“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
প্রলয় নাগ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
প্রলয় নাগ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

কাকতাড়ুয়ার গল্প -২ :: প্রেম পর্ব


।। প্রলয় নাগ।।



 
(C)Image:ছবি
লো
কে বলে কাকতাড়ুয়াকে তার বাপে কুড়িয়ে পেয়েছে । বাপ মুড়ি বিক্রি করত ট্রেনে ট্রেনে
এক ঝড় বাদলে রাতে কাকতাড়ুয়াকে বাড়িতে নিয়ে আসে। সৎমা কাকতাড়ুয়াকে মেনে নিতে পারেনি তুমুল ঝগড়া হয় বাপ মায়েকাকতাড়ুয়ার ভাগ্যে  যশোদার মতো মা জুটল না আর কি! কাকতাড়ুয়ার কোন আক্ষেপ নেই। থাকবে কোত্থেকে, তখনও তার বোঝার বয়সটি হয়নি।
কিছুদিন পরে বাপ মরল সাপের কামড়ে বাপ মারা যেতেই সৎমা চার বছরের কাকতাড়ুয়া ফেলে এক পিয়াজের ব্যাপারীর সঙ্গে হাঙ্গা করে চলে আসে ধুবড়িতে সেইদিন ফেলে আসা শণের ঘরে কাকতাড়ুয়া বসে খুব কাঁদছিল, কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়ে তারপর কতজনের কতকি- মুড়ি, চালভাজা, ভাতের ফ্যান, বাসিপান্তা খেয়ে খেয়ে বড় হয়ে গেল লোকের ধান গম বেগুন ক্ষেতে তেলের টিন বাজিয়ে বাজিয়ে কাকপক্ষী তাড়াতে তাড়াতে নাম হয়ে গেল কাকতাড়ুয়া এখন  নিউ জলপাইগুড়ি নিউ বঙ্গাইগাও লোকালে মুড়ি চানা বিক্রি করে আর মাঝে মাঝে কুষানযাত্রার পালাতে বাঁশের বাঁশি বাজায় মাসে এক-আধ বার বাড়ি আসলে আসে, আর না হলে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের পাশে বস্তিতে এক বিধবার সাথে রাতে থেকে যায়
         কাকতাড়ুয়ার মনে আসে তার পুরনো দিন গুলির কথা হকার বন্ধুদের কাছে আক্ষেপ করে –‘ইস এখন যদি পাইতামট্রেনে চলতে অনেক মেয়েকেই সে দেখে  সব মেয়েকে তার  বোন-মা বলে মনে হয় না অনেককে দেখে চোখের সামনে তার অতীত জীবনটি ভেসে ওঠে তখন সে মুড়ির বাক্স নামিয়ে দরজা রেলিংয়ে ধরে   বুকের বোতাম খুলে দিয়ে বাতাস লাগিয়ে শরীর ঠাণ্ডা করে
 সব কথা তার মনেও নেই তার চেয়ে বয়সে বড় ধাড়ি ধাড়ি মেয়ে গুলো তাকে ডেকে নিয়ে যেত পাট ক্ষেতে বা নদীর চরে গরু চরাতে তারা নির্দ্বিধায় জামা খুলে ফেলত তার সমানে বলত- ‘সুড়সুড়ি দেওসব  তখন সে কিছু বুজত না, ভাবতো এও বুঝি রান্নাবাটির মতো কোন খেলা 
একসময় ধীরে ধীরে কাকতাড়ুয়া সব বুঝতে শেখে এখন আর তাকে কেও ডেকে নিয়ে যায় না শীতের সকালে টিন বাজিয়ে কাক তাড়াতে ফ্রক পড়া মেয়েদের ডাকলেও আর তার কাছে আসে না
কাকতাড়ুয়া  জানে না প্রেম কী ? সে শুধু এই খেলাটাই জানত তার বিশ্বাস হয়ে গেছে প্রেম মানে ছোট বেলায় শেখা  এই খেলাটাই অনেক খেলেছে ও,   অনেককে দেখেছে এই খেলা খেলতে তার মাকেও দেখেছে বাবা বাড়িতে না থাকলে মদনের সাথে এই খেলা খেলছে হিরুয়াকে দেখেছে তার বৌ থাকা সত্ত্বেও ধান ক্ষেতে নিখিলার বৌয়ের সাথে ওই খেলা খেলছে
কাকতাড়ুয়ার মনে কি হয় না হয় সে বলতে পারে না গুছিয়ে একদিন এক বিকেলে পাশের বাড়ির লক্ষ্মীকে সে বলেছিল – ‘তুই আমার লগে পেম করবি?’ লক্ষী  চিৎকার করে তার মাকে বলে দেয় কাকতাড়ুয়ার কপালে জোটে ঝাঁটা জুতা তার পর থেকে সে ভয়ে কাওকে কিছু বলে না এর কিছুদিন পড়ে লক্ষ্মী ভরা পুকুরে পা পিছলে পরে গিয়ে ডুবে মরছিল কাকতাড়ুয়া জল খেতে খেতে বাঁচিয়েছে তারপর থেকে লক্ষ্মী-কাকতাড়ুয়ার একটা ভাব জমে উঠেছিল এসব দেখতে পেয়ে কম বয়সী মেয়েটাকে  জোড় করেই বিয়ে দিয়ে দেয় লক্ষ্মীর বাপ মা কাকতাড়ুয়ার মন খারাপ কিছুদিন কোথায় চলে গেছিল কেউ জানে না কিছু দিন পরে আবার ফিরে এলো গ্রামে
  কাকতাড়ুয়াকে যারা প্রেম শিখিয়েছে তাদের সকলেরই  বিয়ে হয়ে গেছে কারো তো দুতিনটে ছাওয়া পুয়াও হয়ে গেছে তাদের সাথে হঠাৎ দেখা হলে কাকতাড়ুয়া হাসি হাসি মুখ করলেও তারা যেন চেনেই না কাকতাড়ুয়াকে এমন ভান কাকতাড়ুয়ার মনে  প্রথম প্রথম একটু কষ্ট লাগলেও পরে সব সয়ে গেছে
কাকতাড়ুয়ার জীবনে একবার প্রেম এসেছিল তখন সে উনিশ কি কুড়ি  হবে চড়া রোদে ধান বাঁধতে বাঁধতে ক্লান্ত হয়ে ক্ষেতের পাশে বননাইল্যা গাছের নিচে বসে বিশ্রাম করছে পাশে  সুটকার জোয়ান বিধবা বৌ-টাও এসে বসল জল খাওয়াল কাকতাড়ুয়াকে তেষ্টায় কাতর কাকতাড়ুয়ার মনে হল এমন আদর করে কেউ কোন দিন তাকে জল খাওয়ায়নি
কাকতাড়ুয়ারও মনে হয় পছন্দ  হয়েছিল বৌ-টাকে তা না হলে সে দিন সন্ধ্যা বেলা গিয়ে হাজির হলই বা কেন তার বাড়িতে তারপর রোজ রোজ সন্ধ্যা  হলেই কাকতাড়ুয়ার আর দেখা পাওয়া না গল্পগুজব হাসিঠাট্টা রমরমা চলছে এরই মধ্যে দুজনে একদিন নীলকুঠির মাঠে জ্যোতি বসুর জনসভাও করে এসেছে
 এর কিছুদিন পর কাকতাড়ুয়া ধরা পড়ল খড়ের গাদায় জোয়ান বৌটার সাথে পাড়াপড়শিরা মারধোর করে  কাকতাড়ুয়ার নাক মুখ ফাটিয়ে গ্রাম ছাড়া করল দুদিন পরে বৌটিও বাড়ি ছেড়ে চলে গেল এ ঘটনার পর থেকে কাকতাড়ুয়ার গ্রামের প্রতি টান চলে গেছে আসলে আসে, না এলে বিধবা বৌটির সঙ্গে পড়ে থাকে স্টেশনের বস্তিতে আর জ্যোৎস্না রাতে বাঁশি বাজায়, গলা ছেড়ে গান ধরে
সাধের জনম মাটি হইয়া গেল রে
প্রেম কইরাছি অবুজ বয়সে
প্রেম কারে কয় বুঝি নাই রে
সাধের জনম মাটি হইয়া গেল রে

~~~~~~~~~০০০~~~~~~~~~~~~~

কাকতাড়ুয়ার গল্প -১


  ।। প্রলয় নাগ।।


 মাথাভাঙ্গা শহরে ঢুকতেই সুটুঙ্গা নদীর ওপর আব্বাসউদ্দিন আহমেদ সেতু সেতু পার করেই বা পাশে একটা পৌরসভার তৈরি করা পেচ্ছাবখানা তাড়াহুড়োর মাঝে সবাই এখানে চটজলদি কাজ সেরে নেয় আর সমস্ত পেচ্ছাবের ধারা গড়িয়ে কি সুটুঙ্গায় মেশে না-কি অন্য কোথাও যায় কেউ জানে না এই সেতু নিচে বছর ২১শের  ভেসে আসা এক যুবতী মেয়ের মড়াকে নিয়ে বেশ তোড়-জোড় শুরু হয়েছে  কবে ভেসে এসে এটা আটকে গেছে কেউ জানে না আসলে কয়েক দিন পুজোর জন্য সবাই ব্যস্ত ছিল হয়তো  
সকাল সকাল কতগুলো জেলে ঠ্যালা জাল নিয়ে মাছ ধরতে এসে মড়াখানি আবিষ্কার করেছে তবে জেলেরা খুঁজে না পেলেও আজ সবাই টের পেয়ে যেত গন্ধ একটু আধটু বেড়তে শুরু করেছে কাকের উপদ্রবও বাড়তে শুরু করেছিল পেচ্ছাবখানার ওপরে বসে কাকগুলি কা-কা কা-কা করেছে মড়ার দিকে চেয়ে মনে হচ্ছে ওদের ভাগের ধন অন্যকেউ নিয়ে যাবে
আব্বাসউদ্দিন সেতুর ওপর মানুষের ভিড় জমে গেছে  বুড়া-ছুড়া সকলে মড়া দেখছে হা হুতোস করছে ভাগা পান  বিক্রি করা এক বুড়ি - ‘কত সুন্দর ফুলের মতো মাইয়াডা, এইডা কেমন কইরা  হইল?’ রিবন সানগ্লাস-পড়া ছোকরাদের মধ্যে কেউ বলছে- ‘মালটা খাসা ছিল রে মমমু ছ্যাকাট্যাকা খাইছে হয়তো
পাশে নদীর ওপারে অভিজাত শ্মশান তার সাথে আর মা কালীর অধিষ্ঠান রোজ কেউ না কেউ পুড়ছে ওখানে
ঘণ্টা দুয়ে-কের চেষ্টায় মড়াখানি নদী থেকে তুলে নিয়ে গেল পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য মৃতের চোখ দুটি হা-করে খুলেছিল আকাশের দিকে ঠ্যালা গাড়ি থেকে বাড় নেমে যাচ্ছিল নীল বড়-পলিথিনে জড়িয়ে গুম ঘরে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে শহরের মাঝখানে গুম ঘর পাশে বিশাল বড় কাঠালি-বট গাছ হাজার হাজার চাম বাদুর ঝুলে থাকে তার নিচে স্বাস্থ্য-দপ্তরের অফিস। দিনের বেলায় যেতে ভয় লাগে ওই পথ দিয়ে যে ঠ্যালায় করে মড়াখানি শহরের মধ্যে নিয়ে আসা হল সে ঠ্যালায় করে কিছুদিন আগের এক ছোকরাকে নিয়ে আসা হয়েছিল ছোকরার বিয়ে ঠিক হয়ে ছিল কিন্তু শরীরে ছিল সিফিলিস বা গনোরিয়া জাতীয় রোগ ছোকরাটিও ফাঁসি দিয়ে মরে, নিজের পরনের শার্ট দিয়ে
পরদিন খবরে কাগজে বড় বড় করে লেখাযুবতী মেয়ের দেহ উদ্ধার ও গুম ঘর থেকে উধাও ছবিও ছেপে ছিল, সাথে দুএক ছেলে ছোকরার ছবি খবরের কাগজে ছবি দেখে তাদের আনন্দে আর ধরে না
পুলিশ প্রশাসনের ঘাম ছুটে যাচ্ছে মড়া খুঁজতে খুঁজতে  এস.পি স্বয়ং খুঁজতে বেড়িয়েছে মড়া খানি অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী নিয়োগ হয়েছে যে করেই  হোক মড়া খুঁজে বেড় করতে হবে লাল-বাজার থেকে ঘন ঘন ফোন আসছে টিভি চ্যানেল গুলিতে ঘুরে ফিরে মড়ার খবর সন্ধ্যায় কি সব তর্কের আসরও বসেছে এই মড়াকে নিয়ে
শহর ভয়ে জর সড় কত আজগুবি গল্প কে নাকি দেখেছে মড়াটি শহরের বটগাছটিতে বসে বাদুরের সাথে গল্প করেছে আর স্বাস্থ্যদপ্তরে ঢিল ছুড়ছে কেউ মড়াটিকে সরকারি বাস-স্ট্যান্ডে ভেতরে শুয়ে থাকতে দেখছে কেউ মড়াটিকে নাকি এলআইসি অফিসে টাকার কিস্তি জমা করতে দেখছে এক বেকার ছেলে দেখেছে মড়াটি নাকি ভিড় ঠেসে এসএসসি-র ফর্ম তুলেছে পোস্ট থেকে কেউ বলছে মড়াটি নাকি সঙ্গীদের সাথে দল বেঁধে অপ্সরা হলে সিনেমা  দেখেছে কেউ  মড়াটিকে সন্ধ্যা বেলা পিট ব্যাগ নিয়ে টিউশন পড়ে বাড়ি ফিরতে দেখেছে কেউ মনীষী পঞ্চানন বর্মার মূর্তিটিতে ফুল দিতে দেখছে কেউ বলছে – ‘দুর্- এ হল ঢপের চপ গুম ঘর থেকে হয়ত শেয়ালে টেনে নিয়ে গেছে
 কিন্তু কোথায় মড়া ?
কেউ খুঁজে পাচ্ছ না গুম ঘরের লোকটিকে স্পেশাল ব্রাঞ্চের লোকেরা দুদিন থেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে চলেছে বেচারা কীভাবে জানবে? সে তো শুধু ঘরের তালাচাবি লাগায় আর খোলে
মড়া নিয়ে আন্দোলন হবে বিরোধীরা হুমকি দিয়েছে বিধান সভা ওয়াক আউট করেছে দক্ষিণী বুদ্ধিজীবীরা উত্তরে এসেছে মড়া খুঁজতে
মড়া পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও সরকার ঘোষণা করেছে মড়া খুঁজে দিলে দুলাখ
রাজা থেকে প্রজা সবাই মড়া খুঁজতে বেড়িয়েছে  মড়া কোথাও নেই, তবে গেল কোথায়?’ – সকালে চায়ের দোকানের আসরে প্রশ্ন উঠছে

কিছুদিন মড়া পাওয়া গেল। হৈ হৈ রব উঠেছে চারদিকে। ধরলা নদীতে যুবতী মেয়ের মড়া। সবাই হন্যে হয়ে ছুটছে মড়া দেখতে । আকাশে বগি উড়তে উড়তে বগাকে বলে-‘এই বুঝি সেই মড়া।’ বগা বলে-‘না, এ মড়া সে মড়া নয়।’
এক বড় নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যদিয়ে গুমঘরে আনা হল এ মেয়েটির মড়াকেও। বড় বড় অফিসার পাহারায় নিযুক্ত। প্রশাসন বলছে –‘দেখি এবার মড়া কোথায় যায়?’
পর দিন খবরে কাগজে ‘আবার মড়া উধাও’ গুম ঘরের লোকটিকে আবার জিজ্ঞাসাবাদ লাঠি ডাণ্ডালোকটির একি কথা-  ‘আমি কি জানি? আমি তো শুধু তালা লাগাই আর খুলি। মড়া কই কীভাবে কমু?’
                                 ……………………………………………………………….