.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

বৃহস্পতিবার, ১৮ মে, ২০১৭

কামতাপুরি ভাষা ও অতঃপর

।। অশোকানন্দ রায়বর্ধন।।
(C)Image:ছবি
কামতাপুরি ভাষার আলাদা আইডেন্টিটির বিষয়টা আলোচনায় আনতে হলে প্রথমে এই ডায়ালেক্ট প্রভাবিত অঞ্চল সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ আলোকপাত প্রয়োজন ৷বাংলাভাষার অঞ্চলকে ভাষাবিজ্ঞানীরা প্রধান পাঁচটি উপভাষিক অঞ্চল হিসেবে ভাগ করেছেন ৷ রাঢ়ী, বঙ্গালী, বারেন্দ্রী, কামরূপী ও ঝাড়খন্ডী ৷ এই অঞ্চলভেদ অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের উত্তরপূর্বের ভাষিক অঞ্চল হল কামরূপী ৷ শুধু এইটুকুকে কামরূপী উপভাষার অঞ্চল বলে চিহ্নিত করলেও ভুল হবে ৷যেহেতু এই অঞ্চলটি পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে রয়েছে ফলে এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পশ্চিম আসাম, বিহার, নেপালের দক্ষিণ সীমান্ত ও বাংলাদেশের উত্তরাংশের রঙপুর ৷ ফলে এই অঞ্চলে বসবাসকারী লোকজনের ব্যবহৃত উপভাষাই কামরূপী প্রভাবিত ৷ আর এই বৃহত্তর ভূখণ্ডের ভাষাকেই কামতাপুরী নামে অভিহিত করা হচ্ছে ৷ সীমান্তবর্তী অঞ্চলের ভাষা হওয়ার ফলে এই ভাষার উপর প্রতিবেশী ভাষিক প্রভাব বা মিশ্রণ রয়েছে ৷ সাধারণ্যে এই অঞ্চলের ভাষা বাহে, রাজবংশী, গোয়ালপুরীয়া, রংপুরী, উত্তরবঙ্গীয় ইত্যাদি নামে পরিচিত ৷ আসামের গোয়ালপুরিয়া লোকগীতি ( সূত্র:  প্রতিমা পাণ্ডের গাওয়া মাহুতবন্ধুর গান)  , উত্তরবঙ্গের বিখ্যাত ভাওয়াইয়া গান ( ও কি, ও বন্ধু কাজল ভোমরা রে / ও কি গাড়িয়াল ভাই  ) বাংলাদেশের বিখ্যাত নাটক নুরুলদীনের সারাজীবন ( জাগো বাহে কোন্ঠে সবায়)  এই ভাষারূপের নিদর্শন ৷  মূলত ইন্দো- আর্য ভাষাবর্গের অন্তর্ভুক্ত বাংলা, অসমিয়া,নেপালি ইত্যাদি ভাষাসৃষ্ট এবং প্রভাবিত এই ভাষা ৷ ফলে কামতাপুরী ভাষার মধ্যে তিনটি ভাষারই লক্ষ্মণ রয়েছে ৷ ফলে এদের যে কেউ এই ভাষাকে তাদের উপভাষা হিসেবে দাবি করতে পারে ৷ কিন্তু ভাষাবিজ্ঞানীরা বাংলা উপভাষা হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন একে ৷ এখন কথা হলবাংলার উপভাষা হয়েও যদি কামতাপুরী স্বতন্ত্র ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পায় তা হলে মূল বাংলাভাষা থেকে অনেকটা দূরে থাকা চট্টগ্রামের বাংলাভাষাও আলাদা ভাষার মর্যাদা দাবি করতেই পারে ৷ সিলেটের ভাষাও তদ্রূপ নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে এবং নিজস্ব লিপির সৌজন্যে স্বতন্ত্র ভাষার মর্যাদা দাবি করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না ৷  পাশাপাশি ভাষাকে কেন্দ্র করে আলাদা ভূখণ্ডের দাবি যদি জোরালো হয়ে ওঠে তাহলে  পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম এই দুটি প্রদেশ আবার খণ্ডিত হওয়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যাবে না ৷পক্ষান্তরে একথাও বলা যায়, ক্রমাগত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষাগুলি প্রতিনিয়ত যেভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে সেক্ষেত্রে কোন ক্ষুদ্র ভাষা যদি স্বীকৃতিপ্রাপ্তির মাধ্যমে যথাযথ লালন ও চর্চার পরিসর পায় তাহলে লাভই হয় ৷ অন্যথায় ঢাকিসহ মনসা বিসর্জনের মতো নব্যস্বীকৃত ভাষাসহ সমৃদ্ধ মূল ভাষাটিও ভাষাসন্ত্রাসে হারিয়ে যাওয়া বিচিত্র নয় ৷
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন