.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

রবিবার, ৯ অক্টোবর, ২০১৬

সুরমা গাঙর পানিঃ উজান পর্ব ৪২ (সমাপ্ত)

(দেশভাগ এবং পরের দশকের কাছাড় সিলেটের প্রেক্ষাপটে রণবীর পুরকায়স্থের এই উপন্যাস ছেপে বের করেছে দিন হলো। ভালো লাগা এই  উপন্যাস পুরোটা টাইপ করে তুলে আমার প্রিয় কথা শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। আশা করছি আপনাদের সবার এটি পড়তে ভালো লাগবে। সম্পূর্ণ উপন্যাসের সংলাপ ভাগটি সিলেটিতে -সে সম্ভবত এই উপন্যাসের সবচাইতে আকর্ষণীয় দিক। উপন্যাসটি ইতিমধ্যে সিলেট এবং শিলচরের দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হয়েছে। সম্প্রতি ২৩ জুন, ২০১৭তে কলিকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র-এর ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে লেখককে বিশেষ সারস্বত সম্মান দিয়ে সম্মানিত করল এই উপন্যাসটির জন্যে। কবি শঙ্খ ঘোষে সম্মানটি তাঁর হাতে তুলে দেন।আপনাদের পড়বার সুবিধে করে দিতে, ঈশানে এই উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে আসছে। আজ তার  উজান  পর্বের  অধ্যায়   বিয়াল্লিশ, তখা এখানেই 'সুরমা গাঙর পানি' ইতি।  ---সুব্রতা 
মজুমদার।)   






বিয়াল্লিশ


     রিক্সা নেই বলে বৈতল আতুর হয়ে যায়নি । বৈতল জানে জলে নামলে তার রুজির অভাব হবে না । কিন্তু জলকে স্থায়ী পেশা করায় বৈতলের আপত্তি না থাকলেও, দুর্গাবতী যে অপছন্দ করে । দুর্গা এখন আর ব্রাহ্মণ কৈবর্ত নিয়ে বিতর্ক জড়ায় না । মামু চলে যাওয়ায় দুখুও কেমন নিষ্প্রভ হয়ে গেছে । বছই আপদ তো পরগাছা । হিন্দু-মুসলমান নিয়েও দুর্গাবতীর ধারণা পাল্টেছে দুখু এলে ঘরে ডাকতে আর কোনও আপত্তি নেই ।
শুধু বৈতলের মাছ মারা নিয়েই তার আপত্তি । বলে,
--- তুমি মাছ মারাত গেলেউ গাত মাইমলি গন্ধ  অই যায় ।
--- আমি তো মাইমল অউ বেটি । বৈতল দাস পাটনি । গন্ধ ত থাকবউ । 
--- না আমি হে কথা কইয়ার না, মাছর আইছলা গন্ধনি ভালা লাগে বিছনাত ।
--- আইচ্ছা বুজছি বৈতল কৈবর্ত চলত নায়, শর্মা হওন লাগব । আমি জানছনি নতুন কাম লইছি ।
--- কিতা ।
--- না পাটনিও নায় শর্মাও নায় । মেশিনম্যান, আমি অখন মেশিন চালাই ।
--- কিওর মেশিন ।
--- ছাপার মেশিন ।
--- হেঁ ।
--- নাজিরপট্টির যুগশক্তিত কাম লইছি । খবর ছাপানির কাম ।
   বৈতল যেদিন বড় মুখ করে দুর্গাবতীকে তার মেশিনম্যান হওয়ার গল্প বলে তার দুদিন পরে যুগশক্তি বন্ধ হয়ে যায় । আবার দুদিনের বেকারত্বের পর দুর্গাবতীকে দেয় নতুন খবর । বলে,
--- নতুন খবরর কাগজ আর একখান বার অইছে । তারার মেশিন চালানির মানুষ আছে । আর্যপট্টির মুখো জুতির অফিস ।
--- জুতি আবার কিতা নাম । আমি দেখছি বড়বাড়িত আয় জ্যোতি ।
--- অউ এককথা, ঘাড়র নাম গরদজনা । আমার কাম দৌড়ানি । কাগজো নাম লেখি দেয় আর আমি বাড়ি বাড়ি পৌঁছাই দেই । এক এক কাগজে দুই পয়সা । তরে একদিন লই যাইমু দেখিয়া আইবে প্রেস । জালেঙ্গা থাকি আয় এক চিমটা বেটা, যে মেনেজার । ছুকরি আছে দুগু, অ আ উঠাইয়া সাজাইন । আর খটাং খটাং করিয়া মেশিনে ছাপে । আর একটা ছোটো মেশিনও আছে দেখলাম, হিখান উঠানো রাখি দেয়, রুটির চাক্কির লাখান থালো কালা রং মাখি দেয় আর কালা বেলাইন গিয়া মারে ছাপ, কাগজো লেখা বারয়, জালেঙ্গার মেনেজারের কইছি তুমরা খবর ছাপতায় তো, আমি দিমু খবর । যম জমিদারর কথা কইতে কয়, ইতা বুলে মালিকর লগে মাতন লাগব । ডরালুক, মরা মানুষরেও নি অত ডরায় । 




--- ঠিক অউত্ত কইছইন । তুমি ইতা কিতা আরম্ভ করছ । ই বাড়িবাড়ি দৌড়াইয়া কয় পয়সা পাইবায়, তিন পেট পালতায় পারবায় নি । কইলায় নু যাইবায় সবুজবরণ ।
আইরংমারা গিয়া শ্রাবণীর গান গাইবায় ।
--- অয় যাইতাম ।
       বৈতল ঝাঁপ দেয় জলে । জমিদার বাড়ির ডাকাতি, জমিদার যমুনাপ্রসাদের হারিয়ে যাওয়া, পুলিশের নজরবন্দি থেকে ছাড়া পাওয়া এসব খবর ছাপে নতুন সংবাদপত্র । বৈতল বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেয় খবর । দুর্গাবতীর ইচ্ছায় শেষপর্যন্ত জলমগ্ন শহর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয় । ভরা বর্ষায় দিঘীর পার থেকে কলাগাছ কেটে ভোরা বানায় আবার বৈতল । দুর্গাবতী দেখে বলে,
--- অতবড় সংসারর জিনিষপত্র নিয়া কেমনে যাইতায় ই ভেলাত ।
   বৈতল বলে,
--- গাট্টি বান্দো একটা । মনো নাই নি পাকিস্তান থাকি কিতা লইয়া আইছলায় । একগাট্টি বুকর উপরে তুমার । আমার তো কিচ্ছু নাই । অখন দুই গাট্টি, তুমার গাট্টি তুমি নেও । আমার গাট্টি আমার পুড়ি ।
    বৈতল আবার বলে,
--- অখন চল, ইতা থাকউক । আইমুনে পরে । আইয়া নিমু ।
    দুজনের বুকে দুই পাঁজর বেঁধে আবার চলে, নতুন রিফুউজি কলার ভেলায় চড়ে করে যাত্রা । ষাট ইংরাজির বন্যায় ভেসে চলে আর এক অজানার উদ্দেশে । ছোট মেয়ে মরনি, ডাক নামের মনি বাপকে প্রশ্ন করে,
--- বাবা, আমরার কুনু বাড়ি নাই নি ।
--- না, নাইগো মাই ।
--- চান্দর আছে, অতবড় মহল, আমরার নাই ।
--- আছিল সব অউ বেটি কিন্তু এক চেংমুড়ি কানিয়ে কাড়ি নিলা সব ।
--- মা মনসা তো তুমার আই ।
--- আই না, আই না । আই অইলে অত কষ্ট দেয় না কেউ পুয়া-পুড়িরে ।
--- আমি জানি হিন্দু হওয়ার লাগি পাকিস্তান থাকি ভাগিয়া আইছি আমরা ।
--- তুই তখন কই গো মা । তোর তো জন্মউ অইছে না । ইতা কে কইছে । মায়নি ।
--- কইছে । তুমার মামুর আল্লাও বাদ । তুমরারে খেদাইছে ।
--- না গো না, মা বিষরি । কেউ কেউরে খেদায় না । মানুষ মানুষর শত্রু নায় । খালি দুই একজন আলদর বাইচ্চা থাকে । শয়তানি করে ।
--- মায় তো কয় তুমি শয়তান দেখলেউ মারো । ইবার কুন শয়তানে খেদাইল তুমারে ।
--- ইবার কুনু শয়তান নায় । ইবার তুমার এক দাদুর কথা রাখিয়া ডুলিয়ার । পঞ্চখণ্ডর পণ্ডিতপাড়ার লাগা আছিল তান বাড়ি । তাইন কইতা, মানুষ কুনু সময় এক জাগাত থাকে না, খালি জাগা ডুলায় । নতুন জগাত গিয়া মানুষ আরো ভালা হয় । আমিও আমার সেন্টার পাশ পুড়িরে মাস্টর রাখিয়া পড়াইমু অখন । দেখ, দেখ তর মায়ে ইউ দাদুরে নম করের আকাশো ।
    নতুন বসতি গড়তে বৈতলের ভেলা আবার চলে দুলে দুলে ।










একটি মন্তব্য পোস্ট করুন