“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
প্রবুদ্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
প্রবুদ্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৫ জানুয়ারি, ২০১৩

অনুভব তুলসীঃ অসমিয়া কবিতার অন্যতম যুবরাজ

অনুভব তুলসী
নুভব তুলসী। অসমিয়া কবিতার অন্যতম এই যুবরাজকে প্রথম দেখি আট বছর আগের একদিন আগরতলার Poetry Confluence অনুষ্ঠানে। তারপর ইটানগর, ত্রিপুরা, গুয়াহাটিতে সাহিত্য অকাদেমি, ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট্রের বিভিন্ন পোয়েটস মিট অনুভবদার সঙ্গে বন্ধুত্বকে আরও তীব্র করে তোলে। অলোকরঞ্জন যেমন লিখেছিলেন, পাখিটির মাতৃভাষা চেয়ে থাকা, তেমনি অনুভব তুলসীরও কিরাতপ্রতিভা, মিটিমিটি হাসি। অনুভবদার মোহিনী পাঠিকাদের সম্পর্কে সঠিক তথ্য, ওড়িয়া ভাষার কবি মানসরঞ্জন মহাপাত্র ছাড়া আর কারও কাছে নেই। কবি নীলমণি ফুকনের পর সমীর, নীলিম, নীলিমা, জীবন, লুৎফা, অনুভবদের হাতে অসমিয়া কবিতার ধারা নিরীক্ষালালিত হয়ে বাঁক নিয়েছে সৌরভ, কুশল, প্রণবদের হাতে। আখমাতোভা, হাইনে, ভাস্কো পোপা, পাজ, রিলকে, গালিব অনুবাদ করে অসমিয়া ভাষার পাঠকদের মননে অনুভব তুলসী বইয় দিয়েছেন এক দরজাখোলা নদী । গুয়াহাটি পৌঁছে নৈশ শিস দিলেই জয়ানগর বাঙ্কার থেকে অনুভবদা বেরিয়ে পড়েন তার গাড়ি নিয়ে। তারপর শুরু হয় আমাদের যৌথ নাশকতা কর্মসূচি। ২০১১তে ভারতীয় প্রতিনিধি এই ভ্রমণকামুক ঘুরে এলেন অরহান পামুকের দেশ। অনুভবদার পেরেকে রক্তাক্ত হয়ে উঠি তবে?


পেরেক
..........

সেই হিংস্র লোকগুলো
তাদের হাত ভিজিয়েছিল
যিশুর লাল, উষ্ণ
রক্তে

নিতান্ত অকারণেই
ক্রুদ্ধ জনতা
তাদের অভিশাপ ঢেলে দিয়েছিল
পেরেকগুলোর ওপর--
আর পেরেকগুলো সহ্যও করেছিল সব

লোকগুলো সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিল
যে ওই পেরেকগুলো নির্ঘাৎ পচে মরবে
নরকের অতল গহ্বরে

অনিঃশেষ নৈঃশব্দ্য
হিঁচড়ে টেনে এনেছিল
তিন-তিনটে কালো রাত

অবশেষে একসময়
ঘড়ি ঘোষণা করল
ভোর

রোদের প্রথম রশ্মিগুচ্ছ
প্রত্যক্ষ করল সেই
অলৌকিক ঘটনা

হঠাৎই ক্ষয়ে নিঃশেষ হয়ে গেল
শবাধারের সব ক-টি
কাঠের পাটাতন

শুধু পুনর্জন্ম হল
সেই পেরেকগুলোর...

......

-মন্দাক্রান্তা সেন অনূদিত
বৃষ্টিদিন। বইমেলা সংখ্যা। ১৪১৫

শুক্রবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০১২

ওঁ মধু


                                                             ।।
শক্তিপদ ব্রহ্মচারী।।
  
সৌজন্য ঃমেঘ অদিতি





















বিষ্টি বিষ্টি অনাচ্ছিষ্টি ভেতরে তুলকালাম কাণ্ড
মেয়েমানুষ খেয়াল গাচ্ছে লোপাট হচ্ছে মধুর ভাণ্ড
সব শেয়ালের এক রা হুজুর মধুবাতা ঋতায়তে
নাগালয়ে মা ভবানী বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে
হরি তোমার ওপার লীলা তুমি মধু কৈটভারি
"কে ওখানে?" "আমি হুজুর, শক্তিপদ ব্রহ্মচারী।"

নখদন্তবিহীন এবং বারোমাস নিরামিষাশী
সচ্চরিত্র বামুনের পো গুণ করেছে সর্বনাশী
আত্মচরিত লিখব এবার সহস্র রুধিরের ফোঁটায়
চুমু খাওয়ার শর্ত ছিল, ঠোঁট ঘষেছি বুকের বোঁটায়
ইন্দিরাজি দিল্লি থেকে হিন্দি শেখায় সস্তা দরে
কিলোখানেক তা-ও কিনেছি জাতীয় সংহতির ডরে
হুজুরের রাজত্বে করি খুশমেজাজে চৌকিদারি
"কে ভেতরে?" "আমি হুজুর, শক্তিপদ ব্রহ্মচারী।"

ইকিড় মিকিড় ফন্দি ফিকির যা কড়ি মন্তরের গুণে
শ্রীখোলে রবীন্দ্রগীতি কীর্তনিয়া নেড়া বুনে
হুজুর এবার ঢাকি হবেন, আমরা হব ঢাকের কাঠি
নব্যসমস্কৃতি বিনা সব শালা খেজুরের আঁটি
গণ্ডাখানেক চণ্ডী পেলে একটু ঠান্ডা হতে পারি
ছিচরণের দাসানুদাস শক্তিপদ ব্রহ্মচারী।

(অনুলিপিঃ Prabuddhasundar Kar)

রবিবার, ১২ আগস্ট, ২০১২

নদী । এই একটি প্রবহমানতা সমুদ্রগামী ।...............।

 (কিছু কিছু কবি ইচ্ছে করলেই নিজেরা লিখতে পারেন, লিখবেন না আলস্যবশত।  থুক্কু, তাঁরা ফেসবুকে লিখে রাখবেন। যে ফেসবুক আসলে একটি কোম্পানী  ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর মতো। আজ আছে কাল নেই। অন্যদিকে ব্লগ এক ব্যবস্থার নাম। এখানে সংরক্ষিত থাকে, সার্চ  ইঞ্জিনে মেলে  তাড়াতাড়ি । তেমনি এক ফেসবুক নোট লেখক কবি পল্লব ভট্টাচার্য ।  তিনি কেমন শ্রম করেন ফেসবুকে তাঁর একটি নমুনা দিলাম নিচে ,  আশা করছি এরপর  এঁনার  নিজের এবং পরের সমস্ত শ্রম এখানে তুলে দেবার জন্যে গণ দাবী উঠবে।  যাদের কবিতা এখানে রইল তাঁরা সব্বাই ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি ফুল, বিশ্বময়  সুবাস ছড়ান।) 

পল্লব ভট্টাচার্য

নদী । এই একটি প্রবহমানতা সমুদ্রগামী । অস্তিত্বকে অস্তিত্বহীনতায় পৌছে দিতে । ভাসতে থাকে শুধু নৌকাটি ।

…………………………………………………………………
নলিনী দলগত জলমতিতরলং  তদ্বজ্জীবনমতিশয় চপলম্ ।
ক্ষণমিহ সজ্জনসঙ্গাতিরেকা ভবতি ভবার্ণবতরণে নৌকা ।।

…………………………………………………………………………………………………

সমরজিৎ সিংহ

আকাশছায়া

মাকে , মনে হয় , ঐ আকাশছায়া । দিন শেষ হলে
ডেকে ওঠে জ্যোৎস্নাপাখি
শুরু হয় গাছেদের কথাবার্তা
আর একটি নদীর কথা এসে পড়ে প্রাসঙ্গিকতায়
ঐ নদীর জলে একটি নৌকাকে আমি
ভেসে যেতে দেখেছি অনেকদিন

মা যাবার পর , ঐ আকাশছায়া আর নেই
রাত এলে আমি , প্রতিদিন খুঁজে বেড়াই নদী ও জ্যোৎস্না

……………………………………………………………………………………………………


অশোক দেব

উৎসর্গ

শুনেছি জ্যোৎস্না রাতে
একটি গোপন নৌকা ঘাটে ঘাটে ঘোরে

বহুকাল এই গ্রামে থেকে আমি দেখিনি
শুধু শুধু নদীর নামে রটিয়েছি অপবাদ

আজ মনে হয় সব ঘাটই রাতে রাতে
মিশে যায় জলে
নদী আর নৌকাতে চলে অভিমান ।

…………………………………………………………………………………………………

প্রবুদ্ধ সুন্দর কর

অম্বুবাচী

একটি কলকল নদীর কাছে একটি কথা মনে হলো

পাগলা আশ্রম থেকে বেরিয়েছে মাটির নিয়ামক স্রাব , এতো কল্লোল

মাটির অতীতচুমু  যৌনচিহ্ন নিয়ে বিরহচুপ্ নিষিদ্ধ নাঙ্গলবর্ষ
মাটির বিছানায় শুয়ে আছে নিয়ামক রমনী , পাশে আমি নিষিদ্ধ পুরুষ

অনন্ত ৩ দিনরাত একাকী ভালোবাসার নক্ষত্র  আকাশ

চারপাশে তানপুরাবৎসল ফসলের রিন্ ঝিন্ রিন্ ঝিন্

…………………………………………………………………………………………………………

স্বাতী ইন্দু

সামুদ্রিক

সমুদ্রের মধ্যে ডুইব্যা যে মানুষ
যে মানুষ প্রলয় ছাড়া আর কিছু
চিহ্নিত করে না --- ভাবে  না রৌদ্রের রঙ
ভাইঙ্গ্যা গেলে অন্ধকার আসে
আসে--আসে হে প্রিয়তম অন্ধকার--
আর কোন গল্পের প্রয়োজন নাই
নাই কোন গাঁথুনির  নিরেট উচ্ছাস
ভাষা ছাইড়া যে মানুষ রক্তে কথা কয়
বিষন্ন কোষের ঠোঁটে ঠোঁটে
প্রথম প্লাজমের সে মানুষ --নির্দয়তা
তাকে কষ্ট তুমি কি ভাবে দিতে চাও ?

শুক্রবার, ৩ আগস্ট, ২০১২

ইতি সেলিম কাহিনি

।। লিখেছেনঃ প্রবুদ্ধ সুন্দর কর।।

এক.
"কোনও ফর্ম আমি কখনও অনুকরণ করিনি। আমার সমস্ত ভঙ্গিমাই আমার সহজাত। যা লিখেছি সবই দেয়ালে পিঠ দিয়ে। ফাঁকে যাতে কখনোই না পড়ি। হলে হবে, না হলে নেই। যা আমার তার সবটুকুই আমার। প্রকৃত সৃজিত বস্তুর কোনও দোসর থাকে না। এই আত্মবিশ্বাসই আমার যুদ্ধাস্ত্র--আমার শয্যা আমার জয় আমার পরাজয়--আমার পরিচয়।"

দুই.
"যখনই লিখি, 'আধুনিক' অবস্থায়ই লিখি। নইলে লিখবই বা কেন? একই সত্য যদি জীবনে বার বার ঘুরে ফিরে আসে, সেটা সময়ের বিষয়, ইতিহাসের বিষয়--বা সমস্যা। আমার নয়। সমালোচক হিসেবে কেউ যদি চুলচেরা বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্ত দেয় যে সেলিম সারা জীবনে একই কথা বার বার লিখেছে, তাতে আমার হ্রাস বৃদ্ধি কিছুই ঘটে না।"

তিন.
"যেটুকু জানি, সেটুকু কখনও লিখি না আমি--যেটুকু জানি না সেটুকু থাবা দিয়ে ধরতে চাই। এর আগাগোড়া সবটাই আমার--আমার নিজের। আমি আর কারোর কথাই ভাবি না--ভাবলে আমার ধরা হয় না। হবে না।"

চার.
"কবি যেহেতু সমাজ সন্সকারক নয়, এসবে তাঁর দায়িত্ব [অর্থাৎ তাঁর লেখালেখির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার দায়, সমাজ শুদ্ধিকরণের দায়, ইজমের দায়] না থাকারই কথা। আমার এরকম স্টেনলেস স্টিলের মতো কোনও দায় নেই। আরে ভাই! হতে পারে আমি কবি-ই নই। 'ভালোবাসা' খুব বাজে একটা টার্ম। এটার প্রকৃতই কোনও সুগভীর অর্থবহতা নেই। আজকের দিনে,প্রাসঙ্গিকতাহীন মেরামতযোগ্যতাহীন ভাড়াবাড়ির মতো।"

              বছর চারেক আগে গল্পকার সত্যজিৎ দত্তের সঙ্গে এক অন্তরঙ্গ সাক্ষাৎকারে এভাবেই আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন কবি সেলিম মুস্তাফা। প্রায় তিন দশকেরও বেশি, বাংলা কবিতায়, সেলিমের শাহী উপস্থিতি। কখনও রাজধানীর কোলাহলে, কখনও বা নিরাপদ দূরত্বে নির্জন উপত্যকায় বাংলা কবিতার জুয়ার টেবিলে উল্টে দিয়েছেন তাস। বাহান্ন তাসের পর, ছোরার বদলে একদিন, ইতি জঙ্গল কাহিনি, দেবতার অনুরোধে--সেলিমের এই কবিতার বইগুলো নিশিডাকগ্রস্ত আমাদের টেনে নিয়ে গেছে রহস্যখচিত, রাত্রি ও অরণ্যসংকুল সেলিমের সাম্রাজ্যের দিকে। সমতল থেকে শুরু করে বিষ-খাওয়া যুবতির মতো নীল হয়ে থাকা জম্পুই পাহাড়, লঙ্গাই ও দেও নদীর অববাহিকা, শান্তিপুর মৌজা, কাঞ্চনপুর রিজার্ভ ফরেস্ট-- কোথায় বিস্তৃত নয় সেলিমের কবিতাসাম্রাজ্য! কবিতায় জঙ্গলের এক ভাষা পেয়ে গেছেন সেলিম; সত্যি, কোনও আতিশয্য নেই সেলিমের কবিতা সম্পর্কে সমরজিৎ সিংহের মন্তব্যে। ওতপ্রোত নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন 'অনার্য'-এর সঙ্গে। স্বভাবলাজুক, সঙ্গীতপ্রিয় সেলিম, বরাবরই নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন কোলাহল হলাহল থেকে। কয়েক বছর আগে ইতি জঙ্গল কাহিনি পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। শ্রেষ্ঠ কবিতা-ও প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি।
এ বছরই প্রকাশিত, সেলিমের সাম্প্রতিক একটি কবিতার পাঠ আপনাদের জন্যে...


সেলিম মুস্তাফা
...................

অম্বিকাপট্টি



শিলচর অম্বিক্কাপট্টি। আমার মামার বাড়ি। চার পাঁচ বছর বয়সে একবারই দেখেছি। মামা আর কাঠের দোতলা বাড়ি। কাছেই কোথাও খ্রিস্টানদের গোরস্থানও যেন ছিল একটা।

মামা চার আনা দিলেন। সেটা দিয়ে হজমি খেলাম।চায়ের ভেজা পাতার মতো গুঁড়ো আর কালো। পাড়ার দোকান থেকে ফিরে এসে শুনলাম মামা ফিরে গেছেন কর্মস্থলে। যাবার আগে মামা সবাইকে আবারও পয়সা দিয়ে গেছেন--এবার আট আনা করে। খুব আপসোস হল। মামাকে এরপর আর কোনওদিন দেখিনি।

উঠোনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হজমি খাচ্ছিলাম।, আর তখনি দু-পাশের কাঠের দোতলা থেকে উড়ে উড়ে এসে ক-টা কাক আমার মাথায় ক্রমাগত ঠোকর দিতে লাগল। হয়তো হজমির জন্যেই। শেষতক কান্না শুনে রান্নাঘর থেকে ছুটে এসে মা উদ্ধার করেন।

মা-ই আমার চিরকালের ত্রাণকর্ত্রী। আজও সমস্যায় পড়লে মায়ের ছবির সামনে দারাই বা মনে মনে মায়ের অভয়হাসির মুখটা স্মরণ করি।

অম্বিকাপট্টি নামটা খুবই কৌতূহলজনক আমার কাছে। ঐ কাঠের দোতলা বাড়িতে আমাদের সকলের বড়ো দাদা কিছুকাল ছিলেন শুনেছি। পড়তে গিয়েছিলেন। তিনি আমাদের পরিবারের প্রথম ইন্ডিয়ান। গোষ্ঠীর বাদবাকি সকলেই আমরা তখন পূর্ব পাকিস্তানি। শৈশবে কত গেয়েছি 'পাকসার জমিন শাদবাদ...'।

কিন্তু ইন্ডিয়া শুনলেই গায়ে শিহরন হত।এখনও হয়। ত্রিপুরা থেকে ইন্ডিয়া এখনও অনেক দূর।
ইন্ডিয়ান মামি আমার দাদার ভাতের থালার একপাশে একটুখানি ছাই দিয়ে দিলেন। কী অদ্ভুত ! ঠাকুরমার ঝুলিতে হয়তো এরকম গল্প আছে। এরপরই দাদা পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ইন্ডিয়ান আর্মিতে চলে যান।

আজ মামা নেই, মামি নেই। আমাদের দাদাও নেই। হয়তো নেই অম্বিকাপট্টির সেই বারিও।কাঠের বাড়ি আর কতকাল থাকে?

কিন্তু অম্বিকাপট্টি আছে-- সব দেশে, সব শহরে।

কার নাম অম্বিকা?
মানুষ না দেবতা?

দ্বাদশ অশ্বারোহীর একজন

                                                  লিখেছেনঃ প্রবুদ্ধ সুন্দর কর
    কবি শঙ্খপল্লব আদিত্য। ৬-এর দশক থেকে বাংলা কবিতায় তাঁর সন্ত্রাসের শুরুয়াৎ। প্রায় ৫০ বছর আগে, পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে, আগরতলায় চলে এসেছিলেন সপরিবারে। জন্মস্থান ময়মনসিংহ, অজস্র সংকেত, ছেদ, স্মৃতি বিস্মৃতির চেয়ে কিছু বেশি ছোপছাপসহ আলোকিত আর ছায়াছন্ন হয়ে আছে শঙ্খপল্লবের কবিতায়। উদ্বাস্তু যন্ত্রণা, অস্থিরতা, নৈরাজ্য, ভোগবাদ, নগরসভ্যতার প্রতি বিবমিষা, শ্লেষ, তীব্র ভালোবাসা; এতসব বিস্ফোরক আর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে অ্যাম্বুশের ফাঁকে ফাঁকে ছেনি চালিয়ে, অভূতপূর্ব কারুকাজ আর নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে প্রায় ভাস্কর্যের পর্যায়ে উন্নীত করেছেন তাঁর কবিতাকে। কখনও বা তন্ত্রের পরমতায় খুঁজে নিয়েছেন নির্জন আশ্রয়। কবিদের আড্ডা, সভা ও সমিতি, তৎপরতা, উল্লম্ফন থেকে বরাবরই থেকেছেন স্বেচ্ছানির্বাসিত। জীবিকার পাশাপাশি দীর্ঘদিন চালিয়ে গেছেন পাণ্ডুলিপি প্রেস আর তাঁর নিজস্ব পিলাক প্রকাশন। সম্পাদনা করেছেন 'জঠর' কবিতাপত্র। নিজের সম্পর্কে যুগপৎ উদাসীন, উন্নাসিক শঙ্খপলব আদিত্য একে একে বের করেছেন বন্ধুদের বই। গত শতাব্দীর শেষদিকে এসে আমাদের নিরবচ্ছিন্ন উৎপাত সইতে না পেরে বের করতে বাধ্য হন 'ভালোবাসার মনাক্কা ও খাসা কিসমিস'। ১ ফর্মায় শানানো এই চটি কবিতার বইটি-ই সম্ভবত শেষ বই হত, যদি না পল্লব ভট্টাচার্য আর পৌণমী প্রকাশনের নিলীপ পোদ্দার এগিয়ে এসে কয়েক বছর আগে 'শঙ্খপল্লব আদিত্যের কবিতা' প্রকাশ না করতেন।


                    শঙ্খপল্লবের গুহায় কেটেছে আমাদের তারুণ্যের অধিকাংশ দিনগুলি। দর্শন, কবিতা, তন্ত্র, যৌনতা, অধ্যাত্মবাদ, রাজনীতি-আলোচনা, ছন্ন বারুণীর লঘু আড্ডায়, সম্রাট শঙ্খপল্লবকে সন্তের মতোই মনে হত আমাদের। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি ঢাকাতেই 'সংবাদ' কাগজে শুরু হয়েছিল সাংবাদিকতার নেশা, ত্রিপুরায় এসেও যা থেকে আর মুক্ত হতে পারেননি। শঙ্খদার দীর্ঘসূত্রিতায়, মাঝে মাঝে আমরাও যারপরনাই বিরক্ত হয়েছি। কম্পিউটার প্রবর্তনের আগেই 'বিন্দুর চংক্রমণ ও নামহীন কবিতা' শীর্ষক এক পোয়েটিক্স ছকে ছকে আজ অব্দি লিখে উঠতে পারেননি। বহুবার তাৎক্ষণিক সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে, প্রায় এক দশকেরও আগে, নিয়মিত আড্ডা দিয়ে লিখিত সাক্ষাৎকারের প্রশ্নগুলো আজও থমকেই রয়েছে। আমার ধারণা, এই সাক্ষাৎকার, ব্যক্তি ও কবি সমগ্র শঙ্খপল্লব আদিত্যকে বাংলা কবিতায় উন্মোচিত করতে পারত। তাঁর কবিকৃতি নিয়ে লেখালেখি খুব বেশি নেই। হয় CONSPIRACY OF SILENCE, নয়তো শব্দের দ্যোতনানির্ভর তাঁর বাল্মীকিপ্রতিভা নিয়ে অদীক্ষিতদের অক্ষমতা। কবি কল্যাণব্রত চক্রবর্তী আর অমিতাভ দেব চৌধুরী ব্যতীত তাঁকে নিয়ে আর কেউ লিখেছেন বলে মনে পড়ছে না। একদা কবির নিত্য সহচর পল্লব ভট্টাচার্যের পথ চেয়ে দীর্ঘদিন অপেক্ষায় আছি। একমাত্র তিনিই পারেন বাংলা কবিতার আদিত্যদ্যুতিকে অজস্র স্তরের মধ্য দিয়ে বিচ্ছুরিত করতে।
তাঁর সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করে, একটি কবিতা আবারও পাঠ করা যাক।



মুক্তাগাছার মহারাজা ব্রজেন্দ্রকিশোর

..............................................


আজকাল নববিবাহিত যুবকেরাও পূর্ণিমার জ্যোৎস্না লুঠ করে কোনও রমণীর

কাছে বেশি দামে বিক্রি করে না, চনমনে ঘোড়াগুলিরও নেই সেরকম জিন ও সহিস

জ্যোৎস্না লুঠের পয়সায় নেশা করে হাওড়ার পাণ্ডুর চাঁদ ও চাঁদপুরের ইলিশ

কিনে অযথা বউকে জাগায় কজন উজ্জ্বল যুবক?

গভীর রাতে মৌরির গজলবাগানেও নেই কিশোরগঞ্জের পোড়ো বুকে সাপের হিসহিস

মানচিত্রের ছকের একচুল বাইরেও কোনও পা নেই, এরই মাঝে কেউ ধার্মিক কেউ বক

নীলব্রহ্মমণি প্রহরীর কমলদরিয়ায় গহরপাটা নিয়ে কেউ হাঁটাহাঁটিও করে না আজ

নিজেই নিজের সীমাবদ্ধ মুক্তাগাছায় স্বঘোষিত ব্রজেন্দ্রকিশোর মহারাজ

মানুষের সাহস কেবল কমে আসছে, ছোটো হয়ে আসছে ইড়া ও পিঙ্গলা এবং রক্তকোষ

কিন্তু কিছুতেই অহংকারী বোতলের ফেনার নির্বিষ 'ফোঁস' কমছে না।

শনিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০১২

লিটল ম্যাগাজিন ....................

প্রবুদ্ধসুন্দর কর
(প্রবুদ্ধ ঈশানের পুঞ্জমেঘের লেখক, কিন্তু সম্ভবত প্রায়োগিক জটিলতা তাঁকে এখানে লেখার থেকে দূরে রাখে। এই লেখাটা তাই , আমরা তাঁর হয়ে তুলে দিলাম, কিন্তু আশা করছি, আগামীতে তিনি স্বয়ং খানিক সক্রিয় হবেন। তাঁর লেখা সংরক্ষিত থাকা খুবই জরুরি!)

বাংলাসাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্রের 'বঙ্গদর্শন'-ই একমাত্র লিটল ম্যাগাজিন, অনেক আগে এক সাক্ষাৎকারে এরকম একটি মন্তব্য করেছিলেন কথাসাহিত্যিক অমিয়ভূষণ মজুমদার। হয়তো এই একই স্নবারি থেকে তিনি বলেছিলেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের 'চিলেকোঠার সেপাই' না পড়লে আমি জানতামই না, সতীনাথ ভাদুড়ির পর বাংলা উপন্যাস লেখা হয়েছে। লিটল ম্যাগাজিন প্রসঙ্গে অমিয়ভূষণের এই মন্তব্যে সম্পাদককুল রে রে করে তেড়ে আসার আগে অধিকাংশ লিটল ম্যাগাজিন করিয়েদেরই আবারও একটু আত্মসমীক্ষার প্রয়োজন।

            তারুণ্যের স্পর্ধা ও উন্মাদনায় প্রকাশিত অনেক লিটল ম্যাগাজিনকেই প্রথম দিকে ছাড় দিলেও একটা সময়ে এসে সেইসব কাগজের ক্রমপরিণতির প্রত্যাশা লেখক ও পাঠকদের মধ্যে তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। আগেও শুনে এসেছি, এখনও যে শোনা যায় না তা নয়, আরে লিটল ম্যাগাজিনই তো করছে; খুনখারাবি ছিনতাই রাহাজানি তো আর করছে না। যেন সমস্ত অপরাধ ও অপকর্ম প্রতিরোধের বিকল্প লিটল ম্যাগাজিন! আবার লিটল ম্যাগাজিনের দোহাই দিয়ে কোনও কোনও সম্পাদকের সংঘটিত অপরাধ ও অপকর্মের নজিরও কম নয়।

           কেন লিটল ম্যাগাজিন করব বা করছি? সম্পাদক হিসেবে আমার যোগ্যতাই বা কী? এইসব আত্মপ্রশ্নের মোকাবেলা ক-জন সম্পাদকই বা করে থাকেন? সম্পাদনার কাজটি যে অ্যাসেমবল্ড কম্পিউটার তৈরির কাজ নয়, কিছু লেখা জড়ো করে ছাপিয়ে দেওয়ার নাম যে লিটল ম্যাগাজিন নয়, এই আত্মসমীক্ষা কি আজ তথাকথিত সম্পাদকদের জন্যে প্রাসঙ্গিক নয়? কোথায় সেই লিটল ম্যাগাজিন, যাতে লিখে কোনও তরুণ কবির নিজেকে যুবরাজ বলে মনে হয়? অধিকাংশ কাগজেই লেখার ইচ্ছেটা যেন মরে যাচ্ছে কবি লেখকদের। বাড়ছে হ্যাংলামি। বহুলপ্রচারিত বাণিজ্যিক কাগজে লেখা বেরোলে এস এম এস করে বন্ধুদের পড়ার অনুরোধ জানাচ্ছে। আজ অব্দি সেইসব বন্ধুরা কোনও লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত লেখা পড়ার অনুরোধ জানিয়ে এস এম এস পাঠায়নি।

         আজ এই সময়ে এসে লিটল ম্যাগাজিন কনসেপ্ট অনেক পাল্টে গেছে। দারিদ্রকে আইডিয়ালাইজ করার নাম আর লিটল ম্যাগাজিন নয়। হাওয়াই স্যান্ডেলের সোল কেটে লিনোকাট করে প্রচ্ছদ করার দিন শেষ। স্মৃতিকাতর যারা আজও বলেন, লিটল ম্যাগাজিন একটি অলাভজনক উদ্যোগ, ঠিক তখনই সম্পাদকের তৎপরতা নিয়ে সন্দেহ জাগে। সকালের কলগেট টোটাল থেকে শুরু করে, নোকিয়া, স্পার্ক, আই সি আই সি আই, কংগ্রেস, সি পি আই এম হয়ে রাতের ডটেড ম্যানফোর্স অব্দি যে প্রাত্যহিক জীবন বিজ্ঞাপন ও প্রতিষ্ঠানমুখর, সেই জীবন শুধু লিটল ম্যাগাজিনকে হাস্যকর বিজ্ঞাপন ও প্রতিষ্ঠান বিরোধিতায় দেখতে চায়। কাগজ কেউ কেনে না, বলে, যেসব সম্পাদকেরা হা হুতাশ করেন, তাদের উদ্দেশে বলতে ইচ্ছে করে, কেন কিনবে? সম্পাদক হিসেবে আপনার প্রস্তুতি কতটুকু? আপনার সম্পাদিত কাগজ লেখক ও পাঠককে কি আদৌ প্রাণিত করে? নিজেকে ঝাঁকান। কেউ বলেনি আপনাকে লিটল ম্যাগাজিন করতে।

            নিগৃহীত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা নিয়েও যে প্রশ্নটি উত্থাপন করতে চাই, আপনার কাগজে যারা লিখে চলেছেন, যাদের নিরন্তর লেখার যোগান পেয়ে সম্পাদক হিসেবে আপনি প্রচার ও প্রসার পেয়েছেন, তাদের লেখালেখির কি কানাকড়ি মূল্য নেই? আপনি কী করে ভাবছেন, নিজের গাঁটের পয়সা খরচা করে কাগজ কলম কিনে,ডাকমাশুল দিয়ে আপনাকে কবি লেখকেরা তাঁদের শ্রম, অস্থিরতা, অনিদ্রাপ্রসূত লেখাটি পাঠাতে বাধ্য? আপনি হয়তো বলবেন, আপনি তাদের কবিখ্যাতি দিচ্ছেন। লেখক হিসেবে পরিচিতি দিচ্ছেন। সঙ্গে সঙ্গে ভুলে যাচ্ছেন, আপনার কাগজে না লিখেও, আজ একজন কবি বা লেখক তাঁর সৃষ্টিশীল অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে পারে অনায়াসে। মণীন্দ্র গুপ্ত যেমন বলেছিলেন, কাব্যগ্রন্থটিতে ভালো করে কীটনাশক মাখিয়ে মহাকালের গহ্বরে ছুঁড়ে দিতে।