“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
সুপ্রদীপ দত্তরায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সুপ্রদীপ দত্তরায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২১

তুমি

।। সুপ্রদীপ দত্তরায় ।।
 
 
 
 
 
 
 
 
তোমার অঢেল সময়
শুয়ে, বসে, কথায় তুফান তুলে
দিব্যি কেটে যায়।
তোমার অনেক গুণ
লোকের গুণের চালনি চালাতেই
সকাল থেকে সন্ধ্যে, 
টেবিল ভেঙ্গে যায় ।
তোমার অফুরন্ত জীবিকাশক্তি।

"দাদা"র বুকে ব্যথা --
তোমার ঘুমের মুন্ডুপাত।
দাদা তোমার একার নয়
আমার, তোমার সবার
তবু পাতার পর পাতা ট্যুইট, 
ড্র‌ইংরুমে চ্যানেলগুলোয়
চর্চা নিয়ে চর্যাবতী লেখা
তোমার অনেক ব্যস্ততা। 
হায়! ঠান্ডা শীতের সড়ক জুড়ে
লক্ষ বুকে কষ্ট তবু
তোমার নজর কাড়ে না,
তোমার দৃষ্টিতে কি বিশাল স্বচ্ছতা।
তোমায় তারিফ করতে হয়।

খাবার প্লেটে কি খেয়েছি
শুকর নাকি গরু
তুমি ভাবতেই পারো নিশ্চয়।
ক্রিসমাসেতে কোথায় যাবো,
কটা মন্দির মসজিদ ছিলো,
কটা মসজিদ ভেঙ্গে মন্দির
সবটাই তোমার জন্য রাখা
তুমি ভাবতে থাকো
       অঢেল, অঢেল সময় নিয়ে।
ততক্ষণ -
কারখানা সব বন্ধ হোক,
শিল্প জুড়ে ছাঁটাই হোক,
রোজগারেতে লাগাম টেনে
বেরোজগারে ভাতা হোক,
মন্দা নিয়ে মুনাফাতে
বাজার করি মাত।
লেনদেনটা আমিই করি
ভোটের তরী আমিই চড়ি
মেরুদন্ডে নদীর বাঁক
"রাজাকার"রাই রাজা হয়ে থাক।

 

বুধবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২০

যদি জন্ম নিতে হয়

।। সুপ্রদীপ দত্তরায়।।

 (C) Image:ছবি

দি ফিরে আসি আরো একবার

যদি আবারো আমাকে জন্ম নিতে হয়
আমাকে জন্ম দিও এই শহরেই।
এখানে আকাশ, বাতাস, জলাজমি
                        আর কাদা মাটি জুড়ে
অদ্ভুত আঁশটে গন্ধ।
জল থৈ থৈ উঠোনে
রাজহাঁস পাতিহাঁসের একছত্র দাপাদাপি --,
কাক বিড়ালের যুদ্ধ, জলফড়িংএর নাচ --
জীবন্ত শৈশব, আমার রোজনামচা।
যদি জন্ম নিতেই হয় আরো একবার --
আমাকে জন্ম দিও এই শহরেই।

এখানে পথ জুড়ে পীচ, পরতের পর পরত
বাড়িগুলো ক্রমাগত খাদের দিকে ছুটছে,
অনেকটাই আমাদের মানবিকতার মতো
ক্রমাগত তল থেকে তলানির স্রোত।
চওড়া রাস্তা জুড়ে ডিপার্টমেন্টের ঘা,
আবর্জনার স্তূপে ভোলানাথের দল,
আর অতিসাধে জিইয়ে রাখা ষাঁড়ের লড়াই।
শেষ মানেই খেল খতম।
এখানে সব হারিয়ে ছাগলের তৃতীয় ছানা --,
নতুন করে গজিয়ে ওঠা কিছু স্ট্রীটডগ -
সব এই শহরেই।
এখানেই পার্কের অভাব--, রাস্তা জুড়ে পার্কিং --,
ঊর্দির গায়ে সর্দির দাগ --,
লন ছেড়ে আন্দোলন চায়ের পেয়ালায়,
তবু দিনের শেষে অভিযোগ বস্তা বন্দি,
নিজেকে নিঃশেষ ক'রে "তিন্নাথের সেবা",
এ আমার অতি আদরের শহর।
জন্ম যদি নিতে হয় আরো একবার
আমাকে জন্ম দিও এই শহরেই।

এখানে রাজনীতি মানেই হিন্দু-মুসলমান
অসমীয়া-বাঙ্গালী, আর বিদেশি খেদাও "নারা" ,
প্রতিশ্রুতির ললিপপে বঞ্চনার মাইলস্টোন
আর আশায় আশায় ঢেউ গোনা।
এ আমার গর্বের শহর।
এখানেই শাক নিয়ে দর কষাকষি চলে
ভোট কেনাবেচা হয় গ্লাসে,
বিজ্ঞাপনে চোখ ঝলসায়
               মগজ ধোলাই ভাষণে।
যদিও নিঃশ্বাসে বিষ 
              আর হৃদয় জুড়ে চাটুকারিতা আমার কিন্তু ভীষণ পছন্দ --
যদি জন্ম দাও, তবে এই শহরেই দিও।

শনিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২০

আম্ফান

 
(C)Image:ছবি

 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
।। সুপ্রদীপ দত্তরায় ।।


সাফাই বিভাগের একজন কর্তাব্যক্তি
এক অতিথির সাথে প্রাতঃভ্রমনে --
যেদিকেই যান মোড়ে মোড়ে আবর্জনা স্তূপ
এক মেঘ কুন্ঠা নিয়ে উনি বিড়বিড় করে বললেন,
"এত চেষ্টা করি তবু --"
আমি তখন ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে,
বললাম, এ লজ্জা আপনার নয় সাহেব,
                                     আমাদের।
আপনার তবু বোধটুকু আছে
                    আমাদের তাতেও তলানি।

মলের সামনে প্রায় উলঙ্গ মহিলাটি বসে
ভিড় ঠাসা কামাতুর চোখেও 
                                 ‌আশ্চর্য নির্লিপ্ততা
অযত্নে অবক্ষয়ের এক প্রতিমূর্তি
কারো মেয়ে সে, বোন কিংবা হয়তো কারো মা।
মলের ঠিক সামনেই সিঁড়িতে বসা।
হাটের মতো খোলা দুটো বুক --
এখন সেখানে জৈষ্ঠ্যের খরা,
কোন এককালে সেও স্রোতস্বিনী ছিল
কাল গেলেও কালিমা থেকে গেছে।
সাবানহীন একখন্ড কটিবন্ধন
এককালে শাড়ি কিংবা গামছা ছিল হয়তো
সুযোগের ফায়দা নিয়ে সেও প্রতিবাদী,
এতটুকু অসতর্কতায় ঝড়ের ঝাপটা আনে।
একদল নতুন তরুণ মজা নিচ্ছিলেন
অথচ মহিলাটি আশ্চর্য রকম নির্বিকার।
আমার সাথে চোখাচোখি হতেই কেন জানিনা
লজ্জা কূন্ঠার চাদর চাপিয়ে দিলে গায়ে।
আমি নিমেষে চোখ নামিয়ে বললাম
এ লজ্জা তোমার নয়, আমাদের।
তুমি তবু শরীরে উলঙ্গ মা, আমরা যে মনে!

সকালে কাগজ খুলেই শিউরে উঠল বুক
নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছিল না কিছুতেই।
খবরের কাগজে আস্থা রাখিনা কোনকালেই
ওদের উদর জুড়ে ভেজাল চাল 
                      আর সারের ফুলকপি ।
তবু যদি তার খানিকটাও সত্যি হয়
ঈশানের মেঘ শুধু তোমার জন্য নয় "গোমস্"
আম্ফান সবার জন্যেই আসছে।

শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২০

দুঃসময়

 ।। সুপ্রদীপ দত্তরায় ।। 


 
 
 
 
 
কটার পর একটা শহর
লজ্জায় মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে
হাথরাস, বলরামপুর, বুলন্দশহর --
আরো কত কত অনুচ্চারিত শহরতলী ।
নিজেদের ঐতিহ্য খুইয়ে
করজোড়ে ক্ষমা চাইছে 
              সমগ্র নারীজাতির কাছে ।
অগুন্তি মাতৃযোনী কাঁদে তীব্র অনুশোচনায়
আজ পৃথিবী বুকে অন্ধকারতম দিন।

টিভির পর্দায় যখন ঝলসে ওঠছিল খবরগুলো
একজন বাবা হিসেবে গুটিয়ে যাচ্ছিলাম আমি
আশপাশের কালো ছায়া 
          যমকালো হয়ে ওঠছিল ক্রমশ
আমি ভয়ে শিউরে উঠছিলাম --
ওই মেয়েটিও যে আমার মতোই 
           ‌ কোন এক বাবার আদরের কন্যা।
পুলিশ কিংবা প্রশাসন --
              ভূমিকা প্রসংশনীয় নয়
     অন্তত প্রচারিত খবর তো তাই।
কি করে ছাই দিয়ে আগুন চাপা যায়
অলক্ষ্যেতে তার‌ই চলছে ক্রমাগত মহড়া।
কিছু লোক সুযোগের সঠিক ব্যবহারে --
নাটকের পর নাটকের মঞ্চায়ন হয়
বাষ্প হয়ে উড়ে যায় চোখের কোণে জল,
শুধু যে যায় সে আর ফিরে আসে না।

আমার‌ও একটা মেয়ে আছে, নিষ্পাপ
এখনও তার চোখে, মুখে, বুকে
সমাজের মলিনতা স্পর্শ করেনি।
সে জানে না অদৃশ্য নেকড়ের বেষ্টনীতে
           তার নিত্য যাতায়াত।
এখনও সে সকাল দুপুর যখন তখন
ট্রামে বাসে ছুটে যায় জীবনের সন্ধানে।
আমি শুধু আতঙ্কে থাকি, কি জানি
কোন কালো দৈত্যের ছায়া লাগে গায়ে।

এখন আর আগুন জ্বলে ওঠে না
মিছিলের পর মিছিলে মোমবাতি জ্বালিয়ে
এখন বাজারে প্রদীপের বড়  অভাব।
গুমড়ে ওঠা কান্না আর চাপা আক্রোশ
কামড়ে কামড়ে রক্তাক্ত করে 
                 নিজের সাথে দুটো হাত ।
এখন বড় দুঃসময়।

মনে হয় চিৎকার করে বলি হে ঈশ্বর 
যদি পুরুষশ্রেষ্ঠ হ‌ও, আমাকে ক্লীব করে দাও।
নিজেকে পুরুষ পরিচয়ে ঘেন্না হয় আমার,
মনে হয় আমারও ঘামে সেই পুরুষের গন্ধ।


শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

ইমোজি

।। সুপ্রদীপ দত্তরায় ।।


 
 
 
 
 
 
 
 
কাল থেকেই মোবাইল হাতে --
কখন একটা টুক করে শব্দ হবে
পর্দায় ভেসে উঠবে তোমার পাঠানো
একটু হাসির ঝিলিক, একটা ইমোজি।
আমি অপেক্ষায় থাকি।
প্রতিটি মুহূর্ত এক একটা যুগ যেন,
মনে হয় আজ বুঝি তুমিও গেলে,
আর বুঝি তোমার মনে আমার স্থান নেই ।
একটা ভয় আমাকে গ্রাস করে প্রতিদিন।
এই সবটাই আমার ইদানিং শুরু।

একটা দিন ছিল খুব বিরক্ত লাগতো ,
রোজ সকালে একগাদা শুভেচ্ছা
এক‌ই ছবিই নানা হাত ঘুরে ফিরে আসে
কোন নতুনত্ব নেই।
দু-তিন দিন পরপর‌ই হ্যাং হয়ে যায় মোবাইল।
কাজের কথাগুলো মনে হতো
অকাজেই হারিয়ে যাচ্ছে সব।
কত মিটিং আড্ডায় গর্ব করে বলেছি
" দয়া করে উইশ করবেন না, প্লিজ ---
পছন্দ করি না ". তুমি শুধু হাসতে নীরবে।
একটার পর একটা স্তুপীকৃত হতো বার্তা
ইচ্ছে করেই খুলেও দেখতাম না আমি
ইচ্ছাকৃত উপেক্ষা এক নিষ্ফলা আক্রোশে ।
তখন বুদ্ধিভ্রষ্ট ছিলাম,
জীবন ছিল ব্যস্ত নদীর মতো।

এখন এই নিঃসঙ্গতায় ,শারীরিক দূরত্বের সাথে 
মনের দূরত্ব‌ও বেড়ে গেছে অনেক।
কারো বাড়ি যেতে ইচ্ছে করে না আজকাল
মনে হয় বিব্রত করা হবে,
আবার বাড়িতেও কাউকে ডাকি না আমি
অজানা ভয় চোরাবালির মতো কাজ করে।
সবটাই একান্ত আমার অনুভূতি।

প্রথম প্রথম ফোন আসতো অনেক, 
একটা কৌতুহল, উৎকণ্ঠা আর
মুঠোফোনে খুশীর বিনিময়।
এখন চলছে পালা বদলের পালা
সবটাই বিষাদমাখা।
এখন কেউই ফোন করে না আমায়,
কী জানি অবাঞ্ছিত কোন দায়িত্ব
 কাঁধে চেপে বসে !
একমাত্র তোমরা ক'জন‌ই আলাদা।
এই দুঃসময়ে প্রতিদিন নিয়ম করে
আমার মঙ্গল কামনা করো -- শুভেচ্ছা জানাও --
নিজের সমস্ত যন্ত্রণা চেপে এই যে কামনা --
এতদিন বুঝতে পারিনি জানো,
এখন উপলব্ধি করি মর্মে মর্মে ।
এখন বুঝি তুমি বা তোমরাই 
আমার জীবনে সত্যিকারের বন্ধু,
আমার জলসা ঘরে আলোক উজ্জ্বল ঝাড়বাতি।
ভালো থেকো বন্ধু।


মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সেলিব্রেট

।। সুপ্রদীপ দত্তরায় ।।

(C)ছবি:image



 
 
 
 
 
 
 
 
কাশটা মেঘলা ভীষণ
বৃষ্টি হলেও হতে পারে আজ,
বৃষ্টি ভিজলে সর্দি হয় শুনেছি
সর্দি, জ্বরে আমার ভীষণ ভয়।

জীবনটা এমনিতেই ঝুঁকিতে ভরা
এর বেশি ঝুঁকি নেওয়া ঠিক নয় কিছুতেই,
নিয়মের একটা বাঁধা ধরা পথ আছে তো ?
আমার পথ পৃথক করবো কেন ?
ভারতবর্ষ স্বাধীন হবে যেদিন,
তেলেভোলোর মাঠটাও স্বাধীন হবে জানি।

তোমার মনে প্রশ্নগুলো "জীওল' মাছের মতোই
রান্নাঘরে হাঁড়ির মধ্যে গাদাগাদি রাখা,
জীবনের গ্যারেন্টি নেই, প্রশ্নের সংখ্যা !
অনেক লোকেই অনেক কিছু বলেন
তাই বলে ঝড়ের সাথি হতেই পারি না ।
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তোকে পেয়েছি শান্তি,
এখনও তুই অনেকটাই 'বন্য'।

আজ বৃষ্টি হোক কিংবা না
তোর ইচ্ছে থাক আর নাই থাক,
শান্তি, তোর খোলা বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে আয় না, 
বরাবরের মতোই আজ দুপুরটা 
                নিরাপদে সেলিব্রেট করি।


বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

আগর রহনা হ্যায়

 

।। সুপ্রদীপ দত্তরায় ।।

 

(C)Imageঃছবি

 

 

 

 

 

 

মার জন্যে প্রার্থনা করবেন সবাই,

আজ বেশ কিছুদিন রিপোর্ট পজেটিভ এসেছে।

এমনিতে কোন সিম্পটম নেই,

না জ্বর, না সর্দি, কাশি বা শ্বাসকষ্ট

শুধু স্বাদ আর গন্ধ বোধটি নেই।

মুখে নেই স্বাদ -- মনেও

প্রতিদিনের পাঁচমিশেলি খাবারগুলো

এখন অরুচি লাগে।

 

বাড়িতে রকমারি ফুল গাছ

ফুল ফুটেছেও অনেক।

সবাই বলে খুব নাকি সুন্দর গন্ধ,

আমি কোথাও গন্ধ পাই না খুঁজে।

প্রতিদিন যা রান্না হয়,

গরম মশলা, পাঁচফোড়ন কিংবা

ঘরে তৈরি কেক বা বারুদের গন্ধ --

কিছুই আর আমি পাই না।

সুবিধা অনেক, ভালোর সাথে মন্দ‌ও,

দিব্যি খেয়ে যাচ্ছি সব।

এখন কোন কিছুতেই নুন, ঝালের মাত্রা বুঝি না আমি ।

আমার কাছে রক্ত আর আলতা এক ।

 

আমার মতোই আরো অনেক রোগী আছেন

যারা মনে মনে অনেকদিন থেকেই আক্রান্ত,

মুখে স্বীকার করেন না, ভয়ে বা লজ্জায়।

ওইসব কোরোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য

আমার সত্যি করুণা হয়।

 

লোকে বলে মহামারী এসেছে দেশে

আমার কিন্তু মনে হয় তার‌ও বেশি কিছু।

সমস্ত বোধ শক্তিগুলো নষ্ট হয়ে গেছে সবার

                             ধীরে ধীরে।

চোখে বোবা দৃষ্টি,

যত প্রতিবাদ সব চার দেওয়ালের মধ্যে

বাড়িতে বৌ, বাচ্চা আর 

কাজের মেয়েমানুষটির সাথে ।

নিষ্ফল আক্রোশ আর গলা জ্বালা করা কান্না।

 

একটা সত্য এতদিনে উপলব্ধি হয়ে গেছে,

" আগর রহনা হ্যায় তো আওয়াজ নিচে,

বোলে তো বুলডোজার

 

 

 

শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সেরোগেট মা

                  
।। সুপ্রদীপ দত্তরায় ।।

 

 

(C)Image:ছবি

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

ছোটবেলা থেকেই জানি

আমি সেরোগেট বেবি, স্বাভাবিক ন‌ই।

আমার জন্মটা অন্য একটি

                           গর্ভ ভাড়া নিয়ে। 

অনেক টাকার বিনিময়ে। আমি জানি।

একজন মহিলা যিনি দশ মাস দশ দিন

তিলে তিলে প্রাণে স্পন্দন এনে আমাকে,

শুধু মাত্র টাকার বিনিময়ে ছেড়ে যেতে পারেন

তাকে লোকে যাই বলে বলুক ,

                     শ্রদ্ধা করতে পারি না --

এমনটাই ভাবনা ছিল আমার।

 

আমার এখন যিনি মা, নিজের শরীরটাকে

মাখনের মতো মসৃণ রাখতে আমাকে

ছেড়ে দিয়েছিলেন ওই মহিলাটির‌ই গর্ভে।

আমি জানতাম।

আমার সেরোগেট মা, ওকে আমি চিনি,

ছবি দেখেছি বটে, মনের ছবি আঁকিনি কখনো,

আমার‌ই দোষ,খানিকটা ক্ষোভ 

                      আর অবশ্য‌ই অভিমানে।

আমাদের বাড়িতেই কাজ করতেন উনি,

দেখতে সুন্দর, ছিমছাম পরিছন্ন,

অভাবের সংসারে যতটা সম্ভব, ছিলেন ,

একটা আশ্চর্য মমতা ছিল মুখে।

আমার জন্ম নিয়ে জটিলতা ছিল শুনেছি,

      তাই নিয়ে কষ্ট‌ও পেয়েছেন অনেক।

ডেলিভারির পর অনেকদিন, ছিলেন শয্যাশায়ী।

তারপর আর খোঁজ নেই।

প্রয়োজনে যশোদা মাকে পেয়েছি পাশে,

দেবকী আমার খোঁজ রাখেননি কোনদিন।

আমি সেটাই জানতাম।

আজ তিন বছর ফাইন আর্টসে মাস্টার্স করেছি

ইন্ডিয়ান স্কাল্পচার ছিল বিষয়।

বর্তমানে বিশ্ব বিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করি।

 

সেবার মন্ত্রীমশাইএর বাড়িতে দুর্গাপূজা হবে

মন্ত্রীমানুষ, ব্যাপার স্যাপার একটু আলাদা

সবকিছুতেই ব্যতিক্রম চাই।

আমার তাই ডাক পড়েছিল প্রতিমা গড়ার।

আদেশ নয় অনুরোধ, আদেশ থেকেও বড়,

না বলার ধৃষ্টতা আমার মেরুদণ্ডে কোথায়

একটা শর্ত দিয়েছিলাম শুধু, ছোট্ট একটা--

কাজটি আমি বাড়িতে করতে চাই, মণ্ডপেতে নয়।

মন্ত্রীমশাই তাতেই রাজি, খুশিতে সহমত ।

 

মন্ত্রী বাড়ির মূর্তি হবে, ঝক্কি আছে অনেক,

ভালো হলে, দেখতে সুন্দর, মন্ত্রী নেবেন ক্রেডিট,

আর যদি কাজটা খারাপ হয় ---, থাক।

অনেক যত্ন নিয়ে, নাওয়া খাওয়া ছেড়ে,

সৃষ্টি নিয়ে মেতে উঠলাম আমি।

একটু করে খড় বাঁধছি, মাটির প্রলেপ,

কাপড় সেঁটে ফাটল দিলাম ঢেকে।

ধীরে ধীরে আকৃতিটা নিল । রঙ চড়াতেই

             মায়ের মুখটি ভাসে। 

এত সুন্দর আমার হাতের কাজ !

মাগো, কত যত্নে ফসল তুলছি মা,

ঘরটা যেন ভরেছিল আলোয়।

অবশেষে মহাষষ্ঠী এলো আমার দোরে।

 

মন্ত্রীমশাই কথা রেখেছিলেন,

গাড়ি পাঠালেন, সঙ্গে একটা খাম।

দশটা মুটে কাঁধে তুলে নিল

                    টেনে তুললো গাড়িতে,

বাজলো সানাই, আতসবাজি

সঙ্গে একশো ঢাক।

মা চলেছেন সেজেগুজে মন্ত্রীবাড়ি আজ।

শতকন্ঠ গর্জে উঠে "দুর্গা মা কি জয় " ।

বুকের ভিতরটা মুচড়ে উঠলো

                            গলায় কান্নার দলা,

আর পারি না, আর পারি না, একি হলো !

আর একটু দাঁড়া, একটু দেখি,

আমার সন্তান, আমার সৃষ্টি, আমার "আত্মজা",

শেষ বারের মত আমায় একটু দেখতে দে,

ঘরটা আমার শূন্য করে আলো কাড়িস না। 

 

পায়ের নিচে শক্ত মাটি আটকে রাখে পা

 আমার ঘর আঁধার করে শয়তানের‌ই ছা।

বোবা কান্নায় বাতাস স্তব্ধ, আমি ঘরে একা,

সেরোগেট বেবি এবার সেরোগেট মা।