“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
সুব্রতা মজুমদার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সুব্রতা মজুমদার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২২

ধনেশ পাখির পালক

       

     (মনিপুরি লোককথা) 

।।  সুব্রতা   মজুমদার ।।

নেক আগের কথা একটি গ্রামে হাইয়াইনু নামে একটি মেয়ে ছিল। মেয়েটি তার বাবার প্রতি অত্যন্ত অনুগত ছিল, বাবাও তাকে খুব আদর যত্ন করত কিন্তু সৎ মায়ের তা মোটেই পছন্দ হত না। একসময় হাইয়াইনুর বাবাকে গ্রামের বাইরে অনেক দূরে কাজে যেতে হয় বেশি টাকা উপার্জনের জন্য। যাবার সময় স্ত্রীকে বলে যায় মেয়ের খেয়াল রাখতে। বাবা চলে যেতেই সৎমা হাইয়াইনুকে আদেশ দেয় পুকুরপার থেকে কলমি শাক নিয়ে আসতে। মেয়েটি সৎ মায়ের কোনো কথা অমান্য করে না, সে রওয়ানা হয়। সৎমা আবার বলে ছোট ছোট কিছু মাছও ধরে নিয়ে আসতে যাতে তা বাজারে বিক্রি করা যায়। মাছ আর শাক নিয়ে ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই আবার কলস দিয়ে বলে জল আনতে পাঠায়একটার উপর একটা  কাজ সমঝে দেয় মেয়েকে। মেয়েটি সবসময়ই তার সৎমাকে খুব মান্য করে, কিন্তু সৎমা তার প্রতি নিষ্ঠুরই হয় দিন দিনসারাদিন পরিশ্রম করে মেয়েটি বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হলেই সৎমা তাকে গালাগাল করে এবং লাঠিপেটা করতেও দ্বিধা  দ্বিধা করে না।

বাবার অনুপস্থিতিতে দিন এরকমই চলতে লাগল আর সৎমাও হাইয়াইনুর প্রতি নিষ্ঠুর থেকে আরও নিষ্ঠুর হতে থাকে। হাইয়াইনুও দৈহিক আর মানসিক যন্ত্রণা পেতে পেতে দুঃখী আর নিঃস্ব হতে থাকে দিন দিন। একদিন হাইয়াইনু যখন তার বন্ধুদের সাথে নদীতে চুলে চাল আর ডালের জলে তৈরি পরম্পরাগত ‘চেঙহী’ দিয়ে স্নান করতে ব্যস্ত তখন সৎমা দুপুরের খাবার খেয়ে ভাত ঘুমে, হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখে কিছু গরু এসে তাদের বাগানে ঢুকে গেছে। সৎমা ভাবল এটা হাইয়াইনুর অবহেলার জন্যই হয়েছে। হাইয়াইনু বাড়ি ফেরার পর সৎমা তাকে বকাবকির পর মারতে শুরু করে। হাইয়াইনুর সৎ ভাইয়ের তা দেখে দিদির জন্য কষ্ট হয় সে তার দিদিকে খুব ভালবাসত, কিন্তু সেও তখন অসহায় কিছুই করতে পারে না দিদির জন্য। হাইয়াইনু তার বন্ধুদের সাথে মেলামেশা করুক, খেলা করুক কোনো সামজিক অনুষ্ঠানে যাক তা তার সৎমার একদম পছন্দ ছিল না, তাই তার বন্ধুরা যখন এসে তাকে প্রলোভিত করে ‘লাইহরাওবা’ অনুষ্ঠানে যেতে সে রাজি হয় ঠিকই কিন্তু বন্ধুদের বলে তাকে এসে বাড়ি থেকে নিয়ে যেতে। সৎমা তাদের কথাগুলো লুকিয়ে শুনে নেয় এবং হাইয়াইনু সব জামা কাপড় গয়না লুকিয়ে রেখে দেয় আর হাইয়াইনুর চুল ধরে মারধর করে ।

সৎমা কোনো সময়েই মেয়েটিকে অবসর বসে থাকতে দেখতে পারত না বরাবরই কোনো না কোনো কাজ সমঝে দেয়কাজ করতে করতে কোনো কারণে যদি ভুল হয়ে যায় তাহলে মেয়েটিকে তো মারধর করতই এমনকি মেয়েটির মৃত মাকেও গালাগালি দিত। যতক্ষণ পর্যন্ত মেয়েটির বাবা মেয়েটির সঙ্গে থাকত মেয়েটি নিরাপদে থাকত, বাবা কাজে বেরোলেই শুরু হত সৎমায়ের অত্যাচার। মেয়েটির তখন তার বাবার কথা খুব মনে পড়তে থাকে, সে ভাবে বাবা কবে বাড়ি ফিরবে! তার মা যদি বেঁচে থাকত! তাহলে তো সে কত যত্নে থাকত! পূর্ণিমার রাতে চাঁদের আলো এসে মেয়েটির মুখে পড়তে চোখের জল চিকচিক করে ওঠে। বারান্দায় বসে আকাশ দেখতে দেখতে মেয়েটি অনেককিছু ভাবতে থাকে। এরকম পরিস্থিতিতে মেয়েটি খুব দুঃখী হয়ে পড়ে। ঘরে তখন তার সৎমা ছোটভাইকে নিয়ে পালঙ্কে ঘুমিয়ে আছে। সে ঘরে ঢোকে মাটিতে করে রাখা তার বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। রাতে সে তার মৃত মা কে স্বপ্নে দেখেমা বলে,

--- ও হাইয়াইনু, আমার কন্যা! আমি তোকে এভাবে দুঃখী দেখতে পারছি না মা, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে তোর যন্ত্রণা দেখে। এইসব মানুষদের মাঝখানে থাকতে না পারলে এখানে চলে আয় মা, ধনেশ পাখির দলে ধনেশ পাখি হয়েতুই যে নদীতে যাস সেখানে দেখবি প্রতিদিন ধনেশ পাখির একটি দল আসে। তুই দেখিস তাদের অনুরোধ করে রোজ তোর জন্য কিছু পালক ফেলে যাওয়ার জন্য। তুই সেই পালকগুলো এক জায়গায় জমাতে থাকিস, সেলাই করে নিস তোর জামার সঙ্গে এবং চেষ্টা করিস উড়ে আসার, ধনেশ পাখিদের এই সুন্দর পৃথিবীতে চলে আয়, আমাকেও পাবি তুই এখানে

ঘুম ভাঙতেই হাইয়াইনু দৌড়তে দৌড়তে নদীতে যায়। সেখানে গিয়ে দেখে সত্যি সেখানে কিছু ধনেশ পাখির দল ওড়াউড়ি করছে। পাখিদের দেখে মেয়েটিরও ইচ্ছে করে সব দুঃখ কষ্ট থেকে বেরিয়ে গিয়ে তাদের মতো তাদের দলের হয়ে এরকম উন্মুক্ত আকাশে উড়ে যাওয়ার। সে তাদের ডাকতে থাকে,

--- “ও ধনেশ পাখি আমার উপর কৃপা করো! আমি আর আমার সৎমায়ের অত্যাচার সইতে পারছি না।”

ধনেশ পাখিরা সবাই একসাথে উত্তর দেয়,

--- বলো বলো মেয়ে কী হয়েছে?

--- আমি তোমাদের সঙ্গে উড়ে যেতে যাই। আমাকে নিয়ে যাও তোমাদের সঙ্গে।

--- তুমি পারবে না, পারবে না আমাদের মতো উড়তে, তোমার ডানা নেই, ডানা নেই।

চোখের জল মুছতে মুছতে হাইয়াইনু বলে,---

--- পারব, পারব। তোমরা আমাকে সাহায্য কর উড়তে। আমি এই দুখ দুর্দশা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই, উড়ে যেতে চাই খোলা আকাশে, ঠিক তোমাদের মতো। দয়া করে আমাকে তোমরা তোমাদের দলে যুক্ত করো।

ধনেশ পাখির দল উত্তর দেয়, 

--- আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে। বলো কী করে তোমায় আমরা সাহায্য করব?

--- তোমরা কী প্রতিদিন তোমাদের একটি করে পালক দেবে আমাকে? ঝুড়ি ভর্তি না হওয়া পর্যন্ত আমি জমাব। ঝুড়ি ভরে গেলেই ডানা মেলে আমি উড়ে চলে আসব তোমাদের কাছে!

হাইয়াইনুর কথা শুনে ধনেশ পাখিদের খুব দুঃখ বোধ হয় এবং তারা সম্মতি জানায়,

--- আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে!

        ধনেশ পাখিরা তাদের কথা মতোই রোজ একটা করে পালক ফেলে যায় মাটিতে। হাইয়াইনু তা জড়ো করতে থাকে একটা ঝুড়িতে। ঝুড়ি ঘরের মধ্যে লুকিয়ে রাখে যাতে তার সৎমা তা দেখতে না পায়। এরকম পালক কুড়িয়ে জমাতে জমাতে একদিন হাইয়াইনু দেখল তার ঝুড়ি ভর্তি হয়ে গেছে, তখন সে সেই পালকগুলোকে সেলাই করে ডানা বানাতে লাগল। ছোটভাই দরজার আড়াল থেকে দেখে নেয় দিদিকে পালক সেলাই করতে, সামনে এসে জিজ্ঞেস করে,

--- এগুলো দিয়ে কী করবে দিদি?

--- আমি উড়ে যাব ধনেশ হয়ে। এখানে আর থাকতে ভালো লাগছে না রে ভাই

--- আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না দিদি!

বলে দিদিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে ছোটভাই। হাইয়াইনুও পালক সেলাই ছেড়ে ছোটভাইকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে, ও ভাই!

পালক সেলাই শেষ হলে হাইয়াইনু ধনেশ পাখিদের দেখে এবং তাদের ডেকে বলে তাকে উড়ে যেতে সাহায্য করার জন্য। ধনেশ পাখিরাও সাহায্য করে। অতপর মেয়েটিও ডানা মেলে পাখি হয়ে উড়ে যায় আকাশে, মিশে যায় ধনেশ পাখির দলের সাথে। পাশে অসহায় ভাই শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই দেখতে থাকে তার দিদির আকাশে উড়ে যাওয়া। ছোটভাই দৌড়ে গিয়ে মাকে জানায় কথাটি, মা শুনে শুধু একটি কথাই বলে,

--- ভালো হেয়ালি!

কিছুদিন পর হাইয়াইনুর বাবা তার কাজ শেষে বাড়ি ফিরে আসে মেয়ের জন্য অনেকগুলো জামাকাপড়, অলঙ্কার এবং কিছু ফলমূল নিয়ে; কিন্তু মেয়েকে বাড়িতে কোথাও দেখতে পায় না। খুঁজতে থাকে এদিক ওদিক। স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলে স্ত্রী কিছু উত্তর করে না। তখন ছেলেটি আসে তার বাবার কাছে এবং বলে যে কী করে তার দিদি হাইয়াইনু ধনেশ পাখিদের সাথে উড়ে গেছে আর সে কোনোদিন তাদের মধ্যে ফিরে আসবে না। ছেলের কথা শুনে হাইয়াইনুর বাবা হাইয়াইনুর সৎমাকে গালাগাল দেয় যে তার অত্যাচারের জন্যই আজ তাদের মেয়ে এরকম দূরে চলে গেছে। সৎমাও তার কর্মের জন্য ভেতর ভেতর অনুতপ্ত হতে থাকে।

 মেয়েকে এভাবে হারিয়ে হাইয়াইনুর বাবা অত্যন্ত দুঃখী হয়ে পড়ে। খাওয়া ঘুম ছেড়ে দেয় প্রায়। রোজই উঠোনে দাঁড়িয়ে মেয়েকে ডাকতে থাকে,

---‘ও হাইয়াইনু! হাইয়াইনু! প্রিয় মামনি! দ্যাখ আমি তোর জন্য কী কী এনেছি! বাবার কাছে ফিরে আয় মা! দেখ তোর জন্য যে কত কাপড় চোপড় গয়না এনেছি কে পরবে ওগুলো! আমার কষ্ট হচ্ছে মা তোকে ছেড়ে থাকতে!

প্রতিদিন এরকম কাঁদতে কাঁদতে একদিন হাইয়াইনুর বাবা দেখতে পেল যে তাদের বাড়ির উঠোনের উপর দিয়ে একঝাঁক ধনেশ পাখি উড়ে যাচ্ছে এবং সেই দলে তার মেয়ে হাইয়াইনুও আছে। সে মেয়েকে ডেকে ঘরের ভেতর থেকে এক থালা ভাত এনে দিল এবং বলল তার মেয়েকে খেয়ে যেতে। হাইয়াইনু এসে বাবার পাশে দাঁড়ায়, কেঁদে বলে,

--- “বাবাগো, আমাকে ক্ষমা করে দিও, তোমার অসহায় কন্যা তোমার বাড়ি ফিরে আসার অপেক্ষাও করতে পারে নি। আমি আর মানুষের মাঝখানে বসবাস করতে পারছিলাম না। এখন তোমার দেয়া এই খাবারও আমি খেতে পারব না বাবা, আমি এখন ধনেশ পাখিদের দলের একজন, আমার খাওয়া অন্য। আমি অনেক সুখে আছি এখন ওদের সঙ্গে। আমার মাও আছে আমার সঙ্গে। দয়া করে ক্ষমা করে দিও তোমার অবোধ শিশুকে। বিদায় বাবা!

যেতে যেতে আবার দাঁড়িয়ে বলে,

--- আর হ্যাঁ বাবা, এই জন্মে আর হবে না, পরের জন্মে আমাদের দেখা হবে আবার। তোমার মেয়ে হয়েই ফিরে আসব। ভাইয়ের খেয়াল রাখবে, যত্নে রাখবে ওকে। আর মামনিকেও ক্ষমা করে দিও। কেঁদো না বাবা! তুমি যখনই ‘লাইহরাওবা’ অনুষ্ঠানে যাবে তুমি যেখানে বসবে ঠিক তার পাশের বসার জায়গাটা আমার জন্য খালি রেখে দিও, আমি ঠিক এসে বসব কিন্তু!

হাইয়াইনুর সব পাখি বন্ধুরা তাকে ডাকতে শুরু করে যে দেরি হয়ে যাচ্ছে ফিরে যাওয়ার জন্য। হাইয়াইনু তাই এইটুকু বলেই বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তার পাখি বন্ধুদের সাথে সোনালী আকাশে উড়ে যায়! হাইয়াইনুর বাবাও সেই আশা নিয়েই বাঁচতে থাকে তার মেয়ে হাইয়াইনু কোনো একদিন কোনো একজন্মে আবার ফিরে আসবে তার বাবার কাছে!

 

 

*****

 

  

শনিবার, ২৮ জুলাই, ২০১৮

সুরমা গাঙর পানিঃ সিলেটি জীবনের মহাকাব্য

(লেখাটি শতক্রতু পত্রিকাতে প্রকাশিত। পুরো উপন্যাস ঈশানের পুঞ্জমেঘেও পড়তে পারেন। 



দেবাশিস ভট্টাচার্য 


নতিপ্রজ আখ্যানকার রণবীর পুরকায়স্থ হালের এক শক্তিমান কলমচি। গদ্যের জটিল কারিগরিতে তিনি বিন্যস্ত করেন আখ্যান। ভাষার মুদ্রিত ও দৃশ্যমান সজ্জার অন্তর্বয়নে কিংবা ইনার সারফেসে গড়ে তোলেন কথার আরেক স্তর। এই দুই স্তরেও গদ্যের নির্মিতি সার্থক হয় না, যদি না ইশারায় বা ব্যঞ্জনায় থাকা দৃশ্যগন্ধ উপলব্ধির তৃতীয় স্তরটি উন্মোচিত হয়। বলা ও না বলার নানা স্তরের যোগফলে রণবীরের নাগরিক গল্পবীক্ষা এবং জটিল কথকতা অর্থের উপকূলে পৌঁছায়। প্রকাশিত আধ ডজন গল্পের বইতে গল্পত্ব কম, কাহিনির মায়াসৃজনের চাইতে সুমেধার ভেদ-উপযোগী আখ্যান নির্মাণেই আনন্দ পান এই লেখক। স্বভাবতই তাঁর পাঠক সংখ্যা অপ্রতুল। বচনের কারিগর রণবীর পুরকায়স্থর এই যে ভাবমূর্তি, তা ভেঙে দেয় তাঁর একমাত্র উপন্যাস সুরমা গাঙর পানি। গল্পত্বকে এই উপন্যাস পরিহার করেনি, গল্পের আকর্ষণে সাড়ে তিনশো পৃষ্ঠার বিশাল উপন্যাসটিও ক্লান্তিকর ঠেকে না। তবে আঞ্চলিক ভাষার ব্যাপক প্রয়োগ, শ্রীহট্টীয় সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ-প্রবাদ-জনশ্রুতি-ভূগোল ইত্যাদির অপরিচয়ের দরুন প্রাথমিক পাঠ খানিকটা অস্বস্তি দিতে পারে পাঠককে। এমন সমস্যার কথা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বলেওছেন এক পশ্চিমবঙ্গীয়পাঠক। আঞ্চলিক উপাদানে ভরা উপন্যাস পাঠকের এতটুকু শ্রম দাবি করতেই পারে। চট্টগ্রাম কিংবা সিলেট এর পাঠক যদি হাঁসুলিবাঁকের উপকথার প্রথম পাঠে সমস্যার কথা বলেন, রাজধানীর মানুষের কাছে সেটা পাঠকের অপরাধ বলেই গণ্য হবে। কেন্দ্র-পরিধির মনস্তাত্ত্বিক বাধা পেরিয়ে যে-পাঠক সুরমা গাঙর পানিপাঠ করবেন, তিনি ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিচিত্র তথ্যের সঙ্গে যেমন পরিচিত হবেন, তেমনি চেতনাপ্রবাহরীতি আধারিত আখ্যানের সাংগীতিক গঠনও তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে যাবে না। নানাদিক থেকে এই উপন্যাসটি আলোচনা সম্ভব। গোটা সুরমা-বরাক উপত্যকার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা অনুপুঙ্খ উপন্যাসটিকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। উপন্যাসের প্রধান ঐতিহাসিক ঘটনা দেশভাগ। তবে বাংলা কথাসাহিত্যের প্রবণতা অনুসারে, এখানেও ভাগের কথা সামান্যই। ফলের কথাটাই বেশি। দেশভাগ ও রেফারেন্ডামের পর কেন্দ্রীয় চরিত্র বৈতলের দেশত্যাগ ঘটে ২১তম পরিচ্ছেদে, এর পরও রয়েছে উজান পর্বের আরও ৪২ টি পরিচ্ছেদ, যেখানে বৈতলের ঠিকানাসন্ধান যুক্ত হয় স্বাধীনতা-উত্তর কাছাড়ের উদ্বাস্তু পুনর্বাসন এবং এক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে। প্রাথমিকভাবে ইতিহাসের এইসব বিষয়ই উপন্যাসের আধেয় বলে মনে হয়। উপন্যাসটিকে দেশভাগকেন্দ্রিক বাংলা আখ্যানে এক অভিনব সংযোজন হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে উপন্যাসের ব্লার্বএও। তবে নিবিষ্ট পাঠে উপন্যাসটির আরো কয়েকটি দিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শ্রীহট্ট-কাছাড়ের আঞ্চলিক জীবন ও সংস্কৃতির এমন কমপ্লিট প্যাকেজঅন্তত অন্য কোনো সাহিত্যিক প্রতিবেদনে এই আলোচকের চোখে পড়েনি। উপন্যাসের ভাষারীতিও এই প্রসঙ্গে স্বতন্ত্র অভিনিবেশ দাবি করে। আর সর্বোপরি আখ্যানের বয়নকৌশল: মধ্যযুগীয় কথকতার একটা উত্তরাধিকার লক্ষ করা যায় সুরমা গাঙর পানিতে। উপন্যাসের ন্যারেটর যে প্রথম পুরুষ, তার স্বর কখনও মিশে যায় উপন্যাসের কোনও চরিত্রের স্বরের সঙ্গে। কথক আর চরিত্র একাকার হয়ে যায়। অন্যদিকে আদি অন্ত মধ্য সমন্বিত প্লট নয়, বরং মুক্ত চলনের সম্মুখমুখী রৈখিক গঠন, স্মৃতির সূত্রে বারবার কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘটনা ও দৃশ্যে ফিরে আসা- এ যেন গানের সমে ফেরার মতো ব্যাপার। মার্গসঙ্গীতে স্থায়ীর পাশে ছোট ছোট তান বিস্তার লক্ষ করা যায় অন্তরা-সঞ্চারীতেও। এরকম ছোট ছোট তানবিস্তারের মাধ্যমে আখ্যান বারবার সমে ফিরছে, আবার নতুন বিস্তারকে আত্মস্থ করে চলেছে। কথকতার এই সাংগঠনিক কাঠামোটি কেন্দ্রীয় চেতনাপ্রবাহ আশ্রয় করে এগিয়ে যাওয়ার পক্ষে অনুকূল হয়ে উঠেছে। বৈতলের স্মৃতির প্রবাহেই গড়ে উঠেছে একাধিক উজ্জ্বল ঔপন্যাসিক চরিত্র। চরিত্র নির্মাণে রণবীরের দক্ষতাও মুগ্ধকর। প্রাথমিক ভাবে পাঠকের পর্যবেক্ষণে উঠে-আসা বিষয়গুলির প্রথম দুটি সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছুটা আলোচনাই এই নিবন্ধের উপজীব্য। বলাবাহুল্য, বাখতানীয় অর্থেই অনেকার্থদ্যোতক, বহুস্বরিক এই আখ্যানের আরো অনেক অর্থ, আরো অনেক পাঠ সম্ভব।

।।২।।

সুরমা গাঙর পানিউপন্যাস ঘটনাপ্রবাহ মোটামুটি তিরিশ বছর ব্যাপ্ত। প্রোটাগনিস্ট বৈতলের জন্ম ১৩৩৫ বাংলার গুলাসময়, অর্থাৎ ১৯২৯ সালের বর্ষায়। আখ্যানের সমাপ্তি সমাপ্তি ১৯৬০ সালের আরেক বন্যায়। দেশভাগ ও গণভোটের পর, আবার ১৯৫০-এর পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে নরহত্যা ও শত্রু সম্পত্তিদখলের এক অতিচারী পর্ব শুরু হবার আগেই, বৈতল চলে আসে বইয়াখাউরি থেকে কাছাড়ের শিলচরে, আনুমানিক ১৯-২০ বছর বয়সে। এর মাঝেই, কৈশোরে মুসলমান ছেলে লুলার সঙ্গে অভিন্নহৃদয় বন্ধুতা, দুই বাউণ্ডুলের সিলেট ভ্রমণ এবং গুরু সৃষ্টিধর ওঝার কাছে মনসামঙ্গল গান ও নৃত্যশিক্ষা, দেশভাগের হাওয়ায় লুলার রুহুল আমিন হয়ে ওঠা, ‘কয়েদ আজমএর নামে হিন্দুনারীর ওপর আক্রমণ, আর বৈতলের জীবনের সঙ্গে দুর্গাবতী জড়িয়ে যাওয়া। প্রথম খণ্ডের ২১টি পরিচ্ছেদে রাজনৈতিক ইতিহাসের উত্তাপ সঞ্চারিত হয়েছে ধীর লয়ে। বৈতল আর লুলা এই দুই কিশোর জানে, ‘মাইনষর গাত লেখা থাকে না ইন্দু বাঙাল। ইতা মাইনষে বানায়’ (পৃঃ২৭)। দুই বোহেমিয়ান কিশোর ঘুরে বেড়ায় পশ্চিমের সুনামগঞ্জ থেকে পুবের আদরখানা পাথারকান্দি অব্দি। মসজিদে বাজারে বৈতল দাস হয় বৈতল মিয়া, পড়ে নামাজ। রুহুল আমিন লুলা দাস হয়ে প্রসাদ গ্রহণ করে মন্দির-আখড়ায়। মাতৃহীন লুলার জন্য প্রতীক্ষায় থাকে বইয়াখাউরির দুখিনী মা। আলাদা করে মুরগি রান্না করে খাওয়ায় নিজের মুসলমান ছেলেকে। মায়ের স্বপ্নপূরণ করতে বৈতল যায় গুরুগৃহে, পুথি পড়া শিখতে। এদিকে পিতৃগৃহ মিরতিঙ্গায় গিয়ে সর্পাঘাতে মারা যায় বৈতলের মা। পরম যত্নে মায়ের শব ভেলায় রেখে নদীতে ভাসায় রুহুল আমিন। এই যাপনে ধীর লয়ে আসে দেশভাগ প্রসঙ্গ। মুসলমান প্রধান সিলেটে হিন্দুদের মধ্যে আতঙ্ক শুরু হয়। গুরুর দোকানে ঠাকুরের কুর্সি বানানো কমে যায়। সিলেট বিভাগ যা দীর্ঘদিন ধরে আসাম প্রভিন্সের অঙ্গ, তাকে আসামে রাখতে অনাগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন অসমীয়া নেতৃত্ব। বাঙালি হিন্দুদের একটা বড় অংশ চাইছিলেন দেশভাগ হোক, নতুবা হিন্দুর কর্তৃত্ব থাকবে না। আসামে সাদুল্লা আর বাংলায় সোহরাওর্দি-ফজলুল হক পর্বের শাসন এর প্রেক্ষাপটে ক্ষমতায় অংশিদারিত্বের অভীপ্সা থেকে হিন্দু মধ্যশ্রেণির দেশভাগ এর পক্ষাবলম্বন, আর মুসলমানদের মধ্যে ভারতে সংখ্যালঘু গোষ্ঠীতে পরিণতি হবার চেয়ে স্বতন্ত্র মুসলমান রাষ্ট্রের পোষকতা-সিলেটের প্রেক্ষিতে এই রাজনৈতিক বাস্তব চমৎকারভাবে উঠে এসেছে বৈতলের গুরু সৃষ্টিধরের সহজিয়া সংলাপেঃ সিলেট অখন বউত পক্ষর এক কমরর তেনা। এইন টানলে হেইন লেংটা। আসামি হকলে ডরাইন বাঙালি রাজা অই যাইব। বাংলা ভাগ না অইলে হিন্দুয়ে ভাবইন প্রধানমন্ত্রী পাইতা নায়। মুসলমানে ভাবইন ইণ্ডিয়াত থাকলে পাওর তলর বেঙ অইয়া থাকা লাগব” (পৃঃ৪০)

এই পরিস্থিতিতে যেমন সৃষ্টিধর ছেড়ে যেতে চান না নিজের জন্মভূমি বিয়ানিবাজার রইদপুয়ানি, তেমনি পাগলা বইয়াখাউরির পানির পুকবৈতলও ভাটির জল হাওর ছেড়ে যেতে চায় না কোনো নতুন ঠিকানায়। নতুন দেশে তো আর লুলার মতো বন্ধু পাওয়া যাবে না। ধর্মের বিভাজন মানে না লুলা-বৈতল। বৈতলের বাড়িতে লুলা-বৈতল একসঙ্গে থাকবার সিদ্ধান্ত নেয়। লুলার কাছে ধর্ম পরিচয়ের কোনো তাৎপর্যই ছিল না, সে বৈতলের সঙ্গে ঢাকা দক্ষিণের বাবুদের বাড়িতে মহাপ্রভু প্রিয় কচুশাকের প্রসাদ নিয়েছে, তার চোখের সামনে দ্রুত কেমন বদলে যায় সব কিছু। গণভোটে ঘরের চিহ্ন হেরে যাবার পর মুসলমানেরা কেমন অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে শারদোৎসবের ঢাকের বাদ্যি সম্পর্কে, বাজনা আস্তেবাজানোর নির্দেশ দেয়। বিরক্ত লুলা মন্তব্যে করে, “কেনে, আস্তে কেনে আকতা। বাঙাল হকল জিনি গেছইন, নানি!” (পৃঃ ৭৪)

হন্তারক সময় এই লুলাকেও বদলে দেয়। লুলা একদিন বন্ধু বৈতলকে বলেছিল, লিগের স্থানীয় নেতারা বৈতলকে ফুসলে তার বাড়িটা হাতিয়ে নেবার পরামর্শ দিয়েছিল। দেশভাগ আর রায়ট লুলাকেও ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সৈনিক হিসাবে গড়ে তোলে। বন্ধু বৈতল বলে, “তুই তো ইলাখান আছলে নায়” (পৃঃ ৭৬) কয়েদ এ আজমের নাম করে, হিন্দু মেয়েদের সর্বনাশের খেলায় পেয়ে বসল লুলাকে। এই লুলাই দুমাস আগের বন্যায় পীড়িত মুসলমানদের নিয়ে মালিটিলার কালীমন্দিরের আশ্রয় নেয়, দুর্গত হিন্দু-মুসলমান মানুষগুলির অন্নসংস্থানের জন্য ভরা পিয়াইনের জলে ঝাঁপিয়ে বৈতলের সঙ্গে মিলে ডাকাতি করে, চাল-ডাল। যখন সে কয়েদ এ আজমের নাম করে, হিন্দু মহিলাদের উপর রাতের আঁধারে ঝাঁপানো শুরু করে দিয়েছে, তখনো বন্ধু বৈতলকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। দুর্গাবতীর সম্ভ্রম রক্ষা করতে গিয়ে বৈতল হত্যা করে লুলাকে। দেশভাগ, ‘পানির পুকবৈতলকে সুনামগঞ্জের হাওর ছেড়ে উজানে যেতে বাধ্য করে, এবার তার ঠাঁই হয় মেহেরপুরের উদ্বাস্তু শিবিরে।

উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ডের ঘটনা প্রবাহের অন্যতম প্রধান বিষয় দেশভাগের বলি মানুষের পুনর্বাসন প্রসঙ্গ। পঞ্চাশের দাঙ্গার আগে পরে শিলচর শহর ও তার আশেপাশে অনেকগুলি উদ্বাস্তু ক্যাম্প গড়ে উঠেছিল। বরাক উপত্যকার বেশ কিছু স্থাননামেও ক্যাম্পশব্দটি রয়েছে। সুরমা গাঙর পানিতে ক্যাম্প জীবনের টুকরো টুকরো ছবি রয়েছে। রয়েছে ক্যাম্প-এর ডোলএর লোভে স্থানীয় মানুষজনেরও উদ্বাস্তু শিবিরে নাম লেখানো, রিলিফ নিয়ে বখরা, দুর্নীতি- এসবের টুকরো-দৃশ্য। উপন্যাস জানাচ্ছে, শিবিরবাসীদের সম্পর্কে শহরের মানুষের তেমন কোনো সহানুভূতি নেই। শহরের সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, চুরি ডাকাতির ঘটনা বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি ক্ষুব্ধ করে শহরবাসীকে। আবার সুযোগসন্ধানী জমিদার ও ক্ষমতাবান মানুষেরা ক্যাম্পে ক্যাম্পে বেগার শ্রমিক খোঁজে। ক্যাম্প এর জীবনকে লেখক বলেছেন, ‘প্রতিবেশী দেশের নাগরিক খোঁয়াড়’- পশুবৎ জীবনের গভীর যন্ত্রণা এই একটিমাত্র বিশেষণে উন্মোচিত হয়। ঘোলাজলে মাছ ধরার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও বিবরণ রয়েছে উপন্যাসে। ক্যাম্পবাসী বৈতল রিলিফ অফিসারের কাছে জানতে যায়, ‘আমরার কিতা অইব, কই যাইমু না অউ ছাপটা ঘরো থাকিয়া মরমু?’ রিফুজির আত্মপরিচয়ের সংকট স্পষ্ট হয় তার উচ্চারণে ঃ গান্ধিয়ে জিন্নায় ইতা কিতা করলা আমরার! ... আমরা কিতা কইন চাইন, হিনর বাঙাল হকলে কয় বাপর দেশো যা, আইলাম। ইনর ইন্দুয়ে বাঙালে কয় রিফ্যুজি কিতা হিন্দু না মুসলমান না খেদাখাওয়া হকলর নতুন ধর্ম।’ (পৃঃ২১০) এরই মাঝে ওড়া খবর আসে নেতাজী সুভাষ ফিরে আসবেন, দুই বাংলা এক করবেন, উদ্বাস্তুরা ফিরে যাবে দেশে। জন্মভিটেয়। স্মৃতিতাড়িত উদ্বাস্তুদের কেউ কেউ দেশে ফিরে যাবার জন্য ভিক্ষা করে অর্থসঞ্চয়।

রয়েছে পুনর্বাসনের ছবিও। পুনর্বাসন আন্দোলনকে জীবনব্রত করে নিয়েছিলেন তারাপদ ভট্টাচার্য, যিনি নিজেও উদ্বাস্তু, শিক্ষকতা করেন শহর শিলচরে। তারাপদ উপন্যাসে এসেছেন হরিমাধব ভট্টাচার্য হয়ে। কালাইন-কাটিগড়া-বড়খলার মতো জনপদগুলিতে উদ্বাস্তুর পুনর্বাসনের আইনি লড়াই, হুরমত আলি বড়লস্কর এর মতো ঐতিহাসিক ব্যাক্তিদের প্রয়াস উপন্যাসে ডকুমেন্টেড হয়। বরাক উপত্যকার উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের এই টুকরো ছবিগুলি উপন্যাসের ইতিহাস অংশের আধেয়। এখানেও রয়েছে লিগ সমর্থক মুসলমানেরা, যারা শ্লোগান তুলেছে সিলেট নিছি গণভোটে/ কাছাড় নিমু লাটির চোটে। ক্রমশ এই স্বর ফিকে হয়ে আসে, লিগের বড় নেতা ময়নুল হক চৌধুরী কংগ্রেসের অবিসম্বাদী নেতা হয়ে যান। হিন্দু মহাসভাপন্থী যমুনা প্রসাদ সিং প্রথম দিকে মুসলমানদের পাকিস্তানে পাঠানোর হম্বিতম্বি করলেও পরে, ক্ষমতার লোভে হয়ে ওঠেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষকংগ্রেসের চা-জনগোষ্ঠীর অন্যতম নেতা। দুই বছর আগে চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি বেড়েছিল, দু বছরের তলবের দিনে এরিয়ার দিতে গিয়ে দেখা গেল, ইউনিয়নের লেভির পরিমাণ শ্রমিকের বকেয়া মজুরির পরিমাণ থেকে বেশি। শ্রেণি শোষকদের ঐক্যমঞ্চ হয়ে ওঠা কংগ্রেসের ভূমিকা উপন্যাস দেখায় ইতিহাস সম্মতভাবেই। জমিদার যমুনা প্রসাদ আশ্রিত উদ্বাস্তু সামান্য রিক্সাচালক বৈতলকে হত্যা করিয়ে দাঙ্গা বাঁধিয়ে ভোটে জয় সুনিশ্চিত করতে চায়। বৈতলের ভাবনায় উঠে আসে ইতিহাসের প্রতিকার হীন জিজ্ঞাসা। “...দেশ তো ভাগ হয়ে গেছে, হিন্দুস্তান টুকরো হয়েছে, পাকিস্তান হয়েছে। দুই ধর্মের লড়াই কেন থামে না তবে” (পৃঃ২৭৩)। যে-দেশভাগ জন্মসূত্রে পাটনি বৈতলকে সৃষ্টিধর শর্মার নতুন পরিচয় দেয়, উৎখাত করে প্রাণপ্রিয় সিলেট আর সুনামগঞ্জ এর ধাত্রীভূমি থেকে, তারই ধারাবাহিকতায়, আখ্যানের সমাপ্তিতে বৈতলকে বেরোতে হয় আরেক নিরুদ্দেশ যাত্রায়। এক যুগ আগে পরে দুই বন্যায় বৈতলের প্রব্রজনের দৃশ্যটি পুনর্বার অঙ্কিত হয়। বৈতল কিংবা সৃষ্টিধর মূলোৎপাটিত বৃক্ষের মতো থিতু হতে পারে না। জলপুত্র বৈতলের দেশ হারানোর আখ্যান সুরমা গাঙর পানি

।।৩।।

এই হল উপন্যাসের ইতিহাস অংশ। আখ্যানের বিস্তৃত পরিসরে উল্লিখিত হয়েছে প্রচুর ঐতিহাসিক চরিত্র। দেশভাগের আগে যে কমিউনিস্টরা ছিলেন কংগ্রেসেরই অংশ, দেশ ভাগের পর অনন্ত সাধুর মতো কেউ কেউ চলে এসেছেন শিলচরে। ছিলেন বীরেশ মিশ্র অচিন্ত্য ভট্টাচার্যর মতো নেতারাও। তাদের একবারমাত্র নামোল্লেখ ছাড়া তাদের কাজকর্ম সম্পর্কে উপন্যাস নীরব। সতীন্দ্রমোহন দেব, মইনুল হক চৌধুরী, হুরমত আলি বড়লস্কর, বড়খলার দেব লস্কর পরিবার এর নামই এসেছে শুধু। জমিদার যমুনা প্রসাদের মধ্যে একাধিক ঐতিহাসিক ব্যাক্তির ছায়াপাত ঘটেছে। শিলচর শহরের পত্তন প্রসঙ্গে, ব্রিটিশ চা-বাগিচা মালিক এবং ঔপনিবেশিক প্রশাসনের ভূমিকা ইত্যাদি আখ্যানকে প্রসঙ্গক্রমে ছুঁয়ে গেছে মাত্র। এসেছে নতুন বাঙালি বাগান মালিকদের কথাও। উদ্বাস্তু বলতে এক বৈতল ছাড়া আর কারো সঙ্গে তেমন করে পরিচয় ঘটল না আমাদের। এই পর্যবেক্ষণগুলি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে ইতিহাসের প্রেক্ষিতে উদ্বাস্তু-জীবনের যন্ত্রণার আখ্যান রচনাই লেখকের উদ্দেশ্য ছিল না। ঘর এবং দেশ হারানোর যন্ত্রণা বৈতলকে কেন্দ্র করে উচ্চকিত হতে পারে না। সে-অর্থে বৈতলের ঘর ছিল না, সে আজন্ম বোহেমিয়ান, পায়ের তলায় তার সরষেদানা, আর তাই সব ঠাঁই তার দেশের ঠিকানা। দেশের বাড়ির জন্য পিছুটান তার অল্পই। তার বিরহ জলের জন্য ও জলাভূমির জন্য। ভারতবর্ষ তাকে পুনর্বাসন না দিক, পুনর্বাসন দিয়েছে বরাক। দেশের স্মৃতি তার দুটি মানুষকে ঘিরেঃ লুলা আর সৃষ্টিধর। এখানেও বরাকপারে লুলার বিকল্প হিসাবে পেয়েছে দুখুকে, আর কখনো মামুজী কখনো কাকাবাবু, কখনো হেডমাষ্টারের মধ্যে সে পেয়েছে সৃষ্টিধরকে। বৈতলের যে-উদ্বাস্তুপরিচয়, তা যতটা রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক তার চেয়ে বেশি দার্শনিক। দেশভাগ ও তৎপরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাস উপন্যাসের বহির্বৃত উপাদান হিসাবেই বিবেচ্য।

নিবিষ্ট পাঠে মনে হয়, ‘দেশভাগউপন্যাসটির একমাত্র মর্মবিদারক সত্য’ (ভূমিকা) নয়। উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে সিলেটি সংস্কৃতির মহাকাব্য। উপন্যাসের প্রথমখণ্ডে দুই বিধর্মী কিশোরের ভ্রমণ সূত্রে সিলেটের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় হয়। পাগলা-বইয়াখাউরি থেকে অনেকটা উত্তরে মিরতিঙ্গার টিলাভূমিতে বৈতলের মাতুলালয়। বইয়াখাউরিতে শুধু জল আর জল, একের পর এক হাওর। মিরতিঙ্গার টিলাভূমিতে নেমে এসেছে উত্তরের চেরাপুঞ্জি পাহাড় থেকে। আখ্যান ছুঁয়ে যায় লক্ষণশ্রী, দেওয়ান হাসন রাজার বাড়ি। সেখানে যেতে চায় লুলা, তার বাড়ি সিলেটের দক্ষিণ পূর্বের খিত্তা গ্রামে, একেবারে হাকালুকি হাওরের পারে। উত্তরে খানিকটা উজিয়ে বড়লেখা ছাড়িয়ে আরো দক্ষিণ পূবে পাথারকান্দি-আদমটিলা হয়ে ভ্রমণ শেষে উত্তর পশ্চিমে উজিয়ে লুলা বৈতলকে পৌঁছে দেয় বিয়ানিবাজারের পাশে রইদপুয়ানি গ্রামে সৃষ্টিধর ওঝার ভদ্রাসনে। চেরাপুঞ্জি পাহাড়ের দক্ষিণে সুনামগঞ্জ-ছাতক হয়ে সিলেট শহরের উত্তর দিকে পূবমুখে সোজা সরলরেখায় বিয়ানিবাজার স্পর্শ করে রেখাটিকে দক্ষিণে হাকালুকি ছুঁইয়ে আদমটিলা অব্দি নিয়ে পুনরায় উত্তর-পশ্চিমে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত যুক্ত করতে দেখব। দুই কিশোর হবিগঞ্জ বাদ দিলে সিলেটের সমস্ত অঞ্চল ছুঁয়ে গেছে। দুই কিশোর সিলেট শহরে সুরমার চান্নিঘাটে বসে দেখেছে মানুষের মেলা। হজরত শাহজালালের দরগাহ। সিলেট-হাকালুকি-বিয়ানিবাজারের ত্রিভূজের মাঝখানে পড়ে গোলাপগঞ্জ ঢাকাদক্ষিণ, মহাপ্রভু চৈতন্যের পিতৃভূমি। সেখানেও রাত কাটিয়েছে দুই বাউণ্ডুলে কিশোর। দ্বিতীয় খণ্ডের কাহিনি বিস্তৃত হয় করিমগঞ্জ-কুলাউড়া রেল লাইন ধরে বদরপুর থেকে শিলচর শহর পর্যন্ত-দক্ষিণ পূবে মাটিজুরি-জালেঙ্গা অব্দি। শ্রীহট্ট- কাছাড়ের গোটা ভৌগোলিক অঞ্চলটাই উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহের ধারক। বানিয়াচঙ এর কাকিমার প্রসঙ্গ হবিগঞ্জ অঞ্চলকে যুক্ত করে উপন্যাসে।

শুধু ভূগোলই নয়, এই অঞ্চলের বিচিত্র সাংস্কৃতিক জীবন, ‘সুরমা গাঙর পানির বড়ো মূল্যবান উপাদান। ওঝানাচ ও গানের কথা রয়েছে উপন্যাসের অনেকটা অংশ জুড়ে। সারা পূর্ববঙ্গেই মনসাকালট এর চারণভূমি, কিন্তু ওঝা নাচ একান্তভাবেই সিলেটের সম্পদ। আরো বিশেষভাবে বললে সিলেটের পূর্বাঞ্চলের সম্পদ। পশ্চিমের বৈতল ওঝা গান ও নাচ শিখতে এসেছে বিয়ানিবাজারে। করিমগঞ্জ মহকুমার চৈতন্যবরণ পাল শ্রীহট্টের এক বিখ্যাত মনসামঙ্গল গায়ক। পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন পদ্মপুরাণ কাব্যের গায়নোপযোগী পয়ার-লাচাড়ি গুলিকে একত্রে সংকলিত করে তিনি যে পদ্মপুরাণ সংগ্রহতৈরি করেছিলেন, তার মধ্যে রয়েছে তাঁর নিজস্ব গায়নরীতি সম্বলিত বিচিত্র ধূয়া ও দিশা। উপন্যাসে বেশ কয়েকটিরই উল্লেখ রয়েছে। বরাক এবং সুরমা উপত্যকায় নারীবেশী পুরোহিতদের মনসাপূজার প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে। এ বিষয়ে কৌতূহলী পাঠক সুজিৎ চৌধুরীর প্রাচীন ভারতে মাতৃপ্রাধান্যঃ কিংবদন্তীর পুনর্বিচারশীর্ষক গ্রন্থটির প্রাসঙ্গিক প্রবন্ধটি দেখতে পারেন। মনসাকাল্ট সম্পৃক্ত তৃতীয় লিঙ্গের এই উপাসকদের বলা হয় গুরামি। এখন আর গুরামিদের দেখা যায় না, একটি তথ্যমতে গোটা বরাক উপত্যকায় এক বৃদ্ধা গুরামিই জীবিত আছেন। এরা মনসামঙ্গলপালাকে প্রচুর খেউড় সমেত, বিশেষ ভঙ্গিতে উপস্থাপন করে থাকেন। সিলেটের ওঝা গান ও নাচ এবং গুরামি নাচ এর বিস্তারিত পরিচয় রয়েছে উপন্যাসে। লিকলিকে চেহারার যুবক বৈতল এর দাড়ি গোঁফ কম, সে আড়াই পেচ এর লম্বা ঘাঘরা ও সাদাজামা পরে, কানে দুল চোখে কাজল ঠোঁটে লালিমা আনে। এই হল গুরামির সাজ। ওঝারা বেনি করেন না, মাথায় ফেজটুপি পরেন, কানে দুল পরেন না। বৈতল গুরামি সেজেছে, তার এই নারীসাজ পত্নী দুর্গাবতীর পীড়ার কারণ হয়ে উঠেছে। ওঝা নাচ হল গান-নাচ-অভিনয়-কথকতার একটা কম্পোজিট উপস্থাপনা। পয়ারে বা ন্যারেশন অংশে সুরের দোলা থাকে, মাঝে মাঝেই বায়েন এর সঙ্গে সংলাপে জড়িয়ে পড়ে ওঝা যেমন তৈরি করেন নাট্যমুহূর্ত, তেমনি গল্প বলার মতো সুরটানা গদ্যে কাহিনিকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যান। উপন্যাস ওঝা গানের এই বৈশিষ্ট্যকে জানাচ্ছে জানাচ্ছে এভাবে, “গুরু বলেন বাদি ওঝা তার ওস্তাদ। ওস্তাদির মার হল লাচাড়ি, মানে শ্রোতাকে ধরে রাখা, নাটক করে দর্শকের মন কাড়া। মিল ছন্দের টানে শ্রোতাকে বিবশ করে দেওয়া, কোথাও কিছু শ্রুতিমধুর অথচ ধরা যাচ্ছে না। কোথাও গানের কথাকে থামিয়ে রেখে, অভিনয় দিয়ে দর্শককে মোহিত করে দেওয়া। কখনও বিষাদ কখনও উচ্চকিত আনন্দ কখনও ঢেউ আসবে দুলে দুলে, আসবে উচ্ছ্বাসে।” (পৃঃ ২৪০) দীর্ঘ পালা অভিনয় করে গান করে পরিবেশনের মাঝে মাঝে পরিবেশটি হাল্কা করে নিতে হয়, বিশ্রামের অবকাশ নিতে হাল্কাচালের অপ্রাসঙ্গিক বিষয় উপস্থাপন করেন গায়েন, যা মনসা পালায় নেই। এই রকম সময়ে বায়েনরাই ধূয়া-দিশার পুনরাবৃত্তি করে বিশ্রামের অবকাশ দেয় গায়েনকে বা ওঝাকে। বৈতল এরকম দিশা গায়ঃ বুড়া গেল না তোর খাইত/ অকারণে হইলে বুড়া দুইফরী ডাকাইত।স্মৃতিসূত্রে আসে ওঝা গানের এই বৈশিষ্ট্যর সৃষ্টিধারী ব্যাখ্যাঃ ইতা হক্কলতা পুথিত নাই রেবা। ইতা চালাকি। একলা বকবক করে কে কওচাইন আউয়ায়। আসরর বউঝি হক্কলরে দি যদি পড়াইতাম না পারলায় তে আর কিওর গাওরা তুমি। সময় দেওন লাগব। নাইলে শ্বাসকষ্ট হইব, শাসিরগ ফুলি গেলে গাইতায়ও পারতায় নায় পড়তায় নায়। এর লাগি তারারে মাতাও মাঝে মাঝে।” (পৃঃ ২৪১) ওঝা নাচের পোশাক, কিন্মপুরুষ বিকল্প গুরামি নাচএর পাশাপাশি মনসা পূজারও অনুপুঙ্খ বিবরণ আছে করণ্ডি-পঞ্চগুড়ি-নাগপেচ ইত্যাদি উল্লেখে।

সিলেটের হিন্দু-মুসলমান উভয়ের কাছেই মনসাকাব্যের জনপ্রিয়তা রয়েছে। জন্ম বাউণ্ডুলে মুসলমান ছেলে লুলা চৈতন্যচরণ পালের নাম জানে, ওঝা সৃষ্টিধরের রইদপুয়ানির বাড়িও চেনে। সিলেট তথা বরাক উপত্যকার মধ্যবিত্ত হিন্ধু পরিসরে শ্রাবণীর পূজার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হল পুথি পড়া। দৈনন্দিন জীবনে, উপমা দিতে উঠে আসে পদ্মপুরাণের নানান প্রসঙ্গ। বন্ধুদের সঙ্গে খাবারদাবার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বৈতল যেরকম পদ্মপুরাণ, আবৃত্তি শুরু করে দেয়, তেমন অভিজ্ঞতা গ্রামাঞ্চলে দুর্লভ নয় আজও। ওঝার আসরে আজও মুসলমান দর্শকের যে-ছবি উপন্যাসে রয়েছে, তাও বরাক উপত্যকায় সাধারণ দৃশ্য। মামুপীর যে বৈতলের কণ্ঠে বেহুলার দুঃখগাথা শুনে চোখের জল ফেলেন, তাও লেখকের ইচ্ছাপূরণের নির্মিতি নয়।

শুধু মনসামঙ্গলের পালাগান নয়, বরাক- সুরমা লোকসংগীতের বিচিত্র ধারার পরিচয় রয়েছে উপন্যাসে। সূফী ধারার মরমী কবি হাসন রাজার প্রসঙ্গ এসেছে আখ্যানে বারবার। পরমসত্তার জন্য বিরহের বোধ হাসনের গানের একটা উল্লেখনীয় দিক প্রাণবন্ধে আমারে দেওয়ানা করিয়াছে’- গানটি জানে কিশোর লুলাও। হাসন রাজা গাইতেন প্রেমের গান, দিওয়ানা হয়ে নাচতেন, মুসলমান ধর্মের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা ছিল না। বৈষ্ণব ভাবের মরমী কবির রাধাবিষয়ক একাধিক পদ উঠে এসেছে উপন্যাসে। দিনে লণ্ঠন নিয়ে চলতেন আলোকসন্ধানী মরমী সাধক, তিনিই আবার গেয়ে ওঠেন, “মম আঁখি হইতে পয়দা আসমান জমিন। রবীন্দ্রনন্দিত এই গানটিও সৃষ্টিধর-বৈতল সংলাপে উঠে এসেছে। 

হাসনের গানে যে ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক প্রেমসাধনার বানী, সেই একই বাণী বহন করে শিতলাং শার গান। রাধারমন আর শিতলাং শা- এই দুই শ্রীহট্টিয় গীতিকার এর গান রয়েছে উপন্যাসে- শিতলাং শার বৈষ্ণব ভাবাপন্ন পদঃ শিতলাং ফকিরে কয় শ্যামরে কালিয়া/ প্রকাশিত কর ঘর দরশন দিয়া। সুন্দরীমোহন দাস রচিত বিখ্যাত সিলেটি রামায়ণ এর কয়েকটি কলিও শোনা গেল বৈতলের কণ্ঠে। সিলেট তথা সমগ্র পূর্ববঙ্গে একদা জনপ্রিয় মাতমের গান শুনেছি উপন্যাসের ষষ্ঠ পরিচ্ছেদে আদমটিলার ফকিরের কণ্ঠেঃ

ও হোসেন কাইন্দা বলে, মা জননী বলি তোরে,

একটু পানি দিলা না মোরে...

নাম না জানা কবির, সিলেট প্রশস্তিমূলক কবিগানে রুহুল আমিনের কণ্ঠে আমরা শুনলাম হজরত শাহজালাল-এর সিলেটে থিতু হবার জনশ্রুতিঃ ইয়েমেন থেকে পূবের পথে দীর্ঘযাত্রা শেষে আরদেশের মাটির সঙ্গে সিলেটের মাটির মিল খুঁজে পান সুফি সাধক শাহজালালঃ

আরব দেশের মাটির লগে মিল ছিলটর

এর লাগি বাগ অইল বাবা শাহজালালর

জালালি কবুতর উড়ে কাজল পাংখা দিয়া।

আল্লা আল্লা জিকির পড়ে তারা সব বইয়া।।

আবার সিলেটের স্থান বন্দনায় দিলবাহার বাঙাল ওরফে লালু গায় স্বরচিত পদঃ

        জলঢুপের আনারস জগতের সেরা

        শ্রীমঙ্গল ফলায় বুঝি দেখতে যাব মোরা।।

        শ্রীমঙ্গল চায়ের বাগান সবার আছে জানা।

        কেমন করে বানায় চা দেখব তার নমুনা।।

        রয়েছে ময়মনসিং গীতিকার একাধিক পালার (মহুয়া, ভেলুয়া, সুন্দরী) উল্লেখ। ঝড়ের রাতে বৈতলের হাতে লুলার মৃত্যুর পর দুর্গাবতী যখন বৈতলের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে তখন মহুয়ার মতো চান্দ সুরুজসাক্ষী করে মনে মনে বৈতলকে স্বামীরূপে বরণ করে নেয়। শ্রীহট্ট কাছাড়ের সাংস্কৃতিক জীবনে মনমনসিংহের পালাগানগুলি যে গভীভাবে আত্তীকৃত হয়েছে, তার আরেকটি প্রমাণ মাটিজুরির ঠিকাদার সাজিদ মিয়ার গায়ক পুত্রের কণ্ঠে রূপবান পালার পাশেই শুনি ভেলুয়াসুন্দরী পালার গান। গোটা উপন্যাস জুড়ে প্রচুর লোকসঙ্গীত যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে মালসী শ্যামাসঙ্গীতও। সিলেট বৈষ্ণব ভাবাপন্ন মরমি সাধনার যে দীর্ঘ পরম্পরা ছিল, তা জানিয়েছেন যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্যও।

        শাহজালালের ৩৬০ অনুচর আউলিয়াদের সাধনা এই ধারাকেই পুষ্ট করেছে। একদিকে শাহজালালের ও তাঁর অনুচরদের প্রেমসাধনা, অন্যদিকে মহাপ্রভু চৈতন্যের পিতৃভূমিতে বিচিত্র কীর্তনোল্লাস দুই স্রোতের এই সমন্বয় সিলেটের সংস্কৃতিকে অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। দৈ খোরা পাগলমনিরুদ্দিনের মতো স্বল্পপরিচিত কবির গানে কখনো কৃষ্ণের মথুরাগমনে বৃন্দাবনের হাহাকার, আবার তার পরেই-

দৈ খোরা পাগলে বলে আল্লার নাম আর

মিছা ভবের বাজার হায় হায় হায়...

এসব মিলিয়েই শ্রীহট্টের সংস্কৃতি। বৈতলের কণ্ঠে ঢালানি জিয়ানির গান, শ্যামাসঙ্গীত যেমন শুনি, তেমনি শুনি মারিফতি জিকিরঃ

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদূর

পয়লা বন্দনা করি মালিক ছত্তার।

দুসরা বন্দনা করি নবি মছতকার।।

        এই বন্দনা গীতিটি আমরা পেয়ে যাই পূর্ববঙ্গ ও সিলেটে একদা জনপ্রিয় গাজির গানের মুখবন্ধে। ঘাটু গান ও নাচের প্রসঙ্গ আছে উপন্যাসে। লুলা কিছুদিন ঘাটুর পুয়াহয়েছিল।

        পীর ফকির, তেলপড়া-জলপড়া, হেকিমি দাওয়াই, হেমাঙ্গ বিশ্বাস আর আব্দুল গফফার দত্তচৌধুরীর গান- সারি গানের চটুল আনন্দ থেকে জারির গভীর বিষাদ। সব সমন্বিত হয়ে গড়ে তোলে সিলেটি পরিচয়। ধর্মাধর্ম গৌণ, মানুষে মানুষে ‘.........’ সিলেটের প্রাণভোমরা। এর মাঝে যখন দেশভাগ এসে পড়ে তখন বৈতলের মতো বিভ্রান্ত যুবক দানিশ পিরের অলৌকিক স্মৃতির উদ্দেশে নিবেদন করে প্রার্থনা। তুমি তো অমৃতবড়ি বানাইতায় পারো। তে কেনে সারে অলাখান একখানো থাকার বড়ি খাওয়ায়ই দেও না। সবরে তারার ধর্মউর্ম ভুলাই দেও। কও তারা সব সিলেটি অউকা। তারা মানুষ অউকা

।।৪।।

        সিলেটি জীবন ও সংস্কৃতির অজস্র অনুপুঙ্খ ছড়িয়ে আছে গোটা উপন্যাস জুড়ে। একটি ছড়ার নমুনা-


(ক)  ছিকাই লড়ে ছিকাই লড়ে

ঝনঝনাইয়া টাকা পড়ে...

(খ)   একখান কথা

কী কথা

বেঙর মাথা

কী বেঙ

ঘাড়ু বেঙ।... 


প্রথমটি একান্তভাবেই বৃহত্তর সুরমা-বরাক উপত্যকার উৎস থেকে জাত, তার কোনো বিকল্প পাঠ অন্য অঞ্চলের উপভাষায় পাওয়া যায় না। দ্বিতীয়টির আঞ্চলিক রূপবৈচিত্র্য আছে। উপন্যাসে এমন কিছু প্রবাদ/ ডিঠান/ বাগধারা/ ধাঁধা পাওয়া যায় যা আঞ্চলিক লোকপ্রজ্ঞার সরল প্রকাশ। যেমনঃ  

(গ)   হাওরর মাঝে হাকালুকি, বাকি সব কুয়া

বাবুর মাঝে মুরারীচান্দ বাকি সব পুয়া।

(ঘ)    পিঞ্জামেঘর আঞ্জাআঞ্জি চেরাপুঞ্জির পাড়ো,

ধলাভেড়া ফালদি পড়ে কালা ভেড়ার ঘাড়ো।।

        হাকালুকি দক্ষিণ সিলেটের বিশাল হাওর, যেখানে লঙ্গাই সহ একাধিক নদী এসে মিলেছে। মুরারীচান্দ সেই ইতিহাসবিখ্যাত ব্যক্তি, যাঁর নামে সিলেটের বিখ্যাত এম সি কলেজ। আর ধলাভেড়া-ফালদি পড়ে কালা ভেড়ার ঘাড়ো’- দৃশ্যটি ছাতক থেকে উত্তরে পাহাড়ের উপরে মেঘের খেলা না দেখলে বোঝা কঠিন।

        একটা চমৎকার পদঃ

        (ঙ)    মার রান্দা যেমন তেমন বইনর রান্দা পানি

               আমার বাড়ির এইন রান্দইন খাইতে যেমন চিনি।

পশু পাখি পালনের অর্থনিতিঃ

(চ)  হাসে উনা কইতরে দুনা

ছাগলে পিন্দায় কানো সোনা।

ধাঁধাঃ

(ছ) পুয়া নায় পুড়ি নায়, মুখো দেয় চুমা

উন্দাল নায় চুলা নায়, তেও বারয় ধুমা।

(জ) রাজার বাড়িত মেনা গাই মেনমেনাইয়া চায়

হাজার টেকার মরিচ খাইয়া আরো খাইত চায়।

        বৃহত্তর সিলেটি লোকবিশ্বাসে সিকন্দর গাজি এক অতিলৌকিক চরিত্র। সিলেট জেলার সব নদী হাওরর মালিক এই গাজি। বৈতল বাপের কাছ থেকে গাজিকে তুষ্ট করবার মন্ত্র পেয়েছেঃ

(ঝ)  শাহ সিকন্দর গাজি

মাছ পাইলে আধাআধি

তুই খাইবি মাছ খান

মোরে দিবে গচা খান।

        সুরমা গাঙর পানিতে সিলেটের কথ্যভাষার নিজস্ব বাক্‌রীতির প্রচুর দৃষ্টান্ত রয়েছে। কয়েকটি শুধু এখানে উল্লেখ করছিঃ

(ঞ)  পুন্দো নাই চাম, রাধাকৃষ্ণ নাম।

(ট)  ডরালুকর পাদ্রাপুক।

(ঠ)  কেরাইয়ার ইত পিত কালা পাত কালা।

(ড)  পাওর তলর বেঙ।

(ঢ)  মায় বানায় ভূত, বাপে বানায় পুত।

(ণ)  অ কইতে মার্গো ফাটে।

(ত)  হুলার গুমগুমি নালিয়া খেতো।

(থ)  তামাকাসা মাজলে চিকন, লোহা চিকন তায় আর ছাওয়াল চিকন মায়।

        এই সাংস্কৃতিক পরিবেশটি জীবন্ত হয়ে উঠেছে যেন এইসব প্রবাদ-ধাঁধা-বাক্‌রীতির এইসব উপাদানে। উপন্যাসে সিলেটের জনপ্রিয় খাদ্য শিদল বা হিদলসুটকির প্রসঙ্গ আছে বারবার। পুটি মাছ কয়েক মাস মাটির তলায় রেখে দিয়ে বানানোর কৌশলটিও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে আখ্যানে। এই পরিবেশের উপযুক্ত সংলাপ রয়েছে গোটা উপন্যাস জুড়ে। অন্তত শতাধিক শব্দ আছে যেগুলি সিলেট-বরাকের নিজস্ব শব্দভাণ্ডারের সম্পদ। সিলেটি ভাষার ব্যবহার নিয়ে আছে খানিকটা অহংকারও। সৃষ্টিধর তার শিষ্যকে বলেছেন- সারা বাংলা ঘুরেও সিলেটির লাখান মিঠা মাত পাইতায় নায়। আর সিলেটি মাইনষর বুদ্ধির ধারো কাছো কেউ নাই। সিলেটি পই ডিটান ইতা কুনু ভাষাত পাইতায় নায়। তুমার মুখর আগাত হক্কল সময় পাইবায় হাজাইল মাত।

        শুধু সংলাপের হাজাইল মাতনয়, গোটা উপন্যাসের ভাষা বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে উপভাষার অসামান্য প্রয়োগ দক্ষতায়। আঞ্চলিক উপভাষার শব্দ ও বাচনভঙ্গি মিশে গেছে ঔপন্যাসিকের ন্যারেশনের মান্য-চলিত ভাষায়। উপন্যাসের প্রথম বাক্যটি লক্ষণীয়ঃ সাপিখুপির ভয় নেই বৈতল ওঝারসাপিখুপিশব্দটি সিলেট অঞ্চলের কথ্য শব্দ। এমন দৃষ্টান্ত প্রচুর রয়েছেঃ মায়ের সঞ্চয় দুচার পয়সা ছিকির ভিতর নারকেল মালায় থাকে বড়ঘরের মাড়াইল এ। বৈতল ঠালি ভেঙে পয়সা নিয়ে বেরিয়ে যায়। মান্য চলিত বাংলায় নিম্নরেখাঙ্কিত শব্দগুলির রূপান্তর রয়েছে। মান্যচলিত ন্যারেশনে আঞ্চলিক উপভাষার এই দ্রবণ লেখকের সচেতন প্রয়াসের ফসল। এই কাজটা রণবীর গল্পেও করে থাকেন। কেন্দ্র-পরিধি, মান্য চলিত এবং উপভাষার দূরত্ব ভেঙে দিয়ে জীবনের নির্যাস, আর কথাবয়বের নিজস্ব মেজাজটি তৈরি করেন লেখক। পোষ্টকলোনিয়ালবাংলা সাহিত্যের এই প্রবণতাটি রণবীরের কথনবিশ্বের এক মৌলিক উপকরণ। সিলেটি উপভাষার কথনরীতির বিশিষ্ট সুরটি উঠে এসেছে একদিকে বৈতল-দুখু-লুলার সংলাপে, বৈতলের স্মৃতি ও স্বগতচিন্তায় আর সর্বোপরি সৃষ্টিধর ওঝার কথকতায়। সিলেটের মরমি কবিদের কথা আর গান সৃষ্টিধর বৈতলকে শুনিয়েছেন অনেকটা কিচ্ছাবলবার ভঙ্গিতে। কথকতার এই ভঙ্গিটি চলচ্ছবির দৃশ্যের মতো জীবন্ত হয়ে উঠেছে লেখকের বর্ণনাগুণে। সিলেট কাছাড়ের, ভূগোল, প্রকৃতি লোকপ্রজ্ঞা, বিচিত্র সঙ্গীত-ছড়া-প্রবাদ-কথ্যভাষা-ঐতিহাসিক চরিত্র ও প্রসঙ্গ- সব মিলিয়ে সুরমা গাঙর পানিহয়ে উঠেছে সিলেটি জীবনের মহাকাব্য। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ আঞ্চলিক উপন্যাসগুলির অন্যতম হিসেবে উপন্যাসটিকে বিবেচনা করা চলে। মহাকাব্যিক বিন্যাসের প্রকল্পে যোগ্য সঙ্গত লক্ষ করি বয়ানের রীতি বা আঙ্গিকের দিক থেকেও। ধীর লয়ে প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গের পুনরাবৃত্ত বিন্যাসে শ্রী-হট্ট কাছাড়ের সামাজিক- সাংস্কৃতিক জীবনের চলমানতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বিষয় ও আঙ্গিকের যুগলবন্দিতে জীবনের বহুস্বর হয়ে উঠেছে লক্ষ্যভেদীরূপে শ্রুতিগম্য।



*****





শতক্রতু     





সোমবার, ৩০ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকের কথা

।। রণবীর পুরকায়স্থ।।





(ভালোলাগাতে তুলে প্রিয়কথা শিল্পীর প্রবন্ধটি এখানে তুলে দিলাম--- সুব্রতা মজুমদার )
লিখতে লিখতে ধন্দও তো কম হয় না। কত প্রশ্ন। কার জন্য লেখা? কেন লেখা? প্রথম প্রশ্নের না হয় উত্তর হয়, বুদ্ধিমানের জন্য লেখা। কেন লেখার জবাবি শূন্যটাও কি ওখানে নিহিত নেই? নিজেকে ঠকাতেই লেখা। আমি কত বুদ্ধিমান তা প্রমাণ করতে লেখা।
হয়তো তাও নয়। কিছুটা ভান থাকলেও ভাষা এক সপ্রমাণ মাধ্যম। তাত্ত্বিকেরা তো বলেন ভাষা শুধু ভাবের গ্রাহক মাত্র নয়। ভাষার আছে নিজস্ব কিছু কোড অব কন্ডাক্ট। আছে জীবনপ্রণালী। শব্দ নৈঃশব্দ্য, শূন্য মহাশূন্য, নিরবধি সময়কে নিয়ে যে ছায়া মায়া এবং নিরেট শরীর গড়ে ওঠে, বা বলা ভাল গড়ে তোলা হয় বাস্তুকারের নিপুণতায়, তার নাম কথা। কথার অন্তর্বয়নে লুকিয়ে থাকে মণিময় গ্রন্থনা। যে-সজ্জায় ভেদাভেদ থাকে না চেতন অচেতনে, সত্য আর মায়ায়, জাদু আর বাস্তবতায়। সময় কথাকে দেয় মহাশব্দের শিরোপা, বাকি সব এলেবেলে, দূর হটো। বাস্তব আর পরাবাস্তবের খটাখটি কথার বোধকে জারিত করে, মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় মহাকথায়। পরাগ্রন্থনার হঠাৎ বিরাম হঠাৎ ছুটের জাদু ভাষা যার করায়ত্ত, সে-ই সিকন্দর। পাসওয়ার্ড জানা থাকলে সন্দর্ভ রচনা, রচনার পাঠ, পুনঃপাঠ, পরাপাঠ কিছুই কিন্তু ছায়ার সঙ্গে কুস্তি নয়। জানি, কিন্তু পারি কই? তাত্ত্বিক বলেন, পাঠের নাকি আলাপ, জোড়, মীড়, গমক সবই আছে। আছে, রঙ-রূপ রেখার বিন্যাসও। কালো রঙের মেঘবালিকার মতো অক্ষর যখন আরো রূপসী হয়ে ওঠে তখন মুক্তধারা ছোটে। কালোকে আলোর মাপে সাজালেই না চোখের আরাম, মনের আনন্দ। মন না পড়লে শূন্য জগদ্দল হয়ে থাকে। পূর্ণ হয় না আর। তত্ত্ব বলে সন্দর্ভের সাজ সালঙ্কারা। যা নেই কথাভুবনে, তা নেই ভারতে। মানে তত্ত্ববিশ্বে। বিশ্ব নাগরিক হওয়ার চেষ্টা করে বিব্রত হয়েছি বারবার। তবু সাধ যায়। চিৎ হয়ে শুয়ে থাকার বাসনা হয়। বিনোদ সময়ে ফুলসাজের কথাবিছানা সাজিয়ে রাখি রজনীগন্ধায়। ভাষা পশরার হকারি করে বাড়ি ফেরার দিনশেষে এক অঞ্জলি জুঁইফুলে সাজিয়ে দিই মানসপ্রতিমার কবরী। যার যেমন সামর্থ্য।
মূলধন কম বলেই হয়তো ভয় যায় না। ভয় তো নয় ধন্দ। আসলে, কার কোন কাজ? লেখকের কী কর্তব্য? সে তো বুদ্ধিজীবী! বুদ্ধি দিয়ে কী করবে? অন্যজন থেকে বড় হবে? আমি শ্রেষ্ঠ প্রতিপন্ন করবে? আখের গুছোবে?
এদেশে পশ্চিমবঙ্গে এক নন্দীগ্রাম নিয়ে, এক সিঙ্গুর নিয়ে, এক লালগড়, এক মঙ্গলকোট, এক নানুর নিয়ে বড় আতান্তর এখন। বুদ্ধিজীবীকে এখন সামিল হতে হবে বিক্ষোভ, বয়কটে। এসএমএস চালান করতে হবে এই বয়ানে কাল আসুন সকলে বারোটায় মেট্রো চ্যানেলে। মেধার পাশে। আওয়াজ উঠুক বরখাস্ত হোক সরকার, শুরু হোক রাজ্যপালের শাসন ছড়িয়ে দিন বার্তাআসাম আন্দোলনের মিছিলে স্লোগান দিতে হত বাধ্যতামূলক বিদেশি বিতাড়ন করতেই হবে’ ‘করিবই লাগিব, করিবই লাগিবআমরা মুখ নাড়তাম ভিন্ন জবাবে বুঝলাম তো, যাইতাম কই?’ আমি নন্দীগ্রাম বুঝি না পশ্চিমবঙ্গের বিভাজিত বুদ্ধিজীবীর মতো। বলা ভাল বিক্ষুব্ধ বুদ্ধিজীবীদের মতো, যারা এতদিন সরকারি অনুগ্রহ বঞ্চিত ছিলেন, ছিলেন পাতালঘরে। নকল ভূমিকম্পের আভাস পেয়ে উঠে এসেছেন। আর শাসক দলও অপশাসনের দায় স্বীকার না করে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আত্মাহুতির দিন গুনছে। আগেকার দিনে রাজ্য জয়ের জন্য যুদ্ধ হত, মানুষ মরত। এখন রেলযাত্রী মরে, সানন্দ বিদ্বজ্জনও সঙ্গে সঙ্গে রায় দেন, এ বিপক্ষে দলের কীর্তি, ব্যাস দায়সারা। শান্তিতে বাস করার অধিকার এখন নেই অসহায় মানুষের, অসহায় মানুষের মৃত্যু দিয়ে এখন ঘোষিত হয় মানুষের জয়, মাটির জয়, মায়ের জয়। এ কেমন জয়? আমি বুঝি মানুষ মারার অধিকার কারও নাই। তাহলে কেন নন্দীগ্রাম, কেন সিঙ্গুর, কেন নানুর, কেন শাসন? দলীয় রাজনীতির উচ্চাশায় শাসকদল ভীত। ভয়েরও কত মুখ, মিডিয়ায় ভয়, বড়ো ভয় এখন প্রশাসকের, ক্যামেরাকে ভয়। নিয়মনীতি বর্জিত উচ্ছৃঙ্খলতাকে রোধ করতে হবে নিয়ম মেনে নইলে মানবাধিকারের কাছে যে চলে যাবে ফুটেজ। সাড়ে সতেরো বছরের অপশাসনের পর নাকি এবার পরিবর্তন। হাওয়ামোরগ বলছে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর শপথ গ্রহন সময়ের অপেক্ষা। প্রতিরোধ কমিটি গড়া হচ্ছে দিকে দিকে। স্বাধীন তাম্রলিপ্ত গড়া হয়েছে ইতিমধ্যে। বুদ্ধির ছবি ছাপা হয়েছে ভোটপথের মোড়ে মোড়ে। পাঞ্চজন্য ঘোষের মতো ব্যক্তিত্বও ক্যামেরার সামনে মুখ দেখাতে, কথা বলতে উদগ্রীব। ওদের প্রাণ এমন কাঁদে কী করে? আমার তো কাঁদে না। তাই আমি ওরা নই। বুদ্ধিজীবী নই, কিছু নই। শুধু প্রাণ ধারণের এক কৃষক, এক শ্রমিক, এক রেলযাত্রী আমি। সেই আমিকেই যখন নিত্যদিন মরতে দেখি তখন কষ্ট হয়। লাঘব হয় না, মানুষ মারার নতুন নতুন চালাকিকল দেখে ভীত হই। বিভাজিত সমাজের কাউকে বলা যায় না সত্য, ভাগ করা যায় না মনোব্যথা। যার আস্তিনে আছে পরিবর্তনের হাতবোমা, তাকে নয় চেনা গেল খাড়া বেইমান। কিন্তু ঘোলা জলের শিকারি মধ্যবিত্তকে চিনি কী উপায়ে?
আসলে নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর  হলো কার্নিভাল প্রিয় বাঙালির মজাকিস্থান। কলকাতার এতো কাছে, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর চান্স বাঙালি অনেকদিন পায় নি। দুর্ধর্ষ বিদেশি ধাঁচের হাইওয়ের উপর না হলে কে আর সিঙ্গুরে পিকনিক করতে যায়? নন্দীগ্রাম উত্তরে হলে বলত বেশ করেছে। কামতাপুরিদের উপর অত্যাচারে কেউ কাঁদে না। আরো সিআরপি বহাল হলে কিছু যায় আসে না।
প্রত্যক্ষ রাজনীতি করার মতো এলেম আমার নেই। যদিও দৃশ্যমান সত্যের ছবি আঁকতে পারি মনে মনে, মনের বাইরে বের করতে হলে ছাপত্র চাই, সত্যকে রহস্যের চালাকি দিয়ে ঢাকতে হয়। চোখের দেখাকে ঠারতে হয় না দেখার ভাজে। আমার বেরাদিতেও এখন নবীন রাজ-প্রসাদ ধন্য হওয়ার হুড়োহুড়ি। কলকাতা আর তার উপকণ্ঠবাসি লেখকরা ওৎ পেতে আছে নসিনালানিয়ে লিখবে বলে। লিটল ম্যাগাজিনও বিশেষ নসিনালাসংখ্যার পরিকল্পনা করছে। উপন্যাস হবে, গল্প হবে, বিশ্লেষণী প্রবন্ধ হবে, প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, সমাজতাত্ত্বিক, সাংবাদিকদের। মেধা, অরুন্ধতী, অগ্নিবেশদের একজনও থাকবেন। এরপর সিনেমা হবে, নাটক হবে, যাত্রা হবে। বাঙালির একেবারে পৌষমাস, ভরেছে যে পাকা ফসলে  নসিনালা=  নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর, নানুর, লালগড়  
পৌষ আসবে বলে লেখক বন্ধুদের এখন কথা বলার সময় নেই। নরমুণ্ড না হলে যেমন তন্ত্রসাধনা হয় না, বাঙালির ইন্টেলেকচুয়াল হওয়াও হয় না। এখন লেখার জগতে উন্মাদনা, দেশভাগ নিয়ে এমন ছিল না, ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে, দাঙ্গা হয়েছে। স্বদেশ থেকে মানুষ বিদেশে এসেছে, এদেশ থেকে নতুন দেশে গেছে, সাধ করে কেউ ছিন্নমূল হয় না। ইতিহাসের সেই নির্মমতা নিয়ে ক, কেউ কিছু করলেন না তো তেমন?
আপাত সত্যের অনেকান্ত দেখে বিভ্রান্ত হলে সৃষ্টিশীলতা কোথায়? ওরকম করে চোখে দেখি না বলে আমিও হয়তো সৃষ্টিশীল নই। অকারণ উত্তেজিত হয়ে রক্তচাপ বাড়াই না। তাহলে, আমি কে? কী আমার পরিচয়? শুধুই এক নিন্দুক, শুধুই পরশ্রীকাতর? সিদ্ধান্ত স্পষ্ট নয় এখনও, দিকচক্রবাল অস্পষ্ট মনিকণিকায় বিয়োগ শক্তি বাড়িয়ে দিতে হবে, দূর দেখতে হবে যে! যে-শক্তি সবার অধিগম্য নয়। আমারও হয়তো নেই। তাই, আমি আমার মতো। আমার মতো লেখালেখি করি। ভাবি নিজের কাছে সৎ থাকলাম। যদিও একটিও মনের কথা লিখি না। লিখলে তো নবিজির সমালোচনা করে, মর্যাদা পুরুষোত্তম রামচন্দ্রের সমালোচনা করে এক আদর্শ, মুক্ত সমাজের কথা লিখতাম। বেঁচেবর্তে থাকব বলে সারা জীবনে একটিও মনের কথা লিখি নি। লেখা তো হয় দুরকমের, এক কলমচি লেখে, অক্ষরজ্ঞানী আমজনতা পড়ে। বলা হয় জনসভার সাহিত্য, ব্রিগেড নয়, পথসভাও ভরে কি না সন্দেহ। আর একরকম আছে, একের বিপরীত এক, বুদ্ধিজন লেখে বুদ্ধিমান পড়ে। লাইনের মাঝখানে থাকে সত্য। যদিও রহস্যসন্ধানী দ্বিতীয় বর্গটাকে সত্যের কাছাকাছি বলে ধরে নেন তাত্ত্বিক আসলে কোনটাই নয়। আচরণবিধির সমাজে মন যে বিধি-বিধানের বাইরে, তাই মনের কথা মনেই থাকে।
বুদ্ধিজীবীদের প্রত্যেকেই ক্রান্তদর্শী গ্রিক নাটকের অন্ধ ভবিষ্যৎ-বক্তার মতো। সবাই জানে সমাজের ক্ষত কী করে নিরাময় হয়, কিন্তু কেউ বলে না সাহসভরে। সবাই বলে সম্প্রীতির কথা, হিন্দু-মুসলমান ভাইভাই হওয়ার কথা। কিন্তু ধর্মপুস্তকের বাইরে নিয়ে আসতে পারে না কেউ! ভ্রষ্টাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কথা বলে সবাই, কিন্তু রাজনীতির মানুষটির ধোপদুরস্ত পরিচ্ছদটি চেয়ারে বসিয়ে ভিতরের খাঁচাটিকে আড়ং ধোলাই-এ পাঠানোর কথা ভাবে না। হ্যাঁ, সবাই বলে করতে হবে। ভবিষ্যতের অনুজ্ঞা বড় নিরাপদ।
তাই আমি সমাজবহির্ভূত। আমি তাই। আমার কোনো দায় নেই সমাজে, এমন কথাও বলি না। তাই তো সোজা ভাষায় লিখি না এসো জটিল হইবলে গান গেয়েছিল কেউ তাই জটিল লিখি। বুঝিলাম, নাই বুঝিলাম জয় তব জয়বলে ফেলবে কেউ একজন, দুইজন, কয়েকজন তো পাওয়া যাবে। তার উপর তো আছে জাদুবাস্তব আর পরাবাস্তবের সুপ্ত আগ্নেয়গিরি। যা পারলাম না, খোদাই করে গেলাম, খুঁজে নিও প্রত্নখননে।
সহজ ভাষার লেখালেখি পড়ে দারিদ্র্য মোচন হয় না। ভ্রষ্টাচার মুক্ত হয় না সমাজ। লেখালেখি পড়ে ধর্মসমাজের বধির কর্ণে মধুবাতাসের শব্দ পৌঁছয় না। তাই, নিজের জন্যই লেখালেখি। নিজেকে নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে ভাষার বর্মে সত্য সাজানোর প্রচেষ্টা।
মনের মধ্যে যে-লেখার আনাগোনা, সে-লেখায় সত্য থাকে আগমার্কা। ছাপার যে-লেখা সেখানে কৌশলে সত্যকে লুকিয়ে সাজানো হয়। সাজাই। লুকোচুরি খেলি। তাই আমার বেশিরভাগ লেখাই দুর্বোধ্য। দুর্বোধ্য মানে নিজের কাছেও কঠিন। কঠিনকে ভালবেসে কোনো পাঠক পড়ে ফেললে সৌজন্যবশত বলেন স্মার্ট। মন্দ না বলার জন্যই বলা। গল্পকথায় সহজিয়ানা আমি পারি না। ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানে সম্পাদকরা আমাকে বহন করেন।
কেউ কেউ বলেন রণবীর মানে দুটো গল্প। মিনির হাসিআর রঞ্জন আসছে। দুটোই প্রেমের গল্প। আলোচকরাও তাই বলেন। আমি বলি ভুল।
চৌষট্টি ইংরেজিতে কাছাড় কলেজ পত্রিকার সম্পাদক অরবিন্দ পাল, করিমগঞ্জের ছেলে, লিখিয়ে নেয় গল্প, আমার প্রথম গল্প। ভারপ্রাপ্ত অধ্যাপক সেন্ট্রাল রোডের সুবীর দত্তগুপ্ত স্যার, কী জানি কী একটা টিপস দিয়েছিলেন গল্প লেখার। তখন মনে হয়েছিল দারুণ। এর চে' ভাল নতুনপট্টির ভাড়াবাড়ি থেকেই শুরু করা যাক। সেও পনেরো বছর বয়স। কবিরাজ বাড়ির ছেলে মন্টুদা চা-সিগারেট খেতে আসে অমূল্যের দোকানে। ওখানে এক বিহারি গোয়ালা দুধ দিয়ে যায়। আমাদের সঙ্গে গল্প হয়। কম্যুনিস্ট পার্টির গল্প, জ্যোতি বসু, রণদিভে, অচিন্ত্যবাবু, যোশীজির কথা। অচিন্ত্যবাবুর বাড়ি তো একপুকুর পেরোলেই। গোয়ালাদাদা বলে নেতাদের সঙ্গে এক পঙক্তিতে বসে খেয়েছে ডাল রুটি ভাত ও মাছের ঝোল। তখন কেরল নিয়ে ডামাডোলের পর কম্যুনিস্ট আন্দোলন এক নতুন বাঁকের মুখে। কানু সান্যাল, চারু মজুমদারের নামে শ্রদ্ধা। জঙ্গল সাঁওতাল, নকশালবাড়ি। লুকিয়ে পড়ার দেশহিতৈষী থেকে দেশব্রতী। সেই সময় মন্টুদার সঙ্গে কথা হয় গল্পকথার কারসাজি নিয়ে। শাস্ত্রবিরোধী হাংরি নিম আরো কী সব। বাসুদেব দাসগুপ্তর রন্ধনশালা আরো পরে হয়তো। কী করে যে শ্যামলদার সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে গেল আমাদের। মানে, আমি ও মন্টুদা। অশোকায় নিয়মিত আড্ডা আর শ্যামলদার বাকি খাতায় অমৃতি, রাজভোগ, শিঙাড়া ও চা। অনিশ বেরোবে পুজোয়। আমরা বের করলাম ডাউক। সম্পাদক তিনজন, ‘ত্রয়ী। আমি দিলীপকান্তি লস্কর ও মন্টুদা, মানে মহামতি মিথিলেশ ভট্টাচার্য আরও একজন ছিল, ত্রিশ টাকার প্রথম সংখ্যার যোগানদার। শিলচর ডি সি অফিসের চাকুরে আমার বন্ধু নিধিলাল ধর। লিখিত না কিন্তু লেখক বন্ধু এবং সংগঠক। তখনও বন্ধু, এখনও বন্ধু, এখন করিমগঞ্জে। তপন বলল, সেও লিখবে। সংস্কৃত বাংলা ইংরেজি সাহিত্যের পড়ুয়া তপন ওথেলো থেকে ওফেলিয়ার প্রেম নিয়ে লিখল এক রোমান্টিক লেখা। আমরা বললাম, সলিলকি সাহিত্য। অনেকদিন আমাদের মুখে মুখে ঘুরেছে তপোধীরের এই বিখ্যাত পঙক্তি, ‘ওফেলিয়া, আমি একটি অপাপবিদ্ধ সন্তানের জন্ম দিতে চাই  অনিশঘিরে হলাম আমরা তিন লিখিয়ে বন্ধু ও দিলীপ আর নিধিলাল। অনিশ পূজা সংখ্যায় আমার গল্প লেখার মহড়া হল আবার। মিথিলেশ লিখল, ‘প্রাত্যহিকতার ডামাডোলে প্রতুল। তপোধীরের লেখা কালিদাসঃ ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বএক উদ্ধৃতি পড়েই নতুন করে কথার খোঁজ শুরু হয় আমার। উদ্ধৃতি ছিল এরকম,
না পারে বোঝাতে, আপনি না বোঝে
মানুষ ফিরিছে কথা খুঁজে খুঁজে।
তপোধীর লিখে জানিয়েছে আমরা যখন লেখালেখি করি তখন সে কিছুই লেখে না। হয়তো শব্দের সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, সলতে পাকানোর সকালবেলাকে অস্বীকার করা হয়। তপোধীর-বাড়ির গ্রন্থাগার দেখেছি শৈশবে, সেই কাঠের আলমারির পুরুষোত্তম গ্রন্থাগারএখনও উত্তর পূর্বাঞ্চলের সর্ববৃহৎ ব্যক্তিগত বিবলিওথেক। তপোধীরের বই পড়ে প্রস্তুতি, আমার বই দেখে। বই দেখে দেখে, স্বপনকুমারের প্রহেলিকা সিরিজ’, ‘কৃষ্ণা সিরিজপড়ে পড়ে, দস্যু মোহনের বই পড়ে, হেমেন্দ্র রায় পড়ে। নবম দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় লিখেছিলাম এক উপন্যাস। পড়িয়েছিলাম  আমার বাল্যবন্ধু সহপাঠী খাসিয়াপট্টির বন্ধু স্বপন দেবনাথকে। ধন্য ধন্য করেছিল, স্বপন পড়াশুনা ছেড়ে দেয়, চলে যায় যুগীরবন্দ, এখন সে নেই। উপন্যাসটিও নেই, রক্ষে হয়েছে, থাকলে লজ্জার বোঝা বাড়তই। কলেজ সময়ে, ‘দেশপত্রিকায় বিমল মিত্রের বেগম মেরী বিশ্বাসশেষ হয়েছে, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর এই তার পুরস্কারজমে গেছে। আর সমীর রক্ষিত, দিব্যেন্দু পালিত, শীর্ষেন্দু, সুনীল, সন্দীপনরা রাজত্ব করছেন। সুবোধ ঘোষ কী রোমান্টিক গল্প লেখেন। বনফুলের ভীমপলশ্রী আরও কত, পড়ে পড়ে গল্প লেখার ইচ্ছে হতেই পারে। ইচ্ছে পর্যুদস্ত  হয়। শতক্রতুতে একটা ছাপা হতেই ট্রিলজি গল্পের সমাপন। আমার তিন অখাদ্য গল্প। এবার বিদায় নেবার পালা, আমার দ্বারা হবে না। বুঝে গেছি  লেখালেখি আমার হবে না। স্মাগলদের দুনিয়ায় সাড়ে নয় নম্বর প্ল্যাটফর্ম দিয়ে ঢুকতে হয়। তেমন কোনো  প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পাওয়ার জাদুবিদ্যা করায়ত্ত করতে পারিনি যে জীবনে
আসলে পড়াশুনার ভাণ্ডার তো তেমন কিছু ছিল না। শিলচরে সাধারণ গ্রন্থাগার বলতে দুটি, ‘অরুণচন্দ্র গ্রন্থাগারআর জেলা গ্রন্থাগার। মনের মতো বই কোথাও নেই বলার অর্থ দায়সারা। তা নয়, বই পড়ার মানসিকতা ছিল না। কোনও রকমে ইস্কুল পাশ, কাছাড় হাইস্কুল থেকে কলেজ পাশ, সেও কাছাড় কলেজ, নকশাল আন্দোলনে সন্দেহভাজন হওয়ায় বাড়ি থেকে পালিয়ে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরটা হয়ে যায় শ্রীঅভয়াচরণ ভট্টাচার্য পাঠশালার প্রথম মান শ্রেণি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত তপনকে সহপাঠী পাওয়ায় এবং কাছাড় হাইস্কুলে শক্তিদাকে শিক্ষক পাওয়ার সুবাদে জীবন শুধু চাল-তেল-নুন সংসারের গতানুগতিক খাতে বইল না। সাহিত্যের একটা বাড়তি আনন্দপেটিকা বহন করে চলেছি, লেখালেখির এই মায়াভবনে বাসিন্দা হয়েছিলাম বলে জীবন এখনও এত নির্মল এত নির্ভার। লিখে তো বোঝাতে পারিনি কিছুই। কিন্তু তপোধীর এবং শক্তিপদর কবিতা থেকে জোর করে উঠে আসে আমার সমর্পণের পঙক্তি,
আমার সমস্ত ভেঙে তুমি দীর্ঘ হতে চাও
তবে নাও যশ, নাও জয়, নাও ঋদ্ধি, নাও’ (তপোধীর)
তুমি আছো বলে মেঘ জল,
তোমারই ইচ্ছায় সমস্ত নাস্তিক শক্তি
ঈশ্বরের দিকে ছুটে যায়’ (শক্তিপদ)
আটষট্টি, ঊনসত্তরের বারুদ বুকে নিয়ে জেগে-ওঠা সময়কে ভয় পেয়ে যে দেশ ছেড়েছিলাম, কয়েক মাসের জন্য ফিরে এসেছিলাম সত্তরে, সুখের টানে চাকরি করতে চলে যাই ডিগবয় গৌহাটি লামডিং। ছিয়াত্তরে ফিরে আসি আবার লালা। বিশাল এক অট্টালিকায় একা থাকি আর ভাবি বন্দরের কালএবার বুঝি শেষ হল। লেখালেখি আমার নয়, আমার নয়। কিন্তু ছাড়তে চাইলেই কি ছাড়া যায়। সেই ঘরছাড়া সত্তরের পর থেকে তপোধীর সাতদিনের জন্য ভুলতে দেয় নি আমরা বন্ধু, ভুলতে দেয়নি সাহিত্য আমাদের জীবন, সাহিত্য আমাদের ভবিতব্য। নিয়মিত চিঠি লিখেছে, মুঠোফোন এর পাঁচ বছর পর্যন্ত অস্বীকার করেছে- যে-কোনো কথাই শেষ কথা। মানে, গত দশ বছর কানাকানিতে কথা হয়, সাহিত্যের পত্রলেখা অঙ্গন পরিত্যক্ত হয়।
তো, সেই সময় মেধাহীন নিশিদিন ভাবি কী লিখি, কী লিখি। শ্রীরাধার মতো অবস্থা, যা কিছু কালো তাতেই কানু দেখি। সহজ পড়া পড়েছি, কলকাতার কাগজ লিটল ম্যাগাজিন, দেখছি ওরা সমসাময়িকরা কেমন লিখছে। চিত্ত ভরে না, ভাবি ছেড়েই দেব কালো অক্ষরের পিছনে ছুটোছুটি। কিন্তু মূলধন বলতে তো একটাই, লাইনের মাঝখানে না বলা কথা অনেক গুঁজে দিতে পারি কিছু না লিখে। রন্ধনশালার এই রেসিপি কাউকে দেওয়া যায় না কিন্তু ভুরিভোজের একটি পদ হয়ে যায় উপাদেয়। তাই, উপনিষদের সত্য মেনে, ইট, কাঠ আর যুবক-যুবতির মধ্যে ব্রহ্মরূপী ছোটোগল্প দেখতে শুরু করি। আর প্রেমের গল্প সাজাই, প্লটের পড়ে প্লট হয় না, আরও পড়ি। বুঝতে পারি ছোটোগল্পে প্লট ব্যাপারটার তেমন প্রাধান্য নেই আমার কাছে। এক যে ছিলবলে শুরু করার ব্যাপারও নয়, আর লাইনের মাঝখানের অকথিত কথাও নয়। বুঝতে পারি ঐ অকথিতশব্দটায় রয়েছে সব রহস্য, কিন্তু ধরতে পারি নে। বুঝতে পারি একটি ছোটোগল্পে যা লেখা হচ্ছে তার পাশাপাশি রয়ে যাচ্ছে সেই লেখার অন্য একটি পাঠ, যা ভিন্ন পাঠকেরা নিজের মতো পড়ে যাচ্ছে। এক লেখা বহু হচ্ছে, আবার এক থেকে যাচ্ছে অবিকল। যা সীমিত মেধার আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই, টা-টা।
কিন্তু ছাড়াতে চাইলেই কি ছাড়া যায়। লালা শহরে তখন আড্ডা চলছে। ছোটো শহরে তখন স্টেশন মাস্টার, পোস্টমাস্টার আর ব্যাঙ্ক ম্যানেজারের খুব সম্মান। আর বোঝার উপর শাকের আঁটি হয়ে কিছু না লিখেও বরাক উপত্যকার গদ্যশিবিরের সক্রিয় সদস্য, শতক্রতু পরিবারের একজন, অনেকেই নামে চেনে। তপোধীর ততদিনে উপত্যকায় এক সমান্তরাল সাহিত্য-সমবায় গড়ে তুলেছে। সমান্তরাল শব্দটি অর্থহীন হলেও একটা লড়াই কোথাও ছিল, এখন কিছুই নেই, কেউ নেই দৃশ্যমান, সে একাই সব গুল্ম ছাড়িয়ে মহীরুহ একমাত্র। তাই, সেইসময়ে একটা প্রতিফলিত সম্মানের অধিকারী ছিলাম। হাইলাকান্দি থেকে আসত আশু, চন্দ্রপুরে ওদের বাড়ি ছিল, কাছাকাছি কোথাও মাস্টারি করত। বেলাভূমির সম্পাদক আশুতোষ দাস তার স্বভাবের কোমলতায় প্রিয় হয়েছিল। লালা শহরের প্রাণকেন্দ্রে আমার বিশাল বাসাবাড়ি। বন্ধু মানিকলাল চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছিল ব্যাঙ্ক। মানিকও আসত মাঝেমধ্যে সপরিবারে, ছোট্ট মেয়ে চৈতি ছিল মিষ্টি। জেলা-জজ হয়ে অবসরপ্রাপ্ত এখন মানিক। লালা কলেজের অধ্যাপক আবুল হোসেন মজুমদার, জহর সেন এদের সঙ্গে আড্ডা হত। চন্দ্রিকা প্রসাদ শুক্লা ব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক কর্মী, বললেন নাটক করবেন, শের আফগা-এর মহড়া হলো, মঞ্চস্থ হলো না কোনো কারণে। কলাভবনের সদ্য স্নাতক ময়নূল তখন নেহুর শিক্ষক, তারও বাড়ি লালা। শিলং-এর এক মহিলা কবির কবিতা শোনাত, সেই কবিকেই বিয়ে করে ফেলল একদিন। চলেও গেল একদিন, একমাত্র মেয়ে রিখিয়া ছিল মিষ্টি দুরন্ত, এখন তো চিকিৎসক, জানি না বাপের উত্তরাধিকার কতটুকু বহন করছে। এক রবিবারে লালা স্কুলের পিছনের মাঠে ক্রিকেট খেলার আসর বসল, আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে গেলাম, সঙ্গে তপোধীর। উপভোগ্য পরিবেশে তপোধীর ধারাবিবরণী মাইক হাতে তুলে নিল, লালার ক্রীড়ামোদী মুগ্ধ হয়ে শুনল। বিজিৎদার হাইলাকান্দি যাই, আড্ডা হয়, মিথিলেশের বিয়ে হয় সরসপুরের রুবির সঙ্গে, সাহিত্য জগতের তারকা সম্মেলন হয় হাইলাকান্দিতে। অনুপস্থিত বউদির বাড়িতে দুইরাতের লাগাতার আড্ডার ইতিহাস এতদিন জানতাম আমি আর বিজিৎদা। সাহিত্যতখন কবিতার, গদ্য লিখতে বলে বিব্রত হলেন বিজিৎদা। বরাক উপত্যকায় গদ্যসাহিত্যের দুই ভগীরথ শ্যামলেন্দু চক্রবর্তী ও তপোধীর এবং গদ্য শ্রমিকদের কথা বিজিৎদা ছাপালেন ক্রোড়পত্রে। অরুণ শিলং থেকে হাইলাকান্দি এলে উৎসব হয় লালায়। আসে তপোধীর, মিথিলেশ, শেখর। অরুণ চন্দ সুলেখা কালির বোতলে ভরে নিয়ে যায় কবিতা-সুধা। কবিতা হয়, সাহিত্য হয়, সুধাময় বন্ধুত্ব হয়। বিচ্ছেদ হয় হাইলাকান্দি শ্মশানে, শ্মশানরাত্রে আমি তপোধীর  মিথিলেশের বোবা লাগা এখনও যায়নি। এখনও আমরা বন্ধুকে ডাকি অরুণ ফিরে আয়’, ক্রোড়পত্র ছাপাই বারবার।
সেইসময়ে তপোধীর শিলচরে সদ্য বিবাহিত। বন্ধু পত্নীর সঙ্গেও প্রীতির সম্পর্ক জমে যায়। শনিবার লালা থেকে যাই স্টেট ট্র্যান্সপোর্টের বাসে। চারজনের সাহিত্যের আড্ডায় স্বপ্না ভট্টাচার্যকে পাত্তা দিইনি। লেখালেখিতে আমরাই যে শেষ কথা। কী ভুল হয়েছিল, হয়তো আমাদের ভুলের জবাব দিতেই আজ বরাক উপত্যকার ছোটোগল্পকারদের মধ্যে একতমা তিনিই। দেশভাগ পরবর্তী লড়াই আর মূল্যবোধের অসাধারণ গল্প উজানদিয়ে যার আত্মপ্রকাশ, তার গল্পবিশ্ব তো ভিন্নতর হবেই। সমাজ ও সাহিত্য নিয়ে তার ব্যতিক্রমী তথা মুক্ত চিন্তার ফসল হয়ে সদ্য বেরিয়েছে জীবনানন্দের নারীকল্প’, ‘সমান্তরালগল্পগ্রন্থের লেখক এবার একটি উপন্যাস লিখবেন। আমাদের আড্ডায় শেখর দাশকে মানিয়ে চলা একটু কষ্টকর ছিল, আবার শেখর ছাড়া জমতও না। একটু সৃষ্টিছাড়া ছিল তার কথা বলা, সম্পর্ক, আর শতক্রতুর লেখায় ছিল দারুণ পেশাদার। বাঁধের নিচে নদীর পারে শেখরের বাড়ি রিভারভিউআমাদের আকর্ষণের কেন্দ্র ছিল, আর কেন্দ্রমনি ছিলেন শেখরের বাবা, মেশোমশাই আমাদের পেলে আমাদের বয়সী হয়ে যেতেন, আবার একটা রাশভারি আবরণও ছিল, মাসীমাকে আমরা একটু ভয়ই করতাম। আমাদের নতুনপট্টি পাড়ায় থাকত মন্টুদা, মনোরঞ্জন কবিরাজের ঔষধালয়য়ের পিছনে ছোটোভাই মহেশ কবিরাজের থাকার জায়গা। মন্টুদার বড় ভাই কেশবদা আমার দাদার বন্ধু, ছোটো  ঝন্টু আমাদের সমবয়সী। শতক্রতুর দরকারেই হয়তো জ্যেষ্ঠতাতের বাড়ি থেকে উৎখাত হয়ে চলে যায় মালুগ্রাম থানার পিছনে ভাড়াবাড়িতে। ওখানে ননীদার চায়ের দোকানে পুনর্মিলন এবং শতক্রতু। আর তপন বরাবরই নেতাসুলভ উদার, বিশ্বের ভার নিজের কাঁধে নিয়ে নেয়। নিয়েছিল বলেই শতক্রতু’, নিয়েছিল বলেই আমাদের লেখালেখি, শেখর দাশ-এর আবিষ্কার, কাবুলিওয়ালার কাছ থেকে ধার নিয়ে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ। তখন সবাই প্রেম করত। নীলিমার সঙ্গে জোর প্রেম মিথিলেশের, ক অক্ষর একজনের সঙ্গেও কিছুদিন। শেখরও জানি একজনের সঙ্গে। তপোধীর কী করে এতসব রোমান্টিক গল্প লিখল বিয়ের আগে, সে-খবর যারা জানে তারা জানে। সুন্টুনি মুন্টুনি ডায়লগ লিখল, ‘শান্তা, শানু, শানুয়া, তুমি আজ শাম্পু দিয়েছ চুলে।মিথিলেশ ছারপোকার পর লিখেছে শুধু জীবনানন্দকে ধ্রুবতারা করে। বরাক উপত্যকার মধ্যবিত্তও নিম্নবিত্ত জীবনের টানাপড়েন। শেখর বরাবর স্মার্ট। শেখর ফ্রেম গড়ত, ফ্রেম জুড়ে জুড়ে ছোটোগল্প একেবারে সিনেমা। ভাল লাগত যতক্ষণ শতক্রতুতে লিখেছে। এরপর আর ভাল লাগল না। আমারও তখন হরেক রকম, শিলচরে কিছু, ব্রহ্মপুত্রের দেশে এক এবং কলকাতার মিনির সঙ্গে একতরফা। একতরফাতে মন মজল। বন্ধুদের প্রেম পর্বের দর্শক হওয়া আর লালায় ফিরে উদাসী রাত কাটিয়ে দেওয়া। তখনই মনে হল, লেখালেখি ছাড়লে চলবে না, মিনিকে পাব না। ঠিক করলাম, আমার একটা ঘরানা হোক, আমার মতো লিখব। ফ্লপ লেখা লিখতে লিখতে বিরক্ত হচ্ছি, আর মনে মনে লিখে যাচ্ছি নানা কথা। মিনির জন্য মনোদুঃখের এপিটাফ। মিনিকে বলতে পারিনি কিন্তু মিনির সঙ্গে দীর্ঘ ভ্রমণ করেছি, হাবড়া, জয়নগর গেছি। কফি হাউসে গেছি। পাতিরাম থেকে লিটল ম্যাগাজিন কিনেছি হাংরি, শাস্ত্রবিরোধী। শাস্ত্রবিরোধীদের সঙ্গে মনের মিল হয়ে গেল, এই দশক, চিল ইত্যাদি। এক নতুন কথাভাষা পেয়ে গেলাম। তপোধীরের চূড়ান্ত রোমান্টিকতা, মিথিলেশের ভাঙা সময় নিয়ে উদাসীনতা, শেখরের ফ্রেম আর আমার ইঞ্চি মেপে গল্প লেখার ইস্কেল। একান্ত আপন কথাভাষা সম্বল করে শ্রীগণেশ হয় আমার লেখালেখির।
আমি তো আর পাশ্চাত্য রীতির অনুকরণে আত্মজীবনী লিখতে বসিনি। বরং বহমান সময়ের চালিবেয়ে যেতে যেতে কখনও উজানে ফিরি কখনও তরতরিয়ে ভাটিতে। সময়ের মধ্যে থাকাটাই তো পারম্পর্য, এর বাইরে কোনও দায় নেই।
এবার তাই আমার কথা, আমার কয়েকটি গল্পের কথা বলেই করি টাইমপাস। মিনির হাসিশতক্রতুতে বেরিয়ে গেল, আকাশবাণীতেও পঠিত হল, সাহিত্য বিভাগের প্রযোজক শুক্লবৈদ্য মহাশয় বললেন, ‘গোল্ডেন ভয়েস। মানে কী? গল্প ভাল লাগে নি? আমার কণ্ঠস্বর ভাল। পাঠকের ভাল লেগেছিল, ওই একবারই। একবার পায় তারে, পায় নাকো আর। ভাল লাগার হাততালি শুনেছি, বারবার ছেপে বেরিয়েছে, এ কাগজ ও কাগজে, বিভিন্ন সংকলন গ্রন্থে। তপোধীর তখন উত্তরবঙ্গ শিলিগুড়িতে। শিলিগুড়ির এক দৈনিকের রবিবারের পাতার ভারপ্রাপ্ত। ছাপিয়ে দিল মিনির হাসিইলাস্ট্রেশন সহ। ভাবি, ওষধি লেখার লেখক হয়েই কি কাটিয়ে দিতে হবে জীবন? ‘মিনির হাসির পর আবার আকাশবাণীর আমন্ত্রণ। কোথায় লেখা? কলকাতার মিনিকে শিলচরের পার্ক রোডে নিয়ে এলাম এক শনিবার। তপোধীর, স্বপ্না, কখনও মিথিলেশ-শেখর সহ আমরা যাই বুদ্ধ সেন-এর রেস্টুরেন্টে। আলো-ছায়ায় ঘেরা এক মনোরম পরিবেশ ছিল খাওয়া-ঘরের। সেই অভিরূপের রেস্তোরাঁ। একই ফর্মাটে লিখে ফেললাম, আবার হিট, আবার শতক্রতু।
 অনেকদিন পর শুনে অবাক হয়েছি বরাক উপত্যকার সাহিত্য সংস্কৃতির দুই জ্যোতিষ্কের ভাল লেগেছিল রঞ্জন আসছে। দেবাশিস তরফদার ও শুভপ্রসাদ নন্দী মুজুমদার ব্যক্তিগত জীবনে নিকট-আত্মীয়। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুজনের খুব মনে ধরল, দুজনেই সিদ্ধান্ত নিল চিত্রনাট্য করবে। গল্প লিখে এতবড় পাওনা কখনও পাইনি। শুভর মুখ থেকে শুনেছি, এর আগে বিশ্বতোষ বলেছে। দেবাশিসকে চিনতাম না।
এবার অন্য কথায় ধান ভানা। আমার একটি এলআইসি পলিসি হারিয়ে যায়। তখন শিলচরে চাকরি করি। চিঠি দিয়েও কিছু হয় না। তখন একদিন মেহেরপুর এলআইসি অফিসে চলে যাই লড়াই করব বলে। বিভাগীয় অফিসার, তাই বললেন যা যা বলতে হয়, ‘দেখছি,’ ‘অবশ্যই পেয়ে যাবেনইত্যাদি। হঠাৎ আমার নাম জানতে চাইলেন আধিকারিক। নাম শুনে ফাইলপত্র গুটিয়ে রাখলেন। ড্রয়ার তালা লাগালেন, কী ব্যাপার? পাঁচটা তো বাজে, তার মানে আজ আর হবে না। ভদ্রলোক বললেন, চলুন। আমি হতভম্ব। আবার বললেন, চলুন আমার বাড়ি সামনেই। আমি আর কোনো প্রশ্ন করিনি, কে আপনি, কেন আপনি। মানে, কেন যাব। তখন আমার মাথায় হারানো পলিসি। রাস্তায় যেতে যেতে নাম জেনে গেছি। স্কুল লিভিং পরীক্ষায় তখন পর্যন্ত বাংলায় সবচেবেশি নম্বর পাওয়া ছাত্র দেবাশিস তরফদারের নাম সবাই জানে। জানে কবি দেবাশিস কে, মুক্ত গদ্যের কারিগর দেবাশিসকে। কবি সেদিন তার লিংক রোডের ভাড়াবাড়িতে শোনালেন অনেক প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত লেখা। তার স্ত্রীর হাতে তৈরি খাদ্য ও পানীয় চা। এক সময় রঞ্জন আসছেগল্পের চিত্রনাট্য বিষয়েও বললেন। যদিও পরবর্তীকালে দেবব্রত চৌধুরীও আকাশবাণীর জন্য নাট্যরূপ দিয়েছিল, ‘রঞ্জন আসছের। হয়তো গল্পের চিত্ররূপ কিংবা নাট্যরূপ সফল না হওয়ার জন্য গল্পের কোনো কাঠামোগত ত্রুটিই দায়ী ছিল। তো, লেখালেখির এই বিরাট পাওনাটুকু ভুলিনি কোনোদিন। পাঠককে কি এরপরও বলে দিতে হবে যে আমার হারানো পলিসিটা পরদিনই হাতে হাতে পৌঁছে যায় আমার ঠিকানায়।
ওই ঘরানার আর একটি গল্পও লিখেছিলাম সেই সময়ে। আমার লালা সময়ে। বীরেন্দ্রনাথ রক্ষিত-এর একটি কবিতার লাইন ছিল এরকম, সুধা শ্যামলিম পারে তরমুজ খাওয়ার মতো... ইত্যাদি, মানে চুম্বন। সেই শুরু বিস্ফোরক শব্দাবলীকে ঢেকে ঢুকে রাখার কারসাজি। গল্পের নাম ছিল তরমুজ। বীরেনবাবুও অবাক করে দিয়েছিলেন একদিনের পরিচয়ে। মালিগাঁও-এ ওর বাড়ি গিয়েছিলাম, সঙ্গে তপোধীর। তপোধীরের সঙ্গে। বলেছেন আমার দুটো গল্প পড়েছেন, এবং মুগ্ধ হয়ে পড়েছেন। তো এই শেষ। উড়ে গিয়ে ফুরিয়ে যাওয়া। এরপর স্বপ্না ভট্টাচার্য, তপোধীর এবং অমৃতলোক সম্পাদক সমীরণ মজুমদার ভাল বলেছে। প্রমা সম্পাদক সুরজিৎও বলেছে। বন্ধুত্বের দায়।
পাঠক নেই বলে আরও কয়েকটি গল্প নিয়ে সাতকাহন লিখব। আমার নিজের লেখা নিয়েই। তো, শতক্রতু থেমে গেল একসময়, যেমন থামে। এরপর আর বড় মাপের গল্প ছাপার কাগজ রইল না বরাক উপত্যকায়। বিজিৎদা আরম্ভ করলেন বটে। সাধুবাদ তাকে। এখনও চলছে সাহিত্য। বরাক উপত্যকায় অনিশ, শতক্রতুই ছোটগল্পের মাত্রা বেঁধে দিয়েছিল। পঞ্চমে সুর বেঁধেছিল মিথিলেশ, শেখর, অরিজিৎ। বদরুজ্জামান চৌধুরী লিখলেন তার সমাজের কথা। দেওলাগল্পের সুব্রত অনেকদিন লেখে না, কিংবা আমার চোখে পড়ছে না। অমিতাভ লিখছে, দীপেন্দু কেন লেখে না তার জবাব সেও দিতে চায় না। হয়তো রাহুল দাস নিজেকে প্রস্তুত করছে, বিস্তর পড়াশুনা করছে, লেখার রন্ধনশালায় ঢুকে গেছে কিছু করে দেখাবে বলে। অপেক্ষায় আছি। শতক্রতুথেমে যাওয়ার কথা লিখছিলাম। রত্নদীপ নামে একজন আছে, আছে রূপরাজ, ওরা লিখছে। আবার শুরু হয়েছে। হয়তো আবার লিখব যেমন লিখছিলাম। শতক্রতুবন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পশ্চিম বাংলার কাগজে লিখেছি অনেক। আর সেসব লেখা মানে এক একটা লং ড্রাইভ। সোজাসোজা লেখা, সোজা ব্যাটে ফিল্ডসম্যান বিহীন লংঅনে তাডু। মহাসড়কে দৌড় শুধু, উচ্চাবচতাহীন একমুখিন স্টোরি। মানে এক একটি গোল গল্প। আমার গল্পের বই বোকা কাশীরাম কথার সমালোচনা করতে গিয়ে খুব ফাঁপরে পড়েছিলেন স্বপ্নময় চক্রবর্তী। একদিকে সম্পাদককে দেওয়া কথা অন্যদিকে রণবীরের সঙ্গে পরিচিতি, দুরন্ত সেই বুদ্ধিধর গল্পকার ছড়া-কথার অবতারণা করে লিখলেন কী কথা?’ ‘ব্যাঙ-এর মাথাআমার লেখাকে ব্যাঙের মাথা বলায় অখুশি হওয়ার কারণ ছিল না, কারণ স্বপ্নময় আমার প্রিয় গল্পকার, অকারণ মিষ্টি কথা বললে অশ্রদ্ধাই হত। তবু এক জীবনে সেঞ্চুরি হাঁকতে না পারলে টুকটাক দৌড়েছি তো, আম্মোও দৌড়েছি বলার সুখ একটু ভাগ করে নিলে আগডুম বাগডুমের লেখা আয়তনে তো বাড়বে।
গল্পকথা বোকা কাশীরাম কথায়ও প্রেম। প্রেম রিভিজিটেড। তখন সবে কম্পূটার এসেছে জোরকদমে কম্পু নিজে মজা। লেখায় একটু জটিল হয়ে যাই, আমি সাধাসিধে লিখতে পারি না। ভাবি পাঠকের মন্দ লাগবে না জটিলতার জট ছাড়াতে বাবুই পাখির সূঁচ খুঁজতে। আসলে আমি থোড়াই লিখি পাঠকের জন্য, আমার পাঠক আমি, আর আমার সম মনের দু-একজন, যাদের কথা আগে বলেছি। প্রথম লেখাটা কিন্তু একেবারে আমার, একেবারে ওরমানে কাঁচা খনিজ। ওটা সত্যি কাঁচা সোনা। শব্দের সত্য, বাক্যের সত্য থাকে অনেকখানি। পাঠকের কপিতে থাকে চালাকির খাদ, নইলে যে গয়না হয় না। আমার কম্পূটারের নাম কাশীরাম। কাশীভাই নায়ক-নায়িকার প্রেম এবং পরকিয়া রেগুলেট করে। বৈষ্ণবধাম নবদ্বীপে ছিলাম ছমাস চাকরি সূত্রে একাকী, ব্যক্তিগত বিরহ জমিয়ে ক্ষীর বানালাম। বিয়ের পর স্ত্রী ছাড়া প্রেমের রমণী পাই নি বলে দুটুকরো করলাম এক নারীকে। প্রেমের ফষ্টিনষ্টির যে-অংশটুকু স্ত্রীর কাছে পাইনি, ঢুকিয়ে দিলাম দুনম্বরে। ভাল বলল না, বলল মন্দ না কেউ কেউ। স্থায়ী পাঠকরা বলল বেশ। ত্রিপুরার মুখাবয়বছাপল। দেবব্রত দেব সম্পাদক। দেবুর ছোটভাই রতু, শুভব্রত অক্ষর প্রকাশনীর কর্ণধার, আমার একমাত্র বই-এর প্রকাশক। ত্রিপুরার আরও তিনজন দুলাল ঘোষ, অনুপ ভট্টাচার্য আর শ্যামল ভট্টাচার্য আমার প্রিয়জন। নকুলের সঙ্গে, সমরজিতের সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয় না। শুভাশিস ও প্রবুদ্ধের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়। কিশোরের সঙ্গে দেখা হয় না। জয়া লেখেন দারুণ, দেখা হয় নি। মুখ্যত দুলালের উৎসাহে অ-গেরস্থ আমার বই প্রকাশের প্রথম উদ্যোগ হয়। কারণ তপোধীর স্বপ্না ততদিনে হতোদ্যম হয়ে আমাকে দিনে ২৫ বার গালাগালি করে জলপান করা শুরু করেছে। আমার যে ধনুর্বিদ্যা পণ, লেখালেখির জন্য কাগজ কলম ছাড়া অন্য কোন অর্থব্যয় করব না। বই, প্রকাশের জন্য তো নয়। কেন, কে  কিনবে, কিনে পড়বে আমার বই? আর এমন কোনো প্রকাশকও নেই যে গাঁটের পয়সা দিয়ে বই বের করবে। সমীরণ মজুমদারও চেষ্টা করেছিল। তাই দেরি। শুভব্রতকে ধন্যবাদ, বের করল। প্রথম বই বেরোতে ভালই লেগেছিল। লেখক লেখক ভাব। তারপর কেটে গেছে। আসলে যখন লিখি, তখনই ঘর করি পাত্রপাত্রীদের সঙ্গে, ছাপার পর ভুলে যাই অকিঞ্চিৎকর ভেবে। এমন লেখা যে কেউ লিখতে পারে। আমি আলাদা হলাম কোথায়।
কাশীরামেরও আগে, কলকাতা এসেছি সদ্য সদ্য শিলচর থেকে। কফি হাউসে যাতায়াত, নিত্যদিন পরিচয় নতুন নতুন লেখক সম্পাদকের সঙ্গে। আফিফ ফুয়াদ করে গদ্যের কাগজ দিবারাত্রির কাব্যঅমৃতলোকসম্পাদক সমীরণ মজুমদার। প্রমাসম্পাদক সুরজিৎ ঘোষ। এবং মুশায়েরা সম্পাদক সুবল সামন্ত। এবং এই সময়সম্পাদক অরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বাজিকরএবং শিকড়ের সন্ধানেনামে দুটি গল্প ছাপিয়েছেন অরুণবাবু, এত খারাপ গল্প কেউ লেখেনি আজ পর্যন্ত। যেমন লালনমঞ্চ সম্পাদক দিলীপকান্তি ছাপিয়েছে একটি তুয়াতারাপূর্বদেশ গল্পপত্রসম্পাদক ছাপিয়েছেন লুয়াএবং একটি নিমন্ত্রণের জ্যামিতিক পরিণতি’, অক্ষরবৃত্ত সম্পাদক কপিশকান্তিও ছাপিয়েছিল একটি। আমার লজ্জাও নেই। এত খারাপ গল্প লিখছি আবার কলকাতার বন্ধু লেখকদের লেখা পড়ে ভাবছি ওরা মেধাহীন। তাহলে আমি কী? আমিও তো লেখক নই, লেখার ভান করছি। আমার লেখা ছাপুন বলছি না কাউকে, কিন্তু কফি হাউসে পরিচিত সম্পাদকের টেবিলে বসার অর্থই তো দাঁড়ায়, তাকে অনুরোধ করতে বাধ্য করা, একটা গল্প দেবেন। এই করে করে লেখক। মানে স্টক ক্লিয়ারেন্স। এর মধ্যে আমার পছন্দসই একটা দুটো লেখা হয়ে যায়। মন খারাপ থেকে উঠে আসে লেখা। মাঝারি মেধা আর নিম্নমেধার কফি হাউস লেখকদের দেখে মনে হয়, আমি কম কিসে। বাঙালির অলকাপুরী কলকাতায় এসে এমনিতেই মন খারাপ সমাজে ও রাজনীতির দৈন্য দেখে। শিলচর থেকে কলকাতা এসেছিলাম মুক্তমনা কম্যুনিস্ট-এর দেশ পাব বলে। কী পেলাম? আঙুলে আংটি পরে, গলায় পৈতে ঝুলিয়ে, ইনশাল্লাহ বলে, জয়গুরু বলে, নারকেল ফাটিয়ে শিলান্যাস করা নবীন সমাজতন্ত্রীরাই রাজা হয়ে বসেছেন। অপ্রাতিষ্ঠানিক লেখকদের প্রতি যে শ্রদ্ধা ছিল তা অচিরেই ঘুচে গেল, কারণ প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার কারণ আদর্শগত নয়, বরং মেধাগত। যারা মেধার উপরের সিঁড়িতে পা রেখেছেন, তারা বেশ দু নৌকোয় দেশ আনন্দবাজারের সঙ্গে প্রমা, অনুষ্টুপেও লিখছেন। আবার একটা নতুন সময় হলো, মনে হল এদের থেকে ভাল লিখতে পারি। মনে হওয়া আর লেখা এক কথা নয় তবু ইট-কাঠ যোগাড় করে গড়লাম এক অট্টালিকা। নাম দিলাম দুন্দুবুড়ি কথা। তপোধীর পড়ল, স্বপ্না পড়লেন শিলিগুড়িতে। তপোধীর তখনও তেমন খ্যাত নয় কলকাতায়। সদ্য উত্তর আধুনিক নিয়ে অঞ্জন সেন, অমিতাভ গুপ্তদের সঙ্গে অভিবর্তন হয়েছে। শিলগুড়ির সাম্প্রতয় লেখা হয়েছে বিতর্কিত লেখা। তখনও বালুরঘাটে মধুপর্নীর উৎসবে দেখা হয়নি ভগীরথ, অনিন্দ্য, মাধব, কিন্নর, অভিজিৎদের সঙ্গে। দুন্দুবুড়ি স্বপ্নার এমন ভাল লাগল যে ছাপার আগেই আমি মৌখিক পত্রিকা হয়ে গেলাম। বারবার পড়ছি বন্ধু, বন্ধুপত্নীর সামনে, ওদের  প্রিয়জনদের সামনে। আমরা শিলিগুড়ি যাওয়ার আগেই স্বপ্নাদেবী ওখানের, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়য়ের নন্দিতা ভট্টাচার্যকে পড়ে শুনিয়েছেন। শিলিগুড়ি পৌঁছতে আর একবার। উত্তম পাঠক নন্দিতাদেবী এখন কলকাতায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে নন্দিতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শিল্পী সাহিত্যিক সংগঠক ইন্দ্রদার স্ত্রী। বারবার পড়ে পড়ে তপোধীর-পত্নীর গল্পের অনেক অংশ মুখস্থ হয়ে গেছে। প্রমার সুরজিৎ-এরও ভাল লাগল। ছাপল এবং সেই প্রথম লিখে সম্মান দক্ষিণা পেলাম। আসলে উত্তর আধুনিকতার ছোঁয়ায় লেখাটি হয়ে উঠল। ঐতিহ্য জুড়তে গিয়ে অসংগতিও হয়েছে কিছু। বরাক উপত্যকার কথা, কলকাতার কথা, কথার ভিতর কথা আর রূপকথা মিশিয়ে এক মায়াবী ভাষায় লিখেছিলাম দুন্দুবুড়ি কথা। কিছুটা শৈশব স্মৃতি, শীতের রোদ্দুরে উঠোনের কোনে মাটির ঝুরো ঢিবি হতো ছোটো ছোটো টিলার মতো। আর আমরা ঢিবির চারপাশে হাত ঘুরিয়ে সুর করে বলতাম,
দুন্দুবুড়ি নাচ করে
সাহেব দেখে সেলাম করে
এরকম ক্রমাগত হাত ঘোরাতে ঘোরাতে ঢিবির উপর কালো সাহেবের উদয় হত। ভিতর থেকে উঠে আসত পিঁপড়ের মতো কালো পোকা, দুন্দুবুড়ি যার নাম। সব ঠিকই ছিল, কিন্তু ঐতিহ্য গুনতে গিয়ে কাজলরেখার গল্পটা মিলল না। পাঠকও ধরতে পারল না, আসলে পাঠক কোথায়? ব্যক্তিগত পাঠকরা তো মুগ্ধ, ভুল ধরার মানসিকতা নেই। পড়েছিল, সুব্রত কুমার রায়, খুঁটিয়ে পড়েছিল। সুব্রত এক দুরন্ত কথাকার বরাক উপত্যকার, বলা ভাল বাংলা ভাষার। তত্ত্ব জানে সুব্রত, লেখায় তত্ত্বরূপ বেরিয়ে যাওয়া মানে বাঁশ বিচালি দৃশ্যমান হওয়া। দেওলাকিংবা পলাশ দাহর মতো গল্পের লেখকের কাছে বাংলা সাহিত্যের প্রত্যাশা আছে। আমারও বুদ্ধিমান পাঠক পেয়ে ভাল লেগেছিল। কিন্তু ওপর ওপর পড়তে গিয়ে সুব্রত ভুল করেছিল। আমার লেখায় গ্রন্থনার ভুল ধরেছিল, আমি যে ইঞ্চি-মাপা লেখক, ওরকম ভুল করি না, দালান কোঠার স্থাপত্য ভুল করি না, শুধু প্রাণপ্রতিষ্ঠা করতে পারি না আবাসিকের
কাশীরামের গল্পে আমার বেশি কথা বলার প্রবণতার সমর্থনে লিখেছিলাম, ‘অল্প কথায় হয় না গল্প কথার সাজ। একবার কথায় কথায় বলেছিলাম ত্রিপুরার কথাকার শ্যামল ভট্টাচার্যকে। বলেছিলাম আমাদের দেশের ছোটো পত্রিকাগুলি ক্ষীণকায় হয় ঐতিহাসিক কারণে। আর পাঠকের জন্য বরাদ্দও থাকে কম পাতা। তাই উত্তর পূর্বাঞ্চলে কবিতার পত্রিকাই সব। গল্প উপন্যাস হয় না, যদিও বা গল্প দু-একটা হয়, সে-গল্প পোলিওর শিকার হয়। অল্প কথায় হবে না বলেছিলাম ওকে। শ্যামলের মনে ধরেছিল, প্রায়ই বলে, যদিও ত্রিপুরা, গৌহাটি, বরাক উপত্যকায় এখন বদলে গেছে সব। মুখাবয়ব, পূর্বদেশ গল্পপত্র, শতক্রতু এবং সাহিত্য এখন বড়ো বড়ো গল্পের সঙ্গে গল্পের অ্যাপ্রিসিয়েশনও ছাপায়। অল্প কথায় লিখতে পারার কারুকাজ শেখা হলো না বলে লিখেছিলাম লবণহ্রদের সীমানানামের এক বিশাল ছোটোগল্প। আমার মতো করে বলতে পারি গল্পলেখেছি ভাল। আমার সব গল্প যেমন খুল যা সিম সিম। চাবিকাঠি আমার কাছে, চিচিং ফাঁক আমি জানি, পাঠক শুধু আলু ফাঁক, বেগুন ফাঁক করে ক্লান্ত হয়ে দুয়ো দেয়। মিথিলেশ একবার দারুণ কথা বলেছিল, ওকে বলেছিলাম, তোর গল্পের পাত্রপাত্রীরা নড়াচড়া করে কম, রিক্সায় চড়ে বসলে যেন মনে হয় আজন্ম রিক্সাবাসী সে, রিক্সা চড়ার প্রক্রিয়াটা নেই কোথাও, সরাসরি বিষয়ে চলে যাস। মিথিলেশ বলেছিল, ‘হ্যাঁ হয়তো ঠিক, আমি ভাবি আমার পাঠক সব জানে একজন পাঠকের উপর নির্ভর করে বিবরণ বা ডিটেলস কমাচ্ছে, অন্যজন, আমি ডিটেলস ভারাক্রান্ত করে গল্পকেই গুলিয়ে দিচ্ছি। তাই পাঠকের সামনে মুখ থুবড়ে পড়েছে লবণ হ্রদের সীমানা। চেয়ে নিয়েও যা সম্পাদক ফুয়াদ ছাপায়নি সাহস ভরে। গল্প একটা ছিল নাগরিক, আমার বাড়ি আর সল্টলেকের বিভাজন রেখা হয়ে আছে একটি খাল। কেষ্টপুর খাল। মিথ্যের ভিতে জীবন সাজাতে গিয়ে সব হারানো এক দম্পতির কথা নিয়েই গল্প। কথা সাজাতে গিয়ে মনে হয়েছে পুরনো কথকের মতো লিখছি, দেশীয় লেখকরা যেমন লিখতেন কথা সরিৎসাগর। জটিল হয়েছে পাঠক ধৈর্য হারাচ্ছে বুঝেও লিখে গেছি। আমার তো ধৈর্য হারায়নি লিখতে, বেশ পরম্পরা ধরে গড়ে তুলেছি স্বাচ্ছন্দ্যহীন গল্পবাড়ি।
মতামানুষ কথাভাল লেগেছিল সুরজিৎ ঘোষ-এর। কোনো এক পুজো সংখ্যায় ছাপিয়েছিল প্রমায়। কথা ছিল শেষ প্রুফ দেখে দেব আমি। দিয়েছিলাম, পাণ্ডুলিপি না দেখেই ঝরঝরিয়ে কাটা প্রুফ শুদ্ধ হয়েছে কী না দেখলাম। এবং সুরজিৎ আমায় মহালয়ার রাত্রে অশ্রাব্য গালিগালাজ করল, আমার গল্পের যে একটা পাতা ছাড়াই কম্পোজ হয়ে গেছে। লেখকের খেয়াল না করাটা অপরাধ। সে না হয় হল, গালি খেয়েও আমি হেসেছি, যাক আমার গল্পের তা হলে একজন পাঠক তো বাড়ল। মতামানুষ কথাগল্পটি সুরজিৎ কয়েকবার পড়েছে, এত ভাল লেগেছে। আসলে আসাম, কলকাতার পটভূমিকায় লেখা গল্পটার কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্যাম সাহেবের সঙ্গে সুরজিৎ মিলে গেছে হুবহু। না, আমি জেনে লিখিনি কিছু। অসমীয়া ভাষায় মতামানে পুরুষ, সেই মতানিতে মতামানুষ কথা। এখনও দেখা হলেই বলে (আর দেখা হয় না, দেখা হওয়ার বাইরে চলে গেছে সুরজিৎ) কী যেন বিহুগান, রণবীর?’ বলে নিজেই গাইত বিহুর সুরে মুগার হাজে কপো পাহে তোকে ধুনিয়া লাগে। মানুষটা দারুণ রোমান্টিক ছিল, বড় ঘনিষ্ঠ হয়ে মিশেছে, আমার শ্যাম সাহেবও ছিল তেমন। ওর এক ব্যক্তিগত নারীর সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়ায় কফি হাউসে গুঞ্জন হয়েছিল। এমন কী আমার ব্যক্তিগত জীবনেও। নিজের রোগ অসুখকেও রোমান্টিকতায় মুড়ে দিত। কত রকম রোগ অসুখের নাম বলত, বিদেশে ডাক্তার দেখাতে যেত প্রায়ই। এখন মনে হয়, এরকম হয়, হয়ে যায়। কষ্টকল্পনায় হয়তো শ্যাম সাহেব চরিত্রে সচেতনভাবে কোথাও সুরজিৎ-এর আদল ছিল। সুরজিৎ মেয়েকে ভালবাসত প্রাণপ্রিয়। সব ছেড়েছুড়ে চলে গেল।
ত্র্যহস্পর্শআমার ব্যক্তিগত সংকটের গল্প। নিজের কথা ছাড়া কে কখন অন্যের কথা লিখেছে? রাজার শরীরে ঢুকলেও আমি, পথশিশুর শরীরে ঢুকলেও আমার শৈশব লেখকের আড়াল বড় মজার। লেখালেখি করে, আর নিজেকে সাজায় পারিপার্শিকের সঙ্গে। গগনচুম্বী ফ্ল্যাটবাড়ির কথা। গায়ে গায়ে থেকেও গায়ে লাগে না। লাগলে ঝনঝনানি। আকাশহীন, সবুজ শূন্য কৃত্রিমতার ভিতর সংসার। লড়াই লড়াই লড়াই করে প্রতিবেশির জানালার কাঁচ ভাঙে। কাঁচের শব্দ যায় পার্টি অফিসে। লাল পার্টি, গেরুয়া পার্টি, হতফুল পার্টি। সবাই নিয়ে আসে এক একটি কাঁচের জানালা, বিবাদ বিবাদের জায়গায় থাকুক, বিবাদ না থাকলে পার্টি কোন কাজে।কথাকার মানব চক্রবর্তী পড়ে বলেছিল, নতুন ধরণের লেখা। আসলে ভদ্রতার ভাষা। যেখানে শুরু ওখানেই শেষ। তবু মানব আমার প্রিয় লেখক। মানবের লেখা তীব্র অভিজ্ঞতায় জারিত হয়ে বেরোয়। যাপিত জীবন ছাড়া তার বিষয় নেই। অভিজ্ঞতার জন্য আফগানিস্থানের তালিবান জীবনও যাপন করতে পারে সে ক্লেশকর। কিম্পুরুষদের সঙ্গে কাল কাটিয়ে মানব লিখেছেন উপন্যাস সন্তাপ
বাবুই পাখির কিছু হারিয়েছে বলে ওঝা ডাকতে হবে কেন? আমার লেখার সূচ আমিই বের করে দেব পাঠককে, উৎসাহিত করব নবীন পাঠককে। না হলেও ক্ষতি কী, একটা নতুন লেখা তো হলো। এবার হয়তো কথা উঠবে, হঠাৎ কেন এত কথা? কেউ কেউ বলেছে, ‘বোকা কাশীরাম কথাএকটা বই এর নাম হলো? ঠিকই তো, সবাই কেমন স্মার্ট নাম দেয়, বোকামির একশেষ। নাম দেওয়ার দক্ষতাটাও করায়ত্ত হলো না। একটা সঠিক লেখা হলো না। সব কেমন এলোমেলো হয়ে যায়। প্রবাহিত হওয়ার নিয়ম শেখা হলো না। কথকতা যার নাম। আবার ভাবি পাগলা ঘোড়াকে বশ করতে পারিনি, ভালই হয়েছে। কৌশল জেনে গেলে কি আর রহস্য থাকত? ঘোড়ায় চড়ার অনুশীলন করে যাচ্ছি বলে খেদ নেই। কথা সমে না পৌঁছুক কিন্তু লয়কারীর বৈচিত্র তো আছে। এক গতে দুটো কথা বাঁধিনি কখনও। তাহলে কি আত্মজীবনী হচ্ছে? না, ঢাক পেটানোর শব্দ, শুনুন শুনুন সর্বজন। তা এই হঠাৎ কথারও একটা সূত্র আছে। সেটাই বলি এবার , ‘সাহিত্য৮৪ সংখ্যায় বেরিয়েছে এক প্রবন্ধকের অর্দ্ধেক। নাম, ‘এক ভুবন দুই কথাকার। কথাকার দুজনের একজন মিথিলেশ, অন্যজন আমি। প্রথম পর্বে মিথিলেশ। দুজনেরই একমাত্র ছাপা বই নিয়ে আলোচনা। তিনজনই প্রিয় বন্ধু। তাই তপোধীর প্রাবন্ধিককে নিরস্ত্র করতে হবে। বরাক উপত্যকার গদ্যসাহিত্য শেখর, মিথিলেশ, রণবীর মিথ প্রতিষ্ঠায় যিনি বদ্ধপরিকর। আমি তো জানি সচিন শেখরকে, জানি সৌরভ মিথিলেশকে, এই দুজনের সঙ্গে আজাহার অরিজিৎ আছেন, আছেন ডালমিয়া শ্যামলেন্দু চক্রবর্তী, কু-কুড়ির নবীন তারকারাও আছে। আমি সবচেবেশি চিনি আমাকে। আমি স্থায়ী কেউ নই। বেড়াতে এসেছি মাত্র। দুটো টেস্ট খেলে কেউ হিরোদের সঙ্গে কভারেজ পায় না। তাই আগামী সংখ্যায় সমাপ্যকাশীরামের বোকামি বন্ধ করতে সাহিত্যসম্পাদককে গোপন ইমেল পাঠানোর প্রয়াসে এত কথা। যদিও বন্ধ করা যায় নি সেই ঢাকের কথা 




*****