“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

।। চোর যখন স্বামী।।

            ।।মাসকুরা বেগম।।
     মেহেরুন। ব্যাংকের ম্যানেজার। ব্যাংক ম্যানেজারের কঠিন খোলসের আড়ালে সে একজন কোমলমতী, আবেগপ্রবণ, সহজ-সরল নারী। বাবার কথা মনে পড়লে "আয় খুকু আয়" গানটা ছেড়ে দিয়ে চোখ মুছে।

     তার সংসারে আছে শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী হামিদ আর দুই ছেলে - হাসান ও হোসেন।

     মেহেরুনের জীবনের প্রথম আঘাত এসেছিল খুব ছোট বয়সে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন। তখন আসামে ক্যান্সারের উন্নত চিকিৎসা ছিল না।

   মেহেরুন ছিল অসম্ভব মেধাবী। জেদ ছিল, স্বপ্ন ছিল। বাবা-মরা একমাত্র মেয়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য মা নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়েছেন। গণিতের শিক্ষকের মেয়ে, অংকের প্রতি ছিল তার অদ্ভুত নেশা।

    উচ্চমাধ্যমিকে কমার্স বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগে ডিস্টিংশন মার্কস পেল। শহরের নাম্বার ওয়ান কলেজে ভর্তির সুযোগ পেল। কিন্তু সমস্যা - বাড়ি থেকে কলেজ প্রায় ৩০০-৪০০ কিলোমিটার দূরে।

    ভরসা হলো মামা। গুয়াহাটি শহরে মামার বড় ফ্ল্যাট। মামি আর একমাত্র মামাতো ভাই থাকে সেখানে। মামা স্টেট ব্যাংকের ম্যানেজার। ট্রান্সফারেবল চাকরি।

    মা ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "রমিজ ভাই আমার! মেয়েটাকে গুয়াহাটিতে একা কোথায় রাখব? তোর ঘরে একটু থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দে।"
   মামা বললেন, "ঠিক আছে বুবু, চিন্তা করবেন না।"

    কিন্তু মামি রাজি হলেন না। মামাকে চাপ দিয়ে বললেন, "তুমি এত বোকা কেন? জোয়ান ভাগ্নিকে ঘরে রাখবে? আজ ডিগ্রি, কাল মাস্টার্স, পরশু চাকরি। এই ক'বছরে মেয়েটা কত মান-সম্মান নষ্ট করবে কে জানে!"

     পরের রবিবার মামা-মামি মেহেরুনের বাড়িতে গেলেন। অনেক বোঝালেন, "দিনকাল ভালো না। মেয়ে মানুষ শহরের হাওয়া লাগলে নষ্ট হয়ে যায়। আঠারো বছর বয়স, ভালো পাত্র পেলে বিয়েই দিয়ে দাও।"
     মেহেরুনের মা শক্ত গলায় বললেন, "বিয়ে জন্ম-জন্মান্তরের লিখন। আমার একটা মাত্র এতিম মেয়ে। পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। থাকার জায়গাটুকু দিতে পারবে না?"

    অবশেষে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মামি রাজি হলেন। কিন্তু মন থেকে মানতে পারলেন না।

    মেহেরুন নিজেই ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করে একদিন মায়ের সাথে মামার ফ্ল্যাটে উঠল। মামা ঘরে ছিলেন না। মামি খুব একটা আন্তরিকতা দেখালেন না। যাওয়ার সময় মা চোখ মুছে বললেন, "যেভাবে পড়তে এসেছ, সেভাবেই চলবে। কোনো অভিযোগ যেন না শুনি।"
   মেহেরুন মায়ের হাত ধরে কথা দিল, "মা, আমি তোমার অসম্মান হতে দেব না।"

   ধীরে ধীরে মেহেরুন বুঝল সে এই ঘরের বোঝা। মামি কোনোদিন প্লেটে খাবার বেড়ে দেন না। কলেজ থেকে ফিরে অনেকদিন ঠাণ্ডা ভাত আর ডাল ছাড়া কিছুই জোটেনি। মামি মাছ-মাংস হিসেব করে রাখতেন। বাড়িতে মামির মা-বোন বেড়াতে এলে মাংস-পোলাও আরও কত কী রান্না হতো। মামি বলতেন, "আমার রনি মাংস পছন্দ করে, কোরমা-পোলাও পছন্দ করে।" মেহেরুন সেদিনও শুধু আলু আর গ্রেভি দিয়েই ভাত খেত।

   এই এক বছরে মেহেরুন বুঝে গেল, মামির অনুমতি ছাড়া মামা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।

    এদিকে বড় মাসির স্বামী এক বছর ধরে প্যারালাইজড। স্কুল শিক্ষক মেসোমশাই স্কুলে যেতে না পারায় বেতন আটকে আছে। সংসারে অভাব। ছেলে হামিদ গ্রাজুয়েশন করে মাস্টার্স করছে, কিন্তু চাকরি নেই।

    বড় মাসি একদিন মামাকে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "রমিজ, কিছু টাকা দে ভাই। তোর দুলাভাইকে গুয়াহাটিতে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাব।"
    মামা বললেন, "আচ্ছা বুবু, দেখছি।"
কিন্তু মামির না-এর কাছে মামার হ্যাঁ-এর কোনো দাম ছিল না।

    উপায় না পেয়ে হামিদ গুয়াহাটি এসে মামির কাছে টাকা ধার চাইল। মামি সাফ না করে দিলেন, "টাকা যখন ফেরত দেবে, ব্যাংক থেকেই নাও।"

    রাতে খাওয়ার পর হামিদ গেস্ট রুমে শুতে গেল। সেদিন মামা ঘরে ছিলেন না। মেহেরুন সাধারণত গেস্ট রুমেই থাকত। সেরাতে মামির রুমের সোফায় শুয়ে পড়ল। মামি রনিকে নিয়ে বিছানায়। পাশের রুমে মামির ভাই।

   গভীর রাতে কিসের শব্দে মামির ঘুম ভাঙল। লাইট জ্বালিয়ে দেখেন আলমারির পেছনে হামিদ। 
মামি চিৎকার করে উঠলেন, "ভাই! তাড়াতাড়ি এই লুচ্চাটাকে বাঁধ!"
    মেহেরুন ঘুম ভেঙে কিছু বুঝে ওঠার আগেই মামি বলতে লাগলেন, "আমি কতবার বলেছি জোয়ান মেয়ে ঘরে রাখলে মান-সম্মান যাবে। এখন মেহেরুন আর হামিদের ফষ্টি-নষ্টি কে সামলাবে?"

     মামির ভাই হামিদকে বেঁধে ফেলল। আর মামি মামাকে ফোন করে বললেন, "ভাগ্যিস জেগে উঠেছিলাম। নইলে আজ কী কাণ্ড হতো কে জানে!"

     মাঝরাতে মেহেরুনের মায়ের কাছে ফোন গেল, "বুবু, আপনার মেয়ে আর হামিদকে হাতে-নাতে ধরেছি। আপনার ভাই বলেছেন সকালেই যেন আপনারা এসে ওদের বিয়ে দিয়ে দেন।"

    মিথ্যা অপবাদ শুনে মেহেরুন স্তব্ধ হয়ে গেল। বাকরুদ্ধ।

    হামিদের মা-ও ফোন পেয়ে পাথর। হামিদের ছোট বোন বলল, "মা, মেহেরুন দিদিকে তো তুমি চেনো। মামি নিশ্চয়ই ঝামেলা পাকিয়েছে। মামি বিয়ে দিতে চাইলে তোমার আপত্তি নেই বলে দাও।"

    হামিদ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বিনাদোষে একটা মেয়ে কলঙ্কিত হচ্ছে, অথচ সে কিছু বলতে পারছে না। 
    আসলে সে রাগের বশে মামির গয়না চুরি করতে ঘরে ঢুকেছিল। জীবনে প্রথমবার চুরি করতে গিয়েই এমন ফাঁদে পড়বে ভাবেনি। এখন তো একথা ও বলতে পারবে না যে সে চুরি করতে রুমে ঢুকেছিল।

   পরের দিন বিকেলে সবাই রমিজের ফ্ল্যাটে হাজির। হামিদের মা বউয়ের পোশাক নিয়ে, মেহেরুনের মা বরের পোশাক নিয়ে। মামি আগেই কাজী ঠিক করে রেখেছেন।

   কাজীর সামনে কবুল বলার সময় মেহেরুনের চোখ দিয়ে শুধু পানি পড়ছিল। অনিশ্চিত জীবন শেষ পর্যন্ত কি তার স্বপ্ন কেড়ে নেবে? 
এভাবেই চুরি করতে গিয়ে হামিদ হয়ে গেল মেহেরুনের স্বামী। 

    বিয়ের পর সবাই খুশি-খুশি হামিদকে নিয়ে হাইলাকান্দি ফিরে গেল। 

    কিন্তু লোকের মুখে মুখে তাদের নিয়ে নানান গুঞ্জন। সত্যিটা না জেনে যে যার মতো করে কাহিনি তৈরি করছে তাদের নিয়ে। মেহেরুন কাউকে কিছু কৈফিয়ৎ দিতে যায়নি। শুধু রাতের পর রাত জেগে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। অপবাদ কিংবা অপমানকে সে শক্তি বানিয়েছে। তার পাশে দাঁড়িয়েছে হামিদের পরিবার।

    কিছুদিন পর হামিদ ও মেহেরুন গুয়াহাটিতে ছোট্ট একটি ঘর ভাড়া নিল। সেদিনের ঘটনার পর হামিদের মধ্যে এক ধরনের অপরাধবোধ আর জেদ কাজ করছিল। সে ঠিক করেছিল, যে মেয়েটার জীবন তার জন্য উলোটপালোট হয়ে গেছে সেই মেয়েটাকেই সে সফলতার শিখরে পৌঁছে দেবে।

    হামিদ গুয়াহাটিতে টিউশনি শুরু করল। দিনে ৩টা, রাতে ২টা ব্যাচ। পঙ্গু বাবার চিকিৎসা ও নিজের মাস্টার্স ডিগ্রি - সব একসাথে। 
দুই বছর পর মাস্টার্স কমপ্লিট করে একটি বেসরকারি কলেজে অর্থনীতির বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করল। 
    দেখতে দেখতে হামিদের বাবাও কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেন। তিনি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। তাঁর পেনশন নিয়মিত হচ্ছে। হামিদের সংসারের অর্থনৈতিক চিন্তা কমেছে। বাবা হামিদকে পিএইচডি করতে উৎসাহিত করলেন।   

    মেহেরুন থেমে থাকেনি। রাত জেগে ব্যাংকের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে। একটার পর একটা পরীক্ষা দিয়েছে। দুবার ফেল করার পর তৃতীয়বার সে ব্যাংকে অফিসার হিসেবে সিলেক্ট হলো।

    তারপর প্রমোশন। আর ৮ বছরের মাথায়, মাত্র ৩২ বছর বয়সে সে হয়ে গেল একটি জাতীয় ব্যাংকের ম্যানেজার।  
    যে মামি একদিন বলেছিল "মেয়েরা বেশি পড়লে বিয়ে দিতে কষ্ট হয়।", সেই মামিই এখন গর্ব করে বলে, "আমার ভাগ্নি ব্যাংক ম্যানেজার।"

   আজ তাদের সংসার পরিপূর্ণ। মেহেরুনের শ্বশুর-শাশুড়ি, ডাক্তারি পড়ুয়া ননদ, স্বামী হামিদ - আর দুই ছেলে হাসান ও হোসেন। 
হামিদ পিএইচডি কমপ্লিট করে এখন শহরের নামকরা কলেজের প্রভাষক।

    বাবার প্রিয় গান "আয় খুকু আয়" গানটা এখনও মেহেরুন শোনে। আবেগিক হয়। তবে এখন আর আগের মতো কাঁদে না। রিল্যাক্স অনুভব করে। 
বাবা বলতেন, "মা, তুই একদিন অনেক বড় হবি।" বাবার কথা সত্যি হয়েছে।

    অনেকেই জিজ্ঞেস করে, "আপনাদের বিয়েটা তো অ্যারেঞ্জড ছিল না, তাই না?"
মেহেরুন শুধু হাসে। হামিদের দিকে তাকিয়ে বলে, "আমাদের বিয়েটা পরিস্থিতির কারণে হয়েছিল। কিন্তু সংসারটা আমরা নিজেরা গড়েছি।"

    রাতে খাওয়ার পর হামিদ যখন বই পড়ে, মেহেরুন তখন ছেলেদের পড়াশোনা দেখে। 
মাঝে মাঝে হামিদ বলে, "মেহের, সেদিন যদি আমি ওই ভুলটা না করতাম?"
মেহেরুন উত্তর দেয়, "তাহলে হয়তো আমি ব্যাংক ম্যানেজার হতাম না। আর তুমি কলেজ শিক্ষকও হতে না। কষ্টই আমাদের দুজনকে মানুষ করেছে।"


কোন মন্তব্য নেই: