“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬

।। ক্ষমার আলো : রাজকুমারী মালতি।।

।।মাসকুরা বেগম।।

( এই কিচ্ছাটি ছোটবেলা আমার দিদি তাহিয়া আমাকে শুনায়। এটা আমার হৃদয়কে এতো স্পর্শ করে যে বার বার শুনার জন্য দিদিকে বায়না করতাম। সেই ছোট্ট বেলায় শুনে মনের গভীরে দাগ কাটা কিচ্ছা আজ নিজে সাজিয়ে প্রকাশিত করার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস!) 

     অনেক কাল আগের কথা। এক দেশে ছিলেন এক সহজ-সরল রাজা। তাঁর ছিল দুই রানী।

     বড় রানী ছিলেন রূপে-গুণে অনন্যা। তিনি যেমন সুন্দরী ছিলেন, তেমনই ছিলেন দয়ালু। দাস-দাসী থেকে গরিব-দুঃখী প্রজা—সকলের কাছেই তিনি ছিলেন "রানী মা"। তাঁর কন্যা রাজকুমারী মালতিও ছিল মায়ের মতোই। রূপে-গুণে সে ছিল অতুলনীয়া।

     ছোট রানী দেখতে তেমন সুন্দরী ছিলেন না, মনটাও ছিল বিষে ভরা। প্রজারা তাই তাঁকে ভালোবাসত না। তাঁর মেয়ে চন্দনাও ছিল মায়ের মতোই—কালো, আর অন্ধ মাতৃভক্ত। ভালো-মন্দ বিচার না করেই সে মায়ের সব কথায় "হ্যাঁ" বলত।

     প্রজাদের মুখে মুখে সবসময় "বড় রানী মা! বড় রানী মা!", "রাজকুমারী মালতি! মালতি!"—এই কথা শুনে ছোট রানীর বুক জ্বলে যেত। মনে মনে ভাবত, "এত আদিখ্যেতা কেন? নিশ্চয়ই বড় রানী যাদু-টোনা জানে। একদিন আমাদের তাড়িয়ে দিয়ে নিজের মেয়েকে সিংহাসনে বসাবে।" 

    এইসব কুচিন্তা সে ঢেলে দিত মেয়ে চন্দনার কানে।

     ছোট রানী হঠাৎ বদলে গেল। বড় রানীর সাথে খুব ভাব জমাতে লাগল। প্রথমে বড় রানী অবাক হলেও পরে ভাবলেন, "হয়তো ছোট বুঝতে পেরেছে, আমি ওদের কত ভালোবাসি।" 

     রাজাও খুশি। ভাবলেন, দুই রানী মিলেমিশে আছে—এর চেয়ে সুখের আর কী আছে!

    রাজা একবার রাজ্যের বাইরে গেলেন। সেই সুযোগে ছোট রানী বড় রানীর চুলে তেল মালিশ করার ছলে যাদুকরের দেওয়া এক বিষাক্ত তেল লাগিয়ে দিল। সাথে সাথেই বড় রানী কাতরাতে কাতরাতে কুমির হয়ে পুকুরের জলে মিলিয়ে গেলেন।

    মালতি পাঠশালা থেকে ফিরে মাকে না পেয়ে কেঁদে অস্থির। ছোট রানী বলল, "জানি না, দেখো গিয়ে।" 

    ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর মালতি পুকুর ঘাটে বসে কাঁদছিল। হঠাৎ একটি কুমির উঠে এল। মায়ের গলা শুনে মালতি চমকে উঠল। কুমিরই ছিল তার মা। মা বললেন, "আমি প্রতিদিন তোকে একটি করে ডিম দেব। ওটা খেলেই তোর পেট ভরবে। সাবধানে থাকিস মা।"


    ছোট রানী দেখল মালতি না খেয়েও দিব্যি বেঁচে আছে। চন্দনাকে লাগিয়ে দিল মালতির পিছনে। চন্দনা দেখল, কুমির মালতিকে ডিম খাওয়ায়। সে বাড়ি এসে মাকে সব বলে দিল।

     ছোট রানী রাজাকে বলল, "মহারাজ, পুকুরে কুমির হয়েছে। ওটাকে নদীতে ফেলে দিন।" কুমিরকে নদীতে ফেলে দেওয়া হলো। 

     এরপর মালতি নদীর পাড়ে ছাগল চরাতে যেত। কুমির-মা সেখানেও এসে তাকে ডিম খাওয়াত। চন্দনা আবার পিছু নিল। একদিন ভুলিয়ে-ভালিয়ে মালতির কাছ থেকে সব কথা জেনে মাকে বলে দিল। ছোট রানী রাজাকে দিয়ে কুমিরটাকে মেরে ফেলার হুকুম করাল।

      অসহায় মালতি জঙ্গলে চলে গেল। সেখানে এক ফলের বাগান পেল। ক্ষুধা মিটিয়ে বেঁচে রইল। চন্দনা আবার খবর দিল। ছোট রানী সেই বাগানও কাটিয়ে দিল।


       একদিন শিকার করতে এসে অন্য রাজ্যের রাজকুমার জঙ্গলে ঘুমন্ত মালতিকে দেখতে পেলেন। মালতির করুন কাহিনি শুনে রাজকুমার তাকে নিজের রাজপ্রাসাদে নিয়ে গেলেন এবং বিয়ে করলেন। মালতি হয়ে উঠল যুবরানী।

     বছর ঘুরল। একদিন রাজপ্রাসাদের দরজায় দুই ভিখারিনী এল—ছোট রানী আর চন্দনা। রাজা মারা গেছেন। মন্ত্রীর ষড়যন্ত্রে তারা রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়েছে। 

      মালতি তাদের চিনতে পেরে কাছে ডাকল। মালতির পা জড়িয়ে ধরে তারা কাঁদতে লাগল, "আমাদের ক্ষমা করে দাও মালতি।"

মালতি তাদের বুকে জড়িয়ে ধরল। বলল, "অতীত ভুলে যাও।" পেট ভরে খাওয়াল, নতুন কাপড় দিল, আর সম্মানের সাথে বিদায় দিল।

 * নীতিকথা *
হিংসা মানুষকে কোথায় নামায়, আর ক্ষমা মানুষকে কোথায় তোলে—"চন্দনা ও মালতি" গল্পটা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।