“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
সুমিত দেবনাথ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সুমিত দেবনাথ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০১৫

ছেলেটি আর মেয়েটি

(C )Image:ছবি






















------------------------------
© সুনীতি দেবনাথ

নীল সমুদ্রের চোরাবালিতে ডুবো পায়ে
সেদিন দৌড়োতে দৌড়োতে ওরা
হুমড়ি খেয়ে ঠিক পড়েছিল ঢেউয়ের কোলে।
তারপর ভিজে গেলো,  ঢেউয়ে নাচলো
সাঁঝের ছায়াঘেরা অস্পষ্ট আলোয়--
টলেটলে ঢলেঢলে ফিরে গেলো ঘরে।
সেই চান্দ্রমাসে ছেলেটি কথা দেয়
আগামী পূর্ণিমার প্রথম ভোরে প্রথম আলোয়
মেয়েটিকে সে সাজিয়ে দেবে দেবেই
গুচ্ছ গুচ্ছ কৃষ্ণচূড়ার স্তবকে স্তবকে।
তারপর তারার আলোয় সে কী যুগল নৃত্য!

সেদিন পূর্ণিমার ভোর
আকাশের আঙিনায় লেগেছে লালের ছোঁয়া
সাতসকালে মেয়েটি ডুব ডুব দিঘীর জলে
স্নান শেষে সবুজ শাড়ি পরলো
হলুদ ব্লাউজে সোনালি চুমকির
চিকন কারুকাজ
কপালে হলুদ ছোট্ট এক চিলতে
টিপ!
খোলা দরজায় হেলান দিয়ে কোণার্কের প্রতিমা!
এরপর অসহনীয় প্রতীক্ষা _
সকাল গড়ালো দুপুরে গনগনে আগুন সূর্য,
দুপুর ছুটলো ক্লান্ত বিকেলের ম্লানিমায়
সেতো এলোনা -- আর মেয়েটি?
ঝনাৎ ঝনাৎ কাচের টুকরো ভেঙ্গে ভেঙ্গে।

গেটের ওপাশে হুডখোলা পক্ষীরাজ জিপ
কত সফরের রোমাঞ্চ গায়ে মেখে!
 ঝনঝনিয়ে উঠলো সারাটি শরীর ছুটলো মেয়েটি।
ছুটছে পক্ষীরাজ হুড খোলা জিপ ছুটছে নাকি উড়ছে
নাকি বোল্ডার ছড়ানো পাহাড়ি পথে
উঠছে নামছে দোল দোদুল দুলছে
দুলছে যেন পার্কের দুরন্ত নাগরদোলায়,
উড়ছে খোলা চুল উড়ন্ত আঁচল
মনটা ছুটছে বাজছে দুরন্ত মাদল।

ওখানে যেতে হবে যেতেই হবে
পাহাড়ের খাঁজে নিচে ঝর্ণা ছলোছল নটিনী,
ওখানে সেই ছেলেটি ক্যানভাসে ছবি আঁকে
ওকি ভ্যান গগ নাকি লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি?
জানা হলো না!
মেয়েটির একটা ছবিও আঁকেনি সে, একদিনও না!
কি যে আঁকে সেই জানে।
মনে হয় দেখে আদিম মানবের গুহাচিত্র যেন
ছেলেটিকে মনে হয় বহুকাল আগের
সেই আধামানুষ,  সেও নিজে তেমনি মানবী।
মন চাইতো বলে, আমাকে আঁকো না!
আর তখনই ভোরালি সিঁদুরে লজ্জা আঁকতো মুখে,
না বলেনি কোনদিন।

যখন আঁধার নামছে ভরা পূর্ণিমা নিটোল --
অরণ্য ঝর্ণা জ্যোৎস্না স্নানে মগ্ন
মেয়েটি কাঁপা পায়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে চললো
পৌঁছে গেলো সেখানে, ডাগর চোখ আরো বড় করে তাকালো
সুবিশাল ক্যানভাসে সেই তো শুয়ে
অবিকল সে, তার দীঘল গোছা চুলে
সাজানো কৃষ্ণচূড়ার গুচ্ছ,  ওডিসি নৃত্য মুদ্রায় এলিয়ে আছে বাহুবল্লরী
অলক্তক সিঞ্চিত দুটি পা,
আধবুজানো আঁখি দুটি!
সে যেন নারী নয় স্বর্গনদী সুরধুনী!
ছেলেটি শুয়ে আছে পদতলে
যেন দেবাদিদেব মহেশ্বর!
এ কী অপরূপ দৃশ্যপট!

মুহূর্তে সে ছবি হয়ে গেলো
গঙ্গোত্রী থেকে সহস্র ধারে আনন্দে তরঙ্গ তুলে সে নেমে আসছে
ভেসে যাচ্ছে দিগ্ দিগন্ত বেগের তাণ্ডবে,
আর হাসিমুখে ছেলেটি ছড়িয়েছে জটাজুট
মস্তকে ধারণ করছে বেগবতীর ধারা।
মেয়েটি গলে যাচ্ছে কেবলই যাচ্ছে,
ছেলেটি হাসিমুখে তাকে
জটাজুটে আটকে রাখছে শুধু  রাখছে।

 




শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

দানব-রূপী মানবের জন্য, যারা প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে (১)

                                                                         ।। সুমিত দেবনাথ।।
             সাপ নিয়ে যেমন মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই, তেমনি সাপ দেখলেই মেরে ফেলার স্বভাব মারাত্মক। ৩রা সেপ্টেম্বর,২০১৪ রাত প্রায় ১০টার দিকে লুপ্তপ্রায় দুটি সাপের নিধন হলো ত্রিপুরার ধর্মনগর মহকুমার, গঙ্গানগর গ্রামে। হয়তো ৫ মিনিট আগে ঘটনাস্থলে পৌঁছালে সাপ দুটিকে জনতার কাছে থেকে উদ্ধার করতে পারতাম। কালো-হলুদে ডোরা কাটা যে সুন্দর সাপটি দেখছেন সেটির স্থানীয় নাম - শঙ্খিনী, ইংরেজি নাম - Banded Krait, বৈজ্ঞানিক নাম - Bungarus fasciatus। এদের রাতের বেলা চলাচল করতে দেখা যায় (nocturnal), দিনে গুটি মেরে বড় গর্তে পড়ে থাকে।  বিরক্ত হলে তার মাথাটি গুটির মধ্যে লুকিয়ে ফেলে। এরা খুবই লাজুক প্রকৃতির এবং সাধারণত খুব বিরক্ত নাহলে ছোবল দেয় না। তবে এরা মারাত্মক বিষাক্ত, ভারতের যে কয়েকটি মারাত্মক বিষধর সাপ আছে তার মধ্যে এটি একটি। এদের বিষ স্নায়ুবিনাসী (neurotoxins)। ভারতীয় উপমহাদেশের বিশেষত ত্রিপুরা, আসাম, উত্তরবঙ্গ এবং বাংলাদেশে এদের বেশী দেখতে পাওয়া যায়। বিশেষ করে অন্যান্য বিষাক্ত এবং বিষহীন সাপই এদের প্রধান খাদ্য, তাছাড়া বিভিন্ন গিরগিটি, মাছ এইসবও খায়।
         মন্তর গতি এবং চোখে তীব্র আলো ফেললে চলতে না পারাই তাদের বিলুপ্তির প্রধান কারণ। যে কারণে মানুষ এদের সহজেই মেরে ফেলতে পারে।
         অজ্ঞতাবশত একে দু-মুখী সাপ বলা হয়, আসলে এদের একটাই মুখ । লেজের শেষপ্রান্ত একটু মোটা, মুখের মতো দেখতে। এটা তার শিকার ধরার সুবিধার জন্য বিবর্তিত হয়েছে। অন্যান্য প্রাণীগুলির সাথে তার মন্তরগতির জন্য দৌড়ে পারবে না, তাই সে যখন তার শিকারকে ঘিরে ধরে তখন তার লেজটিকে নাড়াতে থাকে। শিকার মনে করে লেজটাই মনে হয় মাথা সে তখন মাথার পাশে দিয়ে পালাতে চাইলেই তার মারণ ছোবল বসিয়ে দেয়।
 ০৩/০৯/২০১৪ তোলা শিকার এবং শিকারির মৃত ছবি।

 গত বছরের তোলা ছবি ভ্রাতৃপ্রতিম সুমিত নাথ দ্বারা উদ্ধারকৃত শঙ্খনী

গত মে মাসে এই সবুজ বোড়াকে দিনের বেলা টেক্টরের চাকা থেকে উদ্বার করে 
জঙ্গলে ছেড়েছিলাম।

          শঙ্খনীর পাশে যে সরু সাপটা দেখতে পাচ্ছেন সেটি শঙ্খিনীরই  আহার ছিল,  মানুষের হাতে পড়ে শিকার ও শিকারির এই পরিণতি। এই সাপটাও যথেষ্ট বিষাক্ত, এটির বাংলা নাম সবুজ বোড়া, ইংরেজি নাম - Green Pit Viper, বৈজ্ঞানিক নাম - Trimeresurus। এরাও নিশাচর, সাধারণত গাছে, ঝোপেঝাড়ে থাকে, গায়ের রং সবুজ হওয়ায় সহজেই ঝোপে-ঝাড়ে মিশে যায় এবং এটিই তার শিকার করার প্রধান কৌশল, সাধারণত টিকটিকি, ছোট পাখি, ব্যাঙ এইসবই তার প্রধান খাদ্য। এদের Hemotoxic বিষও মানুষ মারার পক্ষ্যে যথেষ্ট, Hemotoxic বিষ লোহিত রক্ত কণাকে ভেঙ্গে দেয়। একটু উগ্র প্রকৃতির সাপ, বিরক্ত হলে ছোবল দিতে কার্পণ্য করে না। এদের দাঁত অত্যন্ত উন্নত, বেশ বড়। অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে এরা ছোবল মারে। এদের মুখের কাছে তাপ সংবেদনশীল একটি যন্ত্র আছে (Pit) যার সাহায্যে অতি সহজে এরা সামান্য উষ্ণতার তারতম্য নির্ধারণ করতে পারে যা তাদের শিকারে সাহায্য করে। এই সাপের বাস প্রধানত ভারতীয় উপমহাদেশে হলেও ত্রিপুরায় এই সাপ খুব কম দেখা যায়, এটি আমার দেখা দ্বিতীয় সবুজ বোড়া, প্রথম টিকে রক্ষা করতে পেরেছিলাম এটি পারি নি। ( আজকের তোলা ছবিটি স্পষ্ট হয় নি বলে সঙ্গে আরোও দুটি ছবি দিলাম যেগুলি ধর্মনগর ত্রিপুরা থেকে তোলা)।