.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

ঘুনপোকে স্বাধীনতা

কান্নার আজ সোনায় সোহাগা
বিসর্জন ঘাটে ওপার হয়েছে যত্তসব দলিল-খসড়া
শক্ত ভীত সংশোধনে ওজনে বিক্রি অক্সিজেন
গোধিকা মুক্ত বিচরণ কম্পিত নভচর হঠাৎ স্বার্থ বিঘ্নে,
উষ্ণ তুষারে প্রহেলি কিরণ, শিবিরে আত্মদহন
প্রহসন শুধু সংশোধন ঈক্ষণে।

লাল গোলাপ আঘ্রাণে ক্ষত কাঁটাঘাতে
সংশয়ে, সুন্দর-অমলিন বহিঃমননে,
নিরেট অনশন মেকি তৃষ্ণা মেটা
বোধোদয় ক্ষুদার্থ হিংস্র চিতা
প্রজন্ম পর প্রজন্ম আড়ালে সূর্য হাসে
জ্যোৎস্নার আচলে নেড়ে, যৌবন স্রোতে
ইয়াবোর ময়ূর পঙ্খি বলে অন্তিম লগ্নে,স্বপ্ন-চক্ষু।

নবোদগত অঙ্কুর পলিমাটি অভাবে অশ্লিল দাগে
পলিথিন ব্যাগে মুখ বাঁধা শহ্বর ড্রেণে,
র ্যাবিস জিভে কচি খুলি চাটে
ব্যাংগো করে কার্নাসিয়াল বের করে
স্বতন্ত্র দেহটা 'বাবা ও বাবা' কিবা 'মা' বলে ডাকে
অজুহাতে ভালো আছি,তুমি থেকো সুখে।

ভালোই তো সমকামিতা নির্ভেজাল মনবাসনা
এতোসব নেই চিন্তা, পুরো সাপোর্ট দুহাত তুলে
খারাপ লাগবে কিছু শ্বাপদের প্রতি,রবে ক্ষুধার্ত যথারীতি
তবু বাঁচবে, আমি জানি
জহুরি জহর চেনে খাঁটি অঙ্ককষে।




সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

ভবিষ্যৎ ইতিহাসে.......

সমস্ত পর্ব অনিকেত,মানচিত্রটাও বিকৃত
চিলেকোঠায় বন্দি এককোষি
অপেক্ষা, তৈরীতে ব্যস্ত সোপান
...........রাজমিস্ত্রী।

হর্ষে খেদ বিস্ময়ে দ্যুলোক অস্থির,মজ্জা দোষের ফল
উপত্যকা নিঃস্ব অজ্ঞাত অধিবেশনে
অকেজো লৌহমানব 'ডি এন এ' টেষ্টে
ব্লাড গ্রুপে ক্ষয় রোগ, চৌরাস্তায় সাদা মাখন ভক্ষণে
শতাব্দীর গুজব সেলে প্রাক্তন প্রেমিক
আর্দ্রাজালে  বইছে নিরবধি।

আকন্ঠ বিষপানে অন্তঃসত্ত্বা অনির্ধারিত সংগোপনে
মেটে না লোভী হায়নার তেষ্টা,
দ্যাখ, খেলছে ওরা অযৌক্তিক নীতিজ্ঞ স্তবক-চিহ্নে
বর্ণাঢ্য নর্তকীনূপুরের ঝন-ঝনে শিহোরিত
উত্তেজিত,একনায়কের মর্টার
সর্বস্বে দেখি,লহরে বিজয় কেতন
তবে রুটিন মাফিক লাগবে স্যান্ডউইচ-বাটার-কোলা
আর অখাদ্যটা রেখেদিস ঐ কৃশ কুকুরটার জন্য,
বেচারা দোয়া দেবে!
ভবিষ্যৎ ইতিহাসের পাতায় আবার বর্তমান হবে।




শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

জলশিল্প

।। অভীক কুমার দে ।।

প্রতিদিন আলোয় সমাপ্তির খোঁজ
এক নিয়মিত মহড়া।

সমাপ্তি এক শূন্যতার নাম।

শূন্যতা মানেই অদৃশ্য,
অদৃশ্য থেকে ভেসে ওঠে জীবন এবং দর্শন।

অদৃশ্যে অনন্ত ঘুম আকাশের,
স্বপ্ন কিছু উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়ায়।

রশ্মিও নিজের রূপ দেখাতে চায়,
দেখতে চায় সৈকতের কত প্রেম রূপে।

যদিও সূর্য কোনো ডুবুরি নয়,
দিনের শেষে আলোটাই ডুবে।

দিনের শেষ আলো ওড়না বিছিয়ে ঘুমোলেই
সাগরজলে জোয়ার আসে।

যত সব দেনা- পাওনার হিসেব করে দেখি--
মনের জলবিছানায় জীবিকার ঘুম নেই।

বুকে জমা ইচ্ছেমায়ায় নীল চোখ,
চেয়ে থাকে জলশিল্প।




বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮





অবিশ্বাস

।।    রফিক উদ্দিন লস্কর   ।।

সবটুকু দিয়েছি উজাড় করে
আমারই আছে যতো,
নিজেই আজ পালিয়ে বেড়ায়
ফেরারি পাখির মতো।
আমি নই ওস্তাদ নই অভিনেতা
নহি কোন জাদুকর,
হাসিমুখ দেখে বুঝে নাই কেহ
ভাঙা যে মনের ঘর।
এ দুর্দিনে শুনিবে কি কেহ আর
আমারি কষ্টের কথা,
হারিয়ে গিয়েছে যে ছিল শোনার
সবচেয়ে মনযোগী শ্রোতা।
___________________________
নিতাইনগর,হাইলাকান্দি(আসাম)




বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

তবুও বলছি


.    ।।        রফিক উদ্দিন লস্কর      ।।

আমি জানি; তাই আকাশের সাথে কথা বলি
তোমার উষ্ণ দীর্ঘশ্বাসগুলো আজকাল...
কেবল মুক্তি খোঁজে অপরিণাম আক্রোশে!
আগাম জানিয়ে দেয় ঐ রক্তচক্ষু।
চুরমার করে শ্যাওলার পাহাড়
বুকের জমিনে বিছিয়ে রাখব সবুজ ঘাস।
রোজ সকালে খুঁজে নিতে পারো
দেখবে শিশিরবিন্দুর মত মুক্তো মুক্তো ঘাম,
ইচ্ছে হলে নগ্নপদে হাঁটতে পারো।
যদি পথ ভুল হয় তোমার,
আমার ভাবনার শেষ সীমানায় এসে
হৃদয়ের স্পন্দন শুনে খুঁজে নিও গতিপথ।
____________________________________
১৯/০৯/২০১৮ইং
নিতাইনগর,হাইলাকান্দি(আসাম)




মধ্যরাতে উদ্বাস্তুর কান্না-৩

।।শৈলেন দাস।।

ধর্মের দোহাই দিয়ে টুকরো করে দেশ
সীমানার বাইরে ফেলে রেখে আমাদের
ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব অর্জন করলে তোমরা
মিথ্যা প্রতিশ্রুতি আর অভয়বাণী দিয়ে
আমাদের করলে সর্বনাশ।

তারপরের ইতিহাস সবার জানা
মেঘনা-পদ্মার জল ক্রমশ লাল হল
ভাসল তাতে আমাদের পূর্বজদের লাশ
আমরা মা-বোনের সম্ভ্রম ও ধর্ম বাঁচাতে
ছাড়লাম সোনার দেশ।

এপারের প্রেক্ষাপট অবাক করার মত

ধর্মের দোহাই দিয়ে উত্তাল করে দেশ
ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব অর্জন করল যারা
তারাই নিজেদের প্রতিশ্রুতি ও অভয়বাণীর
দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকরন করে
আমাদের অস্তিত্ব সংকটে ফেলে
স্বধর্মের উৎস ভূমিতে আমাদের সুধায়
কোথায় আমাদের দেশ!

নিজ ধর্ম ও সম্ভ্রম বাঁচাতে অক্ষম আমরা নাকি
এখানকার ভাষা- সংস্কৃতির জন্য হুমকিস্বরুপ
এমন অমানবিক অপপ্রচার করে যারা
তাদের একাংশ আবার প্রায়ই দেখি
বামে হেলে আওরায় বিশ্বমানবতার বাণী
পড়ে নেয় মেকী মুখোশ!

ধর্মের বর্ম আজ এখানেও অকেজো, অসার
মানবতা এখানে ক্ষমতা অর্জন পর্যন্ত সীমিত
ভাষা ও বাম শরে বিদ্ধ, আহত আমরা
'ভীষ্মের স্বেচ্ছামৃত্যু'ই কি তবে ভবিতব্য
আমাদের সুদিনের শেষ?




মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

শব্দ জোনাকি

।।শৈলেন দাস।।

তোমার ফ্ল্যাটবাড়ির পর্দার ফাঁক গলিয়ে

যেটুকু আলো এসে পড়ে ফুটপাতে

তারচেয়েও অনেকটা কম আলোকিত আমার জীবন।

এরপরও যখন দিনের শেষে ক্লান্ত, হতাশ

আমাকে মুখোমুখি হতে হয় তোমার

তখন যাবতীয় ব্যর্থতা, গ্লানি ঢেকে দিতে আমি

একঝাঁক শব্দ জোনাকি করি আবাহন




অনামিকার বয়ান

।।           রফিক উদ্দিন লস্কর          ।।
কোন রাতের অন্ধকারে লুকিয়েছিলাম তোমারই গর্ভে
সামাজিক ধরাবাঁধা আছে তাইতো!
আমার স্থান নর্দমায়, নাহয় পলিথিনে মোড়া কোন ব্যাগে,
নাঁড়ি কাটা হয়েছে খুব তাড়াহুড়ো করে
কোন নামই রাখা হয়নি।
পাবো কি বাবার আদর আর মাতৃসুধা!
সেই অধিকারটুকুও আমার নেই, কারণ...
লোকলজ্জার ভয়ে তোরা ছুটে গেছো অনেকদূর।
আমি চিৎকার করে কেঁদেছি পৃথিবীকে দেখে
তুমি কি শুনতে পেয়েছে? না...
শুনলে তো চলে আসতে এই পৃথিবীকে পাল্টিয়ে।
শুধু শুনেছে ঐ রাস্তার কুকুরের দল
ওরা অজানা থেকেও আবিষ্কার করে নিল, কিন্তু...
ওরাও আমায় রেহাই দেয়নি।
ধারালো নখে আমার পাঁজরগুলো ছিড়ে ফেললো
খুব যন্ত্রণা হয়েছিল যেমনটি তোমার।
তোমায় ভালোবাসি বলে যে আমার জন্ম দিলো
সে কি মানুষ?  না কখনো তা হয়না,
ভালোবাসার মানুষ হলে সে কি কখনো
লোকের অগোচরে কুকুর দিয়ে আমায় খাওয়াতো??
___________________________________
১৮/০৯/২০১৮ইং
নিতাইনগর, হাইলাকান্দি (আসাম-ভারত)




সোমবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

আসল কতা অইলো গিয়া

এই বছরের আগিলা পূজাডা গনেইস্সাই ধইরা লাইছে ৷ পরিসংখ্যান দপ্তরের খাতাপত্রে অহন পইরযন্ত দুই হাজার সারে আঢারডা গণেশপূজার পাত্তা পাওয়া গেছে ৷ এইডা খালি আগরতলা শহরের হিসাব ৷  মমস্সলেরটি অহনঅ আইয়া সারছে না ৷ নেট খারাপ ৷ বিশ্বকর্মা ঠাউর রওনা দিবার লগে লগেঅই  তার স্যাটেলাইট ইনডাসটিকের কর্মীরা যে যার বাইৎ গেছেগা ৷ গিরস্ত বাইৎ গেলেগা খেতের কামলারা যেমুন করে আরকী ৷ না আসল কতা অইলো গিয়া হিসাবটা ভেজাইল্লা লাগতাছে ৷আবার সারে কেরে?  এইডা কুন হিসাব ?  দ্যাবতার আবার আধা কী?  না আসল কতা অইলো গিয়া মিনিসিপালির থিক্কা যহন গনাত বাইর অইলো তহন দেহা গেল কুনু কুন চুমুনির ধারে গণেশ ঠাকুররে একলা ফালাইয়া ভক্তরা নেশামুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করনের লাইগ্গা হিয়ানতে সইরা গেছে ৷ কী করন যায়, বছরের পর বছর ইট্টু ঠান্ডা গরমের ব্যাপার চইল্লা আইছে ৷পট কইরা তো আর বাদ দেঅন যায়না ৷ মানসম্মানের একটা পেসটিজ আছেনা ৷ এর লাইগ্গা গনইন্নারা গিয়া তথ্য লেহনের লাইগ্গা কেউরে পাইছেনা ৷ ঠাউর বুইল্লা কতা ৷ বাদ দেয় ক্যামনে ৷ মিনিসিপালির প্রণববাবু সাব্যস্তের মানুষ ৷ নাটক পরিচলানা করেন ৷ গুণী মানুষ ৷ চিকন বুদ্ধিও আছে তাইনের ৷ বুদ্ধি একখান বাইর করলেন ৷ মানুষ নাই দেবতা আছে ৷ এমুন যে কয়ডা পাইবেন অদ্দেক হিসাব ধইরা লান ৷ বার বার কী আর আঅন যাইব'? সাপঅ মরল', লাডিঅ বাংলনা ৷ হেমনে যাইয়া এই হিসাডা খারাইছে ৷
আসল কতা অইলো গিয়া গণেইশ্শা পূজার বাজারটা কেমনে ধরছে দ্যাহেন ৷ আগরতলা শহরের চুমুনিডির কুনকুনুডার মইদ্দে শনিবার শনিবারে শনিপূজা অয় ৷ ইডারঅ বাচ্ছরিক পূজা আছে কুনুকুনু জাগাৎ ৷ আগরতলার শনিঠাকুর খুব জাগ্রত ৷ চুমুনির মইদ্দে একছিডেন অইলেঅই শনিপূজা শুরু অইআ যায় ৷ এই শহরে শনিতলা বুইল্লা একটা জাগাঅ আছে ৷ কিন্তু মহাদেবতলা নাই, দুগ্গাতলা নাই, লক্খীতলা নাই, কাত্তিকতলা নাই ৷ আর কত কমু ৷ শনির ইহানঅ খুব নাম ডাক ৷ তাইনেই ছেলিব্রিটি আগরতলার ওপেন ফিল্ডে ৷ গণপতি ঠাকুরের আগমনে এইবার পরের দিনের শনিপূজাডিও মাইর খাইছে ৷ শনিপূজার কয়দিন আগের থিক্কা লাইটিং মাইক মিল্লা রাস্তার মইদ্দে একটা অরন্ডি লাইগ্গা যাইত ৷ এইবার গণপতি বাপ্পা মোরিয়া শনিরে মুড়াইয়া লাইছে ৷ মাথা বদলাইয়া দেওননি ছুডুবেলা? মামা গো! বুজছিলা হাতির মাথাৎ কুনুতা ধরতোনা ৷ তুমি রাজত্ব করবা? আর অইতোনা ৷ পঁচিশ বছর বহুত করছ' ৷ আর জ্বালাইওনা ৷ ( ছরি,  কেউ রাজনীতিৎ নিয়েননা)  ৷ আসল কতা অইলো গিয়া শনিঠাউর গত শনিবার জমাইতেই পারলেননা ৷ মাইক, লাইটিং,  থার্মোকলের বাটিৎ খিচুড়ি, ফাইড রাইস কুনুতানেই কুনু কাম অইলনা ৷ হগ্গলতে এইবার ডাইটিং না করইন্না দেবতাডার দিকে ফিরা দৌড় লাগাইছে ৷ কেমনে এই দেহডা লইআ সুগার টুগার ছাড়া বাঁইচ্চা থাহন যায় ইডাঅই জানত' চায় হক্কলে ৷ডাক্তারের চরণে ট্যাহা ঢালতে ঢালতে ফতুর হ্যাকজন ৷ শনিঠাউর অ আর কিতা করতাইন ৷ বয়সঅ অইছে ৷ কোপের দৃষ্টিও নাই ৷ হাই পাওয়ার চশমা লাগে ৷ কি আর করন যায় ৷ কালের কাল বাইস্সা কাল,  ছাগলে চাডে বাঘের গাল ৷ আবছা দৃষ্টিতে  ভাইগনা গণেশের মন্ডবের দিকে চাইয়াই রইছেন ৷ সামনে দিয়া ঢাক বাজাইয়া, ট্রাকঅ উডাইয়া গণেশরে লইয়া যাইতাছে ৷ মাইনষে গণেশে নামে ধ্বনি দিতাছে গো!  মনে পডে হেই গানডা- ফাইট্টা যায়, বুকটা ফাইট্টা যায়!
    এইত গেল শনি ঠাউরের দুর্দশার কথা ৷ আর আজগা দেহি বিশ্বকর্মারঅ মাথাৎ বারি পড়ছে ৷ তাইনে সক্কালবেলা মাডিৎ লাইম্মাঅই টের পাইয়া লাইছইন  এবছরের ভাইল বালানা ৷ আসল কতা অইলো গিয়া কয়দিন আগে গণেশ ঠাউরের পূজার মাইদ্দে মাইনষে যেমনে লামছে আর চান্দা টান্দা দিয়া হাত খালি কইরা লাইছে খরচাপাতি করছে বিশ্বকর্মার চাপটা যেমন নেওন যাইতাছেনা ৷ মাইনষের হাতঅ ট্যাহা পইসা কিচ্চু নাই ৷ অন্যান্য বছর বিশ্বকর্মা পূজার দিন কুনুক্কানঅ যাওন যাইতোনা গাড়ি রিসকার অভাবে ৷ পূজার আগে মানে দুফরের পরে ছাড়া রাস্তাৎ বাইর অইতনা গাড়ি টারি ৷ এইবার এমন কিচ্চু সমস্যা নাই ৷ হগ্গলে
ট্যাহা কামানির ধান্দাৎ লাগছে সহাল থিক্কা ৷ কুনসময় পূজা দিল',  কুনসময় কিতা অইল ৷ চার দুহানের  কুনাৎ যাইয়া বিশ্বকর্মা পুরিতরকারির অর্ডার দিয়া নিরিবিলি খাইতাছ্ল ৷ দুই একটা কথার আওয়াজ কানঅ বারি দিল ৷ ছয়-সাতমাস দইরা রুজি নাই, রেগার কাম নাই, কন্টাক্টরি নাই , কর্মচারীরার পে- কমিশনডাও ঝুলতাছে ৷ মাইনষের হাতঅ ট্যাহা পইসা আছে আর কত, থাকবঅ কত ৷ আহ হায়রে কী ব্যারাছেরার মাইদ্দে আইলাম- বিশ্বকর্মা মনে মনে কয় ৷ মনে মনে আবার হাসেঅ ৷ কদিন পরে ত বড় বৌদিঅ বাপের বাড়িৎ আইব ৷ আইবার সময় দেইক্কা আইছে কোমারে আঁচল প্যাঁচাইয়া বড়দার লগে ঝগড়া করতাছে বড়বৌদি ৷ বাপের বারিৎ আইঅনের লাইগ্গা ৷ আর ইহানঅ যে ভাতিজা বাজারডার দহল লইয়া লাইছে তাইনে কইতারবনি ৷
    দুহানদাররে টিফিনের ট্যাহাডা দিয়া বাইর অইয়া একটা বিড়ি ধরাইয়া সুখটান দিল বিশ্বকর্মা ৷ চুমুনির মাঝখানঅ বিড়ি জ্বালাইছে ৷ পুলিশে ধরবনি ব্যাডারে ৷ আরেনা বিশ্বকর্মা জানে, ইহানঅ আইন অয় ৷ মানন লাগেনা ৷ গাড়িৎ উডেন, অটুৎ উডেন ৷ য্যামনে মন্দের হ্যামনে ভাড়া লইতাছে ৷ যাত্রী লইতাছে ৷ রাজ্যরে নেশামুক্ত করতাছে ৷ আবার মদের বার খুইল্লা দিতাছে ৷ সাপের মুহঅ চুমা চলে আবার ব্যাঙের মুহেঅ ৷ আসল কতা অইলগিয়া বড় বৌদিরে একটা ফুন করন লাগে ৷ ভাতিজার কান্ডকীর্তিডা জানান দরকার ৷ কদিন আগে বৌদি একটা মুবাইল লইআ আইছিল ৷ একটা সিম লাগাইয়া দেওনের লাইগ্গা ৷ একটা নিজস্ব মুবাইলের খুব দরকার ৷ ভক্তরা ফুন করে লক্কু-সরুর মোবাইলে ৷ তারা বিরক্ত অয় ৷ তারার গেইম খেলায় ডিসটাপ অয় ৷ একজন ভক্ত গতমাসে দিল মুবাইলডা ৷ বিশ্বকর্মা তার সিমের টাল থিক্কা একটা স্পেশাল নম্বরের সিম লাগাইয়া দিল মুবাইলডাৎ ৷ নম্বরটা মনে থাকার মতো আবার নিরাপদও ৷ পাঁচটা পাঁচ আর তিনটা তিন দিয়া নম্বরটা ৷ বৌদিরে বুঝাইয়া কইল নম্বরের ব্যাখ্যা ৷ পাঁচটা পাঁচ মানে বড়দার পঞ্চানন আর তিনটা তিন অইলো আপনার ত্রিনয়ন ৷ সব মিলাইয়া দশ ডিজিটের নম্বর ৷ বৌদি খুব খুশি ৷ পহেটতে নিজের মুবাইলডা বাইর করল বিশ্বকর্মা ৷ নম্বরটা মনে আছে ৷ ফাইভ ফাইভ ফাইভ ফাইভ ফাইভ থ্রি থ্রি থ্রি...... হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো বৌদি ৷ আমি বিশু কইতাছি ৷ আরে!  রিং অয় ৷ কাইট্টা ৷ আবার করে ৷ এবার কয় নট রিচেবল ৷ আবার ৷ নেটওয়ার্ক ষেত্র সে বাহার হ্যায় ৷ আবার ট্রাই করে ৷ হুরুজা ৷ সুইচ্ড অফ ৷ মোবাইল কুম্পানিডিও যে ... ৷ আরে স্বর্গে তো বিশ্বকর্মারই নেটওয়ার্ক চলে ৷ কারে দুষতাছে ৷ তাইলে কী তার কর্মচারীরা? আসল কতা অইলো গিয়া..........




রবিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

বৃক্ষতনয়


বড় রাস্তার বাঁকের ভিতরের দিকে রাজাদের ‘বস্তি’ পলিথিনের ছাউনি, সরষের তেলের পুরোনো  টিনের ঢাকনা এবং  খড় বা ছনের বেড়া দিয়ে যে যেভাবে পারে নিজেকে আড়াল করে রেখেছে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এলে ভিজে,কাঁপে,জ্বরজারি হয়,ওষুধ খায়,সেরেও  যায় এসব কেউ গা করে না একটা হাতচাপা কল আর লুঙ্গার মাথায় একটা ডোবা আছে জলের চিন্তা নেই মহিলাদের অনেকে গঞ্জে গিয়ে বাবুদের বাড়িতে কাজ করে কেউ রাজমিস্ত্রীর জোগালি, ফেরিওলা , মাটিকাটার কাজ বা অন্য কিছু করে। পুরুষরাও সকালে খাবারের পুঁটুলি নিয়ে বেরিয়ে কাজ খোঁজে না পেলে বস্তিতে ফিরে আসে এছাড়া প্রায় সব ঘরেই আছে চোলাই মদের ঠেক রাস্তা দিয়ে যেসব গাড়ি যায় তার ড্রাইভার ও সহযোগীরা বস্তিতে এসে গলা ভিজিয়ে যায়, জিরিয়ে নেয় এসবের কোন দিনরাত নেই ছোট  বড়ো যে যখন ঘরে থাকে চোলাই সাপ্লাই করে গাড়িওয়ালার কারণে এবং নিজেদের মধ্যে হরঘড়ি খিস্তি খেউড়ের কারণে বস্তি দিনরাত মুখরিত থাকে    
রাজার কাছে জায়গাটা এমনিতে ভালই লাগে শুধু মা  তিরিক্ষি মেজাজে থাকলে তার খুব ইচ্ছে করে এ জায়গা ছেড়ে  চলে যেতে ভয়ও করে তবে সপ্তপর্ণীর কাছে গেলে ভয়টা চলে যায় সপ্তপর্ণীর যখন ফুল ফোটে তখন বস্তির চোলাইয়ের গন্ধ ছাপিয়ে যায় সেই সুগন্ধে সপ্তপর্ণীই তার বন্ধু বস্তির লোকেরা হরদম তাকে দুচ্ছার করে , খারাপ খারাপ কথা বলে বিশেষ একটা কথায়  সে একা একা কাঁদে তখন একমাত্র সপ্তপর্ণীই তাকে সান্ত্বনা দেয়, আদর করে, চোখের জল মুছিয়ে দেয় ভালো ভালো কথা বলে
কোন কোন রাতে ট্রাক থামিয়ে ঐ লোকগুলো যখন মাকে খারাপ কথা বলে তখনো তার যেদিকে খুশী চলে  যেতে ইচ্ছে করে তাড়াতাড়ি বড়ো হতে পারলে মাকে নিয়ে চলেই যাবে কিন্তু সে  তো বড়ো হচ্ছে না  এই দশ বছর বয়সেও মা যখন তাকে বুকে জড়িয়ে ঘুমোয় তখন সে সারা দুনিয়ার রাজা হয়ে যায় দিদা বলেছে দুনিয়া নাকি অনেক বড় এইরকম কোটি বস্তির সমান ‘কোটি’ শব্দটা সে শুনেছিল তারক মাস্টারের ইস্কুলে তারক মাস্টার বলেছিল কোটির চেয়ে বড় আর কিছু হয় না এখন সে আর তারক মাস্টারের ইস্কুলে যায় না।
দিদা তাকে কত ভয় দেখিয়েছে, শেষ শরতে সপ্তপর্ণীর ফুলের গন্ধে সাপেরা নাকি গাছের কাছে চলে আসে গাছে পেঁচিয়েও থাকে গাছে ভুতেরও বাস কিন্তু রাজাকে নিরস্ত করতে পারে নি সে রোজ  সপ্তপর্ণীর তলায় গিয়ে হেলান দিয়ে বসে লুঙ্গাটার শেষ প্রান্তে ঝোপের ভিতর সপ্তপর্ণী দাঁড়িয়ে কেউ পারতপক্ষে সেদিকে যায় না   এই এলাকায় এত বড় গাছ আর নেই মা কাজে চলে গেলেই সে চলে আসে সপ্তপর্ণীর কাছে কত কথা যে বলে সপ্তপর্ণীর সঙ্গে তার ঠিক নেই দুপুর রোদে  ঘুমিয়েও  পড়ে সপ্তপর্ণীর তলায় তখন সপ্তপর্ণী তার গায়ে হাওয়া করে, ছায়ার আড়াল দেয় একদিন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এল সপ্তপর্ণী বলল, আমাকে জড়িয়ে ধর সপ্তপর্ণীর গা-চোঁয়ানো জলে তার খোলা বুক ভিজে গেল সপ্তপর্ণী বলল, আমিও তোর মতো, আমারও জামা নেই তার মন ভাল হয়ে গেল
সে ঝোপ থেকে বন কূল ,আমলকি পেড়ে এনে খায় বুনো জাম, টেকরই, কাউ, লাল গোটা, কটকি ফুলের গোটা, আরো কত কী খায় ! তেষ্টা পেলে জল-গাছে’র আগা চিবোয় সপ্তপর্ণী খিল খিল করে হাসে, খা খা, তোর জন্যই তো গাছে গাছে ফল ধরে আছে তুই খেলে গাছেরা কত খুশী হয় দেখেছিস কালুর দাদুর উপর খুব রাগ হয় রাজার সপ্তপর্ণীর ফুল ফুটলেই বুড়োটা খেপে যায় বুড়োটা বলে ‘ছাইত্যান’গাছ একবার একটি পাতা তারক মাস্টারকে সে দেখিয়েছিল তিনি বলেছেন, এর নাম ‘সপ্তপর্ণী’, দেখেছিস কেমন সাতটি পাতা সুন্দর করে সাজানো ডালগুলো ছাতার মতো  চারিদিকে  ছড়িয়ে আছে তাই একে ‘ছাতিম’ গাছও বলে দেখেছিস বনের মাঝে সব গাছ ছাপিয়ে রাজার মতো দাঁড়িয়ে থাকে । শুনে রাজার খুব ভাল লেগেছিল আরো বলেছিল, এই গাছের  ছাল, মূল,  পাতা থেকে নাকি অনেক ওষুধ বানানো হয় ‘সপ্তপর্ণী’ নামটা বেশ লাগে দক্ষিণী হাওয়ায় যখন ফুলের গন্ধ বস্তিতে আসে তখন বুড়োটা নাক ধরে বলে, কী বাজে গন্ধ ! এত দুরেও থাকা যায় না ! গাছটাকে একদিন কেটেই দেব রাজার খুব ভয় করে অথচ গাছে যখন থোকায় থোকায়  হাজার হাজার ফুল ফোটে তখন রাজার কাছে মনে হয় পুরো এলাকাটা যেন আলোকিত হয়ে যায়
রাজাকে দেখলেই বুড়ো একটা না একটা কাজ করাবেই একদিন সে  সবেমাত্র সপ্তপর্ণীর দিকে হাঁটা দিয়েছিল বুড়ো বলল, কী হে রাজা বাহাদুর, কোথায় চললি ? আমার সঙ্গে আয় তো রাজার রাগ হল বূড়ো তাকে দিয়ে খাটিয়ে নেবে, আর খারাপ কথা বলবে সে পাশ কাটিয়ে চলে যেতেই  খিস্তি, এই নবাবের বাচ্চা, গায়ে  যে দেখছি বাতাস লেগেছে রাজা থামে না। বুড়ো চেঁচাচ্ছে, হবেই তো যার বাপের ঠিক নেই তার তো  দেমাক হবেই কথাটা কানে যেতেই রাজা ছুট লাগায় এক দৌড়ে সপ্তপর্ণীর তলায় গিয়ে হু হু করে কাঁদতে থাকে তখনই সপ্তপর্ণীর গলা শোনে, আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখ সেও তাই করে একটা বাতাস এসে গায়ে লাগে সে শীতল হয় কান্না থেমে যায় চোখের জল মুছে যায় বাতাসে
এই কারনেই তো সে তারক মাস্টারের ইস্কুলও ছেড়ে দিয়েছে দুই ক্লাশ পর্যন্ত পড়েছিল বহু অপমান সে  সহ্য করেছে অপমান বলতে সে বুঝে সেই বিষয়টা যা তার মনের  খুব ভিতরের একটা জায়গায় খুব কষ্ট দেয় কালু, দুলু, রকেট, দেবা সবাই তাকে কষ্ট দিতো ইস্কুলের দিনগুলোতে যখনই ঝগড়া হতো তখনই ঐ কথাটা বলে দিত যা শুনলে তার ছোট্ট মাথাটার ভিতরে আগুন জ্বলে উঠতো তখন  মনের  গহীনে কী যে কষ্ট হতো তা সপ্তপর্ণী ছাড়া আর কেউ বুঝে না সেই কষ্টটা বাঘকাঁটার খোঁচার থেকেও কোটি কোটি গুণ বেশী রাজার সঙ্গে কেউ কুস্তিতে পারে না, বল লাথি দিয়ে এত দূ্রে নিতে পারে না, ডাংগুলি খেলায় পারে না, এত সুন্দর ধনুক বানাতে পারে না, লাটিম ঘোরাতে পারে না, পাতার বাঁশী  বানাতে পারে না, ডোবার জলের এপার ওপার করতে পারে না যখন তাকে কিছুতেই হারাতে পারে না তখনই ঐ খারাপ কথাটা বলে দেয় রকেট আর দেবাটাই বেশী করে মুখ ভেংচিয়ে বলে, এই বেজম্মা, আমাদের সঙ্গে তোর কীসের মিল ? আমাদের বাপ আছে, আর তোর ? সে কুঁকড়ে যায় ।
মাকে একদিন রাগ করে বলে দিল, মা আমি কি বেজম্মা ? বেজম্মা মানে কী ? বেশ, মা’র মুখটা মুহূর্তেই মেঘের মতো ঘন কালো হয়ে গেল কালুর দাদুটার মুখেই প্রথম সে ঐ শব্দটা শুনেছিল । মানে না বুঝলেও  কথাটা যে খুব খারাপ সেটা সে বুঝতে পেরেছিল মা সেদিন কাজে যায় নি, রান্না করে নি দিদা তাই মাকে আরো খারাপ খারাপ কথা বলল ভয়ে সে মার কাছে ঘেঁষে নি । দুপুর রোদে সপ্তপর্ণীর তলায় গিয়ে কেঁদেছে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে স্বপ্ন দেখেছে সপ্তপর্ণী তার শিয়রে বসে মাথাটা কোলে নিয়ে চুলে হাত বুলিয়ে দিয়েছে , ঠিক মা’র মতো সেদিন রাতে ঘুমুতে গিয়েও মা’র থেকে দূরে  শুয়েছিল ঘুম আসছিল না হঠামা তাকে বুকে টেনে নিয়ে সপ্তপর্ণীর মতো আদর করে দিল চুলে আঙ্গুল ঢুকিয়ে বিলি কেটে দিল । সে মা’র বুকে মুখ গুঁজে টের পেল মা’র বুকে খুব কান্না জমেছে তারক  মাস্টারের  কাছে শোনা সাগরের মতো ঢেউ উঠছে মা’র বুকে কিন্তু ঢেউগুলি থমকে আছে মাকে সে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, যেমনটা সপ্তপর্ণীকে ধরে তার কষ্ট কমে যায় বুঝতে পারে মা’র বুকে একটা বড় পাথর জমে আছে
আরো ছোটবেলায় যখনই বাবার কথা জিজ্ঞেস করতো, মা তখন দূরের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে দিয়ে বলতো, ওই দিকে চলে গেছে আসবে একদিন ইস্কুলের খাতায় লিখে দিয়েছিল আর তাকে শিখিয়ে দিয়েছিল বাবার নাম রবি দাস সেই রবি নামের লোকটাকে দেখতে তার খুব ইচ্ছে করে । বাবা ডাকতে ভারী ইচ্ছে করে দুলু রকেটদের মতো তখনই মনের সেই জায়গাটায় টনটন করে ওঠে লোকটা একবার এলেই তার কষ্টটা চলে যেত দুলু, রকেট  আর ঐ দুষ্টু বুড়োটাও খুব জব্দ হয়ে যেত বস্তির সকলের থোঁতা মুখ ভোঁতা হয়ে যেত সেও আবার  তারক মাস্টারের ইস্কুলে যেত লোকটা কি সেকথা বুঝে না ? তারক মাস্টারের সামনেই জোরে জোরে বলতো, আমি রবি দাসের ছেলে আমার বাবা রবি দাস কতবার যে ‘বাবা’ শব্দটা উচ্চারণ করত ঠিক নেই কোটিবারই করত !
দিদাটা কেমন যেন বদলে গেল  আরো ছোটবেলায় কত কত রাজপুত্তুরের গল্প শোনাতো অথচ এখন সে দিদাকে সহ্যই করতে পারে না দিদার কাছে শোনা ডাইনী বুড়ির মতোই লাগে দিদাকে মাকে প্রতিদিন খারাপ কথা বলে সন্ধ্যের পর মা তাকে নিয়ে ঘুমুতে গেলেই বুড়ির চেঁচামেচি শুরু হয়ে যায় বলে, এই নবাবের ঝি, মদের গেলাসগুলো রেডি করে রাখ আমি একা পারি ?  
কাল রাতেও এই নিয়ে তুমুল ঝগড়া করল বুড়ি মাকে যা তা বলে গালাগাল করল মা বলল, আমি এখন উঠতে পারব না, রাজাকে ঘুম পাড়াবো বুড়ি এবার রাক্ষুসীটার মতো রেগে গেল , সোহাগ দেখে বাঁচি না কত দেখলাম !  যার জন্মের ঠিক নেই তার জন্য এতো ? তখন কতবার বলেছি, এসব আপদ খালাস কর্ শুনলে তো আমার কথা ?  এখন ঐ কাঁটাই বয়ে যা সারা জীবন আরো খারাপ কথা  বলছিল মা তার দুই কানে দুই আঙ্গুল ঢুকিয়ে চেপে ধরেছে সেও বেশ জোরে সপ্তপর্ণীর মতো মাকে জড়িয়ে ধরেছে কিন্তু টের পেল মাথার রক্তটা গরম হয়ে যাচ্ছে পরে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে মনে নেই সকালে ঘুম থেকেই উঠতেই বুড়ির গালাগাল মনে এল আর মাথার রক্তটা আবার গরম হয়ে গেল মাথাটা দুই হাতে চেপে ধরল কাজ হল না চোখ বুজেও দেখল দুলু, রকেট, দেবারা হাসছে হি হি করে, বুড়োটা হাসছে খ্যাক খ্যাক  করে, বাবুদের বাড়ির লোকেরা কেমন করে তার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছে, ইস্কুলে সবাই আঙ্গুল তুলে বলছে , এই বেজম্মা, তোর বাপ কে রে ? সব এক সঙ্গে মাথার ভিতর  কিলবিল করে  উঠল রাজা দুই হাতে মাথা চেপে ধরে ছুট দিল সপ্তপর্ণীর তলায় গিয়ে হেলান দিয়ে বসে শব্দ করে কাঁদতে থাকল একসময় ঘুমিয়ে পড়ল  
সপ্তপর্ণী তাকে হাওয়া করল, চুলে হাত বুলিয়ে দিল শেষে বলল, তুই তো রাজা রাজাদের কোন দুঃখ  থাকতে নেই রাজা বলল,  দুনিয়াতে আমার বাবা নেই, এটাই কষ্ট  সবাই যে আমাকে ঐ খারাপ কথাটা বলে তাতেই তো দুঃখ সপ্তপর্ণী বলে, দূর বোকা, কে বলেছে তোর বাবা নেই ? আমিই তোর বাবা আমার কত সন্তান আমি নিজেই জানি না আর একজন বাড়ল তবে তোর মতো বোকা সত্যিই নেই রে ! আমিই তো জানি না আমার বাবা কে   এই যে  চারপাশে শত শত গাছ, এদের বাবা কে ? এই যে পাখি, ফুল এদের বাবা কে বল ? এত বড়ো যে আকাশ, তার বাবা কে ? আমাদের কারো কোন দুঃখ তো নেই তাহলে তোর কেন থাকবে ? কতগুলো বোকার কথা শুনে তুই শুধু শুধু কষ্ট পাবি কেন ? 
সপ্তপর্ণী তার চোখের জল মুছিয়ে দিয়েছে চুলে বিলি কেটে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে সে আরো জোরে সপ্তপর্ণীকে জড়িয়ে ধরেছে মনের সেই জায়গাটার টনটন করাটা কমে গেছে মাথার রক্তের টগবগ কমে গেছে সে আবার তারক মাস্টারের ইস্কুলে যাবে দুনিয়ার গল্প শুনবে পাশ ফিরতেই অবাক হল মা সপ্তপর্ণীর গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে আর তার মাথাটা মা’র কোলে মা’র হাতের আঙ্গুল তার চুলে ঘুরছে সে নিঃশব্দে মাকে আরো জোরে জড়িয়ে ধরল গনগনে রোদ উঠে গেলেও সপ্তপর্ণীর ছায়ায় রাজার গায়ে রোদের আঁচ লাগছে না
                                         * * * অর্জুন শর্মা,উদয়পুর,গোমতী,ত্রিপুরা