“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
বিজ্ঞান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বিজ্ঞান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ৭ জুন, ২০২১

বজ্রাঘাতে হত… ইতি অষ্টাদশ গজঃ…


।। পার্থঙ্কর চৌধুরী ।।

গাঁও জেলার বামুনি পাহাড়ে সাম্প্রতিক কালে দেড় ডজন গজরাজের আকস্মিক বজ্রাঘাতে মৃত্যুর খবরটা অতিমারি জনিত মৃত্যুর চাইতে কোন অংশে কম ভয়ঙ্কর নয়। কাজিরাঙ্গা থেকে একদিকে হোজাই জেলার ডবকা আর অন্যদিকে কারবি-আংলং পাহাড়ে হাতীদের নিত্য নৈমিত্তিক আসা-যাওয়ার পথ (Elephant Corridor mapping) কেমন রয়েছে, তার হাল- হকিকতই বা কি; মানব নামক দানবের উৎপীড়নে সেই পথ আজকের দিনে কতটুকু নির্বিঘ্ন রয়েছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ নিয়ে আমাদেরই একখানা গবেষণাপত্র সম্প্রতিকালে জেনিফার পেস্টরিনি  সম্পাদিত এবং

শ্রীলঙ্কা থেকে প্রকাশিত ‘Gajah’ নামক জার্নালে বেরিয়েছে। জেনি-র ওই জার্নালে এর আগেও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের পাথারিয়া অঞ্চলে থাকা সীমিত সংখ্যক স্ত্রী হাতির জীবন যাপনের দুর্দশার কথাও প্রকাশ পেয়েছিলো। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও, প্রদীপের নিচটা বরাবরের মতো অন্ধকারই থেকে গেছে!  বিষয়টা নিয়ে উত্তর পূর্বের একে একে সব সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের সাথে একদিকে যেমন কথা হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত হস্তী-বিশেষজ্ঞ (Elephant man of India) বাঙ্গালুরুস্থিত ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব সাইন্সের অধ্যাপক রমন সুকুমার স্যারের সঙ্গেও বছরদিন আগে কথা হচ্ছিল। আজ অব্দি কোন হিল্লে হল না! বরাক উপত্যকার আজকের দিনে সাকুল্যে ৭টি হাতি রয়েছে। হারাধনের এই সাতটি ছানার তিনটি ( ১টি করে পুরুষ ও স্ত্রী, এবং তাদের একমাত্র শিশুশাবক) রয়েছে কাটাখালের জঙ্গলে, বাকি চারটে (সবক’টিই স্ত্রী) পাথারিয়ার জঙ্গলে রয়েছে। ভিসা পাসপোর্ট ছাড়াই গোটা বছরে ওদের পাঁচ থেকে ছ’বার ভারত–বাংলাদেশের মধ্যেকার জঙ্গলে আনাগোনা অব্যাহত।

এখানে বলে নেওয়া উচিত যে হাতির সংখ্যা গোটা দেশের মধ্যে সবচাইতে বেশি রয়েছে কর্ণাটকে, এর পরেই রয়েছে আসাম। যদিও ২০১৯ এর হাতি সুমারির তথ্য এখন পর্যন্ত হাতে আসেনি, কিন্তু ২০১৭-র তথ্য অনুযায়ী আসামে মোট ৫,৭১৯টি হাতি ছিল, যা এর আগের তথ্য (২০০২ সালের) তুলনায় ৪৭৩টা বেশি।  রক্ষণশীল অনুমানেও ২০১৯-র আসামে হাতির সংখ্যা প্রায় ৬০০০-এর বেশি হবে, এতে সন্দেহ নেই। এবং এই সংখ্যার বেশির ভাগই রয়েছে মধ্য আসামের বিস্তীর্ণ অরণ্যভূমি জুড়ে। দক্ষিন আসামের কামরূপ, ধুবড়ি, মানকাছর বডোল্যান্ড ইত্যাদি এলাকাতেও কম বেশি হাতি রয়েছে। গুয়াহাটির অদূরে থাকা রানী-গাড়ভাঙ্গা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের হাতীদের নিয়েও আরেকখানা গবেষণাপত্র এরই মধ্যে প্রকাশ পাবে।  ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণ প্রান্তের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকা জুড়ে তিনটি এলিফেন্ট করিডোর রয়েছে। এ গুলোর প্রথমটা কাজিরঙ্গা থেকে পাশে থাকা লাওখোয়া/ বুড়াচাপরি অভয়ারণ্য। দৈর্ঘ্য- ৫০-৫৫ কিলোমিটার। দ্বিতীয়টা কাজিরঙ্গা থেকে থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ক্রমে বাগসার সংরক্ষিত বনাঞ্চল, ডিজো সংরক্ষিত বনাঞ্চলের দক্ষিন অংশ হয়ে, ধলাপাহাড় হয়ে, সোয়াং সংরক্ষিত বনাঞ্চল, বামুনি সংরক্ষিত বনাঞ্চল, কঠিয়াতলি হয়ে হোজাই-র পাশে থাকা ডবকা সংরক্ষিত বনাঞ্চল অবধি বিস্তৃত।দৈর্ঘ্য- ৬০-৬৫ কিলোমিটার । এবং তৃতীয়টা কাজিরঙ্গা জাতীয় উদ্যান থেকে সোজা দক্ষিণ দিকে  উত্তর কারবি আংলং অভয়ারণ্য অবধি বিস্তৃত। দৈর্ঘ্য- ৪৫-৫০ কিলোমিটার (ছবি-১)। এই করিডর গুলোর মধ্যে দ্বিতীয়টি অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ, এবং এই করিডরের মোটামোটি মধ্যভাগেই রয়েছে বামুনি পাহাড়, যেখানে সম্প্রতি এক সাথে দেড় ডজন হাতির মৃত্যু হল।

গুয়াহাটি ভিত্তিক যাবতীয় সব সংবাদ মাধ্যম দিনরাত এক করে একের পর এক ব্রেকিং নিউজ, বিশেষজ্ঞদের দিয়ে আলোচনা ইত্যাদি করিয়েছে যদিও, কিন্তু কারো মুখেই করিডোর গুলোর কথাটা উঠে আসলো না! তাঁদের কেউই উল্লিখিত করিডোরের স্বাস্থ্য সম্পর্কে না ওয়াকিবহাল, না সংরক্ষণ-মুখর। অন্যদিকে বন বিভাগও নিজেদের ঢাক এই বলে পেটাচ্ছে যে সাম্প্রতিক দিনে রাজ্যে ২২২ বর্গ কিলোমিটার বনাঞ্চল বৃদ্ধি হয়েছে। তবে ওটা ২০১৭ থেকে ২০১৯, এই দুবছরের তুলনামূলক তথ্য; এবং শতকরার হিসেবে সেটা তেমন কোন সন্তোষজনক নয়। আবার অনেকেই ফেবু-টুইটার মাধ্যম বজ্রাঘাতের এই থিয়োরিটা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন।  আবার অন্যদিকে প্রাইভেট কোম্পানি কর্তৃক বামুনি পাহাড় বেদখলের তত্ত্বও আলোচনায় এসেছে। সময়টা কঠিন! অতিমারি-জনিত সেমি লক-ডাউন। দুর্যোগের ঘনঘটা। অনেকেই করোনাক্রান্ত... মৃত্যুর মিছিল আনলিমিটেড। যেহেতু ঘরের বাইরে পা রাখার জো প্রায় নেই, তাই হাতে সময়ও আনলিমিটেড। অনেকের আবার আনলিমিটেড মোবাইল ডাটাও ! এর জন্যই কি এত্তোসব বহুমুখি তথ্য !!

হ্যাঁ, খবরটা প্রথম পেয়েছিলাম ১৩ মে-র সন্ধ্যেবেলা। দুর্ঘটনাস্থল লাগোয়া জায়গায় বাড়ি রয়েছে এবং এই নির্দিষ্ট বিষয়ের (Study of Elephant corridors বা করিডোর অধ্যয়ন) উপর গবেষণারত ছাত্র জ্যোতি বিকাশ বৈশ্যকে সে রাতেই ফোনে পাকড়াও করলাম। অতিমারির এই দিনে সদ্য-বিবাহিত ছাত্রটার উপর প্রভাব খাটাতে নিজের কিছুটা খারাপও লাগছিল বৈ কি! কিন্তু, গবেষণার স্বার্থে, বিষয়টা তো আর হাতছাড়া করা যায় না। মরিগাও জেলার যেখানে ছেলেটার বাড়ি, সেখান থেকে বামুনি পাহাড়ের দুরত্ব ৫২-৫৪ কিলোমিটার। ছেলেটার বাইকের নম্বর জোড় সংখ্যার। পরদিন অর্থাৎ ১৪ তারিখ, মরিগাও জেলায় জোড় সংখ্যার গাড়ি চলার অনুমতি রয়েছে, কিন্তু পাশের নওগাঁ-তে বেজোড়! সে আরেক হ্যাপা। যাকগে! জোড়-বেজোড় বিষয়টাকে জোড়াতাপ্পি মেরে ছেলেটা গিয়ে ওখানে পৌছালো এবং নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বামুনিপাহারের উপর থেকে আমাকে ফোন করলো। তখন সময় সকাল আটটা।

বামুনি পাহাড় বলে যেটাকে এতক্ষন বলছি, সেটা হচ্ছে গিয়ে বামুনি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। নগাও জেলার কঠিয়াতলি বন বিভাগের আওতায় থাকা এই বামুনি বনাঞ্চল প্রায় এক লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার হেক্টর জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। বনাঞ্চলের এখানে সেখানে ছোট থেকে মাঝারি পাহাড় দিয়ে ঘেরা। এই পাহাড়ি পথের চরাই- উতরাই দিয়েই ধলাপাহাড় পেরিয়ে সোয়াং বনাঞ্চল হয়ে  হাতিগুলো বামুনি পাহাড়ে এসে পৌছায়।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী তেরো মে দিনটির ৩-৪ দিন আগে থেকেই সেখানে বজ্র-বিদুত সহ মুশলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। ইন্ডিয়ান মেটেরোলজিকেল ডিপার্টমেন্ট-এর ওয়েবসাইটে দেওয়া পূর্বাভাসেই উল্লেখ রয়েছিল যে ১২ তারিখ থেকে পরবর্তী ৫ দিন দমকা হাওয়া (প্রায় ৭-১১ কিলোমিটার বেগে) এবং বজ্রবিদ্যুৎ সহ সেখানে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা, এবং বাস্তবে হয়েছিলও তাই। আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম বলে একটা আভাষ আবহাওয়া দপ্তর দিয়ে থাকে।  গভীর সমুদ্রে  মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের ক্ষেত্রে যেমন তা প্রযোজ্য, লোকগুলোকে বারণ করা হয়, উত্তর পূর্বের বনাঞ্চলের বনকর্তাদের বন্যপ্রাণীদের গতিবিধি লক্ষ্য করে,  তাদের জন্যও অনুরূপ পদক্ষেপ গ্রহন করাটাও মনে হচ্ছে আশু কর্তব্য। কিছু একটা আগাম পদক্ষেপ হাতে নিলে, হাতীদের করুন মৃত্যু নিয়ে জনমানসে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তাতে কিছুটা হলেও মলম লাগানো যেতো। যাকগে, ভবিষ্যতের জন্য এ এক শিক্ষা হয়ে রইলো! এনিয়ে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত Oryx-জার্নালে আমাদের একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন ইতিমধ্যেই প্রকাশ পাবে।

 বার্তালিপি ৩০ মে, ২০২১

মারা যাওয়া ১৮টি হাতীদের মধ্যে  ৫টা মাদা এবং ১৩টা স্ত্রী। এর মধ্যে ৪টা বাচ্চা হাতি। ১৪ টা পাহাড়ের চুড়ায় এবং বাকি ৪টার মৃতদেহ পাহাড়ের ঢালু এলাকাতে ছড়ানো। বামুনি পাহাড়ের উপরিভাগ, যে স্থানটা হাতীদের গনমৃত্যুর সাক্ষী, সেখানে গাছপালা প্রায় নেই বললেই চলে। এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দু-চারটা সেগুন গাছ, মাঝারি ধরনের ঝোপ-জঙ্গল আর বাঁশঝাড়। এদের কোনটাই গহীন জঙ্গলের চারিত্রিক বৈশিষ্ট নয়! অতএব, একটা কথা পরিস্কার, যতই ২২২ বর্গ কিলো মিটার বনাঞ্চল বৃদ্ধির দাবী করা হোক না কেন, মাথার উপর বৃক্ষ-চন্দ্রাতপ (ছাউনি) না থাকা করিডোর দিয়েই হাতীদের চলাচল করতে হচ্ছিল! আর এর দায় কি শুধু সরকার বাহাদুরের উপর? ওই যে বললাম,  কাজিরঙ্গা থেকে ডবকা পাহাড়, দীর্ঘ ৬০-৬৫ কিলোমিটার এলিফেন্ট করিডোরের মাঝে মধ্যের বিশাল জায়গা জুড়ে গত দু-তিন দশক ধরে শুরু হয়েছে ধানচাষ। জমির মালিক সরকার, ধানের মালিক গেরস্ত। রাজ্যের প্রায় অধিকাংশ বনাঞ্চল জুড়েই অবৈধ গেরস্তদের এরকম ‘অনধিকার-চর্চার’ দৃশ্য চোখে পড়ে। উপত্যকার রজনিখালে বছরদিন আগে যা হয়েছিল, গোটা রাজ্যজুড়ে সেরকম ব্যাপক অভিযান চালানো  মনে হচ্ছে খুবই দরকার। অন্ততঃ বন্যপ্রাণী এবং তাঁদের আবাসস্থল রক্ষাকরার জন্য।

বজ্রপাতের ফলে এই দুর্ঘটনা সংঘটিত হওয়ার স্বপক্ষে কথা বলার জন্য দু-দুখানা ফটো আমাদের হাতে এসেছে। একটাতে দেখা যাচ্ছে যে বজ্রপাতের ফলে হাতির শুড়ের মধ্যে কিছুটা অংশ ছেঁকা লেগে পুড়ে গেছে (ছবি-২) এবং  অন্যটাতে সে জায়গায় থাকা গাছগুলোর পাতা ঝলসে গেছে (ছবি-৩)। ইতিমধ্যে, অর্থাৎ  ২৩ মে, ২০২১ তারিখ ময়না তদন্তের রিপোর্টখানাও বেরিয়ে এসেছে। গুয়াহাটির খানাপাড়াস্থিত আসাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক এস, এম, তামুলি এবং সহকারি অধ্যাপক এ, ডেকা মরা হাতিগুলোর চামড়া, রক্ত এবং দেহকোষ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানিয়েছেন যে, হাই ভল্টেজ ইলেকট্রিক কারেন্টের আঘাতে হাতিগুলোর শরীরে প্রচুর ক্ষতের দাগ পরিলক্ষিত হয়েছে। রিপোর্টে উনারা এটাও উল্লেখ করেছেন যে হাতিগুলোর দেহের উপরিভাগের চামড়া তার নিচের টিসুগুলো থেকে আলাদা হয়ে গেছে, দেহের কোষ গুলো থেঁতলে গেছে, ধমনী এবং শিরাগুলো ফেটে চৌচির হয়ে গেছিল, ফলে আভ্যন্তরিন রক্তপাত ঘটেছে।

যদিও পুরো ঘটনাটাই দুর্ভাগ্যজনক, এবং আসাম তথা গোটা ভারতে এমন ঘটনা এর আগে শোনা যায় নি, কিন্তু এ জাতীয় ঘটনা পৃথিবীতে  যে এর আগে কক্ষনো ঘটে নি, তা নয়। অন্তত দু-দুবার ঘটেছে। ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই আমেরিকার উটা-র ‘মিল কেনিয়ন পিক’-এ বজ্রাঘাতে একসাথে ৬৫৪টা ভেড়া মারা যায়। আবার ৬-৭ বছর আগে (২০১৬ সালের আগস্ট মাসে) ইউরোপের নরওয়েতে  একইভাবে বজ্রপাতে ৩২৩-টা বল্গাহরিণ মারা গেছে যাদের মধ্যে ৭০টাই ছিল হরিনশাবক। বজ্রপাতে বন্যপ্রাণী মারা যাওয়ার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আমেরিকার জাতীয় মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডল প্রশাসন (NOAA)-এর বজ্র-বিদ্যুত বিশেষজ্ঞ জন জেন্সেনিয়াস (John Jensenius) বলেছেন যে খোলা আকাশের নীচে থাকা প্রাণীদের দেহে দুভাবে বাজ আঘাত হানতে পারে। প্রথমটা সরাসরি প্রাণী দেহে এসে পরে; এবং দ্বিতীয়, তির্যক বা সাইড ফ্ল্যাশ। সরাসরি যেটা এসে পরে, সেটা অবজেক্ট অর্থাৎ প্রানিদেহ-কে (অথবা যেখানে প্রানিটা রয়েছে সেই মাটিকে) স্পর্শ করে, ফলে প্রানিদেহ অথবা সেই মাটি তড়িতায়িত হয়ে পড়ে। আর যে মাটি তড়িতায়িত হলো, সেটা ৫০ থেকে ৮০ মিটার ব্যাস জুড়ে সেই মুহূর্তে (সাময়িকভাবে) কারেন্ট থাকে। এমনিতেই প্রাকৃতিক কোন দুর্যোগের সময় বনের পশুরা স্বাভাবিকভাবেই এক জায়গায় জটলা বেঁধে থাকে। এটা তাদের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি। এর ফলেই একসাথে এতগুলো প্রাণী মারা যায়। দ্বিতীয়টা, অর্থাৎ সাইড ফ্ল্যাশ সম্পর্কে জেন্সেনিয়াস বলেছেন, ঘটনাস্থলে যদি উঁচু গাছপালা থাকে, তাহলে বাজ এসে প্রথমে পরবে সে গাছ গুলোর উপর, এবং সঙ্গে সঙ্গে তা ছিটকে গিয়ে পাশে থাকা প্রাণীর উপর পড়ে। হটাত করে আসা সেরকম কারেন্ট প্রাণীদের নার্ভাস সিস্টেম কে আক্রমন করে এবং এর ফলে স্নায়ু-তন্ত্র তথা মস্তিষ্ক আচমকা স্থবির হয়ে পড়ে। তবে এ দুটোর মধ্যে  সাইড ফ্ল্যাশের ক্ষেত্রে প্রাণীদের কম মাত্রায় হলেও বাঁচার সম্ভাবনা থাকে। এবং সেটা সম্ভব হয় যদি খুব অল্পসময়ের মধ্যে প্রাণী টাকে সি-পি-আর (অর্থাৎ Cardio-Pulmonary Resuscitation) করানো হয়। তবে উন্নতদেশগুলো বন্যদের জন্য ঐ CPR-এর কথা ভাবতে পারে, আমাদের এখানে যেখানে সাধারন একটা ‘ক্যাথ-ল্যাব’-এর অভাবে পথে ঘাটে সায়ন্তন-রা মারা যাচ্ছে, সেখানে ওমন ভাবনা করাটাই ব্যাকুলতা বৈ কি আর হতে পারে?

এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে চলে আসছি। এবারের পরিবেশ দিবসটা এলো বলে…। এ বছরের থিম, ECOSYSTEM RESTORATION, অর্থাৎ ‘বাস্তুতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা’। রাজ্যের বামুনি পাহাড়ের একদল হাতি মরে গিয়ে একটা কথা প্রমান করে দিল যে আমরা যে যাই বলি না কেন, বনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য  বন্যদের মধ্যে নেই! হাতীদের বলা হয় ‘আমব্রেলা প্রজাতি’ (Umbrella species)। অর্থাৎ এদের ভালভাবে রক্ষা করলে চেনা-অচেনা অন্য হাজার প্রজাতির সুরক্ষা এমনি এমনিই হয়ে যায়। তাই বলছিলাম, তাদের সুরক্ষার জন্য  বেদখল মুক্ত করে করিডোর গুলোতে ব্যাপক বৃক্ষ-পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এ সময়ের আহ্বান। আজদের দিনে অমন একখানা পদক্ষেপ হাতে নিলে, এ গাছগুলো যখন বড় হবে, অর্থাৎ, পনেরো-কুড়ি বছর পর আসামের পাহাড়ে একই ধরনের বজ্রপাত হলে সেদিন হাতিগুলোকে হয়তঃ বা ওমন বেঘোরে প্রান হারাতে হবে না…   

শনিবার, ১ মে, ২০২১

অক্সিজেন অক্সিজেন এভরিহোয়্যার, নট আ বাবল টু ব্রিদ!




 

।। পার্থঙ্কর চৌধুরী।।

(C)বার্তালিপি

 



         সামুয়েল টেইলর কোলেরিজের ‘ রাইম অব দ্য এন্সিয়েন্ট মেরিনার’-কবিতার সেই বিখ্যাত লাইনটি মনে আছে তো….. মাঝদরিয়ায় নাবিক হাহাকার করে চেঁচাচ্ছিলেন আর বলছিলেন, ‘জল, চারদিকে জল, কিন্তু হায়… এক ফোঁটা জল নেই!’  ভারতের প্রাণকেন্দ্রে গত সপ্তাহে জনা পঁচিশেক লোকের মর্মান্তিক মৃত্যু সেই লাইনগুলোর আক্ষরিক অর্থে পুনরাবৃত্তি হচ্ছে!  শুধু জলের বদলে আমাদের বলতে হচ্ছে -  ‘অক্সিজেন, অক্সিজেন এভরিহোয়ার, নট আ বাবল টু ব্রিদ…!’ যদিও প্রাথমিক ভাবে মৃত্যুর জন্য মারণ ভাইরাস-ই দায়ী, তবুও জীবনদায়ী ‘অম্লজান’ পেলে তাঁরা হয়ত: বা শেষ সংগ্রাম আরেকটু হলেও চালিয়ে যেতেন!

হ্যাঁ। ‘অম্লজান’ শব্দটা সেকেলে। ‘নোমেন অব্লিটাম’। মাতৃভাষায় পড়া ছেলেমেয়েদের কাছেও শব্দটা আনকোরা নতুন ঠেকবে! তাহলে আর… ( না…, ওই দুর্মুখানন্দের মন্তব্য অবতারণ করে পত্রিকার জায়গা নষ্ট করার অভিপ্রায় এই মুহূর্তে নেই….., সে না হয় পরে হবে ’খন…!) বরং যে শব্দটা সবার মুখে মুখে চালু, সেটাই বলি, ‘অক্সিজেন’। আজকের দিনে সবচেয়ে মহার্ঘ হয়ে ওঠা সেই অদৃশ্য অথচ অপরিহার্য অক্সিজেন।

এখন মৃত্যুর মিছিল…! প্রত্যেক দিনই নতুন নতুন চেনা-জানা-দের পজিটিভ হওয়া নতুবা ভাইরাসের ছোবলে মৃত্যুর খবর আমাদের সবারই ‘বেঁচে থাকার আশা’-টাকে খাদের মুখে টেনে নিচ্ছে। হচ্ছে বৈ কি? যে শহরে যত বেশি ঘন-বসতি, সেগুলো থেকেই যেন বেশি বেশি  আতঙ্ক আর উদ্বেগের খবরগুলো আসছে ইদানীং! যাবতীয় সব-কিছুর বাইরে এসে, সময়টা সত্যিকার অর্থেই মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়ানোর। টুইট- টিপ্পনী করার সময় এটা নয়, মামাবাবু…!

AAP-নারাও মাইরি…! আট আট খানা ‘পি-এস-এ’ প্লান্ট এর বরাদ্দ পেয়ে এখন অব্দি মাত্র এক!  আমাদের মত কর্মচারীদের এক দিনের মাইনে থেকে পাওয়া টাকা দিয়েই তো সেটা করার কথা ছিল! তাহলে? আর শুধুমাত্র কি AAP-নি? যেখানে একটা ‘পি-এস-এ’ প্লান্ট  স্থাপন করতে মাত্র দু সপ্তাহ সময় লাগে, সেখানে গেলো ডিসেম্বরে গোটা দেশে ১৬২ খানা বরাদ্দকৃত  প্লান্ট এর মধ্যে মাত্র তেত্রিশ! যে যাই বলুক না কেন, ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ টা আসবে কি আসবে না… সবাই যেন বিষয়টা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। তাই  সবখানেই এই ‘যদ-ভবিষ্য’ মানসিকতা! এর থেকে বেরিয়ে না আসলে কি করে চলবে? সারা দেশে যে ৫৫১ টা প্ল্যান্ট বসানো চাই।

টেকনোলজি সর্বস্ব আধুনিক জীবনে অক্সিজেনের ব্যবহার সর্বত্র। মহাকাশে রকেট ছাড়ার সময়ও প্রচুর পরিমাণের সিলিন্ডার ওখানে গুঁজে দেওয়া হয়। এছাড়াও কল-কারখানায়, ওয়েল্ডিং ইত্যাদি বিভিন্ন কাজেও রয়েছে প্রচুর পরিমাণ অক্সিজেনের ব্যবহার। হাসপাতালের রোগীদের জন্য এর চাহিদা তো রয়েছেই। তবে যে কথাটা এখানে বলে নেওয়া দরকার, তা হল, কল কারখানায় ব্যবহার করা আর রোগীদের জন্য ব্যবহৃত অক্সিজেন, এ দুটোর বানানোর পদ্ধতি কিন্তু আলাদা।

বলছিলাম, মাটিতে যেখানে আপনি পা রেখেছেন, সেখান থেকে  আকাশের দিকে সোজা লাইন ধরে এগোলে, ৮ থেকে ১০ ( সর্বোচ্চ ১৪.৫) কিলোমিটার জুড়ে যতটুকু জায়গা, সেটা ট্রপোস্ফিয়ার। ট্রপোস্ফিয়ারের পর রয়েছে, স্ট্রেটোস্ফিয়ার, মেসোস্ফিয়ার এবং এর পর থার্মোস্ফিয়ার। এদের অন্তর্বর্তী স্থান গুলোতে রয়েছে স্ট্রেটোপোজ, মেসোপোজ ইত্যাদি, এবং সব উপরে অর্থাৎ থার্মোস্ফিয়ারের মধ্যেই রয়েছে আয়নোস্ফিয়ার। এই সাত-সাতটা স্তরের মধ্যে শুধুমাত্র নিচের ৮-১০ কিলোমিটার, অর্থাৎ আমরা যেখানে রয়েছি, সেটাই অক্সিজেনের একমাত্র ঠিকানা।

স্বল্প পরিসরে যদি কেউ পরীক্ষাগারে অক্সিজেন বানাতে চান, তাহলে সহজ উপায় হল  জলকে তড়িৎ-বিশ্লেষণ (বা Electrolysis) করে। অবশ্য এটা অত্যন্ত ধীর পদ্ধতি এবং ধরুন ৫-৬ ঘণ্টায় সাকুল্যে ৮ থেকে ১০ গ্রাম  বানানো যেতে পারে। ওই যে দুটো আলাদা পদ্ধতির কথা বলছিলাম, তার প্রথমটা, অর্থাৎ কারখানায় ব্যবহৃত অম্লজান হিমশীতল (অর্থাৎ, ক্রায়োজেনিক) পদ্ধতিতে বানানো হয়, এবং রোগীদের নাকে গুঁজে দেওয়ার জন্য PSA ( অর্থাৎ Pressure Swing Adsorption) পদ্ধতিতে এটা বানানো হয়। বায়ুমণ্ডলে তো বেশ কিছু গ্যাস মিলে মিশে রয়েছে। এই প্রেসার সুইং পদ্ধতিতে একটা শোষক (বা adsorbant, জিওলাইট বা এক্টিভেটেড  কার্বন) ব্যবহার করা হয়।  নির্দিষ্ট গ্যাসের আণবিক ধর্ম (molecular characteristics) এবং শোষক পদার্থের প্রতি আকর্ষণের ( affinity for the adsorbent) মাত্রার উপর নির্ভর করেই গ্যাসীয় মিশ্রণ থেকে এক একটা গ্যাসকে আলাদা করা হয়। হাসপাতালে ব্যবহৃত জীবনদায়ী অক্সিজেন বানানোর পদ্ধতি এটাই। বিশুদ্ধতার দিক দিয়ে বলতে হয়, প্রেসার সুইং পদ্ধতিতে বানানো অম্লজান ৯৯শতাংশ খাঁটি, যেখানে ক্রায়োজেনিক পদ্ধতির বিশুদ্ধতার মাত্রা শতকরা ৯০-৯৩ শতাংশ।

 

দেশ-বিদেশের বেশ কিছু কোম্পানি রয়েছে যাদের পেশাই হচ্ছে এই মেশিনগুলো বানানো। ছোট-খাট একটা মেশিনের দাম তেমন আহামরি কিছু নয়। এই ধরুন দিনে ২৪-২৫টা সিলিন্ডার ভর্তি করা যাবে, সেরকম একটা মেশিন প্রায় ৩২-৩৩ লাখ টাকাতেই হয়ে যায়। এ কাজটা দু-সপ্তাহের মধ্যেই করে নেওয়া যায়। আর এর জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা? বেশি থাকলে ভালো, তবে ন্যূনতম একটা দশ বাই দশ কিম্বা বারো বাই বারো কোঠা হলেই চলে। চেষ্টা করলে আজকের দিনে যে কেউ এটাকে ‘স্টার্ট-আপ’ হিসেবে নিতে পারেন। এটাই যেখানে ন্যূনতম চাহিদা, সেখানে ‘AAP-নার’ এত বড় ‘ভুল” কেন হল…? প্রশ্নটা থেকেই যায়…! আদালতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দিল্লীর পরিধি অঞ্চলের হাজার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকাতে নাকি কোনো ‘প্রেসার সুইং’ প্ল্যান্ট নেই!

 তবে হ্যাঁ, একটা কথা! প্ল্যান্ট যেখানই বসানো হোক না কেন, যে বাতাসটা (অর্থাৎ Raw materials) থেকে অক্সিজেন, বিশেষ করে রোগীদের ব্যবহারের জন্য বানানো হবে, সেটা তো কলুষ-মুক্ত হওয়া চাই। ২০১৪ সালে চালানো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার  গোটা বিশ্বের ১৬৫০ টা শহরের মধ্যে চালানো এক সমীক্ষা মতে রাজধানী দিল্লীর বাতাসের মান নাকি একেবারে নিচুতলায়…!


সচরাচর বাতাসে থাকা মিশ্র গ্যাসের মধ্যে অক্সিজেনের ভাগ ২১%। সেটা আমাজনের ঘন জঙ্গল হোক, কিম্বা কালো-ধোঁওয়ায় ছেয়ে যাওয়া কোন শিল্প-প্রতিষ্ঠানের অঙ্গন হোক। তারতম্য হয় বাতাসে ভেসে থাকা বিভিন্ন ভাসমান দুষক-কণার মাত্রায়। তাই অপেক্ষাকৃত ভালো পরিমণ্ডলে প্ল্যান্ট স্থাপন নিঃসন্দেহে অপেক্ষাকৃত ভালো ফলদায়ী। আর এই ভালো পরিমণ্ডল সৃষ্টি করার উদ্যোগ তো দেশবাসীর উপরই বর্তাচ্ছে। লোকশিক্ষা দুভাবে হয়। এক দেখে; দুই ঠেকে। ইদানীং আমাদের দ্বিতীয় অভিজ্ঞতাটা হয়েছে।

ভাবছিলাম, উত্তর পূর্বের কথা। একটু চেষ্টা করলে সিলিন্ডারের বাইরেও তো ‘ক্লিন-এয়ার’ আমাদের এখানে সহজেই সম্ভব। প্রয়োজন শুধু সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার।  বর্ষার মরশুম তো এসেই গেল… অন্যান্য খালি জায়গায় চারা রোপণের পাশাপাশি এ মরশুমে বড় বড় সড়কের দু মাথায় জীবনদায়ী গাছ তো লাগানো যেতে পারে। আরেকটা কথা। অক্সিজেন সৃষ্টি করতে বটগাছের জুড়ি নেই। যতদিন বাঁচে, ২৪X৭ অক্সিজেন সে দিয়েই যায়। এছাড়া অন্যান্য ফলমূল আর ওষধি গাছ তো রয়েছেই। সে গুলোও তো পশু পাখি ছাড়াও জীবজগতের অন্যান্য প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে সক্ষম।

এ প্রান্তটা সাত বোনের। তাই বলছিলাম, আরও ভালো হয়, পাশাপাশি থাকা দুই রাজ্য (এবং তাদের বন বিভাগ) যদি সীমান্ত এলাকাতে যৌথউদ্যোগে এ কাজটা শুরু করে। এতে করে, গাছ লাগানোর পাশাপাশি ভাতৃত্ববোধের অনন্য নজিরও গড়ে তোলা যেতে পারে। এর জন্য দরকার পাশাপাশি থাকা রাজ্যগুলির সরকারি উদ্যোগ। সবাই মিলে সাত বোনের দেশে এরকম ‘বৃক্ষ-সেতু’ গড়ে তোলতে পারলে অক্সিজেন সংকট (Nature’s Oxygen Crunch) প্রতিরোধ করার পাশাপাশি পাশের রাজ্যের সাথে ‘মনের মিল’ স্থাপনের জন্য এর থেকে আর ভালো পথ হতে পারে না…!

তৃতীয় ঢেউ আসার আগেও যে হাতে আর খুব একটা সময় নেই…!  

 

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২০

ভাষা, গল্প, কবিতা, উপন্যাসের ভবিষ্যৎ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এ-আই)

 ।। দেবব্রত দেব ।।


         বাংলা বানান শুদ্ধি, ব্যাকরণ, বাক্য গঠন, ইত্যাদি নিয়ে অনেক সময়ই বোদ্ধাগণের মধ্যে বেশ গম্ভীর আলোচনা হয়, বিতর্ক হয়। এবার বানান শুদ্ধির পক্ষে যারা (এবং যারা নন অনেক সময় কিছু ব্যবহারিক কারণে) তাদের জন্যে আমি এই বিতর্কের একটা অন্য দিক তুলে ধরব।

'স্পেল চেকার' - বানান পরীক্ষক

কম্পিউটারে টাইপ করার সময় যে স্বয়ংক্রিয় 'স্পেল চেক' সুবিধাটা উপভোগ আমরা করি তার পেছনে একটা সফটওয়ার কাজ করে। এই সফটওয়ার যে যুক্তি নিয়ে কাজ করে তা শুধু অভিধান আর ব্যাকরণ থেকে আসে না। সফটওয়ারকে প্রথমে বানান ভুলটা ধরতে হয় তার পর সেই ভুল বানানের শুদ্ধটা দেখাতে হয়। এবার বানানে ভুল ধরা খুবই সহজ, টাইপ করা কোনো শব্দকে শুধু একটা স্বীকৃত অভিধানের সাথে তুলনা করলেই হল। এরপর স্পেল চেক সফটওয়ার কে সম্ভাব্য সঠিক বিকল্প লেখককে দেখাতে হয়। এই কাজটা তুলনা মূলক ভাবে মুশকিল। কারণ এখানে, টাইপ করা শব্দটিতে ভুলের পরিমাণের উপরে নির্ভর করে একাধিক সঠিক বিকল্প থাকতে পারে। যেমন যেমন ধরুন আমি লিখব "অমর", ভুল করে লিখলাম "অমির"। তাহলে স্পেল চেকার "অমির" এর সঠিক বিকল্প হিসাবে "আমার", "আমির" "আমীর", "আমিন", "অমর" ইত্যাদি অনেক শব্দই দেখতে পারে এবং সেই বিকল্প শব্দের তালিকা থেকে আমি আমার পছন্দের শব্দ নিয়ে নিতে পারি।

এবার আরও উন্নত স্পেল চেকার কিন্তু শুধু অভিধানের সাথে তুলনা করে সব ধরণের বিকল্প শব্দ না দেখিয়ে, বরং সেই ভুল শব্দ যে লাইনে আছে সেই লাইনের 'সম্ভাব্য অর্থ বোঝে' সবচেয়ে উপযোগী একটা শব্দ সঠিক বিকল্প হিসাবে দেখাতে পারে। এরকম করে আরও উন্নত স্পেল চেকার এক সময় শুধু অভিধান নির্ভর না থেকে ব্যাকরণ সহায়ক সফটওয়্যার হিসাবে উন্নীত হয়। ইংরেজি ভাষার জন্যে এরকম সফটওয়্যার এর উদাহরণ হচ্ছে "Language Tool" এবং "Grammarly"। বাংলা ভাষার এরকম কোনো সফটওয়ার আছে কি না জানা নেই। তবে নিশ্চয়ই পৃথিবীর কোনও এক কোনায় এক বাঙালি "বাংলা ব্যাকরণি" সফটওয়ারের জন্যে কাজ করছে। এতক্ষণ "ধান ভানতে শিবের গান" করলাম, গান মনেহয় বেশ লম্বা'ই হয়ে গেল। তবে এবার ধান ভানা যাক।

এ-আই সফ্টওয়্যার

উপরের গানটাতে এটা বোঝাতে চাইছি যে বাজারে ইতিমধ্যেই এরকম সফটওয়্যার আছে যা শুধু বানান শুদ্ধ করে দেয় না, বরং বাক্যের ব্যাকরণ, গঠন, লেখার ভঙ্গি, একেকটা অনুচ্ছেদের সাথে কোনো শব্দ খাপ খাচ্ছে কি না ইত্যাদিও দেখিয়ে দেয়। এরকম ক্ষমতা থাক সফটওয়ার কে বলা হয় কৃত্রিমভাবে বুদ্ধিমান (Artificially Intelligent) সফ্টওয়্যার অথবা সংক্ষেপে এ-আই সফ্টওয়্যার। লেখা লেখির ক্ষেত্রে এরকম এ-আই সফ্টওয়্যার ইংরেজি ভাষা ছাড়াও জার্মান, ফরাসি, স্প্যানিশ, ইতালিয়ান ইত্যাদি ভাষায় সহজ লভ্য। আর বাংলা ভাষায়ও আশাকরি এরকম সফটওয়্যার আগামীতে আসবে যদি আমরা এরকম করে বাংলা ভাষায় চর্চা জারি রাখি।

কৃত্রিম উপন্যাস ও কবিতা

এ-আই সফ্টওয়্যার ইতিমধ্যে ইংরেজি ভাষায় উপন্যাস, কবিতা লিখেছে যা তর্কসাপেক্ষ ভালো মানের। ইচ্ছুকরা গুগল করলেই অনেক তথ্য পেয়ে যাবেন। তাহলে বর্তমানে আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে কৃত্রিম সফ্টওয়্যার কবিতা, উপন্যাস লিখছে, লেখকের লেখার ভুল শুদ্ধ সবকিছুই বলে দিচ্ছে। একটু এগিয়ে ভেবে বলা যায় যে এরকম ভবিষ্যও খুব দূর নয় যেখানে, শুধু সফটওয়্যার নয়, হার্ডওয়্যারও বেরোবে, যেমন একটা ছোট্ট কম্পিউটার চিপ (chip) যা আমাদের গলায়, মাথায়, অথবা মস্তিষ্কের ভেতরে কোনো এক জায়গায় লাগানো থাকবে, আর আমাদের কথা বলা বা চিন্তনকে পরিচালনা করবে যাতে আমরা প্রত্যেকেই একেকজন সুনীল গাঙ্গুলি অথবা কবি সুকান্ত হয়ে উঠবো। তখন সৃজনশীল কাজের সংজ্ঞাটাই কি হবে কে জানে।

অজানা ভবিষ্যৎ

এরকম একটা ভভিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে যখন বানানের শুদ্ধা-শুদ্ধি আর বাক্যের ব্যাকরণ নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে দেখি, তখন কেমন জানি নিরুপায় লাগে। নাতিসুদূর ভবিষ্যতে এ-আই প্রযুক্তি আমাদের ভাষা, চিন্তন, আত্ম প্রকাশের উপায়, জ্ঞানের আদানপ্রদান, ইত্যাদিকে এমন ভাবে দুমড়ে-মুছড়ে, উল্টে-পাল্টে বদলে দেবে যা আমরা হয়তো এখন কল্পনাই করতে পারবো না। আর হ্যাঁ, এ-আই প্রযুক্তির জন্যে শুধু ভাষা না, বৌদ্ধিক যা কিছু আছে সবই বদলে যাবে। তাই আমাদেরকে এখন থেকেই ভাবা উচিৎ কি ভাবে ভবিষ্যতের অবশ্যম্ভাবী এ-আই পরিচালিত বৌদ্ধিক জগৎকে আমরা গ্রহণ করবো।


তথ্যসূত্র



শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২০

মন্টি হল সমস্যা – অন্তর্দৃষ্টিকে চ্যালেঞ্জ করার খেলা

ভোগবাদ-ই হচ্ছে বর্তমান যুগের মূল মন্ত্র। সেই ভোগবাদের ভুক মেটায় পদার্থ বিজ্ঞান (Material Science)। প্রতিদিন পৃথিবীর কোণায় কোণায় বেশীরভাগ গবেষণাগারে শত শত বিজ্ঞানী এই নিয়ে কাজ করে চলেছেন যে কি ভাবে নতুন নতুন পদার্থ আবিষ্কার করা যায়। এই গবেষণার তাত্বিক ভিত্তি আসে পদার্থবিদ্যার প্রধান দুটি শাখা থেকে, যথা,   পরিসংখ্যানগত বলবিজ্ঞান (Statistical Mechanics) এবং কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান (Quantum Mechanics)। আবার এই দুটি ভাগেরই মূলে আছে সম্ভাব্যতা তত্ত্ব (Probability Theory)।  তাই বর্তমান যুগের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতে সম্ভাব্যতা তত্ত্বের একটা বিরাট ভূমিকা আছে। পদার্থ বিজ্ঞান ছাড়াও এই সম্ভাব্যতা তত্ত্বের উপযোগিতা আছে অর্থনীতি শাস্ত্রে। 
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ও অর্থনীতিতে এতো গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্তেও আমাদের স্কুলের পাঠ্যসূচীতে সম্ভাব্যতা তত্ত্বকে বিশেষ ভাবে রাখা হয়নি, আর যা আছে তাও খুব গুরুত্ব সহকারে পড়ানো হয় না। এ কারণে সম্ভাব্যতা তত্ত্বে আমাদের খুব মজবুত ভিত কখনোই গড়ে উঠে না। তাই এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের ভাল অন্তর্দৃষ্টিও (intuition) জন্মে না। অর্থশাস্ত্র অথবা বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজতো দূরের কথা, আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও সম্ভাব্যতার খেলা অনেক পরিস্থিতিতে আসে এবং আমরা তখন দুর্দান্ত রকম ভাবে বিফল হই আর অনেক ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।

সম্ভাব্যতা তত্ত্ব নিয়ে আমাদের এই দুর্বল অন্তর্দৃষ্টিকে পরীক্ষা করার জন্যে "মন্টি হল সমস্যা" হল এক খুব সুন্দর বৈজ্ঞানিক উপায়।

মন্টি হল (Monty Hall) সমস্যা হল একটি সম্ভাবনার ধাঁধাঁ যা মার্কিন টেলিভিশন গেম শো লেট'স মেক এ ডিল এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। হেঁয়ালিটির নামকরণ হয়েছে অনুষ্ঠানটির উপস্থাপক মন্টি হলের নামে। সমস্যাটি মন্টি হল হেঁয়ালি নামেও পরিচিত, কারণ এর প্রকৃত ফলাফল অসম্ভব মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সত্য। [বাংলা উইকিপিডিয়া থেকে নেওয়া মন্টি হল সমস্যার সংজ্ঞা]

মূলতঃ, মন্টি হল সমস্যা একটা অনুমানের খেলা। কখনো এটাকে সম্ভাব্যতার ধাঁধাঁ বা হেঁয়ালিও বলা হয়। এই খেলার চমকপ্রদ ইতিহাস আর বাকি বিবরণ উইকিপেডিয়ার পাতায় আছে। এই পোষ্টে আমি আমার মতো করে এই খেলার সম্ভাব্যতা তত্ত্বের দিকটা সংক্ষেপে আলোচনা করব। আর একদম শেষে সি-ভাষায় লেখা কম্পিউটার এর একটা প্রোগ্রাম দেব। এই খেলার বৈশিষ্ট্যগুলো কিছুটা এরকম বলা যেতে পারে:
  • এই সমস্যা আপনার অন্তর্দৃষ্টিকে একটি পরীক্ষার মধ্যে ফেলে!
  • গেমটি জিততে আপনার অন্তর্দৃষ্টি আপনাকে এমন কিছু করতে বলতে পারে যা সম্ভাব্যতার গণিত যা বলে তার সাথে বিপ্রতীপ হয়।
  • সুতরাং, এটা সত্যই একটা আকর্ষণীয় খেলা যা আমাদের দেখায় যে শুধু অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে সত্য কখনই অর্জন করা যায় না।
  • বরং গাণিতিক কঠোরতা এবং বৈজ্ঞানিক তদন্তই সর্বোত্তম উপায়।

কেমন করে খেলে ...

এই খেলায় রয়েছে
  • একজন পরিচালক এবং একজন খেলোয়াড়
  • তিনটে বাক্স (ক , খ এবং গ ) এবং একটা বল
  • খেলা শুরুর আগে পরিচালক তিনটে বক্সের যেকোনো একটাতে রাখবে বলটি
  • খেলোয়াড় জানেন না, বলটি কোন বাক্সে রয়েছে।
  • গেমটি জিততে খেলোয়াড়কে অনুমান করতে হয় কোন বাক্সে বলটি রয়েছে।
  • গেমটি নিম্নলিখিত ধাপে হয়:
    • প্রথমত, খেলোয়াড় অনুমান করে একটি বাক্স বেছে নেয় (ধরুন বাক্স ক)
    • তারপর পরিচালক বাকী দুই বাক্সের মধ্যে একটি খালি থাকা বাক্স খোলে (ধরুন বাক্স খ)
    • তারপর পরিচালক খেলোয়াড়কে জিজ্ঞাসা করে যে খেলোয়াড় তার অনুমানটি ক থেকে গ-এ বদল করতে চায় কিনা?
এখন প্রশ্ন: খেলোয়াড়ের কি করা উচিত? তার প্রথম পছন্দেই (বাক্স ক) বজায় থাক, না নিজের প্রথম অনুমান পরিবর্তন করে অন্য বাকি বাক্স (উপরের উদাহরণ অনুসারে বাক্স গ) নির্বাচন করা উচিত?


সম্ভাব্যতার অংক ...

সম্ভাব্যতার অংক মতে খেলোয়াড়কে সব সময়েই তার প্রথম অনুমান বদলে নেওয়া উচিত, তাতে তার জেতার সম্ভাবনা দ্বিগুণ বেড়ে যায়।

আসুন বোঝা যাক এটা কেমন করে হয়। প্রথমে তিনটে বাক্সের (ক, খ এবং গ) মধ্যে যেকোনো একটাতে বল থাকার সম্ভাবনা এক-তৃতীয়াংশ (১/৩)। সব বাক্সের সম্ভাবনা সমান (১/৩)। তার মানে যখন খেলোয়াড় প্রথম বাক্সেটা পছন্দ করল (ধরুন বাক্স ক) তখন বাকি দুটো বাক্সে বল থাকার মোট সম্ভাবনা (১/৩+১/৩=২/৩)। এবার পরিচালক বাকি দুটো বাক্স থেকে একটাকে (ধরুন বাক্স খ খুলে দেখিয়ে দিলেন যে ওটাতে বল নেই, তখনও বাকি দুটো বাক্সে (ক এবং খ-এ) বল থাকার মোট সম্ভাবনা ২/৩-ই রয়ে গেছে (খেয়াল করবেন "মোট সম্ভাবনা")। তাহলে কি দাড়াল? বাকি দুটো বাক্সের মোট সম্ভাবনা ২/৩, একটাতে (মানে বাক্স খ-এ) এখন জানা হয়ে গেছে যে বল নেই, তাহলে রয়ে যাওয়া বাক্সে (মানে বাক্স গ-এ) বল থাকার সম্ভাবনা বদলে গেলো, ১/৩ থেকে বেড়ে হল ২/৩। তারমানে, প্রথম যে বাক্সটা পছন্দ ছিল তাতে টাকা আদৌ আছে কি না তার সম্ভাবনা ১/৩, দ্বিতীয় বাক্স, যা পরিচালক খোলে দেখিয়েছিলেন যে ওটা খালি, তাতে বল থাকার সম্ভাবনা নেই (০), আর শেষ ব্যাগটিতে সম্ভাবনা ২/৩। তাহলে পরিচালকের হস্তক্ষেপের পর (মানে দ্বিতীয় বাক্সের সম্ভাবনা নেই শূন্য করে দেবার পর), খেলোয়াড়কে তার পছন্দ বাক্স ক থেকে বাক্স গ-এ বদলে নেওয়াই উচিত (সফলতার সম্ভাবনা ১/৩ থেকে বেড়ে হয়ে যাবে ২/৩, মানে দ্বিগুণ হয়ে যাবে)।
এটাকে অন্য ভাবেও বোঝা যায়। যেমন খেলোয়াড় যদি তার প্রথম অনুমানেই কায়েম থাকে, পরিচালক কি করল না করল তার কোনো কথাই ভাবে না, তাহলে তার জেতার সম্ভাবনা শুরুতে যা ছিল তাই রয়ে গেল, মানে জেতার সম্ভাবনা ১/৩ হয়ে রয়ে গেলো। তারমানে, পরিচালকের হস্তক্ষেপের পর খেলোয়াড় তার পছন্দ বদলালে, জেতার সম্ভাবনা হয়ে যাবে ১-১/৩=২/৩।

সম্ভাব্যতার ভুল অংক ...

কোনো কোনো খেলোয়াড় আবার অন্তর্দৃষ্টি বশতঃ একটু অন্য ভাবে ভাবতে পারেন আর সম্ভাব্যতার অংকে ভুল করে তার জেতার সম্ভাবনা টা কমিয়ে দিতে পারেন। তাহলে, ভুল ভাবনাটা হচ্ছে এরকম:

খেলোয়াড় একটা বাক্স অনুমান করে পছন্দ করেছে। পরিচালক বাকি দুটো বাক্সের মধ্যে কোনো একটা বাক্স, যেটা খালি, সেটা খুলে দেখিয়ে দিলন যে বল ওটাতে নেই। তাহলে এবার বল হয় খেলোয়াড় যে বাক্সটা পছন্দ করেছে তাতে আছে নয়ত যে বাক্সটা এখন খোলা হয়নি সেটাতে আছে। অন্য ভাবে বললে বল দুটো বাক্সের মধ্যে যেকোনো একটাতে আছে। তাই এই ক্ষেত্রে এখনও বন্ধ থাকা বাক্স দুটোর মধ্যে বল থাকার সম্ভাবনা সমান আর সেটা ১/২। তাই এই খেলায় পরিচালকের হস্তক্ষেপের পর খেলোয়াড় তার পছন্দ বদল করার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ বদল করলেও জেতার সম্ভাবনা সমানই থাকবে।

পরীক্ষা করে দেখা যাক ...

এখানে একটা কথা বলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, যেকোনো সম্ভাবনার খেলায় গাণিতিক যে সম্ভাব্যতার সংখা আসে সেটা পরীক্ষা করে দেখতে গেলে অনেক অনেক বার (যেমন ১ লক্ষ বার) খেলাটা খেলতে হয়। পরিসংখান তত্বের ভাষায় "নমুনার সংখ্যা" (sample size) বাড়াতে হয়। তারপর সব খেলার পরিসংখ্যান নিলে তবেই দেখা যাবে যে সম্ভাবনাটা ঠিক হচ্ছে কি না।

মন্টি হল (Monty Hall) সমস্যার খেলাটাকে লক্ষ বার খেলা হয়তো ব্যবহারিকভাবে একটু মুস্কিলই বটে, কিন্তু এখানে ব্যাপারটা সহজ হয়ে যায় যদি আমরা একটা কম্পিউটার এর সহায়তা নেই। এখানে সি-ভাষায় লেখা একটা কম্পিউটার কোড দেয় আছে। এটা যেকোনো কেউ চালিয়ে দেখে নিতে পারেন যে এতক্ষণ যা আলোচনা করলাম সেটা কতটুকু সঠিক।
#include <stdio.h>
#include <math.h>
#include <stdlib.h>
// This MONTY-HALL PROBLEM
// Written by- Debabrata Deb, TIET, Patiala
// To understand the code better 
// see the following video on YouTube (last 5 mins)
// https://youtu.be/rTSfPOOayaU
// Dated: 10th July 2020
int main(){
 int ii,nplay=10000000,bags[3];
    int hid,pid,heid;
    int nwin=0, win=0;
    for (ii=1;ii<=nplay;ii++){
        // set up the bags
        bags[0]=bags[1]=bags[2]=0;            // emptying all three bags
        hid=(int)(3*(double)rand()/RAND_MAX); // host chooses in which box to put ball
     bags[hid]=1;                          // ball is placed into the hid-th box
          // play the game
     pid=(int)(3*(double)rand()/RAND_MAX); // the player chooses the pid-th box
        
        do{
          // host has to choose an empty box which is neither pid nor hid
          // why not hid? because host only opens the box which is empty
          // and hid is the box which contains the ball. 
          heid=(int)(3*(double)rand()/RAND_MAX); // host's choosen empty box id
        }while(heid==hid || heid==pid);
        // game ends -- next we will check if the player have won 
          // to win with 2/3 probability, 
     // the player switches its choice from pid to
     // the third box which the host did not choose
     // in otherwords, because player would choose to switch to win more, 
     // now if the pid box has the ball then he looses
     if(bags[pid]==1) win=0;   // i.e. the player looses the game 
     else win=1;
        //printf("Game #%4d: ball was in %d box, Player chooses %d box, Host chooses %d box, win %d\n",ii,hid+1,pid+1,heid+1,win);
        
        nwin+=win;
    }
    printf("\nWin probability = %f (ideal=%f)\n",(double)nwin/nplay,2.0/3.0);
    return 0;
}
এই নিচে দেওয়া ইউটিউব ভিডিও তে মন্টি হল সমস্যার আগা-গোড়া আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে সি-ভাষায় লেখা উপরের কোড কেমন করে ব্যবহার করতে হবে, প্রোগ্রাম আউটপুট কেমন করে ব্যাখ্যা করবেন, এই সব বিশদ ভাবে রয়েছে। 



রবিবার, ৭ জুন, ২০২০

দেশান্তরে পরিবেশ



(পরিবেশ মনস্ক সাংবাদিক প্রয়াত  পীযুষ কান্তি দাস-এর প্রতি উৎসর্গীকৃত)


প্রয়াত  পীযুষ কান্তি দাস
কোন অনুষ্ঠানে সঞ্চালক যে ভুমিকাটুকু পালন করেন, এই উত্তর সম্পাদকীয় লিখতে গিয়ে আমাকে তাই করতে হচ্ছে যেহেতু অন্যদের মতামত এবং বার্তা নিয়েই  আজকের এই লিখাটা। সে রকম একটা অনুষ্ঠান বাস্তবে যদি করা হতো, সেখানে সঞ্চালক হিসেবে নিজের মত প্রকাশের অবকাশ খুব কমই থাকতোতাই নিজস্ব মতামত দেওয়া থেকে বিরত থাকতেই হচ্ছে।
সঞ্চালনা এবং ভাষান্তরঃ
পার্থঙ্কর চৌধুরী
 অধ্যাপক, বাস্তু ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগ,
আসাম বিশ্ববিদ্যালয়, শিলচর,
মুঠোফোন ∶ ৯৪৩৫০৭৮২৯৬
  
শঙ্খচিল দেখছিলাম, আর ভাবছিলাম সিনেমার নামটা নিয়ে। পাখিগুলোতো ভূগোলের জ্ঞান থাকে না! ভৌগলিক সীমানার ধার ধারে না আপনার আমার পরিবেশটাও ঠিক তাই দেশ এবং বিদেশের যে যেখানেই রয়েছেন, ঠিক ওই ছোট্ট মেয়েটার স্বাস্থ্যের মতো পরিবেশ নিয়ে যে উদ্বেক সেটাও কিন্তু ভৌগোলিক সীমারেখাতে সীমাবদ্ধ নেই এই প্রেক্ষিতেই আজকের এই দিনটি নিয়ে, দেশের ভুখন্ডের বাইরে থাকা বেশ কিছু বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে কথা বলেছিলাম জানতে চেয়েছি, দিনটি নিয়ে তাদের কি ভাবনা চিন্তা, যেসব দেশে তাঁরা রয়েছেন, সেসব জায়গার পরিবেশের খুনসুটি, এবং এ দিনটির জন্য কোনও বিশেষ বার্তা যাদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তাদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কর্মরত কিম্বা অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, আবার নতুন প্রজন্মের অনেকেই গবেষনায় রত কারোও সাথে পরিচয় হয়তঃ বা কোন সেমিনার-সিম্পসিয়াতে, কিম্বা শুধুই  ইমেল মারফৎ

রমেশ বুনোরতন থাইল্যান্ডের মহীডল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ষাটোর্ধ বয়স ফুরফুরে মেজাজ  চেহারা না দেখে কথা বললে মনে হবে উঠতি যুবক কথায় কথায় বললেন, ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতি বছরই এই ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসটি পালন করে আসছেন জাতিসংঘের গৃহীত এই বিশ্ব পরিবেশ দিবসটা পরিবেশ সুরক্ষার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণের প্রধান বাহন হিসেবে কাজ করছে বলে জানালেনপ্রতি বছর, এক একটি আলাদা আলাদা থিম নিয়ে দিনটা পালিত হয়। ২০২০, এ বছরের থিমটি হ'ল ‘জীব বৈচিত্র্য উদযাপন’ (Celebrate Biodiversity) কথা প্রসঙ্গে অধাপক বুনোরতন বললেন, প্রায় চার দশক ধরে তিনি সংরক্ষণের প্র্যাকটিশনার। কিন্তু তারও অনেক বেশি সময় ধরে তিনি এই প্রচলিত সংরক্ষণের মান সম্পর্কে সচেতন। প্রত্যেকটি দিনই উনার কাছে এক একটি পরিবেশ দিবস, এবং প্রতিদিনই  তিনি তা উদযাপন করেন
দুঃখ করে বুনোরতন বললেন, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, বিশেষতঃ, গত দুই দশকে, পরিবেশের গুনগত অবক্ষয় দেখলে, ‘হৃদয় শিউরে উঠে’! সত্যিই তো! পরিবেশের দুর্বল ও ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা মূলত আমাদের জন্যই। এটা খুব বেদনাদায়কহ্যাঁ, এটা সত্যি যে জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের পরিবেশকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে। তবুও, ভালো করে দেখতে গেলে সেটা আবার সেই মানুষের জন্যই, যারা জলবায়ু পরিবর্তনের গতিটাকে আরও ত্বরান্বিত করছে। প্রচণ্ড ক্ষমতাশীল এবং দোর্দণ্ডপ্রতাপ এই মানুষের জন্যই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট হওয়া পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তনগুলি প্রশমিত করার যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, সেই স্থিতিস্থাপকতা বিকাশের সুযোগ (Opportunity to develop resilience) খুব কমই হচ্ছে! পরিবেশের প্রত্যক্ষ উপকারভোগী হওয়া সত্ত্বেও যতই উপার্জন এবং জীবিকা নির্বাহের দিকে ধাবিত হচ্ছে মানবকুল, ততই পরিবেশের স্বাস্থ্যকর অর্থাৎ সুফলদায়ী দিকটাকে আরও খারাপ করে তোলা হচ্ছে এতসবের পরও অন্ধদৃষ্টিকে মুলধন করে পরিবেশের ধ্বংসের দিকে আমাদের যে যাত্রা, সেটা থেকে পিছ পা হতে আমরা যেন নারাজ।  পৃথিবীতে সম্ভবত মানুষই একমাত্র প্রজাতি, যারা এই ধরনের আত্মঘাতী আচরণ করছে !

রাখঢাক না করেই অধ্যাপক বললেন, যদি আমি আমার মতো করে বলি, তবে বলবো, এভাবে বছর বছর পরিবেশের জন্য ঘটা করে এই ফিফথ জুন উদযাপনের প্রয়োজন নেই। আমি চাই, প্রতিটি দিন, এমনকি প্রতিটি মুহূর্ত নিবেদিত হোক পরিবেশের জন্য। এছাড়া, আমি চাই না দিনটি নিয়ে কোন সেলিব্রেশন হোকযদিও পরিবেশ দিবসের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে পরিবেশ সুরক্ষার জন্য সচেতনতা  গড়ে তোলা যাতে করে পরিবেশ রক্ষার জন্য একশন প্ল্যানগুলা আরো বেশী কার্যকরী করা সম্ভব হয়, কিন্তু বাস্তবটা ঠিক তার বিপরীত। বাস্তবে আমরা দেখছি, পরিবেশ রক্ষার এই গুঁড় তত্ত্বটুকু উদযাপনকারীরা অনুধাবন করতে পারছেন না! পরিবেশ রক্ষার ‘তত্ত্ব-বার্তা’-গুলি  সত্যি সত্যিই উদযাপনকারীদের কানের ভেতর গিয়ে পৌঁছে না। বেশীর ভাগ দেশের লোকেরাই এটাকে ‘ক্রিসমাস’ বা ‘দিওয়ালি’-র মতো উদযাপন করেনসে রকম না করে, এই দিনটা আমাদের অন্তর্দর্শন এবং দৃঢ়় পদক্ষেপের দিন হওয়া উচিত। আমি সেই দিনটার স্বপ্ন দেখছি যেদিন পরিবেশের হানিকারক কাজগুলোকে প্রকৃত অর্থে অপরাধ, মানে আরও জোরালো ভাষায় বলতে গেলে, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সমান কাঠগড়ায় বিচার করা হবে এক বুক নিরাশার মধ্যেও  আশা করছি, এ বছরের পরিবেশ দিবসে শেষ পর্যন্ত সম্বিত ফিরবে এবং লোকেরা বুঝতে সক্ষম হবে যে  পরিবেশের অবনতির সাথে সাথে তাদের আরও বেশী করে হারানো ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। দরিদ্র ও প্রান্তিক বর্গের লোকেরা সাধারণতঃ প্রথম ধাক্কায়  এটা টের পায়। আর শক্তিশালী ধনীরা ? তাদেরও এ থেকে পরিত্রান নেইশুধু সময়ের ব্যাপার। অত্যাধুনিক হাজারো প্রযুক্তি সত্ত্বেও, আমরা এখনও আমরা জীববৈচিত্রের উপর নির্ভরশীল। জীববৈচিত্র্য সমস্ত জৈবিক সিস্টেম এবং প্রক্রিয়াগুলির একটি মৌলিক উপাদান।  জীবিকা এবং জীবন উপভোগের জন্য জীব বৈচিত্র্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই পথে না হেটে, এই মানুষ নামের প্রজাতিটা যা করছে, তা তো নিজেরাই নিজেদের কফিন বানিয়ে রাখার সামিল!

    নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুকেশ কুমার চালিশে। মাস ছয়েক হল, অবসর নিয়েছেন। কথায় কথায় বললেন, পৃথিবীর মোট স্থলভাগের শতকরা মাত্র ০.১ থাকলেও উনাদের দেশে বেশ কিছু আকর্ষণীয় জীববৈচিত্র্য রয়েছেহিমালয় অঞ্চলের চারটি হটস্পটগুলির মধ্যে সেদেশ জীববৈচিত্রের  একটি হটস্পটের অংশ। ছয়টি জীব সংমন্ডল নেপালে রয়েছে। নেপালের মোট অঞ্চলের প্রায় ২৫% এলাকা জুড়ে সুরক্ষিত বনাঞ্চল রয়েছে, এর মধ্যে ৯টি জাতীয় উদ্যান, ৩টি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণাগার, ৫টি সংরক্ষণ অঞ্চল, ১টি হান্টিং রিজার্ভ রয়েছে এবং সেগুলোর প্রত্যেকটাকে ঘিরে বিশাল জায়গা জুড়ে বাফার অঞ্চল রয়েছে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সম্পর্কিত সেদেশে স্থানীয় লোকেদের মধ্যে কিছু প্রচলিত রীতি বংশ পরম্পরায় চলে আসছে এবং সংরক্ষন সম্পর্কে তাদের জ্ঞান অন্য জায়গার আরো দশজন লোকের তুলনায় বরং ভালই জানা। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে অনেক পরে, অর্থাৎ ১৯৭০ সাল থেকে সরকারি পর্যায়ে সেদেশে সংরক্ষণের কাজ হাতে নেওয়া হয়জীববৈচিত্র্য নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তাদের দেশ সক্রিয়ভাবে যোগদান করে চুক্তি সাক্ষর করেছে এবং জীববৈচিত্র্যের বিভিন্ন দিক নিয়েও নিরন্তর গবেষণা করে যাচ্ছে। হিমালয়ের পাদদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে দেশটি রয়েছেপ্রয়োজনমতো বৃষ্টিপাতের ফলে সেখানে প্রচুর অরণ্য রয়েছে এবং সেগুলোতে বন্য প্রাণীদের অবাধ বিচরন চোখে পড়ে এদের মুক্ত চলাফেরার মধ্য দিয়ে উনার যে উপলব্ধি, তা পরিবেশের সুস্বাস্থ্যের ইঙ্গিত দেয় এবং বিশেষ করে এই লকডাউনের সময় বিভিন্ন দূষণকারী এজেন্টকে হ্রাস করার সহায়ক বলে মনে হয়। তাই, পরিবেশ দিবসে উনার এটাই প্রত্যাশা যে  গোটা বিশ্বের লোকেদের জন্য জীববৈচিত্র্যে যেন বজায় থাকে, পাশাপাশি পরিমণ্ডলটাকেও যেন স্বাস্থ্যকর ও দূষণ মুক্ত রাখা যায়৫ জুন দিনটি সম্মিলিত প্রচেষ্টার দিন এবং জীববৈচিত্র্য, মানব এবং সামগ্রিকভাবে আমাদের সৌরজগতের এই একমাত্র জীবন্ত গ্রহকে বাঁচানোর জন্য অনুশীলন শুরু এবং বজায় রাখার অঙ্গীকার করার দিন। 

হাঙ্গেরির জেন্ট ইস্তভান বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণী সংরক্ষন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত গবেষিকা, শ্রেয়া। বাঙালি মেয়ে। বেশ কবছর থেকে সে দেশে থাকলেও, জন্মসুত্রে ভারতীয়।  বলল, ভারত সম্পর্কে ভেবে আমার মনে প্রথম যে শব্দটি আসে তা হ'ল 'বৈচিত্র্য'; প্রাকৃতিক এবং নৃতাত্ত্বিক দুটোই দেশজুড়ে সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক দৃশ্য, প্রজাতি এবং বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্রতা পাশাপাশি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বৈচিত্র্য দেশটাকে বিশ্বের অন্যান্য অংশ থেকে আলাদা করে তোলে।
পরিবেশ উদযাপনের এই দিনটিতে, চারপাশের যে প্রাকৃতিক ঘটনা ঘটছে তার ধারাবাহিকতা এবং এদের সম্ভাব্য মোকাবিলা নিয়ে সবার জন্য একটি সুস্পষ্ট চিন্তাভাবনা এবং রূপরেখা তৈরি করা খুবই জরুরিঅতিমারি, ভূমিকম্প, দাবানল, সুপার ঘূর্ণিঝড়ের মতো একের পর এক বিশ্বব্যাপী মহামারীর আকস্মিক প্রাদুর্ভাব সব কিছুই যেন এ বছর হচ্ছে। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পিছনে থাকা অদৃশ্য বাস্তব টাকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত আমরা সত্যই প্রকৃতির করুনায় রয়েছি তা যেন বার বারই মনে হচ্ছে।
করোনা আক্রান্ত ভারতের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে আমাদের জনগণ ও সরকার পরিস্থিতি মোকাবেলায় কঠোর সময়ের মুখোমুখি হচ্ছেনবিভিন্ন পেশার লোকেরা যদি এই সমস্যাগুলির সমাধানের জন্য একত্র হয়ে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করেন, তবে সম্ভবত একটি উপায় বেরোতে করতে পারেবন্যজীবন সংরক্ষণের শিক্ষার্থী হওয়ায়, আমার দৃষ্টিকোণ থেকে, বাস্তুসংস্থান এবং বন্য প্রজাতির উদ্ভিদ এবং প্রাণীজগতের গুরুত্ব সম্পর্কে সারা দেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে সচেতনতা যথেষ্ট অবদান রাখতে পারেএকইসাথে গবেষণা  এবং বৈজ্ঞানিক অধ্যয়নকেও  গুরুত্ব দিতে হবে। আমি দৃঢ়়ভাবে বিশ্বাস করি যে পরিবেশের স্বার্থে এই পরিবেশ দিবসে আমাদের সকলকে এগিয়ে আসা উচিত এবং সুস্থ সমাজ, আদর্শ পরিবেশ শিক্ষা এবং একটি সচেতন জাতি হিসাবে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা উচিত।

সিঙ্গাপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এন্ডি আংগ জানালেন, আসুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবসটি উদযাপন করার সাথে সাথে  আমরা আমাদের চারপাশের সুন্দর প্রকৃতির প্রশংসা করার জন্য কিছুটা সময় ব্যয় করি এবং আমাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় একসাথে কাজ করি।

বাংলাদেশ, ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণী গবেষক, হাসান আল-রাজি জানালেন অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এ দিনটি খুবই উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে উদযাপন করা হবে বিশেষ করে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পরিবেশ নিয়ে গবেষণা করে এ ধরনের সংগঠনগুলো এই দিনটিকে পালন করতে বিশেষ উৎসাহী। বাংলাদেশ সরকারের বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এই দিনটিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতি বছর উদযাপন করে থাকেপরিবেশের প্রয়োজনীয়তা পরিবেশ সংরক্ষণ এর তাৎপর্য এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আমাদের করণীয় বিষয়গুলোকে সকলের সামনে তুলে ধরাই এই দিনটির উদ্দেশ্য। প্রতি বৎসর ঢাকার আগারগাঁওয়ের বন ভবনে এই দিনটি উদযাপিত হয়। দিনটিকে কেন্দ্র করে রেলি, সেমিনার, আলোচনা সভা ইত্যাদি  আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই আয়োজনে অংশগ্রহণ করে।
এ বছরের পরিবেশ দিবসের বিষয়টা পুরোপুরি ভিন্ন।  পরিবেশ দিবস উদযাপনের ঠিক এই মুহূর্তে পুরো পৃথিবী এমন একটা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে জনসমাগম পুরোপুরি বিপদজনক। করোনাভাইরাস  এর প্রাদুর্ভাবের ফলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। তাই এবছর হয়তো বা আগের বছরগুলোর মত পরিবেশ দিবস উদযাপন করা সম্ভব হবে না। তবে এটাও সত্য যে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এর জন্য দিনটির উদযাপন থেমে থাকবে না।  বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই উদযাপন হবে প্রযুক্তির ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে ঘরে বসেই উদযাপন করা হবে পরিবেশ দিবস। এই কদিন আগে (অর্থাৎ ২২শে মে) বিশ্ব জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের দিনটিও ঠিক এভাবেই পালিত হয়েছে।
করোনাভাইরাস এবছর আমাদেরকে বুঝিয়ে দিল যে পৃথিবীতে মানব সভ্যতা টিকে থাকার জন্য পরিবেশের প্রতি যত্নশীল হওয়া কতটুকু প্রয়োজন। এই  ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এর জন্য অনেক জায়গাতেই পরিবেশ তার নিজের অবস্থায় ফিরে আসছে বলে অনেকে নামি-দামি লোকেরাই মন্তব্য করছেনতবে আমার মনে হচ্ছে, করোনা কালীন সময়েও কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা পরিবেশ দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।  নিজেদের সুরক্ষার জন্য আমরা মাস্ক ব্যবহার করছি, হ্যান্ড গ্লোবসও ব্যবহার করছিব্যবহারশেষে সেগুলো ছুড়ে ফেলে দিচ্ছি এখানে ওখানে যত্র তত্র। এইদিকটাতে  বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই নিয়ম মানা হচ্ছে না। কোন কোন দেশে নীতি নির্দেশিকা থাকলেও, সেভাবে সেটা দেখভাল করা হচ্ছে না।  এতে করে পরিবেশ, বিশেষ করে জলজ পরিবেশ হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। তাই বলছিলাম, এই পরিবেশ দিবসে বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে আমাদের পরিবেশের প্রতি আরও যত্নশীল হতে হবে, পরিবেশের ভারসাম্য যাতে নষ্ট না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।


শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২০

সোনার ধরিত্রী


।। পার্থঙ্কর চৌধুরী।।

সাময়িক প্রসঙ্গে, ২২শে এপ্রিল, ২০২০
রিত্রী দিবসের আজ সুবর্ণ জয়ন্তী। না! এই দিবসটার সাথে আমরা তেমন পরিচিত নই। ২২ এপ্রিল, ১৯৭০ সালে প্রথম বারের মত দুশো লক্ষেরও বেশী আমেরিকার আম-আদমি সেখানকার শতাধিক শহর জুড়ে প্রথম বারের মত এই দিনটি পালন করেন। উদ্দেশ্য ছিল, ‘পরিবেশ-অজ্ঞতা’- বিরুদ্ধে সর্বত্র প্রতিবাদ করা। কবি সুকান্তের ছাড়পত্র কবিতার মত, ‘ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য রে যাব আমি নবজাতকের কাছে আমার দৃঢ় অঙ্গীকারগোছের একটা দৃঢ় প্রত্যয়ও অবশ্য সেখানে মনে মনে কাজ করছিল।
            সেই অর্থে বছর পঞ্চাশতম ধরিত্রী দিবস। এবছরের ধরিত্রী দিবসের বিষয়(Theme) হচ্ছে, ‘ক্লাইমেট একশন’(Climate action), অর্থাৎ, গোটা মানব জাতি, এবং তাদের জীবন  ধারণের পদ্ধতি (Life Support System) যাতে ভবিষ্যৎ দিনে মানুষ তথা সমস্ত উদ্ভিদ প্রাণীকুলের  অস্তিত্ব রক্ষার জন্য দীর্ঘস্থায়ী রূপে অনুকূল পরিস্থিতি করে রাখা যায়; যাতে করে এদের কেউই বিলুপ্তির মুখ না দেখে, সেইমত কাজ করে যাওয়া। এর জন্য যেটা অতি আবশ্যক, তা হচ্ছে, ব্যক্তি স্তরে (এবং সমষ্টিগত ভাবে) কার্বন ফুটপ্রিন্ট ন্যূনতম মাত্রায় কমিয়ে আনা। বলা বাহুল্য, এক এক জনের কার্বন ফুটপ্রিন্ট নির্ধারিত হয় তিনি কি রকম জীবন যাপন করছেন, কি ধরনের গাড়ী দিয়ে অফিস যাতায়াত করেন, কতটুকু দূর গাড়ী নিয়ে রোজ পাড়ি দিচ্ছেন, দিনে গড়পড়তা কতটুকু বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন, যে খাবারটা খাচ্ছেন, সেটা কোথায় এবং কিভাবে বানানো হয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ, এককথায়, ব্যক্তি জীবনের ক্ষেত্রে প্রতি এক জনের জন্য কতটুকু কার্বন পৃথিবীর বুকে এসে জমা হচ্ছে। বলতে দ্বিধা নেই, কার্বন ফুটপ্রিন্টের আজকের দিনে গড়পড়তা মাথাপিছু (Global average) হলো প্রায় টন এবং শুধুমাত্র আমেরিকাবাসীদের জন্য এই মাত্রা ১৬ টন। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী ২০৫০ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি যদি ডিগ্রী  সেন্টিগ্রেড দমিয়ে রাখতে হয়, তার জন্য  বিশ্বজুড়ে মাথাপিছু এই কার্বন ফুটপ্রিন্টের মাত্রা -টনের নিচে নিয়ে আসাটা  নিতান্তই জরুরি। কি ভাবছেন?
এবার তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, তার জন্য  ধরিত্রী দিবসের এই সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষে গৃহবন্দী অধিকাংশ বিশ্ববাসীর, সঙ্গে ভারতবাসীরাও কি করবে? এই লক ডাউনে? আচ্ছা, এটা তো আর এক দিবসীয় কর্মসূচী নয়, যে এইদিনটাতেই শুধু করতে হবে। অন্তত পক্ষে, আমাদের চেতনার উন্মেষ (Consciousness)-টাকে আরেকবার ঝালিয়ে নেওয়ার জন্য প্রচলিত লক ডাউন কোনও ভাবেই পরিপন্থী হয়ে দাঁড়াতে পারে না!
বিজ্ঞজনেরা বলেন, শিক্ষা না কি দুরকমের হয়, এক দেখে শেখা, আরেকটা, ঠেকে শেখা! তারই রেশ ধরে বলছি, ভাবেই হোক, কিম্বা ভাবলেশ মতেই হোক, এবছর আমরা, মানে শুধু উপত্যকাবাসী নয়, বরং স্বীকার করে নেওয়া উচিত, সমগ্র ভারতবাসী, নির্ধারিত এই দিনের (অর্থাৎ ২২ এপ্রিলের) আঠাশ দিনে আগে থেকেই ধরিত্রী দিবস নামক চল্লিশ দিবসীয় ব্রতকথা পালন করতে উদ্যত হয়েছি, এবং মজার খবর এই যে, নির্ধারিত এই দিনের পরও আরো এগারো দিন আমরা তা পালন করব। কি অপূর্ব সমাপতন! বলছিলাম, যে ভোগান্তির মধ্য দিয়ে এই চল্লিশার দশাকাটাতে হচ্ছে, তাতে করে একাংশ লোকের কম বেশী হলেও এতদিনে সম্বিৎ ফিরেছে, এবং ফিরছেও। এখন দেখার কথা, চেতনার এই উন্মেষটুকুর কত খানি প্রতিফলন হয়, ব্যক্তি তথা সামূহিক জীবনের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডে!
আচ্ছা, একবার ভাবুন তো, বিলাসবহুল জীবন যাপনে লিপ্ত আত্মঘাতী মানবকুল এই পৃথিবীর উপর নিরন্তর এবং উপর্যুপরি অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে কি না? গোটা বিশ্ব তথা দেশের কথা ছাড়ুন। যদি আমাদের এই উত্তর পূর্বাঞ্চল, তথা অসম রাজ্য, এমন কি এই বরাক উপত্যকার প্রসঙ্গে কথাগুলো তোলা হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে সারা বিশ্ব তথা দেশের তুলনায় আমরা কোনো অংশে পিছিয়ে নেই!
অসুখের ক্ষেত্রে যেমন কিছু কিছু অসুখ রয়েছে যাদেরকে লাইফ স্টাইল রিলেটেড ডিসিজ’ (Life style related disease) বলা হয় (যেমন, হার্ট এটাক, স্ট্রোক, লিভার পচে যাওয়া ইত্যাদি), ঠিক তেমনি আমাদের দৈনন্দিন জীবন কাটানোর পদ্ধতির উপরও পরিবেশের অসুখ হওয়াটা অনেক খানি নির্ভর করে বৈকি!  আচ্ছা, দশ টাকার জলের বোতলের ব্যবহার কি সামান্য একটুখানি চেষ্টা করলেই আমরা বাদ দিতে পারি না? ঠিক একই ভাবে পলিইথিলিন জাতীয় একবার ব্যবহৃত প্লাস্টিক? শহরাঞ্চল বলুন, কিম্বা গ্রামের। নালা- নর্দমা সর্বত্রই যে এরা জলের মুক্ত ধারাকে ব্যাহত করছে! আবার অতি শিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত কিম্বা অশিক্ষিত ফ্লাট-বাড়ির মালিক কিম্বা গ্রামের গৃহস্থের কথাই বলুন। বাড়ির সামনে রাস্তায় কিম্বা নালায় ধুম করে রোজকার শাক-সবজির খোসার আবর্জনা পোটলা বেঁধে বাইরে ফেলে তো বাড়ির ভেতরের চৌহদটা পরিষ্কার রাখেন। একটিবারের জন্য তাদের ভাববার অবকাশ নেই, এই ফেলে দেওয়া আবর্জনার শেষ গন্তব্যস্থলটা কৈ? এই আবর্জনা মানে শাক-সবজির খোসা থেকে যে সম্পদ (Waste to Wealth) বানানো সম্ভব, সেটা কে কাকে বোঝায়?
বেশ ঘটা করে গেলো বছরের রাজ্যিক স্তরে পরিবেশ দিবস তো এই বরাক উপত্যকায় হয়েছিল। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী (৫ই জুন, ২০১৯ইং) শিলচরের পুলিশ প্যারেড গ্রাউন্ডে দেওয়া ভাষণে প্রত্যেক রাজ্যবাসীকে দুটো-হাতে দুটো-গাছলাগানোর অনুরোধ জানিয়েছিলেন। উনার বক্তব্য মাথায় রেখে, এপক্ষ এবং ওপক্ষের বরাকবাসী (এবং রাজ্যবাসী) মাথাপিছু এখন অব্দি কটা গাছ লাগিয়েছেন, তার কি কোনও তথ্য পাওয়া যাবে?
বেশ কয়েক মাস আগের কথা বলছি। এক ছাত্র মারফৎ জেলারই জয়পুর-রাজাবাজার এলাকা থেকে মুঠোফোনে একটা স্ক্রিন-শট ফোটো পেয়েছিলাম।  অজগরকে একটাকে মেরে তার লেজটা উঁচু গাছে বেঁধে রেখে (অনেকটা পাঁঠা ছোলানোর মত) মাংস খাওয়ার উদ্দেশ্যে চামড়াটা ছাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছিল, এবং সদর্পে সেটা জনৈক সেই ব্যক্তি হোয়াটসএপ- স্টেটাস দিয়ে রেখেছিলেন।
এরকম পথচলতি জীবনে অনেক অভিজ্ঞতারই সঞ্চয় হয়। সেরকম আরেকটা ঘটনার কথা বলছি। মাস কয়েক আগে একটা ইনোভা গাড়ি দিয়ে মিজোরাম বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়ার পথে গাড়িচালকের কাছ থেকে শোনা। তবে ঘটনা যে মিথ্যা নয় তার প্রমাণ পরবর্তীকালে পেয়েছি। গাড়িচালক বলছিলেন, গাড়িটা নাকি খোয়া গেছিল, অনেকদিন এর হদিশ পাওয়া যায় নি, শেষ মেশ হায়দ্রাবাদের এক দামি হোটেলের বেইসমেন্ট ফ্লোর থেকে উদ্ধার হয়েছে। মিজোরাম যাওয়ার পথে গাড়িটা যিনি চালাচ্ছিলেন, তিনি গাড়ির মালিক। বলছিলেন, এর আগে গাড়িটা ড্রাইভারই চালাতো। শহরের এক ব্যবসায়ী (বরং সোজা-সাপটাই বলি, তক্ষক চোরাপাচারে লিপ্ত অবৈধ বন্যপ্রাণী ব্যবসায়ী; শহরের কোন এলাকা, সেটা আপাতত: উহ্য থাকলো) শিলচর থেকে এই গাড়িটা করে সোজাসুজি হায়দ্রাবাদ পাড়ি দেন। ইনোভা গাড়িটা চুরি, পরবর্তীতে এর উদ্ধারের উপাখ্যান, এবং গাড়ী উদ্ধারে পুলিশের সহায়তা এই নিবন্ধের প্রাসঙ্গিকতার মধ্যে পড়ছে না, সেটা না হয় অন্য পরিসরে বলা যাবে) কিন্তু একটা ঘটনা তো স্ফটিকের মত পরিষ্কার, যে  চোরাই পথে বন্যপ্রাণী পাচারের ঘটনায় আমাদের বরাক উপত্যকা দেশের অন্যান্য অংশের তুলনায় কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই!
স্ফটিকের মত স্বচ্ছ আরেকটা ঘটনা আপনাদের স্মৃতির অতলে এখনও তলিয়ে যায় নি! বরাক উপত্যকার তিন জেলা নিয়ে যে বৃত্ত, তার চারপাশের পাঁচশো-হাজার কিলোমিটার দূরত্বে দেশীয় ভূখণ্ডের  কোথাও পোস্ত-চাষ হয় বলে জানা নেই!  (জানিনা আপনাদের জানা আছে কি না!) তাহলে দীপান্বিতার পর পরই শহরে পোস্তর গাড়ি এসেছিলো কোথা থেকে? যাচ্ছিলই বা কোথায়? না, কেউ জানলাম না! অনুসন্ধিৎসু মন উত্তরের অপেক্ষায় থেকেই গেলো! অদূর ভবিষ্যতে সাংবাদিক বন্ধুদের  কেউ হয়ত নিয়ে তদন্তমূলক প্রতিবেদন উপত্যকার কোনও খবরের কাগজে  প্রকাশ করবেন, সেই আশায়ই রয়েছি ! আচ্ছা, একটা কথা তো ঠিক, অবৈধ পোস্তর গাড়ি না আসলে বেঘোরে মেহেরপুরের দুটি মেয়ের প্রাণ যেত না! জানি না এর আগেপরে এক বা একাধিক পোস্তর গাড়ি সে পথ মাড়িয়েছে কি না! তবে মন্দের ভালো এই যে, সেগুলো ক্ষেত্রে  অন্য কোনও (সা/না) বালক - (সা/না) বালিকা কিম্বা বৃদ্ধ-বৃদ্ধার প্রাণ হানি হয় নি!
ভাবছেন, ধান ভানতে শিবের গীত! কোথায় ধরিত্রী দিবস, আর কোথায় পোস্ত- উপাখ্যান! মিল আছে বৈ কি? যে শিরোনামে বলা আছে,  সোনার ধরিত্রী; একটু শ্লেষাত্মক ঠেকবে, তবুও বলতে ইচ্ছে করছে, সুবর্ণ জয়ন্তীতে, অর্থাৎ পঞ্চাশে, ধরিত্রীর পঞ্চত্বপ্রাপ্তি! আর ধরিত্রীর এই পঞ্চত্ব প্রাপ্তিতে আমাদের আপনি বাঁচলে…’ গোছের শরণার্থীসুলভ জীবন-দর্শন, চোখ এবং উদরের অন্তহীন ক্ষুধা ইত্যাদি অনবরত: যোগান দিয়েই চলেছে! যতদিন পর্যন্ত ভাবের ঘরে এই চুরি’-খানা বজায় থাকবে, ততদিন ধরিত্রী বলুন, বা প্রকৃতি... সেটার রক্ষণাবেক্ষণে খামতি থেকেই যাবে! অবধারিত ভাবে যেটা প্রয়োজন, তা হচ্ছে, আমাদের মনন জগতের আমূল পরিবর্তনের।  সকলের সাথে, সবাইকে নিয়ে বাঁচার তাগিদে সেটা তো করতেই হবে। এবার একটু নির্জনে বসে নিজেকে নিজে জিজ্ঞেস করুন দেখি, এই ত্রুটিপূর্ণ জীবন-দর্শন পাল্টানো কি সম্ভব?  দেশ কি ধরতিমাতা আপনাদের সেই উত্তরের অপেক্ষায়ই রয়েছেন। সামগ্রিকভাবে সেটা যদি করা সম্ভব হয়, তাহলেই হয়ত: বা ধরিত্রী মাতার পঞ্চত্ব প্রাপ্তি আটকানো সম্ভব।
নতুবা...??


অধ্যাপক, বাস্তু পরিবেশ বিদ্যা বিভাগ, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়, শিলচর--৭৮৮০১১  
(মুঠোফোন +৯১-৯৪৩৫০৭৮২৯৬ )