.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

রবিবার, ১৮ জুন, ২০১৭

সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাসদের সেমিনারে বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া

।। অরূপ বৈশ্য।।

                   
সুকৃতিরজ্ঞন বিশ্বাস
       ফোরাম ফর সোশ্যাল হারমনি ও কোরাসের যৌথ উদ্যোগে গত ১১ জুন, ২০১৭ শিলচর মধ্যশহর সাংস্কৃতিক সংস্থার হলে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ইতিহাস, ভাষিক অধিকার ও উনিশের ঐতিহ্য শীর্ষক এক সেমিনার হয়ে যায়। এই সেমিনারে সংগঠক ও শ্রোতা হিসেবে উপস্থিত থেকে মনে কিছু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় আমার এই প্রতিক্রিয়া জনসমক্ষে ব্যক্ত না করাই শ্রেয় বিবেচনা করি। কিন্তু পরবর্তীতে এই সেমিনারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া জনসমক্ষে এসেছে। এই প্রেক্ষিতে আমার নিম্নলিখিত সংক্ষিপ্ত ও পয়েন্ট-টার্গেটেড প্রতিক্রিয়া অন্তত সমাজকর্মীদের সামনে তুলে ধরা উচিত বলে বিবেচনা করি।
                      (১) নির্দিষ্ট বক্তা অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্য বিষয়ের উপর বিস্তৃত আলোকপাত করতে গিয়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট উত্থাপন করেন। এই তিনটি হল সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের বিপদ, ধর্ম ও ধর্মতন্ত্রের পার্থক্য ও ইতিহাসের সংজ্ঞা। প্রথম পয়েন্টে তাঁর বক্তব্য ছিল সরাসরি, মেদহীন ও স্পষ্ট। কিন্তু বাকী দুটি পয়েন্টে তাঁর বক্তব্য মনে হয়েছে অস্পষ্ট ও ভাসাভাসা। প্রতিটি ধর্মেই দুটি ধারা বিদ্যমান থাকতে দেখা যায়। একটি ধারা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবন সংগ্রাম থেকে প্রাণ সঞ্চার করে এবং এই ধারার গণ আবেদন শক্তিশালী হয় আম জনতার সংগ্রামের অন্তর্বস্তুতে, অন্য ধারাটি (transcendental) টিকে থাকে ও শক্তিশালী হয় শাসক শ্রেণি-বর্ণের আধিপত্যের সাথে তাল মিলিয়ে শাসকশ্রেণির আধিপত্য কত গভীর এর উপরই নির্ভর করে ধর্মের কোন ধারাটির আবেদন মানুষের কাছে কত বেশি। ইতিহাসের সংজ্ঞার প্রশ্নে তিনি ইতিহাসবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি কী তা বিচার করার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।এটা যদি ইতিহাস পাঠের মানদণ্ড হয় তাহলে ইতিহাস পাঠই দুরূহ হয়ে উঠে,কারণ তাতে ইতিহাস পাঠ ও তার গুণমান নির্ণয়ের আগেই পাঠককে হোঁচট খেতে হয় লেখকের  দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় জেনে নেওয়ার তাগিদ থেকে।

