“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
নাটক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
নাটক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৭

কেন্নো পোকার রেল


মূল অসমিয়া: নবকান্ত বরুয়া
বাংলা অনুবাদ: সুশান্ত কর


কেরেলুয়ার রেল’ নবকান্ত বরুয়ার প্রসিদ্ধ শিশু নাটকগুলোর একটি। মূলত ‘আকাশবাণী’র জন্যে এমন বেশ কিছু নাটক তিনি লিখেছিলেন। ফলে মঞ্চ নির্দেশনা বলে সেরকম কিছু নেই। পদ্যে লেখা হলেও অভিনয়ের সময় কখনো বা পরিচালকেরা এতে সুরসংযোজন করে গীতিনাট্যেরও রূপ দিয়েছিলেন। বাণী কটকীর মতো কোনো কোনো পরিচালক ‘মুখোশ নাটক’-এ পরিণত করে এগুলো মঞ্চেও পরে অভিনয় করান। অন্য দুই এক নাটকের সঙ্গে ‘কেরেলুয়ার রেল’ নাটকটি যোরহাট , গৌহাটিতে বেশ ক’বার অভিনীত হয়েছিল। নবকান্ত লিখেছেন, এগুলো এতোই জনপ্রিয় হয়েছিল যে এককালে ছেলেমেয়েরা পথে ঘাটেও এর সংলাপ আওড়াতো। নাটকটির পাণ্ডুলিপি লেখকের কাছে ছিল না। আকাশবাণীতে নাটকটি অভিনয় করেছিলেন ভারতী বরুয়া, তিনি বহু পরে স্মৃতি থেকে এর পুনরুদ্ধার করে ছাপা সম্ভব করেছিলেন। ‘মনত পরার শব্দ’, ‘কাগজ কলমর রণ’, ‘ গোলাপ আরু বেলি’, ‘মই টুনটুনিয়ে টুনটুনালো’ এই চারখানা নাটক সহ ‘কেরেলুয়ার রেল’ নিয়ে  শিশু নাটকের সংকলন বেরিয়েছিল প্রথমে ১৯৮৪তে  ‘মনত পরার শব্দ’ নামে। ১৯৯০তে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণে নাম হয় ‘কেরেলুয়ার রেল’। এই সবক’টি আবার সংকলিত  হয় তাঁর মৃত্যুর পর ২০০৩এ ‘অন্বেষা’ প্রকাশিত এবং গগণ চন্দ্র অধিকারী সম্পাদিত ‘ নবকান্ত বরুয়া শিশু সাহিত্য সমগ্র---প্রথম খণ্ড’-তে। যেখান থেকে আমরা অনুবাদের পাঠটি নিয়েছি। তিনি নিজে এগুলোকে ‘ননসেন্স রাইম’ গোত্রের বলেছেন। কিন্তু ‘রাইম’ বললে আমরা যা বুঝি, এর ছন্দ হবে ছড়ার--- সে নাটকগুলোতে নাটকের দাবি মেনে ‘ছড়া’র বহু কিছুই নেই, ‘ননসেন্সে’র সবটাই রয়েছে। মাত্রার বৈচিত্র্য আছে, গদ্যের চলন দেবার চেষ্টাও আছে। অন্ত্যানুপ্রাসও আছে, আছে শ্রুত্যনুপ্রাস।আবার বহু জায়গাতে নেই। অনুবাদ করতে গিয়ে আমাদের এই সব সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়েছে। আমরা প্রথমত, চেষ্টা করেছি বাংলা ছন্দের তিন রীতিরই আশ্রয় নিয়ে পদ্যের ধাঁচটা রাখতে। এবং যথাসম্ভব সর্বত্র অন্ত্যানুপ্রাস রাখতে। ফলে বহু সংলাপ ছাড়তে এবং কিছু সংলাপ জুড়তে হয়েছে বাংলায়। বহু শব্দকে নিয়েও খেলা করতে হয়েছে, তাতেই ‘বরসা, মশেলা, কিইচ্ছা’ শব্দগুলো এসেছে। যদিও নাটকের মূল গল্প কাঠামোটি অক্ষতই থেকেছে। দ্বিতীয়ত রেলযাত্রীরা বহুভাষিক হয়ে থাকে, এই কথাটি লেখক মনে রেখে শুধু অসমিয়া নয়, মাঝে মধ্যেই বাংলা, হিন্দি এবং ইংরেজি কথন ভঙ্গীরও মিশেল ঘটিয়েছেন। একটি পুরো বাংলা পঙক্তি ছিল ‘কোথায় যাচ্ছ বরের পোলা’। সমস্যা হলো -- একে কি উলটে অসমিয়া করব? তাতে পাঠক ভাবতে পারেন, আমরা অনুবাদ করতে ভুলে গেছি। তো অসমিয়া আমরা রাখিনি। কিন্তু তৃতীয় সমস্যাটি আরো জটিল। তৃতীয় জিরাফের নাম ছিল ‘চিকুট’। এটিকে যমক অলঙ্কার করে ব্যবহার করেছেন।  ‘চিকুট’-এর অর্থ অসমিয়াতে ‘চিমটি’— এবং ‘চিমটি’ ধরে এর পরে গল্প এগিয়েছে। অথচ বাংলা উচ্চারণে শব্দটি হবে ‘সিকুট’ -- যার আর অন্য কোনো অর্থ হয় না। এই সমস্যাকে আমাদের সমাধান করে এগোতে হয়েছে। কী করেছি সে যথাস্থানে পড়াই ভালো। নবকান্ত লিখেছিলেন, “এই নাটককেইখনত কোনো বিশেষ মূল্যর দাবি নাই।” আমাদেরও এই অনুবাদ নিয়ে একই কথা। একটা পরীক্ষা করা হল, এই মাত্র।


আর হ্যাঁ, ছবিগুলো এঁকে দিয়েছেন দুর্লভ ভট্টাচার্য। সুকুমার রায়ের রচনাগুলোর মতোই এই ছবিগুলো ছাড়া নবকান্ত বরুয়ার রচনাও অসম্পূর্ণ। বাংলার পাঠকের অবশ্য তাঁর রচনাগুলো পড়লে উপেন্দ্র কিশোর, সুকুমার রায়দের মনে পড়বে। রবীন্দ্রনাথ সহ এঁদের কাছে ঋণ নবকান্ত স্বীকার করেন। বর্তমান সংকলনেও ভূমিকা লিখতে গিয়ে বীরেন্দ্রনাথ দত্ত সেসব বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। আমরা যেন মনে রাখি, উপেন্দ্র কিশোর এবং সুকুমার রায়েও লুই ক্যারল সহ বহু পশ্চিমা লেখকের প্রেরণা কাজ করছিল, নবকান্তেও তার ব্যতিক্রম ঘটে নি। তার সঙ্গে শুধু তাতে বাংলার ঐতিহ্যের সংযোজন ঘটেছে। তার পরেও সুকুমার রায়েরই মতো নবকান্তের রচনা তাঁর নিজেরই রচনা, মৌলিক। ‘কোনো কবি বা কোনো শিল্পী সম্পূর্ণ এককভাবে অর্থপূর্ণ হ’ব নোয়ারে।’ বীরেন্দ্রনাথ দত্তের এই কথাটি মনে রেখে যদি এই একক অনুবাদ নবকান্তের বাকি রচনাতে প্রবেশে আগ্রহ বাড়ায় তবেই আমাদের এই পরীক্ষা, এই  শ্রম সফল।    ---অনুবাদক]       



ধুয়া:  ঝোঁক ঝোঁক ঝোঁক ঝোঁক
পীঁ পীঁ পীঁ পীঁ
রেল চলে চলে রেল
             কেন্নো পোকার রেল চলে পাঞ্জাব মেল।

বিছা: মাকড়ি দি গো মাকড়ি দি;
বলছি তুমি, বাড়ি আছো কি?

মাকড়সা: না থেকে ভাই  কই বা যাব,
             তাঁত মেলানো, কই বা থুব?
বিছা: কী বা তুমি বুনছ দিদি?
মাকড়সা: আয় তোরে ভাই দেখিয়ে দি,
               ...... ফুল
বিছা: তোমার জন্যেই এনেছিলাম এক লাছি উল।
মামার  ছেলেকে দিতে  সোয়েটার চাই।
মাকড়সা: আগে কেন বলিস নি রে, ভাই?
   পরশু দেখ, লাগিয়েছি এইখানা তাঁত
   বাতাসে ছিঁড়ল কিনা সুতোটার গাঁট
             এক মাথা টানি যদি আর মাথা ছিঁড়ে
      আগেকার মতো যদি কিছুতেই জুড়ে।
বিছা:  আগের মতো লাগলে তবে,---  হবে
মাছিরাম কেরানিকে খবরটা তো দেবে।
কী দারুণ গো, কী দারুণ! নকল করা জানে
আমরা কী গো! মানুষই তো দেখে হার মানে!
মাকড়সা:  চল̖ , তবে কেন্নো রেলে ওর খবরে যাই।
মাছিরাম কেরানিটাকে কই বা গিয়ে পাই?
বিছা এবং
মাকড়সা: কেন্নো পোক ঝোঁক ঝোঁক, এই র্যা্লা!
দাঁড়াও দেখি,যাচ্ছ কোথা নবাব পোলা?
কাপলিং ছেঁড়া দেখি পাঞ্জাব মেল
ঠেল রে  গজরা, ইঞ্জিন ঠেল!
ধুয়া:   ঝোঁক ঝোঁক ঝোঁক ঝোঁক
পীঁ পীঁ পীঁ পীঁ
রেল চলে চলে রেল
চলে পাঞ্জাব মেল।

                                              কেন্নো:  যাবে যদি, খোলো সাহেব
                        কালো ওভার ক’ট;
         মেমও ছেঁড়ো লাল রশি
                        লাগবে  চাকায় জট ।
                        করো না কো ঠেলা ঠেলি
                        ডান হাতে টিকিট কিনে
                                                              বাম হাতে দোয়ার মেলি
                                                              নাও গো বসার সিট চিনে।
                                                              গল্প করো, আলাপ করো,
                                                              কার পরিচয় কী?
                                                              পি পি পি!
                                                              মিষ্টি কথায় তুলে ধরো।
                                                              অচেনা কোনো প্যাসেঞ্জার
                                                             নিয়ে আমি  যাই--
                                                              এমন কোনো  কারবার
                                                             আমার তো গো নাই।
 বিছা:      ইনি মিসেস মাকড়ি দিদি তাঁত বুনেন ভালো।
চরকা নেই, মাকু নেই অন্ধকার বা আলো।
চিকন করে সুতো কাটেন,তাঁত বুনেন বসে
              পাড়া পড়শি কেউ শোনে না সাড়া শব্দ এসে।
              রান্না করা নেই, নেই তেল  মশেলা
              লিকুইড ডায়েটে  রোজ চলে  দু’বেলা।
মাকড়সা: একে তো চেনোই, নাম শ্রী বিছাধর
   গায়ে কালো সোয়েটার বরসা ঋতুভর।
  সরু গলা, যায় না খোলা
এ নিয়েই পথ চলা।
সবাই: এভাবেই যাই তবে, চলো!
কী বলো ভাই, কী বলো?
কেন্নো: যাই তবে এভাবেই
ওঠো,আছো যেভাবেই।
আগে গিয়ে বলে দিও,নেমে যাবে কই!
মাকড়সা: মাছিরাম মশায়ের বাড়িমুখে অই!
কেন্নো: কে সে মাছিরাম?
           কীই বা ভালো নাম?
             নীলচে
             না কালচে,
             বোতলা না মৌ,
            না ঐ  আদরের কুনকুনি বৌ
            ফলে ফলে ডিম পাড়ে,
                  বাকিদের বাড়িঘর ---
                    কে  চেনে  কারে!
মাকড়সা: আম ঝুলে ডালে ডালে
   নীল মাছি পালে পালে
   যেখানে মানুষ থাকে
   মাছি ঘুরে ঝাঁকে ঝাঁকে।
বিছা: এ মাছি  গো, সে মাছি না;
           কাঁঠালের আঠাতে তার পাখা লাগে না।
           আসলে কী গল্প জানো,
   বলি তবে,মানো কি মানো।
   মাছিমরা ছিল তার নাম,
   তখনো জন্মে নি তো রাম।
   যখন মরা মরা চেঁচিয়ে,
   উঁইঢিবি গুড়িয়ে
   বেরিয়ে রত্নাকর,
               লেখে রামায়ণ
               আমাদেরও মাছিবর,
   মাছিরাম কেরানিতে পেলো প্রমোশন।
কেন্নো: ঠিক আছে, ঠিক হ্যাঁয়!
দেখি, গাড়ি কই যায়!
উঠে যাও এইবার
আমিই ইঞ্জিন,আমিই ডেরাইভার!
                         ধুঁয়া নেই, ধূলি নেই
                         লাল এক রেল...
                         ঠেল রে গজরা, ইঞ্জিন ঠেল! 

ধুয়া:   ঝোঁক ঝোঁক ঝোঁক ঝোঁক
পীঁ পীঁ পীঁ পীঁ
        রেল চলে চলে রেল
                        কেন্নো পোকার রেল
                        চলে পাঞ্জাব মেল!

বিছা:        আরে! এ যে আরো আছে প্যাসেঞ্জার
               রকম রকম কত রকম দেখো ফ্যাশন যার।
         ইনি মিস্টার গো বরুয়া, তাঁর ভাঙা মটর গাড়ি।
মাকড়সা: কলকাতা যাবেন বুঝি, হবে রিপিয়ারি?
কেন্নো: এ যে দেখি শিরি যুক্ত পি পিঁপড়া বাবু
             জংলি শসার বিচি লেগে হলেন বুঝি কাবু?
বিছা:        পি পিঁপড়া? নাম শুনি নি। কোথায় নিবাস?
কেন্নো:       পি কক্, পি হেন্ ---এদের পাশাপাশি বাস।
             সোনা পিঁপড়া, ডাঁই পিঁপড়া, পিঁপড়া আছে কত!
             লিখেছে এদের কথা শাস্ত্র আছে যত।
             কলহ না করে যেন কর্ম করে খায়,
             শিরি কিষ্ণ শেখালেন-- গীতাতে বাখায়!
               সব পিঁপড়া মিলে নিল পি পিঁপড়া নাম।

সবাই: বলো রাম রাম!
               উঠে যাও, উঠে যাও! কথায় কী কাম? 

ধুয়া:   ঝোঁক ঝোঁক ঝোঁক ঝোঁক
পীঁ পীঁ পীঁ পীঁ
            রেল চলে চলে রেল
                        কেন্নো পোকার রেল
                     চলে পাঞ্জাব মেল!

পিঁপড়া:  কে কে শুনবে বলো, মজার কিইচ্ছা।
                রূপকথা জানি বেশ, শোনাই যত ইচ্ছা।
মাকড়সা:  কিচ্ছা জানো! বেশ!
    সেই যে রাজা ছিল, গোধার দেশ!
বিছা: নইলে,সেই যে ছিল রাজহাঁস এক,
সোনার ডিম দিত। প্যাঁক প্যাঁক প্যাঁক!
নতুবা সেই বুড়ো
কচু খেতে সারা দিন মাটি গুড়ো গুড়ো...
পিঁপড়া: সেসব কথা,কথা কি এমন
অং বং চং
এ মন তালাসি, পেয়েছি নূতন
গল্প বলার ঢং।
 গোবরে  পোকা: বলো বলো বলো! কিসের ঢং?
                        চিনের যাদু বুঝি, চিং চাং চং !
                  নাকি সেই আলাদিনের  আশ্চর্য বাতি,
                        কেঁচোমাটি সন্ধানে হাম কলকাতা যাতি।
                  দৈত্যটা শিখেছে কি নতুন কেরামতি?
                         রেডিয়েটার হয়েছে লিক, চাই মেরামতি।
পিঁপড়া:       এক ছিল বন্ধু
              তার ছিল সন্দুক।
গোবরে পোকা: সন্দুকে বন্ধু থাকা কাহানি নেই মাঙতা।
পিঁপড়া: আরে, বলা ভুল হয়েছে,
                কী যেন,প্যাঁচ লেগেছে।
                 এইবার গল্প বলি, একদম টাটকা!
                 নেই কোনো ফাটকা।
                এক ছিল বন্দুক,
                না ছিল সন্দুক।
                 বন্ধুরা প্যাঁচিয়ে দিল রাং রাং রাং তা।
                  তবে বুঝো এইবার
                 কিছু কর কানটার।
                  কালো কচু তুলে এনে কান করো সাফ।
                  চিড়িয়াখানায় যেয়ে
                 তামোল পান  খেয়ে
                  একা একা  চরছিল তিনটি জিরাফ।
সবাই: জিরাফ!
পিঁপড়া:       হ্যাঁ, জিরাফ!
স্বরটা ভীষণ রাফ।
সারাটা শরীর ভরে তুল তুলে পাফ।
কপালে রয়েছে এক ছোট ফুট নোট
ওরা যে  বংশের, তার নাম হলো কূট।
সবাই: জানি, জানি, সেতো জানি!
মাটিতে গজায় লংকা ধানি।
কূট বংশ মহা বংশ
চাণক্যের অংশ
চিত্রকূটের সরোবরে
চরে পরম হংস।
গোবরে পোকা:      প্রথম জিরাফের নাম কি বা কূট,
বিসকূট, মিসকূট না কিসকূট?
পিঁপড়া: কেবলই ই কুট!
ওর ভাই সই করে
মিস্টার বি কুট।
তারও যে ছোট ভাই
  মিস্টার চি কুট।
ইকুট বিকুট  ভাই
তামোল পান খাই
জিহ্ব দেয় পুড়িয়ে
পাণ মশলা কুড়িয়ে
পায় কই---
                        যায় তার সন্ধানে।
কেবা বলো, জুড়ায় জ্বালা  মন দানে!
বাড়িতে তখন বসে   কোন কূট?
বাতাও ভাই, বাতাও দেখি! কোন কূট?
সবাই: সিকুট  সিকুট চিকুট!
পিঁপড়া: চিকুট! অসমিয়া চিকুট ।
                     চিকুট মানে চিমটি।
                        খাও, পাও টেরটি।
                                     ( পিঁপড়া সবাইকে চিমটি কাটে।
বিছা: আরে আরে আরে! পি পিঁপড়া  চিমটি কাটো কেন?
পিঁপড়া: আকাশ কেন নীল,পাহাড় কেন খাড়া? জানো না যেন!
লবণ জলে উঠেনা কেন সাবানের ফেন্?
চিমটি দিলে বাচ্চারা হে করে ঠেন্ ঠেন্!

বিছা: খবরদার! আমায় যদি কাটো!

তবে এই যে ফুলের ঝাড়ু,
  আমার গায়ে দেখ̖ছো, গাড়ু!
ছিঁড়ব তোমার পিঠে, দেখি কেমন করে ঝাঁটো।
মাকড়সা: পি  পিঁপড়া কেটে দিল। আনো রে আনো, টিংচার।
গোবরে পোকা: গো বরুয়াকে কাটিস যদি হবি তবে পাংচার।
পিঁপড়া: এসব এখন রাখো,
     কেন্নো রেলটা দেখো।
                                                         সবাই ওকে চিমটি কাটো, কুট!
    ইকুট বিকুট চিকুট। কাট কুট কুট!
সবাই:        হেইও!  হেই! উঠ উঠ উঠ!
    চিকুট চিকুট চিকুট!
 কেন্নো: খবরদার! খবরদার!
    পিপিলিকা খবরদার!
                 খবরদার বিছাধর!
                  মাকড়িদি নট নড়াচড়!
                 এতোক্ষণ ছিলাম রেল
                 খেলছিলাম মজার খেল
                    জানো না কি, পূর্বপুরুষ আমার অষ্টাবক্র
    গা প্যাঁচিয়ে হচ্ছি দেখো সুদর্শন চক্র।
মাকড়সা: আমার সুতা ছিঁড়িল
বিছা:              আমার জামা ফাটিল
গোবরে পোকা:  আমার পাখা ঝরিল
পিঁপড়া: আমি হলাম চ্যাপেটা। এখন কী করি লো! 
সবাই: বাঁচাও ! বাঁচাও!   হে অষ্টাবক্র পুত্র।
          চক্র যদি না মেলে দাও, পালাই তবে কুত্র?
কেন্নো: বেশ!
                 তবে চিমটিও যেন হয় শেষ!
                 উঠে এসো, উঠে বসো ! চালাই আবার রেল।
                 গার্ড বাবু বাজাও হে! বাজাও হুইসেল।   
ধুয়া:   ঝোঁক ঝোঁক ঝোঁক ঝোঁক
পীঁ পীঁ পীঁ পীঁ
                  রেল চলে চলে রেল
                        কেন্নো পোকার রেল
                        চলে পাঞ্জাব মেল।


                         ~~~~~০০০~~~~~

 
 
    


মঙ্গলবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

হরেন্দ্রনাথ বরঠাকুর এবং তাঁর শিশু নাটক

।। সুশান্ত কর।।

(গত ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭তে তিনসুকিয়ার 'উজান সাহিতো গোষ্ঠী' এক সভাতে হরেন্দ্রনাথ বরঠাকুরকে সংবর্ধনা জানায়। সেখানে এই শিশু সাহিত্যিক তথা নাট্যকারের জীবন এবং কর্মের পরিচয় দিতে গিয়ে এই বক্তৃতাটি তৈরি হয়ে যায়। মূল অনুষ্ঠানে এর একটি সংক্ষিপ্ত বয়ানই পরিবেশিত হয়েছিল। এখানে রয়েছে সম্পূর্ণ এবং বিস্তৃত )



“আমার নাটকগুলো সত্যি নাটক হয়েছে কি হয় নি, সে নিয়ে আমার নিজেরই সন্দেহ আছে। প্রত্যেকটি নাটকই তাগাদাতে লেখা। অভাব আর চাহিদা পুরাতে লেখা। লেখে উঠে, বা মঞ্চায়ন দেখে আমি সবসময় ভীষণ একটা অসন্তুষ্টিতে ভুগী। জানি না কিসের তাড়নাতে নাট্যপীঠ বা প্রশান্ত শর্মা আমার নাটকগুলো এতো যত্ন করে রেখেছেন---যে কাজগুলো কিনা আমি নিজেও করবার দরকার মনে করি নি। কেনই বা তিনি এই সংকলন এতো কষ্টে আর শ্রমে প্রকাশ করতে গেলেন, সে আমার কাছে একটি উত্তর বিহীন প্রশ্ন হয়েই আছে। আমার ভয় হচ্ছে, এই সমস্ত শ্রম এবং আন্তরিকতা সুধী সমাজের বিচারে শেষঅব্দি একমুঠো নষ্ট ফসলে না পরিণত হয়। সেরকম হলেও আমার দিক থেকে খেদ করবার কিছু থাকবে না। সে আমার অজ্ঞতা, বৌদ্ধিক সীমাবদ্ধতা এবং অপরিপক্বতা বলে দ্বিধাহীনভাবে মেনে নেব।” কথাগুলো আমরা অনুবাদ করে নিয়েছি। লিখেছিলেন   হরেন্দ্রনাথ বরঠাকুর তিন বছর আগে তাঁর ‘শিশুনাট সমগ্রে’।  তিনি আরো লিখেছিলেন, “নাট্যকার হবার ধৃষ্টতা আমার কোনোদিনই ছিল না, এখনো নেই। ছাত্রবেলা এবং যৌবনবেলাতে লেখা বহু নাটক আমি নিজেই নষ্ট করে ফেলেছি...” ---এই সব উচ্চারণ যার তিনি এবারে ২০১৭তে অসমীয়া শিশু সাহিত্যে, তথা নাটকে জীবনজোড়া অবদানের জন্যে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। আর কথা গুলো লিখেছিলেন তিনবছর আগে প্রকাশিত তাঁর নাট্য সমগ্রে। শিবসাগরের ‘নাট্যপীঠে’র হয়ে বইটি সম্পাদনা করেছিলেন নাট্যপরিচালক, প্রশিক্ষক, অভিনেতা প্রশান্ত শর্মা।  আপনাদের মনে হতে পারে আকাদেমি পুরস্কার বুঝিবা নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তাঁর ধারণাকে প্রথমবারের জন্যে ভ্রান্ত প্রমাণ করে দিল। এমন ভ্রান্তি আমাদের অনেকরই হয়ে থাকে। বুঝিবা স্বীকৃতি একটি প্রতিষ্ঠান দিলেই দেয়া হলো। আসলে ততদিনে তাঁর নাটক সারা অসমেই বহুবার অভিনীত হয়ে গেছেই। অধিকাংশেরই উদ্যোক্তা এই নাট্যপীঠ এবং পরিচালক প্রশান্ত শর্মা। কিছু নাটক করেছিল উত্তরলখিমপুরের ‘নাবিক’ নাট্যগোষ্ঠী। তাদের দরকারে তাঁরা নাটক চেয়ে গেছেন, আর হরেন্দ্রনাথ বরঠাকুর লিখে গেছেন। ১৯৯৬র ১লা জানুয়ারিতে আরেক প্রখ্যাত নাট্যকার সফদর হাসমির মৃত্যুদিনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নাট্যপীঠ। সেই থেকে তাঁদের অধিকাংশ নাটকই লিখেছেন হরেন্দ্রনাথ বরঠাকুর। কেবল ‘রজার দেউল’ এই একটি নাটকই বিশের বেশিবার অভিনীত হয়েছে। বাকিগুলো মিলিয়ে কবার অভিনীত হয়েছিল আমরা একটা অনুমান করে নিতে পারি। দর্শক সমালোচকেরা যদি ইতিমধ্যে নাটকগুলোর সমাদর না করতেন, তবে তাঁর লেখা নাটকগুলোর থেকে দশখানা নাটক এখান ওখান থেকে সংগ্রহ করে নিজে উদ্যোগী হয়ে প্রকাশ করতে উৎসাহী হতেন না প্রশান্ত শর্মা। তিনি ভেতরে কী কষ্ট করেছিলেন আমরা শুনেছি, দেখিনি। কিন্তু বাইরে আমরা দেখেছি কত শুভানুধ্যায়ীর থেকে পাই পাই করে অর্থ সংগ্রহ করে ব্যয়ভার সংগ্রহ করেছেন। এবং প্রকাশ করেছিলেন ২০১৪র ফেব্রুয়ারির এক বিকেলে তিনসুকিয়া মহাবিদ্যালয়ে এক গুণীজন সমাবেশে। তাঁর পরেও যখন নিজের এই সব অসন্তুষ্টির কথা তিনি ‘নাট্যকার’ আমাদের জানান, তাকে নিছক ‘বিনয়’ বললে তাঁর অসম্মান করা হয়। তিনি অন্তর থেকে জানেন, শিল্পীকে যখন নিজের কাজে সন্তুষ্টি আর দম্ভে পেয়ে বসে তখনই তাঁর ‘যবনিকা পতন’ হয়। নিজের ‘সীমাবদ্ধতাটি’ জেনে একটি অসন্তুষ্টি তাঁর মনে কাজ করে বলেই তিনি মহৎ নাট্যকার, মহৎ শিল্পী। এটা যে কোনো নবীন শিল্পীর কাছে শেখার জিনিস।
            তবে এখানে জানিয়ে নিই, যে বইটির কথা আমরা উল্লেখ করলাম এটিই তাঁর নাটক নিয়ে জীবন জোড়া কাজ নয়। জনপ্রিয় প্রকাশনা সংস্থাগুলো আজঅব্দি তাঁর দিকে যে খুব একটি নজর দিয়েছে, সেরকম আমরা দেখিনি। কিন্তু নিতান্তই আত্মীয় বন্ধু বা নিজের প্রয়াসে প্রকাশিত  তাঁর রচনার সংখ্যা নিতান্ত কম নয়।আটটি পথ নাটক, বেশ কিছু একাঙ্কিকা, দুটি পূর্ণাঙ্গ নাটক লেখা ছাড়াও শিশুনাটক নিয়ে তাঁর সুগভীর তাত্ত্বিক অধ্যয়নের খতিয়ান রয়েছে ‘প্রসঙ্গ অসমীয়া শিশু-নাট্য’ নামে একটি প্রবন্ধ সংকলনে, যেটি অসম সাহিত্য সভার তিনসুকিয়া শাখা প্রকাশ করেছিল ২০০৫এ। ‘খরিয়ে মেলিলে বাট’,‘কণ পরুয়ার বিলৈ’ সহ বেশ কিছু শিশু উপন্যাস, বেশ কিছু কবিতাও তিনি লিখেছেন--- যদিও সেগুলো বই আকারে বেরিয়েছে বলে কোনো সংবাদ আমাদের কাছে নেই।তাঁর লেখা বহু প্রবন্ধপাতি অসমিয়া –বাংলা ছোটকাগজে,স্মরণিকাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। বহু অনুবাদও তিনি করেছেন।ভগৎ সিংহের সুবিখ্যাত বই তাঁর অনুবাদে ‘মই কিয় নাস্তিক হলো’ নামে দশকখানিক আগে প্রকাশিত হয়েছিল। এখন তিনি ব্যস্ত রয়েছেন সুকান্ত ভট্টাচার্যের শিশুরচনাগুলোর অনুবাদে। এই সব কাজের জন্যে ইতিমধ্যে বেশকিছু পুরস্কারেও সম্মানিত হয়েছেন। তবে শেষ প্রকাশনা অবশ্যই ‘হরেন্দ্রনাথ বরঠাকুর শিশু-নাট সমগ্র’। এবং এই বইটি থেকেই তাঁর দিকে আকাদেমির নজর পড়ে। তাই আমরা সেটি নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই, যাতে তাঁর কাজের সম্পর্কে কিছু ধারণা মেলে।
           দশখানা নাটক। তার প্রথমটি ‘প্লেটফর্ম’ এবং ‘একলব্যর বিচার’ ছাড়া বাকি প্রত্যেকটিই বলতে পারি স্পষ্টতই রূপক নাটক। কারণ সেগুলোতে জীব-জন্তু গাছপালা সবাই চরিত্র এবং তারা নিজেদের মধ্যে এবং শিশুদের সঙ্গে কথাও বলে, কাজও করে। এমন কি একটি নাটকে ‘পলরীয়া প্রতিধ্বনী’তে  ‘প্রতিধ্বনী’ও কথা বলে। প্রতীকের রূপকথা উপকথার আদল রয়েছে প্রায় সবকটিতে।  কিন্তু এর একটিও অবাস্তবও নয়, নয় পৌরাণিকও।
     
    ‘প্লেটফর্ম’ নাটকটিকে আপাতদৃষ্টিতে একটি ‘বাস্তববাদী’ নাটক বলা যেতে পারে। নয়টি দৃশ্যে রেলস্টেশনের প্লেটফর্মের ভবঘুরে দরিদ্র শিশুদের গল্প। তাদের কেউ স্টেশনেই গান করে হাত পেতে পয়সা রোজগার করে, কেউ বুট পালিশ করে, কেউ সামান্য টাকার বিনিময়ে সিনেমার পোস্টার সাঁটে শহরের দেয়ালে দেয়ালে। এদের রোজগার যত্রতত্র, কিন্তু মাথা গুঁজবার ঠাই এই স্টেশন প্লেটফর্ম। তাদের জাতধর্মের কোনো ঠিকানা নেই। ‘রানি’ বলে মেয়েটিকে দলনেত্রী বানিয়েছে। রোজগারের টাকা সবাই এসে ওকে দেয়, সে হিসেব করে ওদের ‘সংসার’ সামাল দেয়। আর পি এফ, স্টেশন মাস্টার, বাইরের দুনিয়ার বাবুদের উপেক্ষা, অবজ্ঞা, অত্যাচারে জীবন কাটে।সন্ত্রাসী আক্রমণে রেলবন্ধ হলে এরা বিপন্ন হয়, যাত্রী নেই। ফলে রোজগার জোটে না। জোটে না খাবার। বাইরের শহরে সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা হলেও যেমন জীবন যাপন করা কঠিন হয়, তার উপরে প্রশ্ন উঠে এদের কার ধর্ম বা কী? সাংবাদিক যতীন এদের বন্ধু হয়, দলের সদস্য হয়। তাদের লিখতে পড়তে শেখায়, গাইতে শেখায় নতুন গান। এবং শেষে প্রতিবাদ করতে। এবং নাটকের শেষে এদের টিকিট কেটে রেলে চড়িয়ে পাঠায় অন্যান্য প্লেটফর্মে গিয়ে তাদের মতো যেখানে যত পথশিশু রয়েছে তদের সংগঠিত করতে। এমন করে পথশিশুদের সংগঠিত করা সম্ভব কি না, যখন কি না স্টেশন কর্তৃপক্ষই এদের স্টেশন থেকে তাড়াতে চাইছে, তখন মধ্যবিত্ত যতীন মামার এই পদক্ষেপ অসচেতনভাবে হলেও কর্তৃপক্ষের কাজটিই সহজ করে দিল কি না  খুব কট্টর বাস্তববাদী তথা যৌক্তিক অবস্থান থেকে এই প্রশ্ন উঠতেই পারে। কিন্তু যদি প্রশ্ন করি, একটি সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখা এবং দেখানোর এই ভিন্ন নাট্যকারের সামনে কী পথই বা খোলা ছিল, তখন এইটুকুন খামতি বাস্তবতার দিক থেকে আমাদের মেনে নিতে বেগ পেতে হয় না।
                  বাকি নাটকগুলোতে সেই সমস্যা নেই। প্রতীকী নাটক দুরকমের হয়ে থাকে। এই যেমন রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ আদি হচ্ছে সাঙ্কেতিক নাটক। সেখানে  রাজা-নন্দিনী-রঞ্জন ইত্যাদি চরিত্রগুলোর মর্ম দর্শকের বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে নাট্যকারের ভাবনার সঙ্গে আলাপ না থাকলে। যদিও নাট্যকার ক্রমেই কিছু স্পষ্ট করেও থাকেন, কিছুটা দর্শকের বোধের উপরে ছেড়ে দেন। হরেন্দ্রনাথ বরঠাকুরের নাটকগুলো সেই অর্থে সাঙ্কেতিক নাটক নয়। এগুলোতে মানবেতর প্রাণী, জড় পদার্থ এমন কি প্রাকৃতিক ঘটনাতেও মানবিক চরিত্র আরোপ করেছেন তিনি। সেই অর্থে এই সব উপস্থাপনাকে অবাস্তব বলে মনে হতে পারে,কিন্তু নিজেদের অন্তর্বস্তু নিয়ে চরিত্রগুলো এমন কি কল্পিত কাহিনিও অনেক বেশি বাস্তব হয়ে উঠে। এই ব্যক্তি-বস্তু বা ভাবের বিশেষ কোনো মর্ম এমনিতে স্বাভাবিক অবস্থাতে আমাদের কাছে স্পষ্ট ধরা নাও দিতে পারে, নাট্যকার তাই স্পষ্ট –রূপময় এবং বাস্তব করে তুলেন।  হরেন্দ্রনাথ বরঠাকুরের বাকি সব নাটক এই গোত্রের,অর্থাৎ যাকে বলে রূপক নাটক। অবশ্য শিশুনাটকে এই রূপক আশ্রয়ের একটি অন্যতর ব্যাখ্যা হরেন্দ্রনাথ বরঠাকুরের রয়েছে, যার সঙ্গে আমাদের বিদ্যায়তনিক পরিচয় সাধারণত কম হয়। সেসব তিনি লিখেছেন ঐ ‘প্রসঙ্গ অসমীয়া শিশু-নাট্য’ বইতে। সেখানে তিনি ১৮ বছর অব্দি শিশুদের বয়স ভেদে মানসিক অবস্থা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। এবং লিখেছেন,  তিন থেকে পাঁচ বা ছয় বছর বয়স অব্দি শিশুরা বিমূর্ত ধারণা করতে পারে না। অর্থাৎ মানুষে পশু পাখিতে তফাৎ সেরকম করতে পারে না। পশুপাখির কথা বলা তার কাছে খুবই স্বাভাবিক বলে মনে হয়।মানুষের পিঠে পাখা জুড়ে দিয়ে পরি বানিয়ে ফেললে শিশু তাকে অবাস্তব বলে মনে করে না। ফলে শিশুর দিকথেকে নাটকগুলো রূপক নাহয়ে হয়ে পড়ে বাস্তব। এই বয়সের শিশুর মধ্যে ‘অনুকরণপ্রিয়তা’ প্রবল থাকে। ফলে সে বড়দের আচরণ অনুকরণ করে। পুতুল নিয়ে রান্নাবাটি খেলে, পুতুলকে খাইয়ে দেয় ঘুম পাড়িয়ে দেয় ইত্যাদি। হরেন্দ্রনাথ বড়ঠাকুরের নাটকে সেভাবে পুতুল খেলা দেখব না। কিন্তু এই অনুকরণপ্রিয়তার কথাই মনে হয় তিনি ভেবেছেন যখন বেশ কিছু নাটকে আমরা দেখব শিশুরা আদালত বসিয়ে দিয়েছে, প্রতিবাদী বা শোক সভা করছে। সাত থেকে চৌদ্দ-পনেরো বছরের শিশুদের প্রবণতা হচ্ছে সমবয়সীদের মধ্যে দল গঠন, দলের প্রতি আনুগত্য। ফলে বহু নাটকেই দেখব শিশুরা দল বেঁধে করছে যা করবার, প্লেটফর্মে সবাই দলনেত্রী রানির আনুগত্য মেনে নিয়েছে।যাই হোক, আমরা তাঁর নাটকে চলে যাই।  
             দ্বিতীয় নাটক ‘বালিমাহীর কথা’ নাটকটি তৈরি হয়েছে গল্পের ভেতরে রয়েছে গল্প দিয়ে। মূল গল্পটির শুরু একটি বাস্তব গল্প দিয়ে যেখানে পপী-পিঙ্কুমণি-মাইনারা একটা খোলা জায়গাতে খেলছিল। কিন্তু কী খেলা হবে সেই নিয়ে ওদের মধ্যে তর্ক বাঁধল, জায়গাটি খেলার জন্যে উপযুক্তি বিবেচিত হলো না। ফলে তারা শিশুসুলভ ঠাট্টা তামাসা করে নিজেরাই রেল হয়ে ‘ঝক-ঝক রেলগাড়ি চলে রেলগাড়ি’ গান গেয়ে ‘কণখুড়ার’ বাগিচাতে গিয়ে উপস্থিত হয়। সেখানে গিয়ে বাগিচার বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে এরা বড় মর্মাহত হয়। গাছগাছালি কেটে ফেলা হয়েছে। ভাঙ্গা পাখির বাসা ইত্যাদি দেখে এরা বেশ মর্মাহত হয়। ফলে তারা কি কিছুই খেলল না? অবশ্যই খেলল। মৃতগাছগাছালির জন্যে একটি শোকসভা বসালো, সেই সভা পরিণত হল প্রতিবাদী সভাতে। এবং সিদ্ধান্ত হল বাগিচাটিকে জনতার বাগিচা ঘোষণা করে এখানে আবারও বাগিচা সাজিয়ে তুলতে হবে। তারা বাগিচা সাজাচ্ছে, দিন যাচ্ছে। পপীর কিন্তু ভাবনা যে পাখিটির বাসা ভেঙ্গেছিল, সে আবার ফিরে আসবে কি না। একরাতে সে স্বপ্নে দেখতে পেল সেই পাখিটি একটি  ‘বালিমাহী’ অর্থাৎ খঞ্জনা। সবাই জানতে চাইল স্বপ্নে সে কী দেখেছে? সর্বত্র বাসা বাঁধবার জায়গা খুঁজে পাখিটি হয়রান, পাচ্ছে না কোথাও। এবারে সেই স্বপ্নের কথাটিকে নিয়ে পপী এবং বন্ধুরা তৈরি করে একটি নাটকের ভেতরে নাটক, যেটি বিশুদ্ধ এক রূপকাংশ। খঞ্জনা গাছের কাছে যায়, ঘরের কাছে যায়, ঝর্ণার কাছে যায়, পর্বতের কাছে যায়। তার ডিম পাড়বার সময় হয়েছে, বাসা বাঁধবার জায়গা চাই। অথচ, সর্বত্র দূষণে সবাই বিপন্ন , কেউ তাকে নিরাপদ ঠাই দেবার প্রতিশ্রুতি দিতে পারল না। স্বপ্নের কথা ওখানেই শেষ। কিন্তু স্বপ্নে-বাস্তবে এক হয়ে যায়, যখন শেষে ক্লান্ত খঞ্জনাটি সত্যি এসে পপী-পিঙ্কুদের সামনে অচেতন হয়ে পড়ে যায়। তারা তাকে সেই নির্মীয়মাণ বাগিচাতে আশ্রয় দেয়, শুশ্রূষা করে সুস্থ করে তুলে এবং শপথ নেয় এক দূষণমুক্ত পৃথিবীর গড়বার।
            তৃতীয় নাটক ‘জোনমণির স্বর্গযাত্রা’তেও সেরকম নাটকের ভেতরে নাটক রয়েছে। গল্পটি তিনি নিয়েছেন পোল্যান্ডের লেখক আইজাক বাসেভিচ সিঙ্গারের একটি গল্প ‘মূর্খের স্বর্গ’ থেকে। জোনমণি অলকা ভাইবোন। প্রাতিষ্ঠানিক স্কুলশিক্ষাতে জোনমণির কোনো আগ্রহ নেই। তার বোন অলকা ঠিক বিপরীত। জোনমণি ছবি এঁকে প্রজাপতি ধরে, খেলাধুলো করে ভালো পায়। পড়াশোনা করে নয়। ওদিকে বাড়িতে খুব চাপ। তার মন খারাপ হতে থাকে এই বন্দি দশাতে। সে গল্পচ্ছলে ঠাকমার থেকে জানতে পায় যে স্বর্গেই একমাত্র সুখ, কিন্তু সেখানে লোকে না মরে যেতে পারে না। সুতরাং সে মরবে বলে স্থির করে ফেলল, খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিল। কেউ এই অসুখের কোনো কারণ জানে না। প্রতিবেশী এক দাদু রহস্যটি ভেদ করলেন। তিনি স্বর্গ নিয়ে একটি নাটক তৈরি করেন। জোনমণির ঘরটিকে স্বর্গের মতো সাজিয়ে তুলেন। অলকার জনাকয় বান্ধবীদের সাজানো হলো পরি। সেই নাটকে তার এই বোধ হলো যে যত সুখ এই মাটির পৃথিবীতেই। সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিরুদ্ধে কোনো কথা নেই, বটে। কিন্তু প্রতিবেশী দাদুটি যেভাবে নেচে গেয়ে নাটক করে তাঁকে জীবনে শিক্ষাটি দিলেন---তাতে বিকল্প শিক্ষার একটি ভাবনার বীজ তো বপন করেই এই নাটক।
             চতুর্থ নাটক ‘বেলি ওলোয়া সাধু’ সেরকম কেশব মহন্তের একই নামে একটি গল্পের নাট্যরূপ। এর একটি প্রস্তাবনা দৃশ্য রয়েছে, যেখানে ঘোষক বা সূত্রধার কেশব মহন্তের ভূমিকাতে অবতীর্ণ হন, এবং একদল ছেলে মেয়েকে ঘুমিয়ে পড়া সূর্যের ঘুম ভাঙাবার গল্প বলতে শুরু করেন। এই গল্পই ক্রমে নাটকে পরিণত হয়।  সেই নাটকে অলঙ্কৃতা আফ্রিদি ইত্যাদি কচিকাঁচারা বড় চিন্তিত হয়ে পড়ে কী করে সূর্যের ঘুম ভাঙানো যায়, এতো দূর সূর্যের কাছে যায়ই বা কে আর কীভাবে? চিলকে ডাকা হলো।  চিল গিয়ে বাকি পাখিদের কাছে সমস্যাটি তুলে ধরল। তারপরে পাখিদের মধ্যে নানান তর্ক বিতর্ক দ্বিধাদ্বন্দ্বের ছবি যেভাবে নাটকে উপস্থাপিত হয়---সে আমাদের সংগঠন করবার, মহৎ উদ্দেশ্যে ত্যাগ করবার না করবার, ঈর্ষা-বিদ্বেষ, মিথ্যাচারের শিকার হবার অভিজ্ঞতার গল্প। দুঃসাহসিক অভিযানে টিয়া যেমন ফাঁকি দেয়, কোকিল তেমনি প্রাণ দেয়। ময়ূর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। প্রতি যাত্রাতেই জোনাকি ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। শেষে গিয়ে মোরগ সফল হয়। এটি রূপকথারই গল্প। কিন্তু হরেন্দ্রনাথ বড়ঠাকুরের কলমে যেন অন্ধকার থেকে আলোর বিশ্বে যাত্রার মানুষের সংগ্রামের গল্পে পরিণত হয়েছে।

             
পঞ্চম নাটক ‘পলরীয়ার প্রতিধ্বনি’র গল্প অনেকটা সেই ‘বালিমাহীর কথা’র মতোই । সেখানে যদি দূষণে তবে এখানে নগরায়ণে শিশুদের খেলবার ঠাই নেই হয়ে যাবার সংকটের গল্প। গল্পটি জার্মান লেখক ফ্রেডরিখ ফ্লেডের শিশু উপন্যাসের ডব্ল্যু কে হোমসের কথা ইংরেজি  অনুবাদ "রানওয়ে ইকো’র অসমীয়া নাট্যরূপান্তর। ত্রিকূট পর্বতের আকর্ষণ হল সেখানে গিয়ে কিছু বললেই সে কথার তিনবার প্রতিধ্বনি হয়। ফলে সারা দুনিয়ার বহু লোক সেই পর্বতে ভ্রমণ করতে যায়। কমলা ললিতা পপী পিঙ্কিরা সনিয়ারাও পরিবারের সঙ্গে একদিন সেখানে গিয়ে হাজির হল, সঙ্গে গাইড মিঃ হক। কিন্তু আশ্চর্য! সেদিন কোনো প্রতিধ্বনি শোনা গেল না। ক্লান্ত প্রতিধ্বনি ঠিক করেছে সে আর মানুষের বিনোদন করবে না। তার চেয়ে মানুষের দুনিয়াতে নিজেই কিছুদিন ঘুরে আসবে। এর পরে যা সব কীর্তি সে করে তা হাস্যরসের ঝর্ণা বইয়ে দেয় নাটকে। সে সনিয়াদের স্কুলে গিয়ে প্রধান শিক্ষিকার ভূগোল ক্লাসে প্রশ্নের জবাব দেয় , তাও ভুল জবাব। ছাত্ররা বিদ্রূপ করছে ভেবে প্রথমে যদিও তিনি চটেন, পরে রহস্য না ধরতে পেরে খানিক আতঙ্কিত হন।   সনিয়াদের খেলবার জায়গা নেই, রাজপথের পাশে খেলে। সেখানেও সে গিয়ে সনিয়ার মায়ের ভূমিকাতে নামে, মায়ের ডাক ভেবে পথ পেরোতে গিয়ে সনিয়া দুর্ঘটনাতে পড়ে। একটি ট্রাকের নিচে পড়তে পড়তে সে বেঁচে যায়। ড্রাইভার আর সনিয়ার মায়ের সংলাপে প্রতিধ্বনি জানতে পায় পাশেই নিঃসন্তান প্রতাপশালী মানুষ অরবিন্দ চৌধুরীর দেয়াল ঘেরা একটি বাগিচা এমনি পড়ে আছে, যেটি সে খুলে দিলেই শিশুরা বেশ খেলতে পারে। এইবারে সে অরবিন্দ চৌধুরীর পেছনে পড়ে যাতে বাগিচাটি খুলে দেয়। অরবিন্দ চৌধুরী রহস্য ভেদ করতে পুলিশ পৌরসভা সবার শরণাপন্ন হয়। কিন্তু কিছুতেই বাগিচা খুলে দেবে না। এদিকে অদেখা প্রতিধ্বনির জ্বালায় তার আহার নিদ্রা সবই বিপন্ন । শেষে সে বাগিচা খুলে দিতে রাজি হলে প্রতিধ্বনি সনিয়ার থেকে বিদায় নিয়ে আবার সেই পর্বতে ফিরে যায়। মানুষের নগর তার কাছে মোটেও আমোদজনক মনে হলো না, বরং মিঃ হকের মতো মানুষ বেকার হয়ে যাওয়ার বেদনা সে অনুভব করে। হক হঠাৎ আবিষ্কার করেন প্রতিধ্বনি ফিরে এসেছে।  কচিকাঁচারা আবার সেই পাহাড়ে যায়, প্রতিধ্বনি জানায় সে তাদের ভালোবাসে, গান ভালোবাসে। নাটক এখানেই শেষ হয় শিশুদের একটি গানে। সেই গানের আহ্বানটি এরকম: আমাদের মনের কথা পৃথিবীকে শোনাতে তুমি পথ দেখাও প্রতিধ্বনি, মেঘে মেঘে ঢেউ তুলে প্রতিধ্বনিত হোক সেই কথা।
            ‘একলব্যের বিচার’ নাটকটি নামে মনে হয় একালেও কোনো গুরু বুঝিবা  শিষ্যের বুড়ো আঙুল না হলেও সেরকম কোনো দক্ষিণা দাবি করবেন। না শেষ অব্দি সেরকম কিছু হয় না। এই নাটকের গুরু দ্রোণাচার্যের বিপরীত, সুবিবেচক এবং সুবিচারকও। কিন্তু ঘটনা সেই একই, দরিদ্র ছেলে মোহনের ইচ্ছে সে ছবি আঁকা শেখে। কিন্তু উপায় নেই। তাকে এই বয়সেই রোজগার করে খেতে হয়। সুতরাং সে কাজ নিল এক চারুকলা বিদ্যালয়ে। আঁকিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের ব্রাশটা, তুলিটা, ক্যানভাসটা গুছিয়ে রেখে, চা এনে দেয়, বাসনপত্র ধুয়ে দেয়, বিদ্যালয় সাফাই করে। সে বিদ্যালয় থেকে প্রায়ই রং তুলি হারিয়ে যেতে শুরু করলে কৈফিয়ত দেবার দায়টাও ওর উপরেই পড়ে। যদিও কেউ সেরকম অত্যাচার বা গালিগালাজ তাকে করে নি। একদিকে নাটকের রহস্য আর দিকে দারিদ্র্য এবং সততাকে ঘনীভূত করতে তার মতো আরো দু’চারজন বস্তির ছেলেকেও মাঝে মধ্যে নাটকে নিয়ে আসেন নাট্যকার। তারা মাটিকে আঁকিবুঁকি করে, রং নেই ব্রাশ নেই। স্টুডিওর এটা ওটা কৌতূহল বশে ধরলে মোহন তাদের ধরতে মানাও করে। আর ছাত্রী গায়ত্রী এসে ওদের কিছু চাইলে চুরি না  করে  বলে নিয়ে যাবার মধ্যবিত্তসুলভ উপদেশ দিয়ে কিছু রং তুলি দিতে চাইলে, ওদের আত্মমর্যাদাতে বাধে। ওরা না নিয়ে চলে যায়। তা হলে, হারাচ্ছে কী করে?  সুতরাং শিক্ষক রবিন চৌধুরী এক অভিনব অনুসন্ধান প্রক্রিয়া শুরু করলেন,সবাইকে নিয়ে। সেই সবার মধ্যে মোহনও রয়েছে। তার উপরে দায়িত্ব পড়ল, রাতেও সে স্টুডিওতে থাকবে আর নজর রাখবে কে রং তুলি সরাচ্ছে।  দেবজিৎ বলে একটি ছাত্রের আধো আঁকা একটি ক্যানভাস এক সকালে আবিষ্কৃত হল সম্পূর্ণ হয়ে গেছে, এবং ছবি দেখে সবাই মুগ্ধ হয়ে গেল। ছাত্রেরা মনে করে এই কাজ শিক্ষক ছাড়া আর কারো নয়, কিন্তু তিনি দাবি করেন এমন ভালো ছবি তিনিও আঁকতে পারবেন না। সুতরাং সন্দেহ সেই বস্তির ছেলেদের কিংবা মোহনের উপরে ঘনীভূত হল। বস্তির ছেলেরাও ঘটনাচক্রে  সন্দেহের বাইরে চলে গেলে, এক রাতে রবিন চৌধুরী এসে মোহনকে হাতে নাতে ধরে ফেলেন। সে তখন ছবি আঁকছিল। তার ভয় হলো , এবারে তার চাকরিখানা যাবে। কিন্তু সেরকম কিছু হলো না। পুলিশেও দেয়া হলো না। বিদ্যালয়েই একটি নকল আদালত বসল, এবং জানা গেল যে মোহন প্রখ্যাত শিল্পী চন্দ্রকান্ত দাসের ছেলে। যাকে সমাজ তথা বর্তমান শিল্পীরাও স্মরণে রাখে নি।  সুতরাং বিচারের রায়ে স্থির হলো, মোহন এবং তাঁর মায়ের দায়িত্ব এখন থেকে বিদ্যালয় নেবে, সে স্বাধীন ভাবে এই বিদ্যালয়ে থেকেই শিল্প চর্চা করবে। এভাবে প্রতিভার প্রতি সামাজিক দায়বদ্ধতার নাটক হয়ে উঠে ‘একলব্যর বিচার’ । এই সংকলনে এটি দ্বিতীয় বাস্তববাদী নাটক। এইখানে একটি কথা উল্লেখ করা ভালো, তিনি মনে করেন শিশু যেহেতু সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত নয় বা নীতিগতভাবে যুক্ত থাকার কথা নয় ফলে তাদের কোনো শ্রেণি চরিত্র থাকবার কথা ছিল না। কিন্তু শিশু যে পরিবারে বড় হয়ে উঠে সেই পরিবারের শ্রেণিচরিত্র তাকে শৈশব থেকেই পেয়ে বসে। কথাগুলো তাঁর সেই ২০০৫এর প্রবন্ধ বইতে তিনি লিখেছেন। এবং এই নাটকে শিশুদের মধ্যেকার সেই শ্রেণি-দ্বন্দ্বকেও তিনি সুকৌশলে চিত্রিত করেছেন।
            একটি জনপ্রিয় ছড়াগান-- অসমিয়াতে যাকে বলে ওমলা-গীত-- ‘অ’ ফুল , অ’ ফুল নুফুলো কিয়’র নাট্যরূপান্তর ‘নুফুলা ফুলর মালিতা’ । ছড়াটি সরাসরি নাটকে নেই। মাঝে মাঝে বিভিন্ন চরিত্রের সংলাপে ছড়িয়ে আছে। ছোট্ট ছড়া । আমরা অন্য সূত্র থেকে তুলে দিচ্ছি, তাতে ধারণা একটি করে নেয়া সহজ হবে। একই ছড়া লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার ‘এজনী মালিনী আৰু এজোপা ফুল’ রচনাতে খানিক অন্যরকমও রয়েছে   ...
' ফুল অ' ফুল ! নুফুল কিয় ?
-- গৰু‌ৱে যে আগ খাই মইনো ফুলিম কিয় !
' গৰু অ' গৰু ! আগ খ‌া‌ৱ কিয় ?
-- গৰখীয়াই যে মোক নৰখে মইনো নাখাম কিয় !
' গৰখীয়া অ' গৰখীয়া ! গৰু নৰখ কিয় ?
-- ৰান্ধনিয়ে যে ভাত নিদিয়ে মইনো ৰখিম কিয় !
' ৰান্ধনি অ' ৰান্ধনি ! ভাত নিদিয় / নাৰান্ধ কিয় ?
-- খৰিকটীয়াই যে খৰি নিদিয়ে মইনো ৰান্ধিম কিয় !
' খৰিকটীয়া অ' খৰিকটীয়া ! খৰি নিদিয় কিয় ?
-- বৰগছ যে কাতি থৈছো নুশুকাইনো কিয় !
' বৰগছ অ' বৰগছ !  নুশুকা‌ৱ কিয় ?
-- মেঘে যে বৰষুণ দিয়ে মইনো শুকাম কিয় !
' মেঘ অ' মেঘ !  বৰষুণ দিয় কিয় ?
-- ভেকুলীয়ে যে টোৰটোৰাই মইনো নিদিম কিয় !
' ভেকুলী অ' ভেকুলী !  টোৰটোৰা‌ৱ কিয় ?
-- মই কৰো টোৰ টোৰ
   মেঘে কৰে গুৰ গুৰ
   বৰষুণ দিয়ে হুৰ হুৰ

   বোপা-ককাৰ সহজতো মইনো এৰিম কিয় !
             জোনমণি সেউতী শেওয়ালিরা এক সকালে আবিষ্কার করে তাদের প্রিয় সুন্দর বাগিচার ফুলগুলো কেউ খেয়ে গেছে। এরা তদন্ত শুরু করে ফুলকে জিজ্ঞেস করে জানে গরুতে খেয়ে গেছে। কাজলি রাঙলি গরুদের জিজ্ঞেস করে জানে রাখাল কর্তব্যে অবহেলা করাতে খাবার না পেয়ে এরা যা পেয়েছে তাই খেয়েছে... এই ভাবে নাটকের গল্প এগোয়। শেষে একটি বিচার সভা বসে। এবারে এতোগুলো চরিত্রের কাকে আসামী করা যাবে আর কাকে নয় তার বিচারও বেশ চিত্তাকর্ষক ভাবে করিয়েছেন নাট্যকার। দেখা গেল কাউকেই শাস্তি দেয়া যাচ্ছে না, দিলে দিতে হয় ‘অন্যের উপরে দায় চাপিয়ে দেবার মানবিক স্বভাবটিকে’। আর ‘ভেকুলি’ তথা বেঙ যে বলছে, ‘বোপা-ককাৰ’ রীতি সে ছাড়বে কেন একেই বলে ‘কূপমণ্ডুকতা’। হাজার বছরের অভ্যাসকে সে কোনো প্রশ্ন না করে পালন করে আসছে। তার শাস্তি হলো না, কারণ সরাসরি সে কোনো অন্যায় করে নি। কিন্তু শিক্ষার ব্যবস্থা হলো। স্থির হলো ওকে কুয়ো থেকে বের করে সাগরে ছেড়ে দেয়া আসবে, যাতে দুনিয়াটাকে ভালো জানতে চিনতে পায়। শুনেই বেঙ দিল লাফ, ছেলেমেয়েরা পিছু নিল ওকে ধরবে বলে---এমন এক হাস্যরসের দৃশ্যে নাট্যকার নাটকটিকে শেষ করে কেবল যে নাটকটিকে রসসিক্ত করলেন তাই নয়, আমাদের হাজারো কুসংস্কার এবং পারম্পরিক অভ্যাসকে নিয়ে নিজেও যেন খানিকটা হেসে নিলেন। সম্পাদক জানিয়েছেন নাটকটি ইতিমধ্যে জয়ারানি রায় গোয়ালপাড়িয়া ভাষাতে অনুবাদ করেছেন, আর সেখানকার ‘মাটিয়া’ সংস্থা ২০১৩র অক্টোবরে সেটির অভিনয় করে।
            ‘জোন-তরার সাধু’ অষ্টম নাটক। না চাঁদ বা তারার গল্প নয়। জোন , তরা নামে দুই খরগোশের গল্প। নাটকের শেষের দিকে কাকের সংলাপে যদিও রয়েছে ‘জাকেই পরম বল’ অর্থাৎ ‘একতাই বল’---আমাদের মনে হয়েছে ---এটি সত্য। কিন্তু তারও থেকে সত্য সেই বাংলা প্রবাদ ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’। হরিণার সংলাপেও সেই আভাস স্পষ্ট।  ‘বেলি ওলোয়া সাধু’র মতোই এই নাটকেও ঠাকুরদার গল্প বলার আদল দেয়া হয়েছে। জোন তরা ভালুক জাম্ববন্তের আশ্রয়ে ছিল ভালোই। ধূর্ত শেয়ালে সন্ধানে ছিল কবে এদের ধরে খায়। একদিন ভালুক গেল ভাগ্নের বিয়ে খেতে । একহাড়ি মধু রেখে গেল  জোন তরার দায়িত্বে । সেই সুযোগে শেয়াল এসে ওদের আস্থাভাজন হলো কৌশলে । এবং মধুগুলো খেয়ে নিল। ভালুক ফিরে এলে সব দায় চাপিয়ে দিল জোন তরার উপরে। দু’জনে মিলে এদের আক্রমণ করল। কাকের দল ওদের বাঁচিয়ে দিল। কাক এসে নিয়ে গেল ওদের কাছের এক বনে নিয়ে গেল। সেখানে ঝর্ণা আছে, হরিণের মতো তৃণভোজী প্রাণী আছে। আছে ফুল ফল।  সবচাইতে বড় কথা ‘জাকত থাকি হারিলেও/ পাওঁ আমি সুখ, / আটায়ে ভগাই লওঁ/ হাৰি যোৱাৰ দুখ/ মৰিলেও জাকেই হঁও মৰণৰ ভাগী।’
          ‘রজার দেউল’ সেই ‘বালিমাহীর কথা’ বা ‘নুফুলা ফুলর মালিতা’ র মতোই অনেকটা। সেই বিপন্ন প্রকৃতি, বিপন্ন শৈশবের গল্প।  নাটকগুলো ক্রমান্বয়ে পড়ে গেলে একটি ধারণা গড়ে উঠতে থাকে যে শিশুদের তিনি সামাজিক কম, বেশি প্রাকৃতিক জীব হিসেবে উপস্থিত করেছেন। অথবা শৈশবের আড়ালে আসলে প্রকৃতি বিচ্ছিন্ন আমাদের সামাজিকতার প্রতি নাট্যকারের বিক্ষোভ যেন প্রায় প্রতিটি নাটকে ছড়িয়ে আছে।  এই নাটকে সেটি বিদ্রোহের রূপ ধরে। নাটকের নামটি নিয়েছেন, তিনি একটি বিখ্যাত শিশুখেলার ছড়া থেকে। সেই ছড়ার খানিকটা আমরা দিচ্ছি এরকম:  এইটো কাৰ দৌল?/ৰজাৰ দৌল/ভাঙিম নে নেভাঙিম?/নাভাঙিবা/ক’লী-ব’গীক মাতিম নে নেমাতিম?/নামাতিবা।...”
       
   জোন সোন মালতিদের কাছে রোদ আসে দেশবিদেশের রং নিয়ে বিক্রি করবে বলে। বিক্রি আর করে কই? বিলিয়ে দিয়ে যায়। সে যেতেই ওদের হাতের রংও চলে যায়। এবারে , রং পায় কই। অনেক ভেবে এরা নগরের সবচাইতে বড় বাগিচাতে গেল ফুলের থেকে রং নেবে বলে। গিয়ে দেখে সব ফুল অযত্নে নুইয়ে পড়েছে। এরা সেই বাগিচাকে যত্ন করে আবার সজীব করে তুলে। তখনই শুরু হয় রাজ-পুরোহিতের উপদ্রব। রাজার গড়া মন্দিরের জন্যে সব ফুল নিয়ে যাবে। নিয়ে যাওয়া মানে একরকম বাগিচা ধ্বংস করাই। প্রতিবাদ করতে মালিকে বন্দি করে নিয়ে যায়। আবার ‘বেলি’ তথা রোদ আসে। কচিকাঁচারা আবার আশার আলো দেখে। রোদ ওদের প্ররোচিত করে এই রাজার মন্দির ভাঙতে হবে। সে তাদের সেই দেউল ভাঙার মন্ত্র শেখায়। সেই মন্ত্র সেভাবেই এরা উচ্চারণ করে যেভাবে আবহমান কাল থেকে শিশু সমাজে খেলাটি প্রচলিত। কিন্তু শেষে নাট্যকারের সংযোজন...একটি গানে, “ ভাঙো নে নাভাঙো লাগে কিয় সুধিব/ রজার দ’ল ভাঙিবর হ’ল...” তাদের গানের শেষে দেউল ভেঙেই পড়ে। এই নাটকটি নিয়ে সদ্যপ্রয়াত নন্দকিশোর মহেশ্বরী একটি ছায়াছবি করবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু শেষমেষ হয়ে উঠেনি। হরেন্দ্রনাথ বরঠাকুরের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপে জানলাম সেন্সরবোর্ড রাজার দেউল ভাঙবার দৃশ্যে ছাড়পত্র দেয় নি বলে হয় নি। পরিচালক নাট্যকারকে জিজ্ঞেস করলে তিনিও সেই অংশ বাদ দিয়ে এগোতে রাজি হন নি। অসমের বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাংলানাটকে কিন্তু এরকম সাহসী নাটক এখনো দুর্লভ। 
         শেষ নাটক ‘অমাতর মাত’ । ‘ জোন-তরার সাধু’র মতো এও হিংস্র জন্তুর বিরুদ্ধে অহিংস্র প্রাণীদের বিদ্রোহের নাটক। কিন্তু সেখানে আধুনিক রাষ্ট্রের ‘অভয়ারণ্য’ ঘোষণার রাজনীতির প্রসঙ্গটিও নিয়ে এসেছেন। অভয়ারণ্যে জীবজন্তু হত্যা আইনত নিষিদ্ধ হল তো বটে। কিন্তু আইনের ফাঁকে না হিংস প্রাণীর প্রাণী হত্যা বন্ধ হল, না হলো মানুষের হাতে নিরীহ জন্তুর বিপন্নতার কোনো শেষ। বাধ্য হয়ে তৃণভোজী প্রাণীগুলো জোটবদ্ধ হল। সেই বিদ্রোহে মৌমাছি, বোলতা ইত্যাদি সব চাইতে ক্ষুদ্র প্রাণীগুলোর ঐক্য সাহস এবং কর্মদক্ষতা খুব কাজে এলো। ক্ষুদ্র বলে এদের উপেক্ষা না করবার ফলে তৃণভোজী প্রাণীদের সাহস এবং দক্ষতা এতোটাই বৃদ্ধি পেল যে বনরাজা বাঘ তাদের আক্রমণে মৃতপ্রায় হয়ে গেল। কিন্তু বাঘকে মারেন নি নাট্যকার। চরিত্রটি যদিও প্রতীকী , বাস্তব জগতে বিপন্ন প্রকৃতির শিকার বাঘও। তাকেও বাঁচিয়ে রাখার দায় মানুষের। সুতরাং কোনো ভুল বার্তা না যায়, তাই পরিচালককে নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন শেষ দৃশ্যে হয় বাঘকে অচেতন দেখাবার জন্যে কিছু করুন, অথবা বাঁধন ছিঁড়ে পালিয়ে যাওয়া দেখান যেমন তিনি।
         প্রতিটি নাটক একাঙ্কিকা। সবচাইতে বেশি এগার দৃশ্যের নাটক ‘পলরীয়া প্রতিধ্বনি’, আর সবচাইতে ছোট  পাঁচ অঙ্কের নাটক ‘জোন-তরার সাধু’। ‘রজার দেউলে’ কেন কোনো দৃশ্য বিভাজন নেই, সে আমাদের স্পষ্ট হলো না। নাট্যকার বা সম্পাদকের ভুলেও হয়ে থাকতে পারে। হরেন্দ্রনাথ বরঠাকুর একজন কবিও। নাটকগুলোতে অনেক প্রচলিত এবং পরিচিত শিশু পাঠ্য ছড়া, গান, লোককাহিনি, উপকাহিনির আংশিক বা সম্পূর্ণ ব্যবহার আছে, যদিও বেশ কিছু গান কবিতার কথা তাঁর নিজেরই লেখা। নিছক গল্পে বা ভাববস্তুতেই নয়, নাটকগুলোকে রসসিক্ত করে তুলবার যাবতীয় আয়োজন তিনি করেছেন এই সব ছড়ায়, গানে এবং অভিনয় কালে নাচবার সুযোগ করে দিয়েও। এইখানে বলে রাখা ভালো, অসমিয়া আধুনিক শিশু সাহিত্য যদিও মূলত লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার হাতে শুরু, নাটকের শুরু জ্যোতিপ্রসাদে। তাঁর ‘নিমাতী কইনা’ প্রথম শিশুদের জন্যে লেখা কাব্যনাটক।প্রচলিত লোককাহিনি,কিন্তু তিনি নিয়েছেন লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ারই রচনার থেকে। জ্যোতিপ্রসাদের সম্পর্কে হরেন্দ্রনাথ লিখেছেন,“জ্যোতিপ্রসাদের উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বটি হল---তিনি অসমিয়া শিশুনাটকের পরম্পরাগত ধারাটিকে চিহ্নিত করে স্থানীয় উপকরণেই উন্নততর আধুনিক মানের শিশুনাটক সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন। অসমীয়া আধুনিক শিশুনাট্য সাহিত্যের এটিই ইতিবাচক তথা প্রগতিশীল ধারা। এই ধারাটিকে বিকশিত করে নেবার উপরেই অসমিয়া শিশু সাহিত্যের ভবিষ্যৎ আজও নির্ভরশীল।” (অসমীয়া শিশু নাট্যধারার গতি-প্রকৃতি; প্রসঙ্গ অসমীয়া শিশু নাট্য; পৃ:৩৫ থেকে বাংলাতে অনূদিত।) ফলে তিনি নিজে যে সেই ধারারই অনুবর্তী হয়ে কাজ করবেন, সে লেখাই বাহুল্য। শিশু নাটক খুব বড় হওয়া উচিত নয়, মিনিট বিশেকে শেষ হতে পারলে ভালো -- সেসব তাঁর সুগভীর অধ্যয়ন এবং অভিজ্ঞতার থেকে নেয়া সিদ্ধান্ত। সেই সঙ্গে তিনি শিশুনাটক পরিবেশনার সময় মঞ্চ, আলো, শব্দ সংযোজন, দর্শকাসনের ব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়েও সুগভীর অধ্যয়ন করেছেন। যেমন তিনি লিখেছেন, শিশুনাটক পরিবেশনের সময় হল পুরো অন্ধকার করা উচিত নয়। অভিনেতা-অভিনেত্রীকে দর্শকের প্রতিক্রিয়া দেখতে দেয়া উচিত। সেই সব প্রসঙ্গ আমরা নাটকের পাঠ আলোচনাতে বাদ দিতে পারি। কিন্তু তথ্য হিসেবে একটি কথার উল্লেখ মনে হয় থাকা ভালো যে তিনি মনে করেন প্রসেনিয়াম পদ্ধতিতে আদর্শ শিশুনাটক পরিবেশিত হতে তথা বিকশিত হতে পারে না,তার জন্যে পরম্পরাগত লোকনাট্যের অভিনয় পদ্ধতি না হলেও, পথ নাটক পদ্ধতিই ভালো। যদিও তিনি যখন নাটকগুলো লিখেছেন, বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সমঝোতা করেই লিখেছেন,এবং সেগুলোতে মঞ্চনির্দেশনাও ভালোরকমই দেয়া রয়েছে। 


বৃহস্পতিবার, ২২ জুন, ২০১৭

উত্তর স্বাধীনতা যুগের ভারতীয় নাটকের রূপরেখা



প্রাঞ্জল শর্মা বশিষ্ঠ

বাংলা অনুবাদঃ সুশান্ত কর


( মূল অসমিয়া লেখাটি বেরিয়েছিল অসম প্রকাশন পরিষদ প্রকাশিত, মিহির চৌধুরী সম্পাদিত,অসমিয়া ‘সাময়িক পত্রিকা ‘প্রকাশ’-এর আগস্ট, ২০১৫ সংখ্যাতে। পৃষ্ঠা ১৯-২৩। তার থেকে আমরা অনুবাদ করলাম। এমন নয় যে লেখকের প্রতিটি তাত্ত্বিক ধারণার সঙ্গে আমরা সহমত পোষণ করি। যেমন ভারতীয় নাটকের একটি ধারা তিনি লিখেছেন ‘সংস্কৃতীয়া’। আমরা হলে লিখতাম ‘ধ্রুপদী সংস্কৃত’, কারণ প্রাকৃত নাটকও ছিল। সেরকম ঔপনিবেশিক নাটককে মোটাদাগে বাস্তববাদী নাটক বলা চলে কিনা, সেই নিয়ে আমাদের সংশয় আছে। লেখকের পক্ষপাত উত্তর-ঔপনিবেশিক নাটকদের দিকে থাকা সত্ত্বেও বিজয় তেণ্ডুলকারকে ‘সুদক্ষ পশ্চিমা-বাস্তববাদী নাট্যকার’ বলে লেখকও যেন প্রশংসা করলেন, এবং গিরীশ কার্ণার্ড যখন তাঁকে বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ নাট্যকার বলে অভিহিত করেন, লেখক যেন সমালোচনার কিছু পান নি। তদুপরি, তিনি লিখেছেন এক জায়গাতে, ‘লভিতা’র মতো নাটকে সামাজিক সমস্যার পূর্ণ বিশ্লেষণ করা হলো না’ –নাটক প্রবন্ধের মতো সমস্যার বিশ্লেষণের জায়গা কিনা—সেই নিয়েও আমাদের প্রশ্ন আছে। কিন্তু এটি ঠিক যে ঔপনিবেশিক এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতীয় নাটকের এক সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তিনি তুলে ধরেছেন। সেদিক থেকে নিবন্ধটি মূল্যবান। তাই আমরা অনুবাদ করে নিলাম। অনুবাদটি প্রকাশিত হয় উজান , দ্বাদশ সংখ্যাতে  --অনুবাদক   )
ভারতীয় নাটকের পরম্পরা অত্যন্ত পুরোনো। সেই সঙ্গে তার সংস্কৃত, লোক এবং মধ্যযুগে লিখিত---এই তিনটি ধারাও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। সংস্কৃত ধারাটির শ্রেষ্ঠ নাটক ছিল শূদ্রকের মৃচ্ছকটিকমআনুমানিক খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতকে লেখা এই নাটকের কাহিনি ছিল বৈপ্লবিক। নাটকটি ধারাটির অন্য নাটকের মতো রাজারঞ্জক ছিল না---তাতে রাজার বদলে এক দেউলিয়া,কিন্তু উদার এবং ধীরোদাত্ত ব্যক্তিকে নায়ক হিসেবে দেখা গিয়েছিল।নায়িকা হিসাবে রাজগোত্রীয়,কুমারী কন্যার বদলে দেখা গিয়েছিল এক সাধারণ নগরবধুকে।রাজন্যবর্গীয় ক্ষুদ্র সমাজের বদলে সেই নাটকে  উপস্থাপিত হয়েছিল  সাধারণ জনতার বৃহৎ সমাজ।তারউপরে কাহিনি বিন্যাস ছিল অত্যন্ত জটিল অথচ দক্ষতাপূর্ণ।ভাসের চারুদত্তনাটকের কাহিনির সঙ্গে মৃচ্ছকটিকমনাটকের কাহিনির মিল আছে।কিন্তু চারুদত্ত নাটকটি কাহিনি বিন্যাসের দিক থেকে মৃচ্ছকটিকমের সমান উৎকর্ষের দাবি করতে পারে না।মৃচ্ছকটিকমের পাঁচশ বছর পরে,আনুমানিক দশম শতিকাতে সংস্কৃত ধারাটির সোনালি যুগের শেষ হয় যদিও মধ্যযুগে লেখা নাটকের জন্যে---যেমন আমাদের শংকরদেবের নাটকের জন্যে---তার বহু দিক আদর্শ হিসেবে সজীব থেকে যায়।ভারতীয় লোকনাটকের ধারাটি যদিও স্বাভাবিকভাবেই সংস্কৃত ধারাটির থেকে জনপ্রিয় এবং ব্যাপক ছিল-- লিখিত প্রমাণ না থাকার জন্যে তার ইতিহাস জানা যায় নাতবু সাম্প্রতিক কালের লোকনাটকের প্রকার-প্রাচুর্য আর শৈল্পিক ঔৎকর্ষ দেখে খুব সহজেই বোঝা যে এ বিকাশের বহু স্তর বা পর্যায়ের কষটি পাঠরে ঘসা খেয়ে খেয়ে তবে এই পর্যায়তে এসে পৌঁছেছে শঙ্করদেবের নাটকের মতো মধ্যযুগের বহু নাটকে এই ধারা প্রভূতভাবে প্রভাবিত করেছিল।
ভারতীয় নাটকের সংস্কৃত এবং লোক এই দুই ধারার বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল মধ্যযুগের লিখিত নাটককে ভারতীয় নাটকের তৃতীয় ধারা বলতে পারি।এর ঔৎকর্ষ দেখে অবাক হতে হয়।শঙ্করদেবের নাটকের কথাই ভাবা যাক না।তাঁর নাটক এখন ধ্রুপদী নাটকের মর্যাদা পেয়েছে।তিনি ভাসদএবং সামাজিক লোক’ –উভয় শ্রেণির দর্শকের জন্যে নাটক লিখে গেছেন যদিও তাঁর প্রথম এবং অধুনা দুর্লভ নাটক চিহ্নযাত্রাসম্পর্কে যেসব তথ্য মেলে তাতে বোঝা যায় সামাজিক লোকই ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য।বৈষ্ণব (যেমন মাধব কন্দলি) এবং নব-বৈষ্ণব পূর্ব কবিরা (যেমন বাসব) ভারতজোড়া সাধারণ মানুষের জন্যে কাব্য রচনা করেছিলেন।কিন্তু সেই মানুষের জন্যে নাটক রচনার রূপকল্প দেখালেন সবার শুরুতে শঙ্করদেবইএ নিঃসন্দেহে ছিল এক বৈপ্লবিক কাজ।সাধারণ মানুষকে নাট্য-প্রক্রিয়াতে অন্তর্ভুক্ত করবার জন্যে শঙ্করদেবের অন্তরঙ্গ পরিবেশনের রূপকল্প উদ্ভাবন ছিল সবচেবেশি বৈপ্লবিক।স্বাধীনতা উত্তরকালের  ভারতীয় নাট্যজগতে বাদল সরকার যে ধরণের অন্তরঙ্গ থিয়েটারের জন্যে খ্যাতি লাভ করেছেন,তার অনেকগুলো দিক শঙ্করদেব প্রায় পাঁচশত বছর আগেই প্রয়োগ করে গেছেন।শঙ্করদেবমাধবদেবের পরে অসম সহ সারা ভারতেই ষোড়শ শতক থেকে উনিশ শতক অব্দি নাটক কিছু পরিমাণে স্তিমিত হয়ে পড়েছিল।
            উনিশ শতকে দৃশ্যপট বদলে গেল। সেই শতকে ব্রিটিশ উপনিবেশ বৃক্ষের রূপ নিয়ে ভারতবর্ষকে ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদের ছায়া দিতে শুরু করল।শতকের মধ্যভাগে ভারতীয় নাট্যকর্মীরা দেশীয় নাট্যপরম্পরাকে সরিয়ে রেখে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নাট্যপরম্পরাকে বরণ করে নিলেন।খুব সম্ভব স্তিমিত নাট্যজগতকে পুনরুজ্জীবিত করবার জন্যে এই যুগান্তকারী পরিবর্তন হয় নি।এটি হয়েছিল সম্ভবত ঔপনিবেশিক মানুষের স্বাভাবিক অনুকরণমুখী প্রবণতার জন্যেই।যাই হোক,ঔপনিবেশিক নাট্যাদর্শের পরম্পরাকে বরণ করে ফেলার ফলে জন্ম হল আধুনিকতার ইউরোপীয় ধারণা বয়ে বেড়ানো,নাগরিক এবং উচ্চশিক্ষিত নাট্যকর্মীদের নাট্যভাবনারআর জন্ম নিল নগরকেন্দ্রিক চিন্তাচেতনার প্রসেনিয়াম মঞ্চে মূলত শেক্সপীয়রের রীতিতে উপস্থাপিত আধুনিক ভারতীয় নাটক।তখন থেকে বিশ শতকের প্রথম চারটি দশক পর্যন্ত ভারতের প্রান্তীয় সাহিত্যক্ষেত্রগুলোতে     প্রবাহিত রোমান্টিকতার ঝড়ো বাতাসে নাট্যকর্মীদেরও মন উড়ু উড়ু করে রাখল।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো নাট্যকারের উপরেও তার প্রভাব পড়ল।উদাহরণ স্বরূপ রক্তকরবীতে (বাংলা,১৯২৪) তিনি মাটিতে পা ফেলতে পারেন নি।নাটকটিতে তিনি মানবজাতিকে কর্ষণজীবীআর আকর্ষণজীবী’ ---এই দুই ভাগে ভাগ করে দেখালেন যদিও,সে বাস্তব অভিলাষী মনকে খুব একটা ছোঁয় না। কেন না,দেখা যায় সেই মানব জাতি কল্পলোকেরই বাসিন্দা,বাস্তব জগৎ থেকে বহু দূরে তাঁদের অবস্থান।
এই সময় ভারতীয় নাট্যকারদের উপর রোম্যান্টিক নাটকের প্রভাব এতোটাই পড়েছিল যে তার থেকে তাদেরকে ইবসেন আর বার্ণার্ড শ্বয়ের বাস্তববাদী নাটকের নবলব্ধ প্রভাবেও সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করতে পারে নি।তার নজির আমাদের জ্যোতিপ্রসাদেররূপালীম’ (অসমিয়া,রচনা -১৯৩৬,মঞ্চায়ন-১৯৩৭,প্রথম প্রকাশ ১৯৩৮) এবং কারেঙর লিগিরী’ (অসমিয়া, ১৯৩৭?) নাটক। রূপালীম’-এ রূপালীমের মৃত্যুদণ্ড রোম্যান্টিক নাটকের সমগোত্রীয় ট্র্যাজিক প্রভাব সৃষ্টি করিলে,তার আগে মণিমুগ্ধর আত্মিক পরিবর্তন অতি আদর্শায়িত হল,বাস্তবিক বলতে নাটকটিতে থাকল শুধু আত্মক্ষয়প্রাপ্ত ইতিভেন। কিন্তু শেষঅব্দি তিনি ইবসেনের নোরার মতো বা শ্বএর কেণ্ডিডার মতো বাস্তব বুদ্ধি সম্পন্ন,যুক্তিপরায়ণ নতুন নারীরূপে দেখা দিলেন নাকারেঙর লিগিরীও একটি সর্বাঙ্গসুন্দর আধুনিক সমস্যামূলক নাটক হয়ে উঠল না।কারণ নাটকটির শেষে শেওয়ালির আত্মবলিদান সৃষ্টি করল রূপালীমের মতো ট্র্যাজিক প্রভাব।নিজেকে নতুন নারী রূপে তুলে না ধরে শেওয়ালি রোম্যান্টিক নারীর নায়িকার মতো বাস্তব জগতের অনুপযোগী ত্যাগের আদর্শ।এই আদর্শই সুন্দর কোঁয়রকে বাস্তব কর্তব্যের থেকে সরে গিয়ে বৈরাগী হতে অনুপ্রাণিত করল।এইসব দেখলে শেওয়ালি আর সুন্দর কোঁয়রের ব্যক্তি হৃদয়ের ঔজ্জ্বল্য আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়,আমাদের চোখে ভালো করে পড়েই না নাটকের পূর্বাংশ অধিকার করে রাখা সামাজিক সমস্যা আর উপস্থাপনের আড়ালে নাট্যকারের উদ্দেশ্য।
            শতকের পঞ্চম দশকে দৃশ্যপটে সামান্য,কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক পরিবর্তন এল।সামান্যই পরিবর্তন এল---যেমন জ্যোতিপ্রসাদের লভিতা’ (অসমিয়া, ১৯৪৮) নাটকে দেশপ্রেম আদর্শায়িত হল আগেকার নাটকের মতোই।তার উপরে লভিতার মতো নাটকে সামাজিক সমস্যার পূর্ণ বিশ্লেষণ করা হলো না,ঔপনিবেশিক মঞ্চাদর্শের প্রতিও কোনো রকম বিরোধ প্রদর্শন করা হলো না এগুলোতে (এই প্রবন্ধে প্রয়োজনসাপেক্ষে জ্যোতিপ্রসাদের কিছু নেতিবাচক দিক উল্লেখ করছি যদিও পাঠন না ভুল বোঝেন তাই বলে রাখি,বিভিন্ন কারণে জ্যোতিপ্রসাদই ব্যক্তিগতভাবে আমাদের সবচাইতে প্রিয় নাট্যকার,তাঁর রূপালীমআমাদের সবচাইতে প্রিয় অসমীয়া নাটক এবং রূপালীমের মণিমুগ্ধ আমাদের প্রিয়তম অসমিয়া চরিত্র)তাহলে কি সেই সামান্য,কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এল শতকের পঞ্চম দশকে?অপর্ণা ভার্গব ধারওয়াড়কার থিয়েটার্স অব ইণ্ডিপেন্ডেন্সঃ ড্রামা,থিয়রি এণ্ড আরবান পারফরম্যান্স ইন ইণ্ডিয়া সিন্স ১৯৪৭গ্রন্থে তার খতিয়ান তুলে ধরেছেন।তাঁর মতে ভারতীয় নাটকে পরিবর্তন এল ১৯৪৩ সনে,কারণ এই বছরে তখনকার বোম্বেতে প্রতিষ্ঠিত হল ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ,যে সংগঠন কিনা যুদ্ধং দেহী মনোভাবে  ঔপনিবেশিক থিয়েটারকে অবজ্ঞা করল আর এক প্রতিবাদ মুখর জাতীয় থিয়েটার জন্ম দিতে অগ্রণী ভূমিকা নিল।সংঘের মঞ্চায়িত প্রথম নাটকেই এই প্রতিবাদী মনোভংগী প্রকট হয়ে পড়ল।নাটকটি ছিল,বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন’ (বাংলা,১৯৪৪)নাটকটি এক ঔপনিবেশিক নাট্যাদর্শ বিরোধী প্রতিবাদমুখর জাতীয় নাট্য-চেতনা সৃষ্টি করল। ধারওয়াড়কার লিখেছেন গণনাট্য সংঘের প্রতিষ্ঠার বছরটিতেই উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতীয় নাটকের জন্ম হয়েছে,আর নবান্নই প্রথম উত্তর-ঔপনিবেশিক নাটক (পৃষ্ঠা ৩১)
            নবান্নপড়লে আমরা দেখব,সেই নাটক ১৯৪২-৪৩ সনের বাংলাতে দুর্ভিক্ষের বলি কৃষক জনতাকে এক শোষিত শ্রেণি হিসাবে চিহ্নিত করেছিল।তাঁদের উপস্থাপিত করেছিল শ্রেণি চেতনাতে উদ্বুদ্ধ ব্রিটিশের শোষণকারী ভূমিনীতির বিরোধী প্রতিবাদকারী হিসেবে।তারউপরে ব্রিটিশের ছড়ানো (এবং পরে,দেশবিভাজনের সময়ে এসে প্রবল রূপ নেয়া) সাম্প্রদায়িকতাবাদের প্রবল বিরোধী রূপে।নাটকে জাতীয়চেতনাকে সমাজ চেতনাতে পর্যবসিত করেছিল।এ এমন এক পরিবর্তন যাকে ফ্রঞ্জ ফেনন বলেছিলেন,সাম্রাজ্যবাদকে উৎখাত করবার জন্যে অতি দরকারি বলে বিবেচনা করেছিলেন।নাটকের চতুর্থ অঙ্কে শোষিত জনতা সঙ্ঘবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছেন,পঞ্চম অঙ্কে জনতা সম্মিলিতভাবে নবান্ন উৎসব পালন করার দৃশ্যের মধ্য দিয়ে তাদের জয় ঘোষিত হয়েছে।আর এভাবেই নাটকের শেষে সঙ্ঘবদ্ধ জনতার সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের প্রতি ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। নাটকের শেষটি যেন মার্ক্স এঙ্গেলসের দু কম্যুমিষ্ট মেনিফেস্টোর শেষভাগেরই নাট্যরূপ।
            নাটকটিতে শ্রেণির উপস্থাপন সম্পর্কে আরেকটি লক্ষ করবার কথা এই যে তাতে নারীদের শোষিত শ্রেণির ভেতরে এক অধিক শোষিত প্রান্তীয় উপ-শ্রেণি হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ যেন পরের কালের কৃষ্ণ-নারীবাদের কথিতদ্বি-শোষণএরই পূর্বকথন এই কথন সম্ভব হয়েছে,শব্দগত এবং দৃশ্যগত শ্লেষের যোগে।উদাহরণ স্বরূপ,রাধিকা নামের চরিত্রের কোনো ঋদ্ধি নেই,তার নামের অর্থ যদিও তাই।বিনোদিনী নামের চরিত্রটি হচ্ছে তার নামের অর্থের বিপরীতে বিনোদবিহীনা। আর মাতঙ্গিনী চরিত্রটি তার নামের অনুরূপ হস্তিনীর মতো বলবতী রূপে দেখা না দিয়ে,দিয়েছে নিতান্ত দুর্বলা হিসেবেতার উপরে দৃশ্যগুলো দেখায় এই কটি নারী চরিত্রের সামাজিক স্থিতি পুরুষের সামাজিক স্থিতির থেকে হীন।
            ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতি প্রতিরোধমূলক প্রতিবাদ,জাতীয় চেতনার সমাজচেতনাতে উন্নয়ন,স্বদেশের আভ্যন্তরীণ সমস্যার নির্মোহ বিশ্লেষণ,অধিক শোষিত প্রান্তীয় উপ-শ্রেণির উন্মুক্তি ইত্যাদি উত্তর-ঔপনিবেশিক নাটকের কিছু বিশেষ লক্ষণ। নবান্নতে এই লক্ষণগুলো পরিস্ফুট হয়ে উঠেছিল।তার পরিবেশনাতেও উত্তর-উপনিবেশবাদী নাটকের লক্ষণ উজ্জ্বল রূপে দেখা দিয়েছিল বিজন ভট্টাচার্য এবং শম্ভু মিত্রের পরিচালনাতে নাটকটি এক নতুন থিয়েটারি ভাষা আয়ত্ত করেছিল।কিরণময় রাহার ভাষাতে---‘Gone were the artificial sets,the painted wings and the striving after illusory effects;gone too were the histrionic pyrotechnics of individual brilliance and the familiar forced accommodation of available actors.” (Bengali Theatre,pg. 155) নাটকটিতে এই সব লক্ষণ ফুটে ওঠা দেখে, পরাধীন ভারতে রচিত আর পরিবেশিত হওয়া সত্ত্বেও তাকে নিঃসন্দেহে উত্তর-ঔপনিবেশিকতাবাদী আখ্যা দেয়া যায়। তেমনি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা পাবার মাত্র চারদিন আগে পরিবেশিত মনোরঞ্জন দাশের নাটক আগস্ট ন’-তেও (ওড়িয়া, ১৯৪৭) 'বছর আগেকার আগস্ট বিপ্লবের পটভূমিতে দেশবাসীর নৈতিক অবক্ষয়ের সমস্যাটি নির্মোহভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এদিক থেকে আগস্ট ন’-ও একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক নাটক,যদিও আদর্শের দিক থেকে এটি নবান্নের কঠোর সাম্যবাদী আদর্শের থেকে বহু দূরের জিনিস,যদিও তার পরিবেশনা ভারতীয় নাট্যজগতে ঔপনিবেশিকতার বা ঔপনিবেশিক নাট্যাদর্শের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধমূলক ভাষার সংযোগ ঘটালো না।ভারতীয় গণনাট্য সংঘের উদ্যোগে সঙ্ঘটিত নাট্য-আন্দোলন পরে দীর্ঘস্থায়ী হলো না।তার কারণ---সংঘের মঞ্চে সাম্যবাদী আদর্শকে অত্যধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল,তার ফলে নাট্য-কলা যথোপযুক্ত বিকাশের সুবিধে পেল না।নবান্নের অন্যতম পরিচালক শম্ভু মিত্র,রচয়িতা-পরিচালক বিজন ভট্টাচার্য,সংঘের অন্য বিশিষ্ট কর্মী, যেমন ---উৎপল দত্ত, হাবিব তনবির প্রমুখ সাম্যবাদী আদর্শের সঙ্গে নাট্য-কলারও একই সমান্তরাল বিকাশের কথা ভাবনাতে নিয়ে একে একে সঙ্ঘ করলেন। গড়ে তুললেন নিজেদের নাট্যগোষ্ঠী। শম্ভু মিত্র গঠন করলেন,‘বহুরূপী’ (১৯৪৯), বিজন ভট্টাচার্য গঠন করলেন কলিকাতা থিয়েটার’ (১৯৪৯),উৎপল দত্ত গঠন করলেন লিটল থিয়েটার গ্রুপ’ (১৯৪৯)  এবং পরে পিপলস লিটল থিয়েটার ’ (১৯৬৯) এবং হাবিব তনবির গড়ে তোলেন নয়া থিয়েটার’ (১৯৫৯)এই গোষ্ঠীগুলো ভারতে এক দীর্ঘকালীন নাট্যগোষ্ঠী আন্দোলনের সূচনা করল। গোষ্ঠীগুলো প্রধানত: রাজনৈতিক নাটকই মঞ্চস্থ করেছিল যদিও বিভিন্ন লোকনাট্য এবং ভাষাবৈচিত্র্যর রূপ এবং কাঠামোর উপাদানকে ব্যবহার করে সেই নাটকগুলোকে শৈল্পিক করে তুলেছিলেন। এরকম প্রয়োগ দেশীয় নাট্য-পরম্পরার প্রাচীনত্ব,প্রাচুর্য এবং ঋদ্ধিকে উত্তর-ঔপনিবেশিক সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ যেভাবে চেয়েছিল সেভাবে তুলে ধরেছিল।এক কালে শেক্সপীয়রের নাটক করে প্রভূত খ্যাতির অধিকারী উৎপল দত্ত পরে তাঁর লোকনাট্যমুখী নাটক এবং তত্ত্বধর্মী লেখাগুলোর মধ্য দিয়ে সচেতনভাবেই এক সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিকনাটকের পোষকতা করেছিলেন। এই সব করতে গিয়ে তাঁরা ব্রেখটের মহাকাব্যিক নাটক থেকেও অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
        
    ‘নবান্নের পরে বিজন ভট্টাচার্যের শ্রেষ্ঠ কৃতি দেবীগর্জননাটক (বাংলা,১৯৬৬)তাতে শোষণকারী নারী ধর্ষণকারী সামন্তপ্রভুর বিরুদ্ধে শোষিত কৃষক শ্রেণি সম্মিলিতভাবে বিদ্রোহ করছে।নাটকের শেষে আছে দেবী দুর্গার আখ্যানের অনুষঙ্গে মহিষাসুর যেন সামন্তপ্রভুর নিধনের দৃশ্য এবং কৃষক শ্রেণির মুক্তির বার্তা। জীবন কালে বাংলা নাট্যজগতের কিংবদন্তীস্বরূপ হয়ে উঠা নাট্যকার,অভিনেতা এবং পরিচালক শম্ভু মিত্রের শ্রেষ্ঠ কৃতি হচ্ছে চাঁদবণিকের পালা’ (বাংলা,১৯৭৮)নাটকটি কখনো মঞ্চস্থ না হলেও বাংলা তথা ভারতীয় নাট্যজগতকে আলোড়িত করে রেখেছে। মহাকাব্যিক গাম্ভীর্য এবং বিস্তারের এই নাটকে উত্তর বাংলার খেটে খাওয়া মানুষের ভাষাবৈচিত্র্য এবং ব্রেখটীয় রুপকল্পে লোকনৃত্য-গীত জুড়ে দিয়ে সংখ্যালঘুর অবস্থা এবং বৈপ্লবিক মনোভাব ফুটিয়ে তুলা হয়েছে।উৎপল দত্ত আশিটির বেশি নাটক লিখেছেন।তার মধ্যে কোনটি শ্রেষ্ঠ বলা কঠিন। কেননা অঙ্গার’(বাংলা,১৯৫৯),‘ফেরারি ফৌজ’ (বাংলা,১৯৬১),‘কল্লোল’ (বাংলা,১৯৬৫),‘টিনের তলোয়ার’ (১৯৭১),‘সূর্যশিকার’ (বাংলা,১৯৭১) ইত্যাদি প্রতিটি নাটকই নানান দিক থেকে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখে।উৎপল দত্ত বেশ কিছু পালাঅর্থাৎ নাটক লিখে বাংলা যাত্রানামের লোকনাট্য ধারাটিরও উত্তর-ঔপনিবেশিক উত্তরণে সহায় করেছিলেন।এই নাটকগুলোর পাঠ এবং পরিবেশনে যাত্রার বেশ কিছু উপাদান ব্যবহার করে  তিনি তাঁর উপনিবেশবাদ বিরোধী রাজনৈতিককথাবস্তুকে সবল রূপে প্রকাশ করে রেখে গেছেন।হাবিব তনবির তাঁর নাটকে মধ্য এবং উত্তর ভারতের বিভিন্ন লোকনাট্যের রূপ এবং কাঠামোকে উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন।সঙ্গে ব্যবহার করেছেন মধ্য,পশ্চিম এবং উত্তর ভারতের বিভিন্ন ভাষাবৈচিত্র্য,সংস্কৃত নাটকের কিছু উপাদান এবং তাৎক্ষণিক অভিনয়ের বাচনিক এবং শারীরিক অভিব্যক্তি। লোকনাট্য এবং ভাষাবৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে নিপীড়িত শ্রেণির উপস্থাপন করে প্রভাবী শ্রেণি মানুষের ক্ষমতার খেলা উদলা করে দেখানো নাটকগুলোর মধ্যে চরণদাস চোর’ (ছত্রিশগড়ী, ১৯৭৫), এবং হিরমা কী অমর কহানী’ (হিন্দী, ১৯৮৫) তববীরের শ্রেষ্ঠ নাটক।
            গণনাট্য সঙ্ঘের থেকে বেরিয়ে আসা এই সব সদস্যদের সঙ্গে অন্য কিছু নাট্যকার-পরিচালকও বিভিন্ন নাট্যগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করে এই নাট্যগোষ্ঠী (গ্রুপ থিয়েটার --অনুবাদক) আন্দোলনটিকে সবল পরেছিলেন। এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে  মনোজ মিত্রের সুন্দরম’ (১৯৫৭),‘কাবলম নারায়ণ পাণিক্করের সোপানম’ (১৯৬৪),বাদল সরকারের শতাব্দী’ (১৯৬৭),অরুণ মুখার্জিরচেতনা’ (১৯৭২),সফদর হাসমীর জন নাট্য মঞ্চবা সংক্ষেপে জনম’ (১৯৭৪),রতন থিয়ামের কোরাস রেপার্টরী থিয়েটার’ (১৯৭৬),এবং নীলম মানসিং চৌধুরীর কোম্পানি’ (১৯৮৪)এর মধ্যে সর্বাধিক আলোচিত গোষ্ঠী দুটি হচ্ছে শতাব্দীআর জনমশতাব্দীপ্রখ্যাত তার মুক্তমঞ্চ তথা থার্ড থিয়েটারের ধারণার জন্যে। তার ধারণা গ্রহণ করা হয়েছিল লোকনাটক এবং পশ্চিমা থিয়েটার ইন দ্য রাউন্ডজাতীয় কিছু প্রসেনিয়াম বিরোধী নাট্য-পরিবেশন পদ্ধতির থেকে। এই সব ভাবাদর্শে তৈরি থার্ড থিয়েটার দিয়ে শতাব্দীব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নাট্যাদর্শের বিরুদ্ধে তুমুল প্রতিবাদ সাব্যস্ত করেছে। তার জন্যে উত্তর-ঔপনিবেশিক পরিদৃশ্যে এই থার্ড থিয়েটার যথেষ্ট মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। আমরা আগেই লিখে এসেছি---থার্ড থিয়েটারের সঙ্গে মেলে এমন নাটক পরিবেশন পদ্ধতি আমাদের শঙ্করদেব বহু আগেই ব্যবহার করেছিলেন।অবশ্য শঙ্কর দেবের উদ্দেশ্য স্বতন্ত্র ছিলতিনি অন্তরঙ্গ থিয়েটার দিয়ে সাধারণ মানুষকে ধর্মের পথে আকর্ষণ করতে চাইছিলেন,কোনো প্রচলিত নাট্য-পদ্ধতির বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ করতে চান নি (সে জন্যেই তিনি সংস্কৃত এবং লোক এই দুই ধারার থেকেই মুক্তভাবে উপাদান গ্রহণ করতে পেরেছিলেন)শতাব্দীর মতো  জনমও নতুন নাট্যপদ্ধতির সন্ধান করেছিল।সাধারণ মানুষকে নাট্য-প্রক্রিয়ার সঙ্গে অন্তরঙ্গতা স্থাপনের সুবিধা করে দেবার উদ্দেশ্যে জনমজনপ্রিয় করে তুলেছিল পথ নাটকজনমঅবশ্য পথ নাটকজনপ্রিয়ই করেছিল,সেই নাট্য ধারণার জন্ম দেয় নি।উৎপল দত্ত,হবীন তববীরেরা জনমএর বহু আগেইপথ নাটককরেছিলেন,এই কথাটি এখানে উল্লেখ করে রাখা ভালো।।
            শতাব্দীএবং জনমএর বাইরেও অন্যান্য নাট্যগোষ্ঠীগুলোও কথ্যবস্তু এবং শিল্প সম্বন্ধীয় অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছে। মনোজ মিত্র,রতন থিয়াম প্রমুখ নিজ নিজ নাট্যগোষ্ঠীর মাধ্যমে এমন বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ভারতীয় নাট্য জগতের প্রবাদ পুরুষে পরিণত হয়েছেনকিন্তু দুঃখ হয় ভেবে কাবলম নারায়ণ পাণীক্কর এবং অরুণ মুখার্জির মতো এক একজন জ্যেষ্ঠ নাট্যকর্মীরা তাদের প্রাপ্য সম্মান পেলেন না।অথচ,লোকনাটক,লোকসমর কলা এবং পুরাকাহিনির বিভিন্ন রূপ এবং কাঠামোকে উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে পশ্চিমের বাস্তববাদী নাট্য-পদ্ধতির প্রতিরোধী উত্তর-ঔপনিবেশিক নাটক নির্মাণে তাঁদের অগ্রণী ভূমিকা ছিল।এমনটা হবার কারণ কী? আমাদের মনে হয় এমনটা হবার কারণ হচ্ছে আমাদের সমালোচকদের তেলা মাথাতে তেল দেবার আগ্রহ।আমাদের বেশিরভাগ নাট্যালোচনার বই পত্র খুললেই দেখা যায় ---অধিকাংশ আলোচনা হয় কেবল মোহন রাকেশ, বিজয় তেণ্ডুলকর, বাদল সরকার এবং গিরীশ কার্ণার্ড কেন্দ্র করে। সেগুলোতে কাবলম নারায়ণ পাণিক্করের মতো সুদূর দক্ষিণের মালয়ালী নাট্যকার পরিচালকের কথা তো দূর,পূর্ব ভারতের বাংলার উৎপল দত্ত বা অরুণ মুখার্জি,মধ্য-ভারতের হবীব তনবীরের জন্যেও স্থান থাকে না বললেই চলে।আর এখন সহজ লভ্য ইংরেজি পাঠের জন্যে সেগুলোতে বহু নতুন ব্যক্তি স্থান পাচ্ছেন। সত্যি,প্রান্তীয় নাটকের অনুবাদের অভাবে এবং বই লেখা আর সম্পাদনার ভূতের প্রকোপে ভয় পাইয়ে দেবার মতো ইতিহাসের দেদার ভুল উপস্থাপন হচ্ছে।অবশ্য এই কথা ঠিক---জাতীয় নাট্য বিদ্যালয়,সিগ্যাল থিয়েটার ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান এমনটা করেছে,আমরা দেখি নি।তাদের হিন্দি-ইংরেজি পত্রিকা পড়ে দেখেছি---তাঁরা বিভিন্ন প্রান্তীয় নাটককে গুরুত্ব দেবার প্রচেষ্টা নিয়মিত করে আসছেন।
ফিরে আসছি নাট্যগোষ্ঠী আন্দোলনের বিষয়ে।ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নাট্যগোষ্ঠী স্থাপিত হবার ফলে নাট্যগোষ্ঠী আন্দোলন লাভ করেছিল এক সর্বভারতীয় বিস্তৃতি।তারউপরে আন্দোলনের দিক থেকে এই গোষ্ঠীগুলো নগরকেন্দ্রিক ছিল যদিও আন্দোলনটির অংশ হিসেবে পরিবেশিত অধিকাংশ নাটকে প্রাক-স্বাধীনতা যুগের নাটকের নগরকেন্দ্রিক চিন্তা-চর্চা বা দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্হিত হয়ে পড়েছিল। নগর অবশ্যই দেখানো হয়েছিল,কিন্তু সেসব অধিকাংশ নাটকেই মূল পটভূমি বা চেতনার বিচরণস্থল ছিল না।আসলে লোকনাটকের উপকরণ ব্রিটিশ নাট্যাদর্শের প্রতিরোধমূলক মনোভংগীর অন্যতম অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হওয়াতে এবং নয়া থিয়েটার’,‘সোপানমইত্যাদি নাট্যগোষ্ঠীগুলো সাধারণ মানুষের অপরিশিলীত শরীর ভঙ্গি এবং কথন ভঙ্গি উপস্থাপন করবার উদ্দেশ্যে গ্রামীণ নিরক্ষর,নাট্য-শিক্ষাহীন মানুষকে অভিনেতা অভিনেত্রী হিসাবে নিযুক্তি দেবার ফলে এইসব নাটকে সংযুক্তি ঘটেছিল এক নতুন ধরণের গ্রাম্য-স্বাভাবিকতার।এই সংযোগ নাট্যগোষ্ঠী আন্দোলনটিকে সর্বভারতীয় বিস্তৃতি লাভ করতে প্রচুর সাহায্য করেছিলতবু এই কথা স্বীকার করতেই হবে,আন্দোলনটি উত্তর স্বাধীনতা যুগের ভারতীয় নাট্য ক্ষেত্রের সামগ্রিক রূপের প্রতিনিধিত্ব করে না।কারণ,প্রথমত এই নাট্যজগতের সব নাটক ঔপনিবেশিক নাট্যাদর্শের বিরোধিতা করে নি,কিছু কিছু নাটক বরং সেই পুরোনো আদর্শের অনুসরণই করে যাছে (উদাহরণ স্বরূপ আমাদের ভ্রাম্যমান থিয়েটারের নাটকগুলো আজও বহুলাংশে বাস্তববাদী এবং প্রসেনিয়াম প্রায় মঞ্চতেই অভিনীত হয়) এবং দ্বিতীয়ত,এই নাট্যজগতের অনেকেই ভালোর থেকে ভালো নাটক লিখেছেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে, কোনো নাট্যগোষ্ঠীর প্রতি সমর্পিত না হয়েই (সাময়িক ভাবে কোনো নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত হয়েছেন হয়তো, সেসব আমরা এখানে হিসেবে নিই নি)
     
      ব্যক্তিগত উদ্যোগে,নাট্যগোষ্ঠীর আদর্শের প্রতি সমর্পিত না হয়ে নাটক লিখে ভারতীয় নাট্য জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার বলে বিবেচিত হয়েছেন এমন ব্যক্তিত্বের মধ্যে রয়েছেন,ধর্মবীর ভারতী, হাবিব তনবির,বাদল সরকার,মোহন রাকেশ, আদ্য রঙ্গাচার্য,বিজয় তেণ্ডুলকর,গিরীশ কার্ণাড,চন্দ্রশেখর কম্বার প্রমুখ অনেকে (নিজ নিজ নাট্যগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করবার আগে হাবিব তনবির এবং বাদল সরকার কিছুদিন এরকমই নাটক লিখেছেন এবং পরিচালনা করছিলেন বলে তাঁদেরকেও এঁদের সঙ্গে জায়গা দিতে হবে বটে)এঁদের মধ্যে ধর্মবীর ভারতী এবং হবীব তনবীরের স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণনবান্নপ্রথমবার অভিনীত হবার দশ বছর পরে ১৯৫৪তে এরাই উত্তর-ঔপনিবেশিক নাটকের গতিপথে ঘূর্ণির সৃষ্টি করেছিলেন(অপর্ণা ভার্গব ধারওয়াড়কারের মতে নবান্নএর পরে এই নাটকের জগতে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা দুটো ছিল ১৯৫৬ এবং ১৯৮৯ সনে সংগীত নাটক অকাডেমি আয়োজিত দুটি পুনরালোচনামূলক আলোচনা সত্র)ধর্মবীর ভারতীর অন্ধ-যুগনাটকে (হিন্দি,১৯৫৪) মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পরের অংশের আশ্রয়ে বিশ্বযুদ্ধের পরের পৃথিবীর,বিশেষ করে ভারতের মানুষের নৈতিক অধঃপতনের চিত্র আঁকা হয়েছিল।ধর্মবীরের পুরাকাহিনির সাহায্যে সমসাময়িকতাকে উজ্জ্বল করে তুলবার বিপরীতে হাবিব তনবির তাঁর আগ্রা বাজারনাটকে (উর্দু,১৯৫৪) একই কাজ করেছিলেন শেষ মধ্যযুগের পটভূমিতে কাহিনি উপস্থাপন করে। শ্রেণি-বৈপরীত্য নির্দেশ করে উর্দুর দুটো উপভাষা ব্যবহার করাও আগ্রা বাজারনাটকের এক উল্লেখযোগ্য দিক।উপভাষা সম্পর্কিত এমন পরীক্ষাই ছিল পরের কালে নয়া থিয়েটারএর সমধর্মী সম্পরীক্ষাগুলোর ভিত্তি।নয়া থিয়েটারপ্রতিষ্ঠা করবার আগের বছরে,অর্থাৎ ১৯৫৮ সচে তনবীর শূদ্রকের সংস্কৃত নাটক মৃচ্ছকটিকমএর হিন্দুস্তানী অভিযোজনা পরিচালনা করে উত্তর-ঔপনিবেশিক  ভারতীয় নাটকের আর একটি মূলসন্ধানী ধারারও শুভারম্ভ করেছিলেন। মোহন রাকেশের আষাঢ় কা এক দিন’ (হিন্দি,১৯৫৮),‘লেহরো কি রাজহংস’ (হিন্দি,১৯৬৮),আদ্য রঙ্গাচার্যেরকেলু জন্মেজয়’ (১৯৬০),গিরীশ কার্ণার্ডের যযাতি’ (কানাড়া,১৯৬১) ইত্যাদি নাটক ধর্মবীর ভারতীর সৃষ্ট পুরাকাহিনির পটভূমিতে লেখা নাটকের ধারাটিকে শক্তিশালী করে তুলেছিল। হাবিব তনবিরের ইতিহাসের পটভূমির ধারাটিকে সমৃদ্ধ করেছিল গিরীশ কার্ণার্ডের টোগলকপ্রভৃতি নাটকগুলো। নাট্যগোষ্ঠীগুলোর নাটকে লোকনাটকের রূপ এবং কাঠামোগত উপাদান ইতিমধ্যে ব্যবহৃত হয়েই আসছিল; ব্যক্তিগত উদ্যোগে লেখা নাটকে সেইসব সম্পরীক্ষা চালানো হয়েছিল বিজয় তেণ্ডুলকারের সারি গা সারি’ (মারাঠি, ১৯৬৪),‘জ্বালা অনন্ত হনুমন্ত’ (মারাঠি, ১৯৬৮),‘রাজা-রাণীলা ঘাম হায়ে’ (মারাঠি,শিশু নাটক,১৯৭২),বিশেষ করে ঘসিরাম কটোয়াল’ (মারাঠি,১৯৭২) নাটকে। এছাড়াও গিরীশ কার্ণার্ডের হয়বদন’ (কানাড়া,১৯৭১),চন্দ্রশেখর কম্বারের জোকুমার স্বামী’ (কানাড়া, ১৯৭২) ইত্যাদি নাটকে।
  বাদল সরকার যতদিন নিজের নাট্যদল করেন নি,তখনকার কথাটি সামান্য আলাদা। সেই বাদল সরকার পাশ্চাত্য নাট্যাদর্শের অনুগামীরূপেই পরিচিত।এবং ইন্দ্রজিৎ’ (বাংলা,১৯৬৩),‘বাকী ইতিহাস’ (বাংলা, ১৯৬৫),‘ত্রিংশ শতাব্দী’ (বাংলা, ১৯৬৬),‘পরে কোনোদিন’ (বাংলা,১৯৬৬),‘পাগলা ঘোড়া’ (বাংলা,১৯৬৭) ইত্যাদি নাটকে বাদল সরকার ভারতে এবসার্ড নাটকের এক ধারার জন্ম দিয়েছিলেন।মধ্যবিত্ত মানুষের উপস্থাপনর প্রসঙ্গে বাদল সরকারের এইসব নাটকের এক গুরুত্ব আছে। মধ্যবিত্ত মানুষের জটিল মনোবস্থা এবং পরিপূর্ণতাহীনতা মোহন রাকেশও ফুটিয়ে তুলেছিলেন,তাঁর তৃতীয় নাটক আধে অধুরেত’-(হিন্দি, ১৯৬৯)কিন্তু মধ্যবিত্ত মানুষের জটিল রাজনৈতিক পরিপার্শ এবং তৎজনিত মনোবস্থা বিজয় তেণ্ডুলকারের সমানে বিস্তার এবং দক্ষতাতে কেউই তুলে ধরতে পারেন নি।বিজয় তেণ্ডুলকারের গিদ্ধাড়ে’ (মারাঠি,রচনা ১৯৫৯,মঞ্চায়ন ১৯৭০),‘এক হট্টী মুলগী’ (মারাঠি,১৯৬৬),‘শান্তাত! কোর্ট চালু আহে’ (মারাঠি,১৯৬৭),‘সখারাম বাইণ্ডার’ (মারাঠি,১৯৭৫), ‘ভাউ মুরাররাও’ (মারাঠি,১৯৭৫),‘পাহিজে জাতিচে’ (মারাঠি,১৯৭৬) প্রভৃতি নাটকে এসব সম্ভব হয়েছে তার সুদক্ষ পশ্চিমা-বাস্তববাদী নাট্যকার রূপটির জন্যে।গিরীশ কার্ণার্ডের মতো সমকালীন,বিচক্ষণ নাট্যকার তেণ্ডুলকারের এই রূপটি দেখে তাঁকে বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ ভারতীয় নাট্যকার বলে স্বীকার করেছেন (রঙ্গ প্রসঙ্গ,জুলাই সেপ্টেম্বর,২০০৮,পৃষ্ঠা ১৩৯,আউটলুক ২ জুন, ২০০৮,পৃষ্ঠা ৬৫)অবশ্য একটি কথা,তেণ্ডুলকারের এই রূপটিই সবচাইতে বেশী আলোচিত;ইংরেজি অনুবাদের অভাবে তাঁর ঘাসিরাম কটোয়াল’-এর বাইরে অন্য প্রতি-বাস্তববাদী নাটকগুলোর,শিশু নাটকগুলো সহ,আলোচনা প্রায় হয় নি বললেই চলে।
  
          বিশ শতকের নবম দশক থেকে বর্তমান অব্দি উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতীয় নাটকে নানা ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। সেগুলোতে প্রান্তিক তথা দ্বি-শোষিত সম্প্রদায়গুলোর উপরে চলা শোষণ নির্যাতনের ছবি বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে। নারীবাদী নাটক লেখা হয়েছে,যেমন নবনীতা দেবসেনের মেডেয়া’ (বাংলা,১৯৯৩),সমকামিতা এবং বিকল্প যৌনত্ব সম্পর্কিত নাটক লেখা হয়েছে। যেমন মহেশ দত্তানির ব্রেভলি ফট দ্য কুইন’ (ইংরাজি,১৯৯১),এবং অন আ মাগী নাইট ইন মুম্বাই’ (ইংরাজি,১৯৯৭);জাতিগত অবদমনের সম্পর্কে নাটক লেখা হয়েছে,যেমনএইচ জি শিবপ্রকাশের মহাচৈত্র’ (কানাড়া, ১৯৮৫)তারউপরে দলিত এবং জনজাতি জীবনের প্রেক্ষাপটে লেখা হয়েছে শিবপ্রকাশেরই মাদারি মাদইয়া’ (কানাড়া, ১৯৮৫)কিন্তু এই চারটি বিষয়ই তেণ্ডুলকার তাঁর  বিভিন্ন নাটকে ভালো করেই ছুঁয়ে গেছেন। (উদাহরণস্বরূপ,ক্রমে চিরঞ্জীব সৌভাগ্যকাংক্ষিনী’,‘মিত্রচি গোষ্ট’,‘কন্যাদানএবং দাম্বদ্বীপপচা মুকাবেলানাটকে। নাটকগুলোর সময়ের ক্রম ১৯৮১,১৯৮১, ১৯৮৩ এবং ১৯৬৯)আর সেজন্যেই বলতে পারি,এই কটি বিষয়াশ্রয়ী নাটকের তিনি ছিলেন অগ্রপথিক।
                       
                                                            ~~~০০০~~~