.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

শুক্রবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৬

'উজান সাহিত্য গোষ্ঠী'র উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘শুধু কবিতার জন্যে-২০১৫’

‘শুধু কবিতার জন্যে-২০১৫’
ছবিতে ক্লিক করুন, পুরো এলবামে পৌঁছে যাবেন
৫, ২৬ এবং ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৫ তিনসুকিয়া দুর্গাবাড়ি রঙ্গমঞ্চে 'উজান সাহিত্য গোষ্ঠী'র উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল দু'দিনের উজান অসম বাংলা কবিতা আবৃত্তি প্রতিযোগিতা -- ‘শুধু কবিতার জন্যে-২০১৫’ । উজান আসামের বাইরেও বঙ্গাইগাঁও, ডিমাপুর ইত্যাদি অঞ্চল থেকে প্রতিযোগীরা এলে তাদের আগ্রহকে সম্মান জানিয়ে অংশ নিতে দেয়া হয়।   এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে প্রায় আশিজন প্রতিযোগী, সকাল থেকে রাত নটা অব্দি হল ভর্তি দর্শক নিয়ে উৎসবের চেহারা নিয়েছিল তিনদিনের এই অনুষ্ঠান। ‘উজানে’র উদ্যোগে এ ছিল দ্বিতীয় প্রয়াস। এর আগে  ২৯ এবং ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১২ তে প্রথমবারের জন্যে হয়েছিল ‘শুধু কবিতার জন্য’ ।

            ‘উজান’ গেল এগারো বছর ধরে তিনসুকিয়া থেকে প্রকাশিত একটি ছোট কাগজ। কাগজটিকে কেন্দ্র করে রয়েছে সংগঠন ‘উজান সাহিত্য গোষ্ঠী’। সংগঠন কাগজ বের করা ছাড়াও নিয়ম করে ২১শে ফেব্রুয়ারি এবং ১৯শে মেতে ভাষা শহীদ দিবস পালন করে থাকে, সাহিত্য আসরের আয়োজন করে থাকে। এছাড়াও এটা ওটা করে থাকে। এই ‘শুধু কবিতার জন্য’ নামে  উজান অসম আবৃত্তি প্রতিযোগিতাই হচ্ছে সর্ববৃহৎ আয়োজন যা উজান করে থাকে। এতো বড় অনুষ্ঠান করবার জন্যে উজানের শুভানুধ্যায়ীদের নিয়ে একটি পরিচালন সমিতি গঠিত হয়েছিল।   ডাঃ নক্ষত্র বিজয় চৌধুরীকে সভাপতি, সুজয় রায়কে কার্যকরী সভাপতি  এবং  ত্রিদিব দত্তকে  সম্পাদক করে প্রায় পঞ্চান্ন-জনের এক পরিচালন সমিতি গঠন করা হয়। সেই পরিচালন সমিতি তিনমাসের টানা শ্রমে  এক সুন্দর আর সফল অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ফেলেন।  সত্যি বলতে এতো সুশৃঙ্খল বাংলা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অতি অল্পই হয়েছে এই শহরে।  

             ২৫শের সকাল দশটায় অনুষ্ঠান হলের বাইরে কার্যকরী সভাপতি সুজয় রায় সংগঠনের পতাকা তুলে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন। জীবন সরকার, বর্ণালী সেনগুপ্ত,তুহিনা  ভট্টাচার্য প্রমুখদের নেতৃত্বে উজানের শিল্পীদল তখন গেয়ে ওঠেন উদ্বোধনী গান ‘শুভ কর্মপথে ধরো নির্ভয় গান’। দুটি দুঃসংবাদ অনুষ্ঠানের আগে আগে আয়োজকদের বিব্রত করেছিল।   প্রথমটি উজানের আজন্ম শুভানুধ্যায়ী কবি নিখিলেশ্বর চৌধুরী দিন কয় আগে মারা যান। তিনি অনুষ্ঠানের পরিচালন সমিতির সভাপতি ডাক্তার নক্ষত্র বিজয় চৌধুরীর বাবা। ফলে সভাপতির আর এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা হয় নি। আর ঠিক আগের দিনে চলে গেলেন কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ। এই দুজন ছাড়াও সম্প্রতি প্রয়াত কবি রুচিরা শ্যাম, অমিতাভ চৌধুরী প্রমুখ প্রয়াত শিল্পী সাহিত্যিকদের স্মরণে নির্মিত বেদীতে  শ্রদ্ধাঞ্জলি দেন উজানের উপদেষ্টা অধ্যাপক সুশান্ত কর। সমবেতরা প্রয়াতদের সম্মানে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন।    এর পরে অনুষ্ঠান মঞ্চের সামনে উজানের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক প্রয়াত অশোক কর্মকারের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করেন  উজানের প্রবীণা সদস্যা নীহারিকা দেবী।  তিনসুকিয়া শহরের এককালে সুখ্যাত বাচিক শিল্পী প্রয়াত হরনাথ ব্যানার্জির স্মরণে উৎসর্গ  করা হয়েছিল মূল অনুষ্ঠান মঞ্চ। তাঁরই বড়ভাই আরেক বাচিক শিল্পী রবীন্দ্রনাথ ব্যানার্জি এর পরে সেই মঞ্চটি উন্মোচন করেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর হরনাথের পুত্র সোমনাথ ব্যানার্জি। এর পরে প্রদীপ জ্বালিয়ে মূল অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন উজানের অন্যতম উপদেষ্টা কবি-নাট্যকার হরেন্দ্রনাথ বরঠাকুর।  
এর পরেই বরগীত পরিবেশন করেন অন্তরা শইকীয়া । তাঁর গানে  সঙ্গত করেন অজিত মরাণ, রাজু বরা, অন্তর্জিতা শইকীয়া।      বরগীতের পরে উজানের শিল্পীরা সমবেত গানে কবিতায় অনুষ্ঠানের সূচনা করেন। শিল্পীরা ছিলেন সুজয় কুমার রায়, নীলকমল ব্যানার্জি, সৌমেন ব্যানার্জি, মুনমুন চৌধুরী, নমিতা ঘোষ, ডালিয়া দাস, শতাব্দী গাঙুলি, কিংশুক চৌধুরী, অনামিকা দত্ত, এবং সত্যজিৎ গোস্বামী।
    এর পরেই তিন আমন্ত্রিত বিচারক  এবং সুখ্যাত বাচিক শিল্পী রবিন ভট্টাচার্য, তনিমা নন্দি পালিত, শঙ্কর দাসকে মঞ্চে বরণ করে প্রতিযোগী এবং দর্শকদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয়া হয়। এর মধ্যে প্রথম দু’জন  পশ্চিমবাংলার হাওড়া থেকে, তৃতীয় জন অসমের নগাঁও থেকে। এরই ফাঁকে অনুষ্ঠান উপলক্ষে বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর সম্পাদনাতে প্রকাশিত স্মরণিকা ‘উৎসব’ উন্মোচন করেন পরিচালন সমিতির পৃষ্ঠপোষক ডাক্তার কীর্তি রঞ্জন দে। এর পরেই পরিচালন সমিতির সম্পাদক  ত্রিদিব দত্তের স্বাগত ভাষণ দিয়ে শুরু হয় ক-বিভাগের প্রথম পর্বের প্রতিযোগিতা।
     প্রথম দিনের প্রতিযোগিতা শুরু হয় ক বিভাগের প্রথম পর্ব দিয়ে। পুরো প্রতিযোগিতাকে সাজানো হয়েছিল এই ভাবে।  দুটো বিভাগ ছিল ক এবং খ। আর পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণি ক; দশম শ্রেণি থেকে উপরে সবাই খ বিভাগ ।  দুই বিভাগের তিনটি পর্ব। প্রথম পর্বে নিজের পছন্দের রবীন্দ্র কবিতা আবৃত্তি করতে হয়েছিল। সেখান থেকে দুই  বিভাগেই  পঁচিশ জন করে প্রতিযোগীকে  দ্বিতীয় পর্বে তুলে নেয়া হয়। এই পর্বে পূর্বোত্তরের কবিদের কবিতা আবৃত্তি করতে হয়।  ক-বিভাগে কবিরা ছিলেন অশোক বিজয় রাহা, বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী,   শক্তিপদ ব্রহ্মচারী , দেবলীনা সেনগুপ্ত। এবারে অবশ্য ক-বিভাগে এদের সঙ্গে সুকুমার রায়, কাজি নজরুলের কবিতাও ছিল। কিন্তু খ-বিভাগে কোনো কোনো মিশ্রণ ঘটানো হয় নি। কবিরা ছিলেন,   অমিতাভ দেব চৌধুরী, শক্তিপদ ব্রহ্মচারী, রমানাথ ভট্টাচার্যের অনুবাদে অসমিয়া কবি হেম বরুয়া, কল্যাণব্রত চক্রবর্তী, রণজিৎ দাস, বিজয় ভট্টাচার্য। দুই বিভাগ থেকেই ষোলোজনকে চূড়ান্ত পর্বে তুলে নেয়া হয়। প্রথম দিনে ক বিভাগের দুটো পর্বের প্রতিযোগিতা হয়। দ্বিতীয় দিনে হয় খ-বিভাগের দুই পর্বে। এর আগের বারে দুই দিনেই প্রতিযোগিতা শেষ হয়েছিল। কিন্তু এবারে চূড়ান্ত পর্বের  প্রতিযোগিতা হয় তৃতীয় দিনে বিকেল ৩টা থেকে।  উজান আসাম ছাড়াও বঙ্গাইগাঁও, ডিমাপুর থেকেও প্রতিযোগিতাতে যোগ দিতে আসাতে তাঁদের আগ্রহকে সম্মান জানিয়ে যোগ দিতে দেয়া হয়। দ্বিতীয় স্থানে বিজয়ীও  হন ক-বিভাগে ডিমাপুরের মেধা মহিমা চৌধুরী, আর খ-বিভাগে বঙ্গাইগাঁওয়ের রাজেশ শর্মা। দুই বিভাগে মিলিয়ে প্রতিযোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮০ তবে। বড়রাই সংখ্যাতে বেশি ছিলেন।  চূড়ান্ত পর্বে  বাকি বাংলা-বিশ্বের আধুনিক কবিদের কবিতা বেছে নেয়া হয়েছিল।  সেখান থেকে পাঁচজন করে প্রতিযোগীকে চূড়ান্ত বিজয়ী বলে ঘোষণা করা হয়। পুরস্কার হিসেবে প্রত্যেককে দেয়া হয় একটি প্রমাণপত্র, উজান স্মারক, একটি করে ফলক আর প্রথম পুরস্কারে ৫০০০/ টাকা , দ্বিতীয় পুরস্কারে  ৩০০০/-টাকা, তৃতীয় পুরস্কারে ২০০০/-টাকা , চতুর্থ পুরস্কারে ১০০০/_টাকা এবং পঞ্চম পুরস্কারে ৫০০/-টাকা। এছাড়াও দুই বিভাগে মিলে সম্ভাবনা-সম্পন্ন এক প্রতিযোগীকে বেছে নেয়া হয়। তাকে উজান সম্মান স্মারক এবং ফলক দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়।  শহরের কিছু বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব পুরস্কারের অর্থরাশি দান করেন।  প্রথম পুরস্কারের অর্থরাশি দান করেন ডাক্তার কীর্তি রঞ্জন দে এবং সমীরণ গুহ; দ্বিতীয় পুরস্কার দান করেন অনুপ গোস্বামী এবং শান্তিময় চক্রবর্তী; তৃতীয় পুরস্কারের অর্থরাশি দান করেন ড ০ শুক্লা সরকার এবং মায়া রায়; চতুর্থ পুরস্কারের অর্থরাশি দান করেন বাণীব্রত রায় এবং অনুপ রায়; পঞ্চম পুরস্কার দুটিরই অর্থরাশি দান করেন দীপক ভাওয়াল।
তিনদিনের অনুষ্ঠানের একেবারে শেষে দাতারাই পুরস্কৃতদের হাতে একটি প্রতীকী চেক সহ অর্থরাশি তোলে দেন। প্রমাণপত্র, উজান স্মারক , এবং ফলক তোলে দেন তিন বিচারকেরা মিলে।

ক-বিভাগে
প্রথম হয়: পৌষালি কর ;
দ্বিতীয় হয়: মেধা মহিমা চৌধুরী;
তৃতীয় হয়: স্বর্ণালি ঘোষ;
চতুর্থ হয়: বর্ণিতা চৌধুরী;
পঞ্চম হয়: পৌলমী দাশগুপ্ত।
খ-বিভাগে
প্রথম হন: পৌষালি ঘোষ;
দ্বিতীয় হন: রাজেশ শর্মা;
তৃতীয় হন: মোহনা বণিক;
চতুর্থ হন: অপূর্ব দেব;
পঞ্চম হন: রূপজ্যোতি মিশ্র;

দুই বিভাগ মিলিয়ে সম্ভাবনাময় বাচিক শিল্পীর পুরস্কার পান সায়ঙ্কি দাস।

বিজয়ীদের বেশ কিছু মজার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। দুই বিভাগেই প্রথম দুজনেরই নাম পৌষালি। ক-বিভাগে বিজয়ীরা সবাই মেয়ে।  দুই বিভাগেই দ্বিতীয় পুরস্কার বিজয়ীরা উজান আসামের বাইরে থেকে আসা।  প্রথমজন ডিমাপুর আর দ্বিতীয়জন আসেন বঙ্গাইগাঁও থেকে। খ-বিভাগে চতুর্থ অপূর্ব দেব সব চাইতে বেশি বয়সের প্রতিযোগী, প্রায় সত্তর ছুঁই ছুঁই। 

গতবছর শেষ দিনেই যৎসামান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছিল, তাও খুব একটা পূর্বপরিকল্পিত ছিল না। এবারে তিনদিনেই সন্ধ্যাবেলা টানা তিনঘণ্টার পূর্বপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। শুরুতে তিনদিনই ছিল নিজেদের এবং আমন্ত্রিত বাচিক শিল্পীদের আবৃত্তি।   শঙ্কা ছিল সকাল থেকে কবিতা শুনতে শুনতে এতো রাতঅব্দি দর্শক থাকবেন কিনা, কিম্বা সময়মতো সবই হতে পারবে কিনা। দু’টোর কোনোটাই ঘটেনি। অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং নিয়মানুবর্তী ছিল সেই অনুষ্ঠান। শুধু প্রথম দু’দিনে ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠান দুটো কীর্তন এবং মনসামঙ্গল গানকে একেবারে শেষে রাখা হয়েছিল, কিন্তু দর্শক তেমন থাকেন নি। তৃতীয় দিনে ধামাইলের সময় আর সেটি ঘটেনি। অবশ্য, পুরস্কার প্রদানটাও শেষঅব্দি আটকে রাখা হয়েছিল। এছাড়াও প্রতি পর্বেরই প্রতিযোগিতার শুরুও হয়েছিল আবৃত্তিতে কিম্বা গানে। প্রথম দিনে দ্বিতীয় পর্বের শুরুতেও উজানের শিল্পীরা গান করেন ভূপেন্দ্র সঙ্গীত। দ্বিতীয় দিনের প্রথম পর্বের শুরুতেই মঞ্চে প্রথম আবৃতি করেন ৯৩ বছরের বৃদ্ধা মায়া চক্রবর্তী। তাঁকে পরিচালন সমিতির পক্ষে কার্যকরী সভাপতি সম্বর্ধনা জানান । তিনি স্মৃতি থেকে অনর্গল কবিতা বলে যেতে পারেন বলেই এই সম্মান। এ ছাড়াও আবৃত্তি করেন সৌমেন ব্যানার্জি।  এদিন দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় ত্রিদিব দত্তের আবৃত্তিতে। শেষ দিনে চূড়ান্ত পর্বের প্রতিযোগিতার শুরুতে  গীতা দে’র সঞ্চালনাতে সমবেত আবৃত্তি পরিবেশন করে ‘বর্ণালী শিশু কল্যাণ সংস্থা’র শিশু কিশোর শিল্পীরা।
প্রথম দিনের সান্ধ্য অনুষ্ঠান শুরুতেই   ডিগবয় থেকে আমন্ত্রিত তিন  বাচিক শিল্পী অভিজিৎ গুহ, সুপ্রতীম পুরকায়স্থ এবং রবিন ভাওয়াল ক্রমে ক্রমে আবৃত্তি করেন। সুপ্রতীম পুরকায়স্থ ছিলেন ‘শুধু কবিতার জন্য-২০১২’ র বড়দের  বিভাগে প্রথম পুরস্কার প্রাপ্ত বাচিক শিল্পী ।  এছাড়াও করেন নীলকমল ব্যানার্জি এবং তনিমা নন্দি পালিত। শেষ শিল্পী বিচারকদের অন্যতম, তিনি অন্যদের সঙ্গেও আসামের কবি সঞ্জয় চক্রবর্তীর কবিতা ‘একা নির্জন ঘরে’ আবৃত্তি করেও শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন।  এরপরে একক নাচ পরিবেশন করে শিশু শিল্পী তানিশা  রায়, গান করে একে একে সুচয়িতা চক্রবর্তী  এবং  শীলা দে সরকার। আবারো নাচ পরিবেশন করেন   রেশ্মি পাল। প্রথম দিনের শেষ দুই আকর্ষণের প্রথমটি ছিল নন্দিতা ব্যানার্জির পরিচালনায় ‘উৎসব একাডেমী’র পরিবেশিত নৃতিনাট্য ‘ভানুসিংহের পদাবলী’ এবং দেবদুলাল গোস্বামী, শিব তাঁতি এবং তাঁদের সহ শিল্পীদের পরিবেশনাতে ‘কীর্তন’। এই শেষ অনুষ্ঠানটি তিনসুকিয়ার কোনো মঞ্চে যেমন প্রথম হয়েছিল তেমনি শিল্পীরাও প্রথম মঞ্চে এসেই দর্শকমন জয় করতে সফল হন।
        দ্বিতীয়দিনে সন্ধ্যাবেলা অনুষ্ঠান শুরু হয় ডিব্রুগড় থেকে আমন্ত্রিত বাচিক শিল্পী নীলাভ নয়ন বরদলৈ এবং  রাধামাধব মজুমদার। এছাড়াও আবৃত্তি করেন দুই বিচারক রবিন ভট্টাচার্য এবং শঙ্কর দাস। এর পরেই অমল মুখার্জির সঞ্চালনাতে ‘সঞ্চয়িতা সঙ্গীত বিদ্যালয়ে’র তিন শিশু শিল্পী পৌষালি কর, মঞ্জিৎ পাল এবং গরিমা দেবী পরিবেশন করে কয়েকখানা বাউল গান। তাঁদের যন্ত্রে সঙ্গ দেন  রতন দেব,শুভম রায়, বিজয়া দাস এবং সাগর দেব।   এর পরে পর পর একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন উজানের সদস্যা  তুহিনা ভট্টাচার্য এবং বর্ণালী চৌধুরী।  জীবন কৃষ্ণ সরকারের পরিকল্পনা এবং পরিচালনাতে এরপরে  ‘উজান সাহিত্য গোষ্ঠী’র সদস্য-সদস্যারা পরিবেশন করেন একগুচ্ছ লোকগান নিয়ে সাজানো  গীতি আলেখ্য ‘মায়ের ভাষায় মাটির টানে’। অংশ গ্রহণ করেন জীবন কৃষ্ণ সরকার, তুহিনা ভট্টাচার্য, মৌমিতা দেব, সুচয়িতা চক্রবর্তী, দিশানী সরকার, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, তপস্যা ঘোষ, শিপ্রা দাস, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, গীতশ্রী দত্ত, বিনায়ক সেনগুপ্ত। তবলাতে সঙ্গত করে রতন দেব, দোতারাতে বাবুল বিশ্বাস, আলেখ্যর কথা দিয়েছেন সুশান্ত কর। ভাষ্যপাঠ করেন সৌমেন ব্যানার্জি।  এর পরেই একটি আকর্ষণীয় ধ্রুপদী নৃত্য   পরিবেশন করেন আমন্ত্রিত শিল্পী রক্তিম চক্রবর্তী।
এদিনে শেষ অনুষ্ঠান ছিল ‘মনসা মঙ্গল গান’ । প্রথম দিনের কীর্তন শিল্পীদের মতো এদিনও যারা গান করেন মঞ্চে তাদের ছিল সে  প্রথম উপস্থাপনা । পরিবেশন করেন তিনসুকিয়া হিজুগুড়ির শ্রী শ্রী মা-মনসা কীর্তনীয়া   যুবক সম্র্ দায়ের  শিল্পীরা। দুলাল দাস এবং  সাধন দাস পুঁথি পাঠ করেন দোহার দিয়ে এবং যন্রে া সঙ্গ দিয়ে অন্যান্য শিল্পীরা ছিলেন বিশ্বজিত দাস, অরুণ দেব, সমর মালাকার, বিজন দেব, অনুপম দাস, প্রশান্ত দেবনাথ । 
তৃতীয় দিনের সন্ধ্যার শুরুতেই আবৃত্তি পরিবেশন করে ‘শুধু কবিতার জন্য-২০১২’ র ছোটদের বিভাগে প্রথম পুরস্কার প্রাপ্ত বাচিক শিল্পী পৌলমী দাশগুপ্ত। ডিব্রুগড় থেকে আমন্ত্রিত বাচিক শিল্পী সলিল গুহ মজুমদার, মালবিকা দত্ত। পরিচালন সমিতির দুই সদস্য সৌমেন ব্যানার্জি এবং নমিতা ঘোষ একগুচ্ছ কবিতা যৌথ কণ্ঠে আবৃত্তি করেন। কবিতায় এবং গানে আলেখ্য পরিবেশন করেন নীলকমল ব্যানার্জি, পৌষালি ঘোষ, ডালিয়া দাস এবং নির্মলেন্দু চ্যাটার্জি।
এর পরে সঙ্গীত শিক্ষক অমল মুখার্জি মোহন বীণাতে রাগ বাগেশ্রী বাজিয়ে শোনান। তাঁকে তবলাতে সঙ্গত করেন প্রদ্যুৎ সিংহ।  দুটি করে লোকগান পরিবেশন করেন উজান সদস্য বর্ণালী সেনগুপ্ত এবং জীবন সরকার। কলকাতার থেকে আমন্ত্রিত শিল্পী অরিন্দম পালিত  দুটি ধ্রুপদী সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এদিনের শেষ আকর্ষণ ছিল বিদ্যুৎ চক্রবর্তী এবং তুহিনা ভট্টাচার্যের পরিচালনা এবং পরিকল্পনাতে চারখানি ধামাইল। এর মধ্যে দুটি বড়রা । শিল্পীরা  ছিলেন কল্পনা দাশগুপ্ত, ইন্দ্রাণী  চক্রবর্তী, নন্দিতা চক্রবর্তী, সুমি মুখার্জি, দীপান্বিতা দত্ত, কল্যাণী দত্ত, শ্যামলী চক্রবর্তী, মহুয়া সেন, ও রুমকি চক্রবর্তী।  আর দুটি পরিবেশন করে কিশোরী শিল্পীরা। তারা হচ্ছে পৌলমী ব্যানার্জি, সুচয়িতা চক্রবর্তী, রাজশ্রী দে, সিমরন সেন, মীনাক্ষী  দে শঙ্কর এবং যোশিকা এস শঙ্কর।   আগের দুই দিনের কীর্তন এবং মনসামঙ্গলের শিল্পীরা তবু মঞ্চের বাইরে অনুষ্ঠান করে থাকেন। কিন্তু ধামাইলের শিল্পীরা সম্ভবত সবাই এই প্রথম ধামাইল নাচলেন। তিনসুকিয়া শহরের মঞ্চে এই নৃত্য প্রথমবারের মতো উপস্থাপন করা হলো। এদিন অনুষ্ঠানের শেষ অব্দি দর্শকাসন ছিল ভিড়ে ঠাসা। পেছনে দাঁড়িয়েও অনেকে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।    মূলত একটি সাহিত্যের সংগঠন ‘উজান সাহিত্য গোষ্ঠী’ র এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যেমন ছিল সুপরিকল্পিত , তেমনি সুশৃঙ্খল। কোনো কারণেই অনুষ্ঠান বিঘ্নিত হয় নি। এই এক বড় পাওনা। তৃতীয় দিনের শেষে মনে হচ্ছিল ‘উজান’ একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনেরই নাম। এই শহরে বহুদিন মানুষের এই অনুষ্ঠানের কথা মনে থাকবে। এর পরেই পুরস্কার বিতরিত হয়। সবার শেষে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠান শেষের ঘোষণা করেন উপদেষ্টা অধ্যাপক সুশান্ত কর।

~~~~~~~~~~~~~~~~০০০০০০০০০~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
নিচে অনুষ্ঠানের কিছু টুকরো চলচ্চিত্র রইল। দুর্বল ভিডিও যদিও প্রথম এলবামে রয়েছে দুই বিভাগেই দ্বিতীয় পর্বে পূর্বোত্তরের কবিদের কবিতা আবৃত্তি এবং আরো দুই একটি...।
                দ্বিতীয় এলবামে কীর্তন, মনসা মঙ্গল, ধামাইল এবং আমন্ত্রিতদের আবৃত্তি সহ বাকি কিছু অনুষ্ঠানের চলচ্চিত্র। দুটোই একাধিক ভিডিওর সমাহার।বাজালে পরপর বাজতে থাকবে...। উপভোগ করুন...




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন