.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

শুক্রবার, ২১ এপ্রিল, ২০১৭

কৃষ্ণা চৌধুরীর স্মরণে



প্রয়াত কৃষ্ণা চৌধুরী (চক্রবর্তী)

কৃষ্ণা চৌধুরী শুধু পুণ্যপ্রিয়দার জীবন সঙ্গিনী ছিলেন না। আমাদের ছাত্রাবস্থাতে মুক্তনারীর প্রতীক ছিলেন। পুণ্যপ্রিয়দাই কি শুধু শিলচর সানগ্রাফিস্ক নামের বিখ্যাত ছাপাখানার মালিক মাত্র, যেখানে বিদগ্ধরা বই পত্রিকা ছাপান? আমাদের স্কুলজীবনে যারা বিকল্প ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, কৈশোর তারুণ্যের দিশা দেখিয়েছিলেন তাঁরা সেকালের সেই সব দামাল যৌবনের প্রতিভূ ছিলেন। দেয়াল ভাঙ্গা, জলে কাদায় ঘেরা স্কুলে , দরিদ্র পরিবার থেকে পড়তে যাওয়া আমার মতো অনেক যখন ঘরে-বাইরে-পাড়ায় শহরে নিজেকে প্রত্যাখ্যাত অপর বলে ভাবত--- তখন এরা সেই সব প্রত্যাখ্যাতদের অধিকারের আর মর্যাদার গল্প শোনাত আমাদের স্কুলে স্কুলে গিয়ে। এরা প্রথম জীবনে এস এফ আই করেছেন, পরে ডি য়াই এফ করেছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের সংগঠনে শেষমেশ যোগ দিই নি। আমার পথ হয়েছিল অন্য। সে প্রসঙ্গও অন্য। কিন্তু পথটাই ধরা হত না যদি পুণ্যপ্রিয়দা, শুভপ্রসাদা, সনৎ কৈরি, অরূপ চৌধুরীদের বক্তৃতা শোনার অভিজ্ঞতা না হত। হ্যাঁ, পুণ্যপ্রিয়দার বক্তৃতাতে একসময় শহর শিলচর কাঁপত। একালের তরুণদের সেসব জানবার কথা নয়। তাঁর থেকে ভাল বক্তৃতা কেউ করতে পারত না। পরে যৌথ আন্দোলন করতে গিয়ে তাঁকে দেখে শোনে আমি কিছু কিছু বক্তৃতা করা শিখেছিলাম। বলতে পারি। বক্তৃতা করা এক কথা। আর লোক দাঁড় করিয়ে রেখে দেয়া আর কথা। পুণ্যপ্রিয়দা তাই পারত। তার উপরে পুণ্যপ্রিয়দা ছিল একজন দক্ষ সংগঠক। 
                         
সপুত্র কৃষ্ণা চৌধুরী (চক্রবর্তী)
কিন্তু আমি তো বলছিলাম কৃষ্ণাদির কথা।
যেখানেই, যে স্কুলে কলেজে তারা যাচ্ছেন, সভা করছেন স্লোগান দিচ্ছেন তিন মহিলাকে দেখা যেত , যেতই । তাঁদের সঙ্গে বলছেন, স্লোগান দিচ্ছেন, পোস্টার লিখছেন, সাঁটছেন--- এদের মনে হত অবিচ্ছিন্ন। এই কৃষ্ণাদি, প্রতিমা দি (এখন আশুদার স্ত্রী) আর জবাদি। আমরা যে 'দুষ্ট' সহচরদের সঙ্গে বড় হচ্ছিলাম---সেখানে নারী যে স্বতন্ত্র মর্যাদার মানুষ---সেই শিক্ষা তো বিশেষ হচ্ছিল না। এরা আমাদের মনে সেই মর্যাদা বোধ জাগিয়ে তুলছিলেন, আর গড়ে তুলছিলেন এই বোধ---যে সমাজে নারী সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, নেতৃত্ব দিতে পারে না, মর্যাদার আসনে বসতে পারে না---সেই সমাজ কখনো শোষণ মুক্ত, সভ্য, আদর্শ সমাজ হতে পারে না। আমরা সেই সমাজে বড় হয়েছি যেখানে মেয়েদের বাড়ির বাইরে বেরোতে গেলে হাজার প্রশ্নের জবাব দিয়ে বেরোতে হত। আর গৃহবন্দি মেয়েদের দেখতাম পরনিন্দা পরচর্চা আর নইলে হাজারটা সংস্কারের বেড়াজালে বন্দি। সেখানে কৃষ্ণাদিদের দেখে মনে হত---তাদের যারা প্রশ্নবিদ্ধ করবেন---তারা খুব সুসভ্য নন, সুজনতো ননই। তাঁরা আমাদের জীবনে দেখা প্রথম কিছু 'আদর্শ নারী' ছিলেন না, ছিলেন নারীর 'বিকল্প আদর্শ'। সে এক সময় ছিল। পুণ্যপ্রিয়দারা সেই সময়কে ধরে রাখতে পারলেন কি না, এগিয়ে নিয়ে যেতে পারলেন কি না---সেই প্রশ্ন উঠতেই পারে। আমরা কেউ পারি নি। সব আমাদের হাতে নেই। কিন্তু ভাগ্যবান যে তাঁরা পরস্পরকে জীবন সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলেন।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন