“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৮

এক মুঠো ভাত

।। শরীফ আহমদ  ।।


১.

খালেক মিয়া এবার বর্ষা শুরু হতেই দুটো বলদ কিনে ফেললেন।‌ ছেলে বড় হয়েছে তাই এখন আর চিন্তা নেই। এবার সাত বিঘা জমি বন্ধক নিয়েছেন। নিজের জমি বলতে এক চিলতে বাড়ির মাটি আর ছোট্ট একটি পুকুর ছাড়া মা-বাপ কিছুই রেখে যাননি। তাই অন্যের জায়গা বন্ধক নিয়ে চাষ করেই পেট পালতে হয়। প্রকৃতি উদার থাকলে চাষ ভালো হয় আর মোটামুটি বছর চলে যায়। কিন্তু ধান কম ধরলে মজুরি করে কোনোমতে দিন গুজরান করতে করতেই বছর শেষ হয়। শুরু হয় পরের বছরের জন্য পরিকল্পনা আর স্বপ্ন দেখা। সেই বাইশ বছর বয়স থেকে খালেক মিয়া চাষবাসের উপর ভর করেই ব‌উ আর এক ছেলের ভরণপোষণ করে যাচ্ছেন। ছেলেটা বড়ো হয়ে আসছে। দু'বছর পর মেট্রিক দেবে। কিন্তু খালেক মিয়ার ইচ্ছে ওকে চাষবাসের কাজে ঢুকিয়ে দিতে। পড়াশোনা করে কি আর হবে। এর থেকে সময় থাকতে শিখে নিক। অন্তত ভিক্ষা করতে হবে না। এবার আর হালিচারা করা গেল না। তাই কিনে এনে রোপণ করা ছাড়া উপায় নেই। পাশের বাড়ির আকরাম আলীর সঙ্গে চারার ব্যাপারে কথা হয়ে গেছে। এবার বন্যা নাহলেই হয়। খালেক মিয়া মিষ্টি কুমড়োর তরকারি আর পাঞ্জাব চালের ভাত খেয়ে সাদেকের মার পাশে শুয়ে পড়ে কিন্তু ঘুম আসে না। মাথায় নানা চিন্তা। এবার ক্ষেত ভালো না হলে উপায় নেই। যেভাবেই হোক মহাজনের এবছরের সাত হাজার টাকা ধার মারতে হবে। চিন্তায় ঘুম নেই খালেক মিয়ার। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে।



২.

        মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে সুবীর। চাকরি বাকরি হলো না। সরকারি চাকরি পাওয়ার লোভে এক দালালের খপ্পরে পড়ে আশি হাজার টাকা গচ্চা গেছে। এবার ভেবেই ফেলেছে কিছু একটা ব্যবসা করবে। মাসতুতো ভাই সরকারি চাকরি করে। ওর কাছ থেকে এক লাখ টাকা ধার নিয়ে ব্যবসা শুরু করার প্লান। এক দিল্লির ব্যবসায়ীর সঙ্গে সেদিন গুয়াহাটিতে দেখা হয়ে গেল। শর্মাজীর চালের ব্যবসা। ভদ্রলোক এসেছিলেন নর্থ‌ ইস্ট দেখতে। ব্যবসায়ী লোক তাই চোখ কান সবসময় খোলা। জানতে পারলেন এখানকার চাল কোনো অংশেই উত্তর ভারতের চাল থেকে গুণগত মানের দিক থেকে কম নয়। উনি‌ই বুদ্ধি দিলেন সুবীরকে। আইএসবিটিতে টিকিট কাটার সময় এক‌ই লাইনে দাঁড়ানোর সুবাদে দুজনের কথাবার্তা। এরপর দুজনেই বাসের অপেক্ষা করছিলেন। সুবীর আসবে করিমগঞ্জ আর শর্মাজী যাচ্ছেন অরুণাচল প্রদেশের পাহাড় দেখতে। এক ঘণ্টার মধ্যে অনেক আলোচনা হলো। শর্মাজী সুবীরকে আসাম থেকে চাল পাঠানোর আইডিয়া দিলেন। মোবাইল নম্বর অদল বদল হয়ে গেল। ঠিক হলো এখানকার চাল সুবীর সোর্সিং করে দিল্লিতে পাঠিয়ে দেবে। যদি আসাম থেকে শর্মাজীর দিল্লির গুদামে চাল পাঠানো যায় তবে পরীক্ষামূলকভাবে সেই চাল মিডিল ইস্টে এক্সপোর্ট করা যেতে পারে। শর্মাজীর কাছে এসব জল ভাত। তিরিশ বছর এই লাইনে কাটিয়ে দিলেন। সুবীরের‌ও কপাল ভালো। এই লাইনে আসতে পারলে অন্তত দুবেলা দুমুঠোর জোগান হয়ে যাবে। আর কারুর কাছে হাত পাততে হবে না।



৩.

         আসাম থেকে আসা চালের দাম কম রাখতে হবে। একবার বাজারে চলা শুরু হয়ে গেলে মুনাফার কথা ভাবা যাবে। শর্মাজী নতুন প্রিন্ট করে আনা চালের প্যাকেট দেখে ম্যানেজারকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিলেন। এই চাল সৌদি আরব যাবে। মোটামুটি হরিয়ানা পাঞ্জাবের চালের মত‌ই। রিপিট অর্ডার এলেই কাজ হয়ে গেল। কিন্তু প্রথমবার রিস্ক নেয়া যাবে না তাই দাম কম রাখতে হবে। ম্যানেজারকে নিয়ে আসাম থেকে আসা চাল বারবার দেখলেন শর্মাজী। সুবীর বেছে বেছে ভালো কোয়ালিটির মাল পাঠিয়েছে। ঠিক হলো পাঁচ কেজির এক হাজার প্যাকেট যাবে আপাতত। ম্যানেজারকে বলে দিলেন লুলু কোম্পানিকে নতুন চালের ব্যাপারে অগ্রিম ইমেইল পাঠিয়ে দিতে।




        ব্যাঙ্গালুরুর সতীশ অবশেষে চাকরি পেল। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, লাখের উপর খরচা করে দুরুদুরু বুকে সৌদি আরবের মাটিতে পা দেয় সতীশ সেই তিন মাস আগে। সৌদির বাণিজ্যিক শহর  আল খোবারে সতীশের এক দূরসম্পর্কের মামা আগে থেকেই থাকতেন। দেশে কিচ্ছু হচ্ছে না তাই ভাগ্নেকে সৌদি আরবে আসার পরামর্শ দিলেন। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে অনেক খোঁজাখুঁজি হয়েছে কিন্তু যুতসই চাকরি নেই দেশে। বেশিরভাগ কোম্পানি ফ্রেশারকে নিতে চায়না। অভিজ্ঞতা থাকলে হয়তো কিছু একটা হতো কিন্তু কলেজ থেকে বেরোনো অনভিজ্ঞ সতীশকে কে চাকরি দেবে। শেষে মায়ের ফিক্স ডিপোজিট ভেঙ্গে সৌদি আরবে আসে সতীশ। অনেক জায়গায় এপ্লাই করে বারবার ইন্টারভিউ দিয়ে অবশেষে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। সতীশ সিলেক্ট হয়ে গেল গ্যাস কোম্পানির ট্রেইনি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। সতীশ মামার সঙ্গেই থাকে। এতদিন মামার খরচেই খাওয়া দাওয়া চলছে। এবার ওকেও সাহায্য করতে হবে। মামা একা থাকেন খোবারে। একটি কোম্পানিতে ইলেক্ট্রিশিয়ানের চাকরি। আগে মামীও সাথে থাকতেন। দু'বছর থেকে ছেলে বড় হওয়ায় মামী দেশে চলে গেছেন। এক কোঠা আর এক চিলতে রান্নাঘরের ভাড়া ১৮০০ রিয়াল। এখন সতীশ‌ও মামাকে ঘর ভাড়ার অংশ দেবে বলে ঠিক করল। 



৫.

          শুক্রবারের দিন সাপ্তাহিক ছুটি। সতীশ বাজার করতে গেল। লুলু মার্টে সবকিছুই পাওয়া যায়। মাছ, কুমড়ো আর ভেজিটেবল তেল এক বোতল নিয়ে চাল কিনতে গেল। রেকে লাইন ধরিয়ে রাখা রকমারি চাল। শর্মা ব্র্যান্ডের ইন্ডিয়ান লং গ্রেইন রাইস পাঁচ কিলোর প্যাকেট চোখে পড়ল। প্যাকেটে লেখা সোর্সড ফ্রম নর্থ ইস্ট ইণ্ডিয়া। ২২.৫০ রিয়াল। কিনে নিল এক প্যাকেট। রুমে ফিরে দেখল মামা এখনও আসেননি। মোবাইল হাতে নিতেই ওপাশ থেকে মামার কল। এক পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা করতে গেছেন। একটু পরে আসবেন। সতীশকে বললেন কুকার প্রেশারে ভাত চড়িয়ে দিতে। সতীশ ভুল করে একটু বেশিই চাল ঢেলে দিল কুকারে। এখন আর কিচ্ছু করা যাবে না। মামা ভাগ্নের খাওয়া হয়ে গেলে বেঁচে যাওয়া ভাত ফেলে দেয়া যাবে। ভাতের সাথে ডাল আর মাছ ভাজা করতে ব্যস্ত হয়ে গেল সতীশ। বাইরে যা গরম আজ।



         বিকেল চারটায় সতীশের মামা ফিরলেন। দুজনে খেতে বসলেন। খাওয়ার পর দেখা গেল এক মুঠো ভাত বেঁচে গেছে। সতীশ ফেলে দিতে চাইল কিন্তু  মামা মানা করলেন। বললেন, "সতীশ তুমি যদি জানতে এই চাল কোথা থেকে এসেছে, এর পেছনে কার কার অক্লান্ত পরিশ্রম আছে তাহলে আজ এই ভাত ফেলে দিতে চাইতে না। এক এক চালের পেছনে কতটা গল্প আছে আর কত শ্রম দেয়া হয়েছে তা ভাবা যায় না। আর যাই কর, কোনোদিনই ভাত বা যে কোন খাবার ফেলবে না। একমুঠো ভাতের পেছনে যে পদ্ধতিগত শ্রম আছে তা অস্বীকার করা আমার মতে অনেক বড় পাপ। যখন‌ই আমি ভাত খাই তখনই মনে হয় ঈশ্বর আছেন আর সবকিছু ওনার পরিকল্পনা অনুযায়ী চলছে।" সতীশ কোনোমতে হাসি দমিয়ে রেখে বেঁচে থাকা ভাত ফ্রিজে রেখে দিল। মামার কথায় যুক্তি থাকুক বা না থাকুক এই চালের ভাত খারাপ নয়। এখন থেকে এই চাল‌ই কিনে আনতে হবে। শর্মা ব্র্যান্ডের ইন্ডিয়ান লং গ্রেইন রাইস - সোর্সড ফ্রম নর্থ ইস্ট ইণ্ডিয়া।



(সমাপ্ত)

কোন মন্তব্য নেই: