“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮

দ্বিতীয় অধ্যায়


( এক )

।। সুমন পাটারী ।।

     
(C)Image:ছবি
     
'জীবন নদীর মতো, অবিরাম বয়ে চলা' এই কথাটি অনেকবার শুনেছি। কিন্তু নদীর দ্বিতীয় অধ্যায় বেশ শান্ত ও পিতৃতুল্য হয়। জীবনের ক্ষেত্রে এই কথাটি বেমানান হয়ে যায়। ছাত্রজীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর। এই সময়টা আরো কঠিন হয়ে যায় যখন আমার মতো কোনো মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে যে অন্য ত্রিশ জন ছাত্রের মতো পঞ্চাশ শতাংশ নম্বর নিয়ে গ্র্যাজুয়েট। বন্ধুর সংখ্যা এখন কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। দু'এক জন আছে সিগারেট ভাগ করে খায়। তার উপর প্রেমিকা, সমবয়সী, রোজ একবার নদীর ওপারে গিয়ে 'ভালো থেকো, তোমাকে কখনো ভুলব না' বলে। একবার গাড়িতে করে বাইখোড়া থেকে উদয়পুর যাচ্ছিলাম। গাড়িতে আলাপ হলো একজন পশ্চিমবঙ্গীয় যুবকের সাথে। জানলাম তিনি সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনীর সৈনিক। কথায় কথায় বলে উঠলেন ভাই আমাদের এখানে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যেতে একদিন পেরিয়ে যায়। তোমাদের এখানে একদিনে সব জেলা ঘুরে আসা যায়। হ্যাঁ ঠিক, দারুণ সত্যি বললেন। আসলে হাতের তালুর মতো রাজ্য। বেসরকারি বন্দোবস্ত বলতে আছে চিটফান্ডের কাজ, অথবা এল আই সি। সাম্প্রতিক বন্ধন ব্যাঙ্ক। তাছাড়া বাকি শিল্প বিকাশ হাজার বছরের শীতঘুমে। তো বাকি রইলো সরকারি চাকুরি। বছরে যে কয়েকবার ইন্টারভিউ ডাকা হয় যেন হাজার ভক্তের ভিড়ে উৎসব প্রাঙ্গণে দু'চারটি বাতাসা ছিটিয়ে দেওয়া। তাও অর্ধেক রিজার্ভ। রাজ্য ছোট, অফিস কম, কারবার ছোট, চাকরির বাজারে কাল-- সেই ছোট কাল থেকে শুনে আসছি। তার উপরে নিজে অযোগ্য। ভীষণ কম্পিটিশানের পরীক্ষাগুলো। এমন অবস্থায় নিজের অসহায়তাকে বর্ণনা করা পৃথিবীর কঠিনতম সাহিত্যচর্চা। এমন সময় রাজমিস্ত্রির যোগালির কাজ শ্রেষ্ঠ বেসরকারি সংস্থা বলে মনে হয়।
দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে যাচ্ছে। এই বছর টিউশন নেই তেমন। সব পিতা মাতারাই চাইছে স্কুলের শিক্ষক পড়াক। তার উপরে বেসরকারি স্কুল ব্যাঙের ছাতার মতো মাথা তুলছে সর্বত্র। তার একটা কারণ হয়তো সরকারি স্কুলের প্রতি ভরসা উঠে যাচ্ছে অথবা পিতামাতারা ভাবছে সরকারি স্কুলে দুষ্ট ও অবাধ্য ছেলেরা পড়ে। তাদের সাথে আমার সোনামণি খারাপ হয়ে যাবে।অথবা বন থেকে সদ্য উঠে আসা আধুনিক হতে চাওয়া বর্বররা স্ট্যাটাস মেনটেইন করে বেসরকারি প্রেশারকুকারে সন্তানদের সেদ্ধ করে। বা হয়তো ঘটনাটি এমন ফুটপাতের দোকান ও কাঁচ লাগানো দোকানে একই জামা ফুটপাত থেকে কাঁচওয়ালা দোকানে দাম বেশি হলেও লোকে সেখান থেকেই কিনছে কারণ সেই দোকান টি ঝকঝকে, দরদাম হয় না, স্টাফগুলো বেশ বাবুয়ানা মার্জিত হাসি ও পোশাকে অভিবাদন জানায়। তাছাড়া আরেক দিকে দেখা যায় যে ছেলেটা সরকারি স্কুলে ষাট শতাংশ আনছে সেই ছেলেটাই বেসরকারি স্কুলে আশি শতাংশ পাচ্ছে। বেসরকারি স্কুলগুলোতে বেকাররা খুব কম বেতনে খাটে, সারাদিন দুটো টিউশনের জন্য। স্কুলের পঠনপাঠন এমন হয়ে গেছে স্কুলের শিক্ষক দিয়ে পড়ালেই চমৎকার! মা বাবা নম্বরবিলাসী। সেক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে সিলেবাস থেকে অনেক কমিয়ে সাজেশান দেওয়া হচ্ছে।চাক চাক নম্বর আসছে। তাই যেসব ছেলেমেয়ে গুলো কোথাও শিক্ষকতা করে না তারা অনেকটা সারমেয় হয়ে গেছে।জীবনের মালিকানাহীন। টিউশন এখন টিউশন নেই, গৃহশিক্ষক অনেকটা কেনা গোলামের মতো হয়ে গেছে। যদি আপনার লোকপ্রচারিত রেপুটেশান না থাকে আপনাকে ছাত্র ছাত্রীর মূর্খ মা কীভাবে পড়াতে হবে তা বলবে, আদেশ করবে নোট নিজের হাতে লিখে দিতে, আর ভাগ্যক্রমে কখনো যদি ওদের বাড়িতে কোনো আত্মীয় ও আপনার আসার সময় মিলে যায় তবে এককাপ চা ও পাবেন, মাস শেষ হলে আপনাকে চৈত্রের দুপুরে চাতকের মতো হা করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে, অবশেষে দশ তারিখ পেরুলে লাজ বাদ দিয়ে আপনাকে চাইতে হবে মাইনে টা। এসব ভাবছিলাম শুয়ে শুয়ে, জীবন কোন রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে, হঠাৎ মিঠুন এসে ঘরে ঢুকলো, সান্তু আছিস? হুম আয়। জানিস শনি মন্দিরের সামনে ভীষণ কাণ্ড শুরু হয়েছে।
চলবে....

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন