.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

মঙ্গলবার, ২৩ মে, ২০১৭

প্রীতম ভট্টাচার্যের গুচ্ছ কবিতা


 ।। প্রীতম ভট্টাচার্য ।।

ব্লগপোষ্ট +Rajesh Chandra Debnath 

(C)Image:ছবি






















এক

বৃষ্টির মধ্যে যখন সমুদ্র কে দেখেছি ,
ঢেউ ছাড়া সব কিছু গোপন ছিল তার ।
দ্বিধাহীন এক সত্যের সামনে ছিল
বহু সম্পর্ক এর অসমাপ্ত গল্প।
কক্ষ পথ হারিয়ে -
অচেনা গন্তব্য এর দিকে
স্থির হয়ে বসে থাকে আকাশগঙ্গা ।
পেন্সিল এ আঁকা নদী পাহাড়ের
স্কেচ থাকতেই পারে-
তবে বেঁচে থাকার জন্য
একবার হলেও নাটুকে বিদায় দরকার।

দুই

পাতা থেকে রঙ চুরি করে
ঈশ্বর নিজেকে আঁকতে ছেয়েছিলেন ।
আরও যা যা রঙ বাকি ছিল
তার যোগান দেওয়ার কথা ছিল
মাটি,আকাশ আর সূর্যের ।
জলের যোগান দেওয়ার কথা ছিল আমার,
কিন্তু আমার যে বুক ফাটে,
মুখ ফাটে না ।
চোখে জল আসে না
দুঃখে কান্না ও পায় না।
তখন ঈশ্বর এক
অপরূপ উপায়ের সাহায্য নিলে...
ঈশ্বর এখন মেশিন কিনেছেন ,
রোজ রোজ তাকে আর
রঙ তুলি নিয়ে আঁকতে হয় না।
অবসর সময়ে তিনি আরও
নতুন উপায়ের খোজ করেন।

তিন

আমি যতই রঙ ভরাতে গেছি
তোমার দুপুর রাতের জীবনে ,
তুমি গিরগিটীর মত বদলেছ রঙ।
নানা রঙ এর গোলাপ হয় জানতাম
তারা রঙ বদলায় জানতাম না।
একদিন আমার ও ছিল
রামধনু রঙ সাতরঙে আঁকা
এখন বৃষ্টি নেই, রঙ ও নেই ,
রঙিন আমি অনেকটাই সাদাকালো।
তাই আজ সমুদ্রেও শূন্যতা
বেড়ে যায় নোনতা ঘাম।
ক্রমশ বৃত্ত থেকে বিন্দুতে
স্থির হয় আগুন ।
আগুনের রঙ ও বদলায়
নীল থেকে হয় লাল।
আবার লাল থেকে ......
এ গল্প শেষ হবার নয়।।

চার

ঘুমহীন রাত প্রতিদিনই
আমার সব রঙ কেড়ে নেয়।
সাদা-কালো এর মত
আমি পুরাতন হয়ে যাই রোজ,
যোগ বিয়োগ এর সূত্র ছাড়াই
অজ্ঞাতে পরীক্ষা নেয় ভালোবাসা।
সেখানে আমি বরাবরই ফেল করি
অতিথি ছাত্রের মত।
এত বছর পর ও
আমাকে দেখলেই
বিবর্ণ হয়ে যায় তোমার মুখ
হারিয়ে যায় ত্বক এর লাবণ্য ,
অথচ কথা ছিল ,
রোজ রাতে আমরা
রূপকথা এর দেশে বেড়াবো
মহাকাশে বাঁধবো ঘর।