   
অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্য
সার্ত্রে মন্তব্য করেছিলেন“ History is not order. It is disorder: a rational disorder. At the very moment when it maintains order, i.e. structure, history is already on the way to undoing it.”   পি থম্পসন লিখেছেন “History is not a factory for the manufacture of Grand Theory, like some Concorde of the global air, nor is it an assembly-line for the production of midget theories in series. Nor yet is it some gigantic experimental station in which theory of foreign manufacture can be ‘applied’, ‘tested’, and ‘confirmed’. That is not its business at all. Its business is to recover, to ‘explain’, and to ‘understand’ its object: real history. The theories which the historians adduce are directed to this objective, within the terms of historical logic,…”   
(২) দ্বিতীয় বক্তা সুকৃতিরজ্ঞন বিশ্বাস তপোধীর ভট্টাচার্য বর্ণিত মানবমুখীন ধর্মীয় মতের অনুরূপ মতুয়া ধর্মের কথা উল্লেখ করেছেন, যে ধর্মের জন্ম হয় পূর্ববঙ্গের দলিত নমঃশূদ্রদের আত্মমর্যাদার আন্দোলন, হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের ব্যাপক শিক্ষা আন্দোলন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের গর্ভে। পশ্চিমবঙ্গের উচ্চকোটির নম:শূদ্ররা এই ধর্মকে শাসকের ছত্রছায়ায় ব্রাহ্মণ্য হিন্দুধর্মের কাছাকাছি নিয়ে গেছেন,বামফ্রন্ট তৃণমূল হয়ে এই ধারাটি এখন হিন্দুত্ববাদে উজ্জীবিত হওয়ার চেষ্টা করছে সংঘ পরিবারের হাত ধরে, তথাগত রায় এই উচ্চকোটিরই প্রতিনিধি। তথাগত রায় নিজে ইতিহাসবিদ না হয়েও ক্যামব্রিজ ট্রিনিটি কলেজর ফেলো জয়া চ্যাটার্জিকে যতই তথাকথিত ইতিহাসবিদ হিসেবে উপহাস করুন না কেন, বিদ্বৎ সমাজ জয়া চ্যাটার্জি রচিত ১৯৩২-১৯৪৭ সালের বাংলা বিভাজনের ইতিহাসকে অবশ্য পাঠ্য হিসেবেই ভূষিত করবে, অন্যদিকে তথাগত রায়ের যা ছিল আমাদের দেশবই বৌদ্ধিক মহলে ইতিহাস রচনার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ বলে বিবেচিত না হওয়ারই সম্ভাবনা। যাইহউক,   গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়ের প্রগতিশীল ধারাকে উজ্জীবিত করার মূল আধার হবে পশ্চিমবাংলার পিছিয়ে পড়া মেহনতি অংশ ও নাগরিকত্বহীনতায় জর্জরিত দণ্ডকারণ্য ও আসামের দরিদ্র মেহনতি নমঃশূদ্ররা। এই আন্দোলনের প্রতিনিধি সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাসেরা। তাই তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন আন্দোলনের ইতিহাসের উপর। তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন বাংলার সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ইতিহাসের উপর। ১৯০৫-১৯৪৭ সালে বাংলা বিভাজন ও বাংলা বিভাজন রদ উভয় ক্ষেত্রেই বাঙালি বর্ণহিন্দু ও বাঙালি দলিত-মুসলমানের দুটি অক্ষের সংঘাতের কাহিনি তিনি প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণনা করেছেন।        
 
এই সংঘাত যে অন্তর্বস্তুতে জমিদার শ্রেণি ও প্রজা কৃষক-মজুর শ্রেণির সংঘাত তা তিনি তথ্য সহকারে আলোচনা করেছেন। জাতপাত ও ধর্মীয় ঘৃণা বাংলার ও বাঙালির রাজনীতিতে যে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলো তা রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধি থেকেও তিনি তুলে ধরেন। অখণ্ড বাংলা গড়ে তুলতে শরৎ বসুর মত বর্ণহিন্দু কংগ্রেসি গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের প্রয়াস কংগ্রেসি বর্ণহিন্দুরাই কীভাবে বানচাল করে দিয়েছিলো তাও উল্লেখ করেন তিনি। কংগ্রেসিদের কুটিল চক্রান্তই বাংলা বিভাজনকে নিশ্চিত করে। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের লক্ষ্যে সংঘ পরিবার অখণ্ড বাংলা গঠনের প্রয়াস বানচাল করে দেওয়ার ক্রেডিট দিতে চায় হিন্দু মহাসভা ও শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে। কিন্তু দেশ তথা বাংলা বিভাজনের মাধ্যমে দেশ-জাতির কোমর ভেঙে দেওয়ার ক্রেডিট-ডিসক্রেডিট সবকিছুই প্রাপ্য তৎকালীন কংগ্রেসি বর্ণহিন্দু নেতৃত্বের, রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হিন্দু মহাসভা বা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির মত নেতৃত্বের ও বিপরীত দিক থেকে দুর্বল দলিত সংগঠন বা বাবাসাহেব আম্বেদকর ও যোগেন মণ্ডলদের মত নেতৃত্বের এই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার মত রাজনৈতিক প্রতিপত্তি ছিল না। গোটা আলোচ্য বিষয়ের উপর আলোকপাত করে সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস বাংলা বিভাজনের এই সাম্প্রদায়িক ইতিহাস নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন।কিন্তু এই ইতিহাস বয়ান অসম্পূর্ণ ও একপেশে থেকে যায় যদি আর্থ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনে মুখ্য চালিকা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকা ও বর্ণহিন্দু-দলিত-মুসলিম সম্পর্কে সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব সবিশেষ গুরুত্ব না পায়। বাংলা বিভাজনে যেমন ব্রিটিশ প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে লাভবান বর্ণহিন্দু জমিদার শ্রেণির স্বার্থ জড়িত ছিল, ঠিক তেমনি ব্রিটিশ তাবেদার ব্যবসায়ী বিড়লাদের স্বার্থ জড়িত ছিল দেশ বিভাজনের ক্ষেত্রে। সংঘাতের ক্যানভাসে তিনটি মেরুর যেমন সাম্রাজ্যবাদ,আধিপত্যাধীন বর্ণহিন্দু সমাজ ও প্রান্তিক দলিত-মুসলিম সমাজের আন্তঃক্রিয়া আজ অব্দি চলছে, সেখানে সাম্রাজ্যবাদ রয়েছে মুখ্য ভূমিকায়। ব্রিটিশ আমলে Drain’ and ‘de-industrialisation’ অর্থাৎ ভারতবর্ষের সম্পদ ইংল্যান্ডে পাচার ও দেশীয় শিল্প যেমন বস্ত্র শিল্প ধ্বংস এই ছিল সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির নিয়ম। সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির অধীনে এই নিয়ম খানিকটা নিয়ন্ত্রিত হয় স্বাধীন ভারতে পরিকল্পনা অর্থনীতি ও আমদানি-সামগ্রী উৎপাদনের নীতির মাধ্যমে। এখন বিশ্বায়নের হাত ধরে বিদেশি বহুজাতিক কর্পোরেট পুঁজির রূপে সাম্রাজ্যবাদ আবার আধিপত্যাধীন অবস্থায়। এই পুঁজির নিয়মের পরিণামই হলো আম-জনতার ক্রয় ক্ষমতা কমে যাওয়া, অসাম্য বৃদ্ধি ও বিশাল বেকার শ্রমিকের মজুত ভাণ্ডার তৈরি করা। রাষ্ট্রীয় ও সরকারি নীতি এই প্রক্রিয়াকে মদত দেয়। যে সরকার ও রাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির নিয়মকে সহায়তা করে সেই সরকার ও রাষ্ট্রে বর্ণবাদী আধিপত্য বিদ্যমান। সুতরাং এই আধিপত্যকে ভাঙতে হলে আমাদের চর্চা করতে হয় সাব-অর্লটান শ্রেণির আন্দোলন ও রাজনীতির ইতিহাসের। বিগত কয়েক দশক থেকে ইতিহাসের সাব-অর্লটান স্টাডিজের রণজিৎ গুহদের মত বহু ইতিহাসবিদ কৃষক সংগ্রাম ও সাব-অর্লটান চেতনার ইতিহাস চর্চা করে চলেছেন।
       
কাস্ট-ক্লাস-ট্রাইব-জেন্ডার-রিলিজিয়ন ইত্যাদির আন্তঃসম্পর্কের ইতিহাস সাব-অর্লটান ইতিহাস চর্চাকে সমৃদ্ধ করছে। কিন্তু সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেঞ্জিল সালধানা যেমনি ব্যাখ্যা করেছেন, সাব-অর্লটান চেতনার ইতিহাস অটোনমাস হতে পারে না, একটা সামগ্রিক কাঠামোয় হোলিস্টিক চর্চা জরুরি। সমাজবিজ্ঞান ও দলিত-নিপীড়িত সাব-অর্লটান চেতনার আদান-প্রদানের সংশ্লেষ জরুরি। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক যেমনি প্রশ্ন তুলেছেন Can the subaltern speak?” বা মেজ্জিও লিখেছেন can the subaltern be heard?” সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির নিয়মকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে  শ্রমিকশ্রেণিই বিপরীতক্রিয়ার মূল শক্তি (Countervailing force)                      




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন