.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

শুক্রবার, ৭ অক্টোবর, ২০১৬

সুরমা গাঙর পানিঃ উজান পর্ব ৩১

(দেশভাগ এবং পরের দশকের কাছাড় সিলেটের প্রেক্ষাপটে রণবীর পুরকায়স্থের এই উপন্যাস ছেপে বের করেছে দিন হলো। ভালো লাগা এই  উপন্যাস পুরোটা টাইপ করে তুলে আমার প্রিয় কথা শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। আশা করছি আপনাদের সবার এটি পড়তে ভালো লাগবে। সম্পূর্ণ উপন্যাসের সংলাপ ভাগটি সিলেটিতে -সে সম্ভবত এই উপন্যাসের সবচাইতে আকর্ষণীয় দিক। আপনাদের পড়বার সুবিধে করে দিতে, ঈশানে এই উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে আসছে। আজ তার  উজান  পর্বের  অধ্যায়  একত্রিশ     ---সুব্রতা 
মজুমদার।)  

একত্রিশ

   ভাদ্র মাসের শুরুতেই বাতাসহীন গুমোট গরম । মনসা আইর জন্ম ভাদ্রমাসে, তাই এত গরম, শ্রীকৃষ্ণ ঠাকুরেরও জন্ম ভাদ্রমাসে তাই দুএকদিনের হাওয়া বাতাস । মামুর বাড়িতেও মাঝে মধ্যেই মোচ্ছব হয়, দুখু লাগিয়ে দেয় এটা ওটার উৎসব । দুখু বলে, ওয়াজ । বলে,
--- তুই বেটা চাচ, তর হক্কলতা আমরা জানতাম, কিন্তু আমরার মজহবর কিতা কেমনে হয়, কিচ্ছু জানতে নায় ।
--- কিতা জানতাম । ইদ হয় জানি, বকরিদো ছাগল গরু খাছ, অউত্ত জানি ।
--- আর ওয়াজ ।
--- ওয়াজও জানি । ওয়াজ করি নমাজ পড়া হয় ।
--- ওয়াজো ভালা ভালা কথা কওয়া হয় । নামকরা মৌলবী আইন । জলসা হয় ।
--- আইচ্ছা বেটা মৌলবী, তর আর ইমামতি করন লাগত নায় । ক চাইন তর নবির জন্ম কোন মাসো ।
--- নবির জন্ম ।
 মহাবিপদে পড়ে যায় দুখু । আপদের দিকে তাকায় । বলে,
--- কই দে ইগুরে ।
  দশাসই আপদ আলিও সঙ্গে সঙ্গে বছইর কাঁধে হাত দেয় । বলে,
--- ক বেটা বছই, মুসলমান অইয়া নবির জন্ম জানত নায়, অত আড়ুল পাইল নি আমরারে কই দে ।
 শেষ পর্যন্ত দুখুর কাছেই আবার ফিরে আসে প্রশ্ন, এবার দুখুর আর দোলাচল নেই, প্রত্যয়ে ভর করে বৈতলকে বলে,
--- তর মতো বারো মাস নাই আমরার । নবি দিবস ঘুরি ঘুরি আয় । যেলাখান ইবারর ইদ পড়ব আশ্বিন মাসো । অলাখান । আর তুইন বেটা ইতা দি কিতা করতে ? তর আর বাঙ্গাল হওন লাগতনায় নু কই দিলাম ।
--- না, তেও, জানি রাখা ভালা । নাইলে তুই অউ কইবে কিচ্ছু জানি না ।
   ফতেহা দোয়াজ দহম এর উৎসব, মানে নবি দিবসও খুব ধুমধামে হয় মামুর খানকায় । মাটিজুরির ঠিকাদার সাজিদ আলি টাকা দেয় উৎসবের । সাজিদ ভাই দুখু বছই আপদ আর বৈতলের জন্য বিশেষ ভোজের আয়োজন করে । বলে,
--- তাইন তো পির, দাতা । আপনারা তান খাদিম, আপনারা খুশ অইলেউ তাইন খুশ । তে একখান আর্জি আছে আমার । করি দিবানি ।
   দুখুর ধূর্ত চোখে মিটিমিটি হাসি । বলে,
--- জবাই তো করি লাইছইন, আবার কেনে বিসমিল্লা করবা । কইন ।
