“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
গদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২২

অথ মালিনীবিল কথা



 ।।শৈলেন দাস।।

     মালিনী বিল শিলচর শহর সংলগ্ন এক সুপরিচিত স্লাম। শ্রমজীবী প্রান্তিক মানুষের বাসভূমি এই এলাকা আশির দশক পর্যন্ত ছিল এক পরিত্যক্ত জলাভূমি। তখন শহুরে বাবুদের কাছে এখানকার জমির কোন মূল্য ছিলনা বরং জঙ্গলময় খালি জায়গা হওয়ায় পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষ তটস্থ থাকত এই ভয়ে যে কখন জঙ্গল পেরিয়ে চোর ডাকাত এসে পড়ে তাদের ঘরে ।

     বিশ্বায়নের ছোঁয়া লেগে শহর শিলচরের শরীর যখন ক্রমশ: বেড়ে উঠছিল তখন ক্রমবর্ধমান শ্রমিকের চাহিদা পূরণ করতে গ্রাম বরাকের শ্রমজীবী মানুষ ধীরে ধীরে শহরমুখী হতে শুরু করে। এরই অঙ্গ হিসাবে কিছু সংখ্যক মানুষ বসতি স্থাপন করতে শুরু করে মালিনীবিলে। এছাড়াও শহরের আশপাশের অন্যান্য স্লাম এলাকা থেকে অনেক মানুষ আসে যারা মূলত ছিল ওই সব এলাকার ভাড়াটিয়া।

     মালিনী বিলের অধিকাংশ মানুষই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কৈবর্ত এবং বৈষ্ণব সম্প্রদায়ভুক্ত। এখানে বসতি স্থাপন করতে এসে এই মানুষগুলো প্রথমে লড়াই শুরু করে প্রকৃতির সাথে। জলাভূমির উপর বাঁশের চালা বানিয়ে তার উপর ঘর বেঁধে বসবাস। নেই কোন পথ ঘাট, পানীয় জল। তার উপর বর্ষায় প্রায়ই বাঁশ বেতের তৈরি ঘরগুলি ভেঙ্গে পড়ত  বান তুফানে। তাদের দ্বিতীয় লড়াই ছিল পার্শ্ববর্তী একাংশ পুরনো মানুষের সাথে। মিথ্যা অপবাদ দেওয়া এবং সুযোগ পেলেই নানা অজুহাতে তাদের হেনস্থা করতে দ্বিধাবোধ করত না তারা। 

     জীবন ও জীবীকার তাগিদে পরিত্যক্ত জলাভূমিতে বিবিধ প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে কোনোমতে টিকে থাকতে থাকতে মালীনিবিলের বাসিন্দারা ধীরে ধীরে নিজস্ব পরিচিতি লাভ করতে শুরু করে। মজবুত হতে থাকে তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান। সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও কেউ কেউ সুনাম অর্জন করতে থাকে নিজেদের অধ্যবসায় এবং কর্মের মাধ্যমে। কিন্তু শহর সংলগ্ন এলাকায় থেকে শহুরে পরিবেশে বসবাস করেও সামগ্রিকভাবে মালীনিবিলবাসীরা আশানুরূপ উন্নতি করতে পারেনি। বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্রে হাতে গুনা কয়েকজনই সামান্য সফল হয়েছে।

     মালিনী বিলের বাসিন্দাদের সম্পর্কে শুরুর দিকে কিছু মানুষ যে ভ্রান্ত ধারণা এবং বিরূপ মনোভাব পোষণ করত তা বর্তমানে কিছুটা কমেছে এবং তা সম্ভব হয়েছে এখানকার মানুষের সারল্য এবং সততার কারণে। নিজেদের কর্ম গুণ দিনে দিনে বিকশিত করে বৃহত্তর সমাজকে উন্নত পরিষেবা দিয়ে চলেছে তারা সততার সাথে। ফলে ধীরে ধীরে অনেকের আস্থাভাজন প্রিয় মানুষ হয়ে উঠেছে তারা। তবুও একাংশ মানুষ এখনও এমন রয়েছে যাদের কাছে মালিনীবিলের মানুষ মানেই সব দোষের দোষী।

     যে জলাভূমির জলকাদা পায়ে লাগলে এক সময় ভদ্রলোকেরা নিজেদের অশুচি মনে করত, ঘৃণা করত এখানকার মাছ, ফসল এবং মাটিকে। ব্রাত্যজনের যত্নআত্তি এবং প্রাণের স্পর্শে তা আজ হয়ে উঠেছে যেন সোনা তুল্য। যে কেউ মনে এই অভিলাষ পোষণ করে, যদি একটুকরো জমির দখল পাওয়া যেত! কিন্তু পাবে কি করে? এখানে তো শ্রমজীবীদের বাস। তাই সময়ে সময়ে ব্লুপ্রিন্ট তৈরি হয়েছে উচ্ছেদের। চোর ডাকাত অপবাদ দিয়ে মারা হয়েছে এখানকার নিরীহদের। মালিনী বিলের বাসিন্দাদের জমির পাট্টা দেওয়ার জন্য সরকারি প্রক্রিয়া অনেকদূর এগিয়েও বাতিল হয়ে গিয়েছে কোন অদৃশ্য হাতের কারসাজিতে।

     যেখানে শিক্ষার হার কম এবং নাগরিক সুবিধা অপ্রতুল সেখানে সামান্য উচ্ছৃঙ্খলতা এবং অসামাজিকতা খুব একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। তবুও মালিনী বিলের মানুষ  বৃহত্তর সমাজের সাথে মেলামেশা করা এবং মত বিনিময়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সংযমী। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় এই এলাকা এবং এখানকার মানুষের খারাপ দিকগুলো তুলে ধরার জন্য গণমাধ্যমগুলোর ঔৎসক্য এবং তৎপরতা অতিমাত্রিক, একাংশ বুদ্ধিজীবী সুযোগ পেলেই তাদের উপর অপবাদের দায় চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতা পোষণ করে। তাদের ঘরে বিনা নোটিশে রাতের আঁধারে পুলিশ ঢুকে যেতে পারে। এত সবের পরও এখানকার সহজ সরল মানুষ এই স্বপ্নে বিভোর যে একদিন ঠিকই যাবতীয়  অপবাদ ঘুচে সত্য এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবেই।

 


বৃহস্পতিবার, ১৭ মার্চ, ২০২২

ভানুমতী

        ।। শৈলেন দাস।। 
(C)Image:ছবিঋণ

                                           
     করিমগঞ্জ জেলার একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল ফাকুয়া গ্রাম। এশিয়ার বৃহত্তম জলাভূমি শনবিলের পশ্চিম পারে  অবস্থিত এটি। শিলচর থেকে আমার এখানে  আসার মূল কারণ হল নিখিলদাকে দেওয়া একটি প্রতিশ্রুতি পালন মাত্র। নিখিলদা ফাকুয়া গ্রামের একজন সুপরিচিত যুবক। শিক্ষকতা, সামাজিক কাজ, এনজিও চালানো সবকিছুতেই সে সবার আগে থাকে এই গ্রামে। নিখিলদা পড়াশোনা করেছে শিলচরে থেকে এবং আমার সাথে তার পরিচয় একই বাড়িতে ভাড়া থাকার সুবাদে। ছাত্রজীবন থেকেই নিখিলদা একটু আধটু টিউশন পড়াত। আমি যদিও কোনদিন তার কাছে টিউশন পড়িনি তবে পড়াশোনার বিভিন্ন বিষয় বা সমস্যা নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা হত এবং বিষয়গুলি আমি যেভাবে ব্যাখ্যা করতাম তা নিখিলদার খুব ভাল লাগত। আমরা দুজনই সাইন্স স্ট্রিমের ছাত্র ছিলাম।

    কলেজের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার সময় নিখিলদা প্রতিবারই আমাকে সাথে নিয়ে যাওয়ার কথা বলত কিন্তু নানা অসুবিধার কারণে আমার যাওয়া হত না। নিখিলদা যে বছর স্নাতক তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা দিয়ে পাকাপাকিভাবে গ্রামে চলে যায় সে বছর আমিও স্নাতক প্রথম বর্ষের পরীক্ষা দিয়েছি। তবুও সে বছরই নিখিলদা আমাকে দিয়ে এই প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেয় যে আমি গ্রেজুয়েশন কমপ্লিট করার পর তাদের গ্রামে অন্তত এক সপ্তাহের জন্য অবশ্যই বেড়াতে যাব। তারপর দুবছর কেটে গেছে। আমি সেই প্রতিশ্রুতি বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলাম কিন্তু যেদিন ফাইনাল ইয়ারের শেষ পরীক্ষা দিয়ে বাড়িতে আসলাম ঘরে ঢুকেই দেখি নিখিলদা বসে আছে। পূর্ব প্রতিশ্রুতি মত আমাকে পরের দিনই সকালে ট্রেনে করে তার সাথে ফাকুয়া গ্রামে যেতেই হবে।

    ফাকুয়া রেলস্টেশন এবং তার আশেপাশের  দৃশ্য খুবই মনোরম। ছোট ছোট টিলার মাঝখান দিয়ে রেল লাইন গিয়েছে। বর্ষার বৃষ্টিস্নাত দিনে যেন মনে হয় শৈল শহর হাফলং। ট্রেন থেকে নেমেই নিখিলদা আমাকে নিয়ে একটি চায়ের দোকানে ঢুকে। সেখানে  তার বন্ধুস্থানীয় কয়েকজনের সাথে আমাকে আলাপ করিয়ে দেয়। শিলচর থেকে এসেছি, নিখিলদার ভাতৃপ্ৰর্তীম একজন মেধাবী ছাত্র আমি তাই সবাই  খুব খাতির করল আমাকে। দুয়েকজন নিখিলদাকে বলল আমাকে তাদের বাড়িতে একদিন নিয়ে যেতে। গ্রামের মানুষ এমনই আন্তরিক হয়।

    দু দিন কেটে গেছে ফাকুয়া গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরাঘুরি করে। এরিমধ্যে নিখিলদার বন্ধুদের বাড়িতেও গিয়েছি সময় করে। ফাকুয়ার কলোনি এলাকার পর থেকেই শুরু হয়েছে শনবিলের হাওর। বিস্তৃত এই জলাভূমি যেন সমুদ্র সদৃশ। স্থানীয় লোকজন এখানে শুকনোর মরসুমে চাষবাস করে এবং বর্ষায় মাছ ধরার পাশাপাশি অনেকেই হাঁস প্রতিপালন করে। পড়ন্ত বিকেলে ডিঙি নৌকায় শনবিলে ঘুরতে গিয়ে প্রায় তিনশোরও বেশি হাঁসকে একসাথে দল বেঁধে ঘরে ফিরতে দেখে আমার দুচোখ জুড়িয়ে গেল। নৈসর্গিক এই দৃশ্য ভোলার নয়।

    তৃতীয় দিন সকালে নিখিলদা বলল- আজ ভানুদের বাড়িতে তোর দুপুরে খাওয়ার নিমন্ত্রণ আছে। কাজেই আজ আর কোথাও বের হওয়ার দরকার নেই। তুই বিশ্রাম কর, আমি দরকারি একটা কাজ সেরে আসি। সময়মত এসে নিয়ে যাব তোকে। দুদিন ঘুরাঘুরি করে আমিও কিছুটা ক্লান্ত বোধ করছিলাম তাই নিখিলদার প্রস্তাবে বেশ খুশিই হলাম। তবে খটকা লাগল ওই ভানুর নাম শুনে। এই অতি অল্প সময়ে নিখিলদার সব বন্ধুদের সাথে আমার মোটামুটি আলাপ হয়ে গেছে, তাদের মধ্যে কারও নাম ভানু বলে তো শুনিনি। যা-ই হোক আমি আর এই ব্যাপারটা নিয়ে বেশি মাথা ঘামাইনি। দুপুরে গেলেই তা জানা যাবে।

    ছোট্ট একটি টিলা, চার পাশে আম কাঁঠাল সুপারির এবং নানা ফুলের গাছ।  ঘরের সামনে নিকানো উঠোন। দরজার সামনে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে একজন তরুণী। আমি কোন মতে উঠোন পেরুলাম তার দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে থেকেই। নিখিলদা বলল - কি রে ভানু, কাকাবাবু ঘরে আছেন? আমি যেন চমকে উঠলাম। সে মিষ্টি হেসে বলল- 'হ্যাঁ দাদা, তোমরা বস। আমি বাবাকে ডেকে দিচ্ছি।' নিখিলদা আমাকে বলল- জানিস সতীশ, ভানুমতী খুব ভালো এবং বুদ্ধিমতী মেয়ে। করিমগঞ্জে থেকে পড়াশোনা করে, এবার এইচ এস ফাইনাল দিয়েছে। এন্ট্রান্স একজাম দেবে, যদি না পায় তবে তোর মতই ফিজিক্স নিয়ে পড়বে। কয়েকদিনের জন্য বাড়িতে এসেছে। এখানে সায়েন্স পড়ানোর মত কেউ নেই তাই যে কয়দিন এখানে আছিস তোকে হেল্প করতে হবে তাকে।' আমার তো ভিরমি খাওয়ার উপক্রম। 'কি বলছ তুমি? আমি কি করে পড়াব তাকে?' বলেই করুণ মুখে তাকালাম নিখিলদার দিকে। এরই মধ্যে ভানুমতীর বাবা এসে পড়লেন তাই প্রসঙ্গ বদলে গেল আমাদের। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর নিখিলদা ভানুমতীর বাবাকে বলল- 'কাকু, ও যে কয়দিন এখানে আছে ভানুকে পড়াশোনায় সাহায্য করব।' ভদ্রলোক দেখলাম বেশ আশ্বস্ত বোধ করলেন। আমি মতলবি নিখিলদাকে বকা দিলাম মনে মনে।

    পরদিন থেকে যথারীতি আমাদের ক্লাস শুরু হল। অপ্রস্তুত শিক্ষক হিসেবে আমি যেমন বেশি কথা বলতাম না ভানুমতীও দেখলাম বেশ গুছিয়ে কম কথায় নিজের সমস্যাগুলো আলোচনা করত আমার সাথে। গাণিতিক সমস্যাগুলো একটু ধরিয়ে দিলেই সে করে নিত নিজের থেকে। আমাদের পূর্ব পরিচিতি ছিলনা তবুও ভানুমতী ফ্রি-ভাবেই কথা বলত আমার সাথে। আমার সঙ্কোচ ছিল ঠিকই কিন্তু ভানুমতী যখন লিখায় ব্যস্ত থাকত আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত থাকিয়ে থাকতাম তার দিকে। মেয়েদের সিক্সথ সেন্স খুবই প্রবল তাই মাঝেমাঝে ভানুমতী হঠাৎ মাথা তুলে অস্বস্তিতে ফেলে দিত আমাকে।

    প্রায় এক সপ্তাহ চলেছিল আমাদের ক্লাস। তারপর আমি চলে আসি। ভানুমতীর আর কোন খবর নেওয়া হয়নি আমার। আড়াই বছর পর আবার আমি ফাকুয়া গ্রামে আসি একটি সামাজিক সংস্থার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। সৌজন্যে সেই নিখিলদাই। অনুষ্ঠান প্রায় শুরু হতেই চলেছে, আমি পুরনো পরিচিত কয়েকজনের সাথে কথা বলছিলাম মঞ্চের একপাশে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ খেয়াল করলাম একজন যুবতী অদূরে একথালা ফুল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মন্ত্রমুগ্ধের মত আমার দিকে তাকিয়ে। কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল আমার ভানুমতীকে চিনে নিতে। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য সে সেজে এসেছে। কপালে টিপ, কানে দুল, খোঁপায় লাল গেঁদা ফুল, সবুজে হলুদ শাড়ী পরে যেন সাক্ষাৎ এক পরী। খুশির ঝিলিক তার চোখেমুখে। আমি একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি ভানুমতীর সাথে কথা বলতে এমন সময় মাইকে আমার নাম ঘোষণা হয়ে গেল মঞ্চে গিয়ে আসন গ্রহণ করতে। তাই আমার কথা হয়ে উঠেনি ভানুমতীর সাথে। মঞ্চে উঠে বসে আছি, কিছুই ভালো লাগছে না আমার। অজানা এক ব্যাকুলতা কাজ করছে আমার মধ্যে। এরই মাঝে ঘোষণা হয়েছে স্বাগত ভাষণ দিতে মঞ্চে আসছে কৃতি ছাত্রী ভানুমতী। আমার মন যেন খুশিতে নেচে উঠেছে। পোডিয়ামে কোনাকুনি ভাবে দাঁড়িয়েছে ভানুমতী। অতিথির আসন থেকে ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে তাকে। কম কথায় সুন্দর করে গুছিয়ে বক্তব্য রাখছে সে, চোখে মুখে একরাশ মুগ্ধতা। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে আছি তার দিকে, খেয়ালই নেই সামনে শ'খানেক জনতা বসে আছে। পাশ থেকে নিখিলদা ফিসফিস করে  বলল- 'ভানু এখন দেখতে অনেক সুন্দর হয়েছে। সে ফিজিক্স নিয়েই পড়াশোনা করে। মাঝেমাঝে তোর কথা জিজ্ঞেস করে আমাকে।' সেদিন আর ভানুমতীর সাথে দেখা হয়নি। মঞ্চ থেকে নেমেই আমাদের চলে যেতে হয়েছিল ষ্টেশনের পাশের একটি ফাস্টফুডের দোকানে, শিলচর থেকে আমরা যারা গিয়েছিলাম তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় সেখানে। খাওয়া দাওয়া সেরে সোজাসুজি গাড়িতে উঠে পড়তে হয় আমাদের, রাত হয়ে গিয়েছিল অনেক। তাছাড়া গাড়ি আমার নিজের ছিলনা।

    প্রায় দুবছর পর আজ শিলচর মেইন ব্রাঞ্চে এলআইসি'র প্রিমিয়াম দিতে এসে দেখি কাউন্টারে ভানুমতী বসে আছে। আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছিল না। তবে এবারও কথা বলার সুযোগ নেই। মানুষের দীর্ঘ লাইন, আমি কয়েকজনের পরে। কম্পিউটার থেকে চোখ সরাবার জু নেই ভানুর। আমি কাউন্টারে পৌঁছে টাকা দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলাম- 'কেমন আছো ভানু?' সে এক পলক চোখ তুলে তাকাল। তৎক্ষণাৎ একটা খুশির ঝলক ফুটে উঠল তার চোখে। 'ভালো' বলেই আবার চোখ রাখল মনিটরে। প্রিন্ট হতে থাকল আমার রিসিপ্ট। এর মধ্যেই পিছন থেকে একজন বলে উঠল- 'দিদি, গল্প পড়ে করবেন। আগে ছাড়ুন আমাদের।' রিসিপ্ট এর প্রিন্ট নিয়ে ভানুমতী চটপট কি লিখল তারপর আমাকে দিয়ে বলল -'খুলে দেখো কিন্তু।' আমার ইচ্ছে ছিল কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি সেখানে। অন্য আরেকজনের কাছ থেকে টাকা নিতে নিতে ভানুমতী হাসি মুখে ভ্রু নাচিয়ে আমাকে ইশারা করল চলে যেতে।

    ভিড় থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামছি। রিসিপ্ট এর ভাঁজ খুলে দেখে আমার মন খুশিতে নেচে উঠল। কম কথায় ভানু সব গুছিয়ে বলে দিয়েছে। নিজের মোবাইল নম্বরের পাশে ইউনিভার্সেল সেই চিহ্ন এঁকে দিয়েছে যা 'জবা দিল কি ধড়কন' বুঝায়। দারুণ খুশিতে ভানুর নম্বরটি আমার মোবাইলে সেভ করতে করতে আমি  বেরিয়ে আসলাম বাইরে।


শুক্রবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২২

ধনেশ পাখির পালক

       

     (মনিপুরি লোককথা) 

।।  সুব্রতা   মজুমদার ।।

নেক আগের কথা একটি গ্রামে হাইয়াইনু নামে একটি মেয়ে ছিল। মেয়েটি তার বাবার প্রতি অত্যন্ত অনুগত ছিল, বাবাও তাকে খুব আদর যত্ন করত কিন্তু সৎ মায়ের তা মোটেই পছন্দ হত না। একসময় হাইয়াইনুর বাবাকে গ্রামের বাইরে অনেক দূরে কাজে যেতে হয় বেশি টাকা উপার্জনের জন্য। যাবার সময় স্ত্রীকে বলে যায় মেয়ের খেয়াল রাখতে। বাবা চলে যেতেই সৎমা হাইয়াইনুকে আদেশ দেয় পুকুরপার থেকে কলমি শাক নিয়ে আসতে। মেয়েটি সৎ মায়ের কোনো কথা অমান্য করে না, সে রওয়ানা হয়। সৎমা আবার বলে ছোট ছোট কিছু মাছও ধরে নিয়ে আসতে যাতে তা বাজারে বিক্রি করা যায়। মাছ আর শাক নিয়ে ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই আবার কলস দিয়ে বলে জল আনতে পাঠায়একটার উপর একটা  কাজ সমঝে দেয় মেয়েকে। মেয়েটি সবসময়ই তার সৎমাকে খুব মান্য করে, কিন্তু সৎমা তার প্রতি নিষ্ঠুরই হয় দিন দিনসারাদিন পরিশ্রম করে মেয়েটি বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হলেই সৎমা তাকে গালাগাল করে এবং লাঠিপেটা করতেও দ্বিধা  দ্বিধা করে না।

বাবার অনুপস্থিতিতে দিন এরকমই চলতে লাগল আর সৎমাও হাইয়াইনুর প্রতি নিষ্ঠুর থেকে আরও নিষ্ঠুর হতে থাকে। হাইয়াইনুও দৈহিক আর মানসিক যন্ত্রণা পেতে পেতে দুঃখী আর নিঃস্ব হতে থাকে দিন দিন। একদিন হাইয়াইনু যখন তার বন্ধুদের সাথে নদীতে চুলে চাল আর ডালের জলে তৈরি পরম্পরাগত ‘চেঙহী’ দিয়ে স্নান করতে ব্যস্ত তখন সৎমা দুপুরের খাবার খেয়ে ভাত ঘুমে, হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখে কিছু গরু এসে তাদের বাগানে ঢুকে গেছে। সৎমা ভাবল এটা হাইয়াইনুর অবহেলার জন্যই হয়েছে। হাইয়াইনু বাড়ি ফেরার পর সৎমা তাকে বকাবকির পর মারতে শুরু করে। হাইয়াইনুর সৎ ভাইয়ের তা দেখে দিদির জন্য কষ্ট হয় সে তার দিদিকে খুব ভালবাসত, কিন্তু সেও তখন অসহায় কিছুই করতে পারে না দিদির জন্য। হাইয়াইনু তার বন্ধুদের সাথে মেলামেশা করুক, খেলা করুক কোনো সামজিক অনুষ্ঠানে যাক তা তার সৎমার একদম পছন্দ ছিল না, তাই তার বন্ধুরা যখন এসে তাকে প্রলোভিত করে ‘লাইহরাওবা’ অনুষ্ঠানে যেতে সে রাজি হয় ঠিকই কিন্তু বন্ধুদের বলে তাকে এসে বাড়ি থেকে নিয়ে যেতে। সৎমা তাদের কথাগুলো লুকিয়ে শুনে নেয় এবং হাইয়াইনু সব জামা কাপড় গয়না লুকিয়ে রেখে দেয় আর হাইয়াইনুর চুল ধরে মারধর করে ।

সৎমা কোনো সময়েই মেয়েটিকে অবসর বসে থাকতে দেখতে পারত না বরাবরই কোনো না কোনো কাজ সমঝে দেয়কাজ করতে করতে কোনো কারণে যদি ভুল হয়ে যায় তাহলে মেয়েটিকে তো মারধর করতই এমনকি মেয়েটির মৃত মাকেও গালাগালি দিত। যতক্ষণ পর্যন্ত মেয়েটির বাবা মেয়েটির সঙ্গে থাকত মেয়েটি নিরাপদে থাকত, বাবা কাজে বেরোলেই শুরু হত সৎমায়ের অত্যাচার। মেয়েটির তখন তার বাবার কথা খুব মনে পড়তে থাকে, সে ভাবে বাবা কবে বাড়ি ফিরবে! তার মা যদি বেঁচে থাকত! তাহলে তো সে কত যত্নে থাকত! পূর্ণিমার রাতে চাঁদের আলো এসে মেয়েটির মুখে পড়তে চোখের জল চিকচিক করে ওঠে। বারান্দায় বসে আকাশ দেখতে দেখতে মেয়েটি অনেককিছু ভাবতে থাকে। এরকম পরিস্থিতিতে মেয়েটি খুব দুঃখী হয়ে পড়ে। ঘরে তখন তার সৎমা ছোটভাইকে নিয়ে পালঙ্কে ঘুমিয়ে আছে। সে ঘরে ঢোকে মাটিতে করে রাখা তার বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। রাতে সে তার মৃত মা কে স্বপ্নে দেখেমা বলে,

--- ও হাইয়াইনু, আমার কন্যা! আমি তোকে এভাবে দুঃখী দেখতে পারছি না মা, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে তোর যন্ত্রণা দেখে। এইসব মানুষদের মাঝখানে থাকতে না পারলে এখানে চলে আয় মা, ধনেশ পাখির দলে ধনেশ পাখি হয়েতুই যে নদীতে যাস সেখানে দেখবি প্রতিদিন ধনেশ পাখির একটি দল আসে। তুই দেখিস তাদের অনুরোধ করে রোজ তোর জন্য কিছু পালক ফেলে যাওয়ার জন্য। তুই সেই পালকগুলো এক জায়গায় জমাতে থাকিস, সেলাই করে নিস তোর জামার সঙ্গে এবং চেষ্টা করিস উড়ে আসার, ধনেশ পাখিদের এই সুন্দর পৃথিবীতে চলে আয়, আমাকেও পাবি তুই এখানে

ঘুম ভাঙতেই হাইয়াইনু দৌড়তে দৌড়তে নদীতে যায়। সেখানে গিয়ে দেখে সত্যি সেখানে কিছু ধনেশ পাখির দল ওড়াউড়ি করছে। পাখিদের দেখে মেয়েটিরও ইচ্ছে করে সব দুঃখ কষ্ট থেকে বেরিয়ে গিয়ে তাদের মতো তাদের দলের হয়ে এরকম উন্মুক্ত আকাশে উড়ে যাওয়ার। সে তাদের ডাকতে থাকে,

--- “ও ধনেশ পাখি আমার উপর কৃপা করো! আমি আর আমার সৎমায়ের অত্যাচার সইতে পারছি না।”

ধনেশ পাখিরা সবাই একসাথে উত্তর দেয়,

--- বলো বলো মেয়ে কী হয়েছে?

--- আমি তোমাদের সঙ্গে উড়ে যেতে যাই। আমাকে নিয়ে যাও তোমাদের সঙ্গে।

--- তুমি পারবে না, পারবে না আমাদের মতো উড়তে, তোমার ডানা নেই, ডানা নেই।

চোখের জল মুছতে মুছতে হাইয়াইনু বলে,---

--- পারব, পারব। তোমরা আমাকে সাহায্য কর উড়তে। আমি এই দুখ দুর্দশা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই, উড়ে যেতে চাই খোলা আকাশে, ঠিক তোমাদের মতো। দয়া করে আমাকে তোমরা তোমাদের দলে যুক্ত করো।

ধনেশ পাখির দল উত্তর দেয়, 

--- আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে। বলো কী করে তোমায় আমরা সাহায্য করব?

--- তোমরা কী প্রতিদিন তোমাদের একটি করে পালক দেবে আমাকে? ঝুড়ি ভর্তি না হওয়া পর্যন্ত আমি জমাব। ঝুড়ি ভরে গেলেই ডানা মেলে আমি উড়ে চলে আসব তোমাদের কাছে!

হাইয়াইনুর কথা শুনে ধনেশ পাখিদের খুব দুঃখ বোধ হয় এবং তারা সম্মতি জানায়,

--- আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে!

        ধনেশ পাখিরা তাদের কথা মতোই রোজ একটা করে পালক ফেলে যায় মাটিতে। হাইয়াইনু তা জড়ো করতে থাকে একটা ঝুড়িতে। ঝুড়ি ঘরের মধ্যে লুকিয়ে রাখে যাতে তার সৎমা তা দেখতে না পায়। এরকম পালক কুড়িয়ে জমাতে জমাতে একদিন হাইয়াইনু দেখল তার ঝুড়ি ভর্তি হয়ে গেছে, তখন সে সেই পালকগুলোকে সেলাই করে ডানা বানাতে লাগল। ছোটভাই দরজার আড়াল থেকে দেখে নেয় দিদিকে পালক সেলাই করতে, সামনে এসে জিজ্ঞেস করে,

--- এগুলো দিয়ে কী করবে দিদি?

--- আমি উড়ে যাব ধনেশ হয়ে। এখানে আর থাকতে ভালো লাগছে না রে ভাই

--- আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না দিদি!

বলে দিদিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে ছোটভাই। হাইয়াইনুও পালক সেলাই ছেড়ে ছোটভাইকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে, ও ভাই!

পালক সেলাই শেষ হলে হাইয়াইনু ধনেশ পাখিদের দেখে এবং তাদের ডেকে বলে তাকে উড়ে যেতে সাহায্য করার জন্য। ধনেশ পাখিরাও সাহায্য করে। অতপর মেয়েটিও ডানা মেলে পাখি হয়ে উড়ে যায় আকাশে, মিশে যায় ধনেশ পাখির দলের সাথে। পাশে অসহায় ভাই শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই দেখতে থাকে তার দিদির আকাশে উড়ে যাওয়া। ছোটভাই দৌড়ে গিয়ে মাকে জানায় কথাটি, মা শুনে শুধু একটি কথাই বলে,

--- ভালো হেয়ালি!

কিছুদিন পর হাইয়াইনুর বাবা তার কাজ শেষে বাড়ি ফিরে আসে মেয়ের জন্য অনেকগুলো জামাকাপড়, অলঙ্কার এবং কিছু ফলমূল নিয়ে; কিন্তু মেয়েকে বাড়িতে কোথাও দেখতে পায় না। খুঁজতে থাকে এদিক ওদিক। স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলে স্ত্রী কিছু উত্তর করে না। তখন ছেলেটি আসে তার বাবার কাছে এবং বলে যে কী করে তার দিদি হাইয়াইনু ধনেশ পাখিদের সাথে উড়ে গেছে আর সে কোনোদিন তাদের মধ্যে ফিরে আসবে না। ছেলের কথা শুনে হাইয়াইনুর বাবা হাইয়াইনুর সৎমাকে গালাগাল দেয় যে তার অত্যাচারের জন্যই আজ তাদের মেয়ে এরকম দূরে চলে গেছে। সৎমাও তার কর্মের জন্য ভেতর ভেতর অনুতপ্ত হতে থাকে।

 মেয়েকে এভাবে হারিয়ে হাইয়াইনুর বাবা অত্যন্ত দুঃখী হয়ে পড়ে। খাওয়া ঘুম ছেড়ে দেয় প্রায়। রোজই উঠোনে দাঁড়িয়ে মেয়েকে ডাকতে থাকে,

---‘ও হাইয়াইনু! হাইয়াইনু! প্রিয় মামনি! দ্যাখ আমি তোর জন্য কী কী এনেছি! বাবার কাছে ফিরে আয় মা! দেখ তোর জন্য যে কত কাপড় চোপড় গয়না এনেছি কে পরবে ওগুলো! আমার কষ্ট হচ্ছে মা তোকে ছেড়ে থাকতে!

প্রতিদিন এরকম কাঁদতে কাঁদতে একদিন হাইয়াইনুর বাবা দেখতে পেল যে তাদের বাড়ির উঠোনের উপর দিয়ে একঝাঁক ধনেশ পাখি উড়ে যাচ্ছে এবং সেই দলে তার মেয়ে হাইয়াইনুও আছে। সে মেয়েকে ডেকে ঘরের ভেতর থেকে এক থালা ভাত এনে দিল এবং বলল তার মেয়েকে খেয়ে যেতে। হাইয়াইনু এসে বাবার পাশে দাঁড়ায়, কেঁদে বলে,

--- “বাবাগো, আমাকে ক্ষমা করে দিও, তোমার অসহায় কন্যা তোমার বাড়ি ফিরে আসার অপেক্ষাও করতে পারে নি। আমি আর মানুষের মাঝখানে বসবাস করতে পারছিলাম না। এখন তোমার দেয়া এই খাবারও আমি খেতে পারব না বাবা, আমি এখন ধনেশ পাখিদের দলের একজন, আমার খাওয়া অন্য। আমি অনেক সুখে আছি এখন ওদের সঙ্গে। আমার মাও আছে আমার সঙ্গে। দয়া করে ক্ষমা করে দিও তোমার অবোধ শিশুকে। বিদায় বাবা!

যেতে যেতে আবার দাঁড়িয়ে বলে,

--- আর হ্যাঁ বাবা, এই জন্মে আর হবে না, পরের জন্মে আমাদের দেখা হবে আবার। তোমার মেয়ে হয়েই ফিরে আসব। ভাইয়ের খেয়াল রাখবে, যত্নে রাখবে ওকে। আর মামনিকেও ক্ষমা করে দিও। কেঁদো না বাবা! তুমি যখনই ‘লাইহরাওবা’ অনুষ্ঠানে যাবে তুমি যেখানে বসবে ঠিক তার পাশের বসার জায়গাটা আমার জন্য খালি রেখে দিও, আমি ঠিক এসে বসব কিন্তু!

হাইয়াইনুর সব পাখি বন্ধুরা তাকে ডাকতে শুরু করে যে দেরি হয়ে যাচ্ছে ফিরে যাওয়ার জন্য। হাইয়াইনু তাই এইটুকু বলেই বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তার পাখি বন্ধুদের সাথে সোনালী আকাশে উড়ে যায়! হাইয়াইনুর বাবাও সেই আশা নিয়েই বাঁচতে থাকে তার মেয়ে হাইয়াইনু কোনো একদিন কোনো একজন্মে আবার ফিরে আসবে তার বাবার কাছে!

 

 

*****

 

  

রবিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২১

যে ক'টা দিন পৃথিবীতে ।। ষোড়শ পর্ব

।। ১৬।। 

 

(C)Image:ছবি

আড় চোখে দেখলাম, রাত দেড়টা প্রায়। আমার শরীরটা ক্রমশ: ভারী হচ্ছে যেন। রাতের ভারী খাবারের পর উঠোনের দশ মিনিট দাড়িয়ে থাকা ছাড়া আর বেশ কসরত হয়নি আমার। বসেই আছি সেই থেকে। অথচ আব্বাকে দেখি এখন সতেজ, শুরুতে যে অস্বস্তি ছিল সেটাও কেটে গেছে অনেকক্ষণ, একটা দৃঢ় চেতনা নিয়ে বলে যাচ্ছেন যেন এ ইতিহাস জানা দরকার। অন্তত তাঁর দামাদের সে জানা প্রয়োজন! 

আব্বার খোলা চোখে ছাদের দিকে করা ধ্যানটা ভাঙাতেই বললাম...

-- সুনীল...

--  হুমম, শুনেছি সেই ড্রাইভারই না-কি কীভাবে সুনীলের নাম্বার পেয়েছে, পকেটে ছিল বোধহয়। 

--  তারপর? 

-- হুঁ, তারপর, তারপর আর কী, আমাদের সুনীলের ঘরে থাকার কথাটা ছড়িয়ে পড়ল তাঁদের এলাকায়। সুনীলদের উত্ত্যক্ত করা শুরু হল ঘরে বাইরে। প্রায় সপ্তাদিন পরেই একদিন ফজরের নামাজটা পড়েই বেরিয়ে পড়ি আমরা তিনজন। জায়গায় জায়গায় তখন পুলিশের টহল। ভোরের বাতাসে পোড়া গন্ধটা আরও ঝাঁঝিয়ে লাগছে আমাদের নাকে, মুখে। কিছুদূর যেতেই ক'জন পুলিশ আটকাল আমাদের, বলল, কোথায় যাবেন, বললাম শাহপুর। শাহপুর রিফিউজি ক্যাম্পটা তখন এ অঞ্চলের মুসলমানদের জন্য একমাত্র নিরাপদ আশ্রয় স্থল। ওরাই গাড়িতে করে পৌঁছে দিল আমাদের সেখানে। 

 

--  মানুষ, হায় মানুষ! 

আব্বা আবারও যেন কাঁদো কাঁদো অবস্থায়। আমি বলতে ও পারি না, আব্বা থাক, ঘুমান, পাছে মন আরও খারাপ হয়ে যায়। আসলে মানুষের মন খারাপের কথাগুলো শুনতে হয়, আটকাতে নেই, বেরিয়ে এলেই বোঝাটা হালকা হয়। আব্বা আবার শুরু করলেন...

 

সেখানে প্রায় দিন পনেরো ছিলাম। কী দুর্বিষহ অবস্থা। প্রিয়জন হারানোর শোকে কেউ কারুর দিকে মনোযোগ দেয়ার মত নেই। কারুর মা, কারুর বোন, কারুর বাবাকে পাওয়া যাচ্ছে না। সকাল সকাল বেরিয়ে যান নিজ নিজ হারানো স্বজনদের খোঁজে, কেউ খুঁজে পান, কেউ পান না। যারা পান তারা আরও ভেঙে পড়েন। আহমেদাবাদ মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের বর্জ্য বাহী ট্র্যাক্টরে আসে লাশের ঢের, শাহপুর বড় মসজিদের কবরিস্থানে বিশাল সাইজের গর্ত করে একসাথে পনেরো, বিশটা করে লাশ ফেলে মাটি চাপা দেয়া হত। জীবিতের খোঁজে লাশের স্তূপে ভিড় জমাত আধ মরাদের দল। 

 

এবার আমার চোখে পানি। ছোট্ট নাদিয়ার কথা ভেবে বুক ফেটে যাচ্ছে যেন আমার! আব্বাকে বললাম আর নাদিয়া?

নাদিয়ার কান্না হাজারো শিশুর কান্নার সাথে মিশে একাকার। আমরা সবাই এক! আমাদের একমাত্র পরিচয় আমরা রিফিউজি! 

--  আর অফিস?

---  হ্যাঁ, অফিস তখন অর্ধ দিন হত। সুনীল আমাদের খোঁজে এফ আই আর দিয়েছে থানায়। একদিন অফিসে দেখেই জড়িয়ে ধরল। কিন্তু আমার কেন জানি আর থাকতে ইচ্ছে করছিল না সেখানে। মনে পড়ে যাচ্ছিল সুনীলের ভূপালের দিনগুলোর কথা। সেদিন তার বুকে বোধহয় এমনই যন্ত্রণা ছিল! কে জানে! সুনীলকে বললাম আমি চাকরি ছাড়ছি। সে পীড়াপীড়ি করতে লাগল, বলল সব ঠিক হয়ে যাবে! এমনকি আমাদের আবার শাহপুর থেকে তার ঘরে নিতে চাইল। কিন্তু অবিশ্বাসের বাতাস তখন কোণায় কোণায়, ওলিমা কিছুতেই শাহপুর ছাড়তে রাজি নয়। বাঁচলে সে সেখানেই বাঁচবে আর মরলে ও সেখানে! সুনীল আমাকে ভূপালে চলে যেতে বলল, সে সব ঠিক করে দেবে! তারপর মার্চের পঁচিশ তারিখ আহমেদাবাদ ছেড়ে সোজা এইখানে! 

 

মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে আসছে। আল্লাহু আকবার আল্লা হু আকবার...

