.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

রবিবার, ৩ জানুয়ারী, ২০১৬

ভয় বিভ্রাট

-- জয়শ্রী ভূষণ



(C)Image:ছবি
দিন থেকে সেই একই দৃশ্য মনের মধ্যে আনাগোনা করছে... চোখ খোলা অবস্থায়। চোখ বন্ধ করলেও সেই একই অনুভূতি। সেই ছবিটা মনে আসলেই ......কি রকম জানি অস্বস্তি শুরু হয় আমার মধ্যে। ......ইইইইস...আবার সেই একই ছবি...... অটো থেকে নেমেই সোজা ছেলেকে বগল দাবা করে গটগট করে অন্ধকার গলি দিয়ে হেঁটে চলেছি ...।
শীতের রাত...৮ টা বাজলেই মনে হয় অনেক রাত হয়ে গেছে। তাই কিছুটা হনহন করেই হাঁটছি। উদ্দেশ্য যত তাড়াতাড়ি... মানে সম্ভব হলে বিদ্যুৎ বেগে নিজের এপার্টমেন্টে পৌঁছে নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা। আজও পাড়ায় এফ-আই-আর করেছে আর এক দিদি। দিদি ও দিদির ১৭ বছরের মেয়েকে ঐ পাশের বাড়ির অসভ্য মানুষগুলো কদিন ধরেই যন্ত্রণা দিচ্ছে, একথা কুকথা বলছে। এক মাসও হয়নি এখনও দাদার মৃত্যুর, এখনও শরীর শিউরে উঠে কয়েক সপ্তাহের আগের সেই ছবিটা সামনে ভেসে উঠলে। এক পলকেই জলজ্যান্ত মানুষটা পুজোর অষ্টমীর দিন রাতে পরিবারের সাথে হাসতে খেলতে খেলতে নিয়তির অদৃশ্য পরিহাসে একটা জলজ্যান্ত ছবি হয়ে গেল। তার মধ্যেই আর এক অশান্তি পাশের বাড়ির ছেলে দুটো। জ্বালিয়ে মারছে সারাক্ষণ। পাড়ায় এত মানুষ, থুড়ি মানুষ তো নয় সব ভদ্রলোক, আজকালকার ভদ্রলোকরা আবার ফালতু ঝামেলায় নিজেকে জড়ায় না। শুধু মাত্র সোসিয়েল গেদারিং এ পাবেন, ......হ্যাঁ, হাতে গোনা এক দুজনকে ছাড়া, কারণ ছোটলোকের সাথে কেউ মুখ খারাপ করতে চায় না যে, তার থেকে বরং দূর থেকে দেখে, না দেখার ভাণ সে ঢের ভাল।
আমার ছেলে আমাকে চিমটি কেটে বলল, ... মাম্মা দেখো... পুলিশ এসেছে ...আসলে আমি আগেই দেখেছি...... ঐ বাড়ির দুটো মেয়ের সাথে কথা বলছে, দূর থেকে পুলিশের আর ওদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখেই আসলে বোধহয় আমার হাঁটার গতি আরও বেড়ে গেছে। ছেলেকে হ্যাঁচকা টান মেরে বললাম শীগগির পা চালাও বাবা...... মনে মনে নিজের সাথে দাঁত কিড়মিড় করছিলাম আর ভাবছিলাম,...এদের পুলিশ ও প্রোটেকশন দেবে, কারণ শত হলেও এরাই আজকের রাজনৈতিক দলগুলির চামচা, সে ওরা ক্ষমতায় থাকুক আর নাই থাকুক......চামচাগুলি বহাল তবিয়তে আছে ও থাকবে। একজন পুলিশকে বাইকে ও অন্য আর একজনকে দেখলাম দাড়িয়ে কথা বলছে......ওদের পেরিয়ে যেতে যেতে যেন আমার অস্বস্তিটা আরও বেড়ে গেল, ......আসলে এই অনুভূতিগুলো আমার ভীষণ অপছন্দ,আমার মন যেন এই অনুভূতি গুলোর সাথে যুদ্ধ করছে, না না এভাবে ভেবো না, অন্য দিকে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া দৃশ্য গুলি যেন আমার মনকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাতে দেখাতে আমার মনকে এলো পাথারি ছুটতে বাধ্য করছে। .........মনে মনে ছেলেকে বললাম, বাবা তোর স্বস্তির আশায় জল ঢালতে ভাল লাগছে না, আমার সময়ও ওরা কিছু করেনি , এবারও কিচ্ছু হবে না, ......এই মনের কথাটা দিদিকে বলে নিরাশ করতেও ইচ্ছে করেনি, তাই যখন জিজ্ঞেস করেছিল...আমি বলেছিলাম দিয়ে দেখো দিদি......এছাড়া যে নতুন মেয়েগুলো ইভটিজিং নিয়ে কাজ করছে এখানকার ওদের সাথেও আলাপ করিয়ে দিয়েছিলাম......।
অনেকদিন হল কিচ্ছু লিখিনি। কিছু একটা লিখতে হবে। কিন্তু কী লিখবো ? কাজ করতে করতে চলতে ফিরতে যখন ভাবছি, মাথার ভিতরটা তক্ষুনি অমাব্যসার মত কুচকুচে কালো হয়ে গেল। ধুর ছাই... ভেবে যেই হাল ছেড়েছি, ঠিক তখনি যেন সুইচ অন করে আলোর প্রতিফলনের মত একটি শব্দ মনে এল ‘ভয়’ । ‘ভয়’  শব্দটি মনে আসার সাথে সাথে মনে মনে ভাবতে লাগলাম, আরে ভয় কথাটাই কেন মনে হল......। পর মুহূর্তে যেই  ‘ভয়’  কী  ভাবতে শুরু করেছি, এক নিমেষে আমার মন হুটোপাটি করে পড়িমরি...করে--- দে... ছুউউউ...ট...... আমার এক্কেবারে ছোট্টবেলায়......মনের টিভির সুইচ অন... দেখছি------সেই ছোট্ট বেলায় ভয় কী জানতাম নাতো!! ...খুব ছোট তখন আমি.....ঘরের ভেতর টা অন্ধকার,হঠাৎ করে আলো চলে গেল, লোডশেডিং. ৩/৪ বছরের মেয়েটি বলছে...... মামনি, বাপি জানো, আমি অন্ধকারে ভয় পাইনা তো এক্কেবারে, কারণ অন্ধকার তো নয়, আমি তো দিব্যি অন্ধকারে সব দেখতে পাই, আমার চোখ কি তবে মিঁয়াউ(বেড়াল) এর মত
মন তবুও খুঁজে চলেছে ‘ভয়’ কে আমার মনের গহীনে। খুঁজে না পেয়ে আরও মনের অতলে ভাবনার ঢেউগুলো শুধু স্মৃতির খাতায় এপার আর ওপার ছুঁয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ কী যেন স্মৃতি পাতায় শিশির জলের বিন্দুর মত টলমল করছিল, এইই যাহ্‌... পড়তে পড়তেই ধরে ফেললুম, ...... বয়স তখন কত হবে বড় জোর ৫/৬, আবছা আবছা এখনও,... .....পেছন দিকে ধবধবে সাদা মাটির উঠান,পেয়ারা গাছ, আম, আতার পাশে জলপাই গাছ, তারপরে আসাম টাইপের পুরনো ভিটে বাড়ি, পুকুর, কাঁঠাল গাছ, আরও কত কী!!! আমাদের বাড়ি সামনের দিকটা যেখানে আমরা থাকতাম,...তখনকার দিনেও আজকালের মত অনেকটা ফ্ল্যাট বাড়ির মত,......মধ্যি খানে টুকটুকে লাল বারান্দা, দুপাশে দুটো করে বড় বড় পাকার ঘর... রান্নাঘর আর খাওয়ার ঘর একপাশে, আর একপাশে একটা ড্রয়িং রুম, আর একটা শোবার ঘর, লাল বারান্দার সামনে গাড়ির গ্যারেজ, ......গ্যারেজের দুপাশে দুটো ঘন সবুজ ছোট ছোট উঠান, বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা দুপাশ......সব পেরিয়ে সামনে বিশাল একটি গেইট , তখনও বাঁশেরই ছিল ......পরে লোহার গেইট...এখনও সেই গেইট আছে... শুধু আগে মনে হত বিশাল বড় ...এখন কি করে যেন একটু ছোট ছোট লাগে......আসলে আগে ছোটটি ছিলাম, আর এখন বড় হয়ে গেছি।...শীতের রাত...খুব ঠাণ্ডা লাগছে, ... রাতের খাবার আগে মা বিছানা করে একেবারে আমাদের নিয়ে এপাশে আসে ......