.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

রবিবার, ৯ অক্টোবর, ২০১৬

সুরমা গাঙর পানিঃ উজান পর্ব ৩৯

(দেশভাগ এবং পরের দশকের কাছাড় সিলেটের প্রেক্ষাপটে রণবীর পুরকায়স্থের এই উপন্যাস ছেপে বের করেছে দিন হলো। ভালো লাগা এই  উপন্যাস পুরোটা টাইপ করে তুলে আমার প্রিয় কথা শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। আশা করছি আপনাদের সবার এটি পড়তে ভালো লাগবে। সম্পূর্ণ উপন্যাসের সংলাপ ভাগটি সিলেটিতে -সে সম্ভবত এই উপন্যাসের সবচাইতে আকর্ষণীয় দিক। আপনাদের পড়বার সুবিধে করে দিতে, ঈশানে এই উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে আসছে। আজ তার  উজান  পর্বের  অধ্যায়   ঊনচল্লিশ  ---সুব্রতা 
মজুমদার।)   

ঊনচল্লিশ

   বৈতলের এখন সব শূন্য । আর নেই, বৌ-এর রোজগারে খাওয়া । জমিদারবাড়ির ঝি-গিরি করে দুর্গাবতী । মন্দিরের লেপাপুছা করতে হয় না সত্যি জমিদার বাড়ির রান্নাঘর, চন্দ্রধর রাজকুমারের দেখাশোনার কাজে অনেক সময় বেরিয়ে যায় । রাত বিরেতেও ডাক পড়ে দুর্গাবতীর । দুর্গার রোজগারও বাড়ে । কাপড়চোপড় হয় পূজা পরবে, মেয়ে মণির স্কুলের খর্চা, কাপড়, জামা এমন কি সোনার গয়নাও দেয় যমুনাপ্রসাদ । কর্মহীন বৈতল দুর্গাবতীর খাটাখাটুনি দেখে ঝিম মেরে বসে থাকে । কানা মনুর দোকান থেকে গাঁজা কিনে এনে একা একা টানে চিলিম । দুখুর সঙ্গে কথা বলে না, আপদ বছই এর সঙ্গে দেখা হয় মামুর মোকামে । জমিদারবাড়িতেও নতুন উপসর্গ দেখা দেয় । জমিদার আবার নতুন রূপ নিয়ে হাজির হয় বৈতলের কাছে । আবার যেন সেই কৃতজ্ঞ জমিদার যম সিংহ ।
বলে,
--- আমি আর পারিয়ার না রেবা একলা । আবার লাগি যাও । ইলেকশন আর, তুমি থাকলে আমার ডাইন হাতর লাগি চিন্তা নাই । বাড়ে যাওন লাগত নায়, বাসাতঅউ অফিস থাকব । তুমারে ডরাইব ভলান্টিয়ার হকলে । কনট্রল করবার ।
   বৈতল হাসে । বলে,
--- উঁ ।
   খুশি মনে চলে যায় জমিদার নেতা । পরদিন আবার আসে । বলে,
--- কিতা ভাবলায় উঝা ?
--- ভাবছি ।
--- আমিও ভাবছি, তুমার তিলোত্তমা নামে মেহেরপুরো কিছু জমিন লেখিয়া দিতাম ।
   বৈতল এবারও উম দেওয়ার মতো অস্ফুট শব্দ করে । বলে,
--- উঁ ।
    বিভ্রান্ত জমিদার চলে যায় । চলে যেতেই বৈতল রাগে । রেগে ডাকে দুর্গাবতীকে । বলে,
--- পকুড়া বানাইবে নি ।
--- সকালে পকুড়া দিয়া কিতা অইত ।
--- খাইতাম । মালর লগে খাইতাম, আর কিতা ।
--- কিতা অইছে তুমার । গাইঞ্জা খাইবায় হিতাও খাইরায় । মরবায় নু ।
--- মরলে তোর কিতা । তর তো ভালাউ । থাকবে বেটি জমিদারনি অইয়া ।
   এবার দুর্গাবতী দেয় উম । বলে,
--- উঁ ।
--- উঁ কিতা । আমি মরলে বান্দি বানাই রাখব । হে কিতা ভাবছে । পুড়ি কার, ক তুই । তুই ত মা ।
--- কিতা হইছে । কে কিতা কইছে তুমার পুড়িরে ।
--- হালার হালায় কয় ডাইন হাত বানাইত, কয় পুড়িরে জমিন লেখি দিত । রিক্সা নাই এর লাগি বৈতল কিতা মরি গেছে নি ।
--- তুমি আবার রিক্সা বানাইবায়, আমি পয়সা জমাইয়ার ।
--- আমি আর রিক্সা চালাইতাম নায়, তুমার খুব দুঃখ, রিক্সাআলার বউ, নানি । আমি অখন খালি গান গাইমু । পুথি পড়মু গাইমু, শিখাইমু ।
--- হারাদিন গুরমি নাচ নি । এর থাকি তো রিক্সা চালানি বালা ।
--- আর গুরমি নাচতাম নায় । তুই যেতা অপছন্দ করছ কিচছু করতাম নায় ।
--- আকতা
--- আক্‌তা নায় । ইখান ছাড়ি দিতাম । ইখানো থাকলে কুনদিন রিশ উঠি যাইব আর হিগুরে মারি লাইমু । আর মানুষ মারতাম নায় আমি । আর ভুল করতাম নায় ।
--- কিতা ভুল ।
--- কিচ্ছু নায় । পকুরা বনাইতে নানি ।
--- বানাইমু, অখন নায় । আগে কও ভুলর কথা । আবার কেউরে কিচ্ছু করছইন, না করতায় ।
--- না রে বেটি । ছুটবেলা ত এক পুড়ির কান টানছিলাম । মাকড়ি লইয়া ভাগছিলাম ।
--- ইতো কইছ ।
--- তাই আমারে চাকর কইছিল । আমি জানছ নি, কেউর লগে লাগি না, আমার লগে খামকা লাগলে আমি অই যাই মাছুয়া আলদ
--- আমি যে লাগি, আমারে তো বিষ ঝাড় না ।
--- না পারি না ।
 বৈতল দুর্গার হাত ধরে মুঠো করে । বলে,
--- তর লগে পারতাম নায় । তুই আমার দাউদর খাউজ । খাউজাইতে খাউজাইতে পানি বার অইব, রক্ত বার অইব তেও তো ছাড়তাম নায় । ইখানো থাকলে পাগল অই যাইমু । এর লাগি কই, চল যাই গি ।
--- কই যাইতায় ।
--- নতুন জাগাত । সবুজবরণ গাউত তুমার একমামা আছইন নানি ।
--- মামা নি । মামা ডাকি । পিয়াইনড় পারো আখড়া আছিল । আমারে আদর করতা, মাই ডাকতা । কইতা দুর্গা মাইকি জয় । পাকিস্তান হওয়ার পরে হারাই গেলা । অউ তুমি অউত্ত লইয়া আইলায় কেম্পো । মামায় কইলা, যাইবা গি, একটা টিলা পাইছইন সবুজবরণো । কইলা আখড়া করবা মহাপ্রভুর ।
--- অউত্ত অইছে গো মাই । চল যাই গিয়া । বৈষ্ণব অইলেউ মানুষ ভালা অইন । দয়া মায়া থাকে ।
--- হিতো বুঝলাম । তুমি আবার হিনো গিয়া তাকত দেখাইও না ।
--- ইতা কিতা কও । আমার আর কিওর তাকত । ডুলতে ডুলতে সব শেষ । আমি যতউ করি চতুরাতি আমার কপালো হউ এক রতি । হউ হরে কৃষ্ণ হরে রাম । ইবার আর কিচ্ছুত থাকতাম নায় । যে কুনু কিরা ।
--- অয় তুমি অলাখান বেটা আর কিতা ? তুমারে চিনি নানি ।
--- অউ তুমারে ছইয়া কইয়ার, কিচ্ছুত থাকতাম নায় । মাঝে মাঝে অউ ছুটো হাওরো যাইমু, মাছ মারমু তোমার লাগি ।
--- ছুটো হাওর পাইলায় কই ।
--- কেনে চাতলা । ইতা হাওর নি । ইখানো এক কুয়া হিখানো এককুয়া । এর থাকি ভালা হউ রায় বাড়ির দিঘী ।
--- দিঘী পাইলায় নি ।
--- আছে, আইরংমারাত মস্ত বড় পুকইর ।
--- তুমি কেমনে জানো ।
--- আমি গেছি নানি ।
--- তুমি কিচ্ছু লুকাইরায় আমারে ।
--- কিতা লুকাইতাম ।
--- তখন কইলায় ভুল করছ, অখন কইরায় গেছ আইরংমারাত । আমি যাইতাম নায় যাও ।
--- যাইতায় না কিতা বেটি । হুক্কা যেবায় যায়, চিলিমও হবায় যাইব । আর আমি তরে কিতা লুকাইতাম । আমি সুজা মানুষ আমার লগে কেউ বেইমানি করলে আমি ছাড়ি না । লুলারে মারলাম তর লগে বেইমানি করল এর লাগি
--- না ।
--- তে কিতা
--- আমি জানি তুমি ইতা মান না । হিন্দু-মুসলমান । হে মুসলমান অই গেছিল এর লাগি মারছ ।
--- হে ত মুসলমান অউ ।
--- অউত্ত কথা । তুমি কিতা আর কেউরে মারছ নি ।
--- না ! কে কইছে তরে ।
--- কেউ কইছে না, কিন্তু জমিদারর লগে লাগিও না ।
--- কেনে তারে আমি ডরাইনি । বৈতলের ভয়ডর নাই । আর আমি কেনে মারতাম ? আলদ দিয়াউ যখন মারছি না, ইগু এমনেউ মরা ।
    বৈতল কোথাও ঝামেলা পাকায় না । ঝামেলা ওকে ডাকলে সে দূরে থাকে না । ওকে মেরে ফেলার জন্য কেউ চক্রান্ত করলে সে কেন মানবে । সে কেন পালাবে । বৈতল কার্য সমাধা না করে কোথাও থেকে নড়ে না । তাই দুর্গাবতীর কথা রাখতে আবার সে যায় সবুজবরণ, যায় আইরংমারা, যায় জালেঙ্গা । সবুজবরণ গ্রামে সে খুঁজে পায় বিপ্রদাস বাবাজিকে । দুর্গাবতীর মামা । এবার আর শ্রাবণ মাসে সে থাকবে না হরিৎবরণ । তার আগেই চলে যাবে নতুন ঠিকানায় । আইরংমারায় রায়বাড়িতে বিষহরি পূজা হয় মহা ধুমধাম । বৈতল ওঝার নাম শুনেছেন শান্তিরানী রায়, রায় বাড়ির গৃহিণী, সতীশ চন্দ্র রায়ের স্ত্রী । তাঁর সাথে কথা হয়ে গেছে, সারা মাস ধরে পুঁথি পড়বে বৈতল, নাচবে আইর গানের তালে তালে এমনি নাচ । গুরমির পোষাক গায়ে চড়াবে না । চাতলার পারে নব বসতি হয়েছে কৈবর্তদের । শ্রাবণের মহাধুমধামে বৈতল ওখানেও পুরোহিত । বৈতল যায় বাঁশকান্দি । যামিনী পণ্ডিতের বন্ধু কুতুবউদ্দিনের হাতে দেয় বিদ্যার্জনের মাশুল নগদ পাঁচশ টাকা ।
     সব ঠিকঠাক করে ফিরতেই পুলিশের টানাটানি শুরু হয় । হরিৎবরণ ইটখোলা ঘনিয়ালা ঘিরে হয় তোলপাড় । দুখু মিয়াকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে, ছেড়েও দিয়েছে । বছই আপদ পালিয়েছে শহর ছেড়ে । বৈতল জানে সব বাট্টি ইমামের বুদ্ধি । দুখুর সঙ্গে কথা হয়েছে বৈতলের । কিন্তু বন্ধুত্বের দেখা নয়, কেমন শীতল কেমন দূরত্বের । জমিদার যমুনা প্রসাদ নিখোঁজ হওয়া নিয়েও কোনও কথাই হয় না । দুখু ভাবে, বৈতল তো একবার বলতে পারে কিছু, ওর সঙ্গে লাগালাগি করতে পারে, দোষারোপ করতে পারে তার উপর । বলতে পারে জমিদার হারিয়ে যাওয়ার তার হাত আছে । বৈতল কেন অন্য মানুষ হয়ে যায়, বৈতল ভেবে কুল পায় না । সবাই যখন বৈতলের দিকে ইশারার আঙুল তুলেছে তখন দুখু কিছু বলবে না । বৈতলের দিকে পুলিশের সন্দেহের কারণও যথেষ্ট । বৈতল যে কোথা থেকে এসেছে কেউ জানে না, হিন্দু না মুসলমান জানে না । কেউ বলে সে পাটনি কেউ বলে ব্রাহ্মণ । ব্রাহ্মণ হয়ে রিক্সা চালায়, জাল দিয়ে মাছ ধরে মানুষের পুকুরে । কালো রঙের ক্ষীণকায় মানুষটার এমন সুন্দরী গৌরবর্ণা স্ত্রী কন্যা দেখেও সন্দেহ ঘনীভূত হয় । তার উপর একই সময় বৈতল শহর থেকে উধাও হয় । পুলিশ বৈতলের কথামতো খবর নেয় সবুজবরণ আখড়ায়, আইরংমারার রায়বাড়িতে । চাতলার কৈবর্তপাড়ায় । বৈতল বলে না বাঁশকান্দির কথা । কুতুবের পড়াশুনার খরচ বাবদ পাঁচশ টাকা দেওয়ার কথা । জমিদার উধাও হলে ভাবা যায় কোথাও বেড়াতে গেছে, ফিরে আসবে ফুর্তি-ফার্তা করে । বড়লোকরা যেমন করে । কাছাকাছির বাগানে যায়, দিন দুয়েক থেকে আসে, শিকারে যায় ডার্বি ভুবনডর সরসপুর বড়জালেঙ্গা । কিন্তু জমিদারের সঙ্গে যে উধাও হয়েছে জমিদার বাড়ির প্রভূত ধনসম্পত্তি । দুঃসাহসিক ডাকাতি । সিন্দুক ভেঙে টাকাকড়ি, সোনাদানা উধাও । বাড়ির মন্দিরের প্রাচীন মনসাপট, প্রতিমার সোনার গয়না সব লোপাট । বাড়ির দিঘীর জল তোলপাড় করে পুলিশের ভাড়া করা ডুবুরি । নসিবালি হাকিমের পুকুরেও পড়ে ডুবুরি, কিছু সোনা রূপার বাক্স পাওয়া যায়, সব সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়ির গয়না । জমিদার গিন্নীর চেনা গয়না নয়গুজব রটে দেওলা টেনে নিয়েছে ধনরত্ন আর জমিদারকে ।
    যুবক জমিদারের কৃষ্ণ বর্ণ স্ত্রী পুলিশকে বলে তার স্বামী ফিরিয়ে দিতে, সোনাদানা ফিরিয়ে দিতে । ছোটখাটো অপরাধের শহরে পুলিশ পড়ে মহা ফাঁপরে । পুলিশ বলে কেউ যাবে না বাড়ি ছেড়ে । বৈতল ফিরতে বৈতলের উপরও জারি হয় ফরমান । বৈতল বলে,
--- কেনে না খাইয়া মরতামনি । কে খাওয়াইব ।
পুলিশ বলে,
--- জমিদারনিয়ে খাওয়াইবো ।
জমিদার গৃহিণী বলে,
--- রাজার ধন বেনালে যাইত নি । ডাকাইত ধরি দিলে খাওয়াইমু ।
   পুলিশের কুকুর লাকি আসে কলকাতা থেকে । ঘেউ ঘেউ করে এদিক ওদিক ঘুরে কাউকে ধরতে পারে না । এরোপ্লেন চড়ে চলেও যায় একদিন । পুলিশ বৈতলের পরিবারকেও ছেড়ে দেয় নজরবন্দী থেকে । না ছেড়ে উপায় নেই । শহরের একমাত্র থানাও যে জলের তলায় । ভেসে আছে একমাত্র টিকরবস্তির টিলা বাকি সব থইথই জল । আর ভেসে আছে এক বিশাল সাপের শরীর, বরাক নদীর পেঁচানো বাঁধ । নদীর বাঁক যেখানে ঘোড়ার ক্ষুরের আকৃতির । বাঁধের উপর মানুষের অস্থায়ী ঠিকানা ।
   বৈতল এর মধ্যেই বাঁধের ডাক শুনতে পায় । বৈতলের মনে বোঝাপড়ার হিসেবের খাতা । গুটিগুটি পায়ে বৈতল এগোয় বাঁধের পথে । রিক্ত মানুষ বৈতলের পা পড়ে না । সবহারানো মানুষ বৈতল জালাল পিরের মোকামের দরজায় মাথা নুইয়ে দাঁড়ায় । বৈতলের চোখের জল দেখেনি কেউগভীর দুঃখে বৈতলের চোখে তখন ক্রোধ । দুখুর উপর ক্রোধ না অভিমান কে জানে ।





 চলবে 
< উজান পর্ব ৩৮ পড়ুন                                                                                উজান পর্ব ৪০ পড়ুন >



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন