“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

যে ক'টা দিন পৃথিবীতে ৷৷ তৃতীয় পর্ব

।। ৩।। 

   

(C)Image:ছবি

     ‘ভাই, ও ভাই, ভাই .... ভাই ঘরে কি...’ কে যেন থেমে থেমে আস্তে করে ডাকছে কাউকে। ঘুম ভেঙে গেলো ডাকার এই অদ্ভুত আর বিরক্তিকর ধরণ টা দেখে। বুঝলাম আমাদের ঘরের ই বাইরে দাড়িয়ে কেউ। ভাবছি মানুষটা বাইরের বেল টিপলেই তো পারে, তাছাড়া কেউ জবাব-ই বা কেনো দিচ্ছে না! অগত্যা বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম চোখ কচলাতে কচলাতে! না কেউ নেই বাইরে। কিন্তু মন বলল না কেউ আছে নিশ্চয়ই। ‘কে ওখানে’ বলতেই দেখলাম ঘরের একদম বাম পাশের দেয়াল ঘেঁষে শফি দাঁড়িয়ে আছে। আমার দেখা পেয়ে বলল, ‘ভাই একটু কাজ আছে...!’’কী কাজ’বলতেই দেখলাম একটু ইতস্তত করছে, বুঝলাম বাইরে বেরুতে হবে। 

      ‘ভাই, একটু সাহায্য যদি করতেন, আমি আপনাদের...’কথাটা পুরো শুনার আগেই কেমন যেন বিরক্তি বোধ করলাম। সাহায্যতে এভাবে কদিন চলবে, কাজটাজ করো কিছু।’ এক কদম কাছে এলো যেন, বলল, ‘ভাই আসলে এমন অবস্থা কাল থেকে প্রায় উপোস অবস্থা, বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে বড় অসহায়!’ উপোস শুনেই মনে যেন একটা তীব্র বেদনা অনুভব হলো। সে বলে চলল...

     ‘লকডাউনে কাজ টাজ একদম নেই। তাছাড়া যা রাজ মিস্তিরির কাজ জানি সেটাতে ও যেতে পারি না, এই দেখেন’ বলেই হাত এবং পায়ের পাতা দেখাতে লাগলো। একজেমার মতন কালো কালো ছোপ সারা হাত আর পায়ে। আমি কিছু না বলে ঘরে ঢুকতেই দেখি নাদিয়া জানলার পাশে দাঁড়িয়ে! আমি ওয়ালেটের খোঁজে যখন এদিক ওদিক দেখছি, তখন নাদিয়া একটা দুশ টাকার চকচকে নোট আমার হাত ধরিয়ে বলল, ‘এটাতে চলবে?’ আমি একটা ভাল্লাগা হাসি দিয়ে টাকাটা শফির হাতে দিয়ে কিছুক্ষণ পথ চেয়ে রইলাম। 

      বেলা দশটা। সকালের নাস্তা প্রায় দেড় ঘণ্টার মত লেট। আসলে ফজর শেষের সেই পাজল সলভ করে কীভাবে যে ঘুমিয়ে পড়ি টের ই পাই নি। আমাকে জাগানো হয় নি, ইচ্ছে করেই। আগামীকাল ওলিমা, অনেক প্রিপারেশন, তা-ই বুঝি রেস্ট করতে দেয়া হয়েছে যাতে ফুরফুরে হতে পারি। আমাকে না জাগানো এবং তাঁর কারণ সব শুনে কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি টের পেলাম সমস্ত শরীর, মনে। নাদিয়ার দিকে অপলক চেয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ আর ভাবলাম এ কোত্থেকে এসে টপকাল আমার কপালে! আমার এমন চাহনিতে সে ও কিছুটা অস্বস্তি বোধ করলো যেন! 

        নাস্তার টেবিলে আমি, আমার এক খালা আর সুনামগঞ্জ থেকে আসা আমার বড় খালার ছেলে রৌনক। বুঝলাম আমরা সবাই ঘুমকাতুরের দল। বাকীদের নাস্তা হয়ে গেছে অনেকক্ষণ! খালা আমায় দেখেই বললেন, ‘কী রে কেমন লাগলো আমাদের বউ?’ রৌনক মোবাইল ছেড়ে আমার দিকে হা করে তাকিয়ে যেন অধীর আগ্রহে আমার উত্তর শুনবে। আমি রৌনকের দিকে চোখ তুলে তাকাতেই সে আবার মোবাইল ধরল। এরই মাঝে টেবিলে নাস্তা হাজির। সাদা চীনামাটির বাদিয়া দেখেই একটা অন্যরকম ভাব এলো। মনে পড়ে গেলো ছোটবেলায়  বিটিভিতে দেখা নাটকগুলোর কথা। তাঁদের সব শহুরে নাটকেই এমন চীনামাটির বাসন থাকতো খাবার টেবিলে। আমাদের ঘরে ও এমন আছে বেশ কয়েকটি। বিভিন্ন সাইজের। উৎসবে, দাওয়াতে এগুলোর ব্যাবহার হতো, তা না হলে খুব একটা ব্যবহার হতো না। মিটসেফের নিচের তাকেই পড়ে থাকতো সেগুলো। 

       নাদিয়া বাদিয়া থেকে আখনি পোলাও বেড়ে দিচ্ছে সবার প্লেটে এক এক করে। মানুষ তিনজন অথচ প্লেট দেখলাম চারটা এবং সেই চার নম্বর প্লেটটাতে ও দেখলাম একটু বেড়ে দেয়া হলো। এটা কার?’ বলতেই খালা বললেন, ‘আমাদের বউমা কি না খেয়ে থাকবে রে?’ প্রথম প্রশ্নের মত খালার দ্বিতীয় প্রশ্নটা ও এড়িয়ে গেলাম সযতনে! নাদিয়া একটু হাসলো যদিও, কিন্তু আমি একটা মিশ্র ভাবনার ককটেল বানিয়ে বিসমিল্লাহ বলে শুরু করলাম। সে কি আমার অপেক্ষায় ছিলো সারা সকাল আর খিদে লাগেনি তাঁর, ভাল্লাগা আর খারাপ লাগার এই মিশ্র অনুভূতিটা ভালোকরে অনুভব করতে করতে না করতেই শফির বাচ্চাকাচ্চাদের মুখ ভেসে উঠলো চোখের সামনে। 

 

ক্রমশ: 

 

#যেকটাদিনপৃথিবীতে

 

কোন মন্তব্য নেই: