“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

শনিবার, ১৬ মার্চ, ২০১৯

জনবিস্ফোরণ

লিখেছেন  অভিজিৎ দাস

হেলেন বাবুর জন্মদিন আজ । চল্লিশটা বছর বেঁচে আছেন পৃথিবীর গায়, প্রত্যেক বছর আজকের দিনটাতে নিজের উপর বেশ গর্ববোধ করেন তিনি, গর্বেরই বিষয় বটে, পৃথিবীতে বেঁচে থাকা কি আর চাট্টিখানি কথা? কিন্তু, এ বারের জন্মদিনটা আর পাঁচটা জন্মদিনের মত নয়, আজ তিনি মরবেন বলে ঠিক করেছেন । নির্ধারিত বয়স যদিও পঞ্চাশ, কিন্তু দশ বছর আগেই বিদায় নেবেন বলে পরিকল্পনা করে রেখে ছিলেন বেশ ক-বছর আগে থেকেই । আজ সেই দিন চলে এসেছে । শহরের সকলেই উনার জন্যে গর্বিত । সকলের এত ভালবাসা দেখে অবাক হচ্ছেন খুব হেলেন, সত্যি, লাভ ছাড়া কেউ গর্বিত বোধ করেনা !

আরশি জগতে দেখা দিয়েছে জনবিস্ফোরণ, তাই মৃত্যু নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে এসেছে বহু রাষ্ট্র । ভি,আই,পি নামের কতক জীব ছাড়া পঞ্চাশ বছরের বেশি বেঁচে থাকার অধিকার নেই কারো । এ নিয়ে আন্দোলন কম হচ্ছেনা, মানুষ ক্ষুব্ধ খুব । গদি হারানোর চরম সম্ভাবনা রয়েছে শাসক দলের । হেলেনবাবু কখনো এক কলমও লেখেননি এসব নিয়ে, জীবন-মৃত্যু নিয়ে কোনও লেখাই তাঁর কলমে উঠে আসেনি কখনো । স্থানীয় একটা কলেজে অধ্যাপনার পাশাপাশি লেখালেখি ছিল উনার সখ, গোটা দশেক বই লিখেছেন, পাণ্ডুলিপি তৈরি আরও দুটোর । এমনি করে ভালোই চলছিল হেলেন সাহেবের একার জীবন, হুট করেই যেন চলে এলো মৃত্যু দিনটা ।

সারাদিন ধরেই লোকজন আসা যাওয়া করছেন । অন্যদের মত কোনও জাঁকজমক চাননা মৃত্যুর অনুষ্ঠানে, বরং সেরে ফেলতে চান একান্ত ঘরোয়া ভাবেই । তবুও আসছেন লোকেরা উপহারের ডালি সঙ্গে নিয়ে । এই মাত্র বেড়িয়ে গেলেন দুই সহ-অধ্যাপক, দুজনেই খুব ভাল উপহার এনেছেন । উনারা না আনলে হেলেনবাবুর কখনো জানাই হতনা এভাবেও মরা যায় । একজন এনেছেন একটা সূচ । এই সূচ শরীরের যেকোনো কোথাও ১ সেমি প্রবেশ করালেই মৃত্যু নিশ্চিত, এমনকি গোড়ালিতেও । পছন্দ হয়েছে উনার খুব এটা । অপরজনেরটা আরও চমৎকার, একটা ডি,ভি,ডি,
ডি,ভি,ডি-তেই মৃত্যু ।

উপহারের স্তুপ নেহাত ছোট নয় । ডেথ টুলই অধিকাংশ । ডেথ টুল ছাড়া শুধু রয়েছে একটা মাত্র চকোলেট । পাশের ফ্লাটের লোকটার সাথে এসেছিল উনার ছ-বছরের মেয়েটি, বাবা দিলেন ডেথ টুল, দেখাদেখি মেয়ে দিল চকোলেট । ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বেশ একটু ধমকেও দিলেন পিতা কন্যাকে,
অসামাজিক, অসভ্য মেয়ে ! আজকের দিনে চকোলেট দিতে আছে?

যখনই একা হচ্ছেন স্মৃতিতে ডুবে যাচ্ছেন যেন । কত কত স্মৃতি এই চল্লিশ বছরের । মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে বারবারই, খুব ইচ্ছে করছে মাকে জড়িয়ে ধরে একটু কাঁদতে, একটু হাঁসতে, মা মা বলে ডাকতে । ভাবতে ভাবতে মনে পরে গেল সেই ছোট্ট বেলার কথা, যখন বিশ্বাস ছিল পৃথিবীর সব কিছু তিনি পারবেন । তখন মৃত্যুকে খুব ভয় করত তাঁর । মৃত্যু থেকে পালিয়ে বেড়াতেন কল্পনায় । যেমন করেই হোক, তিনি অমরত্বলাভ করবেনই । নিজেই একটা কিছু আবিষ্কার করবেন যা দিয়ে মৃত্যুকে এড়ানো যাবে, পৃথিবী ধংস হয়ার আগেই কিছু একটা করে চলে যাবেন অন্য একটা গ্রহে...ওসব কথা ভেবে বড় হাঁসি পাচ্ছে আজ । যে মানুষটা মৃত্যুকে এত ভয় করত সেই মানুষটাই আজ দশ বছর আয়ু রেখে মরতে যাচ্ছে !

জীবনটা আসলে বিষিয়ে উঠেছিল কেমন... কিছুই আর ভাল ছিলনা, কিছুই ভাল লাগতনা । একটা মানুষের মধ্যে দুটো মানুষ বেঁচে আছে বহুদিন । মা ছাড়া জীবনে কাউকে কখনো পাননি, অথচ মায়ের মৃত্যুর পর থেকে গতকাল পর্যন্ত মাকে খুব মনে পড়েছে এমন হয়নি । বরং কল্পনার স্ত্রী, কল্পনার প্রেমিকা, কল্পনার সন্তান, কল্পনার বন্ধু এদেরকেই মিস করতেন একেকসময় ।

অতিথি আসা বন্ধ হল রাত নটার দিকে । শেষদিকে বেশ হাঁপিয়ে উঠেছিলেন । হাঁসি মুখে কথা বলতে পারার একটা সীমা আছে সবারই, আর তাছাড়া আজকের দিনটা জীবনের শেষদিন, ইচ্ছা ছিল নিজেকে নিয়ে কাটাবেন
পারা গেলনা । আজ রাতেই মরতে হবে, ইচ্ছেটা কখন যেন দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে । মরতেই হবে । আগামিকাল ভোর ভোর মেডিকেল কলেজ থেকে লোকেরা আসবে দেহটা নিয়ে যেতে, ওদের জন্যে হলেও মরতেই হবে । শেষবারের মত একটু ঘুমাতে ইচ্ছে হল । রাত এগারটার অ্যালার্ম দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন তাই, এটাই তাঁর জীবনের অন্তিম সাধ

পরদিন সকাল ছটায় এসেই মেডিকেল কলেজের অ্যাম্বুলান্স উপস্থিত হল । দরজা সাধারণত ওরা ভাঙে, ভাঙতে ভাঙতে দরজা ভাঙাটাও একটা প্রথা এখন । কিন্তু দরজাটা ভাঙতে হলনা, খোলাই ছিল । মৃত্যুই যখন জীবনের উদ্দ্যেশ্য তখন এমন সুরক্ষার কথা ভাবা মূর্খতাই বটে ! কিন্তু লাশ বাহকরা অবাক হলেন যথেষ্টই এতে, কিন্তু তারও চেয়ে অধিক অবাক হলেন সারা ঘর তন্ন তন্ন করে খোঁজেও কোনও মানুষের দেহ না পেয়ে ।
ডেথ টুল গুলোর স্তুপ পড়ে আছে, লেখার টেবিলে খাতা, ল্যাপটপ, রেফ্রিজারেটরে খাদ্য, নেই শুধু সেই জন্মদিনের উপহার চকোলেট আর গতকালকের ডেথ্‌ ডে বয়

কোন মন্তব্য নেই: