.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

রবিবার, ৯ অক্টোবর, ২০১৬

সুরমা গাঙর পানিঃ উজান পর্ব ৪০

(দেশভাগ এবং পরের দশকের কাছাড় সিলেটের প্রেক্ষাপটে রণবীর পুরকায়স্থের এই উপন্যাস ছেপে বের করেছে দিন হলো। ভালো লাগা এই  উপন্যাস পুরোটা টাইপ করে তুলে আমার প্রিয় কথা শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। আশা করছি আপনাদের সবার এটি পড়তে ভালো লাগবে। সম্পূর্ণ উপন্যাসের সংলাপ ভাগটি সিলেটিতে -সে সম্ভবত এই উপন্যাসের সবচাইতে আকর্ষণীয় দিক। আপনাদের পড়বার সুবিধে করে দিতে, ঈশানে এই উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে আসছে। আজ তার  উজান  পর্বের  অধ্যায়   চল্লিশ  ---সুব্রতা 
মজুমদার।)   



চল্লিশ

  পিরের পিরাকি শেষ হয়েছে কদিন আগে । বৈতল তখন সবুজবরণে, কিছুই জানে না । দুখুর নিষ্ঠুরতায় বৈতল মর্মাহত হয়, এই কি সেই দুখু । তার প্রাণের বন্ধু দুখু যে সোনামনির পা ভাঙার খবর শুনে দৌড়েছে হাসপাতাল । মামুকে রিক্সা থেকে নামিয়ে নিয়ে গেছে রিক্সা । সেই দুখু এত বড় দুঃখের সময় বৈতলকে জানায় না কিছু । চারবন্ধুর পিতৃদায়ে বৈতলকে ওরা আলাদা রাখে । কেন, বৈতল বিধর্মী বলে । হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে গরিব মানুষের ত্রাতা ছিলেন বিশালদেহী মানুষ । কোনও শিক্ষিত ধর্ম মানুষকে তার কাছে দেখা যায় নি জীবৎকালে । এন্তেকালের পর নাকি ঘনিয়ালা বস্তিতে তাঁর কবরের সামনে ঢল নেমেছিল মানুষের । মুসলমানরা কাপড় বা টুপি মাথায় শ্রদ্ধা জানিয়েছে । হিন্দু চাষি-শ্রমিকজনেরা চোখের জলে করজোড়ে দাঁড়িয়েছে । বৈতলের মনে এক প্রশ্ন, মামুকে কোনও এক ধর্মের মানুষ করে রাখা কি ঠিক । বোবা মানুষের কি ধর্ম হয় । মামু তো ধর্মাচরণ করেনি জীবনে, নমাজ পড়েনি তেমন করে । দুখু মামুর মনের কথা ভাষায় প্রকাশ করেছে । মামু ও দুখুর একটা মনের মিল রয়েছে । দুখু ভুল কথা বললে মামু দুখুকে ধরে মারে । আসলে মামুর শরীরটা যে অনেক বড় । সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা তাই মানুষ সম্ভ্রমের সম্মান দেয় । মানুষ নিজের মতো কাউকেই আলাদা করে দেখে না । গুরু সৃষ্টিধর এসব নিয়ে শিখিয়েছেন অনেক তত্ত্ব । বলেছেন,
--- গণেশ ঠাকুররে মাইনষে সিদ্ধিদাতা কয়, আলাদা সম্মান দেয় । কারণ তান মাঝে আলাদা হওয়ার কিচ্ছু আছে, মাইনষর মতো আবার মানুষ না, হাত্তির শুড় মুখো, তেউ আবার বাইচ্চা হাত্তি, পেটটাও মোটা ধুম্বামারা আদর করার মতো । বুদ্ধদেবর মূর্তি দেখছনি, কী সুন্দর । কেনে কও চাইন । তান নাকটা কী সুন্দর, কয় তিল ফুলর লাখান, ইরকম মাইনষর হয় না । কান অত সুন্দর লম্বা, কয় লকারান্তদুর্গার মুখ অত মুকুটমাটুক দিয়া সাজাইল, আমরারে রোজ দেখিয়াও মনো করতায় পারবায় নিকইতায় পারবায় নি সিস্টিছাড়া মিস্ত্রির মুখ কিলাখান ।
  এত বড় মাপের মানুষ রইদপুয়ানির গুরুদেব বৈতলের । নিজেকে নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে পারেন অবলীলায় । বলেন,
--- ঘাস থাকে পাওর নিচে, ঘাসর লাখান নীচা থাকলেউ সুখ রেবা । আমার কথা নায় রেবা, ইতা কই গেছইন তাঁরা ।
    বলে আকাশের দিকে প্রণাম জানিয়েছেন গুরু । রাগের মানুষ বৈতলকে ধৈর্য শিখিয়েছেন তিনি । বৈতল শেষ রক্ষা করতে পারেনি । গুরুবাক্য অমান্য করে লুলাকে শাস্তি দিয়েছে । মামুপিরকেও অমান্য করেছে বৈতল । আরো কী সব সাংঘাতিক ঘটে গেছে তার হাতে । বৈতল এবারও শপথ নেয় মনে মনেবলে,
--- অউশেষ । আর ভুল অইত নায় । তুমি বাঁচি থাকলে কুনু আমি ইতা করলাম নে নি ।
    মামুমুখের শিশুর সারল্য-ভরা হাসি ভুলতে পারে না বৈতলসব কিছু বুঝতে পারে মামু । মনের ভিতর ঢুকে মন পড়তে পারে । সমবেদনা জানাতে পারে দুঃখে, আনন্দে খুশি হতে পারে, ফুর্তি করার একটা মনও আছে মামুর তরতাজা । বৈতলের মেয়ে মনিকে নিয়ে গেলেই আনন্দবাজার ! কী খুশি কী খুশি । বৈতলের মনেও এক প্রশান্তি কাজ করে । মামু চলে যেতেই আবার সুরমা গাঙের উথালিপাথালি । নীল নীল কালচে রঙের জাজালি কবুতর উড়া দিতে চায় । বইয়াখাউরির হাওরের পাখি কিচির মিচির করে ডাকে বৈতলকে, ডাকে মিরতিঙ্গার পাহাড়ের পক্ষীকুল, তার নিজস্ব বানরসেনা । ভাটির টান সুনামগঞ্জ পর্যন্ত নিয়ে যায় বৈতল দাস কৈবর্তকে । মাকে মনে পড়ে বার বার, মিরতিঙ্গার পাহাড়ে তার পাটপাথর দেখে মায়ের হাসি এখনও ভুলতে পারে না বৈতল । ভুলতে পারে না তৃণাদপি সুনীচেন মহীরূহ তার গুরু সৃষ্টিধর ছুতোরকে । পিয়াইনের জলে সমর্পণ করা বাল্যবন্ধু প্রাণসখা লুলাকেও মনে পড়ে । লুলা যে বৈতলের সব ভাল মন্দের সাথি । লুলা তার মায়ের শেষকৃত্য করেছে, লুলার কাছে অনেক ঋণ রয়েছে বৈতলের । বৈতলের খর চোখে এক ফোটা জলকণাও চিকচিক করে না । সব প্রিয়জন একে একে বৈতলকে ছেড়ে যায় । অবুঝ না বুঝে দূরে সরিয়ে দেয় অনেককে । বৈতল সরাতে পারে না একজনকে, বৈতল জীবনের দুর্গাপ্রতিমা দুর্গাবতীকে এক মুহূর্তের জন্যও সরাতে পারে না । বৈতল জানে না দুর্গা সতী না অসতী । বৈতল জানে দুর্গাবতী তার জীবনের ধ্রুবতারা এখন । বৈতল বোঝে দুর্গা তার কাছ থেকে আরো বেশি করে চায় কিছু । শরীরে সুখ চায় আরো । বৈতল তো তাকে নিংড়েই দেয় । তবু দুর্গাবতী লম্পট জমিদারের দীর্ঘ দেহে ফিরে ফিরে চায় ।
     বৈতলের নতুন বসতে আর টান নেই । তাই এবার আবার ভেসে যাওয়া । বৈতল ওঝার মামু নেই, পিরের আশীর্বাদ উঠে গেছে মাথা থেকে, তার মেয়ে মনিকে আদর করার পিরদাদু আর নেই । বৈতলের রিক্সা নেই, ভালই হয়েছে, যা হয় ভালোই হয় । এখন পক্ষীরাজ থাকলেও কি ষে চালাবে আর । মামুকে না চড়ালে তার সাইত ই হয় না, ‘বনিহয় না ।
   ঘরসংসার নিয়েও বৈতলের কোনও ধারণা নেই । মেহেরপুর ক্যাম্পের জীবনে অনেক আতান্তর দেখেছে । প্রায়ই বৈতলের মন বিবাগী হয়ে গেছে । কতবার চলে গেছে কাটিগড়া দামচড়া সোনাপুর কাকাবাবুর সঙ্গী হয়ে, দুর্গাবতীকে একা ফেলে রেখে । ব্রাহ্মণকন্যা দুর্গাবতীকে কিছুতেই স্ত্রীরূপে মানতে পারে নি যে । এখানে পিরের সান্নিধ্যে এসে কী যে হয়ে যায়, বৈতলের মন থেকে অশান্তি দূর হয়, গেরস্থ হয়ে যায় । মনখারাপ যে একেবারে হয়নি তাও নয়, মনখারাপ কাটাতে গেছে মধুবালার কাছে, দেশি মদ আর মামলেট খেয়ে কিছু গালাগালি দিয়ে মন ঠিক রেখেছে । নদীঝাঁপ শুকনো নেশার মৌতাত শুকনো মনকে বেভুল করে দিয়েছে । দুখু বছই আপদের মতো বন্ধুদের জন্যই বৈতল পেরেছে । নইলে কখন সব ছেড়ে ছুড়ে নতুন আকাশের খোঁজে বেরিয়ে যেত । মামুপির তাকে নিঃস্বার্থ ভালবাসা শিখিয়েছে । বৈতল সব ঢেলে দিয়েছে দুর্গাবতীর আঁচলে ।
   বৈতল মানুষকে ভালবেসে ধর্ম পাল্টাতে চেয়েছে । মুসলমান হতে চেয়েছে । জমিদার যমুনাপ্রসাদ চেয়েছে ধর্মীয় বাহিনি গড়তে । প্রথম দিকে হিন্দুমহাসভা । তার পর ধর্মনিরপেক্ষ । ধর্মহীন রাজনীতির নামে সবাইকে তোষণ এবং বিভাজন । বৈতলকে নিয়েও মামুর ভক্তদের মধ্যে বিভাজন । বোবা মানুষেরও শত্রু আছে । শত্রুরা শাসিয়ে যায় । বলে,
--- পিরাকি করছ কর । নিজর মজহব, বেরাদরির মাঝে কর ।
   মামু বৈতলকে ছাড়েনি । দুখুও শুনিয়ে দিয়েছে কড়া কথা । মামুর পাশে দাঁড়িয়েছে নির্ভয়ে । রাতের অন্ধকারে দুখুর উপর আক্রমণ হয়েছে । পরোক্ষে মামুর উপরেই তো আঘাত । পাহাড়ের কি আর একটি-দুটি বাঘ শেয়ালের আছড়ে কোনও ক্ষতি হয় । সেই সব বিরুদ্ধবাদী মানুষরাই এখন কমিটি করেছে, মাজার গড়বে পিরের নামে । অলৌকিকত্ব খুঁজছে মামুর । মামু অলৌকিক কিছু করেনি । কাউকে ধনীও করেনি । মনের ধনে ধনী হয়ে মানুষকে সাহস যুগিয়েছে সরলমতি মহামানুষ ।
    দুর্বিনীত জমিদার আর তার সুন্দরী স্ত্রী দুর্গাবতীকে নিয়ে কোনও সমস্যাই নেই বৈতলের । বৈতল চেনে তার বৌ দুর্গাকে । বৈতল যেমন দুর্গাও তেমন । এক ধাতুতে গড়া । জমিদার চাইলেই দুর্গাবতীকে অধিকার করবে এমন ক্ষমতাবান নয় ভূস্বামী । দুর্গাবতী তার মর্জির মালিক । তাই দুর্গাবতী যা চেয়েছে তো-ই করেছে । জমিদারবাড়িতে ক্ষমতার এক সমান্তরাল কেন্দ্র তৈরি করেছে । কিন্তু বৈতল জমিদারকে মানেনি । দুর্গাবতীকে নিজের কাছে ফিরে পাওয়ার নিরাপদ উপায়টাই বেছে নেয় । বৈতল ধর্মান্তরিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় । সব শুনে দুর্গাবতী হাসে । বলে,
--- জানি
--- কিতা জানছ ।
--- কেনে তুমি ধর্ম বদলাইতায় ।
--- কেনে ।
--- তুমি হারি গেছ ।
--- না, তুই জানছ না
--- তুমি যেতা চাও আমিও চাই । এক বেটায় দুষ করছে এর লাগি মাটিত ভাত খাইতাম নি ।
--- দেখো গো মাই, তুমার আদরর যম ঠাকুররে আমি ডরাই না । বৈতল কেউরে চুকে না । তারে যেতা করার আমি করমু । হিন্দু থাকলেও করমু বাঙাল অইলেও করমু ।
--- কিতা করবায় ?
--- তার ইও ছেচিয়া পানিত গাড়ি দিমু, তেউ শান্তি ।
--- তে আর ফজলু মিয়া অইতায় চাও কেনে ।
--- ডরে নায় রে বেটি ভালবাসায় । বেশুমার প্যার । মামুর কিতা দেখচছ তুই । দেখছি আমি আর দেখছে তর পুড়িয়ে । মানুষটার শরিল থাকি লুক্কা বারয়, লুক্কার আগুনে দুনিয়ার সব বাদবাদুয়া পুড়িয়া খাক অই যায় । তুই পারতে নায় বাদ কাম করতে ।
--- তাইন তুমারে জাদু করছইন ।
--- তুই করচছ নানি বেটি । পানির পুক বৈতলের মাইনষর জঙ্গলো ছাড়ি দিচছ । বিলাই কুত্তার লাখান খাকরাখাকরি করার লাগি ।
--- আমি জাদু জানলে স্বর্গপুরি বানাইলামনে । ইতা দুখু পুখু বানাইলাম নানে ।
--- পিরাকি জাদু নায়রে বেটি পিরাকি প্যার ভালবাসা । মামুর কুনু ধর্ম নাই । তাইন ত ভগবান ।
--- মুসলমানর ভগবান নাই । আল্লা আছইন, খোদা আছইন ।
--- অউ এক অউ কথারে বিবি । তুই যখন দুর্গাবতী থাকি দুরজন বিবি অইবে তখন আপনে আপ সব বদলি যাইব । ভগবান অই যাইবা আল্লা । নতুন মানুষ অই যাইবে বুরখা উরখা লাগাইয়া । একদম মুখ ঢাকি রাখবে । কুনু হালায় যেন দেখত না পারে মুখ ।
--- আর তাইন যদি দেখইন । কিতা অইব মামুয়ে দেখলে । পাপ লাগত নায় নি ।
--- পাপ নায়, গুণা । মামু আর মানুষ এক অইল নি । দেখবে তাইন তর পুড়িরে কী মায়া করইন । দুই বাইচ্চার লাখান খেইড়ো বই যাইন চান্দু আর মনির লাখান লাগে । অলা মায়াধারী । আর কেউ আছে নি তাইর আপনা
--- আছে আছে । তাইরে ভালা পাওয়ার আছইন । দেখ না নি তুমি । দিনে একবার দেখলে কিলাখান পাগল অই যাইন ।
--- ইতা স্বার্থর লাগি । আর বাড়ির বিলাই বাইচ্চারেও মাইনষে ভালা পায় । বাইচ্চার লাগি নায়, বাইচ্চার লাগি নায় । মায়ে নু ইন্দুরর গাতো থাবা দেয় । তরে হাতো রাখার লাগি ইতা করে ।
   মামুর মাজারের সামনে গিয়ে বিহ্বল হয়ে যায় বৈতল । কোথায় সেই শন বাঁশের মোকাম । মাটিজুরির ঠিকাদার একদিক পাকা করে দিয়েছে ইট সিমেন্ট দিয়ে । মামু থাকে নি, পির তার মাটির ঘরের মাটিতেই শুয়েছে । কিন্তু এখন যা হচ্চে সে তো একেবারে এলাহি কারবার । অনেক বড় বড় পৃষ্ঠপোষক হয়েছে মামুর । কবরের সামনে নতজানু হয়ে বসে বৈতল । হাউ হাউ করে কাঁদবে বলে চেষ্টা করে । বৈতল পারে না । বৈতলকে কেউ কোনোদিন কাঁদতে দেখেনি । কবরের উপর কী সুন্দর লাল শালু চড়িয়ে দিয়েছে দুখু । মামুর সব ব্যবহৃত জিনিষের উত্তরাধিকারী এখন দুখু । পিরের এন্তেকাল হওয়ার অনেকদিন পর দুখু আবার সবাইকে ডাকে । আপদ বছইর সঙ্গে বৈতলকেও ডাকে । বলে,
--- আয় আমরা হক্কলে মিলিয়া একবার কান্দি ।
      বৈতল ছাড়া ওরা সবাই কাঁদে । দুখু বৈতলকে নিয়ে যায় মামুর মাটির ঘরে । ওঘরে এখনও নির্মাণ-কার্যে হাত পড়েনি ।
  দুখু বৈতলের কোমরে হাত দিয়ে বলে,
--- আনচছনি ।
--- কিতা আনতাম ।
--- এরে, যন্তর মন্তর আনচ্ছনা নি ঠিক অউ ।
--- কিতা কছবে
--- কেনে । কটা, চিলিম, তেনা, পাত্থর, শলই আর ঘাসপাতা । 
     তিন নেশাড়ু পুরনো দিনের বিস্ময়ে তাকায় দুখুর মুখে । দুখুর মাথায় যে কখন কী বুদ্ধি খেলে কেউ বুঝতে পারে না । কিন্তু তিনজনেই এখন দুহাতে থাবড়ায় যার যার মুখে । বলে,
--- তবা তবা ।
 দুখু দুঃখের হাসি হাসে । বলে,
--- তবা কিতা বে । গুনার ডর ডরাইরে । মামুয়ে তো সব জানতা । মামুরে লুকাইয়া খাইচছনি কুনুদিন । তে ।
--- তে আবার কিতা । লুকাইছিনা কিন্তু তান সামনেও খাইছিনা ।
--- ইখানো কুনু অখন আছইন নি তাইন । তাইন বারো, মাজারো । খাইলা রেবা, খাইলা । একদিন দেখিলাই আবার আমরার মিলাপ । এর পরে তো শকুন পড়ব । আমারেও খেদাই দিব । মামুর জিনিষ উনিশ যেতা আছে, নিতে নি কিচ্চু ।
--- কিতা নিতে ।
বৈতল বলে,
--- নিমু ।
বছই বলে,
--- নিমু ।
দুখু বলে,
--- কিতা নিবে ।
  বৈতল প্রথম দাবি উত্থাপন করে । প্রথম ওয়ারিশান । বলে,
--- মামুর গার এক টুকরা তেনা দিবে নি । পিরর গার গন্ধ লইয়া বাচমু সারা জীবন ।  
  দুখু মামুর ব্যবহৃত ছেড়া লুঙি একটা দেয় দুখুকে । বলে,
--- নে হালার হালা, তোর নানিহালি সম্পত্তি ।
 দুখুর গলা ভারি হয়ে আসে ঠাট্টার সঙ্গে । আবার বলে,
--- আমার কথা রাখবে নি একটা ।
--- , কছ না ।
--- তুইন যা গি টাউন ছাড়িয়া । আর কুনুদিন আইছনা ।
--- কেনে । তর ডরে নি ।
--- না রে, আমারে ডরাইছ না আমি আর কিগু ।
--- একবার পারচছ না মারতে আর পারতে নায় । বৈতলরে মারা যাইত নায় । বৈতল মহাবীর ।
--- অই পুঙ্গির ভাই । আমি পানিত না ফালাইলে অউ ফাল ফালাইতে পারলে নে নি অখন ?
--- লগে লগে তো বুঝছিনা । গুসা অইছিল খুব । পাইলে মারি লাইলামনে তরে ।
--- মেড়া ।
--- মেড়া নায় । তুই যদি দুস্তি নিভাইলে, তে কেনে টানি লইগেলে বান্দো ।
--- কইতাম নি হাচা কথা । তরে না লইয়া গেলে ইটখলার হিন্দু হকলে তরে শেষ করি দিল নে । হরিৎবরণো মারিয়া ঘনিয়ালাত ফালানি অইল নে ।
--- তরে কে কইল ।
--- আমি অখন বলদ পার্টিত কাম করি নানি ।
--- ও হালার হালা । যমে করাইছে ।
--- ইতা আমি জানি না । তে তর দুশমন কিন্তু কুনু মুসলমান নায় । এর লাগি কইয়ার ভাগ ।
   হাতে ধরা আধোয়া নোংরা লুঙির স্বর্গীয় সুবাস প্রাণভরে উপভোগ করে বৈতল । গন্ধের সঙ্গে কথা কয় বৈতল । বলে,
--- মামু, আমারে ভালা থাকতে দেও । বৌ-বাইচ্চা নিয়া আমি সুখে থাকতাম । আমার দোস্ত তিনটারে ছাড়িয়া আমি কই যাইতাম । কই দেও ।






চলবে। 
< উজান পর্ব ৩৯ পড়ুন                                                    উজান পর্ব ৪১ পড়ুন > 



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন