“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬

ক্ষমার আলো : রাজকুমারী মালতী

।।মাসকুরা বেগম।।

 

( এই কিচ্ছাটি ছোটবেলা আমার দিদি তাহিয়া আমাকে শুনায়। এটা আমার হৃদয়কে এতো স্পর্শ করে যে বার বার শুনার জন্য দিদিকে বায়না করতাম। সেই ছোট্ট বেলায় শুনে মনের গভীরে দাগ কাটা কিচ্ছা আজ নিজে সাজিয়ে প্রকাশিত করার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস!)

     অনেক কাল আগের কথা। এক দেশে ছিলেন এক সহজ-সরল রাজা। তাঁর ছিল দুই রানি।

     বড় রানি ছিলেন রূপে-গুণে অনন্যা। তিনি যেমন সুন্দরী ছিলেন, তেমনই ছিলেন দয়ালু। দাস-দাসী থেকে গরিব-দুঃখী প্রজা—সকলের কাছেই তিনি ছিলেন "রানি মা’। তাঁর কন্যা রাজকুমারী মালতীও ছিল মায়ের মতোই। রূপে-গুণে সে ছিল অতুলনীয়া।

     ছোট রানি দেখতে তেমন সুন্দরী ছিলেন না, মনটাও ছিল বিষে ভরা। প্রজারা তাই তাঁকে ভালোবাসত না। তাঁর মেয়ে চন্দনাও ছিল মায়ের মতোই—কালো, আর অন্ধ মাতৃভক্ত। ভালো-মন্দ বিচার না করেই সে মায়ের সব কথায় "হ্যাঁ’ বলত।

     প্রজাদের মুখে মুখে সবসময় "বড় রানি মা! বড় রানি মা!’, "রাজকুমারী মালতী! মালতী!"—এই কথা শুনে ছোট রানির বুক জ্বলে যেত। মনে মনে ভাবত, "এত আদিখ্যেতা কেন? নিশ্চয়ই বড় রানি যাদু-টোনা জানে। একদিন আমাদের তাড়িয়ে দিয়ে নিজের মেয়েকে সিংহাসনে বসাবে।’

    এইসব কুচিন্তা সে ঢেলে দিত মেয়ে চন্দনার কানে।

     ছোট রানি হঠাৎ বদলে গেল। বড় রানির সাথে খুব ভাব জমাতে লাগল। প্রথমে বড় রানি অবাক হলেও পরে ভাবলেন, "হয়তো ছোট বুঝতে পেরেছে, আমি ওদের কত ভালোবাসি।’

     রাজাও খুশি। ভাবলেন, দুই রানি মিলেমিশে আছে—এর চেয়ে সুখের আর কী আছে!

    রাজা একবার রাজ্যের বাইরে গেলেন। সেই সুযোগে ছোটরানি বড়রানির চুলে তেল মালিশ করার ছলে যাদুকরের দেওয়া এক বিষাক্ত তেল লাগিয়ে দিল। সাথে সাথেই বড় রানি কাতরাতে কাতরাতে কুমির হয়ে পুকুরের জলে মিলিয়ে গেলেন।

    মালতী পাঠশালা থেকে ফিরে মাকে না পেয়ে কেঁদে অস্থির। ছোট রানি বলল, "জানি না, দেখো গিয়ে।’

    ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর মালতী পুকুর ঘাটে বসে কাঁদছিল। হঠাৎ একটি কুমির উঠে এল। মায়ের গলা শুনে মালতী চমকে উঠল। কুমিরই ছিল তার মা। মা বললেন, "আমি প্রতিদিন তোকে একটি করে ডিম দেব। ওটা খেলেই তোর পেট ভরবে। সাবধানে থাকিস মা।’

    ছোট রানি দেখল মালতী না খেয়েও দিব্যি বেঁচে আছে। চন্দনাকে লাগিয়ে দিল মালতীর পিছনে। চন্দনা দেখল, কুমির মালটিকে ডিম খাওয়ায়। সে বাড়ি এসে মাকে সব বলে দিল।

     ছোট রানি রাজাকে বলল, "মহারাজ, পুকুরে কুমির হয়েছে। ওটাকে নদীতে ফেলে দিন।’ কুমিরকে নদীতে ফেলে দেওয়া হল।

     এরপর মালতী নদীর পাড়ে ছাগল চরাতে যেত। কুমির-মা সেখানেও এসে তাকে ডিম খাওয়াত। চন্দনা আবার পিছু নিল। একদিন ভুলিয়ে-ভালিয়ে মালতীর কাছ থেকে সব কথা জেনে মাকে বলে দিল। ছোট রানি রাজাকে দিয়ে কুমিরটাকে মেরে ফেলার হুকুম করাল।

      অসহায় মালতী জঙ্গলে চলে গেল। সেখানে এক ফলের বাগান পেল। ক্ষুধা মিটিয়ে বেঁচে রইল। চন্দনা আবার খবর দিল। ছোট রানি সেই বাগানও কাটিয়ে দিল।

       একদিন শিকার করতে এসে অন্য রাজ্যের রাজকুমার জঙ্গলে ঘুমন্ত মালতীকে দেখতে পেলেন। মালতীর করুণ কাহিনি শুনে রাজকুমার তাকে নিজের রাজপ্রাসাদে নিয়ে গেলেন এবং বিয়ে করলেন। মালতী হয়ে উঠল যুবরানি।

     বছর ঘুরল। একদিন রাজপ্রাসাদের দরজায় দুই ভিখারিনী এল—ছোট রানি আর চন্দনা। রাজা মারা গেছেন। মন্ত্রীর ষড়যন্ত্রে তারা রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়েছে।

      মালতী তাদের চিনতে পেরে কাছে ডাকল। মালতীর পা জড়িয়ে ধরে তারা কাঁদতে লাগল, "আমাদের ক্ষমা করে দাও মালতী।’

          মালতী তাদের বুকে জড়িয়ে ধরল। বলল, "অতীত ভুলে যাও।’ পেট ভরে খাওয়াল, নতুন কাপড় দিল, আর সম্মানের সাথে বিদায় দিল।

 

 * নীতিকথা *

হিংসা মানুষকে কোথায় নামায়, আর ক্ষমা মানুষকে কোথায় তোলে—"চন্দনা ও মালতী’ গল্পটা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।



সোমবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

জন্মদাগ

  ।। শৈলেন দাস ।।
 তৃষা আর আমি একই ক্লাস্টারে চাকরি করি। স্কুল আলাদা হলেও দুজনেরই বাড়ি শিলচর হওয়ায় স্কুলে আসা যাওয়ার সময় আমাদের দেখা হয়ে যায় প্রায়ই। অন্নপূর্ণা ঘাটের নতুন সেতু পেরিয়ে স্কুলে যাওয়ার সময় আমি মোটরসাইকেল নিয়ে ওর অটো বা ইরিক্সাকে ওভারটেক করছি, এমন সময় প্রায়ই চোখাচোখি হয় আমাদের। এক্ষেত্রে আমার কোন বিশেষ আগ্রহ বা তৃষার সিক্সথ সেন্স কাজ করে কিনা তা আমি বুঝে উঠতে পারিনা। তবে কেন জানি আমি টের পেয়ে যাই যে আমার সামনের অটোতে তৃষা রয়েছে এবং সম্ভবত তৃষার ক্ষেত্রেও তাই হয় নয়তো এমন সংযোগ ঘটে কি করে! এক ক্লাস্টার মিটিংয়ে তৃষার সাথে আমার প্রথম দেখা হয় সেন্টার স্কুলে। বাম হাতে গোলাপী রঙের ছাতা এবং হালকা নীল রঙের শিপনের শাড়ির সাথে ম্যাচিং করা ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে মুখে হাসি হাসি ভাব এনে এগিয়ে আসছিল সে মেইন গেট পেরিয়ে। আমি সবে মাত্র নিজের বাইকটিকে স্ট্যান্ড করেছি। বড় বড় চোখ আর জোড়া ভ্রু সাথে কোমর পর্যন্ত বিন্যস্ত চুলে এত মায়াময় লাগছিল যে আমি পলক ফেলতে পারছিলামনা। পরবর্তীতে বহুবার আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে এবং সহজ বন্ধুত্বের সম্পর্কও গড়ে উঠে এরই মধ্যে। ক্লাস্টার মিটিং বা সহকর্মী কারোর বাড়ির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা হলে কথা হতো, হাসি ঠাট্টাও হতো। এইটুকুই, ব্যস। এর বাইরে অন্যকোন ভাবনা কাজ করেনি আমার মধ্যে। তবে কৌতূহল একটা ছিল। তৃষার নাভির বাঁ পাশে কিছুটা দূরে সব সময় একটি রুমাল গুঁজা থাকত অথবা শাড়ির আঁচল পেঁচিয়ে রাখা হত সেখানে। কাউকে জিজ্ঞেস করব সেকথা তেমন সাহস যুগিয়ে উঠতে পারিনি আমি, পাছে সবাই মন্দ ভাবে। সেদিন ছিল একাডেমিক ক্যালেন্ডারের শেষ ক্লাস্টার মিটিং। মিটিংয়ের সময় পরিবর্তন হয়েছে, সি আর সি সি সাহেবের দেওয়া এই বার্তাটি আমি এবং তৃষা দুইজনেই খেয়াল করিনি। তাই পূর্ব নির্ধারিত সময়েই পৌঁছে যাই আমরা। যদিও তৃষা এসেছে মিনিট দশেক পরে। সামান্য কিছু কথাবার্তা হল আমাদের। এর মধ্যে তৃষা কি যেন মনে করে উঠে দাঁড়ালো 'সবাই আসতে যেহেতু বাকি আছে তাই আজকের মিটিং এর বিষয়টি আমি বোর্ডে লিখে নিই।' বলেই একটু হাসল। এই হাসিটা আমার কাছে রহস্যময় মনে হল যেন। বোর্ডের দিকে এগিয়ে যেতেই আমাকে অবাক করে নাভির কাছ থেকে রুমালটি খুলে নিল। টেবিল থেকে চক ডাস্টার নেওয়ার আছিলায় রুমালটি রেখে দিল সেখানে। আশ্চর্য, শাড়ির আঁচলটিও আজ পেছায় নি কোমরে। আমি বিস্ময় নিয়ে যখন সাত পাঁচ ভাবছি তখন আমার সব কৌতূহলের অবসান ঘটিয়ে সে ঘুরে দাঁড়ালো আমার দিকে। শঙ্খের আদলে একখানা হালকা কালো রঙের দাগ উঁকি দিয়ে আছে তৃষার নাভির পাশে। কয়েক কদম এগিয়ে এসে সে অনেকটা নার্ভাস হয়ে বলল 'এটা আমার জন্মদাগ, আমার আত্মীয় বা প্রিয়জন ছাড়া সাধারণত কেউ জানে না এটির কথা। আজ তোমাকে মানে আপনি, আই মিন তুমি জানলে।' তৃষার কথাগুলি আমার মনে যে অনুভূতির সৃষ্টি করেছে তার চেয়েও বেশি মুগ্ধ করেছে ওর চোখের ভাষা। যেন প্রাচীন সরোবরের স্নিগ্ধ ছায়ায় হারিয়ে যাওয়ার আকুল প্রার্থনা। আমি বিষ্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠার আগেই সিআরসিসি সাহেবের গলা 'তোমাদের শেষ?' 'আমাদের শেষ মানে! আমাদের কি শেষ? আমি ততমত খেয়ে প্রশ্ন করতেই উনি হেসে বললেন - তৃষা তোমাকে ভালোবাসে। সেকথা বলার কোন সুযোগ পাচ্ছিল না। তাই আজ ইচ্ছে করেই মিটিং এর সময় পরিবর্তন করেছি তোমাদের না জানিয়ে। লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া তৃষার মুখ থেকে চোখ নামিয়ে আমি কিছু বলতে যাব এমনিই অন্যান্য কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকা দরজায় হাজির। তাই প্রসঙ্গ বদল করে নিলাম আমরা। এই ফাঁকে তৃষাও কাউকে বুঝতে না দিয়ে নিজেকে গুছিয়ে নিল সন্তর্পনে। মিটিং এর পর সেদিন আর কোন কথা হয়নি আমাদের। আমি তাড়াতাড়ি মিটিং থেকে বের হয়ে এসেছিলাম। জানিনা তৃষা বা সিআরসিসি সাহেব ব্যাপারটা কিভাবে নিয়েছেন। বাইক চালাতে চালাতে ভাবছি তৃষার কথা আর তার জন্মদাগের কথা। মনের মিলন হলে সামান্য এই জন্মদাগ কোন প্রতিবন্ধকতা হতে পারে না প্রেম পরিণয়ের ক্ষেত্রে। এত রূপ সৌন্দর্য থাকা সত্বেও সম্পর্কের শুরুতে এই বিষয়টিকে আমার নজরে এনেছে মানে এটাকে সে তার দুর্বলতা ভাবে। কিন্তু আমার দুর্বলতা অন্য জায়গায়। সংকীর্ণ সমাজ ব্যবস্থা জন্মের মত যে অদৃশ্য দাগ কেটে রেখেছে আমাদের মধ্যে তা আমি মুছি কি করে? পারিবারিক রক্ষণশীলতার বাইরে গিয়ে তৃষাকে আপন করে নিতে হলে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে আমাকে। বর্তমান সময়ে স্বনির্ভর একজন যুবক হিসাবে ইচ্ছে করলে অনায়াসেই এই সামাজিক কুসংস্কারকে আমি তুরি মেরে উড়িয়ে দিতে পারি। কিন্তু ঋতিকা, তাকে আমি এড়াই কি করে? ঋতিকার কথা মনে পড়তেই ভাবনার সাথে সাথে আমার বাইকের গতিও থেমে গেল। কল আসছে মোবাইলে। ফোন কানে লাগাতেই ওপাশ থেকে মা বলছেন 'অনীক, তোর মনে আছে তো আজ ঋতিকাকে দেখতে যাওয়ার কথা? তাড়াতাড়ি আয়, তোর বাবা পঞ্জিকা দেখে শুভ সময় ঠিক করেছেন। দেরী হলে ক্ষ্যাপে যাবেন কিন্তু।' বলেই ফোন কেটে দিলেন। অনেক খোঁজাখুঁজি করে কুষ্টি, গোত্র আরও কি কি মিলার পর সমন্ধ ঠিক হয়েছে আমাদের। আনওফিসিয়ালি দেখাও হয়েছে দুবার। এমন এক সন্ধিক্ষণে কি সিদ্ধান্ত নেব আমি? কে দেবে আমাকে পরামর্শ? আজ আমার প্রচুর মনোবল দরকার। বাইক স্টার্ট দিয়ে ধীরে ধীরে এগুচ্ছি, সামনেই খোলা প্রান্তর। দুধপাতিলের সোনালী শাইল ধান ক্ষেতের উপর হঠাৎ এক খন্ড মেঘের ছায়া দেখে বেশ রোমাঞ্চিত হলাম আমি। এ যেন তৃষার সেই জন্মদাগ। নিজের অজান্তেই মোটরসাইকেলের এক্সিলেটর দাবিয়ে গান ধরলাম - মে আ রাহা হু বাওয়পস। মেরা ইন্তেজার করনা, তুঝে সামনে বিঠাকে তুজসে হি প্যার করনা।

সোমবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৩

জলাভূমি

 ।। শৈলেন দাস ।।

।।শৈলেন দাস।।

শহরের শরীর ক্রমশ: বেড়ে চলেছে। নতুন নতুন এলাকা যুক্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তার উপর সরকার পৌরসভাকে পৌরনিগমে উন্নীত করার অধিসূচনা জারি করায় শহরের লাগোয়া একপশলা জমিও এখন শহরের অন্তর্ভুক্ত। এমতাবস্থায় একসময়ের শহরতলী দুর্গাবিল এখন শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে। শ্রমজীবী প্রান্তিক মানুষের বসতবাড়ি যেন 'গোল্ড ফিল্ড' সদৃশ। তাই এখানকার বাসিন্দাদের জমির পাট্টা দেওয়ার জন্য সরকারি প্রক্রিয়া অনেকদূর এগিয়েও বাতিল হয়ে গিয়েছে। সতীশ লক্ষ করেছে দুর্গাবিলের প্রান্তিক মানুষের সাথে ক্ষমতাবানদের নিষ্ঠুর আচরণ, রাজনীতিবিদদের ইকোফ্রেন্ডলি চক্রান্ত এবং ভদ্রজনদের চিরাচরিত অবজ্ঞার সাথে নতুন সংযোজন অমানবিক অপপ্রচার। মানুষের ভুল এবং গাফিলতির ফলে বাঁধ ভাঙ্গা উচ্ছ্বাসে বন্যার জল যখন ঘরের চালের উপর দিয়ে যাচ্ছিল তখনও এক শ্রেণীর মানুষ বলতে থাকেন এর কারণও নাকি ঐ দুর্গাবিলের জবর দখল।

 

কয়েকদিন আগে স্থানীয় পত্রিকায় একটি সংবাদ বেরিয়েছিল - শহরে বহু কোটি টাকা ব্যয়ে বিনোদন পার্ক তৈরি হবে, এর জন্য জমিও নাকি চিহ্নিত হয়ে গেছে। সামান্য কিছু প্রতিবন্ধকতার জন্য জায়গাটির নাম উল্লেখ করা হয়নি। আজ দুর্গাবিলের যতীন এবং অন্য আরও কয়েকজন সতীশের ভাড়া বাড়িতে এসেছে। হাতে সবার সরকারি নোটিশ। যতীনরা যেন নিজের থেকেই দুর্গাবিলকে জবরদখল মুক্ত করে সরে যায় অন্যথায় সরকার বাধ্য হয়ে উচ্ছেদ অভিযান চালাবে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বুলডোজার চালিয়ে উচ্ছেদ অভিযানের খবর প্রতিদিনই আসছে। সতীশের আশঙ্কা ছিল একদিন তার প্রয়োগ দুর্গাবিলেও হতে পারে কিন্তু তা যে এত তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে সে ধারণা তার ছিল না। যতীন বলল - এই মুহূর্তে আমরা কি করব? কার কাছে যাব? পনের দিন পর যে মাথার উপর আর ছাদ থাকবে না। সতীশ তাদের কি সান্ত্বনা দেবে বুঝে উঠতে পারছে না। বলল - তোমরা বাড়ি যাও এবং নিজেরা সংগঠিত হও। আমি দেখি কতদূর কি করা যায়। সবাইকে এক থাকতে হবে কিন্তু।

সেদিন যতীনরা চলে যাওয়ার পরেই সতীশ কাজে নেমে পড়ল। তাদের দেওয়া নোটিশ এর সূত্র ধরে খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে গভীর চক্রান্তের হদিস পেল সে। শহরের একাংশ ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, ভুমাফিয়ারা সম্মিলিতভাবে ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেছে দুর্গাবিলের প্রান্তিক মানুষগুলোকে উচ্ছেদ করার। সেখানে অত্যাধুনিক বিনোদন পার্ক তৈরি করে নিজেদের অংশীদারিত্ব অনুযায়ী মুনাফা লুটার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করতে যেকোনো পন্থা অবলম্বন করবে তারা। সরকারি অফিস এবং সংবাদ জগতের ভেতরের খবর যারা জানে তাদের কয়েকজনের সাথে নিজের সুসম্পর্কের দরুন সতীশ এমন কিছু তথ্য জোগাড় করতে সক্ষম হল যা থেকে এটা স্পষ্ট যে দুর্গাবিলের মানুষগুলি শয়তানদের কুনজরে পড়েছে। আসন্ন বিপদ থেকে এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোকে বাঁচানো তার দ্বারা সম্ভব হবে না। এই অসম লড়াইয়ে চাই এমন একজন যোদ্ধা যে প্রান্তিক মানুষের আর্তনাদ শুনলে অস্থির হয়ে উঠবে এবং রুখে দাঁড়াবে সর্বশক্তি দিয়ে। যাকে দেখলে বধ্যভূমিতেও পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠবে প্রান্তিক মানুষের মনোবল।

 

সংসদীয় নির্বাচন আসন্ন। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল নিজেদের জয় ধরে রাখতে বিভিন্ন কার্যসূচি হাতে নিয়েছে তাই ফুরসত নেই দলীয় নেতাদের। ঘণ্টা খানেক অপেক্ষার পর সতীশের ডাক পড়েছে ভিতরে যাওয়ার। বসার ঘরে এখনও জনাকয়েক মানুষ রয়ে গেছে। একজন ভেতরের দরজা দিয়ে সতীশকে উপরে চলে যেতে ইঙ্গিত করল। উপরে উঠেই সতীশ দেখল ড্রইং রুমের সোফায় আরাম করে বসে আছে হরিভানু কৌস্তভ, সোশ্যাল মিডিয়ায় সতীশের সাথে সোসিও পলিটিক্যাল ইস্যুতে যার তর্ক বিতর্ক চলে প্রায়ই। এমতাবস্থায় সে যখন চলে আসবে কিনা ভাবছিল ঠিক তখনই ভিতরের রুম থেকে বেরিয়ে আসল সৌম্য দর্শন সুবাহু যুবক দিব্যাংশু। 'সতীশদা হরিভানুকে নিয়ে কোন সংকোচ নেই। ভিতরে এস, ও আমাদেরই লোক' বলেই নিজের চেয়ারে বসল সে। সতীশ সামান্য কুশল বিনিময় করে সংক্ষেপে তুলে ধরল দুর্গাবিলের যতীনদের কথা। দিব্য বলল 'আমি কি করতে পারি তাতে?' 'মানে?' পাল্টা প্রশ্ন করল সতীশ। 'স্বার্থান্বেষী কিছু ক্ষমতাবান লোক আমাদের মানুষগুলিকে সমূলে উপড়ে ফেলবে আর আমরা চুপ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকব? প্রতিরোধ গড়ে তুলব না? সতীশকে উত্তেজিত হতে দেখে জলের গ্লাস এগিয়ে দিল দিব্য। শান্ত স্বরে বলল 'ইন্টারনেটে বিদ্রোহের ইতিহাস ঘাটাঘাটি করে তুমি আবেগিক হয়ে গেছ সতীশদা, তাই এরকম বলছ। ভেবে দেখ একবার, সামান্য কয়েকটি পরিবারের জন্য শহর উন্নয়নের এত বড় মেগা প্রকল্পে আমি বাগড়া দেই কি করে? পার্টি আমাকে মোর্চার দায়িত্ব দিয়েছে, তা সামলাব না এইসব ঝামেলায় জড়াব?' হরিভানু বলল 'এবার আমাদের সংসদীয় আসনটি সংরক্ষিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মোর্চার দায়িত্ব ভালভাবে সামলালে পার্টি দিব্যকে প্রার্থী করতে পারে। এ কথাটা মাথায় রাখতে হবে আমাদের।' গ্লাসটা টেবিলে রেখেই উঠে পড়ল সতীশ। ক্রুদ্ধ স্বরে হরিভানুকে লক্ষ্য করে বলল 'ভাই, আনুগত্য আমাদের ধাতে নেই। আমাদের ইতিহাস বিদ্রোহের ইতিহাস।' দিব্যকে বলল - সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী হওয়ার বাসনা পোষণ করছ মনে অথচ যাদের নামে এই আসন সংরক্ষিত হবে তাদের আর্তনাদে তোমার হৃদয় কেঁপে উঠবে না না? চলি ভাই। বলেই বেরিয়ে পড়ল সে। পেছন ফিরে দেখল না আর দিব্যর দিকে।

 

দুর্গাবিলের তিন দিক থেকে বুলডোজার ঢুকে উপড়ে ফেলছে প্রান্তিক মানুষের বাড়িঘর। সেখানে উপস্থিত হয়ে সতীশ কর্তৃপক্ষকে বোঝানোর চেষ্টা করছে "পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে এভাবে প্রান্তিক মানুষের বসতবাড়ি ভেঙ্গে ফেলা অন্যায়। এখানে বসবাস করার জন্য ল্যান্ড এডভাইসারি কমিটির অনুমোদন রয়েছে তাদের।' কাগজপত্র দেখিয়েও কোন লাভ হয়নি। কর্তৃপক্ষ বলছে এসব নাকি ভুয়ো। সরকারি রেকর্ডে এটা শুধুই এক জলাভূমি, যা আজ খালি করাতে হবে যে কোন মূল্যে। নিজেকে বড় অসহায় মনে হচ্ছে সতীশের। দিব্যাংশুকে বারবার ফোন করেও পাওয়া যাচ্ছে না। মোবাইল সুইচ অফ রয়েছে তার। ব্যক্তিগত অসুবিধার কারণে বুলডোজারের সামনে গিয়ে পথ আগলে দাঁড়াতে পারছে না সে নিজেও। শ পাঁচেক অসহায় নারী পুরুষ অপেক্ষায় প্রহর গুনছে বাস্তুচ্যুত হওয়ার। ঠিক এমন সময় দুর্গাবিলের দক্ষিণ দিক থেকে মাইকের আওয়াজ ভেসে আসছে 'জয় ভীম, জয় ভারত'। সতীশ বুঝতে পেরেছে এটা দিব্যরই কাজ। নিজের অজান্তেই তার ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠলো। 'জয় ভীম, জয় ভীম' বলে চিৎকার করতে থাকলো কর্তৃপক্ষের সামনে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যতীনকে বলল - 'আর প্রতিবাদ করে কাজ হবে না দাদা, সবাইকে নিয়ে প্রতিরোধে নেমে পড়ো। দিব্য আসছে।' মুহূর্তের মধ্যে 'জয় ভীম' ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল দুর্গাবিল। নারী-পুরুষ সবাই একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ল বুলডোজারের উপর, শুরু হল পুলিশ জনতা খণ্ড যুদ্ধ।

 

শতাধিক মানুষকে সঙ্গে নিয়ে মিছিল করে দুর্গাবিলের দিকে এগিয়ে আসছে দিব্যাংশু। মাইকযোগে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরছে সতীশের জোগাড় করা তথ্যগুলি। কুচক্রী জনপ্রতিনিধি এবং ভূমাফিয়াদের নাম উল্লেখ করে ধিক্কার সূচক বক্তব্য রাখছে সে এবং পার্শ্ববর্তী জনগণের প্রতি আবেদন রাখছে এই ঘৃণ্য চক্রান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে। এদিকে পূর্ব নির্ধারিত সূচী অনুযায়ী আজই মোর্চার প্রতিটি মণ্ডলের মিটিং চলছিল। গুগল মিট এর মাধ্যমে মোর্চার জেলা প্রধান হিসাবে কথা ছিল দিব্য মত বিনিময় করবে তাদের সাথে। হরিভানু নিজের মোবাইল দিয়ে সেই মিটিংয়ে সম্প্রচার করে দিয়েছে দিব্যোর এই প্রতিবাদী কার্যসূচি। কয়েকটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের সাংবাদিকদের পাশাপাশি দিব্যর কিছু ছেলেরাও দুর্গাবিলের উচ্ছেদ অভিযানের মর্মান্তিক দৃশ্য লাইভ টেলিকাস্ট করছে বিভিন্ন সোশ্যাল মাধ্যম নেটওয়ার্কে। এসবই দিব্যর মস্তিষ্ক প্রসূত।

দিব্যাংশুর আবেদনে কাজ হয়েছে। ধীরে ধীরে প্রতিবাদে সামিল হচ্ছে মানুষ। গোটা উপত্যকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে দুর্গাবিলের অসহায় জনগণের আর্তনাদ পৌঁছে গেছে সর্বত্র। উপত্যকার হাওর এবং প্রান্তিক অঞ্চলগুলি থেকে শ'য়ে শ'য়ে জনতা গাড়ি করে শহর অভিমুখে রওয়ানা হওয়ার ভিডিও আসছে ঘন ঘন। অল্প সময়ের মধ্যেই 'জয় ভীম, জয় ভারত' স্লোগান সম্বলিত পোষ্টে ছেয়ে গেছে সোশ্যাল মিডিয়ার দেয়ালগুলি। এদিকে সতীশকে পুলিশের লাঠির আঘাত থেকে বাঁচাতে গাড়ি থেকে লাফিয়ে পরল দিব্যাংশু। বাহুবলে ছুড়ে ফেলল কয়েকজন পুলিশ কর্মীকে। দিব্যাংশুকে নিজেদের মধ্যে পেয়ে দুর্গাবিলের পীড়িতরা উজ্জীবিত হয়ে উঠল নতুন উদ্যমে। তাদের আর্তনাদ হয়ে উঠল আক্রমণের ডাক। আহত সতীশের মনে হল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, দিব্যাংশুই যেন ঐতিহাসিক চরিত্র দিব্বোক!

 

প্রায় ঘন্টাখানেক পর উপর মহলের টনক নড়েছে। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে বন্ধ হয়েছে দুর্গাবিলের উচ্ছেদ অভিযান। স্থানে স্থানে রুখে দেওয়া হয়েছে শহর অভিমুখে আসা আমজনতার গাড়িগুলিকে। জেলাধিপতি সহ পার্টির জেলা সভাপতি স্বয়ং উপস্থিত হয়ে আশ্বস্ত করেছে জনগণকে। তবে সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং জনগণকে উত্তেজিত করার অভিযোগে দিব্যাংশু ও সতীশকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। দলীয় অনুশাসন ভঙ্গ করায় দিব্যাংশু ছয় বছরের জন্য নিলম্বিত হয়েছে পার্টি থেকে।

 

হরিভানু অদূরে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। নিজের তৈরি ছকে দুর্দান্ত সাফল্য এসেছে তবুও চোখ মুখ তার প্রতিক্রিয়াহীন।

 


বুধবার, ২০ জুলাই, ২০২২

।। গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না।।



     


                   

                      (ফটো - গুগল সৌজন্য)

                       ✍️ মাসকুরা বেগম ।

 

মাহিরা চৌধুরীর জীবন কাহিনির কিয়দংশ যেন ওর লেখা প্রথম গল্প ‘গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না’ আর কিয়দংশ যেন ওর লেখা একটি উপন্যাস ‘ ‘হারানো আত্মবিশ্বাস’ এর সাথে গুলিয়ে গেছে । কোনোটাই আসলে ওর জীবন কাহিনির অংশ নয় । এটাই তো সাহিত্যের গুণ । কোনও না কোনোভাবেই চরিত্রগুলো বাস্তবের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় - সেটি কল্প কাহিনি হোক কিংবা বাস্তব উপলব্ধি ! সাহিত্য হচ্ছে সত্যের মূল, বাস্তবের আয়না, কল্পনার শিল্প, হৃদয়ের কথা, বুদ্ধির বিশ্লেষণ। 


ষোলো বছর বয়সী মাহিরার সবেমাত্র মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে । তাই ওর সময়টা কাটছে না কিছুতেই। কেমন যেন একা একা লাগছে । কী যেন মিস করছে ! কী যে করবে ! কী করবে ! কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। টিভি দেখতেও ভালো লাগে না । ওর শহুরে মামাতো বোন ওকে নিয়ে ঠাট্টা করে ওর টিভি সিরিয়াল সম্পর্কে অজ্ঞতা দেখে, - ‘কী গাঁইয়া মেয়েরে বাবা ! টিভি সিরিয়াল দেখে না !’  

  

    পাড়ায় এঘর - সে ঘর ঘুরতেও ভালো লাগে না মাহিরার । ওর মা টিভি দেখা, এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ানো পছন্দ করতেন না । তাই ওকেও সেভাবে গড়ে তুলেছেন । গত কমাস ও পড়াশোনা নিয়ে খুবই ব্যস্ত ছিল ভালো রিজাল্ট করবে বলে। বরাবরই ও পড়তে খুব ভালোবাসে । এই অভ্যাসটা ওর মধ্যে গড়ে উঠেছে ওর মায়ের জন্য। সেই ছোটবেলাতে থেকেই বিভিন্ন ধরনের বই পড়া আর ছবিতে ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতিক দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা ওর হবি।

       জন্ম থেকেই দেখে আসছে ঘরে সংবাদপত্র, আর মাসিক ম্যাগাজিন আসাটা বাধ্যতামূলক। ওর শিক্ষিত মায়ের প্রতিদিন সংবাদপত্র চাই। ওর নানা মানে মায়ের বাবা ছিলেন খুব নাম করা একজন গুণী শিক্ষক । তাই বোধহয় ওর মায়ের মধ্যে অনেক ভালো গুণ আছে আর তিনি কঠোর নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলেন। মাহিরার ঘর  আসামের এক প্রত্যন্ত গ্রামে । সকালের চায়ের কাপের সাথে সংবাদপত্র পাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। বাবা  শহরে বিদ্যুৎ বিভাগের অফিসের কেরানি । সকাল আটটায় শহরে অফিসের জন্য বেরিয়ে যান আর বিকেল ছয়টা-সাতটায় ঘরে ফিরে আসেন । বাবা অফিস থেকে ফেরার সময় নিয়ে আসেন সংবাদপত্র । মা-মেয়ে ভাগাভাগি করে পড়ে পাতাগুলো । মা একটি পাতা নেন তো মেয়ে আরেকটি পাতা নেয় । তারপর পাতা বদল। মেয়েরটা মা আর মায়েরটা মেয়ে নেয় । মাহিরার বিশেষ আকর্ষণ শনিবার ও রবিবারের পাতায়। নিয়মিতভাবে ও পড়ে ছোটদের পাতা, সাহিত্য সম্ভার, নারী জগৎ, সাজগোজ, রান্না-বান্না, ইত্যাদি । রবিবার ও শনিবারের পাতাগুলো আলাদাভাবে জমিয়ে রাখা ওর শখ ! পুরনো সংবাদ পত্রগুলো মা ‘পুরনো কাগজ চাই’ দাদার কাছে বিক্রি করে দেন । কিন্তু মাহিরার জমানো পাতাগুলোতে তিনি কোনোদিন হাত দেন না।

 

       পরিক্ষার পরে এক রবিবারের পাতায় মাহিরা দেখল ‘বিষয়ভিত্তিক গল্প প্রতিযোগিতা’ ! বিষয় - ‘ গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না ‘ । মনে মনে ভাবে, ‘লিখে ফেলি ! বুকের ভিতর অনেক আবোল-তাবোল ভাবনার জ্বালা ! গাঁয়ের মানুষের কত শত চিত্র লেগেই আছে চোখে ! ওই বাস্তব চিত্রগুলো দিয়ে লিখে ফেলি একটি গল্প ! হাতে তো ঢের সময় আছে এখন । ‘ 

 

       একমাস পর রবিবারের পাতায় প্রকাশিত হয় ওর লেখা ছোটগল্প ‘গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না’ । গল্পটিতে গাঁয়ের ছেলে ভবঘুরে মনুকে সবাই ঠাট্টা করে তার উঠতে বসতে গুনগুন করে গান গাওয়া নিয়ে । মা-বাবা বকাবকি, গালাগালি, চড় - থাপ্পড় কোনোটাই কম করেননি । তবুও তার গানের নেশা ছাড়াতে পারেননি । কোনমতে মাধ্যমিক পাস করেছে । পড়াশোনা আর এগুতে পারবে বলে মা-বাবার কোনও আশা নেই তাই কলেজে ভর্তি  করলেন না । ছোটখাটো কিছু একটা কাজে লাগাবার চেষ্টা করতে লাগলেন । একটি কাপড়ের দোকানে বিক্রেতার কাজ পেল । সেখানেও গান গাওয়ার রোগ তাকে ছাড়ল না । দোকান মালিকের মেয়ে শুধুমাত্র তার গান শুনেই  তার প্রেমে পাগল ! সেই কারণে মনু চাকরি ও  হারাল, মায়ের ঝাঁটার বাড়িও খেলো আর বাবার লাথিও খেলো ! মনের দুঃখে সে পালিয়ে বেআইনি উপায়ে একদিন বাংলাদেশে গিয়ে প্রবেশ করল । সেখানে গিয়ে সে কিভাবে একেবারে রাতারাতি সেলিব্রিটি হয়ে উঠল তার গল্প এটি । মাহিরার এই গল্পটি প্রথম পুরস্কার- প্রাপ্ত গল্প হিসেবে নির্বাচিত হল । 

      

        তারপর আরেকদিন লিখে ফেলল একটি কবিতা । পাঠিয়ে দিল রবিবারের সাহিত্য সম্ভারের পাতায় । বেশ সাড়া পেয়েছিল কবিতাটিও । এরপর নিয়মিত লিখতে থাকে মাহিরা । প্রকাশিত হতে থাকে ওর লেখা গল্প, কবিতা একের পর এক । 

 

    মাধ্যমিক পরিক্ষায় খুব ভালো রিজাল্ট করল মাহিরা । বাংলায় পেল ১০০/১০০ । বাকি বিষয়গুলোতে ও অনেক ভালো নম্বর পেল ।  

 

     কিন্তু মাহিরাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও কম করা হয়নি ! অনেকেই বলল, ‘বাংলায় ১০০/১০০ ! সে আর কী বাহ্ বাহ্ কুড়ানোর ব্যাপার ! বিজ্ঞানে কিংবা গনিতে ১০০/১০০ পেলে না হয় কথা ছিল ।’    

 

     পরিক্ষায় ভালো রেজাল্ট করার পর ছোট চাচি বললেন, ‘ সারাদিন বই এর সাথে ফেভিকলের মত লেগে থাকলে কে না ভালো রেজাল্ট করতে পারবে ? আসলে মাহিরা কিন্তু এত ট্যালেন্টেড নয় ! পড়ার জোরে যা ভালো রেজাল্ট আর কি !’

 

      বাবা-মা ওর সাহিত্যে আগ্রহ আর পরিক্ষার নম্বর দেখে কলা বিভাগে ভর্তি করিয়ে দিলেন । উচ্চ মাধ্যমিকে ও বাংলা বিষয়ে রাজ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে চমৎকার ফলাফল করে মাহিরা । তাই বাংলা অনার্স নিয়ে ডিগ্রিতে ভর্তি হয় ।

 

      বিজ্ঞান পড়ুয়া বড় চাচাতো দিদি ঠাট্টা করে বলল, ‘ মেজ-চাচা আর চাচি কী সেকেলে রে বাবা ! মাহিরা ও যে কী বুদ্ধু ! এতো ভালো রিজাল্ট করে আর্টসে এডমিশন হল তাও আবার বাংলা বিষয় নিয়ে । আজকাল আর্টস চলে নাকি ! বাংলায় কোনও স্কোপ আছে নাকি !’

 

 

       পিসিতুতো ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র তাচ্ছিল্য করে বলল, ‘আচছা বলত মাহিরা ! তুই এই গল্প - কবিতা লিখে সময়টা কেন নষ্ট করিস্ ? এসব করে, আর্টস এ বাংলা নিয়ে পড়ে তুই কেরিয়ার গড়বি কেমন করে ?’

 

       সবার কথা শুনে একটু হীনমন্যতাবোধ হল মাহিরার । নিজের উপর যে বিশ্বাস ছিল তা দুর্বল হয়ে পড়ল । ‘সত্যি কি আমি মূল্যবান সময় নষ্ট করছি ? ‘সত্যি কি ভুল পথে পা বাড়াচ্ছি ?’ ‘আমি কি আমার কেরিয়ার গড়তে পারব না ? আমার শখকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে কি আমি আমার জীবনে সফল হতে পারব না ?’  

 

      ওর মা ওকে বললেন, - ‘ আমি মনে করি তুমি একদম সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছ মাহিরা । সফলতা আসে জন্মগত প্রতিভার বিকাশে । আমরা দেখেছি সাহিত্যে তোমার প্রতিভা আছে । তাই সেই প্রতিভার বিস্ফোরণ ঘটাতে যে আলো- বাতাসের দরকার তা হচ্ছে তোমার ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে বিস্তর অধ্যয়ন । তুমি মানুষের কথায় দুর্বল হয়ে যেও না । আল্লাহর উপর ভরসা রাখ । নিজ প্রতিভার বিকাশের জন্য সাধনা চালিয়ে যাও । সাফল্য তোমায় সালাম জানাবে !’

 

     মায়ের জ্ঞান গর্ব কথাগুলো হৃদয় ছুঁয়ে গেল মাহিরার । একান্ত মনে লেগে গেল নিজের প্রতিভার বিকাশে । নিজের অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে উচ্চারিত হওয়া কথাগুলো যেন স্পষ্ট শুনতে পেল - ‘ নিজের প্রতিভার বিকাশ যদি চাও তবে প্রথমে নিজের প্রতিভাকে চেন, নিজের জন্য কাজ করে যাও, নেতিবাচক মানুষ থেকে দূরে থেকো, যারা তোমাকে সম্মান করে না তাদের ধারে - কাছে যেও না । এতে যদি কেউ তোমার আত্মসম্মানবোধকে আত্মগরিমা ভেবে ভুল বুঝে, বুঝুক ।’ 

 

       মাহিরার জীবন কাহিনি নতুন মোড় নেয় ওর পিসিতুতো ভাইয়ের বিয়েতে । সেখানে ওর সাথে দেখা হয় পিসিতুতো ভাইয়ের বন্ধু ও.এন.জি.সি. -তে কর্মরত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার জাভেদের । ফর্সা, ছিপছিপে গড়নের, লম্বাটে মাহিরাকে প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়ে যায় জাভেদের । প্রস্তাবও দিয়ে ফেলেন সঙ্গে সঙ্গে । বাংলা সাহিত্যে পিএইচডি গবেষণারত মাহিরা ও সুঠামদেহী, সুন্দর চেহারার ইঞ্জিনিয়ার পুরুষ জাভেদের প্রস্তাব গ্রহণ করতে সময় নষ্ট করেনি । তার ভদ্র, অমায়িক ব্যবহার দেখে কী এক আকর্ষণ অনুভব করে ও ! দুজনের মধ্যে ফোনালাপের মাত্র একমাস পর বিয়ে হয়ে গেল । সবাই খুব খুশি হয়েছে ওদের বিয়েতে । বলাবলি করেছে, ‘মাহিরা যোগ্য স্বামী পেয়েছে । কী নেই তার ! ডাক্তার বাবার একমাত্র সন্তান জাভেদ । বাড়ি- গাড়ি-উচ্চপদস্থ চাকুরি । প্রচুর সম্পত্তি ! সাত পুরুষে বসে বসে খেয়েও শেষ করতে পারবে না।’ 

 

    একদিন সকালে মাহিরা সংবাদপত্র হাতে নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে এসে জাভেদকে বলল, - ‘ এই দেখ দেখ ! কলেজে সহকারী অধ্যাপকের খালি পদগুলোর পূরণের জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েছে । আমার তো নেট কোয়ালিফাই করা আছে । এপ্লাই করি !’

 

- ‘ কেন ? তোমার কিসের অভাব ? শুনি ! আমাদের এত সম্পত্তি থাকতে তোমার চাকুরি করার কি দরকার ?’

 

     খুব আশ্চর্য হয় মাহিরা ! মুখ দিয়ে কোনও কথা বেরুলো না । খুব দুঃখ পেল ! ব্যথায় বুকটা খুব ভারি হয়ে উঠল কিন্তু কাঁদতেও পারল না । পাল্টা কোনও জবাবও দিতে পারল না প্রাণ-প্রিয় স্বামীকে । ও যে খুব ভালোবাসে জাভেদকে । ওর প্রথম প্রেম জাভেদ ! তাই হজম করে নিল ওর প্রতি জাভেদের অবজ্ঞাকে, তার আত্ম-অহমিকাকে ।

 

      মাহিরা নিজেকে মানিয়ে নিতে শুরু করল জাভেদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার সাথে । ইচ্ছে করে ভুলিয়ে রাখল ওর স্বপ্নকে, আত্মসম্মানবোধকে । হৃদয় উজাড় করে ভালোবাসল স্বামী-সংসারকে । যে ভদ্র - অমায়িক পুরুষ দেখে জাভেদের প্রেমে পড়েছিল - বাস্তবে ঠিক বিপরীত রূপ দেখেছে মাহিরা । প্রায়ই জাভেদ ওর সঙ্গে অবজ্ঞাসূচক ব্যবহার করে। ওদের পরিচয় পর্ব আর বিয়ের মাঝখানে একে অপরকে বুঝার জন্য সময়ও ছিল মাত্র এক মাস ! আসলে প্রেম কি আসে ভালো-মানুষ কি মন্দ-মানুষ বিচার বিবেচনা করে ? প্রেম তো এক দমকা হাওয়া । কখন যে কার সুগন্ধি হাওয়া, কার হৃদয় স্পর্শ করে ! প্রেম তো হৃদয়ের আকর্ষণ থেকে হয়, বিবেকের জায়গা কতটুকুই বা আছে এখানে ?

 

     মাহিরার যোগ্যতা, প্রতিভা ও সৃজনশীল কাজকর্মের কোনও মূল্যই নেই জাভেদের কাছে । ওর কাছে এসব মিছেমিছি সময় নষ্ট । পিএইচডি গবেষণার কাজে ও কোনও সহযোগিতা করে না মাহিরাকে । ওই তো সেদিন ঘরে ঢুকে জাভেদ দেখল মাহিরা আনমনা হয়ে পড়ার টেবিলে কাগজ কলম নিয়ে বসে আছে । জাভেদের মাথা গরম হয়ে গেল তখনই।

 

- ‘ ঘরে কোনও মানুষ ঢুকেছি না ইঁদুর ঢুকেছি ? সারাদিন চেয়ারে বসে বসে শুধু মাথা চুলকাতে থাক । কী লাভ হয় লেখালেখি করে ! শুনি ।’

 

- ‘ তোমার হয়েছেটা কী ? বল তো ! এত চেঁচামেচি করছ কেন ? ইস্ ! আমার কানেকশনটা দিলে তো কেটে । একটার সঙ্গে আরেকটা তার জোড়া লাগানোর পর আবার কানেকশনটা ঠিক করা কত মুশকিল । এখন তুমি চেঁচামেচি করে দিলে তো ছিঁড়ে !’ হেসে হেসেই বলল মাহিরা ।

 

-’ সংসারে দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে গল্পের প্লট আর চরিত্রের কানেকশন লাগালে চলবে ? আমার কোনও খেয়াল রাখ তুমি ? সারাদিন পরিশ্রম করে ঘরে ফিরলাম । কোথায় একটু জল দেবে, খেতে দেবে ? তুমি ফিরে ও তাকালে না ।’

 

- ‘ ডাইনিং টেবিলে সব রেখে দিয়েছি তো, তুমি দেখনি ? তুমি কেন আমায় মিছেমিছি ভুল বুঝতেছো ? আমি তোমার কথার অবাধ্য হয়েছি কখনও ! তাইতো যোগ্যতা থাকতেও চাকুরি করতে যাইনি । আমি লিখতে ভালবাসি কিন্তু তাও অবসরে লিখছি । বিয়ের পর থেকে তো আগের মত এত লেখা প্রকাশিতও করতে পারছি না । পিএইচডি রিসার্চ পেপারের ও কাজ করতে পারছি না তেমন করে। তবুও তো দুঃখ করি না । আমি যদি তোমার খেয়াল না রাখতাম তবে কি তোমরা পছন্দের খাবার টেবিলে সাজিয়ে রাখতাম ? কোন দায়িত্বটা আমি পালন করলাম না যে দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে গেলাম ?’ শান্ত অথচ স্পষ্ট-দৃঢ় কণ্ঠে মাহিরা বলল । 

 

- ‘ বাহ্ ! মুখের উপর কথা বলতে শুরু করে দিয়েছ । খুব উন্নতি হয়েছে তোমার ! জাহিরা কোথায় ? ‘ গলা তিনগুণ চড়িয়ে জাভেদ বলল ।

 

- ‘ আম্মার কাছে ।’

 

-’ কী ! মেয়েকে সারাদিন মায়ের কাছে রেখে তুমি কাগজ কলম নিয়ে তোমার শখ পূরণ করছ ? দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা !’ বলে জাভেদ নিমিষেই টেবিল থেকে মাহিরার অর্ধেক লেখা উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি মেঝেতে ফেলে দিল । 

 

     মাহিরা এলোমেলো উড়ে যাওয়া কাগজ গুলোর দিকে কঠিন দৃষ্টিতে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল । বাইরে আকাশে মেঘেরা উড়ছিল - প্রচণ্ড বেগে বয়ে চলা বাতাসের ধমকে । গাছগুলো দুমড়েমুচড়ে যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। ধ্বংসাত্মক তুফানের সাথে প্রাণপণে লড়ে যাচ্ছিল তারা বাঁচার জন্য । দুর্বল গাছগুলো হার মেনে নিল । ভেঙ্গে পড়ে গেল । কিন্তু যারা শক্তিশালী তারা লড়ে যাচ্ছিল । তুফানকে হারাতে হবেই । বন্ধ করতে হবে তুফানের তাণ্ডব লীলা । নিশ্চয়ই ঐ গাছগুলো আবার মাথা উঁচু করে সোজা হয়ে দাঁড়াবে ।

 

    জাভেদ ফিরল সিগারেট জ্বালানোর লাইটার নিয়ে । কাগজগুলো হাতে নিয়ে যেই পুড়ানোর জন্য আগুন ধরাতে যাবে খপ করে হাতটি ধরে ফেলল মাহিরা ! জাভেদ ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দিল মাহিরার গালে ! মেঘের মধ্যেও দ্রুত বেগে বিদ্যুৎ চমকানোর সঙ্গে প্রকাণ্ড বজ্রপাত হল । 

 

-’ ব্যস ! অনেক হয়েছে । প্রচুর পুরুষত্ব দেখিয়েছেন । আর নয় ! আমার জিনিস পত্রে হাত দেওয়া, ছুঁড়ে ফেলা, আগুনে পুড়ানোর অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে ? আপনার আমার যে সম্পর্ক ছিল তা আমি আজ ত্যাগ করলাম ।’

 

- ‘ আপনার - আমার এভাবে আলাদা করছ কেন, তুমিই তো বলতে যাকিছু তোমার - সবই আমার .........।’

 

- ‘' হ্যাঁ বলেছিলাম ! ওটা ছিল আমার মানসিকতা । কিন্তু আপনিই তো আলাদা করে রেখেছেন আমাকে আপনার জগৎ থেকে । কোনদিন আপনার সোশ্যাল মিডিয়া, চ্যাট বক্স ইত্যাদি আমাকে লগিন করতে অনুমতি দেননা ! আপনার মোবাইল, ল্যাপটপ সবকিছুরই পাসওয়ার্ড লুকিয়ে রেখেছেন । বলেছেন, এসব আপনার ব্যক্তিগত ! যখন আমি একটি ফেসবুক একাউন্ট খুললাম - আমার লেখাগুলো পাঠকের সামনে তুলে ধরার জন্য । তখন আপনার ঘোর আপত্তির জন্য ফেইসবুক একাউন্ট ব্লক করতে বাধ্য হয়েছি । তবুও কিচ্ছু বলিনি । মেনে নিয়েছি আপনার যুক্তি, ‘ মেয়েদের ফেসবুকে - সোশাল মিডিয়ায় বিচরণ শোভা পায় না ‘ । আমি জানি, আপনার ফ্রেন্ড লিস্ট কিন্তু সেই মেয়েমানুষের দ্বারাই পরিপূর্ণ !’'

 

      নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে, শাশুড়ির কোল থেকে মেয়ে জাহিরাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল মাহিরা । সার্কাসের পাখি যেন তিন বৎসর পর আজ শিকল ছিঁড়ে বেরিয়েছে । ব্যথিত- ক্লান্ত পাখি যেন মুক্ত হাওয়ায় প্রাণভরে একটু নিঃশ্বাস নিচ্ছে । অনুভব করছে কী দমবন্ধ করা পরিবেশেই না ছিল এতদিন ! ঝড় - তুফানের পর প্রাকৃতিক পরিবেশটা বেশ হালকা ঝরঝরে হয়ে উঠেছে । হালকা হালকা বৃষ্টি পড়ছে । মাহিরার চোখে - মুখে এসে ঝাপটা লাগছে দু-এক ফোঁটা বৃষ্টির জলের । ভীষণ হালকা লাগছে মাহিরার নিজেকে । একটি ট্যাক্সি ডেকে মেয়েকে নিয়ে মাহিরা রওয়ানা দেয় বাবার বাড়ির দিকে । আর ফিরেনি জাভেদের সংসারে। মা - বাবাও ওর ব্যাপারে কোনও হস্তক্ষেপ করেননি । তাঁদের মেয়ের উপর অগাধ বিশ্বাস আছে । তাই ওর সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দিয়েছেন । মাহিরা মেয়েকে আঁকড়ে ধরে নিজের প্রতিভাকে বিকশিত করে একটি সুস্থ - সুন্দর জীবন শুরু করল । 

 

       কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছে মাহিরার প্রথম উপন্যাস ‘নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা’ । যে উপন্যাসটিতে একটি মেয়ে কীভাবে জীবন যুদ্ধে জয়ী হয়েছে, কীভাবে সফলতার শিখরে পৌঁছেছে - তারই গল্প । মেয়েটিকে প্রভাবিত করেছে একটি প্রবাদ বাক্য ‘নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা’। মেয়েটি যখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে তখন বাংলা ব্যাকরণে পেয়েছে বাক্যটি । শিক্ষক যখন বাক্যটির সারমর্মকে ওদের সামনে তুলে ধরেন ওর হৃদয় স্পর্শ করেছিল বাক্যটি । ওর বাবা তাঁর বিফলতার জন্য দায়ী করেন তাঁর নিজের বাবাকে, ভাই তার ফলাফল খারাপ হওয়ার জন্য দায়ী করে সংসারের অভাব অনটনকে, মা রান্না খারাপ হলে দোষ দেন সবজি কিংবা মশলার উপর । মেয়েটি অনুভব করল সবই আসলে ‘ নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা’। সেই মেয়েটির কষ্টকর সফলতার গল্প কিছু হাস্য কৌতুকের সংমিশ্রণে প্রকাশিত হয়েছে উপন্যাসটিতে । অত্যন্ত মনোগ্রাহী উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পর আলোড়ন সৃষ্টি করল সাহিত্য জগতে। অভিনন্দন - সংবর্ধনা - পুরস্কার ইত্যাদি ঘিরে ফেলল  মাহিরার জীবন !

 

       এরপর অবিরাম চলতে থাকে ওর লেখালেখি। অনর্গল প্রকাশিত হতে থাকে ওর গল্প - উপন্যাস - কাব্যগ্রন্থ -গদ্য ইত্যাদি। সাফল্যের শিখরে পৌঁছে যায় মাহিরা আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ওকে । বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পিএইচডি করে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহিরা সাহিত্য জগতে এক আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব । গল্প, কবিতা, উপন্যাস, গবেষণা ধর্মী গদ্য ইত্যাদি লিখনিতে পরিচিত নাম ড. মাহিরা চৌধুরী !!!

 

গুয়াহাটি । আসাম ।

 

  



   



মঙ্গলবার, ২২ মার্চ, ২০২২

।। অন্যরকম।।

               
                
    ।। মাসকুরা বেগম ।।

 

        আমার নাম এতিমা । এতিমা নামটি আমাকে এমনি এমনি দেওয়া হয়নি । কারণ আছে এ নাম রাখার পিছনে । আমার জন্মের এক মাস আগে আমার বাবার সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ! বাবার এই আকস্মিক মৃত্যুতে মা সাংঘাতিকভাবে মানসিক আঘাত প্রাপ্ত হন । বোবা পুতুলের মত হয়ে যান ! হায়রে নিয়তি ! তারপর যা ঘটেছিল তা আরও হৃদয় বিদারক ! একটি শিশুর জন্ম একটি পরিবারে আনন্দের জোয়ার নিয়ে আসে । কিন্তু আমার জন্ম দুঃখের বোঝা নিয়ে এসেছিল ! হায় ! আমার মা ...! হ্যাঁ ! আমার মা আমাকে জন্ম দিয়েই চিরতরে ইহলোক ত্যাগ করেছেন! হারিয়ে ফেলেছি মাকে ! আর ফিরে এল না মা ! কোনদিন এল না ! আমি মা-বাবার মুখই দেখতে পেলাম না ! কেমন ছিল আমার মা ! কেমন ছিল আমার বাবা ! দাদিমার ভারাক্রান্ত হৃদয়ের দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে এসেছিল আমার নাম - ‘এতিমা’ ! দাদিমার প্রাণের স্পন্দন আমি - এতিমা ।

      দাদিমার কাছে শুনেছি আমার জন্মের পর বড় চাচি  বলেছিলেন, - " আমি পারবো না পরের বোঝা টানতে । আমার তিনটি বাচ্চাকেই বড় করব কীভাবে ! তার উপর এই অলক্ষ্মী অপয়া !’ আরও বলেছিলেন, - " গ্রামের সরকারি স্কুলে আমার ছেলে মেয়েদের পড়াশোনা হবে না । শহরে ভালো স্কুলে পড়াতে হবে । আমরা শহরে চলে যেতে চাই।’

       বড় চাচাও বলেছিলেন, - ‘আমার এখান থেকে শিলচর অফিসে যেতে এক ঘণ্টা সময় লেগে যায় আর শরীরেও সয় না তাই স্থায়ীভাবে ওখানে যাওয়াই ভালো হবে।’

     চাচা-চাচি বাচ্চাদের নিয়ে পরিবার থেকে আলগা হয়ে শহরে চলে গেলেন । তারপর কোনও সময় ছুটি কাটানোর জন্য একটু বেড়াতে আসেন মাত্র । তারা এখন শহরে ভিটে মাটি নিয়ে স্থায়ী বাসিন্দা । দাদিমা বলেন, আসলে নিজের বাচ্চাদের তিনটি কাপড় কিনলে আমার জন্য যে একটি কিনতে হবে, তিন গ্লাস দুধের উপর আরেক গ্লাস যে বাড়তি দুধ লাগবে আমার জন্য, তিনটি চকলেটের জায়গায় চারটি কিনতে হবে - এসব চিন্তা করেই বড় চাচি কেটে পড়েছিলেন নিজের সংসার নিয়ে !

       দুই পিসি তাদের সংসার-স্বামী-সন্তান নিয়ে ব্যস্ত । আমার দায়িত্ব তাঁরা নিতে পারবেন না স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন । গত বৎসর বড় ফুফু  এসেছিলেন তাঁর ছেলের সাথে আমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে । তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে দাদিমাকে বলতে শুনলাম – ‘কক্ষনোই এ সম্পর্ক হতে পারে না ! তুই না তখন বলেছিলি ‘মাই, এতিমাকে দত্তক দিয়ে দাও । এ বয়সে তোমার এই বাচ্চাটাকে নিয়ে ঝামেলায় পড়ার কী দরকার !  এই মেয়েটিকে আমি যখন বড় করতে পেরেছি, বিয়ে দিতেও পারব । তবে তোর মত নির্দয়ের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবো না।’ সেদিন যে রাগ করে বড় ফুফু চলে গিয়েছিলেন তারপর আমার বিয়েতেও পর্যন্ত আসেন নি ।

       ছোট চাচি আমাকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন । তখন চাচির নিজের বাচ্চা ছিল না । আমার পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত ছোট চাচা-চাচি  নিজেরা বাচ্চাই নিলেন না । তারপর তাঁদের কোল আলো করে আমার ভাই এসেছে । আরও তিন বছর পর আমার বোন এসেছে । আমি যতটুকু পারি ছোট চাচি আম্মার সহায়তা করি ভালোবেসে । ‘আম্মা’ – ‘আব্বা' ডাকি ছোট চাচা - চাচিকে । ভাই - বোন দুটোকে দেখে-শুনে রাখি হৃদয় উজাড় করে ভালোবেসে।

       দাদিমা আমার কোলে মাথাটা রেখে শুয়ে আছেন । খুশি মনে গুড়ো করা পান-সুপারি দিয়ে পান চিবোতে চিবোতে কত গল্প করছেন ! ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন গল্প করতে করতে । সারাদিন রোজা রেখে ইফতার করেছেন যে। বয়স তো কম হয়নি ! আশি বছর পার করেছেন জীবনের! কোনও দিন রোজা রাখা বন্ধ করেননি ! অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছেন আমার মাই মানে দাদিমা। আমি ‘মাই’ ডাকি তাঁকে ।

      সারাদিন কাঠফাটা রোদ আর উৎকট গরমে পিপাসায় প্রায় সব রোজাদারেরা ছটফট করছিল । সূর্যের আলোর ফাঁকে ফাঁকে আকাশে কালো বর্ণের বৈশাখী মেঘ দেখা যাচ্ছিল । লোকজন চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে এক পশলা বৃষ্টির আশায়। ইফতারের এক ঘণ্টা আগে এক ঝাপটা কাল বৈশাখী ঝড় প্রকৃতিকে ঠাণ্ডা করার সাথে সাথে ঠাণ্ডা করে দিয়েছে রোজাদারদের প্রাণ । বৈশাখ মাসের বৃষ্টি এক ঝটকায় আসে আবার চলে যায় । বৃষ্টি চলে গেলেও আমেজটা যায় নি। টিনের চালে আম গাছের পাতা থেকে জল পড়ার শব্দ বাজছে সুর তুলে টপটপ-টপটপ। বাইরে বয়ে যাওয়া মৃদুমন্দ ঠাণ্ডা হাওয়া জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকছে আর অফুরন্ত ভালোলাগার ছোঁয়া লাগছে গায়ে ! এই মুহূর্তে প্রকৃতির ফুরফুরে হাওয়া যেমন ভালোলাগার ছোঁয়া দিচ্ছে গায়ে তেমনি আমাদের দাদি-নাতনির মনও খুশিতে ফুরফুর করছে !

          আজ দাদিমার খুশির কারণ আমি । আমার বিয়ে হয়েছে তিন মাস হল । বিয়ের পর এবছরের রমজানের মাসের প্রথম রোজা আজ। এসেছি দাদিমার সঙ্গে ইফতার করতে ! অবাক লাগছে, না ? আজ তো আমার শ্বশুর বাড়িতে থাকার কথা আর বাবার বাড়ি থেকে ঘটা করে ইফতারি দেওয়ার কথা । এটাই তো বরাক উপত্যকার  সমাজের নিয়ম ।

         আজ সকালে তিনজন ভদ্রমহিলা এসেছিলেন আমার শাশুড়ির কাছে । আমার চাচি শাশুড়ি, তিনি নাকি খুবই সম্পদশালী বাবার মেয়ে ! পাশের বাড়ির রুমা পিসি শাশুড়ি, তিনি শ্বশুর বাড়ি থেকে চার দিন পর চলে এসেছিলেন আর কোনদিন ফিরে যাননি কিন্তু কেউ শ্বশুর বাড়িতে কীভাবে চলবে সে বিষয়ে উপদেশ দিতে তিনি পাকা জ্ঞানী ! ওবাড়ির অলির দাদি, তাঁর চার ছেলে থাকতে তাঁর চুলা আলাদা ! ছেলেদের বউদের সঙ্গে তাঁর বনিবনার অভাব ।

       তিন জনেরই মুখ পানসে হয়ে আছে ! বেশি সাড়া শব্দ নেই ! অন্যান্য দিন হলে পান চিবোতে চিবোতে হৈহৈ করে বাড়িতে ঢুকেন ! এমনিতে তাঁদের পানের পিকে রাঙা ঠোঁটের সামনে লিপস্টিকের রংও যেন হার মানায় !

         অলির দাদি শুরু করলেন, - ‘খানো গো, শাহিদের মা ! তোমার বউর ফয়লা ইসতারির গন্ধ বাস ফাইলাম না ।'

- ‘আমরারে তইআ খাইলে ফেট ফুলবো গো ভাবি ।' চাচি শাশুড়ি বললেন ।

- ‘হুনো ভাবি ! বউর বাড়ির কুনতা আইলে সবরে আগে তাকি খইতে লাগে ! ফয়লা ইসতারির মোছা এখলা কুলইন না । ইতা তুমি জানোনা নি ভাবি ?' ফুফু শাশুড়ি বললেন ।

      আমার শাশুড়ি তাঁর ঘরে তাঁদের বসতে দিয়ে চুপচাপ বসে শুনছেন ! আমি আঁটোসাটো হয়ে দাঁড়িয়ে আছি শাশুড়ির পুরনো কাঠের  আলমারিতে গা ঘেঁষে ।

- ‘গতবার হবাড়ির ফখর মাস্টারর বউর ফয়লা দিনকুর ইসতারি সারা গাঁও-এ খাইয়া শেষ করতে ফারছইন না !' দাদি বললেন ।

- ‘আমার ফয়লা দিনকুর ইসতারির খতা মনো নাইনি চাচি ! বাটতে বাটতে শেষ অইছে না, বাদে গরু ছাগলে খাইছইন !' চাচি শাশুড়ি বললেন।

- ‘ওয় ওয় ! তোমার বাড়ির মোছা ইতা ফাউরিমুনি বেটি ! তুমি অইলায় বড়লোক বাফর ফুড়ি । তোমার বাফর কলিজার লাখান কয়জনর কলিজা আছে ।'

- ‘ভাবি তোমার বউর বাড়িত হুনাইয়া রাখছনি । ইলা না আইলে যে তোমার মান সম্মান থাকতো নায় ।' ফুফু শাশুড়ি বললেন ।

         ‘মামনি !' আমার শাশুড়ি হাঁক পাড়লেন । তিনি আমাকে 'এতিমা' ডাকেন না । ‘মামনি' বলে ডাকেন । আমি ভয়ে জড়সড় হয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম – ‘জি আম্মা !'

- ‘মামনি তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও ! শাহিদ স্কুল থেকে ফিরে তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবে ! তোমার দাদিমার সাথে ইফতার করবে না! তোমাকে ছাড়া আজ প্রথমদিন তাঁর ইফতার মুখে উঠবে কী করে ? বিশটি বছর এক লোকমা কি তোমাকে ছেড়ে মুখে তুলেছেন ? কেমন নাতনি তুমি একবারও বললে না দাদির কাছে গিয়ে ইফতার করার কথা ! আমার অবাক লাগছে !' আমার স্বামী শাহিদ বাজারের লাগোয়া  জনকল্যাণ হাইস্কুলের শিক্ষক ।

     আমি হতবাক !  হতবাক আগন্তুকরা ! দাদি, চাচি ও ফুফুর তিন জনেরই পানসে মুখের যেটুকু ঝলক ছিল নিভে গিয়ে বৈশাখ মাসের আকাশে উড়ে বেড়ানো কালো মেঘের মতো হয়ে গেল !

          মা তাঁদের উদ্দেশ্য করে বললেন -   ‘আপনারা শুনুন ! আমি আগে থেকেই আমার মামনির দাদিকে জানিয়ে দিয়েছি এসব ফালতু কষ্ট যেন আমাদের জন্য না করেন । মা বাবা হারানো এতটুকু দুধের শিশু মেয়েটিকে এত বছর দাদি, চাচা-চাচি লালন-পালন করলেন, শিক্ষা-দীক্ষা দিয়ে মানুষ করলেন । বিয়ে দিলেন । এখন আবার স্বামীর বাড়িতে ভিক্ষা দেবেন কোন দুঃখে ? আমি আপনি কি খাচ্ছি না ? আর কোনদিন আমার বাড়িতে আমার মামনির সামনে দয়া করে এধরনের নিকৃষ্ট কথা-বার্তা বলবেন না ।' তিন জন আগন্তুকই মেঘলা মুখগুলো পেঁচার মত করে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলেন । 

        স্বামীসহ আমাকে দেখে তো দাদিমা, চাচা-চাচি, চাচাতো ভাই-বোন সবাই অবাক ! দাদিমা আমাকে কতক্ষণ যে জড়িয়ে ধরে ছিলেন টেরই পায়নি ! ভাই বোন দুটো যখন আমার কাপড় ধরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে টান দিল তখন আমার হুস এল ।  বুঝতে পারলাম দাদিমা আজ আমাকে কতটুকু মিস করছিলেন আর আমিও কত শান্তি পাচ্ছিলাম তাঁর বুকে। আমার স্বামী এখানে ইফতার করে ফিরে গেছেন বাড়িতে । মা একা আছেন । যাওয়ার সময় আমাকে বলে গেলেন, - ‘যতদিন ইচ্ছে করে তুমি থাকো । যেদিন মন চাইবে চলে এসো ।'

     মাস ছয়েক আগে আমি সবার সঙ্গে ছোট চাচির বড় ভাইয়ের মেয়ের বিয়েতে গিয়েছিলাম । সেখানে আমার শাশুড়ি আমাকে দেখেছিলেন আর পছন্দ করে ফেললেন ছেলের বউ করার জন্য । কী দেখে যে তাঁর আমাকে পছন্দ হয়েছে আমি ভেবেই পাই না ! আমি তো আর আহামরি কোনও সুন্দরীও না ! সাধারণ চেহারা, সাধারণ গড়ন, সাধারণ রং আমার । স্বামীও বলে প্রথম দিনেই সে নাকি আমার প্রেমে পড়ে গেছে। আমার ডিগ্রি কোর্সটা এখনও শেষ হয়নি । সমস্যা নেই । মা বলেছেন, -‘তোমার যত ইচ্ছে পড়।'

       দাদিমা বলছেন, - ‘কালকেই ফিরে যা তুই । এত ভালো শাশুড়িকে একা ছেড়ে থাকিস না । খুব যত্ন করবি । তোর সুখ শান্তিতে ভরা সংসার দেখছি । এখন নিশ্চিন্তে দুচোখ মুজতে পারব।'

        সবাই খুব খুশি আমার শাশুড়ি মায়ের ব্যবহারে । চাচা ইফতার করেই ছুটেছেন বাজারে বেয়াইনের জন্য শাড়ি কিনতে ! চাচি টিফিনে কী কী দেবেন পরিকল্পনা করছেন ! দাদিমা নাকি ক্ষীর বানিয়ে দেবেন ! 

আমি বলছি – ‘এসব নিয়ে গেলে মা যদি কিছু বলেন ?'

চাচা অভিমানের সুরে বলে উঠলেন, - ‘কেন কিছু বলবেন ? আমরা তাঁর উপর খুশি হয়ে কি কিছু উপহার দিতে পারি না ?'

      আমার ভীষণ ভালো লাগছে । সবকিছু যেন একেবারে অন্যরকম ! নেই কোনও খরচা পাতির চিন্তা, নেই কোনও জাঁকজমক, নেই কোনও উদ্বেগ, নেই কোনও মনোমালিন্য ! সবাই খুশি আজ । ভীষণ খুশি !!!

 ( এই ‘অন্যরকম' গল্পটি নববার্তা প্রসঙ্গে ১৮/০৭/২০২১ প্রকাশিত হয়েছিল )