“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

সোমবার, ৮ আগস্ট, ২০২২

অভ্যন্তরঃ শুচি

পৃথিবীর পাঁজর ঠেলে ভেতরে

যেতে যেতে -
হাজার অজুত বছরের
গলিত লোহার আধানে
অবিনশ্বর চিরস্থায়ী সঞ্চয়।
উপরিভাগে পড়ে থাকা
লতা-গুল্ম , চামড়া-মাংস
ক্ষণস্থায়ী যত প্রাণ 
ঘড়ির কাটার আবর্তনে
পাল্টে পাল্টে যায়।
থাকে নদী, পাহাড়, মাটি
প্রসব করে নতুন সবুজ, হলুদ,লাল
নীল পর্দা ঢাকায়।

শনিবার, ৩০ জুলাই, ২০২২

বেদব্যাস উবাচ


 ।। সপ্তর্ষি বিশ্বাস ।।


(C)Image:ছবি














"কে বলল যে একলব্য স্ব ইচ্ছায় বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ কেটে

দিয়েছিল গুরুদক্ষিণা? দ্রোণ তার গুরু হল কবে?
হ্যাঁ, নিজহাতে আঙুল কেটেছিল, ঠিক। তা নাহলে
দ্রোণ নিজে কিংবা অর্জুন কিংবা তাদের কোনও
কেনা গুণ্ডা কেটে ফেলত। হয়তো আঙ্গুলই শুধু নয়

একলব্যকেই। ঠিক যেমন পূর্ব বাংলার তাঁতিদের ধরে

আঙুল কেটে দিয়েছিল বিলাতি বাণিয়ার দল
ম্যানচেস্টার ও রানিমার দক্ষিণা হিসাবে কিংবা যেমন
এখন বুলডোজারে উপরে ফেলা হচ্ছে নিয়ত
যারাই করছে ট্যাঁ-ফু রাজা, রাজত্ব আর রাজকার্য নিয়ে।
#
হ্যাঁ, স্ব ইচ্ছায় একলব্য বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ কেটে
দিয়েছিল গুরুদক্ষিণা -- আমিই লিখেছি।
না লিখলে আমার আঙ্গুলও কবে
কাটা যেতো আর এই মহাকাব্য টাব্য কিছু
লেখাই হতোনা।"

https://amarsonarbanglaamitomaybhalobasi.blogspot.com/2022/07/blog-post_30.html


বৃহস্পতিবার, ২৮ জুলাই, ২০২২

প্রবুদ্ধসুন্দর কর : কবিতা ভাবনা ও স্মৃতিভূত সৃষ্টি


জীবন নিয়ে খাঁচার ভিতর অচিন পাখি জড়িয়ে রাত-প্রভাতের মত কর্মব্যস্ততার অবধারিত ঘুর্ণনে জীবন চিত্রের বদল ঘটে হরেক দিন, এটাই মানব জীবন। চৈত্র-বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের প্রাক্‌পর্ব পর্যন্তও স্বাভাবিক থাকে জীবনাচরণ কোনো কোনো সময় মানুষের, জীব-জন্তু বা পশু- পাখির। চৈত্রের কালবৈশাখী, আষাঢ়ের বাধভাঙা জলেচ্ছ্বাস যেমন ছিন্নভিন্ন করে দেয় প্রকৃতির সাজানো সংসার, তেমনি মানবসভ্যতা ও সতর্কতার তরীকে জীবন নদীস্রোতের বিপরীতে নিয়ে এড়িয়ে চলে বিপদের লাল-সঙ্কেত কাটানো প্রহর।

প্রকৃতিই কখনও আপন খেয়ালে নিজের উল্লাসে মেতে ওঠে, ঝড় হয়ে দেখা দেয় প্রাণধারীর আয়ুতে, আবার প্রকৃতিই কখনও চোখের জলে ভাসিয়ে দেয় স্থল— চরভূমি জলের গভীরতা বাড়াতে। অর্থাৎ প্রকৃতিই প্রকৃতির ওপর— নিজের মনে ও শরীরে চালায় শাসন। অধিকার, হুকুম বা কখনও চূড়ান্ত ঘোষণা; যার ফলে প্রকৃতির সন্তানেরা প্রকৃতিরই লীলায় জীবনের সিসিফাসের ভূমিকায় নানান অবস্থাবৈচিত্র্যের পাথর ঠেলে যায়।কালের আপন খেয়ালে এভাবেই তো মহাবিশ্ব তার গতিব্যস্ততা নিয়ে নিজের কর্তব্য পালন করে।

উত্তর পূর্ব ভারতের বাংলা কবিতার জগতে কবি প্রবুদ্ধসুন্দর করকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার কিছু নেই, আমার সে দুঃসাহসও নেই। আমি একজন মুগ্ধ পাঠক হিসেবে তার কবিতার প্রতি আমার ভালোবাসা ব্যক্ত করছি মাত্র। গত শতাব্দীর নয়ের দশকে লিখতে এসেছিলেন প্রবুদ্ধসুন্দর কর। তার কবিতায় দেখা যায় মনের গভীরতম স্তরে সুখ, শান্তি ও স্থিতির উপরে অন্য কিছুকে মূল্য দিয়ে থাকে।আমরা যেখানে চাই কোনো-এক পরম ও নামহীন সুখ, কোনো-এক চরম নামহীন দুঃখ; এবং যা আমরা জীবনে পাই না, কিংবা যা চাইবার সাহস হয় না আমাদের সেইসব অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাই জীবনের বাইরে খুঁজে বেড়াই। তাঁর জীবন ছিলো একজন বিশুদ্ধ কবির জীবন; যিনি সাহিত্যকে একধরনের ব্রত হিসেবে, নিজের ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কবিতার মধ্যে দিয়েই তিনি নিজের আত্মসচেতনতার বোধকে নিরন্তর খুঁজে চলেছিলেন - এটাই প্রবুদ্ধসুন্দর করের স্বধর্ম।

কবি তাঁর কবিতায় বলেছেন - গানের ভেতর তোমার প্রশ্বাস স্পষ্ট শোনা যায়/মৃদু, তবু তীব্র এই শ্বাস ছাড়া যেন/সমূহ অন্তরা আজ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। তিনি সেইসঙ্গে এইটিও বুঝতে পেরেছিলেন যে, নিজের চৈতন্যের দ্বারা সবসময় নিজেকে পরিচালনা করা— মানুষের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কবির ভাঁড় কবিতায় 'জন্মনিরোধক আর বেবিফুড কিনে বাড়ী ফেরে/সেইসব সংখ্যালঘু অর্দ্ধদগ্ধ ভাঁড়/তাদের গোপন আড্ডা থেকে আমাকেও চিঠি দেয়/তীব্র হাহাকার আর গোঙানি মেশানো -- জীবনকে কবিতার সঙ্গে, কবিতাকে জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে চেয়েছিলেন তিনি। কোনো কিছুকেই বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং সমগ্রতার মধ্য দিয়ে সামঞ্জস্য নির্মাণের চেষ্টা করে গিয়েছেন তিনি।

একজন কবিকে প্রতিকূল পরিবেশে যা সবসময় সহায়তা করে, সেইটি হচ্ছে তার নিজস্ব একাকিত্বের বোধ। রিলকে গভীরভাবেই বিশ্বাস করতেন যে শিল্প সবসময়ই এই অন্তহীন এককিত্বের ফসল। একমাত্র ভালোবাসা, আন্তরিকতাই পারে তাকে কোনো-নাকোনোভাবে স্পর্শ করতে। এই বিশ্বাস থেকেই রিলকের মতো কবি বলতে পারেন,জঙ্গলের ভেতর কোথাও এক পরিত্যক্ত রেডিও স্টেশন/কোনো একদিন খুঁজে পেলে জেনো, স্তব্ধতাই এর সিগনেচার টিউন'।

কবি প্রধানত নতুন সমাজের একজন অভিনব প্রেক্ষক।নিজের নিজের জীবনের অনুভূত প্রকৃতিকেও সমাজের মতোই কবিতার বাঁধনে ঢেলে পরিবেশন করেন। প্রতি কবির সৌন্দর্যবোধ আলাদা। কবি প্রবুদ্ধসুন্দর করের যে সৌন্দর্যচেতনা কবিতায় উদ্ভিন্ন তা-ই বাস্তবের বিশিষ্ট সন্ধান। কবির ভাষায়— “ প্রেমিক ও তোমার মাঝখানে নড়বড়ে সাঁকো পার হতে গিয়ে বুঝেছিল কবি,কাকে বলে ছায়াপ্রতারণা। স্থির জলে প্রেমিকের ছায়া, মুখে মাংসখন্ড, দেখে কবি কেঁপে উঠেছিল। লোকমুখে শোনা যায় নিজের ছায়াকে তার, প্রেমিকের ছায়া ভেবে ভ্রম হয়েছিল।”

গত পঁচিশ বছরে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর সাতটি কবিতার বই। উত্তরপূর্বের তরুণ কবিদের নিয়ে সম্পাদনা করেছেন শ্রেষ্ঠ বাংলা কবিতার সংকলন। যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন উত্তরপূর্বের কবিতা।'বাংলাকবিতা'-র ১০টি সংখ্যার ছিলেন যৌথ সম্পাদকও। অনুবাদ করেছেন ভারতবর্ষের প্রাদেশিক অন্যান্য ভাষার সমকালীন কবিতা। কবি ও তাঁর কবিতার বিশ্লেষণের আর শেষ নাই।পরতে পরতে খুলে যায় তার বিভিন্ন দিক। তবে 'পাহাড়ি রাস্তার বাঁকে পাথরের ফলকের গায়ে স্মরণযোগ্য পঙ্‌ক্তির মতো ইঙ্গিতবহ এ আর্তি' -- এর বুকের ব্যাথাটুকু যে আমাদের প্রতিনিয়ত বিষণ্ণ ও শঙ্কিত করে তুলবে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

মঙ্গলবার, ২৬ জুলাই, ২০২২

উজান অসমে বাংলা ব্যানারে কালি এবং প্রগতিশীলদের 'ভাষা আইন’

।। সুশান্ত কর ।।  


(লেখাটি ২৪ জুলাই, ২০২২ -এ করিমগঞ্জ আসাম থেকে  জাহিদ রুদ্র সম্পাদিত  "মননভূমি' কাগজে প্রকাশিত।)

 

  শ্চিমবঙ্গ সহ ভারতের সর্বত্র ‘ভাষা আইন' আছে।  পশ্চিমবঙ্গে শুরুতে কেবল বাংলা ও ইংরাজিই স্বীকৃত সরকারি ভাষা হলেও এখন আরও এগারোটি সহযোগী সরকারি ভাষা রয়েছে। অসমের বরাকের তিন-জেলাতে যেমন বাংলা, পশ্চিম বাংলাতেও দার্জিলিঙের তিন জেলাতে নেপালি সহযোগী সরকারি ভাষা। এ ছাড়াও নানা জেলা এবং ব্লক স্তরেও যদি কোনও ভাষিক গোষ্ঠীর মানুষ ১০%-ও রয়েছেন—সারা রাজ্যে হয়তো ১%-ও নন—তেমন অনেক ভাষাও স্বীকৃত । যেমন উর্দু, হিন্দি, ওড়িয়া, সান্তালি, কুরুখ, তেলেগু, কুর্মালি, তেলেগু, কামতাপুরি, রাজবংশী এমন কি পাঞ্জাবিও। অর্থাৎ মোট চৌদ্দটি সরকারি ভাষা। কোথাও অসমিয়া জনসংখ্যা ১০% হলে অসমিয়াকেও সহযোগী সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে দিত।  না  দিলেও অসমিয়াতে ব্যানার লাগিয়ে অসমিয়া অনুষ্ঠান করলে সারা বাংলাতে কেউ বাধা দিতে যান না।পশ্চিম বাংলা বলেই না,দেশের সব রাজ্যেই অন্তত বড় বড় শহরে অসমিয়া অনুষ্ঠানাদি হয়—অসমিয়াতেই হয়—অসমিয়াতেই তার প্রচার হয়। তাই বলে কি কেউ তাতে বাংলা ভাষার বা তামিল তেলেগু ভাষার বা মারাঠি ভাষার বা হিন্দি ভাষার অবমাননা হল বলে হুমকি ধমকি দিয়ে থাকেন? যান না। এমন করবার কল্পনাও করেন না। আর সংবিধানও এর অনুমতি দিয়ে থাকে। সংবিধানের ২৯ এবং ৩০ অনুচ্ছেদে সমস্ত সংখ্যালঘু ভাষা চর্চার অধিকার সুরক্ষিত। সেই জন্যে অসমেও যখন বাঙালি বা অন্য-ভাষিক সম্প্রদায় অনুষ্ঠানাদি করেন সরকার এখানে এইসবে বাধা দিতে আসে না। অধিকাংশ অসমিয়া মানুষও এতে আপত্তি করবার কিছু দেখেন না —আসে যারা কোনও আইনের ধার ধারে  না।  অনেকটা সারা দেশে হিন্দু নামধারী কিছু সংগঠন যেমন করে—আইন তারা নিজের হাতেই নিয়ে নেয়। অসমে এখন লাচিত সেনা ও এমন কিছু সংগঠনও তাই করছে।

দেখা গেছে জাতীয়তাবাদীদের ভয়ে তটস্থ দক্ষিণ পন্থী দলগুলোও এই নিয়ে রা তো করেই না, কিছু বাম ব্যক্তি বা দল বা সংগঠনও মনে করেন লাচিত সেনার তরুণরা হচ্ছেন  ‘সংগ্রামী বন্ধুসকলআর প্রদীপ দত্তরায়ের বিডিএফ বা অন্যান্য বাঙালি সংগঠনগুলো ‘সাম্প্রদায়িক'। সে নাহয় তাঁরা বলুন। কিন্তু সেই প্রগতিশীল বা ‘বামে’রা যতক্ষণ লাচিত সেনাকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলতে পারছেন না ততক্ষণ সাধারণ বাঙালিকে -- এমন কি ‘প্রগতিশীল’ যারা রয়েছেন বা হতে চাইছেন তাদেরকেও --- সঙ্গে পাওয়া কঠিনএকজন প্রগতিশীল বাঙালিও বাঙালি হবার ‘অপরাধে’ আক্রান্ত হবার ভয়ে থাকেন ঠিক যেমন একজন প্রগতিশীল যেকোনও ভাষী মুসলমান হিন্দুত্ববাদীর ভয়ে থাকেন। বাঙালি সাম্প্রদায়িকেরা অসমিয়া প্রগতিশীলদেরও এভাবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আক্রমণ করেন নাসাহস করেন না কা বিরোধী আন্দোলনের দিনে, মনে আছে কি, বিধায়ক শিলাদিত্য দেবকিছু বাঙালি সংগঠনকে নিয়ে গুয়াহাটির খানাপাড়াতে একটি সমাবেশের আহ্বান দিয়ে পরে নাকখত দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন অসম সাহিত্য সভার সঙ্গে মিলে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের স্মরণ অনুষ্ঠান করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন স্থিতি ঠাণ্ডা হতেই সব ভুলে গেছিলেন এমন কি সাম্প্রতিক তিনসুকিয়ার ঘটনাতে দেখা গেছে বহু হিন্দুত্ববাদী যারা হিন্দু বলে বাঙালি  অসমিয়া ঐক্যের স্বপ্ন দেখেন --- তাঁরাও আতঙ্কিত  তবু হিন্দুত্ববাদীরা কখনও বা  বাম-অসমিয়া তো বটেই আসুর মতো জাতীয়তাবাদীদের বিরুদ্ধেও মুখ খুলেনযখন অসমিয়া নয়আক্রমণের লক্ষ্যমুখ থাকেন মুসলমান যতই নিজেদের ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলুনঅসমিয়া জাতীয়তাবাদীরা ইসলাম বা মুসলমানের বিরুদ্ধে কেউ কিছু করলে বা বললেসাধারণত মুখ খুলেন না এত এত ফেক এন্টাকাউন্টার নিয়ে কজনে কথা বললেনকিন্তু নগাঁওতে আসুর সদস্য কীর্তিকমল বরা আক্রান্ত হলেই শুধু এরা এমনই সরব হলেন যে পুলিশ প্রধানকেও শহর ছেড়ে চলে যেতে হল

  সম্প্রতি তিনসুকিয়া সহ উজান এবং মধ্য অসমে একাধিক শহরে বাংলাতে লেখা ব্যানারে,দেওয়াল লেখাতে কালি মেখেছে লাচিত সেনা  যেন কালি মাখানো অভিযান শুরু করেছে কিছু বাঙালি সংগঠন ভাটি অসম থেকে সমানে উগ্র ভিডিও ভাষণ দেওয়াতে দিন কয় ভিডিও যুদ্ধ হল ২২ জুনের তিনসুকিয়ার ঘটনা এর জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে সেখানে একটি সংগঠন ছিল নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনআরটি ছিল বর্ণালি শিশু কল্যাণ সংস্থা আরও একটি বিপদনাশিনী পুজোর ব্যানার ছিল প্রথম দুটির জন্যেই লোক আতঙ্কিত হয়েছেন বেশিক্ষুব্ধও যেখানে সেই ঘটনা হয়েছে -- সেই দুর্গাবাড়িতে একটি প্রেক্ষাগৃহ রয়েছে শহরের প্রাণ কেন্দ্রে এটি এখানে সব ভাষাতেই অনুষ্ঠানাদি হয়ে থাকে কিন্তু বাঙালির সংগঠনগুলো এখানেই সভাসমিতি ইত্যাদি করে থাকেন অসম আন্দোলনের দিন থেকে কা-বিরোধী আন্দোলনের দিনেও এখানে বাংলা ব্যানার টানানো হয়েছেতোরণ হয়েছে অনুষ্ঠান হয়েছে কেউ কখনও বাধা দেয় নি কা-বিরোধী আন্দোলনের শুরুর দিনে ২০১৬-র ডিসেম্বরে এই প্রেক্ষাগৃহেই  ‘উজান সাহিত্য গোষ্ঠী’র আহ্বানে উত্তর পূর্বভারত বাংলা ছোটো কাগজ সম্মেলন হয়েছিল সারা শহরে বাংলা ব্যানার লেগেছিলকেউ বিরোধিতা করেনি আজ শুরু হয়েছেযখন জাতীয়তাবাদ নিজেই হিন্দুত্বের চাপে বিপন্ন অস্তিত্বের সংকটে ভুগছেতখন এই নতুন সংগঠনটি খালি ময়দানে নিজেদের চ্যাম্পিয়ন করতে নেমেছে এরা কেবল ব্যানারেই কালি মাখে নাএখানে ওখানে বাঙালি ছোটো দোকানদারকেও নানা কারণে হেনস্তা করছে এদেরই মতো একটি সংগঠন অসমিয়া যুবমঞ্চকে দেখা গেল ব্যানার প্রসঙ্গে যেভাবে ভিডিও হুমকি টুমকি দিলদুদিন পরে লক্ষিমপুরে এক বাজারে মুসলমান মাছব্যাপারির তকি মাটিতে ফেলে অপমান করল ওদের অন্ধ ধারণা যে অসমিয়া মুসলমান বাকি মুসলমানের মতো কিছুই করেন না না এরা ‘প্রায় হিন্দু’ হিন্দু এরা বলবেন নাবলবেন ‘অসমিয়া’ ফলে বাংলা ব্যানার টানানো যেভাবে পাপমুসলমানের তকি লুঙ্গি দাড়ি রাখাও পাপ আজ অব্দি শোনা যায় নিশার্ট প্যান্ট পরা কোনও মুসলমানকে এই জাতীয়তাবাদীরা হেনস্তা করেছেন বলে


                বামদল বা ব্যক্তি – বিশেষ করে বাম-অসমিয়াকে সামনে এসে কথা বলতে দেখা গেল না  কিন্তু কাউকে কাউকে বলতে শোনা গেলএই দুর্গাবাড়ির কর্তাব্যক্তিরা বা নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের নেতৃত্ব সবাই শাসক দলগুলোর সঙ্গে থাকেন এখনও তাই আছেন অগত্যাএরাই অসমিয়া বাঙালি বিভাজন করতে এই সব বাংলা ব্যানার-ফ্যানার চাপিয়েছেন অদ্ভুত সমাজ বিচ্ছিন্নতা লাচিত সেনার থেকে এমন অবাস্তব সমাজ-বোধ ভিন্ন কিছু নাঅসমিয়া বাঙালি বিভাজন টেনে প্রবল বানের দিনে মানুষের দৃষ্টিকে অন্যদিকে টেনে নেবার অভিযোগলাচিত সেনার বিরুদ্ধে আনা যেতেই পারেযে বাঙালি সুরক্ষা পরিষদ হুঙ্কার দিয়েছে শিবসাগরে গিয়ে লাচিত সেনাকে পিটবেতাদের সম্পর্কেও একই অভিযোগ আনা যেতে পারে যদিও বাঙালি সংগঠনটি সেই ‘পিটাপিটি’র প্রতিযোগিতাতে হাস্যকর ভাবে হেরেছে তাই বলে নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনকেই আসল  অপরাধী সাজানোযাদের কোনও রেকর্ড নেই অসম সাহিত্য সভাবডো সাহিত্য সভাবরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের মতো ভাষা সাহিত্যের অনুশীলনে বা অধিকার রক্ষা ও সম্প্রসারণের স্বার্থে কাজ করবার কিছু দিবস পালন আর উৎসব আয়োজনই এদের কাজ দুর্গাবাড়ির পেছনেই বঙ্গীয় বিদ্যালয়কে অসমিয়া একটি স্কুলের সঙ্গে মিশিয়ে দেবার সাম্প্রতিক উদ্যোগের বিরুদ্ধেও এরা এগিয়ে এসে প্রতিবাদ করে নি এমন কি নিজেদের উপরে আক্রমণ নামতেও যারা রা করবার সাহস জোটাতে পারে নিতাঁরা করবেন বিভাজনের ষড়যন্ত্রতাঁদের নীরবতা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে সারা শহরে শাখা সভাপতির একটি অডিও ভাইরাল হয়েছেতাঁদের ভীতির প্রমাণ স্বরূপ প্রতিপক্ষ এদেরকেই অসমিয়া ভাষার অবমাননার , বাঙালী আগ্রাসনের প্রতিভূ বলে দাঁড় করাচ্ছে আর একদল ‘বাম’ শাসকদলের স্বার্থে এরা বিভাজনের খেলা খেলছেন বলে কানাঘুষো করছেন হ্যাঁবিভাজনের রাজনীতি এরা একটা করেন সেটি এদের প্রাতিষ্ঠানিকতার অঙ্গ শতবর্ষের অনুষ্ঠানের যে লোগো এরা সারা দেশের জন্যে বানিয়েছেনসেটি দেখলে মনে হবে কোনও হিন্দু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের লোগোএদের অনুষ্ঠানাদিতেও বৈদিক স্ত্রোত্রের এত বাড়বাড়ন্ত যে মনে হবে এরা খ্রিস্টানবৌদ্ধকেও বাঙালি বলে মনে করেন নামুসলমানের তো কথাই নেই এভাবে এরা যে নিজের সমাজকেই ভাগ করে নিজেদেরই দুর্বল করে রাখেন সেই বোধটুকু এদের নেই এবং সাম্প্রতিক সমাজ বাদ দিনশিল্প সাহিত্যের জগতেও এরা থাকেন বলে মনে হয় না  সেই প্রসঙ্গ ভিন্ন কিন্তু যারা এদেরকে অসমিয়া বাঙালি সংঘাতের সূত্রধার মনে করেনতাঁরাও কম সাম্প্রদায়িক নন বস্তত সংখ্যাগুরু অসমিয়া জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে সাহস করে না দাঁড়াতে পেরে এরা নিজেদের প্রগতিশীলতাকেও করে ফেলেন অসমিয়া বিষয়বস্তু অগত্যা অসমিয়া বাঙালি এক হয়ে কোনও সাংস্কৃতিক মঞ্চেও আজকাল দাঁড়াতে দ্বিধা করেন আজকাল আর গণনাট্যও হয় নাজন-সাংস্কৃতিক পরিষদও হয় না এই বিভাজনের সুযোগে হিন্দুত্ব তার কাজ করে যায়  

 দুর্গাবাড়িতে সেরকম বাংলা ব্যানার টানানো বা অনুষ্ঠান করা নতুন কোনও কথা নয়তিনসুকিয়ার এক অগ্রণী বাম-সাংস্কৃতিক কর্মী ছিলেন অশোক কর্মকার লিবারেশন সিপি আই এম এল করতেন আই পি এফে ছিলেন জন-সাংস্কৃতিক পরিষদেও ছিলেন যতদূর জানিতিনি এই নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনেরও সদস্য ছিলেনবর্ণালি শিশু কল্যাণ সংস্থারও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন ‘উজান সাহিত্য গোষ্ঠী’র তিনি প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক প্রতিষ্ঠার দুবছর পরে তাঁর অকাল বিয়োগ ঘটে কিন্তু তাঁর আদর্শ পরবর্তী পনেরো বছর পরেও এই একটিই সংগঠন  ধরে রেখেছে তিনি অসমিয়া বাংলা দুই ভাষাতেই লিখতেন নাটক লিখতেন প্রবন্ধ লিখতেন নাটক করতেন অগত্যা তাঁর দুই সমাজেই প্রতিষ্ঠা ছিল কিন্তু সেই যে সন্ত কবিরকে নিয়ে গল্প আছেতাঁর মৃত্যুর পরে হিন্দু শিষ্যরা চাইছিল শ্মশানে নিয়ে যাবেমুসলমান শিষ্যরা চাইছিল কবর দেবে শেষে শবের চাদর তুলে দেখা গেল দেহ নেইকিছু ফুল পড়ে আছে অশোক কর্মকারও এখন দ্বিখণ্ডিত তাঁর স্মরণে ছবি শোভা পায় বিষ্ণু-জ্যোতি সাংস্কৃতিক সমাজে তাঁর প্রয়াণ দিবসে স্মারক বক্তৃতাও হয় কখনও কখনও সেটি মূলত অসমিয়াদের সংগঠন আর ছবি নেই স্মারক বক্তৃতা নেইতবু নানা ভাবে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত কাগজকে ধরে রেখেছে ‘উজান সাহিত্য গোষ্ঠী’ তিনি দেখে যান নি যে তাঁর কাগজ এখন গোটা পূর্বোত্তরে বা তার বাইরেও একটি পরিচিত নাম এবং সাংস্কৃতিক প্রতিবাদে শহরের অগ্রণী নাম এমন একটি অসমিয়া কাগজও এই শহরে নেই ডিগবয় থেকে নতুন সাহিত্য পরিষদের একটি পত্রিকা কখনও বেরিয়ে থাকে  

অশোক কর্মকারের সতীর্থ কিছু লিবারেশন কর্মী সমর্থকও উজানে ছিলেনবা আছেন অন্য বামদলের সমর্থকেরাও রয়েছেন ডান দলেরও লোক আছেন শাসক দলেরও সমর্থক এই গোষ্ঠীতে রয়েছেন গুটি কয় মানুষসামাজিক দায়বোধ থেকে কাজ করেনসেখানে ভাবাদর্শের গণ্ডি  সংকীর্ণতারই নামান্তর হয়ে যায় সেই ‘উজান’ বহু অনুষ্ঠান এই দুর্গাবাড়িতে করেছে কখনও অসমিয়া ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি বিরোধী কোনও কাজ করেনি যদিও নিজেদের বাংলা ব্যানারে বুক চেতিয়ে লিখে গেছে ‘আমার ভাষা আমার পরিচয়’ ২১শে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে বহুভাষিক অনুষ্ঠান করেন বলেই সেখানে অসমিয়াতেও লিখে রাখেন ‘মোর ভাষা মোর পরিচয়’ এভাবে উজান চেষ্টা করে গেছে উভয় সম্প্রদায়ের ‘প্রগতিশীল’ লোকজনকে ভিড়িয়ে অনুষ্ঠানাদি করবার এবারেও করেছে ২১শের অনুষ্ঠানে ‘ভাষার গানদেশের গানমানুষের গান’  সেখানে চিনিয়েছে টিভির রিয়ালিটি শোয়ের বাইরেও গান রয়েছে কেবল ভক্তি আর প্রেমের গানের বাইরেও গান রয়েছে বলিউড সিনেমার বাইরেও বাংলা অসমিয়াতে উপভোগ্য দেশের গান রয়েছে অসমিয়া শিল্পীরাও এসে ভিড় করে গান করে গেছেন এই সব করতে করতে প্রবল কমিউনিস্ট এবং মুসলমান বিরোধী কেউ কেউ লাল পতাকা হাতে নিয়েও কখনও থানা চারিআলিতে গিয়ে দাঁড়াবার নজির আছে  কিন্তু লালপন্থীরা যদি এমন অদ্ভুত প্রচারে থাকেন যে দুর্গাবাড়ির সবাই শাসক বিজেপি বা কংগ্রেসের লোকতাই বাংলা ব্যানার চাপান -- তবে এরাও ভয়ে কুঁচকে যাবেন বরং এই আস্থা বেড়েই যাবে যে শাসকদলের ছত্রছায়াতেই তাঁদের ভাষিক অস্তিত্ব সম্পন্ন থাকবে যদিও বাস্তব এই যে সাম্প্রতিক বাঙালি বিরোধী আক্রমণের পেছনে শাসকদলের ‘কা’ আইন এনে বাঙালি রক্ষার লোকদেখানো নাটকই মূলত দায়ী অসমিয়া লোকে বলতেই বলেকা না আসতেই এই এলে পরে কী হবে 


নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন একটি সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠান। সমগ্র দেশে তাঁদের শাখা সংগঠন রয়েছে। এই বছর এরা শতবর্ষ উদযাপন করছেন। দেশের কোথাও এই সব বাংলা ব্যানার লেখাবাংলা অনুষ্ঠান করবার জন্যে তাদের অপরাধী সাজাবার নজির নেই অসমে তাই হল। তাতে কি লাচিত সেনা এবং  অসমিয়া জাতীয়তাবাদীদের সম্মান বাড়ল? এরা ‘প্রগতিশীল সংস্কৃতি’ চর্চা করেন কি লোকে যখন খেতে পায় না তখন ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা...’  এমন অতিভক্তির গান করেন—সেই প্রসঙ্গ বৌদ্ধিক তর্কের বিষয় হতে পারে। বাঙালি সংখ্যাগুরু এলাকাগুলোতে এদের বিশেষ সম্মান প্রতিষ্ঠাও নেই। শিলচর আগরতলা শিলিগুড়ি কলকাতাতে নেই। অস্তিত্ব নেই বলেই বলতে পারি। যেখানে বাঙালি সংখ্যালঘু, যেখানে মুক্ত চিন্তার বিশেষ পরিবেশ নেই বাঙালির -- সেখানেই এদের অস্তিত্ব। আর যেখানে নিখিল ভারতও নেই—সেখানে বাঙালির আনুষ্ঠানিক সংস্কৃতি চর্চার অন্যকিছুও নেই। শিলঙের মতো দুই একটি জায়গা ব্যতিক্রম। শিলঙে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ রয়েছে।এই সংগঠনটিতে স্বাভাবিক ভাবেই কংগ্রেস বিজেপির মতো দলগুলোর সমর্থকই বেশি,কিন্তু সবাই নয়। হলই বা — সেটি কি নতুন কোনও ‘অপরাধ’? নির্বাচনের দিনগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোকেও বাংলাতে ব্যানার পোস্টার সাঁটতে দেখা যায়। তিনসুকিয়া শহরে অসম জাতীয় পরিষদ তথা অজাপকেও বাঙলাতে সেইসব করতে দেখা গেছে বাঙালির ভোট পাবার স্বার্থে। পৌরনির্বাচনের দিনেও দেখা গেছে। তখন কিন্তু লাচিত সেনা বা কোনও ‘জাতীয়তাবাদী প্রগতিশীল’ও রা করেন না। আর  সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে সেইসব করবার তাদের এবং বাঙালি জনতার অধিকারও আছে।  বিজেপি বা কংগ্রেসে এই সব করে বলেই লাচিত সেনা এভাবে চটে বলে যদি কোনও প্রগতিশীল দল বা ব্যক্তি দাবি করেন বা মনে করেন তবে একজনও বাঙালি তাদের ধারে কাছে ঘেঁষবেন না। বরং  বাঙালির ভেতরে কমিউনিস্ট বিরোধী বিজেপি কংগ্রেসের প্রচারই শক্তি পাবে। কিন্তু বিজেপি কংগ্রেসের ভয় দেখিয়ে বা দেখে এই যে বাম দল বা লোকেরা ‘জাতীয়তাবাদ’ করেন—তাতেই বা কজন অসমিয়া লোকই এখন এই সব দলের সঙ্গে আছেন? প্রচুর পদ্মে ছাপ দেওয়া অসমিয়াও আছেন—বাকি দিনগুলোতে নিজেদের কম্যুনিস্ট বলে জাহির করেন। বাঙালি সমাজেও, অসমিয়া সমাজেও। কিন্তু তবু এইসব ‘প্রগতিশীল’দের ভাবনা-- অসমিয়া জাতীয়তাবাদের পথ ধরে যদি  অসমীয়ার কোনও মুক্তি আসে। এরা অনেকে শ্রমিক শ্রেণির রাজনীতি করেও আকণ্ঠ মধ্যবিত্ত শ্রেণি-রাজনীতিতে ডুবে আছেন। নিজেরাও জানেন না—এই সব চাতুরি ধরা খুব কঠিন কিছু না।  এঁরা নিজেরা কিন্তু ‘অসম সাহিত্য সভাতে'ও যান  --যে সংগঠনের নেতৃত্ব এখন নিন্দুকে বলেন শাসকদলের  হাতে তিনসুকিয়াতে সিপি আই এম এল লিবারেশনের এক সময়ের সমর্থকের অসম সাহিত্য সভার জেলা সভাপতি হবারও নজির আছে। অসম আন্দোলনের দিনে যখন এরা জনসংস্কৃতি  পরিষদ করছিলেন—তখনও সগর্বে অসম সাহিত্য সভার কেন্দ্রীয় অধিবেশনে শোভা পাবার নজির আমাদের হাতে আছে।

জন সংস্কৃতি পরিষদ বা গণ নাট্য সঙ্ঘ এখন কই? অভিনেতা বিরিঞ্চি বরা সম্প্রতি গ্রেপ্তার হলে পশ্চিম বঙ্গ গণনাট্য থেকে প্রতিবাদের পোস্টার আমাদের হাতে এসেছে। অসমের গণনাট্য থেকে আসে নি। থাকলেও নজরে পড়ে নি। দ্বিতীয় বৃহৎ জনগোষ্ঠী বাঙালি যদি নিজ ভাষাতে বৌদ্ধিক এবং সাংস্কৃতিক চর্চার অধিকার না পায়—তবে আর অসমে এই সব আশা করে লাভ নেই। তিনসুকিয়াতে বিষ্ণু-জ্যোতি সাংস্কৃতিক সমাজ বলে একটি  আছে। তার অনেকেই কমিউনিস্ট ভাবাদর্শের মানুষ। কিন্তু সেখানেও সেদিন এক কর্মকর্তাই বললেন, আমরা রা করব কী? আমাদের ভেতরেই এনকাউন্টার রাজ—বুলডোজার সমর্থক লোক আছেন। কল্পনা করুন— নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন তো বিষ্ণুপ্রসাদ -জ্যোতিপ্রসাদ বাদ দিন হেমাঙ্গ বিশ্বাসেরও  নাম নিতে ভয় পায়। শঙ্খ ঘোষের নাম নিতেই সংকোচ বোধ করে। অতুল প্রসাদ দ্বীজেন্দ্রলালের নিচে নামেই না। এই বিষ্ণু-জ্যোতি সাংস্কৃতিক সমাজের অনুষ্ঠানে আমরা গিয়ে থাকি—আমাদের ‘উজানে’র অনুষ্ঠানেও অনেকে আসেন। অতিথি করেও আমরা আমন্ত্রণ জানাই। কিন্তু লক্ষ করেছি, আমাদের অনুষ্ঠানে অসমীয়া নাচ গান কবিতার অনুষ্ঠান  হলেও তাঁদের অনুষ্ঠানে কখনও বাংলা বা অন্যান্য অনুষ্ঠান হয় না  অন্য কিছু সংগঠনে  যদি বা হল, তবে সেই সব  সাধারণত পশ্চিম বঙ্গীয় হন। পশ্চিম বঙ্গীয় অতিথি ছাড়া গুয়াহাটি বইমেলা থেকে শুরু করে অসম সাহিত্য সভার কেন্দ্রীয় অধিবেশনও সম্পন্ন হয় না কোনোদিনই। ফলে তলায় তলায় একটি দূরত্ব থাকাও সত্য

যাই হোক, এত কথা টানবার উদ্দেশ্য একটাই-- কংগ্রেস বিজেপি করল বলেই বাংলাতে ব্যানার টানলে বা অনুষ্ঠান করলে তাদের আপনি অপরাধী সাজাতে পারেন না। আমরা নিশ্চিত নই, কোনও কমিউনিস্ট দল কি নিয়ম করেছে যে তাঁরা কোনোদিন উজান অসমে বাংলা ব্যানার লাগাবেন না? তবে যে তারা বাঙালি সমাজ থেকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হবেন এটি নিশ্চিত। যদিও আমরা একাংশ বাম-ভাবাপন্নদের চিন্তাতে আঘাত করতেই এই কথাগুলো লিখছি, সবাইকে একই ছাদে ঢালবার বাসনা আমাদের নেই। অনেকেই সাধারণ বাঙালির মতোই এদের বিরুদ্ধে ভয়ে মুখ খোলেন না।  এমন কাজ তো ভারতীয় সংবিধান বিরোধী নয়। সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে পরিষ্কার লেখা আছে Any section of the citizens residing in the territory of India or any part thereof having a distinct language, script or culture of its own shall have the right to conserve the same  বরঞ্চ লাচিত সেনার কাজগুলোই আইন হাতে নেবার মতো হয়েছে এরা কেবল ব্যানারে কালি মাখায় না, এখানে ওখানে ছোটো দোকানিদেরও অপমান  করে, তাড়াতে উদগ্রীব হয়। আর সম্প্রতি শৃঙ্খল চলিহার একটি সাক্ষাৎকার সামনে এসেছে যেখানে তিনি উজান অসমের সমস্ত বাঙালিকে বাংলাদেশি বলছেন। এরা ভাটি অসমের মুসলমান শ্রমিকদেরও বাংলাদেশি বলে প্রায়ই হেনস্তা করেন। দাড়ি লুঙি আর কানের নিচে ঘোমটা মহিলা শ্রমিক দেখলেই হল পথে ঘাটে। ভাগ্যিস আজকাল রিকশা- ঠেলার ব্যাবহার কমেছে। নইলে মুসলমান রিকশাওয়ালা ঠেলাওয়ালাকে এরা এবং প্রায় সমস্ত ‘জাতীয়’ সংগঠনগুলো আর সংবাদ মাধ্যম এই সেদিন অব্দি ছেড়ে কথা বলতেন না। ‘সন্দেহজনক নাগরিক’ বলেও এই সম্প্রদায়কে এরা আবিষ্কার করে রেখেছিলেন। আজকাল এই সব কম শোনা যায় । সম্ভবত তাড়াবার কৃতিত্বে সন্তুষ্ট আছেন।  সেই সব কিছুই আইন হাতে নেওয়াই। সেই সব  সম্পর্কেও বোর্জুয়াদলগুলোকে তো অবশ্যই, কমিউনিস্ট দলগুলোকেও এবং ‘প্রগতিশীলদের' সাধারণত চুপ থাকতেই দেখেছি। কেবল ডিব্রুগড়ে এক দশক আগে একটি সংগঠন ব্যাপক হারে মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি’ বলে তাড়ানো শুরু করলেই অসমিয়া মধ্যবিত্ত সমাজ থেকে এর বিরোধিতাও সমানে হয়েছিল। কিন্তু ছোটোখাটো আক্রমণে কারই বা রা করবার সময় থাকে? কিন্তু এমন আক্রামকদের সংগ্রামী কিন্তু বিভ্রান্ত যুব-বন্ধু বলে উল্লেখ করছেন ‘প্রগতিশীল’রা এমন আশ্চর্য ঘটনাও দেখেছি  এরা এগিয়ে এসে শোষণ শাসনের বিরুদ্ধে তরুণ সমাজকে সংগঠিত করে সংগ্রাম করবে বলে অলীক স্বপ্নও কেউ কেউ দেখেন। বাস্তবে এরা কিন্তু শ্রমিক আন্দোলন বা কমিউনিস্ট আন্দোলন সবল হলে কম্যুনিস্টদেরও ধরে আগেও পিটেছে, পরেও পিটবে। লাচিত সেনা এখন ভয় পাবার মতো সংখ্যাতে কম্যুনিস্ট দেখে না বলে।


                এই কদিন আমরা অসমিয়া জাতির স্বার্থে এদের ভিডিও জারি করে বাঙালি সমাজকে গালি দিতে যেমন দেখেছি, কাউকে কাউকে পরদিনই নূপুর শর্মার সমর্থনে একই ভাষাতে দেশের মুসলমানদের গালি পড়তেও দেখেছি। লক্ষিমপুরে এক মাছ ব্যবসায়ীর মাথার তকি ছুঁড়ে ফেলে হাজতেও গেছেন এমন এক ভিডিও যোদ্ধা। তার সংগঠনটির অবশ্য নাম অন্য।  এদের বন্ধু বলে সম্বোধন করে কেউ কেউ বাঙালিদের হেমাঙ্গ বিশ্বাসের পথ অনুসরণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ‘বাঙালি হোন হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মতো’—এটি একটি অসমিয়া জনপ্রিয় আখ্যান। এর জন্যে কাউকে বামপন্থী হতে হয় না। আমরা শিলাদিত্য দেবকেও বিপদে পড়ে ভগবান রামকে ছেড়ে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের শরণ নিতে দেখেছি। দুই চারটি বিদ্যানিকেতনে এরা হেমাঙ্গ বিশ্বাসের প্রতিমূর্তি স্থাপন করে নিজেদের শ্রদ্ধাটা আগে দেখান। হেমাঙ্গ বিশ্বাস বাংলাতেও গেয়েছিলেন, লিখেছিলেন। তখন অব্দি একটি পরিবেশ ছিল। কিন্তু হারাধন রংমনের স্বপ্ন সাকার হয়নি -- এটি একটি বাস্তবতা। এর পরে ভূপেন হাজরিকাও গাইছিলেন, ‘আমি অসমীয়া নহও দুখিয়া বুলি সান্ত্বনা লভিলে নহব’। গেয়ে অসমীয়া সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলেন। তাঁর প্রতিমূর্তি আজ গোটা অসমে শোভা পায়। নইলে বাংলা আর বাঙালির কাছেই তিনি জনপ্রিয় হয়েছিলেন। তিনসুকিয়া সহ অসমের বহু শহরে তাঁকে অনুষ্ঠান করতে এককালে বাধা দেওয়া হয়েছিল। হেমাঙ্গ বিশ্বাস ষাটের পরের দিনগুলো কলকাতাতেই কাটিয়েছিলেন। আশির অসম আন্দোলনের দিনে অসমে এসে আবার সাংস্কৃতিক যাত্রা করবার পরিকল্পনা করেও হতাশ হয়ে ফিরে যান। বাঙালিকে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের অনুসরণ করবার পরামর্শ দেবার মানে কী? অসমিয়াতে লিখে বলে গেয়ে নেচে এর পরে কলকাতা চলে যাবার পরামর্শ? সেতো মধ্যবিত্ত বাঙালি করছেই। এবং এত সুবিধেবাদী এই সম্প্রদায়টির দাদু দিদিমারা তার পরেও বাংলাদেশ ছেড়ে পালাবার গল্পই তাঁদের নাতিনাতনিদের শুনিয়ে থাকেন। অসম ছেড়ে বেরিয়ে পড়বার, পশ্চিম বাংলা গিয়ে প্রবাসী জীবন বেছে নেবার,প্রব্রজনের মধ্যবিত্ত গল্পগুলো আর করেন না। ভাবখানা এই যেন, তবু তো এরা আমাদের ‘হিন্দুভাই’। অসমিয়াদের যেমন ‘আমার লরা’—সেই রকমই আরকি।  ডিব্রুগড় তিন সুকিয়ার মাত্র কয়েক কিলোমিটার উত্তরে ব্রহ্মপুত্রের উত্তরে শিলাপাথারে ও চিমেন চাপরিতে ১৯৮৩-তে বাঙালি হিন্দুদের বিরুদ্ধে গণহত্যা হয়েছিল—এরা জানেনও না,মানেনও না।   

এই সব কারণেই এখন আর ভূপেন হাজরিকাও নয় --খগেন মোহন্তও নয় --অসমীয়া সংস্কৃতির প্রধান পুরুষ এখন জুবিন গার্গ। যিনি গান করেন ‘পলিটিক্স নকরিবা বন্ধু!’ তিনি গান করেন না ‘মানুষ মানুষের জন্যে’। ‘গান করেন না ‘বুঢ়া লুইত তুমি...!’ তিনি বলেন,কা আইন বলবত হলে—আলফাতে যোগ দেবেন। পরে আর ভুলে গিয়ে যোগ দেওয়া হয়ে উঠে না। আর যখন বর্ষাশ্রী শদিয়াখোয়া বুঢ়াগোঁহাঞি বলে এক কিশোরি কবিতা লিখে হাজতে যখন যায়— দু-মাস আটকে থাকে-- প্রশাসন বলে, আলফাতে যেতে চাইছিল—লোকে টুইটারে ফেসবুকে প্রশ্ন করে—সে তো জুবিনও বলেছিলেন। তার বেলা?

অসমিয়াতে সাহিত্য চর্চা করা বাঙালি এখনও অসমে আছেন। কেউ তাদের নাম নিয়ে বলেন না কেন—তাদেরই মতো সব বাঙালিকে হওয়া দরকারতাতেই প্রমাণ -- এই সব বাহানা মাত্র। ঊষা রঞ্জন ভট্টাচার্য আছেনঅমলেন্দু চক্রবর্তী আছেন তাঁরা কম্যুনিস্ট নন বলে কি তাদের কোনও সম্মান থাকতে নেই?  এমন কমিউনিস্টরা আজকের দিনে বাঙালি হিন্দু বা মুসলমান কাউকেই  নিরাপত্তা দিতে পারেন না। মাঝে এই মজার কথাও বলে দিই—হেমাঙ্গ বিশ্বাস হবার পরামর্শ আবার প্রগতিশীলেরা কেবল বাঙালি হিন্দুদেরই দিয়ে থাকেন। এমনিতে তাঁরা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতা এক্কেবারেই করেন না। মুসলমান তো তাঁদের বিশ্বাস অসমিয়া হয়েই আছেন। কেবল মুসলমানে বদরুদ্দিন আজমলকে আদর্শ করে নিয়েছেন—এটাই সমস্যা। আজান ফকিরকে অনুসরণ করলেই আর সমস্যা নেই। হজরত শাহজালালের সাড়ে তিনশ আউলিয়াকে তো কেউ চেনেনই না। চিনবার দরকারও নেই।  কোন গাছের ‘গুটি’ থেকে যে এই সব তত্ত্ব জন্মায়। তা, কথা হচ্ছিল নিরাপত্তা নিয়ে-- কংগ্রেস বিজেপি  অল্প হলেও ভোটের স্বার্থে দেবে । সেই জন্যেই এই সমাজটি শাসক দলের সঙ্গে থাকেন।

 আমি নিজে একাধিক অসমিয়া বই বাংলাতে অনুবাদ করেছি, আরও অনেক করব। আন্তর্জালে অসমিয়া প্রচারে প্রসারে গত দশকে শুরুর দিনগুলোতে আমার ভূমিকা উল্লেখ থাকবে একটি প্রকাশিতব্য অসমিয়া প্রবন্ধ সংকলনে।  তবু মনে করি না এমন জাতীয়তাবাদী পরিবেশে এই অসমে কোনও একজনও বাঙালি অপমানিত না হয়ে থাকবেন। দীর্ঘদিন আমার কলেজ থেকে ‘প্রজ্ঞান’ নামে একটি বহুভাষিক ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেছি, যার বেশিটাই থাকত অসমিয়াতে। অসমিয়া ছাত্রদের নিয়ে একটি লেখকগোষ্ঠীও গড়ে উঠেছিল। ত্রৈমাসিক ছিল কাগজটি। সাধারণত কোনও কলেজ থেকেই এমন কাগজ বেরোয় না। দেশে বিদেশে এর খ্যাতি পৌঁছে দিয়েছিলেন অসমিয়া অনুরাগীরাই। এর পরেও একাধিকবার এই শহরে আমি অসমিয়ার শত্রু বুলে আক্রান্ত এবং অপমানিতও হয়েছি। কিছু ঈর্ষান্বিত সহকর্মী আমাকে কাজটির থেকে তাড়ান অসমিয়া-বাঙালি করেই এখন পত্রিকাটি অনিয়মিত আগামী বছর থেকে সরকারি নীতির জন্যেই একেবারে বন্ধ হবারই সম্ভাবনা।পদ্মনাথ ভট্টাচার্য বিদ্যাবিনোদ ছিলেন অসম সাহিত্য সভা এবং কামরূপ অনুসন্ধান পরিষদ প্রতিষ্ঠার পেছনে  এক প্রধান ব্যক্তি। তিনি অভিমান করে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ছেড়ে সিলেটের বাড়িতে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন এ নিতান্ত কর্মভূমি থেকে জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়া ছিল না  যতীন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য  অসম থেকে কয়েক হাজার প্রাচীন পুথি অনুসন্ধান করে সংগ্রহ করেছিলেন সব কিছু নিয়ে তিনি কলকাতা চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। এখন  যতীন্দ্র মোহন সংগ্রহশালা আছে কলকাতাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির এইসবই লাভ

হেমাঙ্গ বিশ্বাস অমলেন্দু গুহের মতো মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীকে কজনই সাধারণ অসমিয়া বাঙালি মানুষ চেনেনশ্রমজীবী মানুষ,ছোট দোকানদারেরা কি চেনেনসমস্ত বাঙালিকে  হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে অনুসরণ করবার উপদেশ মধ্যবিত্ত উপদেশ অকমিউনিস্ট উপদেশ! এটাই বা কেন বলা হয় না যে এই সব শ্রমিক শ্রেণির রাজনীতির বৌদ্ধিক নেতৃত্বকে অসমের সমস্ত ভাষা সম্প্রদায়ের মানুষেরই উচিত অনুসরণ করাকেন কেবল বাঙালি হিন্দু?  এখানেই দ্বিচারিতা এমন কথা যত বেশি বলা হবে এই সব মহান শিল্পী লেখক ঐতিহাসিকদের অহেতুক লোকে ঘৃণা করবেন ভাববেন এরা মনে হয় অসমিয়া জাতীয়তাবাদেরই প্রতিভূ ছিলেন বাঙালির শত্রু হেমাঙ্গ বিশ্বাস সমস্ত বাঙালির আদর্শ হতেই পারেন না এই সামান্য কথা বোঝেন না যে সমস্ত ‘প্রগতিশীল’ অসমিয়া মধ্যবিত্ততাঁরা প্রমাণ করেন যে তাঁরা ‘প্রতিক্রিয়াশীল  জাতীয়তাবাদী’ হেমাঙ্গ বিশ্বাসের আদর্শ যদি চান এরা সব বাঙালি স্বীকার করুনগ্রহণ করুনতবে বাংলা ভাষাতে এই গান গাইবার স্বাধীনতা স্বীকার করুন ----ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় নাশিল্পী সংগ্রামী পল রবসন!

অসমীয়া মাধ্যমের বিদ্যালয় ইংরাজি মাধ্যমে রূপান্তরিত হবার উদাহরণ নেইযদিও বিশ্বায়নের  জন্যে সমস্ত সরকারি বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব  বিপন্ন। বাংলা স্কুল বেশি বিপন্ন। অসমিয়া কমকেননা অনসমিয়া ছাত্রছাত্রীরা এসে বাঁচিয়ে রাখছেন ইংরাজি মাধ্যমে যে অভিভাবক ছেলেমেয়ে পাঠাতে পারছেন নাতারা ভাবছেন অসমে চাকরি পাবার জন্যে অসমিয়াই সই  কিন্তু স্কুলগুলো ভাবছে অন্যরকম লাচিত সেনার ধরণের ধমকি হুমকির জন্যে বাংলা মাধ্যমের স্কুলগুলো নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে সমগ্র উজান অসমে ইংরাজি মাধ্যমে যেতে শুরু করেছেন তবু অসমিয়াতে যাচ্ছেন না ইংরাজিতে গেলে জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলো বিরোধিতা করবার যুক্তি খোঁজে পায় না এদের কৌশল বুদ্ধি এর বেশি কাজ করতে পারে না এ একধরণের নঞর্থক প্রতিরোধ  তুমি আমাকে অপমান করে যাও বলে, আমরা ছাত্র পাই না বলে অসমিয়াতে যাচ্ছি নাদরকারে ইংরাজিতে যাব ভাষা- মাধ্যমে জাতিকে রক্ষা করতে পারে বা করবেএই তত্ত্ব এখন বাস্তবের জমিতে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না অর্থহীন হয়ে যাচ্ছে  ১৯৬০-এর আগে থেকে এহেন তত্ত্ব প্রচার করে আসছিলেন যে মধ্যবিত্ততাঁরা নিজেরাই সন্তানদের এখন বেসরকারি মাধ্যমে পাঠাচ্ছেন সেখানে সন্তানেরা বাঙালি বিহারি নেপালি সবার সঙ্গে পড়ছে সেখানে জাতীয়তাবাদী  বা কোনও ধরণের সংগ্রামী ছাত্র সংগঠনও করা যাচ্ছে না শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে অন্যকোনও প্রশ্ন তুলবার থাকলেও ছাত্ররা শিক্ষকদেরই মতো সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকছেন বিশ্বায়নের অনুগামী জাতীয়তাবাদীদের এর জন্যে লজ্জা পাওয়া দরকার এখন দরিদ্র বাঙালিও পড়বে ইংরাজি মাধ্যমে।  


             বাঙালি সমাজে ভাষা আইনের ২০২০-এরসংশোধনের জন্যে অসমিয়া পড়ার আগ্রহ (আন্তরিক কারণে নাহলেও) বেড়েছে –এই কথাটি সত্য শোনা যায়, ইংরাজি মাধ্যমে রূপান্তরিত কিছু আগেকার বাংলা স্কুলের শিক্ষকেরাও ভাষার চাপ কমাতে বাংলার বদলে ছাত্রদের অসমিয়া এম আই এল নিতেও চাপ দিচ্ছেন। সেই শিক্ষক অসমিয়া হতেই পারেন , বাঙালি হলেও অবাক হবার কিছু নেই। এই সব অধিকাংশ শিক্ষকই ভাষাচিন্তার থেকে ধর্ম নিয়ে বেশি চিন্তিত শঙ্কিত। গুণোৎসবে গিয়ে আমার সেরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে। দুই একটি স্কুলের প্রার্থনা শুনে—মনে হয়েছে কোনও হিন্দু মন্দিরে এসে পৌঁছেছি। আজকার সারা দেশেই প্রার্থনা কী শিক্ষা দিচ্ছে — ঈশ্বর জানেন। প্রচুর সংবাদ আসে এই নিয়ে শিক্ষকেরা নিজেদের মধ্যেই সাম্প্রদায়িক লড়াই লড়ছেন।  ‘আল্লাহ’ শব্দ থাকা না থাকা নিয়ে অসমেই হল্লা হয়েছে। এমন প্রার্থনা শুনেই বাহ্যিক মূল্যায়ক হিসেবে যখন প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে বাকি প্রস্তুতির ফাঁকে কথা হচ্ছে—সব কটি বিদ্যালয় নিজেদের হতাশা ব্যক্ত করতে শুরু করেছেন। আগের বছরে এই সব শোনার অভিজ্ঞতা অসমিয়া বিদ্যালয়ে গিয়েও শুরু হয়েছিল। অবসর নেবার বয়স হয়েছে এমন অসমিয়া প্রধান শিক্ষক হুঁ-হুঁ করে কাঁদছেন এমনও তো দেখেছি। এমন আঁকা-বাঁকা পথে অসমিয়া পঠন পাঠন যদি কিছু বছর বেঁচে থাকে তবে থাকবে। এই সব কিছু নিয়ে উদাসীন লাচিত সেনা প্রশ্ন করে যাবে—‘অসমিয়া জীবনেবাঙালির অবদান কীকমিউনিস্ট তথা প্রগতিশীলেরাও প্রশ্ন করতে জানেন না-- লাচিত সেনার সদস্যরা বাঙালি মিস্ত্রী, ঠিকাদারকে দিয়ে নিজের বাড়ি-ঘর বা কোনও প্রতিষ্ঠান কি বানান নি?  নিজেদের বাড়ির বিয়ে জন্মদিন শ্রাদ্ধের ভোজ-ভাতে বাঙালি রাঁধুনিকে ডাকে নি? বাঙালি গাড়ি ড্রাইভার তাদের গাড়ি চালায় নি? বাঙালি হিন্দু মুসলমান চাষির ফলানো ডাল-ভাত- মাছ-মাংস-শাক –সবজি এরা মুখে দেন নি? বাঙালি রিকশাওয়ালা, টটো অটো চালক কখনো মাঝ রাতে এদের বাড়ির অসুস্থ রোগীকে নিয়ে হাসপাতাল দৌড়ান নি? বাঙালি নার্স-ডাক্তার এদের চিকিৎসা করেন নি? বাঙালি শিক্ষক এদের পড়ান নি? শ্রেণি নির্বিশেষে বাঙালিকে কি হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মতো কবি-গায়ক-সংগঠন হতেই হবে? বাঙালির লেখা অসমিয়া গান-কবিতা শুনেই কি অসমিয়া ভাষা ও জাতিকে টিকে থাকতে হবে? গায়ক শিল্পীরাই কি ভারতীয় বিপ্লব সম্পন্ন করবেন? কী বলেন প্রগতিশীলেরা?  

অসমিয়াদের যেমন আছেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস, বাঙালিদের তেমনি— নেতাজি সুভাষ। তিনি বুঝি অসমকে পাকিস্তানে যাবার থেকে আটকেছেন। এহেন বাঙালি আরও এককাঠি সরেস। মনে মনে এদের নেতাজি নিন্দিত হিন্দুত্ববাদও রয়েছে পূর্ণমাত্রাতে। তাঁরা ভুলেই থাকেন— কেবল গ্রুপ সি-র বিরোধিতা করেন নি অসমিয়া মধ্যবিত্ত সমাজ। সিলেটটাকেও পূর্ব-পাকিস্তানে ঠেলে পাঠাতে চাইছিলেন। গোয়ালপাড়াকে অসমে ধরে রাখতে চাইলেও বীর চিলারায়ের ‘কামতাপুর’ নিয়ে এরা বিশেষ আগ্রহ দেখান নি। তাদের কাছে সেটি ছিল পাকিস্তান নয়—পূর্ব বাংলা। খেয়াল করুন—ভাষা আন্দোলন যেমন দেশভাগের পরের দশকের ঘটনা —অসম আন্দোলনও মুক্তি যুদ্ধের পরের দশকের ঘটনা। আর এখন তো ‘কা’ আইন আর আন্দোলোনের যুগ। তখন নেতাজি সুভাষ ছিলেন না। এখনও তো নেইই। যে দুর্গাবাড়ির কথা বললাম, সেখানেই তিনসুকিয়াতে নেতাজি জয়ন্তী হয়। যারা পালন করেন—তাঁরা একটি ব্যানার টিকিয়ে রাখতে পারেন নি। মামলা ঠুকবার সাহস জোটাতে পারেন নি। এভাবেই বাঙালি মনে বেঁচে আছেন নেতাজি। এদের বহু মানুষের ঘোর বিশ্বাস শৌলমারির সেই আত্মগোপনকারী সাধুটিই নেতাজি।  সেই পূর্ববাংলার প্রচুর মানুষ দেশভাগ আর মুক্তি যুদ্ধের পরে অসমে উঠে এলেন বলেই বহু অসমিয়া মধ্যবিত্ত মনে সুগভীর অন্ধ বিশ্বাস গড়ে উঠেছে যে অসমের বাঙালি মাত্রেই ‘বহিরাগত’। অসমিয়া ভাষা এরা গ্রহণ করে না নিলে এদের থেকে বিপদ প্রচুর। তাইই তাঁদের আখ্যানের নায়ক হেমাঙ্গ বিশ্বাস, অমলেন্দু গুহ, পুলক ব্যানার্জি প্রমুখ। এই আখ্যানের বিরুদ্ধে লড়াই করবার ক্ষমতা নেতাজি সুভাষের নেই—সে তিনি যত বড় বীরই হোন।  আমাদের নতুন নায়ক সন্ধান করতে হবে। অসমের জনগণমন অধিনায়ক। না কেবল বাঙালির, না কেবল অসমিয়ার। সে অধিনায়ক অসমের জনতার।