“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৫

স্পার্টাকাস

 

 

 

 
(C)Image:ছবি

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

© সুনীতি দেবনাথ



সেই সমুদ্রমেখলা হিল্লোলিত অরণ্য ঘেরা পৃথিবী
আকাশে পর্বতের তীক্ষ্ণ শিখরের ঔদ্ধত্যের স্পর্ধা
আমাদের পিতামাতারা ঘুরে বেড়াতো সেদিন
সেই অরণ্যছায়ায় সমুদ্রের কিনারায়।
পর্বতের গুহাকন্দরে কৃপণ সূর্যের আলো
বড় কোমল ছিল মুক্তির মত স্বচ্ছ পেলব।

একদিন আমাদের অরণ্যবাসী পিতামাতা দেখলো
নতুন এক সকাল এসেছে পাখপাখালি
মেতে উঠেছে সঙ্গীতে, বৃক্ষেরা আন্দোলিত,
সমুদ্র তরঙ্গে তরঙ্গে উল্লাসে মত্ত উদ্বেল
আকাশের নীলের উচ্ছ্বাসে নিষ্কম্প
এক স্থির আলোর রক্তিমাভা অন্য কোন দিগন্তে বিলীন।
বিস্মিত তারা ঘোর অরণ্য থেকে বেরিয়ে,
পাহাড়ের গুহা থেকে বেরিয়ে,বৃক্ষশাখার
নিশ্চিত আশ্রয় ছেড়ে ছুটলো নদীর দিকে
চলমান নদী তাদের করলো চলিষ্ণুতায় উন্মত্ত।
এ কী আলো! কী এর ইঙ্গিত!
সভ্যতার আদি লগ্নে সূচিত হলো মানুষের উত্থান
অপূর্ব অনুপম সেই আলোয় স্নান করে
সভ্যতার অন্য এক বিভাসিত দিগন্তের আহ্বানে
নতুন অনুভবে জেগেছিল আমাদের পূর্বপুরুষেরা।
প্রকৃতিকে জয় করে সক্ষম মানুষ মুক্ত ছন্দে ছন্দিত হলো।
মিশর মেসিডোনিয়া সুমের আর ভারত চীনে
নদী উপত্যকায় সে কী বিস্ফোরণ!
রোমান সাম্রাজ্যের উত্থান কী বিস্ময়কর!

সেদিন সেই বিস্ময়ের মাঝে,সেদিন সেই
অত্যাশ্চর্য মুহূর্তে মানুষের পিশাচ লোভ
গড়ে তুললো তার এক প্রবঞ্চক সত্ত্বাকে
যে সত্ত্বা অসভ্যতার নিকৃষ্টতম প্রকাশ।
একদল ক্ষমতাগর্বী মানুষ আত্মতুষ্টির উচ্চাসনে বসে
অন্য সব মানুষের হাতে পায়ে পরালো শিকল
শুরু হলো অফুরন্ত সম্পদ আকাঙ্ক্ষার উলঙ্গ নৃত্য
শুরু হলো সম্পদ-স্রষ্টা মানুষকে কেনাবেচা।
সেদিন বিবেক কেঁদেছিল ভূমধ্যসাগরের তীরে
সেদিন ক্রীতদাস কেঁদেছিল জলপাই গাছের আড়ালে।
কী গর্বিত স্পর্ধা! কী ভয়ঙ্কর লিপ্সা!
কুচক্রী শয়তান হেসে উঠলো খল খল
ক্রীতদাস সর্বস্ব হারিয়ে মানুষ নাম হারিয়ে কেঁদেছিল।
তার আত্মার অপমান ফুঁসেছিল, ভূমধ্যসাগরে ঝড় তোলেনি,
শুধু আত্মার গভীরে জমেছিল স্তরে স্তরে।
রোমান সাম্রাজ্য ভিত্তি গড়ে তুলেছিল সেদিন
ক্রীতদাসের শ্রম রক্ত অশ্রু জ্ঞান প্রেম আর মেধার মূল্যে,
সবকিছু সেদিন কিনে নিয়েছিল রোমান স্পর্ধা!