পাঁচ

নক্ষত্র পুড়লে ছাই থাকেনা
যেমন পুড়েছে আমার মন।
আজ নক্ষত্র ও নেই,তাই
চিরকাল গোপন থেকে গেলো
সবুজ গ্রহের দিন রাত্র।
গোপন অভিধান খুঁজে ও
শেখা হয় নি বাক্যের গঠন।
স্বপ্ন নিয়ে হয়ত
হাটা যায় না সরল রেখায়,
এভাবে প্রতিদিনই বাড়ে ঋণ।
মাইলের পর মাইল জুড়ে ক্যানভাস
আমি ধীরে ধীরে হয়ে যাই গল্পহীন,
সেই কবে থেকে তোমার
অপেক্ষায় বসে আছি
তুমি আসবে না জেনেও।
বিশ্বাসের নীল মেঘে চোখ লুকিয়ে
আমি চাই আবার
অভিনয় শুরু হোক।
এবার আমি থাকব
বিশ্বাসঘাতক এর ভূমিকায়।

ছয়

দুপুরের আকাশ মেঘলা হলে
মেয়েরা নোনতা হয়ে যায়,
ছায়ার মিছিলে শান্তি খোঁজে
ব্যস্ত মানব শিশু।
বর্ষার জলেরা
পাশাপাশি গা ধোয় ,
জোয়ার ভাসিয়ে নেয়
আদিম বিষণ্ণতা।
উচ্চাকাঙ্ক্ষা হারিয়ে
বিদায় হয় মসৃণ সময়।
সংসারে আমি নিরীহ বলে
দর্শনের অভিমান নেই ।
সব বৃষ্টি আজকেই হোক
আগামী ভোরের হোক
স্নিগ্ধ আকাশ।

সাত

স্বপ্ন না থাকলে
কঙ্কাল হয়ে পরে থাকে রাত্রি ।
ধোঁয়ার কালিতে
গল্প রচনা করে
আততায়ী প্রেম।
আগুনের কামনায়
একটানা দেকে যায়
নিশাচর সেই পাখিটা ।
মাটির ইতিহাসে লেখা থাকে না
শাড়ির আঁচলের রঙ, তাই
খেলার মাঠে হারিয়ে যায়
জন্মান্তর রহস্য ।
প্রতিদিনই সবাই
যাদুগর হতে চায়,কারণ
যাদু জানলে,
মানুষ কে বোকা বানানো সহজ।

আট

আমার ভেতর নিভৃতে বেড়ে ওঠে
অদৃশ্য সব নির্মাণ ,
সে নির্মাণেই লুকিয়ে যায়
আমার শৈশবের রোমন্থন।
স্কুল ইউনিফর্ম সাদা নীল,
চোখের মাধবী ঈশারা,
পায়ে মোজা, পিঠে ব্যাগ,
বুক চেপে রাখা ব্যাগের ফিতা।
জীবন আজ টেরাকোটা
রঙের সাথে বিরোধ,
ফুরিয়ে যাওয়া বছরের গায়ে
টাটকা নুনের ছিটা ।
পলেস্তারার এর মত খসে পড়ে দোষারোপ
চারদিকে অন্ধকার নিয়ে বেঁচে থাকা ,
শুনলাম অপরাধীদের নাকি তাদের
অপরাধ জানাতে নেই?শুধু শাস্তি।

নয়

মন যে ছিল পাখির খোঁজে
স্বপ্ন ছিল নীল,
নীল আকাশের সীমা পেড়িয়ে
আলোর ঝিলমিল ।
তার মাঝেই বোকা মন
গল্প ফাঁদে প্রেমের,
আঁকাআঁকির রঙিন খাতা
মোম পেন্সিলের দামের।
গল্প শেষ আঁকা ও শেষ
মরছে পাত্রপাত্রী,
মহাকাশের শূন্যতায় সব
আলোর পথযাত্রী

দশ

মেয়েদের শরীরেই সব আগুন
প্রমিথিউসের তা জানা ছিল না।
আগুনের ব্যাবহার না জানলে
তাতে পুড়ে মরতে হয় ।
আগুনে পুড়ে মাটি
আগুনে পুড়ে বিশ্বাস।
অবিশ্বাস্য হলেও
একটা চতুর্ভুজ এঁকে
পুড়ে মরব আগুনে।
প্রতিনিয়ত চলতে থাকবে
বাতাসে পরিণত হবার প্রক্রিয়া।
আগুনের খোঁজ তবু শেষ হবে না
অসুখী ব্যক্তিরা তো পৃথিবীতেই থাকে

এগারো

ভাঙ্গা গড়ার খেলায়
নিজেকে স্বাধীন মনে হয় না,
নাটকের যবনিকার পর ও
বেঁচে থাকে চরিত্র।
এভাবেই গল্প বলার শুরু হয়-
আর পালা বদল হয় নাটকের।
তারই মাঝে-
কেউ ইতিহাস পড়ে, আর
কেউ বা তৈরি করে ইতিহাস।
কেউ শোনে গল্প
আর কেউ বলে যায়।
নাটক রচনা করার অধিকার
কেউ কাউকে দেয়নি।
নিজের নাটক লিখতে গিয়ে
বিধাতা অনেক দিন কে
রাত করেছেন।
তাকে সব কিছুই মানায়

বারো

বৃষ্টি হলে গাছের পাতাগুলো
যেমন সবুজ হয়ে উঠে।
প্রেমটাও এমনই
বৃষ্টি চাই, পাতা ও চাই।
লতা কিশোরের গানের তালে
বৃষ্টি সন্ধ্যায় গুন গুনিয়ে গেয়ে উঠা।
প্রেমটাও এমনই
গান ও চাই, সুর ও চাই
লুচি আলুর দম বা
গরম রুটি , কষা চিকেন।
প্রেমটাও এমনই
শর্করা প্রোটিন দুটিই চাই।
প্রেমিকার স্বামীকে সস্ত্রীক
বাড়িতে নিমন্ত্রণ করার
সৎসাহসই প্রেম ।
প্রেম নাকি সফল হয় ভাঙলে পরে।

তেরো

নিখোঁজ হয়ে গেছে কেউ
আমি জানি -
এ নাটকের কোন
তদন্ত হবে না।
প্রাণাধিক ভাল বাসলেও
কেউ কথা রাখে না।
পলাশ গাছটা কখনো ভাবে নি
পাশের ফণীমনসা গাছটা
তার শত্রু হয়ে উঠবে,
আঙ্গুল কেটে ধীরে ধীরে
ঝরে পড়বে জলবিন্দু।
এত কিছুর পর ও
চোখ বুঝলে স্বপ্ন আসে-
রূপকথার শালিকের মাথায়
পোড়া মাটির মুকুট,
মাটি পুড়ে তৈরি হয় দীর্ঘশ্বাস।

চৌদ্দ

ফুল পরীর কথা মনে পড়লে
চোখ দুটো খুব চঞ্চল হয়ে উঠে।
প্রেমের কাছে যারা মাথা নত করে
আমি সেই দলের।
মেঘ তার গন্তব্য জানে না,
তবু মুঠ করে রাখি
আমার এক পশলা আকাশ।
রোজ ভোঁরে যাদুকাঠি
মাথায় ছুঁইয়ে ঘুম ভাঙ্গিয়ে ,
সে হারিয়ে যায় মেঘের ফাকে।
একা একা জ্বলে যায়
আমার পতঙ্গপ্রাণ।
ধীরে ধীরে বাষ্প প্রায় হয়
আমার জলীয় বাস্তব।
এভাবেই তার বেগুনি ইশারায়
কত কি বলা না বলা কথা
কবিতার মত হয়ে যায়

পনেরো

আমি স্বর্গ ছুঁতে চাই
হে পাখি-
নদীর দিকে আমায়
আর ডেকো না।
নতুন একটা জীবনের খোঁজে
আমি রোজ এভাবে
মরতে চাই।
হে পাখি
আমায় কি তুমি-
বাসা বানাতে শেখাবে না?
ভিটেহীন জীবন
আর কত দিন?




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন