.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

সোমবার, ৩ অক্টোবর, ২০১৬

সুরমা গাঙর পানিঃ উজান পর্ব ২৬

(দেশভাগ এবং পরের দশকের কাছাড় সিলেটের প্রেক্ষাপটে রণবীর পুরকায়স্থের এই উপন্যাস ছেপে বের করেছে দিন হলো। ভালো লাগা এই  উপন্যাস পুরোটা টাইপ করে তুলে আমার প্রিয় কথা শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। আশা করছি আপনাদের সবার এটি পড়তে ভালো লাগবে। সম্পূর্ণ উপন্যাসের সংলাপ ভাগটি সিলেটিতে -সে সম্ভবত এই উপন্যাসের সবচাইতে আকর্ষণীয় দিক। আপনাদের পড়বার সুবিধে করে দিতে, ঈশানে এই উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে আসছে। আজ তার  উজান  পর্বের  অধ্যায়   ছাব্বিশ    ---সুব্রতা মজুমদার।)  



ছাব্বিশ

  দুর্গাবতী জানে তার স্বামীর অনেক গুণ । গুণের মধ্যে অগুণও বিস্তর । কুপিলম্ফর শিখা হয়ে জ্বলে বৈতলের গুণপনা । শিখা স্থির হলেই হয় বিপত্তি, জরা বাঁধে গুটিগুটি হয় । বৈতলকে সর্বদা অস্থির করে রাখতে হয় । অগুণ নিয়ে চিন্তার অবকাশ দিলেই অশান্তি । দুর্গাবতী তাও রাগে । না বলার কথাও বলে তার উদ্ধারকর্তাকে । ভারে স্বামীসুখ দিতে পারেনি জে-মানুষ তার গুণ থাকলেই বা কী, না থাকলেই বা কী । বৈতল কি বুঝতেও পারে না কিছু, নাকি দুর্গাবতী অন্য সুখে বিভোর হয়ে উপেক্ষা করে স্বামীকে । স্ত্রীর উপেক্ষায় শীতলতায় আক্রান্ত হয় । নাকি দুর্গাই হিম হয়ে যায় ক্ষীণদেহী কৃষ্ণকায় মানুষটার সংস্পর্শে । নাকি তার উচ্চবর্ণের অহংকার দূরে সরিয়ে মিলিত হতে পারে না । দুর্গাবতী বৈতলের উপর ভরসা করে আবার বৈতলের নেশা ও পেশাকে অপছন্দ করে । পুঁথি পড়ার প্রশংসা যখন শোনে, গর্বিত হয় । কিন্তু কিম্পুরুষ বেশে নাচকে মেলাতে পারে না । তখন ঘৃণা হয় । দুর্গাবতী ঘর ছেড়ে চলে যায় জমিদারবাড়ির অন্দরমহলে । সুপুরুষ জমিদার যমুনাপ্রসাদের সুঠাম দেহ দেখে লোভী হয় । প্রলোভনের টোপ দেয় । আঠা লাগিয়ে রাখে এখানে ওখানে, সর্বশরীরে ।
    এদিকে, একা ঘরে নিজের বেশভুষা সাজায় বৈতল দাস ওঝা । পুঁথিপড়ার সাজ । মুখে পাউডার ঘষে, চোখে দেয় কাজল । দুর্গাবতী তখন ঘরের কাপড় ছেড়ে পাটভাঙা লালপেড়ে শাড়িটায় কুচি দেয় । আবার খোলে, আবার পরে । কুচি দেওয়া শাড়ি পরে তো আর ঘরের বেড়াকে দেখানো যায় না, আদর করা যায় নাতাই দুর্গাবতী আবার খোলে, আটপৌরে করে পরে । বৈতল তার সাজগোজ ভুলে এবার দুর্গাকে দেখে । মুগ্ধ চোখে দেখে । দুর্গার চোখে তখন আগুন, বৈতল চোখে চোখ রাখতে ভয় পায় । শরীরটাই দেখে, শরীর দেখে আর আশ মেটে না । বলে,
--- একটা পান বানাই খাওয়াও না । একটু সাদার গুড়া দিও ।
    সাদার গুড়ার কথায় বৈতলের মনে পড়ে পুরনো কথা । কালো রঙের ফিঙে পাখিকে বলেছিল এক দুপুরে । বিয়ানিবাজার রইদপুয়ানি গ্রামের গুরুকন্যাকে বলেছিল পান সেজে দিতে, বলেছিল সাদার গুড়া দিতে । সেই সাজা পানও তো হজম হয়নি বৈতলের । সব ছেড়ে ছুড়ে চলে এল । গুরুদেব চেয়েছিল জামাই করে রাখতে, চায়নার রঙ কালো বলে ফেলে চলে এল বৈতল । আর দুর্গাবতী তার বিপরীত, পাকা রুই মাছের মতো সোনার বরণ । বৈতলের বিয়ে না করা বৌ । দুর্গাবতী পান সাজে, খিলি বানিয়ে দেয় বৈতলের হাতে । বৈতলের তখন মৌতাত নআনি দোকানের ছোট আয়নায় কালো ঠোঁটে পানের লাল দেখে । দুর্গাবতীকে বলে,
--- দেখো দেখো, ঠিক ভূষণ উঝার মতো লাগের আমারে । লাগের নি কও ।
   করিমগঞ্জের ভূষণ চন্দ্র দাসের মতো উস্তাদ নেই দুজন এই উপত্যকায় । এমনকি সারা আসামেও । নতুন ওঝাদের প্রেরণা তিনি, গুরুও তিনি । ঝোলা সালোয়ারের উপর মেয়েদের মতো সাদা জামা, জামার কুচি কোমর থেকে হাঁটুর উপর । কানে দুল । বৈতল আয়না ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিজেকে দেখে । দুর্গার চোখের আগুনে নয় আনি আয়না ভেঙে চুরমার হয় । টুকরো টুকরো ছড়িয়ে পড়ে ঘরময় । দুর্গাবতীর আগুন-ঝরা চোখে তাকাতে পারে না বৈতল । চোখ বন্ধ করে । দুর্গাবতীর অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে বৈতলকে । বলে,
--- চউখ বন্ধ করলে কিতা অইব । চা, চাইয়া দেখ ঘরো, সারা ঘর হাসের । তোর মতো নিমাই-মুজরা নায়, দেখ দুর্গাবতী হাসের ঝলকাই ঝলকাই হাসের । আয়না হাসের দেখ, দুর্গার কোমর হাসের, দুর্গার বুক হাসের, পান না খাইয়াউ দুর্গার লাল ঠোঁট হাসের । দেখ বেটা দুর্গারে লইয়া কেমন খেলের আয়নার টুকরাইনতে । দুর্গার গার গন্ধ বার অর দেখ আয়নার টুকরাত ।
    দুর্গার এমন পাগলিনী বেশ দেখেনি কখনও বৈতল । তাই হতভম্ব হয়ে রয় বৈতল । দুর্গাবতী বুকের সেফটিপিন খুলে ভাঙা আয়নার টুকরোয় লাগিয়ে দেয় মৌমাছির হুল দুটো দু-বুকের । আয়নাকে ডাকে,
--- আয় চুকচুক, খা দুর্গারে, আর হউবেটারে ক করণ্ডি সাজাইত, বেটি সাজত । তারে ক, রিক্সা চালাইত গিয়া । যাচনা বেটা ইখান থাকি, যা জালাল পিরর আড্ডাত গিয়া গাইঞ্জা খা, নাইলে মউয়ার মালা গিলতে গিলতে যা গিয়া নাগাপট্টি । তোর দৌড় তো জানা আছে । ইখানো সালোয়ার জামা পিন্দিয়া গেলে নু মুড়া-হুরইনর বাড়ি খাইবে ।