ক্রীতদাস তোমার জন্ম মৃত্যু জীবন সবই বিক্রি হয়,
ক্রীতদাস তোমার দীর্ঘশ্বাস প্রেম অশ্রুও বিক্রীত হয়।
বিলাসী স্বর্গ রচয়িতার ভোগের অধিকার নেই
প্লেটো এরিস্টটলও বলে গেছেন তোমাকে কেনা
একদম এক খেলাআলসে সময়ে ছিপ ফেলে মৎস্য শিকার!
স্পর্ধিত কণ্ঠে হুঙ্কার শোনা গেছে কেবল রোমানরা স্বাধীন
বাকি দুনিয়া ক্রীতদাস!
তোমার বোধ চেতনাও কি বিক্রি হয়েছিল সেদিন?
এমন কোন মূল্য দেবার ক্ষমতা সাম্রাজ্যগর্বী রোমের,
ক্ষমতালোভী স্পর্ধিত রোমের, পশুর মত হিংস্র রোমের
ছিল সেটা সত্য বলে মানিনা।
তাই জেগেছিল স্পার্টাকাস!
স্পার্টাকাস এক চেতনার নাম
মুক্তির নাম অজেয় অমর আত্মার নাম।
স্পার্টাকাস! স্পার্টাকাস!স্পার্টাকাস!

স্পার্টাকাস! আগ্রাসী রোম তোমার জন্মভূমি
থ্রীসিয়া গ্রাস করে বীর সৈনিক তোমাকে বন্দি করেছিল
তারপর তোমার শৌর্য বীর্যে মুগ্ধ লেনটুলোস বাটাইলাস
চড়া দামে কিনেছিলো সেদিন তোমাকে,
সেরা গ্ল্যাডিয়েটর বানাতে ভর্তি করেছিল
ক্যাপুয়ার স্কুলে, অমিত বিক্রমী হলে তুমি।
লেনটুলোস জানতোনা তোমাকে কেনার প্রচুর অর্থ
যদিও ছিল তার, কানাকড়ি ছিলনা
তোমার আত্মা বিবেক কেনার।
দাসত্বের বন্ধন মানেনা সে
আত্মা তার জ্বলে ধিকিধিকি মুক্তির আকাঙ্ক্ষায়।
অসহ্য শৌর্যবীর্যের বিক্রিত জীবন
আমি স্পার্টাকাস, চাই মুক্তি,
চাই হতে মুক্ত মানব নয় ক্রীতদাস!
লেনটুলোস মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল
কত যুদ্ধে লড়ে রোম সাম্রাজ্যের পরিধি
বাড়ালো স্পার্টাকাস।
একদিন জানা হয়ে গেল বিশ্বাসঘাতক লেনটুলোস!
এরা প্রত্যাশা জাগায় পূর্ণ করেনা,
না না না কখনো করে না।

স্পার্টাকাস ফেটে পড়ে প্রচণ্ড আক্রোশে
আকাশ বিদীর্ণ করে ভূমি চৌচির করে
স্পার্টাকাসের মুক্তির আকাঙক্ষা উন্মত্ত হয়ে ওঠে!
সাক্ষী থাকো পৃথিবী মা, সাক্ষী থাকো হে উন্মুক্ত আকাশ,
আর মুক্ত পবন, সাক্ষী থাকো হে সমুদ্র
মুক্তির প্রতীক সবাই,
আমি মানুষ মুক্তি জন্মের অধিকার,
আমি স্পার্টাকাস! বিশ্বাসঘাতকের বাঁচার
অধিকার নেই তাই মুক্তি হরণকারীকে
আমি হত্যা করেছি,আমার মুক্তির অধিকার আমার,
আমি মুক্তি চাই , ক্রীতদাস মুক্তি চায়!

এবার যুদ্ধ ! এ যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধ!
থার্ড সারভাইল ওয়ার! লেনটুলোসকে হত্যার পর
স্পার্টাকাসকে নেতা করে হাজারো ক্রীতদাস
জেহাদ ঘোষণা করলো, বেরিয়ে পড়লো
ফেটে পড়লো বিদ্রোহে। ক্রীতদাসের মুক্তির অভিযান।
তিয়াত্তর খ্রিস্ট পূর্বাব্দের সেই ভীষণতম লড়াইয়ের
ভয়াবহ দিনগুলি আজ কল্পকথা মনে হয়।
সে এক কৌশলী যুদ্ধ চিরকালের বিক্রিত মানুষের
অভিনব মুক্তির যুদ্ধ।মুক্তিকামী সত্তর হাজারেরও বেশী
ক্রীতদাস সেদিন এক সুসংবদ্ধ মুক্তিকামী বাহিনী হলো।
একাত্তর খ্রিস্ট পূর্বাব্দের
শীতল শীতের বাতাস হু হু বইছে তখনো
শকুনির মত শ্যেন দৃষ্টি নিয়ে মত্ত রোমান বাহিনী পশ্চাতে
আর দৃপ্ত পদক্ষেপে পৃথিবী আকাশ কাঁপিয়ে সারিবদ্ধ ক্রীতদাস বাহিনী
এগিয়ে চলেছে নির্ভয়,স্পার্টাকাসের বাহিনী!
মারকুস ক্রেশুশ সুউন্নত পঞ্চাশ হাজারী সেনানী
নিয়ে দাপিয়ে আসছে। খণ্ড যুদ্ধে তাদের পরাস্তও করলো
সেই সে সময় স্পার্টাকাস।
অবশেষে ভিসুভিয়াসের সুউচ্চ শিখরে তারা, '
তাদের ঘিরে প্রহরায় রোমান বাহিনী
যেন এক কণা খাবার না জুটে।
আর স্পার্টাকাস বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে
বুনো লতার রজ্জু ভর করে বাহিনী সুদ্ধ ওপারে।

তারপর কত যুদ্ধ কত কৌশলী চলাচল
ওপাশ থেকে পম্পেই এলো নতুন বাহিনী নিয়ে
ভয়ানক সে যুদ্ধ স্পার্টাকাসের বাহিনী ভেঙ্গে ছত্রখান।
কেউ বলে স্পার্টাকাসকে হত্যা করা হয়েছিল।
স্পার্টাকাসকে হত্যা? অসম্ভব বলে কেউ।
স্পার্টাকাস চির বিজয়ী, তাকে হত্যা?
তার মৃতদেহ তো দেখেনি কেউ!
দৃপ্ত পদক্ষেপে আল্পস পেরিয়ে দক্ষিণে
চলে গেছে সেই মুক্তিদূত!
স্পার্টাকাস মরেনি হার মানেনি!

তৃতীয় সারভাইল যুদ্ধ, সেই অন্যায় অসম যুদ্ধে
হাজার হাজার ক্রীতদাস লাশ হয়েছিল
লুটিয়ে পড়েছিল মাটিতে, যে মাটি তোমার আমার মা।
ছয় হাজার ক্রীতদাস রোমান বাহিনীর হাতে বন্দি হলো
ছয়টি হাজার! তারপর সেই সুদীর্ঘ পথ,
রোম থেকে ক্যাপুয়া তার পাশে সারি দিয়ে
ক্রুশবিদ্ধ করা হলো তাদের, মুক্তিকামী ক্রীতদাস
গ্ল্যাডিয়েটরের স্পন্দিতদেহকে।
কী বীভৎস দৃশ্য! কী কুৎসিত সভ্যতার নগ্ন অত্যাচার!
স্পার্টাকাস আজ কিংবদন্তী
মানব মুক্তির সংগ্রামে উচ্চারিত শৃঙ্খল মুক্তিকামী
উজ্জ্বলতম নাম স্পার্টাকাস! স্পার্টাকাস!




........................................................................................................
কবিতাটির আবৃত্তি এখানে  শুনতে পাবেন! করেছেন জনাব বদরুল আহসান খান সাহেব, বাংলাদেশের বিখ্যাত আবৃত্তি শিল্পী। 


কোন মন্তব্য নেই: