমার অংশ নিজের ভাইদের কাছে থাকলে ভালোইতো, বিপদে আপদে কাজে আসবে। বাড়িতে যখন তখন আসব, তাদের কাছেই তো থাকব!' হাত বাড়িয়ে কাগজটা  নিয়ে সে তার  'পৈতৃক সম্পত্তির অংশ থেকে কিছুই চাই না, সবটুকু স্বেচ্ছায় ভাইদের দান করে দিলাম ‌‌‌‌.......' খুশি খুশি সই করে দিল। 

     এখন কেউই সামিরার খবর প্রায় নে-ই না। 'এত দূর ব্যাঙ্গালোর!' 'কেমনে যাব ‌! এত খরচ হবে!' 'যাওয়ার এত সময়ই বা কোথায়?' যাওয়া তো দূরের কথা একটা ফোন করে বোনের খবর নেওয়ার সময় পর্যন্ত হয়ে উঠে না ভাইদের!এই তো কদিন আগে এক ভাইপো হোয়াটসঅ্যাপ এ ম্যাসেজ করল, 'পিসিমনি! আমাদের বাড়িতে আগামীকাল দাদা দাদির রূহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া আছে। খানা-পিনা হবে। তোমার দাওয়াত রইলো। সবাইকে নিয়া আসলে ভালো হতো। আত্মীয় স্বজন সবাইকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। প্রোগ্রামের ডিসিশন হঠাৎ করে নেওয়া হয়েছে তাই হয়তো তোমাকে আগে বলা হয়নি । এখন আসতে না পারলেও পরে আসিও কিন্তু!' ম্যাসেজটা দেখে সামিরা পড়ে আর মনে মনে হাসে; 'নিজের বাড়িতে দাওয়াত!' ' আমাদের বাড়িতে তোমার দাওয়াত!' প্রোগ্রামটার জন্য নিশ্চয়ই চার ভাইয়ের মধ্যে মিটিং হয়েছে তখন তো মিটিং এ ডাকেনি! সেদিন অন্তত একটা ফোন করতে পারত ভাইয়েরা !' কেন ডাকবে ? সামিরা তো এখন এ বাড়ির সদস্য নয়! সামিরার নিজের বাড়ি যে আজ তার অংশীদারি ভাইদের দখলে! বাচ্চা ছেলেটার হয়তো পিসিকে ডাকা হয়নি বলে খারাপ লেগেছিল তাই বোধহয় একটা ম্যাসেজ পাঠিয়েছে।

     কয়েক দিন থেকে নিজের বাড়ির জন্য মনটা খুব কাঁদছিল তাই সামিরা বাচ্চা দুটোকে নিয়ে চলে আসল। জন্মভূমিতে এসে অনুভব করল এখানে তার স্থান শূন্য! এখন সে শুধু এ বাড়ির এক গায়ে পড়া অতিথি! বড়ো ভাবির আজ বাবার বাড়িতে নিমন্ত্রণ আছে; তাই তিনি চলে গেলেন। মেজ ভাবির কাছে শুনল তাদের সংসারের অভাব অনটনের যত গল্প। অবশ্য মেজদা সরকারি স্কুলের শিক্ষক। সেজ ভাবি বাচ্চাদের পড়াশোনা নিয়ে এতটা সচেতন যে পিসির সঙ্গে বা পিসতুতো ভাই-বোনের সঙ্গে দশ-পনেরো মিনিট কথা বলার সময় পর্যন্ত দিলেন না বাচ্চাদের। ছোট ভাবি নিজেই সারাদিন রিল ভিডিও বানানো নিয়ে ব্যস্ত। নিজের স্বামী সন্তানকেই সময় দিতে পারছেন না । অবশ্য তাদের নিয়ে ভিডিও করেছেন, ফটো তুলেছেন। হঠাৎ গুড়ুম করে মেঘের শব্দ হলো। শিহরিত হয়ে সামিরা ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসল! উঠে দাঁড়াল।এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে মা-বাবার কবরের পানে চেয়ে নিল শেষ বারের মত। কী জানি আর কবে আসা হবে, কতদিন পরে!