চুপচাপ বসে আছি দু'জন মানুষ! আব্বা এতো সাহস দেখিয়ে ও যে কথাটি মুখ ফুটে বলার সাহস রাখতে পারলেন না, সে আমি নীরবে বুঝে গেলাম। 

নাদিয়া কুরেশি, নাদিম কুরেশি আর আয়েশা কুরেশির সেই আদরের দুলাল! 

আমি কান্নায় ভেঙে পড়ছি, আমার দুচোখে অশ্রুর বন্যা! 

 

ক্রমশ: 

 

#যেকটাদিনপৃথিবীতে

 

বুধবার, ২৮ জুলাই, ২০২১

লিলি

                                                         ।। শৈলেন দাস ।।

 

(C)Image:ছবি

  গতকাল সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া কয়েকটি ফটো এবং একটি ভিডিও দেখার পর থেকেই সতীশের মন ভারাক্রান্ত আর আজ বহুল প্রচারিত স্থানীয় দৈনিক কাগজ যে বিচ্ছিরি একটা শিরোনাম দিয়ে ওই ভাইরাল খবরটি ছেপেছে তাতে সে অনেকটা মর্মাহত। একটি মেয়ের সাহসিকতার কথা রয়েছে খবরটিতে অথচ শিরোনামটা অবমাননাকর! সতীশ ব্যাপারটাকে এত পার্সোনালি নিয়েছে কারণ যে মেয়েটিকে নিয়ে এই খবর, সে আগে থেকেই তাকে চিনে। তার নাম লিলি।

 

    বছর দুয়েক আগের ঘটনা। কোন এক সন্ধ্যায় শহরের ব্যস্ততম এলাকায় সতীশ প্রথমবার স্ট্রিট লাইটের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল লিলিকে। ছিমছাম, সাদা সালোয়ার কামিজ পড়ে একটি মেয়েকে এমন অসময়ে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সতীশের কেমন যেন খটকা লাগল। সে এগিয়ে যাবে মেয়েটির সাথে কথা বলতে, হঠাৎ একটি মারুতি ভ্যান এসে থামল লিলির সামনে এবং সে চটপট উঠে পড়ল তাতে। তিনদিন পর সেই একই জায়গায় একই পরিস্থিতিতে অন্য একটি গাড়ি থামিয়ে অপর একজন বলল 'চল'। লিলি তখন এদিক ওদিক তাকিয়ে মিনিট খানেক সময় নিয়ে ইতস্তত করে উঠে পড়ল গাড়িতে। অদূরে চায়ের দোকানে বসে থাকা সতীশের মনে হল লিলি সম্ভবত বুঝতে পেরেছে যে সে লক্ষ করছে তাকে।

 

    সেদিনই চা দোকানীর কাছ থেকে লিলির যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করল সতীশ। মেয়েটির বাবার যকৃতে ক্যান্সার। ছোট্ট দুটি ভাই বোন, মা আর দিদিমাকে নিয়ে তার সংসার। শহরের বৃহত্তম স্লাম এলাকার একসময়ের সচ্ছল পরিবারের মেয়ে ছিল সে। পাঁচটি পেট পালার দায়িত্ব যখন কাঁধে পড়ল তখন সাহস করে পয়সা উপার্জনের সহজ রাস্তায় নেমে পড়া ছাড়া কোনও উপায় ছিল না তার। 

 

    এর কিছুদিন পর সতীশ আবার লিলিকে দেখেছিল মিশন প্রাঙ্গণে। সারদা মায়ের জন্মদিনে বয়সের ভারে ন্যুব্জ বৃদ্ধা দিদিমার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল মিশনের এক কোণে। সতীশ এগিয়ে গেল লিলির কাছে এবং টিপ্পনী করল - 'কোন সময় কে কোথায় যে দাঁড়ায় আজকাল বোঝা বড় দায়'। লিলি বুঝতে পেরেছিল সতীশ তাকে উদ্দেশ্য করেই বলছে কথাগুলি। তবুও কোন প্রত্যুত্তর দেয়নি সে। শুধু দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তার চোখ থেকে। সমাজে তার পেশা নিষিদ্ধ তবু সেদিন লিলিকে অশুদ্ধ বা অশুচি মনে হয়নি সতীশের। বরং সেদিন নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হয়েছিল তার। 

 

    সংবাদ যাই হোক শিরোনামে চমক থাকা চাই। তাই লিলির নামের আগে 'যৌনকর্মী' শব্দটি জুড়ে দিল ব্যবসাসফল পত্রিকার সুচতুর এডিটর। একবারও ভেবে দেখল না যে লিলি যৌনকর্মী হিসেবে নয় দায়িত্ব পালন করেছে সুযোগ্য কন্যার। তাছাড়া খবরের ভিতরের অংশে পরোক্ষে লিলির জীবনের নেগেটিভ দিকই যেন তুলে ধরা হয়েছে বেশি করে। করোনা সংক্রমণের অজুহাতে ছেলেমেয়েরা যেখানে মা-বাবার  মৃতদেহ সমঝে নিতে অস্বীকার করছে সেখানে লিলি কোভিড আক্রান্ত পিতার শব একাই শ্মশানে নিয়ে গিয়ে দাহ করেছে, তাকে তো সামান্য সম্মান দেখানো দরকার।

 

    নিষিদ্ধ পেশায় জড়িয়ে থাকলেও যৌনকর্মীদেরও পরিবার থাকে এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনে ওরা অনেক ব্যতিক্রমী সাহসী - একথা মানুষকে জানাতে হবে। তাই লিলিকে নিয়ে একটা স্টোরি করল সতীশ এবং পাঠিয়ে দিল কয়েকটি দৈনিক কাগজে। কোন কোন কাগজ স্টোরিটি প্রকাশ করে এখন সেটাই দেখার।