“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

বুধবার, ২৫ আগস্ট, ২০২১

বৃক্ষ

॥ পৃথ্বীশ দত্ত ॥

 

     

(C)Image:ছবি

 সেই ছেলে ও মেয়েটি,  কী যেন নাম ? না, তখনও নাম জানা যায়নি । এখন মেয়েটি উধাও । তবু ছেলেটি রুটিন মেনে যায় ।

       ছেলেটি রোজ সেই বৃক্ষের কাছে যায় । তার সাথে কথা বলে । ভাদ্রের তাল পাকা দুপুরে, সূর্যের রৌদ্র শাসনে, তপ্ততা যখন দিগন্তব্যাপী, ছেলেটি তখন অশ্বত্থ ছায়ের শীতলতায় বসে নিঃশব্দে গল্প করে । গল্পের ছলে খেলা করে । বুকের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে নামে বেদনার পাথর । একটু হালকা লাগে । আবারও পাথর গড়িয়ে নামে । বার বার । এ যেন বুক ও দহনের নিরন্তর খেলা !

       সহস্র প্রসারিত হাতে ছায়া মেলে রাখে অশ্বত্থ গাছ । গাছ নয়, সে বৃক্ষ । সেও কথা বলে ছেলেটির সাথে । তার চপল পল্লব হেসে হেসে প্রমোদ ছড়ায় । ভালো লাগা দিতে চায় পরম আশ্রিতকে ।

      কোন মানুষ এখানে আসে না । কোনও প্রয়োজন নেই এখানে আসার ।  জঙ্গলাকীর্ণ চারপাশ । তবু এই নির্জনতা ভরে আছে কত স্মৃতি, কত কথার গুঞ্জন, কত স্পর্শের উষ্ণতায় । এখানেই ওরা বসত । গল্প করত, গল্প রচিত করত দুজনে । সেই গল্পের ভাষা বৃক্ষটি জানত। সে শুনতে পেত তাদের কথার গভীরে কত স্বপ্নের ধ্যান ।  আজ ছেলেটি মৌন । তবু কিসের টানে সে  বৃক্ষের পদতলে আসে !  স্মৃতি সততই নির্জনতা বিলাসী ।

      একদিন সেই বৃক্ষের প্রসারিত শেকড়-চরণে ছেলেটি বসত মেয়েটিকে নিয়ে । সে কোনও একদিন ।  তরল স্বপ্নের রঙ নিয়ে নিবিড় লোফালুফি খেলত । গল্পের মৃদুভাষ ছড়িয়ে পড়ত বৃক্ষের শরীর জড়িয়ে । কল্পকালির টানে নানা স্বপ্নের কোলাজ এখানেই রচিত হত । এই অশ্বত্থ জানে প্রেমিকের মায়া মেদুরতা । সে জানে প্রেমের কথামালা কেমন করে কাব্য হয়ে ফুটে ওঠে । সে জানে প্রেম ও প্রতারণার অলৌকিক সম্মোহন । রঙ মুছে গেলে ক্যানভাসের পাতাগুলো বারবনিতার মত আরোপিত রূপ নিয়ে পড়ে থাকে ।

      ছেলেটি এখন একা । এখন সে অবসাদে নিথর । তার স্বপ্নময় মারীচ হরিণী । তবু সে অশ্বত্থের কাছে যায় । অশ্বত্থই তার প্রেমের সাক্ষী । তার কাছে বসে, তারই কোলে শরীর এলিয়ে স্মৃতি-তর্পণে ডুবে যায় । কত কথা কত গল্প, স্বপ্ন ভাঙার আকুল ঢেউ আছড়ে পড়ে মনতটে । এ বড়োই বেদনাসুধা । এই বৃক্ষের বাকলে এখনো খোদাই করা আছে মেয়েটির নাম l যেন সে মেয়েটির ধারক । জড়িয়ে রাখে বাকলাঙ্গের নীরব মমতায় । গাছেরও প্রাণ আছে । গাছেরও প্রেম আছে । সে ছেলেটিকে নিঃশব্দে ডাকে-- ওরে আয়, আয় আয় !

       হঠাৎ একদিন এই নির্জন বৃক্ষের চারপাশ ঘিরে মানুষের ভিড় । পুলিস এলো । এলো এম্বুলেন্স । ছেলেটি সত্যিই গাছ হয়ে গেল । গাছেই বিলীন হল অদৃশ্য আকুতি । কারণ, গাছেরও প্রেম আছে ।

       কিন্তু তার শরীরটা চলে গেল লাশকাটা ঘরে । মেয়েটি তখন হ্যানিমুনে মত্ত নৈনিতালে । বরফ ও উষ্ণতা নিয়ে মাখামাখি খেলছে তার নিজস্ব পৃথিবীতে, আপন মানুষের সাথে ।

     জানা গেল সেই ছেলেটির নাম আবেগ । মেয়েটি মায়া ।

                                             ***

 

 

1 টি মন্তব্য:

নামহীন বলেছেন...

অসাধারণ লেখাটা l