.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

রবিবার, ৯ অক্টোবর, ২০১৬

সুরমা গাঙর পানিঃ উজান পর্ব ৪১

(দেশভাগ এবং পরের দশকের কাছাড় সিলেটের প্রেক্ষাপটে রণবীর পুরকায়স্থের এই উপন্যাস ছেপে বের করেছে দিন হলো। ভালো লাগা এই  উপন্যাস পুরোটা টাইপ করে তুলে আমার প্রিয় কথা শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। আশা করছি আপনাদের সবার এটি পড়তে ভালো লাগবে। সম্পূর্ণ উপন্যাসের সংলাপ ভাগটি সিলেটিতে -সে সম্ভবত এই উপন্যাসের সবচাইতে আকর্ষণীয় দিক। উপন্যাসটি ইতিমধ্যে সিলেট এবং শিলচরের দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হয়েছে। সম্প্রতি ২৩ জুন, ২০১৭তে কলিকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র-এর ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে লেখককে বিশেষ সারস্বত সম্মান দিয়ে সম্মানিত করল এই উপন্যাসটির জন্যে। কবি শঙ্খ ঘোষে সম্মানটি তাঁর হাতে তুলে দেন।আপনাদের পড়বার সুবিধে করে দিতে, ঈশানে এই উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে আসছে। আজ তার  উজান  পর্বের  অধ্যায়   একচল্লিশ  ---সুব্রতা 
মজুমদার।)   

একচল্লিশ

 রাকনদীর তৃষ্ণা অপরিসীম । পাহাড় থেকে জল নামে । নামতেই থাকে অবিরত । নামে বাঁশ, মুলি আর ডলু । নামে আনারস । নামে আদা, রপ্তানীযোগ্য সব বাণিজ্য পসরা । চৈত্র বৈশাখের বর্ষা এখানে ফাউ পাওনা । জ্যৈষ্ঠমাসে একটু রোদ, কাঠফাটার মাস । আষাঢ় থেকে গুরু ঝমঝমাঝম । ভরে যায় খাল বিল হাওর । বাঁধের উপর নিরাপদ অবস্থান থেকে নিমজ্জিত বাড়ির টুল্লি দেখে এখনও বৈতলের মনে হয় ত্রাণের কথা । বড়লোকের বাড়িতে ডাকাতি করার বাসনা জাগে । লুলা নেই তো কী হয়েছে, দুখু আছে আপদ আছে বছই আছে আছে আরো অনেক না দেখা সহায়ক । সদিচ্ছার অসহায় মন নিয়ে বৈতল বাড়ি ফেরে । হরিৎবরণ জমিদার বাড়ির পুকুরও জলে টইটুম্বুর । পেছনের রাস্তা দিয়ে কানে হেঁটে যাচ্ছে কৈ মাছের ঝাঁক । কোথায় যাবে কে জানে । বৈতল বাড়ির থেকে ঝাঁকা নিয়ে এসে মাছ ধরে । দুর্গাবতীও সঙ্গ দেয় । বৈতল দুর্গাকে বলে,
--- ছালি আছে নি পাখালো । দেখ কত বড় বড় কৈ । তোর হি বেটার বাড়িত দেখলাম, দেখলাম হিদিন হিঙর বড়ি হুকার ।
--- আমি অউ দিছি ।
--- তুই দিচছ । তুই একলা বাটচছ অত কালাইর ডাইল ।
--- তান আর চান্দুর খুব পছন্দনু ।
--- তান কিতা রে । হে কিতা তর হাই নি । আমার লাগি দিতে পারছ না । পারছ না পাড়তে কূটুস কুটুস আঙ্গুল দিয়া লইয়া আয় যা এক মুইঠ ।
--- পারতাম নায় । বর্ষার বড়ির উপরে হক্কলর নজর কমি গেলে ধরি লাইব ।
--- অ তুই তো আবার সতী । না কইয়া আনতে নায় । ঠিক আছে আমি অউ আনমু ফাটক বাজার থাকি । ডাইল থাকি চাউল থাকব বেশি । তেও, বড়ি দিয়া রান্দবে কইমাছ । একটু তেল বেশি দিও গো মাই ।
--- রান্দমু নে । এক অউ রান্দা নু রান্দিয়া আইলাম হি বাড়িত ।
--- অউ পথুয়া কই দিয়ানি । তে বাদ দে, আর রান্দন লাগত নায় তর ।
   শত চেষ্টায়ও বৈতল রাগ সামলাতে পারে না । ঝাঁকা ভর্তি মাছ আবার পুকুরের জলে ছেড়ে দেয় বৈতল ।
    বৃষ্টির দিনের সন্ধ্যায় একটা মনখারাপের সুর বাজে । কোথায় বাজে জানে না বৈতল, কিন্তু বাজে । বৈতল তার বাড়ির পিছন-বারান্দায় বসে পুকুরের জল ভরা দেখে । দেখে বৃষ্টির টাপুর টুপুর । ঝুমুর ঝামুর । মনখারাপের বারিধারায় মিশে-যাওয়া বৈতলের গায়ে গা লাগিয়ে যে কখন দাঁড়িয়ে-গেছে নয় বছরের শিশুকন্যা মরনি, বৈতল বুঝতেই পারেনি । বৈতলের মরণজয়ী মেয়ের নাম এখন মনি । বোবা মানুষের অস্ফুট সংকেত ছুঁয়ে যাবে মেয়ের সারাজীবন । তার নতুন নাম । হঠাৎ কখন অন্ধকারের পাশে আলোর মতো মেয়েকে দেখে চমকায় বৈতল । মেয়ে বাপের গা ঘেঁষে বলে,
--- অউটা কিতা বাবা ।
--- কোনটা গো মাই ।
--- ওউযে পুকইরর মাঝখানো । একটা বাঁশ ।
--- অয় ।
--- বাঁশর আগাত কিওর বাত্তি ।
--- বাত্তি কই দেখলে বেটি ? আশ্বিন মাসো ইখানো বাত্তি দেওয়া হয় । চৌদ্দ পুরুষে দেখইন, আশীর্বাদ করইন । আশ্বিন আইতে তো বউত দেরি ।
--- আমি নু দেখিয়ার । গুড্ডির কাগজর লেনটনর লাখান ।
--- অয়, অয়, গুড্ডির কাগজ দি, বাশ দি বানানি হয় প্রদীপ । তুই নি স্বপ্ন দেখরে বেটি ! ঘুমাইয়া উঠচছ নি ।
--- না বাবা হাচাউ দেখিয়ার । অউ দেখ আকাশর মাথাত দেখছ নি ।
--- না গো মাই দেখিয়ার না । সব আন্দাইর ।
--- অউ দেখ । তুমি দেখরায় নানি বাবা । 




    নয় বছরের মরনি কাতর কণ্ঠে বাবাকে দেখায় আলো, আকাশের আলো । সন্ধ্যার আঁধারে বৈতলের মনখারাপ উধাও হয়ে যায় হঠাৎ । মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বৈতল । আকাশ-আলোয় যেন উজ্জ্বল হয় মুখ । বলে,
--- তুই দেখরে নি গো মা ।
--- অয়, দেখিয়ার । অত সুন্দর বাত্তি তুমি বানাইছ নি বাবা ।
--- না রে বেটি ।
--- তে কে বানাইছে ।
--- তর বাপ থাকি ভালা কেউ একজনে বানাইছে ।
--- কে নানা পিরে নি ।
--- তুই দেখবে সারাজীবন । তাইন দেখাইবা । ইটার নাম অইল জীবন-বাত্তি । হক্কলে দেখে না, কেউ দেখে ।
--- তুমিও দেখবায় বাবা ।
   দেখছে না বললে মেয়ে ভুল বুঝবে তাই বৈতল চুপ করে থাকে কিচ্ছুক্ষণ । তার পর মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলে,
--- তুই আমারে মানছ নি বাবা । বিশ্বাস করছ নি ।
--- করি ।
--- আমারে ভালা পাছ নি ।
--- পাই ।
--- তর মায় আমারে ভালা পায় নি রে ।
--- পায় বাবা ।
--- তুই কেমনে বুঝলে ।
--- চান্দুর বাড়িত তনে কাম করি আইলে মায়ে কান্দইন ।
--- আগে তো কইচছ না মাই ।
--- মায় কইন, তর বাপে যে কেনে ইবাড়িত পড়ি রইছে ।
--- তুই যাছ নি হি বাড়িত ।
--- না, মায় অখন লই যায়না । কয় বড় বড় অই গেছি ।
--- চান্দুর লগে খেলছ না
--- খেলি উঠানো ।
--- চান্দুর বাবা ভালা না তোর বাবা ভালা ।
--- চান্দুর বাবায় বউততা দেয় ।
--- , আমি ভালা নায়, নানি ।
--- আমি তো কিচ্ছু নেই না ।
--- কেনে নেছ না ।
--- মায় কয়, নিলে তুমি গুসা করবায় ।
--- তর মায় তো চান্দরে খুব ভালা পায় । অখনও রইছে হি বাড়িত, খুব রান্দের নানানি বিনানি, নানি ।
--- মা অখন পাকঘরো । মাছ রান্দের । কই মাছর ঝোল বড়ি দিয়া, তুমি খাইতায় ।
--- মাছ কই পাইল । বড়ি কই পাইল ।
--- তুমি নি খালি মাছধরতায় পার, মায় পুকইরো লামিয়া ধরছে ।
--- আর বড়ি ।
--- আমার মার রান্দাঘরো সব থাকে ।
    রাগ হলে বৈতলের সব ইন্দ্রিয় বন্ধ হয়ে যায় । একবগ্‌গা হয় । বেগুন পোড়ার বেগুনের মতো গরম হাওয়া বেরোয় শরীর ফুঁড়ে । দুর্গাবতীর ফস্টিনস্টি নিয়ে নিজের মনখারাপ সাজায় । বৈতল দুর্গাবতীর মনের ভিতর উঁকি দেয় না আর । অনেক চেষ্টা করে দেখে, অতল বৈ কিছু নেই । তাই একাকী বৈতল অন্ধকারে গুম হয়ে বসে থাকে । যখন বৈতলের মন কাঁদে তখন আকাশ ভরা বৃষ্টি । ঝমঝমাঝম । পায়ের নিচেও জল । পাতা ভিজে গোড়ালি অব্দি ছুঁয়েছে । চালাঘরের বারান্দায় সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয় । বৈতল দেখে দূরের আকাশের গায়ে জ্বলজ্বল করছে এক আকাশপ্রদীপ । যা দেখে বৈতলের নয় বছরের মেয়ে মরনি, দুই শূন্যমূল নারী পুরুষের আকাঙ্ক্ষার সলতে । শুধু বাঁচিয়ে রাখা আর বেঁচে থাকার লড়াইরত দুই বাস্তুহারা । বৈতল ওঝা বর্ষার ভিজে বাতাস বুকে নিয়ে তার আপন রমণীর কাঁধে হাত রাখে বিশ্বাসে । বলে,
--- তে চল ।
    চল বলে বৈতল চলার গতি আনে । দুর্গাবতীও জানে তার জীবনের চলার গতি বলতে একজনই । তিলে তিলে বড়ো করে তোলা তাদের নবম বর্ষীয় কন্যা । অবিশ্রান্ত বর্ষার রাতে একাকী বসে থাকা পাথরের মূর্তিকে সঙ্গী করে । দিঘীর জল বলে এখন আর কিছু নেই, সব একাকার । দুর্গাবতী বৈতলের গোড়ালি ছাড়িয়ে উঠে গেছে জল । টুপটাপ বৃষ্টিপতনের শব্দে দুজনের একাকী রাত ঘন হয়ে ওঠে । দুর্গাবতীও বৈতলকে ছুঁয়ে দেয় । বলে,
--- জল বাড়ের ।
--- বাড়উক । আমরা ডারাই না পানিরে
--- কিলাখান টাপুস টাপুস, ছলছলাৎ করি বাড়ের । বিশ্বসংসার ডুবি যাইব ।
--- পানির সর্বনাশা ডাক । আমি চিনি ।
--- জল কুনুসময় সর্বনাশ করে নাজল অইল জীবন ।
--- অখনঅউ তর ভাঙা ঘর ভাসি যাইব ।
--- কেমনে কছ । তুই কুনু সবজান্তা নি ।
--- আমি কেনে । তুমি সব জান তুমি থাকলে আমরার ডর নাই । আমরার মাপুড়ির ভগবান তুমি । আমি যে কই ভাসি গেলাম নে আইজ । দেশবিদেশে জানি না, তুমি অউ আমার দেশ, বইয়াখাউরি ছাতক সুনামগইঞ্জ ছিলেট সব । সব তুমি । আমার লাখান এক পাপিষ্ঠারে লইয়া তুমি ঘুররায় ।
--- তুই আমার বৌ, তাই আমার পুড়ি । আমার লাখান সুখর সংসার কার আছে ক চাইন ।
--- তে তুমি মনখারাপ করি বই রইছ কেনে ।
--- নারে, আমি কিচ্ছু দেখি না, আমি কিচ্ছু জানি না । খামোকা আমারে চাঙো উঠাইছ না ।
--- চাঙো উঠাইতাম কেনে । তুমি যেতা হতাউ কইলাম ।
--- তে ক চাইন, আমি যেতা দেখি তুই হিতা দেখছ নি ।
--- কিতা দেখতাম কও আন্দাইরো ।
--- অউ আকাশো বাত্তি দেখরে নি ।
--- কিওর বাত্তি
--- আকাশ বাত্তি । পুকইরর মাঝখানো বাঁশর আগাত ।
--- আমি কিচ্ছু দেখিয়ার না । ঘুটঘুটি আন্দাইর ।
--- আমিও দেখিয়ার না কিন্তু আমার মরনিয়ে যে দেখের ।
--- তাইরে তুমি মরনি ডাক কেনে তিলোত্তমা নামটা খারাপ কিতা । নামে দুষ করল কিতা । কেউ দিলেউ কিতা নাম খারাপ অই যায় নি । কইলায় মনি ডাকবায়, অখন আবার কেনে মরনি ।
--- নারে ইতা নায় । আমরা গরিব মানুষ, আমরার লাখান নাম রাখা অইত নানি । বড়ো মাইনষর সমাজো মরনি খারাপ নাম অইত পারে, কিন্তু মরণ জয় করার ই নামও কিন্তু খারাপ নায় । বড়লোকর চউখ দিয়া পুড়িরে দেখলে পুড়ি আমরার অইত নায় । কাউয়াও অইত নায় কুকিলও অইত নায় । আমারার তাই কিন্তু মরণ জয় করি বাচি থাকব ।
    বৈতলের বড় বড় সব কথার ভাণ্ডারী এক ছুতোর মিস্ত্রি । গুরু সৃষ্টিধর বৈতলকে পদে পদে জীবনের পাঠ শিখিয়েছেন । জীবনের গূঢ়তত্ত্ব যে এমন সাদাসিদে হয় বৈতলকে শিখিয়েছেন তিনি । তাই দুর্গাবতীর মনোব্যাথায় সামিল হতে পারে সহজে । দুর্গাবতীর মনে মনে গড়ে-ওঠা ধারণাকে মুক্ত করার চেষ্টা করে ।
    বৈতলের এমনিতে ভয়ডর বলে কিছু নেই । সেই নির্ভয় মানুষটার ভেতরকে  আরো শক্ত করেছেন গুরু সহজিয়া কথায় বলেছেন মানুষের জীবনে মৃত্যু এক উৎসব । মৃত্যু মানে পরিপূর্ণতার স্মারক । তাই মৃত্যুকে যে জয় করতে পারে তার জীবনে হয় মহোৎসব । যে-মানুষ সারাজীবন মৃত্যুর ভয়ে মরতে মরতে বাঁচে, তার জীবনে কোনও উৎসব নেই । বৈতলের জীবনে তাই উৎসব লেগেই আছে । বৈতল জীবনে হারতেও শেখেনি । একবার মাত্র হেরেছিল, মেয়ের জন্য হেরেছিল, মেয়ের জন্ম হওয়ার আনন্দে হেরেছিল, ইচ্ছে করে যম জমিদারের কাছে । পাল্টাপাল্টির নাম রাখে জমিদারপুত্র আর পাটনিকন্যার । বৈতল জমিদারপুত্র চান্দুর নাম রাখে চন্দ্রধর, জমিদারও তার মেয়ের নাম রাখে তিলোত্তমা । কথা দিয়েও কথার খেলাপ করে বৈতল, তিলোত্তমা রাখেনি । বৈতল মেয়ের নাম রাখে মরনি । তবে এত ভেবে নাম রাখেনি, ভালো খারাপ ভাবে নি, শুধু গুরুর মৃত্যু নিয়ে ব্যাখ্যা তার মাথায় রেখেছে । এর মধ্যে একদিন শিববাড়ির হেডমাস্টার, তার পক্ষীরাজের বাঁধা সওয়ারি, বৈতলকন্যার অভিনব নাম শুনে বাহবা দেন বিস্তর । বলেন,
--- খুব ভালা নাম রাখছ রেবা । চাবুক মারছ । মরণ শুনলে মানুষে খুব ডরায় । তুমি ডরাইছ না, দেখিও তুমার পুড়ি অইব অকুতোভয় ।
   বৈতল প্রশ্ন করে
--- কিতা কইলা আইজ্ঞা । অর্থ কিতা, অকুতোভয় ।
তিনি হেসে এড়িয়ে গেছেন জবাব । বলেছেন,
--- আছে একতা । খাইয়া নাচন ।
   রাতের অন্ধকারে বৈতল আবার পুকুরপারে তাকায় । স্পষ্ট দেখতে পায় জীবন প্রদীপ । প্রদীপের আলোয় দেখে টাউন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী কুতুবউদ্দিন নিষ্পাপ মুখমুখের হাসি । বৈতল প্রাণপণে দুর্গাবতীকে কাছে টানে । বলে,
--- কইছলাম নানি তরে, এক ভুল করছি
   বৈতল দুর্গাবতীর জবাবের অপেক্ষা করে না । ডুবে যায় তার ভাবনার অতলে । ভেবে পায় না তার মেয়েও কি একই ভুল করবে । পুকুরের অন্যপারে জমিদারের দোতলা বাড়ির আলোকেই কি তবে আকাশপ্রদীপ ভেবে ভুল করছে মেয়ে । যমুনাপ্রসাদের আকাশবাড়ির আলোকে নিশানা করে বৈতল অন্ধকারের জলে মারে ঝপাং ।
    বৈতল সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে না । কোনো দোনামনার অবকাশ রাখে না । কাউকে বুঝতেও দেয় না তার সিদ্ধান্ত কথা । একবার ভুলও করেছে অতি উৎসাহে । গাঁজার কলকেয় দুটান দিয়ে বলে দেয় দুখুকে, বছইকে আপদকে তার মনের কথা । তার শর্তের কথা । বলে,
--- দুধপাতিল উতিল ইতা খামোকা । তর ঘনিয়ালা মজিদউ আমি মুসলমান অইতাম । দুর্গাবতী বেটি ইগুয়ে আমারে খেলার, দেখাই দিতাম তাইরে ।
--- কিতা দেখাইতে ।
--- এ তরে নু কইলাম, পয়লা আমার কাম করি দিবে । হিগুরে বধ না করলে কিচ্ছু অইত নায় ।
   বৈতল দুখুকে শত্রু বিনাশের শর্ত । দুখু ভাবে নেশার কথা । উড়িয়ে দেয় । বলে,
--- ধুর হালার হালা । মুসলমান হওয়ার কুনু শর্ত লাগে না । লাগে খালি ইমান
--- ইমান কিতা রে ।
--- ইমান অইল বিশ্বাস । বিশ্বাস থাকলেউ মোমিন হইবে । এর লাগি মুসলমান হওন লাগে না ।
      ইমান আছে আছে বৈতলের একশভাগ । ছোটখাটো বদমাশি চুরি ছ্যাঁচড়ামি করে সে । সে তো সব গরিবেই পেট ভরানোর জন্য করে । বৈতল ওসব বেইমানি ভাবে না । আর বৈতলের লেজ মাড়িয়ে না দিলে সে কারো উপর চূড়ান্ত আঘাতও করে না । বৈতলের ইমানও তাই তার নিজস্ব । ধর্মবিশ্বাস নেই তার কিন্তু ধর্মের ভিত-এর উপর বিশ্বাস আছে । মানুষের উপর বিশ্বাস আছে বৈতলের ।
      আকাশপ্রদীপ না আলোয়া কিসের টানে জানে না বৈতল, সে রাতে আর দুর্গাবতীর হাতে কইমাছ হিং-এর বড়ির ঝোল খাওয়া হয়নি ঝাঁপ দেয় বৈতল উল্টোদিকের আকাশবাড়ি নিশানা করে ।





চলবে 
<  উজান পর্ব ৪০ পড়ুন                                                  উজান পর্ব ৪২ পড়ুন >
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন