“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

বুধবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৮

কিশোর রঞ্জন দে'র কবিতা / সেলিম মুস্তাফা

।। সেলিম মুস্তাফা ।।

কবি কিশোর রঞ্জন দে’র কিছু কবিতা আমার ব্যক্তিগত মন্তব্যসহ ফেসবুকে দিয়েছিলাম বিগত কিছুদিন ধরে । সেগুলো আজ এখানে দিলাম বৃহত্তর পাঠক সমাজের কাছে ।

১.
কবিকে পাথর ছুঁড়ে মারো
কবি কিশোর রঞ্জন দে । আজ তাঁর কবিতা পড়তে চাই ।

মি যখন কবিতা বা ছন্দ-টন্দ কিছুই বুঝি না, কিন্তু লিখে ফেলেছি প্রায় শ’পাঁচেক কবিতা, তখন কিশোর রঞ্জন পাকা কবি । কখনো স্বরবৃত্তের দোলায়, কখনো টানা গদ্যে, তাঁর অদ্ভুত সব কথাবার্তা ! আমরা কান পেতে শুনি আর মুখ থাকে হা হয়ে ।
কবি পীযূষ রাউতের সর্দারীতে চলছে সাপ্তাহিক মঙ্‌লার হাট ! প্রতি মঙ্গলবার ধর্মনগরের বি.বি.আই-এর টীচার্স কমনরুমে দুটো ইয়া বড় টেবিল জোড়া দিয়ে চারদিকে সাহিত্যের পসরা নিয়ে বসতাম আমরা । হাট বললাম এজন্য যে, তখন ওই আসরে কবির সংখ্যা ছিল বত্রিশ । আর এই বত্রিশের মধ্যেই তিনজন আবার গল্পকারও বটে । দীপক দেব, দীপক চক্রবর্তী আর এই কিশোর রঞ্জন দে । সাল ১৯৭৬ ।
প্রত্যেকে তিনটি করে স্বরচিত কবিতা পড়া ছিল বাধ্যতামূলক । বেশি আনলে, সেগুলো সবার শেষে পড়া হতো । প্রতিটি লেখার ওপর বাকি একত্রিশজনের মন্তব্য করতেই হতো এবং প্রতিটি মন্তব্য পীযূষদা একটা লম্বা খাতায় লিখে নিতেন সঙ্গে সঙ্গে । এমন সর্দার কেউ পেয়েছে কি না জানি না!
কিশোররঞ্জনের স্মৃতিশক্তি অসাধারণ । প্রথম পাঠেই সে একবার শুনে নিলে দ্বিতীয়বার আর শুনতে হয় না । সারা লেখায় কী কী ত্রুটি, কোথায় কোন শব্দ বেমানান, তা সে গড়গড় করে বলে যেতো তাঁর আলোচনার সময় । তাঁর মাথায় বিভিন্ন রকমের পোকা আছে । এবং তাঁর মতো একশ শতাংশ খাঁটি লোকও এ সংসারে বিরল । পাঁচ কিলোমিটার দূরে কারও বাড়িতে একটা আলপিনও পৌঁছে দেবার অনুরোধ করলে, তিনি তা নিষ্ঠার সঙ্গেই পালন করবেন ।

এই কিশোররঞ্জনের কবিতা আজ আমি পড়তে চাইছি । যাদের ভালো লাগে, সঙ্গ দিন ।
তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ— “কবিকে পাথর ছুঁড়ে মারো” । তখনকার সময় অত্যন্ত সাড়া জাগানো কাব্যগ্রন্থ । 
তখন আমরা যা যা উদ্ভট বলে ভাবতাম, তা সবই তাঁর লেখার অংশ । তাঁর ভাষারীতি, গোটা বাংলাসাহিত্যে আর দ্বিতীয়টি পাইনি আমি । কেউ পেলে জানাবেন । তাঁর গদ্যের ভাষা আর কবিতার ভাষা খুব কাছাকাছি । বলার মধ্যেই তাঁর গল্প, বলাটাই কবিতা । তাঁর দেখার মধ্যেই তাঁর কাব্যের চেতনা । মনে হয় বড়দের কথা শিশুদের কাছে বলছেন, মনে হয় শিশুদের কথা বড়দের বলছেন । তাঁর এই সরস মায়াজালই তাঁকে অনন্য করেছে । সবই কৌতুকছলে বলা যেন । রম্য, কিন্তু রম্যরচনা নয় ।
লিগ্যাসি চুরমার করা তাঁর শব্দ-ব্যবহার এখনও সময়ের আগে চলেছে যেন । মাথার ভেতর তালগোল পাকিয়ে যায় আমাদেরর ভাবনার শেকল । তিনি দিব্যি পাশাপাশি লিখে ফেলতে পারেন ‘হাওয়ায় ও বাতাসে’, আর তখনই শব্দগুলি ভিন্ন ভিন্ন কথা বলতে বাধ্য হয়ে যায় । তার শব্দ, অর্থের প্রয়োজনে নয়, চিহ্নের প্রয়োজনে, সিগনিফায়ার!
এই আঙ্গিক অননুকরণীয়

আজ একটাই কবিতা পড়বো  

ঐ বাতাসে
কিশোর রঞ্জন দে

মেঘশালাটা ঢেকেছিল চাঁদশালাকে একটু আগে
কিন্তু ঐ বাতাসে সরিয়ে দিল জলের শেকড়

আমার মায়ের দেহের গন্ধ ছিল
ঐ বাতাসে
মিশেছিল আমার মেধা তোমার দ্বিধা
ঐ বাতাসে দুলেছিল দিদির শাড়ী মাকড়সা জাল

বাজে মেয়ের গাছের তলায়
পা ছড়িয়ে চায়ের গ্লাশে চুমুক দিল
বাজে মেয়ের দৃশ্য এসব বড় টানে চোখটা টানে
ঐ বাতাসে উড়েছিল একটা কিরাত
কিন্তু সেই বালিকা হাই হিলে লম্বা হল উঁচুও হল
কিরাতবাবার প্রণয়চিন্তা তিনটা তাসে
ভাগ্য বেটার এলোমেলো ঐ বাতাসে
আমার মায়ের দেহের গন্ধ ছিল ।
***************************

২৮.১১.২০১৮ 
     "কবিকে পাথর ছুঁড়ে মারো" -র এই কবিতাগুলো লেখা হয়েছিল ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে ।
    আজ আর কোন কথা নয় । প্রতিদিন কমপক্ষে দুটো কবিতা পড়বো । তাই আজকের কবিতাগুলো আজই পড়ে নিন ।


“...এ আকাশ আমার / আমি একে রক্ষা করবো ।”

২.
অমোঘ নিয়মে
কিশোর রঞ্জন দে

অমোঘ নিয়মে, রাজশয্যা পাতা আছে সযত্নে
জনশ্রুতি এইরকম, এখানে যুবরাজ চোখ বুজলেই অন্য প্রযত্নে
ঘণ্টাধ্বনি বেজে উঠে, ময়ূর নেচে নেচে
দেমাক দেখালে মেয়ে ময়ূর যেচে যেচে
দেহকান্তি বিলিয়ে দিয়ে মুগ্ধ হবে, শুদ্ধ
হিমেল হাওয়া বনপথে চলে গিয়ে অবরুদ্ধ
থাকলো এক বছর, তীর্থযাত্রীর মতো ফিরে এলো যখন সরগোল
পড়ে গেল বসন্ত এসেছেন সাম্রাজ্য দেখতে, একদিন ইতিহাস ভূগোল
পড়ে ময়ূরশিশু শিখলো তার বাবা তার মাকে কী রত্নে
জয় করেছিলেন অমোঘ নিয়মে, রাজশয্যা পাতা আছে সযত্নে ।
***************************************** 
৩.
বিবৃতি-৪১
কিশোর রঞ্জন দে

(এক মাহুতের মৃত্যুর পর তার হাতীটি একনাগাড়ে এগারো দিন উপোস ছিল, তারপর মারা যায়)

এখনো মানুষের প্রণয় পৃথিবীর শেষ তীক্ষ্ণ অস্ত্র
অনায়াসে মেঘপুঞ্জ গেঁথে রাখে অন্তরীক্ষে,
এখনো মানুষের প্রণয়-উজ্জ্বল শিকারী এক
বনস্পতিকে দিয়েছে সস্নেহ আশ্রয়, তাকে রক্ষা করে
লোভ থেকে শোক থেকে । তার তর্জনী শাসনে
উচ্চকণ্ঠ জলস্তম্ভ মিশে গেছে মসৃণ সমুদ্রে, রেখে গেছে
নিষ্পাপ ঝিনুক আর চুম্বন/এই বেলাভূমি, যখনি
পৃথিবীর মানুষ পৃথিবীর মানুষকে পরিষ্কার ডেকেছে ‘ভাই’
তখনি সূর্যের যাবতীয় রোদ তাদের অধিকারে
এই ভাবে ঐরাবত নতজানু, প্রণয়ের কাছে
এখনো আমরা এক একজন বুদ্ধদেব সতর্ক প্রহরী
মৃত্যু থেকে নিদ্রা থেকে, এ আকাশ আমার
                               আমি একে রক্ষা করবো ।

**************************************** 
২৯.১১.২০১৮
কবি কিশোররঞ্জনের কবিতা পড়ছি গত ২৭.১১.২০১৮ থেকে । যারা এই পোস্টটি আজ প্রথম দেখছেন, তার ইচ্ছে করলে প্রথমদিনের পোস্টটা পড়ে নিলে কবি সম্পর্কে সম্যক ধারণা হয়ে যেতে পারে ।
কবিতা পড়ে শেষ করার অনেকক্ষণ পর তাঁর লেখার মূল অভিসন্ধানটুকু হয়তো ধরা পড়ে । দেশপ্রেম, প্রেম, যৌনতা, তাঁর রচনায় এসেছে অত্যন্ত গোপনে, মৃদুস্বরে, প্রায় অলক্ষ্যে এবং খুবই শৈল্পিকভাবে বলে আমার ধারণা । একধরণের তেজস্ক্রিয় মজা আছে তাঁর কবিতায় । যা বলার, তা না বলে, পাশ দিয়ে চলে যাবার প্রবণতা তাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে মনেহয় । আজ তিনটে কবিতা পড়ছি ।


৪.
যে কিশোরী নষ্ট হলো আজ
কিশোর রঞ্জন দে

তার থেকে দু’বছরের বড় জেদী পুরুষের সঙ্গে কথা বলে
যে কিশোরী নষ্ট হলো আজ, আর একটু হলে
সে নক্ষত্রের কায়া মাড়িয়ে দিয়েছিল, যুগ্মভাবে শৃঙ্গজয়ের পর
অবতরণের কোন অভিপ্রায় তার ছিল না, তার উপর
নিঃসন্দেহে আনা যেতে পারে এই অভিযোগ
সুডোল হাত পা শরীর নিয়ে অযথা বিব্রত হবার সুযোগ
সে পেয়েছে । জোর করে আদায় করেছে অভিজ্ঞান
সেই তরুণের কাছ থেকে, তার মানে এখন সে যখন তখন অজ্ঞান
হবে জলের ছায়ায় এসে, মাছ শিশুদের সঙ্গে সংঘাতে জেগেও উঠবে
বান্ধবীদের কাছে গল্প করবে ‘এবারে ফুলের বুকে প্রজাপতি ফুটবে ।’
নষ্ট কিশোরীর শিব ঠাকুরের কাছে আর কোন আর্জি নাই
শুধু তার মা আপশোষ করবেন ‘আমার মর্জিনার কাজে কর্মে
                                         একেবারে মর্জি নাই ।’

 **************************************

৫.
চৈতক
কিশোর রঞ্জন দে

আমার যদি পরাজয় এই নাই-ই থাকে
কাকে
নিয়ে পালাতে পারবে তুমি চৈতক
চৈতক ?

আমার প্রায় বেঁকে যাওয়া বুড়ো আঙ্গুল যে কিনা
মেকি না
মোটেই, সে আমার কমজোরী আগ্রহ ছদ্মবেশে
হেসে
বলে দেয়, ডডোপাখির মতো মৃত
ধৃত
বেঁকে যাওয়া দুর্বল মনুষ্য আছে ব্যাংকের ক্যাশে
কে সে
সীসের ঘরে দেখো তো পাথর জমে
কমে
গেছে সাহস । সাহস তো অভ্যাসে বাড়ে
অভ্যাসে কমে, নাড়ে
মৃদু হেসে নার্ভাস দরোজা
সোজা
পড়ে যায় যুদ্ধে
যুদ্ধে
পালাতে পারবে তুমি চৈতক তাকে নিয়ে ?
আমাকে নিয়ে ?

************************************* 

৬.
আমার চামড়ার নীচে—১
কিশোর রঞ্জন দে

আমার চামড়ার নীচে জল যে আছে বের করে দিই
বের করে দিই ভূতের সরল ছায়া নখের কালচে ময়লাসহ
ময়লা গিলে খেলো যে মুরোগ, রতিক্রিয়ায় সে উৎসাহ হারালো

সাদা রৌদ্র গায়ে দিয়ে ঘরণী তার সম্বৎসর শীত তাড়ালো
সম্বৎসর সুঙ্গু দিতে পারে এমন এক চালাকচতুর রাণীকে বিয়ে করতে গিয়ে
বউয়ের আঁচলেই আঙ্গুলসহ বাঁধা পড়লেন বিচিত্রবীর্য ডাক্তার
মরকতমণি আঙ্গুলে না-ছুঁইয়েও ডাক-তার
বিভাগে প্রতিশ্রুতি ভাঙ্গার কাজ পেল একজন কিশোররঞ্জন, জিনপরি
খুব ভালবাসে তাকে, যখনতখন দেয় তাপ উৎপাদনের হাতঘড়ি
আমার চামড়ার নীচে বাদ্য আছে বের করে দিই
বার করে দিই মশার রক্ত শশার লবণ খেয়েও শার্দূল ধারালো
রূপকথাকে নোংরা করলো, নোংরা গিলে খেয়ে মুরোগ
                                         উৎসাহ হারালো ।

 **********************************************

৩০.১১.২০১৮
বলাটাই যে কবিতা হয়ে ওঠে, এতে কোন সন্দেহ নেই । আর কিশোররঞ্জনের বলা আমাদের অতিমনোযোগ দাবি করে একথাও তেমনি সন্দেহাতীত । তার শব্দগুলো অতি কাছের, ফলে ‘কবিতা-কবিতা গন্ধ’ ছড়ায় না মোটেই । তবু ছিঁড়ে যায় যেন আমাদের মেধার সংগঠন! আজ আরও তিনটি কবিতা পড়ছি । যার যেমন ইচ্ছে মন্তব্য করুন নিঃসংকোচে । 

৭.
আমার চামড়ার নীচে—২
কিশোর রঞ্জন দে

আমার চামড়ার নীচে সাদা ঘাস আছে
বাগানের ফটক বন্ধ রেখো, শার্দূল এসে আমার ঘাস
ছিঁড়ে ফেলবে, কি দিয়ে সেলাই করবো আমি, কোন সুতোয় ?
রোদ দিয়ে সেলাই করা যায় শৈত্য, আর চাকার দাগ ?
আর রোদ না থাকলে ? চাকার দাগের সঙ্গে চাকার দাগের সংঘাত হয়

সংঘাত শুনে নিদ্রালু মানবী উঠে, সাদা উল গায়ে দিয়ে সারমেয়কে
বুকে নেয় । সাজুগুজু দিয়ে সেই মানবী একা রাতে মানবের কাছে গেলে
জানা গেল উপপ্রণয় শিখেছে মানব
মানবীকে সে চুলের মুষ্টি ধরে থাপ্পড় মারেনি, ঘুসুর ঘুসুরও করেনি
শুধু চেয়ারে বসিয়ে দেউলিয়া জাহাজের যন্ত্রণা বলেছে

আমার চামড়ার নীচে সাদা ঘাস আছে
কিন্তু বিলাতী মাটি তো নেই— নিটোল মীড়চিহ্ন ছিঁড়ে গেল
                                                       এই ছুঁতোয়
ময়ূরশাবকের ইতঃস্তত সম্পাত ছাড়া সূচীকার্য হবে
                                                কোন সুতোয় ।

***********************************
৮.
আমার চামড়ার নীচে—৩
কিশোর রঞ্জন দে

আমার চামড়ার নীচে অট্টালিকা আছে
অট্টালিকার সঙ্গে কবরের অনেক তফাৎ, কবরে মানব থাকে,
অট্টালিকায় ? কে জানে থাকলে থাকতেও পারে গরমজল
                                     (আফিংগুটিকে পুস্তু বলে)

সম্রাজ্ঞীর স্বাক্ষরে আমি ফিরে পেলাম শৈলগুহা, তাও আমার বাস্তু বলে
সঙ্গে আমি জল মেখেছি, সেই দিদির শীত ছিল বেশী, যা হোক
দেড়বছরের রিকেট রোগে তার দেহ পুড়েছে ক্লান্ত নদীর কিনারে
                                                        পাহাড়ের শাসনে
গভীর ভীড়ের ভেতরে যে লোকটা অট্টালিকার মেয়ের ছায়া টিপে দিলো
তার বোধহয় একগাল দাড়ি ছিল বগলে সরীসৃপ মায়া

আমার চামড়ার নীচে অট্টালিকা আছে
রিকেট রোগী দিদির ছিল মাটির পুতুল, পুতুলেরও শীত ছিল বেশী
ভারী জবরজং পোষাকে বকবক করতো, নালিশ করতো কাকীমার কাছে
                                                  দেখতো কি কি আমি করি
আমি তো ‘যেতা মন ধরে’ করি

********************************

৯.
আমার চামড়ার নীচে—৪
কিশোর রঞ্জন দে

আমার চামড়ার নীচে একজোড়া রণ-পা আছে
অতি দ্রুত যাওয়া যায় নিঝুম শত্রুর কাছে, পালিয়েও আসা যায় তাড়াতাড়ি
আমার চামড়ার নীচে একজোড়া বোধিসত্ত্ব শহর আছে
সেই শহরে রণ-পা লাগিয়ে আটজন যুবক যায় ‘ব্লু এণ্ড হোয়াইট’ সিগারেটের
প্রচারপত্র বিলি করে, তাদের পরিধেয় নীলসাদা ও নতুন তরুণী হয়েছে
মেয়েটা, সখীদের এড়িয়ে গীর্জার সামনের পথটুকু একা যায়, তখন
কালোমাথা জলপাইগেঞ্জি গলায় যীশুচিহ্ন ছেলেটা লজ্জার চিঠি দান করে
সেই চিঠি
অদ্ধেক হাত বাড়িয়ে নেয় তখন মেয়েটার মুখ—‘ব্রহ্মপুত্র কোথায় থাকে
দুলাল দাদা’?
তোমার সেই শ্রীমতী, একবার রেগে গিয়ে তোমাকে ভাইফোঁটা !
নেহাৎ চন্দনমৃত্তিকা পায়নি তাই রণ-পা’র আঘাত নেয় নরম মৃত্তিকা
শক্ত মৃত্তিকা উল্টে ধমক দেয়— গৌহাটী নগরে পায়ের নীচে টাকা নেই
আমি দাঁড়াবো কোথায় ? রণ-পা’র এশিয়া মাইনরের যেকোন প্রাণীকে
আমি বলবো তো ?
‘আপনার অনেক দুক্ক আছে, না নি ?’


 ***************************************

০১.১২.২০১৮
আজ আরও দুটি কবিতা পড়ছি । কবিতা-প্রেমিকরা ক্রমশ জড়িয়ে যাবেন কবির অদ্ভুত ভাষাবিন্যাসে, যা বারবার এক অন্য এক ডিসকোর্সের ঈশারা দিয়ে যায় । আসুন ।

১০.
আমার প্রতিদ্বন্দ্বী আমার প্রণাম গ্রহণ করো
কিশোর রঞ্জন দে

উপঅরণ্য থেকে একদিন সত্যি সত্যি একটা শাখামৃগ এলো
এসে বললো ‘এই দেখো মধুরিমা হাজারিকার সবগুলো কমলালেবু নিলাম’
এবং সে ফিরে গেল স্ববাসে প্রবাসে নরম হাওয়ার ভেতর সেদিন
যৌথ স্থাপত্য ছিলো, কুশিয়ারের ক্ষেতে খুঁজতে গেছি যেই, নেপালি যুবা
নেপালি যুবার হাতে স্পষ্ট দাঁতে কুশিয়ার রস ভাঙ্গে ‘ফট’ । সব রস
ভেঙ্গে যায়, সম্ভোগ ভেঙ্গে যেতে কে দেখেছে ? কে দেখেছে খড়্গ দিয়ে
সুখ কাটা চোখ কাটা লষ্ট প্রণয়িনী কাটা । কে ?
লষ্ট প্রণয়িনীকে দোকানে নিয়ে দু’কানকাটা সহিসের সঙ্গে সওদা করো
আসরফি হাতে নেপালিযুবা, তবে যদি বলে মধুরিমার কমলালেবু
                                                            কোথায় দেখেছে
ভাঁজ করা যায় উদ্দাম ছাতাটা সৌখিন, রঙ্গীন সুরে তার অন্দর দোলে
গালে হাত দিয়ে নিভাঁজ চুলে নিজে ভাঁজ হয়ে মধুরিমা বসে আছে
                                                              বাঘের গবাক্ষে
সমস্ত অবুজ নগরবাসী আর সবুজ নগরযান সেই গবাক্ষ গিলে খেলো এতে
(এতো মশা, সব্বোনাশ আমি একা মারতে পারবো না)
হে আমার সঠিক প্রতিদ্বন্দ্বী আমার প্রণাম গ্রহণ করো
পরমুহূর্তে আমার কোণাকুণি আঘাতে তোমার রক্তস্তর ফেটে যাবে
                                                                হেঁটে যাবে

রেশমী কিরাত সরভের দিকে আছে, কাঁটাগচা গুল্মঝোপ, এসো আমরা আবার
ঈর্ষা করি বেনে আর ঘাতককে । আমার মোক্ষম আঘাতে হেরে যাবে
                                                                   সব বর্ম রণশিঙ্গা
তোমার অস্থি শোনিতের সঙ্গমবিন্দু থেকে খুঁজে নেব আমি
                                                        কমলালেবু আর শস্য গোলা

আমার প্রতিদ্বন্দ্বী আমার প্রণাম গ্রহণ করো, তোমার কাছ থেকে নিয়ে
মধুরিমাকে কমলালেবু ফিরিয়ে দিলে সে হাসবে ।

***************************************** 
১১.
বিবৃতি-৪৬
কিশোর রঞ্জন দে

(‘বামোরু’ একটা বিশুদ্ধ বাঙালী শব্দ, যার মানে ইলো সুন্দর ঊরুযুক্তা রমণী)

পায়ে আমার নিত্যসঙ্গী যা, সারা শীতঋতু কে মেখেছে পিঙ্গল সব্জি
পিঙ্গল চোখে বিস্তার নেই নিস্তার নেই রঞ্জনরশ্মি থেকে, সাদা কব্জি
খুবলে নেবে তাকে উষ্ণ আনুগত্য থেকে তুফান হলো যেবার
এতোক্ষণ চোখের কথা বলেছি, ঊরুর কথা বলি এবার
পাতলা সখে উপশহর থেকে এক ঘণ্টা হেঁটে নিমাইদার বাড়ি গেছি গ্রামে
সপ্তম শ্রেণীর পরিষ্কার আগ্রহী বালক আমি নিমাইদা সহপাঠী আমার, যদিও
চার বছরের বেশী অভিজ্ঞতা ছিল তার পৃথিবীর বাতাসে, আঙ্গুলে গুণ ছিল
                                       সুন্দর বাজনা তুলতো এন সি সি’র ড্রামে
সোনালী সবুজ পোকা সুতোয় বেঁধে ক্লাশে আনতো উপরে ঘুরাতো ।

আকাশী আকাশ সেদিন গরম ছিল খুব
সেই দুপুরে আমাকে দুটো বীজগণিত মিলিয়ে দিতে বলে, শশা পাড়তে গেলে
অন্যায় আগ্রহী বালক আমি, ফিরতে দেরী দেখে তার এগিয়ে গেছি নির্জন সামনে
বেতসের পাশে লালমাটীর দেয়ালের ঘরে বাতায়নও ছিল কাটা, সেখানে দেখেছি
আমি জানতাম না, আমাকে বীজগণিতে বসিয়ে জ্ঞাতী আত্মীয়াকে সঙ্গম করে নিমাইদা,
সেই জানালার পাশে আমি এবং পাকা কাঁঠালের গন্ধ কাঁপে যেন
যেন সেদিন প্রথম ভাত খেয়েছি আমি, অন্নপ্রাশনের উলুশব্দ ও অস্থির ছবি

খাটের কালো বাজুর উপর তার আত্মীয়ার ডোরাকাটা শাড়ী
নিমাইদার কালো ঊরুর নীচে পিষ্ট একজোড়া ধবধবে সাদা ঊরু ছিল
ভোজালি ছিল সুন্দর সৈন্যসামন্তের কুচকাওয়াজ, কি রকম আওয়াজ করে
নিমাইদাকে উল্টে তার উপর উঠে গেল সেই মানবী যখন
গজাল ছিল না আমার হাতে নির্ঘাত গেঁথে দিতাম সেই বাজার এবং রবিশস্য
                                                              কার গতর কে খায়

এই ঢেকির শব্দ বদলে গেছে কতো সহবৎ শিখেছে আমবাগানে
শতরঞ্জি পেতে দিলে বায়সের মতো বসে সে শর্করা দিয়ে সরবত খায়
(কি মিষ্টি ! কি মিষ্টি ঐ নীলাঞ্জন নামটা, অথচ তার আসল মানে তো তুঁতে)
এতোক্ষণ আমি ঊরুর কথা বলেছি যে ঊরু পরকীয়ায় মেখেছে
এবার চোখের কথা বলবো যে চোখ

******************************************* 
০২.১২.২০১৮
আজ সমভবত কিশোর রঞ্জনের একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হল আগরতলায় পুস্তক মেলায় । তাঁকে আমার অভিনন্দন ।
১৯৮৩তে লেখা এই কবিতাগুলো আজও সমান তাৎপর্য আর প্রাসঙ্গিকতা বহন করে চলেছে । আসুন পড়া যাক ।

১২.
এই আবাস
কিশোর রঞ্জন দে

(মেঘালয় সরকারের নতুন নিয়মে সেখানে আর বাঙালীরা চাকুরী প্রায় পাবেই না, পারবে না মাটি কিনতে)

এইসব আবাস
যা কিছু, লাল নীল আলো ছাড়ে পর্বতের গায়ে
যা কিছু, কিছু ছবি ছড়ায় রোদের দিকে
যা কিছু, সহসা বন্দুক তুলে দুঃখের গাইকে শাসায় ।
একদিন এইসব আবাসের কোটরে ঢুকেছিল বাঙালী আহ্লাদে
পোষ না মানা মেধা সেদিন কোমরের কশিতে বন্দী থাকেনি

[ আজ ঊনিশ শ’ তিরাশীতে
জমিতে ও বাঁশীতে
খাসিয়া পাহাড়ে বাঙালী কিনতে
পারবে না, আহার চিনতে
ভাতের ডেগে হাত ঢুকিয়েছে এই পয়লা
ঈশান ভারতে মরে বাঙালী ময়লা ]

এইসব আবাস
যা কিছু, জেদী পরীর চুম্বনের ক্ষণে জন্মকোষে লেপ্টে থাকে
যা কিছু, পর্বতের অভিমানের জন্য দায়ী হয়
যা কিছু, ক্রেতার মতো একপায়ে দাঁড়ায় খ্রীষ্টধর্মের কাছে
একদিন তো বন্দেমাতরমের তাঁবু ঢেকে রেখেছিল সবকিছু
                                         এইসব আবাস

 ***************************************

১৩.
আমার আবাস
কিশোর রঞ্জন দে

নিজের মাথা আঁচড়াতে গিয়ে এ কার চুল আঁচড়ে দিলাম আমি ? কার চুল ?
ক্রমাগত ভুল করি শীতের আন্তরিক রাতে অন্যমানবের গৃহে প্রবেশ আমার
যে গৃহের অভ্যন্তরে শুয়ে আছে সাজানো সায়াহ্ন । স্বয়ংক্রিয় বাতাসের
নীচে নিরাপদ বাতি আরো নীচে প্রমাণিত নরম শয্যা
                                         (একটাও মশা নেই মশারীর ভেতর)
শয্যার সমীপবর্তিনী যিনি প্রসিদ্ধ সম্পত্তি গড়েছেন শরীরে, সে সম্পত্তি
তিনি খুলে দেন কেন ? তা কি কোন অবাক দিঘি ? এ গৃহের গবাক্ষ টেনে
                                                       আনে না তো কই
বাহিরের রব ? দেয়ালে মৈথুন আলেখ্য যা কম্পিত করেছে দেহের রুধির
জন্মেছে গ্লাশে চতুর মদিরা, তাই খেয়ে শয্যাতে গমন করি যুদ্ধংদেহী
আলনায় সুখী পোষাক। পাশেই বরফ তৈরীর আলমিরা ফ্রীজ হয়ে
বসে আছে দূরদর্শনের শৃঙ্গার সরঞ্জাম পর্দা / কম্বলের নীচে মধ্যযামে যুদ্ধংদেহী ঢুকে
গেলে বিজ্ঞানের অগ্নি জেগে জেগে লাল উত্তাপ ছড়ায় /  সমৃদ্ধ এ গৃহ এ আবাস
                                                              আমার নয়
আমার মুখ্য আবাসে কুয়াশার সংকেতে প্রবেশ , তারই যথার্থ আঘাতে
জেগেছে শীতার্ত শস্যগোলা, ঠাণ্ডা খেয়ে হীরামন শূন্যে হারিয়েছে, খাঁচা তার
বাস করে, ঝিঁঝি পোকা আর দূরের ফাঁসুড়ে কার শাসনে শিবাদল ছুঁড়ে
                                                                    দেয় চীৎকার
তেলেপোকা আমার  সংলাপ খুঁটে খায়, ঘোটকীর দুগ্ধজাত মদ্য পান করেছি
মাটীর সরায়, এর দেয়ালও মাটীর, ছনের চালার নীচের একমাত্র স্ত্রীলিঙ্গ
বলতে পরিব্রাজিকা, দুলেছে আকাশ প্রায় তার কোমর রেখায়
পরিব্রাজিকা নেচেছে বিদ্যুতে, স্বেচ্ছাদম্পতি হয়ে বাজিতে জিতেছে
হেরেছে শুধু খিড়কি জানালায়, পর্দার বালাই তো নাই তাই
অনেক বাইরে থেকে কোন ব্যাধ তীর ছুঁড়ে গেঁথেছে যে গাল
আমার উপর চোখ রেখে দশ আঙ্গুল রেখে শুকনো ঘাসের আঙ্গুলে, পোহাতে
তার গালের ক্ষতে আগুনের সিঞ্চন মুহূর্তে মুহূর্তে জ্বলে স্বর্গের শ্মশান

এ গৃহ আমার, এ আবাস আমার, ঐ মস্তিষ্কের উপরে যজ্ঞের কৃষ্ণকেশ
                                                                ঐ চুল আমার
************************************************ 

০৩.১২.২০১৮
কবি কিশোর রঞ্জন পুস্তকমেলায় ব্যস্ত । আমরা এই ফাঁকে তাঁর দুটো কবিতা পড়ে নিই ।

১৪.
সে আমার স্বতন্ত্র ঘোড়া
কিশোর রঞ্জন দে

সে আমার স্বতন্ত্র ঘোড়া । রণের ঘোড়া রণে গেল
ধ্রুবনক্ষত্র তার একমাত্র সঙ্গী । ওদিকে বুড়ো বনের
পাতা কুড়িয়ে নিলো জনে জনে । ঘোড়া আমার
বন পেরিয়ে জঙ্গলে গেল ।

শিবানী কলিতা তুমি সত্য কথা কহ
কহ বন আর জঙ্গল যে একেবারে আলাদা, দুই উপচিহ্ন ।
বনে আছে স্তন, মায়ের স্তন, বাঘমাতার শাবকবিন্যাস
খাগড়ার বনে চিবুক পরিষ্কার করে জিহ্বায়, তুমুল সে স্নেহ, কেহ
নিজের জঠর খালি রাখে, নিহত মাংস টেনে নিয়ে যায় পাথরগুহায়
সেই মাংস থেকে অবিরত লালরক্ত । বনে থাকে চড়ুইভাতি
আঁতিপাতি শিকার খোঁজে জঙ্গলে ভালুক, (ভালুক নাকি আসলে মানুষের ভাই)
                                                                 জিপসিরা বলে
বধের জন্য চিতা গাছে উঠে, জঙ্গলের গাছে শুকনো
পাতা নেই, বাতাস তাই অন্য কাজ করেন ।

তবু জঙ্গলের বাতাস একদিন লজ্জিত থাকলেন
ফৌজি ভাই আর ঘাসের পোষাকের রঙ যে এক
খেয়াল ছিল না তার, ফৌজিভাইয়ের শিয়রে গায়ক ট্রানজিস্টার
ভাইয়ের শরীরে আরে ! আরেক শরীর দেখো কুমারী শিক্ষিকার ! না জেনেশুনে
তিনি তাদের সব কার্পাস উড়িয়ে দিলেন
এবার যদি সেই শিক্ষিকা বোঝেন জঙ্গল আর বন যে আলাদা ।

রণের ঘোড়া এইভাবে রণে গেল, রণক্ষেত্রে মানুষ
জন্মগ্রহণ করে, গ্রহণ করে আত্মীয়তা, কে কার আত্মীয় হবে
তার জন্য লড়াই, মানুষ জিন্দাবাদ
  
******************************************* 
১৫.
বাজে জ্যোৎস্নায়
কিশোর রঞ্জন দে

বাজে জ্যোৎস্নায় অনেকক্ষণ সজাগ থেকে সেই শাক্ত বালক
এখন ঘুমিয়ে পড়েছে । সে দেখেনি
শিকারী পাখীর বাসার নীচে ব্রহ্মপুত্র আছে
ব্রহ্মপুত্রের কিনারে শিকারী পাখীর বাসা আছে সে দেখেনি

বাজে জ্যোৎস্নায় ব্রহ্মপুত্রের কিনারে গণিকারাও আছে
এক গণিকা আত্মস্মৃতি বলে তার এক গভীর ক্রেতার কাছে
পিতামহ তার দীর্ঘায়ু ছিলেন
                    অশ্ব ও ভস্ম কিনেছেন
তাঁর খামার বাড়ীতে মজাদার ঘুম ছিল আর এক ঝাঁক সিরাজী শ্বেতকপোত
উদ্যম নিয়ে তিনি সেমিজ খুলতেন তার তিন ভার্যার শৃঙ্গার করতেন
আশীবিষের কামড়ে এক শ্বেতকপোত ছটফট করছিল একদিন
এই রকম বাজে জ্যোৎস্নায় সাপের ওঝা এসেছিল
এসে মাটি খুঁড়ে সুখ ও মধু পুঁতেছিল

বাজে জ্যোৎস্নায় অনেকক্ষণ সজাগ থেকে সেই শাক্ত বালক
এখন ঘুমিয়ে পড়েছে । সে দেখতে পাবে না
যদি এক শিকারী পাখী মৃতমহিষের চোখের মণি নিয়ে ফিরে আসে
অথবা ব্রহ্মপুত্র নদ যদি পাঁচ বছরের রুমলির মৃতদেহ জবাপুষ্পসহ ফিরিয়ে দেয়
অথবা এক গণিকা যদি সত্যি কোন ক্রেতার গর্তে সুখ ও মধু খুঁজে পায়
                                                              সে দেখতে পাবে না
*************************************************** 
০৪.১২.২০১৮
যদি অতিরিক্ত বলা না-হয়ে যায়, তাহলে বলতে পারি, এই সময়ের কবিতা বা কাব্যচেতনা কবি কিশোররঞ্জনের কবিতায় একবার ঢুঁ মেরে দেখতেই পারে কোথাও রয়েছে কিনা এই সময়ের প্রচলিত ধারণকে মুক্তি দেবার কোন সূত্র বা আমাদের নিত্যপাঠের কোন ‘অপর পৃষ্ঠা’ !

আসুন পড়ি আজ আরও দুটি কবিতা ।
তারপর কবিকে পাথর ছুঁড়ে মারবো !

১৬.
অন্তরীণ থাকাকালীন কাউকে আলিঙ্গন নয়
কিশোর রঞ্জন দে

অন্তরীণ থাকাকালীন কাউকে আলিঙ্গন নয়, এমন কি
জঙ্গলকেও না, জঙ্গলে হৃদ আছে মৌমাছি আছে
লজ্জা পেয়ে তারা উড়ে যাবে দেশান্তরে, জঙ্গলের কাছে যাবো পুন্যাত্মা হয়ে
সেখানে হাসি-খুশী-হৃদ, ভক্তিমতী নারীর মতো শুয়ে আছে সাঁকো তার বুকে
যেখানে ঝিকিমিকি ছায়া পড়ে তুলে নেবে নিটোল জলবিন্দু
“প্রিয় আমার জল, তুমি শ্রেষ্ঠ পর্যটক, উৎস থেকে সফর করেছ মোহনায়
নদীকে দিয়েছো বিদ্যুৎ, আকাশকে রামধনু মেঘ
তোমার আরো সমৃদ্ধি হোক ।”

মৌচাকে পৌঁছাব দেরীতে, তার দুর্গে সতর্ক  পাহারা মৌমাছির
গভীর অবস্থান উপলব্ধির— যাকে তোমরা মধু বলো, তার মহান জন্ম
ফুলের কলেবরে, সে আমাকে দিয়েছে স্বাদ আর প্রণয়
“মধু ! তোমার আরো সম্পদ হোক ।”

অন্তরীণ থাকাকালীন জঙ্গলকে আলিঙ্গন নয়
আলিঙ্গন বরং করা যাবে অন্ধ সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্র জৈনকে
তার শরীরে জীবিত মানুষের গন্ধ, তার মনে
স্বাধীন পক্ষী দম্পতি পছন্দ, সে সওদাগর তপস্যায় দিয়েছে সুর
তার সঙ্গীতে ভারতবাসী হয়েছে গৃহমনস্ক, তাকে আলিঙ্গন দেব ।

***************************************** 
১৭.
রমণীর সম্মুখ প্রদেশে এতো মেঘ
কিশোর রঞ্জন দে

জন্মক্ষণেই জেনেছিলাম রমণীর পশ্চাৎদেশের তুলনায়
সম্মুখ ভাগের মহার্ঘতার কারণ, সেই সূত্রেই আমার পরবর্তী বেঁচে থাকা
সেই সূত্রেই প্রতিবিম্বিত শৈশবে
তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে রাজপুত্র কোটালপুত্রের বিলাসী ঘোড়দৌড় ।

আর যৌবনে তো ছায়া আর শরীর সবাই মহাত্মা
তাই আবার চিনেছি রমণীর সম্মুখ ভাগের মহার্ঘতা, যেখানে
জলবন্দী নাবিক শব্দহীন সাঁতারে খোঁজে পরম দ্বীপ
যে দ্বীপে আছে সঠিক আত্মীয় চোখে সৃষ্টির ইশারা
                                       হাতে স্বাগত প্রদীপ

রমণীর সম্মুখ প্রদেশে এতো মেঘ এতো মানচিত্র প্রজাপতি ।

******************************************* 

০৫.১২.২০১৮
“... ...একটা মাত্র বৃষ্টির ফোঁটা দুজনের গাত্রচর্ম ভেদ করে
                                চলে গেছে অথৈ গভীরে ।......”

১৮.
অর্চনা শিবাজীকে এপ্রিলফুল করেছে
কিশোর রঞ্জন দে

একসঙ্গে বড় হয়েছে তো, একজন আরেক জনের
পেছনে লাগে খুব । (অবশ্য একসঙ্গে বড় হলেই যে পেছনে লাগতে
হবে এমন কোন তীক্ষ্ণ কথা রামায়ণে লেখা নেই)

ছেলেবেলায় একসাথে তারা স্পর্শ করেছে
রঙ আর জলাশয়, তাদের হৃৎপিণ্ড একসঙ্গে বেড়েছে
একটা মাত্র বৃষ্টির ফোঁটা দুজনের গাত্রচর্ম ভেদ করে
                                চলে গেছে অথৈ গভীরে ।

আজ না-হয় ছেলেদের মেয়েদের কলেজ আলাদা
তবু রাস্তা তো আছে, এতো কষ্ট করে মানুষ রাস্তা
গড়েছে কেন ? হয়তো শিবাজী একা, হাতে তার খাতা আর বইয়ের ভার
অন্য হাত ব্যস্ততায় মাঝে মাঝে ঠিক জায়গায় ঠেলে দেয়
শক্তিশালী চশমার ফ্রেম । ঐ চশমা কি কোনদিন
ঠিকমতো ঢাকতে পারে তার মন্দির মন্দির চোখ ?
অর্চনার সঙ্গে তখন অন্য মেয়েরা ।
হলে  কী হবে ? মেয়েটা এমন পাজী
শিবাজীকে দেখলেই বলবে শুনিয়ে শুনিয়ে
‘এস্‌ এইচ ঈ, শী মানে সে, মহিলা
আর বাজী ? এবার অনেক বাজী পোড়াবো বুঝলি দেওয়ালীতে’
তখন আঠারোটা মেয়ে একসাথে বেজে ওঠে হি হি হি হি
রাগে গা জ্বলে শিবাজীর গা জ্বলে
পায়ের গতি দ্বিগুণ বাড়িয়ে তবেই নিষ্কৃতি ।

আর অর্চনা একা থাকলে একেবারে পূজারিণী যেন
তার শান্ত পদক্ষেপ আলতো করে ছোঁয় পৃথিবীর বুক
একেবারে ভাল মানুষ ! কে বলবে ও মেয়ের মগজে
এতো শয়তানি ? শিবাজী ছাড়বে কেন ?
বন্ধুদের উপদেশ দেবে বিজ্ঞের মতো
‘ও রচনা ওভাবে লেখা ঠিক হয়নি রে
পুজো অর্চনার কথা বাদ পড়ে গেছে ।’
ছেলেদের চেয়ে জোরে হাঁটতে কি অর্চনা কোনদিন পারে ?
সেদিন কলেজ থেকে বাড়ী সারা রাস্তা তার জন্য অনেক লাঞ্ছনা থাকে ।

কী একটা বই নিতে অর্চনা এসেছে আজ শিবাজীর কাছে
এমন বোকা না ছেলেটা, এমন বোকা, একেবারে মনে নেই তার
আজ যে পয়লা এপ্রিল । চোখ দুটোকে আরো বেশী
মন্দিরের মতো করে অর্চনাকে বলেছে—
‘তোমার কবরীতে দেখো সাদা গোলাপ ফুটেছে ।’
আরে মূর্খ, সাদা কোথায়, তোর কথা শুনে
অর্চনার গালে লাল মেঘ জেগে ওঠে, দেখ ।

এফ ডাবল ও এল ফুল, ফুল মানে বোকা,
ওদিকে দেখো ছেলেটাকে বোকা বানিয়ে মেয়েটারও
স্বস্তি নেই একেবারে, শিবাজীকে পড়ার ঘরে পোষা তোতাটা আছে যে
এমন খারাপ পাখি ! কী লজ্জা ! এতো জোরে এক কথা
বার বার বলে কেন ?
‘অর্চনা শিবাজীকে এপ্রিল ফুল করেছে ।’

ছেলেরা বেহায়া হলে কী হবে ? অর্চনার কি লজ্জা নেই ?
বাধ্য হয়ে আরো ঘনিষ্ঠ হতে হয় তাকে
‘এই শিবাজী, লক্ষ্মীটি ! পাখিটা এতো জোরে জোরে বলে কেনো !
থামাও না ওকে, এই ।’

*******************************

১৯.
দুঃখী হওয়ার জন্যও
কিশোর রঞ্জন দে

দুঃখী হওয়ার জন্যও একটা যোগ্যতা দরকার
                                        তোমার আছে কি ?
যেদিন চোখে চোখ কাটলে তুমি প্রথম
নড়ে চড়ে উঠলো জলের ন্যুব্জ কান্তার
স্তনের সামীপ্যে তোমার হারের লকেট ধাক্কা খেলো, লকেটে
সূর্যের পরিবারকে খেতে এসে শার্দূল জান তার
খোয়ালো
তোমার বেগুনী শাড়ীর নীচে বেগুনী নাভি
নাভিতে বন্দিনী ছিল যে বাতাস, কুলুপ খুলে যেতেই
সে যথেচ্ছ ভ্রমণের অনুমতী পেল, পেতেই
এক পায়ে দৌড়ে গেল পিলসুজের কাছে
এই রহস্যই ছিল দীপশিখা কেঁপে ওঠার পাছে

যেদিন চোখে চোখ কাটলে তুমি প্রথম
স্কন্ধহীন কবিও এলো সেও নাকি পরকীয়ায় যাবে
তার আঙ্গুলে পোখরাজ পাথরে অনেক মর্মপীড়া ও বুদবুদ
                                                ওঠে
(মর্মপীড়াকে গৃহস্থেরা দুঃখ বলে) সেদিন দুঃখ ছিল তোমার
ঠোঁটে ?
দুঃখী হওয়ার জন্যও একটা যোগ্যতা দরকার
                                              তোমার ছিল কি ?

 *****************************************
০৬.১২.২০১৮
“...আমার গাভীকে
‘রাধিকা’ বললে সে দৌড়ে পালাতো’...

২০.
কবির শরীর
কিশোর রঞ্জন দে

কবির শরীরের সঙ্গে সম্রাটের সংঘাতের কথা আছে
সেই অহংকারে ডুবেছে সম্রাট, আনন্দে ডগোমগো
রাজ্য শাসন একেবারে ভুলে গিয়ে উঠে বসে আছে গাছে,
সারা রাজ্য জুড়ে গেল গেল রব
এতোসব মহল রয়েছে সম্রাটের, প্রত্যক্ষ উৎসবও রয়েছে
ঋজু তরুণীরা খোলাদেহে রয়েছে বীজের অপেক্ষায়
আর রয়েছে অনুগত কুশীলব, গভীর প্রত্যয়ে সে
আঙ্গুলে আঙ্গুল জড়িয়ে অর্থহীন আঁকিবুকি কাটে জলে
যেন এই রকম করলে সম্রাট ফিরে আসবে আগের প্রকোষ্ঠে

অমোঘ পরিণতি থেকে রাজ্যকে বাঁচাতে অবশেষে
স্বয়ং কবিই এগিয়ে আসেন—‘দেখুন সম্রাট !
অকারণে পুলকিত হবার কিছু নেই, গোপন কেচ্ছা বলি শুনুন
আসলে কবি তো মোটেই বিদেহী নন, তারও নাসারন্ধ্রে সর্দি থাকে
নখে থাকে ঘা, দ্বিপ্রহরে একা থাকলে
তারো ক্ষুধা তৃষ্ণা এবং অন্য আরও নোংরা ইচ্ছা জাগে
মেধাবী কবির শরীরেও থাকে টীকার দাগ, মাঝে মাঝে মলিনতা
লাগে তার সততায়, এবং প্রকাশ্যে পদ্মাসনে আত্মশুদ্ধি করলেও
তিনি নিভৃতে হত্যার জন্য লাঠি খেলা শেখেন ।’

******************************************** 
২১.
সুড়ঙ্গের  ভেতর আমার ক্রোধ
কিশোর রঞ্জন দে

দ্বাপরেও ছিলাম আমি, উষ্ণ বলীবর্দ, আমার গাভীকে
‘রাধিকা’ বললে সে দৌড়ে পালাতো । একদিন সুড়ঙ্গ পথে
পালাতে পালাতে সে দেয়ালে বিন্যস্ত হলো, সে দেয়াল আমার
                                         আমার প্রতিদ্বন্দ্বিনী,
মাঁদার গাছের নীচে যে গাভীকে রমণ করেছি কতো, সেই গাভীকে
আমাকে ফিরিয়ে দিলো না, সুড়ঙ্গের ভেতর আমার ক্রোধ
সহসা জমাট বেঁধে ভিক্ষুক হতে যায় রৌদ্রময় নগরের পায়ে
(সেখানে বোধ হয় ত্রিপুরার রৌদ্র ছিল) যা হোক গোপমেয়েরাই
                                                প্রথম পৌঁছায় সেখানে
পদশব্দ লুকিয়ে ভীরু চকমকি বুকে প্রদীপ জ্বালায় লজ্জা পায় স্বয়ং
                                                           কামদেবকে
দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে । নিষিদ্ধ গাভীকে তারা পায় না

সব শেষে ঢোল বাজিয়ে রঙীন হারিকেন হাতে আধুনিক মানুষ যায়
তারা গিয়ে যিসাসের কথা বলে । বলে থীম নিয়ে নতুন ভাবতে হবে আবার
ওতে কোন লজ্জা নেই, আমার পিতার সঙ্গে মায়ার রাজত্ব ও সঙ্গমের দৃশ্যে
জ্বালা-ই থাক না আলো, ওই প্রিয় দৃশ্যেই তো আমার এই জন্মের জন্ম
                                    আমার স্বীয় নরম শরীরের নিষ্পাপ গাঁথুনি

যিসাসের আশীর্বাদ সত্য হলো না, মরচে ধরে শরৎকাকুর
অবিবাহিতা আত্মজা গীর্জা হয়ে গেল । নিষ্পাপ গাভী থাকলো
                                                    তাদেরই অধিকারে
রাজনর্তকীর অবৈধ পোষাক খোলার দৃশ্যেই সংকল্প ভুলে গিয়ে
চতুর মানুষ আলো জ্বেলে দিল । সুড়ঙ্গের ভেতর আমার ক্রোধ
আমরা এখনো বলদ হতেই শিখিনি, যিসাস । সভ্যতা মাথায় থাকো

*******************************************

০৭.১২.২০১৮
‘পাহাড়ী বিকেল মানবীর পায়ে অনেক শিল্প আবাদ করে ।’
২২.
কবিকে পাথর ছুঁড়ে মারো
কিশোর রঞ্জন দে

সব দৃশ্যেই বিশুদ্ধ হয়েছে কবির সংলাপ
এবং অভিনয় । আসলে সব পারেন কবি, সব জানেন
সব প্লাবনের উৎস ও মানচিত্র জানেন
তাঁর ক্ষমতার প্রতি বিশ্বাস আমার দিন দিন বাড়ে ।

পানের দোকানে দাঁড়িয়ে কবি বালককে দেখেন
দশমবর্ষীয় মলিন বালক সদ্য পিতৃহীন, সেই মতো পোষাক তার
খাটো কোরা ধুতি, বগলে গোটানো আসন
গলায় ঝুলছে ধারা পিতৃঋণের স্মারক
চোখে প্রয়াত আলো হাত পেতে বালক পয়সা চায়
কবি তাকে স্বচ্ছন্দে বলে— ‘দুগ্ধ পান করো
                                     ওতে খাদ্যপ্রাণ আছে’

পাহাড়ী শহরে এক পাহাড়ী যুবতী
হাত তার অনায়াসে পুরুষসঙ্গীর কাঁধে
তার নতুন খোলা পা ক্রমাগত আঘাত হানে
পার্বত্য রাস্তায়, অনর্গল কথা বলে অন্য কোন ভাষায়
                                                সম্রাজ্ঞীর মতো ।
এই দৃশ্যেও কী করতে হবে কবি সঠিক জানেন ।
বাড়ী ফিরেই ডায়েরী খুলে কলম চলে
‘পাহাড়ী বিকেল মানবীর পায়ে অনেক শিল্প আবাদ করে ।’

এতো সব জানেন তিনি
তার একান্ত দৃষ্টি স্বচ্ছ বড়, অসহ্য
আঙ্গুল দিয়ে তিনি সময় ছুঁতে চান । কী সাহস তাঁর !
এবার তাহলে কবিকে পাথর ছুঁড়ে মারো নির্দয়ভাবে
পৃথিবীর যাবতীয় শিলাখণ্ড একসঙ্গে তাঁর দিকে
ধাবিত হোক । দেখা যাক এই দৃশ্যের উত্তর তিনি কী রকম জানেন
কী রকম উৎকর্ণ হন ! কী মুদ্রায় হাত তুলে আত্মরক্ষা করেন
                                           আর শেষে প্রতি আক্রমণ ।
তাঁর নিভৃত ব্যক্তিত্ব অমোঘ আক্রান্ত হোক
তাঁকে পাথর ছুঁড়ে মারো ।

************************************* 
২৩. 
বিবৃতি-৫৩
কিশোর রঞ্জন দে

(সাম্যবাদ ! আমার জরুরী হৃৎপিণ্ড)

তোমার বাহুর পিছু পিছু আসে, খেজুরের রস মাথায়
এক হাতে দা’ অন্য খালি হাত কাজ শিখেছে— প্রথম খেজুর

ঘুড়ি থেকে যে সুতো খুলে গেছে নেমে গেছে মানুষের মাথার খুলিতে
অনেক অভিনয় করে কম্যুনিস্ট সেজেছে আমীর ভারতীয় । তদারকি করে
আমার আমলের শেষ চালাকি । বন্দরে বন্দরে কাকে ডেকে
বলি—‘সাম্যবাদকে ভোটের কাঁথার নীচে শুইয়ে রেখেছে ব্যক্তিরা
                                                    ভারতের
                                  কে পারো উদ্ধার করো ।’

সাম্যবাদ বড় প্রিয় ছায়া ছিল আমার মাটিতে
কোদাল দিয়ে চেঁছে ফেলেছি । সে মাটি কুপিয়ে নিলে শস্য হবে
গান হবে বাতাস হবে পাশের ছেলের পিঠে থাপ্পর হবে
বেতন বাড়ার জন্য কাঙাল হই  জরুরী নিম্নবিত্ত
কলসীতে খেজুরের রস মাথায় এক হাতে দা
অন্য খালি হাতে সম্পদের কৌশল
                      যে যে আসে আমার দিকে ?


****************************************
০৮.১২.২০১৮ 
“...চাবি না নিয়েই ফিরে যাই বন্ধ দরওয়াজায়...”


২৪.
আমার চিকন অঙ্ক
কিশোর রঞ্জন দে

তেতো ঢেঁকুরের মতো বিদায় আসে, এসে কান ধরে
আমারে কই নিয়ে যায় ? আমরা জল থেকে আরো জলের দিকে
বিষ্টি থেকে আরো বিষ্টির দিকে গমন করি ।

টিলার উপরে সাদা তাঁবু পড়েছে অনেক
পোকার মতো কী যেন একটা কথা মনে নিয়ে, উস্কখুস্ক চুল নিয়ে
চুলের উপর বকের সাদা গু নিয়ে
পিঙ্গল আর খয়েরী ঘাস মাড়াতে মাড়াতে আমি
                         আরো হেঁয়ালির দিকে হাঁটি ।
আমাকে জাগিয়ে রাখার জন্য যে সরু বসন্ত এসেছিল
তারো কাজ শেষ, জমে থাকা ফাঁকি বুকে ভীরু ব্যথা হয়ে বসেছে
বসে আছে আমার মুরোদ দেখবে বলে । মুরোদ আমার
আছেই যদি, ত্রিপুরাতে কেন ষষ্ঠ পাপ ঘুমায় ?

সারা ত্রিপুরা ঘুমাতে থাকলে
এক হেঁয়ালি থেকে আরেক হেঁয়ালিতে কান ধরে আমাকে
                               নিয়ে যায় আমার চিকন অঙ্ক

***************************************** 
২৫. 
আমার দরওয়াজা
কিশোর রঞ্জন দে

একেবারে মাথার ভেতরে গেঁথে দিলাম আমার দানবের সেতু
কে অমন বিঁধতে পারে ? আমার মতো ?
                           দু’আঙ্গুল দিয়ে গিঁথতে পারে জাল দরওয়াজা ?

ওঝা এসে হয়তো ব্রহ্মপুত্র নদের সময় পরিচয় নিলে
                     ‘মূর্খ কিশোর রঞ্জন দরওয়াজায় যা এবার ।’
কেউ আমাকে মনে করিয়ে দেয় না সেখানে যে তালা লাগিয়ে
                                   বেরিয়ে এসেছিলাম আমি
চাবি না নিয়েই ফিরে যাই বন্ধ দরওয়াজায়
       এমন কি একটা হাফ সুয়েটারও নেই গায়, সঙ্গেই শীতের শিল্পরাত

বহু তর্কের পর তুমি আদিম হলে
ঝুঁকি নিয়ে সওয়ারী উড়ে গেল মিহি হাওয়ায় ছোবল দিল পরকীয়ায়
তাই তো গোপন পরিচয় রাখি, বিষধর ফেরার আগেই তুমি সংশোধন করলে
‘এই ! ভালো করে দেখে নাও, তোমার চাবি ফেলে যাচ্ছ না তো আমার
                                                       প্রশ্বাসের কাছে !’


 ************************************************

০৯.১২.২০১৮
“...আমাদের বাঘেরা ঢুকে যান অরণ্যের
                             সম্পাদিকার ভেতর”...

আজ আমরা পড়ছি কিশোররঞ্জনের ৩টি কবিতা

২৬.

বিবৃতি-৪৯
কিশোর রঞ্জন দে

সেখানে একটা মুগ্ধ চাবুক জলের— যাকে তোরা নদী বলিস

তার কিনারে হেঁটে এসে হাঁটু ভাঙ্গে বালিতে একজন বারো ও একজন দশ ।
বারো যে এখনো হাফপেন্ট, হাত দুটোকে ঠিকমতো রাখতে শিখেনি ।
তার নাম তুনু, মাঝে মাঝে সে নুড়ি ছুঁড়ে ও বালিতে আঙ্গুল লিখে ‘তুনু ও তুনু’
দশ যে, সে তো ঝুমা হবেই । চোখ দুটো এখনো ঠিকমতো রাখতে শিখেনি
বাতাস তার ফ্রক কাঁপায় তবু যা হোক মাথায় বেণী হাতে কুল
ঝুমার জিহ্বা কুল খায় নুন খায় ও বাক্য গঠন করে একটুও বিশ্রাম না নিয়ে
না নিয়ে

সেই মুগ্ধ জলের কিনারে ঝুমার জিহ্বা টেনে নেয় তুনুর পকেটের
সব কুল ও কথা । আচ্ছা তুনু ! বারবার বলতো দেখি ! ‘পাখি পাকা পেঁপে খায়’
              —পাখি পাকা পেঁপে খায়
              —থামলি কেন ? বারবার বল, খুব তাড়াতাড়ি বারবার

(তোরা নিজেরা কখনো ‘পাখি পাকা পেঁপে খায়’ বারবার অতি দ্রুত উচ্চারণ
করে দেখেছিস ? না করলে এমনি একবার চেষ্টা করে দেখ না )
সুতরাং যত দ্রুত বলতে চায় বারবার তুনু জেদ চাপে তার
চোখ জোড়া তার ঝুমাকে ছাড়ে না, হাসতে হাসতে হাসতে হাসতে
                     পাখি পাকা পেঁপে খায়
                     পাখি পাপা পেকে খায়
                     পাখি পাপা পেকে খায়
                     হাসতে হাসতে সামনেই
                           আরোগ্যের বোতাম

***************************************** 
২৭. 
বিবৃতি-৫০
কিশোর রঞ্জন দে

( ঋক্ষ মানে ভালুক । মানুষের ভাই ঋক্ষকে— )
সারা শরীরে মলাট দেখে কতোটা পিছু হঠেছি
আরো কতো পিছু হঠা বাকী !
পাকস্থলীতে মাংস ও শ্মশান পুরে কতো উদ্গার তুলেছি
আরো কতো উদ্গার তোলা বাকী !
বারো মাস জ্ঞান কুড়িয়ে কুড়িয়ে যে পিছু হঠা শুরু
তার জন্যও আয়কর দিলাম । কর দেবার জন্য হাঃ হাঃ
রে পুরোহিত ! পলিয়েস্টার হৃদয় আমার মাকে আমি পুনশ্চ চোরাস্রোত
সরে যায় মানুষের ভাইয়ের রথ

********************************** 
২৮. 
আমাদের বাঘেরা
কিশোর রঞ্জন দে

আমাদের বাঘেরা ন্যুব্জ হয়েছেন শৌখিন স্বদেশের কাছে
সেলাইকল থেকে বেরিয়ে আসছে স্বদেশ, তাতে এশিয়ার ভাঙ্গা মানুষ নেই
আমাদের বাঘেরা একটু ঝাপটা গায়ে নিয়েই গড়িয়ে চলে যান মহাজনের কাছে
মরিয়ানীর কাছে আমাদের ধানজমি বিষ্টি না পেয়ে আগুন হয়ে আছে
                                                       দেখতে ভয় পাই
শুনতে ভয় পাই এশিয়ার চোরদের কথা, তারা যেভাবে সিঁধ দিয়ে নিয়ে যায় যা কিছু
মানুষের শরীরে ও চরিত্রে থাকায়— জন্তু তাকে ঈর্ষা করেও বশ হয় ।
ধ্বস হয় ক্রমে ক্রমে দেশজ জল ও বিত্ত, বাধ্য হয়ে তারা নগরপ্রীতি বাড়ায়
কুরুক্ষেত্র থেকে যুদ্ধ না করে যারা পালিয়ে গিয়েছিল
সনাক্ত করার জন্য তাদের বুকে দেয়া হয়েছে ঘন কালো চুল, তারই পাশ দিয়ে
এণ্ডেলার ঘ্রাণ নিতে নিতে আমাদের বাঘেরা ঢুকে যান অরণ্যের
                                                      সম্পাদিকার ভেতর

****************************************
১০.১২.২০১৮ 
আজ আরও ৩টি কবিতা পড়ছি কবি কিশোর রঞ্জন দে’র ।

“এখন আর কেউ ঈশান কোণ বলে না
বলে, উত্তর-পূর্ব ভারতবর্ষ...”

******************************** 
২৯. 
ঈশান কোণ-১
কিশোর রঞ্জন দে

এখন আর কেউ ঈশান কোণ বলে না
বলে, উত্তর-পূর্ব ভারতবর্ষ । বায়ু কোণের মানে আমাকে
বলে দিতে পারবে কি ঈশানী নামের আসাম দেশের
যুবতী ? যার চক্ষু সারাদিন এত ঘুমুতে পারে ?

দশটা দিকের নাম এখন অনেক বালিকাই জানেন না
আসামেরও দশ রকমের দিক আছে, মনুষ্যশাবক আছে দু’রকমের
বাঙালীর নাতিরা সব ঢুকে বসে আছে ঘড়ির ভেতর, তাদের সঙ্গে আছে
ঐক্যহীন ঊনিশ শ’ আশীর অনেকগুলো পুরুষের অঙ্গ

আমি যখন মায়ের পেটে ভর্তি হলাম, মাকে খাওয়ানো
                                  হলো খেজুরও, সিকিউরিটি
ব্রহ্মপুত্রে তখন ভাইয়ের কার্পেট ছিল মনুষ্যশাবকের সঙ্গে
                           মনুষ্যশাবকের অদৃশ্য বন্ধনরজ্জু
যে বন্ধনরজ্জু শুধু পৃথিবীর হৃৎপিণ্ডকেই । একপক্ষ বিহু বলতো
                                         অন্যপক্ষ পৃথিবীর মিছরি
একদিন সযত্নে আমি ভূমিষ্ঠ হলাম আসামের উপর
ঘড়ির ভেতরের নাতিরা দেখো এমনকি মৃত্যুকেও ডরায়
                           ঈশানকোণের সকড়াকে ডরায়, কার্ফু ।

**************************************
৩০. 
ঈশান কোণ-২
কিশোর রঞ্জন দে

বাবা !
আমার মাথায় মায়ের বিছানা ভেঙে দিলে তুমি
আমার চোখের ভিতর ত্রিপুরার মৃত্যু, সেখানে শুধু ঠিকানা ছিল
শস্য ও ভ্রাতার ত্রিপুরার ভ্রাতার সাথে ভ্রাতার ক্ষুধা
এক হয়ে মিশে গিয়েছিল ভারতবর্ষের দেহের চাপে

ক’জন বাঙালীর নাতিকে খেয়ে ফেলা হলো (মানবিকতার কথা)
উত্তর-পূর্ব ভারতবর্ষের প্রত্যেকটা পাঁজরে কণামাত্র পৌরুষ বিন্যাস
                                                         নেই নাতিদের
কেন যে মরতে বাঙালীর নাতি হলাম
অনেক তদন্ত হবে অনেক তদন্ত হবে
তুমি দেখে নিও একদিন পরেই বিজয় রাঙ্খলদের ক্ষমা ও
পুনর্বাসন দেয়া হবে

কিন্তু ত্রিপুরার নিহত শস্য ও ভ্রাতার কথা ?

****************************************
৩১.
ঈশান কোণ-৩
কিশোর রঞ্জন দে

আমার মাথা পালিয়ে গেছে
ত্রিপুরার জঙ্গলে জঙ্গলে তাকে খোঁজো গিয়ে ।
ঘাস তার এতো প্রিয়, পরনের ধুতি খুলে
ঢেকে দিল স্তূপ করা কাটা ঘাস
তারপর কাঁধে তুলে হেঁটে পার হয়ে গেল গৌহাটির
                                         জলাভূমি
ত্রিপুরার জঙ্গল ও গৌহাটির জলাভূমির নীচে আছে আমার মাথা ।
আমার মাথার ভেতর বসেছিল যে আবহাওয়া, তাতে জাতিস্মরে
 মদ খাওয়া
তিনজন ঐশ্বর্যশালিনী এসে চুরি করলো জাতিস্মরকে ।
আমার মাথাও গেল, জাতিস্মরও গেল
                           ঈশান কোণে শুধু থাকলো মানুষের
প্রথম জীবাণু—

******************************************** 
১১.১২.২০১৮
আজ নেট ভাল না । তাই একটা কবিতাই পোস্ট করছি ।

৩২.
ফাঁসুরে মাঠ
কিশোর রঞ্জন দে

একবার সন্ধ্যায় আমি একটা  ফাঁসুড়ে মাঠের মধ্য দিয়ে
                                                যাচ্ছিলাম ।
ফাঁসুড়েরা অনেকদিন আগে এই মাঠে ফাঁস লাগিয়ে
                                         পথিক মারতো ।
মাঠটা খানিকটা আমার মেলাঘরের স্কুল মাঠের মতো
অনেকটা অশোকের কলিঙ্গযুদ্ধের মাঠের মতো
(উড়িষ্যায় কোণারক থেকে দাউলিগিরিতে যাবার সময়
                           উঁচু রাস্তা থেকে নীচুতে বাঁদিকে
অশোকের মাঠটা প্রদর্শক আমাকে দেখিয়েছিল)

তা, ফাঁসুড়ে মাঠটা খানিকটা এর মতো অনেকটা তার মতো,

গা ছমছম করা অন্ধকারে তাড়াতাড়ি হাঁটছিলাম
হঠাৎ গাছ থেকে ফাঁস এসে লাগলো আমার
                                      আহ্লাদের গলায়
ভূতে থাকতে সুখে কিলাচ্ছিল তাকে
কেন যে তৃতীয় পা থেকে মাথায় উঠে বসেছিল সে
                                        আমার আহ্লাদ
এখন ছট্‌ ফট্‌ করে মরছে
                     তার চোখ থেকে বেরিয়ে যায় জলবায়ু
                     মাথা থেকে বেরিয়ে যায় ব্যস্ত শহর
                     নাভি থেকে বেরিয়ে যায় তেতো যুবতী,
এইভাবে যে কোন আমার মাথায় গেড়ে বসেছিল
তাকে ছাড়ালাম ফাঁসুড়ে মাঠে একদিন সন্ধ্যায়
                               যে মাঠ অনেকটা

********************************************* 

১২.১২.২০১৮ 
আজ এই কবির জন্মদিন । তাঁকে আমার ও আমাদের সকলের তরফে প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাই ।
আমরা তাঁর দীর্ঘজীবন কামনা করি, কামনা করি আরও হাজার কবিতা তাঁর কলম থেকে !!
আজ তাঁর আরও তিনটি কবিতা পড়ছি ।

৩৩.
জঞ্জাল সরস্বতী
কিশোর রঞ্জন দে

তুরুপের তাস তুলে দেয়া হয়েছে তার হাতে, যে
পোকামাকড় চিবিয়ে খেতে খেতে হলঘর থেকে বেরিয়ে এসে
প্রবেশ করে পেতলের জীবনে । তার ডাকনাম মধ্যবিত্ত
সুখী হবার ঠিক আগে জলচৌকিতে বসার ঠিক আগে
                                  সে একবার ভড়ং দেখায় ।

তাকে হাত ধরে নিয়ে গেল উড়িষ্যার গ্রামের আলপথে
নারকেলবনের অন্তিম অন্ধকারে দুই কেজি জোনাকি পোকার বীজে
                                  বালির উপর ভুল যৌবন খরচ হয় ।

বীর্য নিয়ে, ফুল তোলা শাড়ী নিয়ে ফিরে যায় কালো রঙের নারী
                     পাথর হয়ে ফের বসে থাকে কোণারকের গায়ে

ত্রিপুরার যতনবাড়ীতে এই সব স্মৃতিকথা হয়
জলের স্মৃতি নিংড়ে বিদ্যুৎ খুঁড়ে উদ্বাস্তু খুঁড়ে
                           আবার দাঁড়ায় জঞ্জাল সরস্বতী
শীতের বৃষ্টি কেটে যতনবাড়ীতে রাত দশটার খবরের সময়
                     কুটুম্বের মতো দু’একটা তারা গরম হয়

এমন সময় জঞ্জাল সরস্বতী ধোঁয়াময় আগুন জ্বালায়
              উত্তাপ পোহাতে আসে চুরাশির টাটকা বৌদিদি
  
******************************************* 
৩৪.
মহারাণী ডুব দে
কিশোর রঞ্জন দে

দে ডুব । মহারাণী ডুব দে ।
কর্কটক্রান্তির উপর জল বালি ও বড়ই গাছ
তারই কিনারে আঙ্গুল জমিতে ঢুকিয়ে বসে অসমাপ্ত মানুষ
তারই কিনারে কঠিন দূরত্বে থাকে আমার সোহাগ
(সাতাত্তর আটাত্তর কতো তাড়াতাড়ি সোহাগ আসতো আমার কাছে
আসতে চাইতো । আমিও ডাকতাম তাকে যবনের স্বরে
                     সজাগ অলিন্দে মৃদু বালিকার মতো আসতো সে )

এখন একজন ক্ষুদ্র ভূত ও তার প্রেমপাত্রী দৌড়ে দৌড়ে আসতে লাগল
আমার দিকে । তাদের বুড়ো আঙ্গুলের ছায়া নাচতে থাকলো
আমার বিছানায় । সেই ক্ষুদ্র ভূত যে কুরে কুরে খেতে ভালবাসে
উপাদেয় অতীত, সে নিজে এখন মালিক হয়ে বসেছে
একটা টেলিফোন এক্সচেঞ্জের । কী সাহসে পরিব্রাজক দোষ
                                  ঢেকে দেন
ক্ষুধার্ত শিশুর স্তনসচেতন মায়ের

মহারাণী ডুব দে, দে ডুব
কর্কটক্রান্তির উপর পাহাড়ী অবিশ্বাস ও হৃদে
তারই কিনারে মন্দ কিশোর ঘুড়ি উড়িয়ে ভূত ধরে
তারই কিনারে মন্দ কিশোরকে এক জায়গায় যেতে বললে
                                  অন্য জায়গায় চলে যায়

সেবার জঙ্গলে আমার সঙ্গে তুইও তো ছিলি
আর ছিল শঙ্খিনী জাতীয় প্রাণী । শরীর কনিষ্ঠ, আঁখ তিছরী
স্তন ছোট, চুল লম্বা ও কোমর পাতলা হলো একজন সঠিক শঙ্খিনী
হয়রান হয়ে যাই, উন্মাদ হয়ে যাই জঙ্গলের ভেতরে
ঠিক তখন একজন ক্ষুদ্র ভূত ও তার প্রেমপাত্রী
সাঁতার কেটে কেটে আসতে লাগলো আমার দিকে ।

*********************************************** 
৩৫.
আমার চিতাভস্মের উপর
কিশোর রঞ্জন দে

আমার চিতাভস্মের উপর ঢিল ছুঁড়ে মারে কোন সেনাপতি ?
আমার চিতাভস্মের উপর হেঁটে যায় কোন পিপীলিকা ?
সেবার আমার রাষ্ট্রকে আমি সন্তান ও মেধা দিয়েছি
আগুনকে দিয়েছি আঘাত ও কারুকার্য
সেই আগুনই তুলেমূলে গজব করেছে আমার, চুলে অনেক ফুটানি ছিল তো
মূর্খের মতো সুখে ছিল তারা কতদিন, নরসুন্দর কেটে নিল সেই সব জেদ
                                         আমার ছোটবেলা খেলো বাঘে
পরিধেয় কাপড়ে ছিল মস্তানি আর স্মৃতির আদর
ফাঁক বুঝে কলিমের বউকে আদর করতে গেছি যেই
আমার পোষাক নিল কোন বলদে ? ওস্তাগর আমাকে আর
নতুন পোষাক বানিয়ে দিলো না, আমার যে শৈশব নিলো মেঘে

উরঙ্গম যে বনের উরঙ্গম
মনের মানুষে কামড় দিলে আমি তারে দরকারী চিকিৎসা শিখাই
কিন্তু সাপুরিয়া নিলো তাকে, ফক্কুড়ি শেখালো
রথে করে চলে গেলো বচপন আমার আগেভাগে, প্রপাপালিকা
এলো যখন শবাধারে আগুন সামলাতে, কোন পিপীলিকা
আমার চিতাভস্মের উপর ঢিল ছুঁড়ে মারে কোন সেনাপতি ?

****************************************** 
১৩.১২.২০১৮
আজ আরও তিনটি কবিতা পড়ছি কবি কিশোর রঞ্জন দে’র ।

৩৬.
অর্জুন হে
কিশোর রঞ্জন দে

অর্জুন হে
সমীহ কর আমাকে, যুদ্ধের বয়স এখন কত হল ?
মণিপুরে গিয়ে ছেলের সঙ্গে যুদ্ধ কর !
                           যুদ্ধপিতা তুমি আমেরিকা
তোমার যজ্ঞঘোড়া ঘুরে বেড়ায় প্রাচ্যের রৌদ্রে
তির্যক দৃষ্টিতে শাসন করো বায়ুকণিকাকে নিজের জননীকেও
পিপাসা মিটে গেছে আমার
অর্জুন হে
জলের মধ্যে সাপ রাখো কেন ?
মাথার ভেতর দক্ষিণ আফ্রিকা রাখো কেন ?
স্নায়ুর ভেতোর দুর্বহ মর্কট রাখো
যার ফলাহার হলো প্যালেস্তেনীয় প্রিয়ার সন্তানের দেহ
যুদ্ধপিতা আমেরিকা হে
বল্লম বেচে সম্রাটকে শাসাও
              সুপ্তিকে শাসাও

************************************* 
৩৭. 
হিরোসিমা ১৯৮২
কিশোর রঞ্জন দে

পৃথিবীর পিশাচেরা চিনুক
ক্লেদের নফর ইন্দ্রিয়ের নফর
সাতত্রিশ বছর আগে, বুদ্ধরা তখনো ছায়া হয়ে বসেছিল
                                  আয়ুরেখার আক্রমণে,
পৃথিবীর পিশাচেরা চিনুক
                     ক্ষমতার পীড়া, বুদ্ধির পীড়া
অসঙ্গত শিরের সঙ্গে শির মিলে গেলে
প্রণয় ইচ্ছার অক্ষের পাশাপাশি ঘোরে যুদ্ধ
যুগ্মশির বিষ ঢেলে দেয় বিষের পাতে ?
       হে ঈশ্বর চুপচাপ থাকো ! হে জোকার চুপচাপ থাকো !
প্লট তৈরি হয়েছে এই মাত্র
পুরনো সাপেরা নতুন জেদে ছোবল মারবে
                           বাকী হিরোসিমায়
বিলুপ্ত গ্রহে বাজাবে অপ্রাণের এস্রাজ
                           পৃথিবীর পিশাচেরা

****************************************** 
৩৮.
বন্দরের নোটিশ
কিশোর রঞ্জন দে

একদিন সেখানে আবাস তৈরি হলো
তার অনেকদিন পর নির্মিত হলো আলো ।

এর গৃহতলে থুথু ফেলা মানা, গৃহতলে পুজো দেয়া মানা
এ শুধু আবাস

বন্যজন্তু, ঝড়-ঝঞ্ঝা, জল ও তস্কর যাতে
আমার ভোগের পাত্রী ও সন্তানদের ছুঁয়ে না ফেলে
তার জন্য যে বন্দর মানুষ আবিষ্কার করে
তার নাম আবাস
এখানে রাজতন্ত্র মানা, মদ বিক্রয় মানা
বরস্ত্রীদের রমণকালীন ধ্বনি যাতে অমাত্যরা না শোনে
তার জন্য আবাস

এখানে দান ও শোক মানা
প্রতিবাদ মানা, ময়লা রুমালও মানা

***************************************** 
১৪.১২.২০১৮ 
অসাধারণ কিশোর রঞ্জন  !!

“...জলে ডুবে মরবে বলে কবি
                        সাঁতার শিখে না...”

৩৯.
প্রণয় মেনেছে শিবানী কলিতা
কিশোর রঞ্জন দে

প্রণয় মেনেছে শিবানী কলিতা, তাকে শস্য দাও খেতে
দীর্ঘবেণীতে বেঁধে দাও বাহারী বেলুন যতো পারো
নাসারন্ধ্রে দাও তাকে নির্দয় বীজ লোকালয় গন্ধের ।
জাজিম দেবে না তাকে ? জলের জাজিম ?
কবিরা তো জল ভালবাসে, জলে ডুবে মরবে বলে কবি
                                  সাঁতার শিখে না
বনচারী যে মহীরুহ ! অগ্রেতে তিনি সাঁতার শিখেছেন
অরণ্য ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন বৃক্ষ মানবেরও আগে
মানবেরও আগে তারা নগর গড়েছেন

শিবানীর প্রচ্ছায়াকে একটা বৃক্ষ দাও তবে, বৃক্ষে যদি শাখামৃগ থাকে
বিক্ষোভ নিও না মনে, ক্ষুদ্র জান থাকে এইসব প্রাণীদের কলিজায় ।
একবার এক ইঁদুর আমার মা’র প্রদীপের সলতে কেটে দিয়েছে
আরে বুদ্ধুর ডিম ! তোকে তো কেউ কিছু বলবে না !
তুই গিয়ে শিবানীর পয়োধর দেখে আয় না যখন শিবানী
তার ব্লাউজ খুলে অর্ণবধর্মী ঔৎসুখ্যে নিমগ্না
দেখে আয় না তার দেয়ালের রঙ কোন প্রজাপতি
দেখে আয় না কী করে একজন মানুষের মাথা ঢুকে যায়
আরেকজন মানুষের মাথার ভেতর, শৈশব ঢুকে যায় বোতলে

ভাতিজা ইঁদুর এসব কিছুই দেখে না
ইঁদুর আর শাখামৃগের উপর তুমি অসন্তোষ করো না
ওরা এমনই, আকল নেই তাদের, তুমি বরং নিজে যাও
নিজে গিয়ে শ্বেতনমস্কার দাও
বলে এসো—বুকের সম্পদ নিয়ে টানাটানি একি বেয়াদপি ?
বলে এসো—সম্রাটের আবাসেও বিদ্যুৎ গোলমাল করে
                           শিবানী জানে কি ?

**********************************
৪০.
কী অসম্ভব নির্মাণ ভাবনায়
কিশোর রঞ্জন দে

কী অসম্ভব নির্মাণ ভাবনায় সেই বালকের আজ সময় কাটে
যে বালক একদিন ব্যস্ত ছিল অন্য ঠাটে
যে বালক একদিন তার ক্লাসের মনিটার হয়ে সাপের পাঁচ পা দেখেছিল
আজো যার নির্ভুল মনে আছে সেই আরোহনের সময় কে কে ছিল
তার সাথে সুহৃদের বেশে, কে কী রঙের পোষাক
পরেছিল তারা, তুখোর সেনানায়কের মতো শাঁখ
বাজিয়েছিল কে কে । তাদের দলে লুটেরাও ছিল আগুনের মতো
রুক্ষ্মিনীকে না পেলে পরিতুষ্টি ছিল না যাদের; মোটকথা প্রয়াগে যতো
মামদো এসে বাসা বেঁধে ফেলেছিল সেবার, বিদ্যেধরীরা নারীবর্ষ
করেছিল আর আশ্রম । কী ভাবে তাদের দমন করে হর্ষ
করেছিলেন বিধাতা— সে এক বিরাট ইতিহাস
পুরাতন পৃথিবীর প্রত্যক্ষ কোন জীব তার সঙ্গে পরিহাস
করার সাহস পায়নি আর, সব কিছু মনে আছে তার
সব ইতিবৃত্ত; ঘুড়ির সব অব্যর্থ মাঞ্জা; স্মৃতি দিয়ে সে সুখ কাটে
কী অসম্ভব নির্মাণ ভাবনায় সেই বালকের আজ সময় কাটে ।

******************************************* 
৪১.
যে লোকালয়ে
কিশোর রঞ্জন দে

যে লোকালয়ে স্বইচ্ছায় বর্জিত হয়েছি আমি
সেই লোকালয়ে কার ঘাড়ে কটা মাথা গুনে শেষ করা যায় না
যেখানে বরাদ্ধ শব্দের চেয়ে আরো বেশী শব্দ পায় স্থানীয় মানুষ
স্থানীয় মানুষীরা সরল চুল ভেঙ্গে দিয়ে
                     মহাবিদ্যালয়ে যায় পুজো দিতে

পুরো ব্রহ্মপুত্রের ওজন কাঁধ পেতে নিতে অপেক্ষায় থাকে গৌহাটি শহর
আমি এখন দিনে তিনবার ব্রহ্মপুত্র দেখি উঁচু থেকে
অথবা, ব্রহ্মপুত্রই আমাকে দেখে
দেখে এবং মুচকি হাসে, বলে— ‘ইঙ্গিত বুঝ না সখা
                                  এসো না প্রণয় করি ।’
আমি কি সত্যিই ইঙ্গিত বুঝি ?
শহরে নতুন এসেই দেড়দিনের মাথায়
আমি বের করি খারাপ মেয়েদের আবাস
বনস্পতির তলায় দাঁড়িয়ে তারা ঈপ্সিত আদমির সাঁতার শেখা দেখে
ব্রহ্মপুত্রের কাছে আমার অসীম অপরাধ
নিজের আবাস নির্ণয়ে দিনরাত ব্যস্ত থাকি আমি
সময় নেই আমার তাকে বলবো যে
কালি ইয়াতেই আহিবা, আহিবা কিন্তু, তে নে হলে
                           ময় বর বেয়া পাম দে’ ।
জানি তো নিভৃত ইশারায় এই কথা একবার বললেই
নদী তার সব জল আমাকে দিয়ে দেবে ।

**********************************************
১৫.১২.২০১৮ 
আরও কিশোর রঞ্জন

৪২.
নতুন জায়গায়
কিশোর রঞ্জন দে

নতুন জায়গায় এসে জামাকাপড় ও মন গুছিয়ে বসতে
                                  সময় লাগল আমার
নতুন জায়গায় এসে নাকাল হলাম কর্তিত বাতাসের হাতে ।
কখন কোনদিক থেকে যে বাতাস আসে
                           বাতাসের টুকরা আসে
টুকরা টুকরা যুবতী আসে, এসে অঙ্গত্রাণ খুলে দেয়
ভেতরে তাদের প্রত্যেকের কাছে মিষ্টিজলের মাছ আসে
গাজনের বাজনা ও দুষ্ট আচরণ আসে

তাদের হাতে নাকাল হলাম
নাকাল হতে এতো যে ভাল লাগে ।
আবার কুঙ্কুম লাগিয়ে রাজনর্তকী এলো
আমাকে নিয়ে গোলাঘরে ঢুকে গেলো
আবার নাকাল হলাম, আমার ফাঁড়া কেটে গেলো

********************************* 
৪৩.
স্বদেশ ভুল
কিশোর রঞ্জন দে

আমার ভুল বাল্যকাল ভুল ভারতবর্ষের উপর দিয়ে
হেঁটে যায় মৌসুমীবায়ু
নারকেল গাছের জঙ্গলে কিনারে কিনারে যেখানে
মাটিকে আঘাত করে জল শ্বাপদ
নারীকে আঘাত করে ঢেউ ও সাঁতারু
নির্ভুল বিষ যৌবনের শিরে লেপ্টে দেয় বিভ্রান্তি
ভিখারী বালিকা থাকে
সেও আমার বীর্য ক্ষতি করে
                     আমি তাকে দিগদর্শন দিই না তো !
আর আমার স্বদেশ ! সে তো জন্মেই ছিল ভুল কারণে
কাশ্মীর ও ত্রিপুরা মিজোরাম ও তামিলনাডু
এতো বিভিন্ন ভারতবর্ষীয় এক হয়ে দাঁড়াবে কেন আর ?
মন্দিরের গাত্রশিল্পে মিশেছে পরদেশপ্রেমের ঝাঁজ
মিশেছে রেলের লাইনে লাইনে আসামের আন্দোলন
শ্রমজাল ছড়িয়ে দু’মুঠো খায় যারা
তাদের শব্দ শুয়ে আছে বর্জিত গণতন্ত্রের কোলে
দৃষ্টান্ত হাত ধরে চলে যায়, ফলে বারবার একদল জিতে
                                  জিতে দিল্লীতে যায়

অবশেষে দর্শকেরা করতালি দিলেন
তারাই নষ্ট করলেন ভারতবাসীর এক হয়ে দাঁড়াবার কারণ
চোখেমুখে সর্ষেফুল দেখা, নাকি সেটাই আসল দেখা
                                             আমার স্বদেশ
তোমার ভুল শরীরের উপর দিয়ে হেঁটে যায়
                           নির্ভুল মৌসুমীবায়ু

************************************
৪৪.
বিবৃতি-৪০
কিশোর রঞ্জন দে

(পাহাড় মানে, নাগা পাহাড়)

এইভাবে এক এক করে পাপ জমে আনন্দ হয়
ক্ষুরধার এ আনন্দ আমাকে দিও না, আমি নিজ হাতে
সুনিপুণ তৈরী করি আনন্দ, সাজি নিয়ে
বিলি করি মস্তিষ্কে মস্তিষ্কে, এতো বেশী আনন্দ নিয়ে
আমি কি ভাজা খাবো এই পাহাড়ের দেশে, অন্যবেশে এখানে রমণীরা
গোপনে লুকিয়ে রাখে ফুল, সঠিক পুরুষের সামনে
সযত্নে দেহ খুললেই সে-ফুল ছিটকে পড়ে সামনে
তখন সারা শ্বাসযন্ত্রে উল্কাপাতের আশ্চর্য গন্ধ, এই পাহাড়ের দেশে
আমি যদি না একা হয়ে যাই
তবে কি কোনদিন আমার আর একা হওয়া হবে ?

******************************************* 
১৬.১২.২০১৮
কিশোর রঞ্জন দে’র কবিতা কেমন লাগছে ? কবিতার কি ভাল মন্দ আছে ? হয়ত নেই । কী আছে  তাহলে ? সেটাই খুঁজছি । যারা আগ্রহী তাঁরাও খুঁজবেন ।
আজও তিনটি কবিতা পড়ছি । শেষ হবে “কবিকে পাথর ছুঁড়ে মারো” ।
কাল থেকে শুরু হবে “যুবকের হাত সারারাত পাপ ছোঁয়নি” ।

৪৫.
শস্যের কাছে
কিশোর রঞ্জন দে

এতো ঝুঁকি নিয়ে বিষাক্ত হলে !
সেতু নির্মাণ করবে কোথায় ? ভাঙ্গা কারিগর ? নদীটাই নেই যে !
সব বিষ
এখনো বর্জন করো, ক্ষতের ক্ষমতা
                           ভালোই তো জানো
বেড়ে যায় ইজমের জ্বর, আঙুরগুচ্ছ সোনালী হয়েছে এইমাত্র
                                                 সহজ নাগালে
হেঁটে যায় উচ্চাকাঙ্ক্ষী আঙ্গুল দ্বারা কে ছিন্ন করেছে বাতাসকে !
এতো ছোটখাটো মানুষ ! মানুষ পুষে রেখেছে
তাদের দা নেই কুড়াল নেই, কেটে ফেলার মতো একটা ভবিষ্যৎ নেই
অথচ তাদের শান্ত চুলে কাঁটার মতো লেগে আছে সময়ের সাদা দাগ
জালেঙ্গা নামের জায়গাটার শস্যখ্যাতি আছে, আমার মা আছেন
ফড়িং তো ফিরে গেছে অনেক আগেই
শস্যের কাছে মানুষ একদিন আবার ফিরে যাবে, আমিও

**************************************** 
৪৬.
নিজের কথা
কিশোর রঞ্জন দে

সম্রাটের ভঙ্গিতে সে গিয়ে পড়লো গুয়ের উপর
তার গোলায় ধান হলো
তরকারী বসানো উঠোনের উপর দিয়ে হেঁটে গেলেন শিব
এগুলো তার সমৃদ্ধির কথা ।
যে হল্লা তৈরী হয় তিন বাড়ী দূরে তাতেও যৌবন নড়ে

উত্তম উপায়ে শোর ও ক্রোধ নড়তে পারে বলে সেই জিতে এলো,
তার বাবা তাকে পাত্তাই দিলেন না ত্যাগের তৃপ্তিতে,
এগুলো তার জয়ের কথা
মধ্যে মধ্যে তার চুলের গোড়া কেঁপে ওঠে উত্তাপে ও স্নেহে
কুয়োতে ফেলা বালতির মতো টুপ করে ডুবে যায় সময়
                                  মুখ্য ও মূর্খ সময়
এটা তার নিজের কথা

*********************************************
৪৭.
ফুলের বদলে আমার সমস্ত  উদ্যান জুড়ে
কিশোর রঞ্জন দে

ফুলের বদলে আমার সমস্ত  উদ্যান জুড়ে
নেমেছে ঘুম । বন্যার বদলে নদী সেজেছে নৈঃশব্দ্যে ।

পুজোপাঠ এখন, তারপর অলৌকিক বিজ্ঞাপিত হবে
শব্দের ভাগ্য, নারী পাবে স্বাধীন
ক্রন্দনের অধিকার ।
ঈশ্বর আমার, লক্ষ্মীভাইটি, এখুনি তরুণ
রাজপুত্রের হাতে তুলে দিও না তীক্ষ্ণ ছুরি
তাকে সুযোগ দাও অভিষেকের
অন্তত একবার সে প্রতিষ্ঠা করুক আইন
‘স্নান নয়, কুমারী কন্যারা এবারে অবগাহনে খুঁজো নিষ্কম্প গোধূলি’

**********************************************
১৭.১২.২০১৮ 
“যুবকের হাত সারারাত পাপ ছোঁয়নি”

কিশোর রঞ্জন দে’র কাব্যগ্রন্থ দু’টি । একটি আমরা পড়ে ফেলেছি গতকাল পর্যন্ত । আজ থেকে দ্বিতীয়টি । “যুবকের হাত সারারাত পাপ ছোঁয়নি” । সামান্যই কবিতা আছে এটিতেও ।
এই কবির বৈশিষ্ট্য এটাই যে, তিনি তাঁর অদেখা বিষয় বা অভিজ্ঞতার বাইরের কোন বিষয় টেনে আনেননি, নেই সার্‌রিয়ালিজমেরও অতিগমন । তবু, তিনি যা বলেন, তা বলেন না, ফলে রচনা হয়ে উঠেছে বহুস্বরিক, জীবনের মূল্যবোধ ও আস্থার শরিক । তাঁর জীবনের বাস্তব চারণভূমিগুলোই হয়ে উঠেছে তাঁর কবিতার আশ্রয় । আমরা সেখানে অনায়াসেই যেতে পারি । তবু কবি যে ধরা-অধরার মধ্যেই ভাষার চিহ্নায়কগুলো রেখে যান তুলির টানে ।
আজ দুটো কবিতা পড়ছি ।


৪৮.
হোমিওপ্যাথির শিশি থেকে
কিশোর রঞ্জন দে

হোমিওপ্যাথির শিশি থেকে এক দুই করে একে একে
বেরিয়ে এলো আট আটটা দুঃখ । তারা মাকে
যাচাই করে দেখবে । যে যে গুণগুলো আমার মায়ের
ছিল—তা কি ঠাণ্ডা দোকানে বিকানো কিডনির ঘায়ের
দাগ ? তা কি ডানপিটে ছেলের মতো বিশুদ্ধ ছিল একদিন

দিগ্বিজয়ী হয়ে ফিরে এসে মোমবাতিতে পোড়ে ঋণ
বাড়িয়েছে শুধু কলেজটিলায় ?
যেভাবে সময়ের পাখি ফিরে মাইক্রোওয়েভের উঁচু টাওয়ার ছুঁয়ে
                                                সেনাপতি জিলায় ?
অথবা সে ফিরে আসতে পারে না আর
তার আগে নাগাবালক তাকে মাংসলোভে মারে, ঠিক, বিষ্টি থেমে যাবার পর । 
০৯.০২.১৯৮৯ (সেনাপতি, মণিপুর)

************************************

৪৯.
মণিপুরী ফড়িং
কিশোর রঞ্জন দে

সেনাপতি নামের পাহাড়ী আড়ালে কোন কাজে
আমার যাবার কথা ছিল না কোনদিন । অতর্কিতে সেই পাহাড়ের খাঁজে
এক থাপ্পড় মেরে বসিয়ে দেয়া হলো আমাকে, আমার মন্থর মেধাকে
সেনাপতিগিরি করলাম আমি দু’বছর, গুনে গুনে, আধাকে
করলাম এক । ভুলগণনার পর ফড়িং এর পিছু নিয়ে ফুটো পানপাত্র হাতে
পৌঁছালাম দুপুরের ঝর্ণায় । অলৌকিক আইনস্টাইন কেলেণ্ডার থেকে রাতে
আগে গিয়েই বসেছিলেন সেখানে । পাহারা এড়িয়ে সূর্যাস্তের শেয়াল তবু
নাগাযুবতীর বস্ত্রের নীচের সব নিভু নিভু
আগুন আর মুদ্রা খুলে নিল
উত্তর পাহাড়ের সব ফড়িং খুঁজে নিল
সব ফড়িং একজায়গায় জমানো হয়ে গেলে, নারীমূর্তি পাখনা ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে
সব ফড়িং চিবিয়ে খেল, মণিপুরের ফিস্‌ফিস্‌ ভুট্টাক্ষেতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ।

০৯.০২.১৯৮৯
(সেনাপতি, মণিপুর)

*************************************** 

১৮.১২.২০১৮
আজ কিশোর রঞ্জনের দুটো কবিতা পড়ছি । এখানে আমি যা বলি তা একান্তই আমার বক্তব্য । যারা পাঠ করেন আমার এইসব পোস্ট, তাঁরা নিঃসংকোচে তাদের বক্তব্য রাখবেন বা পছন্দ না হলে রাখবেন না, এটাই আশা রাখি । এই কবি আমার অত্যন্ত প্রিয় কবিদের একজন, যাঁর ভাষাবিন্যাস আমাকে প্রতিবার মুগ্ধ করে করে যায়, তাই পাঠক হিসেবে আমার বলার অধিকার থেকে আমি নিজেকে বঞ্চিত রাখতে চাই না । আমি সাহিত্যের কোন প্রতিনিধি নই অবশ্যই ! আমার কোন কথাই গ্রহণযোগ্য না-হতে পারে, এতে কোন সন্দেহ নেই ।

৫০.
বাবার মৃতদেহ নিয়ে প্রতি শীতে
কিশোর রঞ্জন দে

বাবার মৃতদেহ নিয়ে প্রতি শীতে
একবার আমি শ্মশানে যাই । তুলে নিতে
হয় সেই ভার— যা আমার স্কন্ধ বহন
করতে অক্ষম । আমার ভাই আসতে পারেনি গহন
বন ছেড়ে । শীতার্ত আমি ও আমার শ্মশানগামী সখা
জলো হাওয়ায় ডুবে যাই, আবার ভেসে উঠলে দেখি একা
বাবার গায়ের লেপ শ্মশানের গভীর কারিগরকে
দিই । আঙ্গুলের ইন্দ্র ও আঙটি মৃত্যুর জ্বরকে
বাবার মৃতদেহ নিয়ে ফিরে আসি, কলেজটিলায়, কর্কটরোগের ঘরে
শ্মশান থেকে উল্টোযাত্রা এই মতো শেষ হয় যখন
                                       সেনাপতির পাহাড় নড়েচড়ে
শয়তানের সূর্য নড়েচড়ে । নাগাদের সবুজ নখে হয়তো আত্মীয়তাই ছিল
এসব সহজ সত্য উন্মোচিত হতে না হতেই উন্মুখ প্রণয়ীরা দিল
ভাইয়ের অস্থির শস্যক্ষেত । তার পাশ দিয়ে সোপান বেয়ে চিতার কাছে
পৌঁছে হলাম ফতুর
টের পাওয়া যায় না কখন চতুর
কর্কটরোগ ফুসফুসে ঘা করে, ঈশান কোণের যুদ্ধ জিতে
বাবার মৃতদেহ নিয়ে প্রতি শীতে 
১০.০২.১৯৮৯
(ইম্ফল, মণিপুর)

**************************************

৫১.
আমার নয়
কিশোর রঞ্জন দে

তোমার অবাক গৃহস্থালীর ভেতর নরম শব্দ হয়
তোমার তোয়ালে ঢাকা জীবন নড়েচড়ে ওঠে
আমি খুশী হতে হতে আরো খুশী হই
বর্ণময় যেসব সংঘাত ঘটার ছিল তার জন্য অপেক্ষায় থাকি
অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আমার হামাগুড়ি হয়, বেতন হয়, সবকিছু হয়
অবশেষে আমার বাবার ছবির উপর রোদ এসে পড়ে

তখন শিস দিতে গিয়ে দেখি
এই যে দীর্ঘ মন্ত্র ও সম্পদ
এর কিছুই আমার নয়

১৩.১০.১৯৮৯
(আগরতলা)

**************************************
১৯.১২.২০১৮ 
আজ কোন কথাই নয় ।

৫২.
নির্বাচন ১৯৮৯
কিশোর রঞ্জন দে

যে কথা পরে বলা যায় তা পরেই না হয় বলবো ।
এখন যা যা বলা উচিত— তার মুখ ঘুরিয়ে দেয়া হয়েছে জলের দিকে

জলে ঢুকে থাকা পদ্মের মূল দিয়ে আহার হবে
বাহার হবে হাতে হাত ধরা নাচের আসরে
তুমি তাল রেখে নাচবে ? না, বুক উঁচু লাল নাগা মেয়েটাকে দেখবে
আর বোঝার চেষ্টা করবে— কিশোরীটি তাংকুল না মারাম
                                                কী জাতীয় নাগা !

তুমি জানবে কি ভারতবর্ষের বিষাদের মতো
স্টেনগান হাতে যুবকেরা
নাচের আসর এড়িয়ে উঠে যাচ্ছে ভুট্টাক্ষেতের উপরে
                                         দাগী ঝর্ণার দিকে ?
ভারতবর্ষের নির্বাচন থেকেই তাদের জন্ম বলে
               চিকন কথার কামড় তারা টেরই পায় না

যে কথা তারা টের পায়
সে কথা পরে বলা যায়
        তা পরেই না হয় বলবো

২০.১০.১৯৮৯
(সেনাপতি, মণিপুর)

********************************* 

৫৩.
লোকটাকের কইমাছ ও নূপীমাচা
কিশোর রঞ্জন দে

(ইয়া বড় বড় প্রায় বিঘতসমান হয় লোকটাক হ্রদের কই মাছ)

কইমাছগুলো বেচতে বসেছে নূপীমাচা মৈরাং বাজারে
তার অতিফর্সা কাঁধ আজ আর খোলা নয়, চলে গেছে গাঢ় লাল ব্লাউজের নীচে

(এই মৈরাং বাজার পর্যন্ত নেতাজীর সেনারা যুদ্ধ করতে করতে
                                  ঢুকে গেছিল ব্রিটিশ ভারতে)
নেতাজীর ছবি ছাপা দশটাকার নোট আজাদ হিন্দের নামে আজো
নূপীমাচার ঠাকুর্দার কাছে আছে ।

চূড়াচান্দপুর থেকে বাস আসে
এক বাস মিজো ও মিজোনী, তাদের সাথে মিশে রয়েছে
                                       দু’একটা বর্ণসংকরের মুখ ও ঘুম
তারা মাছের দিকে তাকায়ই না
বড়জোর তারা পদ্মের শেকড় কিনে লবণ দিয়ে খায়

(প্রথামতো, পঁয়ত্রিশ বছর বয়স হবার পর, স্বামী বর্জন করেছেন নূপীমাচাকে)
নূপীমাচা দিন দিন মুখোস হতে থাকে, তার যৌবনে নৈঃশব্দ্য নামে
                                        গত থাঙ্গলচৌবার পর থেকে
নৌকা নিয়ে একা একা সে চলে যেতে পারে দ্বীপের সাংহাই হরিণদের কাছে
পৃথিবী থেকে দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া সাংহাইরা তাকে উত্তরভাদ্রপদ নক্ষত্র শেখায়

                                  (২)

(থৌনাওজমদের বাড়ীর মঙ্গলেম নামক পুরুষটিকে কখনো সখনো মৈরাং বাজারে দেখা যায়)
অসমাপ্ত সন্ধ্যায় ক্রেতার জন্য বসে থাকা নূপীমাচার কাছ থেকে টাকাগুলো কেড়ে
নেয় পুরুষটি । (নূপীমাচা বাধা দিলে বদনাম হবে)
আক্রোশে তার বুকে লোকটাক হ্রদের কইমাছ লাফালাফি করে

(তখন বাড়ীতে আজাদহিন্দের গল্প শুনে শুনে সজারু আর ছেলেমেয়েরা অপেক্ষা
করে নূপীমাচার জন্য)
কিন্তু তাদের মা ভাবতে থাকে বাজারে আরেকটু অপেক্ষা করবে কি না ক্রেতা ও ষণ্ডের জন্য
এক বোতল সেকমাই কিনে কোন কোন দিন পুরুষটি আবার ফিরে আসে বল্লম হয়ে না বেচতে পারা মাছগুলো তুলে নিয়ে যায়
                      নতুন বউ আর অন্নের কাছে

অনেকক্ষণ পরে নূপীমাচার বুকে কইমাছের দাপাদাপি থামে
কেরোসিন লম্ফ হাতে, মাথায় বোঝা, সে ঠাণ্ডা ও অন্ধকারের দিকে ফিরে যায় 
১১.১১.১৯৮৯
(মৈরাং, মণিপুর)

পরিচিতি ঃ থাঙলচৌবা মণিপুরের সবচে’ বড় উৎসব । বসন্তের জয়গান । সেকমাই তাদের প্রিয় মদ্য । সাংহাই হল লোকটাকের হ্রদের দ্বীপে বিরল জাতের হরিণ । পৃথিবীর আর কোথাও এই হরিণ নেই । লোকটাক মণিপুরের এক বিশাল প্রাকৃতিক হ্রদ । মৈরাং বড় গঞ্জ— আজাদহিন্দ বাহিনীর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত । থৌনাওজম মঙ্গলেম সিং তার ৩৫ পত্নী বছরের নূপীমাচাকে ত্যাগ করে তরুণী স্ত্রী গ্রহণ করেছে । আর সব পরিত্যক্তা স্ত্রীর মতো নূপীমাচাকেও তার উপার্জিত অর্থ স্বামীর হাতে তুলে দিতে হয় ।

************************************

২০.১২.২০১৮ 
“...আর নির্বাচন চাই না হে ভারতবর্ষ...”

৫৪.
নির্বাচন চাই না কো
কিশোর রঞ্জন দে

তোমার প্রশ্বাসের কাছে ফিরে যাবো বলে কথা ছিল
চৈত্রমাসে মেলাঘরের শুকিয়ে যাওয়া ঢাঁপার শুকনো বালিতে
গাজনের জাদুতে অংশ নেবো বলে কথা ছিল
কথা ছিল দর্শক হবো স্বৈরিণীর সঙ্গে ।

এখন প্রশ্বাসেই কষ্ট বেশী । উৎসব  হয় শুধু বেতনের দিনে
গাজনে এখন বন্যায় দু’রকমের জল হয় ।
এক জলে ফুঁসে ওঠে রুদিজলাভূমি ও গোমতীর ক্ষেত
অন্যজলে নির্বাচনের পাখির ছায়া ভাসে

আর নির্বাচন চাই না হে ভারতবর্ষ ।
আগামী পাঁচবছর কারা শিবানী কলিতার কালো কমলালেবুগুলো নেবে
                          তা ঠিক করতে নির্বাচন আর চাই না কো !

বরং একটা কথাই রাখা যাক
দর্শক হই আমি আর স্বৈরিণী
          মুগ্ধ তাতাল দিয়ে জুড়ে দিই ভাঙ্গা ভারতবর্ষ ! 
১৮.০৭.১৯৯০
(আগরতলা)

**********************************

৫৫.
একক ধনেশপাখি
কিশোর রঞ্জন দে

পুকুর পাড়ের সিঁড়ির শ্যাওলা আরো পুরোনো হয়ে উঠে আসে আমার বুকে
ক’শতাব্দীর শ্যাওলা, কতটা গভীর তার ঘুম !
উম হয়ে তার উপরে জমে থাকে আমার প্রথম যৌবনের শ্লাঘা
                                  আমার অহং ও কবিতা

ভোগদৈ নদীর পাড়ে লালমাটির ক্ষেতে পুরুষ্টু আখের বিন্যাস
অকৃত্রিম নেপালী যুবক ধেয়ে গিয়ে তুলে নেয় ভ্রম ও আখ
সেই আখ তার হাতে দেখতে দেখতে কুশিয়ার হয়ে যায়
জলপ্রপাতের দাঁত দিয়ে কুশিয়ার ভাঙ্গে সে ‘ফট’
তার এগারো হাত দূরে হেসে কুটিকুটি দুই কার্বি কিশোরী
তাদের চোখে নির্মাণ, হাতে স্কুল ফেরৎ বইয়ের ধ্বস্ত বোঝা

আমার অহং বারবার শ্যাওলার মধ্যে নড়েচড়ে
আমি বুঝতেই পারি না, কেন হাতের বইয়ের চেয়ে
নেপালীযুবাদের কুশিয়ারশরীর বেশী প্রিয় হয়
ঐ সবুজ স্কার্ট পরা প্রাগাঢ়স্তনী পাহাড়িনীদের ?
কেন ?
সামনের বছর তাদের স্কুলের শেষ পরীক্ষায় বসতে হবে
অথচ তাদের ভ্রূক্ষেপ নেই কোনো !

নদীর ওপারের বনে সাম্রাজ্যবিস্তার শেষ করে
সূর্যের আলোর পথে
উড়ে গেছে একক ধনেশপাখি কখন  
২০.০৭.১৯৯০
(আগরতলা)

*******************************                     

২১.১২.২০১৮ 
আজ আরও দুটো ।

“...শাখামৃগ আচমকা এসে
নিয়ে গিয়েছিল মধুরিমা হাজারিকার ভূগোল বই ।...”


৫৬.
সূর্যাস্তের পরে
কিশোর রঞ্জন দে

ঠিক ছিল সূর্যাস্তের পর আর কিছু হবে না ।

অথচ সূর্যাস্তের পরেই সবকিছু হল পাহাড়ের ঢালে
নরম বিকেলের কুয়াশা ইস্পাতের মতো ভারী হয়ে পড়লো
                            যুদ্ধসেনানীদের কবরে
নাগারমণীর কাঁধের আনাজের শূন্য টুকরিতে
পাখা ঝাপটালো একটা বনমুরগী, তিন বোতল কড়া সেকমাই ।
সেনাপতি শহরের সাদা কাগজের মতো হাসপাতাল তখন ঢেকে গেছে
                                                     অরণ্য ও রাত্রিতে

একটু হাল্লাগোল্লা হল ভোজনে
কারণ তিন বোতল সেকমাইই শেষ হয়ে গেছিলো
মুরগী ঝলসানোর আগেই ।
তরুণী নার্স ভুল করে হাতের অভিসারী ব্যাগে সৌভাগ্য ও গর্ভনিরোধক আনেনি
মৃদু শৃঙ্গারের বেশী তাই আর এগোয়নি সে
এগিয়েছে যে, ঠিক করেছে প্রাক্তন স্বামীর কাছেই ফিরে যাবে আবার
                                         ভুট্টাক্ষেতের কিনার দিয়ে
রাত আরো মর্যাদা পেলে পাহাড়ের আন্তরিক জানালা দিয়ে
                    হামাগুড়ি দিয়ে স্টেনগান হাতে কঠিন যোদ্ধারা এলো
তাদের চোখে মর্যাদা আর স্বাধীনতা, জাতে তারা নাগা
                                        বয়সে নেহাত কিশোর
ভোজনের আসরে উপস্থিতি বাড়লো, সরে গেল তৃষ্ণা ও তন্বী
প্রস্তাব নেয়া হলো সরোবর ও ভারতীয় রাইফেলসের বিরুদ্ধে

এতো কিছু হবার কথা ছিল না সূর্যাস্তের পরে
২১.০৭.১৯৯০

******************************* 
৫৭.
মধুরিমা ও শাখামৃগ
কিশোর রঞ্জন দে

অনেকদিন আগে
উপঅরণ্য থেকে এক শাখামৃগ আচমকা এসে
নিয়ে গিয়েছিল মধুরিমা হাজারিকার ভূগোল বই ।

মধুরিমা অনেক খুঁজেছে যমুনামুখের ঘোলাটে ঢেউএ
                                            নৌকা দুলেছে

মরচে পড়া কালো রঙের আমগাছটাতে টক ও হালকা আম আছে,
তার নীচের তরুণেরা মধুরিমাকে বাদামী ঠোঁট ওল্টাতে বলেছে
চুম্বন করতে নিয়ে গেছে আরো উঁচুতে ঠাণ্ডা ঘাসের উপর ।
জোঁকের ও স্ফূর্তির ভয়ে মধুরিমা ঘাসে যেতে রাজী হয়নি,
ফলে তরুণেরা লাল সুরকির পথ দিয়ে চলে গেছে
                           সুকিমবাড়ী চা-বাগানের নির্মাণের দিকে ।

বন্যা হলেও সেবছর শীতের শেষে ভাল আলু ও মিঠাপালং হল
মধুরিমার বাবা ও কাকারা প্রচুর লাউপানি খেলেন
মায়ের সাথে মধুরিমা অনেক গামছা বুনেও
                ভোগালি বিহুর আগে সব শেষ করে উঠতে পারলো না
শীতের পোষাক ও শক্তি খুলে ফেলার সময় হলো ।
মেরুণ না নীল কোন ব্লাউজটা পরবে ঠিক করতে না পেরে
মধুরিমা সব্জি ও স্তনদুটিকে রাখলো অনেকক্ষণ খোলা
                                  রৌদ্রে হাওয়ায় ও বাতাসে ।

মুখরোচক ও প্রজাপতির মতো কথা উড়লো চারিআলীর বাজারে
ওদিকে হাজারিকাগাঁওয়ে রাতভর
মধুরিমার মেখলায় লাগলো কলাগাছ থেকে তৈরী ক্ষারের দাগ
পরদিন উঠোনে মধুরিমাকে বাবা ও দাদারা মারলো
                              বাঁশগাছের কঞ্চি ও পচাকাঠ দিয়ে
তার জিহ্বায় জ্বর উঠলো অনেক । পরিবারের পুরুষদের যশ হলো

স্কুল ও নিজের গুল্মের কাছে মধুরিমা আর পৌঁছালো না ।
০৬.০৮.১৯৯০

*********************************

২২.১২.২০১৮ 
“...গীর্জার ডালিয়া আর শিবের বাগানের হলুদ গাঁদা
                                        দূর থেকে আলাদা করা যায় না...”

৫৮.
যুবকের হাত সারারাত পাপ ছোঁয়নি
কিশোর রঞ্জন দে

যুবকের হাত যে সারারাত কোন পাপ ছোঁয়নি
একথাটা পরদিন ভোরে ভোরেই জানতে পারেনি কেউ
                          (এমনকি নাগারাও ভুল জেনেছিল)

যখন জানা গেল অনেক দেরী হয়ে গেছে
নাগাদের ভয়ে নিষ্পাপ যুবক শ্রাবণের জলকলেবরে ভেসে
মণিপুরের পাহাড় ছেড়ে, উত্তরকাছাড়ের পাহাড় ছেড়ে
                                           চলে গেছে সমতলে

পাহাড়ের সেই অনামী জলকলেবর যার পাড়ে
              নেপালীরা অনেক কষ্টে শিবের মন্দির গড়েছে

অনেক দূরে নীচে তার নাম জানা গেল ‘বরাকনদী’
আর জানা গেল যুবক নাগারমণীকে ছোঁয়ওনি ।

পাপী আসলে ছিল পাহাড়ীবাজারের বিস্কুট কারখানার মালিক !

পাহাড়িনীর গর্ভের বীজের দায়িত্ব নিতে হয়নি কাউকে
ফলে ফুটফুটে শিশুকন্যা তার— পাথরে লাফিয়েছে স্বচ্ছন্দে
অনায়াসে নেমে গেছে দ্রুত নীচের গাঁয়ের
                               ডনবস্কো স্কুলের দিকে
প্রায়ই তার মাথায় লাল ফিতে জুটেছে । কেডবেরিজও
তার মায়ের গায়ে আরো যৌবন ও পোষাক এসেছে
বিস্কুট কারখানা ছাড়াও অন্য কোথাও কোথাও শোবার জন্য ।
ইদানীং হিন্দুপরিষদ নেপালীদের মন্দির পুনঃনির্মাণ করছে যখন পাহাড়ে
সেই শিশুকন্যা নাগাদের সবুজ আত্মীয়তার পুরোটাই পেয়েছে
গীর্জা থেকে রবিবারে নেমে আসার সময়ে
               থমকে দাঁড়িয়ে মন্দির নির্মাণের শিল্প মুক্ত চোখে দেখে
তার কচি হাতে গীর্জার ডালিয়া আর শিবের বাগানের হলুদ গাঁদা
                                        দূর থেকে আলাদা করা যায় না
তার অন্যমনস্ক চোখে গীর্জা-মন্দিরের ঘণ্টা স্কুলে শেখা নামতার সুরে বাজে
মন্দির-গীর্জার আরো নীচে

সর্পিল পথে মিলিটারি ট্রাক বিভ্রমের দিকে যায়, সে দেখে ।

********************************* 
৫৯.
যুদ্ধের পাখি
কিশোর রঞ্জন দে

ভোরের হাওয়ায় ভেসে আসা বিষ্টিতে
বারবার ভিজে যাচ্ছিল গীর্জার ঘণ্টাধ্বনি ।
ঘুমে শেষবার ডুবে যেতে যেতে
         সবাই মিলে শপথ নিলাম আমরা
আর যুদ্ধ নয় ।

যুদ্ধের শাসকেরা কিন্তু ঘুমায়নি
নিভৃতে মাটীর নীচে তৈরী করেছে রণকৌশল
আকাশে ও জলে
যেসব সম্ভাবনা তৈরী করেছে শতাব্দীর মেধা
তা পরীক্ষা করার জন্য একটা যুদ্ধের দরকার ছিল

ইরাকের আকাশে এখন ভয়হীন চাঁদ উঠে দেখে
মৃত সমুদ্রে ভাসে পাখিদের শব
পাখি কেনার জন্য পাখি বেচার জন্য
যারা গিয়ে জমা হয়েছিল লোভে
তাদের হাতের শূন্য খাঁচার
         কালো জল টলমল করে
১২.০২.১৯৯১

********************************** 
২৩.১২.২০১৮ 
“...চা-বাগানের পেছনে মিথুনরাশির চাঁদকে
দূরের বস্তিতে জ্বলতে থাকা আগুনে গোপনে মিশে যেতে দেখতে...”


৬০.
পাঞ্জাব
কিশোর রঞ্জন দে

ময়ূরদের রাজা নাচছিল রেললাইনের পাশে ।
সূর্য ও শস্যের ক্ষেত— কার রঙ বেশী হলুদ
বুঝতে পারছিলাম না আমরা— অমৃতসর মেইলের যাত্রীরা ।
ময়ূর রাজার নাচ দ্রুত সরে গেলেও হলুদ ফুলেরা
দীর্ঘ সারি ধরে দৌড়াচ্ছিল ট্রেনটার সঙ্গে ।
সূর্য ডোবার আগেই— কে আগে পৌঁছাবে আম্বালা ?

আমি— যে— পাঞ্জাবে প্রথম এসেছি
         পাঁচটা নদীর নাম মনে করার চেষ্টা বাদ দিয়ে
অমৃতধারী বৃদ্ধ সর্দারজীর সস্নেহ বিবরণ শুনছিলাম ।
এই সর্দারজী কোন্‌ যৌবনে উত্তর-পূর্ব দেশে বেড়িয়ে গেছেন
হারাঙ্গীজাওয়ের অলৌকিক ভোর ও সুড়ঙ্গ এখনো তার মনে আছে ।
বাকী সব স্মৃতি কী করে হারিয়েছেন বয়সে ।
নদী ও যুদ্ধের সময় বললেন ভুল,
আর বললেনঃ পাঞ্জাবের চেয়ে তীব্র যুদ্ধশহীদ আর আছে কোথায় ? জল ?
এখনো তো ‘পাঞ্জাব কা পানী দুধ বরাবর ।’
অমৃতসর আর গুরদাসপুরের ঘোড়সওয়ারদের কাছে আমি কত নিরাপদ
                             তা বোঝানোর আন্তরিক চেষ্টা তিনি করলেন ।

কামরায় আরো যারা প্রসাধন না করা নারীরা ছিল
                                 যারা ভেষজগুণে ভরপুর
আর যারা দৈনন্দিন যাত্রী তাদের বাঁকা ভুরু ও নির্জীব চোখের কষ্ট
আমাকে আবার জানালার বাইরে ময়ূর রাজার নাচ দেখায় ।
২০.০৭.১৯৯১

****************************************** 
৬১.
দাঙ্গার রাত একইরকম
কিশোর রঞ্জন দে

আসামের রাতের কথা, ভয়ের রাতের কথা
                      মনে পড়ে তোমার ! মাগো !
চারদিকে ওরা জ্বালিয়ে দিচ্ছে বসতবাটী, জ্যোৎস্না ও আবীর
চা-জমি থেকে উঁচুতে আমাদের বাসভূমি থেকে
জ্বলতে থাকা আগুন দেখা যায় ।
সে আগুনের অর্থ আমি ও ভাইবোনেরা তখনো বুঝি না
তোমার ও বাবার চোখে মার্চ মাসের রোদ্দুর নিভে যায় ।
প্রতিদিন সকালে দুএকটা পরিবার নিহত হবার
                খবর আসে মৃদু হরিধ্বনির মতো ।

হাল্লা করতে করতে কিছু মানুষ আমাদের দিকে ছুটে আসলে
আমাকে তৎক্ষণাৎ কোথায় লুকাতে হবে,
কোন জঙ্গলে গাছের আড়ালে নতজানু হয়ে
টুঁ শব্দটিও করা চলবে না, এসব আমাকে বোঝাতে গিয়ে
                                              ব্যর্থ হতে তুমি ।
শুধু লুকাতে যাবার ক্রীড়াসুখে উত্তেজিত হতাম
                           ঘুমিয়েও পড়তাম নিশ্চিন্তে ।

তোমারা জেগে থেকে হয়তো অসমান রক্তপাতের সাক্ষী হতে
ঘুমন্ত শিশুদের চমকে জড়িয়ে ধরতে
নড়তে না-চাওয়া হাত দিয়ে
আর নীচে চা-বাগানের পেছনে মিথুনরাশির চাঁদকে
দূরের বস্তিতে জ্বলতে থাকা আগুনে গোপনে মিশে যেতে দেখতে
আমাদের সমস্ত আসবাব যার উপরে বাবার নাম লেখা
উন্মুক্ত পড়েছিল অনেকদিন কানপুর স্টেশন প্ল্যাটফর্মে
স্টেশনমাস্টার নিহত বা পলাতক বলে
                                 রেলে বুক করা যায়নি ।
আবীরের বোয়ামগুলো ক্লান্তিহীন ভেঙে যাচ্ছিল দিনের পর দিন

রহস্যময় বেশী সময় লাগলো দাঙ্গা থামাতে ।

সে দাঙ্গা কি কোনদিন থামলো ?
ভয়ের হাত থেকে বাবার হাত ধরে আমরা
           গারো পাহাড়ের নীল বীজখামারের দিকে
                                   চলে গেলাম একদিন
মনে পড়ে মাগো  !
১১.০৭.১৯৯১

***********************************

২৪.১২.২০১৮ 
“...এই বালুকার পাশাপাশি কোথাও
               কোন এক আর্যপুত্র তাঁর ভ্রাতাকে নিয়ে
                     ‘জানকী জানকী’ বলে কেঁদেছিলেন ।...”
আজ আরও দুটি কবিতা পড়ছি কিশোর রঞ্জনের । আগামীকাল এই পর্ব আপাতত সমাপ্ত হবে ।

৬২.
আমার ময়লা চোখে
কিশোর রঞ্জন দে

আমার ময়লা চোখে
     দেখলাম সামনে বিস্তৃত সোনালী ও সুখী বালির সৈকত
নীল জোরালো জল ধেয়ে আসছে সিংহল দ্বীপ থেকে
নারকেল গাছেরা বিহ্বল । পথ ছেড়ে দিল শরাহত উষ্ণ ভারতীয়া
আমার ময়লা চোখ ভারতীয়া ও বালুকাকে দেখল ।
এই বালুকার পাশাপাশি কোথাও
               কোন এক আর্যপুত্র তাঁর ভ্রাতাকে নিয়ে
                     ‘জানকী জানকী’ বলে কেঁদেছিলেন ।
খুব কাছাকাছি কোথাও বানরেরা মন্ত্রণা করেছিল কাঠবেড়ালি
                                      ও কারিগরের সঙ্গে
মিহি সামুদ্রিক মাছের মতো এসব কথা এখন ইতিহাসে জমা পড়েছে

সৈকতে ভিড় এখন । অনেক ঘুড়ি ওড়ে । লাটাই একটাই ।
ভারতবর্ষের সুর তৈরী হয়ে ভেসে বেড়ায় বিচিত্র দেশের উত্তরপর্বতে
২২.০৭.১৯৯১

***************************************
৬৩.
মণিপুরের বাঁশি
কিশোর রঞ্জন দে

আট আঙ্গুল লম্বা বাঁশের বাঁশি উত্তরপ্রদেশ থেকে গুজরাট গিয়েছিল কিনা
                                                              জানা যায়নি
কিন্তু ঈশান কোণে মণিপুরে তার পৌঁছানোর খবর
গোপন থাকলো না । ‘রাধিকা রাধিকা’ বলে
          উত্তেজিত করলো উপত্যকার সব মানবীদের ।

ইম্ফলের পাশে কাশিপুরে মণিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে
                  কয়েকশ’ তরুণীর নাম এখন ‘রাধিকা’ ।

তরুণেরা মাঝে মাঝে যদিও যুদ্ধ করে আধুনিক রাইফেল হাতে
তবু এখানে আকাশ ততো নীল, বিকেলে বিষ্টির পর রামধনু ওঠে
স্কুটার ও বাইকের অন্তহীন চলার পরেও বাতাসে কবির জন্য থাকে
                                                  প্রচুর অক্সিজেন ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সজারু ও আজাদহিন্দ বাহিনীর ছাপানো টাকা
                                          মিউজিয়ামে জেগে থাকে
ফলে ভারতবর্ষের জয় হয় । রাধিকার জয় হয়
২৪.০৯.১৯৯১
*******************************************

২৫.১২.২০১৮
কবি কিশোর রঞ্জন দে’র সঙ্গে বেশ কিছুদিন কাটানো গেল । আজ তাঁর তিনটি কবিতা পড়ে এই পর্বের আপাতত সমাপ্তি । তাঁর এ পর্যন্ত প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “কবিকে পাথর ছুঁড়ে মারো” এবং “যুবকের হাত সারারাত পাপ ছোঁয়নি” এই দুটির সব কবিতার পাঠ আজ সম্পূর্ণ হবে । যারা এ ক’দিন আমাদের সঙ্গ দিয়ে গেলেন, তাদের ধন্যবাদ জানাই । কিছুদিনের মধ্যেই তার কবিতাসমগ্র প্রথম পর্ব প্রকাশিত হবার কথা । তাতে এই দুটি গ্রন্থও সন্নিবেশিত হবে আশা করা যায় ।

৬৪.
ভয় ১৯৯১
কিশোর রঞ্জন দে

শাবক সারমেয়রা ‘ভৌ ভৌ’ তিনবার ডেকে থেমে গেল গভীর রাতে ।
তারপর থেকে জল তাকে ছাড়তে চাইছিল না বাকী রাতটা

তবু ব্লাউজ খোলা মৃতা
পাপী শহরবাসীর সাজানো আসবাব তছনছ করে দিল ।
সুড়ঙ্গের ভেতর লাল ভয় আচমকা হাওয়ার ঝাপটায়
বাইরে এলে
জানা গেল এবারেও সব খুনীরা আঠারোর নীচেই,
তাদের অনেকেই এখনো বোতাম লাগাতে শেখেনি ।
উঠোনে শব্দ হল অনেক ।

কিন্তু ততোক্ষণে থানার পাখি ডেকে উঠেছে
গায়কেরা এখন এক গান বারবার গেয়ে বিরক্ত ।
প্রধান গায়কের রেকর্ড করা পাখি গাইলো
             ‘ধরো না ধরো না ছেড়ে দাও ছেড়ে দাও ।’
সারমেয়দের ভৌ ভৌ ছাড়া
             আর কোন আলো তৈরী হলো না ত্রিপুরার বারান্দায় ।
যথারীতি সেই উকিলবাবু
যার মা নেই বোন নেই কন্যা নেই
             এসে জামিনে নিয়ে গেলেন কৃমিদের ।
১৮.০৮.১৯৯১

**********************************
৬৫.
উলঙ্গ গাভীদের কবিতা
কিশোর রঞ্জন দে

গুছিয়ে কথাটা বলার আগেই নরম পাখিদের ঝাঁক
                       উড়ে গেল উত্তর পাহাড়ের দিকে
অন্ধকারও যেন পাখিদের উড়ার অপেক্ষাই করছিল
অন্ধকারেও আমরা টের পেলাম
           তোমরা ও তারা গুয়ের এপিঠ আর ওপিঠ
তোমাদের ত্বক ও রোমকূপ পরীক্ষা না করেই
                       মার্বেল প্রাসাদে পাঠিয়েছি আমরা ।
আরো সত্য, প্রাসাদে ঢুকতে
                 তোমরা মাড়িয়ে গেছ রবিশস্যের ক্ষেত
শস্য খেতে আসা বুলবুলি পাখির ঝাঁকই যেন উড়ে গেল এইমাত্র ।

এখন টের পাওয়া যাচ্ছে আমাদের গারদ খুব ছোট ও অক্ষম
গারদে থাকার কথা যাদের
    তারাই মার্বেল প্রাসাদে বসে শাসন করে গোধূলির গাভীদের ।
কোটী কোটী উলঙ্গ গাভী শিং নেড়ে তেড়ে যাবে একদিন তোমাদের দিকে
এই আশায় বসে আছে নরম পাখিদের ঝাঁক উত্তর পাহাড়ে
২০.০২.১৯৯২

************************************** 
৬৬.
মায়ের কাছে শস্যের কাছে
কিশোর রঞ্জন দে

নাহারলাগুন পর্বতে দিক্রং নদীকে ছুঁয়ে
আমার মায়ের চিতা জ্বলে ওঠে ।

নীল জলোহাওয়া ভেদ করে আমার রাত্রির বাস
চা-বাগানে বাগানে কখনো ব্রহ্মপুত্র, কখনো লোভাতুর জঙ্গল পেরিয়ে
দ্রুত ছুটে যায় আমার মায়ের দিকে ।
আমার মায়ের কাছে আমি না পৌঁছালেও
স্থানীয় পাহাড়ীরা পৌঁছায় । তাদের হাতে লম্বা দা
তারা আস্ফালন করে ও আমার ভাইকে চিতা নিভিয়ে ফেলতে বলে ।

দুর্বল আগুনকে ঘিরে ভাইয়ের সখারা দাঁড়ায় ।

দিক্রং নদীর মালিক পাহাড়ীরা, নদীর দুই পাড়ের মালিকও তারাই
যদিও তা সরকারী শ্মশান ।
সে শ্মশানে আমার মা-ই প্রথম মৃতদেহ
তারা জীবনে প্রথম শবদেহের দাহন দেখে
সভয়ে দেখে চিতার ধোঁয়া তাদের বাসভূমির দিকে উড়ে যায়
যদি এই ধোঁয়ার সাথে মৃত্যুর অসুখ তাদের শিশুদের দেহে ঢুকে যায়
তাছাড়া মৃতদেহ পোড়ানোর কত পাপ
তারা রণে আহ্বান করে—
হিমালয়ের প্রকৃতি তখন এদিকে আরো বিষ্টিপাত করে ও ঝড়,
ভিজতে ভিজতে মহিলা ও পুরুষ পাহাড়ী ধেয়ে-ধেয়ে যায়
দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যোদ্ধার মতো আমার ভাই
তার সহকর্মীদের নিয়ে চিতা ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকে ।

আমার বাস গভীর অরণ্যে
চা-দোকান ও আলোর পাশে মাঝে মাঝে বিশ্রাম নেয় ।
আমি ব্যস্ত থাকি ভোর ও মায়ের অপেক্ষায় ।
আমি জানি না—
আমার মা প্রথমে শব ও পরে ভস্ম হয়ে গেছেন,
সেই ভস্মকে ঘিরে যুদ্ধ হয় হয়
অবশেষ এক বলিষ্ঠ ও অজানা বৃদ্ধ আসেন
তার শাসনে ও বাক্যে যোদ্ধা পাহাড়ীরা সরে যায় ।
“এ তো আমার কর্তব্য” বলে মৃদু হেসে বৃদ্ধ পাহাড়ী
অরুণাচলের নিদ্রালু পাথর ও জলের দিকে চলে যান ।

আমার মায়ের কাছে শস্যের কাছে
আমি পৌঁছাতে থাকি । 
০১.০৫.১৯৯১
নাহারলাগুন । অরুণাচল প্রদেশ

                           ***সেলিম মুস্তাফা / ২৭.১১.২০১৮