“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
পার্থঙ্কর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
পার্থঙ্কর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ৭ জুন, ২০২১

বজ্রাঘাতে হত… ইতি অষ্টাদশ গজঃ…


।। পার্থঙ্কর চৌধুরী ।।

গাঁও জেলার বামুনি পাহাড়ে সাম্প্রতিক কালে দেড় ডজন গজরাজের আকস্মিক বজ্রাঘাতে মৃত্যুর খবরটা অতিমারি জনিত মৃত্যুর চাইতে কোন অংশে কম ভয়ঙ্কর নয়। কাজিরাঙ্গা থেকে একদিকে হোজাই জেলার ডবকা আর অন্যদিকে কারবি-আংলং পাহাড়ে হাতীদের নিত্য নৈমিত্তিক আসা-যাওয়ার পথ (Elephant Corridor mapping) কেমন রয়েছে, তার হাল- হকিকতই বা কি; মানব নামক দানবের উৎপীড়নে সেই পথ আজকের দিনে কতটুকু নির্বিঘ্ন রয়েছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ নিয়ে আমাদেরই একখানা গবেষণাপত্র সম্প্রতিকালে জেনিফার পেস্টরিনি  সম্পাদিত এবং

শ্রীলঙ্কা থেকে প্রকাশিত ‘Gajah’ নামক জার্নালে বেরিয়েছে। জেনি-র ওই জার্নালে এর আগেও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের পাথারিয়া অঞ্চলে থাকা সীমিত সংখ্যক স্ত্রী হাতির জীবন যাপনের দুর্দশার কথাও প্রকাশ পেয়েছিলো। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও, প্রদীপের নিচটা বরাবরের মতো অন্ধকারই থেকে গেছে!  বিষয়টা নিয়ে উত্তর পূর্বের একে একে সব সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের সাথে একদিকে যেমন কথা হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত হস্তী-বিশেষজ্ঞ (Elephant man of India) বাঙ্গালুরুস্থিত ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব সাইন্সের অধ্যাপক রমন সুকুমার স্যারের সঙ্গেও বছরদিন আগে কথা হচ্ছিল। আজ অব্দি কোন হিল্লে হল না! বরাক উপত্যকার আজকের দিনে সাকুল্যে ৭টি হাতি রয়েছে। হারাধনের এই সাতটি ছানার তিনটি ( ১টি করে পুরুষ ও স্ত্রী, এবং তাদের একমাত্র শিশুশাবক) রয়েছে কাটাখালের জঙ্গলে, বাকি চারটে (সবক’টিই স্ত্রী) পাথারিয়ার জঙ্গলে রয়েছে। ভিসা পাসপোর্ট ছাড়াই গোটা বছরে ওদের পাঁচ থেকে ছ’বার ভারত–বাংলাদেশের মধ্যেকার জঙ্গলে আনাগোনা অব্যাহত।

এখানে বলে নেওয়া উচিত যে হাতির সংখ্যা গোটা দেশের মধ্যে সবচাইতে বেশি রয়েছে কর্ণাটকে, এর পরেই রয়েছে আসাম। যদিও ২০১৯ এর হাতি সুমারির তথ্য এখন পর্যন্ত হাতে আসেনি, কিন্তু ২০১৭-র তথ্য অনুযায়ী আসামে মোট ৫,৭১৯টি হাতি ছিল, যা এর আগের তথ্য (২০০২ সালের) তুলনায় ৪৭৩টা বেশি।  রক্ষণশীল অনুমানেও ২০১৯-র আসামে হাতির সংখ্যা প্রায় ৬০০০-এর বেশি হবে, এতে সন্দেহ নেই। এবং এই সংখ্যার বেশির ভাগই রয়েছে মধ্য আসামের বিস্তীর্ণ অরণ্যভূমি জুড়ে। দক্ষিন আসামের কামরূপ, ধুবড়ি, মানকাছর বডোল্যান্ড ইত্যাদি এলাকাতেও কম বেশি হাতি রয়েছে। গুয়াহাটির অদূরে থাকা রানী-গাড়ভাঙ্গা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের হাতীদের নিয়েও আরেকখানা গবেষণাপত্র এরই মধ্যে প্রকাশ পাবে।  ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণ প্রান্তের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকা জুড়ে তিনটি এলিফেন্ট করিডোর রয়েছে। এ গুলোর প্রথমটা কাজিরঙ্গা থেকে পাশে থাকা লাওখোয়া/ বুড়াচাপরি অভয়ারণ্য। দৈর্ঘ্য- ৫০-৫৫ কিলোমিটার। দ্বিতীয়টা কাজিরঙ্গা থেকে থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ক্রমে বাগসার সংরক্ষিত বনাঞ্চল, ডিজো সংরক্ষিত বনাঞ্চলের দক্ষিন অংশ হয়ে, ধলাপাহাড় হয়ে, সোয়াং সংরক্ষিত বনাঞ্চল, বামুনি সংরক্ষিত বনাঞ্চল, কঠিয়াতলি হয়ে হোজাই-র পাশে থাকা ডবকা সংরক্ষিত বনাঞ্চল অবধি বিস্তৃত।দৈর্ঘ্য- ৬০-৬৫ কিলোমিটার । এবং তৃতীয়টা কাজিরঙ্গা জাতীয় উদ্যান থেকে সোজা দক্ষিণ দিকে  উত্তর কারবি আংলং অভয়ারণ্য অবধি বিস্তৃত। দৈর্ঘ্য- ৪৫-৫০ কিলোমিটার (ছবি-১)। এই করিডর গুলোর মধ্যে দ্বিতীয়টি অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ, এবং এই করিডরের মোটামোটি মধ্যভাগেই রয়েছে বামুনি পাহাড়, যেখানে সম্প্রতি এক সাথে দেড় ডজন হাতির মৃত্যু হল।

গুয়াহাটি ভিত্তিক যাবতীয় সব সংবাদ মাধ্যম দিনরাত এক করে একের পর এক ব্রেকিং নিউজ, বিশেষজ্ঞদের দিয়ে আলোচনা ইত্যাদি করিয়েছে যদিও, কিন্তু কারো মুখেই করিডোর গুলোর কথাটা উঠে আসলো না! তাঁদের কেউই উল্লিখিত করিডোরের স্বাস্থ্য সম্পর্কে না ওয়াকিবহাল, না সংরক্ষণ-মুখর। অন্যদিকে বন বিভাগও নিজেদের ঢাক এই বলে পেটাচ্ছে যে সাম্প্রতিক দিনে রাজ্যে ২২২ বর্গ কিলোমিটার বনাঞ্চল বৃদ্ধি হয়েছে। তবে ওটা ২০১৭ থেকে ২০১৯, এই দুবছরের তুলনামূলক তথ্য; এবং শতকরার হিসেবে সেটা তেমন কোন সন্তোষজনক নয়। আবার অনেকেই ফেবু-টুইটার মাধ্যম বজ্রাঘাতের এই থিয়োরিটা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন।  আবার অন্যদিকে প্রাইভেট কোম্পানি কর্তৃক বামুনি পাহাড় বেদখলের তত্ত্বও আলোচনায় এসেছে। সময়টা কঠিন! অতিমারি-জনিত সেমি লক-ডাউন। দুর্যোগের ঘনঘটা। অনেকেই করোনাক্রান্ত... মৃত্যুর মিছিল আনলিমিটেড। যেহেতু ঘরের বাইরে পা রাখার জো প্রায় নেই, তাই হাতে সময়ও আনলিমিটেড। অনেকের আবার আনলিমিটেড মোবাইল ডাটাও ! এর জন্যই কি এত্তোসব বহুমুখি তথ্য !!

হ্যাঁ, খবরটা প্রথম পেয়েছিলাম ১৩ মে-র সন্ধ্যেবেলা। দুর্ঘটনাস্থল লাগোয়া জায়গায় বাড়ি রয়েছে এবং এই নির্দিষ্ট বিষয়ের (Study of Elephant corridors বা করিডোর অধ্যয়ন) উপর গবেষণারত ছাত্র জ্যোতি বিকাশ বৈশ্যকে সে রাতেই ফোনে পাকড়াও করলাম। অতিমারির এই দিনে সদ্য-বিবাহিত ছাত্রটার উপর প্রভাব খাটাতে নিজের কিছুটা খারাপও লাগছিল বৈ কি! কিন্তু, গবেষণার স্বার্থে, বিষয়টা তো আর হাতছাড়া করা যায় না। মরিগাও জেলার যেখানে ছেলেটার বাড়ি, সেখান থেকে বামুনি পাহাড়ের দুরত্ব ৫২-৫৪ কিলোমিটার। ছেলেটার বাইকের নম্বর জোড় সংখ্যার। পরদিন অর্থাৎ ১৪ তারিখ, মরিগাও জেলায় জোড় সংখ্যার গাড়ি চলার অনুমতি রয়েছে, কিন্তু পাশের নওগাঁ-তে বেজোড়! সে আরেক হ্যাপা। যাকগে! জোড়-বেজোড় বিষয়টাকে জোড়াতাপ্পি মেরে ছেলেটা গিয়ে ওখানে পৌছালো এবং নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বামুনিপাহারের উপর থেকে আমাকে ফোন করলো। তখন সময় সকাল আটটা।

বামুনি পাহাড় বলে যেটাকে এতক্ষন বলছি, সেটা হচ্ছে গিয়ে বামুনি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। নগাও জেলার কঠিয়াতলি বন বিভাগের আওতায় থাকা এই বামুনি বনাঞ্চল প্রায় এক লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার হেক্টর জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। বনাঞ্চলের এখানে সেখানে ছোট থেকে মাঝারি পাহাড় দিয়ে ঘেরা। এই পাহাড়ি পথের চরাই- উতরাই দিয়েই ধলাপাহাড় পেরিয়ে সোয়াং বনাঞ্চল হয়ে  হাতিগুলো বামুনি পাহাড়ে এসে পৌছায়।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী তেরো মে দিনটির ৩-৪ দিন আগে থেকেই সেখানে বজ্র-বিদুত সহ মুশলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। ইন্ডিয়ান মেটেরোলজিকেল ডিপার্টমেন্ট-এর ওয়েবসাইটে দেওয়া পূর্বাভাসেই উল্লেখ রয়েছিল যে ১২ তারিখ থেকে পরবর্তী ৫ দিন দমকা হাওয়া (প্রায় ৭-১১ কিলোমিটার বেগে) এবং বজ্রবিদ্যুৎ সহ সেখানে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা, এবং বাস্তবে হয়েছিলও তাই। আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম বলে একটা আভাষ আবহাওয়া দপ্তর দিয়ে থাকে।  গভীর সমুদ্রে  মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের ক্ষেত্রে যেমন তা প্রযোজ্য, লোকগুলোকে বারণ করা হয়, উত্তর পূর্বের বনাঞ্চলের বনকর্তাদের বন্যপ্রাণীদের গতিবিধি লক্ষ্য করে,  তাদের জন্যও অনুরূপ পদক্ষেপ গ্রহন করাটাও মনে হচ্ছে আশু কর্তব্য। কিছু একটা আগাম পদক্ষেপ হাতে নিলে, হাতীদের করুন মৃত্যু নিয়ে জনমানসে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তাতে কিছুটা হলেও মলম লাগানো যেতো। যাকগে, ভবিষ্যতের জন্য এ এক শিক্ষা হয়ে রইলো! এনিয়ে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত Oryx-জার্নালে আমাদের একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন ইতিমধ্যেই প্রকাশ পাবে।

 বার্তালিপি ৩০ মে, ২০২১

মারা যাওয়া ১৮টি হাতীদের মধ্যে  ৫টা মাদা এবং ১৩টা স্ত্রী। এর মধ্যে ৪টা বাচ্চা হাতি। ১৪ টা পাহাড়ের চুড়ায় এবং বাকি ৪টার মৃতদেহ পাহাড়ের ঢালু এলাকাতে ছড়ানো। বামুনি পাহাড়ের উপরিভাগ, যে স্থানটা হাতীদের গনমৃত্যুর সাক্ষী, সেখানে গাছপালা প্রায় নেই বললেই চলে। এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দু-চারটা সেগুন গাছ, মাঝারি ধরনের ঝোপ-জঙ্গল আর বাঁশঝাড়। এদের কোনটাই গহীন জঙ্গলের চারিত্রিক বৈশিষ্ট নয়! অতএব, একটা কথা পরিস্কার, যতই ২২২ বর্গ কিলো মিটার বনাঞ্চল বৃদ্ধির দাবী করা হোক না কেন, মাথার উপর বৃক্ষ-চন্দ্রাতপ (ছাউনি) না থাকা করিডোর দিয়েই হাতীদের চলাচল করতে হচ্ছিল! আর এর দায় কি শুধু সরকার বাহাদুরের উপর? ওই যে বললাম,  কাজিরঙ্গা থেকে ডবকা পাহাড়, দীর্ঘ ৬০-৬৫ কিলোমিটার এলিফেন্ট করিডোরের মাঝে মধ্যের বিশাল জায়গা জুড়ে গত দু-তিন দশক ধরে শুরু হয়েছে ধানচাষ। জমির মালিক সরকার, ধানের মালিক গেরস্ত। রাজ্যের প্রায় অধিকাংশ বনাঞ্চল জুড়েই অবৈধ গেরস্তদের এরকম ‘অনধিকার-চর্চার’ দৃশ্য চোখে পড়ে। উপত্যকার রজনিখালে বছরদিন আগে যা হয়েছিল, গোটা রাজ্যজুড়ে সেরকম ব্যাপক অভিযান চালানো  মনে হচ্ছে খুবই দরকার। অন্ততঃ বন্যপ্রাণী এবং তাঁদের আবাসস্থল রক্ষাকরার জন্য।

বজ্রপাতের ফলে এই দুর্ঘটনা সংঘটিত হওয়ার স্বপক্ষে কথা বলার জন্য দু-দুখানা ফটো আমাদের হাতে এসেছে। একটাতে দেখা যাচ্ছে যে বজ্রপাতের ফলে হাতির শুড়ের মধ্যে কিছুটা অংশ ছেঁকা লেগে পুড়ে গেছে (ছবি-২) এবং  অন্যটাতে সে জায়গায় থাকা গাছগুলোর পাতা ঝলসে গেছে (ছবি-৩)। ইতিমধ্যে, অর্থাৎ  ২৩ মে, ২০২১ তারিখ ময়না তদন্তের রিপোর্টখানাও বেরিয়ে এসেছে। গুয়াহাটির খানাপাড়াস্থিত আসাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক এস, এম, তামুলি এবং সহকারি অধ্যাপক এ, ডেকা মরা হাতিগুলোর চামড়া, রক্ত এবং দেহকোষ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানিয়েছেন যে, হাই ভল্টেজ ইলেকট্রিক কারেন্টের আঘাতে হাতিগুলোর শরীরে প্রচুর ক্ষতের দাগ পরিলক্ষিত হয়েছে। রিপোর্টে উনারা এটাও উল্লেখ করেছেন যে হাতিগুলোর দেহের উপরিভাগের চামড়া তার নিচের টিসুগুলো থেকে আলাদা হয়ে গেছে, দেহের কোষ গুলো থেঁতলে গেছে, ধমনী এবং শিরাগুলো ফেটে চৌচির হয়ে গেছিল, ফলে আভ্যন্তরিন রক্তপাত ঘটেছে।

যদিও পুরো ঘটনাটাই দুর্ভাগ্যজনক, এবং আসাম তথা গোটা ভারতে এমন ঘটনা এর আগে শোনা যায় নি, কিন্তু এ জাতীয় ঘটনা পৃথিবীতে  যে এর আগে কক্ষনো ঘটে নি, তা নয়। অন্তত দু-দুবার ঘটেছে। ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই আমেরিকার উটা-র ‘মিল কেনিয়ন পিক’-এ বজ্রাঘাতে একসাথে ৬৫৪টা ভেড়া মারা যায়। আবার ৬-৭ বছর আগে (২০১৬ সালের আগস্ট মাসে) ইউরোপের নরওয়েতে  একইভাবে বজ্রপাতে ৩২৩-টা বল্গাহরিণ মারা গেছে যাদের মধ্যে ৭০টাই ছিল হরিনশাবক। বজ্রপাতে বন্যপ্রাণী মারা যাওয়ার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আমেরিকার জাতীয় মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডল প্রশাসন (NOAA)-এর বজ্র-বিদ্যুত বিশেষজ্ঞ জন জেন্সেনিয়াস (John Jensenius) বলেছেন যে খোলা আকাশের নীচে থাকা প্রাণীদের দেহে দুভাবে বাজ আঘাত হানতে পারে। প্রথমটা সরাসরি প্রাণী দেহে এসে পরে; এবং দ্বিতীয়, তির্যক বা সাইড ফ্ল্যাশ। সরাসরি যেটা এসে পরে, সেটা অবজেক্ট অর্থাৎ প্রানিদেহ-কে (অথবা যেখানে প্রানিটা রয়েছে সেই মাটিকে) স্পর্শ করে, ফলে প্রানিদেহ অথবা সেই মাটি তড়িতায়িত হয়ে পড়ে। আর যে মাটি তড়িতায়িত হলো, সেটা ৫০ থেকে ৮০ মিটার ব্যাস জুড়ে সেই মুহূর্তে (সাময়িকভাবে) কারেন্ট থাকে। এমনিতেই প্রাকৃতিক কোন দুর্যোগের সময় বনের পশুরা স্বাভাবিকভাবেই এক জায়গায় জটলা বেঁধে থাকে। এটা তাদের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি। এর ফলেই একসাথে এতগুলো প্রাণী মারা যায়। দ্বিতীয়টা, অর্থাৎ সাইড ফ্ল্যাশ সম্পর্কে জেন্সেনিয়াস বলেছেন, ঘটনাস্থলে যদি উঁচু গাছপালা থাকে, তাহলে বাজ এসে প্রথমে পরবে সে গাছ গুলোর উপর, এবং সঙ্গে সঙ্গে তা ছিটকে গিয়ে পাশে থাকা প্রাণীর উপর পড়ে। হটাত করে আসা সেরকম কারেন্ট প্রাণীদের নার্ভাস সিস্টেম কে আক্রমন করে এবং এর ফলে স্নায়ু-তন্ত্র তথা মস্তিষ্ক আচমকা স্থবির হয়ে পড়ে। তবে এ দুটোর মধ্যে  সাইড ফ্ল্যাশের ক্ষেত্রে প্রাণীদের কম মাত্রায় হলেও বাঁচার সম্ভাবনা থাকে। এবং সেটা সম্ভব হয় যদি খুব অল্পসময়ের মধ্যে প্রাণী টাকে সি-পি-আর (অর্থাৎ Cardio-Pulmonary Resuscitation) করানো হয়। তবে উন্নতদেশগুলো বন্যদের জন্য ঐ CPR-এর কথা ভাবতে পারে, আমাদের এখানে যেখানে সাধারন একটা ‘ক্যাথ-ল্যাব’-এর অভাবে পথে ঘাটে সায়ন্তন-রা মারা যাচ্ছে, সেখানে ওমন ভাবনা করাটাই ব্যাকুলতা বৈ কি আর হতে পারে?

এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে চলে আসছি। এবারের পরিবেশ দিবসটা এলো বলে…। এ বছরের থিম, ECOSYSTEM RESTORATION, অর্থাৎ ‘বাস্তুতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা’। রাজ্যের বামুনি পাহাড়ের একদল হাতি মরে গিয়ে একটা কথা প্রমান করে দিল যে আমরা যে যাই বলি না কেন, বনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য  বন্যদের মধ্যে নেই! হাতীদের বলা হয় ‘আমব্রেলা প্রজাতি’ (Umbrella species)। অর্থাৎ এদের ভালভাবে রক্ষা করলে চেনা-অচেনা অন্য হাজার প্রজাতির সুরক্ষা এমনি এমনিই হয়ে যায়। তাই বলছিলাম, তাদের সুরক্ষার জন্য  বেদখল মুক্ত করে করিডোর গুলোতে ব্যাপক বৃক্ষ-পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এ সময়ের আহ্বান। আজদের দিনে অমন একখানা পদক্ষেপ হাতে নিলে, এ গাছগুলো যখন বড় হবে, অর্থাৎ, পনেরো-কুড়ি বছর পর আসামের পাহাড়ে একই ধরনের বজ্রপাত হলে সেদিন হাতিগুলোকে হয়তঃ বা ওমন বেঘোরে প্রান হারাতে হবে না…   

শনিবার, ১ মে, ২০২১

রেংটি পাহাড় : কতটুকু কার ??

 
।। পার্থঙ্কর চৌধুরী।।

(C)বার্তালিপি

রেংটি পাহাড়! শহর শিলচর থেকে ৩০৬ নং জাতীয় সড়ক হয়ে দক্ষিণ-দিক ধরে ৫০ কিলোমিটার যেতে না যেতেই ভাইরেংটি। ভাইশব্দটা মিজোরা কি অর্থে ব্যবহার করে, সেটা না জানলেও, আপাতত:, প্রচলিত অর্থে যদি সহোদর ধরে নেই, তবে যে প্রশ্নটা অবধারিত উঠে আসছে, তা হলো, এই গত কিছুদিন থেকে পত্র-পত্রিকায় এত ভাতৃঘাতী খবর বেরুচ্ছে কেন ??
            এই তো সেদিন। মানে কুড়ি ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৭। অর্থাৎ রাজ্যটার বয়স সবেমাত্র ৩৪ বছর। অবশ্যি তার আগে আরো ষোল বছর (১৯৭২-১৯৮৭র ১৯ ফেব্রুয়ারি) সে কেন্দ্র শাসিত ছিল। এরও আগে? স্বাধীনতার পর থেকে ৭১ সাল অব্দি তো এই লুসাই পাহাড় ছিল তো আসাম রাজ্যেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যদিও যাতায়াতের জন্য সমতলের বাসিন্দাদের বিশেষ পাস দরকার হত। সে আরেক কথা। বেঙ্গল রেগুলেশন। সেটা না হয় পরে বলছি। কিন্তু এক্ষুনি যেটা বলতে চাইছিলাম, তা হলো, প্রাণী এবং উদ্ভিদদের বংশবিস্তার সাধারণত: দুভাবে হয়। অযৌন এবং যৌন প্রক্রিয়া। (ইংরেজিতে Asexual এবং Sexual)অ্যামিবা জাতীয় নিচুবর্গের প্রাণীদের দেহ Asexual বা অযৌন প্রক্রিয়াতে (Binary fission) দ্বিখণ্ডিত হয়ে এক থেকে দুই, দুই থেকে চারটি অ্যামিবা সৃষ্টি হয়। তাহলে, মোদ্দা কথা এটাই যে, ওই চারটি দেহে যে জিন-ক্রমোজম রয়েছে, সবই একই দেহ থেকে সৃষ্ট। মেঘালয় বলুন, কিম্বা নাগাল্যাণ্ড, মনিপুর বলুন কিম্বা অরুণাচল প্রদেশ - একই দেহ থেকে সৃষ্ট ভায়েরা নিজেদের মধ্যে এত লাঠা-লাঠিতে ব্যস্ত কেন? ইতর প্রাণীদের মধ্যেও যে এমন ঘটনা বিরল!
        বলতে চাইছিলাম, যে পাহাড়টাকে স্থানীয়রা রেংটি-পাহাড়বলে চেনেন, তার পোশাকি নাম, ‘ইনার লাইন রিসার্ভ ফরেস্ট’ ( Inner Line Reserve Forest, বা সংক্ষেপে ILRF)১৯৮৩ সালের বেঙ্গল ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রেগুলেশন আইনমতে ১৮৭৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন আসামের কাছাড় জেলার দক্ষিণপ্রান্তের ভূখণ্ডকে এই ইনার লাইনঘোষণা করা হয়। যদিও এরও প্রায় দুবছর পর, অর্থাৎ ১৮৭৬-৭৭ সালে গেজেট নোটিফিকেশনের মধ্য দিয়ে ওই পাহাড়ের কেন্দ্রস্থ স্থানের ৩৩৯ বর্গ মাইল এলাকাকে রিসার্ভ ফরেস্টের আওতায় আনা হয়, এবং পরিধি অঞ্চলের আরও ৪৮৯ বর্গ মাইল এলাকা আন-রিসার্ভডরাখা হয়েছিল। (In 1876 a total area of 825 square miles was set apart as Unreserved Forest, of which 336 square miles are within, and 489 without, 'the Inner Line'. – হান্টার, ১৮৭৯ )। এ তো গেলো তখনকার কথা। সেদিনের তুলনায় আজকের দিনের এই ইনার লাইন রিসার্ভ ফরেস্ট প্রায় ৬.১৬ মাইল (বা প্রায় ১০ বর্গ কিলোমিটার) কমেছে, এবং ৮১৮.৮৪ বর্গ মাইল (অর্থাৎ ১৩১৭.৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে বর্তমানের রেংটি পাহাড়।
    


         পাশের দেওয়া ছবি থেকেই বোঝা যাচ্ছে, এই বিশাল এলাকা জুড়ে যে রিসার্ভ ফরেস্টটি বিস্তৃত, বর্তমান ভৌগোলিক মানচিত্র অনুযায়ী তার পরিধি এলাকার সীমানা আনুমানিক ৪০ শতাংশ আসামের (কাছাড় এবং হাইলাকান্দি জেলার) সঙ্গে জুড়ে রয়েছে, বাকি আরও আনুমানিক ৪০ শতাংশ মিজোরামের সাথে এবং পরিধি অঞ্চলের বাকি ২০ শতাংশ রয়েছে পাশের রাজ্য মনিপুরের সাথে।

          ফরেস্ট বিভাগের অনুমতি ক্রমে এবং গবেষণার স্বার্থে গত দেড় কিম্বা দুই দশক ধরে আমাদের ছেলেরা প্রায়ই এই ইনার লাইন অঞ্চলে যেতে হচ্ছে। তুলনামূলক ভাবে সহজ গন্তব্য স্থল গুলো হচ্ছে, বালিচুরি, একারথল, নাগাথল, নক্সাটিল্লা, লোহারবন্দ। আরও দক্ষিণে এগিয়ে গেলে শেওড়াথল, হাডাম্মাবস্তি, পানছড়া ইত্যাদি গ্রাম। অঞ্চলগুলোতে প্রবেশ করলেঅরণ্যের রোদনপ্রায়ই চোখে পড়ে। যত্ন-আত্তির সেরকম ভাবে করা হচ্ছে না ঠিকই, তবুও এই রিসার্ভ ফরেস্টের বিভিন্ন জায়গা বেশ কিছু মূল্যবান গাছ এবং দুর্লভ প্রজাতির প্রাণীর এখনও আবাসস্থল। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের সদর্থক ভূমিকার ফলে ইনার লাইনের আসামের (অর্থাৎ কাছাড় ও হাইলাকান্দি জেলার) আওতায় থাকা স্থান গুলোতে জীববৈচিত্র্য নিয়ে কম বেশি গবেষণা তথা সংরক্ষণের কাজ চলছে যদিও, কিন্তু পার্শ্ববর্তী মিজোরাম রাজ্যে একই ধরনের প্রতিষ্ঠান থাকা সত্বেও, রেংটি পাহাড় নিয়ে সেরকম কোনও কাজ প্রকাশিত গবেষণাপত্রে চোখে পড়ে নি! মিজোরাম অধ্যুষিত ইনার লাইনের ৪০ শতাংশ অঞ্চলে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্রাধান্য পেয়েছে, এরকম কোন গবেষণার খবর নিশ্চয়ই সংরক্ষণবাদীদের কাছে সুখকর হবে। আসলে রেংটি-পাহাড়বলুন কিম্বাইনার লাইন রিসার্ভ ফরেস্ট’, এই বিশাল পাহাড়ি এলাকা এবং এর মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিচিত্র সব মূল্যবান উদ্ভিদ এবং প্রাণীকুলের সঠিক সংরক্ষণের জন্য তিন তিনটি রাজ্যও সরকারের ( আসাম, মিজোরাম এবং মনিপুর) সদর্থক ভূমিকা পালনের জন্য যৌথ আলোচনা টেবিলে বসা প্রয়োজন। বিপুল জীববৈচিত্রে ভরপুর এই পাহাড় নির্দ্বিধায় একটি জাতীয় উদ্যান, নিদেনপক্ষে একটা অভয়ারণ্যের দাবী রাখতেই পারে। এ তো গেল ইতিবাচক দিক। সম্ভাবনার কথা। এ যাবত ঘটে যাওয়া যাবতীয় সমস্যার 'পেনাসিয়া'। (বলাবাহুল্য, কেন্দ্রের উদ্যোগেই জাতীয় উদ্যান কোথাও স্থাপন করা যেতে পারে।)
  


    

  এর উল্টোদিকে, অর্থাৎ, নেতিবাচক দিকগুলো হচ্ছে, সাম্প্রতিক অতীতেই অর্থাৎ এই করোনা-কালীন সময়েই আমরা পত্র-পত্রিকায় দেখতে পেয়েছি, শিলচর- আইজল সড়কের আসাম প্রান্তের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাতে মিজোরা চেক-গেট বসিয়ে দিয়েছিল। কলাশিব জেলার লোকেদের সঙ্গে আসামের কাছাড় জেলার প্রান্তীয় গ্রামের বাসিন্দাদের সংঘর্ষ এখন প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা! এ ছাড়াও দক্ষিণ করিমগঞ্জ জেলার লোকেদের সাথে মিজোরামের লোকেদের সংঘর্ষ প্রায়ই খবরে বেরোয়। একদিকে আসামের জমি মিজো অধিগ্রহণের অভিযোগ তো রয়েছেই। মিজোদের পাল্টা অভিযোগ, আসাম প্রান্তে থাকা অবৈধ বাংলাদেশিরা এ সমস্ত ঝামেলা পাকাচ্ছে। আসলে এই সমস্ত অভিযোগ- পাল্টা অভিযোগের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করতে গেলে ব্রিটিশ জমানায় ফিরে যেতে হবেযখন সাহেবরা তাদের প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ইনার লাইননামক বিভাজন রেখা টেনে দিয়েছিল। কিন্তু বিসমিল্লায় গলদ-টা সেই থেকেই থেকে গেছে। স্বাধীন ভারতে রাজ্যগুলো পৃথকীকরণের সময় আন্তঃরাজ্য সীমানার এই বিভাজন রেখাগুলো সুস্পষ্টভাবে টেনে দেওয়া হয়নি বলেই আজকের দিনে অশান্তির এই বাতাবরণ। সীমানা নির্ধারণ প্রসঙ্গে উত্তর পূর্বের প্রায় প্রত্যেক রাজ্যেরই এক একটা স্বতন্ত্র ধারনা, এবং এই বদ্ধমূল ধারনাই আন্তঃরাজ্য সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু।
    


      

  আপাতত: যদিও আসাম এবং মিজোরাম, এই দুই রাজ্য সরকারের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা অনুযায়ী সীমান্ত ঘেঁষা এলাকাতে স্থিতাবস্থা অর্থাৎ স্টেটাস-কুওবজায় রাখার কথা, কিন্তু বাস্তবে যদি দুপক্ষই তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করত, তবে তো আর উটকো খবরগুলো পত্র-পত্রিকায় ইদানীং বেরুত না!
         


         হ্যাঁ, শুরুতেই বলেছি, বেঙ্গল রেগুলেশনপ্রসঙ্গটা নিয়ে পরে বলব। বলতে চাইছিলাম, আসাম মিজোরাম সীমানা বিবাদের পেছনে রয়েছে দুটো নোটিফিকেশন। প্রথমটা ১৮৭৫ সালের - যা দিয়ে লুসাই পাহাড়কে কাছাড়ের সমতল থেকে আলাদা করা হয়েছিল, এবং দ্বিতীয়টা ১৯৩৩ সালের, যা দিয়ে এই একই পাহাড়কে মনিপুর থেকে আলাদা করা হয়েছিল। মিজোরাম বিশ্বাস করে যে আসাম মিজোরাম সীমানা ১৮৭৩ সালের বেঙ্গল ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রেগুলেশন’ (BEFR Act) (যার নোটিফিকেশন ১৮৭৫ সালে বেরিয়েছিল) মোতাবেক হওয়া উচিত। মিজোদের দ্বিতীয় অভিযোগ, ১৯৩৩ সালের মনিপুর থেকে ওই লুসাই পাহাড়-কে আলাদা করার সময় মিজো সমাজের লোকদের মতামত নেওয়া হয় নি!
        এবার তাহলে দেখা যাক এ ব্যাপারে বেঙ্গল ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রেগুলেশন’-এর বক্তব্য কি? ১৮৭৩ সালের এই BEFR Regulation (Regulation 5 of 1873)- উল্লেখ রয়েছে যে,সেটা প্রযোজ্য হবে তৎকালীন কামরূপ, দরং, নগাঁও, শিবসাগর, গারো পাহাড় অধ্যুষিত গোয়ালপাড়া জেলা, খাসি ও জয়ন্তিয়া পাহাড়, নাগা পাহাড় এবং সেই সময়ের কাছাড় জেলাতে। এই আইনের ব্যাপ্তি প্রসঙ্গে পরের পাতায় আরও বলা আছে যে শিডিউল্ড ডিসট্রিক্ট এক্ট, ১৮৭৪’ ( XIV of 1874, Section- 5) প্রযোজ্য হবে গোয়ালপাড়া জেলার পূর্বপ্রান্ত (ইস্টার্ন ডুয়ার্স), নাগা পাহাড়ের মোককচাং, সদিয়া, বালিপাড়া এবং লখিমপুর ফ্রন্টলাইন এলাকা এবং কাছাড় জেলার লুসাই পাহাড় এলাকা গুলোতে। ওখানে আরও বলা রয়েছে, It shall be Lawful for the state Government to prescribe, and from time to time alter by notification in the official Gazette, a line to be called ‘The Inner Line’ in each of the above named district… অর্থাৎ সরকার ( মানে, অবিভক্ত রাজ্য সরকার) সময় সময়ে এই ইনার লাইন সীমানার সংশোধন অথবা সংবর্ধন করতে পারতেন। ইনার লাইন এলাকাতে সমতলের বাসিন্দাদের অনধিকার প্রবেশ সম্পর্কে বলা আছে, ‘Any one…. if goes beyond such line without a pass, shall be liable, on conviction before a magistrate to imprisonment…. Which may extend to one year, to a fine not exceeding one thousand rupees or both…. অর্থাৎ সে ব্রিটিশ হোক বা ভারতীয়, অবৈধ প্রবেশকারীদের এক বছরের জেল এবং/ অথবা ১০০০ টাকা (১৮৭৩ সালের মূল্যমানে) জরিমানা হতে পারত। নিঃসন্দেহে উপজাতি এলাকার লোকেদের স্বতন্ত্র যে জীবন প্রণালী, তা বাইরের লোকেদের সংমিশ্রণে যাতে শঙ্করায়িত না হয়, তাই তেমন এক খানা আইন। এতটুকু তো ঠিকই আছে।
          কিন্তু, সমস্যা হল ওই রেগুলেশনে বর্ণিত ‘State’ অর্থাৎ রাজ্যের সংজ্ঞায় ! ১৮৭৩ সালের আসাম রাজ্য,(মাদার-অ্যামিবা) যা থেকে গত দেড়শ বছরে অনেক গুলো রাজ্য ছিটকে বেরিয়ে গেছে…, সেটাকে জোড়া দেওয়ার মতো কোনোরাজনৈতিক রসায়ন’, অথবা কুইক-ফিক্সপাওয়া কি সম্ভব?


অক্সিজেন অক্সিজেন এভরিহোয়্যার, নট আ বাবল টু ব্রিদ!




 

।। পার্থঙ্কর চৌধুরী।।

(C)বার্তালিপি

 



         সামুয়েল টেইলর কোলেরিজের ‘ রাইম অব দ্য এন্সিয়েন্ট মেরিনার’-কবিতার সেই বিখ্যাত লাইনটি মনে আছে তো….. মাঝদরিয়ায় নাবিক হাহাকার করে চেঁচাচ্ছিলেন আর বলছিলেন, ‘জল, চারদিকে জল, কিন্তু হায়… এক ফোঁটা জল নেই!’  ভারতের প্রাণকেন্দ্রে গত সপ্তাহে জনা পঁচিশেক লোকের মর্মান্তিক মৃত্যু সেই লাইনগুলোর আক্ষরিক অর্থে পুনরাবৃত্তি হচ্ছে!  শুধু জলের বদলে আমাদের বলতে হচ্ছে -  ‘অক্সিজেন, অক্সিজেন এভরিহোয়ার, নট আ বাবল টু ব্রিদ…!’ যদিও প্রাথমিক ভাবে মৃত্যুর জন্য মারণ ভাইরাস-ই দায়ী, তবুও জীবনদায়ী ‘অম্লজান’ পেলে তাঁরা হয়ত: বা শেষ সংগ্রাম আরেকটু হলেও চালিয়ে যেতেন!

হ্যাঁ। ‘অম্লজান’ শব্দটা সেকেলে। ‘নোমেন অব্লিটাম’। মাতৃভাষায় পড়া ছেলেমেয়েদের কাছেও শব্দটা আনকোরা নতুন ঠেকবে! তাহলে আর… ( না…, ওই দুর্মুখানন্দের মন্তব্য অবতারণ করে পত্রিকার জায়গা নষ্ট করার অভিপ্রায় এই মুহূর্তে নেই….., সে না হয় পরে হবে ’খন…!) বরং যে শব্দটা সবার মুখে মুখে চালু, সেটাই বলি, ‘অক্সিজেন’। আজকের দিনে সবচেয়ে মহার্ঘ হয়ে ওঠা সেই অদৃশ্য অথচ অপরিহার্য অক্সিজেন।

এখন মৃত্যুর মিছিল…! প্রত্যেক দিনই নতুন নতুন চেনা-জানা-দের পজিটিভ হওয়া নতুবা ভাইরাসের ছোবলে মৃত্যুর খবর আমাদের সবারই ‘বেঁচে থাকার আশা’-টাকে খাদের মুখে টেনে নিচ্ছে। হচ্ছে বৈ কি? যে শহরে যত বেশি ঘন-বসতি, সেগুলো থেকেই যেন বেশি বেশি  আতঙ্ক আর উদ্বেগের খবরগুলো আসছে ইদানীং! যাবতীয় সব-কিছুর বাইরে এসে, সময়টা সত্যিকার অর্থেই মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়ানোর। টুইট- টিপ্পনী করার সময় এটা নয়, মামাবাবু…!

AAP-নারাও মাইরি…! আট আট খানা ‘পি-এস-এ’ প্লান্ট এর বরাদ্দ পেয়ে এখন অব্দি মাত্র এক!  আমাদের মত কর্মচারীদের এক দিনের মাইনে থেকে পাওয়া টাকা দিয়েই তো সেটা করার কথা ছিল! তাহলে? আর শুধুমাত্র কি AAP-নি? যেখানে একটা ‘পি-এস-এ’ প্লান্ট  স্থাপন করতে মাত্র দু সপ্তাহ সময় লাগে, সেখানে গেলো ডিসেম্বরে গোটা দেশে ১৬২ খানা বরাদ্দকৃত  প্লান্ট এর মধ্যে মাত্র তেত্রিশ! যে যাই বলুক না কেন, ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ টা আসবে কি আসবে না… সবাই যেন বিষয়টা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। তাই  সবখানেই এই ‘যদ-ভবিষ্য’ মানসিকতা! এর থেকে বেরিয়ে না আসলে কি করে চলবে? সারা দেশে যে ৫৫১ টা প্ল্যান্ট বসানো চাই।

টেকনোলজি সর্বস্ব আধুনিক জীবনে অক্সিজেনের ব্যবহার সর্বত্র। মহাকাশে রকেট ছাড়ার সময়ও প্রচুর পরিমাণের সিলিন্ডার ওখানে গুঁজে দেওয়া হয়। এছাড়াও কল-কারখানায়, ওয়েল্ডিং ইত্যাদি বিভিন্ন কাজেও রয়েছে প্রচুর পরিমাণ অক্সিজেনের ব্যবহার। হাসপাতালের রোগীদের জন্য এর চাহিদা তো রয়েছেই। তবে যে কথাটা এখানে বলে নেওয়া দরকার, তা হল, কল কারখানায় ব্যবহার করা আর রোগীদের জন্য ব্যবহৃত অক্সিজেন, এ দুটোর বানানোর পদ্ধতি কিন্তু আলাদা।

বলছিলাম, মাটিতে যেখানে আপনি পা রেখেছেন, সেখান থেকে  আকাশের দিকে সোজা লাইন ধরে এগোলে, ৮ থেকে ১০ ( সর্বোচ্চ ১৪.৫) কিলোমিটার জুড়ে যতটুকু জায়গা, সেটা ট্রপোস্ফিয়ার। ট্রপোস্ফিয়ারের পর রয়েছে, স্ট্রেটোস্ফিয়ার, মেসোস্ফিয়ার এবং এর পর থার্মোস্ফিয়ার। এদের অন্তর্বর্তী স্থান গুলোতে রয়েছে স্ট্রেটোপোজ, মেসোপোজ ইত্যাদি, এবং সব উপরে অর্থাৎ থার্মোস্ফিয়ারের মধ্যেই রয়েছে আয়নোস্ফিয়ার। এই সাত-সাতটা স্তরের মধ্যে শুধুমাত্র নিচের ৮-১০ কিলোমিটার, অর্থাৎ আমরা যেখানে রয়েছি, সেটাই অক্সিজেনের একমাত্র ঠিকানা।

স্বল্প পরিসরে যদি কেউ পরীক্ষাগারে অক্সিজেন বানাতে চান, তাহলে সহজ উপায় হল  জলকে তড়িৎ-বিশ্লেষণ (বা Electrolysis) করে। অবশ্য এটা অত্যন্ত ধীর পদ্ধতি এবং ধরুন ৫-৬ ঘণ্টায় সাকুল্যে ৮ থেকে ১০ গ্রাম  বানানো যেতে পারে। ওই যে দুটো আলাদা পদ্ধতির কথা বলছিলাম, তার প্রথমটা, অর্থাৎ কারখানায় ব্যবহৃত অম্লজান হিমশীতল (অর্থাৎ, ক্রায়োজেনিক) পদ্ধতিতে বানানো হয়, এবং রোগীদের নাকে গুঁজে দেওয়ার জন্য PSA ( অর্থাৎ Pressure Swing Adsorption) পদ্ধতিতে এটা বানানো হয়। বায়ুমণ্ডলে তো বেশ কিছু গ্যাস মিলে মিশে রয়েছে। এই প্রেসার সুইং পদ্ধতিতে একটা শোষক (বা adsorbant, জিওলাইট বা এক্টিভেটেড  কার্বন) ব্যবহার করা হয়।  নির্দিষ্ট গ্যাসের আণবিক ধর্ম (molecular characteristics) এবং শোষক পদার্থের প্রতি আকর্ষণের ( affinity for the adsorbent) মাত্রার উপর নির্ভর করেই গ্যাসীয় মিশ্রণ থেকে এক একটা গ্যাসকে আলাদা করা হয়। হাসপাতালে ব্যবহৃত জীবনদায়ী অক্সিজেন বানানোর পদ্ধতি এটাই। বিশুদ্ধতার দিক দিয়ে বলতে হয়, প্রেসার সুইং পদ্ধতিতে বানানো অম্লজান ৯৯শতাংশ খাঁটি, যেখানে ক্রায়োজেনিক পদ্ধতির বিশুদ্ধতার মাত্রা শতকরা ৯০-৯৩ শতাংশ।

 

দেশ-বিদেশের বেশ কিছু কোম্পানি রয়েছে যাদের পেশাই হচ্ছে এই মেশিনগুলো বানানো। ছোট-খাট একটা মেশিনের দাম তেমন আহামরি কিছু নয়। এই ধরুন দিনে ২৪-২৫টা সিলিন্ডার ভর্তি করা যাবে, সেরকম একটা মেশিন প্রায় ৩২-৩৩ লাখ টাকাতেই হয়ে যায়। এ কাজটা দু-সপ্তাহের মধ্যেই করে নেওয়া যায়। আর এর জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা? বেশি থাকলে ভালো, তবে ন্যূনতম একটা দশ বাই দশ কিম্বা বারো বাই বারো কোঠা হলেই চলে। চেষ্টা করলে আজকের দিনে যে কেউ এটাকে ‘স্টার্ট-আপ’ হিসেবে নিতে পারেন। এটাই যেখানে ন্যূনতম চাহিদা, সেখানে ‘AAP-নার’ এত বড় ‘ভুল” কেন হল…? প্রশ্নটা থেকেই যায়…! আদালতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দিল্লীর পরিধি অঞ্চলের হাজার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকাতে নাকি কোনো ‘প্রেসার সুইং’ প্ল্যান্ট নেই!

 তবে হ্যাঁ, একটা কথা! প্ল্যান্ট যেখানই বসানো হোক না কেন, যে বাতাসটা (অর্থাৎ Raw materials) থেকে অক্সিজেন, বিশেষ করে রোগীদের ব্যবহারের জন্য বানানো হবে, সেটা তো কলুষ-মুক্ত হওয়া চাই। ২০১৪ সালে চালানো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার  গোটা বিশ্বের ১৬৫০ টা শহরের মধ্যে চালানো এক সমীক্ষা মতে রাজধানী দিল্লীর বাতাসের মান নাকি একেবারে নিচুতলায়…!


সচরাচর বাতাসে থাকা মিশ্র গ্যাসের মধ্যে অক্সিজেনের ভাগ ২১%। সেটা আমাজনের ঘন জঙ্গল হোক, কিম্বা কালো-ধোঁওয়ায় ছেয়ে যাওয়া কোন শিল্প-প্রতিষ্ঠানের অঙ্গন হোক। তারতম্য হয় বাতাসে ভেসে থাকা বিভিন্ন ভাসমান দুষক-কণার মাত্রায়। তাই অপেক্ষাকৃত ভালো পরিমণ্ডলে প্ল্যান্ট স্থাপন নিঃসন্দেহে অপেক্ষাকৃত ভালো ফলদায়ী। আর এই ভালো পরিমণ্ডল সৃষ্টি করার উদ্যোগ তো দেশবাসীর উপরই বর্তাচ্ছে। লোকশিক্ষা দুভাবে হয়। এক দেখে; দুই ঠেকে। ইদানীং আমাদের দ্বিতীয় অভিজ্ঞতাটা হয়েছে।

ভাবছিলাম, উত্তর পূর্বের কথা। একটু চেষ্টা করলে সিলিন্ডারের বাইরেও তো ‘ক্লিন-এয়ার’ আমাদের এখানে সহজেই সম্ভব। প্রয়োজন শুধু সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার।  বর্ষার মরশুম তো এসেই গেল… অন্যান্য খালি জায়গায় চারা রোপণের পাশাপাশি এ মরশুমে বড় বড় সড়কের দু মাথায় জীবনদায়ী গাছ তো লাগানো যেতে পারে। আরেকটা কথা। অক্সিজেন সৃষ্টি করতে বটগাছের জুড়ি নেই। যতদিন বাঁচে, ২৪X৭ অক্সিজেন সে দিয়েই যায়। এছাড়া অন্যান্য ফলমূল আর ওষধি গাছ তো রয়েছেই। সে গুলোও তো পশু পাখি ছাড়াও জীবজগতের অন্যান্য প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে সক্ষম।

এ প্রান্তটা সাত বোনের। তাই বলছিলাম, আরও ভালো হয়, পাশাপাশি থাকা দুই রাজ্য (এবং তাদের বন বিভাগ) যদি সীমান্ত এলাকাতে যৌথউদ্যোগে এ কাজটা শুরু করে। এতে করে, গাছ লাগানোর পাশাপাশি ভাতৃত্ববোধের অনন্য নজিরও গড়ে তোলা যেতে পারে। এর জন্য দরকার পাশাপাশি থাকা রাজ্যগুলির সরকারি উদ্যোগ। সবাই মিলে সাত বোনের দেশে এরকম ‘বৃক্ষ-সেতু’ গড়ে তোলতে পারলে অক্সিজেন সংকট (Nature’s Oxygen Crunch) প্রতিরোধ করার পাশাপাশি পাশের রাজ্যের সাথে ‘মনের মিল’ স্থাপনের জন্য এর থেকে আর ভালো পথ হতে পারে না…!

তৃতীয় ঢেউ আসার আগেও যে হাতে আর খুব একটা সময় নেই…!  

 

রবিবার, ৭ জুন, ২০২০

দেশান্তরে পরিবেশ



(পরিবেশ মনস্ক সাংবাদিক প্রয়াত  পীযুষ কান্তি দাস-এর প্রতি উৎসর্গীকৃত)


প্রয়াত  পীযুষ কান্তি দাস
কোন অনুষ্ঠানে সঞ্চালক যে ভুমিকাটুকু পালন করেন, এই উত্তর সম্পাদকীয় লিখতে গিয়ে আমাকে তাই করতে হচ্ছে যেহেতু অন্যদের মতামত এবং বার্তা নিয়েই  আজকের এই লিখাটা। সে রকম একটা অনুষ্ঠান বাস্তবে যদি করা হতো, সেখানে সঞ্চালক হিসেবে নিজের মত প্রকাশের অবকাশ খুব কমই থাকতোতাই নিজস্ব মতামত দেওয়া থেকে বিরত থাকতেই হচ্ছে।
সঞ্চালনা এবং ভাষান্তরঃ
পার্থঙ্কর চৌধুরী
 অধ্যাপক, বাস্তু ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগ,
আসাম বিশ্ববিদ্যালয়, শিলচর,
মুঠোফোন ∶ ৯৪৩৫০৭৮২৯৬
  
শঙ্খচিল দেখছিলাম, আর ভাবছিলাম সিনেমার নামটা নিয়ে। পাখিগুলোতো ভূগোলের জ্ঞান থাকে না! ভৌগলিক সীমানার ধার ধারে না আপনার আমার পরিবেশটাও ঠিক তাই দেশ এবং বিদেশের যে যেখানেই রয়েছেন, ঠিক ওই ছোট্ট মেয়েটার স্বাস্থ্যের মতো পরিবেশ নিয়ে যে উদ্বেক সেটাও কিন্তু ভৌগোলিক সীমারেখাতে সীমাবদ্ধ নেই এই প্রেক্ষিতেই আজকের এই দিনটি নিয়ে, দেশের ভুখন্ডের বাইরে থাকা বেশ কিছু বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে কথা বলেছিলাম জানতে চেয়েছি, দিনটি নিয়ে তাদের কি ভাবনা চিন্তা, যেসব দেশে তাঁরা রয়েছেন, সেসব জায়গার পরিবেশের খুনসুটি, এবং এ দিনটির জন্য কোনও বিশেষ বার্তা যাদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তাদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কর্মরত কিম্বা অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, আবার নতুন প্রজন্মের অনেকেই গবেষনায় রত কারোও সাথে পরিচয় হয়তঃ বা কোন সেমিনার-সিম্পসিয়াতে, কিম্বা শুধুই  ইমেল মারফৎ

রমেশ বুনোরতন থাইল্যান্ডের মহীডল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ষাটোর্ধ বয়স ফুরফুরে মেজাজ  চেহারা না দেখে কথা বললে মনে হবে উঠতি যুবক কথায় কথায় বললেন, ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতি বছরই এই ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসটি পালন করে আসছেন জাতিসংঘের গৃহীত এই বিশ্ব পরিবেশ দিবসটা পরিবেশ সুরক্ষার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণের প্রধান বাহন হিসেবে কাজ করছে বলে জানালেনপ্রতি বছর, এক একটি আলাদা আলাদা থিম নিয়ে দিনটা পালিত হয়। ২০২০, এ বছরের থিমটি হ'ল ‘জীব বৈচিত্র্য উদযাপন’ (Celebrate Biodiversity) কথা প্রসঙ্গে অধাপক বুনোরতন বললেন, প্রায় চার দশক ধরে তিনি সংরক্ষণের প্র্যাকটিশনার। কিন্তু তারও অনেক বেশি সময় ধরে তিনি এই প্রচলিত সংরক্ষণের মান সম্পর্কে সচেতন। প্রত্যেকটি দিনই উনার কাছে এক একটি পরিবেশ দিবস, এবং প্রতিদিনই  তিনি তা উদযাপন করেন
দুঃখ করে বুনোরতন বললেন, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, বিশেষতঃ, গত দুই দশকে, পরিবেশের গুনগত অবক্ষয় দেখলে, ‘হৃদয় শিউরে উঠে’! সত্যিই তো! পরিবেশের দুর্বল ও ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা মূলত আমাদের জন্যই। এটা খুব বেদনাদায়কহ্যাঁ, এটা সত্যি যে জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের পরিবেশকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে। তবুও, ভালো করে দেখতে গেলে সেটা আবার সেই মানুষের জন্যই, যারা জলবায়ু পরিবর্তনের গতিটাকে আরও ত্বরান্বিত করছে। প্রচণ্ড ক্ষমতাশীল এবং দোর্দণ্ডপ্রতাপ এই মানুষের জন্যই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট হওয়া পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তনগুলি প্রশমিত করার যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, সেই স্থিতিস্থাপকতা বিকাশের সুযোগ (Opportunity to develop resilience) খুব কমই হচ্ছে! পরিবেশের প্রত্যক্ষ উপকারভোগী হওয়া সত্ত্বেও যতই উপার্জন এবং জীবিকা নির্বাহের দিকে ধাবিত হচ্ছে মানবকুল, ততই পরিবেশের স্বাস্থ্যকর অর্থাৎ সুফলদায়ী দিকটাকে আরও খারাপ করে তোলা হচ্ছে এতসবের পরও অন্ধদৃষ্টিকে মুলধন করে পরিবেশের ধ্বংসের দিকে আমাদের যে যাত্রা, সেটা থেকে পিছ পা হতে আমরা যেন নারাজ।  পৃথিবীতে সম্ভবত মানুষই একমাত্র প্রজাতি, যারা এই ধরনের আত্মঘাতী আচরণ করছে !

রাখঢাক না করেই অধ্যাপক বললেন, যদি আমি আমার মতো করে বলি, তবে বলবো, এভাবে বছর বছর পরিবেশের জন্য ঘটা করে এই ফিফথ জুন উদযাপনের প্রয়োজন নেই। আমি চাই, প্রতিটি দিন, এমনকি প্রতিটি মুহূর্ত নিবেদিত হোক পরিবেশের জন্য। এছাড়া, আমি চাই না দিনটি নিয়ে কোন সেলিব্রেশন হোকযদিও পরিবেশ দিবসের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে পরিবেশ সুরক্ষার জন্য সচেতনতা  গড়ে তোলা যাতে করে পরিবেশ রক্ষার জন্য একশন প্ল্যানগুলা আরো বেশী কার্যকরী করা সম্ভব হয়, কিন্তু বাস্তবটা ঠিক তার বিপরীত। বাস্তবে আমরা দেখছি, পরিবেশ রক্ষার এই গুঁড় তত্ত্বটুকু উদযাপনকারীরা অনুধাবন করতে পারছেন না! পরিবেশ রক্ষার ‘তত্ত্ব-বার্তা’-গুলি  সত্যি সত্যিই উদযাপনকারীদের কানের ভেতর গিয়ে পৌঁছে না। বেশীর ভাগ দেশের লোকেরাই এটাকে ‘ক্রিসমাস’ বা ‘দিওয়ালি’-র মতো উদযাপন করেনসে রকম না করে, এই দিনটা আমাদের অন্তর্দর্শন এবং দৃঢ়় পদক্ষেপের দিন হওয়া উচিত। আমি সেই দিনটার স্বপ্ন দেখছি যেদিন পরিবেশের হানিকারক কাজগুলোকে প্রকৃত অর্থে অপরাধ, মানে আরও জোরালো ভাষায় বলতে গেলে, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সমান কাঠগড়ায় বিচার করা হবে এক বুক নিরাশার মধ্যেও  আশা করছি, এ বছরের পরিবেশ দিবসে শেষ পর্যন্ত সম্বিত ফিরবে এবং লোকেরা বুঝতে সক্ষম হবে যে  পরিবেশের অবনতির সাথে সাথে তাদের আরও বেশী করে হারানো ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। দরিদ্র ও প্রান্তিক বর্গের লোকেরা সাধারণতঃ প্রথম ধাক্কায়  এটা টের পায়। আর শক্তিশালী ধনীরা ? তাদেরও এ থেকে পরিত্রান নেইশুধু সময়ের ব্যাপার। অত্যাধুনিক হাজারো প্রযুক্তি সত্ত্বেও, আমরা এখনও আমরা জীববৈচিত্রের উপর নির্ভরশীল। জীববৈচিত্র্য সমস্ত জৈবিক সিস্টেম এবং প্রক্রিয়াগুলির একটি মৌলিক উপাদান।  জীবিকা এবং জীবন উপভোগের জন্য জীব বৈচিত্র্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই পথে না হেটে, এই মানুষ নামের প্রজাতিটা যা করছে, তা তো নিজেরাই নিজেদের কফিন বানিয়ে রাখার সামিল!

    নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুকেশ কুমার চালিশে। মাস ছয়েক হল, অবসর নিয়েছেন। কথায় কথায় বললেন, পৃথিবীর মোট স্থলভাগের শতকরা মাত্র ০.১ থাকলেও উনাদের দেশে বেশ কিছু আকর্ষণীয় জীববৈচিত্র্য রয়েছেহিমালয় অঞ্চলের চারটি হটস্পটগুলির মধ্যে সেদেশ জীববৈচিত্রের  একটি হটস্পটের অংশ। ছয়টি জীব সংমন্ডল নেপালে রয়েছে। নেপালের মোট অঞ্চলের প্রায় ২৫% এলাকা জুড়ে সুরক্ষিত বনাঞ্চল রয়েছে, এর মধ্যে ৯টি জাতীয় উদ্যান, ৩টি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণাগার, ৫টি সংরক্ষণ অঞ্চল, ১টি হান্টিং রিজার্ভ রয়েছে এবং সেগুলোর প্রত্যেকটাকে ঘিরে বিশাল জায়গা জুড়ে বাফার অঞ্চল রয়েছে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সম্পর্কিত সেদেশে স্থানীয় লোকেদের মধ্যে কিছু প্রচলিত রীতি বংশ পরম্পরায় চলে আসছে এবং সংরক্ষন সম্পর্কে তাদের জ্ঞান অন্য জায়গার আরো দশজন লোকের তুলনায় বরং ভালই জানা। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে অনেক পরে, অর্থাৎ ১৯৭০ সাল থেকে সরকারি পর্যায়ে সেদেশে সংরক্ষণের কাজ হাতে নেওয়া হয়জীববৈচিত্র্য নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তাদের দেশ সক্রিয়ভাবে যোগদান করে চুক্তি সাক্ষর করেছে এবং জীববৈচিত্র্যের বিভিন্ন দিক নিয়েও নিরন্তর গবেষণা করে যাচ্ছে। হিমালয়ের পাদদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে দেশটি রয়েছেপ্রয়োজনমতো বৃষ্টিপাতের ফলে সেখানে প্রচুর অরণ্য রয়েছে এবং সেগুলোতে বন্য প্রাণীদের অবাধ বিচরন চোখে পড়ে এদের মুক্ত চলাফেরার মধ্য দিয়ে উনার যে উপলব্ধি, তা পরিবেশের সুস্বাস্থ্যের ইঙ্গিত দেয় এবং বিশেষ করে এই লকডাউনের সময় বিভিন্ন দূষণকারী এজেন্টকে হ্রাস করার সহায়ক বলে মনে হয়। তাই, পরিবেশ দিবসে উনার এটাই প্রত্যাশা যে  গোটা বিশ্বের লোকেদের জন্য জীববৈচিত্র্যে যেন বজায় থাকে, পাশাপাশি পরিমণ্ডলটাকেও যেন স্বাস্থ্যকর ও দূষণ মুক্ত রাখা যায়৫ জুন দিনটি সম্মিলিত প্রচেষ্টার দিন এবং জীববৈচিত্র্য, মানব এবং সামগ্রিকভাবে আমাদের সৌরজগতের এই একমাত্র জীবন্ত গ্রহকে বাঁচানোর জন্য অনুশীলন শুরু এবং বজায় রাখার অঙ্গীকার করার দিন। 

হাঙ্গেরির জেন্ট ইস্তভান বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণী সংরক্ষন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত গবেষিকা, শ্রেয়া। বাঙালি মেয়ে। বেশ কবছর থেকে সে দেশে থাকলেও, জন্মসুত্রে ভারতীয়।  বলল, ভারত সম্পর্কে ভেবে আমার মনে প্রথম যে শব্দটি আসে তা হ'ল 'বৈচিত্র্য'; প্রাকৃতিক এবং নৃতাত্ত্বিক দুটোই দেশজুড়ে সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক দৃশ্য, প্রজাতি এবং বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্রতা পাশাপাশি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বৈচিত্র্য দেশটাকে বিশ্বের অন্যান্য অংশ থেকে আলাদা করে তোলে।
পরিবেশ উদযাপনের এই দিনটিতে, চারপাশের যে প্রাকৃতিক ঘটনা ঘটছে তার ধারাবাহিকতা এবং এদের সম্ভাব্য মোকাবিলা নিয়ে সবার জন্য একটি সুস্পষ্ট চিন্তাভাবনা এবং রূপরেখা তৈরি করা খুবই জরুরিঅতিমারি, ভূমিকম্প, দাবানল, সুপার ঘূর্ণিঝড়ের মতো একের পর এক বিশ্বব্যাপী মহামারীর আকস্মিক প্রাদুর্ভাব সব কিছুই যেন এ বছর হচ্ছে। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পিছনে থাকা অদৃশ্য বাস্তব টাকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত আমরা সত্যই প্রকৃতির করুনায় রয়েছি তা যেন বার বারই মনে হচ্ছে।
করোনা আক্রান্ত ভারতের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে আমাদের জনগণ ও সরকার পরিস্থিতি মোকাবেলায় কঠোর সময়ের মুখোমুখি হচ্ছেনবিভিন্ন পেশার লোকেরা যদি এই সমস্যাগুলির সমাধানের জন্য একত্র হয়ে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করেন, তবে সম্ভবত একটি উপায় বেরোতে করতে পারেবন্যজীবন সংরক্ষণের শিক্ষার্থী হওয়ায়, আমার দৃষ্টিকোণ থেকে, বাস্তুসংস্থান এবং বন্য প্রজাতির উদ্ভিদ এবং প্রাণীজগতের গুরুত্ব সম্পর্কে সারা দেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে সচেতনতা যথেষ্ট অবদান রাখতে পারেএকইসাথে গবেষণা  এবং বৈজ্ঞানিক অধ্যয়নকেও  গুরুত্ব দিতে হবে। আমি দৃঢ়়ভাবে বিশ্বাস করি যে পরিবেশের স্বার্থে এই পরিবেশ দিবসে আমাদের সকলকে এগিয়ে আসা উচিত এবং সুস্থ সমাজ, আদর্শ পরিবেশ শিক্ষা এবং একটি সচেতন জাতি হিসাবে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা উচিত।

সিঙ্গাপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এন্ডি আংগ জানালেন, আসুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবসটি উদযাপন করার সাথে সাথে  আমরা আমাদের চারপাশের সুন্দর প্রকৃতির প্রশংসা করার জন্য কিছুটা সময় ব্যয় করি এবং আমাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় একসাথে কাজ করি।

বাংলাদেশ, ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণী গবেষক, হাসান আল-রাজি জানালেন অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এ দিনটি খুবই উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে উদযাপন করা হবে বিশেষ করে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পরিবেশ নিয়ে গবেষণা করে এ ধরনের সংগঠনগুলো এই দিনটিকে পালন করতে বিশেষ উৎসাহী। বাংলাদেশ সরকারের বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এই দিনটিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতি বছর উদযাপন করে থাকেপরিবেশের প্রয়োজনীয়তা পরিবেশ সংরক্ষণ এর তাৎপর্য এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আমাদের করণীয় বিষয়গুলোকে সকলের সামনে তুলে ধরাই এই দিনটির উদ্দেশ্য। প্রতি বৎসর ঢাকার আগারগাঁওয়ের বন ভবনে এই দিনটি উদযাপিত হয়। দিনটিকে কেন্দ্র করে রেলি, সেমিনার, আলোচনা সভা ইত্যাদি  আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই আয়োজনে অংশগ্রহণ করে।
এ বছরের পরিবেশ দিবসের বিষয়টা পুরোপুরি ভিন্ন।  পরিবেশ দিবস উদযাপনের ঠিক এই মুহূর্তে পুরো পৃথিবী এমন একটা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে জনসমাগম পুরোপুরি বিপদজনক। করোনাভাইরাস  এর প্রাদুর্ভাবের ফলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। তাই এবছর হয়তো বা আগের বছরগুলোর মত পরিবেশ দিবস উদযাপন করা সম্ভব হবে না। তবে এটাও সত্য যে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এর জন্য দিনটির উদযাপন থেমে থাকবে না।  বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই উদযাপন হবে প্রযুক্তির ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে ঘরে বসেই উদযাপন করা হবে পরিবেশ দিবস। এই কদিন আগে (অর্থাৎ ২২শে মে) বিশ্ব জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের দিনটিও ঠিক এভাবেই পালিত হয়েছে।
করোনাভাইরাস এবছর আমাদেরকে বুঝিয়ে দিল যে পৃথিবীতে মানব সভ্যতা টিকে থাকার জন্য পরিবেশের প্রতি যত্নশীল হওয়া কতটুকু প্রয়োজন। এই  ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এর জন্য অনেক জায়গাতেই পরিবেশ তার নিজের অবস্থায় ফিরে আসছে বলে অনেকে নামি-দামি লোকেরাই মন্তব্য করছেনতবে আমার মনে হচ্ছে, করোনা কালীন সময়েও কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা পরিবেশ দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।  নিজেদের সুরক্ষার জন্য আমরা মাস্ক ব্যবহার করছি, হ্যান্ড গ্লোবসও ব্যবহার করছিব্যবহারশেষে সেগুলো ছুড়ে ফেলে দিচ্ছি এখানে ওখানে যত্র তত্র। এইদিকটাতে  বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই নিয়ম মানা হচ্ছে না। কোন কোন দেশে নীতি নির্দেশিকা থাকলেও, সেভাবে সেটা দেখভাল করা হচ্ছে না।  এতে করে পরিবেশ, বিশেষ করে জলজ পরিবেশ হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। তাই বলছিলাম, এই পরিবেশ দিবসে বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে আমাদের পরিবেশের প্রতি আরও যত্নশীল হতে হবে, পরিবেশের ভারসাম্য যাতে নষ্ট না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।