“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

শনিবার, ৩ জুলাই, ২০২১

সিঙ্গেল চ্যালেঞ্জ

                                                       


 শৈলেন দাস

 

    অনেকদিন হয়ে গেল ফেসবুকে আসা হয়নি। কিছুটা কাজের চাপ এবং কিছুটা অনীহা। তবুও আজ হঠাৎই কেন যেন মনে হল একবার ঘুরে আসি নিজের টাইমলাইনটা। অনেকটা অন্যমনস্কের মত নিউজ ফেড স্ক্রল করছি। দু একজন বন্ধুর ফটো ভালভাবে না দেখেই লাইক মেরেছি, দায়সারাভাবে কমেন্টও করেছি কয়েকটি পোস্টে। এর আগে চেক করে নিলাম নিজের টাইমলাইনের নোটিফিকেশনগুলি। না, তেমন বিশেষ কিছুই নজরে পড়েনি সেখানে। তাই আবারও নিউজ ফেড স্ক্রল করতে শুরু করলাম। তখনই একটি পোস্ট নজরে পড়ল -Rajnandini was tagged in, জনৈক মিতা অনন্যাতার #সিঙ্গেল_চ্যালেঞ্জ ফটোতে ট্যাগ করেছে রাজনন্দিনীকে।

 

    রাজনন্দিনী আমার অফিসের সহকর্মী ছিল। তাছাড়া একই এলাকায় থাকতাম আমরা। সেই সূত্রেই সে আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড। তার কোন পোস্টই কোনদিন আমার নজরে পড়েনি সেভাবে। আমার কোন পোস্টেও সে কোন ধরনের মন্তব্য বা লাইক করেছে বলে মনে পড়ছে না আমার। তবুও পুরনো পরিচয়ের সুবাদে সে আমরা ফেসবুক ফ্রেন্ড মানে  ইন্যাক্টিভ ফ্রেন্ড যাকে বলে আর কি। কিন্তু আজ তাকে ট্যাগ করার সুবাদে যে পোস্টটি আমার নজরে পড়েছে, তা হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে তুলেছে আমার। অস্থির হয়ে উঠেছে মন। গ্লানিবোধ হচ্ছে নিজের থেকেই। একটি বাগান বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে প্রায় চল্লিশ ছুঁই ছুঁই এক যুবতী যেন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

 

    প্রায় পনেরো বছর আগের ঘটনা। অফিসের পক্ষ থেকে আয়োজন করা নিউ ইয়ার সেলিব্রেশনের পার্টিতে পারমিতাকে একান্তে পেয়ে তার বুকের আঘ্রাণ নিয়ে যখন বলেছিলাম এখান থেকেই আমি জীবনী শক্তি পাই। ঠিক তখনই সে এমন কিছু বলল যা হয় দ্বিচারিতা নয় ভালবাসা ফুরিয়ে যাওয়ার মত ব্যাপার মনে হয়েছিল আমার।আমি কিছু জিজ্ঞেস করব,এর আগেই কে যেন এদিকে আসছেবলে সে চলে গেল। একটা সুন্দর মুহূর্ত ঘটনার আকস্মিকতায় এমন বিষণ্ণ হতে দেখে আমি মনে মনে রেগে গিয়েছিলাম পারমিতার উপর। তবুও একটু পরে যখন দেখা হল তখন অনুনয়ের সুরে বলেছিলাম --- তোমাকে ছাড়া আমি জীবন কাটাতে পারবনা। সে সামান্য ম্লান হেসে বলেছিল---পারবে না কেন? জীবনের সুখ তখন অন্যের বুকে খুঁজে নিও। আমার রাগ আরেকটু বেড়ে গেল। তোমাকে তা বলে দিতে হবেনাবলেই মুখ ফিরিয়ে চলে এলাম। একবারও ভাবলাম না পারমিতা কেন বলল এইকথা। তাকিয়ে দেখলাম না ওর চোখেমুখে ফুটে উঠা বেদনার দাগ।

 

    এর কিছুদিন পর এই রাজনন্দিনীই আমাকে জানিয়েছিল পারমিতা চলে যাচ্ছে কলকাতায়। ওর বিয়ের  সম্বন্ধ এসেছে সেখান থেকে।ওর ছোট মামা পাত্র ঠিক করেছে।আমাদের কোম্পানির হেড অফিসও কলকাতায়। বিয়ের পর পারমিতা সেখানেই জয়েন করবে,আর ফিরবে না শিলচরে।আমার কেমন যেন বিরক্তি লেগেছিল সেদিন।তাই নিজের থেকে আর কিছুই জিজ্ঞেস করিনি এবং এর পর পারমিতার সাথে দেখাও করিনি অভিমানে। তারপর জীবন এগিয়েছে তার নিয়ম মেনে। কোম্পানির চাকরি ছেড়ে আমিও যোগ দিয়েছি সরকারী স্কুলে। পরিবারের পছন্দ করা পাত্রীর সাথে বিয়ে করে সংসারও করছি ছুটিয়ে। দুই সন্তানের পিতা হিসাবে আমি এখন অনেক দায়িত্ববান। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসাও অগাধ। ভুলে গিয়েছি যে একদিন পারমিতাকে বলেছিলাম তোমাকে ছাড়া আমি জীবন কাটাতে পারবনা।

 

    পারমিতার ফটোটির দিকে তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ। আমি সেটাতে লাইক বা কমেন্ট করব এরকম কোন অপশন নেই, সম্ভবত প্রাইভেসি অনলি ফ্রেন্ডকরে রাখা এবং আমি ওর ফ্রেন্ড নই। তাই ওর প্রোফাইল ইনফো চেক করলাম অনেকটা ভয় মেশানো কৌতূহলে এবং দেখলাম এবাউট মিতে লিখে রেখেছে যে নিয়েছে বুকের ঘ্রাণ সে-ই বেঁধেছে বাসা বুকের ভিতর; আমার জীবন তার জন্য, তার কাছে হলাম-ই বা আমি পর।আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন শুকিয়ে গেল। শীতে পরিযায়ী পাখিরা জাটিঙ্গাতে এসে আগুন ঝাঁপ দেওয়ার মত কষ্টকর অনুভূতি নিয়ে বেরিয়ে আসলাম পারমিতার প্রোফাইল থেকে।

 

কোন মন্তব্য নেই: