“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

বৃহস্পতিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৮

'কাপ্তাই বাঁধ : বর-পরং : ডুবুরীদের আত্মকথন' সমারী চাকমার প্রবন্ধ গ্রন্থের পাঠ-প্রতিক্রিয়া

।। সেলিম মুস্তাফা।।



র্ণফুলি কর্ণফুলি, কাপ্তাই কাপ্তাই !!
কাপ্তাই মানে চাকমাদের কান্না,মানুষের কান্না, হৃদয়ের কান্না,গভীর নীলজলের মতো অন্তহীন বেদনার জললিপিকা ।
কাপ্তাই বাঁধ বর-পরং ডুবুরীদের আত্মকথন। এবার, ২০১৮ সালের আগরতলা বইমেলায় এই বইটি কবি গৌতম চাকমার সৌজন্যে আমি উপহার পাই এর লেখিকা শ্রীমতী সমারী চাকমা হাত থেকে । এ যেন এক বিষাদ-সিন্ধু !
লেখিকা সমারী চাকমা, যার জন্ম ১৯৭৫ সালে, তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী, এবং সুপ্রিম কোর্টেই চাকমা জাতির প্রথম মহিলা আইনজীবী বলে তালিকাভুক্ত ।
ছিন্নমূলতা মানবজীবনের এক অনপনেয় লিপি । মানবসভ্যতার সঙ্গে এর নাড়ীর যোগ । আদিম যুগ থেকে পৃথিবীর বুকে মানুষের ধারা বয়ে চলেছে ইচ্ছায় অনিচ্ছায়, কখনো খাদ্যের অন্বেষণে, কখনো সবলের প্রবল বিতাড়নে । কখনো এর কারণ ধর্ম কখনো রাজনীতি, কখনো জাতপাত, কখনো বর্ণ, কখনো সামাজিক বিকাশ, যান্ত্রিক উন্নতি, এমনকি কখনো নিজের পারিবারিক কারণে ! পরিবর্তন-এর সঙ্গে তাই ছিন্নমূলতার সম্পর্ক গভীর, রহস্যময়, এমনকি কখনো গোপনও । লাঠি যার মাটি তার । কখনো সবলের লাঠি, কখনো উন্নতির ! এখানে কান্নার কোন মানে নেই, কান্নায় কোন সমাধান নেই । চাকা গড়িয়ে আসে, গড়িয়ে চলে যায় । চাকার নিচে পিষে যায় মাটির দীর্ঘশ্বাস । চাকার কোন আত্মা নেই । চাকার ধমনীতে রক্ত নেই, চাকার চোখে জল নেই ।

কর্ণফুলি ! কর্ণফুলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প । স্বাধীনতার আগে ভারতবর্ষ । স্বাধীনতার পরে পূর্বপাকিস্তান ।

বইটি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে পড়লাম । পড়লাম মানে বইয়ের পৃষ্ঠাগুলি আমাকে টেনে নিয়ে গেল, বাধ্য করলো পড়তে, এমনই সুলিখিত । লেখিকা শ্রীমতী সমারী চাকমাকে এবং সেই সঙ্গে  আমার অনুজপ্রতিম গৌতম চাকমাকে ধন্যবাদ দিই বইটি আমাকে উপহার দেবার জন্য ।
কর্ণফুলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প-এর পেষণে তছনছ হয়ে যাওয়া একটি জাতিগোষ্ঠীর করুণ আর্তনাদের সত্যনিষ্ঠ ঐতিহাসিক বিবরণ নিয়ে গড়ে উঠেছে এই গ্রন্থটি । ভারত বাংলাদেশ মিলিয়ে মোট দশজন জীবিত ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে তাদের জবানীতেই লেখিকা  আমাদের  সামনে তুলে ধরেছেন মর্মন্তুদ ঘটনাবলী যাতে রয়েছে একাধারে সরকারি বঞ্চনা তাচ্ছিল্য ও প্রিয়জনের সঙ্গে জীবিত অবস্থায়ই চিরবিচ্ছেদের হাহাকার ! মানুষের আর্তনাদের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে ছেড়ে আসা গৃহপালিত প্রিয় পশুদেরও করুণ বিলাপ !
এই প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রথম করা হয় ১৯০৬ সালে, দ্বিতীয়বার ১৯২৩ সালে পুনরায় তথ্যসংগ্রহএরপর ১৯৪৬ সালে বর্তমান বাঁধের ৬৫ কি.মি. উজানে বরকলে বাঁধটি করার সিদ্ধান্ত হয় । আরও পরে ১৯৫০ সালে চিলের-ধাক নামক জায়গায় বাঁধের স্থান নির্ধারিত হয় । শেষ পর্যন্ত ১৯৫১ সালে কাপ্তাই এলাকার চিৎমরং-এ বাঁধটি নির্মিত হয় এবং ১৯৫৭ সালে শুরু হয়ে ১৯৬২ সালে সমাপ্ত হয় । এতে ৫৪০০০ একর ভূমি জলমগ্ন হয় চিরকালের জন্য যার মধ্যে চল্লিশ শতাংশ কৃষিভূমি এবং প্রায় এক লক্ষ মানুষের ভিটেমাটি চিরতরে জলে তলিয়ে যায় সীতার পাতাল প্রবেশের মতোই । এই বাস্তুহারাদের প্রায় সত্তর শতাংশ চাকমা জাতিসত্তার । পুনর্বাসনের শর্তানুযায়ী এই প্রকল্প থেকে উৎপাদিত ২৪৬ মেগাওয়াট বিদ্যুতে অগ্রাধিকার ছিল চট্টগ্রামবাসীদের, যা আজও বাস্তবায়িত হয়নি । অথৈ জলের সঙ্গে আজও মিশে আছে তিমিররাত্রির অভিশাপ ।
সরকার কি কিছুই করেনি বাস্তুহারাদের জন্য ? করেছে । প্রথমে জরিফ । জল কতখানি উপরে এসে দখল নেবে, সেই সীমানা চিহ্নিতকরণ এবং স্থান ত্যাগ করার নির্দেশ । বড় বড় গাছ কেটে ফেলা । কে কোথায় যেতে চান সেই পছন্দ নির্বাচন করা । কার কতখানি জমি আছে, কত গাছ আছে, সেই নিরিখে ক্ষতিপূরণ প্রদান । সবই হয়েছে । এবং যথানিয়মে, যেমন সর্বত্র সকল বিষয়ে থেকে থাকেএর মধ্যেও রয়ে গেছে কিছু রহস্য ।
শুরু হলো পুনর্বাসন । অজস্র বড় বড় নৌকায় কয়েক পরিবার একসঙ্গে করে কয়েক দিনের যাত্রা । তিমিররাত্রির বুকে ভাসমান হাজার হাজার মশাল । কিছুদূর যাবার পর নদীতীরে ফাঁকা জায়গায় এক রাতের বিশ্রাম, মহাজনতার বনভোজন যেন । তারপর আবার যাত্রা । সরকার থেকে সঙ্গে অবশ্য দেয়া হয়েছিল কিছু নিরাপত্তাকর্মী ।
যে জায়গা বাস্তুহারাদের দেয়া হল, সেটা এমনই এক জঙ্গল, যেখানে আক্ষরিক অর্থেই সূর্যালোক  কখনো নামে না । রয়েছে বাঘের ভয় । সাপের ভয় । রয়েছে ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, কলেরা । তরুণ বয়স্করা যদিবা যুঝে যাবার চেষ্টা করলেন, বিপদ দাঁড়ালো বৃদ্ধ বৃদ্ধা আর শিশুদের জন্য । ফলে জঙ্গল কেটে নয়া বসত গড়ে তোলার আগেই শিশু ও বৃদ্ধদের অনেককেই ক্ষুধা তৃষ্ণা আর বিভিন্ন জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় প্রাণ বিসর্জন দিতে হলো । রাস্তা নেই, ঘাট নেই । শহর তো বহুদূর ।

          কারো মন টিকলো না । কেউ কেউ বহুদিন হেঁটে চলে এলেন ভারতে । যদি কোন ব্যবস্থা হয় । হলোও বটে । ভারত সরকার আশ্রয় দেবে । খবর রটে গেল । শুরু হলো মাইগ্রেশন, অভিপ্রয়ান, পরিযান, সোজা বাংলায় দেশান্তরে গমন । চাকমা ভাষায় তাঁরা এর নাম দিলেন বর-পরং। বড়-দেশান্তর গমন। একই পরিবারের সকলেই যে একসঙ্গে গেলেন এমন নয় । ব্যক্তিগত খোঁজের নিরিখে কেউ কেউ রয়ে গেলেন সেদেশেই, অন্যত্র। পরিবার ভেঙে  গেল। এক ভাই রয়ে গেলেন তো দুই ভাই চলে গেলেন ভারতে,এক বোন পূর্বপাকিস্তানে তো এক বোন ভারতে। জীবনে কোনদিন আর দেখা হলো না তাদের । বুক ফেটে যায়, বুক ভেঙে যায়, তবু জীবন থামে না ।
ভারতে কোথায় গেলেন তারা? মিজোরামের দেমাগ্রী।ভারত সরকার সেখানে শরণার্থী শিবির গড়ে দিলেন। কিছুদিন পর ঠিক হলো,না,এখানে নয়,নেফা যেতে হবে।NEFA মানে North East Frontier Agency যা বর্তমান অরুণাচল প্রদেশ।দেমাগ্রী থেকে শিলচর হয়ে বদরপুর,সেখান থেকে নেফা।কিন্তু সেখানে কি থাকা যায়? সারা বছর বৃষ্টি,প্রচণ্ড ঠাণ্ডা! খরস্রোতা নদী,বন্য-জন্তুর আক্রমণ! এ তো পূর্ব পাকিস্তানের সেই জঙ্গলই যেন! গাছ কাটো,বসতি বানাও। তার ওপর নবাগতদের প্রতি সেখানের বাসিন্দাদের সন্দেহপূর্ণ দৃষ্টি!তবু থাকতে হলো যতদিন থাকা যায়। পেট মানে না,শরীর আর ধকল সইতে পারে না। জীবন থামে না মোটেই !
একটি বাঁধ ঘিরে এতো কাহিনি, এতো রহস্য!পৃথিবীতে কত বাঁধ হয়েছে, কত মানুষ গৃহহারা হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই, কিন্তু আমরা কোন কাহিনীই শুনিনি, সব চাপা পড়ে গেছে সভ্যতার রোশনাইভরা উৎসবের মুখরতার আড়ালে। সেই অর্থে এই গ্রন্থটি কাফ্‌কার চীন দেশের মহাপ্রাচীর’-এর মতই অনপনেয় দুঃসহ যন্ত্রণার গাথা। হয়তো একটু বেশি বলা হলো। হয়তো একটু কম বলা হলো।কিন্তু এই যন্ত্রণার উপলব্ধি যদি আমাদের না-ই হয়,তবে আর বই লেখার,সাহিত্য করার প্রয়োজনই বা কী ? সুতরাং একে প্রাধান্য দিতেই হবে।সকল চাকমারা পড়ুন এই বই ।সকল বাঙালিরা পড়ুন এই বই।কারণ এর একটা বিষয় বাঙালি-ভীতি’-ও রয়েছে। সকল বাঁধ-নির্মাতারা পড়ুন এই বই।সকল সরকার পড়ুন এই বই। পৃথিবীর সকল মানুষ পড়ুন এই বই।এই গ্রন্থটি সকল বাঁধের পেছনের কাহিনির বীজ বা মডেল বা কাঠামো বলা যেতে পারে।যদি পৃথিবীতে আরও বাঁধ হয়, তবে এমনই হবে তারও কাহিনি। সুতরাং আমাদের সভ্যতা এখান থেকে কিছু শিখুক ।
এবার এই বই থেকে, বিভিন্নজনের সাক্ষাৎকারের দুয়েকটা অংশ আমি পড়বো ।----
বাঘাইছড়ি, রাঙামাটি থেকে করুণাময় চাকমার বয়ান (পৃষ্ঠা ৪৭)
“...ফরম পূরণ করা, নতুন জায়গা দেখে আসা, গাছ কাটিং, অন্য সবকিছু মিলিয়ে সময় কখন ফুরিয়ে যাচ্ছিল সেটা প্রথমেই বুঝতে পারিনি।একদিন সত্যি সত্যি গ্রাম ছাড়ার সময় যখন এলো তখন শুরু হল আসল যন্ত্রণা। গ্রামে গ্রামে ঘরে ঘরে কান্নার রোল পড়ে গেল,হাহাকার, বিশ্বাস, অবিশ্বাস, দীর্ঘশ্বাস, অনিশ্চয়তা । এখন এসব অনুভূতি বলে বোঝানো যাবে না, যায় না। শুধু কি মানুষের কান্না ? গৃহপালিত পশুপাখির করুণ ডাকও মিশে গেল মানুষের কান্নার আর হাহাকারের সাথে । বিড়ালের মিউ মিউ করে কান্নার কথা আর কুকুরদের করুণ স্বরের ডাকের কথা কী করে ভুলবো? ওদের ডাকের সাথে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল অমঙ্গলের চিহ্ন। দিনের পর দিন রাত গভীরে করুণ স্বরে ডাকতে ডাকতে ঝাঁক ঝাঁক পাখী উড়ে যেত একদিক থেকে আরেক দিকে।চারিদিকে মৃত্যুর চিহ্ন।ঐ সময়ে আমাদের জীবন থেকে জীবনের চিহ্ন যেন হারিয়ে গিয়েছিল চিরতরে । ...
ত্রিপুরার পেচারথলে এসে বসতি করা মহেন্দ্র চাকমা বলেন(পৃষ্ঠা ৮৫)
“...প্রতিরাতে কুকুর ডাকলেই আমাদের কাজ ছিল ঘর থেকে বের হয়ে ভারতে চলে যাওয়া লোকদের দেখা।প্রথম দিকে গেছে অভাবী মানুষেরা।যারা কাজ করতে পারতো না,অলস টাইপের লোকেরা।শুনেছে যে ভারতে গেলেই ভারত সরকার খেতে দেবে জায়গা দেবে।তাই যাওয়া।অবস্থাপন্ন পরিবারের লোকেরা প্রথম দিকে দেশ ছাড়েনি।বঙলতলি,রুপকারী,বাঘাইহাট পরে চেঙেই মেইনি থেকেও লোক আসছিল।সবাই শুনেছে চাকমা রিফুজিদের জন্য ভারত সরকার দরজা খুলে দিয়েছে । গেলেই জায়গা আর খাবার পাওয়া যাবে।এভাবে দেখতে দেখতে আমাদের মনও দুর্বল হয়ে গেল । ...
দায়ন, অরুণাচল, ভারত থেকে অমিয় চাকমা বলেন(পৃষ্ঠা ৯৯)
“... হঠাৎ করে বাবা আমাদের চার(৪) ভাইবোনকে নিয়ে চলে এলেন দেমাগ্রী । ভালো জীবনের আশায় । এই দেমাগ্রীতে  ছিলাম সেই বছর বিঝু পর্যন্ত । বিঝু শেষ হওয়ার পর ভারতের সরকার আমাদের নিয়ে রওয়ানা দিলো নেফা/North East Frontier Agency(NEFA) সেটা কোথায় কেউ জানে না । নেফাতে পৌঁছাতে এক (১) বছরের বেশি সময় লেগেছিল । দেমাগ্রী থেকে হাঁটাপথে আইজল তারপর বদরপুর তারপর ট্রেনে করে মিয়াও/মি-তে লেডু ক্যাম্পে । এই লেডুতে আমার বাবা মারা যান । বাবা যখন মারা যান, অসুস্থ ছিলেন । অনেক কষ্ট হয়েছিল হাঁটতে, অনিয়ম আর দুঃখে তিনি মারা যান । দুঃখ বলতে অসহনীয় দুঃখ । ...
বস্তুত, কাপ্তাই যত জল জমিয়েছে নিজের উদরে, তার চেয়ে বেশি জল জমে আছে আজও তাদের চোখে, যাদের উন্মূল করেছে সে । কোন কারণে কাপ্তাই ধ্বংস হয়ে শুকিয়ে গেলেও, সেই সব চোখের জল কখনো ফুরোবে না, যুগ যুগ ধরে জমতেই থাকবে, জমতেই থাকবে । একটা সিমেন্টের বাঁধ ভেঙে দিল লক্ষ লক্ষ চোখের বাঁধন !
আর কথা বাড়াচ্ছি না । যা বললাম, সবই আমার বিস্ময় আর বেদনার কথা, সহমর্মিতার কথা ।

সামান্য কিছু বানানবিভ্রাট রয়েছে, আশা করি পরবর্তী সংস্করণে সেগুলোর দিকে নজর দেবেন প্রকাশক । আরও একটি প্রস্তাব।বইটিতে সেই কাপ্তাই বাঁধ আর অপার জলরাশির ছবি থাকলে একটা পূর্ণতা আসতো । আশা করি দ্বিতীয় সংস্করণে আমাদের এই সাধও পূর্ণ হবে।এই বইটি সকল ভাষায় অনূদিত হোক এই কামনা করে,লেখিকা সমারী চাকমাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ইতি টানলাম ।                                                             
                                                                                 ০৮.০৬.২০১৮     

কোন মন্তব্য নেই: