“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ১৩ জুলাই, ২০২১

অধরা কাঙ্খিত পথ


 ।। বিদ্যুৎ চক্রবর্তী ।।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

সৃণ পথে -
কিছু দাগ লেগে যায় অতর্কিতে।
কলঙ্ক কথনে নির্যাতিত পথ চলা
শুধু পিছুটান, শুধু উচ্চ্ছ্বাসে লাগাম
প্রাপ্তি সুখের তৃপ্তি বেলায়
মন গহীনে যেন এক কালান্তক ক্ষয়রোগ।
সেই মায়ার বাঁধনে ভ্রষ্ট দিশায় চলা
কবেকার সে কথা
নূন পান্তার যাপন ক্ষণে কত শখ কত ব্যথা
কত স্বপ্ন কত আকাশ কুসুম কথা
তারই সূত্রে ফিরে আসে ভুলপথের বাখান
অন্তরে অনন্ত মান অপমান।

আজও সেই ধারা চলে অবিরাম
মোহনায় আজও হয় মন আনচান
ভুল করে আজও চলি ভুল পথে পথে
কে যে নাড়ে কলকাঠি, কোন মানসে
খর্ব হয় যত গর্ব, রুদ্ধ হৃদয়
মরি লাজে চোখে রেখে চোখ
দীর্ঘ যাত্রা পথ এসে থামায় রথ
মসৃণ পথেও থাকে অধরা - কাঙ্খিত পথ।



মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২০

রক্তস্নাত উত্তরাধিকার


  ।। বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।।
(C)Image:ছবি

 
 
 
 
 
 
 
হারিয়ে যাওয়া ছবিগুলো কোলাজ হয়ে
ফিরে এলেই হারাই খেই,
স্বচ্ছতোয়া নদীর মতোই নিরেট সোনায় মোড়া
ছবি নয় যেন জ্যান্ত উপাখ্যান।
বনবাদাড়ে কুড়িয়ে পাওয়া জ্বালানি কাঠ
কলসী কাঁখে হাঁফিয়ে ওঠা ফুসফুস আর
নিত্যদিনের ধার দেনার উচ্ছিষ্ট চালকণা।
এমনি করেই দিবানিদ্রায় গড়ে ওঠে
প্রজন্মের উত্তরণ আর সুখের ভবিষ্যৎ।
তিলে তিলে সঞ্চিত আশা গড়ে ভিত,
গড়ে ওঠে সুখ স্বপনের আস্তানা -
অজানা মানচিত্রে স্থাপিত হয় আস্ত নতুন দেশ।
অচেনা পড়শি বাড়ায় ভরসার দুটি হাত
দেনা পাওনার দিন যাপনে কেটে যায়
অগুনতি সব ঝঞ্ঝাবাহিত দুঃস্বপ্নের রাত।

আজ খেলা ভাঙার নতুন খেলায়
প্রশ্নচিহ্নে ব্যতিব্যস্ত রক্তস্নাত উত্তরাধিকার।
পান্তা ফুরানো বিস্মৃত নুনের উদ্যত অপমানে
এবার গোখরো হয়ে হানবো ছোবল,
ভাঙব যত ব্যর্থ অহংকার।

রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২০

এই তো জীবন


।। বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।।

(C)Imageঃছবি























মাঝে মাঝে বেসামাল ছন্দপতন,
এ না হলে কীসের জীবন ?
কত আর সামনে এগিয়ে চলা,
মাঝে মাঝে পেছন ফিরে দেখা।
এই তো আসল জীবন।

কিংবা কয়েক ধাপ পিছিয়ে গিয়ে,
নয়তো অসময়ে খানিক এগিয়ে যাওয়া।
থমকে পড়ে চলার রসদ জুগিয়ে নেয়া।
ঘুরপাকে নতুন পথে স্রোতে ভাসা -
এই তো সঠিক জীবন।

কালের হিসেব জটিল হয়ে ওঠে
জীবন পথে রুদ্ধ সরল পাটিগণিত।
অগোছালো কাল গুছিয়ে নিলে তবে
সাজানো বাগান হাতছানিতে ডাকে,
এই তো সখের জীবন।

যাপন ক্ষেত্র কিংবা খেলার মাঠ
তৈরি থাকে পদচারণ আশায়,
হোক না যতই বেহিসেবি অবকাশ
বিজয় মালা মেলায় সঠিক সময়।
এই তো মধুর জীবন।

জীবন ধারা বয় না ছন্দ মেপে,
ধ্বস্ত ধারায় সন্তরনের মুন্সিয়ানায়
পেরোতে হয় অকাল বেলার পথ,
তবেই আসে বৈশাখী হিন্দোল।
এই তো  কাম্য জীবন। 

শনিবার, ২১ মার্চ, ২০২০

প্রণাম জীবন দেবতা

[কবিতা দিবসে দেশের সমস্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি ]
।।  বিদ্যুৎ চক্রবর্তী ।।









কাশ পানে মাঝে মাঝেই
খুঁজে ফিরি দেবদূত,
কল্পনায় করি আঁকিবুকি
তারই পূত অবয়ব।
দেবভূম মননে সততই ঊর্ধ্বে
ব্যর্থ প্রয়াসে খুঁজে মরি তাই
দেবতা - যত হুরি, পরি, দেবদূত।

অসার প্রয়াসে ভুলে যাই বারে বারে
আছে যত স্বর্গ নরক সবই এইখানে।
মহামারীতেও বুক চিতিয়ে আগুয়ান সব
শুভ্র বসনে আবৃত যত দৃপ্ত দেবদূত
মৃত্যুর কাছে থেকে আগলে রাখে সব
মর্ত্য দেবদুলাল - বিষে অমৃতে নাজেহাল।
সাথে ফিরে যত হুরি পরি অপ্সরা
হানা দিয়ে যম দুয়ারে - তুড়ি মেরে
ফেরায় সবারে মৃত্যুকে করে আলিঙ্গন।

আজ কবিতার হাতটি ধরে
জানাই তাঁদের বুক ভরা সব
পূর্ণ হৃদয় কৃতজ্ঞতায় সাজিয়ে রাখা
শুভ্র প্রাণিপাত,
বাঁচাও ধরণীকে -
বেঁচে থাকো হে আমার জীবন দেবতা
আসুক ফিরে সহস্র সুপ্রভাত।

বুধবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২০

এবার ফিরুক সুখের সাজ

অসিত রায় স্মরণে

















।। বিদ্যুৎ চক্রবর্তী ।।

তোমার কেমন উপহার ?
দিনের আলোয় দিলে আমায়
রাতের অন্ধকার।

চলার পথে এই বিরতি
শেষের আগে কোন সে গরজ
অবেলায় করলে ইতি ?

আমার চাওয়া নয় তো বেশি
ক্ষণিক সুখের মাঝেই কেন
ছিনিয়ে নিলে মুখের হাসি ?

হৃদয় আমার ব্যাকুল যে আজ
প্রতীক্ষার হোক অন্ত এবার
ফিরুক সুখের সাজ।

তোমার  সহসা খেয়ালি খেলায়
স্তব্ধ আমার দিবস রাত্রি
বৃষ্টি ঝরুক তোমার সাড়ায়।

মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯

ইমোজি ভালোবাসা

 
।। বিদ্যুৎ চক্রবর্তী ।।
                                                                                






কটি ইমোজি তোর থেকে পেতে
পোড়াই যে কত কাঠখড়
সে তো শুধু আমিই জানি
হৃদয়ে লাগাতার ঝড়।

তুই কি জানিস - তোর থেকে আসা
একটি ইমোজির দাম
সে তো শুধু আমিই জানি
সুখে মোড়া নীল খাম।

একটি ইমোজি তোলপাড় করে
আমার পিয়াসী মন,
একটি ইমোজি খুশিতে ভরে
আমার উদাসী ক্ষণ।

ছলকে উঠে আকুল হৃদয়
সুখ টইটম্বুর,
শোণিত ধারায় ছুটে চলে যত
ভালোবাসা ঘনঘোর।

তুই তো থাকিস গণ্ডি ভেতরে
লোক জানাজানি ভয়ে,
আমি তো প্রতিটি ক্ষণেই তোকে
ভাবি মশগুল হয়ে।

একটি ইমোজির পথ চেয়ে থাকি
অগুনতি হা-পিত্যেশে
মরেছি মরমে, জ্বলেছি শরমে
আমি তোকে ভালোবেসে।

কত যে কথার পাহাড় রচি
তোর সাথে দিনে রাতে
লোকলাজ ভয়ে চাপা পড়ে রয়
ভাবী ঘাত প্রতিঘাতে।

বিধিনিষেধের যাঁতাকলে আমি
পথ খুঁজে না পাই
ঘুরপথে তাই তোর সকাশে
ইথারে পৌঁছে যাই।

আমার যত না বলা কথা সব
তোর যে হৃদয় দোলায়
সেই বার্তাটি আসে ফিরে তোর
একটি ইমোজি ছোঁয়ায়।

এমনি করেই ভাসবো দুটিতে
পুষবো মিলন আশা
বলবে কথা এমনি ইমোজি
ভালোবাসা ভালোবাসা।

শনিবার, ৬ এপ্রিল, ২০১৯

সূর্য প্রণাম


।। বিদ্যুৎ চক্রবর্তী ।।


(C)Image:ছবি








কিছু ক্ষণ দৌড়ঝাঁপ ঠা ঠা রোদ্দুরে
কিছু ক্ষণ একঘেয়ে আলসেমি -
চলমানতার সাতকাহনে
দোদুল্যমান যাত্রাপথ ।
দহন কালেও সরাসরি চেনামুখ সব
ছায়াময় রাতে আসে কিছু
প্রোথিত মূলের কায়াহীন অবয়ব।
বেঁচে থাকার অতীত রসদ নিয়ে
উঠে আসে কৃতজ্ঞ হৃদপিণ্ডের
অলিন্দ পেরিয়ে স্পষ্ট কোলাজ হয়ে,
অপার সুখের উত্থিত আকরে আকরে।

অচেনা সূর্য এসে ধরেছিল হাত,
মৃত্যুফেরত কিছু পরিচিত আত্মা
আজও বয়ে চলে শিরায় শিরায়।
আজও সূর্যালোক ফিরে ফিরে আসে
অপ্রত্যক্ষে - রাতের গভীরতায়।
বিজন রাতের প্রমোদ বিহারে মগ্ন
প্রসন্ন ক্ষণেও নমস্য আলোকচিত্র,
সঘনে উন্মোচিত আজ জীবন রহস্য
অজানিতে করযোড় সূর্য প্রণামে।
আঁধারি আলোয় সিঞ্চিত হোক
প্রজন্মের সঞ্চিত শ্রদ্ধা, উৎস আলোয়।

মঙ্গলবার, ১২ মার্চ, ২০১৯

দুন্দুবুড়ি


।।  বিদ্যুৎ চক্রবর্তী ।।

(C)Image:ছবি












প্রতিটি রাতের গোপন অভিসারে
তোমাকে জাগিয়ে তোলার
গরজ কি শুধুই আমার ?
খোলস কি একা তোমারই আছে ?
নরম মাটির শঙ্কু ছাঁচে
কুমোর হয়ে খোলস ভাঙ্গার
দায় কি শুধু আমার বলো ?
এক তরফের এ অভিমান
উল্টোখাতে বইবে কি আর ?
সুখের তরে নিতি রাতের
হ্যাংলা বাজের হামলে পড়া
খেয়ালীর এ কেমন খেলা ?

তুমিই কি সেই পোতায় থাকা,
বিবর তলে লুকিয়ে থাকা,
কোমল হাতের হালকা ছোঁয়ায় -
খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসা
লাস্যময়ী দুন্দুবুড়ি - শুধুই আমার ? 

বৃহস্পতিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

'উজান' ও 'সাগ্নিক'


।। বিদ্যুৎ চক্রবর্তী ।।

 সাহিত্যের তৃতীয় ভুবনে বর্তমানে বাংলা ছোট পত্রিকা বা লিটল ম্যাগাজিন এর ক্ষেত্রটি যে এক বৃহৎ আকার ধারণ করেছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ইতিমধ্যেই সাত সাতটি সম্মেলনের উদযাপন তারই সাক্ষ্য বহন করছে। স্বাভাবিক ভাবেই ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাও পিছিয়ে থাকেনি মোটেও। ইদানীং স্বল্প সময়ের ব্যবধানে প্রকাশিত হলো আসামের দুই প্রান্তের দুই উল্লেখনীয় বাংলা ছোট পত্রিকা – ‘উজানসাগ্নিকএর সাম্প্রতিকতম সংখ্যা। উজান আসামের বাণিজ্যিক শহর তিনসুকিয়া থেকে বেরোল উজান’-এর ১৪তম সংখ্যা আর নিম্ন আসামের বাসুগাঁও থেকে সাগ্নিক’-এর ২৬তম সংখ্যা। একসাথে দুটি সংখ্যা হাতে আসতেই এর একটি তুলনাত্মক পর্যালোচনার লোভ সংবরণ করা গেল না। উদ্দেশ্য সমকালীন আসামের বাংলা ভাষা সাহিত্য চর্চার হাল হকিকৎ জনসমক্ষে প্রতিভাত করা।

পর্যালোচনার জন্য এই দুই পত্রিকাকে বেছে নেওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে উভয়ের কলেবরগত সাদৃশ্য তথা হালে অনুষ্ঠিত সপ্তম উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় বাংলা ছোট পত্রিকার গুয়াহাটি সম্মেলনে উভয়ের সদম্ভ উপস্থিতি। পত্রিকা প্রকাশের ধরণ ও বক্তব্য উভয় ক্ষেত্রেই পত্রিকা গোষ্ঠী তথা সম্পাদকের সামাজিক দায়বদ্ধতা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠেছে। উজানবিষয় ভিত্তিক হলেও সাগ্নিকতা নয়। ১২৮ পৃষ্ঠার সাগ্নিকে মোট ৯টি প্রবন্ধ, ২১টি কবিতা, ১১টি ছোটগল্প তথা নিয়মিত বিভাগ রয়েছে। বিপরীতে ১৩৬ পৃষ্ঠার উজানে রয়েছে মোট ৮টি বিষয়ভিত্তিক নিবন্ধ,৬টি অন্যান্য নিবন্ধ, ২০টি কবিতা, ৬টি ছোটগল্প, ১টি বড়গল্প ও নিয়মিত বিভাগ।
একটি পত্রিকা প্রকাশের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে সম্পাদকের সার্বিক কর্মকুশলতার এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি সহজেই অনুধাবনযোগ্য। ঘটনাচক্রে এই নিবন্ধ লেখক উজান পত্রিকার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত থাকার ফলে এবং পূর্ববর্তী সংখ্যার সম্পাদক হওয়ার কারণে তা অত্যন্ত সুজ্ঞাত। উজান পত্রিকায় এক নির্দিষ্ট সম্পাদকমণ্ডলী থাকার ফলে সম্পাদকের একার মাথায় যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে না কিন্তু সাগ্নিকের ক্ষেত্রে তা নয়। সাগ্নিকের সম্পাদকের বক্তব্য বা কর্মতৎপরতার ছবি তাই পত্রিকা পঠনের মাধ্যমে স্পষ্ট প্রতীয়মান।
বিষয় ভিত্তিক হওয়ার ফলে উজানের প্রবন্ধ বিভাগ স্বাভাবিক ভাবেই অধিক পুষ্ট। মাতৃভাষা মাধ্যমের শিক্ষাবিষয়ের উপর একাধিক তথ্যবহুল নিবন্ধের সমাহার ঘটেছে পত্রিকায়। বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য সঞ্জীব দেব লস্কর, ধ্রুবজ্যোতি দে, বাণী সেন ও সুশান্ত করের নিবন্ধ। এঁরা প্রত্যেকেই শিক্ষা বিভাগের সঙ্গে আজীবন জড়িত থাকার ফলে বিষয়ের উপর যথার্থ আলোকপাত করতে সক্ষম হয়েছেন। এ ছাড়াও দিলীপ কুমার দে তথা অনিল দাশ পুরকায়স্থের নিবন্ধও উল্লেখযোগ্য। অন্যান্য নিবন্ধে সঙ্গীত সমালোচক অসিত রায়,বর্ষীয়ান সাংস্কৃতিক কর্মী ও উজান সাহিত্য গোষ্ঠীর বর্তমান প্রধান সুজয় কুমার রায় ও মলয় ঘোষের নিবন্ধ উল্লেখযোগ্য। শনবিল নিয়ে মৃগাঙ্ক পুরকায়স্থের নিবন্ধ বিশেষভাবে উল্লেখনীয়।
সাগ্নিকের প্রবন্ধ বিভাগ তুলনামূলক ভাবে সংক্ষিপ্ত ও বিক্ষিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও দুটি নিবন্ধ বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। প্রমোদ নাথের লোকাচার, লোকবিশ্বাস, লৌকিকতা এবং আদিম আদিবাসী টোটো সম্প্রদায়প্রবন্ধটি সমাজ দর্পণের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্যসম্ভারে সমৃদ্ধ এক অতি প্রয়োজনীয় দলিল। প্রবন্ধ বিভাগের যাবতীয় খামতি সম্পাদক প্রদ্যোৎ গোস্বামী পুষিয়ে দিয়েছেন কড়ায় গণ্ডায় তাঁর এক বিশেষ নিবন্ধের মাধ্যমে। ইতিহাসের আলোকে অসমিয়া বাঙালি সম্পর্কনিবন্ধটি সার্বিক ভাবে উপস্থাপিত এক অতি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবেই জায়গা করে নিতে সম্ভব ইতিহাসের পাতায়। তথ্য,বিশ্লেষণ ও বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে লিখিত সাগ্রহে রাখার মতো এই নিবন্ধটি নিঃসন্দেহে সাগ্নিককে করে তুলেছে এক অতি আবশ্যকীয় পাঠ্য পত্রিকা। নিবন্ধটির কিছু লাইন উল্লেখ করাটা এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। কী এই ডি ভোটার ? ডি ভোটার মানে হলো ডাউটফুল ভোটার বা সন্দেহজনক নাগরিক। হঠাৎ করেই ভোটার তালিকাতে কারো নামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে এই ডি। এ রাজ্যের বাঙালি জীবনে যেন উগ্রপন্থার চেয়েও ভয়ানক হয়ে উঠেছে এই ডি। ডি আসলে এমন এক দৈত্যের নাম যা যেকোনো সময়ে যে কোন মানুষের ঘাড়ে চেপে বসতে পারে। আর একবার ঘাড়ে চাপলে জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে কোন কসুরই সে বাদ রাখে নাদেশ মানে এমন এক খণ্ড মৃত্তিকা যা মানুষকে লালন করে, পালন করে পরম মমতায়। আর যখন সেই ভূমিখণ্ড বা ভৌগোলিক পরিসীমার প্রতি মানুষের মনে মাতৃভাবের উন্মেষ ঘটে তখন সেটা দেশ থেকে রূপান্তরিত হয় স্বদেশেবছরের পর বছর শুধু একে অপরের প্রতি দোষ চাপানোর এই সাপ লুডো খেলায় এই প্রদেশটার লোকসান বৈ লাভ কিছু হয়নি

কবিতায় সাগ্নিক নিঃসন্দেহে টেক্কা দিয়েছে উজানকে। দুটি পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়েছে বর্তমানের কিছু সাড়া জাগানো কবির কবিতা। ২১টি কবিতায় ঋদ্ধ সাগ্নিকে রয়েছেন বিকাশ সরকার, দেবলীনা সেনগুপ্ত, চিরশ্রী দেবনাথ, অভিজিত চক্রবর্তীর মতো কবিরা। নবাগত হিসেবে রীতা চক্রবর্তী,সমীর চক্রবর্তী নজর কেড়েছেন। অপর দিকে ২০ টি কবিতায় সজ্জিত উজানে রয়েছেন মিলন কান্তি দত্ত, অভিজিত চক্রবর্তী,রামচন্দ্র পাল, শ্রীভদ্রের মতো কবিরা। উদীয়মান কবিদের মধ্যে স্বস্তিসাধন চক্রবর্তী ও রাজা চক্রবর্তীর নাম উল্লেখযোগ্য।
ছোটগল্পে সংখ্যার বিচারে সাগ্নিক এগিয়ে থাকলেও ধারে ও ভারে উজানই এগিয়ে। খ্যাতিমান গল্পকারেরও ছড়াছড়ি এখানে। নীলদীপ চক্রবর্তী, মানব রতন মুখোপাধ্যায়, পদ্মশ্রী মজুমদার, অর্পিতা বিশ্বাস বর্তমানের চর্চিত গল্পকার। এই প্রতিবেদকেরও রয়েছে একটি গল্প। বিপরীতে প্রবন্ধ বিভাগেরই মতো গল্প বিভাগের যাবতীয় খামতি থেকে সাগ্নিককে এক যথাযোগ্য স্থানে উঠিয়ে দিয়েছেন ধীরাজ চক্রবর্তী তাঁর এক গুচ্ছ অণুগল্প’-এর মাধ্যমে। অসাধারণ মুন্সিয়ানায় উপস্থাপন করেছেন ছয় ছয়টি অতি উচ্চ মানের অণুগল্প।
উজানের সম্পাদকীয় - সম্পাদকীয় সমিতির পরিবেশনা। এ ক্ষেত্রে সাগ্নিকের সম্পাদকীয় তুলনামূলক ভাবে বিষয় বৈচিত্র্যে ও ভাষার বাঁধনে অধিক আকর্ষণীয় তথা মূল্যবান। একটি ছোট পত্রিকার সম্পাদকীয়তেই সেই পত্রিকার একটি সম্যক চিত্র পরিস্ফুট হয়ে থাকে। সেই বিবেচনায় উভয় পত্রিকাতেই সম্পাদকের ভাবনায় সমকালীন সাহিত্য ভাবনা স্পষ্ট ভাবেই চিত্রিত হয়েছে।
উজানের উজানও ভাটির 'সাগ্নিক' নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখার প্রয়াসে চেষ্টার কসুর করেনি কোথাও এবং সেই প্রচেষ্টায় দুটি পত্রিকাই একশো ভাগ সফল। সযত্নে রক্ষা করে রাখার মতো যথেষ্ট রসদ মজুত রয়েছে উভয় পত্রিকাতেই।
সাগ্নিকে বানান ভুলের পরিমাণ খুবই কম কিন্তু বহু জায়গায় ’-এর পারস্পরিক স্থানচ্যুতি পঠন বিভ্রান্তি ঘটিয়েছে। সম্পাদকের বিশেষ নিবন্ধও এর থেকে মুক্ত নয়। উজানের গত সংখ্যায় যেখানে ভুল বানান খুঁজে পেতে ঘাম ঝরাতে হয়েছিল সেখানে এবার বানান ভুলের আধিক্য খুবই পীড়াদায়ক হয়েছে। মায় প্রচ্ছদেও বানান ভুল খুবই দৃষ্টিকটু হয়েছে। সম্পাদকীয় সমিতিকে পরবর্তীতে আরোও সজাগ হতে হবে এতে সন্দেহ নেই।
প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণে উভয় পত্রিকাই অত্যন্ত আকর্ষণীয়। দুটি ছোট পত্রিকার মধ্যে যে পারস্পরিক সম্বন্ধ রয়েছে তা হলো এই যে উভয় ক্ষেত্রেই দুই পত্রিকা গোষ্ঠী বাংলা সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে ভাষা ও সাহিত্যের পাশাপাশি সামাজিক এক দায়বদ্ধতা নিরলস ভাবে বজায় রেখে চলেছে। আজকের ঝুঁকিপূর্ণ ও স্রোতের বিপরীতমুখী সামাজিক পরিবেশেও এই তাগিদ, এই নিরলস ব্রত বাংলা ভাষা সাহিত্যের রসাস্বাদনে যদি আগ্রহী করে তুলতে পারে একজনও অনুরাগী পাঠককে তবেই সার্থক হবে এই প্রয়াস। সদিয়া থেকে ধুবড়ি বলা ভাল তিনসুকিয়া থেকে বাসুগাঁও মহাবাহুর প্রবাহিত জলরাশিতে যদি সিঞ্চিত হয় সাহিত্যের অমৃত রস আর সেই রসে সিক্ত হয় উঠতি প্রজন্ম তবেই সার্থক হবে উজানসাগ্নিক’-এর পথচলা।
         - - - - - - - - - - - - - - -




শনিবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

মুদ্রা



।।  বিদ্যুৎ চক্রবর্তী ।।

(ছবি দীপঙ্কর কর; সৌজন্য বাসব রায়)














রা বলে - করতে হবে
আমরা বলি - মানব না।
ওদের কথায় দেশ যে চলে
আমাদের তা মানায় না।

ওরা হলো পিঁপড়ের জাত
মিছিল করে ফুলায় বুক
আমরা হলাম বাঁদর বংশ
টেনে নামাই নিজের লোক।

ওরা বলে - অস্ত্র আছে
নেহাত সেটা নিইনি হাতে
আমরা বলি - কিছুই তো নেই
অনুকম্পায় বাঁচাও ভাতে।

ওরা বলে - অস্ত্র নিলে
কেউ পাবে না রেয়াত আজ
আমরা বলি - অহিংসাটাই
অদ্য আমার মাথার তাজ।

ঘৃণা ওদের চোখে মুখে
হৃদয় জুড়ে হিংসানল
দরিয়াদিল আমরা সবাই
তোয়াজ করাই মোদের চল।

আব্দার হোক অন্যায় তবু
আদায় ওরা করেই ঠিক
ন্যায্য পাওনা না পেলেও
আমরা থাকি নীরব- ধিক্।

ভবিষ্যৎটা ওদের জন্য
একশ ভাগই নিশ্চিত
হাজার প্রমাণ দিয়েও আমরা
থাকছি অসুরক্ষিত।

ওদের বেলা রাজানুগ্রহ
উপচে পড়ে যেমন চাই
হাজার চোখের রাঙানিতে
আমরা হচ্ছি পুড়েই ছাই।

ওরা হলো স্বদেশ পুত্র
শেকড় কিন্তু দূর দেশে
আমাদেরও একই সূত্র
তিন পুরুষের এই দেশে।

ওরা তবু রক্তচক্ষু
দেখিয়ে করে অত্যাচার
ভয়েই আমরা সিঁটিয়ে থাকি
দু'য়ে দু'য়ে হই না চার।

ওদের মতোই এখন থেকে
দাঁড়াই রুখে আমরা তবে
লক্ষ লোকের লক্ষ ব্যথা
ভাগ করে নিই নিজের ভেবে।

ভাষার দোহাই দিয়ে ওরা
যতই করুক ফন্দি ফিকির
ভাষার গানেই বাঁধব আমরা
অধিকারের সু-প্রাচীর।

ওদের পথেই হাঁটব আমরা
নামব পথে বাঁধনহীন
আমরাও যে ভূমিপুত্র
নই তো আমরা দীন ও হীন।

ওদের যেমন দাপট আছে
আমরা এতই কি দুর্বল ?
ঈদে কিংবা পুজোয় তবে
পথ বেয়ে কার নামে ঢল ?

ওদের মতোই আমরা এবার
নামব পথে করব পণ
করব আদায় সুবিচার
মিলব পথে লক্ষ জন।

যতই আসুক রাজরোষ আর
যতই বাধা বিপত্তি
দাঁড়াই রুখে এক হয়ে আজ
মানব না আর আপত্তি।

ভাষার আত্মীয়তায় বাঁধা
আমরা সবাই হবই এক
হবেই বাধ্য সব পক্ষ
মানবে সত্য ছাড়বে ভেক।

বুঝুক ওরা আমরাও চাই
অবাঞ্ছিত মুক্ত দেশ
কিন্তু আমরা মানব না তো
অন্যায়ের দেখব শেষ।

বুঝবে ওরা আমরাও যে
এ দেশেরই নাগরিক
কপটতা, ছলচাতুরি
হচ্ছে যা তা নয় যে ঠিক।

জানুক ওরা আমরা যে আজ
অত্যাচার আর সইব না
দেশভক্তির পরাকাষ্ঠা
আর দেখাতে পারব না।

মর্জি মতো অন্যায় আর
অবিচারের হোক অবসান
প্রকৃতই যে দেশের মানুষ
পাক সে ফিরে মান সম্মান।

দেখুক ওরা আমরা যে নই
মোটেই হেলার পাত্র
আমরা তো নই মোটেই শত্রু
সুনাগরিক মাত্র।

এবার তবে ওদের মতোই
জেগে ওঠার পালা
মন্দির আর মসজিদ ছেড়ে
রাস্তায় পা ফেলা।

- - - - - - - -