“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
ঊর্ধ্বেন্দু দাশ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ঊর্ধ্বেন্দু দাশ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

সাকিন আসাম, ১৯৮৩



ঊর্ধ্বেন্দু দাশ
(C)Image:ছবি
 ( সুপরিচিত, বহুপঠিত এই কবিতাটি ঊর্ধ্বেন্দু দাশের 'এই লজ্জা তোমার আমার' কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। পরে 'নাইন্থ কলাম' প্রকাশিত 'নির্বাচিত কবিতা'-তেও সংকলিত হয়। আসাম আন্দোলন এবং সম্পর্কিত পরবর্তী রাজনীতির আবর্তে কবিতাটি এখনো সমান প্রাসঙ্গিক ভেবে আমরা ঈশানের পাঠকদের জন্যে তুলে দিলাম। ---সুশান্ত কর)







 
 
 
 
 
 
 
গ্নস্তূপের মাঝে আজ এই পরিত্যক্ত গাঁয়ের চাতালে
আশি বছরের পোড়া রূপের দেমাক নিয়ে শুয়ে আছে আমার নানিমা,
হন্তারক মানুষের জান্তব পদচ্ছাপ বুকে নিয়ে শস্যহীন বসন্তের মাঠ,
রক্তাক্ত পাঁকে দ্যাখো মুখ গুঁজে পড়ে আছে আমার হানিফ চাচা, তার
বাষট্টির পোড় খাওয়া, গুলিতে ঝাঁঝরা-হওয়া শরীর জুড়িয়ে।---
খোদার মসজিদ আর ঈশ্বরের নামঘর, মাঝে শতাব্দীর টানা অন্ধকার পথ,
পথের দুধারে ছিন্ন শরীর, ভিন্ন
            প্রৌঢ়ের শির, দীর্ণ জননীর যুগল উরোজ।---
ওদিকে ভরলি আর এধারে কলঙসুঁতি, কপিলি, দিখৌ---
লুইতের পার ধরে জলের উজানে যাও, জলের ভাটায় যাও,
শ্মশান, ---শ্মশান। ...
চাপরি, লাহরিঘাট, গোড়েশ্বর, চাউলখোয়া, নেলি,
চামগুড়ি,গহপুর, মাজুলি, শিলাপাথার, নওজান, নিয়ামাটি, হাজো---
সর্বত্র চিতা জ্বলছে : ‘ এই জুই জ্বলিছে , জ্বলিব।’---

কারা বলে এ-আগুন জ্বলছে, জ্বলবে---ওরা কারা?---
ওরা কি মানুষ? না-কি মানুষের শব ঘিরে অশরীরী প্রেত বা পিশাচ?---
কারা  বলে ‘এই যুঁজ মানুহর অস্তিত্বর যুঁজ’?---
বুলেট ও তিরের মুখে,ছোরা- ভোজালির কোপে
                        ভূলুণ্ঠিত তামাম নসিব।–
বুনো উলুখড় আর হোগলাপাতায় ছাওয়া অগণন আশ্রয়- শিবির,
সেখানে চোখের জলে ভেসে চলেছে স্বামীহারা, পুত্রহারা, জায়া ও জননী,---
এধারে ভৈয়াম আর ওদিকে ডুয়ার্সের শরণার্থী-শিবিরে আমারই
তেত্রিশের সোনাবৌদি, তেরোর কিশোরী বোনটি, একান্ত পেটের জ্বালায়
গতর বিকোতে, দ্যাখো, দাঁড়িয়েছে টানা রাজপথে। ...
এই লজ্জা, হে স্বদেশ! শতাব্দীর ঘৃণ্যতম হে মশান,
                                    তোমার, আমার!
এই পাপ, হে মানুষ! ভাষা-ধর্ম-প্রজাতির প্রেত অন্ধকারে মগ্ন
হে পিশাচ, তোমার—আমার। ...

তিন সমুদ্রের জল, সাতাশ নদীর ঢল, এসেছিল পেরিয়ে সেবার
গুটিকয় ধড়িবাজ লালমুখো দানো,---
বাঁহাতে তাদের টানা ফিরিস্তি, ডানহাতে রঙিন আতস কাচ; বলে
ওরা নাকি এদেশের মানুষের নিরঙ্কুশ ভালো করতে চায়। ----
বরফের অভ্রছোঁয়া দেওয়াল ডিঙিয়ে আসে, সেই শীতে, দানোর দোসর
হলুদ-ছোপানো-মুখ আরো কিছু শিকারি শ্বাপদ, ---
পকেটে তাদেরো চড়া ইস্তাহার : ওরা নাকি মানুষের তামাম নসিব
বদলে দিতে চায়। ...
কোথাও মানুষ ছিল, --- মানুষের বুলে ভালোবাসা;
কোথাও অরণ্য দূর,---ন্যগ্রোধের পল্লবিত হাত;
কোথাও পুষ্পিত পথ, ---কুসুমের চোখে দীপাবলি । ---
মানুষের সব গিয়ে, হিংসা ও হনন আজ হয়েছে পাথেয়;
মানুষের চোখ থেকে বহুদিন নিভে গ্যাছে মহাবোধি আলো;
মানুষের সবই গ্যাছে। --- আছে শুধু পতন ও বিনাশের এক
প্রাতিস্বিক ভয়। ...

অথচ এসবই নিয়ে গান বাঁধে, ছবি আঁকে ভাড়াটে শিল্পীরা। ...
কুকুর-কেত্তন হয়। সংবিধান-মতে ঢের ঢলাঢলি, মাতামাতি হয় ।---
দিল্লি থেকে ছুটে আসে হিন্দুর গার্জেন, কিংবা মোসলেমের ফুফা :
তান্ত্রিক হুল্লোড়ে কাঁপে অহর্নিশ বুক নিঝুম শিশুর,
কেঁপে ওঠে মাদার টেরেসা। ---

হাজার বছর ধরে তবু এই পথ দিয়ে হেঁটে গ্যাছে মানুষের মুখ,
হাজার বছর ধরে এ পথে এসেছে ফিরে অন্তহীন মানুষের মুখ,
হাজার বছর ধরে এই পথে উদয়াস্ত মানুষের মুখের মিছিল। ...
গাঁয়ের ঝিঊড়ি যাবে বধূ হয়ে, চোখ মুছে, ভিন জনপদে;
রূপমতী কনেটির হাত ধরে ঘরে ফিরবে এগাঁয়েরই দামাল ছেলেটি;
নামঘরে চাকি জ্বলে, মাজারে মোমের শিখা; ‘কে যায়? কে যায়?’---
‘মই হে আসাদ ভাই, পানিরাম বরা।’ ---
‘কেনি যোয়া?’--- ‘এ-রা!
নামঘরলৈ যাম। ককাদেউতা হলোঁ।’
‘দাঁড়াও হে বরাভাই! আমিও হয়েছি নানা, ---দামাদের খৎ দেখে যাও।’
ভস্মস্তূপের মাঝে এ মহার্ঘ ছবিখানি
আজ এই পরিত্যক্ত গাঁয়ের চাতালে
কোথায় হারিয়ে গ্যাছে! হন্তারক মানুষের জান্তব পদচ্ছাপ বুকে
বীজ-পত্র---শস্যহীন, নদীও---নক্ষত্রহীন, আদিগন্ত বসন্তের মাঠ---
লুইতের পার ধরে জলের উজানে যাও,জলের ভাটায় যাও,
সর্বত্র চিতা জ্বলছে; শ্মশান, ---শ্মশান; ...

হাজার বছর ধরে যদিও এপথ দিয়ে শোনা গ্যাছে
কল্লোলিত জীবনেরই গান। ---

শুক্রবার, ১৪ মার্চ, ২০১৪

ঘরে ফেরার দিন


                                             কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ


 


দোপাটির গোছ খুলে অঢেল চুলের রাশ কবরীর প্রান্তে ছড়িয়ে,
জলের ঝালর –ঘেরা চোখের তারার হাসি থরো-থরো ওষ্ঠে ঝরিয়ে,
শিমূল-ঝরার দিনে পাহাড়তলির ঘন আলতায় পা-দুটি ডুবিয়ে
সম্রাজ্ঞীর মহিমায় ভাস্বর তোমার ছবি কতকাল ভুলতে পারিনি!---

শিমূল ঝরার দিন অতঃপর পৃথিবীতে বারবার এসে, চলে গ্যাছে—
নির্জন বনস্থলী, ঝরনার সিম্ফনি, বলাকার ডানায় কেঁপেছে;
অরণ্যের চন্দ্রাতপে সূর্যের আলপনা-গায়ে দেহাতিরা ঘরে ফিরে গ্যাছে—
নাহর ছায়ায় হেঁটে কখন বিকেল এলঃ তুমি আর ফিরেও ডাকোনি।–

 তোমার উঠোন জুড়ে আমার সতর্কপদ বিকেলের রোদের ক্রমণ,--
 চৈত্রের বিবর্ণদিন ; বিশীর্ণ প্রপাত ঘিরে ঝরঝর জলের পতন
 অদূরে বিচিত্র-সাজ পার্বতী-রমণীর ভারনত শিলাবতরণ—
 মেঘে মেঘে বেলা যায়, আমার অপূর্ণ ঘট ভরা তবু হয়েতো ওঠেনি!_
 সম্মুখে আঁধার রাত, দুর্গম চড়াই –পথ হেঁটে তবে তোমার সীমানা—
 মা, তুমি নিশ্চিত জেনো, সোনালী সূর্যোদয়ে পৌঁছবো ঘরের ঠিকানা।



 ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
আরো কিছু কবিতার সঙ্গে এই কবিতার আবৃত্তি এখানে শোনা যাবেঃ
)

মঙ্গলবার, ৬ আগস্ট, ২০১৩

শুধু কবিতার জন্যে



(ঊর্ধ্বেন্দু দাস অসম তথা পূর্বোত্তরের অন্যতম শক্তিশালী কবি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'শুধু কবিতার জন্যে' কবিতাটির অনুপ্রেরণা নিয়ে এক অন্য বয়ান তিনি হাজির করেছিলেন এই কবিতায়। আমার ভালো লাগা কবিতা তাই এখানে দিলাম।)
ঊর্ধ্বেন্দু দাস
 
তিনটি স্লোগান কারা গেঁথে দিয়ে গেল, কাল
মধ্যরাতে দেয়ালে আমারঃ
‘শুধু কবিতার জন্যে বেঁচে থাকা সম্ভব।’—
‘শুধু কবিতার জন্যে তোমার অস্তিত্ব অর্থবহ।’
‘শুধু কবিতার জন্যে দেহের পতনও তুমি
হেলায় নস্যাৎ করতে পারো।’—

এবার দেয়াল ভেঙে ফেলাটুকু বাকি-ই যা---
তাবৎ ভাষ্য আর তত্ত্বের পচন থেকে ভালোভাবে বাঁচতে হলে,
           এবং বাঁচাতে হলে সবটুকু স্বকীয়তা---
কাম ক্রোধ লোভ মোহ মদ এবং মাৎসর্যের তাপ,
স্বপ্নাতুর অস্তিত্বের স্পর্ধিত বিলাস,--
কবিতার উৎসে এসে স্থির-চিত্তে বসতে হবে,
নগ্ন পদ; নতশির---
রক্তছোপ বাস ছেড়ে জন্মের পথম ত্রিবেণীতে।

শুধু কবিতার জন্যে বেঁচে থাকা চলতে পারে শতেক জীবন---
শুধু কবিতার জন্যে হত্যা করা যেতে পারে সহস্র জীবন---
শুধু কবিতার জন্যে কেড়ে নেওয়া চলে রোজ ভিখিরির উঞ্ছ-রোজগার,-
কবিতার জন্যে ফের মায়ের হৃদপিণ্ড ছিঁড়ে, প্রেমিকার পদতলে
দেওয়া যেতে পারে উপহার।---

কবিতার জন্যে আজো শেয়ার বাজারে রোদ ধুলোর চেয়েও কমদামি,
কবিতার জন্যে আজো বিশ্বাসঘাতিনী নারী সোনার থেকেও লোভনীয়,
কবিতার জন্যে, দেখো , ঈশ্বরবিহীন দেউলে অভিজাত মাতামাতি চলে—
শুধু কবিতার জন্যে রক্তাক্ত ললাট মুছে , অশ্রু চেটে, প্রিয়াকেও
প্রতিপক্ষ প্রেমিকের হাতে সঁপা চলে।–

কবিতার জন্যে কেউ চেয়েছে সবৎসা ধেনু, রমণী ও ভূমি;
কবিতার জন্যে কেউ চেয়েছে অক্ষয় কীর্তি, অনন্ত জীবন;
শুধু কবিতার জন্যে স্বচ্ছা-নির্বাসনে কেউ হয়েছে শহীদ,-
কবিতার জন্যে ফের অস্তিত্বের দৃপ্ত ঘোষণায়
যৌবন-বাউল কেউ অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছে।...

কবিতার জন্যে আজো মধুময় মরুৎ , সলিল—
কবিতার জন্যে আজো মধুময় অস্তোদয়-সূর্যের অয়ন;
শুধু কবিতার জন্যে মধুময় এ ধরণী, এ –জীবন এবং মরণ, --
শুধু কবিতার জন্যে সাগরে স্তম্ভন, মেঘে অশনি –দহন। ...
কবিতার জন্যে শুধু শিশুর মুখের হাসি এত অনুপম,
কবিতার জন্যে শুধু নারীর দুচোখ জুড়ে রহস্য অপার---
কবিতা হয়েছে, তাই সৃষ্টি হলো স্বর্গ ও নরক;
কবিতা হয়েছে তাই জন্ম নিল দেবতা , দানব;--
শুধু কবিতার জন্যে ঈশ্বরের ভাবমূর্তি এত জ্যোতির্ময়ঃ
কবিতার জন্যে ফের প্লাবনের তোরে বসে যুগে যুগে ঈশ্বরের
                          স্খলনকে ক্ষমা করে এসেছে মানব। ...

কবিতা লিখেছি আমি ঘাম, রক্ত, পাপ, ব্যাধি, পতন ও মৃত্যুর ছায়ায়;
কবিতা লিখেছি আমি অর্ধাশন –উপবাস-অপমান-নির্যাতন সয়ে;--
মাতাল-দাঁতাল হয়ে , উন্মত্ত ধীমান শান্ত তীব্র উদাসীন
সম্ভ্রান্ত ক্ষুধার্ত ক্রুদ্ধ অতৃপ্ত ধার্মিক সৎ মগ্নও চতুর
ভূতগ্রস্ত ভয়ংকর আত্মনাশী একদল স্বপ্ন-বিলাসীর
 সাগ্নিক মিছিলে মিশে , নারীর স্ফুরিত ওষ্ঠ,
                     স্তনাগ্র, সরোম ঊরু,
 যোনি খুঁড়ে খুঁড়ে
কবিতার ধমনিতে এনেছি লোহিত ঊষ্ণ –শোনিতের সফেন প্রবাহ। ...


শুধু কবিতার জন্যে বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হয় অপার –জীবন,--
শুধু কবিতার জন্যে আটকে রাখতে ইচ্ছে হয় আসন্ন –মরণঃ

মেষ –পালকের গানে বহুরাত পৃথিবী জেগেছে---


মেষ-পালকের গানে বহুদিন পৃথিবী ঘুমোবে।

( কাব্য গ্রন্থঃ শরসয্যা)

মঙ্গলবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

জাহাজডুবির পূর্বসংকেত
















                              


                                                               
 
 
 
 
 
 
 
 
 
     ।। ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ।।

 
 
 
 
 
 
 
 
 
 নিয়নের ত্রিসীমানা ছাড়ালেই বাঁশবন, পচা ডোবা, টিম-টিম কেরোসিন-আলো
অনন্ত ডুবোমাঠে উপুড় আকাশ, ঝিঁঝিঁ, রাতভোর শেয়ালের প্রহর –ঘোষণা;--
উলুঝুলু কবি, তুমি ভুলেও কখনো যেন কলকাতা ছেড়ো না...
কলকাতার চতুর্দিকে হাঁ-মুখ দাঁড়িয়ে ধু-ধু অন্ধকার মফসসল, ধুলো—
মাঝে মাঝে আলটপকা ঝলসে ওঠা শিল্পবলয়, কোনো রিকেটি শহর
কিছুদূরে চেকপোস্ট, কাঁটাতার, খোলা বেয়োনেট; আরো দূরে
ফেডারেল স্ট্রিম লাইন, প্রদেশ বা ভাষাগত মারমুখী জনতা,-পরবাস।...
ওখানে টিউব নেই, এয়ারকুলার নেই, টিভি নেই , লিফট নেই, ফ্লাইওভার নেই
স্টেশন –সিটিং নেই, গ্যালারি সদন নেই; বইমেলা, থিয়েটার, ফিলমক্লাবও নেই
কুলীন কাগজ নেই, দাগী প্রকাশক নেই; লেঙ্গি নেই, ভাঁওতা নেই, ডুডু ও তামাক নেই
কফি-ভবনের ভিড়ে তুখোড় দাদারা নেই, স্তাবক চামচারা নেই, পিঠ-চুল্কুনি নেই
দালাল-প্রতিভা নেই, ফরেইন মিশন নেই, মদ-মাগি-মচ্ছবের জবরদস্ত আখড়া নেই
শহীদ মিনার নেই, ফিচারের মজা নেই, শেয়ার-বাজার নেই, ঘোড়ার ঠিকুজি নেই
স্টিমার-পিকনিক নেই, ট্র্যাফিক জ্যামিং নেই; লাগাতার লোডশেডিং,
                                       চুরি ও ছিনতাই নেই
মাস্তানি-বিপ্লব নেই, মহান পুলিশ নেই, শৈল্পিক নির্লিপ্তি নেই, বিশুদ্ধ পাতাল নেই
লিগের মরশুম নেই, শেল কিংবা লাঠি নেই, চিকিৎসা-বিভ্রাট নেই,
                                      বৈদ্যুতিক চিতা নেই
যশোকামী কবি, তুমি ভেবে দেখো মফসসলে কত কিছু নেই। ...
মফসসল মানে চাপা পাড়াগাঁর অন্ধকার, লণ্ঠন-রহস্য, পচা পিছুটান, ক্লেদ—
গ্রামীণ বিষাদ ছুঁয়ে চাষাড়ে কবির জীর্ণ মলিন কাঁথার ফোঁড়, তেল-চিটচিটে
নোংরা লিটল ম্যাগ, ম্যাদামারা কবি-সম্মেলন, ত্রাহি গানের উৎপাত, চাঁচাছোলা
ভাষণের অত্যাচার , জোলো আপ্যায়ন, ধুলো-কাদায়-লোপাট পথে ভূত হয়ে ফেরা।–
পরবাস আরো বেশি ক্লান্তিকর, পশ্চিমে ততটা নয়, পূবদিকে যতটা দুঃসহ—
ওখানে লণ্ঠন কিংবা ভৌতিক রহস্য নেইঃ শুধু গ্রানিটের দীর্ঘ ওঠানামা, ভারী
নদীর গর্জন; হিংস্র মানুষ ও পশুতে ভরা নিওলিথ-অরণ্যের জমাট আঁধার।–
ওখানে বাঙালি যারা, নিতান্ত ছাগল—কেউই বাংলা জানে না; এই কলকাতা হতে
নেহাত কাগজপত্র কিছু রোজই উড়ে গিয়ে এখানে ওদের মোটামোটি মানুষ রেখেছে;
পদ্যের ব্যাপারে ওরা নির্ঘাত পিছিয়ে আছে একশো বছর , আর
             দুঃখের কথা কী বলব,---
অমন রবীন্দ্রনাথ, তেনাকেও মিনিমাম তিনজোড়া লাথির ঘায়ে যারা অনায়াসে
ধুলোয় লুটোলো,--ঘোর মধ্যরাতে কলকাতা শাসন করে, রমণী দমন করে, যারা
শুধু কবিতার জন্যে ভুবন পেরিয়ে এসে, শিল্পকে পেঁদিয়ে করল তুরুপের তাস—
সেসব বিশ্রুতকীর্তি, তুলকালাম প্রতিভার নাম এরা স্বপ্নেও শোনেনি। ...
এসব জেনে ও বুঝে, হুঁশিয়ার কবি, তুমি ভুলেও কখনো যেন কলকাতা ছেড়ো না;--
কলকাতার কবি মানে রাজকবি, জমিদার—তামাম মফসসলে ছড়ানো রয়েছে এনাদের
হাজারো মহাল; আছে নায়েব, গোমস্তা, পাইক, পেয়াদা এবং যত বংশবদ প্রজা।–
মাঝে মাঝে ট্যুরে যাবে, হাওয়া বদলাতে যাবে, কখনো-বা সপরিবারেও—
দেদার কবিতা পড়বে, মুফতে আরাম লুটবে, ঢালাও অ্যাডভাইস দেবে,-দেখো
এদেশে এখনো শুধু উপদেশ ট্যাক্সো লাগে না; আর-সাধ্যের ভিতরে যেন কোনো
প্রতিশ্রুতি কাউকে দেবে না। শোন মদ খাবে বুঝে শুনে, লুকিয়ে-চুরিয়ে; আর
রমণী-ঘটিত ঝুটঝামেলা এড়িয়ে চলবে; দিনকাল খারাপ—
             হুম, জানোই-তো ভায়া—

এদানিং মফসসলও যথেষ্ট লায়েক হচ্ছে, ইতি বলতে বেমালুম বুঝে নেয় গজঃ ।...
সম্প্রতি মহালে বেশ হামলা চলছে, দ্রুত অসন্তোষ বাড়ছে নির্বিরোধ প্রজাদেরও মনেঃ
কাগুজে বাঘের খুব উপদ্রব; কয়েকটি মহাল চাইছে অটোনমি, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীভবন।–
এইসব দুর্বিনীত , বিচ্ছিন্নতাকামীদের পিছনে নির্ঘাত আছে বিদেশি শক্তির উস্কানি,--
এ নিয়ে স্বরাষ্ট্র সেলে জোর গবেষণা চলছে; আপাতত বন্ধ আছে ধোপা ও নাপিত,
কুলীন কাগজ আর বইপাড়ার সবকয়টি গোপন জানালা বন্ধ; এই সব রাজদ্রোহীদের
কী করে শায়েস্তা করবে কলকাতার জানা আছে; এরপর মোক্ষম ছাড়বে বিলিতি দাওয়াই,
 কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা, বিষেন বিষক্ষয়; সংক্ষেপে বলিতে গেলে, হিং-টিং-ছট।...
জনান্তিকে বলে রাখি, মেট্রোপলেট কবি! নিতান্ত প্রাণের দায়ে সবিশেষ করহ শ্রবণঃ
মফসসলি বালিকারা প্রণয়কুশলা নয় কলকাতার সুরঙ্গমা, কলাবতী নারীর মতন—
বিবাহে প্রশস্ত এরা, টলমলে দুটি শান্ত চোখের ছায়ায় যেন দিঘির অতল হাতছানি;
এদের সহিত তুমি নিছক আলাপ রাখবে, ডাকবিভাগের কোনো সদাশয় পিয়োন-মারফত—
সেইসব পিয়নেরা , যাহাদের গোঁফ ভারী, চোখ লাল, পরিধানে খাকিরং পুলিশি পোশাক,
পুলিশের চোখে ধুলো আদৌ সম্ভব নয়;--

আর, যদি নিতান্তই গ্রহের বৈগুণ্যে তুমি, নিজে
জেনেশুনে পান করো হলাহল, ঝাঁপ দাও দিঘির অতলে—তবে, সাফ জেনে রাখো
তখন দমকলে কিন্তু খবর দিতেও কেউ ছুটে আসবে না।–
                                                                       (c) ছবিঃ সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়