একদম রাস্তার পাশে বাড়ি আমাদের... যতই রাত বাড়ে চারিদিক কেমন চুপচাপ হয়ে যায়, সেদিন মা খাইয়ে দিয়ে বলল যাও শুয়ে পড়...... ছোট্ট আমি বললাম এখন নয় একটু পড়ে যাব... আসলে রাতের বেলা বারান্দা পেরিয়ে ওপাশে দরজার হুরকোটা খুলে ঘরে ঢুকতে আমার গা ছমছম করতো। মায়ের সেই চাউনি ও মুচকি হাসি, জিজ্ঞেস করলেন কেন ভয় করছে, নিজের বড় হওয়া জাহির করতে মার এই জিজ্ঞাসাকে ভুল প্রমাণ করতে ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিতে বলে উঠলুম... নাগো আমি এখন বড় হয়ে গেছি, ভয় আবার কিসের। বলেই মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে দরজা খুলে আগে শুনশান রাস্তার দিকে তাকিয়ে এক দৌড়ে ওপাশের হুরকো খুলে ঘরে ঢুকেই আবার দরজা লাগিয়ে ভয়ে আর শীতে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে মনে মনে ভাবছিলাম এত সাহস না দেখালেই হত মামনিকে...কী করবো ভাবতে ভাবতে হ্যাঁচকা টানে মশারী খুলে বিছানায় উঠে কোনওমতে হুড়োহুড়ি করে লেপের ভেতরে ঢুকে যেই মাথা ঢেকেছি, মনে হয়েছিল, এই তো আর ভয় নেই, মনে হয়েছে...ঘাম দিয়ে ভয় পালিয়েছে...ভাল করে শ্বাস নিয়ে মনে হয়েছিল, বাব্বা সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পার হয়ে এলাম এইমাত্র।
দশ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছি, সহসা মৃত্যু ...আগে থেকে জানা ছিলনা, শিশু সুলভ মন ছিল, তবুও ভয় পাইনি, রাগ হয়েছিল, কান্না পেয়েছিল, মনে হয়েছিল... পায়ের নীচে থেকে মাটি সরে গেছে, বুঝেছিলাম ... মাথার উপরে আর ছাদ নেই, এখন বড় হতে হবে, ভাইয়ের জন্য মায়ের জন্য। আমাদের বাড়ির কাছেই ছিল আমার এক বাল্য বিধবা পিসির বাড়ি। শুনেছি মাত্র ১৪ বছর বয়সেই বিধবা আর বৈধব্যের ঠিক পরেই নাকি আমার পিসতুতো দিদির জন্ম। বিয়ের এক বছরের মাথায় আমার সেই পিসেমশাই মৃত্যু হয় যক্ষ্মা রোগে। আমার বড়পিসি ছিলেন আমার বাবা কাকা পিসিদের সবার বড় দিদি। সেই দিদিকে সবাই মা জ্ঞানে শ্রদ্ধা ও মান্য করতেন। দিদি-দিদি এই প্রাধান্য এক সময় আমি দেখছি, আমার মা-কাকিমা-জেঠিমাদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠত। শুনেছি ঠাকুরদাদার সৌজন্যে দেশভাগের পর বহু আত্মীয়-অনাত্মীয়দের সাময়িক ঠিকানা ছিল আমাদের বাড়ি। এই পরিস্থিতিতে আমাদের বাবা কাকাদের ক্ষোভ ছিল দাদু নাকি নিজের ছেলেমেয়েদের খেয়াল কখনই সঠিক ভাবে রাখতে পারেননি। আমার সেই বাল্য বিধবা পিসি, দাদুর মৃত্যুর পর বাবার ভূমিকায় ছোট ভাই বোনদের লালন পালন করেন। বৈধব্যের পরেই তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন,ও পরে শিক্ষকতা শুরু করেন। সেই বড় পিসিই আমার ছোট কাকুদের স্বল্প আয়ের থেকেই খেয়ে পরিয়ে মানুষ করেন। আমৃত্যু আমার বাবা কাকা এবং আজও আমার পিসিরা আমার বড় পিসিকে দেবতাজ্ঞানে শ্রদ্ধা করেন। শেষের দিকে আমার বাবা কাকা সবাই মিলেই উনার দেখভাল করতেন। একা থাকতেন। আমাদের একান্নবর্তী বাড়ি, তাই পিসির জন্য ঠাকুরদাদা আগেই আলাদা ছোট্ট একটি বাড়ি করে দিয়ে গেছেন।
বাবার মৃত্যুর পর কয়েকমাস পরেই যখন আবার আমার সেজকাকু বাড়িতে এলেন, তখন মা কে বলে গেলেন আমাদের মধ্যে কেউ যেন বড় পিসির কাছে গিয়ে রাতে ঘুমাই। হঠাৎ করে বাপি মারা যাওয়ার পরে স্বাভাবিক ভাবেই উনিও খুব ভেঙ্গে পড়েছিলেন ও একা বোধ করতেন। বাকি কাকা পিসিরা সবাই বাইরে থাকেন মাঝে মাঝে আসা যাওয়া করেন। আমরা যেহেতু যমজ ভাইবোন, আমাদের মধ্যে একজনকে গিয়ে রাতে ঘুমাতে বলা হল। বাবার মৃত্যু আমাকে একটু তাড়াতাড়ি বড় করে দিয়েছিল, তাছাড়াও ছোটবেলা থেকেই আমার বড় হওয়ার একটু তাগিদটা বেশি ছিল। তাই আমাকেই রোজ যেতে হত। রোজ পড়াশোনা শেষ করে, খেয়ে ৭ টার সময় এক দৌড়ে চলে যেতাম। এমনই একদিন যখন সন্ধ্যার সময় হেঁটে যাচ্ছিলাম, রাস্তাটা অন্ধকার ছিল সেদিন, হঠাৎ করে একটি পুলিশের দাড়িয়ে থাকা খোলা জীপ থেকে আমায় ডেকে যেন কেউ কিছু বলল। কী বলেছিল বুঝিনি তখন, ভাল করে শুনিওনি, কিন্তু কী যেন এক অজানা বোধের দায়রার এত ভয় পেয়েছিলাম, কেন পেয়েছিলাম তাও জানি না, কোন দিকে না তাকিয়ে এক দৌড়ে পিসির বাড়িতে পৌঁছেই শ্বাস ফেলেছি, তা আজও মনে আছে। এর পরেও এভাবেই এক দৌড়ে বড়পিসির বাড়িতে গিয়ে রাতে ঘুমিয়ে আবার ভোর বেলা ঘরে ফিরে স্যার এর বাড়ি সেরে,স্কুল ও পড়াশোনার প্রথম ধাপ এভাবেই শেষ করেছি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নিজে পারতপক্ষে একা অন্ধকারে না থাকারই প্রয়াস করেছি। সেই প্রথম বোধহয় আমি অন্ধকারেরর মানুষকে ভয় পেতে শুরু করেছিলাম।
ভয় আসলে তেমন ভাবে আমাকে গ্রাস করেনি কক্ষনো । একা মনের মধ্যে অদম্য ইচ্ছে এগিয়ে যাওয়ার, আমার মাকে মনখারাপের দুনিয়া থেকে নতুন এক জগতে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন, সাদা রঙের থেকে রঙিন এক আনন্দের মায়াময় জাল সবার জন্য বুনতে গিয়ে আমি কক্ষনো আমাকে আমার পরিবার, পরিজন বন্ধুবান্ধবদের থেকে আলাদা করে ‘আমি’ হয়ে উঠতে পারিনি কারণ ওদের স্বপ্নগুলো আমার স্বপ্নের সাথে একাকার হয়ে মিশে গেছিল। নিজের প্রশংসা করছি ভাবলে পাঠকরা সবাই ভুল করছেন, আসলে ছোটবেলা থেকেই আমি একজন পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে বেড়ে উঠার সুযোগ পেয়েছি বলে, নিজেকে কক্ষনো মেয়ে বলে ভাবতে হয়নি। পরিবারের কেউই তেমন রক্ষণশীল না হওয়ায়, নিজ দায়িত্বজ্ঞানে উৎশৃঙ্খলও হতে পারিনি। বেশি ভালবাসা আর বেশি ভরসা পেলে আসলে ওগুলো বোধহয় কেউ হারাতে চায় না তাই আরও ভালো হওয়ার প্রচেষ্টা বেড়ে যায়। মায়ের অকাল বৈধব্য -বড় পিসির সান্নিধ্য -আজীবন ঘাস পাতার রান্না খাওয়া, পিসির ধবধবে সাদা পাট ভাঙ্গা শাড়ি একা লম্বা দুপুরের নিঃশব্দতা, সব কিছুর পাচমেশালিতে এমন করেই দিন কেটে গেল আর কবে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে আরও বড় হয়ে গেলাম। আরও পড়াশোনা করার খুব ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও, অনিচ্ছা সত্ত্বেও মায়ের ইচ্ছানুসারে চাকুরিতে যোগ দেই। খুব অল্প বয়সেই দায়িত্বের সাথে সাথে যখন পরিবারের ভরণ পোষণ ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দরুন নিজেই নিজের পরিবারের অভাব অনটন দূর করতে পেরেছি, ভয় আর তেমন করে কক্ষনো কাছে ঘেষতে পারেনি।
তখনও তেমন করে টেলিফোন বা মোবাইল এর ব্যবহার শুরু হয়নি, ভিন্ন শহরে চাকুরিরত থাকার কারণে মাঝে মাঝে একা বাড়ি যাওয়ার সময় প্রায়ই বাসে চড়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যেত। মনে মনে একটা অস্বস্তি বা শঙ্কা কাজ করত যতক্ষণ না গন্তব্যে পৌঁছুতাম। নতুন শহরে অফিসে যোগ দেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই পথে দেখা আমার এক কলেজের সিনিয়র দিদির সাথে,আস্তে আস্তে এত সখ্যতা গড়ে উঠল, সেই প্রথম দিন থেকেই আমাকে ছোট বোনের মতন আগলে ছিল, এবং পথ চলতে চলতে চোখে আঙ্গুল দিয়ে শিখিয়ে দিয়েছিল, কী করে ভয়কে জয় করতে হয়। বলত, এমন মুহূর্ত তুই খুব সত্যি সত্যি ভীত কিন্তুকক্ষনো ভয় পেলে অন্যকে বুঝতে দিবি না যে ভয় পেয়েছিস, উপরন্তু ভয় দেখাবি...পরবর্তী সময়ে কথাটা আমার কাছে খুব যুক্তি সঙ্গত মনে হয়েছে। একটা কথা বলত, ...শোন সবথেকে বেশি ভয় মানুষকে... দুষ্ট মানুষকে চিনে নিবি...... নিজেকে দুর্বল ভাবলে এবং তার থেকেও বেশি  বড় কথা সেই দুর্বলতার প্রকাশ নিজের জন্য প্রচণ্ড ক্ষতিকর। উপস্থিত বুদ্ধিমত্তার সাথে সেই ভয়ের মোকাবিলা নিজেকে অনেক অস্বস্তিকর পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে আরও আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে।” দিদির কথা আজও অক্ষরে অক্ষরে সত্যি মনে হয়......আমাদের সমাজে সব থেকে ভয়ংকর ... ‘মানুষ’।
এই মানুষ নামক কিছু অমানবিক সামাজিক জীব আমাদের চারপাশে একটা ভয়ের পরিবেশের সৃষ্টি করার কাজে নিমিত্ত......কারণ ভয় দেখিয়ে ওরা ওদের জীবিকা... ওদের আনন্দ ও ক্ষমতাও বল প্রয়োগের পথ প্রশস্ত করে...। আর আমরা যারা ভয় পাই...... তারা ঐ সব অসামাজিক মানুষকে সমাজকে বিভাজিত ও কণ্টকিত করার জন্য প্রোৎসাহন যোগাই। জন্মের পরই প্রথমে মানুষকে বিভাজন শুরু হয় ছেলে ও মেয়ের নামে, ক্রমে এই বিভাজনের বীজ ধর্ম,বর্ণ, ভাষা, উচ্চ, নীচ, হিন্দু,মুসলমান, দেশ,সীমান্ত ইত্যাদি ইত্যাদি নানা ছল ছুতায় , পুরোহিত,উলামা, বিভিন্ন ধর্মীয় গুরু বললে ভুল হবে আসলে ওরা বেশীরভাগ ধর্মান্ধ এবং কুসংস্কারের অজুহাতে ভয় দেখিয়ে বিশৃঙ্খল বাতাবরণ এর সৃষ্টি করে তোলে। আমাদের দেশে ও সমগ্র বিশ্বে ত্রাস ও ক্ষমতা প্রদর্শনের যেন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, আর তার বলি হচ্ছে আমাদের মানবতা, আমাদের সংস্কৃতি। কিন্তু কেন আজ আমাদের দেশে ও আশে পাশে এই ত্রাসের, সন্ত্রাসের পরিবেশ। আমরা কি কখনও এই নিয়ে ভেবেছি। না, কারণ আমাদের এখন কারও কারো জন্যেই সময় নেই। সবাই আত্মমগ্ন, হয় ইঁদুর দৌড়ে,নয় সোসিয়েল মিডিয়া ফেইসবুক-হোয়াটসয়াপ ......ইত্যাদি ইত্যাদিতে, নয় পার্টিতে, নয় আড্ডাতে, নয় শপিং এ...এখন আমাদের এত ব্যস্ততা, নিজের মা বাবাকে দেখার ওদের শোনার সময় নেই, ছেলে মেয়েকে যান্ত্রিকভাবে বড় করতে করতে বুড়ো হলে আমাদের কোথায় ঠাই হবে সেই হুঁশ নেই, এই সমাজটা আমাদের পরবর্তী জেনারেশনের টিকে থাকার মত রইবে কী, সেই ভাবনাটুকু নেই, আমাদের এই পরিবেশ-পারিপার্শ্বিকতা বিনষ্ট করে আমাদের আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাবার জোটুকু যে নেই...... সেই বোধ ও আমাদের নেই..., আমাদের আছে শুধু ভয়, নিজেকে আগলে রাখার ভয় , তাই আজ আমরা সবাই নন্দলাল, মুখে মুখেই আর সোসিয়েল সাইটে জগত উদ্ধার করেই আমরা খালাস......

একদিন মনে আছে অফিস থেকে বেরোতে একটু দেরি হয়ে গেল, আর তাই গাড়ি  পেতেও একটু দেরি হল। অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছিল। প্রত্যন্ত অঞ্চল, সন্ধ্যার পর গাড়ি  পাওয়া দুষ্কর ছিল, কিন্তু অফিসের বস তা বুঝতে চাইতেন না, আমিও নিজের অসুবিধা তেমন করে ,মেয়ে হওয়ার দুঃখ বা ভীতি বুঝিয়ে বলতে পারতাম না, কারণ তখনও আমি খুবই কম কথা বলতাম। কোনওমতে একটি 407 গাড়ী পেলাম তাতেই চড়ে বসলাম, একটি জায়গায় এসে ট্রাফিক জ্যামে পড়লাম, তখন প্রায় ৭টা। আস্তে আস্তে ৮/৯ ও ৯-৩০ টা বেজে গেল। যত সময় যেতে থাকল, একজন একজন করে নেমে এগিয়ে কাঁদা ভেঙ্গে ট্র্যাফিক জ্যাম এর পরে অন্য গাড়ি করে নিজ নিজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে চলে গেল। আমি শুধু মানুষের মুখ দেখছিলাম, যারা আমার সাথে রয়ে গেল তাদের সাথে আমি কি নিরাপদ, এই ভয় আমার ভেতর ঘূর্ণির মত খেলা করছিল। ইতি মধ্যে শুধু ৩ জন রয়ে গেলাম, পুরো গাড়ী খালি হয়ে গেল। আর অপেক্ষা করা মুর্খামি। সাহস করে ওদের মধ্যে যাকে আমার বেশী বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছিল, --- একজনকে জিজ্ঞেস করলাম উনি কোথায় যাবেন, এবং অনুরোধ করলাম যাতে আমার শহর এ পৌঁছা অবধি উনি আমার সঙ্গে থাকেন। উনি খুব সুন্দর করে উত্তর দিয়ে বললেন কোন চিন্তা না করতে উনি আমাদের শহরেই থাকেন, শুনে আমিও কিছুটা ধাতস্থ হলাম, এবং রাত প্রায় ১০ টায় পৌছার পর উনি আমাকে একটি রিক্সায় উঠিয়ে দিয়েছিলেন। ঐ দিনের পর থেকে আমার অজানা মানুষের প্রতি ভয় আরও কমে গেল, আমি অচেনা মানুষকেও আমার সহযাত্রীদের উপর অনেকটা আস্থা করতে শিখে গেলাম। আস্তে আস্তে অনেক সহযাত্রীরা বন্ধুতে পরিণত হল, বাসের ড্রাইভার, কন্ডাক্টররাও চিনে গেল, ভয় আবারও হা-ও-য়া। খারাপ মানুষ ইচ্ছে করলেও আর আমাকে ভীত করেনি সেই দিনগুলোতে।
             কিছুদিন পর বদলি হয়ে অন্য শহরে চলে এলাম, নতুন অফিস, নতুন সহকর্মী, নতুন জায়গা , নতুন পরিবেশ। আমি খুব কম কথা বলতাম। তাই আমাকে বোঝা খুব মুস্কিল ছিল প্রায় সবার জন্য। তা সত্ত্বেও আস্তে আস্তে অনুভব করলাম, যে আমার উপর অনেকেই খুব বেশি আস্থা করেন। বিশেষ করে বয়োজ্যেষ্ঠরা এবং যারা খুব নিম্ন মধ্যবিত্তের তাদের সাথেই আমার সহজ বন্ধুত্ব আগেভাগেই গড়ে উঠে। আসলে আগে আমি শুধুমাত্র আমার একান্নবর্তী পরিবার ও আমার খুব কাছের কয়েকজন বন্ধু ও তাদের পরিজনদের সাথেই সামাজিক ভাবে জড়িত ছিলাম, কিন্তু আমার চাকুরি  পরবর্তী সময় আমার সমাজের মেলামেশার পরিধি বিস্তৃত করেছে। ছোটবেলায় বাড়িতে শুনতাম , শিক্ষা তিন প্রকারের---- শুনে শেখা, দেখে শেখা ও ঠেকে শেখা । বাইরের আবর্ত, মিথ্যে কথা বলা, মানুষকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা, ফাঁকি দেওয়া এরকম অনেক কিছু আমি আমার চাকুরি জীবনে দেখে শিখেছি, শুনে শিখেছি, কারণ আমার ছোটবেলায় এই শিক্ষাগুলি নেওয়ার সময় ছিলনা, খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে উঠেছিলাম পড়তে পড়তে, খেলতে খেলতে, গাইতে গাইতে, উচ্ছলতায়,স্বপ্ন দেখতে দেখতে...... । একদিন অফিসে বসে বসে কিছু কাণ্ড ঘটার আগেই আঁচ করে নিতে নিতেই ভাবছিলাম, সত্যি এতো অন্য এক শিক্ষা --- শুনে ও দেখে শেখা...এ গুলো তো এমনিতে শেখা যাবে না , যতক্ষণ না এই সব মুহূর্তগুলি আমরা উপলব্ধি ও পরে প্রয়োগ না করি। এই আবর্তে ঘুরতে ঘুরতেই আমি অন্য এক আবর্তে জড়িয়ে গেলাম, জড়িয়ে পড়লাম অনেক রকম মানুষের সাথে, গণনাট্য, নাটক, সংস্কৃতি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, থিয়েটার আরও অনেক কিছুর সাথে। একটু একটু করে দেখা হয়ে গেল অনেক এরকম মানুষের সাথে যারা আমার মত ভাবে, অন্য রকম ভাবে সেই ভাবনা গুলোকে প্রতিফলিত করতে অনবরত চেষ্টা করে যাচ্ছে, এই যে নিজের মত মানুষদের সাথে, ওদের কাজের সাথে নিজের একাত্মবোধ , এ যে কি পরিতৃপ্তির, যেন গায়ে কাঁটা দেয়া আনন্দদায়ক অবিশ্বাস্য কিছু একটা, সে অনুভূতি আমি আপনাদের লিখে বোঝাতে পারব না, ঠিক যেন সেই আমি ...... যেন সেই লেপের ভেতরে মাথা ঢেকে বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার মত করে আবার প্রাণ ফিরে পেলাম, যে শেকড় উপড়ে অন্য শহরে ডেরা করেছিলাম, সেই শহরকে ভালবাসতে শুরু করলাম, আশেপাশের সবাই যেন আস্তে আস্তে আমার হয়ে উঠল, আর আমি আবার কবে একা থেকে অনেক হয়ে   আমরা’  হয়ে গেলাম, আবার সেই ভয় লেশ হীন ‘আমি’আমরা’ তে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেলাম।
এত সবের পরে যে সাহসটুকু সঞ্চয় করলাম, তা হল আমি আর একা নই, ভয় পেতে হবে না, উচিত কথাগুলো বলা দরকার, এই সব দেখে শুনে শুনে ... কবে যেন কথা বলা শুরু করে দিলাম। কেউ কিছু বললে সর্বাবস্থায় সেই কথাটি মাথা পেতে নিতে হবে সেই সব ঝেড়ে কেশে ফেলে দিয়ে একদম কথায় কাঁচি ধার চলে এল। এই যে কথাবলার বিদ্যা কিন্তু আমাকে পরবর্তী সময়ে অনেক অসুবিধা, বিপদ ও অবশ্যই ভয়ের হাত থেকে রেহাই দিয়েছে। কিন্তু আমি কি এখন আর ভয় পাই না, এই মুহূর্তে এই প্রশ্নটি আমার মনে কেন উঁকি মারছে ? আমি কি এখনও ভয় পাই। ভয় নিয়ে এত ভাবছি কেন?
            এই কদিন আগে কথা হচ্ছিল ‘সুমেধা’র সাথে । সেদিনই প্রথম তন্দ্রাদির ফ্ল্যাট এ গেছি। টিংটং ডোরবেল বাজিয়ে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেই দেখা তন্দ্রাদির মেয়ে সুমেধার সাথে। কমপক্ষে ৫ ফুট ৬/৭ ইঞ্চি ১৭/১৮ বছরের এক সুন্দর ফুটফুটে কিন্তু দেখেই মনে হচ্ছিল ভীষণ আত্মবিশ্বাসী মনোভাবের মেয়ে। চা খেতে খেতে কথা হচ্ছিল সুমেধার সাথে। কথা বলেই মনে হচ্ছিল মা বাবার আদরের মেয়ে। মেডিকেল কলেজে ভর্তির পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। কথা হচ্ছিল অনেক কিছু, ইদানীং নাকি রান্না করতে শিখছে। বলছিল, ফেমিনিজম এ বিশ্বাস করে না, নিজেকে মেয়ে মেয়ে বলে ভাবতে ভাল লাগে না, নিজের মধ্যে একটা টম বয়িস টাইপ আছে বলে ওর ভাল লাগে। সব থেকে ভয়ংকর যে কথা বলল, যে যদিও ওরা নেট ওয়ার্ক, মোবাইল,সিসি টিভি ক্যামেরা ও আরও অনেক উন্নততর অনেক টেকনোলজি দ্বারা একে অন্যের সাথে জুড়ে আছে, তবুও যত দিন যাচ্ছে, আশে পাশে অবস্থা দিনে দিনে আরও খারাপ হচ্ছে, আজকাল ওরা নাকি নিজেদের বিপদ মুক্ত বলে মনে করে না। চতুর্দিকে একটা অস্থিরতা, ও ভয়ের পরিবেশ ছড়িয়ে আছে। আরও বলল, মেয়েদের নিয়ে সমস্যা, আগে যে রকম ছিল, এখন তার থেকে অনেক বেশি, ফারাক টা শুধু আগে এত নিউজ হত না, আজকাল সবই মিডিয়ার দৌলতে লোভনীয় সংবাদে পরিণত হয়। তার থেকেও যে মারাত্মক কথা যেটি বলল ,এই সবের জন্য নাকি দায়ী তারাই যারা তথাকথিত শিক্ষিত। একদম শুরু থেকেই কেন তথাকথিত শিক্ষিতরা অনন্ত নিজেদের পরিবার ও ছেলেমেয়ের মধ্যে সমভাবাপন্নতার প্রয়াস শুরু করে না, তাই নিয়ে কিছুটা ক্ষোভ ছিল। ওরা নিজেরা এই অসামঞ্জস্য দূর করতে এক পায়ে সবাই দাড়িয়ে, শুধু কীভাবে করবে তাই জানে না, ওরা ভয় পেতে চায় না, অন্যকেও ভয় পেতে দিতে চায় না।
            ওদের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এসে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম, কোথায় আছি আমরা, সব কিছু কি তাহলে, বিজ্ঞান। নিউটনের থার্ড ল --- এভরি একশন হেজ এন ইকুয়েল এন অপজিট রি- একশন। গ্লোবেলাইজেসন এর নামে নারী, মেয়েরা কি শুধু গ্লোবেলাইজড আইটেম হয়ে, ফেইসবুক , পোস্টারে, ব্যানারে , টিভি তে শুধু মিথ হয়ে থাকবে, মানুষ আর হয়ে উঠবে না । তেল , ইরাক, কুয়েত, সৌদি, আমেরিকা, সিরিয়া, রিফিউজি, আসাম, হিন্দু, মুসলিম, এন আর সি, প্যারিস এর জাঁতা কলে পিষে পিষে ধ্বংস হতে থাকবে মানুষ, আর তার ফলে নারী পাচার, নারী বাজার, আইএসআইএস এর রমরমা বাড়তে থাকবে, আর আমরা ভয়ের হাতে পুতুল হয়েই থাকব, আমারও সুমেধার মত মনে হচ্ছিল, কী করতে হবে ঠিক আমি জানি কি, কোন দিশায় আমি চলব, কোন পথে আমি পা বাড়াবো। সবাই তো সুমেধা বা আমার মত ভয় কে কাটিয়ে উঠার পরিবেশ পাচ্ছে না, আমিও বা আমাকে ভয় মুক্ত করার, আমাদের আশেপাশের সবার সহিষ্ণুতা বৃদ্ধির জন্য আমাদের ভূমিকায় আমরা কি অগ্রণী হতে পেরেছি। মনটা কেন খারাপ হয়ে গেল আবার অনেকদিন পর। যেই বুঝতে পারলাম মনটা অজানা ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে, মনে পড়ে গেল, কয়েকটা লাইন, কোথায় যেন পড়েছিলাম ......... “ THE ENEMY IS FEAR, WE THINK IT IS HATE, BUT IT IS FEAR AND ONLY FEAR…………….”
হঠাৎ করে মনে হচ্ছিল, সত্যি--- বলে না বনের বাঘে খায় না, মনের বাঘে খায়। মনের বাঘকে এক ফুঁয়ে ছুড়ে রাস্তায় কোনোমতে ফেলে দিয়ে বাড়িতে চলে এলাম। একটু পরেই মোবাইলটা বেজে উঠল, স্ক্রিন এ ভেসে উঠল আরাধীতাদির নাম। কয়েকদিনের মধ্যেই জড়িয়ে গেলাম গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির এবারের ১১ তম দ্বি বার্ষিক সম্মেলনের কাজের সাথে। ওদের সাথে আড্ডা, মীটিং এর ফাঁকে , আমার লুকিয়ে থাকা ভয়’গুলি যেন দুঃখের সাথে মুখ হাড়ি করে ছিল, আমি তো আরও এক আবর্তের মাঝে সবার সাথে আমরা হয়ে মিশে গেলাম, যেখানে ভয়ের প্রবেশ নিষিদ্ধ। এক অজানা আশায় আমার আমি, আশে পাশের আমি রা, এক অন্য ‘আমরা’ করব জয় ‘ভয়’ এর গন্তব্যে পাড়ি দিলাম। আসলে এই অভিব্যক্তি ভয় থেকে নির্ভয়ের পথে, আমাকে একটি পাঠ পড়ালো, যে যতদিন আমরা আমি থেকে বেরিয়ে সমষ্টিগত ভাবে আমরা হবোনা, সামাজিক ভাবে শুধু ভাল নয়, মন্দের ভাগ বাটোয়ারা আমাদের কাঁধে তুলে নেবো না, ভয়ের বাণিজ্যিক ঠিকেদাররা আমাদের ভয় দেখাতেই থাকবে, আর আমরা শুধু ভয় পেতেই থাকব......।
অফিসে জন্য দেরি হয়ে গেছে আজও......তাই আবারও হনহনিয়ে ছুটছি ...দূর থেকে সোনালি রোদে পিঠ পেতে বসা দিদি সহাস্যে বলল তুমি যে ঐ ছোট মেয়েদের সাথে পরিচয় আলাপ করিয়ে দিয়েছিলে, আমাকে কিভাবে ওরা যে সাহস জুগিয়েছে, তোমাকে কক্ষনো ধন্যবাদ জানিয়ে ছোট করব না, ...... অনুপ্রিয়াদের... ওদের... ‘উমিদ’ এর সাথে সাহস ভাগ করার পথে আমিও আছি, আমার মেয়েও আছে......আমি আর এখন ভয় পাই না রে......দিদি পরে দেখা হবে বলে...যেতে যেতে অনুভব করলাম...... কোথা থেকে যেন এক দমকা শান্তির আর স্বস্তির নিঃশ্বাস আমার মন প্রাণ ভরে দিল......।।










একটি মন্তব্য পোস্ট করুন