“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
জাকারিয়া ইছলাম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
জাকারিয়া ইছলাম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২০

করোনা মানেই মৃত্যু নয়

ll জাকারিয়া ইছলাম ll


দ্রলোক খুব বিরক্তিভরে ফোনগুলো রিসিভ করেন। তার কথার মধ্যে তীব্র বিরক্তি প্রকাশ পায়। কয়েকজনকে তিনি বলেই ফেলেন, দুএক মাস বাঁচবেন কিনা  ঠিক নেই; পরের মাসের কথা তিনি কিভাবে বলবেন ? সারকথা এইযে, করোনা ভাইরাস নিয়ে তিনি খুবই  আতংকিত । কেমন যেন মৃত্যুভয় পেয়েছেন তিনি । এই কয়েক দিনে আমি আরও কয়েকজনের কথা শুনেছি; ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে বিভিন্ন জনের মতামত বোঝার চেষ্টা করেছি । আমার মনে হয়েছে করোনা ভাইরাসকে যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তাতে এরূপ ধারণা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক যে, বর্তমান মানব সভ্যতার বিলীন হওয়াটা এখন সময়ের ব্যাপার।  কিন্তু, প্রশ্ন হোল, পৃথিবীর জন্য এ ধরণের ভয়াবহ বিপদ কি এই প্রথম? করোনা ভাইরাস কি পুরাতন সব কয়টি বিপদের থেকে অনেক বেশী মারাত্মক? 

যেমন 
২০০৩ সালে সারস ভাইরাসে অ্যাটাক করেছিলো প্রায় ২৬ টি দেশ। মৃত্যুহার ছিলো ১০%।
২০০৯ সালে সোয়াইন ফ্লুতে ৫৭ মিলিয়ন মানুষ আক্রান্ত হয়। মৃত্যুহার ৪.৫%
২০১৪ সালে ইবোলায় মৃত্যুহার ২৫% । মারা যায় ১১,৩১০ জন।
আর ২০২০ সালে করোনা ভাইরাসে মৃত্যুহার মাত্র ২%। মারা গেছে এ পর্যন্ত ৬২৩৯৯ জন।

               এই দুটি প্রশ্নের উত্তরও আমি ইতোমধ্যে জেনেছি । জেনেছি  পৃথিবীতে এ ধরণের বিপদ এই প্রথম নয় এবং এই বিপদ পূর্বের বিপদের তুলনায় ভয়াবহতমও নয় । তবে পার্থক্য হোল,  আগের মানুষ এসব বিপদের কথা সাথে সাথে জানতে পারত না । ২০০৩ সালে ফেসবুক , হোয়াটসআপ ছিলোনা। যখন সারস ভাইরাসে ২৬ টি দেশ আক্রান্ত হয়। ২০০৯ সালে সোয়াইন ফ্লুর সময় দুনিয়া ব্যাপী ফেসবুক ব্যবহারকারী ছিলো মাত্র ১৫০ মিলিয়ন। ২০১৪ সালে ইবোলার সময় হোয়াটস্যাপ ব্যবহার কারী মাত্র ২৫০ মিলিয়ন। আর ২০২০ সালে অন্যান্য মিডিয়া বাদ শুধু ফেসবুক আর হোয়াটসআপ ব্যবহার করছে লাখ, কোটি, মিলিয়ন না। প্রায় চার বিলিয়ন মানুষ। সোসালমিডিয়ার এই শক্তি ব্যাপক। প্রতি সেকেন্ডেই খবর ছড়াচ্ছে। কথায় বলে দুঃসংবাদ ঘোড়ার আগে ছুটে। একটা ভাইরাসে একজন মানুষের মৃত্যু সংবাদ এখন মুহূর্তেই বিলিয়ন মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
এখন  তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার সুবিধার কারণে  স্বল্পতম সময়ে যে কেউ দেশী বিদেশী সব  ঘটনার খুঁটিনাটি জানতে পারছে । কোন বিষয়ে বেশী জানলে মানুষ অনেক বেশী সচেতন হবার কথা । সেই সচেতন করার জন্যই  সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য মাধ্যম থেকে বার বার বলা হলেও ফল হচ্ছে বিপরীত । বিভিন্ন প্রচারণায় মানুষ সচেতন  না হয়ে অনেক বেশী আতংকিত হচ্ছে । আতংকিত মানুষ কোন সমস্যার সমাধান করতে পারে না; বরং নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি করে এ কারণে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সকলের ভেবে দেখা এখনই প্রয়োজন ।
   

          প্রাণীজগতে মানুষ অন্য সকল প্রাণী থেকে আলাদা। দর্শনশাস্ত্র মতে মানুষ একটি বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন  প্রাণী । পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘মানুষ সহজাত বিচারবুদ্ধিসম্পন্নএকটি প্রাণী । এই বুদ্ধিবৃত্তি বা সহজাত বিচারবুদ্ধিগুণই মানুষকে অন্য প্রাণী থেকে আলাদা করেছে । আর একটি বিশেষ গুণও মানুষের আছে । সে গুণটি হোল খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা  একজন মানুষ যেকোনো পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে খুব সহজে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে যা অন্য কোন প্রাণী পারে না । একসময় ডাউনোসরের মত বিশালদেহী প্রাণী এই পৃথিবীতে ছিল । কিন্তু, পৃথিবীর  জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে, ডাইনোসোর প্রাণী পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে গেছে। আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে, মানুষ সেই ডাইনোসোর নয়। মানুষ বিরল গুণসম্পন্ন একটি প্রাণী । পবিত্র কোরআনের ভাষায় মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। কিন্তু, এই সৃষ্টির সেরা জীবের সবচেয়ে  দুর্বল দিক হোল, এইবুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্নপ্রাণী 

কোন বিষয়ে নিজের সহজাত বিচারবুদ্ধিপ্রয়োগ করতে চায় না । এই মানুষ, বিশেষ করে আমাদের দেশের মানুষ বেশীরভাগ ক্ষেত্রে গুজব এবং অন্যের কথা  দ্বারা পরিচালিত হয়। করোনাভাইরাস জনিত এই সংকটময় মুহূর্তেও আমরা প্রায় সকলেই  একই কাজ করছি । আতংকিত না হয়ে সচেতন হবার কথা বলে হলেও, আমরা অন্যের দেখাদেখি নিজেরাই  অনেক বেশী আতংকিত হচ্ছি। কিন্তু, ভবিষ্যৎ অনিবার্য বাস্তবতা হোল, এই মানুষ করোনা সংকটও কাটিয়ে উঠবে। বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকবে এই সৃষ্টির সেরা জীব ।
আজ ফেসবুকে দেখলাম অফিসে কর্মরত একজন  কর্মকর্তার ছবি পোস্ট করা হয়েছে । ছবিটি নিচে দেওয়া হোল। ছবির ভদ্রলোক করোনার ভয়ে রীতিমত একজন নভোচারীর পোশাক পরে  অফিস করছেন ।

আমার ম্যাসেঞ্জারে  একজন ফেসবুক বন্ধু একটি খুদেবার্তা পাঠিয়েছেন । বার্তায়  তিনি লিখেছেন, ‘করোনাভাইরাস এর এই মহা-দুর্যোগের পর কার সাথে কার দেখা হবে অনিশ্চিত! আমরা সবাই কি বেচে থাকব? তাই, আসুন আমরা পরস্পর পরস্পরকে ক্ষমা করে দেই।
আমিও একজন ক্ষমা প্রার্থী
তারমানে আমার ফেসবুক বন্ধু  রীতিমত সবার কাছ থেকে শেষ বিদায় নিয়েছেন । 

কিন্তু,আমার প্রশ্ন করোনা ভাইরাস সত্যিই  কি এমন প্রাণঘাতী? সত্যিই কি এত ভয়ংকর ? আমি নিজেও অবশ্য করোনা ভাইরাস যে ভয়ংকর নয়,  তা বলতে চাইনে । করোনাভাইরাস অবশ্যই ভয়ংকর । কারণ, এই ভাইরাস মানুষের মাধ্যমে অতিদ্রুত গতিতে বিস্তার লাভ করে । ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আগে  ব্যবস্থা না নিলে, মহামারি আকার ধারণ করে । কিন্তু, এই ভাইরাস যে খুব বেশী প্রাণঘাতী নয়, তা পরিসংখ্যান দ্বারা প্রমাণিত। এই ভাইরাসে গড় মৃত্যুর হার ২% । সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ইতালির। সে দেশে করোনাভাইরাস  আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হার ১০% । ইতালির খারাপ পরিস্থিতির মধ্যেও করোনা আক্রান্ত শতকরা ৯০ জন মানুষ সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তাই, পৃথিবীর অনেক ভাইরাস থেকে এই ভাইরাস অনেক কম প্রাণঘাতী। সুস্থসবল মানুষ করোনাভাইরাসে মারা যাচ্ছেন -  তাও নয়। সাধারণত যারা বয়স্ক এবং অন্য কোন রোগের কারণে শরীরে রোগপ্রতিরোধ শক্তি কম- মূলত তাঁরাই করোনা ভাইরাসের মূল শিকার। দ্রুত রোগ সনাক্ত করা এবং আক্রান্ত রোগীদের আলাদা করে চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া- এই রোগ প্রতিরোধের প্রধান  উপায়। এই পদ্ধতি অনুসরণ করে ইতোমধ্যে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সিংগাপুর ইত্যাদি দেশ সফলতা পেয়েছে। আমাদের সরকার সেভাবেই ব্যবস্থা নিচ্ছেন । কিন্তু আতংকিত মানুষ এবং তাঁদের অযৌক্তিক কৌতূহল এখানে বড় বাঁধা। অযৌক্তিক কৌতূহল এই পর্যায়ে যে, করোনা আক্রান্ত আলাদা করা রোগী  দেখতে শত শত মানুষের ভিড় হচ্ছে। একজন মানুষ এই আতংকবোধ এবং অযৌক্তিক কৌতূহল নিজের সহজাত বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করেই দূর করতে পারে । কিন্তু, সেই চেষ্টা করা হচ্ছে না।

আমাদের বুঝতে হবে ভয়ংকর কোন বিষয়ের মোকাবেলা করতে  মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হয়। একজন আতংকিত মানুষের মাথা ঠাণ্ডা থাকে না । ফলে,  আতংকিত মানুষ কোন সমস্যার সমাধান করতে পারে না। চীনের করোনাভাইরাসের কথা প্রকাশ পায় ২০১৯ সালের  ৩১ ডিসেম্বর আজ থেকে ঠিক ৯১ দিন আগে । চীনের দ্রুতগতির উন্নতি যারা পছন্দ করেননি, তাঁরাই এ  বিষয়টি হাতী কাদায় পড়েছেহিসেবে গ্রহণ করেন। সে সময়ে এমনভাবে পরিকল্পিত উপায়ে করোনাভাইরাস নিয়ে প্রচারণা শুরু করা হয়,  যেন সবাই আতংকিত হয় এবং চীনের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে। তাঁদের সেই চেষ্টা সফলও হয়। সত্যিই অতিঅল্প সময়ে চীনের অর্থনীতিতে ধ্বস নামে । কিন্তু, তাঁরা কখনও ভাবেননি যে,  করোনা ভাইরাস তাঁদের নিজেদের দেশ আক্রমণ করবে। তাই কোন রকম প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন তাঁরা বোধ করেননি। সত্যিই যখন তাঁদের দেশ আক্রান্ত হয়, তখন নিজেদের ছড়ানো আতংকে তাঁরা নিজেরাই বেশী আতংকিত হয়ে পড়েন। সব লেজেগোবরে জড়িয়ে যায়। অথচ প্রথম দিকে আতংক সৃষ্টি না করে সবাইকে করোনা বিষয়ে  সচেতনতা সৃষ্টির কথা বলা হলে, বর্তমানের দৃশ্যপট ভিন্ন রকম হত। যাহোক, এসব কথা এখন বলে লাভ নেই । আতংকও এক ধরণের সংক্রামক ব্যাধি। বিশ্বায়নের এই যুগে প্রথম দিকের সেই ছড়ানো আতংকে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষও আক্রান্ত হয়। আতংকিত মানুষ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে বেশ কিছুটা সময় লাগে। আমরা বোধ হয় সেই  ক্রান্তিকালে আছি। এখন নিজেদের সামলে নেওয়া খুবই জরুরি। 
        একজন মানুষ দৈনন্দিন জীবনে লক্ষকোটি অদৃশ্য ভাইরাসের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকে। করোনা ভাইরাসও একটি ভাইরাস। তার শক্তি একটু বেশী। সেই বেশী শক্তির সাথে মোকাবেলা করতে কি ধরণের খাদ্য দরকার; কি পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে সবই  বিস্তারিত বলা হচ্ছে। এখন সংশ্লিষ্ট সকলের মাথা ঠাণ্ডা রাখা দরকার। ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য যে উপকরণের কথা বলা হচ্ছে; প্রয়োজনীয় যে কিটের কথা বলা হচ্ছে নিজেদের সক্ষমতায় কিভাবে তা নির্বাহ করা যায়- সরকারি, বেসরকারি, আন্তর্জাতিক  সকল পর্যায়ের সার্বিক সহযোগিতায় কিভাবে এই জাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলা করা যায় তা নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। তার আগে এই বিশ্বাস থাকা জরুরি যে, এ ধরণের দুর্যোগ মোকাবেলা মানুষই করতে পারে এবং আমরাই তা পারি।
            আর একটা বিষয় এখানে না বললেই নয়। পৃথিবীর কোন দেশ করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের গুলি করে মারছে; কোন দেশ বৃদ্ধদের বাদ দিয়ে শুধু অল্প বয়সীদের চিকিৎসা দিচ্ছে-এটা আমাদের বিষয় নয়। আমাদের সমাজে বয়স্কদের সম্মান করা হয়, রোগীদের সম্মান করা হয়- রোগী বহনকারী এ্যাম্বুলেন্সকে ভি.আই.পি মর্যাদা দেওয়া হয়।  এটা আমাদের নিজেদের ধর্ম এবং সংস্কৃতির অঙ্গ। সামান্য একটা ভাইরাস আমাদের এতদিনের লালিত ঐতিহ্য নষ্ট করুক এটাও কাম্য নয়। আমাদের মিডিয়া আমাদেরকে গুমরাহ করছে, আমাদের মধ্যে অনেকেই ব্যাপারটা বোঝতে পারছেনা, আমাদের সমাজের শিক্ষিত ব্যক্তিদের উচিত তাদের না বোঝা বিষয়গুলো তাদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করা। তাঁদেরকে আমরা যেন অসম্মান না করি; নিজেদের নিরাপদে রেখে, সকলের সম্মান বজায় রেখে আমরা যেন এই জাতীয় সমস্যা মোকাবেলা করি । 
        দেশের সমস্ত শহর এখন ফাঁকা। মেহনতি ও  শ্রমজীবী মানুষেরা এখন তাঁদের নিজ নিজ এলাকায় । মাঠ প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য এখন এটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে সংশ্লিষ্ট সকলকে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন। তবে, সরকারের  একার পক্ষে এই জাতীয় মহাদুর্যোগ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। আমাদের সকলকে যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী মেধা, অর্থ ও শ্রম দিয়ে এই দুর্যোগ মোকাবেলায় অংশ নিতে হবে। আমরা নিজেরা যদি এই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হই এবং এতে যদি মৃত্যুবরণও করি; আমরা যেন সত্যিকার ধার্মিক এবং মানুষ হিসাবে তা করি । কোন আতংকিত অর্থহীন জীবন নিয়ে আমরা যেন বিদায় না নিই ।

           মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের সহায় হউন।




রবিবার, ২৯ জুলাই, ২০১৮

মানুষের মন জয় করুন নিজের ব্যবহার দিয়ে


।।জাকারিয়া ইছলাম।।


        প্রত্যেকেই তার কাঙ্ক্ষিত বস্তু লাভের জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করে থাকে। সম্পদের জন্য যে লালায়িত সে তা অর্জনের নিমিত্তে ও সমৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন রকমের কলাকৌশল ব্যবহার করে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিভিন্ন পদ্ধতি আবিষ্কার করতে সর্বদা সচেষ্ট থাকে।



(ফটো গুগল ডটকম তেকে)


স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো দর্শকদের মন জয় করার জন্য আধুনিক বিভিন্ন প্রোগ্রাম ও নতুন নতুন অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে থাকে। অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ও সঞ্চালকদেরকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় যাতে তারা দর্শকদেরকে আকৃষ্ট করে তাদেরকে অনুষ্ঠান দেখতে আগ্রহী করতে পারেন। একই কথা প্রিন্টমিডিয়া ও বেতারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
অনুরূপভাবে পণ্য বা সেবার উৎপাদকের (প্রোডাক্ট প্রমোটারদের মাধ্যমে) ক্রেতাদের মন জয় করার জন্য কতরকমের পদ্ধতি অবলম্বন করে। যেসব কলাকৌশলের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি করা যায় সেসব কলাকৌশল জানতে এবং সেগুলোকে কাজে লাগাতে সবার মধ্যেই কমবেশি আগ্রহ দেখা যায়।
মানুষের মন বা হুদয় জয় করার অনেক পদ্ধতি ও কলাকৌশল রয়েছে। মনে করেন আপনি একটি সভায় উপস্থিত হলেন। সেখানে প্রায় চল্লিশজন মানুষ রয়েছেন। আপনি তাদের সঙ্গে হাত মেলাতে লাগলেন। প্রথমে একজনকে গুড মর্নিং বলে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। সে কোনরকম হাতের অংশবিশেষ এগিয়ে দিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল 'ধন্যবাদ'। আপনি দ্বিতীয়জনের কাছে গেলেন। সে পাশের একজনের সঙ্গে কথা বলছিল। আপনার গুড মর্নিং শুনে সে হতচকিত কণ্ঠে জবাব দিল এবং আপনার দিকে না তাকিয়েই হাত বাড়িয়ে দিল। তৃতীয়জন তার মোবাইল ফোনে কথা বলছিল। আপনি গুড মর্নিং বলায় সে হাত বাড়িয়ে দিল। কোন রকম হাত মিলিয়ে তবে সৌজন্যস্বরূপ কিছু বলল না, এমন কি আপনার প্রতি কোন আগ্রহ দেখালও না। আর চতুর্থজন আপনাকে আসতে দেখেই গুড মর্নিং বলে দাঁড়িয়ে গেল। চোখে চোখ পড়তেই হাসিমুখে আপনার সঙ্গে কথা বলল। তার হুদয়ের গভীর থেকে আপনার আবেগ প্রকাশ করে আপনার সাথে হাত মেলাল। আপনার সঙ্গে সাক্ষাত করতে পেরে সে বেশ আনন্দিত হয়েছে অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে এটা প্রকাশ করলো। অথচ আপনিও তাকে চেনেন না, আর সেও আপনাকে চেনে না।
এভাবেই আপনি সকলের সাথে গুড মর্নিং বলে হাত মিলিয়ে পরিচয়ের পর্ব শেষ করলেন। এখন বলেন তো, এই চারজন লোকের মধ্যে কার প্রতি আপনার আকর্ষণ সৃষ্টি হবে?
         নিশ্চিত চতুর্থ লোকটির প্রতি আপনি অন্য রকম আকর্ষণবোধ করবেন। অথচ আপনি তাকে চেনেন না। তার নামও জানেন না, সে কোথায় কাজ করে, কী তার পেশা কিছুই জানেন না। তা সত্ত্বেও সে আপনার হুদয়রাজ্য জয় করে ফেলেছে। আর এটা সে কোন টাকা পয়সা কিংবা বড় কোন পদের ক্ষমতার দাপটে করে নি। করে নি বংশমর্যাদার বলে। সে আপনার হুদয়রাজ্য জয় করেছে কেবল কৌশলী আচরণের মাধ্যমে।
এতে প্রতীয়মান হলো, শক্তি, সম্পদ, সৌন্দর্য ও পেশার বড়ত্ব দিয়ে মানুষের হুদয়ে জয় করা যায় না। বস্তুতঃ মানুষের হুদয় এর চেয়েও অনেক সহজে জয় করা যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও খুব কম মানুষ অন্যের হুদয় জয় করতে পারে। আমার মনে আছে, আমি যখন কলেজে পড়তাম তখন আমার সাথে একটা ছেলে পড়ত(সে আমার বন্ধু ছিলো) সে একবার মারাত্মক মানসিক রোগাক্রান্ত ছিল। তার পিতা আমার কলেজের  একজন প্রফেসার ছিলেন। তার বাবার সাথে আমার খুব ভালো রিলেশন ছিলো। আমি অনেক সময় আমার বন্ধুকে সাহায্য করেছি। আমি মাঝে মাঝে তাদের বাড়িতে বেড়াতে যেতাম। তাদের বাড়িটি দেখতে ছিল রাজপ্রসাদের মতো। তার পিতার বৈঠকখানায় সবসময় অতিথিদের এতো ভিড় তাকত যে, সামান্য ফাঁকা জায়গাও থাকত না। তার প্রতি মানুষের এতো ভালবাসা ও আগ্রহ দেখে আমি খুব অবাক হতাম।
অনেক বছর পর। একদিন আমি তাদের বাড়িতে গেলাম। তখন তিনি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন।
আমি তার সে বৈঠকখানায় প্রবেশ করলাম। কামরাটির দিকে তাকালাম। কামরাটির বর্তমান অবস্থা দেখে আমি আশ্চর্য হলাম। সেখানে পঞ্চাশটির অধিক চেয়ার পড়ে আছে। কিন্তু কামরায় কেউ নেই। একজন বুয়া তাকে চা-কফি দিয়ে যাচ্ছে। আমি সেখানে তার সঙ্গে কিছুক্ষণ বসলাম। বের হওয়ার পর ভাবতে লাগলাম, তিনি যখন চাকুরিতে ছিলেন তখন তার কেমন অবস্থা ছিল আর বর্তমানে তার অবস্থা কী? আগে কেন মানুষ তার কাছে আসত? কেন তারা তাকে ভালবাসত? এখন তাকে কেন সেরূপ ভালবাসে না? কেন তার বৈঠকখানায় আগের মতো ভিড় নেই?
আমি বুঝতে পারলাম,  তাই তিনি সদাচরণ এবং অমায়িক ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের হুদয়-রাজ্যকে জয় করতে পারেন নি। মানুষ তারকাছে আসতো তার পদমর্যাদার কারণে, তার চাকরির ক্ষমতা ও প্রভাবের কারণে। ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক গুণের কারণে নয়। আজ যেহেতু তার চাকরি নেই তাই তার সে ক্ষমতাও নেই। তাই আগের মতো উপচে পড়া সে ভিড়ও নেই।
আপনি মানুষের সাথে এমন ভাবে কথা বলেন, যেন তারা ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে ভালবাসে। তারা যেন আপনার কথা, আপনার হাসি, আপনার বিনম্র আচরণে মুগ্ধ হয়ে আপনাকে ভালবাসে। তারা যেন আপনাকে ভালবাসে। অন্যের দোষ দেখেও তা পাশকেটে যাওয়ার মহৎ গুণের কারণে এবং অন্যের বিপদে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দেয়ার মানসিকতার জন্য। তাদের আন্তরিকতা ও ভালবাসা যেন আপনার পদমর্যাদা ও অর্থের কারণে না হয়; বরং তা যেন হয় আপনার প্রতি তাদের হুদয়ের ভালবাসার কারণে। যে ব্যক্তি তার স্ত্রী-সন্তানকে অর্থ-সম্পদ, খাবার-দাবারসহ সব চাহিদা পূরণ করে, সে হয়তো তাদের উদর-তুষ্টি লাভ করতে পারে কিন্তু তাদের হুদয়ের ভালবাসা লাভ করতে পারে না।যে তা সন্তানকে পর্যাপ্ত পরিমাণে অর্থ দেয়, কিন্তু তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে, সে তাদেরকে আর্থিকভাবে খুশি করতে পারলেও তাদের মনের রাজ্যে প্রবেশ করতে পারে না।
যদি আপনি দেখেন, বিপদে পড়ে কোন যুবক তার বন্ধু বা তার পরিচিত কোন ব্যক্তির শরণাপন্ন হয়েছে কিন্তু নিজের বাবাকে জানায় নি তাহলে এতে আশ্চর্য হবেন না। কারণ, তার বাবা তার হৃদয়কে জয় করতে পারে নি, ভাঙতে পারেনি তার ও সন্তানের মাঝে বিদ্যমান অদৃশ্য দেয়াল। অথচ তার বন্ধু কিংবা পরিচিত কেও তার হুদয়রাজ্য অবলীলায় জয় করে ফেলেছে। অনেক সময় মারাত্মক দুশমনও হুদয় জয় করে ফেলতে পারে। তবে এর জন্য দরকার হৃদয়কাড়া আচরণগত দক্ষতা আর মানুষ কে আপন করে নেয়ার সুন্দর কৌশল।
আরেকটি বিষয় ভেবে দেখুন। কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে আপনি হয়তো লক্ষ্য করেছেন, তারা যখন কোন সভায়/মিটিঙে উপস্থিত হয়ে বসার জন্য জায়গা খুঁজতে থাকে তখন উপস্থিত লোকদের মাঝে একধরণের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। সবাই তাকে ডাকতে তাকে, সবাই তাকে নিজের পাশে বসতে অনুরোধ করে। বলেন তো এমনটি কেন হয়? কেন তার প্রতি সকলের এতো আগ্রহ! কেন সবাই তার পাশে বসতে চায়? কেউ একজন আপনাকে হয়তো রাত্রের খাবার জন্য ডিনারের ইনভাইট করল কোন এক রেস্টুরেন্টে। রেস্টুরেন্টের নিয়ম হল, প্রত্যেকে নিজ চাহিদা মতো ডিশ থেকে নিজ নিজ প্লেটে খাবার নিয়ে নেবে। তার পর কোন একটা গোল টেবিলে বসে খাবে। সেখানে আপনি হয়তো দেখে থাকবেন যে, কেউ নিজের প্লেট পূর্ণ করার আগেই অনেকে তাকে ইশারা করে বলতে থাকে, ‘এই যে এখানে ফাঁকা জায়গা আছে, এখানে বসুন। প্রত্যেকেই চায় সে তার সঙ্গে বসুক।
কিন্তু ঠিক সেখানে অন্য একজন তার প্লেট পূর্ণ করে এদিকে সেদিকে তাকাচ্ছে অথচ কেউ তাকে ডাকছে না। কেউ তার প্রতি কোন ভ্রূক্ষেপ করছে না। সে একাকী কোন একটি টেবিলে গিয়ে বসে খেয়ে নিচ্ছে।
প্রথমজনের প্রতি মানুষের এতো আগ্রহ, অথচ দ্বিতীয়জনের প্রতি কোন আগ্রহ নেই। এর কারণ কী? কিছু মানুষ এমনও আছেন যে, তারা যেখানেই থাকুক না কেন, তাদের প্রতি অন্যদের মনের টান অনুভূতি হতে থাকে। যেন তাদের হাতে বিশেষ চুম্বক আছে, যেটি দিয়ে দূর থেকেও তারা অন্যদের হৃদয়-মন আকর্ষণ করে থাকে। এরা কিভাবে অন্যদের হুদয় জয় করলেন? বস্তুত এটা হল বুদ্ধিবৃত্তিক এমন কিছু কলাকৌশল যার মাধ্যমে একজন মানুষ অন্য মানুষের হৃদয়কে জয় করতে পারে। করতে পারে মানুষের ভালবাসা অর্জন।

শেষ কথা
অন্যের হৃদয় জয় করার এবং তাদের ভালবাসা অর্জনের ক্ষমতা আমাদের জীবনকে করতে পারে আরো সুখময়, প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য।