“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২০

বুমারেং (রম্য-কাব্য)

বুমারেং (রম্য-কাব্য) 
--------------------------
               ঝোড়োমেঘ
                (সিক্তা বিশ্বাস) 
                   ৬/৭/২০। 

মস্তানরা আজ বেশিরভাগই মেনি বিড়াল!! 
নেইকো সেই দাপুটে হুংকার! 
এক কথায় মুখে ছিপি আটকাবে
নেই সেই তেজী ধনুকের টংকার!

পাড়ার রুটির দোকানের  আড্ডার আসর
রকমারি সে যে বিচিত্র বাসর! 
নানান রঙিন মেজাজী চিত্র 
নিত্যনতুন যোগায় ঘটনা বিচিত্র!
কখনো কখনো কিছু মেজাজী খেয়াল 
দর্শায় যেন শানানো ঢাল-তরোয়াল!
যেমন দোকানে খদ্দেরের লাইন! 
তেমনি দোকানীর মেজাজ ও বুলি ফাইন! 
যতই হোক না চেনা জানা 
নিয়ম ভাঙায় তাঁর ঘোর মানা! 
বাইক হাঁকিয়ে কাল এক বাবুমশাই 
দেখাচ্ছিলেন মস্তানী যেন দোকানীর হবু জামাই! 
এমন ছিল তার হম্বিতম্বি ও হাঁকডাক! 
যেন সারা না দিলে দোকান হবে এক্ষুনি ফাঁক!! 
মেজাজী দোকানীর নেইকো হেল-দোল! 
উল্টে ঝাঁঝিয়ে উঠলো বাজিয়ে ঢোল!!
একবার, দু'বার লক্ষ্য রেখে
তিনবারেতে উঠলো দাপুটে হেঁকে! 
মস্তানী ছেড়ে সোজা লাইনে দাঁড়ান ! 
ভদ্র বেশী খদ্দেরের হাতটি বাড়ান! 
সত্যিই যদি হিম্মতওয়ালা মস্তান হতেন, 
তো বাড়িতেই বউকে দিয়ে রুটি বানিয়ে নিতেন!!

                   *************

শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২০

একটু নিজের কথাই বলি – ২


একটু নিজের কথাই বলি – ২

আর দশটা শিশুর মত আমার ছাত্রজীবন শুরু হয়নি। আমার বাড়ির সদর দরজা আর বাঁশকান্দি এম ভি স্কুলের প্রবেশদ্বার ছিল একেবারেই মুখোমুখি। শুধু রাস্তাটাই পার হওয়া। তখন এটা জাতীয় সড়কও ছিল না, এখনকার গলির মত ছিল। সেই এত কাছের স্কুলে ভর্তি হলেও আমি সেখানে গিয়ে পড়তে পারিনি। আমার মা চাকরি করতেন। বাড়িতে আমার ছোট ভাইবোনের দেখাশোনা করা ছিল আমার দায়িত্ব। আগলে রাখা, দুপুরের খাবার খাওয়ানো ইত্যাদি। স্কুলে না গিয়েও আমার রোল নম্বর এক হয়ে যেত। এভাবে তৃতীয় শ্রেণীতে ওঠার পর বাড়িতে চিঠি এল আমার নাকি নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। হেড পণ্ডিত নামর আলি বড়ভুঁইয়ার সামনে হাজির হলাম। অনুরোধ করলাম ভাই-বোনদের কথা বলে। কিন্তু তিনি জানিয়ে দিলেন, স্কুলে আসতেই হবে। সেই থেকেই স্কুল যাওয়া শুরু হল আমার। কিন্তু দুপুর হলেই ছুটে আসতাম বাড়িতে। একবার চিড়ে ভিজিয়ে রেখে গিয়েছিলেন মা। বাটির ঢাকনা খুলতেই কালো পিঁপড়ে আমার হাত মুখ সব ঘিরে ফেলল। কোনও ভাবেই এদের সরাতে পারছিলাম না। ভাই-বোন মুখ বেজার করে সেই দৃশ্য দেখছিল। রাগের মাথায় একটা বড় চামচ দুটুকরো করে ফেললাম। এর পর অনেক খুঁজে একজন কাজের মেয়ে পাওয়া গেল।

স্কুলের ছোট্ট মাঠে কাবাডি কোর্ট বানিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু হাফ টাইমে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রীরা আমাদের মেরে সরিয়ে তারা খেলত। আমি, মইনুল, চয়ন, মাহমুদ, আমির হুসেন, আমির উদ্দিন, আক্তার মিলে ঠিক করলাম যেমন করেই হোক আমাদের কোর্টে এদের আর খেলতে দেওয়া যায় না। যেমন কথা তেমন কাজ। দায়িত্ব পেয়ে আমি কোদাল আনলাম বাড়ি থেকে। তারপর তছনছ হয়ে গেল কোর্টটি। হঠাৎ কে একজন একটা দারুণ বুদ্ধি দিল, ‘কিছু কাঁচ ফেলে দিলে কেমন হয়?’ তাই হল। পরদিন ধরাও পড়ে গেলাম। নীলমণি স্যার, ফজলু স্যার, মুক্তাদির স্যার, মইনুল স্যার মিলে হাত লাল করে ছাড়লেন। সব শুনে আব্বা শুধু বলেছিলেন, শাস্তি তো তোমার প্রাপ্য। আড়ালে গিয়ে মাকে বলেছিলেন, এক হাতে বিশটা করে বেত্রাঘাত বেশি হল না? মা বলেছিলেন, একটা শিক্ষা তো হল। আমারও মনে হয়েছিল কাজটা ভালো করিনি। কিন্তু আমার সঙ্গীরা বলত, আমাদের খেলার ব্যবস্থাটাও হল না, বেকার মার খেতে হল।

স্কুল আমার ভালোই লাগত। বাড়িতে কড়া শাসন ছিল। আমাদের বাড়ির মুখে একটা কাঁঠাল গাছ ছিল আমাদের লক্ষ্মণরেখা। এই গণ্ডির বাইরে যাওয়ার সাহস ছিল না আমাদের। আমার তো একটু বেশিই নিষেধ ছিল। বাবার সঙ্গে বাজার যাওয়া বা ছুটি পেলে আত্মীয়বাড়ি যাওয়া ছিল আমার বাইরে যাওয়া। এই কারণেই বোধ হয় স্কুলের প্রতি একটা টান ছিল। রবীন্দ্রনাথ কেন যে স্কুল পালাতেন তার কারণ আমি অনেক চেষ্টাতেও খুঁজে পেতাম না। ভাবতাম জানলা দিয়ে বাঁশকান্দি আনুয়ার জলের ঝিকিমিকি দেখার সুযোগ পেলে হয়ত তিনিও স্কুল পালিয়ে নদীতীরে গিয়ে বসতেন না।

এভাবেই কেটে গেল চতুর্থ শ্রেণী। বৃত্তি পরীক্ষা দিলাম শিলচরের কোন এক স্কুলে। মা আমাকে নিয়ে গেলেন রেহিমা আন্টির (বাবার মামাতো বোন) মধুরবন্দের ভাড়া বাড়িতে। তিনিও শিক্ষিকা ছিলেন। তাই আমার প্রস্তুতি হয়েছিল খুব। মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, দোকানের সাইনবোর্ডে ‘লক্ষীপুর রোড’ কেন লিখা। জানলাম, এই পথেই নাকি বাদ্রিঘাট হয়ে লক্ষীপুর যাতায়াত ছিল। শহরের প্রাণকেন্দ্র নাকি এটাই ছিল। যাই হোক বসলাম পরীক্ষায়। গণিতে সব যেন গুলিয়ে ফেললাম। বৃত্তি পাওয়া আর হল না।

এম ভি স্কুল ছিল সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত। শিক্ষকদের আন্তরিকতাও ছিল। কিন্তু চতুর্থ শ্রেণীতে এক অজানা কারণে আমি পেছনে পড়ে যাই। পরে উত্তরপত্র পরীক্ষা করে আমার প্রথম স্থান বহাল হয়। বাঁশকান্দি নেনা মিয়া হাই স্কুলে (তখনকার) ভর্তি হলাম ক্লাস ফাইভে। দাদার হাত ধরে অনেক গল্প করতে করতে যাওয়া। দাদা এর আগে রামসুন্দর বালিকা বিদ্যালয়ে পড়েছিলেন, এছাড়াও তিনি তখন থেকেই মাঝে মাঝে বাজার খরচ করতেন। আমার থেকে তাঁর স্মার্টনেস বেশি ছিল। দাদা মস্তানদের থেকেও আমাকে বাঁচাতেন। আমি হাল্কা রোগা ছেলে ছিলাম। দাদা গোছের ছেলেরা আমাকে জ্বালাতন করত। আমি মুখ বুজে সহ্য করতাম। আস্তে আস্তে সব ঠিক হওয়া শুরু করল।


বড় মাঠ, সুন্দর ঘর, লিচু গাছ, আমগাছ, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ঝকঝকে চেহারার শিক্ষক-শিক্ষিকা সব মিলে আমার কাছে স্কুলটি প্রিয় হয়ে উঠল। তখনকার প্রধান শিক্ষক আব্দুল মতিন বড়ভুইয়া ছিলেন মার সম্পর্কিত মামা। শিক্ষকরা যেন শিক্ষকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে কোনও একটা অভিযান চালাচ্ছেন মনে হত। কয়েকজন শিক্ষক যে খামখেয়ালি ছিলেন না তা নয়। শিক্ষক-শিক্ষিকারা আমাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন, কারণ আমিও খুব বাধ্য ছাত্র ছিলাম। দুটি সেকশনেই আমাদের ব্যাচটির প্রায় সবাই মেধাবি ছাত্র-ছাত্রী হিসেবে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল। সেই দলের সর্দার হয়ে গেলাম আমি। মানে আমাকে ক্যাপ্টেন করা হল। ষান্মাসিক পরীক্ষার আগে সহপাঠীদের উদ্বেগ দেখে কয়েকজনকে নিয়ে গেলাম প্রধান শিক্ষকের কাছে। বললাম, ‘আমরা খুব চিন্তিত। প্রশ্নগুলো যেন আমাদের পক্ষে কঠিন না হয়।’ মুচকি হাসার চেষ্টা করেও যেন পারলেন না তিনি, মুখটা হাঁ হয়ে গেল। রাশভারি একজন মানুষের পক্ষে এই হাসিটাও ছিল অট্টহাসির সমান।

অনেক সমস্যা সত্বেও পড়াশোনা থামেনি। মাঝে মাঝে মরে যাওয়ার ইচ্ছে হত। তারপর ভাবতাম আমার মা-বাবার জন্য আমাকে পড়তে হবে, প্রথম সারিতে থাকতে হবে। আব্বা আমাদের নিয়ে খুব পরিশ্রম করতেন, এই একটা কাজেই যেন তিনি আত্মনিয়োগ করলেন। প্রতিযোগিতা ছিল মুলত তিনজনের – শাহারুল, হায়দর (বর্তমানে এই স্কুলেই বিজ্ঞান শিক্ষক) ও আমার। শাহারুলের হস্তাক্ষর ছিল ঈর্ষনীয়। এ ছাড়াও নিলোফার (বর্তমানে এই স্কুলের লজিক শিক্ষিকা), শামিমা (অধ্যাপক আব্দুস সহিদ স্যারের মেয়ে), নাসমিন (স্কুলের অধ্যক্ষের মেয়ে), রনি, ইকবাল, ইসমত, মঞ্জুশ্রী, ইন্দিরা সহ অনেকেই। ক্লাসে বা স্কুল চত্বরে ছেলেদের সঙ্গে মেয়েদের মাখামাখি তো দূর, কথা বলা বা তাকানোও ছিল অসম্ভব। মেয়েরা স্কুলে আসত ঘোমটা দিয়ে, তার উপর আবার ছাতা দিয়ে মুখ ঢেকে। এরপরও কিছু বখাটে ছেলে ইভটিজিং করত, তবে আড়ালে তীর্যক মন্তব্য পর্যন্ত সীমিত ছিল তা। আমরা ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠতে উঠতে ছেলে-মেয়েদের চোখে চোখ রেখে কথা বলা যেন আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে শুরু করল। কিছু নতুন সমস্যাও দেখা দিল। এভাবেই মাধ্যমিক পরীক্ষা এল। আমি, হায়দর আর নিলোফার প্রথম বিভাগে পাস করলাম। অনেকেই সামান্যের জন্য দ্বিতীয় বিভাগে পাস করল। এরই মধ্যে স্কুলটি উচ্চতর মাধ্যমিক হয়ে গেল। সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল। অনেকেই এই স্কুলেই থাকল।

তারপর আমার চোখ অপারেশন। দুবছর পড়া হল না। আর পড়াশোনা করার ইচ্ছে রইল না। দুবছর গ্যাপ দিয়ে ভর্তি হলাম নেনা মিয়া স্কুলেই। ক্লাস আর পাঠ্যপুস্তক ছাড়া অন্য প্রস্তুতি ছিল না। দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হলাম। ইংরাজিতে মাত্র ৮৪ মার্কের উত্তর লিখে পেয়েছিলাম ৭০। আসলে সেও আব্বার অবদান। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত আমাকে যে ইংরাজি ব্যাকরণ শিখিয়েছিলেন তার ফল এই। সুলতান স্যার ও ভারতী ম্যাডাম আমাকে শান দিয়ে ঠিক করলেন। ভর্তি হলাম কাছাড় কলেজে ইংরাজি সাম্মানিক নিয়ে। আবার নতুন পরিবেশ। ফাঁক পেলেই বসে যেত গানের আসর। পার্থ, সুব্রত, সিদ্ধার্থ, জয়দীপ, জন আরো অনেক। তারপর আড্ডা দিতে গিয়ে ক্লাস মিস। দোতলার ছাদে বসে জমিয়ে আড্ডা। পড়াশোনাও ছিল। একবার ছাত্র সংসদে সম্পাদক পদের জন্য নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিলাম। কিন্তু নির্বাচনটাই রদ হয়ে গেল। বাড়ি থেকে আসা যাওয়া করা সমস্যা। থাকলাম পঞ্চায়েত রোডে। সেখানেও পরিচয় আরো অনেকের সঙ্গে। আবার চোখ অপারেশন। আবার দুবছর গ্যাপ। এবার ভবঘুরে হয়ে গেলাম। পড়াশোনা আর করব না স্থির করলাম। ক্লাব, বিয়েবাড়ি, গানের আসর এসবে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। সাইকেলে চড়ে সোনাই, সোনাবাড়িঘাট, শিলচর চক্কর দেওয়া। মাঝে মাঝে লোন নিয়ে কী কী করার পরিকল্পনাও শুরু করে দিলাম।

আব্বা তখন ফ্রি কোচিং ওয়ার্কশপ চালাতেন। সেই সময় আমাদের বাড়িতে এলাকার শিক্ষানুরাগী মানুষের আড্ডা জমত। এই আড্ডার মধ্যমণি জাফরুল হাসান আমাকে একদিন খুব জোরালো ভাষায় বোঝালেন। আমি রাজি হলাম আবার পড়াশোনা শুরু করতে। সঞ্জয়, বাহার, মাহমুদ, কবির পয়লাপুল নেহরু কলেজ থেকে ফর্ম আনল। আমাকে শুধু সই করতে হল। তারপর আবার আরেক যাত্রা। কিছুতেই পড়াশোনায় মন বসে না। বন্ধুসংখ্যা কম রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলাম। এই সময় অধ্যাপক সুর্যকান্ত চক্রবর্তী, অ্যাকাউন্টেন্ট সুনির্মল নাথ, অধ্যাপক গণেশ দে, অধ্যাপক আবিদ রাজা মজুমদার চাইছিলেন শারদোৎসব আয়্যোজন হোক। বার বার চেষ্টা করেও হয়নি। আমরা এগিয়ে এলাম। নেহরু কলেজের ইতিহাসে এই প্রথম শারদোৎসব। আর লুকিয়ে থাকতে পারলাম না। দল বড় হয়ে গেল। বন্ধুদের অনুরোধে ভোটে লড়ে হারলাম। শুরু হয়ে গেল গান, আড্ডা, ঘোরাঘুরি। শ্যামলদার রেস্তোরাঁয় আড্ডা আর জয়পুর, হরিনগর, লাবক, জিরিঘাট, লক্ষীপুর চষে বেড়ানো। পাস করলাম দ্বিতীয় বিভাগে।

এবার আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হলাম। অনেক চেষ্টা করলাম ধারে কাছে একটা মেস বা ভাড়াঘর খুঁজে পাওয়ার। কিন্তু নাম বলতেই বাড়ির মালিক অরাজি হয়ে যেতেন। খবর পেলাম, পয়লাপুলের শিবু কানুনগোর একটা বাড়ি আছে আইরংমারায়। কিন্তু কেয়ারটেকার নাম জিজ্ঞেস করে জানালো ঘর খালি নেই। অপু, বলাই, সব্যসাচীরা খুব চেষ্টা করেও পারল না। অবশেষে রাঙ্গিরখাড়ি আর মেহেরপুরে ভাড়া ঘরে থেকে পড়াশোনা করলাম। যে ঘরে ভাড়া পেলাম না মুসলমান বলে সেই ঘরেই কিন্তু রাত জেগে আড্ডা, গান আর ঘুম চলত আমাদের। পড়াশোনা যাকে বলে তা কিন্তু আমার দ্বারা তখনও হয়ে উঠছিল না। ফলে রেজাল্ট তেমন হল না। তপোধীর স্যারের বকুনি খেতে হয়েছিল। একবার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় জয়শ্রী, অনির্বাণ, অনিরুদ্ধ, মণিদীপা, মনোজ, শতদল সহ এক বড় দল বিভিন্ন ক্ষেত্রে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজয়ী হয়ে মেদিনীপুরের বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পাই। ভারতের চারটি এলাকা ভিত্তিক প্রতিযোগিতার পূর্ব জোনের স্থল ছিল এই মেদিনীপুর। সেখানে জয়ী হয়ে দুজন জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় সুযোগ পেয়েছিল। বাকিরা ফিরে এলাম। কিন্তু সেই রেলসফর চিরদিন মনে থাকবে। আমাদের উৎপাতে যাত্রীরা পুরো একটা বগিই আমাদের ছেড়ে দিয়েছিলেন। এতটা হৈ হুল্লোড় করেছিলাম আমরা।

আর পড়াশোনা করব না ঠিক করলাম। একবার আইন পড়তে উদ্বুদ্ধ করল কবির আর মাহমুদ। তাদের সঙ্গে করিমগঞ্জ ল’ কলেজে ভর্তি হলাম। খরচ অনেক কম ছিল বলেই করিমগঞ্জ। সাহায্য করেছিলেন আব্দুল বাসিত স্যার। কিন্তু সে বছর পরীক্ষায় বসা আর হল না। কলেজে কাজ করার সময় মোরাদ আহমেদ লস্করের চাপে সমাজতত্ত্ব পড়তে ভর্তি হলাম কানপুরের ছত্রপতি সাহু জি মহারাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। পাস করলাম প্রথম বিভাগে। স্কুল পরিচালনা করতে গিয়ে আবার পড়তে হল ডিএলএড। কিছুদিন ধ্রুপদী সঙ্গীতও শিখেছিলাম।

আমি এখনও ছাত্র। কাজ করতে গিয়ে ছোট বড় অনেকের কাছেই শিখি বাধ্য ছাত্রের মতই। আর যত শিখি মনে হয় আমি তো আরো ছোট ছাত্র হয়ে গেছি। এ জীবনে আর জানা হল না, শেখা হল না; হবেও না। নিজেকে তথ্যের ভাণ্ডার বা জিকে বুক বানানোর চেষ্টা করি না। কিন্তু জ্ঞানের সার সত্যটা বুঝে না গেলে জীবনটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে – এই ভয় আমাকে কুরে কুরে খায়। এই বিশ্বজগত কি সত্যিই অসীম? সীমাহীন বলে কি কিছু থাকে? অনাদি অনন্ত সময়—সেও কি সম্ভব? ঈশ্বর বলে কেউ আছে যাকে আমরা কল্পনা করি আমাদের মত? তিনি কি আমাদের ডাক শোনেন, না স্টিফেন হকিং এর শরীরে বসানো যন্ত্রের মত আমদের মগজের সঙ্কেত বোঝেন? তিনি কি সত্যিই আমাদের মন্ত্রের ভাষা বোঝেন, না কোনও ভাষার দরকারই নেই তাঁর? তাঁর কি দূত পাঠানোর দরকার আছে? তাঁর কি কোনও আলাদা অস্তিত্ব আছে, না তিনিই সব? এসব প্রশ্নের উত্তর কোন বই পড়ে জানব? বাজারের সব বিক্রেতাই তো বলে, ‘আমারটাই ভালো।’

 ০৩ জুন, ২০২০

মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২০

কেইসড্রাট

স্ট্রিট লাইট
নেই তেল, চারদিক ঘিরে আছে অন্ধকার
হামাগুড়ি দেয়া ইঁদুর ছানা 
রেখাহীন গর্ভে সুড়ঙ্গ খোদে ওরা, এখন বাহুবলী।
আমি জড়পদার্ধ 
বিউগল বাজাতে জানি, বড় বিউগল!
আমার কী দোষ - না স্বেচ্ছায় এসেছি এখানে
এই দুর্দশা গ্রস্থে ভরপুর মাঠে।

আমাদের এ জীবন যেহেতু কমার্শিয়াল চিন্তার,
বেপার চলছে
এক চিলতে রুদ্দুর ও,
জলন্ত অঙ্গারে পরাজিত জীবন্ত আত্মারা 
গলায় দড়ি দিয়ে সময়ের দাবি রাখে
কেইসড্রাটের ডালে।

সোমবার, ২৯ জুন, ২০২০

ত্রিদিবকে নিয়ে কিছু কথা

**প্রজাতন্ত্র দিনে ত্রিদিবের শিল্প**
26 জানুয়ারী ২০২০ !  সকালে স্কুলের প্রজাতন্ত্র উদযাপন অনুষ্ঠান শেষ করে ফিরতি পথে মোটর সাইকেল যেন নিজেই ঘুরে গেল নতুন স্টেশনের দ্বিতীয় গেটে । কচি কাঁচারা বিস্ফারিত চোখে এলোমেলো ভিড় করে আছে । অটো চালক কয়েকজন গুটখা মুখে পুরে ঢিলেঢালা মন্তব্য দিয়ে জানালো "রেল পয়সা খরচ করছে, এলেকশন এসে যাচ্ছে তো, কিছু তো লোক দেখানো কোরতে হবে ।" সেই সঙ্গে ভিড়ে মিশে আছে বিভিন্ন স্কুলের কিছু ছাত্র ছাত্রী । একটু উঁচু বেদি ঘেরাও করে বিদেশি ঘাসেদের সদর্প শিশির মাখা উপস্থিতি । তাতে নৃত্যরত তিন বিহুয়া, আবহমানকালের সংস্কৃতি লালিত ধারাটিকে বুকে আগলে রোদ ঝড় জল বৃষ্টিতে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারবদ্ধ। আর এর ঠিক পেছনেই আপাত সিমেন্টের পাঁচিলে শহরবাসীর জন্য এবছরের সেরা উপহার , "সুজলাং সুফলাং" ! তেরঙ্গা নিয়ে আমাদের আবেগ আহ্লাদ ইতিপূর্বে নাটিকা, সিনেমা, কবিতা, আড্ডা এসবে প্রতিফলিত হয়েছে । কিন্তু কেন যেন আমার দেখার চোখ আমার বোধকে বললো, একি করেছেন শিল্পী! এতো নিজের চেতনাকে অতিক্রম করা, জনজীবনে, নদীমাতৃক রাজ্যের বহমানতায়, কৃষিক্ষেতে পুষ্টি কল্যাণ চিন্তায় এভাবে যে তিরঙা নেমে আসতে পারে, পারে মিশে যেতে, তা কি আগে দেখেছি!! এই কারু শিল্পের কাছে খোদ পতাকা কয়েক মুহূর্ত উন্মোচনের আগে পাশাপাশি নেমে এসে যেন তার দোসরকে সেলাম জানিয়ে উর্ধে উঠে যাবার দাম্ভিক যাত্রাটি করার আদেশ নিতে এসেছে । ত্রিদিব, আপনাকে আর কি বলে সাধুবাদ জানাই, শেষ হবার পর এ কাজ তো আর আপনার থাকলো না, এ শহরবাসীর, সত্যি বলতে কি, অসমবাসীর বড় নিজস্ব, বড় আপনার সম্পত্তি হয়ে গেল । তবু ত্রিদিব, আপনার সম্মানে একবার টুপি খুললাম । আপনি সত্যিকারের ভারতবাসী, অসমবাসী খিলঞ্জিয়া । কারণ জাতি মাটি ভেটির প্রতি ভালোবাসার চূড়ান্ত টান না থাকলে এ কাজ আপনাকে দিয়ে হতো না !
প্রজাতন্ত্র দিনের টান টান গর্ব নিয়ে আমি মোটর সাইকেল স্টার্ট দিলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে !

** ‘মনের কথায়’ রবি ঠাকুরের চিত্রজগত নিয়ে ত্রিদিবের কাজ দেখে ....**
সোজা কথায় সাধারণ মানুষের ব্যাপরটা এই, 'আমাদের সময় নেই'! যদিও এক অত্যন্ত গুণীজন আমায় বলেছিলেন 'তার কাছেই সময় আছে, যিনি খুব ব্যস্ত' ! যাক গে সে কথা ! বলছিলাম , সাত মিনিট তিরিশ সেকেন্ড ভিডিওতে রবীন্দ্রনাথের চিত্রশিল্প তুলে ধরা যে একপ্রকার দুঃসাধ্য তা শিল্পী মাত্রই অনুভব করেন । কিন্তু ত্রিদিব সেই দুঃসাহস করে দেখিয়েছেন শুধু বলা ঠিক নয় , বলা ভালো যারা পেইন্টিং বা চিত্রকর্ম এসব বোঝেন কম , তারাও ভিডিওটি দেখে রবি ঠাকুরের তুলির কারিগরীর অ আ ক খ টুকু ধারণা করতে পারবেন । লিখে, বলে, কম্পিউটার গ্রাফিক্স করে, পরিবেশন করে ত্রিদিব তুলে ধরলেন রবীন্দ্র সাহিত্যের ওই পারে গিয়ে কবি যে অন্য একটি জগৎ রচেছিলেন তার হদিস । যারা ত্রিদিব দত্তের চ্যানেলে নতুন তারা বোধয় জানেন ত্রিদিব নিজেও এক সাধক চিত্রশিল্পী, এবং এই কথাটি একটুও বাড়িয়ে বলা নয় । ক্যানভাস ও আঁকার খাতা ছেড়ে ত্রিদিবের তুলি নগর-প্রাচীরও আলোকিত করেছে বহুবার । শহরের বহু জনপদতো সেই কথাই বলে । আর আরেকটু বলার কথা হচ্ছে, যারা আমার কথা শুনে ভড়কে যাবেন বা আমায় উন্মাদ বলে ভাবতে চাইবেন , চান, কিন্তু আমি বলি কি রবি ঠাকুরের নিজস্ব চিত্র-দুনিয়া থেকে ত্রিদিবের ছবি আঁকার জগৎটিও কোন মঙ্গল গ্রহের কাছাকাছি নয়, বরং যেমন রবি তাঁর কিরণে আমাদের পুষ্টি বর্ধন করেন, তেমনি ত্রিদিবের শিল্প কর্ম সকল স্তরের (হ্যাঁ, শুধু বোদ্ধারা নন, অবোদ্ধাও) মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে , প্রাণের আরাম এনে দেয় চোখের দুয়ার দিয়ে ! বলার এইটুকুই !

**হীরক রাজা, করোনা ও ত্রিদিব**
তিনসুকিয়া শহরে মনে হচ্ছে প্রথমবারের মতো এই অনুষ্ঠান দেখলাম । এনিমেশন ! না না তা তো মনেই হয়নি মনে হচ্ছে স্টেজ প্রোগ্রাম ! দেখছি ! ত্রিদিব আপনি চালিয়ে যান, আপনি শুধু আমাদের নয়, আপনি সমগ্র রাজ্যের গর্ব!

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২০

বাংলা কবিতা: রূপান্তর

রূপান্তর

                ঝোড়োমেঘ
               (সিক্তা বিশ্বাস) 
                 ২৫/৬/২০ইং, 
                 হায়দ্রাবাদ। 

গতির পরিণাম রূপান্তর! 
এ যে গবেষণায় পরিলক্ষিত
লয়ে ক্ষয়ে কাল থেকে কালান্তর!
কেটে যায় গতিবেগে অলক্ষ্যে 
অগণিত কত বসন্ত! কত কাল! 
কত সবুজ বাহু রূপান্তরিত
পাকাপোক্ত হলদে মাখা
কেমন কটকটে রুক্ষ নিরস ডাল! 
সমষ্টি সংখ্যায় কত ঋতুর সমন্বয় কাল! 
তাড়িয়ে তাড়িয়ে হয় ঈপ্সিত
কত টক ঝাল মিষ্টি চাখা! 
নীল আকাশে হলুদ পাখির 
পাখনা মেলা! আবেগ মেশা
ইচ্ছে ডানার ঝাপটা খেলা!!
কুলুকুলু ঝর্ণার আছড়ানো স্রোতে
সময়ের আবেগে ভেসে যাওয়া....
তৃপ্তির পুণ্য সঙ্গমে নাওয়া... 
এও যে অভিসার তীর্থে যাওয়া....
আকাঙ্খিত প্রেম যে যতনে সামলে রাখা
ঝিনুকের বুকের আহ্লাদি মুক্তো, 
আশা, আহ্লাদ ও স্বপন যুক্ত...
স্বপ্ন পূরণেই কালের দাপটের 
নিত্য মারমুখী আকন্ঠ গরল বিষ পান! 
হলাহলের ফলাফলে কখনও বা হৃদয় নাম্নী 
ভঙ্গুর পেলব আরশি রূপান্তরিত
মুকুর-চূর্ণ ঝনঝনানি খানখান!
সুখ-স্বপ্ন সাধনের একি বিচিত্র রূপান্তর! 
শত ধারায় প্রবাহিত অমোঘ এ রূপান্তর যুগ যুগান্তর!!!

        *************

মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২০

ফুটে উঠবার কথা

 

 

স্কুলে ২০১৭র জানুয়ারিতে
    

তই বা বয়েস হবে
, এই সপ্তদশ ছেড়ে অষ্টাদশী হতে চলেছে ও! এবং দুনিয়ার বহু অল্প বয়েসী  প্রতিভাদের মতই আবার ও প্রমাণ করলো যে শিল্পীর চেতনার উত্তরণ ঘটার কোনো বায়োলজিক্যাল সীমানা হয় না, হয় না বয়েস, পারিপার্শ্বিকতা ও সমাজের বিশেষ ভূমিকা । উল্লেখিত সূচকগুলি শুধু মাত্র দশ বারো শতাংশ প্রভাব ফেলে সাধারণ এক ব্যক্তির ওপর, যা কিনা তাঁকে সাধারণ ব্যক্তি থেকে সচেতন শিল্পীতে উন্নীত হতে একটুও বাধা দেয় না।   

৮ মার্চ, ২০২০ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বর্ণালি শিশু কল্যাণ সংস্থা, তিনসুকিয়ার আমন্ত্রণে গিয়ে সংস্থার ৩৮ তম প্রতিষ্ঠা দিনে পৌষালি গাইল চিৎকার কর মেয়ে’ , এই সুবিখ্যাত গানটি ! তো আমিও বলছিলাম পৌষালি করের কথা । উজান অসমের একেবারে প্রান্তীয় শহর তিনসুকিয়াতে বিগত কয়েক বছর ধরে সাহিত্য শিল্প সঙ্গীত এসব চর্চার একটি নিয়মিত বহমানতা এসেছে , যদিও একে স্রোত বা উচ্ছ্বাস বলা চলে না সে অর্থে ! এর কারণ অবশ্যই বহুমুখী । বাণিজ্য প্রধান সমাজ, প্রকৃত অর্থে অল্প-সংখ্যক সচেতন ব্যক্তি, রাজনৈতিক উদাসীনতা, নিজস্ব ভাষাশিক্ষার দুর্বল পরিকাঠামো, সাম্প্রদায়িক সমস্যা ইত্যাদি এই শহরকে মাখামাখি ভাবে জড়িয়ে রেখেছে । তো এই অবস্থায় গান বাজনা তো হয়, কবিতা লেখাও যায়, নাটক মঞ্চস্থ হয় , আবৃত্তি আওড়ানোও চলে ; যতক্ষণ না সেই গান মানুষের অন্তরমহলে সুচের মতো আঘাত হানে, যতক্ষণ না সেই কবিতা পড়ে অনেকের ভ্রূ কুঁচকে আসে দেশদ্রোহিতার সন্দেহে, যতক্ষণ সেই নাটক সমাজ ব্যবস্থার নগ্ন রূপকে মঞ্চে আছড়ে ফেলে অনেকের বিরাগভাজন না হয়, যতক্ষণ না সেই আবৃত্তি কানের অলিগলিতে গলিত সীসার মতো ঢেলে দিতে থাকে সত্য ও সংগ্রামের শাশ্বত বাণী ! পৌষালি কর শহর তিনসুকিয়ায় এক ব্যতিক্রমী শিল্পীর মতো মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে ! ওর গানে, আবৃত্তিতে , আঁকায় ছড়িয়ে রয়েছে সেই বহুমুখী শিল্প প্রতিভা যা মানুষকে ভাবায়, নতুনকে আলিঙ্গন করে নেবার শিক্ষা দেয় ! যুগ পাল্টাচ্ছে দ্রুত । সেই সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে সাহিত্য সংস্কৃতি সঙ্গীত এসবের আঙ্গিক । এসেছে নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা ! এবং সমস্যাটা ঠিক এখানেই ! পুরাতন অনেকেই একে সাদরে, সদরে নিতে পারেননি বা পারছেন না ! ফলে দুখঃজনকভাবে তারা ছিটকে যাচ্ছেন আধুনিক পরিমণ্ডল থেকে।

         একটা উদাহরণ দি । গায়কের কাজ কি? গান গেয়ে পয়সা উপার্জন করা , না সেই সঙ্গে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা রেখে জনসচেতনতা বাড়ানোতে সঙ্গীতকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা ? এই দুটো দিক একসঙ্গে থাকলেই তাঁকে প্রকৃত শিল্পী বলা চলে। সেজন্যই জোন বেজ, বব ডিলান, হ্যারি বেলাফন্ট, ভূপেন হাজরিকা, কবির সুমনরা আন্তর্জাতিক স্তরে শিল্পীর সম্মান ও স্বীকৃতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পেয়েছেন অসংখ্য জনতার মরমী হৃদয় আসনটি , যেখানে তাঁদের অবস্থান চিরকালীন হয়ে থাকবে ।

২০শে মে, ২০১৮ শিলচর রেলস্টেশনে
ঠিক তেমনি বহু আবৃত্তিকার ঠাণ্ডা নরম প্রেম পিরিতির ও প্রকৃতি বর্ণনার কুসুম কোমল পথে গলার সুধা ঢেলে পুরো ক্যারিয়ার যাপন করেছেন, শোনাননি সবহারাদের, দুর্গতদের ও শোষিতদের আর্তি তার আবৃত্তিতে ! তো এরাও শিল্পী , তবে ইতর ভাষায় আলুভাতে মার্কা !

খুব ছোটবেলা থেকে আমি পৌষালির গড়ে উঠা দেখেছি ! আর সকলের মতো ২৫শে বৈশাখে রবীন্দ্র কবিতা আবৃত্তি ও গানের প্রতিযোগীদের মতই শুরু হয়েছিল ওর পথ চলা ! কিন্তু আপন ছন্দে সুরে সেই পথের মোড় ফিরে গেছে এক নিজস্ব শৈলীতে ! শহর তিনসুকিয়াতে বাংলা ফোক, ভাটিয়ালি, লোকসঙ্গীত, বাউলের ধারার যে অসংখ্য শাখা প্রশাখা আছে , আছে গায়েন ভঙ্গি, এসব কিন্তু পৌষালি এই সবুজ বয়েসেই দেখাতে শুরু করেছে ! সেই সঙ্গে অসংখ্য স্বর প্রক্ষেপণ বিধি, বিভিন্ন  ধারার লোকগান , বাংলাদেশ , ত্রিপুরা ও উত্তর পুবের বাংলা গানের যে সরস ও সমৃদ্ধ ধারাটি রয়েছে, যাকে দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এতদাঞ্চলের লোকেরা কলকাতাকেন্দ্রিকতার মায়াপাশে ভুলে রয়েছিলেন নিতান্তই অজ্ঞতার পরবশে, সেসব পৌষালির গানের সুরে প্রায়ই উঠে আসছে অধুনা সময়ে ! হ্যাঁ, শহরের অনেকের সঙ্গে কথাবার্তা বলে দায়িত্ব নিয়েই বললাম এ কথা ! যেসব বিষয় ও শিল্পীকে পৌষালি নির্বাচন করছে ওর গানের পরিবেশনায় তাঁদের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন শহরবাসী , এই প্রথম ! হ্যাঁ , ঠিক শুনলেন , এই প্রথম ! কই আগে তো তিনসুকিয়ার মঞ্চে অনুসূয়া অনাদিলের গান গাইতেন না সাধারণ শিল্পীরা, গাইতেন না হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে, কবি আলফাজকে কি কেউ পৌষালির আগে এই শহরে আবৃত্তি করেছে ?

এই তো বিগত দীপাবলির সন্ধ্যায় হিজুগুড়িতে পৌষালি গাইল কী ঘর বানাইমু আমিএই হাছনের গান ! সে জানে আর আমি জানিএই লালনের গানটিও ! আয়োজক ছিল প্রগতি গোষ্ঠী !

২০১৭র জানুয়ারিতে স্কুলে
      পৌষালির কণ্ঠে গতবছর শুনেছিলাম  সুনীল মাহাতোর কথাতে কুড়মালি ঝুমুর  পিন্দারে পলাশের বনএর মতো চা বাগানের অনিন্দ্য সঙ্গীতটি ! গুয়াহাটি পাণ্ডু রেস্ট ক্যাম্পর অনুষ্ঠানে যেমন জনপ্রিয় ভূপেনদার কহুয়া বনগাইল ঠিক সেই সঙ্গে ২১ জুন , ২০১৮ বিশ্বসঙ্গীত দিবসকে কেন্দ্র করে শিলচরের বাংলা গানের দল দলছুটউদযাপন করা নিজেদের দশ বছর পূর্তি উৎসবে শিলচর রাজীব ভবনে’ ‘প্রজন্মের এককঅনুষ্ঠানে পৌষালি গাইলো আমি সুন্দর হবো’, ফারজানা ওয়াহিদ সায়ানের মাটির সাথে দোস্তি’, লালনগীতি সে কি আমার কবার কথার সঙ্গে চাটগাঁইয়া গান মধু হই হই বিষইত্যাদি !  প্রচলিত চাটগাঁইয়া গান রাধারমণ দত্তর  ভ্রমর কইও গিয়া’, অমর পালের কালারে কইরো গো মানাএর সঙ্গে কিছু রবীন্দ্রনাথের গানও ।

২১শে ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে পৌষালিকে আবৃত্তি করতে শুনি  অসম ও উত্তর পূর্বের বাংলা ও বাঙালির সবহারানোদের কথা তুলে ধরা কবি শিলচরের শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর বিখ্যাত কবিতা উদ্বাস্তুর ডায়েরি’, অথবা ডিব্রুগড়ের কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাসের কবিতা ।

তিনসুকিয়াতে এসব গান বেশির ভাগ শিল্পীরা গান না, আবৃত্তিকারেরা করেন না । সুতরাং বোম্বাইয়া আমের মতো হিন্দি গান ছাড়া যে আমাদের শেকড়ের বাংলা গান আছে , আছে বিশ্বজনীন শ্রেণিহীন শোষিতদের কান্না, বাস্তুহারার মাটির প্রেমের গান, এসবের সঙ্গে এই ছোট শহরের শ্রোতা পরিচিত হচ্ছিলেন না, থেকে যাচ্ছিলেন  ব্রাত্য । এই কাঁচা বয়েসে পৌষালি সেই দায়িত্বটুকু পালন করে প্রকৃত শিল্পী সচেতনতার পরিচয় দিচ্ছে । প্রসঙ্গত উল্লেখ করি ইংরেজি মাধ্যমেই কিন্তু পড়াশুনা পৌষালির । সুতরাং যেমন বলেছিলাম শুরুতে, প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে কিন্তু তা প্রকৃত শিল্পীর গতিকে প্রতিহত করে না ।  

যারা পৌষালিকে চেনেন না , শোনেন নি তাঁদের জন্য আন্তর্জালে সক্রিয় মেয়েটির সূত্র নিচে দিয়ে ওর ইউট্যুব, ব্লগ ইত্যাদিতে যাবার পথ বাতলে রাখলাম। ঘুরে আসুন, ভালো লাগবে !

সকল শহরবাসীর পক্ষ থেকে এই নাগরিক শিল্পীর নিজের, ওর অভিভাবকের, শিক্ষকদের শুভ কামনা জানাই । এগিয়ে চলো মেয়ে !                                                    

 

https://www.youtube.com/c/MusicalDiariesPoushali

https://poushalikar.blogspot.com 

https://www.facebook.com/poushali.kar.75

 

 পৌষালির ভিডিওগুচ্ছ ০১


পৌষালির ভিডিও গুচ্ছ ০২

বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২০

সব ভুল কি সমতুল!

সব ভুল কি সমতুল!

ঝোড়োমেঘ
(সিক্তা বিশ্বাস)
১১/৬/২০ ইং
 হায়দ্রাবাদ।

ভুলেই তো গেছি প্রায়! ম্রিয়মান স্মৃতিপট দর্শায়! 
সে কবে কোন যুগে ছিল, হুজুগেপানা  হৃদয় বিনিময়! 
কেমন আবছা মনে পড়ে-----
অফিসের সময়টা সুন্দর এডজাস্ট করতে
ঠিক আমার কলেজের সময় ধরে!
অবাক হয়ে ভাবতাম , 
ভালোবাসা কতো কি শেখায়! 
যত্ন করে সব খবর রাখা....
ক'টায় ক্লাস... ক'টায় কলেজ যাওয়া... ক'টায় আবার ফেরা...
তখনতো স্বপ্নেও ভাবিনি এও ভুলে যাবো! 

ভুলেই তো গেছি সব! 
সেই একসাথে নাটক, সিনেমা দেখার পালা! 
ক'দিন আগে থেকেই কবে যাবো! 
কবে যাবো! জল্পনাতে কান  ঝালাপালা!
কতো না বলা কথা চোখাচোখিতে বলা...
এইতো প্রেমের আসল শিল্পকলা.... 
দূর থেকে দেখে এক ঝলকেই  কেমন বুক ধড়ফড়.... 
যেন দু'জনে দু'জনকে অহরহ বলছে , 
চিনি ওগো চিনি...জানি ওগো জানি... মানি ওগো মানি...

এত্তো সবও ভুলেই গেছি ! 
কালের দাপটে! সজোরে চাপটে ! 
দু'টি পথ দু'টি দিকে গেছে বেঁকে! 
কেমন না ভাবা বিরহের ছবি এঁকে!
সত্যি! এত্তো বছরে একবারওতো পড়েনি মনে ! 
কোথা ছিল সেদিনের সেই সে টান! সেই আকর্ষণ! 
একে অন্যের অন্তপ্রাণ! প্রাণের দোসর !
সময়ের সাথে জীবন ও কর্তব্যের দাবিতে 
সব ছিল কেমন তলিয়ে যাওয়া অঘটা! বিস্মৃত!
আজ হঠাৎ কোনও এক বন্ধুর পাতায় 
অজান্তে চোখ পড়ে যায় তোমার লেখায়! 
ছোট্ট একটি মন্তব্য! কি তার ইন্দ্রজাল! 
ম্যাজিকের মতো সুস্পষ্ট হয়ে যায় বিস্মৃত স্মৃতিপট! 
কেমন দিন ক্ষণ সহ মনে পড়ে যায় স---ব চটপট!
ফিরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে সেই মুছে যাওয়া দিনগুলোতে.... 
ইচ্ছে করছে জুড়ে দিতে সেই ছিঁড়ে যাওয়া দোতারার তারগুলো....
যদি আবার বেজে ওঠে..... 
ছেয়ে যায় সুরে সুরে ...... 
ঠেলে দেয় বাস্তবের সব বেড়াজাল!
কই এবারে তো ভুলতে ইচ্ছে হচ্ছে না! 
সযতনে পুষে রাখতে ইচ্ছে হচ্ছে অন্তরের মণিকোঠায়...
ভাবছি শুধু কি করে সব ভুলেই ছিলাম! 
একি ভোলা যায়! নাকি নতুন স্বাদের খেলার নেশায় ,
 কিংবা বাঁচার তাগিদে অথবা মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টায়!!
                    *****************