--- যাইতাম নি । তে কই লাই । মামুরে লইয়া আমার দলিজে পাও রাখবা আপনারা একদিন । আমি গাড়ি পাঠাই দিমু ।
--- দলিজ কেনে । আর ভিতরে যাইত নায় নি গাড়ি ।
--- কিতা যে কইন, আমার মঞ্জিল অউত্ত মামুর । তাইন অউ মালিক । তান দোয়া না থাকলে কিচ্ছু অইত নায় । টেম্পু গাড়ির হেণ্ডিমেন অইয়াউ থাকলাম নে ।
  মাটিজুরির মানুষ সাজিদ মিয়াও বৈতলকে ধর্মপ্রাণ খাদিম বলে ধরে নেয় । পিরের তল্পিবাহক মানেই পাক বান্দা । আর দুখুরও কোথাও যেতে বৈতলকে চাই, সে চুরির কুটুম্বিতায় হোক, গাঁজার আসরেই হোক, এদিক-ওদিক ভ্রমণেই হোক । দুখু জানে পিরের সঙ্গ দেওয়া মানে ধর্মীয় নিয়মকানুন, আর বৈতল কোথাও কখনও বেমানান হয় না । বৈতল মিয়া আর আপদ আলির ফারাক থাকে না, বৈতল থাকলে দুখুর চোখ বেড়ে যায় একজোড়া । বিপদ আপদ ধারে কাছে থাকে না, তার উপর মামুর প্যার, বৈতল কাছে থাকলে মামু সব কথা শোনে । তবে গাড়ি পাঠানোর কথা ঠিকঠাক হওয়ার পর সাজিদ মিয়াই ক্যাচাল বাঁধিয়ে দেয় । বছইর বৌকে নিয়েই উৎপাত । সাজিদ আলি মানুষটা দিলদরিয়া হলে কী হবে, একটু বেটিঘেঁষা । পরের বৌ-এর পিছনে ছোটার অভ্যেস । আপদ আলির বৌ বারমাসের বেমারি, দেখতে শুনতেও তেমন সুন্দরী নয়, কাটাখোট্টা চেহারা । আপদ বলে তার বৌ পরি থাকিও ভালাকেন জিজ্ঞেস করলে বলে,
--- নিজে দেখিয়া নিকা করছি । মা বাপে দেখিয়া করাইলে কইতাম ইনো খুত হিনো খুত । দুই বেলা তো রান্দিয়া দেয় অখনও । তে ।
   বিপত্তি হল বছইর বৌকে নিয়ে । দুখু আবার ছড়া কেটে বছইএর রূপ বর্ণনা করে । বলে,
--- বড় বিলর ঢেউ, ফালদি উঠে রউ ।
     বড় মামুএ বিয়া করলা গদা মারা বউ ।
   আপদ বলে বছইর বৌর সঙ্গে দুখুর লেটপেট আছে । দুখু বছইর বৌকে আদর করে পেদেলিবলে ডাকে । মোটাসোটা বাঙালি ঘরের আদুরে বৌ বছইর । একটা পুরুষ টানার আকর্ষণও আছে । তাই সাজিদ মিয়া বছইকে বলে,
--- ভাবিজিরেও লইয়া আইও বছই ভাই ।
  বছই খুশি হয় । বলে,
--- গাড়িত জাগা অইব নি ।
মামু ঘোঁৎ করে বারণ করার আগেই বৈতল বাধা দেয় । বলে,
--- ভাবি অখন কেমনে যাইবা সাজিদ ভাই । ভাবির নু অইতা ।
   না জেনেই বলে দিয়েছে বৈতল । পিরের চেলা তো, মুখের জবান লেগেও যেতে পারে । গরিবের যুবতি স্ত্রী গর্ভবতী থাকবে না এ হতে পারে না । অবাক চোখে বছই বৈতলকে দেখে । আর করুণ চোখে সাজিদ মিয়াকে নিরাশ করে ।
   মুসলমানের মেয়ে বৌ সঙ্গে নেওয়ার অনেক ঝামেলা । রিক্সা চালাতে চালাতে বৈতল দেখেছে, শাড়ি কাপড় দিয়ে রিক্সাকে একেবারে লখিন্দরের বাসর বানিয়ে ফেলে । বোরখায় ঢাকা থাকে নারী, তার উপর পুরনো শাড়ি দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয় রিক্সা । বৈতল এসব ঘোমটা বোরখার খেলাপ । দুর্গাবতীরও এসব কোনও ঢাকাঢুকি নেই । চুরি করে শরীরের এক আধ খাবলা না দেখলে কিসের পুরুষ । চরিত্রহীন জমিদার ব্যাটাও তো দুর্গাবতীর ঘোমটাহীন দেহটার লোভে ঘুরপাক খায় পুকুরপারের ঝুপড়ি ঘরে । দুর্গাবতী তো ইদানীং শাড়ির সঙ্গে ফুলকাটা ব্লাউজও পরছে । সাজগোজের দুর্গাবতীকে বৈতলের সুন্দরই লাগে, তবে পরপুরুষের দেখা ঘোর অপছন্দ বৈতলের । বছইর বৌ-এর আছে ছল্লাবল্লা, ওকে সঙ্গে নিলে সাজিদ মিয়াকেও ছেড়ে কথা কইবে না বৈতল, যেখানেই যত যমজমিদারের উদয় হবে, বৈতল তার বিনাশ করবেই করবে । তবে বৈতল এতসব জটিল ভাবনার কথা বলে না বছইকে । বছইকে বলে অন্য কথা,
--- জিপগাড়ি কুনু ঢাকা নি বেটা । খুলা গাড়ি ঢাকলে কত শাড়ি লাগব ক ।
    ঘনিয়ালা আর মাটিজুরির ফারাক বিস্তর । ঘনিইয়ালা তো শহরের বস্তি, ঘিঞ্জি । মাটিজুরিতে সাজিদ মিয়ার বাড়ি তো বাড়ি নয় শুধু, এক এলাহি প্রাসাদ নদীর পারে কম করেও এক বিঘা জমির উপর বাড়ি । ঢোকার মুখেই প্রশস্ত দহলিজ ।
   মামুপিরের দোয়া পাওয়ার লোভে গ্রামের মানুষ এসে জড়ো হয় মিয়ার উঠোনে । দলিজে বসে আছেন মামু উজ্জ্বল মহিমায়, কাঠের হাতলওয়ালা চেয়ারে সবুজ রঙের সিংহাসনে । মামু এত মানুষজন দেখে বিরক্ত, মুখ থেকে ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ বের করে, সারা শরীর চুলকোতে শুরু করে । আর তখনই তিন শাকরেদ দুখু বছই আর আপদ মামুর বুকপেট আর হাতের দখল নেয়, চুলকে দেয় । দুখু মামুর মুখে হাসি এনে দেয় কাতুকুতু দিয়ে । হাসলে মামুর মুখে স্বর্গের আলো খেলা করে । যেন এক দেবদেহ, শিশুর সারল্য মামু দুখুকে মারে । এরপরই শুরু হয় সব মুসলমানি কাণ্ডকারখানা । মামু তো আর কথা বলতে পারে না, তাই দুখু মিয়া পিরের তরফ থেকে মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে আল্লার নাম জপ করে । মানুষের রূপধারী নবির কথা বলে, বলে ইয়া রসুল আল্লা, ইয়া হবিব আল্লা আরো কত কী বলে দুখু । তখন দুখুকে খুব শ্রদ্ধেয় মনে হয় বৈতলের । তবে এসব সময়ে বৈতলের খুব অস্বস্তি হয়, সে মুসলমানের ধর্মকর্মের খুব কিছু বোঝে না । না বুঝেই দুখুর সঙ্গে লাগালাগি করে । বলে,
--- বাঙাল হকলে কিতা হিন্দুর কাছ থাকি প্রণাম করা হিকছে নি ।
--- মুসলমানে কাফেরর কাছ থাকি কিচ্ছু নেয় না ।
--- পুরা নেয় না, আধা নেয় । আধা প্রণাম তো করছে বেটা ।
--- ইতা প্রণাম নায়, ইতারে কয় সিজদা । নমাজ পড়ার সময় দুই হাঁটু কপাল নাক মাটিত লাগানি লাগে । বহুত নামাজির কপালো দেখবে নে দাগ পড়ি গেছে । তারা পাক পুন্যাত্ম ।
--- সিজদা নায় বেটা, সিজদা চিনি নানি । অউ যে পাও হাত দিয়া করছ ।
--- ইতার নাম কদমবুসি ।
--- ইতা যতউ বুসিবাসি করছ, মামুর খিদমতগারি করছ, তোরে কেউ ইমাম বানাইত নায়, ওয়াজর লেকচারও দিতে পারতে নায় । এর তাকি এক কাম কর...
--- হিন্দু অই যাইতাম, নানি । ইতা নাপাক মাত মাতিছ না আল্লার দরবারো । গুনাগার অই যাইবে ।
--- ধুর বেটা, তরে নেওয়ার লাগি যেন সাধু সন্ন্যাসী হকল বই রইছইন কালীবাড়ির চরো । পাঁঠা অইলে তেও রামদার এক ছেদে লামাই দিল নে । তর মতো খাসিরে নিত নায় ।
   সেই দুখুই আবার বৈতলের গান শোনে বিভোর হয় । বছই আর আপদকে সঙ্গে নিয়ে হরিৎবরণ জমিদার বাড়ির উঠোনে বসে শোনে মনসামঙ্গল গান । মুগ্ধ হয়ে বলে বন্ধুদের,
--- ইগুর গলাত বেউলা বেটির দুখ নি অলা উৎলাই উঠে, নাচে কিলাখান কমর নাচাই নাচাই, দেখরে নি । ইগু হাচাউ গুরামি নি বে ।
   গুরমি মানে কিম্পুরুষ । শ্মশ্রুবিহীন গাল আর সাদা শালোয়ার কামিজে সেজে যখন বৈতল নারায়ণং নমস্কৃত্য...’ বলে মনসামঙ্গলের গান আর নাচের সূচনা করে জমিদার বাড়ির উঠোনে, তখন মন্দির ঘিরে বোল ওঠে জয় আই বিষহরিমুহূর্মুহু শঙ্খধ্বনি আর জোকার । বৈতলের জামায় পোষাকে পেখম ধরে । দুখু তার দলবল নিয়ে এসে দোস্তকে উৎসাহ দেয় । কিন্তু মুখোমুখি হলে ওরা লড়াই করে । বলে,
--- তুইন কুনু বেটা বাবন নি, ই সংগস কিড়িমিড়ি কিতা কছ ।
--- ইতা কওন লাগে, তুই বুঝতে নায় । তুই অইলে আউয়া চাড়াল বকার ডিম । তুই যে ইমামতির ভাও মারছ, পারবে নি এক লাইন কুরাণ পড়তে ।
--- না, নমাজর সময় তো তুইন পড়ি দেছ ।
--- কেমনে বুঝতাম, তুই তো কিচ্ছু জানছ না, নবির জন্মদিনও জানছ না ।
--- তর যত আজারির মাত । নে, নাচচছ ভালা, গাইচছ ভালা, অখন ক খাইতে নি ।
--- কিতা । নাবে, শ্রাবণ মাসো ইতা খাইতাম নায় ।
   শ্রাবণ মাসে বৈতলের শুদ্ধাচার । যতদিন পুঁথিপড়া ততদিন সে কোনও নেশা ভাঙ করে না ।
   মামুপিরের সঙ্গে যতক্ষণ থাকে তখনও ওরা নেশা করে না । আপদের লুঙির গিঁটে গাঁজা কলকে আর দিয়াশলাই এর পুটুলি থাকে না সেই কদিন । সাজিদ মিয়ার বাড়িতে ওরা সম্মানিত অতিথি, মামুর সস্মান জড়িতসাজিদ মিয়ার বাড়ির নেশায় পেয়ে যায় বৈতলকে । বাড়ি যেমন রাজপুরি তেমনি তার আশপাশ প্রকৃতি নদী । পাহাড়ের উপর গাছগাছালির ঘেরা দালানবাড়ি । টিলার নিচে নদী । নদীর উপর দুদুটো ছিপ নৌকা আর সর্বক্ষণের এক মাঝি । নদীর এপার ওপার করার জন্য । নদী দেখে বৈতলের মন উতলা হয় । মাঝিকে বলে,
--- কই যাও ।
--- কই আর, ইপার আর হিপার ।
--- ইতো বুঝিয়ার, আর যাও নানি দুরো ।
--- যাইন ভাইছাবে । কুচিলা যাইন, লালা যাইন ইবায় । হিবায় যাইন কাটাখাল ।
--- হাতরাইতায় পার নি ।
--- পারি ।
--- গেছনি । কাটাখাল থাকি বরাক, বরাক থাকি কুশিয়ারা, সুরমা ।
--- গেছিনা, হুনছি ।
--- যাইতায় কেমনে, হিতো পরদেশ, পাকিস্তান ।
    জলের নেশায় মাতাল হয় বৈতল । ভাবে লুঙ্গি গুটিয়ে দেয় এক ঝাঁপ । জলের সঙ্গে কেন যে দেশের শত্রুতা । জলকেও ভাগ করেছে । গভীর জলে সীমানা । বৈতল ভেবে পায় না নদীর গভীরতা উপর থেকে মাপবে কী করে সীমান্ত পুলিশ ।
     বৈতলের মন তো পাগলপারা । নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার উপক্রম করতেই উপর থেকে দুখুর হাঁক শোনে,
--- ওবা বৈতল মিয়া ।
  দুখু চালাকি করে । বৈতলের পরিচয় লুকিয়ে রাখে । বলে,
--- কিতার লগি ক । দুই দিনর লাগি আইছি, তুই মিয়া বনি যা, কিচ্চু অইত নায় ।
--- তরে তে আখড়াত লই যাইমু, অইবে নি দুখু দাস ।
--- না ।
   এখানেই দুখু আর বৈতলের শৈশব সহচর লুলার ফারাক । ওরা হিন্দু মুসলমান দুই বন্ধু সিলেট ভ্রমণ করেছে, থেকেছে মন্দিরে মসজিদে । কখনও লুলা দাস আর বৈতল দাস । কখনও রুল আমিন বেজ স্বনামে বৈতল মিয়ার দোস্ত । বৈতল আর লুলা এরকম একা টিলার উপর মাজার ও মসজিদে কাটিয়েছে এক রাত । সিলেট শহরের মাঝখানে শাহজালালের দরগা । বৈতলের মাকে তখন ভূতে ধরেছে । আসলে বাপের যন্ত্রণায় মা ভুল বকে, বৈতলকে দূরে সরিয়ে দেয় । বলে দূর যা দূর যা, বেইমান বেটির পুতলুলা বলেছে শাহজালালের দরগাকথা । শাহি ইন্দারার পানি নিয়ে গেছে এক কৌটো । মাকে খাইয়েছে । মা সুস্থ হয়েছে । দিন দশেকের মতো বৈতলকে বকাবকি করেনি । লুলাকে বৈতলকে আদর করে সিদলপোড়া, চেংপোড়া বানিয়ে খাইয়েছে । দুখুর ডাকে লুঙির পাড় ছেড়ে দেয় বৈতল । জলের অতল খোঁজা ছেড়ে পাহাড়চুড়ার সাধুসঙ্গে ফিরে যায় । দুখুকে বলে,
--- আইয়ার । উবা ।
  সাজিদ মিয়ার বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে দুখুর দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় বৈতল । বলে,
--- টান ।
দুখু টেনে তুলে বন্ধুকে । বলে,
--- খাইতে নানি বেটা । মিয়া ভাই এ ডাকিতরা তখন থাকি ।
--- তর দুয়া দরুদ যে অত তাড়াতাড়ি শেষ অই যাইব কেমনে ভাবতাম ভাবলাম একবার আমার বইয়াখাউরি থাকি অই গিয়া । এক বুড়ে আমার সুরমা, আমার পিয়াইন ।
--- তুইন ভাগতে আছলে বেটা রিফ্যুজি ।
--- না বে ভাগতাম কেনে । ভাবছিলাম । ভাবতে ভাবতে গেলাম গি অলাখান এক টিল্লার উপরে । আমার গুরুয়ে কইছলা, ভক্তিভরে শুনাইছলা তান গুণর কথা। আমি দেখিয়া আইছি । তুইতো বেটা খালি ইমামতি করছ, দেখচছ না দুনিয়ার কিচ্চু । দরগা টিল্লার নাম হুনচছনি ।
--- কানো । মাটিজুরিত অউ নি, না রাঙাউটিত ।
--- ধুর বেটা তুই আচছ তোর মাটিজুরি আর রাঙাউটি ভিচিংচা নিয়া । ছিলেটর নাম হুনচছনি । তর টাউনোর দশখান হামাই যাইব । অলা সুন্দরনদীখান আরো সুন্দর । হিন্দু হকলে কইন সুন্দরী বেটির লাখান এর লাগি সুরমা, আর মুসলমানে কইন চউখর কাজল, সুর্মা । অউ অইল সুরমা নদী । অউ নদীর ঘাটো বুলে হুরি পরি হকলে রাইত গোছল করতা, ফক্‌ফকা চান্দনির রাইত তাইন আইছলা শিষ্য সাবুদ লইয়া এর লাগি এক ঘাটোর নাম চান্নি ঘাট । ঘাটর সামনে অউ এক লম্বা ঘড়ি বাড়ির লাখান, কোন এক আমির মানুষ আলি আমজদে লাগাই দিছইন । নদীর উপরে এক লুহারপুল, এক সাহেবে বানাইছইন, মাইনষে ইপার হিপার করইন, নাম কিন পুল । ইতা কিচ্ছু আছিল না, ঘড়ি ও না পুলও না । অউ চান্নি ঘাটো এক লগে বউত নৌকা আইয়া ভিড়ল একদিন, মেলা লাগি গেল । শয়ে শয়ে মানুষ নামলা, সব সাধু । কুল্লে তিনশজন আর তারার যে মুরব্বি তাইন অইলা রাজা, রাজার রাজা । কই থাকি আইছইন ক চাইন ।
--- আমি কেমনে কইতাম । তর ইতা মাতর কল্লা গর্দনা কিচ্ছু বুঝিয়ার না । ছিলটর কথা কইরে বুঝিয়ার ।
--- অউত্ত বাট্টিবেটার বুদ্ধি খুলছে ।
--- ছিলেটি রাজার গপ কইরে ।
--- আবার আউয়ামি কররে । ছিলেটো তখনো আছইন রাজা, তান নাম গবিন্দ ।
--- তুইন তো বেটা গাউয়া মাইমল, কৈবর্ত । অততা শিখলে কেমনে ।
--- আমার গুরু আছলা করাতি, তাইন জানইন সব । তান কাছ থাকি হুনছি ।
--- আইচ্ছা তে ক গোবিন্দ রাজার গপ ।
--- তাইন আর কেউ নায় বেটা, তাইন হজরত শাহজালাল । নাম হুনচছনি ।
--- হুনতাম না কেনে । তাইন আনছিলা জালালি কইতর, আল্লায় দিছলা তানে ।
--- অয় হক্কল তাউ আল্লায় দেইন । তান বাড়ি কই আছিল জানছ নি । নবিজির দেশ কই জানছ নি । আরব, আরব থাকি আইছলা, এমেন বুলে আছিল তান দেশ । তুরুক হকলর লগে থাকতা । তানে একবার তান গুরুয়ে কইলা, যাও হিন্দুস্থান । হিন্দুস্থানো গিয়া আল্লার নাম জপ করবায় । কইয়া তানে এক কটাত এক মুইঠ মাটি ভরি দিলা, কইলা, অউ মাটি যে মাটির লগে মিলব হনোউ তুমার কাম । দিল্লি দাল্লি বউত ঘুরলা, মাটি আর মিলে না, বউত শিষ্যসাবুত অইল তিনশ জনরে লইয়া আইলা চান্দনি ঘাটো । তখন ছিলট এক গাউ, গাউর এক টিল্লাত আইয়া বানাইলা ছাপটা । থাকলা, আবার তো যাওয়ার সময় অইল, আকতা তান মনো অইল মাটির কটার কতা । মিলাইলা, মারহাবা, মিলি গেল । অউটিল্লাত দরগা বানাইলা, ইন্দারা পানির লাগি । অউ ইন্দারার পানিত জানছ নি কিতা আছে, খাইলে কুনু অসুখ বিসুখ থাকে না । মস্ত মস্ত গজার মাছে ভর্তি । অউ কুয়া আর মক্কার জমজম বুলে একঅউ পানি, তলে তলে আইছে । একজন বেপারি একবার মক্কা গেছলা, বউত সোনাদানা কামাইয়া এক বুকচির ভিতরে সব লইয়া খালি ঘুরে, কাবা শরিফ জিয়ারত করত গেছে পিঠো অউ বুচকি লইয়া তখন অউ, তার মতো চুল মুন্ডাইল, সাদা দুই টুকরা কাপড় পিন্দা এক হাজিয়ে তানে কইলা, ‘ইতা কিতা বা পিঠো, আল্লারে দিতায় নি ?’ হে কয় না আল্লায় দিছইন, লই যাইতাম বুরুঙ্গাতবুরুঙ্গা তার বাড়ি আরি, হি সাদা কাপড়র সাধুয়ে কইলা, ‘আউয়া নি বেটা, অউ জমজমো ছাড়ি দেও, তোমার ছিলটো পৌছি যাইব । হিখানো জালাল পিরে টিল্লার উপরে বানাইছইন এক আজব ইন্দারা, ইন্দারার কুনু তল নাই, সোজা জমজমর লগে মিল তলেতলেবেপারি বেটা তো বুঝি গেছে হে ঠগর লগ পাইলিছে, হেও ছিলেটি বেটা কম নায়, কইল হাচা নি চাচাচাচায় কইলা অয়হে কইল আইচ্ছা, কইল ফালাইদিব বুচকি । অউ ভাগল । এর পরে সাদা কাপড়ের বেটায় তো ছাড়ে না, রুজ রাইত অউলেউ জ্বালায়, কয় আল্লার জিনিস বেটা আল্লায় যখন দিছইন ফিরাই নিবা নি কুনু, আল্লারে অবিশ্বাস করিছ না, অবিশ্বাসীর কিতা অয় জানছ না নি । দোজখো যাইতে নি হাবিয়াত গেলে পানি পাইতে নায়, খালি আগুনো জ্বলবে ।রোজরোজই খোয়াব দেখতে দেখতে হে একদিন কয় কিতা আর অইব, তান মাল তাইন নিলে নিবারাইত থাকতে থাকতে বুচকা ইগু নিয়া ফালাই দিল জমজমর পানিত, হজরত শাহজালালর নাম হইল তিনবার, আর চানা মটর যেতা ভিজাইয়া লই গেছিল মচাত করি, আল্লারে ডাকে আর এক একটা করি ইবায় রাখে, ইবায় থাকি হিবায় আনে, হাজার হাজার বার নাম লয় আল্লার । আকাশ সাফ হইতেউ সব চানামটর ফালাই দেয় পানিত । সোনাদানার বুচকি ফালাইয়া বেপারি থাকি ফকির অই গেল, ফকির অইয়া বেটার বুলে উবা ফাল । গেছিল বেটা কত দামি দামি কাপড় চুপড় পিন্দিয়া, বুরুঙ্গাত ফিরিয়া আইল তালি দেওয়া ছিড়া ময়লা এক গিলাবাইয়া গাত দিয়া । কেউ চিনে না, হেও চিন দেয় না । অখনও আছইন তাইন বুরুঙ্গাত ।
   অধৈর্য তিন বন্ধু খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিল বৈতলের কিচ্ছা । যে দুখু সর্বক্ষণ বৈতলের কথার মাঝখানে ফুট কাটে, সেও চুপ  । আসলে সবাই মজেছিল ঐ বোচকাটি নিয়ে, কী হল শেষ পর্যন্ত । এত সব সোনাদানা কোথায় গেল । অসম্ভব সব অবাস্তব গল্প বলায় ওস্তাদ এই বৈতল । ওর আর এক রোগ, কাহিনীর শেষটা সহজে শেষ করে না । আগ্রহ তুঙ্গে উঠিয়ে সে মিটিমিটি হাসে, আর বিড়ি ফোঁকে । মামু পিরের সঙ্গে এসে কদিনের জন্য তো নেশার আসর চৌপাট, তাই বৈতল তার ভেল্কি দেখানোর জন্য সাজিদ মিয়ার দলিজের বাইরে তিন বন্ধুকে ইশারায় ডাকে । বলে,
--- দেখরে নি বেটা গাউ আলা মানুষ কিলা মামুর দিওয়ানা । অত মানুষ নি আইছে তানে দেখাত ।
   দুখু ভুলবার পাত্র নয় । বলে,
--- ইতো আইয়াউ দেখলে । আরো বেশি আছিল, বউতে গেছইন গিয়া । তুইন কথা ঘুরাইছ না, অখন ক বুচকির কিতা অইল । আর বুরুঙ্গার পির যে কইলে অখনও আছইন, কেমনে তান বয়স কত ।
--- কইমু কইমু অখন জিকির দে একটা ।
--- কেনে ।
--- দেছ না, গান গাইতাম । ইচ্ছা অইছে । আল্লার নাম কর, মাইনষে হুনব ।
দুখু আল্লার নাম নেয় বৈতলের কথামতো । সবাই মিলে ডাকে,
--- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রসুলুল্লাহ
  দুখু আপদ বছইর সমবেত আল্লা নামের মাঝখানে বৈতল ধরে গান,
--- ‘পয়লা বন্দনা করি মালিক ছত্তার
দুছরা বন্দনা করি নবি মছতফার
পুবেতে বন্দনা করি আসামর পাড়
দক্‌কিনে বন্দনা করি জিলা তিরপুরার
তিছরা বন্দনা করি ছিলটি মানুষ
বৈতল মিয়ার কথা হুন দিয়া হুশ ।
ধন আছিল জন আছিল, আছিল ধান চাউল ।
হরিণ আছিল, পাখি আছিল, আছিল মাছ হউল ।
কি অর লাগি গম, আল্লা আছলা লগে
পির মুরশিদ আউলিয়ার দুয়া আছিল সঙ্গে
যত নিয়ামত দিছিল আল্লা দুনিয়ার মাঝ
বাদশাগিরি করা আছিল ছিলেটির কাজ
আরব দেশর মাটির লগে মিল ছিলটির
এর লাগি বাস অইল বাবা শাহজালালর
জালালি কইতর উড়ে কাজল পাংখা দিয়া
আল্লা আল্লা জিকির পড়ে তার সবে বইয়া ।
 বৈতলের গলায় জাদু আছে । জাদুর টানে, গানের টানে অনেক মানুষ এসে জড়ো হয় তার চারদিকে । গান থামতেই চোখ মেলে তাকায় । বলে,
--- অইছে বাবাই হকল, গান শেষ, যাউকা ।
   বৈতল বছইর কাঁধে হাত দেয় । আপদের হাত ধরে, দুখুর ঘাড়ে দেয় কিল । আসলে বন্ধুদের ছুঁয়ে ভাবের ঘোর থেকে ফিরতে চায় । কিন্তু ভাব কি আর যায় । দুখুকে বলে,
--- ছিলেট গেছে না বেটা তর জন্মউ অইছে না । জালালি কইতর দেখচছ নি ।
--- দেখতাম না কেনে । যে কুনো মজিদউ দেখবে লাখে লাখে ।
--- দূর বেটা জালালি কইতর দেখতে অইলে যাওন লাগব ছিলেট টাউনো । আমরা গেছলাম, আমি আর আমার দোস্ত লুলা, রুল আমিন বেজ । তফনও নায় গামছাও নায়, কাপড়র এক টুকরা কমরো, গাত নিমা হাতো এক গামছার পুটলি, অউ লইয়া ঢুকিয়ার ছিলেটো । এক লুয়ার পুল, অলা নি লম্বা, অউযে কইছলাম কিনপুল, পুল পার অইয়াউ ঘড়িঘর, কয়টা বাজের তখন ইতা চিনি না, বাইচ্চা নানি । পুলর তলেও চান্নি ঘাট, যেনো আইয়া হজরত শাহজালালর নাও লাগছিল । আমরা হাটিয়া আইছি, সারা রাইত হাটছি, সকাল অইছে বুঝলাম চান্‌নি ঘাটো আইয়া, পুবে দি তখন এক মস্ত ডিংলার লাখান সূর্য উঠছইন । পাকনা লাল মিঠালাউর লাখান গুল আর তখন অউ জানছনি,হাজারে বিজারে কইতর উড়ি গেল পুলের উপরে দি, ইতা আর এক লাখান কইতর, গলাত ময়ূরর রঙ, নীল আবার চিকচিকিও করে । লুলা ইগুতো উস্তাদ, বউতবার আইছে, কয় জালালি কইতর, ইতা কেউ খাইন, যেলাখান দরগা শরিফর গজার মাছ কেউ খায় না ।
   সিলেট প্রেমে বিভোর হয়ে বৈতল আবার গান ধরে,
--- ‘জালালি কইতর উড়ে কাজল পাঙ্খা দিয়া রে ।






চলবে 

< উজান পর্ব ৩০ পড়ুন                                              উজান পর্ব ৩২ পড়ুন >

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন