“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

মঙ্গলবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২১

বাংলা কবিতা: অদ্ভুত

    অদ্ভুত
**********

ঝোড়োমেঘ
(সিক্তা বিশ্বাস)
১৬/১১/২০২১, 
হায়দ্রাবাদ।

বিচিত্র জীবনের 
বিচিত্র স্বাদ! 
খাঁজে খাঁজে লুকোনো
অদ্ভুত ফাঁদ!

সৌভাগ্য, সাথী অদৃশ্য 
কেবল বিমুখী জবাব! 
বুদ্ধি নয়কো লোহা তবু 
ঝংকারে মর্চা রবাব!

বিদেহী মর্যাদাবোধের
আঘাতই অনুভাব! 
মানুষ আবহাওয়া নয়
তবু বদলই  স্বভাব!

ধন্য জীবন! শান্তি খোঁজে, 
অশান্তি মূলত অজ্ঞাত নিজে! 
মাত্রাতিরিক্ত সঞ্চয়ী সচেষ্টা
আনন্দমার্গী উদ্বুদ্ধ! অদ্ভুত তেষ্টা।
  
         **********

রবিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২১

জুনাইদের পিতা

জুনাইদের পিতা
মিফতাহ উদ্দিন 

গীতা পড়া হয়নি তবে সীতার জানি রাম
বলতে পারি ভালোই আমি চারটে বেদের নাম।

দুগগা, কালি কৃষ্ণ জানি, জানি শিব সবার
গরু, হাতি, সাপ, পেঁচা ও দেখি দিনে ক-বার!

দেখলে মিছিল ভগবানের রাস্তা ছাড়ি আগে
জানিনে খুশ হয় কি না সে আমার এমন ত্যাগে!

মত যত ঠিক পথ ততো ভাই গেছেন বলে কেউ
বারো মাসে পর্ব তেরোর তাইতো দেখি ঢেউ!

বন্ধু, তোমার নিজের পুঁথি একটু নাহয় পড়ো;
সাক্ষ্য দেবে সর্ব-শ্লোকই — মানুষ সবার বড়।

বৃক্ষ চিনি ফলেই কেবল, ফুলের সুবাস যেমন;
তোমার মাঝেই খুঁজব আমি তোমার বেদ কেমন।

কেমন ছিলেন ঋষি তোমার, হয়নি আমার পড়া;
কিন্তু জেনো— বক্ষজুড়ে ওদের আসন গড়া।

এই তো সেদিন— কুরুক্ষেত্রে কৃষ্ণ দিলেন ভাষণ,
শীর্ষচূড়ায় জেনে রেখো সময়েরই আসন।

কী বলেছেন যুদ্ধের আগে? মানুষ-মানুষ কী ভেদ?
'অদ্য থেকে বন্ধ, জেনো, ছোট বড়'র বিভেদ।

অজ্যেষ্ঠাসো অকনিষ্ঠাসঃ ভাই ভাই সকলে
শুনিয়াছি ঋগ্বেদের শ্লোকটি তাহাই বলে! 

সংখ্যালঘুর সঙ্গে তুমি করবে যখন যা-ই,
ভাবব আমি— তোমার বেদের শিক্ষা ছিল তা-ই।

কেমন ছিল কর্ম রামের? কেমন বিচার তাঁর ?
তোমার মাপেই মাপব আমি— রামের অবতার।

হয়নি যাওয়া কাশী আমার, যাইনি বৃন্দাবন 
সবার সেরা তীর্থ জানি মানুষেরই মন।

সেই মানুষের মন কে ছেড়ে নামটা ধরে তার
জয় শ্রীরামের নামে চলে কেমন অত্যাচার!

ফ্রীজে রাখা মাংসতে হয় কার গো অপমান
কোন দেবতার আদেশে ভাই নাও তুমি তার জান!

ওপার থেকে একটা দুটো— আসলে খবর উড়ে;
অমনি তুমি প্রতিবাদি এপারে সব ছুড়ে।

রাখবে ক-জন ক-দিন খবর, থাকবে দু-দিন রেশ;
এপারে যে রোজ যে কত হচ্ছে নিরুদ্দেশ  !

তোমার হাতেই ধর্ম তোমার, তোমার বেদ গীতা  ;
গেলাম আমি আরজ রেখে— জুনাইদের পিতা!

২৪ অক্টোবর ২০২১
মোবারকপুর

রবিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২১

যে ক'টা দিন পৃথিবীতে

।। ১৬।। 

আড় চোখে দেখলাম, রাত দেড়টা প্রায়। আমার শরীর টা ক্রমশ: ভারী হচ্ছে যেন। রাতের ভারী খাবারের পর উঠোনের দশ মিনিট দাড়িয়ে থাকা ছাড়া আর বেশ কসরত হয় নি আমার। বসেই আছি সেই থেকে। অথচ আব্বাকে দেখি এখনো সতেজ, শুরুতে যে অস্বস্তি ছিল সেটা ও কেটে গেছে অনেকক্ষণ, একটা দৃঢ় চেতনা নিয়ে বলে যাচ্ছেন যেন এ ইতিহাস জানা দরকার। অন্তত তাঁর দামাদের সে জানা প্রয়োজন! 
আব্বার খোলা চোখে ছাদের দিকে করা ধ্যান টা ভাঙাতেই বললাম...
- সুনীল...
- হুমম, শুনেছি সেই ড্রাইভারই না-কি কিভাবে সুনীলের নাম্বার পেয়েছে, পকেটে ছিল বোধহয়। 
- তারপর? 
- হুঁ, তারপর, তারপর আর কি, আমাদের সুনীলের ঘরে থাকার কথাটা ছড়িয়ে পড়লো তাঁদের এলাকায়। সুনীলদের উত্ত্যক্ত করা শুরু হল ঘরে বাইরে। প্রায় সপ্তাদিন পরেই একদিন ফজরের নামাজ টা পড়েই বেরিয়ে পড়ি আমরা তিনজন। জায়গায় জায়গায় তখন পুলিশের টহল। ভোরের বাতাসে পোড়া গন্ধটা আরও ঝাঁঝিয়ে লাগছে আমাদের নাকে, মুখে। কিছুদূর যেতেই ক'জন পুলিশ আটকাল আমাদের, বলল, কোথায় যাবেন, বললাম শাহপুর। শাহপুর রিফিউজি ক্যাম্প টা তখন এ অঞ্চলের মুসলমানদের জন্য একমাত্র নিরাপদ আশ্রয় স্থল। ওরাই গাড়িতে করে পৌঁছে দিলো আমাদের সেখানে। 

- মানুষ, হায় মানুষ! 
আব্বা আবারও যেন কাঁদো কাঁদো অবস্থায়। আমি বলতে ও পারি না, আব্বা থাক, ঘুমান, পাছে মন আরও খারাপ হয়ে যায়। আসলে মানুষের মন খারাপের কথাগুলো শুনতে হয়, আটকাতে নেই, বেরিয়ে এলেই বোঝাটা হালকা হয়। আব্বা আবার শুরু করলেন...

সেখানে প্রায় দিন পনেরো ছিলাম। কি দুর্বিষহ অবস্থা। প্রিয়জন হারানোর শোকে কেউ কারুর দিকে মনোযোগ দেয়ার মত নেই। কারুর মা, কারুর বোন, কারুর বাবাকে পাওয়া যাচ্ছে না। সকাল সকাল বেরিয়ে যান নিজ নিজ হারানো স্বজনদের খোঁজে, কেউ খুঁজে পান, কেউ পান না। যারা পান তারা আরও ভেঙে পড়েন। আহমেদাবাদ মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের বর্জ্য বাহী ট্র্যাক্টরে আসে লাশের ঢের, শাহপুর বড় মসজিদের কবরিস্থানে বিশাল সাইজের গর্ত করে একসাথে পনেরো, বিশটা করে লাশ ফেলে মাটি চাপা দেয়া হতো। জীবিতের খোঁজে লাশের স্তূপে ভিড় জমাত আধ মরাদের দল। 

এবার আমার চোখে পানি। ছোট্ট নাদিয়ার কথা ভেবে বুক ফেটে যাচ্ছে যেন আমার! আব্বাকে বললাম আর নাদিয়া?
নাদিয়ার কান্না হাজারো শিশুর কান্নার সাথে মিশে একাকার। আমরা সবাই এক! আমাদের একমাত্র পরিচয় আমরা রিফিউজি! 
- আর অফিস?
- হ্যাঁ, অফিস তখন অর্ধ দিন হতো। সুনীল আমাদের খোঁজে এফ আই আর দিয়েছে থানায়। একদিন অফিসে দেখেই জড়িয়ে ধরল। কিন্তু আমার কেন জানি আর থাকতে ইচ্ছে করছিলো না সেখানে। মনে পড়ে যাচ্ছিলো সুনীলের ভূপালের দিনগুলোর কথা। সেদিন তার বুকে বোধহয় এমনই যন্ত্রণা ছিল! কে জানে! সুনীল কে বললাম আমি চাকরি ছাড়ছি। সে পীড়াপীড়ি করতে লাগলো, বলল সব ঠিক হয়ে যাবে! এমনকি আমাদের আবার শাহপুর থেকে তার ঘরে নিতে চাইলো। কিন্তু অবিশ্বাসের বাতাস তখন কোণায় কোণায়, ওলিমা কিছুতেই শাহপুর ছাড়তে রাজি নয়। বাঁচলে সে সেখানেই বাঁচবে আর মরলে ও সেখানে! সুনীল আমাকে ভূপালে চলে যেতে বলল, সে সব ঠিক করে দেবে! তারপর মার্চের পঁচিশ তারিখ আহমেদাবাদ ছেড়ে সোজা এইখানে! 

মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে আসছে। আল্লাহু আকবার আল্লা হু আকবার...
চুপচাপ বসে আছি দু'জন মানুষ! আব্বা এতো সাহস দেখিয়ে ও যে কথাটি মুখ ফুটে বলার সাহস রাখতে পারলেন না, সে আমি নীরবে বুঝে গেলাম। 
নাদিয়া কুরেশি, নাদিম কুরেশি আর আয়েশা কুরেশির সেই আদরের দুলাল! 
আমি কান্নায় ভেঙে পড়ছি, আমার দুচোখে অশ্রুর বন্যা! 

ক্রমশ: 

#যেকটাদিনপৃথিবীতে

বুধবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২১

স্বরবর্ণ

                          স্বরবর্ণ
              রফিক উদ্দিন লস্কর 

বাগযন্ত্রে ধাক্কা না খেয়ে যারা উচ্চারিত হয়
সেই সব বর্ণকে জানি সবাই স্বরবর্ণ কয়।
স্বরবর্ণে বারোটি (১২টি) স্বর আছে মূলতঃ 
তারই মাঝে হ্রস্ব-লি (৯)এখন অপ্রচলিত। 
'অ' থেকে 'ঔ' পর্যন্ত যে প্রচলিত এগারোটি 
তাদের দখলে এখন স্বরবর্ণের তালিকাটি।
স্বরের মাঝে হ্রস্ব, দীর্ঘ, প্লুতস্বর ও যৌগিক 
এগারোতে ৭টি আছে যেগুলো মৌলিক।
অল্প সময়ে উচ্চারণ যার অ,ই,উ এবং ঋ,
দীর্ঘ সময়ে উচ্চারণ এ,ঐ,ও,ঔ, ঊ, আ,ঈ।
বাংলা ভাষায় মৌলিক স্বরধ্বনি ৭টি আছে,
সেগুলো হলো- অ, আ, ই, উ, এ, ও, অ্যা।
'অ' হলো নিলীন ধ্বনি স্বরের মাঝে প্রথম
এগারোতে ১০টি 'কার' একটি মাত্র কম।
পূর্ণমাত্রার ৬টি স্বর আর অর্ধমাত্রার এক(১)
মাত্রাহীন ৪টি আছে শেষ চারে যে উল্লেখ। 

০১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইংরাজি
নিতাইনগর, হাইলাকান্দি (আসাম-ভারত)

বুধবার, ২৫ আগস্ট, ২০২১

বৃক্ষ

॥ পৃথ্বীশ দত্ত ॥

       সেই ছেলে ও মেয়েটি,  কী যেন নাম ? না, তখনও নাম জানা যায়নি । এখন মেয়েটি উধাও । তবু ছেলেটি রোটিন মেনে যায় ।

       ছেলেটি রোজ সেই বৃক্ষের কাছে যায় । তার সাথে কথা বলে । ভাদ্রের তাল পাঁকা দুপুরে, সূর্যের রৌদ্র শাসনে, তপ্ততা যখন দিগন্তব্যাপী, ছেলেটি তখন অশ্বত্থ ছায়ের শীতলতায় বসে নিঃশব্দে গল্প করে । গল্পের ছলে খেলা করে । বুকের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে নামে বেদনার পাথর । একটু হালকা লাগে । আবারও পাথর গড়িয়ে নামে । বার বার । এ যেন বুক ও দহনের নিরন্তর খেলা !

       সহস্র প্রসারিত হাতে ছায়া মেলে রাখে অশ্বত্থ গাছ । গাছ নয়, সে বৃক্ষ । সেও কথা বলে ছেলেটির সাথে । তার চপল পল্লব হেসে হেসে প্রমোদ ছড়ায় । ভালো লাগা দিতে চায় পরম আশ্রিতকে ।

      কোন মানুষ এখানে আসে না । কোনও প্রয়োজন নেই এখানে আসার ।  জঙ্গলাকীর্ণ চারপাশ । তবু এই নির্জনতা ভরে আছে কত স্মৃতি, কত কথার গুঞ্জন, কত স্পর্শের উষ্ণতায় । এখানেই ওরা বসতো । গল্প করতো, গল্প রচিত করতো দুজনে । সেই গল্পের ভাষা বৃক্ষটি জানতো। সে শুনতে পেতো তাদের কথার গভীরে কত স্বপ্নের ধ্যান ।  আজ ছেলেটি মৌন । তবু কিসের টানে সে  বৃক্ষের পদতলে আসে !  স্মৃতি সততই নির্জনতা বিলাসী ।

      একদিন সেই বৃক্ষের প্রসারিত শেকড়-চরণে ছেলেটি বসতো মেয়েটিকে নিয়ে । সে কোনও একদিন ।  তরল স্বপ্নের রঙ নিয়ে নিবিড় লোফালুফি খেলতো । গল্পের মৃদুভাষ ছড়িয়ে পড়তো বৃক্ষের শরীর জড়িয়ে । কল্পকালির টানে নানা স্বপ্নের কোলাজ এখানেই রচিত হতো । এই অশ্বত্থ জানে প্রেমিকের মায়া মেদুরতা । সে জানে প্রেমের কথামালা কেমন করে কাব্য হয়ে ফুটে ওঠে । সে জানে প্রেম ও প্রতারণার অলৌকিক সম্মোহন । রঙ মুছে গেলে ক্যানভাসের পাতাগুলো বারবণিতার মতো আরোপিত রূপ নিয়ে পড়ে থাকে ।

      ছেলেটি এখন একা । এখন সে অবসাদে নিথর । তার স্বপ্নময় মারীচ হরিণী । তবু সে অশ্বত্থের কাছে যায় । অশ্বত্থই তার প্রেমের সাক্ষী । তার কাছে বসে, তারই কোলে শরীর এলিয়ে স্মৃতি-তর্পণে ডুবে যায় । কত কথা কত গল্প, স্বপ্ন ভাঙার আকূল ঢেউ আছড়ে পড়ে মনতটে । এ বড়োই বেদনাসুধা । এই বৃক্ষের বাকলে এখনো খোদাই করা আছে মেয়েটির নাম l যেন সে মেয়েটির ধারক । জড়িয়ে রাখে বাকলাঙ্গের নীরব মমতায় । গাছেরও প্রাণ আছে । গাছেরও প্রেম আছে । সে ছেলেটিকে নিঃশব্দে ডাকে-- ওরে আয়, আয় আয় !

       হঠাৎ একদিন এই নির্জন বৃক্ষের চারপাশ ঘিরে মানুষের ভিড় । পুলিস এলো । এলো এম্বুলেন্স । ছেলেটি সত্যিই গাছ হয়ে গেল । গাছেই বিলীন হল অদৃশ্য আকুতি । কারণ, গাছেরও প্রেম আছে ।

       কিন্তু তার শরীরটা চলে গেল লাশকাটা ঘরে । মেয়েটি তখন হ্যানিমুনে মত্ত নৈনিতালে । বরফ ও উষ্ণতা নিয়ে মাখামাখি খেলছে তার নিজস্ব পৃথিবীতে, আপন মানুষের সাথে ।

     জানা গেল সেই ছেলেটির নাম আবেগ । মেয়েটি মায়া ।

                                             ***

পৃথ্বীশ দত্ত ।

রবিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২১

তোমাকে বলছি, স্বাধীনতা।

তোমাকে বলছি, স্বাধীনতা। 
         -আ,ফ,ম,  ইকবাল॥ 

স্বাধীনতা- 
মখমলের শুভ্র পোশাক পরিহিতা স্বাধীনতা-  কেমন চিত্তাকর্ষক তুমি!  
কত বিস্তৃত তবে ঝলসানো ডানা!  
স্বাধীনতা- পনেরোর রাজপথে  
বিন্যস্ত মিছিলে তোমার পরিচয়?   
স্বাধীনতা- উচ্চাঙ্গ অভিভাষনে 
স্মরণ তোমারে অবশ্যই হয়। 

স্বাধীনতা-
একটি শব্দ মাত্র নয়, 
স্বাধীনতা- অখন্ড আকাশে  
খন্ড খন্ড মেঘে কি হয়  
তোমার আত্মপরিচয়?  
প্রদীপ্ত আকাশখানা  
কখনো যে ঢাকা পড়ে রয়-  
বিশাল ছাদের তলায়  
বিমর্ষ জনতাকে দেখে  
কেন যেন আমার অন্য কিছু মনে হয়! 

স্বাধীনতা- কথা ছিল তেরঙ্গায় মোড়ে  
পৌঁছে দেয়া হবে ঘরে ঘরে-  
ক্ষুধিতের অন্ন,   
বঞ্চিতের বাঞ্ছিত আবরণ,  
ঘুরবেনা পথে পথে  
উলঙ্গ বেদনা, ক্ষুধা, ঘৃণা  
হরেক প্রকারের রক্তিম বেদনা। 

স্বাধীনতা-  
তোমার পোশাক পরা হবে সার্থক  
যখন জননীর নাভিমূল থেকে  
মুছে যাবে সকল ক্ষতচিহ্ন!  
ফুটবে কৃষ্ণচূড়ার মঞ্জরী হরেক দাওয়ায়  
স্বপ্নের গোলাপ পাপড়িতে  
নিভৃতে মধুকর করবে গুঞ্জন! 

বলি তাই স্বাধীনতা-  
তুমি দীর্ঘজীবী হও,  
বেঁচে থাকো আমার অস্তিত্বে  
আমার ভালোবাসার পরিমণ্ডলে, 
ফুটন্ত রক্তকরবীর ডালে ডালে; 
একদিন আমরা মানুষ হবো,  
মানবিক চিত্তে জড়িয়ে নেবো তোমায়  
নিষ্কলুষ জননীর বিনয়ী সন্তান-সম। 
            পনেরোই আগস্ট, ২৯২১। 
            হাফলং, আসাম।

বুধবার, ২৮ জুলাই, ২০২১

লিলি

                                                         ।। শৈলেন দাস ।।

 

(C)Image:ছবি

  গতকাল সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া কয়েকটি ফটো এবং একটি ভিডিও দেখার পর থেকেই সতীশের মন ভারাক্রান্ত আর আজ বহুল প্রচারিত স্থানীয় দৈনিক কাগজ যে বিচ্ছিরি একটা শিরোনাম দিয়ে ওই ভাইরাল খবরটি ছেপেছে তাতে সে অনেকটা মর্মাহত। একটি মেয়ের সাহসিকতার কথা রয়েছে খবরটিতে অথচ শিরোনামটা অবমাননাকর! সতীশ ব্যাপারটাকে এত পার্সোনালি নিয়েছে কারণ যে মেয়েটিকে নিয়ে এই খবর, সে আগে থেকেই তাকে চিনে। তার নাম লিলি।

 

    বছর দুয়েক আগের ঘটনা। কোন এক সন্ধ্যায় শহরের ব্যস্ততম এলাকায় সতীশ প্রথমবার স্ট্রিট লাইটের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল লিলিকে। ছিমছাম, সাদা সালোয়ার কামিজ পড়ে একটি মেয়েকে এমন অসময়ে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সতীশের কেমন যেন খটকা লাগল। সে এগিয়ে যাবে মেয়েটির সাথে কথা বলতে, হঠাৎ একটি মারুতি ভ্যান এসে থামল লিলির সামনে এবং সে চটপট উঠে পড়ল তাতে। তিনদিন পর সেই একই জায়গায় একই পরিস্থিতিতে অন্য একটি গাড়ি থামিয়ে অপর একজন বলল 'চল'। লিলি তখন এদিক ওদিক তাকিয়ে মিনিট খানেক সময় নিয়ে ইতস্তত করে উঠে পড়ল গাড়িতে। অদূরে চায়ের দোকানে বসে থাকা সতীশের মনে হল লিলি সম্ভবত বুঝতে পেরেছে যে সে লক্ষ করছে তাকে।

 

    সেদিনই চা দোকানীর কাছ থেকে লিলির যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করল সতীশ। মেয়েটির বাবার যকৃতে ক্যান্সার। ছোট্ট দুটি ভাই বোন, মা আর দিদিমাকে নিয়ে তার সংসার। শহরের বৃহত্তম স্লাম এলাকার একসময়ের সচ্ছল পরিবারের মেয়ে ছিল সে। পাঁচটি পেট পালার দায়িত্ব যখন কাঁধে পড়ল তখন সাহস করে পয়সা উপার্জনের সহজ রাস্তায় নেমে পড়া ছাড়া কোনও উপায় ছিল না তার। 

 

    এর কিছুদিন পর সতীশ আবার লিলিকে দেখেছিল মিশন প্রাঙ্গণে। সারদা মায়ের জন্মদিনে বয়সের ভারে ন্যুব্জ বৃদ্ধা দিদিমার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল মিশনের এক কোণে। সতীশ এগিয়ে গেল লিলির কাছে এবং টিপ্পনী করল - 'কোন সময় কে কোথায় যে দাঁড়ায় আজকাল বোঝা বড় দায়'। লিলি বুঝতে পেরেছিল সতীশ তাকে উদ্দেশ্য করেই বলছে কথাগুলি। তবুও কোন প্রত্যুত্তর দেয়নি সে। শুধু দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তার চোখ থেকে। সমাজে তার পেশা নিষিদ্ধ তবু সেদিন লিলিকে অশুদ্ধ বা অশুচি মনে হয়নি সতীশের। বরং সেদিন নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হয়েছিল তার। 

 

    সংবাদ যাই হোক শিরোনামে চমক থাকা চাই। তাই লিলির নামের আগে 'যৌনকর্মী' শব্দটি জুড়ে দিল ব্যবসাসফল পত্রিকার সুচতুর এডিটর। একবারও ভেবে দেখল না যে লিলি যৌনকর্মী হিসেবে নয় দায়িত্ব পালন করেছে সুযোগ্য কন্যার। তাছাড়া খবরের ভিতরের অংশে পরোক্ষে লিলির জীবনের নেগেটিভ দিকই যেন তুলে ধরা হয়েছে বেশি করে। করোনা সংক্রমণের অজুহাতে ছেলেমেয়েরা যেখানে মা-বাবার  মৃতদেহ সমঝে নিতে অস্বীকার করছে সেখানে লিলি কোভিড আক্রান্ত পিতার শব একাই শ্মশানে নিয়ে গিয়ে দাহ করেছে, তাকে তো সামান্য সম্মান দেখানো দরকার।

 

    নিষিদ্ধ পেশায় জড়িয়ে থাকলেও যৌনকর্মীদেরও পরিবার থাকে এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনে ওরা অনেক ব্যতিক্রমী সাহসী - একথা মানুষকে জানাতে হবে। তাই লিলিকে নিয়ে একটা স্টোরি করল সতীশ এবং পাঠিয়ে দিল কয়েকটি দৈনিক কাগজে। কোন কোন কাগজ স্টোরিটি প্রকাশ করে এখন সেটাই দেখার।