--- আমি অখন আর রিক্সাআলা নায় । শ্রাবণ মাসো আমি রিক্সা চালাই না, আমার গুরুয়েও আরি রান্দা ঘষাইতা না । আমি অখন উঝা ।
--- ফালাই থ তোর উঝা । তুই গুরমি, এর লাগি তোরে নাচায় ।
--- আমি গুরমি । আমারে নাচায় । কে নাচায় ।
--- কে আবার, জমিদারে । খেমটা কইলে খেমটা, গুরমি কইলে বেটিন্তর জামা পিন্দিয়া চামর হাতো লইয়া গুরমি ।
--- যম । অউ যম ইগুরেউ আমি গুরমি সাজাইয়া নাচাইয়ার । তুই বুঝতে নায় । ইগু তো ধ্বজভঙ্গ, মনসার অভিশাপে তার বংশত কেউ জন্মায় না, পড়ে বাইচ্চা দিয়া যায়, বাইর থাকি । জানছ না ।
--- জানি জানি, কে ধ্বজভঙ্গ আর কে না সব জানি আমি । বড়বৌর যে বাইচ্ছা অইব জানছনি ।
--- অউক না, বাইচ্চা ইগু তার নায় ।
--- তে কার । তোর নি ।
--- আমার লাখান অউ এগু যায় । আমি চিনি, তুইও চিনছ । ভোলারে চিনছ না নি ।
--- যার হউগ্‌দা খাইরে থাকরে বেটা, তার লগে লাগিছ না বালা অইত নায় কই দিলাম । অখনও সময় আছে, ইতা গুরমিগিরি ছাড়িয়া বালা কুনু কাম কর
--- আমি গুরমি । আবার কইরে । দেখ দেখ বেটি, দেখ ।
 রেগে বৈতল তার সালোয়ারের ফিতে খুলে । দুর্গাবতীর চোখ টেনে দেখায় । বলে,
--- গুরমি অইলে বাপ হয় ।
--- হয়, ভোলা থাকলে হয় ।
    যথাকালে যথাসময়ে জমিদার বাড়ির কেন্দ্রে, মানে রাজমহলে, আর প্রান্তে পুকুরপারে বাঁশবেড়ার ঘরে একই সময়ে এক শিশুপুত্র আর শিশুকন্যার জন্ম হয় । রাজার ছেলের রঙ রাজার মতো হয় না রানির মতোও না, হয় ঘোর কৃষ্ণবর্ণ । আর পুকুরপারে কালো রাজা বৈতল দাস ওঝার কন্যা হয় গৌরাঙ্গী । নিজে উত্তরাধিকার, পুত্রসন্তানের জন্ম হওয়ায় জমিদার যমুনাপ্রসাদের প্রাণে টগবগে ফুর্তি । বৈতলের মনের আনন্দও আর ধরে না । দুজনেই খুশিতে সাময়িক যুদ্ধবিরতি মেনে নেয় । জমিদার বৈতলকে বলে,
--- চলো বা উঝা, দেখি আই তুমার কইন্যা ।
   বৈতল কুঁড়েঘর আলো করা তার মেয়ে আর মেয়ের মাকে দেখে গর্বিত দৃষ্টিতে । জমিদারও দেখে নবজাতক আর তার জননীকে । মুখে ঝলমলে আনন্দপাঞ্জাবির পকেট থেকে বের করে সোনার হার, লকেটে আই মনসার পট । বৈতলের মেয়ের বুকের উপর রাখে হার ।
    বৈতল খালি হাতেই মেয়ের মুখ দেখে । সোনার হার উঠিয়ে দেয় মেয়ের মাকে । দুর্গাবতীর মুখে প্রশান্ত হাসি, গরবিনীর দৃষ্টি তার দিকে নয়, জমিদারের দিকে অহংকারী চোখ । বৈতলও যুদ্ধবিরতি উঠিয়ে নেয় তৎক্ষণাৎ । মেয়ের মুখ খুঁটিয়ে দেখে । তার কালো রঙের আভাস খোঁজে মেয়ে মুখে । কোথাও পায় না । তবু বড় মায়া হয় । এক চুম্বনে মেয়েকে কাছে টেনে নেয় । বলে,
--- আমার পুড়ি । আমার সোনা ।
জমিদার বলে,
--- উঝা মেয়ে সন্তান রেবা, তুমি বড় ভাগ্যবান ।
    বৈতল ভেবে পায় না তার সৌভাগ্য কেন টাটায় মানুষটাকে । চুপ করে থাকে । মুখের উপর সোনার হারটা ফেরত দেওয়া যায় কিনা ভাবে । সোনার আংটি যখন নিয়েছিল, নিয়েছিল কেড়ে তার পরাক্রমে । সে নেওয়ায় কোনও দয়া নেই, তার দায়ও নেই ফিরিয়ে দেওয়ার । কিন্তু তার মেয়েকে কেন দেবে দামি উপহার । রোষের দৃষ্টিতে দেখে যম সিংকে । যমুনা প্রসাদ হাসে । বৈতল নিশ্চিন্ত হয়, যাক এখন পর্যন্ত যুদ্ধটা তার একার । জমিদার জানে না তার আক্রোশকথা । পুত্রসন্তান গর্বে গর্বিত পিতা হয় কল্পতরু, যেন বৈতল যা চাইবে সবই দেবে সে । প্রথমে দেয় বন্ধুত্ব । বৈতলের কাঁধে হাত রেখে বলে,
--- মাইয়ার কিতা নাম রাখতায় । ঠিক করছনি কিচ্ছু ।
--- গরিবর পুড়ির আবার নাম । আমার নাম যেলা বৈতল, মিলাইয়া রাখি দিমু নে কিচ্ছু ।
--- কিচ্ছু কিতা কই লাও ।
--- অউত্ত কইলাম, সোনা ।
--- সোনা তো ডাকনাম কইলায়, ভালা নাম কও ।
    বৈতলের নাকের ডগা ফোঁস ফোঁস করে রাগে । তার মেয়ের নাম নিয়ে এত কৌতূহল কেন রাজামানুষেরআর ভাল নাম রাখার তো বিস্তর সময় আছে । মুখভাতের সময় রাখা যাবে ভেবেচিন্তে । তাই রাগের মাথায় বলে,
--- তাইর ভালা নাম রাখমু মরণি ।
--- ইতা কিতা নাম মরত কেনে অত সুন্দর বেটি আমরার । তুমি তো জিয়ানির গান গাও রেবা । দেও ভালা দেখি নাম একটা । তুমি তো বাপ ।
--- আমি কিওর বাপ । আপনার অন্নে আছি, অন্নদাতা পিতা আপনে, আপনেউ দেইন নাম ।
--- দিতামনি কও ।
--- দেইন না ।
--- তাইর নাম রাখো তিলোত্তমা কীরকম নাম রাখলাম কও । তে উঝা ঝিয়ারির তো নাম রাখলাম আমি, অখন আমার শ্রীমানর একখান নাম বাছি দেও দেখি । তুমার তো বউত পুথির বিদ্যা
--- আমার ইতা চুরি বিদ্যা, গুরুয়ে যেতা শিখাইছইন । আপনার তো রাজপুত্র । কই আপনে আর কই আমি ।
--- কিতা যে কও, অখন আর রাজারাজড়া নাই, জমিদার উমিদার নাই সব সমান ।
--- ইতা কওয়ার লাগি । অখনও আপনার কথাত পানি কাইত হয় ।
--- আমি ইলাখান নায় । আমি মাইনষর লগে থাকি, মাইনষর কাম করি, দেখ নানি ।
--- অয় দেখি । তুমারে যে না চিনছে হে অখনও মার পেটো ।
    শেষ কথাটা বৈতল মুখ ফুটে বলে না । বরং কালো রঙের মুখের উপর এক বিকট হাসি বিস্তার করে বলে,
--- আইচ্ছা তে রাজপুত্রর নাম রাখইন চন্দ্রধর ।
   জমিদারপুত্র চন্দ্রধর দিনে দিনে বাড়ে । খেলা করে বাড়ির বাহির উঠোনে । উঠোন তো নয়, মাঠই বলা যায় । প্রতিদিন ভোরে দুর্গাবতীর তত্ত্বাবধানে গোবরলেপা করে রাখা হয় । উঠোনের মাঝখানে বিশাল মহুয়া গাছটির বয়স কত কেউ জানে না । একশ দেড়শ বছরের কম নয় । সিংহ পরিবারের উপরতলার কেউ বিহার থেকে নিয়ে এসেছে গোত্রচিহ্ন হিসেবে । বংশে বংশে বাড় বেড়েছে, ছেয়ে গেছে বিস্তীর্ণ উঠোনে । শাদা ফুলে ছেয়ে যায় লেপাপুছার খেলার মাঠ । জমিদারতনয় ফুল কুড়োয় খেলাচ্ছলে, মুখে দেয়, হাসে, মুখ বিকৃতিও করে, মুখমিষ্টিও করে । পুকুরপাড়ে বাঁশবেড়ার বাড়িঘরের দাওয়ায় বসে ভিন্নবর্ণের সমবয়স্ক বালিকাটি হাসে । হাসি দেখে বালক ফুলমহুয়ার খেলায় ডাকে চিকনবরণী কন্যাকে । হামাগুড়িতে নেমে যায় দুজনেই । খেলতে খেলতে হাতাহাতি, ঝাপটাঝাপটি । কালোবরণ রাজকুমার একসময় হাসতে হাসতে হারে । কাঞ্চনবরণী সোনা একা কুড়োয় মহুয়ার ফুল, বাড়ি নিয়ে যায় । মাকে দেয়, মা দুর্গাবতী ফুলের মালা গেঁথে শুঁকোতে দেয় শনের চালে ।
     জীবনের জটিলতা পছন্দ করে না বৈতল, আবার সেই জটিলতাই তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে । বৈতল শিশু চন্দ্রধরকে ভালবাসে যেমন বাসে তার হৃদয়ের মণি সোনাকে । আবার চাঁদুর পিতৃপরিচয় তাকে বিব্রত করে । শয়তান মানুষটা, যাকে বৈতল প্রথম পরিচয়ের দিন থেকেই শত্রু ভেবে এসেছে । তার শ্রেণীগত বিভেদ ছিল শুরুতে যখন তার ক্ষীণদেহ নিয়ে তির্যক মন্তব্য করেছে । তারপর রাজনৈতিক সামাজিক প্রেক্ষাপটে তার অনৈতিকতা যার নষ্টামির জন্যও ক্ষমা করেনি বৈতল । সে তক্কে তক্কে আছে, সুযোগের অপেক্ষায় আছে, ঝাড়বংশে ধ্বংস করবে সে জমিদারকে । চাঁদুও তো সেই ঝাড়েরই বাঁশ, কিন্তু বৈতল নিষ্পাপ শিশুর হাসির কাছে পরাস্ত হয় । চন্দ্রধর যে তার প্রাণের পুত্তলি সোনামনির খেলার সাথি । বৈতল মেয়ের জন্য অনেক কিছুই সমঝোতা করেছে । যমুনাপ্রসাদ দুম করে মেয়েটার নাম রেখে দেয় তিলোত্তমা । না করতে পারেনি বৈতল, উচ্চবর্ণের জমিদার আর ব্রাহ্মণকন্যা দুর্গাবতীর যোগসাজসেই এমন একটা নাম রাখা হয় যার অর্থই জানে না বৈতল । মরণি নামটা কিন্তু সে স্নেহভরেই রাখতে চেয়েছে । শহুরে মানুষটা উল্টো অর্থ করে তার গালমন্দ করে, দুর্গাবতীও বিরক্তা হয় । মরণি নামের মধ্যে যে কী অন্যায় সে জানে না । বইয়াখাউরিতে অনেক মেয়ের নামই মরণি । বৈতলও মেয়েকে মরণজয়ী করতে নাম রেখেছে । কালাচাঁদ কাকার মেয়ের নাম মরণি, ভুতুকাকার মেয়ের নাম মরণি, মঞ্জুকাকার ছেলেমেয়ে হয় বাঁচে না, শেষমেষ মরণিটাই বাঁচে । তার সোনামনিও বাঁচবে বলেই বাপের আদর । তিলোত্তমা নামটিও ভাল বলেছে দুর্গাবতী । তবু বৈতলের মনের ভিতর একটা কষ্ট থেকেই যায়, নতুন মা হওয়ার কৃতিত্বটা দুর্গাবতী একাই উপভোগ করছে আঁতুড়ঘরে । বৈতলের সঙ্গে ভাগ করেনি । বরং যমুনাপ্রসাদের সব কথায়ই মুচকি হাসির সমর্থন দিয়েছে । দুর্গাবতীর সমর্থন পেয়েই জমিদারের এই হঠাৎ উদারতা, সোনার লকেটসহ হার, মেয়ের নামকরণ বৈতলকে হারিয়েহারেনি বৈতল, সাপের মতো অনিষ্টকারী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করবে এই যমসর্পের বংশধর, তাই নাম রেখেছে চন্দ্রধর । বৈতল এও জানে, ক্ষত্রিয় রাজা বৈতলের জাতিপরিচয় না জেনেই তার দেওয়া নাম নিয়েছে । বৈতল পাটনির নয়, শর্মা ব্রাহ্মণের নামকরণের অধিকার আছে বলেই নিয়েছে । আর সুযোগ বুঝে বৈতলও তার বদলা নিয়েছে চন্দ্রধরের আসল পরিচয় যে পশুসোয়া নামেতে তপস্বী শূদ্রজাতি ।চন্দ্রধরের জন্মের সঙ্গে রত্নাকার দস্যুর বাল্মীকি হয়ে ওঠার মিল অনেক । দুজনেই শূদ্রজাতির সাধু । দুজনেই পাখির দুর্দশায় কাতর হয়ে নবীনজীবন সাজিয়েছেন । অমিলও আছে বিস্তর, বাল্মীকি কবি হয়েছেন, রামায়ণ গান লিখেছেন । চন্দ্রধরের জন্যই না পদ্মপুরাণ মহাপাঁচালি । তবে চন্দ্রধর একা এক মহাবীর, অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইএ নেতৃত্ব দিয়েছেন, লড়েছেন একাও । মনসারে নাগে ধরি পক্ষীর ছানা খায়এ অন্যায় তিনি মানতে পারেন নি তাই তখনই প্রতিজ্ঞা করেন পুনরায় জন্মিব আমি সাপের বৈরী হইয়া ।যেমন বলা তেমন কাজ, ইচ্ছামৃত্যুর পর চম্পকনগরে কোটীশ্বর রাজার ছেলে হয়ে জন্ম এবং আজীবন খল ক্রূর সাপের সঙ্গে, সাপের নেত্রী মনসা দেবীর সঙ্গে শত্রুতায় বদ্ধপরিকর হওয়া । এক আতান্তরের জীবন, কিন্তু সত্যের মুখে অবিচল । বৈতল ও দৈত্যকুলের এই প্রহ্লাদকে নামের মধ্যে বিদ্রোহের গোত্রচিহ্ন পরিয়ে দেয় ।
     যতই কেন বৈতল জমিদারপুত্রের নাম তার নায়ক চন্দ্রধরের নামে রাখুক, হিংসা ভুলতে পারে না । ভুলতে পারে না একসময়ে জন্মে চন্দ্রধরে অতুল বৈভব আর তার কন্যার কেন শূন্য উত্তরাধিকার । বাঁশবেড়ার এক কুঁড়েঘর, তাও চন্দ্রধরের বাপের দয়ার দান । জন্মসূত্রের এই অসাম্য মানতে পারে নয়া বৈতল ।
    সোনামনির বয়স যখন তিন, চন্দ্রধর রাজকুমারের একটি দাঁত ভাঙে উপরের পাটির । বৈতল জানে দুধদাঁত ভাঙেই । জমিদার বলে, না, হেড়ম্ব জেঠাকে ডাকতে হবে । তিনি যে কুলপুরোহিত, তিনি যে বিধান দেবেন তা-ই মানতে হবে । জমিদার বাড়ির পুরোহিত কিন্তু কোনোদিন গাড়ি চড়েন না, সেই বিলপার থেকে হাঁটতে হাঁটতে আসেন বৃদ্ধ । দাঁত তুলে রাখা হয়েছে কাঁচের বয়ামে । ফেলা হবে না রাখা হবে তার বিধান চাই । পুরোহিত বলেন,
--- তলর না উপরর ।
   মা এবং বাবা, জমিদার ও জমিদারগৃহিণী দুজনেই হতভম্ব । নিচের না উপরের পাটির । সে তো খেয়াল করেনি কেউ । আতুপুতু মাতা পিতা জেনেও মনে করতে পারে না । সামনে থেকে বৈতল বলে,
--- আমি জানি উপরর ।
    জমিদার এবং বৃদ্ধ পুরোহিত বৈতলের দিকে তাকায় । এত জটিল একটা বিষয়ের সহজ সমাধান যেন কেউ মেনে নিতে পারেনি । একটু হাঁকডাক ছুটোছুটি জমিদার তনয়কে নিয়ে আসা তারপর সরেজমিন দাঁতশূন্য মুখগহ্বর দেখে না সিদ্ধান্ত । তাই বিরক্ত পুরোহিত অবজ্ঞার দৃষ্টিতে বৈতলকে দেখে বলেন,
--- তুমি কেমনে দেখলায় রেবা ।
--- , ই তো হক্কলেউ দেখছইন । বড় বউএ দেখছইন, জমিদারে দেখছইন, কী জানি কিতা অই গেল ভাবিয়া ডরাই গেছইন । রাজবাড়ির কাণ্ড তো, ছুট অইলে কেমনে অইব । আপনে আইছইন, অখন কইন কিতা করন লাগব ।
--- অয়, কিচ্ছু তো করন লাগব । তলো চালো, তলর অইলে চালো ফালানি লাগব, আর উপরর অইলে দুপো । দূর্বাঘাসর উপরে ফালানি লাগব । তে তার আগে চন্দ্রধর বাবাজিরে একবার ডাকো, ডাকিয়া দেখিলাও কিতা অইছে ।
  এই তো বৃত্তান্ত দাঁত ভাঙার । বৈতল আদিখ্যেতা দেখে বিরক্ত হয় । দুর্গাবতীকে বলে,
--- ইতা কিতা আদিলকামি, আমার পুড়ির ওত্তো দাঁত পড়েছে এর লাগি নি বাবন ডাকাইছি, বইয়ম কিনছি, না আউতাশ করছি । মাইগ্‌গো মাই, পয়সা থাকলে হুনছি মাইনষে বেঙরও হেঙ্গা দেয়, বাইচ্চার দাঁত পড়া নিয়া ইতা দেখছনি না বাপর জন্মত ।
--- তারার পুয়ার দাঁত ভাঙছে তারা করছে । করউক, তারার পয়সা আছে । তুমি মাততায় গেলায় কেনে ।
--- আমার গুসা উঠি গেলো । পুয়া ইগুরে জান নি এর লাগি আদর করতাম পারি না ।
--- কের লাগি ।
--- অউ যে তার বাপর বড়লোকি আর শয়তানি । বুড়া বাবনরে অউ বিলপার থাকি হাটাই আনল । তাইন গাড়ি চড়ইন না ঠিক আছে, একবার তো কইত পারত, তান ওতো বয়স অইছে নানি । লুতুর বুড়া
--- ইতা বাদ দেও । তারার তা তারা বুঝবা । তে তাইন তো তুমার পুড়িরেও আদর করইন । রুজ একবার দেখিয়া যাইন ।

--- অই বেটি, তাইন কিতা রে, তাইন কিতা তর তাইন নি । আর বেটায় কেনে রুজ দেখিয়া যাইত । তার পুড়িনি । 







চলবে 

< উজান পর্ব ২৫ পড়ুন                                                         উজান পর্ব ২৭ পড়ুন >
                               
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন