“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
হিমাদ্রি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
হিমাদ্রি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ২৮ জুন, ২০১৩

সূর্যের নিকটবর্তী নক্ষত্রে তিনটি 'সুপার পৃথিবী' আবিষ্কৃত


(যুগশঙ্খ পত্রিকায় প্রকাশিত।জুন ২৮, ২০১৩)

।। হিমাদ্রি শেখর দাস।। 



প্রাণের স্পন্দন থাকবে তো?
বিজ্ঞান সাময়িকী 'এস্ট্রোনমি অ্যান্ড এস্ট্রোফিজিক্স'-এ গবেষণা পত্রটি প্রকাশিত হবার পর মহাকাশ বিজ্ঞানীদের মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে শুধু এই প্রশ্নটিই সম্প্রতি সূর্য থেকে প্রায় ২২ আলোকবর্ষ (২০৭ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার) দূরে 'গ্লিসে ৬৬৭ সি' নামক নক্ষত্রে পৃথিবীর মত তিনটি বসবাস যোগ্য গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে এই গ্রহ তিনটিতে জল থাকার সম্ভাবনা প্রবল আর জল থাকলেই প্রাণ ...
               এই বিশাল মহাবিশ্বে শুধু পৃথিবী নামক একটি ক্ষুদ্র গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব থাকবে সেটা কখনোই মেনে নেওয়া যায়না! অগণিত নক্ষত্র খচিত রাতের আকাশে তাকালেই নানা প্রশ্ন মনের জানালায় উঁকি দেয় এই মহাবিশ্বে কি আমরা একা? সৌরজগতের বাইরে কি কোনও গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে না? যদি ভিনগ্রহী মানুষ থেকে থাকে, তবে কি অতীতে তাদের পদার্পণ ঘটেছিল এই গ্রহে? বহির্বিশ্বের উন্নত প্রাণীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা কি সম্ভব হবে? প্রশ্নগুলির উত্তরের সন্ধানে বিজ্ঞানীরা তাঁদের গবেষণা অব্যাহত রেখেছেন, কিন্তু এর উত্তর আমাদের কাছে আজও অধরা উত্তর না মিললেও কল্পনার জগতে কিন্তু আমরা রচনা করে চলেছি নিত্য নূতন সৃষ্টি উপন্যাস, গল্পে তাই আবির্ভাব ঘটেছে ভিনগ্রহী মানুষ বা 'এলিয়েন'-দের যারা নাকি মানব সভ্যতা থেকেও উন্নত আর্থার সি ক্লার্ক, কলিন হার্ভে, উইলিয়াম হিগস্মিথ ইত্যাদি কল্পবিজ্ঞান খ্যাত লেখকদের কলম থেকে সৃষ্টি হল রোমহর্ষ কারি অবিশ্বাস্য গল্প সাহিত্যের অঙ্গন থেকে ধীরে ধীরে তাঁদের ঠাই হতে লাগলো সেলুলয়েডের পর্দায় হলিউডের ম্যাজিক স্পর্শে 'ই টি', 'সুপারম্যান', 'ম্যান ইন ব্ল্যাক' ইত্যাদি মুভি বিশ্বের বাজার দাপিয়ে বেড়াতে লাগল পিছিয়ে নেই বলিউড...'কোই মিল গয়া' মুভিটিও সবার হৃদয় স্পর্শ করল
                দূরবীক্ষণ যন্ত্রের আবিষ্কার রাতের রহস্যভরা আকাশকে নিয়ে এলো কাছে ধীরে ধীরে মহাবিশ্বের রহস্য আমাদের কাছে পরিষ্কার হতে লাগল কিন্তু সৌরজগতের বাইরে কোনও নক্ষত্রে গ্রহের উপস্থিতি পরীক্ষামূলক ভাবে প্রমাণ করা যাচ্ছিলো না আর এর মূল কারণ হচ্ছে দূরত্ব আসলে নক্ষত্রের আলোতেই আলোকিত হয়ে ওঠে গ্রহ আর দূরত্ব বাড়লে অতি শক্তিশালী দূরবীন দিয়ে পৃথিবী থেকে দূরবর্তী গ্রহকে চিহ্নিত করা মুশকিল তখন পরোক্ষ উপায়ের উপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় থাকেনা বিজ্ঞানীরা উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে ১৯৮৮ সালে প্রথম সৌরজগতের বাইরে গ্রহের সন্ধান পান শুরু হয় এক নতুন অধ্যায় বাকিটা ইতিহাস সৌরজগতের বাইরে নূতন গ্রহের অস্তিত্ব জানার তাগিদেই 'কেপলার'-এর জন্ম এখন পর্যন্ত ১৩২টি গ্রহ আবিষ্কারের কৃতিত্ব তার ঝুলিতে ওহ! বলতেই ভুলে গেছি, 'কেপলার' আসলে কোনও মানুষ নয়, সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা 'নাসা' প্রেরিত একটি মহাকাশযান, যার মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক দূরবীক্ষণ যন্ত্র এছাড়াও রয়েছে নানা সূক্ষ্ম যন্ত্রাদি জার্মানির বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলারের নামানুসারেই তার এই নাম, যাকে গত ৭ মার্চ ২০০৯ সালে পৃথিবী থেকে প্রেরণ করা হয়েছিল তারপর থেকেই তার জয়যাত্রা অব্যাহত কেপলার বেঁচে থাকলে এই আবিষ্কারের খবরটা পেয়ে উল্লাসে তিনি মেতে উঠতেন সন্দেহ নেই! প্রতি মাসেই নিত্যনুতন গ্রহের খবর কেপলার আমাদের উপহার দিচ্ছে আর নূতন গ্রহ আবিষ্কার হলেই আমাদের মনে সেই চিরাচরিত প্রশ্ন জাগে-'প্রাণ আছে তো গ্রহটিতে'?
           বিজ্ঞানের তত্ব মতে জল বিনা কোনও প্রাণ টিকে থাকতে পারেনা তাই কোনও গ্রহে প্রাণ থাকতে হলে তরল জল থাকা আবশ্যক গ্রহে জল থাকবে কিনা তা নির্ভর করে নক্ষত্র থেকে সেই গ্রহের দূরত্বের উপর কারণ জল তরল থাকতে গেলে তাপমাত্রা অবশ্যই শূন্য ডিগ্রী সেলসিয়াস থেকে একশো ডিগ্রীর ভেতরে হতে হবে আমাদের এই সৌরজগতের খুব কাছের গ্রহ বুধ আর শুক্র সূর্যের খুব কাছে থাকার জন্য জল বাষ্পীভূত হয়ে যায় আর পৃথিবীর পরে যে গ্রহগুলি রয়েছে যেমন মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি ইত্যাদি গ্রহে তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রী থেকে কম হওয়ায় সেখানেও জল তরল অবস্থায় থাকতে পারেনা সূর্য থেকে প্রায় পনেরো কোটি কিলোমিটার দূরত্বে জল তরল অবস্থায় থাকতে পারে আর আমাদের পৃথিবী রয়েছে তেমন দূরত্বে যে বলয়ের মধ্যে জল তরল অবস্থায় থাকতে পারে তাকে 'হেবিটেবল জোন' বা 'বসবাস যোগ্য বলয়' বলা হয় বলা-বাহুল্য যে এই সৌরজগতে শুধু পৃথিবীই এই বলয়ের মধ্যে রয়েছে, তাই প্রাণের বিকাশ সম্ভব হয়েছে এই গ্রহে নক্ষত্রের ভর বেশি হলে সেই বলয়ের দূরত্বও বাড়তে থাকে, আর কম হলে দূরত্ব কমতে থাকে      
              সম্প্রতি সূর্যের নিকটবর্তী নক্ষত্র 'গ্লিসে ৬৬৭ সি'-তে ছয়টি গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে এই গ্রহগুলির মধ্যে তিনটি রয়েছে বসবাস যোগ্য বলয়ে আমাদের প্রিয় নক্ষত্র সূর্য ঐ নক্ষত্র থেকে প্রায় তিনগুণ বড় হলেও গ্রহ তিনটি পৃথিবী থেকে কিন্তু সামান্য বড় প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে যে এদের ভর পৃথিবী থেকে প্রায় তিন থেকে চার গুণ বড় হবে বসবাস যোগ্য বলয়ে থাকার সুবাদে গ্রহ গুলিতে জল থাকার সম্ভাবনা প্রবল আর জল থাকলে প্রাণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায়না কেপলারের এই আবিষ্কারে নাসার বিজ্ঞানীরা উল্লসিত এ যেন প্রত্যাশা থেকেও অনেক বেশি! বিজ্ঞানীদের পরবর্তী কাজ হবে ঐ গ্রহগুলির গঠন প্রকৃতি আর বায়ুমণ্ডল নিয়ে অধ্যয়ন এছাড়া ঐ গ্রহগুলিতে রেডিও তরঙ্গ প্রেরণ করেও উন্নত প্রাণী আছে কি না এও সন্ধান করা যাবে আসলে কেপলারের নিত্যনুতন আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষদেরও বহির্বিশ্ব নিয়ে আগ্রহ বাড়াচ্ছে হয়তো সেই দিন আর দূরে নেই যখন বহির্বিশ্বের কোনও গ্রহে এলিয়েনদের সন্ধান আমরা পেয়ে যা
কেপলারের এই সাফল্যে নাসার বিজ্ঞানী জন গ্রুনসফেল্ড তো আবেগে বলেই ফেললেন-'কেপলার মহাকাশযান তো বিজ্ঞানের রকস্টার হয়ে উঠল' আপনারা কি বলেন?

মঙ্গলবার, ৭ আগস্ট, ২০১২

প্রাণের খোঁজে ‘কিউরিওসিটি রোভার’র মঙ্গল গ্রহে অবতরণ


‘কিউরিওসিটি রোভার’
(লেখাটা দৈনিক যুগশঙ্খে বেরিয়েছে ৭ আগষ্ট, ২০১২)

         কিমাশ্চর্যম ! ‘কৌতূহল’কে নিয়ে কৌতূহল ! আর সেটা কিনা প্রশমিত হল এক ট্যুইট বার্তায়‘আমি মঙ্গল পৃষ্ঠের উপর নিরাপদে আছি । ‘গেইল ক্র্যাটার’ আমি আপনার মধ্যে আছি’
সোমবারের সবথেকে হিট ‘ট্যুইট’কে নিয়ে সারা বিশ্বে শোরগোল শুরু হয়েছে । ‘কিউরিওসিটি রোভার’ মঙ্গলগ্রহে অবতরণ করার পরই ঘটে ঘটনাটি । ট্যুইটারে কিউরিওসিটির নিজস্ব অ্যাকাউন্ট থেকে উপরোক্ত বার্তাটি প্রেরণ করার পর সাইবার জগতে আলোড়ন সৃস্টি হয় অলিম্পিকের আপডেটসের খবরও যারা রাখছিলেন তাঁরাও কিছুক্ষণ পর পর নাসার সাইটটিতে চোখ রাখছিলেন । অলিম্পিক জ্বরে কাবু জনসাধারণের মধ্যে হাইটেক প্রযুক্তিতে তৈরি এই রোবটটির অবতরণের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার যে হাইটেক মুনশিয়ানা ‘নাসা’-র বিজ্ঞানীরা করিয়ে দেখিয়েছেন তা এককথায় অনবদ্য । সোমবার ভারতীয় সময় সকাল এগারোটা দুই-এ কিউরিওসিটি মঙ্গলে অবতরণ করার পরই ইতিহাস রচিত হয়ে যায়    পারমানবিক শক্তিতে চালিত এই রোবটটিই হচ্ছে নাসার প্রথম হাইটেক মিশন ।
পৃথিবীর পাশের গ্রহ মঙ্গলকে নিয়ে আমাদের কৌতূহলের অন্ত নেই । সেই প্রাচীন কাল থেকেই ‘লাল গ্রহ’ তাঁর রূপ আর রহস্য ভরা চরিত্র নিয়ে আমাদের মোহিত করে রেখেছে । বিজ্ঞানী থেকে লেখক সবাই মজে গিয়েছিলেন মঙ্গলের প্রেমে । ১৮৯৮ সালে এইচ জি ওয়েলস নামক কল্পবিজ্ঞানের এক বিখ্যাত লেখক যখন তাঁর ‘দ্য ওয়ার অফ দ্য ওয়ার্ল্ডস’ উপন্যাসটি প্রকাশিত করলেন, তখন মঙ্গল গ্রহ নিয়ে এক নূতন আতঙ্কের সৃষ্টি হল । সেই উপন্যাসের বিষয়বস্তু ছিল সত্যিই লোমহর্ষক । কাহিনীতে উল্লেখ আছে মঙ্গল গ্রহ থেকে একদল কদাকার শুঁড়ওলা ভয়ঙ্কর প্রাণী পৃথিবীতে নেমে এসে ধ্বংস কার্য শুরু করেছে । মানুষ কিছুতেই মোকাবিলা করতে পারছেনা তাদের শক্তিমত্তা আর রণ চাতুর্যের সঙ্গে । শেষ পর্যন্ত নানা সঙ্কটের মধ্য দিয়ে নানা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গল গ্রহের প্রাণীরা ধ্বংস হল । অবশেষে রক্ষা পেল মনুষ্যজাতি । এই কাহিনী মানুষের মনে সৃষ্টি করলো মঙ্গল গ্রহ নিয়ে এক দুশ্চিন্তা – মঙ্গলে অমঙ্গল নিশ্চয় সেখানে রয়েছে মানুষ থেকে বুদ্ধিমান প্রাণী । মঙ্গল নিয়ে তেমন অসংখ্য কল্পবিজ্ঞানের কাহিনীর অভাব নেই । অবশেষে বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ আবিষ্কার করলো মঙ্গল গ্রহে মানুষের মত কোনও উন্নত প্রাণী নেই । মানব সভ্যতা নিশ্চিন্ত হল । কিন্তু প্রাণের কোনও স্পন্দনই কি নেই সেই গ্রহে  ? এই প্রশ্নটি বিজ্ঞানীদের ভাবিত করেছে সবথেকে বেশী । এর উত্তর এখনো অজানা । আর এ নিয়ে শুরু হয়েছে বিস্তর গবেষণা । সেই রহস্য সন্ধানে নানা স্পেস ক্রাফট মঙ্গলের দিকে ধেয়ে গিয়েছিল নানা সময়ে । যার সাম্প্রতিক সংযোজন হল  ‘কিউরিওসিটি রোভার’ নামক রোবটটি । প্রায় ২৫ কোটি ডলারের এই প্রজেক্টের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে মঙ্গল পৃষ্ঠে প্রাণের খোঁজ করা ।
২৬ নভেম্বর ২০১১ সালে ‘মার্স সায়েন্স ল্যাবরেটরি’ মহাকাশযানটিকে ‘নাসা’-র বিজ্ঞানীরা নাসার কেপ ক্যানাভেরাল উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে উৎক্ষেপণ করেন । এই মহাকাশযানেই পে লোড হিসেবে রয়েছে ছয় চাকা বিশিষ্ট একটি বিশেষ রোবট যার নাম হচ্ছে ‘কিউরিওসিটি রোভার’ অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি এই রোভারটি পারমানবিক শক্তিতে নিয়ন্ত্রিত । কিউরিওসিটির নকশা বানানো আর সেটিকে তৈরি করার দায়িত্বে ছিলেন নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা । প্রায় সাড়ে আট মাসের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে গত ৬ আগস্ট ২০১২ সালে ভারতীয় সময় সকাল এগারোটা দুই-এ রোভারটি মঙ্গলের বুকে অবতরণ করে । সাধারণত: সৌরশক্তির সাহায্যে মহাকাশযান কিংবা মানবহীন রোবট গুলোকে চালানো হয়, কিন্তু কিউরিওসিটির ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা পারমানবিক শক্তির সাহায্য নিয়েছেন, যা এক অত্যাধুনিক প্রযুক্তিপ্লুটোনিয়াম ব্যাটারির সাহায্যে তাপ এবং বিদ্যুৎ উভয়ই কিউরিওসিটি রোভারকে আগামী ১৪ বছর খুব ভাল ভাবেই সচল করে রাখতে পারবে । এই রোভারেই রয়েছে সতেরোটি অত্যাধুনিক ক্যামেরা । যার সাহায্যে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা করা সম্ভব হবে ।  
এবার জেনে নেওয়া যাক  কিউরিওসিটি রোভার প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য । মঙ্গল গ্রহে প্রাণ আছে কিনা সেটি গবেষণা করাই এর মূল উদ্দেশ্য । মঙ্গলের বুকে নানা পাথর আর গভীর গর্তের মধ্যে কিউরিওসিটি রোবটটি সুড়ঙ্গ করে অনুসন্ধান করবে কোনও ব্যাকটেরিয়া জাতীয় প্রাণের অস্তিত্ব আছে কিনা । এর জন্য ঐ রোবটের শরীরের ভেতরেই রয়েছে এক মিনি ল্যাবরেটরি । মঙ্গল পৃষ্ট থেকে পাওয়া নানা পদার্থ সেখানেই বিশ্লেষণ করে রোভারটি সেই তথ্য পৃথিবীতে বেতার তরঙ্গ মারফত প্রেরণ করবেএছাড়া মঙ্গলের আবহাওয়া সম্পর্কেও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করবে এই হাইটেক রোবট । মঙ্গলের ভূতত্ব গবেষণা করাও তার মিশনের একটি প্রধান অঙ্গ । এই মিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য মঙ্গল গ্রহে  মানব মিশনের রূপরেখা তৈরী করতে বিজ্ঞানীদের আগামীতে নানাভাবে সাহায্য করবে ।  
নাসার চতুর্থ রোবোটিক মিশন কিউরিওসিটি তার পূর্বসুরিদের থেকে অনেক বেশী হাইটেক          সম্পন্ন । এর ভরও আগের রোভার মিশন থেকে বেশী । নাসার পূর্ববর্তী মিশন থেকে এটি পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে মঙ্গলের উত্তর গোলার্ধে রয়েছে বরফের স্তর । এই কঠিন বরফের নিচেই নাকি রয়েছে তরল জলের সমুদ্র । তাই নাসার বিজ্ঞানীরা উত্তর গোলার্ধের ‘গেল’ নামক ক্রেটারে কিউরিওসিটিকে অবতরণ করান । এই ক্রেটার বা গর্তেই রয়েছে ১৫৪ কিলোমিটার ব্যাস আর ৫.৫ কিলোমিটার উঁচু এক বিশাল পর্বত । ‘এয়েলো মন্‌স’ নামক ঐ পর্বতের বয়স হচ্ছে প্রায় ৩৫ থেকে ৩৮ কোটি বছর । বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন যে সেখানেই নাকি লুকিয়ে থাকতে পারে প্রাণের বীজ । আগামীতে কিউরিওসিটি সেই ‘গেল’ গর্তেই অক্লান্তভাবে খুঁজে বেড়াতে থাকবে প্রাণের বীজ ।      
নাসার এই সাফল্যে বিজ্ঞানী মহল খুব খুশি । এই হাইটেক মিশনের সাফল্যের উপরই নির্ভর করছে ভবিষ্যতের নানা রূপরেখা । আগামীতে মানব কলোনী গড়তেও এই মিশন যথেষ্ঠ সাহায্য করবে । কে জানে হয়তো ১০০ বছর পর  মঙ্গলগ্রহে হয়ে যাবে আমাদের আর এক ঠিকানাআর তখন গরম কিংবা শীতের ছুটিতে সেই গ্রহে ক’দিন ঘুরে আসাটাও মন্দ হবেনা । কি বলেন ?


( এই ভিডিও দেখবার আগে, 
              উপরে বায়ে ব্লগের 
                      মূল ভিডিও বন্ধ করে দিন) 

শনিবার, ২১ জুলাই, ২০১২

রক্তস্নাত একুশে জুলাই


         ২১শে জুলাই, ১৯৮৬ সকালে বাবা আর আমি খেতে বসেছি । মেনু – কাঁচকলা আর আলু সেদ্ধ ভাতবাবার খুব তাড়া, সার্কিট হাউসে যেতে হবে । কারণ জিজ্ঞাসা করতেই  বাবা গম্ভীর হয়ে একটি কথাই বললেন – “ভাষা আন্দোলন” হঠাৎ বাবার বিষম উঠলো । ভালো করে খাওয়া হয়ে উঠলোনাএর স্বল্পক্ষণ পর কয়েকবার গুলিচালনার শব্দ শুনতে পেলাম ।  বাবাকে বলতেই ব্যাপারটা তিনি পাশ কাটিয়ে বললেন যে পটকার শব্দ হতে পারে । বাবা আঁচ করতে পেরেছিলেন যে হয়তো কিছু ঘটতে চলেছে । তাড়াহুড়োর মধ্যেই তিনি বেরিয়ে গেলেন তারপর দু’ দু’টো রাত কেটে গেল, বাবার কোন খবর নেই ।


     ক্লাস ফাইভের ছাত্র হিসেবে করিমগঞ্জের নীলমনি উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সদ্য ইংরেজী শিখতে শুরু করেছিবাংলা ভাষার পাশাপাশি আরো দু’টি ভাষা হিন্দি আর ইংরেজী শিখতে পারবো বলে কত আনন্দ । বাবার মুখেই শুনতাম বিদেশে যেতে হলে অনেক ভাষা জানতে হয় । কারণ ভাষা শেখার বিকল্প নেই । “ভাষা আন্দোলন” শব্দটা আমার কাছে কেমন জানি বাঁধো ঠেকলো ! ভাষার জন্য আবার আন্দোলন করতে হয় না কি ? এখানে  তো সবাই দিব্যি বাংলা বলছে২১শে জুলাই-এর রাতে মা এর মুখেই শুনতে পেলাম বাংলা ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এই আন্দোলনে দু’দুটো তাজা প্রাণ শহিদ হয়েছে, আর আহতের সংখ্যা অগনিত । কার্ফ্যু হয়ে যাওয়ায় পর বাবার কোন খবর পাওয়া যাচ্ছিলনা । বাবাও কি তবে ...আমরা কেউ ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতেই পারছিলাম না । পরদিনও সারাক্ষণ উৎকন্ঠায় কাটলো । একদিকে সেনার ফ্ল্যাগ মার্চ আর অপরদিকে পুলিশের ঘন ঘন টহল, পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছিল । ২৩ শে জুলাই সকাল বেলা খবর পেলাম যে বাবা সিভিল হাসপাতালে রয়েছেন । এক ঘন্টার জন্য কার্ফ্যু উঠার পর তড়িঘড়ি মা আর দিদি হাসপাতালে বাবাকে আহত অবস্থায় দেখে এলেন
     ভাষা আন্দোলনের অতীত যে অনেক পুরানো তা পরে জেনেছিলাম ১৯৬০ সালে আসাম রাজ্যভাষা আইন চালু হওয়ার পর থেকেই বরাক উপত্যকার বাংলাভাষীদের উপরে অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে সামিল হয় মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চালিহার সরকার । এর ফলস্বরূপ ১৯৬১ এর ১৯শে মে-এর  ভাষা আন্দোলনে শিলচরে পুলিশের গুলিতে এগারো শহিদের রক্তে রাঙ্গা হয়ে উঠে শিলচর রেলস্টেশন চত্বর । চালিহা সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়কিন্তু চক্রান্ত চলতেই থাকে । ১৯৭২ সালে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় একটি চরম সিদ্ধান্ত নেন যে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যম হবে একমাত্র অসমীয়া ভাষাতদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী শরৎচন্দ্র সিংহ ও ঝোপ বোঝে কোপ মারলেন । উনার মন্ত্রীসভাও ১৯৭২ সালে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো যে মাধ্যমিক পর্যায়ে অনসমীয়া ছাত্রছাত্রীদের জন্য অসমীয়া ভাষা বাধ্যতামূলক করা হবে ।  এই সিদ্ধান্তের বিরূদ্ধে বরাকে আবার আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠলো অবশেষে সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়, আর অনির্দিষ্ট কালের জন্য গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অসমীয়া ভাষাকে একমাত্র মাধ্যম করার প্রস্তাবটি স্তগিত রাখা হয় এবং সঙ্গে ভাষা সার্কুলারটিও । ১৯৮৫ এর ডিসেম্বর মাসে প্রফুল্ল কুমার মহন্ত ক্ষমতায় বসেই ভাষা সার্কুলারের “মাইন” আবার নুতন করে পুঁতবার প্রস্তুতি শুরু করলেন । দিসপুর থেকে বরাক উপত্যকায় নির্দেশ আসলো অসমীয়া ভাষা এখন থেকে বাধ্যতামূলক হবেআবারও গর্জে উঠার পালা এই উপত্যকার অবহেলিত মানুষদের । ১৯৮৬ সালের ২১শে জুলাই মুখ্যমন্ত্রীর করিমগঞ্জ সফরে ভাষা সার্কুলারের বিরূদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দেওয়ার জন্য শতশত মানুষ সামিল হলেন ভাষা আন্দোলনে ।
২১শে জুলাই, ১৯৮৬ সকাল ন’টা । তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লকুমার মহন্তের হেলিকপ্টার করিমগঞ্জ শহরের অদূরে মাইজডিহিতে অবস্থিত সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হ্যালিপেডে এসে নামলো । সার্কিট হাউসের সামনে মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় আসার পর দেখা গেল কালো পতাকা নিয়ে অগনিত মানুষের জটলা । জেলা প্রশাসনের মদতে জনতার ভিড় ঠেলে মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় সার্কিট হাউসের দিকে চলে গেল । ততক্ষণে আন্দোলনকারীদের  পালে হাওয়া লেগেছে । ‘অগপ সরকার মূর্দাবাদ’, ‘প্রফুল্ল কুমার মহন্ত মূর্দাবাদ’ ধ্বনিতে কেঁপে উঠলো সার্কিট হাউসের আশপাশ । উত্তপ্ত হয়ে উঠলো আন্দোলনের পরিবেশ । এরই মধ্যে পুলিশের কাজ শুরু হয়ে গেল । ‘কেলা বঙালি’ বলেই আন্দোলনকারীদের উপর লাঠি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লো আসাম পুলিশের বর্বর ব্যাটেলিয়ান । সার্কিট হাউসের বারান্দায় এসে মুখ্যমন্ত্রী মহন্ত পর্যবেক্ষণ করে গেলেন তার সরকারী বাহিনীর দাপট । এদিকে পুলিশের লাঠিচার্জে বিক্ষোভকারীরা বেসামাল হয়ে পি ডবলিউ ডি অফিসের সামনে জমায়েত হতে লাগলেন । এর অল্পকিছুক্ষণ পর মুখ্যমন্ত্রী মহন্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়ে আন্দোলনকারীদের পাত্তা না দিয়ে নিমিষে বেরিয়ে যান পরবর্তী গন্থব্যস্থল ফকিরাবাজারের দিকে । নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের মধ্যে কেউ কেউ পুলিশের দিকে ঢিল ছোঁড়তে শুরু করে । ব্যস – তারপর অগ্নিশর্মা পুলিশের দল গুলি চালনা শুরু করে দেয় । সময় তখন সকাল ন’টা পঞ্চান্ন । বুলেটের ছোবলে জগন্ময় দেব (জগন) আর দিব্যেন্দু দাস (যীশু) লুটিয়ে পড়লেন পি ডবলিউ ডি অফিসের সামনে । শহিদের রক্তে করিমগঞ্জের মাটি পবিত্র হয়ে উঠলো । আহত মানুষদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস কেঁপে উঠলো । 
‘প্রতিক্ষণ’ ম্যাগাজিনের (১৭ আগষ্ট, ১৯৮৬) রিপোর্টের একটি অংশ ।

“ঘর থেকে বের হবার পর আমি খবর পেলাম পুলিশের লাঠি চার্জ আর ফায়ারিং-এ শহরের পরিস্থিতি থমথমে রেডক্রস আর সরকারি হাসপাতালে আহতদের ভিড় । তাই হাসপাতালে ছুটে গেলাম আহত আন্দোলনকারীদের সাহায্যে সুপারিন্টেনডেন্টের ঘরে যখন আহত মানুষদের খবর নিচ্ছি তখন হাসপাতাল চত্বরে প্রবেশ করলেন করিমগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার মহন্ত । এসেই তিনি আমাকে দেখে বললেন ‘দুলাদা আপনাকে আমি গ্রেফতার করলাম । চলুন গাড়িতে ।’ হাসপাতালের সীমানা থেকে বের হবার আগেই মহন্তের সেনাবাহিনী আমার দিকে ছুটে আসলো, আর এলোপাথারি লাঠির আঘাত করতে লাগলো হাত দিয়ে আটকাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু গাড়িতে উঠার পর সেটা যেন বেড়ে গেল । বুটের লাথি আর লাঠির আঘাতে জর্জরিত এক বৃদ্ধকে ক্ষমা দেখাবার ন্যূনতম সৌজন্যবোধ দেখালো না আসাম পুলিশের বর্বর দল । পুলিশের গাড়িতে অন্যান্য আন্দোলনকারীদেরও একই অবস্থা । অবশেষে থানায় এনে আমাদের বস্তার মত ফেলে দেওয়া হল । অনেক অনুরোধের পর আমাদের সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হল । ডান হাতটা ভীষণ ব্যথা করছিল । ভাবতেই পারিনি যে হাত ভেঙ্গে গেছে । হাসপাতালে আসার পর চশমা না থাকায় খুব অসুবিধে হচ্ছিল । চশমার কথা জনৈক অসমীয়া পুলিশকে বলতেই অশ্লীল গালি আমার দিকে ধেয়ে আসলো যাই হোক এক বাঙালি পুলিশ কর্মীর বদান্যতায় অবশেষে চশমাটি পেলাম ।” বক্তা আমার বাবা হিমাংশু শেখর দাস (দুলা)এই ঘটনার রোমন্থন অনেকবারই তিনি করেছেন । প্রতিবারই আমার মনে হতো নুতন ঘটনা শুনছি । কারফিউ উঠার পর রোজ হাসপাতালে বাবার ওখানে যেতাম আর শুনতাম নানা গল্প । পুলিশের অকথ্য অত্যাচারের গল্প তখন ঘরে ঘরে মা বোনদের আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছিল । অনেক নেতারাও বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন । এদের মধ্যে রথিন সেন, রণেন্দ্রমোহন দাস (দুলুবাবু), নৃপতি চৌধুরী, সুজিৎ চৌধুরী, লোপামুদ্রা চৌধুরী প্রমুখ । বর্তমান কংগ্রেস সরকারের কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়ও সেসময় করিমগঞ্জ সফর করেন আর বাবার সঙ্গে আন্দোলন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয় । কলকাতার পাক্ষিক পত্রিকা “প্রতিক্ষণ” বিস্তারে ২১শে জুলাই এর ঘটনা নিয়ে ১৭ আগস্ট, ১৯৮৬ সালে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে । সেই সংখ্যার ম্যাগাজিনে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বাবার একটি সচিত্র (চিত্রঃ ১) রিপোর্ট বের হয় যা বাবা মৃত্যুর আগে পর্যন্ত একখানি কপি আগলে রেখে ছিলেন । বাবা ছিলেন একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী । বৃটিশের বিরূদ্ধে আন্দোলনের অনেক কথাই উনার মুখে শুনেছি । বাবা কখনো আক্ষেপ করে বলতেন যে স্বাধীন ভারতে এখন স্বদেশী ভাইদের বিরূদ্ধে ভাষার অধিকার নিয়েই লড়াই করতে হচ্ছে । বাবার অবশ্য এক আলাদা রাজনৈতিক পরিচয়ও ছিল প্রথম জীবনে তিনি জনসঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন । পরে যখন জনসঙ্ঘ বিভক্ত হয়ে ‘জনতা পার্টি’ আর ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ হয় তখন বাবা জনতা পার্টিতে যোগ দেন । দীর্ঘকাল তিনি জনতা পার্টি (পরে জনতা দল) এর সম্পাদক আর সভাপতির পদ অলঙ্কৃত করেন । বাবা করিমগঞ্জ থানার ও সি মহন্ত এন্ড কোম্পানীর বিরূদ্ধে মামলাও করে ছিলেন । মহন্ত এবং আর এক পুলিশ অফিসার বদরুল হক লস্কর আমাদের বাড়িতে প্রায়ই এসে বাবাকে কেস তুলে নেবার জন্য কাতর অনুরোধ করতো । কিন্তু বাবা তাদের কথায় কর্ণপাত করেননি ।  অনেকদিন সেই মামলা চলার পর দেখা গেল শেষে সাক্ষী দেবার লোক নেই । মহন্তের চোখ রাঙ্গানিতে ওরা ভয় পেয়ে গিয়েছিল । কেসের গতি রুদ্ধ হয়ে গেল । সাক্ষী হিসেবে বাবা উনার সেদিনের পরিহিত রক্তরাঙ্গা কাপড়ও রেখেছিলেন । কিন্তু ২১শে জুলাইয়ের ভিলেনদের কোন বিচার হলনা !  সেই আক্ষেপ বাবা বাকী জীবন বয়ে গিয়েছিলেন         
২১শে জুলাই এর ঘটনা বাংলা ভাষার প্রতি আমার এক আলাদা তাগিদ সৃষ্টি করে । ১৯৬১ এর ভাষা আন্দোলনেও বাবা একজন সৈনিক ছিলেন । সেসময় করিমগঞ্জ রেলষ্টেশন চত্বরে পুলিশের লাঠির আঘাতে বাবার পা ভেঙ্গে যায় । “যুগান্তর” পত্রিকায় বাবার একখানি ফটো আর উনাকে নিয়ে একটি রিপোর্টও বেরিয়ে ছিল । পত্রিকার কাটিং রাখার এক বিচিত্র শখ ছিল বাবার । প্রচারবিমুখ বাবা উনার ফাইলে ১৯৬১ সালের ভাষা আন্দোলনের অনেক দুর্লভ কাটিং সংগ্রহ করে রেখেছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ আজ সেই সব আমার কাছে কিছুই নেইএই উপত্যকার প্রতিটি মানুষের বাংলা ভাষার প্রতি এক তাগিদ আসলে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করা । প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে বরাকের সর্বস্তরের মানুষই ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল । তাই ভাষা আন্দোলন নিয়ে যখন কোন আলোচনা হয় তখন প্রচারবিমুখ বাবার অবদানের জন্য  নিজেকে বড় গর্বিত মনে হয় ।

রবিবার, ৩ জুন, ২০১২

৬ জুনের লাইভ শো দেখার জন্য তৈরি তো ?

আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে গত ৮ জুন ২০০৪ সালে ‘শুক্রের সূর্য অতিক্রমণ’ ঘটনার তোলা ছবি ।সূর্যপৃষ্ঠে শুক্র গ্রহকে কালো মটর দানার মত দেখা যাচ্ছে ।
   
        ‘লাইভ শো’ দেখতে যারা ভালবাসেন তাঁদের জন্য এক জব্বর খবর । ‘আই পি এলের’ দীর্ঘ নাটকীয় লাইভ ক্রিকেট ম্যাচগুলো দেখে যারা ‘বোর’ হচ্ছিলেন, তাদেরকে এক আলাদা স্বাদ দেবার জন্য আগামী ৬ জুন দু’জন ‘কলাকার’ তৈরি হচ্ছেন । প্রায় তিন ঘণ্টার এই শোয়ে থাকবে এক আলাদা আনন্দ, মজা আর শিহরণ । সকাল সাতটা থেকে শুরু হওয়া এই ‘শো’ দেখার জন্য বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষেরা উৎসুক হয়ে অপেক্ষা করছেন । সেদিনই ঘটতে চলেছে এমন এক মহাজাগতিক ঘটনা যা আবার দেখতে হলে আমাদের আরও ১০৫ বছর অপেক্ষা করতে হবে । ‘ট্রেন্সিট অব ভেনাস’ নামক অনুষ্ঠানে সূর্য আর শুক্রের দ্বৈত অভিনয়কে ক্যামেরা-বন্দী করবেন পৃথিবী স্বয়ং । আসলে সেদিনই এক অভিনব সূর্য গ্রহণ ঘটতে চলেছে যার নেপথ্যে রয়েছেন নায়িকা শুক্র গ্রহ বা ‘ভেনাস প্ল্যানেট’ । সূর্যের সঙ্গে শুক্রের ‘টুইস্ট ডান্স’ নিয়ে আসর আপাতত গরম । আর এই লাইভ শো-এর ‘টি আর পি’ও তাই এখন তুঙ্গে ।
     সৌরজগতের নানা চমকপ্রদ ঘটনার মধ্যে ‘ট্রেন্সিট অব ভেনাস’ হল এক অতি বিরল ঘটনা । সূর্য আর পৃথিবীর মধ্যে রয়েছে শুক্র আর বুধ গ্রহ । কখনো কখনো এই গ্রহ দু’টি সূর্য আর পৃথিবীর মধ্যে এক সরলরেখার চলে আসে । আর তখন দৃশ্যমান হয় গ্রহণ । সাধারণত: সূর্যগ্রহণ বলতে আমরা পৃথিবী আর চন্দ্র উপগ্রহের ‘রাউন্ড ডান্স’-এর কথাই জানি । পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় চন্দ্র পুরো সূর্যকেই ঢেকে ফেলে । তখন সূর্য ভোজবাজীর মতই কিছুক্ষণের জন্য পৃথিবীর আকাশ থেকে ‘গায়েব’ হয়ে যায় । গ্রহণ হতে হলে সূর্যের কৌণিক ব্যাসার্ধের সঙ্গে চন্দ্রের কৌণিক ব্যাসার্ধ মিলতেই হবে, আর হতে হবে অমাবস্যা । আর বলয়গ্রাসের সময় চন্দ্রের কৌণিক ব্যাসার্ধ সূর্য থেকে কিঞ্চিৎ ছোট হয় । তাই সূর্যকে একটি রিং এর মত দেখায় । আর এই মজার ঘটনা সম্ভব হওয়ার পেছনে চন্দ্র আর পৃথিবীর স্বল্প দূরত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে । কিন্তু বুধ আর শুক্র গ্রহের দূরত্ব পৃথিবী থেকে বেশী হওয়ার কারণে বুধ বা শুক্র গ্রহ পুরো সূর্যকে ঢাকতে পারেনা । পৃথিবী থেকে এই বিশেষ সূর্য গ্রহণের সময় শুক্র গ্রহকে তখন একটি কালো মটর দানার মত সূর্যের পৃষ্টে দেখা যায় । এই গ্রহ সূর্যের বলয়ের এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে সময় লেগে যায় কয়েক ঘণ্টা । মজার ব্যাপার হল জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ‘ট্রেন্সিট’ সময় গণনা করে পৃথিবী আর সূর্যের দূরত্ব নির্ণয় করতে পারেন ।
       ১৬৩১ সালে জোহানেস কেপলার প্রথম গণনার সাহায্যে সর্বসমক্ষে ঘোষণা করেন যে ৬ ডিসেম্বর ১৬৩১ সালে ‘ট্রেন্সিট অব ভেনাস’ হবে ।  সেদিন ‘ট্রেন্সিট অব ভেনাস’ ইউরোপে দৃশ্যমান না হওয়ায় তিনি সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকলেন । জেরেমিয়া হরোকস নামে এক ইংরেজ পুরোহিত প্রথম বোঝতে পারেন যে এই ঘটনা দ্বিতীয়বার ‘রিপিট’ হবে খুব কম সময়ের ব্যবধানে । তিনি অঙ্ক কষে দেখেন যে ২৪ নভেম্বর ১৬৩৯ সালে এটি আবার দৃশ্যমান হবে । বিজ্ঞানের ইতিহাসে তিনিই প্রথম এই ঘটনা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষণ করেন । আসলে ‘ট্রেন্সিট অব ভেনাস’ জোড়া ঘটনা হিসেবে হয়ে থাকে । এর মানে এই ঘটনা একবার হলে দ্বিতীয়টি খুব কম সময়ের মধ্যে ‘রিপিট’ হয় । যেমন ১৮৯৫ আর ১৯০৫ সালে ‘ট্রেন্সিট অব ভেনাস’ ঘটেছিল । এই ঘটনা গত ৮ জুন ২০০৪ সালে পৃথিবী থেকে শেষ দেখা গিয়েছিল ।  ৬ জুন ২০১২ এর পর আবার এই ঘটনা দৃশ্যমান হবে ২১১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে । এর মানে পাক্কা ১০৫ বছর পর !
    এই ঘটনা দেখতে হলে একটু সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে । খালি চোখে সূর্যকে দেখতে গেলেই অন্ধ হবার চান্স থাকে । সাধারণত: ওয়েল্ডিং এর কালো গ্লাস বা এক্স রে প্লেট কে দুই বা তিন পরতে জোড়া দিয়ে ফিল্টার বানাতে হবে যা সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি থেকে রক্ষা করবে । জলে প্রতিফলিত সূর্যের প্রতিবিম্বকেও যেন সরাসরি কেউ না দেখেন । দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে প্রজেকশন স্ক্রিনের মাধ্যমে সূর্যের প্রজেক্টেড ইমেজ দেখা যেতে পারে । আর এটাই সব থেকে নিরাপদ ।
    সকাল ঠিক সাতটার সময় এই ঘটনা শিলচরে দৃশ্যমান হবে । ততক্ষণে শুক্র গ্রহ সূর্যের প্রায় মধ্যখানে চলে আসবে । সকাল প্রায় ১০:০৫ এ সূর্যের বলয় থেকে  শুক্রগ্রহ বের হওয়া শুরু হবে । তারপর সকাল প্রায় ১০:২১ এ শুক্র পুরোপুরি বেরিয়ে পড়বে সূর্যের বলয় ছেড়ে আর শেষ হয়ে যাবে লাইভ শো ।  
    গরমের কষ্টে নাজেহাল আম আদমিরা অন্তত: সেদিন আশা করবেন না যে বৃষ্টি হোক । আসলে এই ঋতুতে বৃষ্টির সঙ্গে যে আমাদের এক আলাদা রোমান্সের সৃষ্টি হয় । আসুন না গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ স্বল্প ক্ষণের জন্য ভুলে আমরা এক মহাজাগতিক ঘটনার সাক্ষী হই !

* সম্পর্কিত সংযোগঃ Transit of Venus